সমরেশ মজুমদার

রেললাইন থেকেই দেখা যায় কতকগুলি ছোট-বড় গাছের আড়ালে একখানি ভাঙা বাড়ি, সামনে ছোট্ট একটি ডোবা। বাড়ির চারিদিকে, ঘেঁটু আশশ্যাওড়া আরও কত কিসের ঝোপ, ঝাড় জঙ্গল। বাড়ির ইট বেরিয়ে পড়েছে। নোনাধরা দেওয়াল, স্থানে স্থানে এত ক্ষয়ে গেছে যে কি করে অমন বাড়িতে মানুষ থাকে ভাবতে বিস্ময় লাগে। বাড়ির চারিদিকের পাঁচিল মাঝে মাঝে ভেঙে গেছে। তার ফাঁক দিয়ে অন্দরের উঠোন পর্যন্ত দেখা যায়। খোয়া-ওঠা উঠোন। তার এধার থেকে ওধার পর্যন্ত তার ঝোলানো, তাতে কয়েকখানা ছেঁড়া কাঁথা, ভিজে কাপড় ঝুলছে। ওইতেই অন্দরের মর্যাদা রক্ষিত হচ্ছে।
ডোবার বাঁধাঘাটের অবস্থাও সমান শোচনীয়। অন্ধকারে পা না ভেঙে নামা অসম্ভব। কিন্তু ওদের এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে একটা ছোট ছেলেও চোখ বুঁজে নামতে পারে। এই ঘাটটিই এ পাড়ার খিড়কি, ছোট ছোট পানায় তার জল এমন নীল হয়ে গেছে যে ছুঁতেও ঘৃণা হয়।
সকালবেলা। সবে সূর্য উঠেছে। একটি বৃদ্ধা বিধবা ঘাটের পৈঠায় বসে তামাকের গুল দিয়ে যে ক'টি দাঁত এখনও অবশিষ্ট আছে সেই ক'টি সযত্নে মার্জিত করছিল। আর একটি আধা-বয়সী স্ত্রীলোক মাথায় আধ-ঘোমটা টেনে ঘাটের অপর প্রান্তে ঘাড় হেঁট করে নি:শব্দ বাসন মাজছিল। চারিদিকে গাছের ঝিমিয়ে-আসা পাতায় কেমন একটা স্তব্ধতা এসেছে। তারই বিষণ্ণ ছায়া পড়েছে ডোবার নিস্তরঙ্গ নীল জলে।
একটি বউ ভাঙা বাড়ি থেকে মন্থরপদে বেরিয়ে এসে ঘাটের মাথায় মুখ ঢেকে থমকে দাঁড়াল। কতই বা তার বয়স হবে? কুড়ি-একুশ, কি আরও কম। ছিপছিপে শরীর, কিন্তু তারও বাঁধন যেন আলগা হয়ে পড়েছে। গাছ থেকে লতার বাঁধন আলগা হয়ে গেলে লতার যে অবস্থা হয় তেমনি। যেন এলিয়ে এলিয়ে পড়ছে। বউটি মুখ ঢেকে দাঁড়াল। ঘাটের এই দুটি মেয়ের কাছে মুখ দেখাতে তার ইচ্ছে করছে না। তার কচি ঘাসের মতো কোমল লাবণ্য যেন কোথায় উবে গেছে। কোমল ত্বকে কর্কশতা এসেছে। মুখে কলঙ্করেখা দেখা দিয়েছে। চোখে জল নেই বটে, কিন্তু লাল, রক্তের মতো লাল। আর তার ঘন পল্লবে বিশ্বের শ্রান্তির ছায়া এসেছে ঘনিয়ে। তারই ওপর মাথার রুখু চুলগুলি বারে বারে উড়ে উড়ে এসে পড়ছে। চোখের কোণে রাত্রি জাগরণের কালিমা।
বউটি ঘাটের মাথায় থমকে দাঁড়াল। পরিচিত মানুষের সামনে তার পা যেন চলতে চাইছে না। কিন্তু তবু থমকে দাঁড়লে চলবে না। দিনের সব কাজই তার বাকি। বুড়ি শাশুড়ীর কাল থেকে কোমর যেন ভেঙে গেছে। আর উঠতে পারছেন না। স্তিমিত দৃষ্টি চোখের জলে অন্ধ হবার উপক্রম। তবু কান্নার এখনই হয়েছে কি? বলতে গেলে এখনও তো শুরুই হয়নি। এখনও মানুষটির শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে, চোখ মেলে চাইছে, অতি কষ্টে দুয়েকটি কথাও বলছে। কিন্তু আর বোধ হয় বেশিক্ষণ নয়। হয়ত আজ দুপুরেই নিশ্বাস থেমে যাবে, চোখ মেলে চাওয়াও হবে শেষ। ডাক্তার মুখে কিছু বলেননি বটে, কিন্তু তাঁর মুখ-চোখ দেখে বুঝতে আর কারও বাকি নেই। হয়তো দুপুরেই, কিংবা বড়জোর সন্ধ্যায়। তার বেশি নয়। কান্নার শুরু হবে তখন। তখন থেকে সমস্ত জীবনভোর। সমস্ত জীবন-ভোর...সমস্ত জীবন-ভোর...সমস্ত জীবনভোর...
এর বেশি তরুবালা আর ভাবতে পারে না। একটি জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও তারই সঙ্গে ওত:প্রাোতভাবে জড়িত বাকি জীবনগুলি সামনে চলতে থাকবে—এ যেন বিশ্বাস করার মতো কথা নয়। যাকে প্রত্যহ দেখছি, যার অস্তিত্ব প্রত্যেক মুহূর্তে অনুভব করছি, অকস্মাৎ একটি বিশেষ মুহূর্তের পরে তাকে আর কোথাও দেখা যাবে না—এ কথা ভাবতে গেলেও মন হু-হু করে, মাথা ঝিম ঝিম করে ওঠে, অকস্মাৎ পৃথিবীর সঙ্গে যোগসূত্র ছিঁড়ে গিয়ে সমস্ত মন বিস্বাদ ঔদাসীন্যে পরিপূর্ণ হয়। জীবনের যেন আর কোনো মানেই থাকে না।
যে বৃদ্ধা পিছন ফিরে দন্তধাবন করছিল, তরুবালাকে সে লক্ষ্য করেনি। তরুবালা তখন ঘাটের শেষ পৈঠায় পৌঁছেছে। যে মেয়েটি বাসন মাজছিল, সে যেন তরুবালাকে দেখে সমীহ করে একটু সরে বসল। বৃদ্ধার দৃষ্টিও তার ওপর পড়তে সেও অপ্রয়োজনে একটু সরে গেল। সবাই জানে আর কয়েক ঘণ্টা পরেই এই বধূটির দু:খে বনের পাখিও কেঁদে উঠবে। আর কয়েক ঘণ্টা মাত্র। এই অল্প সময়টুকু কেউ তাকে কোনো দু:খ দিতে চায় না। এই ঘাসেই বাসন মাজা নিয়ে কতজনের সঙ্গে কত কলহই না হয়ে গেছে। ছোট ঘাট। তিনজন নামলেই চতুর্থ জনের আর পা ফেলবার জায়গা থাকে না। তাকে বাসনের গোছা হাতে করে ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। কোথায় কে পৈঠার ওপর চিবানো ডাঁটা ফেলে গেছে; কার পাতের ভাত ঘাটের কোণে জড় হয়ে আছে, ফেলে দিতে মনে নেই; কার এঁটো বাসনে কারও পা ঠেকেছে, এই অবেলায় নেয়ে মরতে হবে; কলহের কারণের কি অভাব আছে? কিন্তু সে সব আজ নয়, বিশেষ করে এই বধূটির সঙ্গে কিছুতে নয়। ওর সিঁথির সিন্দুর এখনও জ্বলজ্বল করছে বটে, কিন্তু সে সিন্দুর চিহ্নের দিকে চাওয়া যায় না, সে যেন ওর সিঁথিকেই বিদ্রূপ করছে— মর্মান্তিক বিদ্রূপ। যে সীমন্তিনীর সকল গৌরব আর কিছু পরেই পথের ধুলোয় মিলিয়ে যাবে, তাকে প্রতিবেশিনীরা সকল গৌরব নি:শেষ করে আজকেই মিটিয়ে দিতে চায়। যাকে কদিন আগে তারা গ্রাহ্যই করেনি, আজ তাকেই দেখে সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দিলে।
বউটি সসঙ্কোচে ঘাটে নামল।
—নিবারণ কেমন আছে, বৌমা?
বৃদ্ধা একবার গলাটা ঝেড়ে, আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলে।
এ প্রশ্নের উত্তর দেবার কিছু নেই। নিবারণের অবস্থা কাল রাত থেকেই খুব খারাপ। ভালো লক্ষণ যা ছিল, একটি একটি করে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। আশা করার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। বৌমা উত্তর দিলে না। নি:শব্দে মাথাটা নেড়ে ডান হাত দিয়ে ললাটের চুলগুলি সরিয়ে ফেললে। এই কদিনের রোগীসেবায় আর দুর্ভাবনায় তার শরীর আধখানা হয়ে গেছে। শীর্ণ করপ্রকোষ্ঠে চুড়ি দুগাছি ঢল ঢল করছে। ওই দুগাছি সরু চুড়িই আজ তার সম্বল। চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহের পর তার গায়ের গহনা —অবশেষে ওই দুগাছিতে এসে ঠেকেছে।
প্রতিবেশিনীরা সহানুভূতিসূচক দীর্ঘশ্বাস ফেললে। কাজ তাদের শেষ হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে চলে গেল।
ফাল্গুনের শেষ। জলে এখনও শীত রয়েছে বেশ।
এই ডোবায় নামলে চারিদিকের উঁচু পাড় বাইরের পৃথিবীকে দৃষ্টির আড়ালে রাখে। অকস্মাৎ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তরুবালা যেন বেঁচে গেল। মুমূর্ষু রোগীর অস্ফুট আর্তনাদ, পান্ডুর চোখের কাতরদৃষ্টি, শিশুপুত্রের কখনও দাপাদাপি কখনও চিৎকার, বৃদ্ধা শাশুড়ীর ভাষাহীন বিহ্বল দৃষ্টি-জরা-মৃত্যু-ব্যাধিগ্রস্ত বিপুল পৃথ্বী তার সমস্ত কুশ্রীতা নিয়ে এই গোষ্পদের সুগভীর নির্জনতায় তলিয়ে গেল।
তরুবালা মুখ ধোবার জন্যে ঘাটে এসেছিল। তার এখনও অনেক কাজ বাকি। সমস্ত রাত ছটফট করে এখন একটু নিস্তেজ হয়ে স্বামী ঝিমুচ্ছে। এখনই উঠবে বোধ হয়। কাছে কেউ নেই। সমস্ত রাত্রি জেগে শাশুড়ী এ ঘরে এলিয়ে পড়েছেন। ছেলেটা সকালে উঠে পুজোর রঙিন পাঞ্জাবিটা গায়ে দেবার জন্যে বেজায় ঝোঁক ধরেছিল। সেটা বের করে দিতেই ছুটতে ছুটতে পাড়ায় বেরিয়ে গেছে। স্বামীর কাছে কেউ নেই। রোগীর ঘুম, হয়তো এখনই উঠে পড়বে। তাকে ওষুধ দিতে হবে। কত কাজ। ছেলেটা একটু পরেই ফিরবে। গয়লা দুধ দিয়ে গেছে, সেটুকু গরম করে রাখতে হবে। নইলে ক্ষুধায় ছেলেটা কাঁদবে। কাল শাশুড়ীর একাদশী গেছে। তাঁর দ্বাদশীর ব্যবস্থা করতে হবে। আর নিজের জন্যে না হলেও, ওদের দুজনের জন্যেও তো দুটো ভাতে ভাত চড়িয়ে দিতে হবে। মাত্র একটি মানুষেরই জীবনের তেল ফুরিয়ে এসেছে। সে যাবে, যারা থাকবে তাদের খেতেও হবে, খাটতেও হবে, সবই করতে হবে।
তরুবালার অনেক কাজ। কিন্তু ডোবার ঠান্ডা জল তাকে লোভ দেখাচ্ছে। সর্বাঙ্গ জ্বালা করছে। উনিশ-কুড়ি বছরের তরুবালা আর পারে না। সে আকণ্ঠ জলে ডুবিয়ে এই সুশীতল একাকিত্বে যেন মগ্ন হয়ে গেল। বাইরের পৃথিবীর কিছুই আর খেয়াল রইল না।
খেয়াল রইল না নিজের সুদীর্ঘ জীবনব্যাপী অসংখ্য দু:খ-দারিদ্র্য ও জীবন-সংগ্রামের দুর্ভাবনা। বুড়ি শাশুড়ী মরি-মরি করেও আরও কতকাল বাঁচবেন কে জানে, কে জানে সে নিজেই কতকালের পরমায়ু নিয়ে এসেছে। ছোট ছেলে একদিন বড় হবে, তাকে মানুষ করতে হবে—কিন্তু সে পরের কথা পরে, আপাতত এই তিনটি প্রাণীর দৈনন্দিন দুবেলা দুটি গ্রাসের অন্ন কে জোগাবে সেই তো সমস্যা।
কিন্তু তরুবালা আর ভাবতে পারে না। গত পনেরো দিন ধরে সে কেবলই ভাবছে, কেবলই ভাবছে। ভেবে ভেবে তার দেহ-মন ভেঙে গেছে, মস্তিষ্কের ভাববার শক্তি লোপ পেয়েছে। একটু সে বিশ্রাম চায়। একটু বিস্মৃতি।
ডোবার নীল জল কনকনে ঠান্ডা। উঁচু পাড়ের আড়ালে পৃথিবীতে চলছে ভাঙা-গড়ার খেলা —অবিশ্রান্ত। ঝোপে ঝোপে কটি পাখি তুলেছে নিরবচ্ছিন্ন কুজন। তরুবালার সব ভুল হয়ে গেল...
সে ডোবার জলে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে মুখ দিয়ে জল ছিটিয়ে আপন মনে খেলা করতে লাগল।
নিবারণ মস্তবড় লোক নয়। সে মারা গেলে তার নিজের নিভৃত কোণটি ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এতটুকু চাঞ্চল্য দেখা যাবে না। না বেরুবে খবরের কাগজে ছবি, না লেখা হবে ইনিয়ে বিনিয়ে সত্যিমিথ্যে নানারকম শ্রদ্ধাঞ্জলি। এক যদি কোনো বড়লোকের মোটর চাপা পড়ে মরতে পারত, কিম্বা পুলিশের গুলিতে, তাহলেও হতো। কিন্তু সে মরছে নিতান্ত মামুলি ধরনে। দীর্ঘকাল ধরে রোগে ভুগে অস্থিচর্মসার হয়ে—আরও কোটি কোটি লোক প্রত্যহ যেমনভাবে মরছে। এমন মৃত্যুর কেই যা খবর রাখার উৎসাহ বোধ করে! আর কি উৎসাহই বা বোধ করবে? কেউই কি তাকে চেনে? মানব-সভ্যতায় তার দান কি?
নিবারণ ক্যানভাসার। হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল লাইনে সে ট্রেনে ফেরি করে বেড়ায় জি সি দত্তের বিখ্যাত নিমের মাজনের, জয়পুরের মানসিং গুলীর, নারকেল তেলের মসলার, সুগন্ধী ধূপকাঠির আর মাথাধরা, মাথাঘোরা, মাথা ঝনঝন কনকন করার অব্যর্থ ও একমাত্র ওষুধ মাথলিনের!
তার বয়স পঁচিশ, ছাব্বিশ, সাতাশ, কি বড় জোর আটাশ অর্থাৎ তাকে দেখে বয়স বলা শক্ত।
নিবারণ সাধারণ বাঙালির চেয়ে অন্তত চার ইঞ্চি বেঁটে, রোগা। সে তুলনায় গোঁফজোড়া যথেষ্ট বড়। আর জুলফি নামাতে নামাতে গাল পাট্টায় এসে দাঁড়িয়েছে। গাল মাংসহীন। চোয়াল চওড়া, আর সামনের দিকে ঝুঁকে এসেছে। নাকের গোড়াটা চ্যাপটা, কিন্তু ডগাটা বর্তুলাকার। হাঁ-মুখ অসম্ভব রকম বড়, আর পুরু পুরু ঠোঁট। আর কণ্ঠ? নিবারণ পাশের গাড়িতে কথা বললেও এ গাড়ি থেকে শোনা যায়।
লোকটি ওরই মধ্যে একটু সৌখীন। গায়ে থাকে একটি সিল্ক, নয়তো লংক্লথের পাঞ্জাবি। পরণের কাপড় ধোপদরুস্ত। হাতে রিস্টওয়াচ। মাথার চুলে পরিপাটি টেরি। এর সঙ্গে মিলত না তার জুতো। সময়াভাবে জুতোয় কালিও দিতে পারত না, মেরামতও করাতে পারত না। আর সময়ের অভাব ঘটত ক্ষৌরকর্মে। ক্যানভাসারের রবিবারও নেই, দোল-দুর্গোৎসবও নেই। সেই কারণে মুখমণ্ডল প্রায়ই শ্মশ্রুকন্টকিত হয়ে থাকত।
ন'টার সময়ে যা-হোক দুটি নাকে মুখে দিয়ে তাকে বেরুতে হত। এই যা-হোক দুটির ব্যবস্থা করতেই তরুবালাকে উঠতে হত ভোর পাঁচটায়। নিবারণ একটু নিদ্রাবিলাসী। উঠতে তার সাড়ে সাতটা বেজে যেত। তাও কি সহজে? তরুবালা চা নিয়ে এসে কত সাধ্যসাধনা করে ওঠাত। চোখ বুজে বুজেই নিবারণ চা-টুকু খেয়ে নিত। তারপরে একটু অবসাদ কাটলে, উঠে তেল মেখে, একেবারে দাঁতন করতে করতে নাইতে যেত-কি শীত, কি গ্রীষ্ম। স্নান করে এসেই বসত খেতে তারপরে ন'টা সাতের ট্রেন ধরতে স্টেশন দৌড়ান। যাওয়ার সময় তরুবালা হাসি মুখে দুটি পান দিত—প্রত্যহ। এর আর ব্যতিক্রম ছিল না। খোকা নিজের হাতে বাপের মুখে পান দুটি তুলে দিত। কোনদিন প্রসাদ পেত, কোনদিন পেত না।
তারপরে?
জি সি দত্তের বিখ্যাত নিমের মাজন চাই? মাজন? আপনারা অনেক দামি দিশিও বিলাতি মাজন ব্যবহার করে দেখেছেন কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের নিমের মাজন একবার ব্যবহার করে দেখতে অনুরোধ করি। মহাশয়গণ, এ মাজনে কোন অদ্ভুত জিনিস নেই। এ আমাদের দিশি গাছ-গাছড়ায় তৈরি। এতে আছে আমলা হরীতকী,বহেড়া...দাঁত-নড়া, দাঁতে রক্ত পড়া ,দাঁতের গোড়া কনকন করা, দাঁতে পোকা প্রভৃতি যাবতীয় দন্তরোগ একদিনেই আরোগ্য হবে। এ আমাদের বাজে কথা না মহাশয়গণ, যাঁদের দাঁত হল হল করে নড়ছে, কিম্বা মুখে এমন দুর্গন্ধ হয় যে কারও সামনে কথা বলতে সঙ্কোচ হয়, এমন যদি এখানে কেউ থাকেন, তাঁকে একবার আমাদের এই মাজন পরীক্ষা করে দেখতে অনুরোধ করি, একমাসের ব্যবহারযোগ্য এক কৌটার দাম মাত্র দু'পয়সা। একসঙ্গে তিন কৌটা নিলে মাত্র পাঁচ পয়সায় পাবেন। মুখের দুর্গন্ধ নষ্ট হয়ে চমৎকার সুগন্ধ হবে। যাঁর দরকার হবে চেয়ে নেবেন।
মুখের গন্ধ এত লোকের মধ্যে স্বীকার করতে কেউ রাজি নয়। যাদের দাঁত হল হল-হল করে নড়ে তারাও এই ট্রেনে, মুখ ধোবার জল নেই, কিছু নেই, এমন মহৌষধ ব্যবহার করে দেখতে সম্মুত হয় না। তবু প্রয়োজন মত কেউ কেনে, কেউ কেনে না।
নিবারণ বিখ্যাত মাজন ব্যাগে পুরে আবার একটা নতুন জিনিস তুলে চিৎকার আরম্ভ করে :
জয়পুরের মানসিং গুলি। চাই কারও মহাশয়গণ, আমাদের নতুন আবিষ্কার সম্বন্ধে একটা কথা বলা প্রয়োজন মনে করি একটু দয়া করে শুনবেন।
হয়তো কোন ভদ্রলোক একটু ঝিমুচ্ছিলেন। চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বলেন, দয়া না করেও শুনতে পাচ্ছি মশাই, একটু আস্তে বলবেন।
নিবারণ অপ্রস্তুত হয় না, হাসে। গলা একটু ও না নামিয়ে বলে চলে, —মুখস্থ বলার মতো:
—মহারাজা মানসিংহ এই গুলি ব্যবহার করতেন। হাসবেন না মহাশয়গণ, আপনাদের দেশে সব ছিল। কালের প্রভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। যাতে বিলিতি ওষুধের দোকানের ছাপ মারা নেই, এখন আপনারা তার নাম শুনলেও হেসে উঠবেন! আমার কথায় আপনাদের বিশ্বাস হবে না মহাশয়গণ। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখতে দোষ কি? এতে স্মৃতিশক্তি বাড়ে দেহের বল বাড়ে, কণ্ঠস্বরসুমিষ্ট হয়, গলাধরা, ঢোক গিলতে কষ্ট হাওয়া, টন্সিলের ব্যথা সমস্ত আরোগ্য হয়। মূল্য একশো গুলির শিশি মাত্র চার আনা আমার কাছে ছোট নমুনা শিশিও আছে। মূল্য চার পয়সা মাত্র। যার আবশ্যক হবে চেয়ে নেবেন।
তারপর নারকেল তেলের মসলা। তার পরে মাথলিন।
সবই পরের পর নিবারণ তোতাপাখির মতো গড়গড় করে বলে। যাদের ওষুধ, কি বলতে হবে তারা তা লিখে দিয়েছ। নিবারণ মুখস্থ বলে যায়। তার নিজের অবদান মাঝে মাঝে মহাশয়গণ কথা বসিয়ে দেওয়ায়।
ওর সাহিত্যিক কৃতিত্ব হচ্ছে সুগন্ধী ধূপের বেলায়। সেইজন্য এইটে সে সব শেষে বলে : রতিবিলাসও বটে, আরতি-বিলাসও বটে! যার যেমন প্রয়োজন হবে চেয়ে নেবেন।
'বাসর-মজান', 'রতি-বিলাস'—আর তার সঙ্গে 'আরতিবিলাস' এই তিনটে কথা তার নিজের আবিষ্কার এবং এই 'সাহিত্যিক' প্রচেষ্টায় সে বেশ গর্ব অনুভব করে। আরও কয়েকজন ধূপ বিক্রি করে কিন্তু তারা শুধু বলে মহীশূরের সুগন্ধী ধূপ। নিবারণের 'ট্রেড—মার্কা' যেন কেউ ব্যবহার না করে সেজন্যে তাদের সাবধান করে দেওয়া হয়েছে।
নিবারণ তার 'ট্রেড—মার্কের' ফল শ্রোতৃবৃন্দের ওপর কিরকম হল—চেয়ে চেয়ে দেখে। তারপর বলে :
—যাঁরা অনেকদিন পরে বাড়ি যাচ্ছেন তাঁরা অন্তত এক প্যাকেট কিনে নিয়ে যান। দেখবেন সুগন্ধে ঘর-মৌ মৌ করবে, 'মানুষের' মুখে হাসি ফুটবে, সুখে নিশি প্রভাত হবে আর আমার ধূপের জয় জয়কার হবে। 'বাসর-মজান' ধূপ। সুগন্ধে বাসর রাত্রির কথা মনে পড়বে। নিয়ে যান। রতিবিলাস ধূপ, আরতিবিলাসও বটে—যাঁর যেমন দরকার। এক প্যাকেট মাত্র দু'পয়সা, পাঁচ পয়সায় তিন প্যাকেট। একরাত্রেই দামের চতুর্গুণ উশুল হবে। নিবারণ আত্মতৃপ্তির হাসি হাসে। তার সাহিত্যিক প্রচেষ্টার ফলেই হোক আর যে কারণেই হোক ধূপটা বিক্রি হয় বেশ, মানে অন্য জিনিসের চেয়ে বেশি।
প্রায় কামরায় দু'একজন পরিচিত লোক থাকেন। ছ'বছর ধরে এই লাইনে সে ঘুরছে। মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে রসিকতা হয় :
—এই যে বাবুদাদা, আবার অনেকদিন পরে যে! কলকাতায় বাসা করেছেন? বেশ, বেশ তাহোক, বাসর-মজান ধূপ দু'প্যাকেট নিয়ে যান। এত সস্তায় এ জিনিস আর কোথাও পেতে হয় না!
বাবুদাদার 'না' বলবার উপায় থাকে না। ততক্ষণে নিবারণ তাঁকে দু'প্যাকেট ধূপ গছিয়ে দিয়েছে।
বাবুদাদা কেবল একবার বলেন, দু'প্যাকেট নয়, এক প্যাকেট দিন।
কিন্তু কে কার কথা শোনে! নিবারণ হাসতে হাসতে বলে, এক প্যাকেটে কি হয়? কলকাতায় বাসা করেছেন...আবার কবে দেখা হবে...কিরকম! বড়বাবু নাকি? এই নিন আপনার সুবাসিত নারকেল তেলের মসলা। আজ শনিবার, জানি কিনা, আপনি আজ আসবেনই। আমি এই ছ'বছরের মধ্যে আপনাকে একটা শনিবারও বাদ দিতে দেখলাম না।
নিবারণ নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে ওঠে।
—ক'প্যাকেট দোব! দুটো? চারটে?
বড়বাবু তাড়াতাড়ি বললেন, না, না। আজ আর দরকার হবে না। সেদিন দুটো নিয়ে গেছি, তাই এখনও ফুরোয়নি।
নিবারণ বড়বাবুর হাতে দুটো প্যাকেট গুঁজে দিয়ে বলে, সে প্যাকেট নয় বড়বাবু, আপনার জন্য স্পেশ্যাল, তৈরি করে রেখেছিলাম। বাড়ি নিয়ে যান, যিনি সমঝদার তিনি বুঝবেন!
নিবারণ হো হো করে হাসলে।
প্রতি কামরাতে এমনি দু'একজন আছেই। কেউ দাদা, কেউ ভাই, কেউ বাবু। কিন্তু কারও নাম সে জানে না। তারও নাম কেউ জানে না। শুধু চেনার পরিচয়। নাম পাতিয়ে নিয়েছে নতুন করে। তাতে উভয় পক্ষেরই কাজ চলে যায় নির্বিঘ্নে। প্রতিদিনের লেনদেনে কোনো অসুবিধে হয় না। সেই কারণে এর চেয়ে ভালো করে চেনবার জন্যে কোনো পথেরই কৌতূহল এর চেয়ে বেশি এগোয়নি।
নিবারণের পৃথিবী বলতে এই। ঘরে মা, স্ত্রী একটা শিশুপুত্র,—আর বাইরে এরা। তার নামের কারবার নেই। মা, মা। মায়ের নাম থাকে না। স্ত্রী, ওগো। আর শিশুপুত্রের নাম এখনও স্থির হয়নি। যে যা খুশি তাই বলে ডাকে। তাতেই শিশু সাড়া দেয়। আর বাইরে একদল নামহীন, অপরিচিত বন্ধু।
এই নামের পৃথিবীতে তার কারবার একটু অদ্ভুত ধরনের। যত নামহীন লোক নিয়ে।
তার অসুখের খবর কেউ পেলে, কেউ পেলে না। কেউ জানলে, কেউ জানলেই না। কিন্তু সবাই নিজেদের অজ্ঞাতসারেই মনে মনে একবার বোধহয় অনুভব করলে।
তরুবালা ঘাটে গলা ডুবিয়ে রয়েছে তো রয়েইছে।
ওর যেন জ্ঞান লোপ পেয়ে গেছে। কিছুরই আর খেয়াল নেই। ছোট মেয়ের মতো আপনমনে জল নিয়ে খেলাই করছে, খেলাই করছে। সময়ের হিসাব নেই।
ঘোষাল গিন্নি ঘাটে এসে সশব্দে বাসন নামালেন। তরুবালার কানে এ শব্দ পৌঁছুলই না। তাকে এমন নিশ্চিতভাবে জলে গা ডুবিয়ে বসে থাকতে দেখে ঘোষাল-গিন্নি ভাবলেন, নিবারণ বোধহয় ভালোই আছে।
জিজ্ঞাসা করলেন, নিবারণ কেমন আছে বৌমা?
নিবারণ কে? নিবারণ কে? তরুবালা অকস্মাৎ মানুষের কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল। কিছুই যেন সে বুঝতে পারেনি এমনি করে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল।
তারপরে বিস্মৃতির তিমির বিদীর্ণ করে ধীরে ধীরে জেগে উঠল বাস্তব পৃথিবীর রূপ... যেখানে মায়ের চোখের সুমুখে মরে ছেলে, স্ত্রীর চোখের সুমুখে মরে স্বামী, ভায়ের চোখের সুমুখে মরে ভাই।
নিষ্ঠুর কদর্য পৃথিবী।
তরুবালার চোখের পল্লবে আবার ঘনিয়ে এল বিষণ্ণ ছায়া, ঠোঁটে জাগল নিরতিশয় অসহায়তা, আর দুই চোখে ভরে উঠল অসীম শূন্যতা।
তরুবালা মাথায় ভালো করে ঘোমটা দিয়ে ক্লান্তকণ্ঠে বললে, ভালো নেই, খুড়িমা।
সামনের মরা আমড়াগাছের শুকনো ডালে একটা কাক এমন করে ডেকে উঠল যে দুজনেই ভয়ে ভাবনায় শিউরে উঠল।
সেদিন আর নয়, কিন্তু তার পরের দিন দুপুরের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল। সকালেই নাভিশ্বাস উঠেছিল। ঘোষাল-গিন্নি চটপটে মেয়ে। ব্যাপার বুঝে সকালেই নিবারণের ছেলেকে দুটো ভাতে-ভাত নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর জেদাজেদিতে তরুবালাকেও অমন অবস্থায় স্বামীকে ফেলে রেখে একবার থালার সামনে বসতে হয়েছিল, এক টুকরো মাছও মুখে দিতে হয়েছিল। এ নাকি প্রথা। প্রতিবেশিনীরা তাকে জোর করে স্বামীর কাছ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ঘোষালবাড়ির রান্নাঘরে বসিয়ে দিয়েছিল। কে একজন এক টুকরো মাছও তার মুখে গুঁজে দেয়। এ নাকি লক্ষণ।
তখনই তরুবালা স্বামীর শিয়রে ফিরে আসে। কিন্তু কথা নিবারণের সকাল থেকেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখন শুধু চোখের দেখা। চোখ মেলে স্বামীর শেষ যন্ত্রণা দেখা। সেও অল্পক্ষণের জন্যে। দুপুরের মধ্যেই নিবারণ চলে গেল। সন্ধ্যার মধ্যেই তার পার্থিব দেহের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট রইল না।
নিবারণের সঙ্গে আমার পরিচয়ও আর পাঁচজনের মতোই অতি সামান্য। ট্রেনের জনৈক সহযাত্রীর মুখে এই ঘটনা শুনেছিলাম। ঘটনাও আজকের নয়, অনেকদিন আগের। কিন্তু আমাদের ট্রেন সেই পানাপুকুরের ধার দিয়ে চলবার সময় হঠাৎ মনে পড়ল নিবারণকে, অনেকদিন পরে।
এই গতির জগতে মানুষের বিশ্রামের অবকাশ নেই। নিবারণের মৃত্যুর পর এই পথ দিয়ে হাজার ট্রেন এসেছে, গেছে। হাজার হাজার যাত্রী, এইখানে পানাপুকুরের সামনে এসে কচিৎ কারও হয়তো তাকে মনে পড়েছে, একটি মুহূর্তের জন্যে। তেমনি করেও আমারও তাকে মনে পড়ল অনেক কাল পরে। ওই পানাপুকুরের অনেক পরিবর্তনই নিশ্চয় তারপরে হয়েছে। কিন্তু দেখে দেখে তা আর চোখে পড়ে না। ওরই মধ্যে নিবারণের স্মৃতি একটুখানি কোথাও বেঁচে আছে। ওদিকে চাইতেই একমুহূর্তের জন্যে তাকে একবার মনে পড়ল।
একবার মাত্র। তাও নিবারণের জন্যে নয়, বিশেষ কোনো একজন লোকের জন্যেও নয়। একবার শুধু মনে হল যাদের চিনতাম তাদের মধ্যে কত মানুষই নেই। চকিতে সমস্ত মন কেমন উদাস হয়ে গেল।
ট্রেন চলেছে ঝড়ের বেগে।
শ্রীরামপুর...শ্রীরামপুর...
নতুন স্টেশন। সে পানাপুকুরের চিহ্নমাত্র নেই। আবার নতুন জগৎ, নতুন আবেষ্টনী। পাঁচ মিনিট আগের মন পাঁচ মিনিট পিছিয়ে পড়ল। তার হল মৃত্যু আর তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন