সমরেশ মজুমদার

শম্ভু বাজিকর এ মেলায় প্রতি বৎসর আসে। তাঁহার বসিবার স্থানটা মা কঙ্কালীর এস্টেটের খাতায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মত কায়েমী হইয়া গিয়াছে। লোকে বলে, বাজি? কিন্তু শম্ভু বলে ভোজবাজি—ছারকাছ। ছোট তাঁবুটার প্রবেশ পথের মাথার উপরেই কাপড়ে আঁকা একটি সাইনবোর্ডেও লেখা আছে 'ভোজবাজি সার্কাস।' লেখাটার এক পাশে একটা বাঘের ছবি অন্যপাশে একটা মানুষ, তাঁহার এক হাতে রক্তাক্ত তলোয়ার, অপর হাতে একটা ছিন্নমুণ্ড। প্রবেশমূল্য মাত্র দুই পয়সা। ভোজবাজি অর্থে গোলকধামের খেলা। ভিতরে পট টাঙাইয়া কাপড়ের পর্দায় শম্ভু মোটা লেন্স লাগাইয়া দেয়, পল্লীবাসীরা বিমুগ্ধ বিস্ময়ে সেই লেন্সের মধ্য দিয়া দেখে 'আংরেজ লোকের যুদ্ধ', 'দিল্লীকা বাদশা', 'কাবুলকে পাহাড়', 'তাজবিবিকা কবর', তারপর শম্ভু লোহার রিং লইয়া খেলা দেখায়, সর্বশেষে একটা পর্দা ঠেলিয়া দেখায় খাঁচায় বন্দি একটা চিতাবাঘ, বাঘটাকে বাহিরে আনিয়া তাহার উপর শম্ভুর স্ত্রী রাধিকা বেদেনী চাপিয়া বসে, বাঘের সম্মুখের থাবা দুইটি ধরিয়া টানিয়া তুলিয়া আপন ঘাড়ের উপর চাপাইয়া মুখোমুখি দাঁড়াইয়া বাঘটাকে চুমা খায়, সর্বশেষে বাঘটার মুখের ভিতর আপনার প্রকাণ্ড চুলের খোঁপা পুরিয়া দেয়। সরল পল্লীবাসীরা স্তম্ভিত বিস্ময়ে নিশ্বাস রোধ করে দেখিতে দেখিতে করতালি দিয়া ওঠে। তাহার পরই খেলা শেষ হয়, দর্শকের দল বাহির হইয়া যায়, সর্বশেষ দর্শকটির সঙ্গে শম্ভুও বাহির হইয়া আসিয়া আবার তাঁবুর দুয়ারে জয়ঢাকটা পিটিতে থাকে—দুম দুম দুম। জয়ঢাকের সঙ্গে স্ত্রী রাধিকা বেদেনী প্রকাণ্ড একজোড়া করতালি বাজায়, ঝন-ঝন-ঝন।
মধ্যে মধ্যে শম্ভু হাঁকে, বড়? ওই বড় বা-ঘ।
বেদেনী প্রশ্ন করে, বড় বাঘ কি করে?—পক্ষীরাজ ঘোড়া হয়, মানুষের চুমা খায়, জ্যান্ত মানুষের মাথা মুখের মধ্যে পোরে, কিন্তু খায় না।
কথাগুলো শেষ করিয়াই সে ভিতরে গিয়া বাঘটাকে একটা তীক্ষ্ম অঙ্কুশ দিয়া খোঁচা মারে, সঙ্গে সঙ্গে বার বার বাঘটা গর্জন করিতে থাকে। তাঁবুর দুয়ারের সম্মুখে সমবেত জনতা ভীতিপূর্ণ কৌতূহলস্পন্দিত বক্ষে তাঁবুর দিকে অগ্রসর হয়।
দুয়ারের পাশে দাঁড়াইয়া বেদেনী দুইটি করিয়া পয়সা লইয়া প্রবেশ করিতে দেয়।
এছাড়া বেদেনীর নিজের খেলা আছে। তাহার আছে একটা ছাগল, দুইটা বাঁদর আর গোটা কয়েক সাপ। সকাল হইতেই সে আপনার ঝুলি ঝাঁপি লইয়া গ্রামে বাহির হয়, গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি খেলা দেখাইয়া, গান গাহিয়া উপার্জন করিয়া আনে।
এবার শম্ভু কঙ্কালীর মেলায় আসিয়া ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল। কোথা হইতে আর একটা বাজির তাঁবু আসিয়া বসিয়া গিয়াছে। তাহার জন্য নির্দিষ্ট জায়গাটা অবশ্য খালিই পড়িয়া আছে, কিন্তু এ বাজির তাঁবুটা অনেকটা বড় এবং কায়দাকরনেরও অনেক অভিনবত্ব আছে। বাহিরে দুইটা ঘোড়া, একটা গোরুর গাড়ির উপর প্রকাণ্ড একটা খাঁচা রহিয়াছে, নিশ্চয় উহাতে বাঘ আছে।
গরুর গাড়ি তিনখানা নামাইয়া শম্ভু নতুন তাঁবুর দিকে মর্মান্তিক ঘৃণায় হিংস্র দৃষ্টিতে চাহিয়া দেখিল। তারপর আক্রোশভরা নিম্নকণ্ঠে বলিল, শালা!
তাহার মুখ ভীষণ হইয়া উঠিল। শম্ভুর সমগ্র আকৃতির মধ্যে একটা নিষ্ঠুর হিংস্র ছাপ যেন মাখানো আছে। ক্রুর নিষ্ঠুরতা-পরিব্যঞ্জক একধারার উগ্র তামাটে রং আছে—শম্ভুর দেহবর্ণ সেই উগ্র তামাটে; আকৃতি দীর্ঘ, সর্বাঙ্গে একটা শ্রীহীন কঠোরতা, মুখে কপালের নিচেই নাকে একটা খাঁজ, সাপের মতো ছোট ছোট গোল চোখ, তাহার উপর সম্মুখের দুইটা দাঁত কেমন বাঁকা হিংস্র ভঙ্গিতে অহরহ বাহিরে জাগিয়া থাকে। হিংস্র ক্রোধে সে আরও ভয়াবহ হইয়া উঠিল।
রাধিকাও হিংসা ক্রোধে, ধারালো ছুরি যেমন আলোকের স্পর্শে চক-মক করিয়া উঠে তেমনই ঝক-মক করিয়া উঠিল; সে বলিল, দাঁড়া, বাঘের খাঁচায় দিব গোক্ষুরের ডেঁকা ছেড়্যা!
রাধার উত্তেজনার স্পর্শে শম্ভু আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল, সে ক্রুদ্ধ দীর্ঘ পদক্ষেপে বলিল, কে বটে, মালিক কে বটে?
কি চাই? তাঁবুর ভিতরে আর একটা ঘরের পর্দা ঠেলিয়া বাহিরে আসিল একটি জোয়ান পুরুষ। ছয় ফিটেরও অধিক লম্বা, শরীরের প্রতি অবয়বটি সরল ও দড়, কিন্তু তবুও দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায়; লম্বা হালকা দেহ, 'তাজী' ঘোড়ায় যেমন একটা মনোরম লাবণ্য ঝকমক করে—লোকটির হাল্কা, অথচ সরল দৃঢ় শরীরে তেমনি একটা লাবণ্য আছে। রং কালোই, নাকটি টিকালো লম্বা, চোখ দুটি সাধারণ, পাতলা ঠোঁট দুটির ওপরে তুলি-আঁকা গোঁফের মত এক জোড়া গোঁফ সূচাগ্র করিয়া পাক দেওয়া, মাথায় বাবরি চুল, গলায় ঝুলানো একটা সোনার ছোট চৌকা তক্তি। সে আসিয়া শম্ভুর সম্মুখে দাঁড়াইল! দুইজনেই দুইজনকে দেখিতেছিল।
কি চাই?—নতুন বাজিকর আবার প্রশ্ন করিল, কথার সঙ্গে সঙ্গে মদের গন্ধে শম্ভুর নাকের নিচের বায়ুস্তর ভুর ভুর করিয়া উঠিল।
শম্ভু খপ করিয়া ডান হাত দিয়া তাহার বাঁ হাতটা চাপিয়া ধরিল, বলিল, এ জায়গা আমার। আমি আজ পাঁচ বৎসর এখানে বসছি।
ছোকরাটিও খপ করিয়া আপন ডান হাতে শম্ভুর বাঁ হাত চাপিয়া ধরিয়া মাতালের হাসি হাসিল, বলিল, সে হবে, আগে মদ খাও টুকচা।
শম্ভুর পিছনে জলতরঙ্গ বাদ্যযন্ত্রে দ্রুততম গতিতে যেন গৎ বাজিয়া উঠিল। রাধিকা কখন আসিয়া শম্ভুর পিছনে দাঁড়াইয়াছিল, সে খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল, বলিল, কটি বোতল আছে তুমার নাগর মদ খাওয়াইবা?
ছোকরাটি শম্ভুর মুখ হইতে পিছনের দিকে চাহিয়া রাধিকাকে দেখিয়া বিস্ময়ে মোহে কথা হারাইয়া নির্বাক হইয়া গেল। কালো সাপিণীর মতো ক্ষীণতনু দীর্ঘাঙ্গিণী বেদেনীর সর্বাঙ্গে যেন মাদকতা মাখা; তাহার ঘন কুঞ্চিত কালো চুলে, চুলের মাঝখানে সাদা সুতোর মতো সিঁথিতে, তাহার ঈষৎ বঙ্কিম নাকে, টানা অর্ধ-নিমীলিত ভঙ্গির মদিরদৃষ্টি দুটি চোখে, সূচালো চিবুকটিতে-সর্বাঙ্গে মাদকতা। সে যেন মদিরার সমুদ্রে সদ্য স্নান করিয়া উঠিল। মাদকতা তাহার সর্বাঙ্গ বাহিয়া ঝরিয়া পড়িতেছে। মহুয়া ফুলের গন্ধ—যেমন নিশ্বাসে ভরিয়া দেয় মাদকতা, বেদেনীর কালো রূপও তেমনই চোখে ধরাইয়া দেয় নেশা। শুধু রাধিকারই নয়, বেদে জাতের মেয়েদের এটা একটা জাতিগত-রূপ-বৈশিষ্ট্য। রাধিকার রূপের মধ্যে একটা প্রতীকের সৃষ্টি করিয়াছে; কিন্তু মোহময় মাদকতার মধ্যে আছে ক্ষুরের মত ধারের ইঙ্গিত, চারিত্রিক হিংস্র তীক্ষ্ণ উগ্রতার আভাস, মোহমত্ত পুরুষকেও থমকিয়া দাঁড়াইতে হয়। ভয়ের চেতনা জাগাইয়া তোলে, বুকে ধরিলে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া যাইবে।
রাধিকার খিল খিল হাসি থামে নাই, সে নতুন বাজিকরের বিস্ময়বিহ্বল নীরব অবস্থা দেখিয়া আবার বলিল,—ব্যাক হর্যা গেল যে নাগরের?
বাজিকর এবার হাসিয়া বলিল, বেদের বাচ্চা গো আমি। বেদের ঘরে মদের অভাব। এস।
কথা সত্য। এই অদ্ভুত জাতটি মদ কিনিয়া কখনো খায় না। উহারা লুকাইয়া চোলাই করে, ধরাও পড়ে, জেলেও যায় কিন্তু তা বলিয়া স্বভাব কখনও ছাড়ে না।
শাসন বিভাগের নিকট পর্যন্ত ইহাদের এ অপরাধটা অতি সাধারণ হিসাবে লঘু হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
শম্ভুর বুকখানা নি:শ্বাসে ভরিয়া এতখানি হইয়া উঠিল। আহ্বানকারীও তাহার স্বজাত নতুবা—। সে রাধিকার দিকে ফিরিয়া কঠিন দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল, তই আইলি কেনে এখেনে?
রাধিকা এবারও খিল খিল করিয়া হাসিয়া বলিল, মরণ তুমার! আমি মদ খাবে নাই?
*
তাঁবুর ভিতরে ছোট একটা প্রকোষ্ঠের মধ্যে মদের আড্ডা বসিল। চারিদিকের পাখির মাংসের টুকরো টুকরো হাড়ের কুচি ও এক রাশি মুড়ি ছড়াইয়া পড়িয়াছে; একটা পাতায় এখনও খানিকটা মাংস, আর একটা পাতায় কতকগুলো মুড়ি, পেঁয়াজ, লঙ্কা, খানিকটা নুন; দুইটি খালি বোতল গড়াইতেছে, একটা বোতল অর্ধসমাপ্ত। বিস্রস্তবাসা একটি বেদের মেয়ে পাশেই নেশায় অচেতন হইয়া পড়িয়া আছে, মাথার চুল ধূলায় রুক্ষ, হাত দুইটি মাথার উপর দিয়া ঊর্ধTবাহুর ভঙ্গিতে মাটির উপর লুণ্ঠিত, মুখে তখনও মদের ফেনা বুদ্বুদের মত লাগিয়া আছে। হৃষ্টপুষ্ট শান্তশিষ্ট চেহারার মেয়েটি।
রাধিকা তাহাকে দেখিয়া আবার খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। বলিল, তুমার বেদেনী? ইষি কাটা কলাগাছের পারা পড়েছে গো!
নূতন বাজিকর হাসিল, তারপর সে স্খলিত পদে খানিকটা অগ্রসর হইয়া একটা স্থানের আলগা মাটি সরাইয়া দুইটা বোতল বাহির করিয়া আনিল।
মদ খাইতে খাইতে কথা যাহা বলিবার বলিতেছে নূতন বাজিকর আর রাধিকা।
শম্ভু মত্ততার মধ্যেও গম্ভীর হইয়া বসিয়া ছিল। প্রথম পাত্র পান করিয়াই রাধিকা বলিল, কি নাম গো তুমার বাজিকর?
নতুন বাজিকর কাঁচা লঙ্কা খানিকটা দাঁতে কাটিয়া বলিল, নাম শুনলি গালি দিবা আমাকে বেদেনী।
কেনে?
নাম বটে কিষ্টা বেদে।
তা গালি দিব কেনে?
তুমার নাম যে রাধিকা বেদেনী, তাই বুলছি।
রাধিকা খিল খিল করিয়া হাসিয়া গড়াইয়া পড়িল, পরক্ষণেই সে আপনার কাপড়ের ভিতর হইতে ক্ষিপ্ত হস্তে কি বাহির করিয়া নতুন বাজিকরের গায়ে ছুঁড়িয়া দিয়া বলিল, কই কালীয়া দমন করো দেখি কিষ্টো, দেখি!
শম্ভু চঞ্চল হইয়া পড়িল; কিষ্টো বেদে ক্ষিপ্র হস্তে আঘাত করিয়া সেটাকে মাটিতে ফেলিয়া দিল! একটা কালো কেউটের বাচ্চা! আহত সর্পশিশু হিসহিস গর্জনে মুহূর্তে ফণা তুলিয়া দংশনোদ্যত হইয়া উঠিল; শম্ভু চিৎকার করিয়া উঠিল, আ—কামা। অর্থাৎ বিষদাঁত এখনও ভাঙা হয় নাই। কিষ্টো কিন্তু ততক্ষণে তাহার মাথাটা বাঁ হাতে চাপিয়া ধরিয়া হাসিতে আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। হাসিতে হাসিতে সে ডান হাতে ট্যাঁক হইতে ছোট একটা ছুরি বাহির করিয়া দাঁত দিয়া খুলিয়া ফেলিল এবং সাপটার বিষদাঁত ও বিষের থলি দুইটি কাটিয়া ফেলিয়া রাধিকার গায়ে আবার ছুঁড়িয়া দিল। রাধিকাও বাঁ হাতে সাপটাকে ধরিয়া ফেলিল; কিন্তু রাগে সে মুহূর্ত পূর্বের ওই সাপটার মতই ফুলিয়া উঠিল, বলিল, আমার সাপ তুমি কামাইলা কেনে?
কিষ্টে বলিল, তুমি যে বলল্যা গো দমন করতে।—বলিয়া সে এবার হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল।
রাধিকা মুহূর্তে আসন ছাড়িয়া উঠিয়া তাঁবু হইতে বাহির হইয়া গেল।
সন্ধ্যার পূর্বেই।
নূতন তাঁবুতে আজ হইতেই খেলা দেখানো হইবে। সেখানে খুব সমারোহ পড়িয়া গিয়াছে। বাহিরে মাচা বাঁধিয়া সেটার ওপর বাজনা বাজিতে আরম্ভ করিয়াছে। একটা পেট্রোম্যাকস আলো জ্বালিবার উদ্যোগ হইতেছে। রাধিকা আপনাদের ছোট তাঁবুটির বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহাদের খেলার তাঁবু এখনো খাটানো হয় নাই। রাধিকার চক্ষু দুইটি হিংস্রভাবে যেন জ্বলিতেছিল।
শম্ভু নিকটেই একটা গাছতলায় নামাজ পড়িতেছিল। আরও একটু দূরে আর একটা গাছের নীচে নামাজ পড়িতেছে কিষ্টো। বিচিত্র জাত বেদেরা। জাতি জিজ্ঞাসা করিলে বলে, বেদে। তবে ধর্মে ইসলাম। আচারে পুরা হিন্দু, মনসা পূজা করে, মঙ্গলচণ্ডী ষষ্ঠীর ব্রত করে। কালীদুর্গাকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করে, নাম রাখে শম্ভু শিব কৃষ্ণ হরি, কালী দুর্গা রাধা লক্ষ্মী। হিন্দু পুরান-কথা ইহাদের কণ্ঠস্থ। এমনই একটি সম্প্রদায় পট দেখাইয়া হিন্দু-পুরাণ—কথাগান করে, তাহারা নিজেদের বলে পটুয়া, বিপুল চিত্রকরের জাতি। বিবাহ আদান-প্রদান সমগ্র ভাবে ইসলাম ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে হয় না, নিজেদের এই বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ।
বিবাহ হয় মোল্লার নিকট ইসলামীয় পদ্ধতিতে, মরিলে পোড়ায় না, কবর দেয়। জীবিকায় বাজিকরেরা সাপ ধরে, সাপ নাচাইয়া গান করে, বাঁদর ছাগল লইয়া খেলা দেখায়, অতি সাহসী কেহ কেহ এমনই তাঁবু খাটাইয়া বাঘ লইয়া খেলা দেখায়। কিন্তু এ নতুন তাঁবুর মতো সমারোহ করিয়া তাহাদের সম্প্রদায়ের কেহ কখনো খেলা দেখায় নাই। রাধিকার চোখ ফাটিয়া জল আসিতেছিল। তাহার মনশ্চক্ষে কেবল ভাসিয়া উঠিতেছিল, উহাদের সবল তরুণ বাঘটির কথা। ইহারই মধ্যে লুকাইয়া সে বাঘটাকে কাঠের ফাঁক দিয়া দেখিয়া আসিয়াছে। সবল দৃঢ় ক্ষিপ্ততাব্যাঞ্জক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে চকচকে চিকন লোম, মুখে হিংস্র হাসির মতো ভঙ্গি যেন অহরহই লাগিয়া আছে। আর তাহাদের বাঘটা স্থবির শিথিলদেহ—অতি কর্কশ খসখসে লোমগুলা দেখিলে রাধিকার শরীর ঘিন ঘিন করিয়া উঠে। কতবার সে শম্ভুকে বলিয়াছে একটা নতুন বাঘ কিনিবার জন্য, কিন্তু শম্ভুর কি যে মমতা ওই বাঘটার প্রতি, যাহার হেতু সে কিছুতেই খুঁজিয়া পায় না।
নামাজ সারিয়া শম্ভু ফিরিয়া আসিতেই সে গভীর ঘৃণা ও বিরক্তির সহিত বলিয়া উঠিল, তুর ওই বুড়া বাঘের খেলা কেউ দেখতে আসবে নাই।
ক্রুদ্ধস্বরে শম্ভু বলিল, তুই জানছিস সব!
রাধিকা নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া কহিল, না জেনে না আমি! তু-ই জানছিস সব।
শম্ভু চুপ করিয়া রহিল, কিন্তু রাধিকা থামিল না, কয়েক মুহূর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া সে বলিয়া উঠিল—ওরে মড়া বুড়ার নাচন দেখতে কার কবে ভাল লাগে রে? আমারে বলে, তু জানছিস সব!
শম্ভু মুহূর্তে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল, পরিপূর্ণভাবে তাহার হিংস্র দুই পাটি দাঁত ওই বাঘের মতো ভঙ্গিতেই বাহিরে করিয়া সে বলিল, ছোকরার উপর বড় যে টান দেখি তুর!
রাধিকা সর্পিনীর মত গর্জন করিয়া উঠিল, কি বুললি বেইমান?
শম্ভু আর কোন কথা বলিল না, অঙ্কুশভীত বাঘের মতো ভঙ্গিতেই সেখান হইতে চলিয়া গেল।
ক্রোধে অভিমানে রাধিকার চোখ ফাটিয়া জল আসিল। বেইমান তাহাকে এতবড় কথাটা বলিয়া গেল? সব ভুলিয়া গিয়াছে সে? নিজের বয়সটাও তাহার মনে নাই? চল্লিশ বৎসরের পুরুষ তুই তো বুড়া! রাধিকার বয়সের তুলনায় তুই বুড়া ছাড়া আর কি? রাধিকা এই সবে বাইশে পা দিয়াছে। সে কি দায়ে পড়িয়া শম্ভুকে বরণ করিয়াছে? রাধিকা তাড়াতাড়ি আপনাদের তাঁবুর ভিতরে ঢুকিয়া গেল।
সত্য কথা, সে আজ পাঁচ বৎসর আগের ঘটনা। রাধিকার বয়স তখন সতেরো। তাহারও তিন বৎসর পূর্বে শিবপদ বেদের সহিত তাহার বিবাহ হইয়াছিল। শিবপদ ছিল রাধিকার চেয়ে বৎসর তিনেকের বড়। আজও তাহার কথা মনে করিয়া রাধিকার দু:খ হয়। শান্ত প্রকৃতির মানুষ, কোমল মুখশ্রী, বড় বড় চোখ, সে চোখের দৃষ্টি যেন মায়াবীর দৃষ্টি। সাপ, বাঁদর, ছাগল এ সবে তাঁহার আসক্তি ছিল না। সে করিত বেতের কাজ,—ধামা বুনিত, চেয়ার-পাল্কির ছাউনী করিত, তাহাতে তাহার উপার্জন ছিল গ্রামের সকলের চেয়ে বেশি। তাহারা স্বামী-স্ত্রীতে বাহির হইত; সে কাঁধে ভার বহিয়া লইয়া যাইত—তাহার বেতের জিনিস, রাধিকা লইয়া যাইত তাহার সাপের ঝাঁপি, বাঁদর, ছাগল। শিবপদের সঙ্গে আরও একটি যন্ত্র থাকিত, তাহার কোমরে গোঁজা থাকিত বাঁশের বাঁশি। রাধিকা যখন সাপ নাচাইয়া গান গাহিত, শিবপদ রাধিকার স্বরের সহিত মিলাইয়া বাঁশি বাজাইত।
ইহা ছাড়াও শিবপদের আরও কতবড় গুণ ছিল! তাহাদের সামাজিক মজলিসে বৃদ্ধদের আসরেও তাহার ডাক পড়িত। অতি ধীর প্রকৃতির লোক শিবপদ, এবং লেখা-পড়াও কিছু কিছু নিজের চেষ্টায় সে শিখিয়াছিল, এই জন্য তাহার পরামর্শ প্রবীণেরা গ্রহণ করিত। গ্রামের মধ্যে সম্মান কত তাহার! আর শিবপদ ছিল রাধিকার ক্রীতদাসের মতো। টাকাকড়ি সব থাকিত রাধিকার কাছে। তাঁতে বোনা কালো রঙ্গের জমির ওপর সাদা সূতার খুব ঘনঘন ঘর কাটা শাড়ি পরিতে রাধিকা খুব ভালোবাসিত, শিবপদ বারো মাস সেই কাপড়ই তাহাকে পরাইয়াছে।
এই সময় কোথা হইতে দশ বৎসর নিরুদ্দেশ থাকার পর আসলে এই শম্ভু, সঙ্গে এই বাঘটা, একটা ছেঁড়া তাঁবু আর এক বিগত যৌবনা বেদেনী। বাঘ ও তাঁবু দেখিয়া সকলের তাক লাগিয়া গেল। রাধিকা প্রথম যেদিন শম্ভুকে দেখিল, সেদিনের কথা তাহার আজও মনে আছে। সে এই উগ্র পিঙ্গলবর্ণ, উদ্ধতদৃষ্টি কঠোর বলিষ্ঠদেহ মানুষটিকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া গিয়াছিল।
শম্ভু তাহাকে দেখিতেছিল মুগ্ধ বিস্ময়ের সহিত; সে-ই প্রথম ডাকিয়া বলিল, এই বেদেনী, দেখি তুর সাপ কেমন?
রাধিকার কি যে হইয়াছিল, সে ফিক করিয়া হাসিয়া বলিয়াছিল, নাগরের শখ দেখি যে খুব! পয়সা দিবা?
বেশ মনে আছে, শম্ভু বলিয়াছিল, পয়সা দিব না; তু সাপ দেখালে আমি বাঘ দেখাব।
বাঘ! রাধিকা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিল। কে লোকটা? যেমন অদ্ভুত চেহারা তেমনিই অদ্ভুত কথা; বলে বাঘ দেখাইবে। সে তাহার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিয়াছিল, সত্যি বুলছ?
বেশ, দেখ, আগে আমার বাঘ দেখ; সে তাহাকে তাঁবুর ভিতর লইয়া গিয়া সত্যই বাঘ দেখাইয়াছিল। রাধিকা সবিস্ময়ে তাহাকে প্রশ্ন করিয়াছিল, ওই বাঘ নিয়া তুমি কি কর?
লড়াই করি, খেলা দেখাই।
হ্যাঁ?
হ্যাঁ, দেখবি তু? বলিয়া সঙ্গে সঙ্গেই সে খাঁচা খুলিয়া বাঘটাকে বাহির করিয়া তাহার সামনের দুই থাবা হাতে ধরিয়া তুলিয়া বাঘের সহিত মুখোমুখি দাঁড়াইয়াছিল। বেশ মনে আছে, রাধিকা বিস্ময়ে হতবাক হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। শম্ভু বাঘটাকে খাঁচায় ভরিয়া রাধিকার সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিয়াছিল, তু এইবার সাপ দেখা আমাকে।
রাধিকা সে কথায় উত্তর দেয় নাই, বলিয়াছিল, ওটা তুমার পোষ মেনেছে?
হি হি করিয়া হাসিয়া শম্ভু সবলে তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়াছিল, হি, বাঘিনী পোষ মানাইতে আমিও ওস্তাদ আছি।
কি যে হইয়াছিল রাধিকার, একবিন্দু আপত্তি পর্যন্ত করে নাই। দিনকয়েক পরেই সে শিবপদর সমস্ত সঞ্চিত অর্থ লইয়া শম্ভুর তাঁবুতে আসিয়া উঠিয়াছিল। চোখের জলে শিবপদর বুক ভাসিয়া গিয়াছিল, কিন্তু তাহাতে রাধিকার মমতা হওয়া দূরে থাক, লজ্জা হওয়া দূরে থাক, ঘৃণায় বীতরাগে তাহার অন্তর রি-রি করিয়া উঠিয়াছিল। রাধিকার মা-বাপ, গ্রামের সকলে তাহাকে ছিছি করিয়াছিল, কিন্তু রাধিকা সে গ্রাহ্যই করে নাই।
সেই রাধিকার আনীত শিবপদের অর্থেই শম্ভুর এই তাঁবু ও খেলার অন্য সরঞ্জাম কেনা হইয়াছিল। সে অর্থ তাহার আজ নি:শেষিত হইয়াছে। দু:খেই দিন চলে আজকাল; শম্ভু যাহা রোজগার করে সবই নেশায় উড়াইয়া দেয়, কিন্তু রাধিকা একটি দিনের জন্য দু:খ করে নাই। আর বেইমান কিনা, এই কথা বলিল? সে একটা মদের বোতল বাহির করিয়া বসিল।
সহসা তাহাদের তাঁবুর বাহিরে শম্ভুর ক্রুদ্ধ উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনিয়া সে মত্ততার উপর উত্তেজিত হইয়া বাহির হইয়া আসিল। দেখিল, শম্ভুর সম্মুখে দাঁড়াইয়া কিষ্টো। তাহার পরনে ঝকঝকে সাজ-পোশাক, চোখ রাঙা, সেই তখন বলিতেছিল, কেনে, ইথে দোষটা কি হল? তুমারা বসে রইছ, আমাগোর খেলা হচ্ছে। খেলা দেখবার নেওতা দিলাম, তা দোষটা কি হল?
শম্ভু চিৎকার করিয়া উঠিল, খেল দেখাবেন খেলোয়াড়ি আমার! অপমান করতে আসছিস তু!
কিষ্টো কি বলিতে গেল, কিন্তু তাহার পূর্বে উত্তেজিত হইয়া রাধিকা একটা ইট কুড়াইয়া লইয়া সজোরে তাহাকে লক্ষ্য করিয়া মারিয়া বসিল। অব্যর্থ লক্ষ্য, কিন্তু কিষ্টো অদ্ভুত, সে বলের মতো সেটাকে লুফিয়া ধরিয়া ফেলিল, তারপর ইটটাকে লুফিতে লুফিতে চলিয়া গেল! বিস্ময়ে রাধিকা সামান্য কয়েকটা মুহূর্তের জন্য যেন স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিল, সে ঘোর কাটিতেই সে বর্ধিত উত্তেজনায় আবার একটা ইঁট কুড়াইয়া লইল; শম্ভু তাহাকে নিবৃত্ত করিল, সে সাদরে তাহার হাত ধরিয়া তাঁবুর মধ্যে লইয়া গেল। রাধিকা বিপুল আবেগে শম্ভুর গলা জড়াইয়া ধরিয়া ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল।
শম্ভু বলিল, এই মেলার বাদেই বাঘ লিয়ে আসব।
ওদিকের তাঁবু হইতে কিষ্টোর কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল, খোল কানাৎ, ফেলে দে খুল্যে।
তাঁবুর একটা ছেঁড়া ফাঁক দিয়া রাধিকা দেখিল তাঁবুর কানাৎ খুলিয়া দিতেছে, অর্থাৎ ভিতরে না গেলেও তাহারা যেন দেখিতে বাধ্য হয়। সে ক্রোধে গর্জন করিয়া উঠিল, দিব আগুন ধরাইয়া তাঁবুতে।
শম্ভু গম্ভীর হইয়া ভাবিতেছিল। কিষ্টো চলন্ত ঘোড়ার পিঠে দাঁড়াইয়া কসরৎ দেখাইতেছে। রাধিকা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল, নতুন খেলা কিছু বার কর তুমি, নইলে বদনামি হবে, কেউ দেখবে না খেলা আমাগোর!
শম্ভু দাঁতে দাঁত চাপিয়া বলিল, কাল পুলিশে ধরাইয়া দিব শালাকে। মদের সন্ধান দিব।
ওদিকে টিয়া পাখিতে কামান দাগিল, সেই মেয়েটা তারের উপর ছাতা মাথায় দিয়া নাচিল, বাঘটার সহিত কিষ্টো লড়াই করিল, ই:—একটা থাবা বসাইয়া দিল বাঘটা।
রাধিকা আপনাদের খেলার দৈন্যের কথা ভাবিয়া ঝর ঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল! সঙ্গে সঙ্গে আক্রোশেও ফুলিতে ছিল। তাঁবুটা আগুন ধরিয়া ধু-ধু করিয়া জ্বলিয়া যায়। কেরোসিন তেল ঢালিয়া আগুন ধরাইয়া দিলে কেমন হয়?
পরদিন প্রভাতে উঠিতে রাধিকার একটু দেরি হইয়া গিয়াছিল; উঠিয়া দেখিল শম্ভু নাই, সে বোধহয় দুই চারজন মজুরের সন্ধানে গ্রামে গিয়াছে। বাহিরে আসিয়া সে শিহরিয়া উঠিল। কিষ্টোর তাঁবুর চারপাশে পুলিশ দাঁড়াইয়া আছে। দুয়ারে একজন দারোগা বসিয়া আছেন। একি? সে সটান গিয়া দারোগার সামনে সেলাম করিয়া দাঁড়াইল, দারোগা তাহার আপাদমস্তক দেখিয়া বলিলেন, ডাক সব, আমরা তাঁবু দেখব!
আবার সেলাম করিয়া বেদেনী বলিল, কি কসুর করলাম হুজুর?
মদ আছে কিনা দেখব আমরা, ডাক বেটাছেলেদের। এইখান থেকেই ডাক।
রাধিকা বুঝিল, দারোগা তাহাকে এই তাঁবুরই লোক ভাবিয়াছেন, কিন্তু সে তাঁহার ভুল ভাঙ্গিল না। সে বলিল, ভিতরে আমার কচি ছেলে রইছে—হুজুর—
আচ্ছা ছেলে নিয়ে আসতে পার তুমি। আর ডেকে দাও পুরুষদের।
রাধিকা দ্রুত তাঁবুর মধ্যে প্রবেশ করিয়া সেই দেখা জায়গাটার আলগা মাটি সরাইয়া দেখিল, তিনটা বোতল তখনও মজুত রহিয়াছে। সে একখানা কাপড় টানিয়া লইয়া ভাঁজ করিয়া বোতল তিনটাকে পুরিয়া ফেলিল এবং সুকৌশলে এমন করিয়া বুকে ধরিল যে শীতের দিনে সযত্নে বস্ত্রাবৃত্ত অত্যন্ত কচি শিশু ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। তাঁবুর মধ্যেই কিষ্টো অঘোরে ঘুমাইতেছিল, পায়ের ঠেলা দিয়া তাহাকে জানাইয়া দিয়া রাধিকা বলিল, পুলিশ আসছে, বসে রইছে দুয়ারে, উঠ্যা যাও।
সে অকম্পিত সংযত পদক্ষেপে স্তন্যদানরত মাতার মতো শিশুকে যেন বুকে ধরিয়া বাহির হইয়া গেল। তাহার পিছনে পিছনেই কিষ্টো আসিয়া দারোগার সম্মুখে দাঁড়াইল।
দারোগা প্রশ্ন করিলেন, এ তাঁবু তোমার? সেলাম করিয়া কিষ্টো বলিল, জি, হুজুর!
দেখব তাঁবু আমরা, মদ আছে—কিনা দেখব।
মেলার ভিড়ের মধ্যে শিশুকে বুকে করিয়া বেদেনী ততক্ষণে জলরাশির মধ্যে জলবিন্দুর মতো মিশাইয়া গিয়াছে।
শম্ভু গুম হইয়া বসিয়াছিল, রাধিকা উপুড় হইয়া পড়িয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছিল। শম্ভু তাহাকে নির্মমভাবে প্রহার করিয়াছে। শম্ভু ফিরিয়া আসিতে বিপুল কৌতুকে সে হাসিয়া পুলিশকে ঠকানোর বৃত্তান্ত বলিয়া তাহার গায়ে ঢালিয়া পড়িল। বলিল, ভেল্কি লাগায়ে দিছি দারোগার চোখে।
শম্ভু কঠিন আক্রোশভরা দৃষ্টিতে রাধিকার দিকে চাহিয়া রহিল, রাধিকার সে-দিকে ভ্রূক্ষেপও ছিল না, সে হাসিয়া বলিল, খাবা, ছেলে খাবা?
শম্ভু অতকির্তে তাহার চুলের মুঠি ধরিয়া নির্মমভাবে প্রহার করিয়া বলিল, সব মাটি করে দিছিস তু। উহাকে আমি জেহেলে দিবার লাগি পুলিশে বলে এলাম, আর তু করলি এই কাণ্ড।
রাধিকা প্রথমটায় ভীষণ উগ্র হইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু শম্ভুর কথা সমস্ত শুনিয়াই তাহার মনে পড়িয়া গেল গত রাত্রির কথা। সত্যই একথা শম্ভু তো বলিয়াছিল! সে আর প্রতিবাদ করিল না। নীরবে শম্ভুর সমস্ত নির্যাতন সহ্য করিয়া উপুড় হইয়া পড়িয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল।
আজ অপরাহ্ন হইতে এ তাঁবুতেও খেলা আরম্ভ হইবে। শম্ভু আপনার জীর্ণ পুরাতন পোশাকটা বাহির করিয়া পরিয়াছে, একটা কালো রঙের চোঙার মতো সরু প্যাল্টালুন আর একটা কালো রঙের খাটো-হাত কোট। রাধিকার পরনে পুরানো ঘাঘরা আর অত্যন্ত পুরানো একটা ফুল হাতা বডিস। অন্য সময় মাথার চুল সে বেণী বাঁধিয়া ঝুলাইয়া দিত; কিন্তু আজ সে বেণীই বাঁধিল না, আপনাদের সকল প্রকার দীনতা ও জীর্ণতার প্রতি অবজ্ঞার ক্ষোভে তাহার যেন লজ্জায় মরিতে ইচ্ছা হইতেছিল। উহাদের তাঁবুতে কিষ্টোর সেই বিড়ালির মতো গাল মোটা, স্থবিরার মতো স্থুলাঙ্গী মেয়েটা পরিয়াছে গেঞ্জির মত টাইট পাজামা, জামা, তাহার উপর জরিদার সবুজ সাটিনের একটা জাঙ্গিয়া ও কাঁচুলি ঢঙের বডিস, কুৎসিত মেয়েটাকেও যেন সুন্দর দেখাইতেছে, উহাদের জয়ঢাকটার বাজানোর মধ্যে কাঁসা-পিতলের বাসনের আওয়াজের মতো একটা রেশ শেষকালে ঝঙ্কার দিয়ে উঠে। আর এই কতকালের পুরানো ঢ্যাপঢ্যাপে জয়ঢাক, ছি—!
কিন্তু তবুও সে প্রাণপণে চেষ্টা করে জোরে জোরে করতাল পেটে।
শম্ভু বাজনা থামাইয়া হুকিল, ও-ইব-ড়-বা-ঘ!
রাধিকা রুদ্ধ স্বর কোন মতে সাফ করিয়া লইয়া প্রশ্ন করিল, বড় বাঘ কি করে?
শম্ভু খুব উৎসাহ ভরেই বলিল, পক্ষীরাজ ঘোড়া হয়, মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করে, মানুষের মাথা মুখে ভরে, চিবোয় না।
সে এবার লাফ দিয়া নামিয়া ভিতরে গিয়া বাঘটাকে খোঁচা দিল, জীর্ণ বৃদ্ধ বনচারী বাঘ আর্তনাদের মতো গর্জন করিল।
সঙ্গে সঙ্গে ও তাঁবুর ভিতর হইতে সবল পশুর তরুণ হিংস্র ক্রুদ্ধ গর্জন ধ্বনিত হইয়া উঠিল, মাচার উপরে রাধিকা দাঁড়াইয়া ছিল, তাহার শরীর যেন ঝিমঝিম করিয়া উঠিল। ক্রুর হিংসাভরা দৃষ্টিতে সে ওই তাঁবুর মাচানের দিকে চাহিয়া দেখিল, কিষ্টো হাসিতেছে, রাধিকার সহিত চোখাচোখি হইতে সে হাঁকিল, ফিন একবার।
তাঁবুর ভিতর হইতে দ্বিতীয় বার খোঁচা খাইয়া উহাদের বাঘটা এবার প্রবলতর গর্জনে হুঙ্কার দিয়া উঠিল, রাধিকার চোখে জ্বলিয়া উঠিল আগুন। জনতা স্রোতের মত কিষ্টোর তাঁবুতে ঢুকিল।
শম্ভুর তাঁবুতে অল্প কয়টি লোক সস্তায় আমোদ করিবার জন্য ঢুকিল, খেলা শেষ করিয়া মাত্র কয়েক আনা পয়সা হাতে শম্ভু হিংস্র মুখ ভীষণ করিয়া বসিয়া রহিল। রাধিকা দ্রুতপদে মেলার মধ্যে বাহির হইয়া গেল। কিছুক্ষণ পরেই সে ফিরিল একটা কিসের টিন লইয়া।
শম্ভু বিরক্তি সত্বেও সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল, কি উটা?
কেরাচিনি। আগুন লাগায়ে দিব উহাদের তাঁবুতে। পুরা পেলম নাই, দু'সের কম রইছে। তাহার চোখ জ্বলিতেছে।
শম্ভুর চোখও হিংস্র দীপ্তিতে জ্বলিয়া উঠিল। সে বলিল, লিয়ে আয় মদ।
মদ খাইতে খাইতে রাধিকা বলিল, দাউ দাউ করে জ্বলবেক যখন।
সে খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। সে অন্ধকারের মধ্যে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল, ওই তাঁবুতে তখনও খেলা চলিতেছে। তাঁবুর ছেঁড়া মাথা দিয়া দেখা যাইতেছিল, কিষ্টো দড়িতে ঝুলানো কাঠের লাঠিতে দোল খাইতে খাইতে কসরৎ দেখাইতেছে, উ: একটা ছাড়িয়া আর একটা ধরিয়া দুলিতে লাগিল। দর্শকেরা করতালি দিতেছে।
শম্ভু তাহাকে আকর্ষণ করিয়া বলিল, এখুন লয়, সেই —নিস্তব্ধ রাতে।
তাহারা আবার মদ লইয়া বসিল।
সমস্ত মেলাটা শান্ত স্তব্ধ; অন্ধকারে সব ভরিয়া উঠিয়াছে। বেদেনী ধীরে ধীরে উঠিল, এক মুহূর্তের জন্য তাহার চোখে ঘুম আসে নাই। বুকের মধ্যে একটা অস্থিরতায়, মনের একটা দুর্দান্ত জ্বালায় সে অহরহ যেন পীড়িত হইতেছে। সে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল, গাঢ় অন্ধকার থমথম করিতেছে। সমস্ত নিস্তব্ধ। সে খানিকটা এদিক হইতে ওদিক পর্যন্ত ঘুরিয়া আসিল, কেহ কোথাও জাগিয়া নাই। সে আসিয়া তাঁবুতে ঢুকিল, ফস করিয়া একটা দেশলাই জ্বালাইল, ওই কেরোসিনের টিনটা রহিয়াছে। তারপর শম্ভুকে ডাকিতে লাগিল, সে শীতে কুকুরের মতো কুণ্ডলী পাকাইয়া অঘোরে ঘুমাইতেছে। তাহার উপর ক্রোধে ঘৃণায় রাধিকার মন ছি-ছি করিয়া উঠিল, অপমান ভুলিয়া গিয়াছে, ঘুম আসিয়াছে। সে শম্ভুকে ডাকিল না, দেশলাইটা চুলের খোঁপায় গুঁজিয়া টিনটা হাতে লইয়া একাই বাহির হইয়া গেল।
এই পিছন দিক হইতে দিতে হইবে। ওদিকটা পর্যন্ত পুড়িয়া তবে এদিকে মেলাটার লোক আলোর শিখা দেখিতে পাইবে। ক্রুর হিংস্র সাপিনীর মতোই সে অন্ধকারের মধ্যে মিশিয়া শন শন করিয়া চলিয়াছিল। পিছনে আসিয়া টিনটা নামাইয়া সে হাঁফাইতে আরম্ভ করিল।
চুপ করিয়া বসিয়া সে খানিকটা বিশ্রাম করিয়া লইল। বসিয়া থাকিতে থাকিতে তাঁবুর ভিতর একবার দেখিয়া লইবার জন্য সে কানাতটা সন্তপর্ণে ঠেলিয়া বুক পাড়িয়া মাথাটা গলাইয়া দিল, সমস্ত তাঁবুটা অন্ধকার। সরীসৃপের মতো বুকে হাঁটিয়া বেদেনী ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল, খোঁপার ভিতর হইতে দেশলাইটা বাহির করিয়া ফস করিয়া একটা কাঠি জ্বালিয়া ফেলিল।
তাহার কাছেই এই যে কিষ্টো একটা অসুরের মতো পড়িয়া অঘোরে ঘুমাইতেছে! রাধিকার হাতের কাঠিটা জ্বলিতেই লাগিল, কিষ্টোর কঠিন সুশ্রী মুখে কী সাহস! উ: বুকখানা কি চওড়া, হাতের পেশিগুলা কি নিটোল।। তাহার আশেপাশে ঘোড়ার ক্ষুরের দাগ—ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে কিষ্টো নাচিয়া ফেরে। ওই যে কাঁধে সদ্য ক্ষতচিহ্নটা—ওই দুর্দান্ত সবল বাঘটার নখের চিহ্ন। দেশলাইটা নিবিয়া গেল।
রাধিকার বুকের মধ্যেটা তোলপাড় করিয়া উঠিল, যেমন করিয়াছিল শম্ভুকে প্রথম দিন দেখিয়া। না, আজিকার আলোড়ন তাহার চেয়েও প্রবল। উন্মত্তা বেদেনী মুহূর্তে যাহা করিয়া বসিল তাহা স্বপ্নের অতীত, সে উন্মত্ত আবেগে কিষ্টোর সবল বুকের উপর ঝাঁপ দিয়া পড়িল। কিষ্টো জাগিয়া উঠিল কিন্তু চমকাইল না, ক্ষীণ নারীতরুখানি সবল আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া বলিল, কে? রাধি—
তাহার মুখ চাপিয়া ধরিয়া রাধিকা বলিল, হাঁ চুপ।
কিষ্টো চুমায় চুমায় তাহার মুখ ভরিয়া দিল, দাঁড়াও মদ আনি।
না, চল, উঠ এখুনই, ইখান থেকে পালাই চল।
রাধিকা অন্ধকারের মধ্যে হাঁফাইতেছিল।
কিষ্টো বলিল, কুথা?
হু-ই দেশান্তরে।
দেশান্তরে? ই তাঁবুটাবু—
থাক পড়্যা। উ ওই শম্ভু লিবে। তুমি উহার রাধিকে লিবা, উয়ারে দাম দিবা না?
সে নিম্নস্বরে খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল।
উন্মত্ত বেদিয়া—তাহার উপর দুরন্ত যৌবন—কিষ্টো দ্বিধা করিল না, বলিল, চল।
চলিতে গিয়া রাধিকা থামিল, বলিল, দাঁড়াও।
সে কেরোসিনের—টিনটা শম্ভুর তাঁবুর উপর ঢালিয়া দিয়া মাঠের ঘাসের উপর ছড়া দিয়া চলিতে চলিতে বলিল, চল।
টিনটা শেষ হইতেই সে দেশলাই জ্বালিয়া কেরোসিনসিক্ত ঘাসে আগুন ধরাইয়া দিল। খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল, মরুক বুড়া পুড়্যা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন