সমরেশ মজুমদার

আজ শনিবার। অফিস ছুটি।
লিখছিলাম।
এমন সময়ে ফোনটা বাজল।
তোমার ফোন, সনু।
সনু যথারীতি তার দিদির ঘরে ঘুটুর-ঘুটুর করছিল। বিএ পরীক্ষা হয়ে গেছে অনেকদিন। এখন ফলের জন্যে শবরীর তপস্যার মতো তপস্যা করা ছাড়া অন্য কাজ কিছু নেই।
আমি আমার দু-মেয়ের, বা সাধারণভাবে বলতে গেলে, সংসারের জন্যে কিছুমাত্রই করি না বা করিনি কোনদিনই। আমার মেয়েরা দুজনেই ন্যাশনাল স্কলার। সবদিক দিয়েই ভাল। এবং তাদের ভালো হওয়ার পেছনে সব কৃতিত্বই তাদের মায়েরই একার।
দোষের মধ্যে সনুটা বাংলা পড়ে না। বড়ই দু:খ হয়, যখনই এ কথা মনে হয়।
আমরা মেয়েরা আমার কাছ থেকে পাওয়ার মধ্যে শুধু একটি বদভ্যাস পেয়েছে। সেটি এই যে, তারাও শিশুকাল থেকেই বইয়ের মধ্যে বাস করতে ভালোবাসে।
অন্তর্মুখিনতা আজকাল আর কোনও শখ নয়। এটি একটি দুর্মূল্য বিলাস এবং অতি স্বল্প মানুষেরই মনের জোর বা জেদ আছে এই বিলাসে বিলাসী হওয়ার। আমার মেয়েরা যে অন্তর্মুখী হয়েছে তা দেখে বড়ই আহ্লাদিত হই। আজ রাতেই যদি ঘুমের মধ্যে মরে যাই তবুও একটুও দু:খ থাকবে না আমার।
কী হল। সনু! তোমার ফোন।
আবার বললাম।
এই দুবার ওকে ডাকার মধ্যেই এত কথা মাথার মধ্যে দাপাদাপি করে গেল।
হুঁ! কে?
অনুরাধা।
কোন অনুরাধা?
অরিজিনাল। বোস। পণ্ডিতিয়ার। কল্লোলদার মেয়ে।
আসছি।
ধরো অনুরাধা। আসছে সনু। তোমার বাবা কেমন আছেন?
ভালো।
মা?
ভালো।
আমাকে কবে ইলিশমাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক আর ভাপা ইলিশ আর ইলিশমাছের টক খাওয়াবেন, জিগ্যেস কোরো তো মাকে?
সনু আসতে আসতে বলল, বিরক্ত গলাতে; আবার আরম্ভ করলে।
তারপর ফোনের রিসিভারটা নামিয়ে রেখে কর্ডলেসটা তুলে নিয়ে ঘরে চলে গেল।
ঘরটা যদিও ওর একার নয়।
আমি এমনই তালেবর বাবা ওদের যে, দুই অধ্যয়নশীল মেয়েকে দুটি আলাদা ঘর পর্যন্ত দিতে পারিনি জীবনের শেষে পৌঁছেও। হায়! তাতেও কত মানুষই না আমাদের 'সাফল্যে' (?) কাতর।
মৌ আর সনু ওই একটি ছোট্ট ঘরেই গুঁতোগুতি করে পড়াশুনোর পাট প্রায় চুকিয়ে ফেলল।
আমার একটি আলাদা ঘর লাগেই। সে-ঘরের আলমারিতে বই, টেবলে বই, বিছানাতে বই, বাথরুমে বই। বইয়ের সঙ্গেই শুয়ে থাকি আমি। সে জন্যে আমার স্ত্রী মিতুর অভিযোগও কম নেই। তবে আজকাল আর কেউই কিছু বলে না আমাকে। পুরোনো আসবাবেরই মতো আমিও এই ফ্ল্যাটের একটি ফিক্সচার হয়ে গেছি। যেতে-আসতে চোখে যে পড়ি না তা নয়, কিন্তু আমার আলাদা কোনও অস্তিত্ব নেই। তা ছাড়া, সকলেই জেনে গেছে যে বলে কী লাভ? পাথরের গায়ে কলমের আঁচড় তো পড়ে না।
ও ঘর থেকে হিহি-হাহা শোনা গেল। ফোনে কত যে বলার কথা থাকে ওদের।
মিতু এখন বাড়িতে নেই। রেডিওর রেকর্ডিং-এ গেছে। মৌ অফিসে। তার কোনও শনি-রবি নেই। উইকডেজ এ সকল নটাতে বেরিয়ে দশটা এগারোটাতে ফেরে একগাদা বইপত্র-ফাইল ইত্যাদি নিয়ে। তারপরও যতবার আমি রাতে বাথরুমে যাই, দেখি প্রায় সারারাতই ঘরের আলো জ্বলে। ও আবার চলে যায় অফিসে সকাল নটাতে। মোমবাতির দুদিকেই আগুন দিয়েছে। ওরও অবস্থা আমারই মতো হবে।
ওর মায়েরই সঙ্গে মিতুর ঘরে শোয় রাতে সনু। কোনও কোনও দিন রাতে খেতে বসে, বেয়ারা পঞ্চাননকে শুধোই, মৌ এখনও আসেনি?
উনি তো আজ বিকালে দিল্লি চলে গেছেন। অফিস থেকেই। হঠাৎ কাজ পড়ে গেছে।
ও! কবে আসবেন।
দিদির অফিসের ড্রাইভারই জানে। তাকেই বলে গেছেন। বলল, কিছুই ঠিক নেই। ফেরার আগের দিন ফোন করবেন বলেছেন। তখনই জানা যাবে।
বউদি কোথায় রে পঞ্চানন?
মেহেন্দি হাসানের গান শুনতে গেছেন জয়ন্ত চ্যাটার্জির বাড়িতে 'সানি টাওয়ার্স'-এ। বলে গেছেন, ফিরতে ফিরতে একটা হবে। খেয়ে আসবেন। চাবিও নিয়ে গেছেন। আপনাকেও তো যেতে বলেছিলেন।
হ্যাঁ। কিন্তু কাজ আছে আমার। আজই একটি লেখা শেষ করতে হবে। আর গাইয়ের নামটি মেহেন্দি হাসান নয় মেহেদ্দি হাসান।
লজ্জা পেল পঞ্চানন।
আর সনু?
দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ছোটদিদি বটানিকস-এ গেছিলেন। ভীষণ ঘুম পেয়ে গেছে। তাই খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছেন।
ও:।
আমি বলি।
ফাঁকা টেবলে বসে খেতে ভালো লাগে না। কিন্তু এ নিয়ে আমার কোনও অনুযোগ নেই। হয়তো ওদেরও আমার বিরুদ্ধে নেই। কারণ, আমরা প্রত্যেকেই জানি যে আমাদের পরিবার অন্য দশটি পরিবারের মতো নয়। ভালোমন্দর কথা নয়, আমরা শুধু অন্যরকম। আমরা, আমারই। সেকথাটা জেনে এই একাকিত্ব, অসুবিধা, এই সবকিছুর জন্যই এক ধরনের গর্বও বোধ করি। আশ্চর্য! এই গর্বটাও আবার অনেকের চোখে স্পর্ধা হয়ে প্রতিভাত হয়।
কেউ না থাকলে বা আগে পরে কোনদিন কেউ খেলে, ঘরেই নিয়ে আসতে বলি আমার খাবার ট্রলি করে। খাওয়াটাও যদি মনপসন্দ না হয়, তবে সেটা নিতান্তই শুষ্ক কর্তব্য হয়ে ওঠে আমার কাছে। ইনকনসিডারেট, বিবেকরহিত ও মনস্তত্বজ্ঞানহীন অধুনা ডাক্তারদের অজ্ঞতায় prescribe করা অখাদ্য, নাড়াচাড়া করে ফিরিয়ে দিই।
সনু বলল, বাই-ই।
বলে, ফোনটি রাখতে এল আমার ঘরে।
ফোনটা থাকে বসার ঘরেই। অনেকগুলো ফোন করতে হবে জরুরি তাই এ ঘরে কর্ডলেসটি নিয়ে এসেছি।
কথা হল?
হ্যাঁ।
কী কথা বললে?
বাবা! সত্যি তুমি না। বন্ধুরা কত কথা বলে। তুমি যখন বিএ পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে ছিলে তখন দাদু কি জিগ্যেস করতেন তোমাকে, বন্ধুর সঙ্গে কী কথা বললে?
বয়ফ্রেন্ডসদের কথা বলছিলে বুঝি?
আমি শুধোলাম সনুকে?
হা:। তাহলে তো হতই!
তোর দাদু তো আমাকে বি.কম. পরীক্ষার অনেক আগে থেকেই জোয়ালে জুতে দিয়ে নিজের বেগুন ক্ষেতে বেগুন চাষ করাচ্ছিলেন। তোর মতো অত কথা বলার সুযোগ কি আমার ছিল? সকালে ঘুম থেকে উঠে যেতাম উ্যনিভার্সিটি ল কলেজে। সেখানে ক্যান্টিন এ ভরপেট খেয়ে অফিস টাইমের ট্রামে-বাসে উঠতে পারতাম না বলে কলেজ স্ট্রিট থেকে হেঁটে হেঁটে অফিসে আসতাম।
হ্যাঁ। সনু বলল। আর তার পরেরটাও বলো। সেটা বলছ না কেন? বিকেলে টেনিস খেলতে যেতে দেশপ্রিয় পার্কে। 'দক্ষিণী'তে গান শিখতে, নাটক করতে।
তারপরই বলল, তোমার না, বাবা, সবটাতেই একটা দু:খ দু:খ ভাব। কেন বলো তো? মাকে দেখো না? সবসময় আনন্দে ঝলমল করছে। যেন আনন্দময়ী মা। এই জন্যেই তো মা বলে, ঠিকই বলে, যে, তোর বাবা জানেই না কী করে সুখী হতে হয়। এততেও যদি তুমি সুখী না হও তবে কে তোমাকে সুখী করতে পারে বলো? তোমার মতো কজন সাকসেফুল?
'সাকসেস' কথাটার মানে একেকজনের কাছে একেকরকম। সেইটাই হচ্ছে মুশকিল। তাছাড়া, তোর মায়ের চৈত্র মাসে জন্ম তো। তোর দাদুরই মতো। ওঁরা ভীষণই অপ্টিমিস্ট, এনার্জেটিক। কুলিখাটানো, কাজের-লোক-খাটানো, কারখানা চালানো, এসব কাজ ওঁরা খুবই ভাল পারেন। আর্মিতে জয়েন করলে ওঁরাই জেনারেল হন।
তুমি শুধুই মায়ের নিন্দা করো। মা কিন্তু কখনও তোমার নিন্দা করে না।
এটা কি নিন্দের কথা হল? যা বললাম? তাছাড়া আমার সম্বন্ধে নিন্দা করার কিছু থাকলে তবেই তিনি নিন্দা করবেন?
হ্যাঁ। তা কি আর নেই।
আমি চললাম।
যাবে? কোথায়? তোমাকে তো দেখতেই পাই না। বোসো না একটু। ছুটির দিন। বাবাকে একটু কম্পানি দাও। কী করবে কী, গিয়ে?
বাবা:! কত কাজ!
কী কাজ? করছিলে কী?
একটা বই পড়েছিলাম। দিদি বম্বে থেকে কিনে এনেছে গত সপ্তাহে।
কী বই?
'V'—When Feeling Bad Is Good.
কার লেখা?
Ellen Megrath.
কিসের বই?
মেয়েদের পড়ার বই। লানডান এর সাইকিয়াট্রিস্ট লেনার্ড ক্রিস্টাল লিখেছেন 'A truly remarkable book...An absolute must for women the world over who will take heart from its Profound message.'
প্রকাশক কে?
Bantam
তুমি তো আর ডিপ্রেশান ফিল করছ না?
মাঝে মাঝে করি বাবা।
কেন? এখনই কি? এত অল্প বয়সে।
অল্পবয়স যে চিরটাকাল অল্পবয়স থাকে না বাবা। তুমি মনে করে দেখো, এই তো সেদিনও তুমি অল্পবয়সী ছিলে। ছিলে না? ক্যালকাটা র্যাকেট ক্লাবে স্কোয়াশ খেলতে যেতে। আমাকে অরেঞ্জ স্কোয়াশের গ্লাস হাতে ধরিয়ে দিয়ে তুমি খেলতে। আমি তখন এক হাতে গ্লাস ধরতেই পারতাম না। দু-হাতে করেই ধরতাম। আমি একটা হালকা লেমন-ইয়ালো রিবন মাথায় বেঁধে যেতাম। মনে আছে। মাসি যেন কোথা থেকে এনে দিয়েছিল। বেঞ্চ-এ উঠতে পারতাম না। এতই ছোট ছিলাম। তোমাদের র্যাকেট ক্লাবের আবদুল বেয়ারা আমাকে তুলে ধরে বসিয়ে দিত। বাবা। বাবা। বলে আদর করে কথা বলত।
তারপর বলল, কেমন আছে এখন আবদুল দাদা?
আবদুল মারা গেছে।
দেখলে তো।
আবদুল দাদা তখন প্রৌঢ় ছিল। এই সেদিনও। দেখো, মরে গেল এরই মধ্যে।
আমি তোমার খেলা দেখতাম। বাবা: কী ফাস্ট খেলা স্কোয়াশ। মার্কার জেভিয়ার এর সঙ্গে খেলতে তুমি। তাই না? মনে হয়, এই তো সেদিন। আর আজ? আজ বাদে কাল আমি এম. এ. ক্লাসে ভরতি হব। তুমিও অফিস ছেড়ে দেবে শিগগির। কী যেন বলো না তুমি। এবারে নিজের 'নিজস্ব' কাজ করবে। এতদিন কি তাহলে পরস্ব কাজ করলে?
আমি হাসলাম।
বললাম, তাই-ই। তা এখন কটা বাজে বল তো সনু?
সাড়ে বারো? বলিস কী? ইটস টাইম ট্যু হ্যাভ আ ড্রিংক নাউ।
তোমাকে না শম্ভু কাকা দুপুর বেলা এসব আজেবাজে জিনিস খেতে মানা করেছেন?
রাখ তো তোর শম্ভু কাকার কথা। সে কি আমার মতো ভোর চারটেতে উঠে লেখার কাজ করে ছুটির দিনে? আর সে তো লেখে প্রেসক্রিপশান। ক্রিয়েটিভ লেখালেখির যে কী স্ট্রেইন তা তারা কী জানে। দুটো জিন খাব, তারপর গিয়ে ভাত খাব তোমার সঙ্গে আজ ইলিশমাছ দিয়ে, তারপর কিছুক্ষণ ঘুমব, আ: কী সুন্দর মেঘলা দিন! তারপর আবার লিখব রাত আটটা অবধি। আমার তো ছুটির দিনেও ষোল ঘণ্টা কাজ।
তুমি খেও। আমি ইলিশমাছ খাব না, তুমি তো জানো! বোঁটকা গন্ধ। খেলে ওডিকোলোন লাগাতে হবে হাতে।
সনু বলল।
তারপরে বলল, সোম থেকে শুক্র, আমি আর মা যখন Star T.V-র Bold and the Beautiful সিরিয়াল দেখি, রাত আটটা থেকে পৃথিবীর আর কোনও কিছু সম্বন্ধেই যখন আমাদের আর কোনও হুঁশ থাকে না। তখন Santa Barbara শেষ না হওয়া অবধি তুমি পঞ্চানন দাদাকে দিয়ে বরফ আর গ্লাস আর হইস্কির বটলটা আনিয়ে নিয়ে ঘর অন্ধকার করে পটাপট...
তোর তো সাংঘাতিক বুদ্ধি। থুড়ি, দুর্বুদ্ধি।
হবেই তো। আমি তো তোমারই মেয়ে।
আরে বোকা। তখন তো আমার সঙ্গীত সাধানার সময়। ওয়াকম্যানটা কানে লাগিয়ে রাজ্যের গান শুনি। কখনও কখনও সঙ্গে সঙ্গে গাইও। আর একটু হুইস্কি খাই। খুব অন্যায় করি কি?
আমি কি বলেছি অন্যায় করো। ন্যায় অন্যায় রিলেটিভ ব্যাপার। তবে, মাঝে মাঝে যা চেঁচামেচি করো, তখন আই রিয়্যালি হেইট উ্য।
আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, আমি জানি যে ইউ অল হেট মী। এ কথা ঠিক যে, মাঝে মাঝে অমন রেগে যাই। রাগাটা কিন্তু ড্রিংক করার জন্যে নয়। রাগটা থাকেই ভিতরে, সবসময়েই গুমরে মরে। কখনও কখনও অনেক বছর ঘুমিয়ে থাকা অগ্নেয়গিরির মতো অগ্ন্যুৎপাত করে।
তারপরে বললাম, আমি নিজেও নিজেকে ঘেন্না করি। কেন যে কী করি, যদি বুঝতিস সনু। কত বড় একটা জাহাজ আমাকে চালাতে হয়। সারেং আমি। যতই মাসের এক তারিখটা এগিয়ে আসতে থাকে, ততই...মাথাটা...অথচ আমি মানুষটা এসবের কোনও কিছুই...তোরা ঠিক বুঝবি না। কেউই বোঝে না আমাকে। সংসারে আমাকে মানায় না।
চললাম আমি। আবার আরম্ভ করলে।
না মা! যাস না। আর একটু বোস...
পঞ্চাননদাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, নইলে অধীরদাকে ।
নারে সনু। তোর হাতে এক গ্লাস জল খেতেও যে কী মিষ্টি লাগে।
সত্যি। তুমি এত জ্বালাও না। ভাল লাগে না। এখন আমাকেই দিতে হবে তোমার ওই সব? যত্ব বাজে সব।
বলেই, গজরাতে গজরাতে সনু চলে গেল।
তারপর ফ্রিজের দরজা খুলে ডাইনিং-কাম-সিটিং রুমে দাঁড়িয়ে বলল, বিটারস দেব, না লেবু। বলো?
আজ লেবু! গন্ধরাজ।
বরফ?
হ্যাঁ।
জিন তো? না ভডকা? কোথায় আছে সেই সব ছাই-পাঁশ।
সেলারেই আছে রে মা।
একটু পরেই সবকিছই ট্রেতে করে সুন্দর করে সাজিয়ে নিয়ে এল সনু।
মায়ের শিক্ষাতে দুই মেয়েই বড় গুছিয়ে কাজ করতে শিখেছে। করে না কিছুই। কিন্তু যদি করবে বলে মতি হয়, তবে একশতে একশ নম্বর দিতে হয় তাদের। মৌ তাও একটু আমার মতো, কাগজপত্রর ব্যাপারে, বইটই এর ব্যাপারে একটু অগোছালো, সেটা আমারই মতো সময়াভাবেই হয়; বুঝি। কিন্তু সনু একেবারে তার মা বসানো। মেজাজেও। মাঝে মাঝে বড়ই বকাঝকাও করে আমাকে। কী করব! বাড়িতে যে আমি মাইনরিটি। এই পরিবার ম্যাট্রিয়র্কাল ফ্যামিলি। মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা ছেলে থাকলে হয়তো আমার দিকটা বুঝত, বাবাকে তার চোখ দিয়ে অ্যাপ্রিসিয়ট করত।
তুমি না আমাকে 'বার গার্ল' বানিয়ে দিলে। এসব কাজ কি কোনও বাবাই মেয়েকে দিয়ে করায়? ছি!
আমি যে তোর যে 'কোনও বাবা' নই রে মা। প্রথমত, আমি তোর একমাত্র বাবা। দ্বিতীয়ত, আমি যে আমিই। জাস্ট 'কোনও' বা 'এলেবেলে' বা 'যে কোনও' বাবা নই। তা ছাড়া, একটা কথা ভাব। আমার জামাই তো বলবেই তোকে, আহা। তোমার মা কী চমৎকার শিক্ষা দিয়েছেন তোমাকে। এটা তো নতুন কোনও কথা নয়। সব মায়েরাই মেয়েদের ভালো ট্রেনিংই দেন তাঁর তাঁর মতো। কিন্তু ক'জন বাবা ক'জন মেয়েকে তুই যে ট্রেনিংটা পেলি, তা দেয় বল?
সনু হাসল।
বলল, বলেছে ভালোই। ট্রেনিংই বটে।
আমি বললাম, জামাই বলবে, আহা। শ্বশুরমশাই তোমাকে ট্রেনিংটা দিয়েছিলেন বটে।
সনু হাসল। বলল, ভাবছ তাই। জামাই-ফামাই হবে না কোনদিনও তোমার। সব বোকা বোকা Vague ছেলে। পছন্দ হয় না একটাকেও। আর যদি হয়ও কখনও কাউকেও পছন্দ; আমার প্রথম condition-ই হবে যে ড্রিংক করতে পারবে না। করলে, মাথাতে বোতল ভাঙব।
সে তো বিয়ের সময়ে সব ছেলেই প্রতিজ্ঞা করবে রে। ছেলেদের তো চিনিস না। আমিও কি তোর মাকে কথা দিইনি? তা ছাড়া আমিও তো বলেছিলাম, সিনসিয়রলি বলেছিলাম। বিশ্বাস কর। এসব তো এই বুড়ো বয়সেই...
তবে? কথা দিয়েও। ছি: বাবা।
ও তুই বুঝবি না। জীবনে কোনও প্রতিজ্ঞাই, কোনও কথাই Static নয়রে। বড় দু:খময় হলেও এর চেয়ে বড় সত্যি আর নেই। সময়ের সঙ্গে কথা সরে যায়; নড়ে যায়, এই পৃথিবীতে, সুন্দরতম গাছের পাতাও ঝরে যায়। ফুলও। আমরা নিরুপায়। কে বলতে পারে।। হয়তো বুঝবিওবা, এই স্ট্রেইন, এই ঘোরাঘুরি, এই আনসার্টেনটি, এই নোংরামি, চক্রান্ত, বিদ্বেষ, এই এত এবং এতরকমের অকৃতজ্ঞতা, অপমান, লেখার চিন্তা, মক্কেলের চিন্তা, এত সবের বোঝা যে এই ঘাড়ে চাপবে সে কথাও তো জানা ছিল না আগে, বল? সব মিলে-মিশে এই ক্লান্ত বিরক্ত মাথাটা একটু উদ্দীপ্ত হতে চায়। ড্রিংক করাতে, মাথার কাজ যাদের, তাদের দোষ নেই, বাড়াবাড়িটাই দোষের। ক্রিকেটার ফুটবলারদের বিয়ার আর উকিল, ব্যারিস্টার, অ্যাকাউন্ট্যান্টদের হুইস্কি। ওষুধই বলতে পারিস। আমাদের প্রফেসর নারিয়েলভালা সাহেব বলতেন, উ্য মাস্ট ওর্য়াক হার্ড টু আর্ন ইওর স্কচ। ড্রিংক-ট্রিংক পরিশ্রমী মানুষদেরই জন্যে। হয়তো ক্রিয়েটিভ মানুষদের জন্যেও। উ্য মাস্ট ডিসার্ভ ইট; আর্ন ইট।
ছাই ওষুধ। চললাম আমি।
সনু বলল।
বলেই দুদ্দাড় করে ও ঘরে চলে গেল।
দু-মিনিট পরেই আবার বোতাম টিপলাম রিমোট কন্ট্রোল বেল-এর।
সনু দরজাতে দাঁড়িয়ে বলল, ওরা কেউ নেই।
কেউই নেই? কোথায় গেল?
পঞ্চাননদা চুল কাটতে গেছে আর অধীরদা গেছে চান করতে।
আমি যেদিন বাড়িতে থাকব সেদিনই কি ওদের বিউটিফিকেশান-এর দিন।
মহিম কোথায়। বাবুর্চি সাহেব।
সে ওষুধ কিনতে গেছে।
কী ওষুধ? নিজৌষধি? আমারই মতো?
জানি না। বলো কী চাই?
কী আর চাইব বল? কার কাছেই বা চাইব? এ বাড়িতে প্রত্যেকেই মালিক। শুধু আমি সকলের তাঁবেদার। আমিই একমাত্র কাজের লোক। না, কী যেন বলে আজকাল 'গৃহকর্মী।'
কী চাও বলো না বাবা?
আমার স্টেপলারটা। কোথায় যে গেল!
হাতের কাছেই তো থাকার কথা। নিয়ে নাও না।
কই? পাচ্ছি না রে। কোথায় হাতের কাছে?
উ:! তুমি যা জ্বালাও না। সে জন্যই তো বাড়ি থাকতে ইচ্ছে করে না তুমি বাড়ি থাকলে।
একটু আহত হয়েই আমি বললাম, তোদের এতই জ্বালাই।
আমিও আহত হই কখনও কখনও। লজ্জাহীনেরও লজ্জা থাকে।
তারপর বললাম, লক্ষ্মী সোনা, একটু দেখে দিয়ে যাও।
ঘরে ঢুকেই বলল, এই তো! এটা কী?
কোথায়?
তোমার পেছনে।
পেছনে যে ভগবান চোখ দেননি রে মা। যদিও দেওয়াটা, তোদের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁর 'হাইলি' উচিত ছিল।
বিছানাটাকে যা করেছ না। মা দেখতে পেলে! মা আসার শব্দ পেলেই দরজা লক করে দেবে ভিতর থেকে বুঝেছ! যদি কুরুক্ষেত্র এড়াতে চাও...
স্বল্পক্ষণ পরেই আবারও আমি ডেকে উঠলাম, সনু-উ-উ সনুউউ—
কী হল আবার?
একটু এসো।
না। আসব না। বলো না।
একটা বই খুঁজে পাচ্ছি না। কালকেই রিভিউটা জমা দিতে হবে।
কী বই? রিভ্যু-ফিভ্যু করার দরকার কী? তুমি তো আবার মন রেখে কথা বলতে পারো না। আর কত বাড়াবে শত্রু?
বাড়ুক বাড়ুক। অগণ্য শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে যে কী আনন্দ তাও আমি তোদের শিখিয়ে দিয়ে যাব। মাই লিগ্যাসি। তোরা যদি সততার দিকে থাকিস, ন্যায়ের দিকে থাকিস, তবে অসত্য, ভণ্ড, খল অন্যায়কারীরা চিরদিনই তোর সঙ্গে শত্রুতা করবে। যার শত্রু নেই, সেই মানুষকে এড়িয়ে চলবি। তারা মানুষ হিসেবে খুবই গোলমেলে। শত্রুতা, এই ক্লীবের দেশে, তোদের ক্ষমতাকে ক্ষুরধার করুক, ওই আশীর্বাদ করি।
বইটা পড়ইনি আর রিভিউ করবে। কী করে।
কে বলেছে পড়িনি, পড়েছি রে পড়েছি। পড়েছি অনেকবারই কিন্তু সমালোচনা করার সময়ে বইটা তো হাতের কাছে দরকার।
কোন কাগজে করবে? রিভিউ?
'আজকাল' থেকে বলেছে।
কেমন দেখতে? বইটার কভার?
মিঞা তানসেন অথবা অন্য কেউ বসে ফতেপুর সিক্রিতে হাত ছুঁয়ে গান গাইছেন। দারুণ কভার এঁকেছেন বিমলদা।
বিমলদা কে?
বিমল দাস।
মিঞা তানসেন হাত ছুঁড়লে দোষ নেই। আর পপ মিউজিকে যখন হাত পা ছোঁড়ে তখনই দোষ হয়ে যায়।
আরে সেই হাত-পা ছোঁড়া আর এতে অনেকই তফাত আছে।
কী বিষয়ের বই।
ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক অ্যান্ড মিউজিসিয়ানস। বইটা একবার পড়লে পারতিস। অনবদ্য ভাষা। চমৎকার বই। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে রে! কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
হতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে অ্যাজ ফরেন অ্যাজ এস্পেরর হাইলে সেলাসি। বাবা ইচ্ছে থাকলেও পড়া যাবে না।
তারপরে বলল, আমরা বড়ই আনফরচুনেট বাবা। আমাদের কেরিয়ারই ফার্স্ট প্রায়রিটি। একচুল বাড়তি সময় যে নেই। আর কেরিয়ারের দিকে না দেখলে যে তোমার ঘাড়ে বসেই সারাজীবন খেতে হবে।
তা খাবি না হয়। আমার ঘাড় তো তেমন অমজবুত নয়।
না বাবা। ঠাট্টা নয়।
নইলে, কোনও অশিক্ষিত বড়লোক, নয়তো অত্যাচারী স্বামীর পয়সাতে খেতে হবে। আজকের মেয়েদের কাছে স্বাবলম্বনই হচ্ছে প্রথম প্রায়রিটি। আমরা নিরুপায় বাবা। তা ছাড়াও সত্যি কথা বলতে কী, ইন্টারেস্ট পাই না। ইংলিশ-মিডিয়াম স্কুলে পড়ার যেমন গুণ আছে অনেক, অনেক দোষও আছে। আমাদের জীবনের পাতাগুলোকে সব মার্কার দিয়ে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইটস আ ম্যাটার অফ প্রায়রিটিজ। প্রায়রিটি আফটার প্রায়রিটি। আসলে, জীবন তো বড় ছোট না।
গম্ভীর হয়ে গেলাম।
আমি বললাম, তা ঠিক। তুই কুড়ি বছরেই একথা যে বুঝেছিস এটাই তোর কৃতিত্ব। আমি যে এখনও সে কথা পুরোপুরি বুঝেই উঠতে পারলাম না। আজও ভাবি যে জীবন বুঝি অনন্ত। এখনও অনেক কিছুই করার সময় আছে। আসলে বোঝা উচিত যে, নেই।
সনু বলল, অবশ্য দীর্ঘ জীবনটা ইমমেটরিয়াল। গ্রিক হিরো অ্যাকিলিস বলেছিলেন না? জীবনের দৈর্ঘ্য দিয়ে জীবনের মাপ হয় না কখনওই। জীবনে কে কী করল, সেটুকু দিয়েই জীবন মাপা হয়।
তারপরেই বলল, আমি চললাম। একটু গান শুনব ওয়াকম্যানে। বড় টেনশানে আছি। বুঝেছ, বাবা! কখন খাবে? মায়ের তো আজ আসার ঠিক নেই। তুমি দেরি করলে আমি কিন্তু খেয়ে নেব।
তোর আবার কিসের টেনশান?
জে. এন. উ্য-তে ভরতি হবার পরীক্ষা দিয়েছিলাম তো। রেজাল্ট বেরোবে দু-একদিনের মধ্যেই।
জে. এন. উ্য মানে?
দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনির্ভাসিটি?
সে কী। কবে দিলি আবার পরীক্ষা?
ওই তো দিয়ে দিয়েছি। পরীক্ষা সব জায়গারই দিয়ে রেখেছি। তবে জে, এন, উ্য-তে হবে না। সারা দেশের ছেলে মেয়েরাই দিয়েছে তো! তার মধ্যে আমার কোনও চান্সই নেই।
আর যদি পেয়ে যাস? কী হবে?
আতঙ্কিত গলাতে আমি বললাম।
কী আবার হবে। চলে যাব।
কোথায়?
দিল্লিতে! রাজধানী।
সে কী রে।
আমি সোজা হয়ে বসে, উৎকণ্ঠিত গলাতে বললাম।
তারপর বললাম, আমি তোকে যেতে দেব্বই না। তুইই আমার একমাত্র সঙ্গী, বন্ধু, ফিলসফার। ফাই-ফরমাস খাটার মানুষ হাতের নড়ি; অন্ধের ষষ্টি। তোর মা আর দিদির কি সময় আছে আমার দিকে দেখার? তোকে কিন্তু আমি যেতে দেব না। আগেই বলে রাখছি। দুটি কান খুলে শুনে রাখ।
সনু হাসল। শব্দ না করে।
বসলাম, হাসছিস যে বড়।
ও বলল, কী যে বলো। তুমি সেনাইল হয়ে যাচ্ছ বাবা। আমাকে যদি বিয়ে দিয়ে দিতে? তখন যেতে না দিয়ে পারতে?
অকাট্য যুক্তিতে আটকে গিয়ে তুতলে বললাম, বিয়ে? বিয়ে দিলেও খুঁজে পেতে ঘরজামাই আনতাম। আমার সনুকে আমি ছাড়তে পারব না। ছেড়ে, বাঁচতেই পারব না একদিনের জন্যেও।
সনু চুপ করে থাকল একটুক্ষণ।
বলল, সকলকেই সকলে ছাড়ে বাবা। ছাড়তে হয়ই। আজ আর কাল। তা ছাড়া, ছাড়ার কত্ব রকম হয়। এই যে আমাদের বন্ধু রিঝির ছাড়তে কি হল না? আমরা তো কতজনাই ছিলাম। আটকাতে কি পেরেছিলাম। রিঝি জড়িয়ে ধরে রাখতে চাইল, তার বাবাকে, শ্মশানযাত্রীরা এসে বললেন, আর দেরি করা ঠিক হবে না হে, এবার ওঠাও। জ্যান্ত জ্বলজ্বলে রিঝির বাবা থেকে হঠাৎই তিনি একটা 'ডেডবডি' হয়ে গেলেন। একটা ফোটো। ফোটোমাত্র। জীবন এরকমই...
স্তম্ভিত হয়ে গেলাম আমার মেয়ের কথা শুনে। সে বিএ পরীক্ষা দিতে পারে। কিন্তু আমার চোখে সে যে আমার সেই ছোট্ট সনুই। এই তো সেদিন জন্মাল সনু। মিতুর সেকেন্ড সিজারিয়ান বেবি। সেদিন!
অনুরাধাও যাবে নাকি? দিল্লি?
আমি শুধোলাম।
অনুরাধা খুব আদরের মেয়ে। ওকে বাড়ি থেকে ছাড়বেই না। ছোট মেয়ে। তা ছাড়া ও এ কারণে পরীক্ষাই দেয়নি জে এন উ্যর।
তুমিও তো আমার ছোট্ট মেয়ে। তুমি কি অনাদরের?
আমাকে তুমি বলো না, দূর হয়ে যা। রেগে গেলে?
বলিরে বলি। সে তো মুখেরই কথা। তুই চলে গেলে, আমিও থাকব না কলকাতাতে। চলে যাব কোথাও। বলে দিচ্ছি। দেখিস!
যাবে কোথায়?
যেদিকে দুচোখ যায়।
হ্যাঁ। তুমি দেখি শরৎবাবুর শ্রীকান্তর মতো ডায়লগ দিচ্ছ।
তুই পড়েছিস নাকি শরৎবাবুর শ্রীকান্ত?
না। আমি পড়িনি। দিদির সব পড়া। দারুণ তাড়াতাড়ি পড়তে পারে দিদি। বড় ব্যারিস্টারের মতো। অনুরাধা চক্রবর্তী পড়েছে আমাদের ক্লাসের। ওই বলত—, প্রেসিডেন্সির ছেলেদের, এই, শ্রীকান্তর ডায়লগ ঝাড়িস না তো!
কবে জানত পারবে রেজাল্ট? জে এন উ্যর?
এনি মোমেন্ট।
ঠিক সেই সময়েই ফোনটা বাজল।
আমিই তুললাম। গলাটা খুবই চেনা লাগল। সনুর কোনও অবাঙালি বন্ধু।
ইয়েস। প্লিজ স্পিক হিয়ার।
আমি বললাম।
হো-য়া-ট! আই ডোন্ট বিলিভ ইট। হি-ই-ই-ই।
বলেই, লাফাতে লাফাতে ডান হাতে রিসিভার ধরে বাঁ হাত উপরে তুলে, যেমন করে ম্যাচ জিতে স্টেফি গ্রাফ হাত তোলে, বলল, পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি। বা-ব্বা-বা-আ। আই কান্ট বিলিভ ইট!
আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পরে বলল, থ্যাঙ্কস আ মিলিয়ান গীতাঞ্জলি। বাই।
কোন গীতাঞ্জলি?
আমি চোরের মতো বললাম।
হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে বইমেলাতে দেখা হয়েছিল না? সেই।
তারপরেই আমার মনে পড়ল গীতাঞ্জলিকে। গীতাঞ্জলি চতুর্বেদী। ওর বাবা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের সেক্রেটারি। ওর বাবার এক বন্ধু দিল্লিতে ফল জেনে ওঁকে তক্ষুনি ফোন করে খবর দিয়েছেন। গীতাঞ্জলিও যাচ্ছে দিল্লিতে।
সনু বলল, মা যে কী রেকডিং করছে এতক্ষণ আকাশবাণীতে! ও, না। রেকডিং করে ত্যে ন্যু-মার্কেট হয়ে আসবে বাজার টাজার করে। মা শুনলেই খুব লাফাবে।
হ্যাঁ। আমি বললাম।
বলেই, একটা বড় জিন ঢাললাম।
বললাম, সনু, তুই কি সত্যিই যাবি নাকি?
বাবা। উ্য রিয়্যালি আর আ...। যাব না?
আমি চুপ করে গেলাম। বুকের মধ্যেটা ফাঁকা হয়ে গেল।
ও বলল, ভালো কথা। তুমি ভারতী রায়কে চেনো?
কে ভারতী রায়?
ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির প্রাো-ভাইস-চ্যান্সেলার।
চিনি মানে, দুবার দুজায়গাতে দেখা হয়েছিল। অত্যন্ত সুন্দরী মহিলা। অত্যন্তই খোলামেলা, সপ্রতিভ। এবং বিন্দুমাত্র এয়ার নেই। কথা বলেন চমৎকার। আ গ্রেট লেডি। কিন্তু কেন!
এখন নিয়ম করেছে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, শুনেছি, উনি আসার পরই যে রেজাল্ট যবেই বেরোক, যে সব ছেলেমেয়ে বাইরের কোনও ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে তাদের রেজাল্ট পাবলিকলি বেরোবার আগেই কনফিডেনশিয়ালি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে রেজাল্টের জন্যে তাদের ভরতি হওয়া আটকে না থাকে। শুনেছি বাবা। তুমি প্লিজ একটু ফোন করো না। গীতাঞ্জলি ফোন নাম্বার দিয়েছে ওঁর।
তুই ডায়াল কর।
বলেই, জিনটা এক গল্পএ গিলে ফেললাম।
সনুকে বললাম, সনু আমি আজকে দশতলা থেকে নীচে ঝাঁপ দেব।
কেন?
আমার সনু আরও উন্নতি করবে বলে তার একটা মাত্র বাবাকে একা ফেলে দিল্লি চলে যাবে। আর বেঁচে থেকে আমি কী করব! উন্নতি করার কি অন্য কোনও উপায় ছিল না।
সত্যি। তুমি না। দাঁড়াও ডায়াল করি। ডায়াল করে ভারতী রায়কে চেয়েই বলল, নাও। নাও। শিগগির নাও। কথা বলো। প্রাো-ভাইস চ্যান্সেলার বলে কথা। আমার ভয় করছে।
আমি বুদ্ধদেব গুহ বলছি। নমস্কার। চিনতে পারছেন?
বাবা:। বুদ্ধদেব গুহকে না চিনলে চলবে?
ওঁকে সমস্যার কথাটা বলতেই উনি বললেন, নো প্রবলেম। দুশো টাকা জমা দিয়ে অ্যাপ্লিকেশান করে দিতে বলুন। কনফিডেনশিয়ালি রেজাল্ট আগেই পাঠিয়ে দেব। আমি আসার পর থেকে, অন্য জায়গাতে সুযোগ পেয়েও ফল দেরিতে বেরোবে বলে, ছেলেমেয়েরা ভরতি হতে পারবে না, এমনটি আর হতে দিচ্ছি না।
বললাম, আপনি শুধু সুন্দরীই নন। সুদক্ষ সহ-উপাচার্যও বটে। অশেষ ধন্যবাদ।
সৌন্দর্য এবং দক্ষতার সহাবস্থান কি দোষের?
হেসে বললেন উনি।
আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ।
বলেই, রিসিভারটা নামিয়ে রেখে বললাম, সনু। যা: তোর কাজ হয়ে গেল। চমৎকার মহিলা। কোনও ফর্ম আছে কিনা খোঁজ নিয়ে সেই ফর্মে টাকা জমা দিয়ে দে। কিন্তু...। কিন্তু কী করে থাকবি একা একা? মা-বাবা কাকা-কাকিমারা মামা-মামিমারা, মাসি, দিদি সকলকে ছেড়ে...
ফ্ল্যাটে আসার পরে তো অনেক বছর একা থাকা অভ্যেসই হয়ে গেছে বাবা। আর অন্যরা কেই বা কতটুকু খবর রাখে আমরা বেঁচে আছি কি মরে গেছি। তুমি বা কতক্ষণ বাড়ি থাকো? বা কলকাতাতেই? দিদি ও মাও তো তাইই! সবই অভ্যেস হয়ে যাবে বাবা। কিছু ভেব না। বিদেশে যাচ্ছে কত ছেলে মেয়ে। তাদের বাবারা কি কাঁদতে বসছে পা ছড়িয়ে? তুমি ভীষণই ব্যাক-ডেটেড বাবা।
ভাবছিলাম আমি। বিদেশে যে কেন যায় ছেলেমেয়েরা। সকলেই কি খুব কিছু একটা হয়ে ফেরে? অনেকে তো ফেরেই না। বিদেশে গেলেই কি লেজ গজায়? গজার ছেলে ধ্বজাকে বিএ পড়তে পাঠিয়েছিল গজা ইংল্যান্ডে । মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করে। দুনম্বরি বড়লোক। টাকার অভাব কী? ট্যাক্স দিতে হয় না। ইন্ডিয়াতে নাকি বি. এ-টাও ভালোভাবে পড়া যায় না। কী পড়ে এসেছে জানি না। তবে ফিরে এসেছে ধ্বজা। একটা ট্রাউজার পরে এসেছে। তার একটা পা নীল আর অন্যটা লাল। পেছনেও হয়তো অন্য রং ছিল, লক্ষ করিনি সেদিন। পরে একদিন লক্ষ করে দেখতে হবে।
গজা বলল, দ্যাখ দ্যাখ, আমার বিলেত-ফেরত ছেলেকে দ্যাখ।
গজাদের মাছের ভেড়ি আছে। টাকার অভাব নেই। এখন একটু 'কালচার'-এর দরকার। 'জাতে' ওঠার জন্যে।
সনু কালই সকালে চলে যাবে। দিল্লিতে।
তার মা, তার দিদি এবং সে, গত তিন সপ্তাহ ধরে বিয়ের তত্ব সাজিয়েছে। খাওয়া নেই, দাওয়া নেই; চান নেই। মাথার চুল সব খাড়া। জামা-কাপড়, বই পত্র, কাগজ-খাতা, কলম-কালি, এখানের সকলের ঠিকানা, দিল্লির সকলের ঠিকানা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের। ফোন-নম্বরের লিস্ট।
গত প্রায় সাতদিন রাতে সনু বাড়িতে খায়নি। স্কুলের বন্ধু এবং কলেজের বন্ধুরা বাড়িতে নেমন্তন্ন করে আলাদা করে ওকে খাইয়েছে। বন্ধুরা তো বটেই, বন্ধুর মায়েরাও খুবই ভালোবাসেন ওকে।
বন্ধুদের সকলকেও ও একদিন খাইয়ে দিয়েছে।
পরশু ডেকে বলেছিলাম, মায়ের মনটা খারাপ, আর তুমি রোজই বাইরে খাচ্ছ? বাড়িতে একটু থাকলে কী হয়?
আজকালকার ছেলেমেয়েরা সকলেই বাইরে বড়ই রুক্ষ-স্বভাবের। ক্যাট ক্যাট করে কথা বলে। পৃথিবী বদলে গেছে, তাই তাদের আবরণকেও পুরু করতে হয়েছে বোধহয়। অন্ত:সলিলা ফল্গুর মতো ওদের গতি। বাইরে থেকে ওদের হৃদয়ের নম্রতা বোঝা যায় না। অনেকখানি খোঁড়াখুড়ি করতে হয়।
সনু বলল, তা কী করব। বন্ধুরা আমাকে যদি নেমন্তন্ন করে তো কি 'না' বলব!
আমার কাছেও তো আসতে পারো একটু।
কী হবে এসে। তুমি তো সবসময়েই কাজ করো। তোমাকে ডিসটার্ব করি না। আমারও এখন এত কাজ। সংসার উঠিয়ে নিয়ে হস্টেলে থাকব তো। বোঝো না কেন বাবা!
পাকা গিন্নির মতো বলল সনু!
বুঝি রে! বুঝি বলেই তো...
বালিগঞ্জ পার্ক-এর চক্রবর্তীদের বাড়িতে কার যেন বিয়ে। লীলাদিদের (মজুমদার) বাড়ির কাছেই। অথবা বৌভাত । অথবা বিয়ের পাঁচিশ কি পঞ্চাশ বছর হবে।
আমার মনটা ভারী খারাপ। অফিস যাইনি আজ। বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকেই ফিসফিস করে। আমি ওঁদের চিনি না। ওঁরাও আমাকে চেনেন না, কিন্তু ওঁদের বাড়ির দুগগোপুজো বা বিয়ে সবই আমাদের বহুতল বস্তি থেকে চোখে পড়ে। না চিনেই বলতে পারি ওঁরা কলকাতার বাঙালি পরিবারদের মধ্যে Last of the Mohicans! গর্বিত হই।
চক্রবর্তী বাড়িতে সানাই বাজছে। এতদূর থেকে বৃষ্টি ফিসফিসানির মধ্যে রাগটা যে কী তা বোঝা যাচ্ছে না। সম্ভবত বিভাস। যোগিয়াও হতে পারে। তখন সকালের সানাই বাজাছিল।
দেখতে দেখতে সন্ধে নেমে এল। বৃষ্টি থেমে গেছে। সানাই-এর শব্দ জোর হয়েছে।
সনু চিংড়িমাছ খেতে খুব ভালোবাসে। গড়িয়াহাটে গৌর সাহার দোকান থেকে আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসব বলেছিলাম, মাছ। কিন্তু মিতু বলল, যাওয়ার আগের দিন যদি পেট আপসেট করে? মাগুর মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাক।
এ বাড়িতে আমার কোনও মতই খাটে না। অতএব।...
আমি এখন আমার লেখার টেবলের সামনে বসে আছি বাইরে চেয়ে। ঘর অন্ধকার করে। দিনের বেলাতে যে বড় কদমগাছ আর জোড়া অমলতাস দুটি চোখে পড়ে বালিগঞ্জ পার্ক-এর পথের মোড়ে, তাদের দেখা যাচ্ছে কিন্তু অন্ধকারে তাদের রূপ বোঝা যাচ্ছে না। অন্ধকারের মধ্যে অন্ধকারতর দেখাচ্ছে তাদের। ঝুপড়ি-ঝুপড়ি। আজ রাতের আমার সব ভাবনারই মতো।
রাতের সানাইয়ের রাগের চেহারাটা স্পষ্ট হয়েছে এখন—হংসধ্বনি। হংসধ্বনি বাজছে।
প্রায় বছর পঁয়ত্রিশ আগে রবিশংঙ্করের একটি ডিস্কে ওই হংসধ্বনি প্রথম শুনি। গান-বাজনার কতটুকুই বা বুঝি।
ভালোবাসি, এইটুকুই।
সানাইয়ের সুরে শিশুকাল থেকে শুধু আনন্দই পেয়ে এসেছি। সানাইয়ের সুর যে এত ব্যথাবাহীও তা আগে কখনই হৃদয়ঙ্গম করিনি। কত শত বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে সানাইওয়ালার সামনেই বসে থেকেছি। খাদ্যের চেয়েও গানবাজনা আমার কাছে চিরদিনই বেশি প্রিয়। নির্গুণ হলেও মুগ্ধ হয়ে বাজনা শুনেছি। কিন্তু সেই সুর বিদায়ী কন্যার হাস্যমুখী বাবা-মায়ের হৃদয়ের গভীরে যে কত অন্যরকম ক্ষতের ব্যথাবাহী বিধুর ভাবের উদ্রেক করে, তার বিন্দুমাত্র খোঁজও রাখিনি এত বছর।
সন্ধের সময়ে সনুর একমাত্র মাসি এল। অনেক খাবার-দাবার নিয়ে। হজমি, দইবড়া, আচার, চুরমুর বিস্কিটের প্যাকেট, জীবনে প্রথমবার বাইরে পড়তে-যাওয়া এবং প্রবাসী হয়ে-যাওয়া বোনঝির জন্যে সব গুছিয়ে নিয়ে। আরও অনেকে এলেন। অনেকে ফোনও করলেন।
রাত দশটা বাজতে চলল। আমি বললাম, এবারে শুয়ে পড়ো সনু। ভোর সাতটাতে ফ্লাইট। পাঁচটাতে বেরোতে হবে।
তারপর বললাম, আমার কাছে একটু শোবে না আজ?
সনু বলল, বাবা। কত্ব কাজ যে এখনও বাকি তোমাকে কী বলব।
আমি কিছুই আর বললাম না। অধিকার বলে তো কিছুমাত্রই নেই আমার মেয়ের উপরে। মেয়েকে চোখের দেখা দেখতে পাওয়াও অনেকখানি আমার কাছে। বাবার তেমন কোনও ভূমিকাও নেই আমার মেয়েদের জীবনে। এবং এই সংসারেও।
মৌ, সনুর দিদি সঙ্গে যাবে। ন বছরের বড় দিদি, প্রায় গার্জেনেরই মতো। একজন মক্কেলকে বলে দিয়েছিলাম, দিল্লি এয়ারপোর্টেই একটি গাড়ি পাঠাবেন। ওরা যতদিন থাকবে, গাড়িটা থাকবে ওদের সঙ্গে। দিল্লিতে এখন ভারী পচা গরম। তাই এ.সি. গাড়িই পাঠাতে বলেছি।
আমি বললাম, এয়ারপোর্টে কি আমি যাব?
সনু বলল, একদম না। তুমি গিয়েই দশজনের সামনে যাত্রা করবে। জানো বাবা, শো অফ এমোশানস কিন্তু শিক্ষার লক্ষণ নয়। আনন্দেও কাঁদতে নেই; শোকেও নয়।
আমি বললাম, কারেক্ট। তোরা আমার মৃত্যুতেও কাঁদিস না।
সত্যিই। কান্নাকাটি, চোখের জল, এসব অশিক্ষারই লক্ষণ। কোনও সন্দেহ নেই। এসব গ্রাম্যতাও। এ কথা আমিও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি যে এখন গ্রাম্যই রয়ে গেছি রে মা। গ্রামের ছেলে তো একপুরুষে শহুরে হতে পারে না।
আমার ঘুম আসছিল না। রাত আড়াইটা অবধি লিখলাম। পুজোর লেখার সময় এখন। যদিও খুবই কম লিখি, তবুও চাপ পড়েই। তারপরেও যখন ঘুম এল না তখন একটা অ্যালজোলাম খেলাম।
হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল। আচমকা, দরজা খুলে ঘরের মধ্যে দুড়দাড় করে ঢুকে সনু বলল, শোনো বাবা। আমরা এবারে যাব। তুমি কি চা খাবে?
আরে! আমাকে আগে কেউ উঠিয়ে দেয়নি কেন? বাড়িসুদ্ধ মানুষ উঠে তৈরি হয়ে যেতে পারল আর...পঞ্চানন তোরা ভেবেছিস কী? পাঁচটা হয়ে গেছে। এখন তৈরি হব কী করে? সাতটাতে যে প্লেন ছেড়ে যাবে।
তুমি থাকো বাবা, মৌ বলল। তোমার শরীর ভালো নেই। চোখে হেমারেজ হয়েছে। তাই নিয়ে কাজ করছ। তাড়াহুড়ো করতে হবে না। চা খাও। এসো, বাইরে এসে বোসে।
মিতুর ঘরে ওরা ফাইনাল-টাচ দিচ্ছিল। ড্রাইভার, রাতে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারেই ছিল। সে গাড়ি বের করেছে। সনুর বড় ট্রাঙ্কও তাতে উঠে গেছে। এখন ওভার-নাইটার দুটি নিয়ে, দুই বোনে নামবে। মিতুও তৈরি হয়ে গেছে।
সনু তৈরি হয়েই ঘর থেকে বাইরে এল। আমি বসবার ঘরের সোফাতে বসে চা খাচ্ছিলাম। আমার মন ভারী খারাপ। সনুকে দেখে, আমি সোফা ছেড়ে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে উঠলাম।
ডাকলাম, সনু।
আমি ডাকলাম না। বুকের মধ্যে থেকে অন্য কেউ যেন আর্তনাদ করে উঠল।
আমার আধুনিক, কঠিন হৃদয়ের ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট সনু হঠাৎই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে দৌড়ে আমার বুকে এসে আছড়ে পড়ল। আমিও অশিক্ষিত গ্রাম্য মানুষের মতো কেঁদে উঠলাম।
পরমুহূর্তেই ওকে আদর করে বললাম, কাঁদে না। কাঁদে না মা! জীবনে বড় হতে যাচ্ছ, মানুষ হতে যাচ্ছ; কাঁদে না সোনা।
তারপরেই লিফট-এ করে সকলে নেমে নীচে এলাম।
গাড়িতে সনু, তার মা আর তার দিদির মধ্যিখানে বসেছিল।
গাড়ি ছেড়ে দেবার আগে, গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি আবার ডাকলাম, সনু।
সনু হাতটা বাড়িয়ে দিল। ওর পুরো হাতের পাতায় নয়, ওর চারিটি আঙুলের সঙ্গে আমার আঙুলের একবার ছোঁয়া লাগল।
কী যেন বলতে গেলাম আমি বলতে পারলাম না। আমার আত্মজার পরশ পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই কান্নাতে এই গ্রাম্য, অশিক্ষিত মানুষটার গলা বুজে এল।
মিতু বলল, এবারে যেতে হবে।
গাড়িটা ছেড়ে দিল।
যতক্ষণ দেখা যায়, ততক্ষণ হাত নাড়লাম সনুকে। দশতলাতে উঠতে উঠতে লিফটম্যান রতনকে বললাম, ছোট দিদি চলে গেল রে রতন। দিল্লিতে। বড় হবে বলে।
কবে আসবেন আবার?
সেই ডিসেম্বরে।
ডিসেম্বর তো অনেকই দেরি।
আমি মাথা নাড়ালাম।
আমার চোখের জল দেখে লিফটম্যান রতন নিজেই অস্বস্তি বোধ করে চোখ নামিয়ে নিল।
আমি ভাবছিলাম, মানুষ হয়তো একদিন চাঁদেই বাস করবে। সুপার-কম্পুটার নির্ধারণ করবে আমাদের নিত্যকার জীবনযাত্রা। কিন্তু পিতা-পুত্রীর সম্পর্কের ওপরে কোনও যন্ত্র, কোনও দেবতা, কোনও দাবি কখনও প্রভাব ফেলতে পারবে না। আমার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কোটি কোটি বাবার আদরের সনুরা, তাঁদের কাছে সনুই থাকবে। বড় আদরের ধনু। কুসুমরতন।
বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। গাড়ির চাকা-চারটেতে হাওয়া বেশি নিয়েছিল নিরঞ্জন গতকাল। এয়ারপোর্টের রাস্তাতে গাড়ি স্কিড না করে। আমার চিন্তা হচ্ছিল।
ফ্ল্যাটে ঢুকে আমি আমার ঘরে গিয়ে শুলাম।
সেই সকালে চক্রবর্তীদের বাড়িতে সানাই থেমে গেছে। একটু পরেই ম্যারাপ খোলা শুরু হবে। নগ্ন বাঁশগুলো, কোনওরকম সিমোট্রিহীন বাঁশগুলো, দিগ্বিদিকে দাঁত উচিয়ে জেগে থাকবে। শয়ে-শয়ে বাঁশ।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বা, ঘোরে ছিলাম। কর্ডলেস ফোনটা হাতের কাছেই ছিল। হঠাৎ বাজতেই উঠিয়ে নিলাম।
মৌ! কী রে? মৌ!
বাবা, চিন্তা কোরো না। চেক-ইন করে নিয়েছি। সনুর সঙ্গে কথা বল।
সনু স্বাভাবিক, সপ্রতিভ গলাতে বলল শোনো বাবা! চেক-ইন করে নিয়েছি। ভাল থাকবে। ওই সব খারাপ জিনিস কম খাবে।
বললাম, প্রতি সপ্তাহে ফোন কোরো আমাকে। রিলিজয়াসলি। বুঝেছ। মাকেও চিঠি লিখবে। ফোন করা ছাড়াও।
ও বলল, হুঁ।
তারপর বলল, তোমার পাঠক-পাঠিকাদেরই মতো আমাকেও চিঠি লিখো। লিখবে তো? যদিও আমি তোমার কোনও বইই পড়িনি। এমনকী যে বই তুমি আমাকে উৎসর্গ করেছ, সেই বইও।
বাক্যটি শেষ করেই সনু স্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি কল্পনা করে খুব আনন্দ পেলাম যে, 'সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত' করতে সনু তার অপদার্থ বাবার জন্যে হয়তো এক ফোঁটা চোখের জল ফেলছে। নীরবে। হয়তো।
বলতে গেলাম হ্যাঁ। কিন্তু হয়ে গেল ভ্যাঁ।
ছাড়ছি বাবা।
বুদ্ধিমতী সনু বলল তাড়াতাড়ি, আমার স্বরের বৈকল্য বুঝেই।
আমি রেসপনসিবল বাবা হয়ে গিয়ে বললাম, লুক আফটার ইওরসেল্ফ। বি সাকসেসফুল ইন লাইফ সনু। বি ব্রেভ।
বলেই, সুইচ—অফফ করে দিলাম কর্ডলেসটার। ভাবছিলাম আমরা যখন সনুদের বয়সি ছিলাম তখন আমরা কথাটাকে জানতাম Battle Of Life বলেই। কিন্তু আজকে ওদের জীবন তো শুধু একটি মাত্র Battle-এর নয়। অগণ্য Battle-এর সমষ্টি। অনেকই লড়াই ওদের লড়তে হবে। আজীবন। War Of Life-এ জয়ী হতে হবে।
আমাদের মতো অশিক্ষিত, এমোশানাল; গ্রাম্য মানুষের দিন শেষ হয়ে গেছে।
বড় কষ্টের হবে ওদের বেঁচে থাকাটা, বড়ই সংগ্রামের ।
বেচারি সনু।
আমার সনু।
আমাদের প্রজন্মের বাবা-মায়েদের লক্ষ লক্ষ সনুরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন