রুদ্রের আবির্ভাব

সমরেশ মজুমদার

বিবাহের পর ব্যোমকেশ কয়দিন হইতে আমার কাছে একটা চাকুরির জন্য ঘুরিতেছে। বলিলাম,—এখানে আমি চাকরি পাবো কোথায়? তবে কলকাতায় যেতে চাও তো মামার কাছে লিখে দিতে পারি।

বড়বাজারে পিপুলের দোকান করিয়া মামা বিস্তর পয়সা করিয়াছেন। তাঁহাকে লিখিয়া দিলাম। উত্তরে তিনি লিখিলেন : পরের জন্য মাথা না ঘামাইয়া নিজেই সোজা চলিয়া এস। গ্রামে বসিয়া কী কেবল পচিয়া মরিতেছ? চাকরি করিতে চাও তো একটা বন্দোবস্ত অনায়াসেই করিয়া দিতে পারিব। লোক আমারও চাই বটে, কিন্তু অনাত্মীয় অপরিচিতকে আমার একেবারেই ভরসা হয় না। কি করিব, ব্যবসা করিতেছি। কতো লিখিব, নিজে তুমি একবার আসিতে পারো না?

মামার চিঠি পাইয়া মনে মনে হাসিলাম। গ্রামে বসিয়া পচিয়া মরিতেছি বটে !

ব্যোমকেশকে বলিলাম—চাকরি করে কী হবে? তোমাকে কিছু জমি ছেড়ে দিচ্ছি, চাষ করো! খাজনা বাবদ কিছু চাই না, ফসল হলে কিছু ভাগ দিয়ো না-হয়। কেমন, রাজি?

ব্যোমকেশ লাফাইয়া উঠিল। গরুলাঙল কিনিবার পয়সা নাই, আমিই ধার দিলাম। কিছু মহৎ কীর্তি অর্জন করিতেছি এমনিভাবে কহিলাম,—জমিতে সুবিধে না করতে পারো তো এই ধার তোমার শোধ করতে হবে না।

মহাসমারোহে ব্যোমকেশ লাঙল ঠেলিতে লাগিল। জাঁকালো ভাষায় খবরের কাগজে এক রিপোর্ট পাঠাইয়া দিলাম। বি-এ পাশকরা ছেলে চাকুরির খোঁজে ফ্যা-ফ্যা না করিয়া নিজ হাতে জমি চষিতেছে—বড়-বড় হেডলাইনে খবরটা দিগ্বিদিকে রাষ্ট্র হইয়া গেল। ব্যোমকেশ ভাবিল, কী যেন একটা করিতেছি! আমি ভাবিলাম, মামার উপর খুব একটা প্রতিশোধ নেওয়া হইল যা হোক।

বাসন্তী প্রথমে এখানে আসিতে রাজি হয় নাই। কিন্তু চারিদিকের খোলা মাঠ, দূরে নদী ও নতুন ছবির মতো ঝকঝকে বাড়িখানি দেখিয়া সে অবাক হইয়া গেল। ছেলেবেলা হইতে শহরে মানুষ হইয়াছে, গ্রামের কথা শুনিতেই তাহার মনে গরুর গাড়ির চাকার একঘেয়ে করুণ আর্তনাদের মতো একটা ক্লান্তিকর অবসাদ আসিত। কিন্তু অপর্যাপ্ত বাতাসে আঁচল ফুলাইয়া নদীর পাড়ে যখন সে আসিয়া দাঁড়াইল, তখন স্পষ্ট অনুভব করিলাম তাহার চোখের দৃষ্টি আরো কালো ও গভীর এবং শরীরের শহুরে রুক্ষশ্রী সবুজ ও ঠান্ডা হইয়া উঠিয়াছে। এতো বড়ো সাম্রাজ্যে তার কর্ত্রীত্ব অসীম : তাহার মুখের একটি কথায় জনমজুর একশোখানা কাজ নিমেষে সমাধা করিয়া আনে। দেখিতে-দেখিতে তাহার হুকুমে সামনের জমিটা ফুলন্ত বাগান হইয়া উঠিল; দুইটি শিশু গাছ যেখানে ঘেঁসাঘেঁসি হইয়া ছায়া করিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার নিচে বাঁশের একটি মাচা বাঁধা হইল—সেখানে সকাল বেলা সে পড়িবে ও বিকেলে বেড়াইয়া আসিয়া বিশ্রাম করিবে। বেড়ার গা বাহিয়া মালতীর লতা উঠিল, লোক লাগাইয়া আগাছা দূর করিয়া ছোট উঠানটি সে তাহার পায়ের তলার মতো নরম তকতকে করিয়া তুলিল। দিল্লির দেওয়ানি-খাস এর সিলিঙের মতো বাসন্তীও এইখানে ফুলের অক্ষরে লিখিয়া দিল যে, স্বর্গ বলিয়া যদি কিছু থাকে তো এইখানে, এইখানে!

বিবাহের দান-সামগ্রীর যাবতীয় জিনিস আসিয়া পৌঁছিল—দক্ষিণের ঘরটাকে ছোটখাটো একটা ড্রয়িং-রুম বানাইয়া ফেলিলাম। বন্ধু-বান্ধবের বালাই নাই, আমরাই পরস্পরের নির্জনতা কথায় ও স্পর্শে, হাসিতে ও দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ করিয়া তুলিয়াছি। বাসন্তী যখন একা ঘরে বসিয়া রান্না করে ও আমি যখন একা ঘরে বসিয়া গল্প লিখি, তখনো আমরা নির্জন নই—যখন কিছু নেহাত করি না, তখনো আকাশ ও আলো, তারা ও অন্ধকার মিলিয়া আমাদের পারিপার্শ্বের শূন্যতাকে স্বপ্নের মতো আচ্ছন্ন করিয়া রাখে।

মা মারা যাইবার পর বাবা একা-একা এইখানে বসিয়া বিস্তৃত আকাশের সঙ্গে অপরিসীম বিরহ ভোগ করিতেছিলেন। আমি তখন কলিকাতায় মেসে থাকিয়া কলেজে পড়িতেছি ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের যুবকের মতো কলেজ ঠিক না পালাইলেও শনিবার-শনিবার শ্বশুরালয়ে নিয়মিত আতিথ্য নিতেছি। এবং আশ্চর্য এই, গল্পে-গুজবে খাওয়া-দাওয়ার অসাবধানে রাত্রি যখন বেশি করিয়া ফেলিতাম ও জোরে ঘণ্টা বাজাইয়া লাস্ট ট্রামকে যখন অনায়াসে চলিয়া যাইতে দিতাম, তখন চট করিয়া মনে পড়িয়া যাইত যে আজ রাত্রে মেসে যাইবার কোনও পথ-ই আর খোলা রাখি নাই। এবং শনিবারের রাতটাই যখন যাই-কি-না-যাই এমনি মিথ্যা উত্তেজনার মধ্য দিয়া কাটাইয়া দিলাম, তখন নিশ্চিন্ত হইয়া রবিবারের রাতটাই বা ঘুমাইয়া লইতে কী হইয়াছে। এমনি এক সোমবার ভোরে অনিদ্রাক্লিষ্ট চক্ষু লইয়া মেসে ফিরিয়া আসিয়া দেখি আমার নামে একটা টেলিগ্রাম কখন হইতে পড়িয়া আছে। খবর আর কিছু নয়, বাবা সন্ন্যাস রোগে মারা গিয়াছেন।

সে সব অনেক কথা। শ্বশুর-মহাশয় এখানেই একটা কাজ দেখিয়া লইতে বলিলেন—মেয়েকে চোখের কাছে রাখিবেন ও পচা পুকুরের জল ঘাঁটিতে দিবেন না, এমনি একটা অজুহাতে আমার জন্যে বাড়িভাড়ার টাকা গুনিতেও রাজি হইয়া গেলেন। কিন্তু গ্রামে যাইবার কী যে গোঁ ধরিয়া বসিলাম, মনে হইল, ত্রেতা যুগে রাম হইয়া অবতীর্ণ হইলে সেই জোরে অনায়াসে হরধনু চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া ফেলিতে পারিতাম। গ্রামে তো আসিলামই, বাসন্তীকে লইয়া আসিলাম। সে যতোই কেন না নাসাগ্রাভাগ কুঞ্চিত করুক, এত বড় আকাশ ও মাঠ-নদী ভরিয়া এত প্রচুর জ্যোৎস্না তাহার দুই চোখে আর কুলাইয়া উঠিতেছে না। বাপের বাড়িতে নিতান্তই সে পরগাছা ছিল, কিন্তু এইখানে সে সর্বময়ী কর্ত্রী হইয়া উঠিয়াছে। জীবনে কোথায় যে তাহার আসন তাহা আবিষ্কারের পর তাহার আনন্দের আর সীমা নাই।

বাসন্তীকে লইয়া আসিবার সময় শ্বশুর-মহাশয়ের সঙ্গে ছোটোখাটো একটা বচসার সূত্র ধরিয়া ভীষণ কলহের অগ্ন্যুৎপাত হইয়া গেল। তিনি সরাসরি বলিয়া বসিলেন, বাসন্তী যদি আমার কথার অবাধ্য হয়, তবে ওর মুখ আমি কখনো দেখবো না। বাসন্তীর মুখের দিকে তাকাইলাম—সে ধীরে আমার পাশে সরিয়া আসিল। মেয়ের এই দুর্বিনীত ঔদ্ধত্য তিনি সহ্য করিতে পারিলেন না, মুখ বিকৃত করিয়া অস্ফুট একটা চিৎকার করিয়া উঠিলেন। বাসন্তীকে লইয়া ট্যাক্সি করিয়া স্টেশনের পথে আসিতে আসিতে কহিলাম,—তুমি রামায়ণে সীতার মতোই একটা অসমসাহসিক সতীর দৃষ্টান্ত দেখালে।

রিক্তহস্তে আসিয়াছিলাম বটে কিন্তু বিয়ের সময় শ্বশুর-মহাশয় সখ করিয়া যাহা যৌতুক দিয়াছিলেন স্পষ্ট রুঢ় কণ্ঠে তাহা দাবি করিয়া বসিলাম। খাট-টেবিল, আলনা-দেরাজ, বাসন-কোসন হইতে শুরু করিয়া বাসন্তীর চুলের পিন ও আমার ফাউন্টেন পেনের ক্লিপটি পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিল। সঙ্গে শ্বশুরমহাশয় কড়া করিয়া একটা চিঠি দিয়াছিলেন বটে, যে এইসব জিনিস ঘরে পুঁজি করিয়া রাখিতে তাঁহার ঘৃণা হইতেছে, কিন্তু নিজের ঘরে পুঁজি করিয়া রাখিবারো যে কোনওকালে তাঁহার অধিকার ছিল না, সবিনয়ে এই কথাটাও তাঁহাকে জানাইয়া রাখিলাম। যাহা হোক, সেইখানেই যবনিকা পড়িল। কিন্তু বাসন্তী এতেও ক্ষান্ত হইল না,—সময়ে অসময়ে কেবল নানা জাতীয় ক্যাটালগ লইয়া নাড়াচাড়া করে, আর এটা-ওটা ফরমাজ করিয়া কলিকাতার সাহেব-পাড়ার দোকানগুলোকে ব্যাতিব্যস্ত করিয়া তোলে। বিয়েতে নগদ যাহা কিছু পাইয়াছিলাম তাহা দিয়া বইয়ে-আসবাবে ঘর-দুয়ার ভরিয়া ফেলিলাম। পা-পোষের মতো পুরু কার্পেট হইতে শুরু করিয়া দেয়াল-জোড়া বড়-বড় দিশি বিলিতি ছবিতে ঘর-দুয়ার গমগম করিতে লাগিল।

নিজের শরীর সম্বন্ধে যতটা না হোক, গৃহ-প্রসাধনে বাসন্তী একেবারে মত্ত হইয়া উঠিয়াছে। আমি কিন্তু গৃহ ছাড়িয়া গৃহস্বামিনীকেই শুধু দেখিতেছি। বাসন্তীকে দেখিতে এখন কত যে সুন্দর হইয়াছে ভাবিয়া তৃপ্তির কূল পাইতেছি না। প্রত্যেক ছবির প্রকৃত আবেদন যেমন তাহার পটভুমিতে, তেমনি অন্তরালহীন আকাশের প্রতিবেশের মধ্যে এতোদিনে তাহার সত্যিকার রূপ উদঘাতিত হইল! পায়ের রক্তাভ নখকণা হইতে শুরু করিয়া কৌতূহলবিশিষ্ট ভুরু দুটির চঞ্চল সঙ্কেত লাবণ্যের তরল একটি নদীরেখা নি:শব্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে।

বলিতাম, এতো সব জিনিসপত্রে ঘর বোঝাই করছ, এ তোমার দেখবে কে? লোককে দেখাতে না পারলে বিলাসিতার সুখ কী!

বাসন্তী কোমরে আঁচলটা জড়াইতে-জড়াইতে কহিত,—কে আবার দেখবে? আমি আর তুমি।

হাসিয়া বলিতাম—নিজেরাই তো যথেষ্ট আছি। এ-সব বাজে আড়ম্বরে নিজেদের খালি সঙ্কীর্ণ করে রাখা।

বাসন্তী সেই সব কথা শুনিবারই মেয়ে বটে! ততোক্ষণে পেট্রোম্যাকসটা ফিট করিলে তাহার কাজ দিবে।

জীবনে নতুন একটি আবহাওয়া আসিয়াছে। প্রত্যেকটি মুহূর্ত গূঢ়, প্রথম চুম্বনের মতো রোমাঞ্চময়। চারিদিকে কেমন একটা মুক্তির নিমন্ত্রণ পাইতেছি, আকাশের প্রত্যেকটি তারা বাসন্তীর দেহের প্রত্যেকটি স্পর্শের মতো পরিচিত, ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। বাসন্তীর দেহে নতুন স্বাদ, আমার অনুভূতিতে নতুন তীব্রতা! গ্রামের বিরাট সঙ্গহীনতায়ও নিজেদের কিছু নির্জন লাগে না। যখন আমি ঘরে বসিয়া লিখি ও বাসন্তী রান্নাঘরে বসিয়া রান্না করে তখন প্রকৃতি শব্দে ও নি:শব্দে আমাদের মতো পরস্পরের কাছে অন্তরঙ্গ হইয়া উঠে। অথচ শহরের জন-বহুল বিপুল উৎসব আয়োজনের মধ্যেও নিজেকে কতো একা ও অনর্থক মনে হইয়াছে।

এই নতুনতরো নেশা ছাড়িয়া আমি শহরে গিয়া চাকুরি করিব ও রাস্তায় চলিতে প্রতি মুহূর্তে গাড়ি-ঘোড়ার উৎপাত হইতে বাঁচাইয়া চলিবার স্নায়বিক উত্তেজনায় দিনের পর দিন ক্লান্ত হইতে থাকিব—শ্বশুরমহাশয় আমাকে কী ভাবিয়াছেন!

বাবা নগদ টাকা কিছু রাখিয়া যান নাই বটে কিন্তু এই ছোট সুন্দর বাড়িখানি, বিঘে পাঁচ-সাত আবাদি জমি, কয়েক ঘর প্রজা—এই দিয়াই আমি আমার জীবনকে সুদীর্ঘ একটি রবিবারের সুরে ভরিয়া নিতে পারিব। চাকুরি করিব কোন দু:খে? জীবিকা-নির্বাহের ক্ষমাহীন কঠিন প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্ব এড়াইয়া এই যে অবারিত একটি আলস্য ভোগ করিতেছি কী বলিয়া ইহার তুলনা দিব! আমার এই অবকাশের আকাশ হইতে তারার স্ফুলিঙ্গের মতো কতো কাহিনী, কতো ঘটনা কতো চরিত্র মূর্তিময় হইয়া উঠিবে কে বলিতে পারে।

রাত করিয়া গাছপালা ঝাপসা করিয়া নামিয়া আসিল। শিয়রে মোমবাতি জ্বালিয়া নতুন একটা গল্প লিখিতেছি। ইজিচেয়ারের গভীর কোলে ডুবিয়া গিয়া বাসন্তী কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে।

কান পাতিয়া দূরে নদীর তরল কোলাহল শুনিতেছি।

আবছা অন্ধকারে বাসন্তীকে কেমন যেন ক্লান্ত বলিয়া মনে হইল। মনে হইল গ্রামের এই অজস্র প্রশান্তি ধীরে ধীরে তাহাকে জীর্ণ করিয়া ফেলিতেছে। সে হয়তো গভীরতার বদলে বিস্তার কামনা করে—প্রচুর বৈচিত্র্যের মাঝে নিজেকে সে প্রকাশিত, বিকীর্ণ করিতে চায়—এইখানে তাহার আর ভালো লাগিতেছে না। একটানা বৃষ্টির শব্দে তাহার দীর্ঘশ্বাসটি স্পষ্ট কানে বাজিল।

পায়রার বুকের মতো তাহার নরম তপ্ত দেহটিকে কোলে করিয়া বিছানায় শোয়াইয়া দিলাম। জাগিয়া উঠিয়া সে আমাকে আঁকাড়াইয়া ধরিল। কহিল,—আমার বড্ড ভয় করছে।

বলিলাম—ভয়? ভয় কিসের?

আর সে কথা কহিল না। আমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজিয়া ঘুমাইতে লাগিল।

মোমবাতিটা নিবাইয়া শুইয়া পড়িলাম। চারিদিকের রাশি রাশি কোলাহলও বাসন্তী সহ্য করিতে পারে না, তাহার ভয় করে। জনবিরল মাঠের মধ্য দিয়া ঝোড়ো হাওয়ার উদ্দাম দীর্ঘশ্বাস তাহাকে অস্থির করিয়া তোলে, সারারাত ঘুমাইতে দেয় না।

কিন্তু ভোর হইতেই আবার সেই নি:শব্দতা। বাসন্তী পরিচিত জগতে নামিয়া আসিয়া হাফ ছাড়ে। হাসিমুখে জিনিসপত্র ঝাড়ে-পোঁছে, ঘর-দুয়ার ছুরির ফলার মতো ঝকঝকে করিয়া তোলে।

নদী কাল রাত্রে নাকি অনেক দূর ভাঙিয়া আসিয়াছে—বাসন্তীকে লইয়া তাহাই দেখিতে চলিলাম।

বৃষ্টি পাইয়া ব্যোমকেশের ক্ষেত মাতামাতি শুরু করিয়াছে। গাঢ় সবুজে ফিকে সোনালির আভা দিয়াছে দেখা যায়। ব্যোমকেশের স্ফুর্তি আর ধরে না। সেও আমাদের সঙ্গে চলিল।

বেশি দূর যাইতে হইল না—নদীই যা হোক অনেকটা আগাইয়া আসিয়াছে। এখনো আর্তনাদ থামে নাই। সর্বাঙ্গ ভরিয়া এখনো তাহার উত্তাল উৎসাহ। ভীষণ খাড়া পাড়। নিচে চাহিলে দস্তুর মতো পা কাঁপিতে থাকে। দাঁড়াইয়া আছ, অমনি তোমাকে বেষ্টন করিয়া মাটিতে প্রকাণ্ড একটা চিড় ধরিয়া গেল, সাবধান না হইলে অমনি তোমাকে সুদ্ধ গ্রাস করিয়া বসিবে। দূরে চাহিলে মনে হয়, একটা ফিনফিনে সাদা সিল্ক-এর আঁচল ফাঁপাইয়া কে যেন সাঁতার কাটিতেছে—খালি পাড়ের কাছেই তাহার দিগবসনা, রাক্ষুসি মূর্তি! কাল শেষ রাত্রের দিকে নটবর ভুমালির ঘরটা নিয়াছে। অল্পের জন্য ছেলেপিলে লইয়া সে বাহির হইতে পারিয়াছিল; চালের কুটাটি পর্যন্ত বাঁচাইতে পারে নাই। নদী একটু জুড়াইলে সে একবার চেষ্টা করিয়া দেখিবে অন্তত তাহার স্ত্রীর গলার হাঁসুলিটা সে উদ্ধার করিতে পারে কি না। স্ত্রী মারা গিয়াছে পর এই একটিমাত্র চিহ্নই সে কোনোক্রমে আঁকড়াইয়া ছিল, শত অভাবে পড়িয়াও তাহা সে বিক্রি করে নাই। কাহারো বাধা সে মানিবে না, জলটা একটু জুড়াইলেই সে নামিয়া পড়িবে। অমাবস্যা ছাড়িতে আর ঘণ্টা দুই মাত্র বাকি।

বাসন্তী বেশিক্ষণ সেইখানে আমাকে দাঁড়াইতে দিল না। গর্জমান বিরাট নদীর মুখোমুখি দাঁড়াইয়া থাকিতে তাহার-ভয় করে। মনে হয় ফেনময় বাহু বাড়াইয়া অলক্ষ্যে সে আমাদের দুজনকে ডাকিতেছে। পায়ের কাছের মাটিতে একটা চিড় ধরিতেই সন্ত্রস্ত হইয়া বাসন্তীকে লইয়া পলাইয়া আসিলাম।

বিকেল হইলেই মার কোলে ঘুমন্ত খুকিটির মতো নদীর জল স্তিমিত হইয়া আসিল। বাসন্তী এতোক্ষণে হাসিয়া কথা কহিতে পারিতেছে। দুজনে আবার বেড়াইতে বাহির হইলাম—ব্যোমকেশ অবশ্য এইবার সঙ্গে আসিল না। চলিতে চলিতে শ্মশান ছাড়িয়া একটা নির্জন মাঠের উপর আসিয়া পড়িয়াছি। নদী ভাঙা প্রকাণ্ড অশ্বত্থের গুঁড়ির উপর পাশাপাশি দুজনে বসিলাম। সামনেই নদী—এখন দেখিতে নিতান্তই বাঙালি মেয়ের মতো নিরীহ : রূপালি গলায় মৃদু-মৃদু কথা কহিতেছে। যতো ভাবি নদীর দিকে বেড়াইতে আসিব না, ততোই নদী আমাদের কাছে টানিয়া আনে। আর যাইবার বা জায়গা কোথায়? যেখানে যাইব, সেইখানেই নদী তাহার চঞ্চল ও সুনীল চক্ষু মেলিয়া রাখিয়াছে! দেখিতে-দেখিতে কতো কাছে যে আগাইয়া আসিল। আমাদের বাড়ীর দক্ষিণে যে ঝাউগাছের সারি ঘন হইয়া দাঁড়াইয়া আকাশকে সঙ্কীর্ণ করিয়া রাখিয়াছিল, দেখি তাহা কোনদিন ফাঁকা হইয়া গেছে। এখন দক্ষিণটা একেবারে সাদা, সবুজ বা নীলের কোথাও এতোটুকু বাধা নেই—যেন অবিনশ্বরতার গাঢ় রঙ। এত বড়ো মুক্তির চেহারা দেখিয়া দুইজনে মনে-মনে ভীত হইয়া পড়ি, কিন্তু সেই ভয় পরস্পরের থেকে লুকাইতে গিয়া আরো সহজে ধরা পড়িয়া যাই।

যে-জায়গাটায় আসিয়া বসিলাম তাহা গাছ-পাতার আড়ালে কার একটি কুটিরের নিভৃত আঙিনা। কোনো চাষা-ভুষোর বাড়ি হইবে, নদী কাছে আসিয়া পড়ায় আগেই বিদায় নিয়াছে। ছোট-ছোট উঠানটি ঘিরিয়া সংসারের ছোট ছোট চিহ্ন এখনো এখানে সেখানে ছড়ানো আছে দেখিলাম। তাড়াতাড়িতে সব জিনিস হয়তো সরাইতে পারে নাই—মানুষের প্রাণের চেয়ে কতোগুলি ডালা-কুলোর দাম তো আর বেশি নয়। তবু সেই পরিত্যক্ত, শূন্য ঘরের নিরানন্দ চেহারা দেখিয়া মন ভারি বিমর্ষ হইয়া উঠিল। এখন তাহারা কোথায় উঠিয়া গেছে না জানি।

বাসন্তী হালকা সুরে অনেক সব কথা কহিতে লাগল। সম্প্রতি এখানে সে ছোটখাটো একটা পাঠশালা করিতে চায়—বিনে মাইনের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে পড়াইয়া তবু যা-হোক করিয়া দিন তাহার কাটিবে। আমি উহার আবদার চিরকাল পালন করিয়াছি, আজো কহিলাম—সরকার মশায়কে বলে দেব, সামনের বাগানের ধারে তালপাতার ছাউনি দিয়ে একখানা ঘর তুলে দেবেন।

বাসন্তী ঠোঁট ফুলাইয়া কহিল—একটুখানি তো ঘর, তা আবার তালপাতার কেন? রাণিগঞ্জের টালি দেবে।

—একটুখানি বলেই তো তালপাতার বলছি।

—গরীব ছেলেমেয়েরা পড়বে বলেই বুঝি এমনি হেনস্তা করতে হয়? বেশ পাকা দালান হবে—উঁচু ক্লাসের ছাত্র জুটলে তুমিও মাস্টারি করতে পারো—অবশ্যি আমি যদি দরখাস্ত মঞ্জুর করি। দুজনে কাজ পেয়ে বেঁচে যাবো। এমনি আর পারি নে।

বলিলাম,—খালি পাকা দালান হলেই চলবে?

—বা, বেঞ্চি-চেয়ার কিনতে হবে না? গ্লোব ম্যাপ, ব্ল্যাকবোর্ড, আলমারি—সে সব ফর্দ আমি ঠিক করে রাখবো। সরকার-মশায়কে বলে তুমি কেবল টাকা জোগাড় করে দেবে।

—সে যে অনেক খরচ।

—টাকা তবে আছে কী করতে? এ তো আর বাজে কাজে উড়োচ্ছি না, দস্তুর-মতো দেশের কাজ।

—কিন্তু টাকা পাবো কোথায়?

—সরকার-মশায়কে বললেই তিনি বন্দোবস্ত করে দেবেন। কাজ ছাড়া আমি বাঁচি কী করে বলো? ওদিকে আমার ভারি জাতের একটা অসুখ করুক, তখন তো উঠে পড়ে খরচ করতে শুরু করবে। কেমন, ঠিক কি না।

তাহার একটি হাত নিজের মুঠির মধ্যে চাপিয়া ধরিলাম। মাথার উপর দিয়া এক ঝাঁক গাঙ-শালিক উড়িয়া গেল। পাখার চাঞ্চল্যে সমস্ত নি:শব্দতাটা হঠাৎ স্বচ্ছ তরল হইয়া আসিল। দূরে খেজুর গাছের দীর্ঘ পাতার ফাঁকে একটি তারা উঠিয়াছে। সূর্য কখন ডুবিয়া গিয়াছে খেয়াল করি নাই।

অন্ধকার ঘন হইয়া আসিতেই নদীকে পিছনে রাখিয়া বাড়ীর দিকে অগ্রসর হইলাম। যতো এগোই, ততোই মনে হয় নদীও যেন নি:শব্দে আমাদের অনুসরণ করিতেছে! পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখি নিঝুম কালো নদী বালির বিছানায় গা এলাইয়া ঘুমাইতেছে—কোথাও যেন এতটুকু নিশ্বাসের স্পন্দন নাই। দেখিয়া ভারি নিশ্চিন্ত হইলাম। বাসন্তী আমার দিকে চাহিয়া কেমন করিয়া যেন হাসিল।

দিন পনেরো-কুড়ির মধ্যে বাসন্তীর স্কুলের বাড়ি উঠিয়া গেল।

বাসন্তীর আনন্দ দেখে কে! নিতাইকামারের দুইটি ছেলে নিয়া সে অ-আ-শুরু করিয়া দিল। ইহাদের একটিও যে ভবিষ্যতে হাইকোর্টের জজ হইবে না এমন কথা হলফ করিয়া বলিবার আর সাহস রহিল না।

দুপুরের আগেই বাসন্তী খাওয়া-দাওয়ার পাট তুলিয়া মাস্টার ও ঘড়ি লইয়া ইস্কুলে গিয়া ঢোকে আর নিতাই কামারের দুরন্ত দুই ছেলে অক্ষর ভুলিয়া যতোই ঘরময় দাপাদাপি করিতে থাকে, বাসন্তীর উৎসাহ ততোই বাড়িয়া যায়। শাসন করিবার পদ্ধতিটা তাহার অতিমাত্রায় আধুনিক। একটুও রাগে তো সে নাই, বরং দুরন্ত ছেলে দুইটাকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া চুমায়-চুমায় চোখ-মুখ আচ্ছন্ন করিয়া উহাদের সায়েস্তা করিতে চেষ্টা করে।

দক্ষিণের কোঠায় বসিয়া আমি তাহা দেখি ও লিখিবার কিছু প্লট খুঁজিয়া না পাইয়া অবশেষে একটি সন্তানকামনাতুরা নারীর নিষ্ঠুর নি:সঙ্গতা লইয়া গল্প লিখিবার ভাষা খুঁজিয়া বেড়াই।

গ্রামে সম্প্রতি কে একজন সন্ন্যাসী আসিয়াছে যাগ যজ্ঞ করিয়া নদী শুকাইয়া দিবে বলিয়া আমাদেরই সম্মুখের মাঠে তাঁবু গড়িয়াছে। সেখানে আজ বড়ো ভিড়। পূজা যখন একটা হইবেই, প্রসাদ নিশ্চয় আর বাদ পড়িবে না—অতএব সেইখানে না গিয়া এইখানে বসিয়া ভালুকের মতো ভীষণ দুইটা অক্ষরের দিকে নির্নিমেষে চাহিয়া থাকিয়া তাহাদের অবয়বের অলৌকিক গঠন-প্রণালীটা আয়ত্ত করিতে হইবে নিতাই কর্মকারের ছেলেরা তাহা বরদাস্ত করিতে পারিল না। বাসন্তীর আঁচলের তলা হইতে কখন ছুটিয়া পালাইল।

বাসন্তী বিরত হইবার মেয়ে নয়। কখন আবার ইস্কুলের জন্য উমেদারি করিতে বাহির হইয়া পড়িয়াছে।

মাসখানেক কাটিয়া গেল। এত করিয়াও ছেলেতে-মেয়েতে মিলাইয়া চার পাঁচটির বেশি সে জোগাড় করিতে পারিল না। নদীতে গ্রাম লোপাট হইতে চলিল, বাসন্তীর হাতে দিগগজ হইবার জন্য কে এখানে সখ করিয়া বসিয়া থাকিবে?

সন্তানকামনাতুরা নারীর সেই গল্পটা আজ রাত্রে ঘুমাইবার আগে বাসন্তীকে শুনাইব ভাবিয়াছিলাম, কিন্তু নদীর গর্জনের সঙ্গে রাত্রির অপার নি:শব্দতা মিলিয়া তাহাকে এমন অভিভূত ও ক্লান্ত করিয়া ফেলিয়াছে যে প্রস্তাবটা পাড়িবার আগেই সে ঘুমাইয়া পড়িল। তাহার শুইবার ভঙ্গিটা এত করুণ ও কৃশ যে মায়া হইতে লাগিল। নুইয়া পড়িয়া তাহার দেহে—রাত্রির নি:শব্দতার মতো শীতল দেহে চুমা খাইলাম, কিন্তু সে একটুও সাড়া দিল না। ভাঁটার নদীর মতো নির্জীব হইয়া পড়িয়া রহিল। আশ্চর্য, আমার কেবল এই কথাই মনে হইতে লাগিল, নদীর এই ক্ষিপ্ত উদ্বেলতা বাসন্তীর যৌবনকে ক্রমে-ক্রমে ম্লান স্তিমিত করিয়া আনিয়াছে। নদীর লবণাক্ত, তিক্ত স্বাদের কাছে বাসন্তীর দেহের মদিরা অনেকাংশে জলীয়, তাহাতে আর সেই আনন্দময় জ্বালা নাই। নদী এখন এত প্রত্যক্ষ, এত নিদারুণ , এত অজস্র উচ্ছাসিত যে বাসন্তীকে সে অনায়াসে আড়াল করিয়া দাঁড়াইল। প্রকৃতির কাছে মানুষের এই অপ্রতিবাদ পরাভব ইহার আগে আর কখনো দেখিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না।

বাসন্তীর আর সেই লীলা নাই, সেই আবেগের আগুন তাহার নদীর জলে নিভিয়া গেছে। আমি বোধহয় দিনে-রাত্রে নদীর এই উত্তেজনায় আচ্ছন্ন হইয়া রহিলাম—বাসন্তীকে আর চোখে ধরিল না।

গফুর তরি-তরকারি বেচিয়া দিন গুজরাইত, একদিন সপরিবারে সে আসিয়া আমার কাছে ইস্কুল ঘরে থাকিবার মিনতি জানাইল,—কাল রাত্রে তাহার ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-খামার নদীর জলে উজাড় হইয়া গেছে। আজ রাতটা কোনো রকমে কাটাইয়া সে অন্য কোথাও চলিয়া যাইবে—কোথায় যে যাইবে এখনো তাহা ঠিক করে নাই। বাসন্তীর থেকে চাবি চাহিয়া সরকার-মহাশয়কে দিয়া দরজা খুলাইলাম। উহাদের জায়গা হইল—এবং দেখিতে দেখিতে ইস্কুল ঘরটা বিচিত্র ধর্মশালার চেহারা নিয়া বসিল। কাহারো নড়িবার নাম নাই। শেষে কেবল মনে হইতে লাগিল, নদী এই হতভাগ্যদের খুঁজিয়া ফিরিতেছে—উহাদের না সরাইলে হয়তো আমারই দরজার কাছে আসিয়া হানা দিবে। গরুর গাড়ি ডাকাইয়া পোঁটলা-পুঁটলিতে চিঁড়ে-ডাল বাঁধিয়া উহাদের পথ দেখিতে বলিলাম। রাজি না হওয়া ছাড়া উহাদের উপায় ছিল না—উহাদের তাড়াইবার জন্য বাসন্তী এমন বিজাতীয় গোঁ ধরিয়াছে! যদি ক্ষুধার তাড়নায় একদিন সকলে মিলিয়া লুঠ-তরাজ করিয়া আমদের সর্বস্বান্ত করিয়া ফেলে! উহারা একে একে বিদায় নিল বটে, কিন্তু নতুন গৃহপ্রবেশের সম্ভাবনায় কেহ যে বিশেষ খুশি হইল এমন মনে হইল না। রাজা মিঞা তো ঝাঁজালো গলায় দস্তুরমতো শাসাইয়া গেল যে, এমন করিয়া যে গৃহহীনদের তাড়ায়, রাক্ষুসী নদী তাহাকেও তাড়াইয়া ফিরিবে।

আমাদের অতিথিবৎসল না হওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না। কয়েকদিন পরেই আরেক দল লোক আসিয়া হাজির, ইস্কুলঘরে আজ রাত্রের জন্য তাহাদের ঠাঁই দিতে হইবে। মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছিল—কন্ঠস্বরটা যে কাহার প্রথমে ঠিক চিনিতে পারিলাম না। জানালা ফাঁক করিয়া দেখিলাম লোকটার পিছনে একটি স্ত্রীলোকও তাহাকে ঘন করিয়া ঘিরিয়া কতকগুলি শিশু ভিজা কাপড়ে হি-হি করিয়া কাঁপিতেছে—এত বড়ো আকাশের তলে কোথাও তাহাদের এতটুকু আশ্রয় নাই। লন্ঠন জ্বালিয়া ছাতা মাথায় দিয়া বাহিরে আসিলাম। দেখিলাম এ আর কেহ নয়, আমারই প্রজা নবীন মাইতি। বুঝিতে বাকি রহিল না নদী আমারো জমিতে থাবা বসাইয়াছে।

বলিলাম—ঘরদোর সব গেলো?

নবীন গড় হইয়া প্রণাম করিয়া কহিল—সব বাবু, কোনো রকমে সরে আসতে পেরেছি। আজই এমন ঝড়-বৃষ্টি করে না এলে আরো কিছুদিন থাকতে পারতাম। এখন আপনি জায়গা না দিলে ছেলেপুলে নিয়ে কোথায় যাই বলুন।

পরিষ্কার বুঝিলাম, তাহার কাছে যে বাকি-খাজনা পাওনা ছিল, নদী তাহাও কাড়িয়া নিয়াছে।

ধমক দিয়া উঠিলাম, সময় থাকতে সরতে পারিসনি? জিনিসপত্র কতক তো অন্তত বাঁচতো।

কিন্তু ধমকাইয়া তাহকে কী করিব? স্ত্রী-পুত্র লইয়া যে বাঁচিতে পারিয়াছে, এই ঢের—তুচ্ছ কতকগুলি জিনিস দিয়া তাহার কী হইবে?

নবীন মুখ কাঁচুমাচু করিয়া কহিল—তাড়াতাড়িতে এই মাদুর আর বালিশ দুটো শুধু নিতে পেরেছি—

ওদিক হইতে নবীনের ছোট ছেলে বলিয়া উঠিল—আর আমি আমার নাটাইটা, বাবা!

মুখ-চোখ বির্বণ করিয়া সরকার-মহাশয় ভয়ে ভয়ে কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। লেখা হইতে মুখ তুলিয়া প্রশ্ন করিলাম, আজকে কী নতুন খবর?

সরকার-মহাশয়ের মুখে তক্ষুনি ভাষা জুগাইল না। অনেক ঢোক গিলিয়া পরে কহিলেন,—আমগাছগুলি কাল গেছে।

বিস্মিত হইব না ভাবিয়াছিলাম, কিন্তু খবরটা এমন মর্মান্তিক যে মনে হইল যেন এইমাত্র কোনো আত্মীয়তম পরম বন্ধুর মৃত্যুর খবর শুনিতেছি। চমকাইয়া উঠিলাম—কোন আমগাছ?

—সব। সরকার-মহাশয় ব্যাখ্যা করিয়া বলিতে পারিলেন না। মনে আছে গত বৎসর আমি বৈশাখের সন্ধ্যায় বাসন্তীকে লইয়া এই আমবাগানে বেড়াইতে গিয়াছিলাম। বিন্দুমাত্র আভাস না দিয়া নির্লজ্জ এই নদীর বন্যার মতো অকস্মাৎ আকাশে তুমুল ঝড় উঠিয়াছিল। জোরে বাতাস ছাড়িতেই কচি-কচি আম অজস্র শিলাবৃষ্টির মতো এখানে-ওখানে ঝরিয়া পড়িতে লাগিল, কোঁচড় বাঁধিয়া বাসন্তীর সে কী আম কুড়াইবার ঘটা! ধূলায় সমস্ত মাঠ-বাড়ি একাকার হইয়া গেছে, খানিকটা গরম থাকিয়া সমস্ত শূন্য পাথরের মতো ঠান্ডা হইয়া আসিল, কোথায় কাহাদের গরু-ছাগল ভয় পাইয়া চীৎকার পাড়িতেছে—বৃষ্টি এই আসিল বলিয়া! আর আকাশের যেমন চেহারা বৃষ্টি একবার আসিলে সহজে থামিবার নাম করিবে না। কিন্তু কথা শুনিবার মেয়ে বাসন্তী নয়। হাওয়ায় চুল ও আঁচল এলো করিয়া প্রাণপণে সে আম কুড়াইতে লাগিল। ঝড় এমনি দুর্দান্ত যে তাহাকে প্রবল পুরুষস্পর্শের আলোড়নে একেবারে বিপর্যস্ত ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলিতেছে। বলিলাম,—কেন এতো ব্যস্ত হচ্ছ? ঝড় থামলে চাকরকে পাঠিয়ে দেব, সব আম কুড়িয়ে নেবে। বাগান তো আমাদেরই—ভাবনা কিসের? বাসন্তী তবুও কথা শুনিল না। উন্মত্ত বাতাসে কাপড়ের প্রান্ত উড়াইয়া পিঠময় চুলের ঢেউ তুলিয়া দ্বিগুণ উৎসাহে আম কুড়াইতে লাগিল। আবাহাওয়াটি এত গম্ভীর ও এত ভয়ঙ্কর যে তাহাকে আমার অত্যন্ত অপরিচিত ও অপরিচিত বলিয়াই প্রখরতর রূপে সুন্দর বলিয়া মনে হইল।

বাসন্তীকে বলিলাম,—চলো, একবার দৃশ্যটা দেখে আসি।

নিজে তো যাইবেই না, আমাকেও সে জোর করিয়া আঁকড়াইয়া রহিল। খবরটা তাহার কাছে এত নিদারুণ যে শতপুত্রশোকে গান্ধারীর মতো সেও বোধহয় অন্ধ হইয়া যাইবে।

আজকাল আমরা আর বেড়াইতে বাহির হই না, স্থানের ও সময়ের সমস্ত পরিধি নদী অনায়াসে লুপ্ত করিয়া দিয়াছে। ঘরে বসিয়াই নদী দেখি, প্রচুর হাওয়ায় দেয়ালের প্রকাণ্ড ছবিগুলি মেঝের উপর ভাঙিয়া পড়ে। বিস্তৃত জলরাশির কিনারে মর্ত্যের দুইটি প্রাণী মৃত্যুর প্রলোভন এড়াইয়া কোনওরকমে একের পর এক মুহূর্ত গুনিতেছি!

তারপর আসিল ব্যোমকেশ। খবরটা ব্যাখ্যা করিয়া বলিবার দরকার ছিল না, সময় থাকিতে বুদ্ধিমানের মতো হাটে গিয়া সে যে লাঙল ও বলদ বিক্রি করিয়া আসিয়াছে। তাহার জন্য তাহাকে তারিফ করিলাম—পয়সাটা ঠিক তাহারই প্রাপ্য কিনা তাহা আর বিচার করিয়া দেখিলাম না। কেবল এই-ই দু:খ হইতে লাগিল যে, তাহাকে এইবার সত্যি-সত্যিই চাকরির জন্য দরখাস্ত করিতে হইবে। কিন্তু খবরের কাগজের সম্পাদক সেই কথা জানিতে আসিবেন না; জানিলেও এত বড়ো ব্যর্থতার কথা সসমারোহে ছাপিবার আর তাঁহার আগ্রহ থাকিত না। প্রকৃতির কাছে মানুষের এই পরাভবের ব্যর্থতার মধ্যে মহিমা নাই, এই পরাজয় মানুষের নিজের সৃষ্টি নয় বলিয়া। এত দু:খেও ব্যোমকেশ তাই সুখী হইতে পারিল না।

এইবার সময় হইল। শতলক্ষ হাত মেলিয়া নদী স্কুল-ঘরটাকে আক্রমণ করিয়াছে।

নবীন আগেই সরিয়াছে, অত এব তাহার জন্য বিশেষ ব্যস্ত হইবার নাই। বাসন্তী বুকের কাছে সরিয়া আসিয়া কহিল,—অমনি অমনি যেতে দেবে নাকি?

এত বড় বিপদের সম্মুখে পড়িয়াও যদি বাসন্তী দার্শনিক না হয়, তবে কী করিতে পারি? বলিলাম,—কোন জিনিস তুমি আঁকড়ে ধরে রাখতে পারো শুনি? যা যায়, যাক।

বাসন্তী কহিল,—কিন্তু টুল-চেয়ারগুলিও তো বেচতে পারতে?

—কোথায় বেচবো? কিনবে কে? কতোই বা দাম পাওয়া যাবে? পয়সা যা পাবে, তাও কি অমনি যাবে না খরচ হয়ে? ও নিয়ে মিথ্যে মন খারাপ করো না —দেখ, মৃত্যুর এমন চমৎকার চেহারা আর দেখেছ কখনো?

দক্ষিণের কোঠায় পাশাপাশি চেয়ারে দুইজন বসিলাম। দেখিলাম, সরকার-মহাশয় লোক লাগাইয়া স্কুল ঘরের জিনিস-পত্র বাহির করিতেছেন। মনে মনে হাসিলাম, কোথায় এগুলি তিনি সরাইয়া রাখিবেন—কে ইহাদের বোঝা টানিয়া টানিয়া বেড়াইবে? তবু নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ইহাদের তুলিয়া দিতে সরকার-মহাশয়ের মন যেন কেমন করিতেছিল।

হাওয়ায় বাসন্তীকে একেবারে উড়াইয়া নিতেছে। নদী যত তাহার আবরণ কাড়িয়া লইবার জন্য কাড়াকাড়ি করিতেছে, ততই সে কুন্ঠিত, ম্রিয়মান হইয়া এতটুকু হইয়া হইয়া যাইতেছে। ঝড়ের মুখে শুকনো পাতার মতো তাহাকে এমন দুর্বল লাগিল—এই বিরাট সৌন্দর্য-সমারোহের মাঝে সব এমন অকিঞ্চিৎকর মনে হইল যে সেই মুহূর্তে বাঁচিয়া থাকিবার কোনো অর্থ খুঁজিয়া পাইলাম না।

আমাদের চোখের সমুখে স্কুল-ঘরের একটা ধার নদীর মধ্যে ধ্বসিয়া পড়িল। বাসন্তী সভয়ে একটা চিৎকার করিয়া উঠিতেই তাহাকে বুকের কাছে টানিয়া কহিলাম,—ভয় কী!

বুকে মুখ গুঁজিয়া বাসন্তী কাঁপিতেছে; চাপা গলায় কহিল,—একেবারে আমাদের পায়ের কাছে এসে পড়লো যে।

—আসুক। বাড়ি নিতে এখনো দেরি আছে! পূর্বদিক ঘেঁসে চরও পড়ছে শুনছি—সবাই ত বলছিলো এই বর্ষাটা কোনো রকমে কাটিয়ে উঠতে পারলেই বেঁচে গেলাম। ভয় কী, বাসন্তী? আর যদি যায়-ই, যাবে—জিনিস-পত্র স্তূপাকার করে রেখে লাভ কী? দুজনে আবার ফাঁকা হয়ে যাবো।

বাসন্তী তেমনি মুখ গুঁজিয়া কহিল,—আমি চোখ মেলে তা দেখতে পারবো না। তার আগেই আমরা এখান থেকে পালাবো।

আস্তে-আস্তে তাহার পিঠে হাত বুলাইতে লাগিলাম। ঘণ্টা-খানেকের মধ্যেই স্কুল ঘরটা নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল। নিতাই কর্মকারের ছেলে মুন্সেফ-কোর্টের সামান্য একটা পেসকারও আর হইতে পারিল না।

এখন একেবারে নদীর কোলে শুইয়া আছি। ফুলের বাগানটাও গেছে। এখন এক পাড়ে আমি আর বাসন্তী, আর আমাদের সুমুখে নদী—স্রোতমুখর, ফেনিল, লালায়িত—সমস্ত বন্ধন ছিঁড়িয়া, কাড়িয়া তাহারই মতো আমাদের সে বস্তুর জগতে একবারে উলঙ্গ করিয়া দিবে।

কৌচগুলিতে ধূলা জমিতেছে, আলমারির কাচগুলি আর পরিষ্কার করা হয় নাই। কার্পেটটা জায়গায় জায়গায় ফুটা হইয়া গিয়াছে—সেই দিকে কাহারো লক্ষ্য নাই। টিপয়ের উপর পিতলের বড় ডাবরে পাতাবাহারের গাছ দুইটা কবে মরিয়া গেছে—কে আর উহাদের আদর করিয়া জল দিবে। দেয়ালের বড়ো ক্লকটা বন্ধ, চাবি দিতে ভুলিয়া গেছি। অনেক দিন ধোপা আসিতেছে না—বিছানার চাদর ও বালিসের ওয়াড়গুলি এত ময়লা হইয়া গেছে যে যেন তাহারই জন্য আমাদের চোখে ঘুম আসে না। ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলানো হয় নাই কতদিন—জানিবার কিছু প্রয়োজন বোধ করি না। পরস্পরের মুখের দিকে চাহিয়া কেবল সেই পরম ক্ষণটির প্রতীক্ষা করিতেছি।

বাসন্তী অস্থির হইয়া বলিল,—এখানে থেকে কী হবে—চলো পালাই।

বলিলাম,—নাটকের শেষ অঙ্কটাই নাটকের সমস্ত। একেবারে যবনিকা পড়লে তবে উঠবো। এমন একটা চমৎকার দৃশ্য দেখতে তোমার কুণ্ঠা কিসের?

—এ আমি সইতে পারবো না।

—যা কিছু অসহ্য, তাইতেই তো তীব্র আনন্দ আছে। বলিয়া বাসন্তীর মুখে চুমা খাইলাম। যেন ভালো লাগিল না। উহার চেহারা এই ঘর-বাড়ির মতো কেমন রুক্ষ্ম, বিবর্ণ হইয়া গেছে। কতদিন উহাকে একটু আদর পর্যন্ত করি নাই। মৃত্যুর এই অপরিমেয় ঐশ্বর্যের মাঝে ক্ষণভঙ্গুর প্রেমের অভিনয় করিতেও হাসি পায়।

ভিতরের উঠান ছাড়াইয়া খানিক দূরে সরকার-মহাশয় সময় থাকিতে ছোট-খাটো একখানি ঘর বাঁধিয়া রাখিয়াছেন। সময় আসিলে এই বাড়ি ছাড়িয়া সেখানে উঠিয়া যাইব। তাহার পরেও যে নিস্তার নাই তাহাও সরকার-মহাশয় ভালো করিয়া জানিতেন, তবু আবশ্যকীয় জিনিসপত্র সরাইয়া রাখিবার জন্য হাতের কাছে একটা আশ্রয় থাকা উচিত। কোন জিনিসগুলি যে অধিকতর আবশ্যকীয় ঘরের চারিদিকে চাহিয়া চট করিয়া ভাবিয়া নিতে পারিলাম না। বাসন্তীকে জিজ্ঞাসা করিয়া কোনো লাভ নেই—সবগুলি জিনিসই একান্ত প্রিয়, একান্ত আপনার—কোনটা ছাড়িয়া কোনটার প্রতি যে সে পক্ষপাতিত্ব দেখাইবে সে একটা কঠিন সমস্যা। অতএব মাত্র শুইবার খাটখানা, বিছানা-পত্র, কাপড়-চোপড়, ভরিয়া একটা বড় ট্রাঙ্ক, লিখিবার ছোট একটি টেবিল, এমনি মোটামুটি কয়েকটা জিনিস সরাইয়া রাখিলাম। আমার গল্পের খাতা ও বাসন্তীর গহনার বাক্সটা হাতের কাছেই রহিল—নদী আসিয়া পড়িলে সেগুলিও সঙ্গে নিতে হইবে।

ছোট ঘরখানি—রানিগঞ্জের টালিতে নয়, উলুখড়ে কোনোরকমে ছাওয়া হইয়াছে। চাকর সেই ঘরে একটি বাতি জ্বালিয়াছে দেখিলাম। বিপুলকায় গর্জমান নদীর পাড়ে বসিয়া ঐ মৃদু শিখাটিকে ভারি করুণ মনে হইতে লাগিল। বাসন্তী বলিল,—চলো, ঐ ঘরে আজই উঠে যাই।

অভয় দিয়া বলিলাম,—আজই কী! এখনো হাত পঞ্চাশ দূরে আছে। আজ রাতটা অনায়াসে এখানেই ঘুমিয়ে নিতে পারবো।

জল, জল, ক্ষুরের মতো ধারালো, বিদ্যুতের মতো দ্রুত —ধাবমান ঘোড়ার মতো ঢেউগুলি পাড়ের কাছে আছড়াইয়া পড়িতেছে। কোথাও এতটুকু বিশ্রাম নাই, স্তব্ধতা নাই—ফুঁসিয়া-গর্জিয়া ছিঁড়িয়া-কাড়িয়া অনড়, স্থবির মৃত্তিকাকে একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিবে। অমন চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে দিবে না। সেই নিয়ত বেগবান বিরাট শক্তির কাছে আমাদের অস্তিত্ব কেমন ম্লান, সঙ্কুচিত হইয়া গেছে। পরিমিত নিশ্বাস ফেলিয়া আমাদের এই জীবন ধারণের তুচ্ছতাকে নদী যেন চারিদিকের উগ্র খলহাস্যে বিদ্রূপ করিয়া উঠিল।

জল আর জল —সাদা গাঢ় জল! বেগের প্রাবল্যে কোথাও এতটুকু বিশ্রামের রঙ নাই—ফেনায়িত প্রখর সাদা অমন তীব্র শুভ্রতা চক্ষু মেলিয়া সহ্য করিতে পারি না।

রাত্রে কখন একটু ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম—ঘুমের মধ্যেও নদীর সেই ডাক শুনিতেছি। তাহার আর ঘুম নাই, প্রবল আর্তকণ্ঠে কী যেন সে চাহিতেছে! সেই ভাষা আমরা কি করিয়া বুঝিব।

হঠাৎ কোথায় কী একটা শব্দ হইল—হয় তো এক তাল মাটি পড়িল—সঙ্গে সেই শিমুল গাছটাও। ধড়মড় করিয়া জাগিয়া উঠিলাম—দেখি পাশে বাসন্তী নাই, চারিদিকে প্রবল শব্দে ঝড় বহিতেছে—চিৎকার করিয়া উঠিলাম—বাসন্তী।

কোথাও এতটুকু সাড়া মিলিল না।

তাড়াতাড়ি খাট হইতে নামিয়া পড়িলাম। আলো জ্বালিবার কথা মনেও হইল না। দেখি, দক্ষিণের দরজাটা খোলা, প্রচুর উচ্ছাসিত হাওয়ায় ঘরের মধ্যে ধূলা উড়িতেছে—এত বাতাসে ও ধূলায় নিশ্বাস টানিতে কষ্ট হইতে লাগিল। আবার ডাকিলাম,—বাসন্তী। অজস্র কণ্ঠে নদী ব্যঙ্গ করিয়া উঠিল। স্পষ্ট মনে হইল, নদীর ডাকে বাসন্তী কখন দরজা খুলিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছে বুঝি।

পাগলের মতো সামনের জমিতে ছুটিয়া আসিলাম, ঝাপসা অন্ধকারে খেজুরগাছের নিচে কি-একটা কাপড়ের মতো চোখে পড়িল। কাছে আসিয়া দেখি—বাসন্তী নদীর পাড়ে চুপ করিয়া বসিয়া আছে।

ব্যস্ত হইয়া কহিলাম—এখানে উঠে এসেছ যে!

সে যেন কেমন করিয়া হাসিল; কহিল—একটুও ঘুম আসছে না। বলিয়া আবার স্তব্ধ হইয়া নদীর দিকে চাহিয়া রহিল। প্রবল চাঞ্চল্যের তীরে তাহার এই ধ্যানময় স্তব্ধতা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর মনে হইল। তাহাকে বেষ্টন করিয়া এই নির্জনতা এমন ভয়াবহ হইয়া উঠিয়াছে যে, তাহাকে আমার অতি-পরিচিত বাসন্তী বলিয়া যেন চিনিতে পারিলাম না।

গায়ে ঠেলা দিয়া কহিলাম—এখানে বসে আছ কী করতে? ঘরে চলো!

বাসন্তী কহিল—এই বেশ লাগছে। তুমিও আমার পাশে এসে বোস না।

তাহার পাশে বসিলাম; কিন্তু তাহার পর কী যে বলিব বা বলা যাইতে পারে—সমস্ত ভাষা নীরব হইয়া গেল। উহার সঙ্গে দৃষ্টি মিলাইয়া আমিও জল দেখিতেছি। তাহার পর জল কখন চোখ হইতে মিলাইয়া গিয়াছে—বাধাহীন অশরীরী বেগ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়িতেছে না।

বাসন্তীকে এত কাছে রাখিয়াও নিজেকে এই নদীর মতো অত্যন্ত নি:সঙ্গ মনে হইতে লাগিল। আগে তবু এখানে-সেখানে কয়েকখানা নৌকা দেখা যাইত, ছইয়ের তলায় বসিয়া মাঝিদের রান্না ও গল্পগুজবের শব্দ কানে আসিলে কতকটা যেন নিশ্চিন্ত বোধ করতাম। সামনের রাস্তাটা ভাঙিয়া গেছে বলিয়া একটা গরুর গাড়ির চাকার শব্দও আর শুনিতে পাই না। সব যেন বিরাট গতির ঘুর্ণিতে পড়িয়া কোথায় নিশ্চিহ্ন হইয়া গেছে।

একটা শকুন অন্ধকারে পাখার শব্দ করিয়া উড়িয়া গেল। সচেতন হইয়া চাহিয়া দেখি বাসন্তীও কেমন অসাড়, উদাসীন হইয়া বসিয়া আছে। উহাকে আমার যেন কেমন ভয় করিতে লাগিল। গায়ে ঠেলা দিয়া কহিলাম—এখান থেকে উঠে চলো, নইলে এবার ভেঙে পড়বো।

বাসন্তী তবু নড়িল না। চকিতে মনে হইল, উহার চোখে মৃত্যুর স্পর্শ লাগিয়াছে, এমন স্তব্ধ-মত্ততায় তন্ময় হইতে আর কখনো উহাকে দেখি নাই। নদী যেন এখুনি উহাকে আমার বাহুবন্ধন হইতে ছিনাইয়া নিবে। আর দেরি নাই।

আমাদের ঘিরিয়া সত্য-সত্যই অনেকখানি জায়গা লইয়া চিড় ধরিল। দুই বলিষ্ঠ হাতে মাটি হইতে উহাকে বুকের মধ্যে কাড়িয়া লইলাম। কোনোদিকে না চাহিয়া বাসন্তীকে বুকে ধরিয়া ঘরের মধ্যে ছুটিয়া আসিলাম—দেখি আমারই বুকের উপর কখন সে মুর্ছিত হইয়া পড়িয়াছে।

অবশ ভাবটা কাটিলে জিজ্ঞাসা করিলাম,—এখন কেমন লাগছে, বাসন্তী?

দুর্বল হাত দুইটি দিয়া আমার গলা জড়াইয়া সে কহিল,—ভীষণ ভয় করছে। আমাকে তুমি ধরে রাখো। আমায় ছেড়ে দিও না।

আমার স্নেহ দিয়া তাহাকে আবৃত করিয়া রহিলাম। কহিলাম,—কেন তোমায় ছেড়ে দেবো? কার সাধ্য তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে রাখে?

লক্ষ লক্ষ ঢেউ তুলিয়া নদী আমাদের এই গভীরতম মিলনের মুহূর্তকে বিদ্রূপ করিতে লাগিল। যেন উদ্দাম প্রবাহে এই মুহূর্তটিকে সে ভাসাইয়া নিয়া যাইবে।

তাহার পর আমাদের জীবনে সেই পরম লগ্নের আবির্ভাব হইল।

রাত অনেক হইয়াছে—অকূল আকাশ ভরিয়া জ্যোৎস্নার আর অবধি নাই। সেই পরিপূর্ণতম প্রশান্তির নিচে নদীর এই লেলিহান উন্মত্ততার কোথাও এতটুকু সঙ্গতি খুঁজিয়া পাইতেছি না।

সময় থাকিতেই ছোট খড়ের ঘরে উঠিয়া আসিয়াছি। চাকর ছোট টেবিলের উপর তেমনি বাতি জ্বালাইয়া খাট জুড়িয়া বিছানা করিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু রাতে আজ গল্প লিখিবার বা ঘুমাইবার কথা ভাবিতে গেলেও শিহরিয়া উঠিতে হয়!

লিখিবার খাতা ও গয়নার বাক্সটার সঙ্গে আরো কিছু খুচরো জিনিস সরাইয়া ফেলিব ভাবিয়াছিলাম, কিন্তু শেষকালে কেন জানি না আর হাত উঠিল না। কী ফেলিয়া কী নিব, নিয়াই বা কী করিব, কোথায় রাখিব, এমনি একটা মূঢ় সন্দেহে বা বৈরাগ্যে স্তম্ভিত হইয়া রহিলাম। তাহার চেয়ে বাসন্তীকে লইয়া মুক্তির এই উজ্জ্বল প্রখর উলঙ্গতা দেখিতে শরীরে রোমাঞ্চ হইতে লাগিল।

লক্ষ-লক্ষ অমিতবিক্রম শ্বেতহস্তী আমাদের বাড়িটার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল— যে বাড়িতে বাসন্তী কার্পেট ও কৌচ বিছাইয়া ড্রয়িংরুম তৈরি করিয়াছিল, যে-বাড়ির ছোট একটি নিভৃত কোঠায় বসিয়া আমি যতো না লিখিয়াছি তাহার চেয়ে ভাবিয়াছি ও অনুভব করিয়াছি বেশি, যে বাড়িতে প্রকৃতির পরিবেশে পরস্পর দুইজনের নিগূঢ় রহস্য সন্ধানও সমাধান করিয়াছি, যে-বাড়িতে বাবা-মার অপূর্ব বিচ্ছেদ-স্মৃতির স্বপ্নটি রাখিয়া গিয়াছেন।

অথচ, আকাশে যে এখন প্রচুর নির্মেঘ জোৎস্না—এই জ্যোৎস্না রাতে আমরা দুইজনে যে শিশু-গাছের তলায় বাঁশের উপর বসিয়া কতো গল্প করিয়াছি—একথা কে বিশ্বাস করিবে?

অসহায় চোখের সামনে বাড়িটার মৃত্যু দেখিতে লাগিলাম। বড়ো বড়ো ছবি, কৌচ টেবিল-চেয়ার- আলমারি, বাসন-কোসন, খেলনা-পত্র, বিম-বরগা, ইঁট-কাঠ, জানলা-দরজা-সব যেন একসঙ্গে কানের কাছে আর্তনাদ করিয়া উঠিল। সমস্ত কিছুর যেন প্রাণ আছে, দু:খ অনুভব করিবার তীব্র ক্ষমতা আছে— আর আছে মৃত্যুর আক্রমণে আমাদেরই মতো কঠিন পরাঙ্খুখতা। কিছুতেই আশ্রয় ছাড়িবে না, মাটি আঁকড়াইয়া পড়িয়া থাকিবে, সাধ্যমতো সংগ্রাম করিবে, বাধা দিবে, আর্তনাদ করিবে। সহজে হার মানিবে না। বেগের সঙ্গে বস্তুর সেই অপরূপ যুদ্ধ দেখিতে দেখিতে সারা দেহে ভয় ও বিস্ময়ের রোমাঞ্চ হইতে লাগিল।

কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে কে কবে পারিয়াছে? ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বাড়িটার আর চিহ্ন পর্যন্ত রহিল না।

মুহূর্ত মধ্যে প্রকাণ্ড একটা মুক্তির আকাশে আসিয়া উত্তীর্ণ হইলাম। সমস্ত কিছু আকাশের মতো সাদা হইয়া গেল।

সকালবেলার দিকে সরকার-মহাশয় গরুর গাড়ি ডাকিয়া আনিলেন। যাহা কিছু অবশিষ্ট ছিল, তাহা গাড়িতে বোঝাই হইল। বাসন্তীকে লইয়া ঘুর-পথে রেল ইস্টিশান-এর দিকে রওনা হইলাম।

খড়ের ঘরে সরকারমহাশয় কিছুকাল আরো থাকিবেন ও বর্ষার শেষেও যদি পূর্ব দিকের চর মাথাচাড়া দিয়া না উঠে, তবে একদিন বাড়ির দিকে রওনা হইলেই চলিবে।

ট্রেনে চড়িয়া এতক্ষণে বাসন্তী সহজ করিয়া কথা কহিতে পারিল। আমরা কলকাতায়ই যে যাইতেছি ও আশ্রয় ভিক্ষা করিতে যে বাগবাজারে তাহার বাপের বাড়িতে গিয়া উঠিব না ইহাতে সে অত্যন্ত নিশ্চিন্ত বোধ করিল। তাহার বাবা যে আমাদের এই পরাজয়ের লজ্জাকে সগৌরবে ব্যঙ্গ করিবেন, আমার স্ত্রী হইয়া তাহা তাহার অসহ্য।

বলিতে কি, মামার কাছে গিয়াও হাত পাতিলাম না। কালীঘাটের অঞ্চলে একটা বাড়ির একতলাটা ভাড়া লইলাম। দুইখানি মাত্র ঘর—একটিতে সামান্য কয়টি রান্নার সরঞ্জাম ও অন্যটিতে মেঝের মাদুর বিছানো শয্যা ছাড়া আর কোনো উপকরণ নাই। দেয়ালে একটিমাত্র ল্যাম্প জ্বলে ও গল্প লিখিবার কথা মনে না আনিয়া সেই আলোতে বসিয়া কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখিয়া-দেখিয়া দরখাস্ত লিখি।

নদী-স্রোতের মতো সময়ও উত্তাল বেগে সমনে আগাইয়া আসিতেছে। একটা ছোট-খাটো চাকরি জোগাড় করিয়াছি—নিজেরই একার চেষ্টায়। সেই অহঙ্কারে কিছু জিনিসপত্র কিনিবার ইচ্ছা হইল। বউবাজারে কোথায় খুব সস্তায় নিলাম হইতেছে—চার টাকা দিলে অনায়াসে ঘরে একখানা করিয়া টেবিল ও চেয়ার আসে। কথাটা ভয়ে-ভয়ে বাসন্তীর কাছে উত্থাপন করিলাম। বাসন্তী ম্লান হইয়া হাসিয়া কহিল,—ভাড়াটে বাড়ি, কখন উঠে যেতে হয় ঠিক নেই, জিনিসপত্র কাঁধে করে কোথায় ঘুরে বেড়াবে? এই বেশ আছি।

টেবিল-চেয়ার আর কেনা হইল না। চার টাকা দিয়া ঠিকে একটা ঝি রাখিলে বরং কাজ দিবে।

ভাড়াটে বাড়ি। কথাটা ভুলিয়া গিয়াছিলাম। তীরের বন্ধন হইতে নদী আমাদের বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে লইয়া আসিয়াছে।

নদী আমাদের বাড়ি ভাঙিয়াছে, কিন্তু সময়ের স্রোত আমকে ও বাসন্তীকে ধীরে ধীরে জীর্ণ করিয়া ফেলিতে লাগিল।

গেল সোমবার হইতে ছোট খোকাটার জ্বর—ডাক্তার একজন ডাকিয়া আনিলে হয়। কিন্তু হোমিওপ্যাথিতে যদি সারে, মিছামিছি কয়েকটা টাকা খরচ করিয়া এমন আর বিশেষ কী লাভ হইবে? আরো কয়েকদিন যাক।

ঝি'র সঙ্গে বাসন্তী নিতান্ত খেলো শহুরে ভাষায় ঝগড়া করিতেছে। উনুনের ধোঁয়ায় ঘর-দুয়ার সব আচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে। কে যেন কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। ঝিকে তাড়াইবার জন্য তাগিদ দিতে বাসন্তী আসিল, না বাকি মাসের মাহিনা লইয়া বিদায় হইতে ঝি আসিল, সহসা বুঝিতে পারিলাম না।

আপিসে যাইবার জামাটা বাসন্তীকে কতদিন সেলাই করিয়া রাখিতে বলিয়াছি, তাহাতে তাহার গ্রাহ্য নাই। রোদে তোষক মেলিবার জায়গা নাই বলিয়া ছারপোকার কামড়ে রাত্রে একটু ভালো করিয়া ঘুমাইতেও পারি না। চাহিয়া-চিন্তিয়া তাজমহলের ছবিওয়ালা সুন্দর একটা ক্যালেন্ডার আনিয়া দেয়ালে টাঙাইয়া রাখিয়াছিলাম, দুরন্ত ছেলে দুইটা কাড়াকাড়ি করিয়া ছিঁড়িয়া দিয়াছে।

নদীর হাত হইতে রক্ষা পাইলেও সময়ের হাতে আমাদের আর নিস্তার নাই।

শুনিতেছি আপিসে কর্মচারীদের ছাঁটাই শুরু হইয়াছে। আমি এখনও কোনওরকমে টিঁকিয়া আছি—। তবে বলা যায় না। নদী আমাদের বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে লইয়া আসিয়াছে।

তবু রাশি-রাশি ফেনিল জলের থেকে এ অনেক ভালো। টাইমপিস ঘড়িটির মতো হৃৎপিণ্ড মৃদু-মৃদু ধুক-ধুক করিতেছে—কোনওরকমে যে নিশ্বাস নিতেছি এই একরকম ভালো লাগিতেছে। তীব্র সুখের মধ্যে এই যে, শত দারিদ্রেও শ্বশুরের কাছে গিয়া হাত পাতি নাই—ব্যোমকেশের সঙ্গে দেখা হইলে তাহাকেই না-হয় আরেকবার মামার পিপুলের দোকানে পাঠাইয়া দিব। সে না-জানি এখন কী করিতেছে!

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%