অতি সাধারণ ঘটনা

সমরেশ মজুমদার

মানুষের মাথা যে এমন করিয়া কাঠের উপরে ঢুঁ মারিতে পারে এই লাইনের 'বাসে' না উঠিলে তাহা কখনই জানিতে পারিতাম না। উঁচু-নীচু রাস্তায় বাসখানা এক-একবার হুঁচোট খায় আর আট-দশটা মাথা ছাদের কাঠের তক্তায় গিয়া আঘাত করে। কাঠও ফাটে না, মাথাও ভাঙে না—দুই-ই সমান শক্ত! আমি মাথায় ছোটো, আমার মাথা ততদূর পৌঁছায় না বটে, কিন্তু সম্মুখবর্তীর পিঠে গিয়া গুঁতা মারে, গুঁতাটাকে সে আগে চালান করিয়া দেয়, এমনি করিয়া গুঁতাটা অগ্রসর হইতে হইতে গতির তীব্রতা হারাইয়া ফেলিয়া প্রথম সারির লোকের একটা শির:কম্পনে গিয়া অবসিত হয়। বাসের গায়ে পুরাতন অক্ষরে লেখা আছে বটে ষোলোজন যাত্রী বসিবে, কিন্তু আমরা প্রায় পঞ্চাশজন লোক বসিয়া, দাঁড়াইয়া, বাঁকিয়া, দুমড়াইয়া, ঝুলিয়া এবং দুলিয়া চলিয়াছি; পঞ্চাশজন এবং পঞ্চাশজনের আনুসঙ্গিক পোঁটলা পুঁটলি। ভিড়টা এমনই সূচীভেদ্য যে সহযাত্রীদের কাহারো পূর্ণ মূর্তি দেখিবার সুযোগ নাই। কাহারো চেহারার সিকি, কাহারো দু-আনা, কাহারো মাথা, কাহারো জুতা মাত্র দেখিতেছি। আবার, একজনের দেহটাকে অনুসরণ করিয়া আর একজনের পায়ে গিয়া দৃষ্টি ঠেকে একজনের হাতটাকে অনুসরণ করিলে আর একজনের কাঁধে গিয়া পৌঁছায়—গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো অবধি যখন এইভাবে ঝুলিয়া থাকা ছাড়া গত্যন্তর নাই, কাজেই ওই এক ধাঁধার মীমাংসা লইয়া কাটাইতেছি। পা দুখানা এত পুষ্ট মুখখানা রোগা! পা এবং মুখ একই জীবের কিনা মীমাংসা করিতে ব্যস্ত এমন সময়ে কাঠামো সুদ্ধ একবার নড়িয়া গেল, আর একটু হইলে একখানা মিলিটারি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়াছিল আর কি। ধাক্কা না দিলে কাহারো বাঁচিবার আশা ছিল কি?—পথের পাশেই গভীর নালা। বোধকরি কেহই বাঁচিত না। মুখ তুলিতেই বাসের দেয়ালের গায়ে লেখা চোখে পড়িল—‘No chance’—কী সর্বনাশ! কোম্পানি তো স্পষ্ট করিয়া সতর্কবাণী লিখিয়া রাখিয়াছে—নো চান্স! সেরকম ব্যাপার দেখিতেছি তাহাতে 'নো চান্সই' বটে তো! কোনওরকমে একবার নামিতে পারিলে হয়। পরে জানিয়াছি ‘No chance’ নয় ‘No change’—অর্থাৎ ভাঙানি পাওয়া যাইবে না। কিন্তু G-টা ‘C-এর মতো দেখায়—লেখাটা বোধহয় দ্ব্যর্থক।

এমন সময়ে নর-ব্যূহের অবকাশে একখানা হাতের মণিবন্ধের অংশ চোখে পড়িল। আর কিছু দেখা যাইতেছে না। ধাঁধার মীমাংসায় আবার লাগিয়া গেলাম—এ মণিবন্ধ যার, তার মুখ কোথায়? মণিবন্ধটা কোমল, সুকুমার, বর্ণ উজ্জ্বল! কিশোর বালকের হওয়াই সম্ভব। এমন সময়ে একটা গুঁতার ফলে সম্মুখে ঝুঁকিতে বাধ্য হইলাম—তখনই চোখে পড়িল মণিবন্ধের প্রান্তে একখানি শাঁখা। তবে তো বালিকার হাত, আর একবার হুঁচোট—আরও একটু অগ্রসর হইতেই চোখে পড়িল শাঁখার নীচেই একখানি লোহা। এবারে আর সন্দেহ নাই যে বিবাহিতা স্ত্রীলোকের ওই মণিবন্ধ। তার মুখখানা বোধকরি ওই পাঞ্জাবীদ্বয়ের দাড়ির মেঘের আড়ালে অন্তর্হিত। এমন সময়ে গোটা দুই আচ্ছা রকম ধাক্কা দিয়া বাসখানা থামিয়া গেল। একটা স্টেশন। এই লাইনের ইহাই উপান্ত স্টেশন। অধিকাংশ লোক ভারতীয় বহু জাতির বিচিত্র প্রতিনিধির দল—দাড়ি, পাগড়ি, টুপি, টিকি, টাক ও পোঁটলা পুঁটলি লইয়া প্রস্তরখণ্ডবাহী জলস্রোতের মতো সবেগে নামিয়া গেল। বাস প্রায় খালি—এতক্ষণে বসিবার জায়গা পাওয়া গেলো।

বসিয়া পড়িলাম। হাত, পা, ঘাড়, মাথা সব যেন আর কাহারো। বাঁকিয়া চুরিয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে থাকিতে সব অবশ হইয়া গিয়াছিল। হাত পা টান করিয়া ঘাড়টাকে কয়েকবার ঘুরাইয়া চেতনা ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টায় নানারূপ কসরত করিতেছি। ঘাড়টাই সবচেয়ে অসাড় হইয়াছে—বারংবার দুই বিপরীত দিকে ঘুরাইয়া লইতেছি। একবার ঘাড় ঘুরাইতেই পাশের দিকের বেঞ্চিতে একটি মেয়ের উপরে চোখ পড়িল। কচি বয়স, সিঁথায় সিঁদুর, মুখে কচি ডাবের শ্যামল সৌকুমার্য এবং অনবদ্য স্নিগ্ধ রমণীয় একটি নিটোলতা; শ্যামল বাংলার শ্যামা বালিকা।

লাবণ্য মসৃণ দুখানি বাহু ক্রমশ সূক্ষ্ম হইয়া অবশেষে পাঁচটি নীরব আঙুলে পর্যবসিত হইয়াছে। কোমল মণিবন্ধে শুধু একখানি করিয়া শাঁখা ও লোহা।

ও:, তবে ইহারি মণিবন্ধের অংশ জনতার অবকাশে চোখে পড়িয়াছিল! কিন্তু ঘাড়টা এখনো স্ববশে ফেরে নাই—এখনো মাঝে মাঝে ঘুরাইতেছি। একবার মেয়েটিকে চোখে পড়ে আর একবার পথের পাশের কৃষ্ণচূড়ার অফুরন্ত পুষ্পিত আবীরের ছটা। হঠাৎ মনে হইল কিন্তু একি! মেয়েটি বিবাহিত অথচ হাতে কোনও অলংকার নাই কেন? বাংলাদেশের বিবাহিত মেয়ে যতো গরিবই হোক না কেন, আর মেয়েটিকে তো চেহারায় ও পোশাকে মধ্যবিত্ত ঘরের বলিয়াই মনে হয়, দু-একখানা সোনার অলংকার পরিয়াই থাকে। একটা রুলি, দুখানা চুড়ি, যা সকলেরই জোটে, বিবাহের সময়ে এই সামান্য অলংকার না পায় এমন মেয়ে বাংলাদেশে বিরল, ইহার কি তাহাও জোটে নাই? ইহার দারিদ্র্য কি এমনি অসাধারণ! অথচ মেয়েটির মধ্যে আর কোনো অসাধারণত্ব চোখে পড়ে না। কিংবা এমনও হইতে পারে যে, অলংকারগুলো কোনও আসন্ন বিপদের পথে রোধ করিতে গিয়াছে? এই অল্প বয়সে এমন কি বিপদ ইহার ঘটিল যাহাতে শাঁখা ও লোহা ছাড়া সব খুলিয়া দিতে হইয়াছে? ওই রিক্ত মণিবন্ধের নিরঞ্জন কোমলতা কেবলই মনের মধ্যে খোঁচা দিতে লাগিল। অলংকারের মধ্যে মেয়েদের ইতিহাস নিহিত—তাহাদের সৌভাগ্যের দুর্ভাগ্যের এবং পতনের।

বাস শেষ স্টেশনে আসিয়া থামিল। এখানে একটি প্রসিদ্ধ যক্ষ্মানিবাস অবস্থিত। যাহারা আসে—এই যক্ষ্মানিবাসের আত্মীয় স্বজনকে দেখিতেই আসে। অন্য কাজে বড়ো কেহ আসে না। মেয়েটি নামিল—হাতে ছোট একটি ফলের পুঁটুলি। আর পাঁচজনের সঙ্গে সে অদূরস্থিত যক্ষ্মানিবাসের দিকে দ্রুতপদে চলিয়া গেল। অমনি এক বিদ্যুতের ঝলকে তাহার মণিবন্ধচ্যুত অলংকারের ইতিহাসে বেদনার বহ্নি-ভাষায় আমার মনে উচ্চারিত হইয়া গেল। কোথায়, কেন সেই অলংকারগুলি গিয়াছে বুঝিতে বিলম্ব হইল না। লুপ্ত অলংকারের মধ্যে তাহার গুপ্ত ইতিহাসের একটা আভাস পাওয়া গেল। গাছপালার আড়ালে পথের বাঁকে মেয়েটি অন্তর্হিত হইয়া গেল, কিন্তু আসন্ন অস্ত আভায় করুণ তাহার সেই মুখ, শঙ্খমাত্রসহায় অনন্য অলংকার, সেই শূন্য মণিবন্ধ, কিছুতেই ভুলিতে পারিলাম না। অনেকদিন ধরিয়া এই দুটি ছবি আমার চেতনার মধ্যে সূচী চালনা করিয়া বেদনার কন্থা বুনিয়া যাইতে লাগিল। ভাবিলাম যক্ষ্মানিবাসে গিয়া একবার খোঁজ করিলেই তো সব জানা যায়—সব জানাতেই সব কৌতূহলের পরিসমাপ্তি! কিন্তু তাহা আর সম্ভব হইল কোথায়? ভাবিলাম, নিজের মনেই মেয়েটির ইতিহাস রচনা করিয়া কৌতূহল শান্ত করি না কেন? তাহার ইতিহাসের কাঠামোটা তো সর্বজনবিদিত—তাহার ভাগ্যে নূতন আর কি ঘটিবে? তাহার ব্যক্তিগত বেদনার মেঘের মধ্যেই তো সহস্রের অশ্রুজল সঞ্চিত হইয়া আছে! তাহার অজ্ঞাতে তাহার কাহিনি রচনা স্থির করিয়া ফেলিলাম। দু:খের চক্রাবর্তনে তাহার কাহিনী শিল্প-সামগ্রী হইয়া উঠিল। শিল্পেই পূর্ণতা—পূর্ণতাই শান্তি।

অতি সাধারণ ঘটনা, অতি সাধারণ মানুষ। অমিত আর শমিতার মাথা ভিড়ের মধ্যে তলিয়ে যাবার মাপে বিধাতা তৈরি করেছিলেন বলেই হোক, আর ইচ্ছার অভাবেই হোক, কখনো তারা ভিড়ের ঊর্ধ্বে নিজেদের মাথা উদ্ধত করে তোলেনি। পাহাড়ের সানুতে দৃষ্টির অতীত সে-সব শিলাখণ্ড পড়ে থাকে, তারাও একদিন অগ্ন্যুৎপাতের ঠেলায় অন্তিম ভাস্বরতায় আকাশপথে উৎক্ষিপ্ত হয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—অমিত শমিতার ভাগ্যে এমন কি সেই বেদনার দ্যুতিরও সৌভাগ্য ছিল না, বিধাতা নিতান্তই কৃপণ হাতে তাদের গড়েছিলেন। তারা ছিল ইতিহাসের রাজপথে 'ক্যাম্পফলোয়ার'—যেখানে কেবল রাজা মন্ত্রী পাত্র মিত্রকেই চোখে পড়ে, বাকি অগণ্য লোক যেখানে নগণ্য; তারা জন নয়, জনতা মাত্র।

অমিত-শমিতার নাম একসঙ্গে করলাম বটে, এক জায়গায় তাদের জীবনে গ্রন্থিও পড়েছিল সত্য, কিন্তু বরাবর তারা এমন এক ছিল না। গোড়া থেকে এক থাকলে মাঝখানে এক হবার আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত হত। বিধাতা তাদের নগণ্য করেছিলেন কিন্তু নিরানন্দ করেননি।

অমিত-শমিতার বিবাহের কথারই আভাস দিলাম! আধুনিক মতে স্ত্রী এক, পুরুষ এক; বিবাহে একে একে গ্রন্থি বেঁধে মিলন হয় বটে কিন্তু সে দুইয়ের মিলন; সংসারের উচ্চাবচ পথে একটু জোর হুঁচোট খেলেই গ্রন্থি ছিঁড়ে মিলিত দুই আবার হয়ে যায়—এক আর এক। আধুনিক মতে স্ত্রী আর পুরুষ আধ; বিবাহের হোমানলে দুই আধ দলিত হয়ে একে পরিণত হয়। সংসারের আবর্তে তাতে টান পড়ে বটে, কিন্তু ভিন্ন হবার কথাই ওঠে না;—রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়, আধে আধে পূর্ণতা ঘটেছে যে!

অমিত-শমিতার বিবাহ হল। কিন্তু অমনিতে হয়নি। প্রজাপতি অবশ্য অনুকূল ছিলেন কিন্তু প্রজাপতির গুটি থেকে ঠিক কতোখানি স্বর্ণসূত্র পাওয়া যাবে তা পরিমাপ করার ভার যাঁর উপরে, তিনি হয়ে দাঁড়ালেন প্রতিকূল। অমিতের পিতা অর্ধেন্দুবাবু একালের নতুন বোতলে সেকালের পুরানো মদ। ছিপি না খোলা পর্যন্ত হালের চোলাই বলে মনে হয়, কিন্তু ছিপি খুললেই বেরিয়ে আসে মনুসংহিতার গন্ধ। সেকালের মদ বলল, পুত্রের বিবাহের কর্তা পিতা; একালের বোতল বলল, দেখোই না, ছেলে যদি নিজের শক্তিতে সোনার খনি আবিষ্কার করেই ফেলে—অত গোল করা কিছু নয়। তখন মদে বোতলে আপস হয়ে গিয়ে গ্রামের তারিণীচরণকে চিঠি লিখে দিলো—ব্যাপারটা একবার খোঁজ খবর করা দরকার। তারিণীচরণ অর্ধেন্দুবাবুর গ্রামের লোক—থাকে কলকাতায়, যেখানে এখন রয়েছে অমিত এম-এ পাঠের উপলক্ষ্যে। তারিণীচরণের চিঠি এল—শমিতারা জাতের এক-আধ ধাপ নীচে হলেও তা চোখ বুজে সহ্য করবার মতো—কারণ গুটিতে স্বর্ণসূত্রের দৈর্ঘ্য নেই বললেই হয়। তারিণীচরণ আবগারী বিভাগের লোক—জানে যে সত্যে পৌঁছবার পথ অত্যুক্তি। অর্ধেন্দুবাবু চোখ বুজেই রইলেন, সব জেনেও কিছু জানলেন না, বরঞ্চ না জানার পথ খোলা রাখবার জন্যে পুত্রকে একখানি চিঠি লিখে 'ফর্মাল প্রটেস্ট' জানালেন, অথচ তার ভাষা এমন হল না, যাতে বিবাহ ভেঙে যাবার আশঙ্কা আছে। অতএব অর্ধেন্দুবাবুর অনুপস্থিতিতেই অগত্যা অমিতের সঙ্গে শমিতার বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল।

ওরা ছিল এক কলেজের পড়ুয়া। কলকাতায় তখন সবে দ্বৈতী শিক্ষার ধারা স্বর্গলোক থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। স্ত্রী-পুরুষের দ্বৈতী ধারার মিলনে কলেজের কলরোল নদনদী সঙ্গমের কলধ্বনিকে ছাপিয়ে গিয়েছে। কিছুদিন এমন চলবার পরে কর্তৃপক্ষের মনে কি হলো, যার ফলে দ্বৈতী শিক্ষা অদ্বৈতপাঠে পরিণত হল। মেয়েদের সময় ধার্য হল সকালে; ছেলেদের দুপুরে। তবু ওই এগারোটার কাছে ঘেঁষে রইল একটা দেখা-শোনার দিগন্ত।

অমিত শমিতা মাত্র এক বছর দ্বৈতসাধনার সুযোগ পেয়েছিল—তারপরে এল এই অসি-পত্রের ব্যবধান। প্রেম দুর্মর, সহজে তার অঙ্কুর মরতে চায় না। বাস্তব থেকে উৎপাটিত মূল হয়ে গেলেও আশার মধ্যে বায়ুজীবীরূপে বেঁচে থাকে। অমিত-শমিতার আশা রইল—কলেজের গণ্ডি পার হতে পারলে আবার শিক্ষা জগতের পরলোক অর্থাৎ পোস্ট গ্রাজুয়েটে গিয়ে দেখা হবে। সেখানে বিরহের আশঙ্কা নেই। হলোও তাই। কিন্তু এখানে একটু কৈফিয়ত দেওয়া প্রয়োজন মনে করি। কলেজের সীমাতেই তাদের সম্বন্ধে প্রেম শব্দটা প্রয়োগ উচিত হয়নি—কারণ সে অনুভূতি ওখানে তাদের ঘটেনি। অমিতের কথাই বলি। সে প্রথমে দেখতো প্রেমের একান্তে একগুচ্ছ মেয়ে—সকলকে একসঙ্গে চোখে পড়ত অর্থাৎ কাউকেই চোখে পড়ত না। এ সেই যুধিষ্ঠিরের অস্ত্রপরীক্ষার ব্যাপার আর কি! যুধিষ্ঠির তো শুধু পাখিটাকে দেখেননি, গাছ এবং আকাশের সঙ্গে এক করে পাখিটাকে দেখেছিলেন বলেই তিনি দ্রোণাচার্যের 'ফেল করা' ছাত্র! তারপরে অমিত এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা অনুভব করল। মাঝে মনে হতো সব মেয়েই এসেছে—তবু যেন ওদিকটা শূন্য—সবই আছে, তবু কি যেন নেই। কেউ যদি তখন তাকে রহস্যে বলে দিত যে, অমিত একেই বলে প্রেমের পূর্বাভাস, তবে সে কথাটা নিশ্চয়ই হেসে উড়িয়ে দিত। যখন এইরকম চলছে, অর্থাৎ ক্লাসের স্বাদ—বিস্বাদ, এমন সময়ে হঠাৎ সে করিডোরে শমিতাকে দেখতে পেল। চমকে উঠল, সে যে এক আবিষ্কার।—আমেরিকার ডাঙা চোখে পড়বার আগে তার ভাঙা ডালপালা সমুদ্রে দেখে কলম্বাস যেমন চমকে উঠেছিলেন! অমিতের মনে হল, তাই তো! এই মেয়েটিই তো ক্লাসের লাবণ্য, যার অভাবে সমস্ত এমন বিস্বাদ বোধ হচ্ছে। পরীক্ষা করতেও বিলম্ব হল না। তার পরদিন ক্লাসে শমিতা এল, অমিতের মনে হল—ক্লাস যে শুধু হৃদ্য হয়েছে তা নয়, এতক্ষণে পূর্ণ হল। এতদিনে সে জনতা ভেদ করে বিশেষ একটি জনকে দেখতে পেল। এবারে সে অস্ত্রপরীক্ষায় যুধিষ্ঠিরের স্থান থেকে অর্জুনের স্থানে ডবল প্রমোশনে উন্নীত হল।

তারপরে এল তারা পোস্ট গ্রাজুয়েটের ক্লাসে। সেখানে প্রতিদিন প্রেমের নূতন নূতন অভিজ্ঞতা কচি গাছের নূতন কিশলয়ের মতো খেলতে লাগল তাদের হৃদয়ে। কিন্তু অমিত-শমিতার প্রেমের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে আমি বসিনি তো। আর বসলেই বা কি হত? এমন কোনও অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে ঘটেনি যাকে নতুন বলা যায়। বিধাতা যে তাদের প্রতি অকৃপণ নন, সে তো গোড়াতেই বলে রেখেছি। জগতের আদি যুগে কোনও প্রবল জ্যোতিষ্ক আর একটা গ্রহের কাছ ঘেঁষে চলে যাবার সময়ে তার হৃদয়ে আগুনের জোয়ার জাগিয়ে দিয়ে যেত, কিন্তু নিজে ধরা দিত না। অনেকেরই প্রথম প্রেমের অভিজ্ঞতা ওই জাতীয়। জ্যোতিষ্কের টানে হৃদয়ে জোয়ার জাগে—কিন্তু না দেয় ধরা, না পারে ধরতে। কিন্তু ওরা প্রথমবারেই পরস্পর পরস্পরের কাছে ধরা দিল। অমিত-শমিতা বিবাহে প্রতিশ্রুত হল।

শমিতার সংসারে ছিলেন বিধমা মা। হিন্দু সংসারে স্ত্রীর মূল্য শূন্য, কিন্তু স্বামীর পাশে অধিষ্ঠিত হবার ফলে তার মূল্য যায় বেড়ে। সেই স্বামীর অবর্তমানে আবার সে শূন্যতায় পর্যবসিত হয়। শমিতার মার মূল্য এখন শূন্য। তাঁর হাতে কিছু টাকা ছিল, কিন্তু টাকাকে মূলধন করে কীভাবে সংসারে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াতে হয়, সে কৌশল তাঁর জ্ঞাত ছিল না। বিশেষ ও টাকাকে তিনি মেয়ের সম্পত্তি বলেই জানতেন—সংসারে তাঁর আর কেউ তো নেই। তিনি বিবাহে খুশিই হলেন।

ওদের বিবাহ হয়ে গেল। বলা বাহুল্য, অর্ধেন্দুবাবু এলেন না—কেন না বিবাহে উপস্থিতিতে বিবাহকে কতখানি স্বীকার করে নেওয়া হয়, সে সম্বন্ধ তাঁর সন্দেহ ছিল—অথচ মনে মনে অনিচ্ছা ছিল না, কাজেই এ দুয়ের সামঞ্জস্য করবার উদ্দেশে বিবাহে হলো তাঁর কূটনৈতিক অনুপস্থিতি।

বিবাহের পরে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ওদের সম্মিলিত জীবনে ঘটলো। অমিত সামান্য একটা চাকুরি পেল আর শমিতার মা মারা গেলেন। যাইহোক, ইতিহাসের পাতার বাইরে অগণ্য লোকের জীবনস্রোত বইছে, তাদের সঙ্গে মিলিয়ে তাদের জীবনও চলা শুরু করল—কখনও বা দু:খের কালো পাথার ডিঙিয়ে, কখনও বা উচ্ছল হাসির অজস্রতায় আর কখনও বা পঙ্কিল আবর্তনের মন্থন সহ্য করে।

ওদের একটি দু:খ ছিল যে অর্ধেন্দুবাবু এলেন না। কিন্তু সে দু:খ দীর্ঘকাল রইল না। অর্ধেন্দুবাবু এলেন না বটে, কিন্তু তার পত্র এল। সে পত্রের ছত্রে ছত্রে পুরাতন মদের ছিটা। অর্ধেন্দুবাবু পুত্রের অবিমৃষ্যকারিতার জন্য তাকে তিরস্কার করেছেন। প্রাচীনকালের রাম ও পরশুরাম প্রভৃতি প্রাত:স্মরণীয় ভদ্রলোকগণ পিতৃআজ্ঞা পালনের জন্য কত কি অপ্রত্যাশিত কাজ করতে কুণ্ঠিত হননি—তার দীর্ঘ ফর্দ সেই পত্রে রয়েছে। অবশেষে আছে পিতার প্রতি পুত্রের কর্তব্যের স্মারক। অর্ধেন্দুবাবু উদারভাবে লিখেছেন যে, যদিচ বধূমাতার জলগ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তত্রাচ অমিত যদি তাঁকে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠায় তবে তা তিনি গ্রহণ করতে সম্মত আছেন।

চিঠি পড়ে শমিতা বলল—মার তো কিছু টাকা আছে, তাই থেকে মাসে মাসে কিছু পাঠালেই হয়।

অমিত বলল—তা কি হয়? আমি দেখি কি করতে পারি। সে কাজের উপরে খুচরো আর একটা কাজ জোগাড় করে নিলে এবং উদ্বৃত্ত অর্থ পিতাকে পাঠাতে লাগল। এতে তার খাটুনি বেড়ে গেল। স্বাস্থ্য তার কোনওদিনই ভালো ছিল না, এখন তাতে ঘাটতি দেখা দিতে শুরু হল।

শমিতা বলে—তুমি কাজ ছেড়ে দাও, ওই টাকা থেকে পাঠালে চলবে।

অমিত বলে,—ও টাকাও তো আমার, প্রয়োজনকালে ও টাকা কাজে লাগবে। এখন চলছে—চলুক।

অর্ধেন্দুবাবু টাকা পেয়ে খুশি হলেন, কিন্তু সন্তুষ্ট হলেন না। যে এতো দিচ্ছে সে আরও দিতে পারত, এই চিন্তা তাঁকে অসন্তুষ্ট করে রাখল। একটা না একটা উপলক্ষ্য করে তিনি টাকার দাবি চড়িয়ে যেতে লাগলেন, অমিতও সাধ্যাতীত পরিশ্রম করে চাহিদা মিটিয়ে যেতে লাগল। অর্ধেন্দুবাবু মনে-মনে হাসেন, বৈবাহিক তাঁকে ঠকিয়াছিল বটে, এখন তিনি তার সঞ্চিত স্বর্ণসূত্রে টান দিচ্ছেন আর হাসছেন বিধাতা পুরুষ, অর্ধেন্দুবাবু স্বর্ণসূত্র উপলক্ষ্য করে নিজে পুত্রের স্বাস্থ্যে টান দিচ্ছেন, দেখতে পেয়ে।

দুই

অবশেষে ডাক্তারে একদিন স্পষ্ট করে বলতে বাধ্য হল যে, রোগটা টি বি বলেই মনে হচ্ছে, তবে কিনা ভগবান আছেন। বাঘে যখন ধান খায় আর ডাক্তারে যখন ভগবানের নাম উচ্চারণ করে, তখন বুঝতে হবে সর্বনাশের আর অধিক বিলম্ব নেই।

সেদিনও প্রতিদিনের মতো অমিত আপিসে বেরুতে উদ্যত হচ্ছিল, শমিতা একেবারে দরজা রোধ করে দাঁড়াল। বলল,—তুমি কি সর্বনাশের কিছুই বাকি রাখবে না!

অমিত বললে,—কিন্তু চাকরি না করলে চলবে কি করে?

শমিতা বলল,—তুমি চলে গেলে আমার চলে কি সুখ?

শমিতা চাপা মেয়ে—এর বেশি বলা তার স্বভাবসিদ্ধ নয়। অমিত বুঝলো যে ওই কথা কয়টিতে আর দশজন মেয়ের অনেক কান্না, অনেক মাথাকোটা ঘনীভূত হয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে রয়েছে। অগত্যা সে বেরুবার আশা ছাড়ল।

তবু অমিত আর একবার বলবার চেষ্টা করল—শমি, চলবে কেমন করে?

শমিতা শুধু বলল,—সে আমি দেখব, মেয়েরা যখন 'দেখব' বলে, তারা সত্যিই দেখে। পুরুষের মুখে ওটা একটা কথার মাত্রা মাত্র। অমিত শয্যাগ্রহণ করতে বাধ্য হল; শমিতা সংসারের ভার তুলে নিলো।

যক্ষ্মা ব্যাধিটা রাজকীয় ব্যাধি। প্রাচীনকালে রাজারা মানুষের দণ্ডাতীত ছিলেন। তাই তাদের দণ্ডিত করবার জন্যে অদৃষ্ট এই ব্যাধিটির সৃষ্টি করেছিল। সেই জন্যেই তো ওর পুরো নাম রাজ-যক্ষ্মা। কিন্তু যেহেতু আধুনিক গণতন্ত্রের যুগে প্রত্যেক মানুষই একটি ছোটোখাটো রাজা, ওই ব্যাধিটা তাই ক্ষুদে রাজাদের ঘাড়ে এসে চেপেছে। কিন্তু স্বভাব বদলাতে পেরেছে কি? ওকে রাজকীয় আড়ম্বরে চিকিৎসা করতে হয়। সে সামর্থ্য আছে ক'জনের? আবার লোকে ব্যাধির পূর্ব কৌলীন্য ভুলতে পারেনি; কাজেই যক্ষ্মাবাসগুলোতে খরচের উদারতা ঘটিয়ে সাধারণের আয়ত্তের বাইরে করে রেখেছে।

শমিতা সংসারের ভার নিয়ে দেখলে আয় বাড়াবার একমাত্র উপায় খরচ কমানো। শ্বশুরের মাসোহারার দিকেই তার প্রথম দৃষ্টি পড়ল। শমিতা অনেক ভেবেচিন্তে রাত জেগে অর্ধেন্দুবাবুকে সব অবস্থা জানিয়ে একখানা চিঠি লিখে ফেলল। শ্বশুরকে এই তার প্রথম চিঠি। অর্ধেন্দুবাবুর উত্তর এলো কিন্তু তা অমিতের নামে, তাতে পুত্রবধূর উল্লেখ পর্যন্ত নেই। পিতৃ-আজ্ঞা লঙ্ঘন করে বিবাহ করবার দণ্ডস্বরূপ এই ব্যাধি যে তাকে আক্রমণ করেছে—একথা তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। অদৃষ্টের উপরে তাঁর হাত নেই। পুনশ্চ জানিয়ে লিখেছেন এখন থেকে অমিত যেন তাঁর মাসোহারা চুনারের ঠিকানায় পাঠায়, ওখানকার স্বাস্থ্য ভালো বলে তিনি সেখানে কিছুকাল থাকবেন। শমিতা চিঠিখানা পড়ে ছিঁড়ে ফেলল, অমিতকে কিছু জানাল না।

অমিত মাঝে মাঝে শুধাত—বাবার টাকা নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে কি না? শমিতা বলত, হচ্ছে বই কি। কি করে যে হচ্ছে অমিত আর তা জানবার জন্যে পীড়াপীড়ি করত না। এই মিথ্যাকথাটা বলে শমিতা এমন আনন্দ পেল, মহা সত্য কথা বলেও তেমনটি কখনো সে পায়নি।

ওদের সংসার কেমন করে চলে সে প্রশ্ন অবান্তর, কারণ সংসার চলে না চালাতে হয়। শমিতা কিছু কিছু সঞ্চয় করেছিল, তার সঙ্গে মায়ের টাকা যুক্ত হয়ে একরকম করে তাদের দিন চলে যায়—যাতে ভিতরে ভিতরে টান পড়ে অথচ বাইরে টোল খায় না।

অমিতের রোগ সারবার নয়, কিন্তু হয়তো কমত যদি মনে তার দুশ্চিন্তা না থাকত। সে যে অসহায় একটি মেয়ের ঘাড়ে নিজের ভার তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে, এই গ্লানি তাকে ভিতরে-ভিতরে চাবকাচ্ছিল। তাদের বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকে শমিতা কতবার চাকুরি করতে চেয়েছে—অমিত হেসে জবাব দিয়েছে, তুমিও যদি আয়ের পথ দেখো, তবে খরচ করবে কে? অমিত কিছুতেই তাকে চাকুরি করতে দিতে সম্মত হয়নি—ওতে তার পৌরুষ ব্যথা পেয়েছে। এখন তাই শমিতা চাকুরি করবার প্রস্তাব আর পাড়েনি, জানত ওতে তাকে মর্মান্তিক কষ্ট দেওয়া হবে। কিন্তু সেদিন হঠাৎ অমিতই তাকে চাকুরি নেবার জন্যে অনুরোধ করল। বলল—শমি, একটা ভালো চাকরির বিজ্ঞাপন দেখছিলাম, একবার চেষ্টা করে দেখো না। এই কথা শুনে শমিতার চোখ ছলছল করে উঠলো, তার কাছে কি লুকানো থাকবে না—কত দু:খ, কত সংস্কার দমন করে তবে ওই প্রস্তাব অমিত করতে পেরেছে? অমিত তখন কি দেখছিল? দেখছিল সকালবেলার স্থলপদ্মের পাপড়ির মতো শাড়িখানা পরে শমিতা সবে ফিরেছে, গ্রীষ্মের দুপুর তখন আড়াইটে, রৌদ্রের তাপে গাল দুটিতে তপ্ত আভা, কপালে অশাসিত চূর্ণ কুন্তল নানা বিচিত্র রেখায় লিপ্ত, কণ্ঠে স্বেদবিন্দুর মুক্তার পাঁতি, চোখের কোণে ঈষৎ রক্তিমা। অমিত দেখলো, শমিতা সুন্দর। বাস্তবিক রৌদ্রে ঘুরে না এলে মেয়েদের সত্যিকার সৌন্দর্য খোলে না!

অমিত ভাবলো, এখন তার বৃথা পৌরুষের গর্ব কি হবে? শমিতা চাকুরি নিলে আয়ের পথ প্রশস্ত হয়ে তার দুশ্চিন্তা কমবে।

শমিতা বললে, সে কি হয়! এখন চাকরি করতে গেলে তোমাকে দেখবে কে? আসলে দেখবার সময়ের অভাবটা সত্য নয়। যে কষ্ট সুস্থ সময়ে অমিতকে সে দিতে পারেনি, অসুস্থতার মধ্যে তা দেবার কল্পনাও শমিতার কাছে অসহ্য। কাজেই শমিতার আর চাকরি করা হলো না। ওদের সংসার কি করে চলে? সংসার চলে না—সংসারকে চালাতে হয়।

তিন

এইরকমে সুখে-দু:খে যখন ওদের জীবনযাত্রা চলছিল তখন অমিতের দেহের যক্ষ্মার জীবাণুগুলো নিশ্চিন্তে বসে ছিল না। এ অন্ধ রোগ-বীজাণুর শ্রেষ্ঠ আবাস মানুষের দেহ বটে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাদের হৃদ্যতার কোনও সম্বন্ধ নেই। তারা দিনরাত্রি মানুষের স্নেহ-দয়া-মায়ার প্রতি সম্পূর্ণ অন্ধ নিরপেক্ষতায় নিজেদের ধ্বংসমূলক কাজ করে যায়। নিরন্তর তারা মানুষের ফুসফুসে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে চলেছে—জীবন থেকে মৃত্যুতে পৌঁছবার নিশ্চিততম সরলতম একান্ততম পথ। ওরা স্নেহহীন, দয়াহীন, মায়ামমতাহীন, ওরা অন্ধ, অজ্ঞান, সম্পূর্ণ এক স্বতন্ত্র জগতের অধিবাসী। মানুষের বুকের মধ্যে আর এক বিচিত্র জগৎ, মানুষের জগৎ বীজাণু জগৎ এমন সমান্তরাল যে কোনওকালে তাঁদের মিলিত হবার সম্ভাবনা নেই। তারপরে হঠাৎ একদিন দুই সমান্তরাল রেখা এক জায়গায় গিয়ে থেমে যায়—একই সঙ্গে দুইয়েরই চিরাবসান।

এমন সময়ে শমিতার এক আত্মীয় শহরের নিকটের এক যক্ষ্মাবাসের ডাক্তার হয়ে এলেন। শমিতা তাঁকে গিয়ে ধরল। তিনি অমিতের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়ে তাকে কিছু কম খরচে যক্ষ্মাবাসে ভরতি করে নিলেন।

অমিত টাকার কথা তুলল না, জানে যে ওতে শমিতাকে কেবল কষ্ট দেওয়াই হবে। তা ছাড়া ভাবলো—আর কতদিনই বা। এ ক'টা দিন শমিতার ইচ্ছেয় বাধা দেবার উৎসাহ তার হল না। ও ভাবলো—এ ক'টা দিনের সেবার স্মৃতি শমির মনে অক্ষয় হয়ে থাক। আমার যখন আর কিছু করবার সাধ্য নেই—ওর মনে দু:খের খোঁচা দেবার অহংকারই বা করি কেন?

অমিত যক্ষ্মাবাসে ভরতি হলে শমিতা রোজ বিকেলে দেখা করতে যায়। অমিত টাকার প্রশ্ন তোলে না দেখে শমিতার ভালো লাগে না। বুঝতে পারে যে তার মনে প্রশ্নটা অব্যক্ত কাঁটার মতো বিঁধে আছে। তাই সে একদিন নিজেই কথাটা তুলে বসল—জানো, আমি স্কুলে একটা চাকরি নিয়েছি। কিন্তু পাছে এই কথায় ও মনে করে যে তার জন্যেই শমিতার এই কাজ গ্রহণ করতে হয়েছে, তাই ব্যাখ্যা স্বরূপে বললে,—এখন তো সারাদিন বসে থাকা, একা একা ভালো লাগে না, তাই কাজ নিয়ে কোনওরকমে ভুলে থাকি।

অমিত কি একথা বিশ্বাস করল? কি জানি, হয়তো সে বিশ্বাস করতেই চায়। কিন্তু টাকা যে কোত্থেকে আসছে তা অমিতের চোখ এড়াতে পারল না। সে দেখছে শমিতার হাতের চুড়ির গোছা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। সে দেখত, সবই বুঝত, তবু চুপ করে থাকতো, কারণ চুপ করে থাকা ছাড়া আর যা করবে, তাতেই শমিতার কষ্ট বাড়বে বই কমবে না। কেবল সে রাতের বেলায় জেগে থেকে অনেকক্ষণ ধরে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করত—সেরে উঠবার নয়, কারণ তা বিধাতারও অসাধ্য—সে প্রার্থনা করত মরবার। শমিতার চুড়ির গোছ নি:শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন তার জীবনান্ত ঘটে। যে বিধাতা জীবনদান করতে অশক্ত, তিনি কি এই ইচ্ছামৃত্যু দানেও সমর্থ নন? নিজের হাতের চুড়ির গোছা যে ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে, সেদিকে শমিতার খেয়াল ছিল না। হঠাৎ একদিন আচম্বিতে তার খেয়াল হল। শমিতা এলে অমিত তার অগোচরে একবার করে চুড়ির সংখ্যা গুণে দেখত। শমিতা এতোদিন তা লক্ষ্য করেনি। আজ হঠাৎ দুজনের দৃষ্টি পরস্পরের কাছে ধরা পড়ে গেল। কিন্তু শমিতা যেন কিছুই বোঝেনি এমনভাবে বলল—একলা আসতে হয়, ফিরতেও একলা, তাতে আবার সন্ধে হয়ে যায়, দিনকাল খারাপ, কতকগুলো চুড়ি খুলে রেখেছি। কেমন, ভালো করিনি?

অমিত শুধু বলল, ভালোই করেছ। সে রাত্রি অমিত একা বিনিদ্র জেগে প্রার্থনা করল—হে সুখ-দু:খের দাতা, যে একই সঙ্গে মানুষের বুকে আত্মবিস্মৃতি প্রেম আর যক্ষ্মার বীজাণু বিতরণ করে রেখেছ, তোমার কাছে কি প্রার্থনা করতে হয় জানিনে। সে প্রার্থনার কতোটুকু তুমি গ্রহণ করো, কতোখানি বর্জন করো তাও জানিনে। তবু এ বিশ্বাস আছে, সুখের প্রার্থনার চেয়ে দু:খের প্রার্থনা তুমি হয়তো দ্রুত হস্তে মঞ্জুর করে থাকো। আমার দেহাবসান শমির ওই চুড়ির ক-গাছার সঙ্গে ঘটিয়ে দাও প্রভু! তারপরে তার মনে হল, এ প্রার্থনা কি তার সুখের নয়? এ অবস্থায় একমাত্র সুখ যা সম্ভব, তাই তো সে চেয়েছে। সর্বদু:খের দাতা কি তা মঞ্জুর করবেন? দু:খের ছদ্মবেশে এই সুখটুকু কি সে ফাঁকি দিয়ে আদায় করে নিতে পারবে? আর যদি শমির চুড়ি নি:শেষ হবার পরেও তার জীবনান্ত না ঘটে, তখন কি হবে? সে শঙ্কিত সম্ভাবনাতে আর সে কিছুতেই চিন্তা করতে পারলো না। ঘুমিয়ে পড়লো। শমিতার সে রাত্রে বাড়ি ফিরে এসে ঘুম হলো না। ঘুম না হওয়া তার নূতন নয়। কিন্তু আজকার নিদ্রাহীনতা একপ্রকার নতুন আনন্দের। সে ঘরে থেকে উল্লাসে পায়চারি করে ফিরতে লাগল—আমি মিথ্যা কথা বলেছি—আমি মিথ্যাবাদী। মিথ্যা কথা সে অমিতের জন্যে আগেও বলেছে—কিন্তু আগে এমন মিথ্যা কথায় প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দেয়নি। আজকার বিশেষ আনন্দ ওতেই। শমিতার মনে হচ্ছিল, কাছাকাছি যদি কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকতো তবে তাকে এখনি এত রাত্রে ঠেলে তুলে সব ঘটনা বর্ণনা করলে যেন আনন্দ দ্বিগুণিত হয়ে ফিরে পেত। এই মিথ্যাভাষণের আনন্দ প্রণয়ের বিদ্যুৎ শিখার মতো তার আসন্ন বৈধব্যের শুভ্রশূন্যতার প্রান্ত বেষ্টন করে চিরায়ুষ্মতীর রঙিন পাড় অঙ্কিত করে দিল।

এর পরের ঘটনা অতিশয় সংক্ষিপ্ত। সুখ-দু:খের বিধাতা, সুখের চেয়ে দু:খ দিতে যিনি অধিকতর তৎপর, তিনি অন্তত একবারের জন্যেও অমিতের কথা রাখলেন। শমিতার শেষ চুড়িখানা নি:শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই অমিতের জীবনান্ত ঘটল।

সেদিন শমিতা যখন এল—তার হাতে একখানাও চুড়ি নেই। সেদিন সকালেই শেষ চুড়ি ক'খানা বেচে যক্ষাবাসের আগামী মাসের পাওনা সে মিটিয়ে দিয়েছে।

শমিতা নিজেই প্রসঙ্গ তুললো। কালকে ফিরবার পথে হঠাৎ মাঠের মাঝখানে 'বাস'-এর কল বিগড়ে গেল। তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, 'বাসে' আমরা দুজন মাত্র যাত্রী—চারিদিক নির্জন, অনেক কিছুই ঘটতে পারত। যাক, কোনও বিপদ অবশ্য ঘটেনি। আমি ফিরে গিয়েই স্থির করলাম—আর নয়। তখনি চুড়ি ক'গাছা খুলে তুলে রেখে দিলাম, কেমন ভালো করিনি?

অমিত ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানালো। তারপরে একদিন সব অবসান হল। তার হাতের শুভ্রশঙ্খের ক্ষীণ শশীকলা শুক্লা চতুর্থীর নবযৌবনের অকাল দিগন্তে কখন খসে পড়ে গেল। তার সিথিঁর সিঁদুরের শেষ রেখাটির চিহ্নমাত্রও আর কোনও দিকপ্রান্তে রাখল না। এতোদিনে শমিতার নব নব মিথ্যাভাষণের শেষ আনন্দের অবকাশও অন্তর্হিত হল।

অমিতের মৃত্যুর পরে যক্ষ্মাবাসের কর্তৃপক্ষ তার একখানি চিঠি শমিতাকে পাঠিয়ে দিল।

অমিত লিখছে—

শমি,

তোমার জন্যে কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। শুধু রইলো আমার ভালোবাসা, আর তোমার অলংকারগুলো। তুমি এম-এ পাস করেছ, কোনওরকমে তোমার চলে যাবেই জেনে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে চললাম।

মিথ্যা কথার প্রতিদান মিথ্যা কথায় দিয়ে গিয়েছে। শমিতা চিঠি পড়ে ভাবল তবে তো উনি আমার মিথ্যা ধরতে পারেননি। বিধাতার আশীর্বাদে মিথ্যাই আমার সত্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠল। তবু কি তার সর্বত্যাগ অমিত জানতে পারলে শমিতা বেশি সুখী হত না। হয়তো হত—নিশ্চয় করে কে পরের মনের কথা বলতে পারে!

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%