উদ্বাস্তু

সমরেশ মজুমদার

বিছানায় শুয়ে এক কাপ চা খাওয়া সারাদিনের পরিশ্রমের প্রথম বিলাসী ভূমিকা। স্ত্রী যদি উঠতে তাগাদা না-ও দেয়, নিজের তাগাদাতেই বিছানা ছাড়তে হয় বেলা আটটার মধ্যে। হাত-মুখ ধোয়া, পায়খানা ও বাজার সারতে-সারতে সাড়ে-আটটা। বাকি আধঘণ্টা সময় হাতে রাখতে হয় কয়লা ওষুধ কিংবা লনড্রির জামা-কাপড় ইত্যাদি কিছু-না-কিছুর জন্য। তারপর আট ঘণ্টা—বেশ্যা যেমন তার মেয়েত্বকে এক ঘণ্টা, দু-ঘণ্টা বা তিন ঘণ্টার জন্য বেচে—নিজের ইংরেজিতে চিঠি লিখবার বা ঠিকে যোগ দেবার ক্ষমতাকে বেচে, নিজ মেরুরেখার চারপাশে আবর্তিত হতে পৃথিবীর আরও যে-বারও ঘণ্টা সময় লাগে তা ঝিমিয়েই কাটিয়ে দেয়া যায়। জীবনের জন্য জীবিকা—এই ধরনের প্রচারিত একটি সিদ্ধান্ত যখন নিজ অভিজ্ঞতার জোরে জীবিকার জন্যই জীবনধারণ এই প্রকার বিপরীত সিদ্ধান্তের দিকে ঝোঁকে, তখন-যে সকাল আটটায় ঘুম থেকে না-ওঠার কোনও উপায়ই নেই; সেই কালে স্ত্রীর বা কন্যার ডাকা-ডাকি, সাধাসাধি, চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে এনে কাকুতি-মিনতি নিজেকে বেশ সম্পন্ন ব্যক্তি বলে মনে করায়। সেই ধাক্কাতেই আবার ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত চলে যায় বেশ। প্রভিডেন্ট ফান্ডে যে-টাকা রেখে মারা যাওয়ার সুযোগ ঘটে, তাতে ঋণ বাদ দিয়ে দাহ-খরচ ও শ্রাদ্ধ ভালোভাবেই চুকে যায়। পঞ্চভূতে মিশে যাবার আগে শব্দহীন স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গোটা দুনিয়া, আর 'লোকটা বেশ গোছানো ছিল, টুকটুক করে চালিয়ে মরাটা পর্যন্ত রাইট টাইমে মরল'—একপ্রকার শোকবার্তা স্মৃতি বহন করে। সন্তানসন্ততিরা জানান দেয় লোকটার বেশ শক্ত মূল ছিল, বহুদূর প্রসারিত, আর কখনোই লোকটি নিজের জমি ছাড়িয়ে অন্য জমিতে শেকড় চালায়নি।

কেরোসিন কাঠের তক্তপোশে সাড়ে চার টাকা দামের এক তাঁতের মশারির নিচে সত্যব্রত সেদিন এইরকম একটি আত্মনির্ভর স্বত্বাধিকারীর মতোই ঘুমোচ্ছিল। নি:সংশয়ে তারই যে স্ত্রী, সেই মহিলা সত্যব্রতকে এসে ডাকাডাকি করছিল—শুনছ, এই শুনছ, শুনছ, এই। আপ্যায়িত সত্যব্রত অনাবশ্যক পাশ ফিরে শুলো। যেন ওপর দিকের কানের গর্ত দিয়ে অণিমার ডাকগুলো খুব ভালোভাবে ভেতরে গলে যাবে। কিন্তু অণিমা বলল—'বাইরে তোমাকে কারা ডাকছেন।'

সুতরাং সত্যব্রত চোখ খুলে—'কে?'

'কী জানি? জানি না। বসতে বললাম, বসল না, দাঁড়িয়ে আছে', বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে অণিমা যোগ করল—'চা হয়ে গেছে, খেয়ে নাও, নইলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।'

ততক্ষণে চৌকির কানায় পা ঝুলিয়ে বসে সত্যব্রত নিজেকে স্বত্বাধিকারী ভাবার বদলে যেন চারিদিকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখল, তার বাড়িতে যে-সব জিনিস থাকবে ধরে নিয়ে লোক দুটি এসেছে, তা আছে কি না, যেন, আদালত থেকে তার বাড়ি নিলামে চড়াতে এসেছে—এমনভাবে কয়েক সেকেন্ড ঘরের চারপাশে তাকাল। তারপর অপর চৌকিতে অঞ্জুকে শোয়া দেখে যেন অনেকখানি নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের দিকে তাকাল। দু-টাকা চার আনা দামের লুঙ্গি, রং উঠে গেছে, সত্যব্রত আন্ডার-ওয়্যার পরে না, অর্থাৎ লুঙ্গিটা যেন দেবীদের শাড়ির মতো, আছে অথচ নেই। বালিশের পাশে গেঞ্জিটা পড়েছিল, সেটা গায়ে দিল। তারপর নিজের চেহারাটা কল্পনা করল—পাতলা লুঙ্গি, ছেঁড়া গেঞ্জি, সদ্যনিদ্রোত্থিত—অচল। যেন বাইরের লোক দুটো সত্যব্রতকেই নিলামে তুলতে এসেছে। অণিমার পায়ের শব্দে চমকে দাঁড়িয়ে, কয়েক মিনিট আগে যে-লোকটা একটা মালিক-মালিক ভাব নিয়ে ঘুমোচ্ছিল, দু-হাতের তালুতে মুখ ঘুষতে-ঘষতে সে এমনভাবে বাইরে গেল যেন সে তার নিজের নামটাই অস্বীকার করবে। অণিমা 'এই' পর্যন্ত বলে চায়ের কাপ টেবিলের ওপর ডিশ চাপা দিয়ে রেখে অঞ্জনাকে ধাক্কা দিতে শুরু করল—এই অঞ্জু ওঠ, অঞ্জু, অঞ্জু, এই দ্যাখো, কীরে চড় খাবি নাকি?'

লোক দুজন সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সত্যব্রত গিয়েই বলল,—ভেতরে বসুন।

'না-না, দরকার নেই, একটা খবর দিতে এসেছি, এক্ষুনি চলে যাবো।'

লোকটার হাসি থেকে সত্যব্রত অনুমান করার চেষ্টা করতে লাগল কাছাকাছি কোনওদিন নিমন্ত্রণ পাবার কথা আছে কি না।

'ভেতরে এসেই বসুন না।—'

'না। শুনুন, আপনাকে আজ বা কাল যে-কোনো সময় থানায় গিয়ে একবার দারোগাবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। যখন আপনার সুবিধে—'

'থানায়! আমাকে?'

একজন বলল 'আজ্ঞে।' আর-একজন পকেট থেকে নোটবই বের করে কয়েকটা পাতা উলটে পড়ল—'আপনার নাম তো শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী, পিতার নাম মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ী, হোল্ডিং নাম্বার দুইশো তিরিশ বাই, এ বাই সিক্স, তারপর নোটবইটা পকেটে রাখতে রাখতে বলল, 'আজ্ঞে আপনিই।'

অপরে সাইকেল ঘোরাতে-ঘোরাতে বলল 'যখন আপনার সুবিধে হয় যাবেন, এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই, একদিন গেলেই হল—'

লোক দুটো সাইকেলের প্যাডেলে পা দিচ্ছিল। সত্যব্রত তাদের ডেকে থামাল 'আচ্ছা, আপনারা বলতে পারেন একটু, কেন?'

লোক দুটো ওখান থেকেই ঘুরে দাঁড়াল, আর-একজন বলল 'আরে কিছু না, কিছু না। বলেন কেন আর। গভর্মেন্ট থেকে অর্ডার এসেছে, তোমাদের দেশে—মানে শহর, আবার সীমান্ত শহর কিনা—আমরা খবর পেয়েছি, তোমাদের ওখানে অনেক লোক আছে, যারা আসলে সে-লোক নয়।' তারপর যেন সত্যব্রতকে অভয় দেবার জন্যই লোক দুটো দেখে বা শুনে-মহড়া-দেওয়া মনে হয় এমনি এক হাসি হেসে বলল, 'আর বললেন না মশাই সেন্ট্রালের কাণ্ড, যারা আছে, তারা তারা নয়। ভাবুন দেখি, আমরাই বা কী করি, চাকরি তো রাখতেই হবে। আচ্ছা চলি, যাবেন একদিন, একটু আলাপ করে আসবেন।' লোক দুটি সাইকেল চেপে চোখের বাইরে চলে যাবার আগেই সত্যব্রত পেছন ফিরে ঘরে ঢুকে পড়ল, যেন সে লোক দুটোকে দেখাতে চায় যে সে দেখতে চায় যে সে তাদের যাবার আগেই ঘরে ঢুকছে। তা ছাড়া নি:সন্দেহে অণিমা ভেতর থেকে কথাবার্তা শুনেছে। বারান্দায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে অণিমাকে ভাবতে দিতে চায় না যে থানায় যাবার নামে সে ঘাবড়ে গেছে।

কিন্তু অণিমা কোনো কথাই শোনেনি। সত্যব্রত টেবিল থেকে চা-টা তুলে নিয়ে চুমক দিলে, এমন সময় রুটি কামড়াতে-কামড়াতে অঞ্জুর প্রবেশ, তার পেছনে অণিমা। অর্থাৎ অণিমা এতক্ষণ অঞ্জুকে নিয়ে রান্নাঘরে ছিল, এটুকু ভেবেই সে মনে-মনে হেসে উঠল—সে কী, আমি কি চুরি না ডাকাতির দায়ে ধরা পড়েছি যে অণিমাকে জানতে দিতে চাইছি না।

'জানো, আমরা আমরা কি না—তার খোঁজ-খবর নেবার জন্য গভর্নমেন্ট নাকি থানায় অর্ডার দিয়েছে, তাই থানায় যেতে হবে।

'থানায় যেতে হবে, তোমাকে, কেন?'

'আমি যে আমি, এটা প্রমাণ দিতে।'

'কেন?'

'গভর্মেন্টের হুকুম', বলে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে সত্যব্রত খুব দ্রুত কুয়োর পাড়ের দিকে গেল। হাত-মুখ ধোয়া সেরে বাজারে যেতে হবে।

বাজার থেকে ফেরার পর যে-আধঘণ্টা সময় টুকিটাকি কাজের জন্য আলাদা করে রাখা, তারই ফাঁকে সত্যব্রত থানা থেকে ঘুরে আসবে স্থির করল। সেজন্য বাজারটাও ধীরে-সুস্থে করল না। খানিকটা দৌড়েই যা পেল তা কিনল। অথচ লোক দুটো বলে গিয়েছিল যে যখন সুবিধে তখন গেলেই হবে। থানায় কাজ থেকে ফেরার পথে গেলেই সবদিক থেকে সুবিধে। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এ-খবর শুনে ইস্তক থানায় যাবার জন্যই যে সে ছটফট করছে তা আর নিজের কাছেও লুকোনো থাকল না, যখন বাজার ফেলেই সে বেরিয়ে পড়ল। অণিমা একবার বলেছিল—এত ছটফট করে যাবার দরকারটা কী, বিকেলে গেলেই তো হয়। অঞ্জুও একটা অঙ্ক দেখিয়ে নেবার জন্য পিছু-পিছু ঘুরছিল। সত্যব্রত তাড়াতাড়ি থানার দিকে হাঁটা শুরু করল।

আর ফিরল সূর্যাস্তের পর। অণিমা দুপুর থেকে ওঠা-বসা, ঘর-বারান্দা করছে। দশটার পর পাড়াতে বয়স্ক ছেলেপুলে পর্যন্ত নেই যে তাকে খবর নিতে পাঠাবে। বিকেল পর্যন্ত এইভাবে কাটিয়ে শেষে একজনকে থানায় পাঠিয়েছিল। ছেলেটি এসে সংবাদ দিল সত্যব্রত ওখানে আছে। পাড়ায় ঘুরে অণিমা শুনে এসেছে একবার সবাইকেই নাকি থানায় যেতে বলেছে এবং ওই একই কারণে, যে-যা তা কি না সেটা চূড়ান্তভাবে যাচাই করতে এবং আত্মপরিচয় দিতে। যে-মাটিতে শেকড় চাড়িয়ে সে গাছ, সেই মাটি ছেড়ে; যে-পরিবারের মধ্যে সে স্বীকৃত, সেই পরিবার ছেড়ে; আজ বা কাল থানায় গিয়ে প্রমাণ দিতে হবে—তার আত্মার প্রমাণ, আজ অথবা কাল, তার অস্তিত্বের প্রমাণ, আজ অথবা কাল।

সত্যব্রত হাঁটছিল গা ছেড়ে দিয়ে পা টেনে-টেনে। ঘাড়-ভাঙা মুরগির মতো গলাটা ঝুলছে, ভেজা কুকুরের মতো চুলগুলো বিশৃঙ্খল, কণ্ঠার আশ্রয়ে মৃত্যুর মতো শীতলতা, আঙুলগুলো চামড়ার ¢াভসের মতো যেন পাঞ্জার অনুকরণ। বাইরের দরজা থেকে কথাটি না বলে পায়ে-পায়ে অনুসরণ করেছে অণিমা। একবার পিঠের ওপর হাত রেখেছিল, সহসা অনধিকারবোধে আক্রান্ত হয়ে সে হাত তুলে নিয়েছে। ভেতরের সিঁড়ির ওপর শ্মশান প্রত্যাগতের মতো বসে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর চোখ বুজে হেলান দিয়েছে। পেছনে থাম না-থাকলে হয়তো শুয়ে পড়ত। অণিমা নায়নি, খায়নি। সত্যব্রতর সমস্ত শরীরে উত্তর খুঁজে অণিমা বসে পড়ল, বোধহয় তার বসার শব্দেই চোখ মেলে শুধু মণিটাকে চারপাশে ঘুরিয়ে সত্যব্রত কিছু একটা সন্ধান করল। এতক্ষণে অণিমা বলল—অঞ্জু ওর এক বন্ধুর বাড়িতে গেছে। শুনে সত্যব্রত চোখটা যখন অণিমার মুখের ওপর স্থির করল, তখন অণিমার মনে হল; সত্যব্রত পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বের করে অণিমার হাতে দিয়ে আবার চোখ বুজল। চারপাশ থেকে ঝুপ-ঝুপ করে অন্ধকার ঝরছে। ক্ষণেক আলো পাবার আশায় অণিমা আকাশের আলোয় গিয়ে দাঁড়াল।

জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রচারিত

১৯৩৯ থেকে '৪৫ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে পৃথিবীর ভূগোল ও ইতিহাসে যে-গুরুতর পরিবর্তন ঘটেছে, তার একটি সুম্পাদিত ও সুসংগৃহীত তালিকা না-থাকায়, পৃথিবীর অধিবাসীদের দেশ, জাতি, ভাষা, বংশ ইত্যাদি চিহ্নিত করার কিছু ব্যাঘ্যাত ঘটেছে। সব দেশের ভূগোল ও ইতিহাস এক গুরুতর পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে যে, কে যে কে, সে বিষয়ে স্থির নিশ্চিত জানার উপায় নেই। আমরা এক তথ্যসংগ্রহ অভিযানের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারি যে পৃথিবীগ্রহে বর্তমানে বহু ফেরারি ও বেনামা ব্যক্তি আছে। বিশেষ করে ভারতবর্ষ-পাকিস্তান, উত্তর ভিয়েৎনাম দক্ষিণ দেশগুলিতে। উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া, পূর্ব জার্মানি' পশ্চিম জার্মানি ইত্যাদি দেশগুলিতে। সে-কারণে 'খাঁটি ব্যক্তির সন্ধান' নামক রাষ্ট্রসঙ্ঘের কর্মসূচির ভিত্তিতে আমরা সমস্ত দেশেই যে-যা বলে পরিচিত, সে-তা কি না, তা পরীক্ষা করছি। এবং বিশ্ববাসীকে অনুরোধ করছি তাঁরা যেন স্ব-স্ব আত্মপরিচয় নিয়ে নিকটবর্তী থানায় হাজিরা দেন।

বল্লভপুর থানার বিবরণ :

এক। শ্রী সত্যব্রত লাহিড়ী, পিতা মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ী, আদি নিবাস পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে ২৩০/এ/৬ হোল্ডিংস্থ মোকানে বসে করেন। এই হোল্ডিংয়ের জন্য দেয় মিউনিসিপ্যাল কর গত বারো বৎসর যাবৎ তিনি দিয়ে আসছেন। ও ইংরেজি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জুন তারিখে ৬ই হোল্ডিংয়ের তৎপূর্ব মালিক শ্রীবনবিহারী মল্লিকের স্বাক্ষর-যুক্ত বিক্রয় দলিল পরীক্ষার পর উক্ত হোল্ডিং শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ীর নামে বল্লভপুর রেজিস্ট্রেশন অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত হয়। কিন্তু বিশেষ অনুসন্ধানের পর জানা যায় শেখ মনসুর আলি, পিতা মৃত কদম শেখ, হালসাকিন রায়চর, জিলা পাবনা, ওই হোল্ডিংয়ের বর্তমান ন্যায়সংগত মালিক। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর মৃত কদম শেখ তাঁর পুত্র মনসুর, কন্যা আমিনা ও স্ত্রী নূরাকে নিয়ে পূর্বপাকিস্তানে চলে যাবার পূর্বে তাঁর বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওই পাড়ার তিন পুরুষের অধিবাসী শ্রীবনবিহারী মল্লিকের ওপর দিয়ে যান। এবং ওই বৎসরই শ্রীবনবিহারী মল্লিক ওই হোল্ডিংয়ের মালিক হিসাবে শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ীর নিকট বিক্রয় করেন। পাবনা অন্তর্গত রায়চরে শেখ মনসুর আলির নিকট ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই ডিসেম্বর তারিখের মূল দলিলের নকল আছে।

সুতরাং শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী নামক কোনও ব্যক্তি বল্লভপুর মিউনিসিপ্যালিটির ২৩০/এ/৬ নং হোল্ডিংস্থ মোকানের মালিক নন। বা বল্লভপুর মিউনিসিপ্যালিটির ২৩০/এ/৬ নং হোল্ডিংস্থ মোকানের মালিকের নাম শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী নয়।

দুই। মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র বলে কথিত শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী ১৯৪৭ সালের পর ভারত ইউনিয়নের বহু জায়গায় সরকারি ও বে-সরকারি ক্ষেত্রে ইস্কুলমাস্টারি, কেরানিগিরি ইত্যাদি কাজ করেন। সব জায়গাতেই তিনি সত্যব্রত লাহিড়ী, পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৪৫ সালের বিএ বলে নিজের পরিচয় দিয়েছেন।

নির্দিষ্ট দিন কাজের পর যখনই তাঁর কাছে বিএ ডিপ্লামা প্রভৃতি চাওয়া হয় তিনি বলেন হয় পরীক্ষা দেওয়ার পর দাঙ্গার ভয়ে দেশত্যাগ করায় তিনি বিএ মূল ডিপ্লামা সংগ্রহ করতে পারেননি ও দেশভাগের পর এখন আর তা সম্ভব নয়। দু-একটি ক্ষেত্রে এর পরেও কর্তৃপক্ষ চাপ দেওয়ায় তিনি কাজ ছেড়ে দেন।

তদন্তে প্রকাশ : মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র সত্যব্রত লাহিড়ী নামধেয় ব্যক্তি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেছিলেন বটে, কিন্তু পর বৎসরই তিনি খুলনা যাবার পথে ট্রেনের মধ্যেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে নিহত হন।

এমন হতে পারে বর্তমানে যে বা যারা মৃত সত্যব্রত লাহিড়ীর আত্মপরিচয় গাপ করেছে, তারা মৃত সত্যব্রত লাহিড়ীর অত্যন্ত ঘনিষ্ট পরিচিত ও সেই কারণেই মৌলিক সত্যব্রত লাহিড়ীর পরিচয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলিকেও নিজেদের কাজে লাগাতে পারছে। মৃত সত্যব্রত মরেও জীবিত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবং বর্তমান জীবিত সত্যব্রত লাহিড়ী বস্তুত মৃত।

মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর এক খুড়তুতো ভাই স্বাধীনতার বহু পূর্ব থেকেই কলকাতায় চাকরি করেন। তদন্ত-কমিশনের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে সত্যব্রত লাহিড়ীর পরিচয়ে চাকরির চেষ্টা হয়েছে এমন দশটি ক্ষেত্রের কথা তিনি জানেন। তাঁর জানা দশটি ক্ষেত্রের বিবরণ শোনার পর বোঝা গেল তাঁর অজ্ঞাতে বহু-বহু জায়গায় চাকরির চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু চাকরিই নয়, সত্যব্রত লাহিড়ীর পরিচয় দিয়ে এমনকী বিবাহের চেষ্টা পর্যন্ত হয়েছে এবং একটি বিবাহ যে সংঘটিত হয়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেজেট আলোচনা করে দেখা যায়, ১৯৪৫ সালে দুইজন সত্যব্রত লাহিড়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন। এই দ্বিতীয় সত্যব্রত লাহিড়ীই সমস্ত সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছেন। নইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৪৫ সালের বিএ এই পরিচয়দানকারী যে কোনো ব্যক্তিকেই নিশ্চিন্তমনে গ্রেপ্তার করা যেতো।

বিভিন্ন জেলা কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে প্রাপ্ত সংবাদে জানা যায়, সব শুদ্ধু এ পর্যন্ত মোট সাতাশি জন 'সত্যব্রত লাহিড়ী' ১৯৪৭ সালের পর বিবাহ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কজন '১৯৪৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ' তা জানা যায়নি।

দ্বিতীয় ওই আর-একজন সত্যব্রত লাহিড়ী ওই একই বৎসর বি. এ. পাশ করেছেন বলে কে জীবিত আর কে মৃত সত্যব্রত তা নিশ্চিতরূপে নির্ণয় করা যায় না। এমন হতে পারে 'মৃত' সত্যব্রত (বা জাল সত্যব্রত) নিজের সুবিধা অনুযায়ী কখনও মৌলিক মৃত সত্যব্রতের, কখনো মৌলিক জীবিত সত্যব্রতের বাবার নাম নিজের বাবার নাম হিসেবে বলে।

১৯৪৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ—এই পরিচয়টিই জাল সত্যব্রতের নিজেকে অন্য পরিচয়ে পরিচিত করার একমাত্র কারণ বলে ওই তথ্যটি সে কোনও ক্ষেত্রেই বদলায় না। এবং সেখানে তাকে অবিশ্বাসও করা যায় না, কারণ, সত্যিই এক সত্যব্রত লাহিড়ী ১৯৪৫ সালে বি. এ. পাশ করেছেন। পিতৃপরিচয়ে জাল সত্যব্রত লাহিড়ীর প্রয়োজন নেই বলেই তা পরিবর্তনশীল।

ফলে (ক) মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র (খ) ১৯৪৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি. এ. এবং (গ) শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী—এই তিনটি পরিচয় একত্রে পাওয়া যায় না।

পরন্তু সমস্যা আরও জটিল হয় মৌলিক সত্যব্রত লাহিড়ীর মৃত্যুর অনিশ্চিয়তায়। সংবাদে প্রকাশ ১৯৪৬ সালের প্রথম দিকে খুলনা যাবার পথে একবার এক গুন্ডার দল ট্রেন আক্রমণ করে, ফলে বহুলোক হতাহত হয়। এই নিহতের তালিকায় 'সত্যব্রত লাহিড়ী' এই নাম পাওয়া যায়। এই নাম ভুল ছাপা হতে পারে। এই সত্যব্রত লাহিড়ী অন্য কেউ হতে পারে। কিন্তু ওই খুলনা রওনা হবার পর ১৯৪৫ সালের বি. এ. ও পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র সত্যব্রত লাহিড়ী আর ফিরে আসেননি বলে তাকে মৃত ধরে নেওয়া হবে।

সুতরাং সমস্যা নিম্নপ্রকার। (১) মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৪৫ সালের বিএ, খুলনা ট্রেন-আক্রমণে নিহত বলে ধরে নেওয়া কি অযৌক্তিক? অর্থাৎ মৌলিক সত্যব্রত জীবিত হওয়া সত্বেও কি তাকে মৃত বলে ধরা হচ্ছে? (২) যদি মৌলিক সত্যব্রতের সত্য-সত্যই মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে তার পরিচয়কে-কে আত্মসাৎ করেছে?

এই দুটি প্রশ্নের উত্তর মাত্র একজন দিতে পারেন। 'সত্যব্রত লাহিড়ী' এই নাম নিয়ে যে কজন একজন হয়েছেন। সেই কারণেই এই প্রশ্ন ঘরে ঘরে, ১৯৪৭ -এর পর যাঁরা বিবাহ করেছেন, যাঁদের সন্তান হয়েছে, যাঁরা চাকরি-বাকরি নিয়ে ঘর সংসার করেছেন—তাঁদের প্রত্যেককে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

যতদিন এই দুই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া যায়—ততদিন কোনও সত্যব্রত লাহিড়ী নিজেকে নি:সংশয়তিরূপে সত্যব্রত লাহিড়ী বলে ভাবতে পারবেন না, কোনও স্ত্রীই তাঁর স্বামীকে মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র সত্যব্রত লাহিড়ী বলে নি:সন্দেহ হতে পারবেন না, কোনও সন্তানই তার পিতাকে অকৃত্রিম ও আদি সত্যব্রত লাহিড়ী বলে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে না।

নিজের আদি, অকৃত্রিম ও মৌলিক আত্মপরিচয় সহ নিকটবর্তী থানায় হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করুন আপনি যে, আপনি সত্যিই সে।

তিন। শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩০-এ জুলাই চব্বিশ পরগনা জিলার মুখের গ্রামের শ্রী হেমচন্দ্র সান্যালের দ্বিতীয়া কন্যা শ্রীঅণিমা সান্যালকে হিন্দুশাস্ত্রমতে শালগ্রাম শিলা ও অগ্নি সাক্ষী রেখে বিবাহ করেন। মৃত বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য ও শ্রীনরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী উভয়েই এই বিবাহে পৌরোহিত্য করেন ও তাঁদের উভয়ের সাক্ষ্য থেকেই এ-বিবাহ যে শাস্ত্রমতে নিষ্পন্ন হয়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়। শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী ও শ্রীঅণিমা লাহিড়ী উভয়ে গত দশ বৎসর যাবৎ বল্লভপুর মিউনিসিপ্যালিটির ২৩০/এ/ ৬নং হোল্ডিংস্থিত মোকানে স্বামী-স্ত্রীরূপে বসবাস করছেন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মার্চ বল্লভপুর সদর হাসপাতালে শ্রীঅণিমা সান্যাল একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে বিবাহের সাত মাস পরে হলেও শিশু পূর্ণাঙ্গ, সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল এবং প্রসবও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে। এ বিষয়ে বল্লভপুর সদর হাসপাতালের খাতায় দেখা যায় যে ভর্তি হবার পর পাঁচদিন পরই অণিমা লাহিড়ী খালাশ হয়ে যান। এই সন্তানই শ্রীঅণিমা লাহিড়ী ও শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ীর একমাত্র সন্তান শ্রীঅঞ্জনা লাহিড়ী।

'খাঁটি ব্যক্তির সন্ধান' নামক বিশ্বব্যাপী কর্মসূচির আহ্বানে বর্তমানে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক জনাব এনামূল হকচৌধুরীর স্বতোপ্রণোদিত এক বিবরণে জানা যায় পাকিস্তানে অণিমার পিতা শ্রীহেমচন্দ্র সান্যালের বাড়ি তাঁদের পাড়ায় ছিল। ইং ১৯৫০ সনে পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় শ্রীহেমচন্দ্র সান্যাল সপরিবারে জনাব এনামূল হকচৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। তখন এনামূল হকচৌধুরীর পিতা জনাব মইনুল হকচৌধুরী জীবিত। তিনি ও এনামুল দৃঢ়তার সহিত হেমচন্দ্র সান্যালের পরিবারকে রক্ষা করেন। দিন পনেরো বিশ পর হেমচন্দ্র ভারত ইউনিয়নে চলে আসেন। কিন্তু তাঁর কন্যা অণিমা পাকিস্তানে এনামূল হকচৌধুরীর বাড়িতেই থেকে যায়। হেমচন্দ্র সান্যালের দ্বিতীয়া কন্যা শ্রীঅণিমা সান্যাল পাকিস্তানে থেকে তো গিয়েইছে, পরন্তু ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে সে কুমকুম এই নামে মইনুল হকচৌধুরীর পুত্র এনামুল হকচৌধুরীকে রেজিস্ট্রেশন বিবাহ করে। জনাব এনামুল হকচৌধুরী তাঁর এই বিবরণের সঙ্গে এই বিবাহের সার্টিফিকেটের একটি নকল পাঠিয়েছেন। সে-দলিলে পাত্রীর নাম আছে কুমকুম, পিতার নাম এইচ. সি. সান্যাল।

এই বিবরণের সপক্ষে নিম্নপ্রকার পরিস্থিতিগত সাক্ষ্য পাওয়া যায়। শ্রীহেমচন্দ্র সান্যাল যখন ভারত ইউনিয়নে আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে কেউই তাঁর দ্বিতীয়া কন্যা অণিমাকে দ্যাখেনি। এমনকী মুখেরা গ্রামে আসার পর হেমচন্দ্র প্রতিবেশিদের বলেন যে তাঁর দ্বিতীয়া কন্যা অণিমা তাঁর প্রথমা কন্যা অঞ্জলির কাছে আসামের এক চা-বাগানে আছে। আসামের এক চা-বাগানে হেমচন্দ্র সান্যালের বড়ো জামাতা কাজ করতেন। কিন্তু তাঁদের সাক্ষ্যে জানা যায়, অণিমা সেখানে কোনোদিনই যায়নি। অর্থাৎ এই সাক্ষ্যগুলি পরোক্ষভাবে এই সিদ্ধান্তের সমর্থন করে যে, ১৯৫০ সালে যখন শ্রীহেমচন্দ্র সান্যাল পাকিস্তান ত্যাগ করেন, তখন অণিমা তাঁর সঙ্গে ছিল না।

তবে কি অণিমা কুমকুম নাম গ্রহণ করে এনামুলকে সত্যই বিবাহ করে? কিন্তু এইচ. সি. সান্যাল নামের আদ্যক্ষর ঘটিত এই সামান্য মিল ছাড়া আর কোনো প্রমাণই নেই যে কুমকুম ও অণিমা একই ব্যক্তি।

কিন্তু তাই যদি না-হবে, তাহলে অণিমা পাকিস্তানে থেকে গেল কেন?

এই বিষয়ে দুই প্রকার মত আছে।

প্রথম মত : জনাব এনামুল হকচৌধুরীর ও অণিমা সান্যালের মধ্যে বাল্যকাল থেকেই প্রণয় ছিল। উভয়ের বাড়ি একই পাড়ায়। আট-ন বছর বয়স পর্যন্ত তারা একই পাঠশালায় পড়ত। অণিমার মাকে এনামুল মা বলে ডাকত। এনামুলের পিতা মইনুল হকচৌধুরী ছিলেন ওই অঞ্চলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। সাতচল্লিশ সালের পর থেকে এনামুল ও অণিমার হৃদয়-সম্পর্ক এবং এই দুই পরিবারের যোগাযোগ শ্রীহেমচন্দ্র সান্যালের পাকিস্তান ত্যাগ না-করার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এনামুল একদিন সান্যাল বাড়িতে না গেলে অণিমার বাবা তাকে ডেকে পাঠাতেন। এনামুলের খাবার জন্য আলাদা কাপ-ডিশ-থালা-গেলাস ছিল।

এই প্রকার অবস্থায় '৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। নিজের বাড়ি ঘর ছেড়ে এনামুল তখন সান্যাল বাড়িতে চলে আসে। এনামুলের পিতা জনাব মইনুল হকচৌধুরী এই সমস্ত ব্যাপারে জড়িত হতে একেবারেই চাচ্ছিলেন না। কিন্তু তাঁর একমাত্র পুত্র যখন এই বিপদের সম্মুখীন হলো তখন তিনি আর স্থির থাকতে না-পেরে সপরিবারে হেমচন্দ্রকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং শহরের ওই এলাকার শান্তি রক্ষার জন্য পুলিশ ও সরকারের সাহায্য আদায় করেন।

একটি মাত্র ঘরে সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করে সান্যাল পরিবার ছিল। দরজার বাইরে প্রতিটি শব্দকেই তাঁরা আশঙ্কার কানে শুনতেন। যখন তাঁরা ভেতর থেকে টের পেতেন যে এনামুল বেরিয়ে গেল, তারপর এনামুলের ফেরা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত না হয়ে কেন স্বচ্ছন্দে নিশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে পারতে না। সেই মরণপুরীতে একমাত্র ভরসা ছিল এনামুল। তারই স্রোতে ভেসে এসেছে এই হকচৌধুরী পরিবার। এনামুল সহই কেবল এঁদের বিশ্বাস করা যায়। দিনে চারবার করে দরজা ঠেলে খাবার দিয়ে যেত। এবং সান্যাল পরিবারের জন্য এখানে আলাদা বাসন-কোসনের ব্যবস্থা ছিল না। সর্বক্ষণ চারদিকে হত্যাকারী ও আহতের উল্লাস ও আর্তনাদ, আগুনের নি:শব্দ লেলিহানতাকে ঘোষণা করে মানুষের চিৎকার—এক-এক ধাক্কায় সংস্কারগুলোকে খান খান করে ভেঙে দিচ্ছিল; ভূমিকম্প যেমন এক-এক ধাক্কায় পৃথিবীতে কী চিরস্থায়ী তা যাচাই করে নেয়। আর সেই মৃত্যুপরিবৃত অবস্থাতে সবাই বুঝছিল যে অণিমা আর এনামুলের প্রেম সেই তরণী যাতে এই তুফানের দরিয়া পার হবার চেষ্টা করা হচ্ছে। অণিমা এনামুলের প্রেম না-থাকলে এ-বাড়িতে সান্যাল পরিবার আসতে পারত না ও সরকারকে এনামুলের বাবা এ-অঞ্চলে শান্তরক্ষার কাজে বাধ্য করতেন না ও এনামুল শান্তিবাহিনী তৈরি করে কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আগুন নেবানো ও আহতের উদ্ধার সাধন করতে যেত না। এগুলো অঙ্কের মতো এত প্রমাণিত ছিল যে সেই অবস্থায় সান্যাল পরিবার আর হকচৌধুরী পরিবার সমবেতভাবে এই ভালোবাসাকে রক্ষা করবার চেষ্টা করছিল, ধোঁয়া বা ধুলো থেকে চোখের মণি দুটোকে রক্ষা করার জন্য যেমন আমাদের স্নায়ু অচেতনেই কাজ করে। মুহূর্তে-মুহূর্তে প্রাণগুলি যে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচছিল, তাদের কাছে এ-ছিল আলোর মতো স্বচ্ছ।

আর এ-কথা সেদিন সবচাইতে বেশি করে বুঝেছিল অণিমা। আগে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় যদি-বা অণিমার সঙ্গে এনামুলের আলাদা দেখা সাক্ষাৎ হত, দাঙ্গার অবস্থায় তার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। দিন-রাতে এনামুল তিন-চারবার মাত্র এদের ঘরে ঢুকত।

স্নেহ প্রেম ইত্যাদি প্রমাণ করা অসুবিধাজনক ঘটনাগুলিকে আইনগত অনুসন্ধানের কাজে সাক্ষ্য হিসাবে উপস্থিত করা সমীচীন না-হলেও, এনামুলের সঙ্গে অণিমার অবিচ্ছিন্ন দেখা-সাক্ষাৎ না-হওয়া অথচ বাইরের ঘোরঘুরির পর পরিশ্রান্ত এনামুল যখন ও ঘরে ঢুকত তখন ঘাম মুছবার জন্য গামছাটা বা হাওয়া খাবার জন্য পাখাটা স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে অণিমার এগিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে যে, যদি এনামুলের প্রতি অণিমার প্রেম পরিণতিমুখী হয়েই থাকে তবে তা নিশ্চয়ই এই সময়, আর কোনও সময়েই নয়। কারণ সংস্কারগুলো তখন খানখান হয়ে ভেঙে যাচ্ছিল আর সেই মৃত্যুপরিকীর্ণ অবস্থায় সান্যাল পরিবারের অতগুলি লোকের নিশ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎপিণ্ডধ্বনি অণিমার সম্মুখে প্রত্যক্ষ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে তার প্রতি এনামুলের ভালোবাসার শক্তি দর্শাচ্ছিল। নইলে পনেরো-বিশদিনের অনবরত চেষ্টায় যখন মইনুল হকচৌধুরী সান্যাল পরিবারের ভারত ইউনিয়নে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন, তখন অণিমা ভারতে যেতে অস্বীকৃত হল কেন।

অণিমাকে পাকিস্তানে রেখে আসতে হেমচন্দ্র সান্যাল নিশ্চয়ই একবারে সম্মত হয়নি। কিন্তু এনামুলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ব্যতীতই মেয়ের আত্মঘোষণায় তাঁরা হয়তো ভয় পেয়েছিলেন, আবার তাঁদের প্রাণরক্ষার জন্য এনামুলের পরিশ্রম দেখে হয়তো তাঁরা অসম্মত হতে লজ্জা পেয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, অণিমা পাকিস্তানে থেকে যায়।

এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা থামবার পর অণিমা স্বইচ্ছায় ও স্বচেষ্টায় ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারি 'কুমকুম' নামে জনাব এনামুল হকচৌধুরীকে বিবাহ করে। কুমকুমের সঙ্গে এনামূলের বিবাহের রেজিস্ট্রিদলিল আছে। কিন্ত নাম-পরিবর্তন কেন?

এনামুল ও অণিমা দুজন নাকি মনে করে যে এ-কথা জানাজানি হলে ভারত ইউনিয়নে সসম্মানে বসবাস করা সান্যাল পরিবারের পক্ষে অসুবিধাজনক হতে পারে, এবং সে-কারণেই পিতার পুরো নাম ব্যবহার করা 'হয় নাই'।

দ্বিতীয় মত : পাকিস্তান হবার পূর্ব থেকেই এনামুল অণিমার প্রতি আকৃষ্ট হয়। পাকিস্তান হওয়ার পর এনামুল প্রথমে অণিমাকে বেশ কিছু পত্র দেয়। তার কোনো জবাব না-পাওয়ায় পথে-ঘাটে অণিমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। মাঝে-মাঝেই সে অণিমাদের বাড়িতে এসে অণিমার মাকে মা বলে ডেকে জোর-জবরদস্তি করে চা ইত্যাদি খাওয়ার চেষ্টা করত। অবশেষে যেদিন সে এক চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে অণিমাকে বলে যে তার বিবি হতে রাজি না হলে সান্যাল পরিবারের সবাইকে কুচিকুচি করে কাটা হবে, সেদিন থেকে অণিমার বাইরে বেরুনো একেবারে বন্ধ হয়ে দেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে ১৯৫০ সালের দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে। তার শুরুতেই এনামুল দলবল সহ সান্যাল বাড়িতে চড়াও হয় ও প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে অণিমাকে তার সঙ্গে বিয়ে না দিলে সান্যাল বাড়ির প্রত্যেকটি লোককে হত্যা করা হবে। সান্যালমশাই এনামুলের বাবা মইনুল হকচৌধুরীকে এ-কথা জানালে তিনি পুলিশকে জানিয়ে দেন যে এনামুল তার দলবল নিয়ে ওই পাড়ার শান্তিরক্ষা করছে। ফলে পুলিশ ওই এলাকায় আসে না ও এনামুল ওই এলাকার একমাত্র কর্তা হয়ে দাঁড়ায়।

একদিন রাত্রি গোটা দশেকের সময় প্রথমে বাড়িতে ভীষণ ঢিল পড়তে থাকে। সান্যাল বাড়ির সবাই দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে। ঘণ্টাখানেক পরে 'আল্লা হো আকবর' ধ্বনি দিতে-দিতে একদল লোক সান্যাল বাড়ি ঘিরে ফ্যালে। এবং বাইরে থেকে চেঁচিয়ে বলে দরজা না-খুললে সেই মুহূর্তে আগুন দেয়া হবে। সেই সময়ই এনামুল এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে—'দরজাটা একবার খুলুন, আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।' বাধ্য হয়ে দরজা খুলতে হয়। এনামুল বলে, যদি তারা সপরিবারে হকচৌধুরী পরিবারে আশ্রয় নেয় তবেই একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনা। অনন্যোপায় সান্যাল পরিবারকে বাধ্য হয়ে এনামুলদের বাড়িতে এসে উঠতে হয়। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁদের মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে বাঁচতে হয়েছে।

মাঝে-মাঝেই এনামুল ঘরে ঢুকত ও সবার সামনেই অণিমাকে বাতাস করতে কী ঘাম মুছিয়ে দিতে বলত। তখন সান্যাল পরিবারের পরিবারত্ব নেই, আত্মরক্ষাই একমাত্র সমস্যা, দেব-মন্দিরের পূজার্থীর যেমন প্রয়োজন শুধু নিজের প্রার্থনা পূরণের। সেজন্য বলিদানের রক্তও তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারে না। এবং অণিমার প্রতি এনামূলের এই অশিষ্ট ও অশ্লীল ব্যবহারে এরা প্রত্যেকে আত্মরক্ষার স্বস্তি পেত। যেন অণিমা নামক প্রতিরোধক না-থাকলে ওই অশিষ্টতা ও অশ্লীলতা হত্যার নেশা হয়ে উঠত, যেন অণিমার শরীরের ওপরকার চামড়া এনামুলকে তার শরীরের ভেতরকার রক্তের প্রতি দৃষ্টি হানবার সময় দেয়নি। যদি ওই চামড়াটাকে রক্ষা করবার কোনও চেষ্টা করা যেত, তাহলে ভেতরের রক্ত দিয়ে সে চেষ্টার দাম শোধ করতে হতো।

আইনগত অনুসন্ধানের কাজে কাম, লোভ, অত্যাচার, বলাৎকার ইত্যাদি যে-সমস্ত বিষয়ের উৎস ও উদ্দেশ্য থাকা স্বাভাবিক—তাকে যথেষ্ট মূল্য না দিলে ঘটনার সত্যতা যাচাই হয় না। অণিমার শরীরের প্রতি এনামুলের লোভ স্বীকার না-করলে ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না কেন দশ-পনেরোদিন হকচৌধুরী বাড়িতে থাকার পর এনামূল যখন প্রস্তাব দিল অণিমাকে রেখে গেলে সে তাদের ভারত ইউনিয়নে যাবার ব্যবস্থা করে দেবে, তখন সান্যাল পরিবার সম্মত হলো। দাঙ্গার কয়েক দিন হত্যার করার জন্য ও নিহত হবার ভয়ে মানুষের উল্লাস ও আর্তনাদ, আগুনের নীরব লেলিহানতাকে ঘোষণা করে মানুষের সমবেত কণ্ঠস্বর, সংস্কারগুলোকে খানখান করে ভেঙে ফেলেছিল।

অণিমাকে পাকিস্তানে রেখে আসতে হেমচন্দ্র সান্যাল নিশ্চয়ই একবারে সম্মত হন নাই। কিন্তু এতগুলি লোককে প্রাণ নষ্ট আর অণিমার কুল নষ্ট—এর মধ্যে যোগ-বিয়োগ করে তিনি নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন কোনটা লাভজনক। এবং তিনি অণিমাকে পাকিস্তানে রেখেই ভারতে ইউনিয়নে চলে আসেন।

দাঙ্গা-হাঙ্গামা থামবার পর ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারি অণিমাকে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত ও কুমকুম নামান্তরিত করে এনামুল হকচৌধুরী রেজেষ্ট্রি বিবাহ করে।

তখন এই প্রকার আশঙ্কা ছিল যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা থামবার পর এইসব ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হতে পারে। সেই কারণেই অণিমার নামান্তর ও পিতৃ-পরিচয় গোপন রাখবার জন্য আদ্যক্ষর ব্যবহার।

পাকিস্তানে অণিমার থেকে যাওয়া সম্পর্কে এই দুটি মত ছাড়া সম্ভাব্য তৃতীয় একটি মত কিন্তু পাওয়া যায় না যে অণিমা ও কুমকুম আসলে এক ব্যক্তিই নয়। হেমচন্দ্র সান্যালের মুখেরাস্থিত প্রতিবেশী ও আসামস্থিত বড়ো জামাতা ও তদীয় পত্নী অঞ্জলির সাক্ষ্যে অণিমার ভারত ইউনিয়নে না-আসা এমনভাবে প্রমাণিত যে, সেই কারণেই কুমকুম ও অণিমার দুই ব্যক্তিত্বের যুক্তি পাওয়া যায় না। যদি অণিমা ও কুমকুম এক ব্যক্তি নয় এই মত প্রচলিত থাকত তবে সমস্যাও এইখানেই থাকত। তারা দুইজনই না একজন এর মীমাংসা না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু সে-প্রশ্ন না-ওঠায় এরা যে একই ব্যক্তি তা পরোক্ষ সর্বসম্মত।

১৯৫২ সালের ৩০-এ জুলাই এই অণিমা সান্যালের সঙ্গেই যদি সত্যব্রত লাহিড়ীর বিবাহ হয়ে থাকে, তবে অণিমা সান্যাল ওরফে কুমকুম হকচোধুরী পাকিস্তান ছেড়ে ভারত ইউনিয়নে এল কবে ও কেন?

এ-বিষয়ে দুই প্রকার মত আছে।

প্রথম মত : ১৯৫২ সালের জুন মাসে প্রথম বোঝা যায় যে অণিমা গর্ভবতী। বমি, মাথাঘোরা, অরুচি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক লক্ষণও ইতিমধ্যে দেখা যায়। কিছুদিন পূর্বেই এনামুলের বাবা মইনুল হকচৌধুরী মারা যান। বাড়িতে শিক্ষিত বা অভিজ্ঞ মহিলারও একান্ত অভাব। তাছাড়া শারীরিক কারণেই অণিমা অত্যন্ত নার্ভাস হয়ে পড়ে ও বারবার বাবা, মা, ভাই, বোন ইত্যাদির কথা বলতে থাকে।

এক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। অণিমা তার বাবা-মার সঙ্গে ভারত ইউনিয়নে যেতে অস্বীকার করায় এনামুল এতদূর পর্যন্ত বিস্মিত হয়েছিল যে তাদের বিয়ের পর পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে নিজে খাপ খাইয়ে নিতে ও অণিমাকে খাপ খাইয়ে নেবার সুযোগ দিতে সে দীর্ঘদিন বাইরে বাইরে ছিল। কেন না এনামুল জানত—অণিমা যে হিন্দু ও সে মুসলমান, এ চিন্তা সংস্কার দুজনের মনেই এত সুদূরে মূল প্রসারিত করে আছে যে ভেতর থেকে ক্ষয়ে না-গেলেও শুধু বাইরের টানে তা উৎপাটন করা যাবে না। তাছাড়াও, তার জন্যই স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে থেকে যাওয়ায় অণিমাকে এনামুল বোধহয় একপ্রকারের সশ্রদ্ধ দূরত্বে রাখতে চাইছিল। বোধহয় সে সর্বদাই সচেষ্ট ছিল যাতে কোনো প্রকারেই সে অণিমার ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি না করে। মইনুল হকচৌধুরীর মৃত্যুর ফলে বাধ্য হয়ে এনামুলকে অণিমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে হয় এবং তখন সে আবিষ্কার করে তারই মতো অণিমাও এতদিন এনামুলের কথা ভেবেই দূরত্ব রক্ষা করেছে। অত:পর তাদের সুখী দাম্পত্যজীবন। এবং এই কারণেই বিবাহের এক বৎসর পর অণিমার গর্ভসঞ্চার।

অণিমার শারীরিক অবস্থায় বাপ-মায়ের কাছে থাকলে ভালো হবে ও শ্বশুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে বিবেচনায় এনামুল অণিমাকে মুখেরা পাঠাবার ব্যবস্থা করে। অথচ সে গেলে শ্বশুরবাড়ির সামাজিক অসুবিধা হতে পারে ভেবে নিজে যাবে না স্থির করে।

এবং এনামুলের সক্রিয় ইচ্ছায় উৎসাহে শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি ও শান্তির জন্য অণিমা ভারত ইউনিয়নে আসে। সে যে নিরাপদে ভারত ইউনিয়নে এসেছে ও তার বাবার কাছে আছে এ-সংবাদ জানিয়ে অণিমা এনামুলকে একখানি পত্র দেয়। নাম লেখা ছিল অণিমা।

পাকিস্তান ছাড়ার পর এটিই তার একমাত্র চিঠি। তারপর এনামুল ঘন-ঘন তিন-চারটি পত্র দেয়, অভিমান করে পত্র দেয়া বন্ধ করে, আবার পত্র দেয় ও অবশেষে টেলিগ্রাম করে।

এদিকে অণিমা মুখেরা পৌঁছুবার সঙ্গে-সঙ্গেই হেমচন্দ্র সকলকে বলেন যে অণিমার বিবাহ স্থির হওয়ায় সে বড়দির কাছ থেকে চলে এসেছে। এরপর গর্ভবতী অণিমাকে প্রায় রুদ্ধ কক্ষে আটক রেখে, এনামুলকে চিঠিপত্র দেবার সমস্ত পথ বন্ধ করে ও এনামুলের সমস্ত চিঠি গাপ করে হেমচন্দ্র যে-কোনও মূল্যে একটি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ, বাৎস্য ব্যতীত অন্য গোত্রে একটি পাত্র খুঁজতে লাগলেন। মইনুল হকচৌধুরী ও এনামুলের চেষ্টায় যে টাকা পয়সা গহনাপত্র আসবার সময় সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন, তাতে মুখেরা গ্রামে জমি সহ বসতবাটি, ব্রাহ্মণত্ব ও ধর্মবোধ একই সঙ্গে তিনি ভারত ইউনিয়নে সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। মাঝখানের কয়েকটা দিন তিনি মুছে দিতে চাইছিলেন।

এবং অবশেষে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩০-এ জুলাই, অর্থাৎ অণিমা পাকিস্তান থেকে আসার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই, মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ীর সঙ্গে হেমচন্দ্র দুই মাসের গর্ভবতী অণিমার বিবাহ দেন। ও সেই বিবাহের সাত মাস পরে সে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মার্চ বল্লভপুর হাসপাতালে একটি পূর্ণাঙ্গ সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান সন্তান প্রসব করে। এ সন্তানের গর্ভসঞ্চার হয়েছে এনামুল হকচৌধুরীর স্ত্রীরূপে, প্রসব হয়েছে সত্যব্রত লাহিড়ীর স্ত্রীরূপে।

দ্বিতীয় মত : ভারত ইউনিয়নে চলে আসার পর দীর্ঘদিন হেমচন্দ্র অণিমার কোনো খবর পান না। অথচ তাঁর আশা ও আশঙ্কা ছিল। কোনওদিন হয়তো অণিমা ফিরে আসতেও পারে। তাই তিনি সবাইকে তাঁর দ্বিতীয় কন্যার অস্তিত্বের কথা জানিয়েছেন ও বলেছেন যে সে তার বড়দির কাছে আসামের চা-বাগানে আছে। অবশেষে হঠাৎ ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে অণিমা অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় মুখেরায় এসে উপস্থিত হয়। সে নাকি বলে যে হেমচন্দ্র সান্যাল পাকিস্তান ছাড়বার পরদিনই সে এনামুলের হাত থেকে পালায় ও তারপর বহু কষ্ট ও যাতনার পর পাকিস্তান থেকে বেরুতে পারে ও তারপর নানা সূত্রে চেষ্টা করে হেমচন্দ্র সান্যালের ঠিকানা বার করে।

হারানো সন্তান ফিরে পেয়ে হেমচন্দ্র প্রথমে তাঁর ভগ্নশরীর সারিয়ে তুলবার চেষ্টা করেন ও সেই কারণে সবসময় সে ঘরের মধ্যে থাকত ও বাইরের কারু সঙ্গে মেশার সুযোগ পায়নি। মাসখানেকের মধ্যেই হৃতস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার হয়। এবং যে ডাক্তার চিকিৎসা করছিলেন, তাঁর চিকিৎসা সম্পূর্ণ হবার আগেই মৃত পুণ্যব্রত লাহিড়ীর পুত্র শ্রীসত্যব্রত লাহিড়ী বিএ-র সহিত অণিমার সম্বন্ধ আসে। কন্যার প্রতি কর্তব্যের তাড়ায় ও নিজের ভগ্নস্বাস্থ্যের প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভর রাখতে না পেরে হেমচন্দ্র এ-বিবাহে সম্মত হন। এবং ১৯৫২ সালের ৩০-এ জুলাই সত্যব্রতের সঙ্গে অণিমার বিবাহ হয়।

বিবাহের মাসখানেক মাসদেড়েক পরে অণিমা যখন বাপের বাড়িতে আসে, তখন তার গর্ভের লক্ষণ দেখা যায়। এ-বিষয়ে মুখেরার প্রতিবেশিরা সাক্ষ্য দিতে পারেন। চার মাসের মাথায় অণিমাকে বল্লভপুর পাঠানো হয়। এবং সাত মাসের শেষে ১৯৫৩ সালের ১৭ই মার্চ অণিমার একমাত্র সন্তানের জন্ম হয়। এ-গর্ভসঞ্চার সত্যব্রতের সঙ্গে বিবাহের পরে ও এ-সন্তানের একমাত্র পিতা সত্যব্রত।

যদি এনামুল অণিমাকে ব্যবহার করার সুযোগ পেত, তবে কি আর অণিমা ছাড়া পেত, আর সেই লম্পট গুন্ডার সঙ্গেই যদি সে থাকত, তবে এক বৎসর পর তার গর্ভসঞ্চারের কারণ কী?

সমস্ত মতামত বিবেচনা করলে দেখা যায়—(ক) অণিমা এনামুলকে ভালোবাসত, না কি এনামুল জোর করে অণিমাকে আটকে রেখেছিল (খ) অণিমা এনামুলকে নামান্তরিত হয়ে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছিল, না কি বাধ্য হয়ে (গ) অণিমা সত্যব্রতকে গোত্রান্তরিত হয়ে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছিল, নাকি বাধ্য হয়ে (ঘ) অঞ্জনা কার কন্যা, এনামুলের না সত্যব্রতের—এই চারটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরের ওপর অণিমার প্রকৃত পরিচয় নির্ভর করছে, এবং অঞ্জনার। এবং প্রশ্নগুলি মানুষ সম্পর্কে কতকগুলি মৌলিক প্রশ্নের কাছাকাছি নিয়ে যায়, অতি দ্রুত ও অতি সোজাসুজি।

যতদিন এই সোজাসুজি প্রশ্ন চারটির সত্য জবাব পাওয়া না যাচ্ছে ততদিন-যাঁকে আপনি স্ত্রী বলে জানেন, তিনি আপনার স্ত্রী নন; যাকে আপনাদের সন্তান বলে জানেন, সে আপনাদের সন্তান নয়।

সুতরাং নিজের আদি, অকৃত্রিম ও মৌলিক আত্মপরিচয় সহ নিকটবর্তী থানায় হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করুন আপনি যে, আপনি সত্যিই সে।

খিড়কিতে সদর দাওয়ায় তুলসীকোণায় ঘরের আনাচে-কানাচে অন্ধকার। দ্রুতবিস্তারী বন্যার মতো, প্রাণান্তিক মহামারীর মতো, অন্ধকার। আত্মপরিচয়হীন উদ্বাস্তু অণিমা আর সত্যব্রত সে-অন্ধকারকে তপ্ত তরল লোহার ফুটন্ত সমুদ্র ভেবে বিলীন হতে চাইল।

পূর্বমুহূর্তে পর্যন্ত যেগুলি সংসার ছিল, এখন সেগুলি আলোহীন চোখের গর্ত—যেন মিথ্যা পল্লব তুলে উঠোনে অণিমা আর সিঁড়িতে সত্যব্রতের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই ঘর, সেই বাড়ি, সেই পরিবার, সেই সুখ, পা-গজানো রাক্ষসের মতো সত্যব্রত-অণিমার চারিদিকে আচ্ছন্ন করে তোলে এবং সেই ক্রমঘনিষ্ঠ অন্ধকারের আকাশে নি:শব্দ ঘোষণা, 'তুমি, তুমি নও সত্যব্রত; তুমি তুমি নও অণিমা।'

সম্পূর্ণ অনাত্মীয় দুটি আত্মা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে—বাইরে কচি করুণ একাকণ্ঠে তীরের মতো তীব্রস্বরে অন্ধকারকে ভেদ করে অঞ্জু তাদের আত্মার তর্পণের মন্ত্র হাঁকবে : 'বাবা' 'মা'—তারই অপেক্ষায়।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%