সমরেশ মজুমদার

সামনের দেয়ালে আবার একখানা পোস্টার পড়েছে।
রাস্তা দিয়ে কত লোক যায়। কেউ কেউ পড়ে দেখে। কেউ দেখেও দেখে না। কারো বা নজরে পড়ে না। তবু আমাদের এ ফ্ল্যাটবাড়িটার মুখোমুখি রাস্তার ওপারের ওই দেয়ালের গায় দু-চারদিন পর পর পোস্টার মারে। কে বা কারা মারে জানি না। জানবার চেষ্টাও করি না। ছাপোষা কেরানি। কে যায় যত সব হাঙ্গামা হুজ্জতের নেপথ্যের কথা জানতে? যার খুশি মারুক, যার ভালো লাগে পড়ুক।
তবু না পড়ে পারি না। এত কাছে, একেবারে মুখোমুখি তাই। আমার দোতালার শোবার ঘরের মধ্যে থেকে গোটা দেয়ালটা চোখে পড়ে। বলাবাহুল্য, রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ি না কখনো। নরম নিরীহ পোস্টার।
সরবরাহ মন্ত্রী বলেন, কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়েছে : তবে কাপড়ের দাম কমে না কেন?
কেন কমে না সে কথাই ভাবতে ভাবতে নিচে নেমে যাই। রোজ সকালে চা খাওয়ার পরে রাস্তার দিকের রকে গিয়ে বসি। পাশের বাড়ির অধ্যাপক পরেশবাবু আসেন তাঁর ইংরেজি সংবাদপত্রখানা সঙ্গে করে। আমারই পাশের ফ্ল্যাটের ইনকামট্যাক্স অফিসের ধনঞ্জয়বাবু আসেন তার বিশ বছরের প্রিয় বাংলা খবরের কাগজখানি নিয়ে।
'দত্তমজুমদারের খাটালের দেয়ালটা দস্তুরমতো একটা সংবাদপত্র হয়ে দাঁড়াল।'
'তাই তো দেখছি। ধনঞ্জয়বাবুর পরিহাসের জবাবে বললাম, 'ইদানিং একটু বেশি রকম বাড়ছে খবরের সংখ্যা।'
সংবাদপত্র থেকে মুখ তুলে অধ্যাপক পরেশবাবু বলে উঠলেন, 'এতে আশ্চর্য হবার কী আছে? হালে খবরের কাগজওয়ালারা নীতি বদলেছেন : ঘটে যাহা সব সত্য নয়। তাই পছন্দসই খবর না হলে—তা সে যত বড় অঘটনই হোক না কেন—আজকাল তা সংবাদপত্র অপাঙক্তেয়। ফলে একঘরে খবরগুলো ঠাঁই নিচ্ছে দেয়ালে দেয়ালে।'
'যাই বলুন, ও-সব পোস্টার-ফোস্টার মেরে কিছু হয় না।' ধনঞ্জয়বাবু গম্ভীর হয়ে মন্তব্য করেন, 'কী লাভ হয় এতে? ক-জন লোক পড়ে মশায়?'
'শত হলেও খবরের কাগজ!' বললাম, 'ছাপার হরফের একটা জাদু আছে যেন!'
হ্যাঁ, একেবারে বেদবাক্য—তা সে যত বড় মিথ্যাই ছাপা হোক না কেন! অধ্যাপক ফোড়ন কাটেন।
শুনে খুশি হই না। অধ্যাপকের মতামত মাঝে মাঝে একটু উগ্র হয়ে ওঠে। তবু আমাদের বন্ধুত্বে কখনো টান পড়ে না। তাঁর সঙ্গে একটা জায়গায় আমাদের দুজনের স্বভাবের মিল আছে। গোলযোগের গন্ধ পেলে তিনিও দূর দূর দিয়ে গাঁ বাঁচিয়ে চলেন।
ধনঞ্জয়বাবু না বলে পারলেন না, 'আপনি তো বক্তৃতার ঝোঁকে অনেক কথাই বললেন। বিপদের কথাটা একবার ভেবে দেখছেন?'
'এতে আমাদের ভয় পাবার কী আছে মশায়?' অধ্যাপক প্রশ্ন করেন।
'কে বলতে পারে হঠাৎ একদিন সার্চটার্চ হবে কিনা। অনর্থক হয়রানি কে চায় মশায়। আমাদের এই বাড়িটাতে ছেলেছোকরা—তা আট-দশ জন তো হবেই। ধরে নিয়ে গেলেই হলো। আজকাল কি আর আইন-টাইন আছে!'
চেয়ে দেখি মই বেয়ে উঠে পোস্টার লাগাচ্ছে দেয়ালে—সিনেমা কোম্পানির নতুন ছবির সচিত্র বিজ্ঞাপন! 'কনট্রোল তুলে দেবার পর তিন মাসে কাপড়ের কলওয়ালারা একশো কোটি টাকা মুনাফা লুটেছে।'—দু-তিন দিন আগের সেই বড় বড় হরফের পোস্টারটাকে একেবারে ঢেকে দিল ভারত-বিখ্যাত চিত্রতারকার তিনরঙা আবক্ষ মূর্তি।
পরদিনই আবার একখানা। এবার পরোক্ষ কায়দার এক উপভোগ্য পোস্টার : 'পুরোদমে চোরাকারবার চালাও। 'ক্ষমতা হাতে পেলেই চোরাকারাবারীদের ফাঁসি দেব'—পণ্ডিত জহওরলাল। এক বছরে ক-জন ধরা পড়েছে? মাভৈ: নিখিল চোরা কারবার সমিতি।'
যথাসময়ে রকের আড্ডায় এসে বসেছি। অধ্যাপক সহাস্যে বললেন, 'পোস্টারওয়ালারা দেখছি নতুন টেকনিকের খেলা দেখাতে শুরু করল!—আজ লোক টানছে মন্দ নয়।'
দেয়ালের কাছে ছোটখাটো ভিড় জমেছে। বেশিক্ষণ নয়। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে লোক থামে, দেয়ালের কাছে এগিয়ে যায়। পড়ে, হাসে, টীকা-টিপ্পনীও করে।
খানিকবাদে ধনঞ্জয়বাবু এসেই জানালেন, 'শুনেছেন তো?'
'কী?'
'যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই। এ পাড়ায় টিকটিকির আনাগোনা শুরু হয়েছে।'
'মানে?'
'কাল দুপুরের দিকে আশপাশের দোকানগুলোর লোকজনদের তারা—সি-আই-ডি-র লোকই হবে—বিস্তর জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছে। রসুল মিঞাকে নাকি শাসিয়ে গেছে—বলে গেছে নজর রাখতে।'
আমাদের এ বাড়িরই গায়ে লাগানো রসুল মিঞার বিড়ির দোকান। হাঁক দেই। রসুল হাতের কাজ ফেলে চলে আসে।
'কাল নাকি পাড়ায় পুলিশের লোক এসেছিল?'
'মালুম নেহি।'
'তোমার দোকানে হে'—ধনঞ্জয়বাবু জোর দিয়ে বলেন।
'নেহি তো বাবু।'
এবার প্রশ্ন করেন পরেশবাবু 'ওসব পোস্টার কারা লাগায় জানো? তুমি তো সব সময় সামনেই থাক।'
'ম্যায় তো হরবকত কাম পর হি রহতা হুঁ বাবু। ঔর বাঙলা জবান তো মুঝে মালুম নেহি হোতে হ্যায়।'
'আরে বাংলা বাত হিন্দি বাতের কথা হচ্ছে না,' ধনঞ্জয়বাবু প্রায় রুখে ওঠেন, 'দিনদুপুরে ওসব কারা এসে মেরে রেখে যায় তুমি তার কিছুই জানো না বলতে চাও।'
'কুছু কুছু দেখতা হুঁ। কভি বাবুলোক লাগাতে হেঁ, কভি মজদুর লোক ভি লাগাতে হেঁ।'
রসুল চলে যেতেই অধ্যাপক বললেন, 'যা-ই বলুন না, লোকে ওসব পড়তে চায়। দেখছেন তো এত পোস্টার বাড়ছে, কই ছিঁড়ে ফেলছে না তো কেউ।'
দেয়ালের কাছে আবার একটা ছোট্ট ভিড় জমেছে।
দিন চারেক বাদে।—একখানা বড় আকারের তথ্যভারী নীরস পোস্টার :
'পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী জানাইয়াছেন, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা বেতন পান ও নয় হাজার টাকা ভাতা পান। এ ছাড়া তাঁহার মস্কো অফিসের জন্য ব্যয় হয় বৎসরে ৫ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা। এ টাকা কার? তোমার আমার—কোটি কোটি ভারতবাসীর।'
ধনঞ্জনবাবু দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন—পড়ছেন না। পড়ছে জনকয়েক পথচারী : কারখানায় যাবার পথে শশব্যস্ত শ্রমিক, রেশনের থলে হাতে চশমা-পরা কেরানি ভদ্রলোক, একরাজ্যের সংবাদপত্র বগলদাবা করে দাঁড়িয়ে এক ছোকরা বয়েসী হকার।
ধনঞ্জয়বাবু শঙ্কা প্রকাশ করেন, 'এবার নিশ্চয় পুলিশের উৎপাত শুরু হবে। বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে।'
'কেন? নতুন খবর তো কিচ্ছু দিচ্ছে না। এসব ফ্যাক্টস ফীগারস তো সেদিন খবরের কাগজেই পড়েছি।'
'তা হলে কী হয়! খবরের কাগজে কি আর এসব খবর এমন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়!'
'তা বটে।'
অধ্যাপক দেয়ালের দিকে চেয়ে আছেন। বললাম, 'কী ভাবছেন পরেশবাবু?'
'ভাবছি—'রোলস রয়েস এ্যাডমিনিসট্রেশন ইন এ বুলক-কার্ট কান্ট্রি!' একটু হেসে বললেন অধ্যাপক, 'এ উক্তি করেছিলেন সেকালের এক মডারেট নেতা। আজ ফিরে এলে নিশ্চয় একসট্রিমিস্ট লেবার লীডার বলে স্পেশাল পাওয়ার্স এ্যাক্টের বেড়াজালে পড়বেন।'
ধনঞ্জয়বাবু এক টিপ নস্যি নিতে নিতে সেদিনের মতো আবার জোর অভিমত জানান, 'এতে কোনো লাভ হয় না। ক-জন লোক পড়ে এসব? আর পড়েই বা হচ্ছে কী?'
'কী হয় না-হয় জানি নে। তবে আপাতত আমার পনেরো বছরের ছেলেটার মগজে কিঞ্চিৎ শ্লোগানের ধোঁয়া ঢুকেছে।' পরেশবাবু হেসে বলেন।
আমার বড় ছেলেটাও ওই বয়েসী। সুতরাং উৎকর্ণ হয়ে শুনে যাই।
'গেল মাসে আমাদের ঠিকে ঝি সাতদিন কামাই করেছে। বলে, অসুখ করেছিল। আমার তা বিশ্বাস হয়নি। হিসেব করে এ মাসে সাত দিনের মাইনে কম দিয়েছি বলে আমার পুত্র তার মায়ের কাছে নাকি মন্তব্য করেছে, বাবার বড় পেটি-বুর্জোয়া মেন্টালিটি।'
'বলবেন না আর!' বললেন এবার ধনঞ্জনবাবু, 'আমার কনিষ্ঠ সহোদরের বড় বড় কথার ঠেলায় গায় জ্বালা ধরে। এদিকে কলেজের পড়া তো শিকেয় উঠেছে। একটা পরখ করলাম, বলতো স্টক আর শেয়ারে তফাত কী? বলে কী না, ও-সব কথা তোমরা জানবে—আমাদের জন্যে নয়। ভবিষ্যতে স্টক এক্সচেঞ্জই থাকবে না, তার আর স্টক আর শেয়ারের তফাত।'
পরেশবাবু আর আমি একসঙ্গে হেসে উঠি। হাসেন ধনঞ্জয়বাবুও, কিন্তু পরক্ষণেই যেন একটু গম্ভীর হয়ে বলতে থাকেন, 'আমরাও তো তা-ই চাই। কে না চায় বলুন। তাই বলে কি আজই সব হবে, না হতে পারে? ধীরে ধীরে আসবে সব। এখনই একস্ট্রিমিস্ট হয়ে কোনো লাভ আছে? একস্ট্রিমিজম মানেই ভায়লেন্স, আর ভায়লেন্স বিগেটস ভায়লেন্স!' বলেই ধনঞ্জয়বাবু এতক্ষণে একটা উঁচুদরের কথা বলতে পেরেছেন ভেবে খুশির হাসি হাসেন।
পর পর দিন কয়েক নতুন করে পড়ল আবার পুরনো পোস্টারগুলো : ছাঁটাই করা চলবে না....জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ চাই। বিদেশী মূলধন বাজেয়াপ্ত কর। ইত্যাকার।
পড়ে—সবাই বুঝি পড়ে। অন্তত আমার গৃহিনীও যে মাঝে মাঝে পড়ে তার প্রমাণ পেয়েছি। কালোবাজারের প্রসঙ্গে সেদিন বেশ প্রাসঙ্গিকভাবেই ঝেঁজে উঠেছিল, 'গভর্নমেন্ট আমার হাতে দিক না সব ভার বুঝিয়ে। তোমাদের ওই চোরাবাজার একদিনেই ঝেঁটিয়ে বিদায় করব দেখে নিয়ো।'
আজকের আসরে নিচের তলার পেছন দিকের ফ্ল্যাটের কালীবাবুও আছেন।
বললাম, 'বাড়িতে আজকাল গিন্নীরাও যে পলিটিক্স শুরু করে দিলে মশায়।'
'দেবে না! কালীবাবু বললেন, এতকাল পলিটিক্স ছিল বাইরে বাইরে। হাল আমলে তা ঘরে এসে ঢুকেছে—একেবারে রান্নাঘরের হাঁড়ির মধ্যে।'
'হ্যাঁ, পেটে টান পড়লে ও বস্তু আপনি আসে।' টিপ্পনী করলেন অধ্যাপক।
চেয়ে দেখি একজন আধা-বয়সী লোক দেয়ালে একখানা পোস্টার লাগিয়ে চলে গেল। মফ:স্বলে কোথায় এক ভুখা মিছিলের উপর পুলিশ লাঠি চালিয়েছে—তারই সংক্ষিপ্ত খবর।
কালীপদবাবু রসিক লোক। তবে মাঝে মাঝে বড় মাত্রা ছাড়িয়ে যান। আরো একটা দোষ আছে। একবার একটা কথা পেলেই—ব্যাস। আর কাউকে কথা বলতে দেবেন না। শুরু করে দিলেন, 'আজকাল ওই এক হিড়িক। কথায় কথায় মিছিল। চাল চাই, কাপড় চাই, হেন চাই, তেন চাই। —কেবল চেয়ে চেয়েই জিততে চায়। ও করে কোনোদিন কিছু হয়েছে, না হবে?'
'ও ছাড়া আর কোন পথ আছে বলুন?'
কালীপদবাবু তার কৃত্রিম ক্রোধের ভাব এবার দ্বিগুণ চড়িয়ে দিয়ে বলেন, আছে মশায়। সোজা, স্পষ্ট পথ। সব দেশের সব যুগের যা একমাত্র পথ।'
'যথা?' প্রশ্ন করে তাঁকে উসকে দিতে চাই।
কালীপদবাবু ফিক করে হেসে গরম সুর হঠাৎ নরম করে আনেন, 'পথ মশাই যা-ই হোক না কেন, তাই বলে এমন সব ছিঁচকাঁদুনের মিছিল। হ্যাঁ, মিছিলের মতো মিছিল বার কর একটা, তবে না।'
'কেমন?'
'এই ধরুন : ট্যাঁকে টাকা আছে—বাজারে কাপড় নেই। সমস্যাটা তো এই? বেশ তো, পাঁচ টাকার আর দশ টাকার নোট গঁদের আঠা দিয়ে জুড়ে জুড়ে এক-একখানা দেড়হাতি গামছা তৈরি করে তাই পরে যা না চলে কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে লাটসাহেবের বাড়ির কাছে। দিগম্বর-দিগম্বরীদের সাইলেন্ট ডেমোনেস্ট্রেশান। শ্লোগানের দরকার নেই। দেখেই বুঝবে : টাকা আছে, কাপড় নেই।
আমি আর অধ্যাপক সলজ্জ বিরক্তি গোপন করে চুপ করে থাকি। ধনঞ্জনবাবু কিন্তু একটুখানি রসালো লেজুড় জুড়ে দিলেন, 'তা করেও কোনো ফল হবে না মশায়। লাট-বেলাটের প্রাসাদে আজকাল যা কেত্তন গানের ধুম, তাতে দূর থেকে বাইনোকিউলার চোখে লাগিয়ে মনে করবে—নব ভারতের নব বৃন্দাবনের যত গোপিনীরা এসেছে।
উৎসাহিত হয়ে কালীপদবাবু বোধ হয় আরো একটু মাত্রা ছাড়িয়ে যাবার মতলবে ছিলেন। বাধা পেলেন।
তেতলার ফ্ল্যাটের ধরণীবাবু আমাদের কাছে এসে সোৎসাহে জানালেন, 'শুনেছেন?'
'কী?'
'কাল সকাল সাড়ে আটটায় আমাদের এই রাস্তা দিয়ে গর্ভনর যাবেন—মনোরমা প্রসূতি ভবনের নতুন ওয়ার্ডের উদ্বোধন করতে।'
আমাদের এতদিনের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো।
সকালবেলা রকে বসে আমরা খবরের কাগজ পড়ছি। এক পুলিশ কনস্টেবল এসে দেয়ালের পোস্টারগুলো ছিঁড়তে লেগেছে। বুঝলাম—তার উপরওয়ালার হুকুম। লাট সাহেবের গমন-পথে কোনোরূপ অবাঞ্ছিত দৃশ্য থাকলে চলবে না।
হঠাৎ রাস্তার একজন লোক কাছে গিয়ে কনস্টেবলের হাত চেপে ধরেছে—তাকে কিছুতেই পোস্টার ছিঁড়তে দেবে না। প্রথমে গালাগাল, পরক্ষণেই হাতাহাতি, তারপর ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। হৈ চৈ শুনে জড়ো হল এক ছোটখাটো জনতা।
রোগাটে লোকটাকে কাবু করতে কনস্টেবলটির বেশি সময় লাগল না। হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে চলল থানায়। অদূরে জনতা থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নি:শব্দে।
এমন সময় মুহূর্তমধ্যে ঘটল এক অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। জনতার মধ্যে থেকে জন দশেক লোক বাজপাখির মতো কনস্টেবলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। স্পষ্ট দেখলাম—তাদের মধ্যে আছে রসুল মিঞা, মোড়ের চায়ের দোকানের বয়টি, স্যাকরার দোকানের সেই কানা কর্মচারীটি, 'রমা ফার্মেসি'র বাইরের বারান্দায় আমেরিকান লজেন্স-বিস্কুট-চকোলেট বিক্রি করে যে বেঁটে ছোকরা সে-ও, এবং আরও জনকয়েক অচেনা অজানা মুখ। বাকি জনতাও টগবগ করছে উত্তেজনায়।
লোকটাকে পুলিশের কবলমুক্ত করে তারা সামনের চৌমাথার দিকে চললো এক বিজয়ী সেনাবাহিনীর মতো।
আমাদের চোখের সামনে চার পাঁচ মিনিটের মধ্যে এমন অনর্থ ঘটবে কে ভেবেছিল।
'গতিক ভালো নয়'—বলে অধ্যাপক উঠে দাঁড়ান। আমরা যে যার ঘরে ফিরে যাই। কেন না থানা বেশি দূরে নয়।
দোতলার ঘরের মধ্যে বসে দেখছি সব। দুই গাড়ি সঙ্গিনধারী পুলিশ এসেছে। নেমেই প্রথমে তারা দেয়ালটা একেবারে সাফ করে দিলে—সিনেমার বিজ্ঞাপনগুলি সুদ্ধ। তারপর দু-ভাগ হয়ে একভাগ চলে গেল মোড়ের দিকে। ভাবলাম—এবার শুরু হবে ধরপাকড় আর খানাতল্লাশ।
মিনিট দশেক বাদে। রাস্তার উপর তোলপাড় কাণ্ড। লাট আসছেন। অসম্ভব ব্যস্ততার সাড়া পড়ে গেছে। ঘন ঘন হুইসিল। হটো, হটো : তফাত যাও : খাড়া রহো : ঠারো উধার : হটো।
রাস্তার দু-ধারে নিরুদ্ধ নি:শ্বাসের মতো থেমে গেছে সব কিছু : চলন্ত গাড়ি, পথচারী ভিখিরি, বেওয়ারিশ বেড়াল-কুকুর-ষাঁড়—সব। সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যেন একটি ভয়ংকর মুহূর্তের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে।
এক, দুই তিন, চার...
নক্ষত্রেবেগে বার হয়ে গেল গভর্নরের গাড়ি।
বিকেলে আপিস থেকে বাসায় ঢুকে সিঁড়ির মুখে প্রশ্ন করি গৃহিণীকে, 'তোমার ছেলে বাসায়?'
'হ্যাঁ।'
'আজ কোথাও যায়নি তো?'
'না গো, স্কুল থেকে সোজা বাড়ি ফিরেছে।'
নিশ্চিন্ত হই।
সন্ধ্যার পর ধনঞ্জয়বাবু তাঁদের দোতলার বারান্দা থেকে ডাকলেন। আমাদের বারান্দার এক কোণে গিয়ে রেলিঙ-এ ভর করে মুখ বাড়িয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে প্রশ্ন করি, 'মহীতোষ ফিরেছে?'
'না। সে জন্যেই তো ভাবনায় পড়েছি। বলে গেছে, খেলার মাঠে যাচ্ছি। হতভাগাকে এত বলি, তবু রোজ রাত করে বাসায় ফিরবে।'
ওপারে দেয়ালের কাছে একজন কনস্টেবল মোতায়েন রয়েছে সকালবেলার ঘটনাস্থলে। সারারাত পাহারা দেবে নাকি?
তেমনি অনুচ্চ কণ্ঠে বলি, 'মহীতোষকে এলে বলবেন—অবজেকশনেবল কাগজপত্তর কিছু থাকলে আজ রাত্তিরেই সব যেন সরিয়ে ফেলে।'
'না, সে ভয় নেই'—ধনঞ্জনবাবু অভয় দেন, 'যত বড় বড় কথা ওর মুখেই। —আমরাও এক কালে বলেছি মশায়। যাক, আজ থেকে পড়াটা ঠান্ডা হবে আশা করা যায়। শেষপর্যন্ত কজন প্রেপ্তার হলো জানেন?'
'সতেরো জন।'
পরদিন সকাল বেলা। যথাসময়ে নিচে যেতেই পরেশবাবু অঙ্গুলি সঙ্কেত করে বললেন, 'দেখছেন তো? রাতারাতি কী কাণ্ড।'
'হুঁ। ভোরবেলা বিছানায় বসে বসেই দেখেছি সব।'
আবার পোস্টারে পোস্টারে দেয়ালের গায় কোথাও একটুকু ফাঁক নেই।
'ইঁদুরের রাজত্বি শুরু হলো মশায়—ইঁদুরের রাজত্বি?' ধনঞ্জয়বাবু সভয় বিস্ময়ে বললেন, 'বীজ ছড়াচ্ছে—সর্বনেশে মহামারীর বীজ!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন