বাঁদী

সমরেশ মজুমদার

[ শশী বলেছিল মেমসাহেবের দয়ার শরীর। কুঞ্জ আরেকটু বেশি দেখেছিল : স্বাধীন, সহজ, নি:শঙ্ক। বকুলদিকে মনে পড়েছিল, কুড়িতে বুড়ি, স্বামীর কাছে ক্রীতদাসী। দুই মেরু। বকুল যদি তমসা, মেমসাহেব তবে জ্যোতি, তারপর— ]

সিনেমায় কী হয়েছিল, সেদিন বোঝেনি কুঞ্জ। ফিরে এসে বকুল ভালমন্দ কিছুই বললে না। কেমন গল্প, ক'টা গান, কিছু না। কুঞ্জও জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেলে না।

দিন তিনেক বাদে প্রাণকৃষ্ণ বলল, চটপট তৈরি হয়ে নাও। বিকেলে বেড়াতে যাব। সুবোধ চক্কোত্তি আসবে গাড়ি নিয়ে।

বকুলের মুখ মড়াফ্যাকাশে হয়ে গেল, প্রাণকৃষ্ণ সেটা নজর করল কিনা বোঝা গেল না, কিন্তু কুঞ্জ দেখে নিয়েছে ঠিক।

—আজকে? আবার!

বিবর্ণ মুখ প্রাণকৃষ্ণ দেখতে পায়নি, কিন্তু বিরল গলা শুনল ঠিক। চটে গিয়ে বলল, কী রাজকার্য করছ এখানে বল দেখি। সুবোধ চক্কোত্তির মেলা পয়সা বকুল, খাবার লোক নেই, লোকটা তাই মনমরা হয়ে থাকে। নইলে টাকাকে টাকা জ্ঞান করে না। আজ ধরেছে ডায়মন্ডহারবার যাবে।

—যাক না। বকুল বলল, যত খুশি বেড়িয়ে বেড়াক। আমাদের নিয়ে টানাটানি কেন।

কথার ছিরিতে প্রাণকৃষ্ণ ক্ষেপে গেল।—টানাটানি আবার কিসের। যেতে ইচ্ছে হয় যাবে, না হয়, যাবে না। আমার চাকরিও হবে না।

স্থির চোখে একবার স্বামীর চোখের দিকে তাকাল বকুল, বলল, বেশ, চল।

ফিরে এসে সটান শুয়ে পড়ল। কুঞ্জ আগেই মুড়ি-বাতাসা খেয়ে নিয়েছিল। সেদিন আর উনুন জ্বলল না।

নাটকীয় সেই ঘটনাটা ঘটল আরও দিন চারেক পরে।

একটা টাকা দিয়ে লোকটা ওকে ফরমাস করল, যাও তো খোকা, এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এস, আর দু-খিলি পান।

ঝাঁঝাঁ দুপুর, দোকানের ঝাঁপ বন্ধ, ফিরে আসতে কুঞ্জর মিনিট পনেরো লাগল। দরজা ঠেলে ঘুরে ঢুকতে যাবে, পারল না।

রুদ্ধশ্বাস বকুলদি আরক্তমুখী, বলছে যান, এখুনি বেরিয়ে যান আপনি। নইলে—

মিটি মিটি হাসছে সুবোধ।—নইলে কী।

—নইলে উনি এসে আপনাকে ঘাড় ধরে বার করে দেবেন।

—প্রাণকেষ্টোর কথা বলছ? তেমনি হাসছে সুবোধ,—আরে না, সে আসছে না বকুল, তোমার ভয় নেই। প্রাণকেষ্টকে মোড়ের দোকানে বসিয়ে এসেছি, সে এখন চিংড়ির কাটলেটের কাঁটা চুষছে।

সেই মুহূর্তে কী হল কুঞ্জর, ঘরে ঢুকল ঝড়বেগে, অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সুবোধের গায়ে, হাতের কাছে কিছু না পেয়ে শুধু নখে রক্তক্ষত করে দিতে থাকল।

ছিটকে পড়ল অবশ্য মুহূর্তেই। সুবোধ চক্রবর্তী লিকলিকে হলেও কুঞ্জর মতো পুঁচকেকে কায়দা করার জোর রাখে। মেজেয় ঠোকর খেয়ে কেটে গেল কপালের খানিকটা, আর, তখন আর, জ্ঞান রইল না কুঞ্জর। হাতের মুঠোয় ছিল খুচরো ক'আনা পয়সা, দেশলাই, সিগারেটের প্যাকেট। সব আবীরছোঁড়ার মতো ছুড়ে দিল সুবোধের চোখ লক্ষ্য করে। চশমাটা চুরমার হয়ে পড়ল মাটিতে, তারই দু-একটা টুকরো বিঁধে থাকবে সুবোধের চোখে। দু-হাতে মুখ ঢেকে সুবোধ মাথাহেট-অপমানে ঘর থেকে সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু সে তো শুধু প্রথমাঙ্কের যবনিকা। প্রাণকৃষ্ণের প্রবেশ হল বেলা গড়িয়ে যেতে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, সুবোধ আসেনি?

হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসেছিল বকুল, এতক্ষণে ভেঙে পড়ল কান্নায়। গোঙানির সঙ্গে ইনিয়ে বিনিয়ে কী বললে, বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে পেল না কুঞ্জ।

প্রাণকৃষ্ণ ততক্ষণ কঠিন হাতে ঠেলছে বকুলকে।—যাওনি, যাওনি তবে সুবোধ চক্কোত্তির সঙ্গে?

মিনমিন স্বরে বকুল একবার বলতে চেষ্টা করল, তুমি ছিলে না—

—সতীনোকখি! কই, পাতানো ভাইয়ের সঙ্গে গলাগলি করে সিনেমায় যাওয়ার সময় এই হিসেব তো ছিল না। ওর সঙ্গে কিসের এত গুজগুজ ফুসফুস। ও শালাকে আজই মেরে তাড়াব।

দম নিল প্রাণকৃষ্ণ, ফের হতাশার ভঙ্গিতে হাত ঘুরিয়ে শুরু করল : আর কী, যা কিছু আশা ও ভরসা ছিল, সব ফরসা হয়ে গেল। কী খোয়া যেত তোমার সুবোধের কথাটা রাখলে। আর মাস খানেকের মধ্যেও একটা কাজ যদি না জোটাতে পারি, তখন কোথায় থাকবে তোর এত তেজ। বেশ্যাবিত্তি করেও কূল পাবিনি।

মেরে তাড়াতে হল না, কুঞ্জ সেদিন নিজে থেকেই সরে পড়ল। তারপরেও কিন্তু একদিন লুকিয়ে দেখা করতে এসেছিল বকুলের সঙ্গে। দেখল তালা বন্ধ।

মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, দেখল গাড়ি থেকে নামল বকুল।

ভাঙা চশমা জোড়া লাগেনি, নতুন চশমা সুবোধের চোখে। ভুরুর ওপরে ছোট একটু ব্যান্ডেজ।

উলটোদিকে মুখ ফিরিয়ে হনহন-রাগে কুঞ্জ চলতে শুরু করল।

সব শুনে শশী বলল, রাগের কী আছে। বকুল ঠিকই করেছে কুঞ্জ।

শশীর সব ঠান্ডামাথা বিবেচনা। বলল, স্বামীর ইচ্ছেই তো ইস্ত্রীর ইচ্ছে। স্বামীর ভালোই তো ইস্ত্রীর ভালো। তার আবার আলাদা সুখ কী, আলাদা ইজ্জত কী।

কুঞ্জ তবু বলল, তাই বলে পরপুরুষের...

শশী বলল, পরপুরুষ আবার কী। স্বামী যার হাতে সঁপে দেন তার মধ্যেই তো স্বামীকে ধ্যান করতে হয়। গোপিনীরা যেমন করেছেন। নিজেদের শ্রীকৃষ্ণের কাছে সঁপে দিতেন, পড়িসনি? এর মধ্যে কোন পাপ নেই কুঞ্জ। বকুলের কোনও দোষ নেই।

চার নম্বর পোলের পাশের দুনম্বর বস্তির দিনগুলো এখন মনে হয় দু:স্বপ্নের মত। সেই নর্দমার আঢাকা গন্ধ, ফুটো চালে উঁকি দেওয়া শতনেত্র ইন্দ্র আকাশ, আর শতছিদ্র কাপড়ে রোগারোগা কতগুলো মেয়েমানুষের ঘোরাঘুরি।

এখানে শুধু ফুলে ফুলে রামধনু, সবুজ ঘাসগালিচা, ঝাউউদাস হাওয়া, আর,—মেম সাহেব।

স্বল্পলোক একটি স্বপ্নসুড়ঙ্গের মত দিনগুলোর স্মৃতি মনে এখন ছায়াছায়া মাত্র আছে। পরম্পরা নেই, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সম্মোহিত দিন।

কোথায় কোন স্পোর্টসে বখশিস বিতরণ করে এসেছেন মেমসাহেব। এসেই শুয়ে পড়েছেন বিছানায়। মাথা ধরেছে। একটু ওডিকোলন ছিটিয়ে দিলেন কপালে, তাতেও ব্যথা কমল না, অস্ফুট গোঙানি শুনতে থাকল কুঞ্জ, দূরে বসে। একটু পরে মেমসাহেব ওকে ইশারায় ডাকলেন, ছোট রুমালটা শুকিয়ে গিয়েছিল, আবার ভিজিয়ে আনতে বললেন।

শয়নকক্ষলগ্ন স্নানঘর। এটুকু পথ যেতে আসতে কুঞ্জর তিন মিনিট কেটে গেল। এতক্ষণ ধরে নিবিড় স্পর্শে ইন্দ্রাণীর কপালের সবটুকু তাপ আহরণ করেছে রুমালটা, সেই তাপটুকু কুঞ্জ শুষে নিতে চাইছে করতলের রোমকূপ দিয়ে। বেসিনে জল ঝরছে তা ঝরছেই; ইন্দ্রাণী কাতর গলায় ডাকলেন, কুঞ্জ! কী করছিস এতক্ষণ ধরে।

চকিতে সম্বিত ফিরে এল। থরথর হাতে ভিজে রুমালটা মেম সাহেবের হাতে কুঞ্জ তুলে দিল।

একটু পরেই ঘরে ঢুকেছেন চৌধুরী সাহেব। সুইচবোর্ডে হাত দিতেই ইন্দ্রাণী বলেছেন, প্লীজ, ডোন্ট।

মাথা ধরেছে?

পাশ ফিরে শুয়ে ইন্দ্রাণী বলেছেন, ইয়েস, বীস্টলি।

তখনকার মত কেটে গেছে বটে, কিন্তু সেই স্বপ্নমোহ বারবার ফিরে এসেছে কুঞ্জর।

আর্ট একজিবিসনে যাবেন, বিছানা থেকে উঠে মেমসাহেব চোখে মুখে জল দিতে গেছেন, বিছানাটা ফের ঠিক করতে গিয়েও কুঞ্জর হাত সরেনি। চাদরে বালিশে একটি দিব্যদেহের ছাঁচ, একটি অস্পষ্ট মধুর সুরভি।

জুতো পালিশ করতে গিয়েও দেরি হয়েছে, ধমক খেয়েছে, তবে কুঞ্জর হুঁশ হয়েছে।

আরেক দিন।

দামি শাড়িখানা কুঞ্জই ধুতে দিয়েছিল। ভাঁজ খুলেই মেমসাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, একী, এমন করে আঁচলটা কাটলে কে!

তলব পড়ল কুঞ্জর।

—এটা কে ধুয়ে এনেছে, তুমি?

—কুঞ্জ স্বীকার করল। তৎক্ষণাৎ ওকে শাড়িটা দিয়ে ইন্দ্রাণী বললেন, যাও, এক্ষুনি এটা ওদের দোকানে দেখিয়ে নিয়ে এস। বল, পুরো দাম কাটব আমি।

কুঞ্জ তবু নড়ে না।

মেমসাহেব ধমক দিলেন আবার।—

—যা—আও! দাঁড়িয়ে আছ যে।

পলক পড়ছে না কুঞ্জর চোখের। ওর পেছনের দেয়ালে বিজলী আলো, সামনে মেমসাহেব। হঠাৎ কুঞ্জর নজরে পড়েছে, মেম সাহেবের গায়ে ওর সম্পূর্ণ দেহের ছায়া। কুঞ্জর চিনতে ভুল হয়নি, সে-ছায়া ওর নিজেরই। নিনখ শুভ্র পায়ের আঙুর-আঙুল ছুঁয়ে সাপের মত বেয়ে বেয়ে উঠেছে সে ছায়া, শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে বাধা পেয়ে পেয়ে, বাধা না মেনে, ছায়া করাঙ্গুলি থরথর করে কাঁপছে ইন্দ্রাণীর দু:শাসন উচ্চচূড় স্তনে, কুঞ্জর রুগ্ন, ধুক ধুক বুক ছায়া হয়ে মিশে আছে ইন্দ্রাণীর অবারিত গ্রীবামূলে, আর ইন্দ্রাণীর ঈষদ্ভিন্ন অধরোষ্ঠ কুঞ্জর ছায়া কণ্ঠে আসক্ত। মাথায় কুঞ্জ ইন্দ্রাণীর ছোট, কিন্তু ছায়া হয়ে ছাড়িয়ে গেছে।

ইন্দ্রাণী ফের অসহিষ্ণু ধমক দিলেন, কই গেলে না? যাও।

যাবে, কুঞ্জ এবার যাবে। কায়া দিয়ে যার পায়ের পাতাটুকু ছোঁবারও অধিকার কোনদিন পাবে না, ছায়া হয়ে তার সর্ব দেহের নিবিড় স্পর্শ পেয়েছে। কুঞ্জর আর আপশোষ নেই।

কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে গেছে। কদিন ধরে স্পষ্ট টের পেয়েছে কুঞ্জ।

বাগানে জল দেওয়া বন্ধ। ঘাস বিবর্ণ, হলিহক, ভায়োলেট, পপি আর প্রিমরোজ নির্জীব। গাছগুলো ঝাঁকরাচুল হল, তবু ছাঁট নেই। শশী বলল, এ বছর আর ফুল হবে না, বাড়তি খরচ সাহেব সব বন্ধ করে দিয়েছেন। একটু থেমে ক্ষুন্নকণ্ঠে আবার বলল, আমারও জবাব হয়ে যাবে কুঞ্জ।

—জবাব হয়ে যাবে শশীদা!

কুঞ্জর শহর বাস বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, গলায় আর তেমন আন্তরিকতা ফোটে না। এমনকী শশীর সুপারিশেই যে এখানে ঢুকেছিল সেটাও যেন ভাল মনে নেই কুঞ্জর।—জবাব হয়ে যাবে শশীদা! কারুর পুত্র বিয়োগের খবর পেয়ে মেমসাহেব ফোন তুলে যে সুরে শোকাতুরাকে সান্ত্বনা দেন, কুঞ্জর গলাতেও সেই নিরুত্তাপ নাগরিকতা।

আসল খবর জানা গেল ক্রমে ক্রমে। শেয়ারের খেলায় ফকির হয়েছেন চৌধুরী সাহেব। কাঁচা টাকা প্রায় সবই খাঁচাছাড়া চিড়িয়ার মতো উধাও, স্থায়ী জিনিসের মধ্যে এই বাড়ি, এই গাড়ি আর কিছু জমি—সেখানেও স্পেকুলেশন—সেও বঁড়শে বেহালার দক্ষিণে, নীচুডাঙ্গায়, ভূমণ্ডলের মতো তারও তিনভাগ জল, একভাগ স্থল।

ভেজান দরজার বাইরে কুকুরটা ট্যাঁ ট্যাঁ করে, কেউ ফিরেও চায় না, দরজার আড়ালে সাহেব-মেমের কলহ চলে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঝিমোয় কুঞ্জ, কী কথা হয় বোঝে না, শুধু চাপা গলায় ক্রুদ্ধ তর্জন কানে আসে।

মাঝে মাঝে কুঞ্জ চমকে ওঠে, এই এক্ষুনি পরদা ঠেলে মেমসাহেব বেরিয়ে আসবেন, একটি মাত্র আঙ্গুলের ইশারায় ওর জবাব হয়ে যাবে। যে পথে গেছে বাগানের ফুল, লনের ঘাস, দেয়ালের কলি, সেই পথেই কুঞ্জকে যেতে হবে।

শক্ত করে টুলটা চেপে ধরে কুঞ্জ, চোখের পাতা ভিজে ওঠে। যাবে না, যেতে পারবে না। কাঁপা কাঁপা আঙুল দিয়ে কুর্তার পকেটটা হাতড়ায়, মুঠি করে ধরে। কে জানে কুঞ্জ ওখানে কী রেখেছে।

পা টিপে টিপে দরজায় চোখ রাখে। সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন টুলের ওপর পা রেখে, একটা হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে, স্পষ্টই উত্তেজিত।

—দেখাবে না, দেখাবে না তুমি আমাকে তোমার হিসাব।

—না। সংসার খরচের টাকায় তোমাকে হাত দিতে দেব না; এটা আমার।

—তোমার! এমন স্বরে সাহেব হেসে উঠলেন যে কুঞ্জর মনে হল জানালার সার্সি ঝন ঝন করে উঠল।—তোমার! তোমাকে কে চেনে ইন্দু, সবাই চেনে মিসেস চৌধুরীকে। এর কোন জিনিসটা তোমার। সংসার খরচের টাকার কথা ছেড়ে দাও, এই মুহূর্তে তোমার বাক্সের চাবি ছিনিয়ে নিতে পারি, দেখতে পারি কত আছে তোমার পাশ বইয়ে, এমনকি, এক টানে ছিঁড়ে নিতে পারি তোমার কানের ওই বার্লিংটনের বাড়ির জড়োয়া দুল...

কুঞ্জ শিউরে উঠল, দেয়ালটা ধরে সামলে নিল, সরল না তবু। সভ্য মানুষটির মুখোশ বুঝি একেবারে খসে খসে!

কিন্তু না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইন্দ্রাণী, দেবী প্রতিমার মত, সাহেবের মাথাও যেন ছাড়িয়ে গেছেন। দেবীর মত অস্ত্র শস্ত্র নেই হাতে, কিন্তু ভঙ্গিটা এক। তা ছাড়া ওই দ্রুত ওঠাপড়া বুকের সাহস, প্রাোজজ্বল চোখের ঘৃণা, ওই তো তাঁর আয়ুধ।

একটি কঠিন আঙুল তুললেন ইন্দ্রাণী, একটি নিশিত ছুরিকার মতো, রঞ্জিত নখাগ্রে বিজলী ঝলসে গেল।—যাও, এক্ষুনি চলে যাও তুমি। যাও।

সেই মুহূর্তে ইন্দ্রাণীর পায়ের কাছে কুঞ্জ মূর্ছিত হয়ে পড়তে পারত। পেরেছেন, ইন্দ্রাণী পেরেছেন। তার কুড়িবুড়ি বকুলদি যা পারেনি, একটি মাত্র নির্ভীক আঙুল তুলেই মেমসাহেব সেই অসাধ্য সাধন করেছেন।

সাহেব বেরিয়ে যেতেই মেমসাহেব শুয়ে পড়লেন, আলো নিবিয়ে। পা টিপে টিপে সেই ঘরে ঢুকল কুঞ্জ। কী ঠেকল পায়ে। কুঞ্জ কুড়িয়ে নিল। একটা কাঁটা। বোধহয় মেমসাহেবের চুলের।

সেই যে বেরিয়ে গেলেন সাহেব, আর সাত দিনের মধ্যে ঘরমুখো হলেন না। বাগান তো কবেই শুকিয়েছিল, এখন ধূলোর সর পড়েছে বারান্দায়, পরদায়, আসবাবে। মেমসাহেবের ভ্রূক্ষেপ নেই। ঠোঁটের কোণের হাসিটুকু মিলিয়ে গেছে, এসেছে একটু কঠিন দৃঢ়তা। পোষাকের সেই ঝিমঝিম এসেন্সগন্ধটুকু নেই, এ ক'দিন মেমসাহেব মোটে প্রসাধনই করেননি। কাছেও ডাকেননি কুঞ্জকে। তবু, দূর থেকে দেখেই, কুঞ্জর বুক ভরে গেছে। ইন্দ্রাণী বিদ্রোহী, বন্দিনী, তবু বিজয়িনী।

সাতদিন পরে ফের ঘরের মধ্যে গুন গুন আলাপ শুনে কুঞ্জর অবাক লাগল। শশী বলল, সাহেব কাল ফিরেছেন যে। অনেক রাত্তিরে গাড়ি এল, শুনিসনি? সাহেব গিয়েছিলেন বোম্বাইয়ে।

—কেন? অর্থ নেই, তবু কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করল।

পুরোনো চাকর, কী করে সব খবরই যেন চটপট জানা হয়ে যায় শশীর। একটা ফিলিম কোম্পানি খোলার ইচ্ছে সাহেবের অনেক দিনের। এবার শেয়ার বাজারে মার খেয়ে সেই ইচ্ছেটা আরও প্রবল হয়েছে। যা কিছু ঝরতি-পড়তি পুঁজিপাটা আছে, সব একত্র করেছেন। বোম্বাই থেকে পাকড়ে এনেছেন জন কয়েক চাঁইকে। বেশিরভাগ টাকা তারাই দেবে, বাংলা বই কলকাতাতে তোলা হবে।

তারা সব কোথায়, কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করল।

তারা উঠছে একটা বড় হোটেলে, আজ বিকেলে জোর একটা পার্টি।

সাহেব বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। শিষ দিলেন খানিকক্ষণ, নীল আকাশটার দিকে চেয়ে। লুপিকে কোলে তুলে আদর করলেন।

মেমসাহেবও এসেছেন পিছনে পিছনে। চৌধুরী বললেন, আমি তা হলে এখন চললুম, ছ'টার আগেই ওদের নিয়ে আসব। তুমি সব ব্যবস্থা এদিকে ঠিক করে রেখ, হোটেলে ফোন করলেই ওরা সব ঠিক ঠিক পৌঁছে দিয়ে যাবে।

—পারব না।

সাহেব চটলেন না, হাসলেন—নর্টি গার্ল; সেম এ্যাজ এভর।

—বিকেলে আমার কাজ আছে; আর্টগ্যালারিতে সিম্পোসিয়ম।

—টু হেল ভিথ ইয়োর সিম্পোসিয়ম। সাহেব বললেন, না না, এ কাজটা তোমাকে করতেই হবে ইন্দু, এটা হাসিল হলে আমার ভালো, তোমার ভালো। ইউ ক্যান ডু ইট, এ্যান্ড আই নো ইউ উইল।

মেমসাহেব জবাব দিলেন না, ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। উঁকি দিয়ে কুঞ্জ দেখেছে, সোফায় ইন্দ্রাণী আধশোয়া হয়ে। করপল্লবে দু-চোখ আচ্ছাদিত। অনেক পরে মেমসাহেব উঠলেন, চাবি দিয়ে খুললেন আলমারি। কুঞ্জ তখনো দেখছে। থরে থরে সাজানো শাড়ি, জামা, পেটিকোট। ভাঁজ খুলে খুলে মেমসাহেব দেখছেন।

নিশ্বাস পড়ে না কুঞ্জর। সাহেব নেই, এই অবসরে তবে পালিয়ে যাবেন মেমসাহবে। বেছে নিচ্ছেন শুধু নিজের পছন্দমত দু-চারখানা জামা কাপড়।

কিন্তু না। মেমসাহেব সবই ফের একে একে গুছিয়ে রাখলেন আলমারিতে। শুধু চোখ ঝলসানো এক প্রস্থ পোশাক নিয়ে গোসল কামরায় ঢুকলেন।

একটু পরে বেরিয়ে এলেন নব রূপে; আয়নার সন্মুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন কর্ণাভরণ, যাতে তাঁকে সব চেয়ে মানায়।

কুঞ্জর তলব পড়ল খানিকক্ষণ বাদে। আজ ক'জন লোক আসবে, মেমসাহেব বললেন, তুমি দরজা জানালাগুলো একটু ঝেড়ে পুঁছে রাখ।

বেলা পড়তে না পড়তেই হোটেলের গাড়িতে খাবার এল। নার্সারির লোক পৌঁছে দিয়ে গেল গুচ্ছ গুচ্ছ শ্বেত পদ্ম। ধবধবে ঢাকনা পড়ল ছোট-ছোট টেবিলে; ঝকঝকে চিনেমাটির বাসন বেরুল অনেক দিন পরে।

তারপর, বেলা গড়িয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রাঙ্গনে ঘস ঘস শব্দ শোনা গেল কয়েকটা গাড়ির; সিঁড়িতে এক সঙ্গে অনেকগুলো ঠকঠক জুতো।

কুঞ্জ চেয়ে দেখল, সব সিল্ক পাৎলুন আর হাওয়াই কুত্তার দল।

সবার সঙ্গে আলাপ করছেন মেমসাহেব, হেসে হেসে করমর্দন করছেন।

ওদের জন্যেই মেমসাহেব পিয়ানোতে একটা গৎ বাজালেন; তারপর, চৌধুরী সাহেবের ইশারায় বেছে বেছে খেতে বসলেন এমন একটা লোকের পাশে যার ভুঁড়ি ঠেকেছে প্লেটের কিনারে, রোমশ একটি হাতের আঙুলে চারটি আংটির ঝিকিমিকি।

কয়েকটা খাবার নিজের পাতে নিল লোকটা, ক'টা দিল মেমসাহেবের ডিশে। হাতে হাতে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে গেল, মেমসাহেব হাত সরালেন না, সরেও বসলেন না পর্যন্ত। কুঞ্জর তখন চোখ দুটি জ্বলছে।

তারপর কী একটা রসিকতা করল লোকটা, সবাই হেসে উঠল, চৌধুরী সাহেবও যোগ দিলেন। মেমসাহেব লাল হলেন, কিন্তু মুহূর্তমাত্র, যেন রাগ করলেন, তারপর নিজওে সেই হাসিতে যোগ দিলেন।

চৌধুরী বললেন, এসব বলে ইন্দুকে তুমি লজ্জা দিতে পারবে না ছবিলাল। ও 'প্রুফ' হয়ে গেছে কবে। স্টেজ-শাই নয়। এম্পায়ারে নেচেছেও তো কয়েকবার।

রিয়েলি! ছবিলাল বলল, আসুন না মিসেস চৌধুরী, এই ছবিতেই নেমে পড়ুন তবে।

মেমসাহেব বললেন, আই ওন্ট মাইন্ড ইফ আই ডু—হেসে উঠলেন খিলখিল করে। কুঞ্জ কথাটা বুঝল না, হাসিটা বুঝল।

সরে এল কুঞ্জ বাগানের এক কোণে। শরীরের সবক'টা রগ যেন কেরোসিনভেজা সলতের মতো জ্বলছে।

ওর কুর্তার পকেটে হাত দিতেই সযত্নে রাখা ক'টা জিনিস বেরুল; কুঞ্জ একটার পর একটা ছুড়ে ফেলে দিল। যত দূর পারে।

শাড়ির আঁচলের কাটা টুকরো, চুলের কাঁটা, চিরুনি থেকে ফেলে দেওয়া কয়েক গাছি দীর্ঘ চুল, কয়েকটি রঞ্জিত নখাগ্র।

দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরেছে কুঞ্জ। ওর এতদিনের গোপন সংগ্রহ, এতদিনের চুরি, পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাড়িয়ে দিতে দিতে অস্ফুট ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, বাঁদী সব বাঁদী।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%