পাশের বাড়ির মেয়ে

সমরেশ মজুমদার

কাল আমাদের বাড়িতে পাশের বাড়ির গিন্নি এসেছিলেন। আমি রান্না চাপাচ্ছি, মেজাজটা খুব ভালো নেই, ঠাকুরের শরীরটা ক'দিন ভালো যাচ্ছে না। নিজেই রান্না করছি। মনে দারুণ সন্দেহ ব্যাটার বোধ হয় আসলে কিছুই হয়নি, এমন সময়ে পাশের বাড়ির গিন্নি এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ালেন।

মাছগুলো ছেড়ে দিয়ে ফিরে একবার তাঁর মুখের দিকে তাকালাম, মুখখানি যেন তেলো হাঁড়ি, ভাঁড়ের দুধ দই হয়ে যাবার জোগাড় শুধোলাম—'ও কি, আবার কি হল?'

জলচৌকির উপর বসে পড়ে বললেন—'দিদি, মনটা খুব খারাপ।'

বললাম, 'সে কি! অনিলবাবু ভালো আছেন, ছেলে পাশ করেছে, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, জায়গা-জমি কিনেছেন, মন ভালো হয়ে গেছে বলুন।'

বিষম একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন—'না হাসির কথা নয়, ছেলেমেয়ে জায়গাজমি দিয়ে কি হবে? জানেন নুটুর ভূগোল বইতে কি সাংঘাতিক কথা পড়ে এসেছি?'

মাছে অল্প একটু জল ঢেলে, তার উপর কুচি কুচি ধনেপাতা আর আস্ত আস্ত কাঁচা লঙ্কা ছেড়ে বললাম,

'অ্যাঁ, তাই না কি? ভূগোল আবার কি বলে?'

বললেন, 'উ: জীবনে আমার সব স্পৃহা চলে গেছে। আপনি জানেন যে পৃথিবীটা ক্রমে ঠান্ডা হতে হতে একদিন একবারে হিমশীতল বরফে ঢাকা মরুভূমিতে পরিণত হবে? তখন এইসব প্রাসাদ, মন্দির, কৃষ্টি শিল্প, বিজ্ঞান, কাব্য এ সবের কি হবে?'

হাউ হাউ করে কেঁদে বললেন, 'আমাদের পুতির-পুতিদের কি অবস্থা হবে ভেবে যে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে!'

মাছটা নামিয়ে রেখে দিলাম—'কি আপদ! এই ভেবে এত কষ্ট পাচ্ছেন? আপনি জানেন না। অ্যাটম বোমা দিয়ে সব কৃত্রিম উপায়ে গরম করা হবে?'

'আ: বাঁচালেন দিদি। সত্যি এম এ পাশ করার কত সুবিধে? যাই এ-বেলার রাঁধাবাড়ার জোগাড় করি গে, সারাদিন ভেবে ভেবে আর কিছু করে উঠতে পারিনি।'

এমনি ধারা ঘটনা প্রায়ই হয়। হয়তো রাত্রে একটা বই নিয়ে নিরিবিলি একটু বসেছি, দরজার কাছে নি:শব্দে এসে দাঁড়ালেন, ভারি চুপচাপ ঠান্ডা মানুষটি এদিকে। আদর করে বসাই, কান পেতে থাকি আবার কি নতুন চিন্তা এল। বললেন—

'দিদি ঘরকন্নার ওপর কখনো আপনার ঘৃণা ধরে যায়?'

বললাম—'তা আর যায় না? অনেক সময়েই যায়। কাঁচের বাসন ভাঙলে, ছেলে অঙ্কে ফেল করলে, ধোপা দেরি করে এলে, ননদ এসে দু-মাস থাকলে, হঠাৎ জিভ কামড়ে গেলে, ওর সঙ্গে খিটিমিটি লাগলে, সত্যি বলছি, এইসব বলতে-বলতেই আমার সংসারের ওপর একটু একটু করে ঘৃণা জন্মে যাচ্ছে।'

তিনি বললেন,—'না, দিদি আমি ওরকম ঘৃণার কথা বলছি না। আপনার কি কখনও মনে হয় না যে যীশু, শঙ্করাচার্য, বুদ্ধদেব, রামকৃষ্ণ পরমহংস, এমন কি স্বয়ং আমার গুরুদেব কেউ দুনিয়াটাকে যখন ভালো করতে পারছেন না, তখন আর বেঁচে থেকে লাভ নেই? যেদিকে তাকাবেন খালি পাপের গন্ধমাদন, ঠক জোচ্চর নিষ্ঠুর দুষ্টু লোকেরা চারিদিকে আনন্দে বিচরণ করছে আর ভালো লোকরা কষ্ট পাচ্ছে?'

আমি চমকে উঠে বললাম—'এই রে! পাপের গন্ধমাদন বলতে মনে পড়ে গেল, আমার ছোট ভাজ আবার আমার কাঁচি নিয়ে গিয়ে ফেরত দেয় নি, ধর এবার ওকে ঠেসে।'

উঠেই পড়ি।

ভদ্রমহিলা আগে বোধ হয় খুব মাছের মুড়োটুড়ো খেতেন, নইলে চিন্তা করবার এত শক্তি পেলেন কোথায়? একদিন এসে বললেন—

'দিদি, একটা বড় ভাবনায় পড়ে গেছি। এই যে কারও ছেলে হল, মেজ পিসিমার নাতনী হল, অমলা কমলা দুজনারই ছেলে হল, রমেনের বউ—এরই বা হতে কতক্ষণ, এই এতগুলো লোক বেড়ে গেল, তার বদলে কই কেউ তো আমাদের মোল না? তাহলে কি করে চলবে? পাঁচটা জন্মাবে আর বড় জোর একটা মরবে, এমনিতেই শুনি রেশনের বাজার, কিছু পাওয়া যায় না, তাহলে শেষ পর্যন্ত ওনাকে কি কবে পেট ভরে খেতে দেব?'

আমি বললাম—'কি মুশকিল! আপনার যে ভাবনার আর অন্ত নেই। এই বিষয়ে অনেক বড় বড় পণ্ডিতরা আগেই গবেষণা করে রেখেছেন, আপনি কিছু চিন্তা করবেন না, দেখবেন ওই অমলা কমলার ছেলেপুলেরা হয় জলে ডুবে নয় বোমা পড়ে, নয় গাড়ি চাপা পড়ে, নিশ্চয় অল্প দিনের মধ্যেই মারা যাবে। তাছাড়া শিগগির দেখবেন বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই এইটুকু জায়গায় এতখানি ধান গজানো হবে, সবাই খেয়ে পরে সুখে থাকবে।'

'তাই বলুন।' নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যান।

পরদিন সকালে আবার এসে উপস্থিত। 'দিদি, কাল যে অমলা কমলার ছেলেদের শিগগিরই মারা যাবার কথাটা বললেন, কথাটা ঠিকই। বোধ হয় কয়েক বছরের মধ্যে আমেরিকার লোকরা যুদ্ধে যত না মরেছে, গাড়ি চাপা পড়ে মরেছে তার চেয়ে ঢের বেশি। আমাদের দেশের লোকরা তো আরও আনাড়ি। ভাবছি অমলা কমলাকে জানিয়ে দেব কিনা, ওরা আবার ছেলেদের নামে কি সব কাগজ কিনে রাখবে বলছিল, মরেই যখন যাবে, তবে আর পয়সা নষ্ট কেন?'

ব্যস্ত হয়ে বললাম, 'না, না; অমন কাজ করবেন না, কে জানে হয়তো অমলা কমলার ছেলেরাই বেঁচে থাকবে, আমরা সবাই মরে যাব, কিছুই তো বলা যায় না।'

কোনওরকমে তাঁকে ঠান্ডা করি।

আরেক দিন আমিই একটু আঠা চাইতে ওঁদের বাড়ি গিয়েছিলাম, দেখি গিয়ে বাড়ির যা অবস্থা সে আর ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। জিনিসপত্র এদিকে ওদিকে ছড়ানো, চারধারে ধুলো ঝুল কালি, বুঝলাম নিশ্চয় কোনো দারুণ চিন্তা এসেছে। তিনতলার ছাদে গিয়ে দেখলাম হাসি হাসি মুখ করে আকাশের দিকে চেয়ে বসে আছেন। তবুও ভালো। আমাকে দেখেই ছুটে এসে পায়ে পড়ে বললেন—

''দিদি, দিন, দিন; চারটি পায়ের ধুলো দিন। আজ আমার মনটা যে কি খুশি সে আর কি বলব।''

জিজ্ঞাসা করলাম—'কেন বলুন তো? আমি আবার কোথাও আমার আঠার শিশি খুঁজে পাচ্ছি না, বলে খুব মন খারাপ করে এসেছি।' খুব হেসে আমাকে আঠার শিশি দিলেন, দিয়ে বললেন—'না, দিদি, এখনি যাবেন না, বসুন একটু মিষ্টিমুখ করে যান। আজ বড় আনন্দের দিন।'

কি আর করি, হাতে তেমন কাজও ছিল না, বসে রসগোল্লা টসগোল্লা খেলাম। বললেন—

'জানেন, ভেবে ভেবে পৃথিবীর সব দু:খ দূর করে দেবার উপায় ঠিক করে ফেলেছি। এত সহজ উপায়টা যে এতোদিন কারও কেন মনে হয়নি তাই ভাবি।'

অবাক হয়ে বললাম, 'তাই নাকি! সবাইকে শিখিয়ে দিন তা হলে।'

'শেখাবার কিছু নেই, পৃথিবীতে কেউ যদি বিয়ে না করে, সবাই যদি সন্ন্যাসী হয়ে যায়, তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে গেল। সংসারে লোকই থাকবে না তবে আর কষ্ট পাবে কে? হাসছেন, দিদি, ভাবছেন বুঝি ঠাট্টা করছি। এই দেখুন, সত্যি সত্যি আমার ননদের ভাবী বেয়াই বাড়িতে চিঠি লিখেছি, এ চিঠি বেয়াই পেলে, কখনোই ননদের ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন না, এমনি করে একটু একটু করে, দু:খের সম্ভাবনা দূর করতে হয়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওকি দিদি, চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন যে।'

ভদ্রমহিলার স্বামীর সঙ্গেও আলাপ আছে আমাদের, দিব্যি মোটাসোটা হাসিখুশি মানুষটি, চোখে একটা দুশ্চিন্তার ছাপ। একদিন বললেন—'দেখুন, আমার গিন্নির হাজার রকমের চিন্তা, কিন্তু আমার ওই একটিমাত্র চিন্তা, গিন্নির চিন্তাগুলো যাতে কাজে পরিণত না হয়, এই এক চিন্তা। জানেন, কাল আমাদের একটা বড় ফাঁড়া কেটে গেছে।'

বললেন—'ভালো চিন্তাই বলুন আর মন্দ চিন্তাই বলুন, চিন্তাতে আমাদের বড় একটা এসে যায় না। আর শুধু আমাদের কেন, পৃথিবীতে কারই বা এসে যায়। যদি যেত, তবে এত ভালো লোক এত সব ভালো ভালো চিন্তা করে যাওয়া সত্বেও দুনিয়াটার এ দুর্দশা কেন? গিন্নি যতক্ষণ শুধু-চিন্তা করেই ছেড়ে দেন, আমরা একটুও মাইন্ড করি না, কিন্তু মাঝে মাঝে যখন উনি চিন্তাগুলোকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন, তখন আমরা বাড়িশুদ্ধ সকলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি।

'বুঝলেন, কাল দেখলাম একটা নতুন চাকর এসেছে, কদমছাঁট করে চুল ছাঁটা, খাটো একটা নীল হাফ প্যান্ট আর ময়লা গেঞ্জি গায়, চোখ দুটো নাকের পাশ ঘেঁষে বসান। সব সময় চারিদিকে চাইছে। দেখেই আমার দারুণ সন্দেহ হল। গিন্নিকে বললাম,

'ওকে কোথায় পেলে? ও যদি পাকা চোর না হয় তো কি বলেছি। গিন্নি অবাক হয়ে বললেন—চোরই তো। চোর বলে কি ফেলে দেব? জেলে দিয়ে, শাস্তি দিয়ে, ঘেন্না করে কোন চোরকে কখনো ভালো করা গেছে? চাকরি দেব না তো কি! ও বেচারা কি আবার চুরি করে খাবে? জানো ও সাতাশ বার জেল খেটেছে, তবু ওর স্বভাব বদলায়নি? জেলের দারোগাবাবুর বউ-এর কাছ থেকে আমার শোনা। তাই ওঁকে ডেকে নিয়ে এসেছি। এ বিষয় আমি অনেক চিন্তা করেছি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। তুমি খালি আপিস যাও আর পয়সা রোজকার কর, তাই তুমি চিন্তা করবার সময় পাও না, নইলে বুঝবে আমি ঠিকই বলছি। আজ রাত্রে তোমার সোনার বোতাম, হাতঘড়ি আর ফাউন্টেনপেন টেবিলে রেখে, দরজা খুলে শোব। দেখো, কিছু হবে না। বরং ওর একটা অনুতাপ আসবে। কত ভেবেছি এ বিষয়।'

বললাম—'আমার সোনার বোতাম, হাতঘড়ি, ফাউন্টেনপেন এ সম্মানের যোগ্য নয়। তোমার সোনার মাকড়ি দিয়েই পরীক্ষা হোক, আর কিছু দিয়ে নয়।'

'তাই গিন্নি করলেন শেষ পর্যন্ত। আর সে কি ঘুম, খাটে শোয়ামাত্র ভোঁস ভোঁস নাক ডাকা। কি বলব মশায়, আমারি চুরি করতে ইচ্ছা করছিল। চুপ করে মটকা মেরে পড়ে আছি। আর পা টিপে টিপে বাছাধন ঘরে ঢুকেছেন, যেই মাকড়ি পকেটে পুরেছেন, আমিও লাফিয়ে উঠে, তাকে জাপটে ধরে, চেঁচিয়ে মেচিয়ে লোক জোগাড় করেছি। তারপর জেলের ছেলে আবার জেলে।'

একটু থেমে, একটা পান মুখে পুরে, ভদ্রলোক অল্প হেসে বললেন—'গিন্নির চিন্তাশক্তিকে আজ হার্নেস করে ফেললাম মশাই। উনি আসছে বছর স্কুল ফাইনেল পরীক্ষা দেবেন। অঙ্ক আর সংস্কৃতের মাস্টার ঠিক করেছি। এখন উনি, চিন্তা করবার বিষয় পেলেন—নর—নরা—নরৌ আর একটা বাঁদর একটা তেল মাখানো বাঁশ বেয়ে এক মিনিটে তিন ফুট ওঠে, পরের মিনিটে দেড় ফুট পিছলে পড়ে।

আচ্ছা তবে আসি।'

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%