শহুরে

সমরেশ মজুমদার

হরিবিলাস সর্দার বিবাহসংক্রান্ত বিলটা কতদিন হইল পাশ হইয়েছে বলুন তো?...আপনি যে আঙুল গুণিতে বসিয়া গেলেন, না অত মাস তারিখ ধরিয়া হিসাবে দরকার নাই। মোটামুটি ছয় সাত বছর হইল, না?

তাহা হইলে আমার নায়িকা সোনিয়ার বয়স আঠারোর কিছু বেশি, আর নায়ক মিঠুয়ার বয়স সম্ভবত পনেরো, দু-এক মাস কমই হইবে, বেশি তো নয়ই।

সোনিয়ার বাপের বাড়ি বিহারের একটি শহরের উপান্তে, শহরের ক্ষীণ আলো আর পাড়াগাঁয়ের অন্ধকারের সন্ধিস্থলে আর কি? বাপ প্রথমটা সর্দার অ্যাকটের গোলযোগটা অতটা গ্রাহ্যের মধ্যে আনিল না, শহরে ওরকম কত ঢেউ উঠিতেছে, আবার মিলাইয়া যাইতেছে। যখন ঢেউটা মিলাইয়া না গিয়া সত্যই দেশটাকে তোলপাড় করিয়ে তুলিল, তখন সে চিন্তিত না হইয়া পারিল না। ছেলের বাজার তখন গরম হইয়া উঠিয়াছে, পাওয়াই দুষ্কর। অনেক খুঁজিয়া-পাতিয়া প্রায় ক্রোশ ছয়েক দূরে একটি নিভৃত পল্লীতে মিঠুয়ার সন্ধান পাওয়া গেল। তখন তাহার উচ্চতা সওয়া গজ আন্দাজ, সোনিয়ার চেয়ে ঠিক এক মুঠার উপর দুই আঙ্গুল বড়। বিবাহ হইয়া গেল।

মধ্যের এই ছয়-সাত বৎসরের ইতিহাস বাদই দেওয়া যাক। কোনও রোমান্সের খোরাক নাই, নায়ক-নায়িকার মধ্যে কুল্যে দেখা সাক্ষাতের যো নাই তো রোমান্স। আপনাদের অত সহজে থামানো যাইবে না, জানি। জিজ্ঞাসা করিবেন অন্তরালের—অদর্শনের রোমান্স!...মিঠুয়ার তরফে যে কিছুই নাই, এ কথা বেশ নি:সংশয়ে বলা চলে। ছেলেটা হাঁদা গোছের, খানিকটা বড় হইয়া উঠিয়াছে মাত্র। নিয়মিতভাবে খাওয়া-দাওয়া, গরু-মহিষ চরানো আর ক্ষেতে ফসল তোলার বাহিরেও যে একটা দুনিয়া আছে, সে সম্বন্ধে তাহার অত খোঁজ-খবর নাই। তাহার 'মনোভাব' নামক জিনিসটাই গজায় নাই, সেক্ষেত্রে সোনিয়া সম্বন্ধে তাহার মনোভাবটা কি সে কথাই উঠে না। এক কথায় বলা চলে ছোঁড়াটা মাথায় বাড়িয়াছে, কিন্তু মাথার ভিতরে বাড়ে নাই।

অবশ্য সোনিয়ার কথা একটু ভিন্ন। একে মেয়ে, তায় যত অল্পই হোক না, শহরের একটু গন্ধ আছে। তাহা ছাড়া বয়সেও তো সে মিঠুয়ার চেয়ে বড়। এর উপর যখন ধরা যায় তাহার স্বভাবটাও স্বামীর মত হাঁদাটে নয়, তখন তাহার মনের জটিলতা স্বীকার না করিয়া উপায় থাকে না। ঘরকন্নার কাজের অতিরিক্তও তাহার কাজ আছে। কাপড়টি ছোবনো, সাজিমাটি দিয়া ঘাটে বসিয়া চুলের গোছা ধোওয়া, শহরে মার সঙ্গে কিছু বেচাকেনা করিতে গেলে শহরের হাওয়া একটু লক্ষ্য করা, বাঙালিদের 'বেটি-বহুরা' কীভাবে কপালে টিপটি পরে, এদেশিরা হাতে কি ধরনের মেহদির নকসা তোলে, মণিবন্ধে, বাজুতে, কণ্ঠের নীচে কি ধরণের উল্কি আজকাল চলতি—এই সব। সুবিধা পাইলে—ধরুন, মা যখন কাহারও বাড়িতে ধানটা ঝাড়িয়া দিতেছে, কিংবা দালটা বাছিয়া দিতেছে—সে সমবয়সীদেরদলে ভিড়িয়াও যায়—অবশ্য তাহার অবস্থার মেয়ের পক্ষে যতটা ঘনিষ্ঠভাবে ভিড়া সম্ভব। মোট কথা মিঠুয়া বোধহয় যে সময়টা মহিষের পিঠে শুইয়া মাঠের মাঝে অকাতরে নিদ্রা দিতেছে, কিংবা ঘুড়িনাটায়ের ঝগড়ায় মার খাইয়া কান্নার চোটে পাড়া মাথায় করিতেছে, তাহার পত্নী সোনিয়া তখন সম-বয়সিদের কাছে এমন সব সংবাদ শুনিতেছে, যাহা তাহাকে নিজের সম্বন্ধে অধিকতর সচেতন করিয়া তুলিতেছে।

অবস্থা যখন এইপ্রকার মিঠুয়ার বাপ বুধন মড়ল একদিন হঠাৎ আসিয়া বেহাই বাড়িতে উপস্থিত হইল। রৌদি মহতো নেশাপানি আনিয়া বেহাইকে অভ্যর্থনা করিল। বুধনের মেজাজটা একটু যেন বেশি রুক্ষ, বলিল, এ তো ভালো কথা নয় সমধি (বেহাই), টাকা নেই, টাকা নেই, বলে মেয়ের দ্বিরাগমন করাচ্ছ না, ওদিকে আমার যে মুখ দেখানো ভার। বেটীর চালচলন শহুরে হয়ে উঠছে—সে-দেশ পর্যন্ত এ কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল, অথচ তোমার যেন হুঁশই নেই। কবে তোমার টাকা হবে, মেয়েকে কায়দামাফিক বিদায় করবে, সে ভরসায় থাকলে তো চলবে না। আমি আজ এসেছিলাম শহরের দিকে, ফিরে গিয়ে জ্যোৎখীজির (জ্যোতিষীজির) কাছ থেকে দিন দেখিয়ে ছেলেকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি মেয়ে পাঠাবার যোগাড় কর!

বেহাই বিস্তর কাকুতি-মিনতি করিল। ক্ষেতে মকাইটা হইয়াছে ভালো এবার, ফসলটা উঠিলে মেয়েকে বিদায় করিবে। হাত এখন নিতান্তই খালি, পাওনাদারদের কয়েক মাস সুদ পর্যন্ত দিতে পারে নাই, সেদিকে একটি পয়সারও আশা নাই...এখন পাঠালে কিছুই করতে পারব না। সব সাধ আহ্লাদই বাকী থেকে যাবে...নাও সমধি, তুমি আজ যে মোটেই গেলাস তুলছ না...

ছেলের বাপ রাজি হইল না,—ছেলের বাপই তো! অষ্টমবার গেলাসটা ভরিয়া বলিল—'মনে সুখই নেই তো গেলাস ভরা। তুমি মেয়েকে এক বস্ত্রে, খালি হাতে পাঠিয়ে দাও, আমার জোটে দেব পরতে, না জোটে ন্যাকড়া পরবে। আমি ইজ্জৎদার লোক, আমার ইজ্জৎ বজায় থাকলেই হল।...তবে আসল কথাটা বলতেই হল সমধি, আজ শহর থেকে আসার পথে কনিয়াকে (বধূকে) সখীদের সঙ্গে যেরকম বেহায়াপনা করতে করতে আসতে দেখলাম, তাতে...।'

পেটে অনেকখানি গিয়াছে, রাগিতে গিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। রৌদিও যোগদান করিল। খানিকটা অশ্রু বিসর্জন করিয়া কহিল—'কে কার বেটী, কে কার বাপ? সব রামজির লীলা! তুমি নিয়ে যাও তোমার কনিয়াকে সমধি।'

বুধন গেলাসটা শেষ করিয়া শান্তভাবে একটু চুপ করিয়া রহিল, তাহার পর একটি দীর্ঘশ্বাসের সহিত বলিল,—'না হয় থাকই তবে মকাই পাকা পর্যন্ত। তুমি ইজ্জৎদার লোক, তোমার কথাটা ঠেলব? আমার মন যেন সায় দিচ্ছে না।'

রৌদি তখন পাঠাইবার দিকেই ঝুকিয়াছে। প্রবল বেগে হাত নাড়িয়া বলিল,—'না, না, সব মায়ার বন্ধন সমধি, যত শিগগির কাটানো যায় ততই মঙ্গল, বলে—

কহত কবীর শুনো রঘুনাথা

মায়াধার নরক পথ যাতা

—মায়ার নদী নরকেই নিয়ে যায়। নদীতে গা ভাসাতে চাই না।'

বুধন দুই হাঁটুর উপর হাতের কনুই দুইটা ন্যস্ত করিয়া বলিল, 'ঠিক বলেছ সমধি—

আরে কৌন কিসকা বেটা ভইয়া,

কৌন কিসকা বাপ।

মায়াকা হও মুটঠি বানহে,

হাত পসারো—সাফ।

—কেই বা কার? মায়ার বশে হাত মুঠো করে ভাবছি—কি রত্নই না রয়েছে, খুলে দেখ—ফাঁকি।...কাটিয়াতে আর আছে নাকি? দেখ তো।...না থাক দরকার নেই...এও একটা মায়াই বলতে হবে কিনা, যত এড়ানো যায় ততই ভালো।'

রৌদির বাড়িতে এই দার্শনিক বৈঠকের দুইদিন পরে মিঠুয়া বধূকে লইতে আসিল। মাথায় একটা গোলাপি চীনে সিল্কের টুপি, গায়ে সবুজ গেঞ্জির উপর একটা পাৎলা পিরান, কোমরে হলুদ-ছোবানো কাপড়, হাতে একটা বাঁশের লাঠি। মাথায় জবজবে করিয়া মাখা সরিষার তেল, টুপির নীচের অংশটা ভিজাইয়া কয়েকটি ধারায় কপাল গাল, ঘাড় বাহিয়া নীচে নামিয়া আসিয়াছে—চোখে কাজল।

পথে এক বান্ডিল বিড়ি কিনিয়াছিল, শ্বশুরবাড়ির নিকট আসিয়া একটা কানে গুঁজিয়া দিয়া যথাসম্ভব, শহুরে হইয়া লইল।

শ্বশুর-শাশুড়ি বাড়ি ছিল না। সোনিয়াকে তাহার দুই তিনজন সখী জোর করিয়া আনিয়া ঘরের ছ্যাঁচা বেড়ার আড়ালে দাঁড় করাইল—অবশ্য খুব যে জোর করিতে হইল, এমন নয়। বেড়ার ফাঁক দিয়া দেখিয়া ঠোঁট উলটাইয়া, নাক সিটকাইয়া সোনিয়া চাপা গলায় বলিল, 'ইস! কি ভারী মদ্দ রে আমার।...আমি সোজা লোক? নিজে দেড় হাতের হলেও চার হাতের লাঠিই আমার।'

সবাই চাপা গলায় হাসিয়া উঠিল।

একজন সখী বলিল, 'তুই তো ওই বিড়ির মতই ওকে তোর কানে গুঁজে রাখবি সোনিয়া।'

অপর একজন বলিল, 'দেখিস, যেন বিড়ির মতো ফুঁকে দিস নি তা বলে।'

আর একটা হাসির লহর উঠিল।

সব না বুঝিলেও বেড়ার আড়ালে যে একটা কিছু হইতেছে তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া, মিঠুয়া সেটা বেশ বুঝিতে পারিল। নিজের পুরুষত্বটাকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য একটা গলা খাঁকারি দিয়া নড়িয়া চড়িয়া বসিল এবং তাহাতে আরও একটা কি মন্তব্যের সঙ্গে বেড়ার ও-ধারে প্রবলতর হাসির বেগ ওঠায় অসহায়ভাবে হাত-পা গুটাইয়া বসিয়া রহিল।

একটু যেন ভিতর হইতে ধাক্কা খাইয়া একটি মেয়ে একেবারে সামনে আসিয়া পড়িল। একটু থতোমতো খাইয়া নিজেকে সামলাইয়া লইয়া মুখে কাপড় দিয়া প্রশ্ন করিল, 'পহুনা (কুটুম), বেশ ভালো আছ তো?'

মিঠুয়া মাথা নীচু করিয়া বলিল, 'হুঁ।'

'বলদ মহিষ সব কেমন আছে?' নিজেও হাসিয়া উঠিল, পাশেও দুই তিনটি কণ্ঠে হাসির শব্দ পাওয়া গেল। মিঠুয়া আরও ঘাড় গুঁজিয়া নিরুত্তর রহিল।

আর একটি মেয়ে দুইবার উঁকিঝুকি মারিয়া বাহিরে আসিল। অযথা এক ঝলক হাসিয়া আবার কৃত্রিম গম্ভীরতার সহিত বলিল, 'আহা কচি ছেলে, দু'কোশ পথ হেঁটে এসে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে গো। দুধ খেয়ে এসেছিলে পহুনা?'

মিঠুয়া তেলে-ঘামে একেবারে জবরজং হইয়া উঠিয়াছে। মাথা নীচু করিয়া আড়চোখে দেখিল আর একজন বাহির হইয়া আসিল, একটু হাসিয়া বলিল, 'মুখ তোলো তো পহুনা, ক'টি দাঁত হয়েছে দেখি। আহা সত্যি বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, ঘাড় তুলতে পারছে না।...আচ্ছা, ভাবনা নেই, যাবার সময় হেঁটে যেতে হবে না—মিতিনকে (সইকে) বলব কোলে করে নিয়ে...'

এমন সময় অপর একদিকে রৌদির গলার আওয়াজ শোনা গেল। সে বাড়ি ছিল না, এই মাত্র আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। মেয়েরা যে যেখানে পারিল ছুট দিল।

সন্ধ্যা পর্যন্ত রৌদির স্ত্রী এবং ভগ্নীও বাড়ি ফিরিল; পাড়ার বর্ষীয়সীদের ডাকিয়া রাত বারোটা পর্যন্ত গান হইল। তাহাকে উপলক্ষ্য করিয়াই এই সমস্ত ব্যাপার হইতেছে জানিয়া মিঠুয়া মেয়েগুলার হাতে খোয়ানো আত্মমর্যাদা আবার অনেকটা ফিরিয়া পাইল এবং রাতে দৈনন্দিন নেশা করিয়া শ্বশুর যখন তাহার চিবুক ধরিয়া পিঠে হাত বুলাইয়া অন্তত আর একটা দিনও থাকিয়া যাইবার জন্য অনুরোধ করিল, তখন সে পূর্বলব্ধ আত্মমর্যাদার বশে কোনওক্রমে রাজি হইল না।

পরের দিন বিকালে সাজগোজ করিয়া এবং শ্বশুরের দেওয়া একজোড়া রঙিন কাপড় আর উড়ানিটা কাঁধে ফেলিয়া সে একটা গোটা পুরুষের তেজে বউকে লইয়া বিদায় হইল।

সোনিয়া যাইবে না বলিয়া বাড়ির মধ্যে খুব একচোট কান্নাকাটি, ওজর-আপত্তি করিল, চৌকাঠের বাহিরে আসিয়া, আর একচোট ধ্বস্তাধ্বস্তি করিল, তাহার পর ঘোমটার মধ্যে একটানা কান্নার সুর তুলিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইল। মা, পিসি, পাড়ার বর্ষীয়সী আর সখীরা কাঁদিতে কাঁদিতে গ্রামের প্রান্তে 'বড়হম দেওতার' (ব্রহ্মদেব) আস্তানা পর্যন্ত সঙ্গে গেল, তাহার পরে একবার গলা-জড়াজড়ি করিয়া কাঁদিয়া,সোনিয়াকে বিদায় দিয়া আস্তানার কদমতলাটিতে দাঁড়াইয়া রহিল।

পথটা প্রায় পোয়াখানেক পর্যন্ত সোজা গিয়াছে। এটুকু সোনিয়া এমন ধীরে ধীরে চলিল যে দুই-তিনবার মিঠুয়াকে থামিয়া পড়িয়া তাহার অপেক্ষা করিতে হইল। আপত্তির যে-রকম নমুনা দেখিয়াছে, দূরত্ব বাড়াইয়া শেষকালে পলাইয়া যাইতেও পারে—শহুরে মেয়েকে বিশ্বাস নাই। মোড়টা ঘুরিয়া খানিকটা পরে কিন্তু তাহার যেন বোধ হইল, বধূর পদক্ষেপ একটু একটু করিয়া দ্রুত হইয়া উঠিতেছে। নতুন বধূ হইতে একটা ভব্য দূরত্ব বজায় রাখিবার জন্য তাহাকেও গতিবেগটা বাড়াইয়া দিতে হইল। দেখিল, তাহাতেও নিস্তার নাই। তখন নির্জন রাস্তায় তাহার গা-টা যেন ছমছম করিতে লাগিল।—মেয়েটা ঘাড়ে পড়িবার দাখিল হইয়াছে, মতলবখানা কি?

হঠাৎ সোনিয়া চলিতে চলিতে থামিয়া গেল। মিঠুয়া অজ্ঞাতে খানিকটা আগাইয়া গিয়াছিল, ফিরিয়া দেখিয়া ধীরে ধীরে বধূর কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। আত্মীয়া ভিন্ন এত বড় মেয়ের সহিত সে কখনও কথা কহে নাই। প্রবল অস্বস্তিতে পড়িয়া লাঠির মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল।

খানিকক্ষণ পরে ঘোমটার মধ্যে থেকেই ফিসফিস করিয়া প্রথম কথা ফুটিল, 'ইস, দৌড়ানো হচ্ছে একেবারে।'

ইহা অতিমাত্রায় অপ্রত্যাশিত! মিঠুয়ার প্রথমটা কথাই যোগাইল না, একটু পরে জিভে ঠোঁট ভিজাইয়া আমতা আমতা করিয়া বলিল, 'বা:, তুমিই তো জোরে চলতে আরম্ভ করলে, আমি সে রকমভাবে চললে এগিয়েই যেতে!'

ঘোমটায় একটা ঝাঁকনি হইল, শব্দ বাহির হইল, 'গমার কাঁহাকে!' অর্থাৎ, গেঁয়ো কোথাকার!

মিঠুয়ার যাহা কিছু বুদ্ধি অবশিষ্ট ছিল, বধূর এরূপ সম্ভাষণে একেবারেই বিলুপ্তপ্রায় হইল। একটু পরে বলিল, 'বেশ, চল আস্তে আস্তেই।'

খানিকটা গেল! একটু পরে হঠাৎ পিছন ফিরিতে দেখিল—বধূর মাথায় ঘোমটা নাই, কখন খুলিয়া ফেলিয়াছে, সে সশঙ্কভাবে মুখটা তাড়াতাড়ি ফিরাইয়া লইল। ভাবিতে লাগিল—এ তো ভীষণ ফ্যাসাদে পড়া গেল, মাঝরাস্তায় কি করিয়া এই অভাবনীয় বিপদ হইতে উদ্ধার পাইবে চিন্তা করিতেছে, এমন সময় পিছনে তাহার জামার খুঁটে টান পড়িল। যদিও ফিরিয়া দেখিল, বধূর হাত তাহার অঞ্চলের ভিতরেই অচঞ্চলভাবে আছে, তবুও তাহার আর সন্দেহ রহিল না যে, এ ওই দু:সাহসিকারই কাজ। প্রশ্ন করিল, 'কিছু বলছ?'

বধূ ঘোমটাযুক্ত মুখটা ব্যঙ্গের সহিত ঘুরাইয়া লইয়া বলিল, 'কাকে?'

'আমায়?'

সোনিয়া ভ্রূ কুঁচকাইয়া বলিল, 'ও: ওঁকে বলছে, মস্ত সমঝদার লোক কিনা! গেওয়া—বুঝবে শুধু মোষ বলদের কথা।'

এরকমভাবে ঘা দিলে মিঠুয়ার মতো লোকেরও লাগে, রাগে মুখটা ভার করিয়া বলিল, 'হ্যাঁ: বুঝি কিনা বলেই দেখ না।'

'ঢের বলেছি আর ঢের বুঝেছ, চল এখন, সামনে লোক আসছে।'

ঘোমটাটা টানিয়া দিয়া আবার চলিতে আরম্ভ করিল। যখন আন্দাজ করিল লোকটা দৃষ্টিপথের বাহিরে চলে গিয়াছে, ঘোমটাটা খুলিয়া একেবারে পাশাপাশি আসিয়া গল্প জুড়িয়া দিল। বোধহয় দুইজনে মতলব করিয়া পথিকটিকে প্রবঞ্চনা করায় দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতাটা আরও নিবিড় হইয়া গেল। অবশ্য সোনিয়াই অগ্রণী, বলিল, 'গল্প করতে করতে চল না, হাবা না বোবা?'

'কি গল্প বলব?'—রাজারাণী না হুড়ারের?

সোনিয়া হাসিয়া ফেলিল, বলিল, 'মনসার (মিনসের) কথা শোন না! আমি কি খুকি যে বাঘ-ভূতের গল্প শুনব? তুমিই বরং দুধের ছেলে। কালকের কথা মনে আছে?—আমার মিতিনদের হাতে নাকালটা?'

মিঠুয়া চুপ করিয়া রহিল। সখীদেরই একটা কথা সম্বন্ধে সঙ্কেত করিয়া সোনিয়া বলিল,—পা ব্যথা করছে না তো?—যদি করে তো বল না হয়...'

শেষ করিতে না পারিয়া মুখে হাত দিয়া হাসিয়া উঠিল। মিঠুয়া লাঠিটা বাগাইয়া গম্ভীর হইয়া বলিল, 'তাদের সবগুলোকে আমি কাঁধে করে অমন পাঁচ ক্রোশ ঘুরে আসতে পারি—আমার নাম মিঠঠু মড়র, হুঁ!'

'ও:, তাই তো গো! তা, তাদের বললে না কেন? তাহলে হনুমানজি বলে তোমায় পুজো করত!'

হাসিতে হাসিতে বলিল, 'তিনিও রামলক্ষণ-সীতাজী—সবাইকে এক সঙ্গে ঘাড়ে বয়ে নিয়ে বেড়াতেন।...নাও, খানিকটা এগিয়ে যাও, একটা গ্রাম এসে পড়ল।...এখন হাতে ধরে মড়রকে শেখাই দু-বছর।'

নিজেও ঘোমটাটা টানিয়া দিল এবং গতি মন্দ করিয়া স্বামীর আর নিজের মাঝে উপযুক্ত ব্যবধান করিয়া লইল। গ্রামটায় বসতি বিরল, তবে রাস্তার দু-ধারে দূরে দূরে ছাড়া ছাড়া প্রায় আধ মাইল পর্যন্ত গিয়াছে। ছেলেমেয়েরা কুটীর হইতে বাহির হইয়া, কোথাও বা রাস্তার মাঝে আসিয়া—'কনিয়া গে, দুগো ধনিয়া দে'—বলিয়া দুলিয়া দুলিয়া ছড়া কাটিতে লাগিল। একটু যাহারা বোঝে, বর-কনের বয়সের তারতম্য লইয়া অম্ল-মধুর মন্তব্য ছাড়িতে লাগিল।

গ্রাম ছাড়াইয়া খানিকটা গিয়া রাস্তার ধারে একটা পুকুর পড়ে। রাস্তার একটু পাশেই ঝাঁড়া বকুলগাছের তলায় রানভাঙা একটা পুরাতন ঘাট। লোকজন নাই কেহ। সোনিয়া বলিল, 'তেষ্টা পেয়েছে, চল একটু বসি।' মিঠুয়া বাহাদুরি দেখাইয়া বলিল, 'ই: দু-ক্রোশ তো পথ, তার মধ্যে আবার চারবার বসা। আমার তেষ্টা পায় নি।'

সোনিয়া ঘাটের দিকে অগ্রসর হইয়া বলিল, 'তবে তুমি যাও।'

'আর তুমি?'

'আমি জিরিয়ে টিরিয়ে বাড়ি ফিরে যাব।'

যা মেয়ে দেখা যাইতেছে ও তা পারে। মিঠুয়া শুষ্ক মুখে অগ্রসর হইয়া আসিল এবং সোনিয়া ঘাটের রানায় একটা জায়গায় গিয়া বসিলে সেও গিয়া পাশে বসিল। সোনিয়া গা-টা গুটাইয়া লইয়া বলিল—'দেখ কাণ্ডটা! আর জায়গা নেই নাকি? যে একেবারে ঘাড়ের উপর এসে পড়লে? আচ্ছা পাড়া গেঁয়ে ভূত তো।'

মিঠুয়া অতিমাত্র অপ্রতিভ হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সে যেরকম উৎসাহ পাইয়া আসিয়াছে, তাহাতে মনে করিয়াছিল খুব কাছে বসাটাই বরং অভিজ্ঞ নাগরিকের মতো হইবে। বোকার মতো একবার চারিদিকে চাহিয়া বলিল, 'আর বসার মতো পাকা জায়গা তো দেখছি না, তাহলে তো আমায় নীচে বসতে হয়।'

সোনিয়া ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া কপট গাম্ভীর্যের সহিত বলিল, 'তাই তো গা—এত বড় অপমান! আমি'...হঠাৎ থামিয়া মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল, 'কত বয়স হল? এগারো?'

মিঠুয়া যথাসম্ভব জোর দিয়া বলিল, 'পন্দ্রহ।'

সোনিয়া কথাটাতে মিঠুয়ার চেয়েও জোর দিয়া চোখ পাকাইয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, 'আমি পন্দ্রহ বছরের মদ্দ—অমুক মড়র—আমি বসব নীচে...।'

নীচে বসবে না তো কোথায় বসবে?—আমার বয়স যে উন্নৈস!—বিশ্বাস হচ্ছে না?' বলিয়া তাহার উনিশ বছরের সমস্ত শরীরখানি কপট দর্পে বিচলিত করিয়া, রানার নীচে পা দুইটি ঝুলাইয়া, বিপরীত দিকে গ্রীবা বাঁকাইয়া বসিল।

একটু পরে ফিরিয়া দেখিল, পনের বৎসরের জীবটি নিজের পরাজয় মানিয়া লইয়া জড়সড় হইয়া তাহার পায়ের কাছে, ঘাসের উপর বসিয়া আছে। একটু মুচকিয়া হাসিল, তাহার পর বলিল, 'বসে না থেকে দুটো ভালোসারির (বকুলের) ফুল কুড়োও দিকিন। আমি ততক্ষণ মুখ ধুয়ে আসি।'

ফুল কি হবে?

'বাড়ি গিয়ে তোমায় ভেজে খাওয়াব,—হাঁদারাম—'

মুখ ধুইয়া অঞ্জলি করিয়া জল পান করিয়া উঠিল। ছোবানো শাড়ির কোঁচা দিয়া মুখ মুছিয়া মিঠুয়ার দিকে মুখটা হঠাৎ বাড়াইয়া বলিল, 'দেখ তো আমার কপালে টিকলিটা (টিপ) ঠিক আছে কি না।'

'এক পাশে সরে গেছে।'

'কোন দিকটায়?'

'ডানদিকে।'

সোনিয়া মেহদি রাঙানো তিনটি আঙ্গুলের ডগা টিপ ছাড়া কপালের আর সব জায়গায় বুলাইয়া বলিল, 'কোথায়? বুঝতে পারছি না তো।'

'ডানদিকে ভুরুর ওপরে।'

সোনিয়া আবার সেইরূপভাবে হাত বুলাইয়া বলিল, 'কোথায়? দুৎ মিছে কথা, পড়ে গেছে নিশ্চয়।'

'না না, পড়েনি।'

সোনিয়া ঝগড়া করিবার মত করিয়া বলিয়া উঠিল, 'হ্যাঁ! হ্যাঁ হ্যাঁ—পড়েছে, নিশ্চয় পড়েছে-চাষা।'

মিঠুয়া আশ্চর্য হইয়া গেল,—ওইটুকু ছোট কপালটায় হাত বুলাইয়া টিপটা কোথায় ধরিতে পারিল না, এ যে বিশ্বাস করা শক্ত। তা ছাড়া ইহাতে রাগ করিবার, ঝগড়া করিবারই বা কি আছে? একটু হতভম্ভ হইয়া বলিল, 'যদি রাগ না কর তো দেখিয়ে দিই।'

'যদি খালি টিকলিটা খুঁটে নিয়ে বসিয়ে দিতে পার তো কিছু বলব না, কিন্তু খবরদার, যেন...ন্যাকাকে কোনও কাজ দিয়ে বিশ্বাস নেই।'

ন্যাকার হাতটা কাঁপিতেই ছিল, তাহার উপর বাঙালি প্যাটার্নের ক্ষুদ্র টিপটা বেশ একটু বাগড়াও দিল; খুঁটিতে গিয়া কপাল হইতে নাকে পড়িল, সেখান হইতে দুইটি ঠোঁটের মাঝখানে।

মিঠুয়া ভয়ে ভয়ে, যতটা সম্ভব আলগাভাবে সেটাকে উদ্ধার করিয়া কপালে বসাইয়া দিল এবং একটা নিশ্চিন্ততার নিশ্বাস ফেলিল।

সোনিয়া দুইটি আঙুল দিয়া টিপটা একটু চাপিয়া দিয়া বলিল, 'গেঁয়ো কোথাকার।'

মিঠুয়া অত্যন্ত আশ্চর্য হইয়া গেল, প্রশ্ন করিল, 'আবার ও কথা বলছ কেন? দিইনি ঠিক করে খুব সাবধানে?'

'নিশ্চয় বলব, আমার খুশি। নাও চল। আকাঠ গেঁয়ো।'

আবার দুইজনে চলিতে আরম্ভ করিল। সোনিয়া কি ভাবিতেছিল, একটু পরে বলিল, 'তুমি গেঁয়ো বললে চট; কিন্তু কাউকে যদি বল যে আমার গায়ে হাত দিয়ে কপালের টিপ পরিয়ে দিয়েছ তো সে আরও গেঁয়ো বলবে। মনে থাকে যেন।'

মিঠুয়া মস্ত বড় বুদ্ধিমানের মতো বলিল, 'সে আমি বলতে যাব কেন? এতই বোকা নাকি?'

কথাবার্তা আরও অন্তরঙ্গতার সহিত হইতে লাগিল। পথের মাঝে লোক দেখিয়া যতবারই দুইজনে সরিয়া যাইতে লাগিল, লোক চলিয়া গেলে ততবারই আবার আরও কাছাকাছি হইয়া চলিতে লাগিল। সোনিয়া গ্রামের কথা জিজ্ঞাসা করিল। শ্বশুর-বাড়ির কথা, ননদ, দেওর, গরু মহিষ, নিজে শহরের কথাও বলিতে লাগিল। বাঙালি মেয়েদের কথা। কে এক বাঙালি মেয়ে তাকে বড় ভালোবাসিত, সোনিয়া তাহাদের বাড়ি ঘুঁটে যোগাইতে যাইত মাঝে মাঝে—তাহাকে আদর করিয়া বলিত, সোনাময়ী—মানে, সোনার তৈয়ারি। সে নাকি সুন্দর বলিয়া তাহাকে এই আখ্যা দিয়াছিল...বাবা: বাবা: বাঙালির মেয়েরা এত মিথ্যাও জানে। সোনিয়া নাকি আবার সুন্দর।

মিঠুয়ার সাহস বাড়িয়াছে, একটু বোধহয় জ্ঞানবুদ্ধিও হইয়াছে, পথ চলিতে চলিতে। বলিল, 'মিছে কথা আর কি বলেছে। তুমি তো সুন্দরই।'

'নিজে যে সুন্দর সে ওরকম বলে—মানে, বাঙালির বেটী নিজে সুন্দর বলেই আমার প্রশংসা করত।'

মিঠুয়া ঠিক বুঝিতে পারিল না, এর মধ্যে তাহারও প্রশংসা প্রচ্ছন্ন আছে কি না।

যেন মনে হইল তাহাকে লক্ষ্য করিয়াই এটুকু বলিয়াছে এবং যে ক্রমাগতই একনাগাড়ে গেঁয়ো, গেঁয়ো করিয়া আসিয়াছে তার মুখে ভালোই লাগিল কথাটা।

হঠাৎ কি ভাবিয়া বলিল, 'বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। ইন্দারাটার পাশ দিয়ে ঘুরলেই আমাদের বাড়ির রাস্তা কিনা। আচ্ছা, আসবার সময় তুমি অত কান্নাকাটি করছিলে কেন বল তো? এখন তো বেশ...'

সোনিয়া একেবারে সচকিত হইয়া উঠিল। খপ করিয়া একগলা ঘোমটা দিয়া চাপা স্বরে উদ্বিগ্ন ভাবে বলিল, 'সত্যি এসে পড়েছি নাকি? আগে বলতে হয়,—এগিয়ে যাও,—এক্ষুনি এগিয়ে যাও—'

সঙ্গে সঙ্গে ঘোমটার ভিতর হইতে কান্নার সুর উঠিল। মিঠুয়া অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল, 'এ কি! এই তো দিব্যি ছিলে, বললে, আমাদের বাড়ি খুব ভালো লাগবে, আরও বললে...'

স্বামীকে বেশ একটু ধাক্কা দিয়াই—আগাইয়া সোনিয়া তাড়াতাড়ি বলিল, 'বাড়ি যে এসে পড়েছে। গেঁয়ো ভূচ্চরকে নিয়ে কী ফ্যাসাদেই—'

অত:পর নিজের গতি মন্দ করিয়া বেশ উচ্চ সুরেই বিনাইয়া বিনাইয়া ক্রন্দন আরম্ভ করিয়া দিল।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%