সমরেশ মজুমদার

দুটো বেণী দিয়ে গড়া প্রকাণ্ড খোঁপায় ফুলের মালা জড়ানো, হাতে ভারী ওজনের মোটা মোটা কঙ্কণ, মিহি ক্রেপের শাড়ির জমকালো টিসুর আঁচলটা অবহেলায় পিঠে ফেলা, পায়ের জুতোয় আর হাতের ভ্যানিটি ব্যাগে শ্রীনিকেতনী শিল্পচাতুর্য—অতি আধুনিকার একখণ্ড নিখুঁত নমুনা কৃশাঙ্গী কস্তুরী, গাড়ি থেকে নেমে যেন হালকা হাওয়ার মতো ভেসে বাড়িতে উঠে এলো।
উঠেই আসতে হয়, রাস্তা থেকে বাড়িটা উঁচু।
প্রদীপ বলে 'বাইশতলা দেশ'।
মিথ্যে বলে না। উপরে-নীচে এখানে-ওখানে পথ আর বাড়ির যেন গোলকধাঁধা।
কস্তুরীকে দেখে প্রদীপের একাধারে গৃহরক্ষক দেহরক্ষক সেসব পালক সবকিছু, পাহাড়ি বালক নানকুটা হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকে। তার চাকরি-দশায় এহেন অপরূপ আবির্ভাব কখনও ঘটেনি।
কস্তুরী ওর স্তম্ভিত ভাবটা উপভোগ করে আরও যেন ঝড় বইয়ে দেয়—ঘরে আবার চাবি লাগানো কেন রে? কী মুশকিল! খোল খোল!
বলা বাহুল্য এমন দরাজ হুকুমের পর ইতস্তত করা সম্ভব নয়। নানকু সসম্ভ্রমে দোরটা খুলে দেয়।
ভ্যানিটি ব্যাগটা দোলাতে দোলাতে দিব্য সপ্রতিভ ভাবে ঘরে ঢুকে পড়ে কস্তুরী।
আর ঢুকেই প্রদীপের টেবিলের কাজগপত্র উল্টে-পাল্টে তচনচ করতে থাকে। কবি কোথায় কিছু লিখে ছড়িয়ে রেখে গেছে কি না।
ও বাবা! প্যাডের মধ্যে এ যে চিঠি! কস্তুরীকে মনে আছে তাহলে! আজ মাস দুই-আড়াই তো প্রায় চিঠিপত্র বন্ধ। মাঝে মাঝে দু-এক ছত্র যা পাঠায় সে আর চিঠি নয় নেহাতই দায়সারা কুশলবার্তা।
আরে এ যে রীতিমতো সাহিত্য!...চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ে প্যাডটা খুলে ধরে কস্তুরী, তর সয় না।
বাসরে, এসব আবার কি লিখছে প্রদীপ!
'—রাত জেগে তোমায় চিঠিটা লিখছি কস্তুরী—রাত্রে আজকাল জেগেই থাকি। প্রায়, কিছুতেই কেন জানি না ঘুম আসতে চায় না। তবু এই জেগে থাকা আমার খারাপ লাগে না। মনে হয় রাতে ঘুমিয়ে থেকে ভারী ভুল করি আমরা। ঘুমিয়ে থাকি তাই পৃথিবীর সমস্ত রহস্য আমাদের অজানা থেকে যায়। আমরা যখন সারাদিন স্থূল প্রয়োজনের তাগিদে ছুটোছুটি করে মরি, তখন ঘৃণায় করুণায় বোবা পৃথিবী নিশ্চল দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে।
রাত্রে যদি ঘুমিয়ে না পড়ে আমার মতো জানলায় এসে বসো কস্তুরী, তাহলে অনেক কিছু জানতে পারবে। জ্ঞানের পরিধি কত বেড়ে যাবে তোমার। ভারী আশ্চর্য লাগবে সুদীর্ঘকাল ধরে রাত্রিটা ঘুমিয়ে নষ্ট করে এসেছ বলে।
তুমি কি জানো কস্তুরী, রাত্রির অন্ধকারে অরণ্যে যে মর্মর ধ্বনি ওঠে সে ধ্বনি কিসের? তুমি হয়তো আজও জানো না সেকথা, আমি জানি...
পাতায় পাতায় বাতাসের লীলামৃগয়ার মুখর চপলতা সে নয়, সে ধ্বনি কোটি কোটি অশরীরি আত্মার বিক্ষুব্ধ আর্তনাদ। প্রতিদিন প্রতিরাত্রে মুহূর্তে মুহূর্তে নিষ্ঠুর নিয়মের নিষ্করুণ আকর্ষণে যে সব হতভাগ্যরা আশা-আকাঙ্ক্ষার ভরাপাত্র নামিয়ে রেখে এই শোভাসম্পদময়ী ধরণী থেকে অসময়ে স্খলিত হয়ে পড়ে যাচ্ছে—অনন্ত শূন্যের ক্ষুধার্ত জঠরে, দলে দলে উঠে আসে তারা, অন্ধকারের অসাবধান অবসরে। উঠে আসে—ছেড়ে-যাওয়া পুরোনো পৃথিবীর বুকে। উঠে এসে অবাক হয়ে যায় তারা! বেদনায় বিদীর্ণ হয়ে যায়! ধিক্কারে স্তম্ভিত হয়ে যায় পৃথিবীর দুর্ব্যবহারে।...এসে চিনতে পারে না কিছু, খুঁজে পায় না নিজের পুরনো জায়গাটাকে। বুঝতে পারে না—কোথায় হারিয়ে গেল, তাকে হারিয়ে ফেলার গভীর ক্ষতচিহ্নটা? জানত না—মমতাহীনা পৃথিবী হারিয়ে ফেলবার সঙ্গে সঙ্গেই নিমিষে মুছে ফেলে ক্ষতির সকল চিহ্ন। নতুন করে নিজেকে সাজিয়ে নেয় আগামী নতুনের জন্য।...
কাউকে হারিয়ে ফেলে হাহাকার করতে বসবে এত সময় পৃথিবীর হাতে নেই।...
বুঝতে পেরে ওরা ক্ষুব্ধ অপমানে দলে দলে গিয়ে জড়ো হয় অরণ্যে অরণ্যে। পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়ে ওদের হতাশ হাহাকার। যেন মাথা কুটে কুটে সাড়া তুলতে চায় মমতাহীনার প্রস্তরীভূত বক্ষপঞ্জরে। বুঝি মনে পড়িয়ে দিতে চায়...'আমি ছিলাম' 'আমি ছিলাম'...'একদা তোমার এই শোভাসম্পদের উপর ষোলো আনা অধিকার ছিল আমার, এমন নির্মম ঔদাসীন্যে আমাকে ভুলে যেও না।' এক সময় ফিসফিস করে কথা কয়ে ওঠে নিজেরা নিজেরা। নিশ্বাস ফেলে বলে—'ভুলে গেছে আমাদের!...আমরা নেই!' তখন হয়তো ক্ষণকালের জন্যে অরণ্যানী স্তব্ধ হয়ে যায়, শুধু একটা অনুচ্চারিত 'হায় হায়' স্থির হয়ে থাকে।
আবার আছড়ে এসে পড়ে নতুন দল।
আবার তাদের ভারাক্রান্ত নিশ্বাসে পাতায় পাতায় ওঠে মর্মর শিহরণ। সারা রাত্রি ধরে চলে এই আনাগোনা, এই মাতামাতি।
নিরুপায় অরণ্যকে সমস্ত রাত ধরে সহ্য করতে হয় অশরীরি আত্মাদের এই অদ্ভুত আক্রমণ। ঊষার আলো ফুটলে তবে অরণ্যের মুক্তি, তখন সে নিশ্বাস ফেলে বাঁচে।
প্রেতাত্মারা আলোর আভাসে সচকিত হয়ে ওঠে, বুঝতে পারে জীবিত প্রাণীর রাজ্যে এ তাদের অনধিকার প্রবেশ। বুঝতে পেরে ম্লান মুখে বিদায় নেয় তারা।
আমার এই অদ্ভুত কল্পনার খবর পেয়ে তুমি কি হাসছ কস্তুরী?...ভাবছ দিনের আলোয় কি অরণ্যে মর্মরধ্বনি ওঠে না?...
ওঠে বইকি। ওঠে!
সে ধ্বনি শাখাপত্রে বাতাসের লীলা চাপল্যের। তখন কেউ ফিসফিস করে কথা কয়ে ওঠে না।...কস্তুরী, দিনের আলোয় তুমি যদি অরণ্যের জটিলতায় ঘুরে বেড়াতে চাও, তখন যে শব্দ তুমি শুনতে পাবে, সে নিতান্তই তোমার নিজেরই পায়ের চাপে শুকনো পাতা গুঁড়িয়ে যাওয়ার শব্দ। তখন রহস্যহীন মৌন অরণ্য গম্ভীর মুখে চেয়ে থাকবে তোমার দিকে। সারা রাত্রির মাতামাতির ইতিহাস দেখতে পাবে না তার মুখের কোনও রেখায়।
কস্তুরী, অরণ্যের এত কাছাকাছি কখনও থেকেছ তুমি, যেখান থেকে জানলা খুললেই বনের গন্ধ পাওয়া যায়? গভীর রাত্রে বিছানা থেকে উঠে এসে জানলায় দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করেছ অরণ্য-মর্মরের সত্যকার ইতিহাস?
না না!
নিশ্চয় তুমি এসব দেখোনি কস্তুরী, নিশ্চয় শোন নি এসব! যদি শুনতে পেতে—তাহলে পরীক্ষায় একটা বাড়তি ডিগ্রি আর কিছু পরিমাণ বেশি নম্বর আহরণের আশায় ইট-কাঠের অরণ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থেকে অমন দুরূহ তপস্যায় মগ্ন থাকতে পারতে না। তোমার এই তপস্যাটা কী হাস্যকরই আজ লাগছে আমার কাছে! আকাঙ্ক্ষার পরিধি কতো ছোট হয়ে গেছে আমাদের, ভাবলে তোমার বিস্ময় লাগে না কস্তুরী?
পড়ে হাসছ?
কিন্তু সত্যি বলছি, কেন জানি না রোজ রাত হলেই এই অদ্ভুত কল্পনায় যেন পেয়ে বসে আমাকে। কী হাস্যকর লাগে নিজেদেরকে!...কী তুচ্ছ লাগে দৈনন্দিন জীবন-সংগ্রামের সহস্র খুঁটিনাটি!...
কিছুদিন আগে একটা ঘটনা ঘটে গেল এখানে—চিঠিতে খুলে লেখবার উপায় নেই। দেখা হলে বলব। আমার মনে হয়, হয়তো এ সমস্ত সেই ঘটনারই প্রতিক্রিয়া। সত্যকার একটা পরীক্ষা না এলে—'
প্যাডটা উলটে-পালটে দেখে কস্তুরী। না: আর কোথাও কিছু লেখা নেই। নিশ্চয় রাত্রে লিখতে-লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কবি, তারপর ভোর না হতেই ছুটেছেন চাকরী বজায় রাখবার কঠোর তপস্যায়।
মৃদু একটু হাসি ফুটে ওঠে কস্তুরীর ঠোঁটের কোণে।
আহা বেচারা! ও কি জানতো সাড়ে তিনশো মাইল দূর থেকে হঠাৎ এসে পড়ে কস্তুরী ওর কাব্যির ওপর হানা দেবে?... নিশ্চয় আবার আজ রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সেরে দু-চারটে সিগারেট ধ্বংস করে নিয়ে মৌজ করে বসে অসমাপ্ত চিঠিখানা শেষ করতো কথার জাল বুনে বুনে। মধুর রসের প্লাবন বইয়ে ফেলেও কস্তুরীকে ভাসিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলেই বোধহয় এবারে অদ্ভুত রসের আমদানী করতে শুরু করেছে প্রদীপ!
অরণ্য-মর্মরের সত্য ইতিহাস!'
রৌদ্রদগ্ধ বহির্প্রকৃতির দিকে একবার তাকিয়ে দেখে আর একবার হেসে ওঠে কস্তুরী। আহা বেচারা রে! শক্তিসামর্থ্যওয়ালা এতোখানি লম্বা-চওড়া পুরুষ জাতটাকে 'বিরহ' জিনিসটা কী কাবুই না করে ফেলে!...তা' নয়তো সমস্ত দিন খেটে-পিটে এসে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব কিনা মাঝ রাত্রে জানলা খুলে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বঞ্চিত আত্মাদের অতৃপ্ত হাহাকার শুনতে বসেন!
মাথা খারাপ! কিন্তু 'ঘটে যাওয়া ঘটনাটা' কি?
প্যাডটা চাপা দিয়ে রেখে ভ্যানিটি ব্যাগটা লুফতে লুফতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে কস্তুরী। বাচ্চা চাকরটাকে ডাক দিয়ে প্রশ্ন করে—ওহে বীরভদ্র, তোমার 'সাহেব' কখন ফিরবেন জানো?
পাহাড়ি ছেলেটার ভাগ্যে এমন একটি গরীয়সী প্রশ্নকারিণী কখনো জুটেছে কিনা সন্দেহ। তবে সে বিগলিত কৃতার্থে একগাল হেসে ভাঙা বাংলায় যা বলে সেটা কস্তুরীর পক্ষে খুব হৃদয়গ্রাহী হয় না। সন্ধ্যার আগে প্রদীপের ফেরবার কোন আশাই নেই নাকি।
আর এখন সবে বেলা এগারোটা।
অর্থাৎ কমপক্ষে এখনও ঘণ্টা-সাতেক একা থাকতে হবে কস্তুরীকে! ট্রেনে এলে এইটি হতো না! যথারীতি খবর দিয়ে বেরিয়ে, অধীর আগ্রহে স্টেশনে অপেক্ষমান প্রদীপের কাছে এসে নেমে পড়তে পারলেই হয়ে যেত। অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যে দিশেহারা প্রদীপের সেই চেহারা কল্পনা করতে পারছে কস্তুরী।
তা নিজেই বসে কি কম কবিত্বটা করে বসেছে? যেই ইচ্ছে হল আকাশে উড়ে চলে এল! হঠাৎ এসে পড়ার মজাটাই মনে রেখেছে, অসুবিধেটা ভেবে দেখে নি তো!
এতক্ষণ কি করবে সে? স্নান আহার সেরে নিয়ে দিব্যি নিটোল একটি ঘুম দেবে?
আরে ছি:, অসম্ভব!
তবে?
জুতোর চাপে শুকনো পাতা গুঁড়িয়ে গুঁড়িয়ে বেড়িয়ে বেড়াবে বনের ধারে ধারে?
উঁহু, রক্ষে করো বাবা!
তাহলে?
প্রদীপের ঘর-সংসার তচনচ করে নতুন করে গোছাতে বসবে? 'পুঁথিগতপ্রাণা' হলেও কস্তুরী যে গৃহিণীপনার অযোগ্য নয়, একথা প্রমাণ করে দেবে প্রদীপের কাছে?...থাকগে যাক, কে অকারণ অতো খাটে! সংসার করতে যখন আসবে দেখিয়ে দেবে একেবারে।...তবে কি ওর খাতাপত্র বই-কাগজ তল্লাস করবে বসে বসে? আরো কি কি উদ্ভট পাগলামির নমুনা সংগ্রহ করতে পারা যায় তাই দেখতে?
দূর! মজুরি পোষাবে না!
সব থেকে ভালো, যত ইচ্ছে আলিস্যি করে স্নানাহারপর্ব সেরে এই চাকরটার সঙ্গে গল্প জমানো।...হোক না বালকমাত্র, তবু কৃতার্থ হয়ে যাবে সন্দেহ নেই। শিথিল ভঙ্গীতে খোঁপাটা খুলতে খুলতে ভ্রূভঙ্গী করে বলে—
—এই হাঁদারাম, তোর সাহেবের ঘরবাড়ি সব তো এক কথায় আমার হাতে ছেড়ে দিলি, বল দিকিন আমি কে?
'হাঁদারাম' ঘাড় হেলিয়ে বলল—জানি, মেমসাহেব!
—চমৎকার! কে তোকে বলল শুনি?
—কেউ বলল না। আমি বুঝছি।
—বেশ করছ। যাও এখন স্নানের জল দাও দিকি? হুঁ, তা'পর তোদের এখানে কিছু খেতে-টেতে পাওয়া যাবে তো?
—খুব!—যতোটা সম্ভব ঘাড় হেলিয়ে জবাব দেয় নানকু।
ভারী আশ্বাসের সুর ছেলেটার কণ্ঠে!
কস্তুরী হেসে ফেলে বলে—শুনে বাঁচলাম। তা' কি খেতে দিবি একেবারে জেনেই প্রাণ শীতল করে যাই। কি আছে তোদের ভাঁড়ারে?
কথার সুখেই কথা কওয়ায় খুশির পাত্র উপচে পড়লে এমনই হয় বোধহয়। পাহাড়ী ছেলেটা কস্তুরীর কৌতুক কথার অর্থ বুঝুক না বুঝুক, তবু উপযুক্ত শ্রোতার অভাবে ওর সামনেই নিজেকে ঝলসে তুলবে কস্তুরী।...গানের সুরের মতো হেসে উঠবে অকারণ, গেয়ে উঠবে এক লাইন গান। কথা বলবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত।
প্রদীপ অনুপস্থিত। তবু সারা বাড়িতে তো তার উপস্থিতির বাতাস বইছে! এ বাড়ি কস্তুরীর, এ সংসারের ওপর যথেচ্ছ কর্ত্রীত্বের দাবি কস্তুরীর, ভাবতে কি অপূর্ব রোমাঞ্চ!
সত্যি! বইখাতা নিয়ে তখন চলে এলেই হতো প্রদীপের সঙ্গে।...নাইবা অনার্স নিত, নাইবা হতো ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট!
কী লাভ হবে তাতে? কী ক্ষতি হত এম-এটা যদি নাই দিতো? প্রদীপ 'বেচারা', না কস্তুরী নিজেই 'বেচারী?'
খোলা চুল আঙুলে জড়াতে জড়াতে কস্তুরী হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে—কই বল শুনি?
ছেলেটা মহোৎসাহে জানায়—চাল-ডাল আলু পিঁয়াজ ডিম মাখন ঘি আটা—কোন বস্তুরই অভাব নেই সাহেবের ভাঁড়ারে। তবে যদি মেমসাহেবের মুরগির মাংস খাবার বাসনা থাকে, কিঞ্চিত সবুর করতে হবে।...অবিশ্যি বেশি নয়, ছুটে গিয়ে ওই বনের ধারে মনিহারীর বউকে খবর দিয়ে আসতে যা দেরি।
—মনিহারীর বউ? সে আবার কে?
সাধারণ কৌতূহলে প্রশ্ন করে কস্তুরী। কিন্তু উত্তর শুনে কৌতূহল আর সাধারণ থাকে না, ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
মনিহারীর বৌ!
সেই যে মনিহারী, সাহেবের 'টুরে' বেরোনোর সময় তলপী বইত, সাহেবের গাড়ি আর বন্দুক সাফ করত, যে মারা পড়ল—সাহেবেরই সেই বন্দুকের গুলিতে! তারই বউ!...সাহেবের প্রাণ বাঁচাতে পুলিশের কাছে মিছে কথা বলেছে বলে ওর আত্মীয়-কুটুমেরা একঘরে করে দিয়েছে কিনা।...ওই বনের মধ্যে একটা চালা তুলে নিয়ে একা থাকে সে এখন—মুরন্ধগ পোষে, ডিম বেচে, বেতের চুপড়ি বোনে।
তাকে একবার খবর দিতে পারলেই কস্তুরীর বাসনা পূর্ণ হয়।...এমনকড় ও এসে মাংস রান্না করে দিয়ে যেতে পারে পর্যন্ত। খুব ভালো রাঁধে ও। কতদিন রান্না মাংস চুপিচুপি রেখে যায় সাহেবের জন্যে, সাহেব না জেনে তারিফ করেন এই আনাড়ি ভূত নানকুকে।
আঙুলের আগায় খোলা চুলের গোছা এঁটে এঁটে বসেছে, লাল হয়ে উঠেছে আঙুলের ডগা।...কিন্তু মুখটা? মুখটা অমন লাল হয়ে উঠেছে কেন কস্তুরীর? অদৃশ্য কোন রজ্জুতে কেউ ওর কণ্ঠনালীটা কি জড়িয়ে জড়িয়ে পাক দিচ্ছে? ও বসে পড়েছে—উঠোনে পড়ে থাকা তেলচিটে খাটিয়ার ওপর! ধুলোয় লুটোচ্ছে দামি শাড়ির ঝকঝকে আঁচলটা। এই তবে ঘটনা?
অনেক কষ্টে কণ্ঠস্বরকে এইটুকু মুক্তি দিতে পারে কস্তুরী—ও—এই মনিহারী গুলি খেলো কেন?
ছেলেটা অকপট সরলতায় ব্যক্ত করে, যদিও অপরের কাছে বলতে মানা কিন্তু কস্তুরী যখন নিতান্তই সাহেবের নিজের মেমসাহেব, তখন বলতে বাধা নেই। পুলিশ জানে বটে বন্দুক সাফ করতে গিয়ে হঠাৎ ভুলক্রমে গুলি ছুটে মারা গেছে মনিহারী, ওর বউও বলেছে সেই কথা পুলিশের কাছে, কিন্তু আসল কথা তা নয়! রাতের অন্ধকারে সাহেব ওর চোখ দেখে বনবিড়াল ভেবে ভয় খেয়ে গুলি করেছেন।
—ভয়? কিসের ভয়! মানুষকে বনবিড়াল ভাববার মানে? আর্ত চিৎকার করে ওঠে কস্তুরী।
ছেলেটা হতাশ ভাবে দুই হাত উলটে বলে—কি জানি মেমসাহেব। ও পাগলটা কেন যে রাতভোর জেগে জেগে সাহেবের জানলায় চোখ রেখে ঘর পাহারা দিত কে জানে! ওর চোখ দুটো ছিল ঠিক বনবিড়ালের মতো। রাতে আগুনের মতো জ্বলত।...ঘুমের ঘোরে উঠে সাহেব হঠাৎ ভয় খেয়ে—
ধীরে ধীরে ধাতস্থ হচ্ছে কস্তুরী।
গম্ভীরভাবে বলে—তা ওর বউ পুলিশের কাছে মিছে কথা বলতে গেল কেন?
ছেলেটা যেন কস্তুরীর অজ্ঞতায় অবাক হয়ে যায়। নিজে নিতান্ত বিজ্ঞের মতো বলে—না বললে সাহেবের নামে কেস হত না?
—হতোই বা! উদ্ধত স্বরে বলে কস্তুরী—সাহেবের ফাঁসি হলে ওর কি লোকসান ছিল? ওর নিজের স্বামী খুন হয় গেল—
ছেলেটা নিজের ঠোঁটের উপর একটা আঙুল ঠেকিয়ে কণ্ঠস্বর খাটো করবার ইঙ্গিত জানায় কস্তুরীকে। চুপিচুপি প্রতিপ্রশ্ন করে—সাহেবের ফাঁসি হলে ওর আদামি বেঁচে উঠতো?
এত বড়ো মহৎ প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষের কাছে থাকে না। কিন্তু কস্তুরী কেন সেই মহানুভব নারীর কাছে কৃতজ্ঞ হচ্ছে না? যার একটিমাত্র কথায় ফাঁসি হয়ে যেতে পারত কস্তুরীর স্বামীর! সে সুযোগ গ্রহণ না করে যে নিজের স্বামীহন্তার প্রাণরক্ষা করেছে!
বরং আরো রুক্ষ আরও ক্রুদ্ধ স্বরে মন্তব্য করে বসে কস্তুরী—নাই-বা বাঁচল—মানুষ খুন করলে ফাঁসি হওয়াই তো উচিত!
পাহাড়ি ছেলেটা চমকে মুখ তুলে এক নিমিষ তাকিয়ে থাকে কস্তুরীর মুখের দিকে। তারপর গম্ভীরভাবে বলে চলে যায়—গোসলখানায় জল দিচ্ছি।
সাত ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না, বেলা তিনটের মধ্যেই এসে পড়ে প্রদীপ। এরোড্রোমের এক ছোকরা কর্মচারী কি সূত্রে যেন চিনত কস্তুরীকে, সেই স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে খবর দিয়েছে প্রদীপকে।
ছুটে এসেছে প্রদীপ গাড়িখানার 'হাওয়া গাড়ি' নাম সার্থক করে। ছুটে এসেছে বিস্ময় আনন্দ আর উৎসাহে জ্বলজ্বল করতে করতে। না: নিজেকে আর আটকে রাখতে রাজি নয় সে, ছোকরা চাকরটার সামনেই কস্তুরীকে প্রায় জড়িয়ে ধরে আর কি!
কিন্তু আশ্চর্য!
কস্তুরী কী কঠিন আর কী নিরুত্তাপ!
জমাট কঠিন হিমশীতল এক খণ্ড বরফ স্বামীকে উপহার দেবে বলেই কি এই হিম পাহাড়ের দেশে ছুটে এসেছে কস্তুরী? রোদপড়া বরফের মতোই কী ভয়ানক ঝকঝক করছে ওর ডাসা উজ্জ্বল চোখ দুটো!
—কি হল কস্তুরী? শরীর খারাপ লাগছে?
—শরীর? হেসে ওঠে কস্তুরী—আশ্চর্য রকমের ভালো লাগছে। পাহাড়ে হাওয়ায় এখুনি খিদে বেড়ে যাচ্ছে!
প্রদীপ ব্যথিত স্বরে বলে—এলে যদি তো অমন দূরে কেন কস্তুরী? কী অদ্ভুত লাগছে তোমাকে! 'তুমি' বলে যেন চেনাই যাচ্ছে না!'
কস্তুরী আর একবার হাসির ঝিলিক দিয়ে ওঠে—রাত জেগে ক্ষুধিত আত্মার নিশ্বাস শুনে শুনে তোমার পার্থিব দৃষ্টিটা কিছু খাটো হয়ে গেছে বোধহয়।
—ও:! তুমি আমার চিঠিটা পড়েছ বুঝি?...চমকে ওঠে প্রদীপ।...ওসব আমার অর্থহীন পাগলামি! দেখলে কেন? লিখেছিলাম তোমাকে, কিন্তু পাঠাতাম না। তুমি এসেই সব দেখে ফেললে?
—অন্যায় হয়ে গেছে না?
কস্তুরী বাঁকা কটাক্ষে বলে—হঠাৎ বড়ো অসুবিধেয় পড়ে যেতে হল কেমন? যাক কালই ফিরছি, বেশি অসুবিধে বাড়াব না।
ব্যাকুল প্রদীপ এ রহস্যের মীমাংসা করতে পারে না।
এমন হঠাৎ এসে পড়ল কেন কস্তুরী? এসেছে যদি তো এমন দূরত্বের আবরণে ঘিরে রেখেছে নিজেকে? কেন ওর স্বভাবসিদ্ধ প্রগলভতায় বেপরোয়াভাবে স্বামীর কণ্ঠলগ্ন হয়ে ঝুলে পড়ে বলছে না—'কী মজা করলাম বলো তো? কেমন জব্দ! চিঠি না দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকবে আর?'
যাক গে। এখন আর রহস্যভেদের চেষ্টা করে লাভ নেই।
রাত্রিটা তো হাতে আছে—সমস্ত দ্বন্দ্ব সমস্ত বাধা, যতো কিছু অভিমান আর ভুল বোঝার মধুর পরিসমাপ্তির আশ্বাস নিয়ে! এখন চলুক সাধারণ আতিথ্যের পালা।
তা সেটা উভয় পক্ষেই চলে। ভদ্রতা আর সৌজন্যের কে কত নিখুঁত অভিনয় করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলে যেন।...চা খাওয়া সারা হতে বেলা পড়ে যায়।
প্রদীপ বলে—চলো কস্তুরী, বেড়িয়ে আসা যাক একটু।
—বেড়াতে? কোথায়?
—বনে-জঙ্গলে যেখানে তোমার খুশি। আজ সব তোমার ইচ্ছেয়—
কস্তুরী তীক্ষ্ণ হেসে বলে ওঠে—বনের পথটা তোমাকে ভীষণভাবে টানে, তাই না?
প্রদীপ একটু থতমত খেয়ে ওর দিকে তাকায়, তারপর অবাক হয়ে বলে—ঠিক বলেছ কস্তুরী! সত্যিই, অরণ্য যেন অবিরত আমাকে আকর্ষণ করতে থাকে। কেন বলো তো?...নিজেই বুঝতে পারি না আমি কেন এমন হই। কতদিন—মাঝরাতে ইচ্ছে করে বেরিয়ে পড়ি, দেখি কি রহস্য লুকোনো আছে ওখানে। কেন কিছুতেই ওকে ভুলে থাকতে পারি না আমি! তুমি বলতে পারো কস্তুরী, কেন এমন হয়?
—পারি! গম্ভীরভাবে উত্তর দেয় কস্তুরী, বুনো পাহাড়ি মেয়েরা অনেক কিছু মন্ত্রতন্ত্র তুকতাক জানে।
—ওর মানে? ও আবার কি একটা যা খুশি উত্তর হল? ওকথা বললে যে—
—বললাম এমনি। চলো চলো। দেখে, আসি—তোমার অরণ্যের আত্মাকে।
—দূর ছাই! প্রদীপ চেষ্টাকৃত লঘু স্বরে বলে—কি দু-পাতা ছাই-পাঁশ বাজে কথা লিখে রেখে তোমার মাথাটাকেই বিগড়ে দিয়েছি দেখছি।
বেড়াতে বেড়াতে সন্ধ্যা পার হয়ে যায়।
কৃষ্ণপক্ষের মৃদু জ্যোৎস্না গাছের ফাঁকে ফাঁকে কোথাও হাল্কা, কোথাও ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।...পায়ের চাপে চাপে শব্দ উঠছে শুকনো পাতা গুঁড়িয়ে যাওয়ার।
আগে কিছু কিছু কথা হচ্ছিল, ক্রমশ বন্ধ হয়ে গেছে।
নির্বাক দুটি প্রাণী যেন কোন অমোঘ বন্ধনে বন্দি হয়ে যন্ত্রের মতো চলেছে পাশাপাশি।
হঠাৎ এক সময় মৃদু একটু হেসে কস্তুরী বলে ওঠে—দেখো অরণ্যের জটিলতায় পথ হারিয়ে ফেলবে না তো?
প্রদীপ দাঁড়িয়ে পড়ে। একটু চুপ করে থেকে স্থির স্বরে বলে—বোধ করি অমনি কোন সন্দেহ তোমার পথকে জটিল করে তুলছে কস্তুরী। কিন্তু নিশ্চিন্ত থেকো আমার পথ হারাবে না। আমার ধ্রুবতারা আছে।
—কই? কোথায়?
একটু দুর্বল আর ফ্যাকাশে শোনায় কস্তুরীর গলা।
—বা:, বলে খেলো হব কেন? সে হল নিজের জিনিস।
উত্তর দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে কস্তুরী। সভয়ে বলে, বনের ভেতর ওখানে আলো কিসের?
—আলো নয় আগুন। শুকনো পাতা জ্বেলে ভাত রাঁধছে...ওকি ওকি পাথর ছুঁড়ছ কেন?...কী সর্বনাশ! —হঠাৎ একি—
পথ থেকে কুড়িয়ে নেওয়া ভারী পাথরের টুকরোটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে কস্তুরী প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে বলে—দেখতে পাচ্ছ না। ওখানে কি যেন একটা বুনো জানোয়ার বসে রয়েছে?
—কী ভয়ানক! ও যে মনিহারীর বউ! ওই তো পাতা জ্বেলে ভাত রাঁধছে। কিম্ভূত মতো বিশ্রী জোব্বাজাব্বা পরে আছে বলে ওইরকম দেখাচ্ছে। ওর গল্প করবো তোমার কাছে।...এখন বলছ জানোয়ার, শুনে বলবে দেবতা।...ও আমার প্রাণদাত্রী তা জানো? আচ্ছা—এখন পরিচয় করিয়ে দিই, পরে সব বলব! ওরে এই বউ! এ—মনিয়ার বউ রে—
পায়ে পায়ে দুজনেই বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে ততক্ষণে।
সাড়া পেয়ে আগুনের কাছ থেকে উঠে আসে মানুষটা। উঠে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। কথার উত্তর দেয় না, নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটো মানুষের দিকে।...
গাছের সারি এখানে পাতলা, জ্যোৎস্না যেন খানিকটা হাঁফ ফেলে বেঁচেছে। সেই মৃদু জ্যোৎস্নায় সামনাসামনি স্থির হয়ে থাকে দু-জোড়া চোখ।
খুব স্পষ্ট কিছুই দেখা যায় না।...অস্পষ্ট হয়ে গেছে শিফন শাড়ি, ওমেগা ঘড়ি, জয়পুরী কঙ্কণ আর শান্তিনিকেতনী বটুয়া...অস্পষ্ট হয়ে গেছে বহু ব্যবহৃত ঘাগরার গায়ে বেরঙা ছিটের তালি, দড়াদড়া সেলাই! অস্পষ্ট হয়ে আছে সমস্ত পরিবেশ!
স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শুধু দু-জোড়া চোখ।
কি আছে সে-চোখে?
প্রভু-পত্নীর প্রতি সসম্ভ্রম সমীহ?
স্বামীর প্রাণদাত্রীর প্রতি সুগভীর কৃতজ্ঞতা?
না। সে-চোখে আছে শুধু আদিম অরণ্যের নিবিড় ছায়া, অথবা ছায়া নয় আগুন। আগুন জ্বালাতে যারা জানতো না। সেই গুহাবাসিনী আদিম প্রপিতামহীদের চোখে যে-আগুন ঝিলিক মারত, সেই আগুন!
পরিবেশটা সহনীয় করে তুলতে প্রদীপ বুঝি বলতে চেষ্টা করে—'কি রে রান্না করছিস?' কিন্তু গলা দিয়ে ওর স্বর ফোটে না। যেমন এসেছিল তেমনি ফিরে যায় মনিহারীর বউ, শুধু অবহেলায় একটা সেলাম জানিয়ে।
ফেরার পথে হালকা হাসির ভঙ্গীতে কস্তুরী বলে—উ: কী ভয়ানক চোখদুটো ওর! যেন জ্বলছিল! ভাগ্যিস তোমার বন্দুকটা সঙ্গে ছিল না! থাকলে হয়তো বা বনবিড়াল ভেবে গুলি করে বসতাম।
চমকে ওঠে প্রদীপ।...কে বলল ওকে?
মুহূর্তে সব স্পষ্ট হয়ে যায় ওর কাছে। ও: তাই। তাই এই ভাবান্তর কস্তুরীর! কিন্তু বেশ স্থির কৌতুকের ভঙ্গিতেই বলে—তবু ওর বাঁচাটা নিতান্তই ভাগ্য বলতে হবে, নইলে অস্ত্রের অভাব তো ছিলো না কস্তুরী? আদিম পৃথিবী সেই আদিম বর্বর যুগ থেকে এই সভ্যভব্য আণবিক যুগ পর্যন্ত মানুষের হাতের কাছে পাথরের টুকরোর জোগান ঠিকই রেখেছে।...প্রস্তর যুগ শেষ হয়ে গেছে বলে যে সে-অস্ত্রে কাজ হয় না তা তো নয়?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন