এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা

সমরেশ মজুমদার

অন্ধকার রাত্রি। জঙ্গলের হাঁটা পথ ও বিপথ। ভালো পথের দিক তারা জানে, কিন্তু তার দরকার নেই। সে-পথে আতঙ্কের ভয় বেশি।

তারা চলেছে। ছোটোদল, বড়োদল, ভাঙাদল হয়েও একমুখেই একইসঙ্গেই চলেছে।

না, তীর্থযাত্রী নয়। সাগরমেলা বা কেদার বদরিকাশ্রমের যাত্রী নয়। মেলা বা অন্য কোনও দুর্গম পথের যাত্রীও নয়।

যদিও গন্তব্য তাদের দুর্গম। কোনওরকমে যদি একবার গন্তব্যস্থলে পৌঁছোয়। তাহলে? তাহলে মেয়েদের মান, পুরুষের প্রাণ আর চিরকালের ধর্ম বাঁচবে। ধনরত্ন নয়। সে তাদের নেই। ধন-ধান্য ছিল বটে।

পুরুষদের হাতে লাঠি টাঙ্গি। পিঠে কাপড়চোপড় বা চালচিঁড়ের পুঁটলি। খালি গা, পরিধানে আঁটসাঁট ধুতি মালকোঁচা দিয়ে পরা। নানারকমের পুরুষ বৃদ্ধ যুবক প্রৌঢ়।

আর মেয়েদের কোলে শিশু। হাতেও শিশুর হাত ধরা। কারুর হাতে তার সঙ্গে চাল-মুড়ি চিঁড়ে-গুড়ের পোঁটলা। মাথায় ঘোমটা।

নানারকমের নারী, কমবয়সিরা একেবারে ভিড়ের মাঝখানে। গুরুজনের বন্ধুজনের বেষ্টনীতে।

নীরব যাত্রা। যাত্রীরাও আতঙ্কাভিভূত।

সহসা কোন জঙ্গলের একদিকে রেলের তীক্ষ্ম বাঁশির 'কু' শব্দ শোনা গেল। তারপর আকাশে কালো ধোঁয়া। গাড়িচলার সুদূরবর্তী শব্দ।

আনন্দে মেয়েরা উলুধ্বনি দিল। আর পুরুষ কয়েকজন হরিবোল দিল।

আ:, কী হুজ্জুত লাগাইছস চুপ কর। ওরা শুনবার পাব বুঝছস না? একজন প্রৌঢ় পুরুষ ধমক দিলেন।

যাত্রীরা নীরব হয়ে গেল। কিন্তু মনে আনন্দের সীমা নেই। ক-রাত্রি হেঁটে চলে জঙ্গল ভেঙে নদী পার হয়ে আজ বুঝি কূল পাওয়া গেল। একবার টিকিট কিনে গাড়িতে বসলেই হয়। জানে দেশ গেছে। স্বজন নেই। মাটি নেই। ধন নেই। অর্থ নেই। নি:সম্বল নি:স্ব। তবু এক ধর্মের এক জাতের মানুষ তো আছে। শেয়াল কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেবে না। প্রাণ মান নিয়ে টানাটানি করবে না।

পঞ্চাশ-ষাট জনের জনতা এসে পৌঁছল। সীমান্তের স্টেশনের ধারে। পিছনে আরও আসছে। এপার থেকে লোকেরা ঘিরে দাঁড়াল, 'কোত্থেকে আসছিস? পাসপোর্ট কই?'

বোকা নির্বোধ লোকগুলো পাসপোর্টের নাম জানে। শিখেছে। কিন্তু মাঝে-মাঝে এমনি এসে পড়তে পেরেছে তো অনেক জন। গতবছরের দুর্যোগের দিনে।

তারা বললে, 'পাসপোর্ট করতে পারিনি, মিঞা সাহেব, চলে যেতে দিন। আর তো আসুম না।'

মিঞা সাহেবরা চুপ করে থাকেন। বলেন, 'ওদের ওপারে জিগাও।' এরা ওদিকে যায়।

তারা বললেন, 'না, হুকুম নেই, ফিরে যাও দেশে।

'সে কী?' হতবুদ্ধি লোকগুলো হাতে-পায়ে ধরে দুদিকের লোকদের।

না:, হাত-পায়ে ধরার চেয়ে, ক্রন্দনের চেয়ে আরও স্পষ্ট স্থূল কিছু চাই। হ্যাঁ। দুদিকেই চাই; বুড়ো বড়রা পিছন ফিরে আছেন। ছোটখাটোরা ইঙ্গিত-ইশারায় বক্তব্য বুঝিয়ে দেয়। দু-পক্ষেরই দ্বিমত হয় না।

যারা পারল গেল, বাকিরা স্টেশনের প্রান্তে একপাশে বসে থাকে।

সহসা একজন এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলে, 'তোর নাম কী?'

জিজ্ঞাসিতেরা নীরবে বসে ছিল একধারে। তাদের 'সেলামি' 'নজর' দেবার মতো কিছুই নেই। ফিরে যাবার উপায়ও নেই। কিন্তু এগিয়ে যাবার মতো উপায়ও নেই। হেঁটে-হেঁটে সে যেতে পারত যদি যেতে দিত। তারা দুজন স্বামী-স্ত্রী।

সে আশান্বিত হয়ে বললে, 'বাবু, আমার নাম সুদাম ঋষি।'

'ও কে তোর সঙ্গে?'

'আমার পরিবার। আর কেউ নাই, আমরা দুজনেই আছি। যেতে দেবেন, বাবু?'

বেশ সুশ্রী বিশ-বাইশ বছরের মেয়ে। সেও নতমুখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসেছিল।

সকলের চোখ পড়ছে। কোথায় কোনও ভালো মেয়ে আছে। কোথায় কার ট্যাঁকে টাকাপয়সা আছে। দু-পারের মানুষই এক নিমেষে বুঝতে পারে অভ্যস্ত চোখে কারা কেমন, কার কাছে কী পাওয়া যেতে পারে।

প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞাসা করলে, 'কত দিতে পারবি দুজনার জন্যে?'

সুদাম ব্যাকুলভাবে বললে, 'বাবু গো, পাঁচটি টাকা আছে, আর কিছু নাই।'

তারা হাসিতে ভেঙে পড়ল একসঙ্গে। 'যা, বেটা ফিরেই যা দেশে।'

তারা সুদামের স্ত্রীর দিক চাইল।—'ওর নাম কী?'

'উয়ার নাম দুর্গা।'

'দুর্গা'ই বটে। তারা ভাবে। 'তোদের দুজনের জন্যে পঁচিশ টাকা লাগবে। তাহলে হাঁটাপথে যেতে দেবো।'

'কোথায় পাব বাবু অত টাকা?'

সহসা দুর্গা ঘোমটা সরিয়ে স্বামীকে কী বললে। কী সুন্দর মুখখানি। বা:, রংও তো বেশ। কে বলবে মুচির মেয়ে।

সুদাম বললে, 'কলকাতায় ওর ভাই আছে, সেখানে গেলে টাকা আনতে পারি। কিন্তু ওকে পাঠিয়ে দিই একলা কার সাথে?'

যারা দুর্গাকে দেখছিল তাদের আর চোখ ফেরে না।

তারা বললে, 'তুই যা না। টাকা নিয়ে আয়। ও এখানে মাস্টারবাবুর বাড়িতে থাক (স্টেশনমাস্টার)।'

ওরা দুজনে কাঁটা হয়ে গেল। যেন এখনি কে ছাড়াছাড়ি করিয়ে দিচ্ছে।

সুদাম বললে, 'না থাক, বাবু। ফিরেই যাব।'

দিন শেষ হয়ে যায়। রাত্রি। মুড়িশুড়ি দিয়ে দুর্গা স্বামীর কাপড়ের সঙ্গে নিজের আঁচল বেঁধে শুয়ে থাকে। একটু ঘুম আসে। আবার ভয়ে ভাবনায় আতঙ্কে ভেঙে যায়।

দেখতে-দেখতে এ-দলের সব লোকই যেভাবেই হোক এদিক-ওদিক চলে গেল। যারা রইলেন তারা অচেনা ভিন গাঁয়ের লোক। তবু হিন্দুই।

আবার দিন গিয়ে রাত আসে। সেই দালালরাও আসে। বলে, 'তুমি চলে যাও, সুদাম। টাকা নিয়ে এসো, আমরা তোমার বউকে দেখব।'

দুর্গা ভয়ে কাঠ হয়ে থাকে। ওরা দেখবে? ওরা কারা?

আবার দিনরাত যায়। অবশেষে দুর্গাই বলে, 'তা তুমি আমাকে মাস্টারসাহেবের বাড়ি নিয়ে রেখে এসো। যদি তিনি রাখেন তো থাকবো। তাঁর তো বিবি আছে।'

স্টেশনমাস্টারের কোয়ার্টার কাছেই। তাঁর বিবি আছেন। দু-তিনটি ছেলেমেয়ে আছে।

দুর্গা একগলা ঘোমটা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। আর সুদাম বাড়িতে মাস্টারসাহেবের পায়ের কাছে বসে চোখের জল ফেলতে-ফেলতে বললে, 'আপনি আমার বাপের মতন। আপনি ওরে রাখুন। আমি ওর ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা এনে আপনাকে দেবো।'

মানুষ পাথরও হয়, আবার মানুষও হয়।

লোকের দু:খ-দুর্দশা দেখে স্টেশনমাস্টারেরও সবই যেন অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।

তবু সহসা সুদাম আর দুর্গার অসহায়তা দেখে কেমন দয়া হল।—'আচ্ছা, তুই রেখে যা আমার বিবির কাছে। কিন্তু ক'দিন হবে? এখানে তো নানারকম গুন্ডা আছে, আমি একা সামলাতে পারব কি? আর খাবে কী? তোরা তো আমাদের কাছে খাবি না—হিঁদু তো।'

সুদাম খুশি হয়ে উঠে বসল।

'আমি যাবো আর আসব। ওকে আপনার পোলাপান মনে করবেন। ও যা হয় করে একটু ফুটিয়ে নেবে ওর 'মায়ের' কাছে—আপনার বিবিসাহেবের কাছে। চিঁড়েমুড়ি খাবে। সঙ্গে আছে। দু-তিন দিন বই তো নয়। মা-জানের কাছে থাকবে।'

তন্বী সুন্দরী তরুণী দুর্গা দিন গোনে। হ্যাঁ, আজ তিনদিন। আজ এসে পড়বেই সুদাম। দাদারা কলকাতায় আছে। ওর মাসি আছে। সুদামেরও পিসি আছে। সকলে মিলে কি আর পঁচিশটা টাকা দেবে না?

না:, পাঁচ দিন গেল। দেখতে-দেখতে দশ দিনও কেটে গেল। সে ভয়ে ভাবনায় এবারে অভিভূত হয়ে যায়। কী হল সুদামের? কী হল? আর আসবে না? বিপদ হল কিছু? সেখানকার লোকেরা ছেড়ে দেয়নি? মিঞা বাড়ির কাছাকাছি স্টেশনের ফাজিল ছোঁড়াগুলো বিবিসাহেবের কাছে এসে দাঁড়ায়। নানা গল্পের মাঝে বলে,—'বিবিসাহেব, ওকে কেন ঘরে পুষে ধরে রেখেছ। বিদেয় করে দাও। যেখানে ইচ্ছে যাক চলে। স্টেশনের কুলিগুলো হি-হি করে হেসে বলে, 'সে আবার আসবে টাকা নিয়ে? ঘাড় থেকে নামিয়ে বেঁচেছে বলে। এবার ছুঁড়িই কত টাকা রোজগার করবে, আমরাই খদ্দের দেখে দেবো।' দুর্গা ছোট্ট ভাঁড়ারঘরের এককোণ থেকে সব শুনতে পায়। বুক ঢিপঢিপ করে। চোখ জলে ভরে যায়। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।

তারা চলে গেলে সে বিবিসাহেবের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদে। বলে, 'তুমি আমার মা। মা-জান বলেছি তোমায়, তুমি আমায় ওদের কাছে দিও না।'

বিবি বলেন, 'নারে না, ভাবিসনি। থাক না তুই।'

কিন্তু রাত্রে অবসর হলে স্বামীকে বলেন, 'সে-লোকটা আইল না ক্যান?

ফেইল্যা পালাইল নাকি?'

মিঞা বলেন, 'খোদায় মালুম সে-কথা। তবে আসবে। জোয়ান পরিবার, অত রূপ। যাবার সময় আমার পায়ে ধরে কাঁদল। তবে কলকাতা শহর। কী হয়তো বিপদ হল। নয়তো টাকা পায়নি। ম্যেয়া ছেড়ে দিতে পারতাম। তা 'এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা।' দুদিকেই তো টাকা দিতে লাগব। সবাই তো সমান সাধু। জানোই তো।'

বিবি বললেন, 'আহা, জোয়ান মেয়েটা। কী হবে কে জানে। সে যদি না-আসে। কতদিন তুমি রাখতে পারবা এই হাঙ্গামা হুজ্জুতের দিনে।'

পাশের ঘরে বিনিদ্র দুর্গা সব শুনতে পায়। তাহলে?

তাহলে কী করবে সে? ওই রাক্ষস দলের হাতেই এরা ছেড়ে দেবে ওকে? যেমন আর-আর গাঁয়ে দেখে শুনে এল, পথেও যেমন ক'বার হল। মেয়েরা কাঁদল। পুরুষরা মরল। পালাল। তাহলে? দুর্গা কাঠ। দুর্গা পাথর।

ভাবে, পালিয়ে যাবে? কোথায় পালাবে। বাইরেও তো ওরা আছে। গলায় দড়ি দেবে? ডুবে মরবে? নদী আছে কোথায়? পুকুর আছে কি? আছে যেন। আবার ভাবে, আসবে। সুদাম আসবে নিশ্চয়ই।

কিন্তু আরও ক'দিন গেল।

স্টেশনমাস্টারসাহেব আর বিবি সবাই সন্দিগ্ধ হয়ে উঠছেন ক্রমশ। সুদাম পালিয়েছে। দুর্গা আর রাঁধে না। খায় না। শুকনো দুটি চিঁড়ে-মুড়ি জলে ভিজিয়ে চিবিয়ে নেয়—বিবি বেশি-বেশি বললে।

...একুশ দিনের দিন সুদাম এল। চোখ-মুখ বসে গেছে ভাবনায়—কিন্তু এল।

অতি কষ্টে নানারকমের লোকের হাত থেকে টাকা ক'টি বাঁচিয়ে আনতে পেরেছে, কেঁদে-ককিয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে।

এসে আভূমি নত সেলাম করে স্টেশনমাস্টারের সামনে দাঁড়াল। ডাকল, 'সাহেব?'

সাহেব যেন চমকে ভূত দেখলেন। 'এত দেরি করলি? তিনদিন বলে। কী হয়েছিল?'

'টাকার জোগাড় করতে দেরি হল সাহেব। তা আজকেই তো ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারুম? ভালো আছে তো সে?'

হাতের নোটগুলো সাহেবের সামনে ধরে দেয়।

তিনি নিলেন না। শুধু শুষ্ক মুখে বললেন, 'তুই কিছু খেয়ে নে। তারপর কথা বলব।'

সুদাম ভয় পেয়ে গেল। ভাবলে, বুঝি আরও টাকা চাইবেন। কোথায় পাবে? কোথায় পাবে টাকা?

সে সাহেবের সঙ্গে তাঁর কোয়ার্টারে গেল।

বিবিসাহেবকেও পেন্নাম করল। তিনিও শুকনো মুখে বললেন, 'ভালো আছো তো? তা এত দেরি কেন করলে?'

'সে কোথায়, মা-জান?' সুদাম উৎসুক হয়ে এদিক-ওদিক চায়।

বিবি বললেন, 'কিছু খাওয়াদাওয়া কর। তারপর বলছি।'

'সে কি রাঁধে নাই? ওই দু'গা খাব'খন। দিতে বলুন।'

এবারে বিবির চোখে জল এল।

শুকনো কাঠ মুখে সুদাম বললে, 'সে কি নেই? ধরে নিয়ে গেছে তাকে?'

মিঞা পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, 'না, ধরে নেয়নি। সে বেঁচে নেই। জলে ডুবে গেছে।' সুদাম স্তম্ভিতের মতো উঠোনে বসে পড়ল।

অনেকক্ষণ—তারপর উঠে বাইরে গেল।

অকস্মাৎ তার মনে হল সবাই ওরা মিথ্যে বলছে। ওরা আরও টাকা চায়, তাহলেই ছেড়ে দেবে। সে বেঁচে আছে। সে আছে এইখানে কারুর কাছে।

সে স্টেশনে এল। একটু কাজের নিরিবিলি হলে সে মিঞাসাহেবের পা জড়িয়ে ধরে মাথা কুটতে লাগল মাটিতে, জুতোর ওপরে। কপাল মাথা ফুলে ঢিবি হয়ে ওঠে।

লোক জমে গেল এদিক-ওদিক।

সে কাঁদে আর বলে, 'সাহেব গো, ওরে দিয়া দেন। আমার আর কেউ নাই গো!'

গোলমালে ওপারের অফিসার এপারের কর্মচারী ভাগ্যনিয়ন্তারা সকলে এসে দাঁড়ালেন।

সকলেই বলে, 'সে একটা পচা পুকুরে গলায় ইট বেঁধে ডুবে মরেছে। সবাই জানে। বেঁচে নেই রে। তোর দেরি দেখে এই করেছে।'

সুদাম ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। কিছু বলে না। তার বিশ্বাস হয় না।

হিন্দু অফিসার বলেন, 'তুই আমার সঙ্গে ওপারে চল। এখানে থেকে কী করবি? পাঠিয়ে দেব।'

মুসলমান অফিসার বলেন, 'সত্যি বেঁচে নেই রে সে। আমরা দেখেছি, পুলিশ জানে।' সে জন্তুর মতো বসে থাকে। কারুর কাছে যায় না। কোনো কথাও কানে যায় না তার।

এক-একবার বনের দিকে, যাওয়া-আসার পথে লোকের বিরাম নেই। সেইদিকে তাকিয়ে থেকে-থেকে দুর্গাকে খোঁজে। ওই মেয়েটি? ওই-যে ফরসা মতো রং, লালপাড় শাড়িপরা, পায়ে আলতা? ঠিক যেন দুর্গা। কিন্তু না:, সহসা কী মনে হয়। ফিরে আসে স্টেশনমাস্টারের বাড়ি।

সাহেব খানা খেয়ে বসে ছিলেন।

'সাহেব গো, আপনি জানেন সে কোথায় আছে, মোরে বলেন। আমি তারে কলকাতায় নিয়ে গঙ্গাচান করিয়ে পঞ্চগব্যি খাইয়ে শুদ্ধ করে নিমু। তারে জাতে তুলে নিমু। বড় কেঁদেছিল সে। যাবার দিনে।'

দু:খিতভাবে বিবি বললেন, 'ওরে, সে নেই রে, নেই।'

তার পরদিন আবার আসে। এবারে বলে, 'মা-জান, আমি মোছলমান হবো। তাহলেই তো ওরা আমাকে তারে ফিরে দিবে। তুমি তাদের তাই বল গো। মোছলমানরা তো মোছলমানের বৌরে ঘরে রাখবে না। ফিরিয়ে দেবে। মা-জান, তুমি আমার মা, সাহেবরে বুঝায়ে বলো। সে মরেনি। সে আমারে শিগগির আসবার জন্যি বলেছিল।'

বিবিসাহেব হতবুদ্ধি। কী বলবেন ভেবে পেলেন না।

শুধু বললেন, 'তুই পাগল! সে যে বেঁচে নেই রে।'

সুদাম ফিরে গেল। পথে-বিপথে বনে-বাদাড়ে ঘোরে। রাত নেই, দিন নেই, ঘোরার শেষ নেই। যেদিক থেকে এসেছে সেদিকেই হয়তো দুর্গা গেছে। লোকেরা নিয়ে গেছে। সেদিকে যায়। প্রতিদিনই লোক আসছে। জমছে। ভিড় করছে।

কত রকমের মেয়ে। পাৎলা চেহারা, তন্বী, জোয়ান মেয়ে। ফরসা রং। পায়ে আলতা, মাথায় সিঁদুর, মুখে পান। দূর থেকে দেখে মনে হয় ওই-তো দুর্গা। চেঁচিয়ে ডাকে, 'দুর্গা রে, দুগগা।'

এগিয়ে যায়। না। দুর্গা নয় তারা কেউ।

অনেক রাত্রে ক্লান্ত হয়ে স্টেশনে পড়ে ঘুমোয়। আবার সকাল হবার আগেই চমকে ঘুম ভাঙে।

নিশুতি অন্ধকারেই উঠে পড়ে। আজ হয়তো পাওয়া যাবে দুর্গাকে।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%