রাজা যায় রাজা আসে

সমরেশ মজুমদার

ভোরবেলা পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে পা নাচাচ্ছিল রাজেক। পরনে সবুজ জমির ওপর হলুদ হলুদ রেখকাটা লুঙ্গি আর জালি গেঞ্জি। এই সাতসকালেই চুলে কাকুই পড়েছে; মাথায় পেখম তুলে টেরি কেটে নিয়েছে সে। তার বুকে এখন সুখের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আজই শুধু? ক'মাস ধরেই সুখের নদীতে বান ডেকে আছে তার।

পুবের ঘর বাদ দিলে উত্তর এবং পশ্চিমের ভিটের বড়-বড় পঁচিশের বন্দের দুখনা ঘর। সেগুলোর মাথায় ঢেউটিনের নক্সা-করা চাল; গায়ে শালকাঠের খিলান দেওয়া দেয়াল, বিলিতি মাটির পাকা মেজে।

রাজেক যেখানে বসে আছে, তার তলা থেকে ঢালা উঠোন। উঠোনটার একধারে সারি সারি ধানের ডোল, আরেক ধারে শিউলি গাছ। উঠোনের পর খানিকটা নামাল জমি; পিঠক্ষীরা আর সোনালের ঝোপে জায়গাটা ছেয়ে আছে। তারপর পুকুর। পুকুর পেরিয়ে ধানের খেত। বর্ষায় পুকুর এবং ধানখেত ভেসে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এখনও তেমনটিই রয়েছে, দুয়ের মাঝখানে সীমারেখা নেই কোথাও।

এতগুলো বড় বড় টিনের ঘর, প্রকাণ্ড উঠোন, পুকুর, পুকুরের পর একলপ্তে নব্বুই কানি দো-ফসলা জমি-সমস্ত মিলিয়ে রাজা-বাদশার ঐশ্বর্য। আর এ সবই এখন রাজেকের। অথচ আট মাস আগে? আট মাস আগের কথা এখন নয়।

আশ্বিন মাস যায় যায়। সারা বর্ষায় জলে ধুয়ে ভাদ্রের গোড়ায় আকাশ সেই যে আশ্চর্য রকমের নীল হয়ে গিয়েছিল, এখনও তা-ই আছে। তার গায়ে থোকা থোকা ভবঘুরে মেঘ। উঠোনের শিউলি গাছটা ফুলে ফুলে সেজে রয়েছে। সেই কবে থেকে, শরৎ আসবার আগেই বুঝি, সারা গায়ে ফুল ফোটাতে শুরু করেছিল গাছটা, এখনও ফুটিয়েই যাচ্ছে।

দেখতে-দেখতে সূর্য উঠে গেল। গলানো সোনার মতো রোদের ঢল নামল চারদিকে। কোত্থেকে দুটো মোহনচূড়া পাখি উত্তরের ঘরের চালে উড়ে এসে ঠোঁটে ঠোঁট ঘষে খুনসুটি জুড়ে দিল। সামনে-পেছনে, পুবে-পশ্চিমে—যেদিকেই চোখ ফেরানো যায়, শরৎকাল যেন জাদুকরের বেশে দাঁড়িয়ে।

পা নাচাতে-নাচাতে অন্যমনস্কের মতো ধানখেতের দিকে তাকিয়ে ছিল রাজেক। ক'মাস ধরে রোজ সকালবেলা এমনিভাবে পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে অলস চোখে তাকিয়ে থাকছে সে। এটা যেন বিলাসের মতো, কিংবা তার মনেরই কোনও প্রিয় খেলা।

দূরে, অনেক দূরে ধানখেত চিরে চিরে একটা নৌকো আসছিল। নৌকোটা ঠিক দেখা যাচ্ছিল না। ধানবনের ওপর গোল ছই, একটা কালো কুচকুচে মাঝি আর উঁচু লগির ওঠানামা চোখে পড়ছিল।

রোজ সকালে কত নৌকোই তো ধানখেত ভেঙে কত দিকে চলে যায়। ওই নৌকোটা কোথায় কোনদিকে চলেছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই রাজেকের। চারধারে আশ্বিনের নরম রোদের ছড়াছড়ি, মোহনচূড়া পাখি দুটোর নাচানাচি কিংবা আকাশের ভাসমান মেঘ—কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না সে। রাজেক ভাবছিল—নিজের কথা, নিজের তিরিশ বছরের একটানা দীর্ঘ জীবনটার কথা।

হায় রে, কী জীবন ছিল তার। আজ এই জালি গেঞ্জিটি গায়ে দিয়ে মাথায় শৌখিন টেরিটি কেটে, সুখের নদীতে গা ভাসিয়ে রাজেক পা নাচাচ্ছে, আট মাস আগে তা ছিল অসম্ভব। দেশখানা যদি দু-ভাগ না হত, বৈকুণ্ঠ সাহারা যদি এই ছিপতিপুর গ্রাম ছেড়ে চলে না যেত, এত সুখ কপালে ছিল না।

ভাবনাটা পুরো হল না। তার আগেই কি আশ্চর্য, ধানখেতের সেই নৌকোটা পুকুর পাড়ি দিয়ে ঘাটে এসে ভিড়ল।

ভুরু কুঁচকে খাড়া হয়ে বসল রাজেক। ভেবেই পেল না, সকালবেলায় তার কাছে কে আসতে পারে। সে জন্য অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। একটু পরে নৌকো থেকে যে নামল সে আর কেউ না, স্বয়ং তোরাব আলী—ছিপতিপুর গ্রামের সব চাইতে বড় ধনী গৃহস্থ।

দুশো কানি তেফসলা জমি তোরাব আলীর, হাল-হালুটি অগুনতি, গরু আর বলদ পঞ্চাশ-ষাটটা, নৌকো গোটা চল্লিশেক। পঁচিশ-তিরিশটা কামলা বারো মাসই খাটছে। ধান-পাট-মুগ-মুসুর সব মিলিয়ে এলাহী কাণ্ড। মাস আষ্টেক আগেও তার বাড়ি কামলা খেটেছে রাজেক। এই ছিপতিপুর গ্রামের সে মাথা; সব চাইতে গণ্যমান্য ব্যক্তি।

বড় গৃহস্থই শুধু না, তোরাব আলী মানুষটি ভারি শৌখিনও। এই সকাল-বেলাতেই পরিপাটি সাজসজ্জা করে বেরিয়েছে। পরনে সিল্কের লুঙ্গি, কলিদার পাঞ্জাবি, পায়ে কাঁচা চামড়ার নাগরা, চুলে-দাড়িতে কলপ। রাজেক জানে, কাছে গেলে তার চোখে সুর্মার টান দেখতে পাবে, আতরের ভুরভুরে গন্ধ নাকে এসে লাগবে।

তোরাব আলী কি তার কাছেই এসেছে? প্রথমটা বুঝতে পারল না রাজেক। তোরাব আলীর মতো মানুষ তার কাছে আসতে পারে, এর চাইতে বিস্ময়কর ঘটনা জগতে আর বোধহয় কিছু নেই। বিমূঢ়ের মতো কিছুক্ষণ একভাবে বসে থেকে হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে পড়ল রাজেক; তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে-ছুটতে পুকুরঘাটে চলে এল। হাত কচলাতে কচলাতে খুব সম্ভ্রমের গলায় বলল, 'আপনে!'

দু-হাতে দাড়ি তোয়াজ করতে-করতে সামান্য হাসল তোরাব আলী। বলল, 'হ, আমিই তর কাছে আইলাম—'

হায় আল্লা! শুনেও যেন বিশ্বাস করতে পারল না রাজেক। প্রতিধ্বনির মতো করে বলল, 'আমার কাছে!'

'হ—হ, তরই কাছে।'

কী উত্তর দেবে, রাজেক ভেবে পেল না।

খুব তরল গলায় তোরাব আলী এবার বলল, পুকের (পুকুর) ঘাটেই খাড়া করাইয়া রাখবি নিকি? ঘরে নিয়া যাবি না?'

সুরটা অন্তরঙ্গ। সেই ছোটকাল থেকে তোরাব আলীকে দেখছে রাজেক; এভাবে তাকে কথা বলতে আগে আর কখনও শোনেনি।

যাই হোক, রাজেক খুব লজ্জা পেয়ে গেল। ব্যস্তভাবে বলল, 'আসেন-আসেন—'

বাড়ি এনে তোরাব আলীকে কোথায় বসাবে, কীভাবে আপ্যায়ন করবে, ঠিক করে উঠতে পারল না রাজেক। প্রথমে ছুটে গিয়ে একটা পাটি এনে দাওয়ায় বিছিয়ে দিল। কিন্তু নিজের কাছেই তা মন:পূত হল না। তক্ষুনি সেটা গুটিয়ে একটা জলচৌকি নিয়ে এল।

তোরাব আলী কিন্তু বসল না। তার সমাদরের জন্য রাজেকের ছোটাছুটি ব্যস্ততা দেখে সে খুব সন্তুষ্ট। প্রসন্ন গলায় বলল, 'আমার লেইগা অস্থির হইস না রাজেক। বসুম পরে। আগে তর ঘরদুয়ার দেখা—'

চমকে সংশয়ের চোখে তোরাব আলীকে একবার দেখে নিল রাজেক। তার বাড়িঘর দেখার জন্যই কি সক্কালবেলা ছুটে এসেছে লোকটা? তোরাব আলীর মনে কী আছে, কে জানে!

রাজেকের মুখচোখের সন্দিগ্ধ চেহারা দেখে কিছু একটা আন্দাজ করে নিল তোরাব আলী। মৃদু কৌতুকের সুরে বলল, 'ডর নাই, তর বাড়িঘর আমি কাইড়া নিমু না। তর জিনিস তরই থাকব।'

মুখ ফুটে তোরাব আলী একবার যখন দেখতে চেয়েছে তখন আর 'না' বলা যাবে না। মনের ভেতর স্তূপাকার সন্দেহ নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাল রাজেক।

খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত দেখে জলচৌকির ওপর জাঁকিয়ে বসল তোরাব আলী। বলল, 'তামুক আছে রে?'

খেয়াল করে তামাক-টামাক নিজেরই দেওয়া উচিত ছিল। রাজেক দিতও। কিন্তু সন্দেহে মনটা হঠাৎ মেঘলা হয়ে যাওয়ায় ভুলে গিয়েছিল।

যাই হাক, ছুটে গিয়ে তামাক সেজে নিয়ে এল রাজেক। আয়েশ করে হুঁকো টানতে-টানতে তোরাব আলী বলল, 'বৈকুণ্ঠ সা বাড়িঘর তরে দেখাশুনা করতে দিয়া গেছে, না?'

লোকটার উদ্দেশ্য ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। প্রায় দম বন্ধ করে রাজেক উত্তর দিল, 'হ'।

সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে তোরাব আলী বলল, 'ঐ পুকৈরও তো বৈকুণ্ঠ সা'র?'

'হ।'

'পুকৈরের ওই পারের জমিন?'

'হেয়াও (তাও) সা' কত্তার।'

'কত জমিন আছে?'

'নব্বই কানি।'

'হগলই (সবই) অখন তর হ্যাফাজতে (হেপাজতে)?'

আবছা গলায় রাজেক বলল, 'হ।'

একটু নীরবতা। দ্রুত বারকতক হুঁকো টেনে গল গল করে ধোঁয়া ছাড়ল তোরাব আলী। তারপর বলল, 'বৈকুণ্ঠ সা'রা আট মাস আগে গেরাম ছাইড়া গেছে না?'

লোকটা দেখা যাচ্ছে, অনেক খবর রাখে। আগের সুরেই রাজেক বলল, 'হ।'

'কই গেছে জানস?'

'শুনছিলাম কইলকাতার দিকে যাইব।'

'খোঁজখপর কিছু পাইছস?'

'না।'

'এইর ভিতরে তরে চিঠিপত্তর দিছে?'

'না।'

'একটু চুপ করে থেকে কপাল কুঁচকে কি ভাবল তোরাব আলী। তারপর বলল, 'তর কী মনে হয়?'

প্রশ্নটা বুঝতে পারল না রাজেক। জিগ্যেস করল, 'কোন ব্যাপারে?'

'বৈকুণ্ঠ সা'রা আর ফিরব?'

'কেমনে কমু?'

রাজেকের কথা যেন শুনতে পেল না তোরাব আলী। অনেকটা আপন মনেই বলে উঠল, 'আমার মনে লয় অরা (ওরা) ফিরব না।'

রাজেক উত্তর দিল না।

তোরাব আলী আবার বলল, 'বৈকুণ্ঠ সা'রা না ফিরলে তার জমিন, বাড়িঘর পুকৈর—সগল তর হইয়া যাইব। হইয়া যাইব কি, হইয়া গেছেই।'

রাজেক এবারও চুপ।

বৈকুণ্ঠ সাহা এবং তার বিপুল সম্পত্তি সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরো কিছুক্ষণ খবর-টবর নিল তোরাব আলী। তারপর হঠাৎ বলে উঠল, 'এইবার কামের কথাখান সাইরা লই।'

দম বন্ধ করেই ছিল রাজেক। আবছা গলায় বলল, 'কী কাম?'

'আমার ইচ্ছা, কাইল দুফারে (দুপুরে)আমাগো বাড়িত চাউরগা (চাট্টি) ডাইল-ভাত খাবি।'

সামনে বাজ পড়লেও এতখানি চমকাত না রাজেক। ছিপতিপুর গ্রামের সব চাইতে বড়, সব চাইতে সম্মানিত, সবচাইতে মর্যাদাসম্পন্ন গৃহস্থ—যার বাড়ি ক'দিন আগেও সে কামলা খেটেছে, সেই তোরাব আলী কিনা নিজে এসে তাকে নেমন্তন্ন করছে। কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল রাজেক, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল না।

এদিকে হাতের উপর ভর দিয়ে উঠে পড়েছে তোরাব আলি। বলল, 'তাহলে ওই কথাই রইল। কাইল দুফারে আসবি কইলাম।'

সজ্ঞানে না, অনেকটা ঘোরের মধ্যেই যেন ঘাড় কাত করল রাজেক।

তোরাব আলী বলল, 'আবার ভুইলা যাইস না। আমরা কিন্তুক তর লেইগা বইসা থাকুম।' বলে আর দাঁড়াল না। সামনের ঢালা উঠোন, তারপরের সোনাল আর পিঠক্ষীরা গাছের জঙ্গল পেরিয়ে পুকুরঘাটে চলে গেল। একটু পর তার নৌকো দূর ধানখেতের ভেতরে অদৃশ্য হল।

তোরাব আলী চলে যাবার পরেও অনেকক্ষণ একইভাবে বসে থাকল রাজেক। পুকুরঘাট পর্যন্ত যে তাকে এগিয়ে দিয়ে আসা উচিত ছিল, এই কথাটা রাজেকের একবারও মনে পড়েনি। আসলে এত বিস্মিত, এত স্তম্ভিত, এত বিহ্বল আগে আর কখনও হয়নি সে। এমন ভয়ও কখনও পায়নি।

তোরাব আলী তার কাছে এসেছিল, কাল দুপুরবেলা খাবার জন্য নেমন্তন্ন করে গেছে—সমস্ত ব্যাপারটাই যেন অবিশ্বাস্য। তোরাব আলীর মতো মানুষ তার কাছে আসতে পারে, শুধু আসাই না, এত খাতির করতে পারে—এমন ঘটনা ভাবাই যায় না। আজ না হয় বৈকুণ্ঠ সাহারা দেশ ছেড়ে যাবার পর একটু সুখের মুখ দেখেছে। নইলে আট মাস আগেও তার দিন যে কিভাবে চলত!

আশ্বিনের এই সকালে বিমূঢ়ের মতো পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ সময়ের উজান ঠেলে পেছন ফিরে গেল রাজেক।

হায় রে, কী জীবন ছিল রাজেকের! ছোটকালেই তো বাপ-মা খেয়ে বসেছে। তারপর থেকে দু গরাস ভাতের জন্য কুকুরছানার মতো ছিপতিপুরের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াত। কখনও যেত মৃধাদের বাড়ি, কখনও সর্দারদের কখনও বা খাঁয়েদের। তবে সব চাইতে বেশি যেত হিন্দু পাড়ায়। কোথাও কিছু জুটত, কোথাও আবার কিছুই না। খিদে ছাড়া সে সময় আর কোন অনুভূতি ছিল না; সর্বক্ষণ খিদেটা তার পায়ে পায়ে ফিরত।

একটু বড় হবার পর রাজেকের মনে হয়েছিল, অন্যের করুণার ওপর চিরকাল বাঁচা যায় না; আর তা সম্মানজনকও না। কাজেই খানিকটা টোন সুতো আর বঁড়শি যোগাড় করেছিল সে। লোকের বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে এনেছিল খানদুই মুলি বাঁশ। বাঁশ চিরে চিরে 'পোলো' এবং 'চাই' বানিয়েছিল আর বুনে নিয়েছিল একখানা 'ধর্মজাল'। তখন থেকে কঠিন জীবন-সংগ্রামের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছিল তার।

এ দেশে সারা বছরই জল। খাল শুকোয় তো বিল আছে, বিল শুকোয় তো গাঙ তার বুক ভরে রেখেছে। বঁড়শি নিয়ে, ধর্মজাল নিয়ে, পোলো নিয়ে খাল-বিল কি দু-মাইল দূরের বড় নদীতে চলে যেত রাজেক। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত একটানা পরিশ্রমের মূল্যস্বরূপ যে মাছ মিলত তাই নিয়ে সে ছুটত সুনামগঞ্জের হাটে। মাছ বেচে সন্ধের পর ছিপতিপুরের এক কোণে যে গরিব মুসলমান পল্লীটা আছে সেখানে চলে যেত। ওদের রান্নাবান্না হয়ে গেলে কারো উনুনে চাট্টি ফুটিয়ে নিত। তারপর খেয়েদেয়ে তাদেরই ঘরের দাওয়ায় টান হয়ে শুনে পড়ত।

সারাটা বছর জলে-জলেই কেটে যেত রাজেকের। ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলে লোকের বাড়ি কামলা খাটত। এর ধান কেটে দিত, ওর পাট 'তুলে' দিত। বেশির ভাগ সময় সে খাটত তোরাব আলীর কাছে। পৌষ মাঘ মাসে ধান উঠে গেলে মাঠে যে শস্যের দানাগুলো কৃষাণদের চোখ এড়িয়ে পড়ে থাকত সেগুলো খুঁটে খুঁটে তুলে আনত রাজেক, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান বের করত। কুড়নো ফসল থেকে এক-আধটা মাস ভালই কেটে যেত।

জলে-স্থলে সারা বছরই তার নিদারুণ জীবন-সংগ্রাম। ডাঙায় অবশ্য বেশিদিন থাকতে পেত না রাজেক। প্রায় বারো মাস জলে ভিজে ভিজে চামড়া ফেটে ফেটে গিয়েছিল; গা থেকে সর্বক্ষণ খই উড়ত। চুল-দাড়িতে জট পাকিয়ে গিয়েছিল; চোখ দুটো থাকত ঘোলাটে হয়ে। নখের কোণে পাঁক ঢুকে 'কুনি' হয়েছিল। হেজে হেজে আঙুলের ফাঁকে থকথকে ঘা। রাজেকের চোখের সামনে দিনরাতের একটাই মোটে রঙ তখন। তার নাম দু:খ, অসীম অন্তহীন দু:খ।

হায় রে, কী জীবন ছিল রাজেকের!

শীত-গ্রীষ্ম, শরৎ-হেমন্ত—ঋতুর চাকায় পাক খেয়ে খেয়ে তিরিশটা বছর কিভাবে কেটে গেছে, রাজেক জানে না।

একদিন সকালবেলা এক কোমর স্রোতে নেমে ধর্মজাল বাইতে-বাইতে হঠাৎ তার চোখে পড়েছিল, স্কুলবাড়ির সামনের বড় মাঠটায় কাতারে-কাতারে মানুষ গিয়ে জমা হয়েছে। চিত্রবিচিত্র পোশাক-পরা একদল লোক বিলিতি বাজনা বাজাল; কারা যেন গলার শির ফুলিয়ে-ফুলিয়ে, প্রচুর মাথা নেড়ে বক্তৃতা করল; সিল্কের নতুন পতাকা উঠল আকাশের দিকে।

সকালবেলা বর্ণশূন্য ধূসর চোখে স্কুলবাড়ির মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিল রাজেক। সন্ধের পর ওখানেই যখন বাজি পোড়াবার ধূম পড়ে গেল তখন আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে শুধিয়েছিল, 'এত রং-তামাশা ক্যান? বাজি ফুটানের হইল কী?'

ভিড়ের ভেতর থেকে কে একজন ধিক্কারের গলায় বলে উঠেছিল, 'আরে আহাম্মক, তুই আলি (এলি) কইথন (কোথা থেকে)? দেখি, দেখি তর চোপাখান (মুখখানা)।' পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভাল করে দেখে নিয়ে লোকটা এবার বলেছিল, 'তাই কই, আমাগো রাজেইকা ছাড়া এমুন কথা আর কার মুখ দিয়া বাইর হইব! জলে থাইকা থাইকা বুদ্ধিসুদ্ধি তর গেছে। কোনও খবরই রাখস না—'

'প্যাচাল না পাইড়া কী হইছে হেই কথাটা কও—'

লোকটা এবার বুঝিয়ে দিয়েছিল। সে একটা দিনের মতো দিন। সেদিন দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনই শুধু না, কোটি কোটি মানুষ যার স্বপ্ন দেখেছে, যার জন্য মৃত্যুপণে সংগ্রাম করেছে, সেই পাকিস্তানেরও প্রতিষ্ঠা সেই দিনটিতে। এমন একটা দিন বছরের, এক-আধ বছরের কেন, বহু বহু বছরের, বহু লক্ষ ম্যাড়মেড়ে আটপৌরে দিন থেকে আলাদা। তাকে তো অন্যমনস্কের মতো উদাসীনভাবে হাত পেতে নেওয়া যায় না; বিপুল সমাদরে রাজকীয় সমারোহে বরণ করে নিতে হয়। তাই এত লোকজন, এত বাজি পোড়াবার ধূম, এত উদ্দীপনা।

মনে আছে, অনেক রাত পর্যন্ত সেদিন স্কুলবাড়ির মাঠে ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল রাজেক। এত আলো, এত হইচই, এত উত্তেজনা, এত রোশনাই, এত রং—সবই ভালো লেগেছিল তার, নতুন নতুন মনে হয়েছিল। কিন্তু ভাল লাগার আয়ু মোটে একটা রাত। পরের দিনই 'পোলো' নিয়ে খালে গিয়ে নামতে হয়েছিল তাকে।

সেই চমকপ্রদ বিশেষ দিনটির পর বছরখানেক কাটল। হঠাৎ একদিন কার্তিক মাসের পচা জলে 'চাই' পাততে-পাততে রাজেক খবর পেল, ছিপতিপুর গ্রামে ভাঙন লেগেছে। গোঁসাই বাড়ির লোকেরা নাকি জমিজমা ঘরদুয়ার বেচে কলকাতায় চলে গেছে। গোঁসাইদের পর গেল ভুঁইমালীরা, তারপর একে একে বারুইরা, কুমোররা, যুগীরা। দেখতে দেখতে ছিপতিপুর একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল।

বারো মাস জলে থেকে থেকে অনুভূতিগুলো প্রায় অসাড় হয়ে গিয়েছিল রাজেকের। গ্রামে কারা থাকল, কারা গেল—তা নিয়ে আদৌ দুর্ভাবনা নেই। তার দিনরাতের একমাত্র চিন্তা—জলের তলা থেকে কেমন করে জীবন্ত রুপোলি ফসলগুলোকে তুলে আনবে।

দেশভাগ, স্বাধীনতা দিবসের জমকালো উৎসব কিংবা গ্রামের ভাঙন—সমস্ত কিছুই রাজেককে আলতোভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। সে সব নিয়ে বসে থাকার মতো যথেষ্ট সময় তার নেই। কেন না, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য তাকে এত খাটতে হতো যে তারপর আর কোনও ব্যাপারে মেতে ওঠার মতো উৎসাহ থাকত না।

কিন্তু খুব বেশি দিন চারপাশের জগতের দিকে পিঠ ফিরিয়ে থাকা গেল না। মাঘ মাসের এক শীতল দুপুরে মাঠে মাঠে ফেলে-যাওয়া শস্যের দানা কুড়োচ্ছিল রাজেক। হঠাৎ বুড়ো বৈকুণ্ঠ সাহা তার সামনে এসে দাঁড়াল।

রাজেক শুধিয়েছিল, 'আমারে কিছু কইবেন সা-মশয়?'

'হ—' বৈকুণ্ঠ সাহা মাথা নেড়েছিল।

'ক'ন (বলুন)—'

'আমরা তো গেরাম ছাইড়া চললাম—'

'কই চললেন?'

'কইলকাতা।'

'ফিরবেন কবে?'

'ফিরনের ঠিক নাই।'

রাজেক আর কিছু জিগ্যেস করেনি।

বৈকুণ্ঠ সাহা আবার বলেছিল, 'তর লাগে একখানা কামের কথা আছে।'

'কী?'

'আমরা কইলকাতা গেলে আমাগো ঘরদুয়ার জমিন-পুকৈর সগল তুই দেখবি। এমনে এমনে দেখতে কই না; ধান পাট যা হয় সব তুই পাবি। যদি কুনোদিন ফিরি তখন বাড়িঘর ফিরাইয়া দিস। না ফিরলে বেবাক তরই হইয়া যাইব।'

বৈকুণ্ঠ সাহারা সত্যিই চলে গেল। তার বিপুল সম্পত্তি, বিশাল ঐশ্বর্য এসে পড়ল রাজেকের হাতে। আট মাস ধরে জীবনধারণের জন্য জলে-স্থলে উঞ্ছবৃত্তি করে বেড়াতে হচ্ছে না তাকে। এ ব্যাপারে এখন সে নিশ্চিন্ত। আরামে আর সুখে থেকে থেকে পায়ের হাজা, নখের কুনি-টুনি সেরে গেছে রাজেকের। খই-ওড়া চামড়ায় চকচকে মসৃণতা এসেছে, মাথায় ঢেউখেলানো টেরি দেখা গিয়েছে। মেজাজটিও হয়ে উঠেছে শৌখিন। আজকাল সিল্কের লুঙ্গি, জালি গেঞ্জি, কলিদার পাঞ্জাবি ছাড়া চলে না। গন্ধতেলটি না হলে মন খুঁতখুঁত করে।

ইদানীং সব সময় রাজেকের মনে হয়, ভাগ্যে দেশখানা দুভাগ হয়েছিল, ভাগ্যে বৈকুণ্ঠ সাহারা চলে গিয়েছিল! না হলে তার কপাল কি খুলত! এত সুখের মুখ কি সে দেখতে পেত!

দিনগুলো ভালই কাটছিল। কিন্তু ছিপতিপুর গ্রামে এত মানুষ থাকতে আজ তোরাব আলী কেন যে বেছে বেছে হঠাৎ তার কাছেই আসতে গেল! শুধু আসা না, দাওয়াতও করে গেল! লোকটার মনে কী আছে, কে জানে।

তোরাব আলী নেমন্তন্ন করে গেছে। না গেলেও নয়, আবার যেতেও ভরসা হয় না। পরের দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসে বসে ভাবল রাজেক; ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার তোরাব আলীর উদ্দেশ্যটাকে বুঝতে চেষ্টা করল। তারপর নিজের অজান্তেই এক সময় চানটান সেরে, রঙচঙে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবিটি পরে, কাঁচা চামড়ার নাগরা পায়ে দিয়ে নৌকোয় গিয়ে উঠল।

ছিপতিপুর গ্রামের শেষ মাথায় একটা দ্বীপের মতো জায়গায় তোরাব আলীর বাড়ি। যেমন তেমন বাড়ি না, রীতিমত পাকা দালান। অনেকখানি জায়গা জুড়ে বাড়িটা, অসংখ্য ঘর। মানুষজনও প্রচুর।

ধানবন ঠেলে ঠেলে রাজেক যখন সেখানে পৌঁছল আশ্বিনের বেলা অনেকখানি হেলে গেছে। রোদে হলুদ আভা লাগতে শুরু করেছে।

ঘাটে নৌকো ভিড়তে না ভিড়তেই তোরাব আলী ছুটে এল। সমাদরের গলায় বলল, 'আইছ মেঞা! আমি তো ভাবছিলাম, তুমি ভুইলাই গেছ—'

উত্তর দেবে কি, রাজেক স্তম্ভিত। এই সেদিনও অবজ্ঞার সুরে তাকে 'তুই' বলত তোরাব আলী, সম্ভাষণের ভাষাটা ছিল 'রাজেইকা'। বেশি দূর পিছিয়ে যেতে হবে কেন, কালও তাকে 'তুই তোকারি' করে এসেছে তোরাব আলী। রাতারাতি হঠাৎ এমন কি ঘটে গেল যাতে সে এত সম্মানিত হয়ে উঠেছে! 'তুই' থেকে 'তুমি', 'রাজেইকা' থেকে 'মেঞা'—এতখানি বিস্ময় রাজেক সহ্য করতে পারছে না।

তোরাব আলী বলল, 'আসো—আসো—'

নি:শব্দে নৌকো থেকে পাড়ে নামল রাজেক। তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির দিকে যেতে যেতে তোরাব আলী বলতে লাগল, 'এত দেরি হইল ক্যান?'

জড়ানো গলায় রাজেক কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার এক বর্ণও বোঝা গেল না।

তোরাব আলী বলল, 'আরেট্টু (আরেকটু) দেখতাম। হে'র (তার) পরও যদি না আইতা, তোমার বাড়িত লোক পাঠাইতাম।'

অনেক কষ্টে স্বরটাকে গলার ভেতর থেকে এবার মুক্ত করে আনল রাজেক, 'আপনে কাইল কইয়া আইলেন। না আইসা কি পারি, ঘেটিতে (ঘাড়ে) আমার কয়টা মাথা?'

তোরাব আলী কিছু না বলে হাসল।

বাড়ির ভেতরে এনে ধবধবে ফরাসের ওপর খুব যত্ন করে রাজেককে বসানো হল। তক্ষুনি সরবত এল, পান-তামাক এল। বাড়ির যত বয়স্ক মেয়ে-পুরুষ সবাই এসে রাজেককে ঘিরে বসল। বাচ্চাগুলো দরজার সামনে ভিড় করে দাঁড়াল।

রাজেক ঘামতে শুরু করেছিল। আট মাস আগেও সে এ বাড়িতে কামলা খেটেছে, মাঠ থেকে ধান কেটে এনেছে, পাট 'জাগ' দিয়েছে—এই কথাগুলো কিছুতেই ভুলতে পারছে না। তোরাব আলীরা কিন্তু সে-সব ভুলে গেছে। অন্তত তাদের আদর-যত্ন এবং খাতিরের ঘটা দেখে তাই মনে হয়। সে যেন এ বাড়ির অত্যন্ত সম্মানিত অতিথি।

তোরাব আলী বলল, 'খাও মেঞা সরবত খাও। রান্ধনের (রান্নার ) দেরি আছে। দুই-একখানা পদ অখনও বাকি।'

বাড়ির অন্য লোকেরাও সায় দিল, 'হ-হ, খাও—'

কাঁপা কাঁপা হাতে সরবতের গেলাস তুলে নিল রাজেক।

সরবতের পর তামাক সাজা হল। তোরাব আলী হুঁকোয় দু-চারটে টান দিয়ে রাজেকের দিকে এগিয়ে দিল।

সঙ্কোচে একেবারে এতটুকু হয়ে গেল রাজেক। দু-হাত এবং মাথা নেড়ে বলতে লাগল, 'না-না, না-না—'

তোরাব আলী হুঁকোটা প্রায় তার হাতে গুঁজেই দিল, 'আরে মেঞা, ধর ধর। মাইয়া মাইনষের লাখান (মতো) অত সরম ক্যান!'

মুখ নীচু করে আবছা গলায় রাজেক বলল, 'আপনের সুমখে (সামনে) নিশা (নেশা) করুম! না-না—'

'আমার সমুখে বইলা কী? খাও-খাও—'

অনেক বলার পর তোরাব আলীর দিকে পেছন ফিরে বার কয়েক দ্রুত হুঁকো টানল রাজেক। তারপর কাছে যাকে পেল তার হাতে হুঁকোটা দিয়ে আবার ঘুরে বসল।

সরবত আর তামাকের পর গল্প শুরু হল। দেশভাগের গল্প, গ্রামের ভাঙন লাগার গল্প। ধান-পাট, এ বারের বর্ষা—কিছুই বাদ গেল না। তবে বেশির ভাগ কথাই হল বৈকুণ্ঠ সাহা আর তার বিষয়-আশয় নিয়ে।

কথায় কথায় বেলা আরো হেলে গেল। পশ্চিম আকাশের ঢালু পাড় বেয়ে সূর্যটা যখন অনেকখানি নেমে গেছে সেই সময় ভেতরবাড়ি থেকে খবর এল রান্নাবান্না শেষ।

তোরাব আলী ব্যস্ত হয়ে উঠল, 'ইস, বেইল (বেলা) যায়! তোমার বড় কষ্ট হইল মেঞা।'

রাজেক বলল, 'না, কষ্ট কিসের!'

'লও লও, খাইতে যাইবা।'

খাবার ব্যবস্থা ভেতর-বাড়িতে। তোরাব আলী আয়োজনও করেছে প্রচুর। পাঁচ-ছ রকমের মাছ, মাংস, পায়েস, পাতক্ষীর, বড় বড় মোহনবাঁশি কলা, পুরু সরওলা হলুদবর্ণ ঘন দুধ।

একা রাজেক না, তার সঙ্গে তোরাব আলী এবং এ বাড়ির বর্ষীয়ান ক'টি মানুষও খেতে বসল। খেতে খেতে আবার বৈকুণ্ঠ সাহাদের কথা উঠল, তাদের ফেরার সম্ভাবনা আছে কিনা তাই নিয়ে আলোচনা হল।

রাজেক অবশ্য বিশেষ কথা বলছিল না। সে এত বিস্মিত এত স্তম্ভিত হয়ে আছে যে তোরাব আলীর প্রশ্নের উত্তরে খুব সংক্ষেপে এক-আধটা 'হুঁ' 'হাঁ'র বেশি তার মুখ থেকে বেরুচ্ছিল না।

মাথা নীচু করেই খাচ্ছিল রাজেক। হঠাৎ তোরাব আলীর এক বুড়ো চাচার কথায় মুখ তুলে পাশের দিকে তাকাতে গিয়েই ওধারের এক জানালায় তার চোখ আটকে গেল। সেখানে কামরণ দাঁড়িয়ে আছে; তোরাব আলীর মেয়ে কামরণ। কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং, দীঘল টান দেওয়া নাক-চোখ চিবুক। মুখখানা পানপাতার মতো। ছোট কপালের ওপর থেকে থাক থাক কোঁচকানো চুল; ফুরফুরে পাতলা ঠোঁট। পরস্তাবে (রূপকথায়) সেই যে গুলেবাখালী রাজকন্যার কথা আছে, কামরণ যেন তাই।

মেয়েটা খুব সম্ভব একদৃষ্টে পলকহীন তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হতেই সলজ্জ মধুর হেসে তাড়াতাড়ি চলে গেল।

কামরণকে অবশ্যই এই প্রথম দেখল না রাজেক। কামলা খাটতে এসে কতবার দেখেছে। কী দেমাক ওই মেয়ের! রূপের দেমাক, বড়মানুষির দেমাক। দুনিয়াখানাকে যেন পায়ের তলায় রেখে দিয়েছে। মানুষকে মানুষ বলেই সে ভাবত না।

সেই কামরণ যে এমন হাসতে পারে, তা যেন এক অভাবনীয় ব্যাপার।

খাওয়া-দাওয়ার পর বাইরের ঘরের ফরাসে এসে বসতে না বসতেই সন্ধ্যে নেমে গেল। রাজেক বলল, 'অখন আমি যাই।'

তোরাব আলী আর তাকে আটকাল না, 'আইচ্ছা যাও, আবার আইসো।' ঘাট পর্যন্ত গিয়ে রাজেককে নৌকোয় তুলে দিয়ে এল সে।

যতদূর চোখ যায় এখন গাঢ় অন্ধকার। সমস্ত চরাচর জুড়ে লক্ষ লক্ষ জোনাকি জ্বলছে। আশ্বিনের এলোমেলো ঝিরঝিরে হাওয়া ছুটছে দিগ্বিদিকে।

ধানখেতের ওপর দিয়ে নৌকো চালিয়ে যেতে যেতে রাজেক সেই পুরনো কথাটাই ভাবছিল। তোরাব আলীর এত খাতির, এত সমাদর—এ সবের উদ্দেশ্য কী? এগুলো ফাঁদ নয় তো? ভুলিয়ে-ভালিয়ে বৈকুণ্ঠ সাহার জমিজমা বাড়িঘর সে গ্রাস করতে চায় কি?

সেই যে নেমন্তন্ন খাওয়া শুরু হল, কার্তিকের শেষাশেষি পর্যন্ত একটানা তার জের চলল। দু-চারদিন পর পরই একটা না একটা উপলক্ষে তোরাব আলীর বাড়ি যেতে হয়েছে রাজেককে।

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে রাজেক, ইদানীং কামরণ তার সামনে আসে না। খেতে বসে কিংবা গল্প করতে-করতে জানালার ফাঁকে চকিতের জন্য এক-আধবার তাকে দেখা যায়। অথচ আট-দশ মাস আগেও বাড়িতে সে কামলা খাটতে আসত, সর্বাঙ্গে রূপ আর গর্বের ঝিলিক দিয়ে গরবিনী মেয়েটা তাদের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াত। সেই কামরণের এজাতীয় আচরণের কোনও কারণ খুঁজে পায় না রাজেক। ভেবে ভেবে কুলকিনারা চোখে পড়ে না তার।

শেষ পর্যন্ত রহস্যটা পরিষ্কার হল। অঘ্রান মাসের গোড়ায় একদিন সকালবেলা তোরাব আলি রাজেকের কাছে এল, 'তোমার লগে কামের কথা আছে মেঞা—'

এতদিন বাড়িতে নিয়ে গিয়ে নেমন্তন্নই খাইয়েছে তোরাব আলী আর প্রচুর খাতির-যত্ন করেছে। এলোমেলো গল্প ছাড়া বিশেষ কোন কথা বলেনি। তবে সে যে বলবে, নিদারুণ উদ্দেশ্যপূর্ণ কিছু তার মুখ দিয়ে বেরুবে, তা আন্দাজ করতে পারছিল রাজেক। সে জন্য রাজেকের ঘুম নেই, একটা ধারাল কাঁটা বুকের ভেতরে সবসময় যেন আড় হয়ে বিঁধে আছে।

তোরাব আলীর কাজের কথাটা কী, কে বলবে। নিশ্বাস বন্ধ করে রাজেক তাকিয়ে থাকল। তোরাব আলী বলল, 'আমার মাইয়া কামরণরে দেখছ তো?'

লোকটা কী বলতে চায় বুঝতে না পেরে বিমূঢ়ের মতো মাথা নাড়ল রাজেক, 'হু—'

'আমার ইচ্ছা, কামরণের লগে তোমার শাদি দিমু—'

ভীষণভাবে চমকে উঠল রাজেক, 'এ আপনে কী ক'ন বড় মেঞা—'

তোরাব আলী শুধলো, 'ক্যান, কী কই?'

'আপনে কত বড় মানুষ, কত বড় ঘর আপনেগো! আপনের কাছে হেই দিনও কামলা খাইটা গেছি। হেই মাইনষের মাইয়ারে শাদি! না-না—'

'কামলা খাটার কথা ভুইলা যাও মেঞা। আর বড় মানুষ, বড় ঘরের কথা যখন তুললা তখন কই তুমিও ছোট না। বৈকুণ্ঠসার'র অত জমিন পাইছ, ঘর-দুয়ার হাল হালুটি পাইছ। তুমি কম কিসে? জাতে উইঠা গেছ মেঞা—'

দ্বিধান্বিত সুরে রাজেক বলল, 'কিন্তুক—'

'আবার কী?'

'আমার লগে মাইয়ার শাদি দিলে মাইনষে আপনেরে কী কইব?'

'কোন হালায় (শালায়) কিছু কইব না। সুমখা-সুমখি (সামনা-সামনি) কওনের সাহস কারো নাই। হেয়া (তা) ছাড়া—'

'কী'?

'আমার দেখতে হইব মাইয়া কোনখানে বেশি সুখে থাকব। তুমি ছাড়া আর কোন হালার নব্বই কানি জমিজেরাত আছে, এমুন সোন্দর ঘরদুয়ার আছে? লোক না পোক। মাইনষের কথায় আমি কান দেই না।'

এ একেবারে আশাতীত, অকল্পনীয়। জামাই করবে বলেই তবে তোরাব আলীর এত ছোটাছুটি, এত সমাদর, এত মেজবান খাওয়াবার ঘটা! সুখের নদীতে ভাসতে ভাসতে রাজেক বলল, 'তাইলে আমি আর কী কমু, আপনে যা ভাল বোঝেন—'

একটু ভেবে, তোরাব আলী বলল, 'ভাবছি, ধান টান উইঠা গেলে তোমাগো শাদিটা সারুম—'

রাজেক উত্তর দিল না, মুখ নিচু করে বসে থাকল।

তোরাব আলী বলল, 'তাহলে ওই কথাই রইল। অখন আমি যাই—'

তোরাব আলী চলে যাবার পরও উঠল না রাজেক। বসে বসে ভাবতে লাগল, ভাগ্যি দেশখান দু'ভাগ হয়েছিল, ভাগ্যি বৈকুণ্ঠ সাহারা চলে গিয়েছিল! নইলে এত সুখ কি তার কপালে ছিল!

অঘ্রানের মাঝামাঝি ধান কাটার মরসুম শুরু হল। মাঠ থেকে ধান তুলে এনে সেই ধান ঝেড়ে শুকিয়ে, ডোলের ভেতর সেঁতে রাখতে মাঘ মাস পেরিয়ে গেল। তারপর আবার এল তোরাব আলী। বলল, 'ফসল টসল তো উঠল, এইবার মোল্লা-মুচ্ছুল্লিগো খবর দেই—'

নখ খুঁটতে খুঁটতে রাজেক বলল, 'আপনার যা ইচ্ছা—'

খানিক চিন্তা করে তোরাব আলী বলল, 'আইজ কী বার?'

'বুদ (বুধ)—'

শনিবার দুফারে নাও পাঠাইয়া দিমু, তুমি আমাগো বাড়িত যাইও। মোল্লামুচ্ছুল্লিগো খবর দিয়া রাখুম, তারাও আইব। হেইদিন শাদির কথা, দেন-মোহরের কথা পাকা হইব।'

রাজেক বলল, 'নাও পাঠাইতে হইব না, আমি এমনেই যামু গা—'

তোরাব আলী শুনল না। জোরে জোরে প্রবলবেগে মাথা নেড়ে বলল, 'এট্টা ভালো কামে যাইবা, নাও না পাঠাইলে হয়! তোমার সোম্মান নাই?'

বুধবার তোরাব আলী চলে যাবার পর দিন যেন আর কাটতেই চায় না। শিরায় শিরায় সীমাহীন উত্তেজনা নিয়ে সর্বক্ষণ অস্থির হয়ে থাকল রাজেক।

তবু একে একে বেস্পতি গেল, শুক্র গেল। শনিবার সকাল থেকে সময় যেন একেবারে থেমেই গেছে। সূর্যটা অন্যদিনের চাইতে অনেক দেরি করেই বুঝি আজ উঠেছে; আর চলছে দেখ না! এক ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিতে আজ দশ ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে তার।

রাজেক ঘুরছে ফিরছে আর দূর মাঠের দিকে তাকাচ্ছে। সকাল থেকে কত বার যে পুকুরের ওধারের মাঠটার দিকে সে তাকিয়েছে তার হিসেব নেই।

এই ফাল্গুনে মাঠে অবশ্য জল নেই। কিন্তু তার পাশ দিয়ে একটা বড় খাল আছে; খালটা সোজা এসে বৈকুণ্ঠ সাহার পুকুরে থেমেছে। তোরাব আলীর নৌকো ওই খাল দিয়েই আসবে।

যত ধীরেই যাক, এক সময় দুপুর হল। আর তখনই অনেক দূরে নৌকোর গোল ছই চোখে পড়ল রাজেকের। সঙ্গে সঙ্গে দোতারায় এলোপাথাড়ি ছড় টানার মতো বুকের ভেতর ঝড় বইতে লাগল তার। এটা যেন সাধারণ দু-মাল্লাই নৌকো না, পরস্তাবের মনোহারিণী রাজকন্যা তার জন্য একখানা ময়ূরপঙ্খীই পাঠিয়ে দিয়েছে।

দেখতে দেখতে নৌকোটা পুকুরঘাটে এসে ভিড়ল। নিষ্পলকে তাকিয়ে ছিল রাজেক; ভাবছিল ঘাটে যাবে কিনা।

ভাবনাটা সম্পূর্ণ হবার আগেই নৌকো থেকে যে নামল, এই মুহূর্তে—এই মুহূর্তে কেন, দু-তিন মাসের ভেতর তার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি! রাজেক চমকে উঠল; সামনে বাজ পড়লেও মানুষ এত চমকায় না। হৃৎপিণ্ডের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা স্রোতের মতো সিরসিরিয়ে কী যেন বয়ে গেল তার।

একা বৈকুণ্ঠ সাহাই না, তার সঙ্গে আর একজনও নেমেছে। পোশাক-আশাক এবং চেহারা-টেহারা দেখে মুসলমান বলেই মনে হয়; বয়েস ষাটের কাছাকাছি।

পুকুরঘাট থেকে সঙ্গীকে নিয়ে সোজা বাড়িতে চলে এল বৈকুণ্ঠ সাহা। রাজেককে দেখে ভারি খুশি সে। বলল, 'ভালোই হইল রাজেক, বাড়িতে পা-ও দিয়াই তরে পাইয়া গেলাম। ভাবছিলাম, পামু না। তা আছস কেমুন? শরীল-গতিক ভালো তো?'

বাজ-পড়া অসাড় মানুষের মতো দাঁড়িয়ে ছিল রাজেক। কোনরকমে বলতে পারল, 'আপনে সা-মশয়!'

বৈকুণ্ঠ সাহা বলল, 'হ, আমিই। তরে খবর দিয়া আইতে পারি নাই। হঠাৎ সুযুগ হইল, আইসা পড়লাম।'

'এ্যাদ্দিন আছিলেন কই?'

'মেলা জায়গায়। কইলকাতা, বনগাঁ, দত্তপুকৈর—কতখানের নাম কমু? শ্যাষম্যাষ মুশশিদাবাদে থিতু হইছি।' বলতে বলতে সঙ্গী সম্বন্ধে সচেতন হল বৈকুণ্ঠ সাহা। তার উদ্দেশে বলল, 'বসেন বসেন আমিন সাহেব। দে রে রাজেক, একখানা জলচৌকি বাইর কইরা দে। তামুক-টামুক থাকলে সাজ—'

জলচৌকি এলে আমিন সাহেব বসল। বৈকুণ্ঠ সাহাও বারান্দার একধারে বসল। তারপর গল্প-সল্প শুরু হল। দেশের হালচাল, গ্রামে কারা আছে, কারা কারা গেছে—ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কথা। বৈকুণ্ঠ সাহাই এক তরফা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেল। রাজেক মনে মনে অবসন্ন বোধ করছিল; নির্জীব গলায় উত্তর দিয়ে যেতে লাগল।

এলোমেলো অনেক রকম কথার পর আসল কথা পাড়ল বৈকুণ্ঠ সাহা, 'তারপর ঘর দুয়ার ভাল কইরা রাখছস তো?'

এতকাল পরে হঠাৎ বৈকুণ্ঠ সাহা গ্রামে ফিরে এল, বোঝা যাচ্ছে না, আর এল এমন দিনে যেদিন শাদির কথা পাকা হবে। অন্যমনস্কের মতো রাজেক বলল, 'দ্যাখেন না, কেমুন কইরা রাখছি—'

বৈকুণ্ঠ সাহা তক্ষুনি উঠে পড়ল। আমিন সাহেবকে ডেকে বলল, 'আসেন, আসেন। নায়ে কইরা আসনের সময় আমার জমিন দেখাইছিলাম। অখন আমার বাড়িঘর দ্যাখেন—'

ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমিন সাহেবকে চারদিক দেখাতে লাগল বৈকুণ্ঠ সাহা। রাজেক কিন্তু তাদের সঙ্গে গেল না; আকণ্ঠ দুর্ভাবনা আর উদ্বেগ নিয়ে বসে থাকল। বুকের ভেতর ঢেঁকির পাড় পড়তে লাগল তার।

বৈকুণ্ঠ সাহা এতদিন পর বউ-ছেলে-মেয়ে, সংসারের কাউকে নিয়েই আসেনি সত্যি কিন্তু আমিন সাহেবকে সঙ্গে এনেছে। আমিন সাহেব এদিককার লোক না। হলে রাজেক নিশ্চয়ই চিনতে পারত। এই মুসলমান ভদ্রলোকটির সঙ্গে বৈকুণ্ঠ সাহার সম্পর্ক কী? আসবার সময় তাকে ধান জমি দেখিয়েছে বৈকুণ্ঠ; এখন বাড়িঘর দেখাচ্ছে। সমস্ত ব্যাপারটাই রাজেকের কাছে রহস্যময় লাগছে। কিছুই বুঝতে পারছে না সে।

কিছুক্ষণ পর আমিন সাহেবরা ফিরে এল। দাওয়ায় বসতে-বসতে বৈকুণ্ঠ সাহা শুধলো, 'বাড়িঘর কেমুন দেখলেন?'

আমিন সাহেব বলল, 'ভালো।'

'পছন্দ হইছে তো?'

'হ্যাঁ।'

আমিন সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল বৈকুণ্ঠ সাহার। তাড়াতাড়ি রাজেকের দিকে ফিরে বলল, 'ভাল কথা, তর লগে তো আমিন সাহেবের আলাপ-সালাপই কইরা দেই নাই। উনি মুর্শিদাবাদের মানুষ, আমার বন্ধু। আমিন সাহেবকে বলল, 'আর ও হইল রাজেক মেঞা, বড় বিশ্বাসী মানুষ। আমরা যখন দ্যাশ ছাইড়া যাই অর উপুর বাড়িঘর জমিজিরাতের ভার দিয়া গেছিলাম। দ্যাখেন কেমুন সোন্দর পরি (পাহারা) দিয়া রাখছে।'

আমিন সাহেব কিছু বলল না; মাথা নাড়ল শুধু।

আলাপ-পরিচয়ের পর বৈকুণ্ঠ সাহা বলল, 'বুঝলি রাজেক, দ্যাশে আমরা আর ফিরুম না। হেইর লেইগা আমিন সাহেবরে লইয়া আইলাম। কেন আনছি বুঝছস?'

রাজেক মাথা নাড়ল। অর্থাৎ বোঝেনি।

চারদিক ভালো করে দেখে নিয়ে চাপা গলায় এবার বৈকুণ্ঠ সাহা বলল, 'আমার সকল সম্পত্তি আমিন সাহেবকে দানপত্তর কইরা দিমু। আসলে ব্যাপারটা কী জানস?'

'কী?'

'আমিন সাহেব ইন্ডিয়ায় থাকব না। মুর্শিদাবাদে তেনার ঘরদুয়ার খ্যাত-খামার যা আছে, আমরে দানপত্তর কইরা দিব। পাকিস্তানের আমার যা আছে, তেনারে দিমু। ব্যাপারটা অইল 'এচ্চেঞ্জ' (এক্সচেঞ্জ); বাংলায় কয় বিনিময়—'

রাজেক কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, সেইসময় তোরাব আলীর দুই মাঝি এসে দাঁড়াল সামনে। বলল, 'লন মেঞাসাব, তরাতরি লন। আমাগো আইতে এট্টু দেরি হইয়া গেল—'

আমিন সাহেবকে সব সম্পত্তি দানপত্র করে দেবে বৈকুণ্ঠ সাহা। এ কথা শুনবার পরও তোরাব আলীর বাড়ি যাবার আর প্রয়োজন আছে কিনা রাজেক বুঝতে পারছে না। মোট কথা, গুছিয়ে কিছুই ভাবতে পারছিল না সে।

এদিকে মাঝি দুটো সমানে তাগাদা দিতে শুরু করেছে। হঠাৎ তোরাব আলীর সহৃদয় ব্যবহারের কথা মনে পড়ল রাজেকের। খাতির-যত্নের কথা মনে পড়ল। রাজেক ভাবল, শাদির ব্যাপারে এতদূর এগিয়ে এখন আর না-ও পিছোতে পারে তোরাব আলী।

একরকম ঘোরের মধ্যেই উঠে দাঁড়াল রাজেক। বৈকুণ্ঠ সাহেদের বলল, 'আপনেরা এট্টু বসেন সা-মশয়। আমি এট্টু ঘুইরা আসি—'বলে মাঝি দুটোর সঙ্গে গিয়ে নৌকোয় উঠল।

তোরাব আলীর বাড়ি আসতেই দেখা গেল বার-বাড়ির আসর একেবারে জমজমাট। মোল্লামুছুল্লিরা ইতিমধ্যেই এসে গেছে। সর্দারদের বাড়ি থেকে, খাঁয়েদের বাড়ি থেকে, মৃধাদের বাড়ি থেকে—ছিপতিপুর গ্রামের হেন বাড়ি নেই যেখান থেকে মান্যগণ্য লোকেরা এসে হাজির হয়নি।

রাজেক ঢুকতেই সাড়া পড়ে গেল। পিচকিরি দিয়ে প্রচুর গোলাপ জল ছিটানো হল। পান এল, তামাক এল, মিঠাই এল, ভুরভুরে আতর এল। ফাঁকে ফাঁকে ঠাট্টাঠিসারা চলল। রঙের কথায়, রসের কথায় হাসি উথলে উথলে উঠতে লাগল।

কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছিল না রাজেক, দেখতে পাচ্ছিল না। নির্জীবের মতো বিহ্বলের মতো বসে ছিল সে।

তোরাব আলী লক্ষ্য করেছিল। মেজাজখানা আজ তার খুবই ভালো; মনে গোলাপি আভা লেগেছে। ভাবি জামাইকে একটু ঠাট্টা করার লোভ কিছুতেই সে সামলাতে পারল না। রাজেকের কাছে ঘন হয়ে বসে বলল, 'আইজের দিনে এমুন মনমরা ক্যান মেঞা? ব্যাপারখানা কী?'

ফস করে নিজের অজান্তেই রাজেক বলে ফেলল, 'আইজ বৈকুণ্ঠ সা' আইছে!'

তোরাব আলী চকিত হয়ে উঠল, 'বৈকুণ্ঠ সা' আইছে!

'হ। লগে আমিন সাহেব বইলা একজনেরে আনছে। তারে নিকি জমিন-জিরাত বাড়িঘর লেইখা দিয়া যাইব।'

মুহূর্তে সমস্ত ঘরখানায় স্তব্ধতা নেমে এল। অনেকক্ষণ পর তোরাব আলি বলল, 'তাইলে শাদির কথার দরকার কী? খোদা যা করে ভালর লেইগাই করে। ভাগ্যি আইজই বৈকুণ্ঠ সা আইছে—' বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল এবং বড় বড় পা ফেলে ভেতরবাড়ির দিকে চলে গেল।

একটু পরে একে একে মোল্লামুছুল্লিরা, গ্রামের গণ্যমান্য লোকেরা চলে গেল। ফাঁকা ঘরে একা একা অনেকক্ষণ বসে থেকে একসময় বাইরে চলে এল রাজেক।

তারপর দিন যায়, দিন আসে।

আবার পোলো নিয়ে, ধর্মজাল নিয়ে টোন সূতোর বঁড়শি নিয়ে খালে-বিলে-নদীতে নামল রাজেক, আবার হেমন্তের মাঠে শস্য কুড়োতে শুরু করল। দেখতে দেখতে তার পা ফেটে গেল, আঙুলের ফাঁকে থকথকে হাজা হল, চামড়া থেকে খই উড়তে শুরু করল।

মাছ আর শস্যকণার সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে আজকাল রাজেক নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে আপনমনে বলে, 'দেশখান দু ভাগ হয়, সাহারা-ভুঁইমালীরা-যুগীরা গ্রাম ছাইড়া যায়, দ্যাশের এক রাজা যায়, আরেক রাজা আসে, তাতে তর কী রে, তর কী?'

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%