সমরেশ মজুমদার

প্রথম ঘটনা
দীর্ঘ দেড় বৎসর পরে কাল সকালে সাতকড়ি বাড়ি ফিরিবে।
সাতকড়ি এতদিন কোথায় ছিল তাহার হিসেব দিতে হইলে মধুডাঙ্গার সেই ঘটনাটা বিবৃত করিতে হয়।
কোন যুগে কার আমলে কি কোন রাজার রাজত্বের সময় মধুর প্রাদুর্ভাব ঘটিয়াছিল তাহালইয়া গবেষণা করার প্রয়োজন আছে বলিয়াই আজ পর্যন্ত এদিককার কেহ মনে করে নাই। মধু হিন্দু ছিল কি মুসলমান ছিল, উগ্র ক্ষত্রিয় ছিল কি সদগোপ ছিল তাহাও কেহ জানে না। জানে কেবল ইহাই যে, বহুদিন পূর্বে মধু নামে এক দুর্ধর্ষ দস্যু এই স্থানে বাস করিত। স্থানের নাম আগে ছিল পীতাম্বরপুর—তাহার পর মধুর নামে নাম প্রচলিত হইয়া এখন এই পীতাম্বরপুরকে সবাই বলে মধুডাঙ্গা।
দিগন্ত বিস্তৃত তৃণবৃক্ষহীন দুস্তর এই ডাঙ্গার কোথায় নাকি মধুর দুর্গ ছিল ভূগর্ভে। সরকারি কোনো গুপ্তচর সেই দুর্গ এবং দুর্গেশ্বর মধুকে কোনদিন খুঁজিয়া পায় নাই।
মধু গেছে কিন্তু মধুডাঙ্গা আছে এবং পথপ্রান্তবর্তী ক্ষুদ্র এই মধুডাঙ্গা গ্রামে ঝুলনের দিন এক মেলা বসে। কিন্তু মধুডাঙ্গার এই মেলা নামে মেলা—তেমন কিছু নয়। মাত্র দশ-বারোখানা দোকান বসে। বালতি, কড়াই প্রভৃতি রান্নার সরঞ্জাম, হরেক রকমের খেলনা, আরশি বসানো টিনের কৌটা, কাঠের চিরুনি, কাঠের মালা, ফিতে, ঘুনসি, সূচ, সুতা, পাঁপর ভাজা, ঘুঘনি, পান, সিগারেট আর নানান আকারের নানান স্বাদের নানান রঙের আর নানান গন্ধের বিবিধ মিষ্টান্ন বালক-বালিকার আর গৃহস্থের লোভনীয় এবং ক্রেয় যা তাহাই কেহ গরুর গাড়িতে কেহ নিজের মাথায় কি পিঠে চাপাইয়া লইয়া আসে আর চট টানাইয়া বসিয়া যায়। কিন্তু সমারোহটা ভিতরে বেশি।
রাধামাধব বিগ্রহের প্রশস্ত আর উচ্চশির মন্দির, তার সম্মুখেই নাটমন্দির, তার এদিকে চত্বর। চত্বরের দক্ষিণে অতিথিশালা সাধু-বৈষ্ণবের বিশ্রাম আর ভোজনের স্থান।
সন্ধ্যা লাগিতেই বড় বড় আলো জ্বালাইয়া কীর্তন শুরু হইয়া গেল। অসংখ্য লোক কীর্তনরস গ্রহণ করিতে বসিয়া গেছে। দেড় মাসের শিশুটিকে লইয়া এক জননীও আসিয়াছেন। শতাধিক বর্ষ বয়স্ক এক অন্ধ বৃদ্ধকে আনিয়া বাড়ির লোকে একেবারে সম্মুখে বসাইয়া দিয়া গিয়াছে। সক্ষম লোকের তো কথাই নাই।
কীর্তনের আসরে অনেক লোক থাকিলেও সেখানেই সবাই নাই, বাইরে গাছের তলায় স্থানে স্থানে বৈষ্ণবীগণসহ বাবাজি বসিয়া আছেন—তাঁহাদের কোনও কাজ নাই, গল্প চলিতেছে কেবল। ওদিকে কেউ ইট পাতিয়া আগুন করিয়া কড়াইয়ে চাল সিদ্ধ করিয়া লইতেছে—রাধামাধবের প্রসাদ পাইবার নিমন্ত্রণ তাহার হয় নাই, যেমন হইয়াছে বৈষ্ণবীগণসহ ওই বাবাজির। ধোঁয়ায় ধূলায় স্থানটা বড় অপরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে। আরও যাহারা বাহিরে আছে, তাহারা সবাই যেন ক্লান্ত। যে বেড়াইতেছে সে গা দুলাইয়া বেড়াইতেছে, যে বসিয়া আছে সে ঘাড় গুজিয়া বসিয়া আছে, যে শুইয়া আছে সে পিঠ দুমড়াইয়া হাঁটুর সঙ্গে মাথা ঠেকাইয়া শুইয়া আছে। একটি ভিখারিণী বসিয়া বসিয়া নির্বিকার চিত্তে তার ছেলেটির দিকে তাকাইয়া আছে। ছেলেটি ধূলা লইয়া মুখে পুরিতেছে—দোকানগুলি খোলাই আছে। বাইশ-তেইশ বছরের একটি বিধবা মেয়ে একটি মণিহারী দোকানের সম্মুখে বসিয়া কাহারও জন্য যেন ঘুনসি বাছাই করিতে ছিল, দুগাছা বাছিয়া লইয়া আর দাম দিয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া দেখিল তার পাশেই একটা অপরিচিত লোক দাঁড়াইয়া আছে।
মেয়েটি সরিয়া গেল।
মেয়েটির অপরিচিত ওই লোকটিই সাতকড়ি। প্রাণপ্রিয় দুইটি বন্ধুসহ সে মধুডাঙ্গার মেলায় আসিয়াছে ফুর্তি করিতে। কীরকম ফুর্তি সে এতক্ষণ করিয়াছে এবং কীরকম ফুর্তি সে রাতভোর করিত তাহা কেহই জানে না, সে-ও জানে না, কিন্তু সে চরম ফুর্তিতে যে প্রচণ্ড বাধা পড়িয়া গেল তাহা সবাই জানে।
ফুর্তি চরমে তুলিতে যাইয়াই মধুডাঙ্গার মেলা হইতে তাহাকে সবান্ধবে যাইতে হইল গিরিধরপুরের থানায়—ফুর্তি করা শেষ হইল না, গুরুতর একটা অপরাধের দরুণ আদালতের বিচারে তাহার কারাদণ্ড হইল, সেই কারাদণ্ড ভোগ করিয়া অর্থাৎ ফুর্তির শখ নিঙড়াইয়া বাহির হইয়া যাইবার পর সাতু কাল বাড়ি ফিরিবে। আজ মাসের কোন তারিখ তাহা এ-বাড়ির কেহ জানে, কেহ জানে না। কিন্তু এত লোকের কে একজন যেন নি:শব্দে হিসাব রাখিতেছিল, হঠাৎ সে প্রচার করিয়া দিল, কাল সাতু বাড়ি আসিবে। কাল ৭ই।
চারিটি ভাইয়ের ভিতর সাতকড়ি দ্বিতীয়। ছোট দুইভাই বিদেশে থাকে, তবু বাড়িতে লোকের ভিড়, ভিড়ের ভিতর সাতকড়ির স্ত্রীও বর্তমান। সাতকড়ির স্ত্রী মাখনবালাও দিন গুণিতে শুরু করিয়াছিল, কিন্তু অন্যভাবে, স্বামীকে পুনরায় চোখে দেখার দিনটি সে দুরুদুরু বুকে ভয়ে ভয়ে গুণিতেছিল। গুণিতে গুণিতে অবশ হইয়া একদিন সে গুণিতে ভুলিয়া গিয়াছিল। শুরুর সূত্রটা মনে ছিল আর গণনার শেষ দিনটা বিভীষিকার মতো সম্মুখে দাঁড়াইয়া তাহার বুক কাঁপাইয়া তাহাকে জর্জর করিতেছিল, কিন্তু একটি একটি করিয়া মাঝখানকার অসংখ্য দিন তাহার অসাড়ে উত্তীর্ণ হইয়া গেছে—আর সে ভাবিতে চাহে নাই। মনে মনে চোখ বুজিয়া অন্ধ হইয়া সে সেই অগণ্য দিনের শেষ দিনটাকে প্রাণপণে অনন্ত অন্ধকারে রাখিয়া দিয়াছিল, ভয়াবহ সেই দিনটা সেই অন্ধকারের ভিতর হইতে হঠাৎ মুখ তুলিয়াছে, মাখন চমকিয়া উঠিল। মাঝখানে ছোট একটা রাত্রি, সূর্য কাল আবার উঠিবে তখন স্বামী আসিবেন—মাখনের জীবন্মৃত শুষ্ক প্রাণ কণ্ঠাগত হইল। সূর্যের উদয়াস্তব্যাপী জীবন আর দিনগুলিকে এত সংক্ষিপ্ত তার কোনওদিন মনে হয় নাই, সাতকড়ি যেদিন যায় সেদিন তখন কেবল প্রভাত, আজ এই সন্ধ্যা—
মাখনের মনে হইতে লগিল, মাঝখানে কেবল একটি দীর্ঘনি:শ্বাস সে ত্যাগ করিয়াছে। নি:শ্বাসটি শেষ করিয়া ফেলা হয় নাই, বুক যেন নি:শ্বাসের ভারে দুর্বহ হইয়া আছে। ইহারই মধ্যে দেড় বৎসর কাটিয়া গেল। বাড়িতে আরো লোক আছে—সবাই সাতুর আপন, কেউ ভাজ, কেউ মা, কেউ আর কিছু। কিন্তু এতগুলি পরমাত্মীয় থাকিতেও মাখনের মনে হইয়াছে, সমগ্র ব্যাপারের সঙ্গে তাহারই লিপ্ততা যেন সকলের চেয়ে বেশি—সেই বেশি করিয়া জড়ানো, সে স্ত্রী, বাহির হইতে আসিয়া স্বামীর কোন ক্ষেত্রটা অধিকার করিয়া বসিয়াছে, তাহা অনুমান করিতে কেহ কখনো বোধহয় মন খুলিয়া বসে নাই, তবু একটা তাহার আধিপত্যের পরাকাষ্ঠা লোকে যেন তাহার কাছে প্রত্যাশা করিয়াছে; একটি স্থানে সে সর্বস্ব, সর্বগ্রাসী, সতত জাগ্রত; সে তাহার দাবি পূর্ণতম মাত্রায়, একটি অণু পরিমাণ প্রাপ্যের মায়া ত্যাগ, দাবি লঙ্ঘন সহ্য না করিয়া অশেষ শক্তিশালিনী দশভূজার মতো দশ হস্তে কাড়িয়া-টানিয়া ছিনাইয়া আদায় করিয়া লইবে—ইহা যেন মানুষের চৈতন্যের মতো যেমন সহজ তেমনি অকুন্ঠ ব্যাপার।
কিন্তু সে ক্ষমতা সে দেখাইতে পারে নাই। সংসারের প্রত্যেকটি লোকের কাছে এই অক্ষমতার লজ্জায় তাহার মুখ হেঁট হইয়া গেছে। বিবাহের পর শাশুড়ি কতবার আভাসে-ইঙ্গিতে জানাইয়াছেন যে ছেলের বন্ধন সে-ই, জীবনের শৃঙ্খলা সে-ই, সৌষ্ঠব শ্রী-সৌন্দর্য সম্মান একমাত্র তাহারই হাতে, সবারই সেই মতো, বাড়ির বাহিরের লোকেরও সেই ইচ্ছা, সেই জ্ঞান মাকে ডিঙ্গাইয়া একটি অগ্রজ দুইটি অনুজকে অতিক্রম করিয়া সেই সব—একটি লোকের জন্য এই সর্বোচ্চ অগণ্য স্থানটি অকপটে ছাড়িয়া দিয়া নিশ্চিন্ত হইতে কাহারো বাধে নাই। কেহ ইতস্তত সন্দেহ করে নাই; শাশুড়ি যেন পরিত্রাণ পাইয়াছিলেন। তাহার অস্তিত্বই যেন একটা অপরাজেয় অপরিহার্য শাসনবাণী—তাহাকে লঙ্ঘন করিবার উপায় নাই। কিন্তু আজ সে পরাস্ত—শাসনদণ্ড ধুলায় লুটাইতেছে; সে আজ এত তুচ্ছ অর্কমণ্য গুরুত্বহীন যে, তাহার থাকা না থাকার একই মূল্য। দুনিয়ার লোকে কি বলিতেছে; কি ভাবিতেছে তাহা সে জানে না; কিন্তু স্বামীর জীবন হইতে নিজেকে বিচ্যুত করিয়া লইয়া সে তো সরিয়া স্বতন্ত্র হইয়া দাঁড়াইতে পারিতেছে না। তাহার পৃথিবী অতিশয় ক্ষুদ্র; স্বামীর সত্তার বাহিরে যে জীবন্ত পৃথিবী রহিয়াছে তাহার সঙ্গে সংযোগ তাহার স্বামীকেই বৃন্ত করিয়া, স্বামীকেই বৃন্তরূপে পাইয়া সে চারিদিকের আবহমণ্ডলে ফুটিয়া আছে, তাহার পরিচয়ই ওই।
ওই পরিচয় চলিতেছিল—
কিন্তু হঠাৎ একদিন কি হইয়া গেল—পৃথিবী তাহার পথ ছাড়িয়া উলটাইয়া পড়িল, যেখানে যে বস্তুটি সুবিন্যস্ত ছিল বলিয়াই সে সুখে ছিল, স্বাভাবিক ছিল; একটিবার চোখের পলক না পড়িতেই তাহারা মিলিয়া মিশিয়া বিকৃত একাকার হইয়া তাহার সেই পৃথিবী ছন্নছাড়া মৃতের শ্মশানে রূপান্তরিত হইয়া গেল....
স্বামী জেলে গেলেন—
যে কুঞ্জ মক্ষিকার গীতিগুঞ্জরণে মুখর ছিল, প্রচণ্ড আঘাতে সে এলাইয়া পড়িল, যে আকাশ আলোর মালা, মেঘের ঢেউ, বায়ুর কম্পন দিয়া সাজানো ছিল, তাহা অন্ধকারে অদৃশ্য হইয়া গেল; ভাবনার দলগন্ধ আর বুকের তৃষ্ণা দিয়া নির্মিত যে নীড় অনন্য ছিল, তাহার চিহ্নও রহিল না; মন্দিরের নিত্য অর্চনোৎসব বন্ধ হইয়া গেল, ফুলের বুকের মধুরস তিক্ত হইয়া উঠিল; যে পথে সে আলো দেখিত, যে পথে সে গান শুনিত, যে পথে সুধা ঝরিত, চক্ষের নিমেষে সমস্ত পথ রুদ্ধ হইয়া জগতের সঙ্গে তাহার আর কোন সম্পর্ক রহিল না...
কিন্তু তাহার এই চরম দুর্গতির অংশ লইতে কেহ বুক বাড়াইয়া আসিল না; তাহার মনে হইতে লাগিল, একটা ছি-ছি রব তাহাদেরই গৃহকেন্দ্র হইতে উত্থিত হইয়া ছড়াইতে ছড়াইতে যেখানে সত্য সত্যই আকাশ স্পর্শ করিয়াছে, সেই শেষতম প্রান্তরেখা পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হইয়া গেছে—জীবজগৎ শিহরিয়া কানে আঙুল দিয়া বসিয়া আছে...এই দুর্বিষহ লজ্জা অখণ্ড গুরুভার আর অন্ধকার একখানা মেঘের মতো কেবল তাহারই বুক জুড়িয়া অক্ষয় হইয়া রহিল—আমিও তোমার সঙ্গে আছি বলিয়া ভার বন্টন করিয়া লইতে কেউ আসিল না।
স্বামীর অপরাধ গুরুতর এত যে, তাহার চিন্তাই সহ্য হয় না; মানুষ কোনদিন তাহা সহ্য করিতে পারে না—সন্তানের জননী হইয়া, কূলের বধূ হইয়া, স্বামীর স্ত্রী হইয়া নারী তাহা ক্ষমা করে নাই। ভগবানের নাম যার বুকে আছে পশু হইয়া জন্মগ্রহণ করে নাই—এ জ্ঞান যার আছে সে তাহা ক্ষমা করে নাই। স্বামী এমনি অচিন্তনীয় অপরাধ করিয়া জেলে গিয়াছিলেন; মুক্তি পাইয়া কাল ফিরিয়া আসিবেন। কাল ৭ই। গৃহের আর সবাই উৎকন্ঠিত, ভৃত্যটি পর্যন্ত; বিমর্ষে থাকিয়া থাকিয়া তাহারা শ্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। —সেই শ্রান্তির মাঝেই যেন তাহাদের লজ্জাবোধের সমাধি হইয়াছে; তাহাদের মনে নাই কি কারণে তাহাদের সেই পরমাত্মীয়টি এতদিন গৃহে নাই। কিন্তু কোনওদিন একেবারে না থাকিলেই যেন ভালো হইত।
রাত্রি তখন গভীর।
মাখন বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল—আকাশের দিকে চোখ তুলিয়া একবার ভগবানকে সে ডাকিল...এত বড় আকাশের যেখানে যে জ্যোতি:বিন্দুটি ছিল, মেঘের গাঢ় প্রলেপে তাহা একেবারে চিহ্নহীন হইয়া গেছে; থই থই অন্তহীন কালোর পাথারে পৃথিবী ডুবিয়া গেছে; তাহার শ্বাস বহিতেছে না—মাখনের ভয় করিতে লাগিল।
কালোর অতলগর্ভে অবতরণ করিয়া কাহারা যেন মন্থনে রত হইয়াছে; তাহারা তাহাদের হারানো রত্ন খুঁজিতেছে, তাহাদের হাতের শব্দ নাই; পায়ের শব্দ নাই; মুখে শব্দ নাই; কেবল চক্ষু দুটি দপদপ করিতেছে...
তাহাদের নির্মম অবিশ্রান্ত দণ্ডপ্রহারে আবর্ত-কেন্দ্র হইতে ঢেউ ছুটিতেছে—আগে ধোঁয়া, তাহার পর ফেনমুখী হলাহল উদগীরিত হইতেছে...সেই জ্বালাময় হলাহলের পাত্র হাতে লইয়া কে যেন অগ্রসর হইতে লাগিল; কালোর মাঝেই কালো মূর্তিটি স্পষ্ট—যেমন নি:শব্দ তেমনি দৃঢ, তেমনি মন্থর। ওই হলাহল তাহাকে পান করিতেই হইবে—নিস্তার নাই। কতদূর হইতে কালোর স্তর লণ্ঠন ঠেলিয়া ঠেলিয়া মূর্তি অগ্রসর হইতেছে—তাহার গতির বিরাম নাই, অনন্তকাল ধরিয়া সে যেন আসিবেই—পথের শেষ নাই...
কবে একেবারে সম্মুখে পৌঁছিয়া হলাহলের পাত্রটি তাহার হাতে দিবে। বড় জা গোলাপ সর্বাগ্রে উঠিয়াছিল, সে উঠানে নামিয়াই চিৎকার করিয়া উঠিল এবং সেই চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গিয়া শশব্যস্তে বাহিরে আসিয়া সবাই দেখিল মাখন মূর্ছিত হইয়া উঠানে পড়িয়া আছে।
শাশুড়ি ছুটিয়া যাইয়া বধূর মাথা কোলে তুলিয়া লইয়া বসিলেন। আজ এখনই ছেলে আসিবে যে। আজ ৭ই। গোলাপ দু-মিনিটে তিন বালতি জল তুলিয়া ফেলিল; নিতু মাখনের মুখে হাত দিয়া ডাকিতে লাগিল কাকীমা? কাকীমা?
সাতকড়ির দাদা সতীশ দরজার আড়াল হইতে মুখ বাড়াইয়া ফিরিয়া গেল। গোলাপ নিতুকে সরাইয়া দিয়া মাখনের মাথায় জল ঢালিতে লাগিল; বিরাজ পাখা করিতে লাগিলেন এবং অল্পক্ষণ পরেই মাখন চোখ খুলিয়া উঠিয়া বসিয়া মনে করিতে পারিল না যে, যে দৃশ্যটি মনে পড়িতেছে সে দৃশ্যটি স্বপ্নে দেখিয়াছিল, কি সত্যই ঘটিয়াছিল! বিরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন, বউমা, কেমন আছ? কিন্তু মাখনের মন ছিল কুহেলিকাচ্ছন্ন। শব্দ গঠিত করিয়া উত্তর দিতে তাহার দেরি হইল। বিরাজ আবার ওই প্রশ্ন করিলেন কিন্তু মাখন কিছু বলিবার পূর্বে সতীশ নামিয়া আসিল—
বিরাজ বলিলেন—কোথায় যাচ্ছিস?
—সাতুকে আনতে যাচ্ছি মা...
—যা।
সতীশ জিজ্ঞাসা করিল,—বউমা উঠোনে এসে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন কী করে?
—তাই ত ওকে শুধোচ্ছি। তুই ভাবিসনে, ভালোই আছে। অর্থাৎ সাতকড়িকে আনিতে যাইবার পক্ষে বউমায়ের জন্য উৎকণ্ঠায় কালক্ষেপ করিবার প্রয়োজন নাই।
—যাই, বলিয়া সতীশ বাহির হইয়া গেল। ধরিয়া আনিবার দরকার সাতুর ছিল কিনা কে জানে; কিন্তু একা একা, যেন অনিমন্ত্রিতের মতো, গৃহে প্রবেশ করিতে সে সংকোচ বোধ করিতে পারে, তাহারই নিবারণকল্পে বিরাজ এবং তাহার বড় ছেলে সতীশ পরামর্শপূর্বক সহজভাবে একটু চেষ্টা করিলেন—সতীশ আগুয়ান হইয়া তাহাকে আনিতে গেল। বিরাজ ও বড়বউ তখন মাখনকে লইয়া পড়িলেন—
—অসুখ করেছে? মাখন নির্জীবের মতো বসিয়াছিল; বলিল, না।
—তবে, ভয় পেয়েছিলে?
—না।
—তবে?
মাখন বলিল—রাত্তিরে ঘুম হল না; বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। কখন কেমন করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছি—জানিনে। বলিয়া মাখন উঠিল। নিতু তখন মাখনের কাপড় ধরিয়া আহ্লাদে লাফাইতে লাগিল। অনেক বেলায় সতীশ ফিরিল, কিন্তু একা। ছোটবউকে সুস্থভাবে চলিতে ফিরিতে দেখিয়া বিরাজ সেদিকে নির্বিঘ্ন হইয়া পুত্রের আগমন প্রতীক্ষায় দরজায় দাঁড়াইয়াছিলেন—সতীশকে একা ফিরিতে দেখিয়া তিনি চেঁচাইয়া উঠিলেন,—সাতু কই?
সতীশ ধীরে ধীরে তাঁহার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল; বলিল,—সে এল না।
—এল না? কোথায় গেল? এতদিন দর্শন ও প্রাপ্তি আসন্ন হয় নাই—অনিবার্য বিলম্ব সহিতেছিল; কিন্তু আজ সে প্রতি মুহূর্তে নিকটতর হইতে হইতে একেবারে সম্মুখে না আসিয়া সহসা কোথায় অদৃশ্য হইল। বিরাজের বুক ফাটফাট করিতে লাগিল...
সতীশ বলিল,—চলো ভিতরে, বলছি। ভিতরে আসিয়াই বিরাজ পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, তাকে আনতে পারলিনে কেন? কোথায় গেল সে?
—কি জানি কোথায় গেল? জেলের বাইরে এসে সে বলল, একটু দাঁড়াও আমি আসছি। বলে সে কি কাজে গেল জানিনে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার—
সাতুর অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাহার কি দুরবস্থা ঘটিল তাহা সতীশ বলিল না; বোধহয় মায়ের চোখে জল দেখিয়া সে একটু বিব্রত বোধ করিয়াই পাশ কাটাইল।
বিরাজ বলিলেন, সে হয়তো তখুনি এসে তোকে না দেখতে পেয়ে অন্যদিকে চলে গেছে।
বিরাজের এ অনুমান সত্য নিশ্চয়ই নয়—কিন্তু সতীশের নিকট হইতে কোনও জবাব আসিল না। বিরাজের চোখে সেই যে জল দেখা দিল সে জল নিজেও থামিল না, তিনিও চেষ্টা করিয়া থামাইলেন না—জলের সঙ্গে নি:শ্বাসও বহিতে লাগিল...কিন্তু মাখনের সকল দু:খ আর অসহিষ্ণুতার উপর যেন অধিকতর দু:সহ হইয়া উঠিল এই বেদনাটাই যে, যে পুত্র সমুদয় পৃথিবীর সজাগ দৃষ্টির সম্মুখে তাহাদের সবাইকে এমন করিয়া পাঁকে ডুবাইয়া লইয়া দাঁড় করাইয়া দিয়াছে, সে পুত্র কেমন পুত্র। এই চোখের জল সর্বকালের এবং সর্বদেশের মনুষ্যত্বের অবমাননা—জননীর বুকের স্নেহের অঙ্গে কলঙ্কের কালিমা লেপন। ইহা অভদ্র।
বিরাজের একবার চোখ মুছিবার সময় মাখন বলিল,—পথ চেয়ে আছ বৃথাই মা, দিনের আলোয় মানুষের সামনে দিয়ে আসার উপায় তাঁর নেই। তিনি আসবেন সন্ধ্যার পর।
শুনিয়া বিরাজের পিত্ত জ্বলিয়া গেল। তিনিও বধূর ভাবগতিক লক্ষ্য করিতেছিলেন; ওই কথায় তাহাকে তিনি তীব্রতর চক্ষে লক্ষ্য করিলেন, বলিলেন, বউমা তোমার মান-অভিমান আর রাগের ভঙ্গী আমার ভালো লাগছে না। তোমার মুখ দিয়ে বিষ পড়ছে। অমন বিষ-মুখ করে থেকো না তুমি, মুখ অমন বিষ করে ছেলের সামনে যেতে পাবে না শুনে রাখো। তুমি যেমন আছ, তেমনি থাকো; আমরা তোমার গুরুজন। আমাদের সামনে—
কিন্তু মাখন হঠাৎ পিছন ফিরিল দেখিয়া বিরাজ যাহা বলিতেছিলেন তাহার গতি অন্যদিকে ফিরাইয়া লইলেন—শেষ কথাটাই অত্যন্ত সংক্ষেপে এবং অত্যন্ত সতেজে বলিয়া দিলেন—যাও, কিন্তু সাবধান।
একটু নি:শব্দ হইতেই সতীশ গলা বাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল,—কি মা?
—যাই বলছি গিয়ে। বলিয়া বিরাজ ছোটবউয়ের আচরণ অর্থাৎ তাহার দু:খের আর ক্ষোভের কথা বড় ছেলের কানে ঢালিতে বসিয়া গেলেন, কিন্তু সুখ কি দু:খ কিছুই পাইলেন না। এই ঘাঁটাঘাঁটিতে সতীশের লজ্জা করিতে লাগিল, বলিল, বড়বউকে বলো সে-ই বুঝিয়ে বলবে এখন। বলিয়া সে মুখ নামাইল। মায়ের নি:শব্দ চোখের জল আর সবার মুখের তাড়নায় অতিষ্ঠ হইয়া সতীশ ভাইকে আর একবার খুঁজিতে বাহির হইল। কিন্তু গম্য-অগম্য ইতর-ভদ্র কোন স্থানেই নিরুদ্দিষ্টের সাক্ষাৎ মিলিল না—কোথায় গেলে সাক্ষাৎ মিলিবে সে সন্ধানও মিলিল না। এই সংবাদ বিরাজ পাইয়া শুইয়া পড়িলেন এবং খানিক শুইয়াই রহিলেন; তারপর তিনি মুহুর্মুহু ঘর-বাহির করিতে লাগিলেন, মাখনের রকম দেখিয়া উৎকণ্ঠার উপর তাঁহার ক্রোধ জন্মিতে লাগিল—তথাপি তাঁহার মুখের শব্দ বন্ধ হইয়া রহিল। তাঁহার মুখে আজ ভাত উঠিল না।
কিন্তু ফলিল মাখনের কথাই।
সন্ধ্যার পর বার-দুয়ারের চৌকাঠে ঠাকুমারকোলের কাছে বসিয়া নিতু বলিতেছিল, কাকা কখন আসবে ঠাকুমা? কোথায় গিয়েছে কাকা?
বিরাজ বসিয়া যেন বিশেষ ঘোরে ঝিমাইতেছিলেন, বলিলেন, তা জানিনে।
—এতদিন কোথায় ছিল?
বিরাজ মুখ ফিরাইয়া রহিলেন, কথা কহিলেন না। নিতু বলিতে লাগিল, কাকা অনেকদিন বাড়িতে আসেনি, নয়, ঠাকুমা? কেন আসেনি? কোথায় ছিল এতদিন? আমার জন্যে কি আনবে?
পরম স্নেহাস্পদ বালক পৌত্রের কৌতূহল নিবৃত্তির দিকে ঠাকুমার কিছুমাত্র উৎসাহ দেখা গেল না। বালকের এমনি ধারা শতেক প্রশ্নে যে মিনতি আর যে আগ্রহ দেখা দেয়, বিরাজের প্রাণের আনন্দপ্রবণ অন্ত:স্রোত তাহার স্পর্শে চিরকাল নাচিয়া উঠিয়াছে, আজ তা তাঁহার অজ্ঞাতেই মুহূর্তের জন্য একবার চোখের পাতা ভারি করিয়া তুলিল মাত্র, কিন্তু মনে পড়িল না যে সবই বিষদৃশ। নিতু চুপ করিবার পর বাড়ি নিস্তব্ধ হইয়া গেল। বিরাজ আনমনা হইয়া রহিলেন—
বিরাজ আনমনাই ছিলেন; হঠাৎ চমকিয়া তিনি দেখিলেন, আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা একটি লোক তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে। তাহাকে চিনিতে তাঁহার বিলম্ব হইল না—সাতু? বলিয়া তিনি প্রকৃত সজীব ব্যক্তির মতো লাফাইয়া উঠিলেন,সাতু গায়ে-মাথার আচ্ছাদন খুলিয়া ফেলিয়া জননীকে প্রণাম করিল এবং পরক্ষণেই হইচই বাধিয়া গেল। নিতু চিৎকার করিয়া সংবাদ রাষ্ট্র করিতে লাগিল, বাবা,কাকা এসেছে, মা, কাকা এসেছে, কাকীমা, কাকা এসেছে। বলিতে বলিতে সে কাকার মুখের দিকে মুখ তুলিয়া আর তার হাত ধরিয়া নাচিতে লাগিল...
'আয়,' বলিয়া বিরাজ অগ্রসর হইয়া গেলেন। তাঁহার পিছন পিছন সাতু বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া দেখিল তাহার স্ত্রী ব্যতীত আর সবাই একত্র হইয়া সোৎসুকে দাঁড়াইয়া আছেন। দাদাকে সে প্রণাম করিল, বউদিকেও প্রণাম করিল, দাদার ছোট ছেলেটাকে সে দেখিয়া যায় নাই—এটা আবার কবে হল? জিজ্ঞাসা করিয়া সাতু ডান হাতের দুটি আঙুলে তাহার গণ্ড স্পর্শ করিল।
দাদার বিশেষ কিছু বলিবার ছিল না। 'আমায় দাঁড় করিয়ে রেখে কোথায় পালিয়েছিলি?' বিস্মিত এই প্রশ্নটি অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকবার তার মনে উঠিয়াছিল, কিন্তু কেন পালাইয়াছিল তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়া বোধহয় চক্ষুলজ্জার বশেই সে নি:শব্দে সরিয়া গেল, মাকে সন্তুষ্ট করিতেও সে কোনও সম্ভাষণও মুখে ফুটাইতে পারিল না।
বউদি গোলাপ কেবল জিজ্ঞাসা করিল—ভালো আছ?
সাতু বলিল,—তোমাদের আশীর্বাদে। বলিয়া হাসিল। হাসিটা হঠাৎ কটু মনে হইয়া গোলাপের মন আরও খারাপ হইয়া গেল। তাহার হেঁশেল ছিল, মুৎফরক্কা অভ্যর্থনার পর সে সেখানেই গেল।
বিরাজ ছেলেকে অবলোকন করিতে ছিলেন; তাঁহার চক্ষুলজ্জাও নাই, হেঁশেল নাই, ছেলের গায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে তিনি বলিলেন,—বড় রোগা হয়ে গেছিস। ভেতরে অসুখ নেই তো?
সাতু নিজের গায়ের দিকে একবার চাহিয়া দেখিল : হাসিয়া বলিল,—না। কিন্তু বড় কষ্ট দিয়েছে, মা!
শুনিয়া মায়ের চোখে জল আসিল—বলিলেন,—আজ সারাদিন খেয়েছিস?
সাতু, তাহাদের আড্ডায় আজ যা খাইয়াছে সে জিনিস এ-বাড়িতে রান্না হওয়া দূরের কথা, প্রবেশই করে না। কিন্তু সে মিথ্যা কথা বলিল, কিছুই খাইনি মা।
—কিছুই খাসনি? আ-হা-হা...আর্তনাদ করিয়া বিরাজ হাঁকিলেন,—ছোটবউমা, রান্না হল? বলিয়া উত্তরের জন্য এক মুহূর্ত সবুর না করিয়া তিনি নিজেই রান্নার তদারক করিতে রান্নাঘরের দুয়ারে যাইয়া দাঁড়াইলেন এবং রান্না সমাপ্ত হইয়াছে কিনা তাহা দেখিবার পূর্বেই তিনি দেখিতে পাইলেন, ছোটবউ ব্যাধিকাতর দুর্বল ব্যক্তির মতো জড়সড় হইয়া এককোণে দেয়ালের সঙ্গে গা ঠাসিয়া বসিয়া আছে....
খুবই লক্ষ্য করা—এব্যাপারটা মুলতবী রাখিয়া বিরাজ জানিতে চাহিলেন—বড় বউমা, রান্না হল? সাতু সারাদিন কিছু খায়নি।
'এই হল মা'—বলিয়া বড়বউ হাঁড়ি আর কাঠি লইয়া খুব ব্যস্ত হইয়া উঠিল।
বিরাজ অবেলায় রান্নাঘরের আমিষ মাটি ভুলিয়াও মাড়ান না, কিন্তু এখন বড় তাগিদ ছিল, মুলতবী ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করিতে তিনি আমিষ মাটির উপর দিয়াই ছোটবউয়ের দিকে আরও খানিকটা অগ্রসর হইয়া গেলেনঃ গলা খুব খাটো করিয়া বলিলেন, তুমি অমন করে বসে আছ যে? ইত্যবসরে তাঁহার বিরহী ছেলেকে দেখা এবং দেখা দেওয়া বিরহিণী বউয়ের উচিত ছিল বলিয়া বিরাজের মনে হইল।
মাখন কথা কহিল না, তাহার মাথা মাটির দিকে আরো ঝুঁকিয়া পড়িল।
বিরাজ বলিতে লাগিলেন,—ছেলের শরীরের দিকে চেয়ে আমার মন ভালো নেই, বউমা। এমন সময় তুমি আমায় জ্বালিও না বলছি। ওঠো।
মাখন মুখ তুলিল না, বলিল—উঠে কি করব?
—করবে আবার কি? নেচে বেড়াতে তোমায় কেউ বলছে না। ছেলের সামনে তুমি মুখ অমন বিষ করে থাকতে পাবে না।—বলিয়া মহা রাগতভাবে মাথায় মস্ত একটা ঝাঁকি দিয়া বিরাজ প্রস্থান করিলেন।
সাতু ইত্যবসরে তাহার দেড় বৎসরের পরিত্যক্ত গড়গড়াটা বাহির করিয়া লইয়াছে। কেবল তাহার প্রিয় তরকারিগুলি প্রস্তুত করিতে বধূদ্বয়কে হুকুম করিয়াই বিরাজ কর্তব্য সম্পাদনপূর্বক নিশ্চিন্ত হন নাই, সাতুর শ্রান্তিহারী এবং সুখজনক শৌখিন তামাক আর টিকেও আনাইয়া চাকরটাকে কি কারণে কে জানে, সে দিনের মতো ছুটি অর্থাৎ বাহির করিয়া দিয়াছেন।
সাতু চটপট তামাক সাজিয়া লইয়া টানিতে বসিল। নিতু তার ছড়ানো পায়ের ফাঁকে বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল—কোথায় ছিলে কাকা এতদিন?
বালকের ওই একই প্রশ্ন—
কিন্তু একবারও তাহার উত্তরের আশা মিটিল না, ভূতপূর্ব বাসস্থান সম্বন্ধে সাতু একটা অপ্রকৃত উত্তর গড়িয়া না তুলিতেই বিরাজ রান্নাঘর হইতে সেখানে আসিয়া পড়িলেন, বলিলেন—তোর সে কথায় বারবারই কাজ কিরে লক্ষ্মীছাড়া? পালা এখান থেকে। বলিয়া নিতুর সোহাগ সুখ ভাঙ্গিয়া দিয়া তাহাকে তিনি দাঁড় করাইয়া দিলেন।
সাতু চিরদিন সপ্রতিভ—
নিতুর প্রশ্নে এবং ভর্ৎসনা দিয়া মায়ের এই চাপা দিবার চেষ্টায় তাহার মনে ঘুণাক্ষরেও একটু বিকার উপস্থিত হইল না, বলিল—আহা বসুক না। বলিয়া সে নিতুকে হাতে ধরিয়া টানিয়া লইয়া বসাইল, কিন্তু নিতুর তখন আর খবর জানিবার উৎসাহ নাই।
বিরাজ সাতুকে দেশের খবর, অর্থাৎ পরিচিত মানুষের জন্ম মৃত্যু বিবাহের খবর শুনাইতে লাগিলেন। সাতু তাহা তামাক টানিতে টানিতে শুনিতে লাগিল।
আহারের ঠাঁই হইল দুই ভাইয়ের পাশাপাশি। সাংসারিক কথাই সংসারে বেশি এবং প্রবল। দাদা সতীশের সঙ্গে এবং মায়ের সঙ্গেও সাতু আহারে বসিয়া যথেষ্ট লিপ্ততার সঙ্গে সে আলোচনা করিল এবং অকুণ্ঠিতভাবে আর দীর্ঘ ভাষায় স্বীকার করিল যে, ঋণ যাহা হইয়াছে তাহার কারণ সে-ই।
সতীশ ভাতের থালার দিকে এবং বিরাজ সাতুর মুখের দিকে তাকাইয়া ঋণ সম্বন্ধে তাহার বক্তব্য শুনিলেন—দু:খের কথা উচ্চারণ করিলেন না।
ভোজনে সাতু বৃক-তুল্য—কিন্তু আজ তাহাকে অল্পেই তৃপ্ত হইতে দেখিয়া জননী বিরাজ ক্ষুব্ধ হইলেন বলিলেন,—কই খেলিনে তেমন?
—পেটের খোল চুপসে গেছে মা, না খেয়ে। ভেবো না, ক্রমশ আবার বড় হবে, বলিয়া সাতু মাতৃহৃদয়কে অভয় দিয়া খুব হাসিতে লাগিল।
আনন্দের মাঝেই আহার সমাধা হইল। সাতু তামাক সাজিয়া লইয়া শয়নকক্ষে যাইয়া বিছানায় বসিল।
মাখন ভাতের থালা সামনে লইয়া নিশ্চেষ্টভাবে বসিয়া রহিল।
গোলাপ কাতর স্বরে বলিল,—খা...
দু-গ্রাস ভাত মুখে তুলিয়াই মাখন হাত টানিয়া লইল। গোলাপ সে দিকে একবার বিষণ্ণ চক্ষে চাহিয়া দেখিল—আর বলিল না কিছুই।
বহু যোজন দূরে ঝড় উঠিলে নাকি সমুদ্রের নির্বাত তটেও তাহার ঢেউ আসিয়া লাগে। মাখনের মনের কথা গোলাপের অজানা নাই, মাখনের বুকের বেদনা যেন নি:শ্বাসবায়ু চালিত হইয়া তাহার বুকে বাজিতেছিল—
তবু সে একবার বলিল,—ভাই আমার মাথা খাস...
মাখন বলিল,—দিদি আমায় বিষ দাও। বড়বউ ছলছল চক্ষে বাম হস্তে তাহার চিবুক স্পর্শ করিয়া চুম্বন করিল।
ছোটবউমার খাওয়া হল?—জানিতে চাহিয়া বিরাজ আসিয়া অদূরে দাঁড়াইলেন—অকারণেই তাঁহার মনে হইতেছিল ছোটবউ ইচ্ছাপূর্বক বিলম্ব করিতেছে।
বড়বউ বলিল—হয়েছে।
ছোটবউয়ের দিকে তাকাইয়া বিরাজ বলিলেন—তবে বসে আছ কেন?
হেঁশেল বড়বউমা সারবে খন, তুমি আঁচিয়ে যাও তোমার ঘরে।—বলিতে বলিতে তাঁহার নজরে পড়িয়া গেল সাতুর খাওয়া থালাখানা। থালাখানা তাঁহার সাক্ষাতে তুলিয়া আনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনি সাক্ষাতের উপর ছিলেন না বলিয়াই বোধহয় সেই উচ্ছিষ্ট ভোজনপাত্রে ছোটবউ ভাত লয় নাই দেখিয়া, অর্থাৎ স্বামীর প্রতি বধূর এই ঘৃণা প্রকাশে, বধূর প্রতি দারুণ অপ্রবৃত্তি জন্মিয়া বিরাজের যে কেমন ঠেকিতে লাগিল তাহা বলা যায় না। কিন্তু সে কথা তিনি মোটেই তুলিলেন না; কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, কথা বলছ না যে?
কি কথা তিনি বধূর মুখে শুনিতে চান তাহা তিনিই ভালো করিয়া জানেন না। কোথায় একটু ধিক্কার যেন ছিল—তাহাকে নির্বিষ করিতেই তিনি তাঁহার ক্ষমার অধিকারের আর আকাঙ্ক্ষার সাথে খুঁজিয়া মরিতেছেন, বধূর মুখের কথায় যদি তাই একটু পান, কিন্তু মুশকিল এই যে—এই কথা লইয়া গলা চড়াইবার উপায় নাই।
আরো মুহূর্ত দুই অপেক্ষা করিয়া থাকিয়া বিরাজ পুনরায় বলিলেন, মনের ঝাঁজ যেন গলিয়া গলিয়া মুখ দিয়া বাহির হইতে লাগিল, 'কথা কইছ না যে তবু? কার হাতে তুমি পড়েছ তা জানো? আমার হাতে। আমায় ঘাঁটিয়ে কেউ নিস্তার পায়নি।'
বলিবার কিছুই ছিল না বলিয়াই মাখন তথাপি কিছু বলিল না। বড়বউ মধ্যস্থ হইয়া আসিল, বলিল,—তুমি যাও মা। আমি ওকে দিয়ে আসছি।
যাওয়া ছাড়া বিরাজের আর গতিই ছিল না। পাথরে আঘাত কে কত করিতে পারে! মনে মনে ছোটবউয়ের মাথা চিবাইতে চিবাইতে তিনি চলিয়া আসিলেন।
বড়বউ যাইয়া মাখনের হাত ধরিল। বিছানায় বসিয়া তামাক টানিতে টানিতে সাতকড়ি মধুডাঙ্গার মেলার ঘটনাই চিন্তা করিতেছিল—সেখানকার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া, আর দুর্বিপাকের বহর ভাবিতেছিল, দৈব নিতান্তই বিমুখ, নতুবা ধরা পড়িবার তো কোনওই সম্ভাবনা ছিল না। সঙ্গীরা পাকা লোক। সতর্কতা অবলম্বন করিতে কোনওদিকেই ত্রুটি হয় নাই। মেয়েটির সঙ্গ লইয়া পায়ে পায়ে তাহাকে অনুসরণ করিয়াছিল—ঘুণাক্ষরেও তাহাকে টের পাইতে দেয় নাই।
দোকানপাট বন্ধ হইয়া মেলার স্থানটা ক্রমে নিদ্রিত নির্জন হইয়া গেল। কীর্তন তখন দুনে চলিতেছে, জমিয়াছে বেশ, কীর্তনওয়ালা ঘামিয়া নাহিয়া উঠিয়াছে, তবু তার বসিবার নামটি নাই, খোলবাদকগণ যেন নেশায় মাতিয়া উঠিয়াছে...
নাট-মন্দিরের ভিড়ের বাহিরে একটা টিনের চালার কাঠের খুঁটি ঠেস দিয়া বসিয়া মেয়েটি ঢুলিতেছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড একটা হরিধ্বনিতে চমকিয়া সজাগ হইয়া সে বোধ করি গায়ে হাওয়া লাগাইতে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। দোকানের আওতায় বাতাস ভাল বহিতেছে না, মেয়েটি ধীরে ধীরে গলির মুখে আসিয়া দাঁড়াইল...
তারপর যা ঘটিল তা চক্ষের পলকে, মেয়েটির মুখের উপর কাপড় চাপা পড়িল, সঙ্গে সঙ্গে তার দেহখানা শূন্যে উত্তোলিত হইয়া তীব্রবেগে চলিতে লাগিল।
অদূরে বিস্তৃত বাগিচা—
কেজো-অকেজো ছোট-বড় গাছে আর ঝোপ-জঙ্গলে বাগিচা পরিপূর্ণ। কিন্তু বিধাতা এমনি অপ্রসন্ন যে গভীর রাত্রে বন্যভ্যন্তরেও তিনি একজন দর্শককে পূর্ব হইতে স্থাপিত করিয়া রাখিয়াছিলেন, সেই পুলিশের হাতে ধরাইয়া দিল।
তারপর মামলা; অত্যন্ত তোড়জোড়, অসংখ্য যাতায়াত, অজস্র অর্থব্যয়, কত কি বিশৃঙ্খলা, কিন্তু প্রত্যেক ঘটনা স্বতন্ত্র এবং স্পষ্ট...
তারপর সুদীর্ঘ সশ্রম কারাবাস; দেহের শক্তি যেন নিঙড়াইয়া বাহির করিয়া লইয়া ওরা কাজে লাগাইয়াছে—নিদারুণ দাসত্ব সহ্য করিতে হইয়াছে।
দু:সহ পীড়ন সহ্য করিতে হইয়াছে বলিয়া সাতুর কিন্তু নি:শ্বাস পড়িল না। মেয়েটির মুখখানা তাহার মনে পড়িল—নয়নাভিরাম, কালোর উপর উলকির ফোঁটা, স্বাস্থ্য অতি সুন্দর, চক্ষু দুটি গেঁয়ো হাবা দেখিলেই তা বোঝা যায়। মেলায় একা আসিয়াছিল, না সঙ্গীসাথী কেহ ছিল কে জানে। এখন সে কোথায়, কেমন তার দশা তাই বা কে জানে!
সাতু উহাই ভাবিয়া বিস্মিত হইয়া উঠিয়াছে, এমন সময় দরজার খিলের শব্দ পাইয়া সে ধীরে ধীরে চোখ ফিরাইয়া দেখিল, মাখন আসিয়াছে—সে আরও দেখিল যে সে মেয়েটির চেয়ে মাখন সুন্দর...
বলিল—এতক্ষণে দেখা দিলে! এসো।
কিন্তু মাখন স্বামীর আহ্বানে পোষমানা কি মন্ত্রমুগ্ধ মানুষটির মতো সরাসরি শয্যায় না যাইয়া দূরে দেয়ালের দিকে যাইয়া দাঁড়াইল; তার সোহাগপূর্ণ সাদর আহ্বান সে শুনিতে পাইয়াছে কিনা তাহাই সাতু বুঝিতে পারিল না।
স্বামীর সঙ্গে মাখনের মিলনের একটা সুত্র না থাকিয়া পারে নাই; কিন্তু প্রাণের আঁশে আঁশে যোগের স্রোত প্রবেশ করিয়াছিল এ-কথা বলা চলে না। সংসর্গজ স্তিমিত একটা কোমলতা জন্মিয়াছিল—মাঝে মাঝে তাহা ফুটিত তার উপর কোথায় ভয়াবহ দণ্ডপানি একজন শাসক বসিয়া আছেন—তিনিও টানিয়া লইয়া প্রকাশ্য একটা স্থানে জোড় মিলাইয়া দিয়াছিলেন —মাখন তা অস্বীকার করিতে পারে নাই। কিন্তু স্বামীকে মাখন চিনিয়াছিল। মানুষ মানুষের হাসি দেখিয়া চেনে, ভাষা শুনিয়া চেনে, চাহনি দেখিয়া চেনে, চিনিবার দিকে এমন উগ্রভাবে সচেতন প্রাণের কাছে প্রাণের পরিচয় গোপন রাখা যেমন কঠিন, চিনিতে পারিবার পর সেদিকে চোখ বুজিয়া থাকাও তেমনি কঠিন। সুখের হোক দু:খের হোক তবু স্পর্শ ছিল—সুখে-দু:খে মিশ্রিত হইলেও এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছায় অনিচ্ছাই প্রবল হইলেও কর্তব্যের দায় আর প্রেরণা ছিল, অভিমান বোধ ছিল, আছে আর আছি বলিয়া নিরন্তর একটা অনুভূতি ছিল—
সব লুপ্ত হইয়া গেছে—মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর উপর নিপতিত জলবিন্দুর মতো সে এত বড় ব্রহ্মাণ্ডের কোথায় যাইয়া আশ্রয় লইয়া অদৃশ্য হইয়া গেছে, তাহার উদ্দেশ নাই।
মাখন স্বামীর চোখের উপর চোখ পাতিয়া রাখিল। সে দৃষ্টির অর্থ কি, সাতু তাহা বুঝিল না—সে বুঝিল না যে দু জনাই মানুষ হইলেও তাহাদের জগৎ বিভিন্ন; কোনও অপরিচিত জগতের অনভ্যস্ত আত্মা যেন এই জগতের আত্মার কাছে বন্দী হইয়া আসিয়াছে—পুরুষের দিকে স্ত্রীর এই দৃষ্টি বিভীষিকার সম্মুখে মূর্ছিতার বিহ্বল দৃষ্টি—নি:শব্দ আর্তনাদ...
সাতু হাসিতে লাগিল, বলিল—বড়ই অভিমান যে। ডাকছি, তা আসা হচ্ছে না। ঢং দেখলাম বিস্তর। নেও হয়েছে, এস এখন, না আমাকেই উঠতে হবে।
মাখন চোখ নামাইয়া মাটির দিকে চাহিয়া একবার ঢোঁক গিলিল—তাহার বুক ধড়ফড় করিয়া সর্বাঙ্গ যেন কাঠ হইয়া যাইতেছে...সাতু উঠিতে উঠিতে বলিল,—উ:! বলিয়া বিরক্তি আর শ্লেষ প্রকাশ করিয়া সে উঠিল।
মাখন কেবল সরিয়া সরিয়া যাইতে লাগিল—কোথায় সে যাইতে চায় সে জ্ঞান তাহার নাই, যাইবার স্থান নাই, তবু নিজেকে আড়ষ্ট করিয়া তুলিয়া সে কেবলি সরিয়া দেয়ালের বাহিরে যে অশেষ উন্মুক্ত পৃথিবী, যেন তাহাকেই লক্ষ্য করিয়া সে চলিয়াছে—তাহার স্থূল অবয়ব কেবল ত্বকের উপর পশ্চাতের কঠিন বাধা অনুভব করিতেছে। দেয়ালের সঙ্গে ঘর্ষণে তাহার পিঠের চামড়া কাটিয়া গেল।
সাতু অগ্রসর হইয়া আসিয়াছে—তাহার স্পর্শটা আসিয়া মাখনের সর্বশরীরে যেন বিষাক্ত হুলের মতো বিদ্ধ হইতে লাগিল...
কিন্তু দেহ সংকোচনের অবকাশ আর নাই—পর মুহূর্তেই তার সঙ্কুচিত আড়ষ্ট সর্বাবয়ব যেন রুদ্ধ বায়ু বাহিরের দিকে নির্গত করিয়া দিয়া বাহিরের চাপ বাহিরের দিকেই ঠেলিয়া দিল—সর্বান্ত:করণ বিদ্যুতের আগুনে জ্বলিয়া লাল হইয়া সহসা প্রাণপণে আপনাকে বিস্তৃত করিয়া দাঁড়াইল...
সাতু তাহা দেখিল—এমন ব্যাপার না দেখিয়া উপায় নাই; কিন্তু সাতু তাহা গ্রাহ্য করিল নাঃ তা করিবার মতো মন তাহার হইলে সে জেলে যাইত না। বলিল, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়, একটা কথা আছে না? অমন করে চাইলে কি হবে! আমার—
বলিতে বলিতে মাখনকে হাত তুলিতে দেখিয়া সাতু থমকিয়া দাঁড়াইল। মাখনের হাত তুলিবার ভঙ্গীটি বড় অসাধারণ—তাহার উদ্দেশ্য যেন শুধু আত্মরক্ষা নয়, তাহার উপরে মারাত্মকই কিছু। সাতু যতই দুর্জয় হউক আর এখানে-সেখানে সে যতই ভুল করুক, এবারে সে ভুল করিল না, আর ভয় পাইল; হটিয়া আসিয়া বলিল, মারবে নাকি?
মাখন বলিল,—আমায় ছুঁও না।
—যদি ছুঁই?
শুনিয়া সাতুর বুক কাঁপিয়া উঠিল—নিজের হাতে হামেশাই থাকে বলিয়াই তৎক্ষণাৎ তাহার মনে হইল, তীক্ষ্ম একখানা অস্ত্র তাহার স্ত্রীর বাঁ হাতে আছে আঁচলে তা ঢাকা আছে।
সাতু ফিরিল; প্রাণভয়ে পালাইবার মতো করিয়া ছুটিয়া যাইয়া দড়াম করিয়া দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিয়া সে চেঁচাইয়া ডাকিল,—মা?
বিরাজ অবশ্য তখন জাগিয়াই ছিলেন—এক ডাকেই সাড়া দিয়া ছেলের ব্যাকুল কণ্ঠ কানে বাজিতেই তিনি লাফাইয়া উঠিলেন—'কি রে? কি হল রে?' বলিয়া উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন করিতে করিতে তিনি ঘরের দরজা খুলিয়া বাহির হইয়া আসিলেন।
সাতু বলিল,—বউকে বের করে আনো, ও-ঘরে আমি যাব না। মারবে বলছে।
—বিরাজ ঠিকরাইয়া উঠিলেন, মারবে বলেছে?
—তা পারে! ওর কাপড়-চোপড় ঝেড়ে দেখ—ছুরিছোরা বোধ হয় ওর কাছে আছে।
শুনিয়া বিরাজ হতজ্ঞান হইয়া গেলেন। বড় কষ্টে দীর্ঘদিন তাঁহার কাটিয়াছে, উৎকণ্ঠায় তাঁর স্নায়ু উঠিয়া পড়িয়া অবিরাম ঝমঝম করিয়া বাজিয়াছে, শ্রান্ত শক্তিহীন হইয়া গেছে, ছেলের ক্লান্ত শীর্ণ চেহারার দিকে চাহিয়া তাঁহার কিছুই ভালো লাগে নাই, তাহার উপর এই বধূরই পিছনে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বিরক্তিতে আর বধূর অমানুষিক একগুঁয়ে আচরণে ক্রোধের তেজে তাঁহার রক্ত তখনও ফুটিতেছিল।
এখন ছুরি লইয়া সেই বধূ তাহার পুত্রকে খুন করিতে উঠিয়াছে, আচমকা এই খবর পাইয়া তাঁর মাথার হাড় পর্যন্ত আগুনের জ্বালায় জ্বলিয়া উঠিল—
'কই?' বলিয়াই যখন তিনি বধূর উদ্দেশে ধাইয়া গেলেন, তখন তিনি উন্মাদ—হিতাহিত ন্যায়-অন্যায় বুঝিবার হুঁশ লোপ পাইয়া গেছে...
চোখে পড়িল, বধূ কোণে দাঁড়াইয়া আছে। কেমন করিয়া সে দাঁড়াইয়া আছে তাহা তাঁহার চোখে পড়িল না, ছোরাছুরির ভয়ও তিনি করিলেন না, লাফাইয়া যাইয়া তাঁহার সম্মুখে পড়িলেন, ঘাড় ধরিয়া তাহাকে সম্মুখে আনিলেন এবং ঘাড়ে ধাক্কা দিতে দিতেই তাহাকে বারান্দায় আনিলেন, উঠানে নামাইলেন, উঠান পার করিলেন, বধূর ঘাড় হইতে হাত নামাইয়া সদর দরজার খিল খুলিলেন—
বলিলেন—যা চুলোয়। বলিয়া ঘাড়ে শেষ ধাক্কা দিয়া তাহাকে সদর দরজার বাহিরে পাঠাইয়া দিলেন—তাহার পর খিল আঁটিয়া দিয়া দাঁড়াইয়া হাঁপাইতে লাগিলেন।
উপরে সতীশের কানে গেল খিলের শব্দটা, জিজ্ঞাসা করিল—সদর দরজা কে খুলেছে?
সাতু উত্তর করিল,—মা, তারপর অত্যন্ত দু:খিতভাবে এবং নিম্নতর কন্ঠে নিজের সম্বন্ধে একটা কথা সে বলিল, জেলই আমার ছিল ভালো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন