সমরেশ মজুমদার

জলের মতো রং ছিল সেদিন আকাশের। সুরমা বিছানায় শুয়ে ছিল। সুরমা রুগণ। বাবুল বারান্দায় রেলগাড়ি চালাচ্ছিল। সতীশ রথের মেলা থেকে বাবুলকে রথ কিনে না দিয়ে রেলগাড়ি কিনে দিয়েছিল। রেলগাড়ির চাকায় সামান্য শব্দ হচ্ছিল; পাখি ডাকছিল আকাশে। ভোরের সূর্য উঠে আসছে। জানালায় পাতাবাহারের গাছ। গাছে লাল, নীল, হলুদ পাতা। বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় পাতার উপরে পরিচ্ছন্ন ভাব; সতেজ এবং স্নিগ্ধ। বাবুল গাড়ি চালাতে চালাতে ডাকল, বাবা আমার গাড়িটা চলছে না।
সতীশ গাড়িটাতে দড়ি বাঁধা দেখল। গাড়ির চাকা ঘুরছে না বলে বাবুল দড়ি ধরে টানছে এবং চালাবার চেষ্টা করছে। সতীশ নুয়ে গাড়িটা উলটে দিল। আর পিন লাগালে গাড়ির চাকা আবার ঘুরতে থাকল। বাবুল রেলগাড়িটা টানতে টানতে দেয়ালে বোধহয় পাখি দেখল, বোধ হয় পাখি উড়ে গেলে দেয়ালে সে নিজের ছায়া দেখে থেমে গেল এবং কেমন ভয় পেয়ে বলল, বাবা তুমি আমার পাশে বসবে।
বুঝতে না পেরে সতীশ বাবুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। বড় চোখ বাবুলের। হাসলে গালে টোল পড়ে। কালো রং। মুখের ভিতর চোখ দুটোই সার। ছোট করে ছাঁটা চুল এবং মুখশ্রীতে কেমন যেন জাদু আছে। যেন দূরের কোনও মাঠে বৃষ্টিপাতের পর সামান্য জ্যোৎস্নায় ছোট্ট শিশু দুহাত তুলে ছুটছে। সতীশ মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, কী বললে?
বাবুল এবার গাড়িটা বগলে নিয়ে সতীশের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, এখানে তুমি আমি বসব। বলে সে ইঞ্জিনের দিকটাতে স্থান নির্দিষ্ট করলে সতীশ বলল, মা কোথায় বসবে? কথা শুনে বাবুল একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। মা পাশে না বাবা পাশে? কে পাশে বসবে এ-মুহূর্তে কিছুই স্থির করতে পারল না। ওর চোখে-মুখে ক্লিষ্ট এক ভাব ফুটে উঠছে। সুতরাং সতীশ বলল, তুমি যেখানে বলবে আমরা সেখানেই বসব। তোমার গাড়িতে কে কোথায় যাবে তুমিই ঠিক করবে। বাবুল এবার গাড়িটা ফেলে মায়ের কাছে ছুটে গেল। সুরমা এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। ওর দেরি করে ওঠার অভ্যাস। ঝি আসবে। এসে সব হাতের কাছে এনে দিলে সে রান্না করবে। ওর পেটে কী যেন কষ্ট সব সময়। সামান্য অপারেশনের দরকার। এবং অপারেশন হলেই সুরমা মরে যাবে এমন একটা ভয় তার। বাবুল বিছানার পাশে আসতেই সুরমা মাথায় হাত রাখল। বলল, ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে খেলতে নেই। এখন পড়তে বোস। এমন কথায় বাবুল বিষণ্ণ হয়ে গেল। সতীশের দিকে না তাকিয়েই বলল, বাবা তুমি আমার পাশে বসবে। মা দিদি পিছনে বসবে। ভোর হলে সূর্য আপন মহিমায় যেমন আকাশে উঠে আসে, এই বাবুল, ছোট্ট বাবুল সেইরকম দাপাদাপি করে এই সংসার ভরে তুলছিল। পড়ার কথায় সে বিষণ্ণ হয়ে গেল।
—তার পিছনে কে বসবে? কারণ বাবুলের গাড়ি চার কামরার। সে এবার কী ভাবল। জানালায় পাতাবাহারের গাছ। তারপর পথ। এই প্রাসাদের মতো বাড়ির ভিতর এক ফালি ঘর নিয়ে সতীশ রয়েছে। স্ত্রী সুরমা আছে। এই বড় বাড়ির দুপাশে ফুলের বাগান। বাগানে কত বিচিত্র ফুল। এবং বাগান পার হলে পুকুর, পাড়ে পাড়ে আমলকী গাছ। এখন কী মাস সতীশের যেন মনে আসছিল না। ওই আমলকী গাছের ছায়া এবং বন তার পরে মাঠ, মাঠ পার হলে রেল কলোনির লাল ইটের বাড়ি এসব তার মনে আসছিল।
বাবুল তখন বলল, তার পেছনে দিদিমা।
—আর কেউ নয়?
—না।
—তোমার ঠাকুমা ঠাকুরদা।
এবারেও সে দ্বিধায় পড়ে গেল। সে কিছু না বলে গাড়িটাকে টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর একটা চেয়ারে বসে ইতিহাসের পাতা খুলে পড়তে বসল। রাম-রাবণের ছবি। রামের মাথায় রাজার টুপি। বড় লম্বা টুপি দেখলে বাবুলের মনে হয় বুঝি রাজার টুপি। সে বাবাকে কতবার এমন একটা টুপি কিনে দিতে বলেছিল, সতীশ বলেছিল রথের মেলা থেকে কিনে দেবে। কিন্তু রথের মেলা থেকে না রথ, না টুপি। সে লম্বা এক রেলগাড়ি কিনে এনেছে।
বাবুল কী ভেবে ফের নিবিষ্ট হল ছবিতে। সতীশ কী ভেবে জানালাতে পাতাবাহারের গাছ দেখল। আর সুরমা দরজায় উঁকি দিয়ে দেখল ঝি মঙ্গলা এসেছে কি না। অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি উঠে বসল। ক্লান্ত এবং বিষণ্ণ চোখ সুরমার। দুই সন্তানের জননী সুরমা। চোখে-মুখে বিস্বাদের ছাপ শুধু। সে উঠতেই বাবুল বলল, আমি আর পড়ব না মা।
—কেন পড়বে না?
—বাবা বলেছিল টুপি কিনে দেবে, রাজার টুপি। টুপি না দিলে আমি পড়ব না। বলে সে একটা খাতা টেনে ছবি আঁকতে বসে গেল।
সুরমা ধমক দিল এবার।—বাবুল তুমি পাকা কথা বলবে না। এখন পড়াশোনা করো। কেবল ছবি এঁকে খাতা নষ্ট করা। সতীশ এলে বলল, তোমার ছেলেমেয়েকে বলে যাবে দুপুরে বাইরে বের না হতে।
এই এক ভয় সুরমার। সুরমার কেন সতীশেরও। বাড়ির বাইরে ফুলবাগান, বাগান পার হলে বড় জলাশয়। জলে কালো রঙের শ্যাওলা। এবং বড় গভীর। এত বড় বাড়ির এক কোনায় সতীশের তিন কামরার ঘর। প্রাসাদের মতো এই বাড়ির কোনও ভগ্নাংশে যেন সতীশ এবং সুরমা তাদের দুই সন্তানের প্রতি স্নেহ নিয়ে জীবনের বাকি অংশটুকু কাটিয়ে দিচ্ছে। সতীশের ভয়, বাবুল একা একা—যখন সুরমা দুপুরে ঘুমিয়ে পড়বে, যখন নির্জন দুপুরে পাতাবাহারের গাছে কিছু পাখি ডাকবে—তখন এই বাবুল তালপাতার টুপি মাথায় দিয়ে কাঁধে খেলনার বন্দুক নিয়ে দৈত্য শিকারে বের হয়ে পড়বে। আর সঙ্গে থাকবে মিন্টু। দুই ভাইবোনে চুপিচুপি বের হয়ে ফুল ফল পাখির জন্য দারোয়ানদের খুপরি ঘরগুলো অতিক্রম করে আমলকীর বনে হারিয়ে মার অসুখের দৈত্যটাকে খুঁজবে।
এই বড় শহরে এসে সুরমার স্বাস্থ্য ক্রমে ভেঙে গেল। সতীশ সেই পাতাবাহারের পাতা দেখতে দেখতে কথাটা ভাবল। এই বড় শহরে নি:সঙ্গ সে। ক্রমে সে অস্থির হয়ে উঠছে। কারখানার কিছু কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ছে এ সময়। সতীশ একদা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করত। সুরমা শিক্ষয়ত্রী ছিল। বড় মাঠ ছিল সামনে। মাঠ পার হলে স্টেশন। স্টেশনে রেলগাড়ি এসে থামত। বাবুল আর মিন্টু রেলগাড়ি এলে জীবন দপ্তরির কাঁধে মাঠ পার হয়ে স্টেশনে উঠে যেত। বারান্দায় ইজিচেয়ার থাকত। সুরমা এবং সতীশ বসে বসে ওদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দেখত। এখন কেন জানি সে সব ছবি স্বপ্নের মতো মনে হয়। এখন শুধু কানে কারখানার ঘণ্টা পেটানোর শব্দ ভেসে আসে। কে যেন অন্ধকারে লাল বলের মতো এক অগ্নিগোলক ঝুলিয়ে রেখেছে এবং কারা যেন মাথায় রাজার টুপি পরবে বলে ক্রমান্বয় ঘণ্টা পিটিয়ে যাচ্ছে। এই ঘণ্টা পেটানোর শব্দ কানে এলেই সতীশের হাত-পা কাঁপতে থাকে। কেবল মনে হয় কারা যেন সব সময় হল্লা করে ওর পেছনে ছুটে আসছে। আজ সোমবার। বোনাস সম্পর্কে শ্রমিক পক্ষ থেকে কথা বলতে আসবে। কথায় কথায় বচসা হবে।...নানারকমের ভয় ভীতিতে ওর গলা শুকিয়ে আসছিল। সে ঝি মঙ্গলাকে ডাকল; জল, এক গ্লাস জল দিতে বলল মঙ্গলাকে। তারপর জলটা ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলল এবং সুরমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আজ ফিরতে দেরি হতে পারে। অযথা আমার জন্য ভাববে না।
সুরমা মুখ ফেরাল না। বলল, তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।
—কী কথা?
—বাবার চিঠি এসেছে। অফিস ফেরত চিঠি পড়ে মাথা ঠিক রাখতে পারবে না বলে দিইনি।
সতীশ সামান্য হাসল।—কই দেখি চিঠিটা। সুরমা বালিশের নিচ থেকে চিঠি বের করল এবং সতীশের হাতে দেবার সময় বলল, এ নিয়ে তুমি মাথা গরম করবে না। সুরমা সতীশকে শপথ করাতে চাইল। সতীশ জবাব দিল না। চিঠির ভাঁজ খুলে সেই বৃদ্ধ মানুষটির হস্তাক্ষর দেখল। হস্তাক্ষরে সতেজ সবল ভাবটা ক্রমে কেটে যাচ্ছে। পরম কল্যাণবর—এখন এই শব্দ এবং অর্থ ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। সতীশ গত মাসে বাড়িতে নিয়মিত যে টাকা দেয় তা দিতে পারেনি। তার কোম্পানির অবস্থা খারাপ হবার দরুণ রোজগার কমে গেছে। সুতরাং বাজেট ঘাটতি। বাবা নিশ্চয়ই চিঠিটা খুব রেগে গিয়ে লিখেছেন। সে পড়ল—তুমি অবিবেচক হয়ে পড়েছ। শুনেছি তোমার আয় পাঁচশত টাকার মতো। আমাকে প্রতি মাসে একশত টাকা দাও। আমরাও চারজন, তোমরাও চারজন।...এ মাসে সেই সামান্য দান তুমি আরও সংক্ষিপ্ত করেছ। এই বৃদ্ধ বয়সে অনাহারে দিন যাপন করতে হবে ভাবতে কষ্ট লাগে। কল্যাণীর সম্বন্ধ এসেছিল। পাত্রপক্ষ কলকাতায় তোমার বাসার কাছেই থাকে।...সতীশ কেমন অন্যমনস্কভাবে চিঠিটা পড়ছে। পাত্রপক্ষের খোঁজ খবর নেবে। নিম্নে ঠিকানা দেওয়া থাকল। শেষে আরও অস্পষ্ট কয়েকটি শব্দ। সতীশ চোখের কাছে এনে উদ্ধার করতে পারল। যতীনের আবার একটি মেয়ে হয়েছে। দাদা কি খেপে গেলেন। সতীশ কেমন অসহিষ্ণু গলায় না বলে পারল না। এবার পত্রের খুব নিচে 'পুন:' এই শব্দ ব্যবহারে চিঠি শেষ করেছেন। তুমি লিখেছ একা তোমার পক্ষে সংসারের দায়দায়িত্ব বহন করা ক্রমে কঠিন হয়ে পড়েছে। তুমি বলতে চাইছ, যতীন সংসারে সামান্য সাহায্য করুক। যতীন রেলে চাকুরি করে। সামান্য তিনশত টাকা মাহিনা। ছয়টি কন্যাসন্তান এবং ওরা দুজন। তাও বড় মেয়েটিকে আমি এ-মাসে নিয়ে এসেছি বলে রক্ষা। তিনি যেন দয়া করে পত্র শেষ করেছেন। চিঠিটা সতীশ ভাঁজ করে সুরমাকে দিয়ে দেবার সময় কথাটা না ভেবে পারল না।
বাবার এই এক অজুহাত। সংসারে সতীশ সামান্য বেশি আয়ের চাকুরি করে বলে এবং বিদ্বান বলে সব চাপ ওর ওপর। সুরমা সংসারে বড় ঘর থেকে আসায় এবং মা-বাবার অমতে বিবাহের দরুন সকলেই সুরমার প্রতি যেন সংগোপনে আক্রোশ বহন করে বেড়াচ্ছে। কারণ বিয়ের আগে, সতীশ শেষ কপর্দক মায়ের হাতে দিয়ে দিয়েছে এবং সংসারে সেই প্রায় সব ছিল। কোথাকার এক উটকো যুবতী এসে সতীশকে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। সতীশ চিঠিটা সুরমার হাতে দিয়ে বলল, ভেবেছি বাবুলকে দাদার কাছে দত্তক দিয়ে দেব।
সুরমা বলল, তার মানে?
সতীশ হাসতে হাসতে বলল, দাদার পুত্রসন্তানের বড় শখ।
—শখ না বলে বলো স্বার্থপর মানুষ। সুরমা খেপে গেল। এই মানুষ সতীশ যেন উৎসর্গকৃত প্রাণ। সব দায় দায়িত্ব তার। কেন বাপু—সুরমার রুগণ হাত-পা কাঁপতে থাকল, অন্য দুই ভাই আছে তোমার, ওরা কাজ করছে। লেখাপড়া শেখাবার চেষ্টার ত্রুটি তো তুমি করোনি। শুনেছি তুমি টিউশান করে, পত্রিকা হকারি করে তোমার পড়ার খরচ চালিয়েছ। আর তুমি ছোট ভাইয়ের পড়ার জন্য কী না করেছ—ওরা মানুষ না হলে কার দায়! সামান্য একটানা কথা বললেই সুরমা বড় বেশি কাতর হয়ে পড়ে। সে বিছানায় উঠে বসল।—ওরাও কিছু কিছু করে বাবাকে সাহায্য করতে পারে।
সতীশ তেমনি সরল সহজ মুখে বলল, দেখলে তো মাথা খারাপ কে করছে!
সুরমা বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, আমার বাবুলকে আমি দিতে যাব কেন?
—না দিলে দাদা রেস চালিয়ে যাবে। সতীশ ঠাট্টা করে বলল।
—রেস চালালে দারিদ্র্য বাড়বে। তাতে আমার কী। সুরমা ক্রমে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। সতীশের ভালো লাগছিল সুরমাকে রাগিয়ে দিতে। বলল, দাদার কাছে থাকাও যা আমার কাছে থাকাও তাই। সতীশ বারান্দায় নেমে গিয়ে সুরমার মুখ দেখতে চাইল।
—বাবুল আমার। সংসারে তুমি তোমার মা-বাবা দাদার জন্য সব করতে পার। আমি পারি না। তোমার যা চাকরি—কবে কোনদিন সব যাবে আমাদের। আমরা পথে গিয়ে দাঁড়াব। কী সঞ্চয় তোমার বলো? এতদিন চাকরি করে কী করেছ তুমি? মিন্টু বড় হচ্ছে। ওদের দিকে তুমি একবার ভালো করে তাকাও। তোমার কারখানা, শ্রমিক, মা-বাবা-দাদা ওরাই সব। তারপর আরও কী বলতে গিয়ে সুরমা থেমে গেল। এই এক অভ্যাস সুরমার। রেগে গেলে সকলকে টেনে আনবে। কোথায় যেন সুরমা অনিশ্চয়তায় ভুগছে। সতীশ নিজেও মাঝে-মাঝে জীবনযাপনের নিরাপত্তাবোধের অভাবে ভুগছে। কারখানার ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। ক্রমে ক্রমে ঋণ বাড়ছে এবং কারখানার নাভিশ্বাস উঠছে। সে যেন কোনওদিকে পথ খুঁজে পাচ্ছে না। পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং প্রাচীন সব পদ্ধতির জন্য প্রতিযোগিতায় ক্রমে তারা হটে যাচ্ছে। ফলে কারখানার দৃশ্য চোখের ওপর ভেসে উঠলেই মনে হয়, এক বড় অগ্নিগোলক, অতিক্রম করতে পারলেই রাজার মাথায় টুপি। সতীশ বারবার প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেই অগ্নিগোলক অতিক্রম করতে পারছে না। সতীশ জামাকাপড় পরার সময় ভাবল, বাবুলকে আজ হোক কাল হোক, সে একটা টুপি কিনে দেবে। সে রাজার টুপি পরে রাম অথবা রাবণ সেজে বাবাকে ভয় দেখাবে। সে ডাকল, বাবুল তোমার পড়া হয়েছে?
কোথায় বাবুল! তখন বাবুল টেবিলের নীচে বসে মার অসুখের দৈত্যটাকে খুঁজছে। হাতে বন্দুক, কোমরে বেল্ট এবং তাতে আঁটা চকচকে লোহার পাত। সব রাংতা দিয়ে মোড়া। মনে হয়, বাবুল যথার্থই সৈনিক সেজে এই সংসার থেকে সব অমঙ্গল দূর করে দিতে চাইছে। বের হবার মুখে সুরমা ফের সতীশকে বলল, তুমি বারণ করে যেয়ো।
সতীশ বলল, মিন্টু, তুমি বাবুলকে নিয়ে দুপুরে বের হয়ে যাবে না।
বাবুল টেবিলের নিচে থেকে বলল, না বাবা, আমি বের হব না। দিদি আমাকে কেবল যেতে বলে। সতীশ বলল, তুমি যাবে না। তুমি সাঁতার জান না। জলে পড়ে গেলে কেউ টের পাবে না। তারপর ভয় দেখানোর জন্য বলল, পুকুরটাতে বড় একটা অজগর সাপ আছে। যাবে না। গেলেই খেয়ে ফেলবে। এক জলাশয়ের দৃশ্য সতীশকে কেমন ভীত বিহ্বল করে রাখে। অথবা অফিসে সময় সময় অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে মনে হয়, বাবুল এবং মিন্টু যেন এক প্রাচীন দিঘির পুরনো ভাঙা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কী যেন তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মা রুগণ। মা সারা দিন শুয়ে থাকেন। মার জন্য বনের ফুল ফল অথবা মার জন্য অমৃত ফল তুলে আনতে হবে। জলাশয়ের পাড়ে পাড়ে ওদের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য সতীশকে মাঝে মাঝে বড় অন্যমনস্ক করে দেয়।
পথে বের হলেই মিশনারিদের এক বড় দেয়াল এবং সদর গেট। একটু পথ হেঁটে বাসে উঠতে হয়। সেখানে এক কুষ্ঠরুগির মুখ, তার হাত হাওয়ায় নিয়ত দুলতে থাকে। বয়সে প্রাচীন সেই নারীর গলিত শবের মতো হাত-পা-মুখ; আর কী করুণ ইচ্ছা তার দু-হাতে সূর্য স্পর্শ করার। সতীশ এখানে এলেই সামান্য সময় দাঁড়ায়, কিছু সাহায্য দেয়।...তারপর যদি তুমি কোনওদিন দ্যাখো সংসারের সব দুর্যোগ তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে? এমন কথা মনে হয় তখন? সতীশ তখন ছুটে পালাতে চায়, কিন্তু কে যেন তখন পাখির মতো ডেকে ডেকে বলে, বাবা তুমি আমায় রাজার টুপি কিনে দেবে না? তুমি আমাকে বড় মাঠে নিয়ে যাবে না?
অফিসে ঢুকেই সতীশ শুনল, দুজন লোক ওর সঙ্গে দেখা করবে বলে বসে আছে। সে টেবিলের উপর কিছু চিঠি পড়ে আছে দেখতে পেল। লোক দুজন বাইরে বসে আছে। সে বেল টিপে অবিনাশবাবুকে ডাকল। বলল, কারা এসেছে? কী চায় ওরা? ইউনিয়ন থেকে আসেনি তো! সতীশ ওদের ডাকল। এবং বলল, আপনি বসুন অবিনাশবাবু। ওরা এলে বলল, কী চাই? ওরা জবাবে বলল, স্যার প্টে কিনতে চাই।
সতীশ এবার চেঁচিয়ে উঠল।—এখানে প্টে বিক্রি হয় না। এখানে প্টে কেনা হয়। সে কেন জানি সহসা মাথা গরম করে ফেলল। মাথা গরম করা বুদ্ধিমানের লক্ষণ নয়। সে খুব শান্তশিষ্ট বালকের মতো মুখ করে বসে থাকার চেষ্টা করে দেখল, ওরা কিছু বলার চেষ্টা করছে।—বলুন। ওরা সাহস পেল যেন বলতে। স্যার অনেক কোম্পানি তো আজকাল কোটা বের করে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
আমরা দিচ্ছি না। অথচ সতীশ জানে আজকাল ব্যবহারের চেয়ে বিক্রি ভালো। বিক্রিতে লাভ বেশি। কর্তৃপক্ষের বিক্রির দিকে একটা ঝোঁকও আছে। অথচ এইসব মিথ্যাভাষণের দায়দায়িত্ব তার থাকবে। সে অত্যন্ত কষ্ট করে যেন বলল, এখানে তা হয় না। লোক দুজন উঠে গেলেই একটা কোলাহল শুনতে পেল। সকলে মিলে অফিসের দিকে ছুটে আসছে। ফ্যাক্টরির ভিতর মোটর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চাকা থেমে গেছে।—কী, কী হল? সতীশ অবিনাশকে বলল, দেখুন তো কী ব্যাপার! ওরা সকলে ছুটে আসছে কেন? তখন বাইরে গলা পাওয়া গেল—স্যার অ্যাকসিডেন্ট। তেওয়ারীর হাত উড়ে গেছে। এখন অ্যাকসিডেন্ট রিপোর্ট—হাসপাতাল এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। ওদের কোলাহল আসছে না। সতীশ অন্য এক সহকারীকে ডেকে বলল, ওরা সকলে বাইরে কেন? ওদের ভেতরে যেতে বলুন, কাজ করতে বলুন। আমি সব ব্যবস্থা করছি।
দুজন লোক তেওয়ারীকে হাসপাতালে নিয়ে চলে যাচ্ছে। সতীশ ওদের ডেকে বলল, এবার তোমরা বলো কী বলবে?
—স্যার পাঞ্চিং মেশিন খারাপ ছিল।
—সুপারভাইজারকে রিপোর্ট করেছ?
ওরা বলল, করেছি। তবু সুপারভাইজার ওকে কাজ করতে বলেছেন।
সতীশ মনে মনে হাসল। কারণ এমন সব অভিযোগে সব সময় সত্যমিথ্যা জড়িত থাকে। শ্রমিক পক্ষ সব সময় কর্তৃপক্ষের ওপর দোষটা চাপাতে চায়, কর্তৃপক্ষ শ্রমিকপক্ষের ওপর। সে কী চিন্তা করে বলল, চলো দেখছি। ভিতরে ঢুকে সে নিজেই প্যাডেলে চাপ দিল এবং বলল, কই ডবল তো পড়ছে না। ঠিক আছে মেশিন। নিশ্চয়ই তেওয়ারী অন্যমনস্কভাবে কাজ করছিল। তারপর সে চাবিটাতে হাত দিলে বুঝল ভিতর চাবির ঘাট ক্ষয়ে গেছে। ঘাট ক্ষয়ে গেলে মাঝে মাঝে চাবি ধরবে না এবং ডবল পড়ার সম্ভাবনা আছে। ভিতরে ভিতরে তার বুক কাঁপছিল। মেশিন আজই খুলে ফেলতে হবে। অন্য চাকা এবং চাবি লাগিয়ে দিতে হবে। সে অজুহাত বের করার তালে চারিদিকে কী খুঁজে দেখল। কিছু ভাজাভুজির অংশ নিচে এবং নিচের দিকে চোখ রেখেই বলল, এখানে এসব কেন? নিশ্চয়ই খেতে খেতে পাঞ্চিং চালাচ্ছিল তেওয়ারী। সে অভিযোগটাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিতে পারলে কোনও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন থাকবে না। দায় দায়িত্ব সব শ্রমিকের। ইউনিয়নের দুজন পান্ডা লোককে ডেকে চারপাশটা দেখালে—এখানে এসব কী হয়। সে সুপারভাইজারকে পর্যন্ত শাসাল। ঘটনাটাকে এবার হুশ করে কাক তাড়ানোর মতন ফুস মন্তরে মুছে দিতে চাইল।
সে রিপোর্টে লিখল কাজে অন্যমনস্কতা এবং দুর্ঘটনা। দুজন শ্রমিককে সাক্ষী নিয়ে রিপোর্ট লিখে দিতেই প্রাণের ভিতরে কেমন যেন এক রক্তশোষা জীব উঁকি দিয়ে ফের রক্তের ভিতরে ডুবে গেল। যা হয়, প্রাণের চেয়ে মানের মূল্য বেশি, দুই মুখ তখন উঁকি দেয়—মিন্টু বাবুলের মুখ। রক্তশোষা জীব যেন এবার ওদের তেড়ে যাচ্ছে। বাবুল একবার ছবিতে রাম-রাবণের যুদ্ধ দেখেছিল। যুদ্ধ দেখে বলেছিল, বাবা আমি রাম সাজব। আমাকে রাজার টুপি কিনে দেবে বাবা। রিপোর্টে সই করার পরই সতীশের মেজাজটা কেমন রুক্ষ হয়ে গেল। রথের মেলা থেকে রাজার টুপি কিনতে হবে সেকথা সে ভুলে গেল।
সে অফিসে বসে অন্যমনস্কভাবে কতগুলি বিল সই করল। চিঠি সই করল। চিঠি অথবা বিল সই করার সময় অন্যান্যদিনের মতো সে সবটা পড়ে সই করল না। এমন কী একবার চোখও বোলাল না। এই এক বিশ্রী অভ্যাস তার, ভিতরে কোনও পাপবোধ কাজ করতে থাকলে সে কেমন ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। সংসারের বিবিধ কারণ শিয়রে তার সোনার কাঠি রাখতে দিচ্ছে না। সে অসহায় আর্ত এক মানুষ। তার আদৌ ইচ্ছা ছিল না তেওয়ারীর রিপোর্ট এমন হোক। তবু কার জন্য, বুঝি দুই শিশুসন্তান এবং যুবতী রুগণা স্ত্রী আর মা-বাবা ভাইবোনের কথা ভেবে সোনার কাঠি সে শিয়রে রাখল না। সব ফেলে দিয়ে সে কেমন অমানুষ এবং ক্রীতদাস হয়ে গেল।
ট্যাক্সিতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় তেওয়ারীর বউটা কাঁদছিল। জানালা দিয়ে সতীশ সেই মুখ দেখল। সতীশ ক্রমে খেপে যাচ্ছে। এই ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না সে সহ্য করতে পারছে না। ক্রমে সে অসহায় হয়ে পড়ছে। সে উঠে দাঁড়াল এবং অফিসের ভিতর পায়চারি করতে থাকল—যেন সে সাহস সঞ্চয় করছে। সে অবিনাশকে ডেকে বলল, ওদের এবার যেতে বলুন। এখানে কান্নাকাটি করে আর কী হবে। বস্তুত সতীশ এখন নিরালম্ব মানুষের মতো। সংসারের অন্ধকারে এক কালো ঘোড়া আছে, তাতে চড়ে নিরন্তর ডাইনি-বুড়িটা মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে যেমন হয়—কোনও দু:খের ছবি, আর্তের কষ্ট আর—নিরাপত্তাবিহীন জীবিকা দেখলে যেমন হয়, সংসারে পাখি ওড়ে না। মরুভূমির মতো মাঠ শুধু সামনে, আর এক উট—দীর্ঘ পথবাহী নদী নালা বিহীন মাঠে অনবরত উট ছুটছে। সতীশ তেমনি নিজেকে কীসের আশায় ছুটতে দেখল। কারা যেন পেছনে তাড়া করছে; ফুটপাথের বাসিন্দা, অনাহারে মৃত বালকের ছবি এবং সেই কুষ্ঠরুগি। সে এবার চিৎকার করে উঠল, অবিনাশবাবু।
—আজ্ঞে আমাকে ডাকছেন, স্যার!
—দ্যাখুন তো তেওয়ারীর বউটা এখনও কাঁদছে কি না।
—না স্যার, কাঁদছে না। কখন ওরা চলে গেছে!
সতীশ কেমন নিশ্চিন্ত মনে এবার বসে পড়ল। সে দুই হাতলে হাত রেখে শরীর সোজা করে দিল। কোনও দিকে তাকাল না। বোনাস সম্পর্কে কথা বলতে হবে আজ, সম্ভবত ঘেরাও করবে শ্রমিকেরা এবং ওদের দাবিদাওয়া নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি হবে। সে নিজেকে রক্ষা করার জন্যে কোম্পানির যে কী ভয়ংকর দুরবস্থা চলছে, আর এ-ভাবে চললে বেশিদিন কাজ চালানো যাবে না, উৎপাদন না বাড়ালে প্রতিযোগিতায় হটে যেতে হবে—এ-সব নিয়ে নিজের মনেই যুক্তিতর্কের জাল বিস্তার করতে করতে কখন দেখল সতীশ আর সতীশ নেই—সে এক ভাঙা রেলগাড়ি হয়ে গেছে। ওকে সাইডিং-এ ফেলে ঝকঝকে নীল রঙের ট্রেন ওর সামনে ছুটে বের হয়ে যাচ্ছে। সে এবার সোজা হয়ে বসল এবং বলল, হবে না। শ্রমিকরা বলল, তা কী করে হয়। সে বলল, পাঁচ বছরে আমি তোমাদের বেতন ডাবল করেছি, তোমরা উৎপাদন এক বিন্দু বাড়াওনি। কোম্পানি সেই অনুপাতে মালের দাম বাড়াতে পারেনি। আমরা ক্রমশ হেরে যাচ্ছি—কোম্পানির ক্রমশ ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বলা নিরর্থক, ওরা কিছুই শুনবে না। উৎপাদন বাড়াবে না। সে এবার বলল, সরকার তোমাদের বোনাসের যে রেট বেঁধে দিয়েছেন। তাই পাবে। মানে ফোর আর ফরটি...বলে সতীশ শেষ করতে পারল না। সমস্বরে চিৎকার শোনা গেল—আমাদের দাবি মানতে হবে,। সতীশ এবার অবিনাশবাবুর দিকে তাকাল। অবিনাশবাবু বিনোদবাবুর দিকে তাকাল—ওরা সকলে ঘেরাও হয়ে গেল—ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কথা বলতে পারছিল না। ক্রমে এ-অঞ্চলে অন্ধকার নেমে আসছে শুধু এইটুকু ওরা টের পাচ্ছে। তোমরা দরজা ছেড়ে দাও—আমরা যাব। সতীশের বলার ইচ্ছা হল। কিন্তু দরজায় মানুষগুলো আরও জট পাকিয়ে বসল। এবার ওরা তেওয়ারীর কথা তুলবে। জুলুমের কথা তুলবে। সতীশ ভিতরে ভিতরে ছটফট করতে থাকল। বাবুলটা এখন কী করছে কে জানে! যা ছেলে! মা'র অসুখ বাড়লে ছেলের ফুল ফলের জন্য যেন আকর্ষণ বেড়ে যায়। সে এবার অবিনাশবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, চলুন তবে উঠি। কিন্তু যারা দরজা আগলে বসে ছিল, তারা বসেই থাকল। উঠল না কেউ। সতীশ অথবা অবিনাশকে দরজা ছেড়ে দিল না। ওদের দাবি না মেনে নিলে সতীশ এবং অবিনাশ যেতে পারবে না। ওদের পাংশু এবং ভয়ংকর চোখ কেমন বিব্রত করছ সতীশকে। সতীশ ক্রমে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। এমন মুখ ওদের দেখল মনেই হয় না সামান্য কথায় এখন দাঙ্গা বেধে যেতে পারে। সে বলল, দরজা ছেড়ে বস। আমরা যাব। ওরা আরও ঘন হয়ে বসল, দরজা পুরোপুরি আটকে দিল। আমাদের দাবি মানতে হবে—দরজা আটকে দিয়ে এমন কথা বলতে চাইল।
—তবে তোমরা আমাদের আটকে রাখতে চাও।
—সে আমরা পারি স্যার!
—কী আমার বিনয়ের অবতার—সতীশ যথার্থই ক্ষোভে দু:খে বলে ফেলল। সে অবিনাশবাবুর দিকে তাকাল—কী করবেন এখন, এমন বলার ইচ্ছ। অবিনাশবাবু একটা কাগজ দলা পাকাচ্ছিল। কাগজের সেই খণ্ড বিনোদবাবুর দিকে ছুঁড়ে দিল—যেন এক ধরনের খেলা। অবিনাশবাবু কাগজের গুলতি তৈরি করে পাখি শিকার করবেন এমন এক মুখ করে উঠে দাঁড়ালেন। একমাত্র পুলিশের সাহায্য এই সময় দরকার। এইসব মানুষ বিনয়ের অবতার অথচ ফোনে হাত রাখলে হা হা করে ছুটে আসবে। সুতরাং অবিনাশ ঘরের ভিতর উটের মতো মুখটি তুলে পায়চারি করার সময় বিনোদবাবুকে সংকেতে কী সব বলে দিতেই তিনি বের হয়ে গেলেন। প্রায় একশত মুখ এখন দরজায় জানালায়। কিছু কিছু মানুষ সামনের মাঠের অন্ধকারে উঁকি দিয়ে আছে। সাহস সঞ্চারের জন্য ওরা মাঝে মাঝে ধ্বনি দিচ্ছিল—আমাদের দাবি মানতে হবে। যেন ওরা বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে বসে আছে, অবিনাশ অথবা সতীশ বের হলে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে। তখন বিনোদবাবু সদর রাস্তায় হাঁটছিল—হাতে আবেদনপত্র—উই আর রংফুলি কনফাইন্ড। সে রাস্তায় নেমে চিঠিটা পড়ল এবং দৌড়ে থানায় জমা দিলে পুলিশ গাড়ি এল। নিমেষে সব কিছু ফাঁকা হয়ে গেল। সতীশ পুলিশের গাড়িতে বসে কেমন কাপুরুষের গলায় বলল, তেওয়ারীর বউটা খুব কাঁদছিল অবিনাশবাবু।
ঘরে ফিরে সতীশ দেখল, সুরমা শুয়ে আছে। ক্ষোভ দু:খ হতাশা ক্রমে জোয়ারের জলের মতো বাড়ছে। সুরমাকে শুয়ে থাকতে দেখে সে কেমন ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে।
—তুমি এখন শুয়ে আছ! বলার ইচ্ছা সতীশের। ও-ঘরে কার গলা!—কে এল সুরমা! সুরমা না তাকিয়েই বলল, বড়দা এসেছেন। সতীশ বলল, বাবুল কোথায়!
—বাবুল দাদাকে কবিতা শোনাচ্ছে।
—তুমি কখন এলে? সতীশ দরজায় মুখ রেখে বলল। বাবুল লাফাচ্ছে, গাইছে এবং ছুটে ছুটে কবিতা আবৃত্তি করছে। এখন পড়ার সময়। কেউ এলেই বাবুলের দাপাদাপি বেড়ে যায়। সে এখন পড়াশোনায় ফাঁকি দিচ্ছে।—তুমি পড়তে বসো বাবুল। সে বাবুলকে ধমক দেবার সময়ই মনে করতে পারল কাপুষের মতো সে আজ পালিয়ে এসেছে। এই কাপুরুষ ভূমিকার জন্য সে কেমন নীচ হীন হয়ে পড়েছে। নিশ্চয়ই বড়দা কোনও কাজ উদ্ধারের আশায় এসেছেন। বড় মেয়েটিকে বাবার কাছে রেখেছ, মেজ মেয়েটিকে আমার কাছে...কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, চা জলখাবার খেয়েছে?
—খেয়েছি সব। এখন তুই তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে আয়। কিছু জরুরি কথা আছে।
হাত মুখ ধুলে জরুরি কথা, সেই এক কথা—সম্বন্ধটার কী করলি! পাত্রপক্ষ পণ চাইছে। দাবি দাওয়া অনেক। এমন পাত্র ছাড়াও যাবে না। ওদের কল্যাণীকে খুব পছন্দ হয়েছে। সতীশ দাদার কথা বোধ হয় ভালোভাবে শুনতে পাচ্ছিল না। সে বাবুলকে দেখছে। বাবুল তাক থেকে কীসব নামাচ্ছে। কাচের পাত্র হলে ভেঙে যাবার ভয়। দাদার সামনে খুব জোরে সে ধমকও দিতে পারছে না। দাদা আহত হতে পারেন। সে খুব নরম গলায় বলল, বাবুল তুমি নীচে নেমে এসো। পড়ে যাবে। পড়ে গেলে হাত-পা ভাঙবে। বাবুল কথা শুনছে না! জ্যাঠামশাইকে দেখে ওর বেজায় সাহস বেড়ে গেছে। রাগে সতীশের মাথায় রক্ত উঠে আসছে। তখন দাদা বললেন, সকলে তোমার আশায় আছে। যদি তুমি মত না দাও, তবে এ পাত্রটিও হাত ছাড়া হয়ে যাবে।
সতীশের দু-হাত তুলে চিৎকার করতে ইচ্ছা হল, আমাকে তোমরা কী ভাব! আমি কি চুরি করব। আমাকে তোমরা চুরি করতে বলছ। আমার কী আয়! আমি কোথা থেকে এত টাকা পাব। সতীশ অথচ ক্ষোভে এবং দু:খে জবাব দিতে পারল না। সে মাথা নিচু করে বসে থাকল। এবং ধীরে ধীরে বলল, দেখি কী করতে পারি। দাদা চলে গেলে হতাশ মুখে ঘরে ঢুকল সতীশ। ওর চোখ মুখ টানছে। ক্লান্তিকর জীবন এবং সারাদিনের খণ্ড খণ্ড হঠকারী ঘটনা ওকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছে না। বাবুলের ওপর রাগটা কিছুতেই মরছে না। বাবুলের কাছে সতীশ বুঝি ধরা পড়ে গেছে। কাপুরুষের মতো চোখ যার, যার মাথা উঁচু নয়—সে মেলা থেকে কী করে রাজার টুপি কিনবে! সে চেষ্টা করছিল ভেতরের রাগটা দমন করতে। ভেতরের রাগ দমন হলে বাবুলকে পড়তে বলবে। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই সুরমা সতীশকে অভিযোগ করল, তুমি বারণ করে গেছিলে ছেলেমেয়েকে বাইরে বের হতে। দেখবে কোনদিন ওরা জলে ডুবে মরে থাকবে। দুপুরে কোন ফাঁকে বের হয়ে গেছে।
সতীশ এবার দু-হাত উপরে তুলে ছুটে গেল। যেন সে মেরে ফেলবে বাবুলকে। সে বলল, বাবুল তুমি বাইরে গিয়েছিল, পুকুরে গিয়েছিলে। সতীশের এক ভয়, নিরন্তর এক ভয়। বাবা আজ তাকে মারবে বুঝে বাবুল ছুটে বারান্দায় চলে গেল। সতীশ বারান্দায় গেলে বাবুল ঘরে। ঘর বারান্দা, দুই দরজা দিয়ে সামান্য এক বাবুল সতীশকে ঘর বারান্দায় আর বারান্দায় ছুটিয়ে মারছে। বাবা কেমন এক দৈত্য হয়ে গেছে। সে ছুটছিল আর বলছিল, বাবা আর যাব না। তোমার পায়ে পড়ছি বাবা আর যাব না। সে হাউ হাউ করে কাঁদছিল। সতীশ চিৎকার করছিল, বাবুল তুমি ছুটবে না। বাবুল তত বলছিল, তুমি আমাকে মেরো না বাবা, আমি আর যাব না। কিন্তু হায় কে কাকে রক্ষা করে—সতীশ ছুটতে ছুটতে সত্যি অমানুষ হয়ে গেল অথবা এক দৈত্য, সে বাবুলের চুল ধরে ফেলল, তারপর দু-হাতে উপরে তুলে, দোলাতে থাকল আর নির্মম আঘাতে আঘাতে ওকে জর্জরিত করল। সুষমা ছুটে এসে ধরে ফেলল, তুমি কি পশু হয়ে গেছ, তুমি কি ছেলেটাকে মেরে ফেলবে?
মিণ্টু তখন খাটের নিচে চলে গেছে। কারণ বাবুলের হয়ে গেলেই বাবার মিন্টুর কথা মনে পড়তে পারে।
খেতে বসে সতীশ বলল, ওদের দিলে না?
—তোমার দেরি দেখে ওদের খাইয়ে দিয়েছি।
সতীশ থালায় বড় পুঁটি মাছ ভাজা দেখে বলল, মাছ! কে মাছ দিল! কারণ সতীশের মাছ সপ্তাহে দুদিন, এক দিন ডিম এবং রবিবারে মাংস। বাবুলের মাছ না হলে হয় না। কিন্তু সতীশকে বাজেট রক্ষা করতে সপ্তাহে তিনদিন নিরামিশ খেতেই হয়। নিরামিষ খাবার কথা। বড় পুঁটি মাছ দেখে সতীশ তাজ্জব বনে গেল।
সুরমা বলল, তোমার ছেলের কাণ্ড। পুকুর থেকে দারোয়ানদের কেউ বোধ হয় মাছ ধরছিল। ওকে তিনটে মাছ দিয়েছে।
—ওকে দিয়েছে, না, ও চেয়ে এনেছে।
—সে আমি জানি না। মাছ দিয়ে বলল, একটা বাবা খাবে। একটা আমি খাব।
সতীশের গলায় মনে হল ভাত আটকে যাচ্ছে। সুরমা মাছ প্রসঙ্গে এত বলছিল যে সতীশের গলায় ভাত আটকে যাচ্ছে। জানো! সুরমা বড় বড় চোখ করে বলল, বড় মাছটা বাবা খাবে। জানো! সুরমা এবার ডালের বাটি এগিয়ে দেবার সময় বলল, বিকেলে সারাক্ষণ ছুটে এসে দেখে গেছে মাছ ঠিকমতো রেখেছি কি না—না বেড়ালে বাদুড়ে খেয়ে নিল—ওর কী উদ্যম এই মাছের জন্য, কোথায় রেখেছি, কীভাবে রেখেছি—কী উৎসাহ ছেলের—বড় মাছটা ওকে খেতে দিলে খেল না, তোমার জন্য তুলে রেখে দিল—বাবা খাবে।
সতীশের কী যেন কষ্ট ভিতরে। এবার যথার্থই গলায় ভাত আটকে গেল। সে জল খেল ঢক ঢক করে। সে ভাতগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকল। কোথায় যেন এই বর্ষার রাতে একটা ব্যাঙ ডাকছে। সতীশের ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কে এই শিশু, কী তার পরিচয়—সারা সংসার জুড়ে যে যেন কেবল দাপাদাপি করে বেড়ায়। এখন মনে হল সে নিষ্ঠুর এবং ভয়ংকরভাবে অসহায়। যত অসহায় বোধ করছে তত এই সংসারের সব কিছু অপ্রীতিকর ঠেকছে। সুরমার রুগণ মুখ বাবুলের অসহায় চোখ এবং দাবদাহের মতো এই সংসার নিয়ত ওকে ভীত বিহ্বল করে দিচ্ছে। সে ভয়ে খেতে পারল না। বাবুলের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণে ওর ভিতরে ভিতরে জলের স্রোতের মতো এক কান্না এল। সে আবেগে কেমন অস্থির হয়ে উঠল এবং যেখানে বাবুল কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওকে বুকে তুলে যেমন অন্যদিন নিজের বিছানায় নিয়ে আসে, বুকে নিয়ে শুয়ে থাকে এবং দু-হাতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, তেমন—এখন সেই ভালোবাসায় সন্তানের মুখ দেখতে গিয়ে মনে হল, পিঠে বড় বড় দাগ, চামড়া কেটে গেছে। অন্ধকারে রক্তপাত হচ্ছিল। সতীশ সেই মানুষের মতো হায় এক মানুষ—ক্রীতদাস-প্রায় মানুষ। সতীশ পাগলের মতো ওর পিঠে ভালোবাসার হাত ছড়িয়ে দিতেই চাপ চাপ রক্ত। সে তার দুই নরকপ্রায় হাত নিয়ে ছুটে গেল, দ্যাখো সুরমা আমি কী করেছি। ক্ষতস্থানে হাত পড়তেই বাবুল ককিয়ে উঠল। এক অমানুষ, ভিতরে এক অমানুষ কেবল খেলা করে বেড়ায়। সতীশ দু-হাত সুরমার মুখের সামনে ধরে চিৎকার করে উঠল, আমি কী করেছি দ্যাখো।
তারপর বাবুলের পাশে বসে আহত স্থানগুলোতে নরম নরম চাপ দিলে দেখতে পেল টেবিলে নীল আলো জ্বলছে। রাত ক্রমে গভীর হয়ে আসছে। কোথাও আর যেন রাতের কীট পতঙ্গ ডাকছে না। ধরণী শান্ত এবং স্থির। সে দেখতে পেল তখন নীল আলোর ভিতর দুই ছবি। রাম রাবণের ছবি। রামের মাথায় রাজার টুপি, রাবণের মাথায় কাক। নীচে বাবুল ভালো নামে সই করছে—শুভাশিস। রাত ক্রমে আরও গভীর হয়ে আসছে। সতীশের এখন সারাদিনের ঘটনা এক দুই করে মনে হতে থাকল। তেওয়ারির বউটা বোধহয় বসে বসে এখনও কাঁদছে। সংসারে কী যে শুভ কী যে অশুভ এ সময় সে কিছুই স্থির করতে পারল না। কেবল দেখল বাইরে বাবুলের রেলগাড়িটা সাদা জ্যোৎস্নায় পড়ে আছে। বর্ষাকালের বৃষ্টি—এই আসে এই যায়, এই সাদা জ্যোৎস্না এই অন্ধকার। বাবুলের রেলগাড়িতে সে যেন এখন একা বসে আছে। কেউ নেই। সকলে ওকে এক বড় মাঠে ফেলে কোনও এক অজ্ঞাত স্টেশনে নেমে গেছে। সে শুধু ইঞ্জিনটা নিয়ে মাঠের ভিতর ভূতের মতো রেলগাড়ি হয়ে গেছে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠলে সে আর রেলগাড়ি থাকল না। বাবুলের জন্য রাজার টুপি কিনে আনতে হবে, সুতরাং সতীশ ঘরের সব দরজা জানালা খুলে দিল। সে যে ক্রীতদাস এ সংসারে তা আর মনে থাকল না। সে বাবুলকে কাঁধে নিয়ে পাতাবাহরের গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে ভোরের সূর্য দেখতে দেখতে বলল, সামনের দিকটাতে আমরা পুব দিক বলি, ডানদিক দক্ষিণ, পেছনের দিকে সূর্য অস্ত যায় বলে পশ্চিম এবং বাঁ-দিকে—তুমি যত দূরই চলে যাও না উত্তর দিক হবে। সতীশ ছেলেকে কাঁধে নিয়ে ভোরবেলায় আজ কী ভেবে দিকনির্ণয় শেখাতে থাকল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন