সমরেশ মজুমদার

ফেরিওলার হাঁক শুনলেই নীলিমার মন রাস্তায় ছুটে যায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হয়তো। ডাকে—'এই এসো—দোতলায়'। কি হয়তো চাকর দিয়ে ডেকে পাঠায়। পিঠের বোঝা নামিয়ে একটি ঘর্মাক্ত জীব সিঁড়ির ধারে এসে বসে, নীলিমা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কত জিনিস যে নেড়েচেড়ে দ্যাখে। চার আনার জিনিস কিনতে আধঘণ্টা কাটিয়ে দেয়। ফেরিওলারা অতি ভালো লোক, কথা খুব মিষ্টি, তাছাড়া তাদের সঙ্গে আজগুবী দরদস্তুর চলে। প্রথমে যা চাইলো তার প্রায় অর্ধেক দামেই হয়তো জিনিসটা দিয়ে যায়। তাও বাকিতে।
কি জিনিস? ছিটের কাপড়, তাঁতের শাড়ি, কাচের চুড়ি, সিঁদুর, আলতা, চুলের কাঁটা, কত কী। আর বাবলুর জন্য পুতুল, আর এটা-ওটা। কতগুলো লোক আছে, তারা এই ঝাঁ-ঝাঁ রোদে চিৎকার করে হেঁকে যায়—'চে-য়াই সাবান তরল আলতা।' পিঠের উপর বোঁচকার ভারে শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গ তাদের বাঁকানো—ওই বোঝা নিয়ে এত বড়ো শহরে কোথা থেকে কোথায় তারা চলে যায়, নীলিমার ভাবতে অবাক লাগে।
এদিকে শান্তনু ফেরিওলা পছন্দ করে না। তার বড়োলোকী মেজাজ, জিনিসের দরকার হলে নিউমার্কেটে গিয়ে ঝনাৎ-ঝনাৎ টাকা ফেলে নিয়ে এসো—হাঙ্গামা চুকলো। ফেরিওলা, জাপানি খেলো জিনিস, আর দরদস্তুর—তিনটের উপরেই তার নাক-শিঁটকোনো ভাব।
অথচ ঝনাৎ ঝনাৎ-এর অভাব প্রায়ই ঘটে এবং শান্তনুর মতে চললে ভালো জিনিস কেনার আশায় বসে থেকে-থেকে অনেক দরকারী জিনিস হয়তো কখনোই কেনা হতো না। তাছাড়া, সংসারে কত জিনিস দরকার, পুরুষমানুষ তার কী বোঝে।
না বুঝুক, নাক ঢোকানো চাই সবটাতেই। যেমন ধরা যাক, নীলিমা সেদিন তার ফেরিওলার কাছ থেকে দশ পয়সা করে আট গজ মার্কিন রেখেছে, শান্তনু মুখ বেঁকিয়ে বললে, 'ওগুলো রাখলে কেন?'
নীলিমা হঠাৎ রেগে গিয়ে বললে, 'রেখেছি তো রেখেছি, তুমি চুপ করো।'
শান্তনু সংক্ষেপে বললে, 'পয়সা নষ্ট।'
'হ্যাঁ, তা তো বটেই! এদিকে বালিশের ওয়াড়গুলো সব ছিঁড়ে গেছে, তা নিয়ে প্যানপ্যান করতে তোমাকেই শুনি।'
'ও, এ দিয়ে বালিশের ওয়াড় হবে বুঝি?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, আর এ অভাগিনীর একটা শেমিজ।'
'ওই মোটা কাপড়ে তোমার শেমিজ! আমাকে যদি বলতে—'
'তোমাকে বললে শেমিজ কিনতে তো ছুটতে হোয়াইটওয়ে লেডলর দোকানে! তোমার বুদ্ধির দৌড় তো ওই পর্যন্ত! হয়তো আধ-ডজন পিলোকেস আসতো।'
'ভালোই তো। ভালো জিনিস তো ভালোই। তোমার শেমিজের জন্য আমি খুব চমৎকার একটা কাপড় কিনে আনবো, দেখো।'
'থাক, থাক, আমি গরিবমানুষ, আমার ওতেই হবে। তুমি আর তোমার ছেলে যত পারো বাবুগিরি কোরো।'
নীলিমা তক্ষুনি মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শেলাইয়ের কল নিয়ে বসে গেল।
শান্তনু একটু এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে বললো, 'এই খেয়ে উঠলে, এক্ষুনি বসলে কল নিয়ে। ও-রকম করো বলেই তো মাথাধরা ছাড়ে না।'
'ও: আমার মাথা—তা ধরলেই বা কী, না ধরলেই বা কী? তোমার মাথা ঠান্ডা থাকলে বাঁচি।' চললো তারপর কলের ঘটর-ঘটর। শান্তনু আর কী করে, রবিবারের দুপুরবেলায় নভেল হাতে নিয়ে এপাশ-ওপাশ।
দুজনের কথা কাটাকাটি লেগেই আছে। শান্তনু যা বলবে, নীলিমা ঝাঁ করে প্রতিবাদ করবে; তারপর একপ্রস্থ ঝগড়া। জগতে এমন কোনো বিষয় নেই যাতে দু-জনে একমত।
সকালবেলায় একটা লোক হেঁকে যাচ্ছে—'আতাফল চাই! আতাফল!'
তক্ষুনি শান্তনু বলে উঠলো, 'ওই যে তোমার কৃষ্ণের বাঁশি।'
নীলিমা বললে, 'ঠিক মনে করেছো। আতাফলের কথাই ক-দিন থেকে ভাবছি।
'তুমি ভালোবাসো না আতা?'
'ওসব বাজে ফলটল আমি খাইনে।'
'তা খাবে কেন। মনে করো বারো পেয়ালা চা খেলেই খুব হলো। রাখি কয়েকটা, আপিস থেকে এসে খাবে।'
আতাওলা এলো, ছ-টা ফল বেচে দিয়ে গেলো। শান্তনু বলে, 'সত্যি আমার এক-এক সময় ফেরিওলা হতে ইচ্ছে করে।'
'বড়ো সুখ কিনা! এই রোদ্দুরে ঘুরে-ঘুরে ক-পয়সাই বা রোজগার। আহা—ওদের আবার স্ত্রী-পুত্র! কোথায় সব দেশে পড়ে আছে—বছরে বুঝি দেখাও হয় না।'
শান্তনু আবার একটা চিঠি লিখতে শুরু করেছিলো; অন্যমনস্কভাবে বললে, 'হু'।'
'তোমার মার্কেটের জোচ্চোরদের পাল্লায় পড়ার চাইতে ওদের দুটো পয়সা দেয়া ঢের ভালো। ওরা যে কী অসম্ভব গরীব ভাবতে পারো না।'
'কেন বলো তো?'
'সেদিন এক বুড়োর কাছ থেকে চিনে সিঁদুর কিনলুম। আমাকে বললে—এ পাড়ার সক্কলে আমার কাছ থেকে নেয়, আপনিও নেবেন, মা?'
'ও, তোমার নতুন পুষ্যি হলো বুঝি?'
'বলে কি—আর পারিনে মা, রোদে রোদে ঘুরতে, কিন্তু কী করবো। মায়েরা সব বলেন—কত লোক তো সিঁদুর হেঁকে যায় কিন্তু তোমার মত জোরে আর-কেউ হাঁকে না। আমার ডাক শুনলেই চিনতে পারেন মায়েরা। জোরে কি আর শখ করে হাঁকি, মা, জোরে-না হাঁকলে কেউ তো ডাকবে না আমাকে। এবারে কিছু পয়সা জমলেই দেশে চলে যাবো। —জানো লোকটা হিন্দুস্তানী, দেশ মজ:ফরপুরে, বৌ কবে মরে গেছে, এক মেয়ে আছে শুধু। বলছিলো, দেশে যাবার টাকা জমতে আরো দু-মাস নাকি লাগবে। আহা-মেয়ের জন্য মন কেমন করে না। আমি বলেছি ওর কাছ থেকেই সব সময় সিঁদুর কিনবো, কিন্তু বছরে মানুষের কতটুকুই বা সিঁদুর লাগে।'
শান্তনু বললে, 'এ-রকম কত আছে।'
'এত খাটে, কিন্তু কী পায়? কিচ্ছু না।'
'দু-আনা দিয়ে একটা হারমোনিয়াম-বাঁশী কিনেছি। বাবুল খুব খুশি।'
শান্তনু গম্ভীর হয়ে বললে, 'না-কিনলেই কি চলতো না? এমনি করে কত পয়সার অপব্যয় করো।'
'কী যে বলো। ছেলে বাঁশি নিয়ে বাজাতে শুরু করেছে, কেড়ে নেয়া যায় নাকি হাত থেকে!'
'এ নিয়ে তো বোধহয় পঞ্চাশটা বাঁশি কিনলে। ছেলেটা দু-দিন লাফালাফি করে, তার পরেই হয় ভাঙে, নয় ফেলে দেয়। এত পয়সা জোটাতে কি আমরা পারি!'
'কী আর করবে, শিশুরা ওই রকমই। তা দু-আনার বাঁশি কবে আর কিনেছি। এক পয়সার বাঁশের বাঁশিগুলো—।'
'এক পয়সা এক পয়সা করে কম হয় না।'
'ও: খুব তো হিসেব শিখেছে। কবে এত সুবুদ্ধি হলো? বড়ো যে বলছো অপব্যয়, ফেরিওলাদের কাছ থেকে কত সস্তায় সব পাওয়া যায় তা জানো?
'সস্তাও যেমন, পচাও তেমনি।'
'সে তো ঠিকই! সেদিন দেড় টাকা দিয়ে বাক্সওলার কাছ থেকে বাবলুর জন্য যে-কোটটা রেখেছি, সাধ্য ছিলো তোমার চার টাকার কমে কোথাও কেনো! আসল সার্টিন, আর কি সুন্দর ছাঁটকাট। তোমাকে পাঁচশো দিন বলে-বলে এই জামাটা কেনাতে পারলুম না। আর্মি-নেভিতে যাবার মতো অবস্থা হবে, তবে তো! তাও কতো সুবিধে—বাকি রাখা যায়, আস্তে-আস্তে দিতে গায়ে লাগে না।'
শান্তনু সিগারেট ধরিয়ে বললে, 'এদিকে কত পয়সা যে বাজে খরচ হয়ে যায় তা তো ভাবোই না। খামকা কত কিছু কেন—কোনো কাজেই লাগে না সে-সব।'
'কাজে কোনটা লাগে আর না লাগে তুমি তার কী জানো! হাজার রকম ছোটোখাটো জিনিসের ব্যবহারের ফল হচ্ছে—তোমার শারীরিক আরাম। সেই জিনিসগুলো তুমি তো আর চোখে দ্যাখো না।—'
'যথা—হাতা, খুন্তি, শিল-নোড়া ইত্যাদি। হার মানছি, এবারে একটা পান দিলে বাধিত হই।'
'এই তো—সেবারে পুরী থেকে ফেরবার সময় কটক স্টেশনে একটা জাঁতি কিনেছিলাম বলে রাগ করেছিলে। অথচ কি সুন্দর জাঁতিখানা, কি চমৎকার কাজে লাগছে।'
নীলিমা উঠে গিয়ে পান সেজে নিয়ে এলো। একটু পরে বললে, 'জানো ওই বুড়ো ফেরিওলা বলে কী। ও আমাদের সমস্ত জিনিস দেবে—সাবান, পাউডার, এমন কি তোমার সিগারেট, তারপর মাসের শেষে দাম নেবে। আমরা যেসব সাবান-টাবান মাখি তার বাক্সগুলো পেলে ও ঠিক সেই জিনিস এনে দেবে। তোমার সিগারেটের একটা খালি টিন নিয়ে গেছে।'
মাস ভরে বাঁকিতে সিগারেট খাবার সম্ভাবনায় শান্তনু একটু উল্লসিত হয়ে বললে : 'বলো কী!'
নীলিমা বললে, 'তুমি যদি বলো ওকে ঠিক করি। বাবা:, তোমার ওই নবকৃষ্ণ ভাণ্ডার যা চোর! বাকিতে যেমন দেয়, দাম নেয় ডবল। ওদের তুমি এ-মাস থেকে ছেড়ে দাও।'
'বেশ। তোমার ফেরিওলা দিয়ে সুবিধে হলেই হলো।'
'ও দিতে পারলে দিক না। কী বলো?'
'ভালোই তো। আমার সিগারেট কবে আনবে?'
'বলছে তো কাল নিয়ে আসবে।'
আর সত্যি পরের দিন শান্তনু আপিস থেকে ফিরে দ্যাখে, টেবিলের উপর আস্ত দু-টিন সিগারেট, আর তার সঙ্গে এক সেট ছবি-আঁকা জাপানি ছাইদান—একটা বড়ো থালার উপর চারটে ছোটো-ছোটো বাটি। নেহাত মন্দ না।
'কত দাম নিলে?'
'পাঁচ আনা বলেছে—এখনো দিইনি। সুন্দর না? তোমার পছন্দ হয়েছে? আর সস্তাও খুব।'
শান্তনু বললে, 'হুঁ।'
নীলিমা স্বামীর মুখের দিকে বাঁকা চোখে একবার তাকিয়ে বললে, 'তোমার পছন্দ না হয় ফিরিয়ে দেবো। অ্যাশট্রে তো তোমার দরকার।'
সত্যি বলতে, ছেলের জন্য দু-আনার বাঁশি যতটা বাজে খরচ মনে হয়েছিলো, নিজের জন্য এই পাঁচ আনার অ্যাশট্রে ঠিক ততোটা মনে হলো না। দোমনাভাবে বললে, 'আচ্ছা, রেখেছো যখন—'
নীলিমা মুচকি হেসে বললে, 'তোমাকে দাম দিতে হবে না। আমি উপহার দিলুম তোমাকে ওটা।'
'ও:, এতই যখন দয়া, তখন দুটো টাকা আমাকে ধারও দিতে পারো। বড়ো উপকার হয়।'
'আমি গরিব মানুষ, দু-টাকা কোথায় পাবো। দু-আনা চার-আনা পর্যন্ত দৌড়।'
'কেন, সেবার আস্ত দুটো টাকা দিয়েছিলে।'
'মনে আছে তাহলে! দু-দিনের কথা বলে দুটো টাকা নিয়েছিলে, আর ফিরিয়ে দিলে না। চোর!'
শান্তনু হেসে বলে, 'গোড়া থেকে তা-ই। তোমাকে যখন মাতৃক্রোড় থেকে ছিনিয়ে এনেছিলুম তখন ডাকাত বলতে পারতে।'
নীলিমা বললে, 'ওগো ভালোমানুষ, দয়া করে আমার দুটো টাকা ফিরিয়ে দিতে ভুলো না। আমার কৌটোতে কিচ্ছু নেই।' একটি পাউডারের কৌটো ফুটো করে নিয়ে নীলিমা তাতে বাজার-ফেরত দু-চার পয়সা ফেলে রাখে, মাঝে মাঝে একটা দু-আনি কি সিকি, কদাচ একটি আধুলি বা টাকা। কৌটোটা এক এক সময় ওজনে খুব ভারি হয়ে ওঠে, কিন্তু তার আসল ভার বিশেষ কিছু নয়, কেননা তার গহ্বরে বেশির ভাগই তাম্রমুদ্রা। তবু সেটা অনেক সঙ্কট থেকে বাঁচায় এবং সঙ্কট প্রায় ঘটে বলে তার উদর এত বেশি টানা-হেঁচড়া চলে যেটা নীলিমার পছন্দ হয় না। সকালে উঠে দেখা গেলো বাজারের পয়সা নেই, ভৃত্য অপেক্ষমান, নীলিমা আড়ালে গিয়ে কৌটো ঝেঁকে-ঝেঁকে পয়সা বের করে—ভৃত্য কিছু দেখতে পায় না, কিন্তু ঝনঝন শব্দ শোনে কিনা কে জানে। পাউডারের তলানিতে সাদাটে হয়ে যাওয়া এক মুঠো তামার পয়সা চাকরের হাতে দিতেও কেমন খারাপ লাগে।
কিম্বা হয়তো বাড়িতে হঠাৎ কোনো আত্মীয়রা বেড়াতে এসেছেন, নীলিমা তাঁদের বসবার ঘরে বসিয়ে লুকিয়ে একটি আধুলি উদ্ধার করে আনে, মিষ্টিমুখে ভদ্রতা রক্ষা হয়।
একবার সেই কৌটো থেকে দু-দুটো টাকা ধার করে শান্তনু আর ফিরিয়ে দেয় নি। নীলিমা সুযোগ পেলেই সেটা শোনায়।
শান্তনু তার শেষ কথা বললে, 'আমি তো তোমার কৌটোর ভরসাতেই আছি—আর সম্প্রতি তোমার ফেরিওলার।' ঘরে বসে সিগারেট খেয়ে শান্তনুর মেজাজ বেশ ভালোই যাচ্ছিল, এর মধ্যে এক কাণ্ড। সকালবেলায় চা খেয়ে কাগজ-কলম নিয়ে বসেছে, এক বন্ধু বলেছে আধুনিক মেয়েদের বিরুদ্ধে দু-পৃষ্ঠার সাধুভাষায় কিছু অসাধু বচন ঝাড়তে পারলে দশটা টাকা পাওয়া যাবে। বিষয়বস্তুটা আদৌ তার মন:পুত নয়, কিন্তু দশটা টাকাও ছাড়া যায় না। কিছুতেই লেখা এগোচ্ছে না, সিগারেটের পর সিগারেট খামকা পুড়ে যায়, এদিকে ঘরের বাইরে নীলিমা অবিশ্রান্ত কার সাথে বকর-বকর করছে। খানিক পরে তার মনে হলো এ কোনো ফেরিওলা না হয়ে যায় না। রাগে তার মুখ কালো হয়ে গেলো। কার সাধ্য এ-বাড়িতে একটু নিরিবিলি বসে কাজ করে। সব সময় বাজার বসেছে যেন এদিকে যে দশটা টাকার জন্য মাথা খুঁড়ে মরছে, ওদিকে নীলিমার কাণ্ডটা দ্যাখো। ঠিক আধুনিক মেয়েদের আক্রমণ করার মতোই যখন তার মনের অবস্থা এমন সময় নীলিমা ঘরে ঢুকে নিচু গলায় বললে—'শোনো ওই ফেরিওলা টাকা চাইছে।'
'আমাকে কেন বলতে এসেছো ও-কথা।'
'কাকে বলবো তবে? শোনো ও বলছে এত জিনিস দিয়ে আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না—টাকা না পেলেই চলবে না ওর।'
'তাই বলে এক্ষুনি চাই ওর? এই মুহূর্তে?'
'বড্ড পিড়াপিড়ি করছে। গরিব মানুষ—ঠিকই তো, এত সিগারেট ও দেবেই বা কোত্থেকে। সবসুদ্ধ ছ-টাকা তেরো আনা হয়েছে।'
'এখন মাসের শেষ, কোথায় পাবো টাকা?'
'তাই তো ভাবছি।'
'আগে ভাবলেই ভালো করতে। যত রাস্তার লোক ধরে-ধরে এনে জোটাবে—কী বোকার মতো কাজ করো এক-এক সময়।'
শেষের কথাটা হজম করে অতি নিচু গলায় নীলিমা বললো, 'কাল আসতে বলবো ওকে? পারবে জোগাড় করতে?'
কাগজের দিকে গোটা দুই লাইনের আঁকিবুঁকির দিকে তাকিয়ে শান্তনুর শরীরটা যেন জ্বলে গেলো। চড়াগলায় বলে উঠলো, 'কোত্থেকে জোগাড় করবো? তুমি জানো না আমার অবস্থা? এখন আমাকে ধার করতে ছুটতে হবে তো—আর চাওয়ামাত্র ধারই বা কে দেবে আমাকে।'
নীলিমা প্রায় হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়ে বললে, 'ও তো বলেছিল মাসের শেষে নেবে, এ-রকম হবে জানলে—'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমার ফেরিওলারা তো এরকমই। জোচ্চোর, চোর, বাড়ির মেয়েদের ঠকিয়ে দু-পয়সা করাই তো ওদের পেশা। আর তুমিও যেমন। ফেরিওলা ডাকা ছাড়া আর কি সময় কাটাবার উপায় নেই?'
'দরকারেই ডাকি।'
'অদরকারেও ডাকো। জানো কিছু নেবে না, হাতে পয়সা নেই, তবু কত লোক ডেকে এক ঘণ্টা ধরে জিনিসপত্র ঘেঁটে ফিরিয়ে দাও। লজ্জাও করে না! আমি তোমাকে বলছি, কক্ষনো আর এ-বাড়িতে ফেরিওলা ডাকতে পারবে না।'
মুহূর্তে ঝলকে উঠলো নীলিমার চোখ। 'বেশ আর ডাকবো না। এ বাড়ি তোমার, তোমার ইচ্ছে-মতোই সব হবে। কিন্তু এটা ঠিক জেনো, যত জিনিস আমি ওদের কাছ থেকে কিনি সবই তোমার আর তোমার ছেলের জন্য। নেহাত যা-না হলেই নয়, তা-ই। এই ছ-টাকা তেরো আনার মধ্যে পাঁচ টাকাই তোমার সিগারেটের দাম, তা মনে রেখো। আর সাবান-তাও তোমার। আর কয়েকটা কাঁচের গেলাস—তাও—'
'থাক, থাক আর হিসেব শুনতে চাইনে। এক্ষুনি বিদেয় করে আসছি ওকে।' এক ঠেলায় চেয়ারটা সরিয়ে শান্তনু বাইরে গিয়ে দেখে, বুড়োমতো একটা লোক সামনে প্রায় একটি মনোহারি দোকান সাজিয়ে বারান্দার বসে গামছা নেড়ে হাওয়া খাচ্ছে। রাগে শান্তনুর মুখ থেকে হিন্দি বেরিয়ে গেলো, 'এই ভাগো! বাহার যাও! আভি নিকোলো!'
শান্তনুর সঙ্গে তার 'সিগারেট সরবরাহকারীর' প্রথম সাক্ষাৎ হলো এইরকম। লোকটা তার কুঁকড়ানো মুখ তুলে অবাক হয়ে তাকালো শান্তনুর দিকে।
'কায়া? মালুম নেই হোতো? বাহার যাও জলদি।' বলে শান্তনু ওর দু-একটা জিনিস পা দিয়ে ঠেলেও দিলে।
লোকটা কোনো কথা বললে না; মাথা নিচু করে আস্তে-আস্তে তার সব পসরা কুড়িয়ে নিয়ে বস্তা বাঁধলো, তারপর ঘাড়ে করে আস্তে-আস্তে নেমে গেলো সিঁড়ি দিয়ে।
শান্তনু ঘরে ফিরে এসে বললে, 'আপদ গেছে। কক্ষনো আর ডেকো না বলে দিলাম।'
কথা বলতে গিয়ে নীলিমার ঠোঁট কেঁপে উঠলো, চেষ্টা করে নিজেকে সামলে নিয়ে বললে, 'খুব তো বীরত্ব করে এলে। তা ওটা আমার উপর করলেই ভালো করতে। ও বেচারা তো কোনো দোষ করেনি।'
নিষ্ঠুরতার একটা নেশা আছে। তারই, ঝোঁকে শান্তনু বলে উঠল, 'নাও, নাও' রাস্তার লোককে অত দয়া না করে নিজের স্বামীকে একটু-আধটু দয়া করতে শেখো।'
নীলিমার ঘনঘন নিশ্বাস পড়তে লাগলো, দাঁতে-দাঁত চেপে বললে, 'এটাই তো তুমি জানাতে চাও যে, তুমি কর্তা, তুমি প্রভু! এ তো কবেই বুঝেছি যে আমি তোমার দাসী ছাড়া আর কিছুই নই—তোমার সব খুঁটিনাটি আরজি মেনে চললে মাঝে মাঝে একটু পিঠে হাত বোলাতে পারো বটে। আমার নিজের বলে কিছু আছে নাকি? আমি তো সেইরকমই চলি তুমি যা ভালো না-বাসো তা না-করাটা আমার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। বলতে পারবে, আমার নিজের শখ বলে কিছু আছে, নিজের খেয়ালে একটা টাকা কখনো খরচা করেছি? ভিখিরির মতো কুড়িয়ে-কাড়িয়ে দু-চার পয়সা যা জমাই তা-ই দিয়ে কখনো-কখনো এটা-ওটা কিনি বলেই তো তোমার এত রাগ। ঐ বুড়োকে তোমার সিগারেটের জন্যই ঠিক করেছিলুম—সব সময় হাতে পয়সা থাকে না, অসুবিধে হয়—'
'জানি, জানি আমি সিগারেট খেয়ে টাকা ওড়াই, এ-কথা কত আর শোনাবে। আমার বাবুগিরির মধ্যে ওই তো এক সিগারেট। তা তুমি যা-ই বলো সিগারেট না-হলে আমার চলবে না। এত খেটে রোজগার করি এই সামান্য একটা বিলাসিতাও কি আমার অন্যায়?'
'থাক, থাক, আর বোলো না। তুমি একা থাকলে তো ভালোই থাকতে, আমাকে বিয়ে করে গরিব হয়েছো, এ-কথাটা নাই-বা শোনালে। আমি এলাম, তারপর বাবলু এলো, কত বাড়লো খরচ, তোমার নিজের সুখ-সুবিধে সব গেলো, সবই জানি আমি। কেন আমাকে বিয়ে করেছিলে? এত কঠিন দু:খ কেন দিলে আমাকে? তোমার জীবনের সমস্ত কিছুর মধ্যে নিজেকে মনে-প্রাণে বিলিয়ে দিয়ে ভাবি, এই তুমি চেয়েছিলে, আমাকে না-হলে তোমার চলত না, চলবেও না। ভুল, ভুল! আমরা মেয়েরা শুধু মনে-মনে খেলাঘর সাজাই, তা ছাড়া কী?' বলতে-বলতে নীলিমা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
এদিকে শান্তনু হঠাৎ লক্ষ্য করলো ঘড়ির কাঁটা নটা ধরো-ধরো। পাগলের মতো ছুটে গেলো বাথরুমে, মাথায় দু-ঘটি জল ঢেলে এসে হাঁকে-ডাকে কেষ্টকে অস্থির করে তুলে, গোগ্রাসে কিছু ভাত গিলে পাৎলুন আর কোট চাপিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে গিয়ে ট্রাম ধরলো। নীলিমার সঙ্গে আর একটা কথা বললো না।
বিশ্রী একটা কাণ্ড ঘটে গেল।
আপিস থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই শান্তনু পকেট থেকে একটি দশ টাকার নোট বের করলে, 'এই নাও তোমার ফেরিওলার পাওনা চুকিয়ে দিয়ো।' হেসে বললে কথাটা, হঠাৎ ঠাট্টার সুরে, যেন সকালবেলার ঘটনাটা এই একটুখানি হালকা হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে চায়।
নীলিমা স্বামীর মুখের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল।
'তোমার কাছেই রাখো।'
শান্তনু আবার বললে, 'নাও!'
নীলিমা নিলে নোটটা, কাপড়ের আলমারির দেরাজে রেখে দিয়ে বললে, 'চা খাবে এসো!'
খাবার টেবিলে বিরাট আয়োজন, নীলিমাই বসে-বসে করেছে ও-সব। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছিলো শান্তনুর, দ্রুতবেগে খেতে শুরু করলো।
একটু পরে বললে, 'তুমি খাচ্ছো না?'
'আমিও খাচ্ছি।'
একটু শিঙাড়া ভেঙে মুখে দিলে নীলিমা, আধ পেয়ালা চা ঢেলে নিলো। হয়তো সে কেঁদেছে, হয়তো দুপুরে সে খেতে বসেও কিছু খেতে পারেনি।
এদিকে শান্তনু আপিসে পৌঁছেই যা হোক করে সেই প্রবন্ধ লিখে বেয়ারার হাতে পাঠিয়ে দশ টাকা আনিয়েছে; লাঞ্চের সময় খুব খিদে পেয়েছিলো। তবু ভালো করে কিছু খায়নি তাহলে নোটটা ভাঙাতে হবে। এমনি করে নোটটা উপার্জন ও রক্ষা করে বাড়ি নিয়ে এসেছে, কিন্তু নীলিমা একবার জিগ্যেস করলে না কোথায় পেলো।' কথাগুলো সব মনে-মনে সাজানো ছিল; বলা হলো না। চাপা গুমোটে কাটলো সে রাত, কাটলো তার পরের দিন। আপিস থেকে ফিরে শান্তনু জিগ্যেস করলে, 'তোমার ফেরিওলা টাকা নিয়ে গেছে?'
'না, আসেনি।'
'আসে নি? কাল আসবে দেখো—টাকা যখন পাবে, না-এসে যাবে কোথায়? কিন্তু শান্তনুর মুখে একটা উদ্বেগের ছায়া পড়লো। চার দিন কেটে গেলো, বুড়ো এলো না। শান্তনু বললে, 'নীলিমা কেমন হল? আসে না কেন লোকটা?'
'কী জানি।'
'অসুখ করলো নাকি? তোমার তো আরো সব ফেরিওলা আছে—তাদের দিয়ে একটু খোঁজ করাও না।'
নীলিমা চুপ করে রইলো।
'রাস্তায় ওর ডাক শুনতে পাও না?'
'কই, না তো।'
'কাল মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করো।'
কিন্তু পরের দিনও বুড়োর সেই চড়া হাঁক-শোনা গেল না একবারও। তার পরের দিন রবিবার। শান্তনু সারা দুপুর ঘুমোতে পারল না। প্রায়ই উঠে-উঠে বারান্দায় যায়, মনে হয় বুড়োকে বুঝি দেখবে। কিন্তু কোথায়।
এক মাস কেটে গেল।
'কী আশ্চর্য! শান্তনু হঠাৎ একদিন বললে 'বুড়ো আর এলোই না।'
নীলিমা বললে, 'এলো না তো।'
'কী হলো ওর বলো তো?' বড়ো ম্লান দেখালো শান্তনুকে, প্রশ্নটা বড়ো অসহায় শোনালো।' হয়তো দেশে ফিরে গেছে ওর মেয়ের কাছে—কী বলো?'
'হয়তো গেছে।'
হয়তো গেছে। হয়তো গাড়ি চাপা পড়েছে, হয়তো জ্বর হয়ে মরে গেছে—কি হয়তো কলকাতারই অন্য কোনো পাড়ায় ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুরে পথে-পথে ঘুরে গলা ফাটিয়ে চীনে সিঁদুর হেঁকে বেড়াচ্ছে, দেশে যাবার পয়সা জমতে এখনো ঢের দেরি। কে জানে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন