ঝড়

সমরেশ মজুমদার

বেশ মনে পড়ে, সে-ও এমনি ঝড়ের রাত। চারিধারে বাতাসের এমনি গর্জন, আকাশে মেঘের এমনি ছুটোছুটি! পনেরো বছরের কথা—তবু মনে হয়, যেন সে কালকের ঘটনা। সেই রাতটিকে যদি আমার সর্বস্ব দিয়েও আজ ফেরাতে পারতুম!

বাবা আমার মস্ত জমিদার। মান-সম্ভ্রম, আদব-কায়দার দিকে পুরোদস্তুর তাঁর নজর ছিল—আমি তাঁর একটিমাত্র মেয়ে। সকলে বলতো, হাঁ, বাপকা বেটী। মা বলতেন, বাপের অহংকারটুকুও কি পূর্ণমাত্রায় পেতে হয়। মেয়েমানুষের পক্ষে ও জিনিসটা যে ভারী সর্বনেশে।

তখন বুঝিনি, আজ বুঝি, আমার স্নেহময়ী মার সে কথাটুকু কত খাঁটি। মাগো, চিরদিন নিজেকে সবার আড়ালে সবার পিছনে রেখে সকলকে তৃপ্তি দিয়ে অত তাড়াতাড়ি তুমি চলে গেলে! যাবার বেলায় কেন মা তোমার এই দুর্দান্ত মেয়েটিকে তার সব অহংকার, সব গর্ব চূর্ণ করবার মন্ত্রটুকু শিখিয়ে দিয়ে গেলে না? তাহলে যে আজ তাকে বুকের মধ্যে এমন বেদনা নিয়ে...

সেই কথাই বলতে বসেছি। কোনোখানে এতটুকু গোপনতা রাখব না। মানুষের কাছে আমি বিচার চাইতে আসিনি—এ যে আমার নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া। রাখা-ঢাকার ফাঁকি তো আর নিজের মনের সঙ্গে চলে না!

আমার বয়স তখন দশ বৎসর—আমার লক্ষ্মী মা হঠাৎ একদিন বাড়িটায় কান্নার রোল তুলে বিদায় নিলেন। বাবা ছিলেন পুরুষ। তিনি সংসারী জীবের এই মৃত্যুকে চিরন্তন সত্য জেনে মিথ্যা শোকের ধোঁয়ায় নিজেকে আচ্ছন্ন করে ফেললেন না। তিনি তাঁর জমিদারির কাজকর্ম—পথ-ঘাট তৈরি, খাজনা আদায়, বাকি বকেয়া উশুলের দরুন বেয়াদব প্রজাকে শায়েস্তা করা প্রভৃতি বেশ যথানিয়মেই করতে লাগলেন।

দেখে সকলে বললে, মার মৃত্যুর পূর্বে যেমন, পরেও তেমনি তাঁর কাজকর্মের ধারাটি বেশ অবিচ্ছিন্ন বয়ে চলেছে। আচার-ব্যবহার বা ভাব-ভঙ্গিতে কোথাও এমন একটু ফাঁক দেখা গেল না যা থেকে বাহিরের লোকে কোনোরকম বিচ্ছেদ বা অমঙ্গলের আভাস পেতে পারে। বাড়ির গুরু-পুরোহিত শাস্ত্র আওড়ে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, এই তো স্থিতধী মুনির লক্ষণ। আর একদল লোক আড়ালে বলাবলি করেছিল, মানুষটাকে কি ভগবান এক ফোঁটা প্রাণও দেননি। এ কথাটা খুব অস্ফুটে অস্পষ্ট ভাষায় উচ্চারিত হলেও আমার কানে পৌঁছুতে কিছুমাত্র বাধা পায়নি।

এমন বাপের মেয়ে আমি—মা-মরা মেয়ে। বোধহয় নিজের সম্বন্ধে এর বেশি আর কোনো কথা না বললেও চলে।

লেখা-পড়া গান-বাজনা—এই সব নিয়ে বেশ একটা স্বপ্নের রাজ্য গড়ে তুলেছিলুম। বাহিরে বিশ্বের পানে চেয়ে দেখবার অবসর ছিল না। কিন্তু হঠাৎ পাঁচজনে এই স্বপ্নের রাজ্যে একটা খবর নিয়ে এলো যে বয়স আমার পনেরো পার হতে চলেছে। বাড়িতে এক বিধবা পিসি ছিলেন। তিনি বাবাকে শুনিয়ে বললেন, এ বয়সে হিন্দুর ঘরের মেয়েকে আইবুড়ো রাখা কিছুতেই চলে না। ইহলোকে লোকলজ্জা তো আছেই, তাছাড়া পরলোকেও নাকি বিস্তর লাঞ্ছনা জমা হচ্ছে।

বাবা হেসে বললেন, নীরু এখনও ছেলেমানুষ। ওর যখন জমিদারি চালাবার মতো বুদ্ধি হবে, তখন ওর বিয়ে দেব।

পিসি বললেন, শোনো কথা। মেয়েমানুষ আবার জমিদারি চালাবে কি রকম?

তার চেয়ে নয় তোমাদের ওই লেখাপড়া-জানা শান্ত-শিষ্ট সুন্দর একটি ছেলে দেখেই বিয়ে দাও। সেও তোমার বশে তোমারই ঘরে থাকবে—জমিদারিও বজায় রাখবে।

বাবা বললেন, বেশি নিরীহ লোক নীরুর সঙ্গে খাপ খেয়ে চলতে পারবে না।

পিসি বললেন, তা ঠিক। যে ধিঙ্গি মেয়ে!

পিসির মুখ গম্ভীর হলো, বাবা চুপ করলেন, আমিও পাশের ঘরে বসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম।

বিয়ে!

এক-গা গয়না পরে আধ হাত ঘোমটা টেনে মুখ ঢেকে মাটির পুতুলের মতো জড়-ভরতটি হয়ে ঘরের কোণে বসে থাকা তো! পরের ইশারায় নড়াচড়া, খাওয়া-বসা, শোওয়া-দাঁড়ানো—সুখে হাসতে পাবো না, দু:খে বুক ভেঙে গেলেও একফোঁটা চোখের জল ফেলবার অধিকার নেই— এই তো বাঙালির বৌয়ের সুখের ছবি। কাজ নেই আমার অমন সোনার চাঁদ বরের আদরে ডুবে সংসার করা। যেমন আছি, আমি যেন এমনি থাকি—এই গান-গল্প, খেলাধূলা, হাসিখুশি নিয়ে। কোনো নতুন লোকের নতুন সঙ্গ-সুখের স্বাদ আমি চাই না।

মনের যখন এমনি অবস্থা, তখন একদিন বাবা বললেন, চ নীরু, একবার পশ্চিমে ঘুরে আসি।

আমি বললুম, চলো।

দিল্লী, আগ্রা, লখনৌ, প্রয়াগ নানান দেশ ঘুরে আমরা একদিন এসে কাশীতে আস্তানা পাতলুম। তীর্থ বলে যে কাশীর উপর টান পড়লো, সেকথা বললে মিথ্যা বলা হবে। জানি না বাবা কোনোদিন বিশ্বনাথ দর্শনে গেছলেন কিনা—তবে আমি গেছলুম—কিন্তু সে একদিন। দেবতাকে প্রণাম করতে যাবো বলে যাইনি, একথা স্পষ্টই স্বীকার করি। এতে যদি কেউ নাস্তিক বলে ঘৃণায় নাক সিটকে মুখ ফেরান তাহলে নিরুপায়। আমি কিন্তু সত্য কথা বলছি। আর বলেছি তো কারো বিচারের প্রত্যাশী হয়ে আমি নিজের এ কাহিনী আজ বলতে বসিনি। আমি গেছলুম মন্দির দেখতে—শুধু সেই প্রাচীনতার কথা শুনে, তা দেখবার কৌতূহল নিয়ে।

এবং এই যে কাশীতে আটকে পড়লুম—সে পরকালে স্বর্গ বা শিবত্বপ্রাপ্তির লোভে নয়। বাবার এক বন্ধু জুটে গেলেন, ছেলেবেলায় কবে নাকি দুজনে একসঙ্গে কলকাতার কোন স্কুলে পড়েছিলেন; ভাব ছিল, আজ প্রায় চল্লিশ বছর পর দুজনের এই কাশীতে দেখা। তাঁরই বন্ধুত্বের খাতিরে পড়ে বাবা বললেন, নীরু মা, এখানে আর কিছুদিন থেকেই যাই। ঘুরে-ঘুরে আমিও একটু শ্রান্ত হয়েছিলুম, বললুম, বেশ।

বাবার সে বন্ধুটির নাম বিশুবাবু। বিশুবাবু লোকটি ভারী অদ্ভুত ধরনের। আর্যামির গর্বে তিনি এমনই আত্মহারা যে, পৃথিবীর অপর সমস্ত জাতকে কুকুর-বিড়ালের সামিল বলেই তিনি মনে করতেন।

বাবার সঙ্গে তাঁর তর্ক চলতো। বাবা যখন সাংসারিক সচ্ছলতা বা নানাবিধ আধিভৌতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা পাড়তেন, তখন বিশুবাবুর তর্কে আধ্যাত্মিক আগুন এমনি তীব্র তেজে জ্বলে উঠত যে, তাঁর দিকে বেশি এগিয়ে যাওয়া যে কোনো বুদ্ধিমান লোকের পক্ষে শ্রেয়ষ্কর ছিল না। কারণ বিশুবাবুর তর্কে আগুন যতখানি জ্বলত, গালাগালের ধোঁয়া তার চেয়ে ঢের বেশি উঠত। সে ধোঁয়ায় তাঁর প্রতিপক্ষের চোখে জল বার করিয়ে তবে তিনি স্থির হতেন। আমি এক-আধদিন আড়াল থেকে তাঁর তর্ক-যুক্তি শুনতুম—কিন্তু কোনো দিন সে তর্কে আঘাত দিতে আমার প্রবৃত্তি হয়নি। বিশুবাবুর যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি খাড়া করতে মন আমার অশ্রদ্ধায় ভরে উঠত।

এই তর্কে এক-আধদিন আবার বিশুবাবুর ভাগ্নে তিনকড়ি খুব মৃদু-মন্দ ছন্দে সুর মেলাতো। তবে তিনকড়ির বয়স ছিল কাঁচা, কাজেই আর্যবংশাবতংস এমন মাতুলের যুক্তিধারা সে বেচারা তেমন পরমানন্দে পান করতে পারত না। ফলে অনেক সময়েই ঘটত এই যে, তর্কের গোড়ায় মাতুলকে অনুসরণ করতে গিয়ে শেষ বরাবর তিনকড়ি বাবার যুক্তির স্রোতে ভেসে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে এসেই থই নিতো। তার সে আচরণ দেখে মাতুলের অবস্থা বাতুলের মতো হয়ে উঠত। আমি নেপথ্যে বসে এদের কাণ্ড দেখে হেসে সারা হতুম।

একদিন এই তর্কের মুখে ভাগ্নের উপর চটে মাতুল বিশ্বনাথ বলে উঠলেন, তোমার মাথায় যদি এমন সব ম্লেচ্ছ ভাব তাল পাকাতে থাকে, তাহলে তোমায় আমার কাছে বাস করতে দেওয়া তো নিরাপদ নয়।

এই আকস্মিক রসভঙ্গে তিনকড়ি একেবারে অবাক হয়ে গেল। বাবা কোনোমতে গোল থামিয়ে সেদিন মাতুল-ভাগিনেয়ের সম্পর্কের বাঁধনটুকু অটুট রাখলেন।

এরপর কথায় কথায় বাবা একদিন বললেন, বুঝলি নীরু, এই বিশুটা পাগল। এদিকে তো আমাদের চালচলন পছন্দ হয় না—তবু বলে কি জানিস—বলে, ওই তিনকড়ির সঙ্গে যদি তোমার মেয়েটির বিয়ে দাও তাহলে আমি নিশ্চিন্ত হই। তিনকড়িরও একটা হিল্লে হয়, তাছাড়া—

আমার কান দুটো গরম হয়ে উঠল। কী আশ্চর্য আজগুবি সাধ! স্পর্ধাও কম নয়! চোখে কঠিন দৃষ্টি নিয়ে বাবার পানে চাইলুম।

বাবা আমার ভাব বুঝতে পেরে ঘাড় নেড়ে বললেন, তা হয় না। তবে এটুকু বুঝেছি, তিনকড়িকে বাড়িতে রাখতে বিশুর আর তেমন ইচ্ছা নেই। ছেলেটির লেখাপড়ার দিকে চাড় আছে—বিশু বলে, যা হোক কোনো উপায় করতে লেগে যা।

বাবা যেন বাতাসকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলে গেলেন। আমিও তাতে কোনওরকম সায় বা সাড়া দেওয়া প্রয়োজন মনে করলুম না।

তিনকড়ির দোষ এমন কিছু দেখি না। লোকটা নেহাৎ মন্দ নয়। বাহিরের চেহারা প্রভৃতি ভদ্র সমাজে চলবার মতো—কিন্তু বড়ো গরিব সে। যাক, কাজ কি আমার মিছে তিনকড়ির কথা ভেবে।

এরপর একদিন মজার ঘটনা ঘটল।

চৈত্র মাস। আকাশে সেদিন দুপুর থেকেই মেঘের একটু সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল। আমি তা গ্রাহ্য না করে চিরপ্রথামতো বেড়াতে বেরুলুম।

কাশীতে স্ত্রীজাতির মস্ত একটা স্বাধীনতা আছে—এ জন্য হে তীর্থ, নমো নমো! তোমার কল্যাণে বাঙালির মেয়ে এখানে তবু গায়ে একটু হাওয়া লাগিয়ে তাদের নারীজন্ম কতক সার্থক করতে পায়।

সেদিন বরাবর গঙ্গার ধার দিয়ে চলে অনেকগুলো গলি-ঘুঁজি পার হয়ে বেণীমাধবের ধ্বজায় এসে উঠলুম। তখন জোর বাতাস বইতে শুরু হয়েছে। ধ্বজার উপর থেকে ওপারে রামনগরের পানে চেয়ে দেখলুম। রামনগর থেকে অসি অবধি গঙ্গার উপর দিয়ে এপার-ওপার জুড়ে কে যেন মস্ত একটা স্বচ্ছ বালির দেওয়াল তুলে দিয়েছে। আমার হাতে একখানা রুমাল ছিল—দমকা বাতাসে সেখানা উড়ে চকিতে কোথায় চলে গেল, বুঝতেও পারলুম না। হু হু করে বাতাসের বেগ বাড়তে লাগল। তখন ভাবলুম, না, বাড়ি যাই। বেণীমাধব থেকে নেমে আবার গলি ভেঙে একেবারে দশাশ্বমেধের কাছে এসে পৌঁছুলুম। মাথার উপর আকাশ তখন বেশ কালো হয়ে উঠেছে। দিগবিদিক কাঁপিয়ে কী রকম একটা সোঁ সোঁ আওয়াজ হচ্ছে। ঠান্ডা জলো হাওয়ায় ওপার থেকে অদ্ভুত রকমের একটা বুনো গন্ধ ভেসে আসছে। আমি বাড়ির দিকে চলতে লাগলুম। পথে না আছে একখানা এক্কা, না গাড়ি। খানিক আসতে বৃষ্টির বড়ো-বড়ো ফোঁটা ঝরতে শুরু হল। গায়ে যেন হাজার তীর ফুটছিল। আমি আরও জোরে চলতে লাগলুম। বৃষ্টির বেগও আরও বেড়ে উঠল। আমার গা ছমছম করতে লাগল। এমন সময় পিছন থেকে কে বললে, এই বৃষ্টিতে আপনি পথে বেরিয়েছেন?

পা কেমন থমকে পড়ল। এই সময় আবার বিদ্যুৎ চমকে গেল। পিছনে চেয়ে দেখি তিনকড়ি, মাথায় তার ছাতা।

কোনো জবাব দিলুম না। দরকার ছিল না। তিনকড়ি বললে, এই বৃষ্টি-ঝড়ে আর এগুবেন না। ওই টিনের ছাদটার নিচে দাঁড়াবেন চলুন। জলের বেগ কমলে আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।

তবুও কোনো কথা বললুম না। তিনকড়ি ছাতাটা এগিয়ে এনে আমার মাথায় ধরলো। অমন ভীষণ মুহূর্তেও আমার হাসি পেল। কী নির্লজ্জ রূপ-যৌবন-লোলুপ পুরুষের যেচে এই সেবা দেবার প্রয়াস। অভদ্র দাসত্বপনা! কেউ তো তার এ সেবা চায় না। হায়রে! এই পুরুষই আবার শাস্ত্র লিখে স্ত্রীজাতির উপর প্রভুত্ব খাটাতে চায়। জেনো তোমরা নিতান্ত দুর্বল দয়ার পাত্র বলেই স্ত্রীজাতি তোমাদের এইসব পুঁথির বুলির বিরুদ্ধে কোনোদিন কোনো কথাটি কয় না—ঘাড় পেতে সমস্ত সহ্য করে যায়। একবার যদি তারা এর বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়, তাহলে তাদের চোখের একটা বক্র ইঙ্গিতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তোমাদের ওই বহুমূল্য শাস্ত্র আর স্বার্থ-পঙ্কিল প্রাণ।

হঠাৎ একটা খেয়াল হল। সামনেই দেখি এক বড়ো গাছের নীচে খুঁটির উপর টিনের ছাদ-দেওয়া একটুখানি ছোট্টো আস্তানা। বোধহয় কোনো সন্ন্যাসী কোনো যোগের সুযোগে ছাউনি ফেলেছিলেন—এখন তাঁর সেই পরিত্যক্ত আস্তানাটুকু ভক্তের স্বর্গে যাবার সোপান হয়ে পড়ে আছে। আমি সেই টিনের ছাদ দেওয়া ছাউনিতে এসে দাঁড়ালুম। যতখানি পারে তিনকড়ি আমায় বৃষ্টির জল আর ঝড়ের দাপট থেকে রক্ষা করবার চেষ্টায় ছাতা ঘিরে আড়াল তুলে দাঁড়াল। ঝড়ের তখন কী সে প্রচণ্ড বেগ—বৃষ্টিরও কী জোর! মাথার উপর টিনের ছাদ হঠাৎ এক সময় তার খুঁটির মায়া ত্যাগ করে ভূমিসাৎ হল। আমায় রক্ষা করতে গিয়ে তিনকড়ি তার দুই হাত তুলে টিনখানা ধরে ফেলল। তার জামা ছিঁড়ে হাত কেটে রক্ত পড়তে লাগল—তিনকড়ি শেষে টিনের ভার রাখতে না পেরে পিছলে পড়ে গেল।

ভালো গ্রহ। তাড়াতাড়ি আমি টিনখানা সরিয়ে তিনকড়ির হাত ধরে তাকে ওঠালুম। হাতে তার বেশ জখম। রক্ত পড়ছে। আমি তাড়াতাড়ি আমার বৃষ্টিতে ভেজা আঁচল ছিঁড়ে তার হাতে বেশ করে পটি জড়িয়ে দিলুম। তিনকড়ি ধুঁকছিল।

আমি বললুম, আর এখানে নয়। চলুন, আমাদের বাড়ি চলুন। পথে আরো ঢের বিপদ ঘটতে পারে। দেখুন দিকি আমার জন্য নিজেকে একেবারে এতোখানি ক্ষতবিক্ষত করে ফেললেন।

তিনকড়ি আমার পানে চাইল—বড়ো করুণ সে দৃষ্টি! সে দৃষ্টির অর্থ যে না বুঝলুম, তা নয়। সে দৃষ্টি আমার মনের মধ্যে এক দুর্দমনীয় বিজয় স্পৃহা জাগিয়ে তুললে। একটু কৌতুক করবার ইচ্ছে হল। দৃষ্টিতে করুণা মাখিয়ে তিনকড়ির পানে চেয়ে দেখলুম। একে মেঘের এই চপল লীলা, তার উপর এ কৌতুক। সে এক মারাত্মক ব্যাপার।

তিনকড়ি বোধহয় আমার চোখে সে সময় এমন কিছু দেখেছিল, যাতে তার সমস্ত সংকোচ চট করে কেটে গেল। সে একেবারে বলে উঠল, আপনার যে গায়ে এতোটুকু আঁচ লাগেনি, এতেই আমি কৃতার্থ। এর জন্য আমার প্রাণটা গেলেও—তিনকড়ির কথাটা আর শেষ হল না। আদরের প্রত্যাশায় পোষা কুকুর যেমন আকুল চোখে প্রভুর পানে চায়, তেমনি দৃষ্টিতে তিনকড়ি আমার মুখের পানে চেয়ে রইল।

আমি খুব উচ্চ হাস্য করে বললুম, বটে—কেন বলুন দেখি!

তিনকড়ির হাতের পটিটা তখন আমি চেপে-চেপে আর-একবার ভালো করে জড়িয়ে দিচ্ছিলুম। হঠাৎ সে আমার হাতখানা ধরে ফেলে বললে, আমি আপনাকে ভালোবাসি, বড়ো ভালোবাসি। জানি পাবার নয়, তবু আমার মনকে কিছুতে আমি ফেরাতে পারি না।

তাড়াতাড়ি আমি হাত টেনে নিয়ে সরে এসে বললুম, বৃষ্টি একটু নরম পড়েছে। চলুন বাড়ি যাই।

বলেই তাকে আর দ্বিতীয় কথাটি কইবার অবকাশমাত্র না দিয়ে রাস্তায় নেমে চলতে শুরু করলুম। তিনকড়িও আমার পাছু-পাছু আসতে লাগল।

বাড়ি ফিরে চা খেয়ে গরম কাপড়-চোপড় পরে বিছানায় এসে বসলুম। ধবধব করছে নরম বিছানা। সামনে টেবিলে বাতি জ্বলছিল। সেই বাতির আলোয় হঠাৎ আমার কেমন মনে হল, আজ আমার মতো সুখী কে! আমি মুক্ত, আমি স্বাধীন। এমন ঐশ্বর্য আমার, এমন বয়স, এমন রূপ। মানুষ এর বেশি কিছুই আর কামনা করতে পারে না। ইহলোকে মানুষের কামনা করবার মতো বস্তুই বা আর কি থাকতে পারে? কিছু না। তিনকড়ির কথা মনে পড়ল। মাতুলের ভিক্ষা-অন্নে লালিত, নিতান্তই সে কৃপার পাত্র! নিজের মাথা গোঁজবার আশ্রয় নেই। আজ ওই মামা বিশ্বনাথ যদি তাকে পথে বার করে দেয়, আজ, এই রাত্রে—এই ঝড়বৃষ্টির পরে বাহিরের পথঘাট যখন অত্যন্ত কদর্য বিশ্রী হয়ে আছে—তাহলে এই কদর্য পথে-ঘাটেই তাকে বেরিয়ে পড়তে হবে।

সামনে প্রকাণ্ড আয়না ছিল—তার পানে চেয়ে দেখলুম। হেসে চেঁচিয়ে আপনাকে আপনি বলে উঠলুম, এ মূর্তি দেখে কে চুপ করে থাকতে পারে? বেচারা, বেচারা তিনকড়ি!

মন যখন এমনি গর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সেই সময় কে যেন তার চুলের মুঠি ধরে বলে উঠল—এই তো রূপ আর তরুণ বয়স নিয়ে বসে আছিস—কে এলো রে তোর কুঞ্জদ্বারে, কে তার স্তুতিগান শোনাতে এল। আর এই তিনকড়ি, এ মানুষ!

মন আবার চোখ রাঙিয়ে উঠল, বললে, কী! আমি রাজার মেয়ে আর ওই তিনকড়ি পথের ভিখিরি। সে আমায় পুজো করতে পারে, কিন্তু—

ভাবনার আর অন্ত রইলো না। হু হু করে যা-তা ভাবনা এসে মনটাকে তোলপাড় করে দিলে।

কিসেরই যে ছাইপাঁশ ভাবনা। হাসি পেলো। আমি শুয়ে পড়লুম। রাত্রে ঘুমের ঘোরে কিন্তু সেই এক সুর কানের কাছে বাজতে লাগল, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ওগো বড়ো ভালোবাসি।

সকালে উঠে মনটা প্রথম কেমন আচ্ছন্ন বোধ হল। জোর করে চাবুক মেরে তাকে সিধে করলুম। তারপর কারা দু-দলে মিলে মনের মধ্যে এক বিষম লড়াই বাধিয়ে দিলে। অস্থির হয়ে বললুম, না, না, না।

বাবাকে বললুম, কলকাতা যাই চলো, বাবা এখানে আর ভালো লাগছে না।

বাবা বললেন, কিন্তু একটা কথা আছে মা।—

আমি বাবার মুখের পানে চাইলুম।

বাবা বললেন, এই তিনকড়ি বেচারা! ও আমায় বড্ডো ধরেছে। লেখাপড়া শিখে ও মানুষ হতে চায়, কিন্তু অর্থপিশাচ মামা তার জন্য আর একটা কানাকড়িও খরচ করতে রাজী নয়। সে বলে, কাশী হেন স্থান, যাত্রী ধরে পেট চালা। তিনকড়ি তাতে রাজী নয়। সে বলে, তার মার যা গহনাপত্র ছিল, সেগুলো দাও, তা বিক্রি করে সে লেখাপড়া শিখবে। মামা হাঁকিয়ে দিয়েছে, বলে, গহনা আবার কি! তাই বেচারা আমায় এসে ধরেছে। কি বলিস মা?

আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল। আবার সেই তিনকড়ি। যার জন্য মনের সঙ্গে অহরহ এই যুদ্ধ চলছে—যার কাছ থেকে দূরে যেতে চাই, এমনি করে ভূতের মতো সে সঙ্গ নেবে। না, কখনো না। কে তিনকড়ি—সে আমার কে যে তার জন্য এতো মাথাব্যথা। না, সে কেউ নয়, কেউ নয়। হতভাগা বেচারা, পথের এক সামান্য পথিক সে।

বাবা আবার বললেন, তাহলে কি বলিস মা?

আমি বললুম, তাকে তুমি সঙ্গে রাখতে চাও নাকি?

বাবা বললেন, তুই যা বলিস তাই করি—

ইচ্ছা হলো বাবাকে বলি, আর ফ্যাসাদ জড়িয়ো না বাবা। কিন্তু গলাটা কে যেন চেপে ধরলে। একটা ঢোঁক গিলে বললুম, বেশ, কিন্তু আমাদের একসঙ্গে থাকা হবে না, তা বলে রাখছি। কোথাকার কে, কেমন লোক—

বাবা বললেন, লোক বোধহয় মন্দ হবে না। ছেলে ভালো, তার মামার মতো নয়। তবে হ্যাঁ, এক বাড়িতে থাকা হয় না—কেননা আমি আজ কোথায় থাকি, কাল কোথায় যাই, ঠিক নেই—তার চেয়ে ওকে মাসে-মাসে বরং কিছু করে দেব, ও কলকাতায় গিয়ে মেসে থেকে পড়ুক। কেমন?

আমি বললুম, বেশ—তাহলে ওকে কালই কলকাতায় পাঠাও, আমরা এদিকে আরও ক-দিন মুঙ্গের-টুঙ্গের ঘুরে তারপর কলকাতায় যাবো খন।

কোথায় যেন আমার বাধছিল। গা ছমছম করছিল। তিনকড়ির সঙ্গে আর না দেখা হয়। একটু ভয়ও হচ্ছিল। কিন্তু না, কিসের ভয়?—আমি রাজার মেয়ে, তার উপর এই রূপ, এই বয়স! কোথাকার কে তিনকড়ি এসে কানের কাছে এক আবদারের সুর তুলবে, আর অমনি আমি—না, না, কখনো না!

তারপর সেই বছর মাঘ মাসেই আমার প্রাণে বসন্ত জেগে উঠল। আমরা তখন কলকাতার বাড়িতে। অজস্র ফুলের গন্ধে, পাখির গানে আমার প্রাণটাকে ভরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত সমারোহ করে আমার হৃদয়-রাজ্যেশ্বর একদিন সন্ধ্যায় এসে উপস্থিত হলেন। মাগন্দীর রায়বাবুদের বংশ-তিলক এক তরুণ যুবার হাতে বাবা আনন্দাশ্রু চোখে আমায় সমর্পণ করলেন। সে রাত্রির সেই আলো, গান-বাজনা আর ফুলের গন্ধে আমার প্রাণ-মন অসহ্য সুখের সম্ভাবনায় বিভোর হয়ে উঠল। সেই আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত হাতের উপর হাত রেখে আমার মনে হল, মস্ত একজন সহায় পেলুম, বন্ধু পেলুম, স্বামী, স্বামী, স্বামী। মনে মনে আমার চিরজীবনের সুখ-দু:খ এই হাতেই অসীম নির্ভয়ে সমর্পণ করে আমার প্রাণ কৃতার্থ হল। বিচিত্র আবেশ এক অপূর্ব মায়াকুঞ্জ আমার চোখের সামনে ধরে দিলে, প্রাণের-মাঝে বহুদিনকার সাধ-আশা ফুলের মতো অজস্রভাবে অপরূপ শোভায় ফুটে উঠল।

কিন্তু হায়রে, সে কতক্ষণের জন্য!

ফুলশয্যার রাত্রে ফুলের গহনা পরে মনের মধ্যে প্রেমের মণিদীপ জ্বেলে ফুলের বাগান সাজিয়ে বসেছিলুম—এইবার আমার প্রিয়তমকে প্রাণভরে একান্তে দেখবার সুযোগ পাব। অস্থির পুলকে ক্ষণে ক্ষণে আমার রোমাঞ্চ হচ্ছিল—এমন সময় আমার স্বামী দেবতা দেখা দিলেন। হায়, ফুলের মুকুট মাথায় দিয়ে নয়, শান্তি, আরাম, আশ্বাসভরা প্রেমের ডালি হাতে নিয়ে নয়—চোখ তাঁর জবাফুলের মতো লাল, পা টলমল করছে, মুখে বিশ্রী গন্ধ, মদ খেয়ে মাতাল। নিমেষে যেন কোথা থেকে এক ভীষণ ঝড় উঠল—তার দাপটে আমার প্রাণের মধ্যে সে দীপের আলো নিভে গেল—অত সাধের ফুলের রাশ ছিঁড়ে কোথায় ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। সুন্দর মায়াকুঞ্জ চোখের পলকে শ্মশানের মতো বীভৎস হয়ে উঠল। অসহ্য জ্বালা সারা দেহ-মনটাকে একেবারে তাতিয়ে তুললে। ঘৃণায় আমি সে ফুলের গহনা ছিঁড়ে ফেললুম, মাথাটা দপদপ করে উঠল। একেবারে খড়খড়ির ধারে এসে দাঁড়ালুম। খড়খড়ি বন্ধ ছিল, জোরে খুলে ফেললুম। বাহিরের ঠান্ডা হাওয়ায় কে যেন অনেকখানি জ্বালা জুড়িয়ে দিলে। দূর হতে কার বাঁশিতে সাহানার সুর ভেসে আসছিল, আকাশে একরাশ নক্ষত্র—মনে হলো, সবাই হাসছে, সবার মুখে তীব্র বিদ্রূপ। ভাবলুম, আজ যদি আমার এই তপ্ত প্রাণের তীক্ষ্ণ জ্বালায় সমস্ত আকাশ-বাতাস জ্বালিয়ে দিতে পারতুম, পৃথিবীটা পুড়ে ছাই হতো।

দেবতা এসে হঠাৎ আমার আঁচল টেনে জড়ানো গলায় ডাকলেন, প্রাণেশ্বরী—

এক ঝটকায় আঁচল টেনে নিয়ে সরে দাঁড়ালুম। মাতাল অবাক হয়ে চেয়ে রইল—খানিক পরে বললে, বেশ বাবা!

আমার স্বামী-সম্ভাষণ এই প্রথম, এই শেষ!

রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলছিল। বাড়ি এসে বাবাকে বললুম, আমি আর কোথাও যাবো না বাবা। যদি আর আমায় সেখানে পাঠাও, আমি আত্মহত্যা করবো।

বাবা আমার মুখের পানে চাইলেন। আমার মনের মধ্যে তখন এমন আগুন জ্বলছিল যে তার ঝাঁজ অবধি আমার চোখ-মুখ দিয়ে ফুটে বেরুচ্ছিল। আমি বললুম, এক পাষণ্ড মাতাল—

কেঁদে ফেললুম। বাবারও চোখে জল এলো। তাড়াতাড়ি আমাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। বাবারও মুখে একটি কথা ফুটল না।

তারপর আবার সেই পুরনো জীবনধারায় গা ঢেলে দিলুম। বাপে-মেয়েতে নানান দেশে লক্ষ্যহীন গতিতে আবার সেই ভেসে বেড়ানো।

দেবতার কাছ থেকে এত্তেলা এল, পাঠাও।

বাবা জবাব দিলেন, না।

তাঁরা চোখ রাঙালেন, ছেলের আবার বিয়ে দেব।

বাবা লিখলেন, তোমাদের মর্জি হয় দাও গে।

তাঁরা আবার শাসালেন, আদালত আছে।

বাবা লিখলেন, কেউ পায়ে দড়ি বেঁধে রাখেনি, স্বচ্ছন্দে সেখানে যেতে পারো।

তারপর সব চুপচাপ।

কিন্তু এই নানান দেশে ঘুরে বেড়িয়ে, নর-নারীর এই বিপুল মেলায়—তাদের সুখের ঢেউ মাঝে মাঝে আমার মনটাকে ছুঁয়ে এক বিষম দোল দিয়ে যেতো। পাখির গান, ফুলের গন্ধ, এসব তেমনি আছে—তবে আমার প্রাণে তারা আর কোনো সাড়া জাগায় না। বসন্ত তেমনি আসে, চাঁদ তেমনি আলোর ঢেউ তুলে নেচে চলে যায়, কিন্তু সব নির্জীব, সব জড়। কুয়াশায় আগাগোড়া কে যেন তাদের সে প্রাণটুকু ঢেকে দিয়েছে। এক-একবার সে কবেকার ঝড়ের রাত্রির কথা মনে পড়ত। সেই বেচারা তিনকড়ি, আর তার সেই ব্যাকুল বেদনাভরা আবেদন। সে যে একটা স্বপ্ন! মনকে চাবকে বললুম, খবরদার! তোর আপন তেজে তোকে দাঁড়িয়ে থাকতেই হবে। মাথা হেঁট করা কিছুতেই চলবে না তোর। ভেঙে যাস যদি যা—কিন্তু মচকে পড়িস নে...

এমনি বিপুল দ্বন্দ্বে মনকে নিয়ে যখন অস্থির, তখন কোথা থেকে বুকে বাজ পড়ল। বাবা হঠাৎ একদিন কোন অদৃশ্যলোকে চলে গেলেন। এ বিপুল জগতে আমি আজ একা।

জোর করে বললুম, না, কিসের ভয়! আমার অগাধ ঐশ্বর্য—রাজার ঐশ্বর্য।

দু-দিন পরে আবার এক খবর এলো। আমার স্বামীদেবতা এক গণিকার গৃহে মজলিশ করছিলেন—শেষে একসময়ে মদের নেশায় ভালোবাসার সীমা দেখাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে প্রাণ দিয়েছেন। মস্ত একখানা ভারী পাথর বুক থেকে সরে গেল। বা:! আমার সব বন্ধন আজ কেটে গেছে—আমি আজ সম্পূর্ণ স্বাধীন, মুক্ত। চমৎকার!

শ্রান্ত মন নিয়ে বারো বৎসর নানা দেশ ঘুরে আবার একদিন বাড়ি ফিরলুম। রাজ্যেশ্বরী রাজ্য-পালনে মন দিলুম। খাতাপত্র থেকে মহাল পর্যন্ত নিজে দেখে তদবির করতে লাগলুম। এক-এক সময় চোখের সামনে পড়তো, গরিবের সংসার, চাষার সংসার। স্বামী খেতে খেটে সারা হচ্ছে, মাথায় প্রচণ্ড সূর্য আগুন ছড়াচ্ছে, সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপও নেই, শুধু খাটছে, খাটছে, খাটছে! তার স্ত্রী ছোটো ছেলে কাঁকালে করে থালায় ভাত বেড়ে স্বামীকে খাওয়াতে এল। দুজনে গাছের ছায়ায় বসে ছোট্ট ছেলেটিকে একটু নাড়াচাড়া করলে—তারপর স্ত্রী হেসে ছেলে-কোলে বাড়ি ফিরে গেল, স্বামী খেতে খাটতে লাগল। কোথাও বা স্বামী কাজে বেরুচ্ছে, আর তার স্ত্রী লোকচক্ষু বাঁচিয়ে ছাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে ম্লান হাসি হেসে তাকে বিদায় দিচ্ছে। অনাদিকালের সংসার তার সরল ধারাতে বয়ে চলেছে।

দেখে মন আমার হু হু করে উঠত।

আবার এক চৈত্র মাস। আকাশে বৃষ্টি-বাতাসের ভীষণ যুদ্ধ। ঘরের জানলা বন্ধ করে বিছানায় শুয়েছিলুম—মনের মধ্যে আলো-আঁধারের খেলা চলছিল।

বৃদ্ধ নায়েবমশায় এসে বললেন, উকিলবাবু এসেছেন।

আমি বললুম, কেন?

তিনি বললেন, বাহার গাঁয়ের প্রজারা খাজনা বন্ধ করেছিল—কাল তাদের নামে নালিশ রুজু না করলে সব তামাদি হয়ে যাবে। তাই আর্জি তৈরি করে আপনাকে তা বুঝিয়ে আপনার সই নিতে নিজেই তিনি এসেছেন।

আমি বললুম, তাঁকে এখানে নিয়ে এসো।

নায়েব দ্বিরুক্তি না করে চলে গেলেন।

উকিল আমাদের সেই তিনকড়ি। বাবার কৃপার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার সে করেছিল। আজ পাঁচ বৎসর উকিল হয়ে আমাদের এস্টেটের সমস্ত কাজকর্ম সে-ই দেখছে।

উঠে একটা ইজিচেয়ারে আমি বসলুম। উকিল তিনকড়ি ঘরে এসে দাঁড়াল। নিস্ফলতার তীব্র রোষে মন আমাদের মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠলো। তারপর হাসিমুখে সহজ সুরেই বললুম, কি চাই? অত্যন্ত বিনীত স্বরে তিনকড়ি বললে, এই আর্জিগুলো এনেছি—পড়ে সই করতে হবে।

আমি বললুম, পড়ো।

তিনকড়ি পড়তে লাগল। আমার কানে তার কিছু গেল না। শুধু জাগছিল এক বিষম ঝড়ের হু হু গর্জন। আর তারই ফাঁকে-ফাঁকে ভেসে আসছিল অত্যন্ত কোমল সুরে এক করুণ আবেদন, ভালোবাসি, আমি ভালোবাসি, আমি ভালোবাসি। কলের মতোই কতকগুলো সই করলুম। নায়েবমশায় আর্জিগুলো হাতে নিয়ে বললেন—আমি তাহলে তফসিলগুলো ঠিক করে রাখিগে।

নায়েবমশায় চলে গেলেন।

তিনকড়ি চলে যাচ্ছিল। আমি বললুম, দাঁড়াও।

তিনকড়ি দাঁড়াল। ঘরে আর কেউ নেই, শুধু তিনকড়ি আর আমি। বুক আমার দুরদুর করে উঠল! আমি বললুম, আর কোনো কথা নেই তোমার?

না।

নিজের...কোনো কথা নয়?

তিনকড়ি চুপ করে রইল। আমি বললুম, এই রাত্রে নিজে তুমি কষ্ট করে এসেছো। এই জল-ঝড়—কোনও কথা নেই?

একটা নিশ্বাস কিছুতেই চেপে রাখতে পারলুম না। তিনকড়ি তখনও দাঁড়িয়ে নির্বাক—মুখ তার মাটির পানে। খুব সাবধানে ছোট একটা নিশ্বাস চেপে আমি বললুম, বাড়ির সব খবর ভালো? বৌ ভালো আছে?

হ্যাঁ।

যাও।

তিনকড়ি চলে গেল। এই সেই তিনকড়ি। একটা কদর্য মাংসপিণ্ড—বিয়ে করে পরম সুখে নিশ্চিন্ত মনে সংসার-যাত্রা নির্বাহ করছে।

আর আমি! শুধু সেই কবেকার এক ঝড়কে বুকের মধ্যে পুষে রেখেছি।

হা রে হতভাগিনী, আজ কোথায় তোর সে তেজ, সে গর্ব! বাতিটা নিবিয়ে বালিশে মুখে গুঁজে বিছানায় শুয়ে পড়লুম। চোখের জল আর কোনোমতেই চেপে রাখতে পারলুম না।

বাড়ির দোর-জানলাগুলোকে কাঁপিয়ে বাহিরে উদ্দাম ঝড় হা-হা করে গর্জে ফিরতে লাগল।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%