হ্যাংম্যান

সমরেশ মজুমদার

কাল ভোরবেলা আলি হোসেনের ফাঁসি। গত মাসখানেক ধরেই চলেছে তার প্রস্তুতিপর্ব।

বিচারক তো দণ্ড দিয়েই খালাস। তার পর থেকে শুরু হল আমাদের কাজ—আমরা যারা জেল আগলে আছি, এবং তা চলতে থাকবে ততক্ষণ না খালাস পাচ্ছে সেই দণ্ডিত কয়েদী, কখনো জেল থেকে, কখনো বা দুনিয়া থেকে।

আলি হোসেন চলে যাচ্ছে দুনিয়া থেকে। খানদানি ঘরের ছেলে। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিল চাচাতো বোনকে। সুন্দরী, অনুগত স্ত্রী। হঠাৎ কী হল! মাস তিনেক না যেতেই দিল শেষ করে। সঙ্গে সঙ্গে থানায় গিয়ে বলল, বৌকে খুন করে এলাম, যা করবার করুন। ব্যস, ওই পর্যন্তই। এর বেশি আর কোনো কথাই বেরোয়নি তার মুখ থেকে। থানায় না, কোর্টে না, উকিল বা আত্মীয় স্বজনের কারো কাছেই না। বলেছে 'কেন' দিয়ে কী দরকার আপনাদের? করেছি, এইটুকু পেলেই তো হল।

সে না করেছে আপীল, না পাঠিয়েছে মারসি পিটিসান mercy petition। হেসে বলেছিল, একটি মাত্র মারসি শুধু চাইবার আছে। যত শিগগির পারেন ঝুলিয়ে দিন।

সেদিক দিয়ে আমাদের ত্রুটি হয়নি। আপিল-টাপিলের ফ্যাঁকড়া না থাকায় ব্যাপারটা খুব তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেছে।

তাহলেও ফাঁসির একটা আয়োজন আছে এবং সে পর্বটি মোটেই ছোট নয়। সারাদিন ধরে তাই নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। তার পরেও কোথাও কোনো ছিদ্র রইল কিনা আরেকবার খতিয়ে দেখবার জন্যে রাত নটার সময় হাজির হলাম জেলখানায়।

ফটক পেরিয়ে দু' গেট এর মাঝখানে যে প্রশস্ত জায়গা সেখানে পা দিতেই একটা লোক হনহন করে এগিয়ে এল, 'সেলাম হুজুর। আমাকে একটু বেরোবার হুকুম দিন। যাবো আর আসব।'

'কে তুমি?'

'আজ্ঞে আমি মধু—মধু দাস, হ্যাংম্যান।'

ঢ্যাঙা, কালো রোগামতো লোকটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাকিয়ে দেখলাম। মাথায় টেড়ি, পরনে ফর্সা হাফশার্টের নিচে অপেক্ষাকৃত ময়লা ধুতি, পায়ে স্যান্ডাল, চোখে-মুখে ব্যস্ততা। ভোরবেলা একজিবিউশান নামে যে মহাযজ্ঞ উদযাপিত হতে চলেছে তার প্রধান হোতা এই হ্যাংম্যান। মোটা ম্যানিলা রজ্জু দিয়ে তৈরি যে কঠিন ফাঁসটি সযত্নে রাখা আছে আমার আলমারিতে, ফাঁসিমঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে সেটা আলি হোসেনের গলায় পরিয়ে দেবার অত্যাবশ্যক কাজটি ওর।

ফাঁসি-পর্বের অনুষ্ঠানে আমাদের প্রত্যেকেরই একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। জেলের অধ্যক্ষ অর্থাৎ সুপারিন্টেডেন্ট, জেলর, ডেপুটি জেলর, ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার, চীফ হেড-ওয়ার্ডার এবং সশস্ত্র বাহিনী। তাদের মধ্যে কেউ অনুপস্থিত হলে তার কাজ অন্য কাউকে দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু মধু দাসের কোনো বিকল্প নেই। ফাঁস পরাবার জন্যে তার কিছু প্রাপ্তি আছে—নগদ বত্রিশ টাকা। জেল সুপারের সই করা চিঠি পেয়ে সে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে গেছে এবং আজও সন্ধ্যার পরেই এসে হাজির হয়েছে। তার দায়িত্ব সম্পর্কে সে সজাগ। কিন্তু সে তো কয়েদী নয় যে বাইরে যাবার জন্যে আমার অনুমতি দরকার।

ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে গেটকীপারের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। সে বলল, 'বড় জমাদার সাহেব ওকে গেট-এ আটকে রাখতে বলে গেছেন।'

'কেন?'

উত্তর দিল মধু, 'পাছে মদ-টদ খেয়ে আসি, এই ভয়ে। বুঝুন একবার! আমার কি সে জ্ঞান নেই? এত বড় একটা দায়িত্ব রয়েছে মাথার ওপর।'

'বাইরে যেতে চাইছ কেন?'

'ছেলেটার অসুখ, একবারটি দেখে আসব। এই তো কালীঘাটে আমার বাসা। আধঘণ্টার মধ্যে এসে পড়বো।'

তখনো ইতস্তত করছি দেখে বললে, 'হুজুর নতুন ঢুকেছেন জেলখানায়। আমাকে দেখেননি। তামাম জেল-ডিপার্টের সব বাবুরা আমাকে চেনেন। সবখানেই আমাকে যেতে হয় তো। এই আমার পেশা। আমার বাবাও এই কাজ করে গেছেন। আমরা জাতিতে ডোম, কিন্তু কোনো ছোট কাজ করি না। মদ-টদ একটু খাই। হুজুরের কাছে মিছে কথা বলব না। কিন্তু তাই বলে আজ...

দাঁতে জিভ কেটে দু-কানে হাত দিল মধু ডোম।

আমাদের বড় জমাদার অর্থাৎ চীফ হেড-ওয়ার্ডার রাম অবতার সিং। লোকটি সব ব্যাপারেই অতি-সাবধানী। প্রায়ই দেখেছি যেখানে ধরে আনা প্রয়োজন, সেখানে সে বেঁধে আনে। অতিরিক্ত কর্তব্যপরায়ণ! এটাও তারই একাট দৃষ্টান্ত বলে মনে হল। তাছাড়া ন্যায়ত এবং আইনত এই লোকটাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটক করে রাখবার কী অধিকার আছে আমাদের?

মধুকে বললাম, 'আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরবে তো?'

হ্যাঁ হুজুর, তার আগেই চলে আসবো। শুধু ছেলেটাকে এক নজর দেখা।

আমার সরকারী কোয়ার্টারের সদর দরজায় দুমদাম শব্দ এবং সেই সঙ্গে রিজার্ভ-ওয়ার্ডারের বাজখাঁই গলা। ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। জেলর আপশন সাহেবের জরুরী তলব। একরকম ছুটে গিয়ে জেল গেট-এ ঢুকতেই গম্ভীর রুক্ষ প্রশ্ন, 'হ্যাংম্যানটাকে তুমি বাইরে যাবার পারমিশন দিয়েছিলে?'

'হ্যাঁ, স্যার। এখনো আসেনি? বলে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা যেন জমাট বেঁধে গেল। রাত বারোটা চল্লিশ। আপশন বললেন, 'নো, অ্যান্ড আই অ্যাম সারটেন, হি ওনট টার্ন আপ টু-নাইট।'

'তার বাড়িতে একবার...'

'সেখানেও নেই।'

'তার ছেলের অসুখ বলেছিল।'

'ওরকম বলে থাকে।'

কাছে একখানা চেয়ার ছিল। হাতে একটা অসহায় ভঙ্গি করে সেখানে বসে পড়ে জেলর সাহেব বললেন, 'নাউ, হোয়াট টু ডু?'

এটা প্রশ্ন নয়। হলেও, আমাকে নয়। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ পরে বললেন, 'এক কাজ কর। রিং আপ ইওরোপীয়ান ওয়ার্ডার এডওয়ার্ড, ইন দা প্রেসিডেন্সি জেল। আমার নাম করে বল, এখুনি যেন চলে আসে। ও একবার একটা ফাঁসি দিয়েছিল। হয়তো কোনো রকমে কাজটা চালিয়ে দিতে পারে।'

ভাগ্যক্রমে এডওয়ার্ডের তখন নাইট ডিউটি এবং জেল গেটেই তাকে পাওয়া গেল। আমার কথায় আসতে চায় না। আপশন গিয়ে অনেক করে বলতে শেষ পর্যন্ত রাজি হল। কিন্তু আমতা আমতা করে বলল, 'পারব কি? নাট'টাকে ঠিকমতো প্লেস করা। যদি এদিক ওদিক সরে যায়?

জেলর ভরসা দিলেন, 'যায় যাবে। সঙ্গে সঙ্গে মরবে না, কিছুক্ষণ ছটফট করবে, এইতো? তা করুক। হোয়াটস দা হার্ম?'

কথা হল, রাত ঠিক তিনটায় হাজির হবে এডওয়ার্ড।

বাসায় আর ফেরা হল না। বাকি রাতটা অফিসে বসেই কেটে গেল। লজ্জায়, দুর্ভাবনায় এবং কী এক আশঙ্কায় সমস্ত মনটা আচ্ছন্ন হয়ে রইল। শেষ পর্যন্ত কার্যোদ্ধার হবে কি? যদি না হয়?

সাড়ে তিনটায় সুপারিন্টেডেন্ট এসে পড়লেন। সঙ্গে একজন ম্যাজিস্ট্রেট! অফিসে ঢুকেই জেলরকে ডেকে পাঠালেন এবং প্রথম প্রশ্নই হল, 'হ্যাংম্যান আছে তো? বাইরে থেকেই তাঁর গলা শুনতে পেলাম এবং বুঝলাম, এবার আমার ডাক পড়বে। কিন্তু পড়ল না। সম্ভবত সময় ছিল না বলে। তখন সকলেরই চিন্তা, আগে আসল ব্যাপারটা মিটে যাক। আমার ব্যাপারটা পরে আসবে এবং যে কঠিন রূপ নিয়ে আসবে তার পূর্বাভাস, মনিব বেরোতে গিয়ে যে দৃষ্টিবাণ আমার প্রতি নিক্ষেপ করলেন, তার মধ্যেই পাওয়া গেল।

আমরা সদলবলে ফাঁসি প্রাঙ্গণে এসে পড়লাম। মাঝখানে উঁচু ঢিপির উপর সজ্জিত ফাঁসি-মঞ্চ লোহার পাত দিয়ে ঢাকা। দুধারে দাঁড়িয়ে দুটো লোহার পোস্ট এবং তার উপরে আড়াআড়ি ভাবে লাগানো একটা লোহার রড। তারই সঙ্গে ঝুলছে মোটা দড়ির ফাঁস। তার একদিকে একটা নট বা গিট লোহার বলের মতো শক্ত। ওরই কথা বলছিল এডওয়ার্ড। কয়েদিকে যখন চোখমুখে-ঢাকা টুপি পরিয়ে, পিছন দিকে হাতকড়া লাগিয়ে ওই পাতের ওপর এনে দাঁড় করানো হবে, হ্যাংম্যান তার গলায় পরিয়ে দেবে ফাঁস। এমনভাবে পরাবে, ওই শক্ত বলের মতো নটটা যেন ঠিক ঘাড়ের ওপর থাকে, যাতে করে লোকটা যখন ঢিবির ভিতরকার গর্তের মধ্যে পড়ে যাবে, এই কঠিন গিঁটটা তার ঘাড়ের হাড় ভেঙে দিতে পারে। তা না হলে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হবে না।

হ্যাংম্যানের কৃতিত্ব ওইখানে।

ওদিকে কনডেমড সেল-এর সামনে আলি হোসেন তার শেষ স্নান সেরে নিয়েছে। বাইরে থেকে এই উপলক্ষে যে মৌলবীকে আনা হয়েছে, শোনা যাচ্ছে, তার অনুচ্চ উদাত্ত কণ্ঠের কোরাণ পাঠ। এদিকে দৃশ্যপট প্রস্তুত। রিজার্ভ চীফ হেডওয়ার্ডারর মকবুল খাঁর নেতৃত্বে সশস্ত্র কোর্স 'অর্ডার আর্মস' পোজিসনে দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্চের উপর 'নায়কের' আবির্ভাব ঘটলেই শোনা যাবে তার গম্ভীর কমান্ড—'প্রেজেন্ট আর্মস।' কী তার তাৎপর্য জানি না। সম্ভবত মৃত্যু পথযাত্রীর উদ্দেশ্যে কারা-বাহিনীর শেষ অভিবাদন।

সুপারিন্টেডেন্ট মেজর ঘোষ ওয়ারেন্ট হাতে অপেক্ষা করে আছেন। দায়রা বিচারপতির দণ্ডাদেশ। শেষবারের মতো দণ্ডিতকে সেটা পড়ে শোনানো হবে। সুপারের ডান পাশে দাঁড়িয়ে নিখুঁত ইউনিফর্মে সজ্জিত জেলর এবং আমরা তাঁর ডেপুটির দল। সেল থেকে ভেসে আসা কোরান পাঠ ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। সব স্তব্ধ নিথর।

হঠাৎ পিছনে একটা চাঞ্চল্য জেগে উঠল। একজন সিপাই এবং সঙ্গে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়ল মধু ডোম,—আ গিয়া, হুজুর। কথাগুলো একটু জড়ানো। জেলর স্থান-কাল ভুলে গিয়ে দাঁত কড়মড় করে একটা অভ্যস্ত অশ্রাব্য গালি উচ্চারণ করলেন। মধু যেন শুনতে পায়নি এমনি ভাবে এগিয়ে এসে বড় সাহেবের সামনে ফৌজী কায়দায় লম্বা স্যালুট দিয়ে দাঁড়াল। তিনি ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললেন,—পারবে?

'নিশ্চয়ই পারব।'

এবার কণ্ঠে কোনও জড়তা নেই, পা দুটোও কিছুমাত্র টলছে না।

এরই নাম বোধ হয় স্থান-মাহাত্ম্য।

ঢিপির ওপর দাঁড়িয়ে আলি হোসেনের গলায় ফাঁসটা ঠিকমতো পরিয়ে দিয়ে মধু তার মুখস্থ বুলিটা আউড়ে গেল : আমার কোনো অপরাধ নিও না ভাই। আমি হুকুমের দাস। হুকুম পালন করছি...। তারপর হ্যান্ডেলে হাত দিয়ে অপলক চোখ দুটো তুলে ধরল বড় সাহেবের দিকে। তিনি হাতের রুমালখানা মাটিতে ফেলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাতল টেনে দিল হ্যাংম্যান। লোহার পাতখানা সরে গেল এবং মুহূর্ত মধ্যে নিচেকার গহ্বরের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল আলি হোসেনের দীর্ঘ দেহ। মোটা দড়িটা শুধু টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল চোখের ওপর। একটুখানি নড়ে উঠল একবার কি দুবার। তারপর একেবারে স্থির।

আমরা নির্ভাবনার নি:শ্বাস ফেলে বাঁচলাম। শেষ পর্যন্ত সব ভালোয় ভালোয় উৎরে গেছে। অপারেশন সাকসেসফুল।

তারপর সারা বাংলার বিভিন্ন জেলে মধু ডোমের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। সেই একই চেহারা, একই পোশাক। সেদিনকার ব্যাপারটার জন্যে সে বরাবর মনে মনে লজ্জিত ছিল। একদিন বলেও ফেলেছিল, 'একটু গলা ভিজিয়ে নিতে হয় হুজুর। একটা জলজ্যান্ত খুন তো। পুরো জ্ঞান থাকলে করা যায় কখনো? তবে, ঐদিন ডোজটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। তাই ফিরতে অত দেরি।'

আর কোনোদিন অবশ্য এতটুকু গাফিলতি দেখা যায়নি তার কথায়। কাজেও কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি।

ওইদিন যে তাকে আমি বিশ্বাস করে ছেড়ে দিয়েছিলাম তার জন্যে সে মনে মনে আমার উপরে কৃতজ্ঞ ছিল। যত দেরিই করুক তবু ঠিক সময়ে এসে এবং ঠিকমতো কার্যোদ্ধার করে দিয়ে সেও যে আমার মুখ রক্ষা করেছিল, তার জন্যে আমিও কম কৃতজ্ঞ ছিলাম না। দুয়ে মিলে আমাদের মধ্যে কেমন এক ধরনের অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছিল। কোনো জেল থেকে ডাক এলে গিয়ে যদি শুনত, আমি সেখানে আছি, সকলের আগে সে আমার সঙ্গে দেখা করত, 'সব খবর ভালো তো হুজুর? মা, খোকাবাবুরা কেমন আছেন?'

আমিও তার ঘরসংসারের খবর নিতাম।

কালক্রমে আমি যখন কয়েক ধাপ উপরে উঠে গেছি এবং রুমাল ফেলে দিয়ে শেষ ইঙ্গিত দেবার অধিকার লাভ করেছি তখনো আমাদের সম্পর্কটা বিশেষ বদলায়নি।

তারপর একদিন সরকারী চাকরির উচ্চ মঞ্চ থেকে নেমে এলাম। ফাঁসি-মঞ্চ পড়ে রইল পিছনে। সে রাজ্যের প্রধান পুরুষ হ্যাংম্যানের সঙ্গেও আর কোনো সম্পর্ক রইল না। মাঝে মাঝে মধু দাসের কথা (ডোম বললে সে স্পষ্টত ক্ষুণ্ণ হতো) মনে পড়ত। ধীরে ধীরে ভুলে গেলাম।

বছর কয়েক আগে একদিন কালীঘাটের মোড়ে দাঁড়িয়েছিলাম ট্রামের আশায়। সেই পরিচিত সুর, 'সেলাম হুজুর।'

চমকে উঠলাম। অনেক দিন বাদে শুনছি বলে নয়, লোকটার দিকে তাকিয়ে। লম্বা দেহটা যেন ভেঙে পড়েছে, চোখ দুটো কোটরে, চোয়ালের হাড় ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। বললাম, 'কেমন আছে মধু?'

'আর কেমন।'

'কোনো অসুখ-বিসুখ করেছিল নাকি?'

'না হুজুর, স্রেফ না খেয়ে না খেয়ে এই চেহারা। ছেলেপিলেগুলোকে যদি দেখেন, চমকে উঠবেন।'

একটা নি:শ্বাস ফেলে বলল, 'সেদিন আর নেই, স্যার। কোনও জেল থেকেই আর ডাক আসে না।'

'অন্য লোক ঠিক হয়েছে বুঝি?'

'অন্য লোক!' যেন গর্জে উঠল সে,—মধু দাস ছাড়া হ্যাংম্যান আছে নাকি বাংলাদেশে? আজকাল ফাঁসিই হয় না। আগেকার কালের সেই সব ছোকরা হাকিম তো আর নেই। তাদের বুকের পাটাই ছিল আলাদা। খুন প্রমাণ হলেই ফাঁসি। এখনকার এই বুড়ো জজবাবুদের সে সাহসই নেই। ফাঁসির হুকুম দিতে হাত কাঁপে। বসিয়ে দেয় 'যাবজ্জীবন'।

কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়। আই. সি. এস. জজদের আমলে যত ফাঁসি হতো, পরের যুগে তা অনেক কমে গেছে।

মধু যেন একটু লজ্জিত হল, 'আপনি হয়তো ভাবছেন, দলে দলে লোক ফাঁসি-কাঠে মরুক এই চাইছি আমি। তা নয়। কিন্তু দুটো-চারটেও যদি না মরে, ছেলেপিলে নিয়ে আমি বাঁচি কী করে?'

'অন্য কোনো কাজ-টাজ...'

'কী কাজ করবো বলুন? আমার বৌও এই কথা বলে—শুয়োর চরাও, লাশ কাটো, নর্দমা সাফ কর। আমার জাতের অন্য পাঁচটা লোক যা করে। শুনুন কথা। আরে, আমি যে একটা হ্যাংম্যান। বত্রিশ টাকা সরকারি ফ্রী পাই। আপনাদের মতো সাহেব-সুবোরা কত ভালোবাসেন। আমি কখনো ছোট কাজ করতে পারি?'

ট্রাম এসে পড়েছিল। উঠে পড়লাম। প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে ফুটপাত ধরে এগিয়ে গেল মধু দাস।

কয়েক মাস পরে আবার দেখা হয়ে গেল মধুর সঙ্গে। না হলেই বোধহয় ছিল ভালো।

একটা সাহিত্য সভায় নিমন্ত্রণ ছিল। হাজরা রোডে ট্রাফিক জ্যাম, এগোবার উপায় নেই। গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে ড্রাইভার কালীঘাটের একটা সরু গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। কয়েক মিনিট চলার পর দেখা গেল, সেখানকার অবস্থা আরো জটিল। ঠিক সামনেই সারা রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের গাড়ি। পিছনে হটবার জো নেই। পর পর অনেকগুলো গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের আবির্ভাব স্বভাবত:ই আমার ড্রাইভারের কৌতূহল উদ্রেক করল। নেমে গেল খবর নিতে। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, খুন কেস। একটা মেয়ে মানুষের মাথা ফেটে গেছে। মেরেছে নাকি তার স্বামী। নাম শুনলাম মধু ডোম।

মধু ডোম! তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম। পুলিশ তখন লোকজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। খোলার ঘরের বারান্দার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটা কঙ্কালসার নারীদেহ। মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কাছেই পড়ে আছে একখণ্ড রক্তমাখা কাঠ। ঘটনাটা মোটামুটি শোনা গেল।

মধু বড় একটা বাড়ি থাকে না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। দুপুরের দিকে ফিরচিল। সামনেই একটা দশ-বারও বছরের উলঙ্গ ছেলে ম্যানহোলের ভিতর থেকে উঠে দাঁড়াল। সর্বাঙ্গে ময়লা। প্রথমটা চিনতে পারেনি মধু। তারপর একটু ঠাহর করে দেখল, তারই ছেলে। তেড়ে উঠল, 'একাজ করতে কে বলেছে তোকে?'

'মা।'

'মা! চল, বাড়ি চল। ম্যানহোলে ঢুকতে লজ্জা করে না?'

ছেলে গ্রাহ্য করল না। বাকি লোকগুলোর সঙ্গে ওদিকটায় চলে গেল।

হনহন করে বাড়ি ফিরল মধু দাস। সামনেই পেল বৌকে। শাসিয়ে উঠল, 'কার হুকুমে আমার ছেলেকে ওই নোংরা কাজ করতে পাঠিয়েছিস?'

বৌও সমানে তেড়ে জবাব দিল, 'পাঠিয়েছ, বেশ করেছি। তিনদিন হাঁড়ি চড়েনি, এদিকে...'

'তাই বলে হ্যাংম্যানের ছেলে নর্দমা সাফ করবে!'

'অ্যাংম্যান!' শ্লেষে বিদ্রূপে ফেটে পড়ল বৌ, 'তোর অ্যাংম্যানের মাথায় মারি ঝাড়ু।'

'মুখ সামলে কথা কস।' বলে, একটা কুৎসিত গালাগালি যোগ করল শেষের দিকে।

বৌটারও মাথার ঠিক ছিল না। তেড়ে এল এবং মুখ থেকে যা বেরোল তাও কম কুৎসিত নয়।

মধুর হাতের কাছে ছিল একটা কাঠ। তুলে নিতেই বৌও একটা কি ছুঁড়ে মারল ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে কাঠটা তার মাথায় গিয়ে পড়ল। এক ঘায়েই খতম।

আশপাশের বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে এসে দেখল, বৌয়ের রক্তাক্ত দেহটার দিকে শূন্য বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মধু ডোম। তারপর ধীরে ধীরে ভিতরে গিয়ে ঢুকল।

পুলিশ এসে বাড়িতেই পেয়ে গেল আসামীকে। রান্নাঘরের আড়া থেকে ঝুলছে।

জীবনে অনেক ফাঁকি দিয়েছে হ্যাংম্যান। শেষ ফাঁস পরিয়ে দিল নিজের গলায়। দামী ম্যানিলা রোপ আর কোথায় পাবে? নট-ফটের ঝঞ্ঝাটও ছিল না। বৌয়েরই একটা ছেঁড়া শাড়ি পাকিয়ে দড়ি বানিয়েছে এবং গলায় পরে ঝুলে পড়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%