সমরেশ মজুমদার

কার্তিকের মাঝামাঝি চৌধুরীদের খেজুর বাগান ঝুরতে শুরু করল মোতালেফ, তারপর দিন পনের যেতে না যেতেই নিকা করে নিয়ে এল, পাশের বাড়ির রাজেক মৃধার বিধবা স্ত্রী—মাজু খাতুনকে। পাড়া-পড়শী সবাই তো অবাক, এই অবশ্য প্রথম সংসার নয় মোতালেফের। এর আগের বউ বছরখানেক আগে মারা গেছে। তবু পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের জোয়ান পুরুষ মোতালেফ। আর মাজু খাতুন ত্রিশে না পৌঁছলেও তার কাছাকাছি গেছে, ছেলেপুলের ঝামেলা অবশ্য মাজু খাতুনের নেই, মেয়ে ছিল একটি, কাঠিখালির শেখেদের ঘরে বিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ঝামেলা যেমন নেই, তেমনি মাজু খাতুনের আছেই বা কি? বাক্স সিন্দুক ভরে যেন কত সোনাদানা রেখে গেছে রাজেক মৃধা, মাঠ ভরে যেন কত ক্ষেতখামার রেখে গেছে সে, তার ওয়ারিশি পাবে মাজু খাতুন। ভাগের ভাগ ভিটা পেয়েছে কাঠা খানেক, আর আছে একখানি পড়ো শনের কুঁড়ে। এই তো বিষয়-সম্পত্তি; তারপর দেখতেই বা এমনকী একখানা ডানাকাটা ছবির মতো চেহারা। দজ্জাল মেয়েমানুষের আঁট-সাট শক্ত গড়নটুকু ছাড়া কি আছে মাজু খাতুনের যা দেখে ভোলে পুরুষেরা, মন তাদের মুগ্ধ হয়।
সিকদার বাড়ির, কাজীবাড়ির বউঝিরা হাসাহাসি করল, 'তুক করেছে মাগী, ধূলাপড়া দিছে চৌখে।'
মুন্সীদের ছোটবৌ সাকিনা বলল, 'দিচ্ছে, ভালো করছে। দেবে না? অমন চৌখে ধূলাপড়া দেওয়ানেরই কাম, খোদা যে পাতা দেয় নাই চৌখে। দেখছো তো কেমন ঢ্যারাইয়া চায়, ধূলা ছিটাইয়া থাকে তো বেশ করছে।'
কথাটা মিথ্যা নয়, চাউনিটা একটু তেরছা মোতালেফের। বেছে বেছে সুন্দর মুখের দিকে তাকায়। সুন্দর মুখের খোঁজ করে ঘোরে তার চোখ, অল্পবয়সি খাপসুরত চেহারায় একটি বউ আনবে ঘরে, এতদিন ধরে সেই চেষ্টাই সে করে এসেছে, কিন্তু দরে পটেনি কারো সঙ্গে, যারই একটু ডাগর গোছের সুন্দর মেয়ে আছে, সেই হেঁকে বসেছে—পাঁচ কুড়ি সাত কুড়ি। সবচেয়ে পছন্দ হয়েছিল মোতালেফের ফুলবানুকে। চরকান্দার এলেম শেখের মেয়ে ফুলবানু। আঠার-উনিশ বছর হবে। বয়সী রসে টলটল করছে সর্বাঙ্গ, টগবগ করছে মন, ইতিমধ্যে অবশ্য একহাত ঘুরে এসেছে ফুলবানু। খেতে পরতে কষ্ট দেয়, মারধোর করে, এই সব অজুহাতে তালাক নিয়ে এসেছে কইডুবির গফুর সিকদারের কাছ থেকে, আসলে বয়স আর চেহারা সুন্দর নয় বলে গফুরকে পছন্দ হয়নি ফুলবানুর। সেইজন্যই ইচ্ছা করে নিজে ঝগড়া কোন্দল বাঁধিয়েছে তার সঙ্গে কিন্তু একহাত ঘুরে এসেছে বলে কিছু ক্ষয়ে যায়নি ফুলবানুর, বরং চেকনাই আর জেল্লা খুলেছে দেহের।
রসের ঢেউ খেলে যাচ্ছে মনের মধ্যে। চারকান্দায় নদীর ঘাটে ফুলবানুকে একদিন দেখেছিল মোতালেফ, এক নজরেই বুঝেছিল যে, সেও নজরে পড়েছে। চেহারাখানা তো বেমানান নয়। মোতালেফের নীল লুঙ্গি পরলে ফর্সা ছিপছিপে চেহারার চমৎকার খোলতাই হয় তার। তা ছাড়া এমন ঢেউ খেলানো টেরিকাটা বাবরিই বা এ তল্লাটে ক'জনের মাথায় আছে। ফুলবানুর সুনজরের কথা বুঝতে বাকি ছিল না মোতালেফের, খুঁজে খুঁজে গিয়েছিল সে এলেম শেখের বাড়িতে। কিন্তু এলেম তাকে আমল দেয়নি। বলেছে—গতবার যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গেছে তার। এবার আর না দেখে শুনে যার তার হাতে মেয়ে দেবে না। আসলে টাকা চায় এলেম, গাঁটের কড়ি যা খরচ করতে হয়েছে—মেয়েকে তালাক নেওয়াতে গিয়ে, সুদে আসলে পুষিয়ে নিতে চায়, গুনাগার চায় সেই লোকসানের। আঁচ নিয়ে দেখেছে মোতালেফ, সে গুনাগার দু-এক কুড়ি নয়, পাঁচ কুড়ি, একেবারে তার কমে কিছুতেই রাজি হবে না এলেম, কিন্তু অত টাকা সে দেবে কোত্থেকে।
মুখ ভার করে চলে আসছিল মোতালেফ আশশেওড়া আর চোখ উদানের আগাছার জংলার ভিটার মধ্যে ফের দেখা হল ফুলবানুর সঙ্গে। কলসী কাঁধে জল নিতে চলেছে ঘাটে। মোতালেফ বুঝল সময় বুঝেই দরকার পড়েছে তার জলের।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিক করে একটু হাসল ফুলবানু। 'কি মেঞা, গোসা কইরা ফিরা চললা নাকি?'
'চলব না? শোনলা নি—টাকার খাঁকতাই তোমার বা-জানের।'
ফুলবানু বলল, 'হ-হ শুনছি। চাইছে তো দোষ হইছে কি? পছন্দসই জিনিস নেবা বা-জানের গুনা, তার দাম দেবা না?'
মোতালেফ বলল, 'ও খাঁকতাইটা আসলে বা-জানের নয়, বা-জানের মাইয়ার, হাটে-বাজারে গেলেই পারো ধামায় উইঠা।' মোতালেফের রাগ দেখে হাসল ফুলবানু। 'কেবল ধামায় ক্যান, পালায় উইঠা বসব। মুঠ ভইরা সোনা-জহরৎ ওজন কইরা দেবা পালায়। বোঝব ক্ষেমতা, বোঝব কেমন পুরুষ মাইনষের মুঠ।' মোতালেফ হন হন করে চলে যাচ্ছিল। ফুলবানু ফের ডাকল পিছন থেকে, 'ও সোন্দর মিঞা রাগ করনোনে? শোন শোন।'
মোতালেফ ফিরে তাকিয়ে বলল, 'কি শোনব?' এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে—আরও একটু এগিয়ে এল ফুলবানু, 'শোনবা আবার কি, শোনবা মনের কথা। শোন বা-জানের মাইয়া টাকা চায় না, সোনা দানাও চায় না, কেবল মান রাখতে চায় মনের মাইনষের। মাইনষের ত্যাজ দেখতে চায়, বুঝছ?'
মোতালেফ ঘাড় নেড়ে জানালে বুঝেছে।
ফুলবানু বলল—'তাই বইলা অকাম কুকাম কইরো না মেঞা, জমি ক্ষেত বেচতে যাইও না।'
বেচবার মতো জমি ক্ষেত অবশ্য মোতালেফের নেই, কিন্তু সে গুমর ফুলবানুর কাছে ভাঙল না মোতালেফ, বলল—'আইচ্ছা, শীতের কয়ডা মাস যাউক, ত্যাজও দেখাব, মানও দেখাব, কিন্তু বিবিজানের থাকবেনি দেখবার?'
ফুলবানু হেসে বলল, 'খুব থাকব, তেমন বেসবুর বিবি ভাইবেবা না আমারে?'
গাঁয়ে এসে আর একবার ধারের চেষ্টা করে মোতালেফ, গেল মল্লিকবাড়ি, মুখুজ্যে বাড়ি, সিকদারবাড়ি, মুন্সিবাড়ি—কিন্তু কোথাও সুরাহা হয়ে উঠল না। টাকা নিলে তো আর সহজে হাত উপুড় করবার অভ্যেস নেই মোতালেফের, ধারের টাকা তার কাছ থেকে আদায় করে নিতে বেজায় ঝামেলা, সাধ করে কে পোয়াতে যাবে সেই ঝক্কি।
কিন্তু নগদ টাকা ধার না পেয়েও, শীতের সূচনাতেই পাড়ার চার-পাঁচ কুড়ি খেজুরগাছের বন্দোবস্ত পেল মোতালেফ, গতবছর থেকেই গাছের সংখ্যা বাড়ছিল, এবার চৌধুরীদের বাগানের দেড় কুড়ি গাছ বেশি হল, গাছ কেটে হাঁড়ি পেতে রস নামিয়ে দিতে হবে। অর্ধেক রস মালিকের, অর্ধেক তার, মেহনত কম নয়, এক-একটি করে এতগুলি রস গাছের শুকনা মরা ডালগুলি বেছে বেছে আগে কেটে ফেলতে হবে, বালি কাদায় ধার তুলে তুলে জুতসই করে নিতে হবে ছ্যান। তারপর সেই ধারালো ছ্যান গাছের আগা চেঁছে চেঁছে তার মধ্যে নল পুঁততে হবে সরু কঞ্চি ফেঁড়ে। সেই নলের মুখে লাগসই করে বাঁধতে হবে মেটে হাঁড়ি। তবে তো রাত ভরে টুপ-টুপ করে রস-পড়বে সেই হাঁড়িতে। অনেক খাটুনি, অনেক খেজমত। শুকনো শক্ত খেজুর গাছ থেকে রস বের করতে হলে আগে ঘাম বের করতে হয় গায়ের, এতো আর মার দুধ নয়, গাইয়ের দুধ নয় যে, বোঁটায় বানে মুখ দিলেই হল।
অবশ্য কেবল খাটতে জানলেই হয় না, গাছে উঠতে নামতে জানলেই হয় না, গুণ থাকা চাই হাতের, যে ধারালো ছ্যান একটু চামড়ায় লাগলেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে মানুষের গা থেকে। হাতের গুণে সেই ছ্যানের ছোঁয়ায় খেজুরগাছের ভিতর থেকে মিষ্টিরস চুঁইয়ে পড়ে।
এত আর ধান কাটা নয়, পাট কাটা নয় যে, কাঁচির পোঁচে গাছের গোড়া শুদ্ধ কেটে নিলেই হল। এর নাম খেজুরগাছ কাটা, কাটতেও হবে আবার হাত বুলোতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, গাছ যেন ব্যথা না পায়, যেন কোন ক্ষতি না হয় গাছের। একটু এদিক-ওদিক হলে বছর ঘুরতে না ঘুরতে গাছের দফা-রফা হয়ে যাবে। মরা মুখ দেখতে হবে গাছের, সে গাছের গুঁড়িতে ঘাটের পৈঠা হবে, ঘেউরের পৈঠা হবে, কিন্তু ফোঁটায় ফোঁটায় সে গাছ থেকে হাঁড়ির মধ্যে রস ঝরবে না রাত ভরে।
খেজুরগাছ থেকে রস নামাবার বিদ্যা, মোতালেফকে নিজে হাতে শিখিয়ে ছিল রাজেক মৃধা। রস সম্বন্ধে এসব তত্বকথা আর বিধি-নিধেষও তার মুখের। রাজকের মত অমন নামডাকওয়ালা 'গাছি' ধারে-কাছে ছিল না। যে গাছের প্রায় বারো আনা ডালই শুকিয়ে এসেছে, সে গাছ থেকেও রস বেরুত রাজেকের হাতের ছোঁওয়ায়। অন্য কেউ গাছ কাটলে যে গাছ থেকে রস পড়তো আধ হাঁড়ি, রাজেকের হাতে পড়লে সে রস গলা হাঁড়িতে উঠতো। তার হাতে খেজুরগাছ ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত গৃহস্থরা। গাছের কোন ক্ষতি হতো না, রসও পড়ত হাঁড়ি ভরে। বছর কয়েক ধরে রাজেকের সাকরেদ হয়েছিল মোতালেফ, পিছনে পিছনে ঘুরত, কাজ করত সঙ্গে-সঙ্গে, সাকরেদ দু-চারজন আরো ছিল রাজেকের—সিকদারদের মকবুল, কাজীদের ইসমাইল। কিন্তু মোতালেফের মত হাত পাকেনি কারো। রাজেকের স্থান আর কেউ নিতে পারেনি তার মত।
কিন্তু কেবল গাছ কাটলেই তো হবে না কুড়িতে কুড়িতে রসের হাঁড়ি বয়ে আনলেই তো হবে না, বাঁশের বাঁখারির ভারায়, ঝুলিয়ে রস জ্বাল দিয়ে গুড় করবার মতো মানুষ চাই। পুরুষ মানুষ গাছ থেকে কেবল রসই পেড়ে আনতে পারে—কিন্তু উনান কেটে জ্বালানি জোগাড় করে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসে বসে সেই তরল রস জ্বাল দিয়ে তাকে ঘন পাটালি গুড়ে পরিণত করবার ভার মেয়েমানুষের উপর, শুধু কাঁচা রস দিয়ে তো লাভ নেই, রস থেকে গুড় থেকে পয়সার কাঁচা রস যখন পাকা রূপ নেবে—তখন সিদ্ধি, কেবল তখনই সার্থক হবে সকল খেজমত মেহনত। কিন্তু বছর দুই ধরে বাড়িতে নেই মানুষ সেই মোতালেফের। ছেলেবেলায় মা মরেছিল। দু-বছর আগে বউ মরে ঘর একেবারে খালি করে দিয়ে গেছে।
সন্ধ্যার পর মোতালেফ এসে দাঁড়াল মাজু খাতুনের ঝাঁপ-আঁটা ঘরের সামনে, 'জাগনো আছো নাকি মাজুবিবি?' ঘরের ভিতর থেকে মাজু খাতুন সাড়া দিয়ে বলল, 'কেডা'? 'আমি মোতালেফ, শুইয়া পড়ছ বুঝি? কষ্ট কইরা উইঠা যদি ঝাপটা একবার খুইলা দিতা, কয়ডা কথা কইতাম তোমার সাথে।'
মাজু খাতুন উঠে ঝাঁপ খুলে দিয়ে বলল, 'কথা যে কি কবা, তা তো জানি। রসের কাল আইছে আর মনে পইড়া গেছে মাজু খাতুনের। রস জ্বাল দিয়া দিতে হবে, কিন্তু সেরে চাইর আনা কইরা পয়সা দেবা মিঞা, তার কমে পারব না, গতরে সুখ নাই এ বছর?'
মোতালেফ মিষ্টি করে বলল, 'গতরের আর দোষ কি বিবি। গতর তো মনের হাত ধইরা ধইরা চলে, মনের সুখই গতরের সুখ।'
মাজু খাতুন বলল, 'তা যাই কও তাই কও মেঞা, চাইর আনা কমে পারব না এবার?'
মোতালেফ এবার মধুর ভঙ্গিতে হাসল, 'চাইর আনা ক্যান বিবি, যদি ষোল আনা দিতে চাই, রাজী হবা তো নিতে?'
মোতালেফের হাসির ভঙ্গিতে মাজু খাতুনের বুকের মধ্যে একটু যেন কেমন করে উঠল, কিন্তু মুখে বলল, 'তোমার রঙ্গ তামাসা থুইয়া দাও মিঞা, কাজের কথা কবা তো কও, নইলে যাই, শুই গিয়া?'
মোতালেফ বল, 'শোবাই তো। রাইত তো শুইয়া ঘুমাবার জন্যই কিন্তু শুইলেই কি আর চোখে ঘুম আসে মাজু বিবি, না চাইয়া চাইয়া এই শীতের লম্বা রাইত কাটান যায়?'
ইশারা ইঙ্গিত রেখে এরপর মোতালেফ আরও স্পষ্ট করে খুলে বলল মনের কথা। কোনওরকম অন্যায় সুবিধা-সুযোগ নিতে চায় না সে, মোল্লা ডেকে, কালমা পড়ে, সে নিকা করে নিয়ে যেতে চায় মাজু খাতুনকে, ঘর-গেরস্থালির ষোল আনা ভার তুলে দিতে চায় তার হাতে।
প্রস্তাব শুনে মাজু খাতুন প্রথমে অবাক হয়ে গেল, তারপর একটু ধমকের সুরে বলল, 'রঙ্গ তামাশার আর মানুষ পাইলা না তুমি! ক্যান কাঁচা বয়সের মাইয়া পোলার কি অভাব হইছে নাকি দেশে যে, ত্যাগো থুইয়া তুমি আসবা আমার দুয়ারে?'
মোতালেফ বলল, 'অভাব হবে ক্যান মাজু বিবি? কমবয়সি মাইয়া পোলা অনেক পাওন যায়। কিন্তু শত হইলেও, তারা কাঁচা রসের হাঁড়ি!'
কথার ভঙ্গিতে একটু কৌতুক বোধ করল মাজু খাতুন, বলল, 'সাঁচাই নাকি! আর আমি?'
'তোমার কথা আলাদা, তুমি হইলা নেশার কালে তাড়ি—আর নাস্তার কালে গুড়, তোমার সাথে ত্যাগো তুলনা?'
তখনকার মত মোতালেফকে বিদায় দিলেও, তার কথাগুলি মাজু খাতুনের মন থেকে সহজে বিদায় নিতে চাইল না।
অন্ধকার নি:সঙ্গ শয্যায় মোতালেফের কথাগুলি মনের ভিতরটায় কেবলই তোলপাড় করতে লাগল, মোতালেফের সঙ্গে পরিচয় অল্পদিনের নয়। রাজেক যখন বেঁচে ছিল, তার সঙ্গে সঙ্গে থেকে যখন কাজ-কর্ম করত মোতালেফ, তখন থেকেই এ বাড়িতে তার আনাগোনা, তখন থেকেই মাঝে মাঝে একটু হালকা ঠাট্টা তামাসা চলত, কিন্তু তার বেশি এগুবার কথা মনেই পড়েনি কারো, মোতালেফের ঘরে ছিল বউ, মাজু খাতুনের ঘরে ছিল স্বামী, স্বভাবটা একটু কঠিন আর কাঠখোট্টা, ধরনের—ছিল রাজেকের। ভারি কড়া-কড়া চাঁছাছোলা ছিল তার কথাবার্তা, শীতের সময় কুড়িতে কুড়িতে রসের হাঁড়ি আনত মাজু খাতুনের উঠানে, আর মাজু খাতুন সেই রস জ্বাল দিয়ে করত পাটালি গুড়। হাতের গুণ ছিল মাজু খাতুনের। তার তৈরি গুড়ের সের দু-পয়সা বেশি দরে বিক্রি হতো বাজারে। রাজেক মরে যাওয়ার পর পাড়ার বেশির ভাগ খেজুরগাছই গেছে মোতালেফের হাতে। দু-এক হাঁড়ি রস কোনবার ভদ্রতা করে তাকে খেতে দেয় মোতালেফ। কিন্তু আগেকার মতো হাঁড়িতে আর ভরে যায় না তার উঠান। গতবার মাসখানেক তাকে রস জ্বাল দিতে দিয়েছিল মোতালেফ। চুক্তি ছিল দু-আনা করে পয়সা দেবে প্রতি সেরে, কিন্তু মাসখানেক পরেই সন্দেহ হয়েছিল মোতালেফের, মাজু খাতুন গুড় চুরি করে রাখছে, অন্য কাউকে দিয়ে গোপনে গোপনে বিক্রি করাচ্ছে সেই গুড়, ষোল আনা জিনিস পাচ্ছে না মোতালেফ। ফলে কথান্তর মতান্তর হয়ে সে বন্দোবস্ত ভেস্তে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তার ঘরে রসের হাঁড়ি পাঠাবার প্রস্তাব নিয়ে আসেনি মোতালেফ, মাজু খাতুনকে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে চেয়েছে। এমন প্রস্তাব পাড়ার আধবুড়োদের দলের আরো করেছে দু-একজন, কিন্তু মাজু খাতুন কান দেয়নি তাদের কথায়, ছেলে-ছোকরাদের মধ্যে যারা একটু বেশি বাড়াবাড়ি রকমের ইয়ার্কি দিতে এসেছে, তাদের কান কেটে নেওয়ার ভয় দেখিয়েছে মাজু খাতুন, কিন্তু মোতালেফের প্রস্তাব সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের, তাকে যেন তেমনভাবে তাড়ানো যায় না, তাকে তাড়ালেও তার কথাগুলি ফিরে ফিরে আসতে থাকে মনের মধ্যে। পাড়ায় এমন চমৎকার কথা বলতে পারে না আর কেউ, অমন খাপসুরত মুখও কারোর নেই, অমন মানানসই কথাও নেই কারো মুখে।
মোতালেফকে আরও আসতে হল দু-এক সন্ধ্যা, তারপর নীল রংয়ের জোনাকী শাড়ি পরে, রং বেরঙের কাচের চুড়ি হাতে দিয়ে মোতালেফের পিছনে পিছনে তার ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলো মাজু খাতুন।
ঘরদোরের কোন শ্রীছাঁদ নেই, ভারি অপরিষ্কার আর আগোছালো হয়ে রয়েছে সব। কোমরে আঁচল জড়িয়ে, মাজু খাতুন লেগে গেল ঘরকন্নার কাজে। ঝাঁট দিয়ে জঞ্জাল দূর করল উঠানের, লেপে-পুঁছে ঝকঝকে তকতকে করে তুলল, ঘরের মেঝে।
কিন্তু ঘর আর ঘরণীর দিকে তাকাবার সময় নেই মোতালেফের, সে আছে গাছে গাছে। পাড়ার আরো অনেকের—বোসদের বাঁড়ুয্যেদের গাছের বন্দোবস্ত নিয়েছে মোতালেফ। গাছ কাটছে, হাঁড়ি পাতছে, হাঁড়ি নামাচ্ছে, ভাগ করে দিচ্ছে রস। পাকাটির একখানা চালা তুলে দিয়েছে মাজু খাতুনকে মোতালেফ উঠানের পশ্চিমদিকে। সারে সারে উনান কেটে তার ওপর বড় বড় মাটির জালা বসিয়ে তার সেই চালা ঘরের মধ্যে বসে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জ্বাল দেয় মাজু খাতুন। জ্বালানীর জন্যে মাঠ থেকে খড়ের নাড়া নিয়ে আসে মোতালেফ, জোগাড় করে আনে খেজুরের শুকনো ডাল। কিন্তু তাতে কি কুলোয়। মাজু খাতুন এর পর ওর এর বাগান থেকে, জঙ্গল থেকে শুকনো পাতা ঝাঁট আনে ঝাঁকা ভরে ভরে, পালা ভরে ভরে, বিকেলে বসে বসে দা দিয়ে টুকরো টুকরো করে শুকনো ডাল কাটে জ্বালানীর জন্যে। বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই, মনের মত মানুষ পেয়েছে ঘরে।
ধামা ভরে ভরে হাটে-বাজারে গুড় নিয়ে যায় মোতালেফ, বিক্রি করে আসে চড়া দামে।
বাজারের মধ্যে সেরা গুড় তার। পড়ন্ত বেলায় ফের যায় গাছে গাছে হাঁড়ি পাততে। তল্লা বাঁশের একেকটি করে চোঙা ঝুলতে থাকে গাছে। সকালে রসের হাঁড়ি নামিয়ে ঝরার চোঙা বেঁধে দিয়ে যায় মোতালেফ। সারা দিনের ময়লা রস চোঙাগুলির মধ্যে জমে থাকে। চোঙা বদলে গাছ চেঁছে হাঁড়ি পাতে বিকেলে এসে। চোঙার ময়লা রস ফেলা যায় না। জ্বাল দিয়ে চিটে গুড় হয় তাতে, তামাক মাখবার। বাজারে তাও বিক্রি হয় পাঁচ আনা ছ আনা সের। দুবেলা দুবার করে এতগুলি গাছে উঠতে নামতে ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ে মোতালেফের পৌষের শীতেও সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘাম পড়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। সকালবেলায় রোমশ বুকের মধ্যে, ঘামের ফোঁটা চিক-চিক করে। পায়ের নিচে দুর্বার মধ্যে চিকচিক করে রাত্রির জমা শিশির। মোতালেফের দিকে তাকিয়ে পাড়া-পড়শিরা অবাক হয়ে যায়।
সেরা গাছের সবচেয়ে মিষ্টি দু'হাঁড়ি রস আর সের তিনেক পাটালী গুড় নিয়ে মোতালেফ গিয়ে একদিন উপস্থিত হল চরকান্দায় এলেম শেখের বাড়িতে। সেলাম জানিয়ে এলেমের পায়ের সামনে নামিয়ে রাখলে রসের হাঁড়ি, গুড়ের সাজি, তারপর কোঁচের ঘুঁটের বাঁধা খুলে বার করল পাঁচখানা দশ টাকার নোট, বলল, 'অর্ধেক আগাম দিলাম মেঞাসাব।'
এলেম বলল, 'আগাম কিসের?'
মোতালেফ বলল, 'আপনার মাইয়ার—'
তাজা করকরে নোট বেছে নিয়ে এসেছে মোতালেফ। কোণার, কিনারে চুল পরিমাণ ছিঁড়ে যায়নি কোথাও, কোন জায়গায় ছাপ লাগেনি ময়লা হাতের। নগদ পঞ্চাশ টাকা। নোটগুলির ওপর হাত বুলোতে বুলোতে এলেম বলল, 'কিন্তু এখন আর টাকা আগাম নিয়া আমি কি করব মিঞা? তুমি তো শোনলাম নেকা কইরা নিছ রাজেক মেরধার কবিলারে। সতীনের ঘরে যাবে ক্যান মাইয়া আমার।'
এলেম শেখ জলচৌকি এগিয়ে দিল মোতালেফকে বসতে, হাতের হুঁকোটা এগিয়ে ধরল মোতালেফের দিকে, তারিফ করে বলল, 'মগজের মধ্যে তোমার সাঁচাই জিনিস আছে মেঞা, সুখ আছে তোমার সাথে কথা কইয়া, কাম কইরা।'
ফুলবানুকে একবার চোখের দেখা দেখে যেতে অনুমতি পেল মোতালেফ। আড়াল থেকে দেখতে শুনতে ফুলবানুর কিছু বাকি ছিল না। তবু মোতালেফকে দেখে ঠোঁট ফুলালো ফুলবানু, 'বেসবুর কেডা হইল মেঞা? আমি রইলাম পথ চাইয়া অর তুমি ঘরে নিয়া ঢুকাইলা আর একজনারে।'
মোতালেফ জবাব দিল, 'না ঢুকায়ে করি কি?' মানের দায়ে, জানের দায়ে, বাধ্য হয়ে তাকে এই ফন্দি খুঁজতে হয়েছে, ঘরে কেউ না থাকলে পানি-চুনি দেয় কে, প্রাণে বাঁচে কি করে।
ফুলবানু বলল, 'বোঝলাম, মানও বাঁচাইলা, জানও বাঁচাইলা, কিন্তু যে আর একজনের গন্ধ জড়াইয়া রইল, তা ছাড়াব কেমনে।'
মনে এলেও মুখ ফুটে একথা বলল না মোতালেফ যে, মানুষ চলে গেলে তার গন্ধ সত্যি আর একজনের গায়ে জড়িয়ে থাকে না। তা যদি থাকত, তা হলে সে গন্ধ তো ফুলবানুর গা থেকেও বেরোতো। কিন্তু সে কথা চেপে গিয়ে মোতালেফ ঘুরিয়ে জবাব দিল, বলল, 'গন্ধের জন্য ভাবনা কি ফুলবিবি।'
মুখে আঁচল চাপতে চাপতে ফুলবানু বলল, 'সাঁচাই নাকি?' মোতালেফ বলল, 'সাঁচা না ত কি মিছা? শুইঙ্গা দেইখো তখন নতুন মাইনষের নতুন গন্ধে ভুর-ভুর করবে গতর। দক্ষিণা বাতাসে চুলের গন্ধে ফুলের গন্ধে ভুর-ভুর করবে, কেবল সবুর কইরা থাক আর দুইখান মাস।'
ফুলবানু আর একবার ভরসা দিয়ে গেল, 'বেসবুর মানুষ ভাইবো না আমারে।'
যে কথা সেই কাজে মোতালেফের দুমাসের বেশি সবুর করতে হল না ফুলবানুকে।
মাজু খাতুন জিভ কেটে বলল, 'আউ আউ, ছি-ছি! তোমার গতরই কেবল সোন্দর মোতি মেঞা, ভিতর সোন্দর নয়। এত শয়তানি, এত ছল চাতুরি তোমার মনে? গুড়ের সময় পিঁপড়ার মতো লাইগাছিলা, আর গুড় নাই ফুরাইল, অমনি দূর দূর।'
কিন্তু অত কথা শোনবার সময় নেই, মোতালেফের ধৈর্যও নেই।
আমের গাছ বোলে ভরে উঠল, গাব গাছের ডালে ডালে গজাল তামাটে রঙের কচি কচি পাতা।
ফুর্তির অন্ত নেই মোতালেফের মনে। দিনভর কিষাণ-কামলা খাটে। তারপর সন্ধ্যা হতে না হতেই এসে আঁচল ধরে ফুলবানুর। 'থুইয়া দাও তোমার রান্ধন-বাড়ন ঘর-গেরস্থালি। কাছে বস আইসা।'
ফুলবানু হাসে, 'সবুর সবুর! এ কয় মাস কাটাইলা কি কইরা মেঞা?'
মোতালেফ জবাব দেয়, 'খেজুর গাছ লইয়া।'
নিবিড় বাহু বেষ্টনের মধ্যে দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসে ফুলবানুর, একটু নিশ্বাস নিয়ে হেসে বলে, 'তুমি আবার সেই গাছের কাছেই ফিরা যাও। গাছি'র আদর গাছেই সইতে পারে।'
মোতালেফ বলে, 'কিন্তু গাছি'র কাছেও যে গাছের রস দুই-চাইর মাসেই ফুরায় ফুলবানু, কেবল তোমার রসই বছরে বারো মাস চোঁয়াইয়া চোঁয়াইয়া পড়ে।'
মাজু খাতুন ফের গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল, রাজেকের পড়ো পড়ো শনের কুঁড়োয়। ভেবেছিল আগের মতই দিন কাটবে! কিন্তু দিন যদি বা কাটে, রাত কাটে না। মোতালেফ তার সর্বনাশ করে ছেড়েছে। পাড়া-পড়শীর এসে সাড়স্বরে সালঙ্কারে মোতালেফ আর ফুলবানুর ঘরকন্নার বর্ণনা করে, একটু বা সকৌতুক তিরস্কারের সুরে বলে, 'না: বউ বউ কইরা পাগল হইয়াই গেল মানুষটা। যেখানে যায়, বউ ছাড়া আর কথা নাই মুখে।'
বুকের ভিতরটা জ্বলে ওঠে মাজু খাতুনের। মনে হয়, সেও বুঝি হিংসায় পাগল হয়ে যাবে। বুক ফেটে মরে যাবে সে।
দিন কয়েক পরে রাজেকের বড় ভাই ওয়াহেদই নিয়ে এল সম্বন্ধ। বউটার দশা দেখে ভারি মায়া হয়েছে তার। নদীর ওপারে তালকান্দায় নাজির শেখের সঙ্গে দোস্তি আছে ওয়াহেদের, এক মাল্লাই নৌকা বায় নাদির। মাসখানেক আগে কলেরায় তার বউ মারা গেছে। অপোগন্ড ছেলেমেয়ে রেখে গেছে অনেকগুলি। তাদের নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়েছে বেচারা। কমবয়সি ছুঁড়ি-টুড়িতে দরকার নেই তার। সে হয়তো পটের বিবি সেজে থাকবে, ছেলেমেয়ের যত্ন-আত্তি করবে না কিছু। তাই মাজু খাতুনের মতো একটু ভারিক্কি ধীরবুদ্ধি গৃহস্থ ঘরের বউই তার পছন্দ, তার ওপর নির্ভর করতে পারবে সে।
মাজু খাতুন জিগ্যেস করল, 'বয়েস কত হবে তার?'
ওয়াহেদ জবাব দিল, 'তা আমাগো বয়সিই হবে। পঞ্চাশ, এক পঞ্চাশ।' মাজু খাতুন খুশি হয়ে ঘাড় নেড়ে জানাল—হ্যাঁ ওই রকমই তাঁর চাই। কম বয়সে তার আস্থা নেই। বিশ্বাস নেই যৌবনকে।
তারপর মাজু খাতুন জিগ্যেস করল, 'গাছি না তো সে? খাজুর গাছ কাটতে যায় না তো শীতকালে?'
ওয়াহেদ বিস্মিত হয়ে বলল, 'গাছ কাটতে যাবে ক্যান! ওসব কাম কোন কালে জানে না সে। বর্ষাকালে নৌকা বায়, শীতকালে কিষাণ-কামলা খাটে, ঘরামির কাজ করে, ক্যান বউ গাছি ছাড়া, রসের ব্যাপারী ছাড়া কি তুমি নিকা বসবা না কারও সাথে?'
মাজু খাতুন ঠিক উলটো জবাব দিল, রসের সঙ্গে কিছুমাত্র যার সম্পর্ক নেই, শীতকালের খেজুরগাছের ধারে-কাছেও যে যায় না, নিকা যদি বসে মাজু খাতুন, তার সঙ্গেই বসবে, রসের ব্যাপারে মাজু খাতুনের ঘেন্না ধরে গেছে। ওয়াহদ বলল, 'তা হলে কথাবার্তা কই নাদিরের সাথে? সে বেশি দেরি করতে চায় না।'
মাজু খাতুন বলল, 'দেরি কইরা কাম কি।'
দেরি বেশি হলও না, সপ্তাহখানেকের মধ্যে কথাবার্তা সব ঠিক হয়ে গেল। নাদিরের সঙ্গে এক মাল্লাই নৌকায় গিয়ে উঠল মাজু খাতুন। পার হয়ে গেল নদী।
মোতালেফ স্ত্রীকে বলল, 'আপদ গেল। পেত্নীর মতো ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ নিশ্বাস ফেলত, চোখের উপর শাপমন্যি করত দিন রাইত, তার হাতগুনা তো বাচলাম, কি কও ফুলজান?'
ফুলবান হেসে বলল, 'পেত্নীরে খুব ডরাও বুঝি মেঞা?'
মোতালেফ বলল, 'না, এখন আর ডরাই না। পেত্নী তো ছুইটাই গেল। এখন চোখ মেললেই তো পরী। এখন ডরাই পরীরে।'
'ক্যান, পরীরে আবার ডর কিসের তোমার?'
'ডর নাই? পাখা মেইলা কখন উরাল দেয় তার ঠিক কি।'
ফুলবানু বলল, 'না মেঞা, পরীর আর উরাল দেওয়ার সাধ নাই। সে তার পছন্দমত সব পাইয়া গেছে। এখন ঘরের মাইনষের পছন্দ আর নজরডা বরাবর এই রকম থাকলে হয়।'
মোতালেফ বলল, 'দেখি যদ্দিন আছে, নজরও ততদিন থাকবে।'
দিনরাত ভারি আদরে-তোয়াজে রাখল মোতালেফ বউকে। কোন মাছ খেতে ভালোবাসে ফুলবানু, হাঠে যাওয়ার আগে শুনে যায়, ট্যাঁকে পয়সা না থাকলে কারো কাছ থেকে পয়সা ধার করেকেনে সেই মাছ।
ফুলবানু বলে, 'অত পান আন ক্যান, তুমি তো ভক্ত না পানের। দিনরাত খালি ফুডুত ফুড়ুত তামাক টানো।'
মোতালেফ বলল, 'পান আনি তোমার জৈন্যে। দিন ভরিয়া পান খাবা। খাইয়া খাইয়া ঠোঁট রাঙাবা।'
ফুলবানু ঠোঁট ফুলিয়ে বলে, 'ক্যান, আমার ঠোঁট এখনে বুঝি রাঙা না, যে পান খাইয়া রাঙাইতে হবে? আমি পান সাইজা দেই, তুমিও বরং দিন রাইত খাওয়া ধর, তামাক খাইয়া খাইয়া কালা হইয়া গেছে ঠোঁট, পানের রসে রাঙাইয়া নেও?'
মোতালেফ হেসে বলল, 'পুরুষ মাইনষের ঠোঁট তো ফুলজান কেবল পানের রসে রাঙা হয় না, আর একজনের পান-খাওয়া ঠোঁটের রস লাগে।'
নিজের ভুঁই ক্ষেত নেই মোতালেফের। মল্লিকদের, মুখুজ্যেদের কিছু কিছু জমি বর্গা চষে, কিন্তু ভালো কৃষাণ বলে তেমন খ্যাতি নেই, জমির পরিমাণ, ফসলের পরিমাণ অন্য সকলের মতো নয়, সিকদারদের, মুন্সীদের জমিতে কৃষাণ খাটে, পাট নিড়ায়, পাট কাটে, পাট জাগ দেয়, ধোয় মেলে। ভারি খেজমত খাটুনি খাটে। ফর্সা রঙ রোদে পুড়ে কালো হয়ে যায়। মোতলেফের বর্গা জমির পাট খুব বেশি ওঠে না উঠানে, সিকদাররা, মুন্সীর নগদ টাকা দেয়। কেবল মল্লিক আর মুখুজ্যেদের বিঘা চারেক ভুঁইয়ের ভাগের ভাগ অর্ধেক জাগ দেওয়া পাট নৌকা ভরে খালের ঘাটে এনে নামায় মোতালেফ, পাট ছাড়াতে ভারি উৎসাহ ফুলবানুর। কিন্তু মোতালেফ সহজে তাকে পাটে হাত দিতে দেয় না, বলে কষ্ট হবে, পচা গন্ধ হবে গায়?
ফুলবানু, বলে, হইল তো বইয়া গেল, রউদে পুইড়া তুমি কালা কালা হইয়া গেলা আর আমি পাট নিতে পারব না, কষ্ট হবে, কেমনতেরা কথাই যে কও তুমি মেঞা?'
নিজেদের পাট তো বেশি নয়, পাকাটি পাওয়া যায় না। ফুলবানুর ইচ্ছা, অন্য বাড়ির জাগ-দেওয়া পাটও সে ছড়িয়ে দেয়, সেই ছাড়ানো পাটের পাটখড়িগুলি পাওয়া যাবে তাহলে। কিন্তু মোতালেফ রাজি নয় তাতে, অত কষ্ট বউকে সে করতে দেবে না।
আশ্বিনের শেষের দিকে আউস ধান পাকে। অন্যের নৌকায় পরের জমিতে কিষাণ খাটতে যায় মোতালেফ। কোমর পর্যন্ত জলে নেমে ধান কাটে। আঁটিতে আঁটিতে ধান তুলতে থাকে নৌকায়। কিন্তু মোমিন, কোরিম, হামিদ, আজিদ—এদের সঙ্গে সমানে সমানে কাটি চলে না তার, হাত বড় ধীরচ মোতালেফের, জলে ভারি কাতর মোতালেফ। একেক দণ্ড পিঠে বগলে জোঁক লেগে থাকে। ফুলবানু তুলে ফেলতে ফেলতে বলে, 'জোঁকটাও ছাড়াইতে পার না মেঞা, হাত তো ছিল সঙ্গে?'
মোতালেফ বলে, 'ধান কাটার হাত দুইখান সাথেই ছিল, জোঁক ফেলাবার হাত থুইয়া গেছিলাম বাড়িতে।'
যেখানে যেখানে জোঁকে মুখ দিয়েছিল সে সব জায়গায় সযত্নে চুন লাগিয়ে দেয় ফুলবানু, আরো পাঁচজন কৃষাণের সঙ্গে ধান মলন দেয় মোতালেফ, দেউনি পায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
ফুলবানু বলে, 'হে কষ্টে একেবারে মইরা গেলাম না। কার নাগাল কথা কও তুমি মেঞা। গেরস্ত ঘরের মাইয়া না আমি, না সঁচাই আশমান গুনা নাইমা আইছি।'
বসন্ত যায়, বর্ষা যায়, কাটে আশ্বিন-কার্তিক, ঘুরে ঘুরে ফের আসে শীত। রসের দিন মোতালেফের বতরের দিন। কিন্তু শীতটা এবার যেন একটু বেশি দেরিতে এসেছে। তা হোক আরও বেশি গাছের বন্দোবস্ত নিয়ে পুষিয়ে ফেলবে মোতালেফ। খেজুর গাছের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ে। একাজে নামডাক আছে মোতালেফের, একাজে গাঁয়ের মধ্যে সে-ই সেরা। এ করেও বাঁড়ুজ্যেদের কুড়ি-দেড়েক গাছ বেড়ে গেল।
গাছ কাটবার ধুম লেগে আছে। একটুও বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই মোতালেফের, সময় নেই তেমন ফুলবানুর সঙ্গে ফষ্টিনাষ্টি রঙ্গরসিকতা। ধার-দেনা শোধ দিতে হবে, সারা বছরের রসদ জোগাড় করতে হবে, রস বেচে, গুড় বেচে। দৈত্যের মতো দিনভর খাটে মোতালেফ, আর বিছানায় গা দিতে না দিতেই ঘুমে ভেঙে আসে চোখ। দু-হাতে ঠেলে, দু-হাতে জড়িয়ে ধরে ফুলবানু, কিন্তু মানুষকে নয়, যেন আস্ত একটা গাছকে জড়িয়ে ধরেছে। অসাড়ে ঘুমোয় মোতালেফ। শব্দ বেরোয় নাক থেকে, আর কোন অঙ্গ সাড়া দেয় না। মোটা কাঁথার মধ্যেও শীতে কাঁপে ফুলবানু।
মানুষের গায়ের গরম না পেলে, শীত কি কাঁথায় মানে?
কেবল রস আনলেই হয় না, রস জ্বাল দেওয়ার জ্বালানি চাই। এখান থেকে ওখান থেকে শুকনো ডাল-পাতা আর খড় বয়ে আনে মোতালেফ।
কিন্তু হাঁড়িতে হাঁড়িতে রসের পরিমাণ দেখে মুখ শুকিয়ে যায় ফুলবানুর, বুক কাঁপে। দু-এক হাঁড়ি রস জ্বাল দিয়েছে সে বাপের বাড়িতে, কিন্তু এত রস একসঙ্গে সে কোনওদিন দেখেনি, কোনকালে জ্বাল দেয়নি!
মোতালেফ রুক্ষস্বরে বলে, 'কেমন তরো মাইয়া মানুষ তুমি, এত কইরা কইয়া দেই, বুঝাইলে বোঝ না। এই গুড় হইছে, এই নি খইদ্দারে কেনবে পয়সা দিয়া?'
ফুলবানু একটু হাসতে চেষ্টা করে বলে, 'কেনবে না ক্যান। বেচতে জানলেই কেনবে।'
মোতালেফ খুশি হয় না হাসিতে, বলে, 'তাইলে তুমি যাইয়া ধামা লইয়া বইস বাজারে। তুমি আইস বেইচা! খাপসারত মুখের দিকে চাইয়া যদি কেনে, গুড়ের দিকে চাইয়া কেনবে না।'
বোকা তো নয় ফুলবানু, অকেজো তো নয় একেবারে।
বলতে বলতে শেখাতে শেখাতে দু-চার দিনের মধ্যেই কোনওরকমে চলনসই গুড় তৈয়ারি করতে শিখল ফুলবানু, বাজরে গুড় একেবারে অচল রইল না।
পুরোনো খদ্দেররা একবার গুড়ের দিকে চায় আর একবার মুখের দিকে চায় মোতালেফের, 'এ তোমার কেমন তরো, গুড় খাইছি তোমার, জিহ্বায় যেন জড়াইয়া রইছে; আস্বাদ ঠোঁটে লাইগা রয়েছে। এবার তো তেমন হইল না। তোমার গুড়ের থিকা এবার ছদন সেখ, মদন সিকদারের গুড়ের সোয়াদ বেশি।'
বুকের ভিতর পুড়ে যায় মোতালেফের, রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলতে থাকে। গতবারের মত এবারে স্বাদ হচ্ছে না মোতালেফের গুড়ে। কেন, সে তো কম খাটছে না; কম পরিশ্রম করছে না গতবারের চেয়ে। তবু কেন স্বাদ হচ্ছে না মোতালেফের গুড়ে, তবু কেন দর উঠছে না, লোকে দেখে খুশি হচ্ছে না, খেয়ে খুশি হচ্ছে না, গুড়ের সুখ্যাতি করছে না তার। অত নিন্দামন্দ শুনতে হচ্ছে কেন, কিসের জন্যে?
রাত্রে বিছানায় শুয়ে শুয়ে রস জ্বাল দেওয়ার কৌশলটা আরো বার-কয়েক মোতালেফ বলল ফুলবানুকে, 'হাতায় কইরা কইরা ফোঁটা দেইখো, 'নামবার সময় হইল কিনা ঢালবার সময় হইল কিনা রস।'
ফুলবানু বিরক্ত বিরস মুখে বলে, 'হ-হ, চিনছি! আর বক বক কইরো না, ঘুমাইতে দেও মাইনষেরে।'
হঠাৎ মোতালেফের মনে পড়ে গেল মাজু খাতুনের কথা। রাত্রে শুয়ে শুয়ে রস আর গুড়ে কত আলোচনা করেছে তার সঙ্গে মোতালেফ। মাজু খাতুন এমন করে মুখ ঝামটা দেয়নি, অস্বস্তি জানায়নি ঘুমের ব্যাঘাতের জন্যে, সাগ্রহে শুনেছে, সানন্দে কথা বলেছে।
পরদিন বেলা প্রায় দুপুর নাগাদ কোত্থেকে এক বোঝা জ্বালানি মাথায় করে নিয়ে এল মোতালেফ, এনে রাখল সেই পাকাটির চালার দোরের কাছে, 'কি রকম গুড় হইতেছে আইজ ফুলজান?'
কিন্তু চালার ভিতর থেকে কোনও জবাব এল না ফুলবানুর। আরো একবার ডেকে সাড়া না পেয়ে বিস্মিত হয়ে চালার ভিতর মুখ বাড়ল মোতালেফ, কিন্তু ফুলবানুকে সেখানে দেখা গেল না। কীরকম গন্ধ আসছে যেন ভিতর থেকে, জালার মধ্যে ধরে গেল নাকি গুড়? সারে-সারে গোটা পাঁচেক জালায় রস জ্বাল হচ্ছে, টগবগ করছে রস জ্বালার মধ্যে। মুখ বাড়িয়ে দেখতে এগিয়ে গেল মোতালেফ! যা ভেবেছে ঠিক তাই। সবচেয়ে দক্ষিণ কোণের জ্বালাটার রস বেশি জ্বাল পেয়ে কি করে যেন ধরে গেছে একটু। বুকের মধ্যে জ্বালাপোড়া করে উঠল মোতালেফের, গলা চিরে চিৎকার বেরুল,—'কই, কোথায় গেলি হারামজাদি?'
ব্যস্ত হয়ে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল ফুলবানু। বেলা বেশি হয়ে যাওয়ায় দুদিন ধরে স্নান করতে পারেনি। শীতের দিন না নাইলে গা কেমন চড়বড় করে, ভালো লাগে না। তাই আজ একটু সোডা-সাবান মেঘে ঘাট থেকে সকাল সকাল স্নান করে এসেছে। নেয়ে এসে পড়েছে নীল রঙের শাড়ি। গামছায় চুল নিংড়ে তাতে তাড়াতাড়ি একটু চিরুনি বুলিয়ে নিচ্ছিল ফুলবানু, মোতালেফের চিৎকার শুনে ত্রস্তে চিরুনি হাতেই বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ভিজে চুল লুটিয়ে রইল পিঠের ওপর। এক মুহূর্ত জ্বলন্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল মোতালেফ, তারপর ছুটে গিয়ে মুটি করে ধরল সেই ভিজে চুলের রাশ, 'হারামজাদি, গুড় পুইড়া গেল, সেদিকে খেয়াল নাই তোমার, তুমি আজ সাজগোজ লইয়া পটের ভিতর গুনা বাইরাইয়া আইলা, তুমি বিদ্যাধরী, এই জৈন্যেই গুড় খারাপ হয়, আমার অপমান হয়, বদনামে দেশ ছাইয়া গেল তোমার জৈন্যে।'
ফুলবানু বলতে লাগল, 'খবরদার, চুল ধইরো তাই বইলা, গায়ে হাত দিও না।'
'ও, হাতে মারলে মান যায় বুঝি তোমার?' পায়ের কাছ থেকে একটা ছিটা কঞ্চি তুলে নিয়ে তাই দিয়ে হাতে, বুকে, পিঠে মোতালেফ সপাসপ চালাতে লাগল ফুলবানুর সর্বাঙ্গে বলল, 'কঞ্চিতে মারলে তো আর মান যাবে না শেখের ঝির। হাতেই দোষ, কঞ্চিতে তো আর দোষ নাই।'
ভারি বদরাগী মানুষ মোতালেফ। যেমন বেসবুর বেবুঝ তার অনুরাগ। রাগও তেমনি প্রচণ্ড।
খবর পেয়ে এলেম সেখ এল চারকান্দা থেকে। জামাইকে শাসালো, বকলো, ধমকালো, মেয়েকেও নিন্দা-মন্দ কম করল না।
ফুলবানু বলল, 'আমারে লইয়া যাও বা'জান তোমার সাথে—এমন গোঁয়ার মাইনষের ঘর করব না আমি।'
কিন্তু বুঝিয়ে-শুঝিয়ে এলেম রেখে গেল মেয়েকে। একটু আস্কারা দিলেই ফুলবানু পেয়ে বসবে, আবার তালাক নিতে চাইবে। কিন্তু গৃহস্থ ঘরে অমন বারবার অদল-বদল আর ঘর বদলানো কি চলে। তাতে কি মান-সম্মান থাকে সমাজের কাছে। একটু সবুর করলেই আবার মন নরম হয়ে আসবে মোতালেফের। দু-দণ্ড পরেই আবার মিলমিশ হয়ে যাবে। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াঝাঁটি। দিনে হয়, রাত্রে মেটে। তা নিয়ে আবার একটা ভাবনা।
মিটে গেলও, খানিকবাদেই আবার যেচে আপোষ করলো মোতালেফ। সেধে ভজে মান ভাঙলো ফুলবানুর। পর দিন ফের আবার উনানের পিঠে রস জ্বাল দিতে গিয়ে বসল ফুলবানু। দুপুরের পর ধামায় বয়ে গুড় নিয়ে চলল মোতালেফ হাটে। যাবার সময় বলল, 'এই দুইটা মাস, দুইডা মাস কাইটা গেলে কোনওরকমে তোমার কষ্ট সারে ফুলজান।'
ফুলবানু বলল—'কষ্ট আবার কি।' কিন্তু কেবল মুখের কথা, কেবল যেন ভদ্রতার কথা। মনের কথা যেন ফুটে বেরোয় না দুজনের মুখ দিয়ে। সে কথার ধরন আলাদা, ধ্বনি আলাদা, তা তো আর চিনতে বাকি নেই কারোরই। বলেও জানে, শোনেও জানে।
হাটের পর হাট যায়, রসের বতর প্রায় শেষ হয়ে আসে, গুড়ের খ্যাতি বাড়ে না মোতালেফের, দর চড়ে না; কিন্তু তা নিয়ে ফুলবানুর সঙ্গে বাড়ি এসে আর তর্ক-বিতর্ক করে না মোতালেফ, চুপ করে বসে হুঁকোয় তামাক টানে। খেজুর গাছ থেকে নল বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রস পড়ে হাঁড়ির মধ্যে। ভোরে গাছে উঠে রস-ভরা বড় বড় হাঁড়ি নামিয়ে আনে মোতালেফ, কিন্তু গত বছরের মত যেন সুখ নেই মনে, স্ফূর্তি নেই, ঘামে এবারও সর্বাঙ্গ ভিজে যায়, কিন্তু শুকনো পাকাটির মত খট খট করে মন, দুপুরের রোদের মত খাঁ খাঁ করে। কোথাও ছিটা-ফোঁটা নেই রসের। রসের হাঁড়িতে ভরে যায় উঠান, রসবতী নারী ঘরের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, তবু যেন মন ভরে না, কেমন যেন খালি খালি মনে হয় দুনিয়া।
একদিন হাটের মধ্যে দেখা হয়ে গেল নদীর পারের নাজির শেখের সঙ্গে।
'সেলাম মেঞাসাব।'
'আলেকম আসেলাম।'
মোতালেফ বলল, 'ভালো তো, সব ছাওয়ালপাল ভালো তো—?'
মাজু খাতুনের কথাটা মুখে এনেও আনতে পারলে না মোতালেফ। নাদির একটু হেসে বলল, 'হে মেঞা ভালোই আছে সব।'
মোতালেফ একটু ইতস্তত করে বলল, 'ছাওয়ালপানের জৈন্যে সের দুই-তিন গুড় লইয়া যান না মেঞা। ভালো গুড়।'
নাদের হেসে বলল, 'ভালোই তো। আপনার গুড় তো কোনওকালেই খারাপ হয় না।'
হঠাৎ ফস করে কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যায় মোতালেফের, 'না মেঞা, সে দিনকাল আর নাই।'
অবাক হয়ে নাদির, এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে মোতালেফের দিকে। এ কেমন-তরো ব্যাপারী? গুড় বেচতে এসে নিজের গুড়ের নিন্দা কি কেউ করে?
নাদির জিজ্ঞাসা করে, 'কত কইরা দিতেছেন?'
'দামের জৈন্যে কি? দুই সের গুড় দিলাম আপনার পোলাপানরে খাইতে। কয়ন জানি, চাচায় দিচ্ছে'
নাদির ব্যস্ত হয়ে বলে, 'না না না, সে কি মেঞা, আপনার বেচবার জিনিস, দাম না দিয়া নেব ক্যান আমি।'
মোতালেফ বলে, 'আইচ্ছা, নিয়া তো যায়ন আইজ। খাইয়া দ্যাখেন। দাম না হয় সামনের হাটে দিবেন।'
বলতে বলতে কথাগুলো যেন মুখে আটকে যায় মোতালেফের। এবারেও জিনিস কাটবার জন্যে বলতে হয় এসব কথা, গুড়ের গুণাপণার কথা ঘোষণা করতে হয় খদ্দেরের কাছে, কিন্তু মনে মনে জানে, কথাগুলি কত মিথ্যা। পরের হাটে এসব খদ্দের আর পারতপক্ষে গুড় কিনবে না তার কাছ থেকে, ভিড় করবে না। তার গুড়ের ধামার সামনে।
অনেক বলা কওয়ায় এক সের গুড় কেবল বিনা দামে নিতে রাজি হয় নাদির, আর বাকি দু-সেরের পয়সা গুনে দেয় জোর করে মোতালেফের হাতের মধ্যে।
মাজু খাতুন সব শুনে আগুন হয়ে ওঠে রেগে, 'ও-গুড় ছাওয়ালপানের খাওয়াইতে চাও খাওয়াও, কিন্তু আমি ও-গুড় ছোব না হাত দিয়া, তেমন বাপের বিটি না আমি।'
এক-হাঠ লয়, নাদির আর ঘেঁষে না মোতালেফের গুড়ের কাছে। মাজু খাতুন নিষেধ করে দিয়েছে নাদিরকে, 'খবরদার ওই মাইনষের সাথে যদি ফের খাতির-নাতির কর, আমি চইলা যাব ঘরগুণা, রাইত পোহাইলে আমারে আর দেখতে পাবা না।'
মনে মনে মাজু খাতুনকে ভারি ভয় করে নাদির। কাজেকর্মে সরেশ কথায় বার্তায় বেশ, কিন্তু রাগলে আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না বিবির।
দিনকয়েক পরে একদিন ভোরবেলায় দুটি সেরা গাছের সবচেয়ে বড় ও ভালো দু-হাঁড়ি রস নিয়ে নদীর ঘাটে গিয়া খেয়া নৌকায় উঠে বসল মোতালেফ। ঝাপটানো ফুলগাছটার পাশ দিয়ে ঢুকল গিয়ে নাদিরের উঠানে, 'বাড়ি আছেন নাকি মেঞা?'
হুঁকো হাতে নাদির বেরিয়ে এল ঘর থেকে; 'কেডা? ও, আপনে? আসেন, আসেন। আবার রস নিয়া আইছেন ক্যান মেঞাসাব?'
মোতালেফকে আমন্ত্রণ জানাল বটে নাদির, কিন্তু মনে মনে ভারি শঙ্কিত হয়ে উঠল মাজু খাতুনের জন্য। যে-মানুষের নাম গন্ধ শুনতে পারে না বিবি, সেই মানুষ নিজে এসে সশরীরে হাজির হয়েছে। না জানি, কি কেলেঙ্কারিটাই ঘটায়।
যা ভেবেছে নাদির তাই। বাঁখারির বেড়ার ফাঁক দিয়ে মোতালেফকে দেখতে পেয়েই স্বামীকে ঘরের ভিতর ডেকে নিল মাজু খাতুন, তারপর মোতালেফকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, 'যাইতে কও।'
নাদির ফিসফিস করে বলল, 'আস্তে আস্তে—একটু গলা নামাইয়া কথা কও বিবি। শোনতে পাবে। মাইনষের বাড়ি মানুষ আইছে, অমন কইরা কথা কয় নাকি। কুকুর বিড়াল ডারেও অমন কইরা খেদায় না মাইনষে।'
মাজু খাতুন বলল, 'তুমি বোকবা না মিঞা, কুকুর বিড়াল থিকাও অধম থাকে মানুষ, শয়তান থিকাও সাংঘাতিক হয়। পুছ কর, রস খাওয়াইতে যে আইল আমারে, একটুও ভয়ডর নাই মনে, একটুও কি লাজ-সরম নাই?'
একটা কথাও মৃদুস্বরে বলছিল না মাজু খাতুন, তার সব কথাই কানে যাচ্ছিল মোতালেফের। কিন্তু আশ্চর্য, এত কঠিন, এত রূঢ় ভাষাও যেন তাকে ঠিক আঘাত করছিল না, বরং মনে হচ্ছিল, এত নিন্দামন্দ, এত গালাগাল তিরস্কারেরও মধ্যে কোথায় যেন একটু মাধুর্য মিশে, মাজু খাতুনের তীব্র কর্কশ গলার ভিতর থেকে আহত বঞ্চিতা নারীর অভিমান রুদ্ধ কণ্ঠের আমেজ আসছে একটু একটু।
দাওয়ায় উঠে রসের হাঁড়িদুটি হাত থেকে নামিয়ে রেখে মোতালেফ নাদিরকে ডেকে বলল, 'মেঞাসাব, শোনবেননি একটু?'
নাদিরের হাত থেকে হুঁকোটা হাত বাড়িয়ে নিল মোতালেফ, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই মুখ লাগিয়ে টানতে শুরু করল না, হুঁকোটা হাতেই ধরে রেখে নাদিরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমার হইয়া একটা কন বিবিরে।'
নাদির বলল, 'আপনেই কন না—দোষ কি তাতে।'
মোতালেফ বলল, 'না, আপনেই কন, কথা কবার মুখ আমার নেই, কন যে মোতালেফ মেঞা খাওয়াইবার জন্যে আনে নাই রস, সেইটুকু বুদ্ধি তার আছে।'
নাদির কিছু বলার আগে মাজু খাতুন ঘরের ভিতর থেকে বলে উঠল, 'তয় কিসের জৈন্যে আনছে?'
নাদিরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই জবাব দিল মোতালেফ, বলল, 'কয়ন যে, আনছে জ্বাল দিয়া দুই সের গুড় বানইয়া দেওয়ার জৈন্যে। সেই গুড় ধামায় কইরা হাটে হাটে নিয়া যাবে মোতালেফ মেঞা। নিয়া বেচবে অচেনা খদ্দেরের কাছে। এ-বছর এক ছটাক পছন্দসই গুড়ও তো সে হাটেবাজারে বেচতে পারে নাই। কেবল গাছ বাওয়াই সার হইছে তার।'
গলাটা যেন ধরে এল মোতালেফের। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, বাঁখারির বেড়ার ফাঁকে চোখে পড়ল কালো আর বড় বড় চোখ ছলছল করে উঠেছে। চুপ করে তাকিয়ে রইল মোতালেফ। আর কিছু বলা হল না।
হঠাৎ যেন হুঁস হল নাদির শেখের, বলল, 'ও কি মেঞা, হুঁকাই যে কেবল ধইরা রইলেন হাতে, তামাক খাইলেন না? আগুন নি নিবা গেল কইলকার?'
হুঁকোতে মুখ দিতে দিতে মোতালেফ বলল, 'না মেঞা ভাই, নেবে নাই।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন