রাজা

সমরেশ মজুমদার

উড়ো খবর নয়—পোস্টকার্ডের চিঠি সুধীর নিজ হাতে লিখিয়াছে—

বাবা, বহুদিন আপনাদের কুশল সংবাদ না পাইয়া চিন্তিত আছি। শনিবার বারোটার গাড়িতে বাড়ি পৌঁছিয়া শ্রীচরণ দর্শন করিব এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎমতে নিবেদন করিব—

শনিবার অর্থাৎ আগামী কাল। নিবারণ তাড়াতাড়ি বাড়ির মধ্যে খবর জানাইলেন। পুরা দুইটি বছর অন্তে ছেলে বাড়ি আসিতেছে। ছুটি পায় নাই বলিয়া নহে, বরঞ্চ এতদিন ছুটি ছিল দিবা-রাত্র চব্বিশঘণ্টা। চাকরির উমেদারিতে এ যাবৎ যত হাঁটাহাঁটি করিয়াছে, তাহার সমষ্টিতে বোধ করি পদব্রজে ভারতবর্ষ হইতে ল্যাপল্যান্ড অবধি পরিভ্রমণ সারা হইয়া যায়। যাহা হউক চাকরি জুটিয়াছে, ভালো চাকরি—এবং এই প্রথম ছুটি।

পাঁজি খুলিয়া নিবারণ মনোযোগ সহকারে শনিবার তারিখটা গোড়া হইতে আগা পর্যন্ত পড়িয়া ফেলিলেন, একটা কিছু পুজো-পার্বণ চোখে পড়িল না। ছুটিটা কিসের সাব্যস্ত হইল না। বুধবারে ঈদের বন্ধ আছে বটে, চিঠির তারিখটা শনিবার কি বুধবার লিখিয়াছে—দৃষ্টিবিভ্রম হইতে পারে, ভালো করিয়া আর একবার মিলাইয়া দেখিতে বালিশের নিচে হাত দিলেন, তারপর বিছানা উলটাইয়া ফেলিলেন, তবু চিঠি পাওয়া গেল না। যতদূর মনে পড়ে, বালিশের তলায় রাখা ছিল, তবে যায় কোথায়?

চিঠি তখন চলিয়া গিয়াছে উত্তরের ঘরে আমতলার দিককার জানালার কাছে। চোরে চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে—চোর কিরণমালা। চার-পাঁচ লাইনের চিঠি, কিন্তু খুকির জ্বালায় কথা কয়টা স্থির হইয়া পড়িবার জো আছে? থাবা দিয়া ধরিতে যায়। অবশেষে ছোট ননদ পটলিকে অনেক খোসামোদ করিয়া তাহার কোলে খুকিকে পাড়ায় পাঠাইয়া দিল। তারপর কিরণ এদিক-ওদিক চাহিয়া সবেমাত্র কাপড়ের ভিতর হইতে বাহির করিয়াছে, আবার বিপদ! শাশুড়ি আসিয়া ঢুকিলেন। কিরণ চিঠি ঢাকিয়া ফেলিল। শাশুড়ি সেকেলে মানুষ, অতশত দেখেন না, আসিয়াই বলিলেন—বউমা, বিছানার চাদর ওয়াড়-টোয়ারগুলো খুলে দাও তো শিগগির—এখন সেদ্ধ করে রাখি, ভোর থাকতে থাকতে কেচে দেব—কেমন?

বধূ সায় দিয়া বলিল—হ্যাঁ মা, কীরকম বিচ্ছিরি ময়লা হয়ে গেছে, দেখো না—

শাশুড়ি বলিলেন—খোকা বারোটার গাড়িতে যদি আসে তার আগেই সব কেচে দেব। নোংরামি মোটে সে দু-চক্ষে দেখতে পারে না। আর তোমাকেও বলে দিচ্ছি মা, এরকম পাগলি মেয়ের মতো বেড়াতে পারবে না—কালকে সকাল সকাল নেয়ে ফিটফাট থেকো। যে যেমন চায়, তেমনি থাকতে হয়। শহরে-বাজারে থাকে বোঝ না?

আনন্দে কিরণের বুকের ভিতর কেমন করিতে লাগিল, হাসিও পাইল। খোকা—বুড়ো খোকা—অত বড় গোঁফওয়ালা ছেলে, এখনও মা কিনা খোকা বলিয়া ডাকেন।

এদিকে বাইরে নিবারণের গলা উচ্চ হইয়া উঠিয়াছে। ঘটনাটা এই—নটবর কামার বছর আট-সাত আগে একটা বটি গড়াইয়া দিয়াছিল, তাহার দরুন এখনও তিন আনার পয়সা বাকি। উক্ত পয়সার তাগাদা করিতে আসিয়া এমনভাবে চাপিয়া ধরিয়াছে যে, তৃতীয় ব্যক্তি কেহ উপস্থিত থাকিলে নিশ্চয় মনে ভাবিত, ওই তিন আনা পয়সা এখনই হাতে না পাইলে বেচারা সবংশে নির্ঘাত মারা যাইবে। কিন্তু নিবারণ বহুদর্শী ব্যক্তি, অপরে যে-প্রকার ভাবুক—নটবরের জন্য তাঁহার দুশ্চিন্তা হইল না। বলিলেন—রোসো, এইবারে ঠিক—আর একটা দিন মোটে—কাল সুধীর বাড়ি আসবে, কাল আর নয়, পরশু সকালের দিকে এসো একবার—পাই পয়সাটি অবধি হিসেব করে নিয়ে যেও। নাও কলকেটা ধরো—

বলিয়া হুঁকা হইতে নটবরের হাতে কলিকা নামাইয়া দিয়া আবার শুরু করিলেন—শোননি নটবর, বল কি—শোননি, কানে তুলো দিয়ে থাক না কি? আমার সুধীরের মস্ত বড় চাকরি হয়েছে, দেড়শো টাকা মাইনে—

কিঞ্চিৎ বাড়াইয়া বলা নিবারণের অভ্যাস, এ গ্রামের সকলেই ইহা জানে। পাওনাদার এবং আত্মীয়-স্বজন বহুবার একথা শুনিয়াছে—চাকরি ঠিক হয়ে গেছে, এখন সাহেব বিলেত থেকে পৌঁছতে যা দেরি। এবারে আর ভুয়ো নয়, আসছে মাসের পয়লা থেকে নিশ্চয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহেব কখনও বিলাত হইতে আসিয়া পৌঁছে নাই এবং মাসের পর মাস অনেক পহেলাই কালসূত্রে তলাইয়া গিয়াছে। সুধীরের চাকরির কথা তাই লোকে বড় বিশ্বাস করে না। তবে এবারের কথা স্বতন্ত্র। দোকানে বসিয়া হাপর টানিতে টানিতে নটবরও যেন কাহার মুখে শুনিয়াছে, সুধীরের ভারি কপালজোর, ভালো চাকরি পাইয়াছে। এখন ওই দেড়শো টাকার কথা যদি বাদ-সাদ দিয়া অন্তত সত্যকার টাকা পঁচিশেও দাঁড়ায়, তবু নটবরের তিন আনা আদায় হইবার উপায় হইয়াছে। সে পুলকিত হইল।

নিবারণ পুত্রগর্বে স্ফীত হইয়া বলিতে লাগিলেন—সেদিন দাকোপার পাঁচু ঘোষের সঙ্গে দেখা—পিসি আর বউকে নিয়ে কালীঘাট গিয়েছিল। সুধীর দেখতে পেয়ে এই টানাটানি—বাসায় না নিয়ে ছাড়লই না। পাঁচু বলে—দাদা, বলব কি মস্ত তিনমহল বাড়ি ভাড়া করেছে, ঝি-চাকর যে কতগুলো গুনে ঠিক করতে পারলাম না। মাইনে দেড়শ আর উপরি—সকালে আপিসে যায় খালি পকেটে, সন্ধেবেলা দু-পকেট যেন ছিঁড়ে পড়ে। টাকার বোঝা নিয়ে হেঁটে আসতে পারবে কেন, গাড়ি করে ফিরতে হয়। দেখা হলে একবার পাঁচু ঘোষকে জিজ্ঞাসা করে দেখো।

নটবরের গা শিরশির করিয়া উঠিল—এই সেদিনের সুধীর, তাহার দোকানের সামনে দিয়া খালি গায়ে জেলেপাড়া হইতে মাছ ধরিয়া লইয়া আসিত। বলিল—তা বেশ—বড্ড ভালো কথা, আর আপনার দু:খ কী চৌধুরীমশাই, রাজ্যেশ্বর ছেলে—

নিবারণ বিনয় প্রকাশ করিয়া বলিলেন—তোমরা পাঁচজনে ভালো বললেই ভালো। পাঁচু যা বললে—বুঝলে, শুনে তাক লেগে যায়—পেত্যয় হয় না। রাজরাজড়ার কাণ্ডই বটে! শুনেছ বোধহয়, এবার আমরা বাড়িসুদ্ধ কলকাতায় চলে যাচ্ছি, সুধীর আসছে সেই সব ঠিকঠাক করতে—

নিবারণ চুপিচুপি কথা বলিবার লোক নহেন, বিশেষত ছেলের এই সৌভাগ্যের কথা। ঘরের ভিতর হইতে কিরণ শুনিতে পাইল, সুধীর দেড়শো টাকার চাকরি পাইয়া রাজরাজড়ার কাণ্ড আরম্ভ করিয়াছে। কিরণ একবারও কলিকাতায় যায় নাই এবং সত্যিকার রাজারা যে কী প্রকার কাণ্ড করিয়া থাকে তাহাও সঠিক আন্দাজ করিতে পারে না। গ্রামে সখের থিয়েটার আছে, অতএব রাজা সে অনেকবার দেখিয়াছে গাঁয়ে—ঝকমকে শরীর, ঝকমকে পোশাক, মাথায় মুকুট। সুধীরের মাথার উপর মুকুট বসাইয়া দিলে কীরকম দেখায় তাহাই সে সকৌতুকে কল্পনা করিতে লাগিল। নিবারণ সত্যবাদী যুধিষ্ঠির নয়, তাহা কিরণ জানে। তবু আজিকার কথাগুলি মিথ্যা বলিয়া ভাবিতে কিছুতেই প্রাণ চাহে না। অনেকবার অনেক আশা করিয়া শেষে সমস্ত মিথ্যা হইয়া গিয়াছে, এবারে মিথ্যা হইলে সে মরিয়া যাইবে। এইটুকু জীবনে সে অনেক দু:খ পাইয়াছে, সে এক সাতকাণ্ড রামায়ণ। ছেলেবেলায় কিরণের মা মরিয়া গেলে বাবা আবার বিবাহ করেন। নতুন মা কিরণকে মোটে দেখিতে পারিত না। এখন আর তাহাকে বাপের বাড়ি লইয়া যাইবার নামও কেহ করে না। সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিয়াছে, বাদাম গাছের ফাঁকে চাঁদ উঠিল। কিরণের মনে হইল যেন কোন অনির্দেশ্য স্থানে বসিয়া তাহার অনেক দিনের হারানো মা তাকাইয়া দেখিতেছেন এবং বড় খুশি হইয়াছেন যে সুধীর রাজা হইয়াছে, আর সে—তাহার সেই জন্মদু:খিনী মেয়ে, এতকালের পর হইয়াছে রাজার পাটরাণী। আয়না ও চুলের দড়ি পাড়িল, আবার ভাবিল—দূর হোক গে, চুল বাঁধব না আর আজ, বেলা একেবারে গেছে। রান্নাঘরে আসিয়া উনান ধরাইতে গিয়া ভাবিল—এত সকাল সকাল কিসের রান্না! ছেলেমানুষের মতো খিলখিল করিয়া হাসিতে ইচ্ছা করে, তাহার যেন কী হইয়াছে, তাহাকে ঠিক ভূতে ধরিয়াছে—

পটলি পাড়া বেড়াইয়া আসিয়া খুকিকে কিরণের কোলে ঝপ করিয়া ফেলিয়া দিল। তখনই ছুটিয়া বাহির হইয়া যায়। কিরণ ডাকিল—ও পটলি, যাচ্ছিস কোথায়? শোন—সুশীলাদের বাড়ি গেছলি? তার বর নাকি এসেছে—কলকেতায় বাসা করেছে, তাকে নিয়ে যাবে সত্যি? পটলি দৃকপাত না করিয়া কোমরে আঁচল জড়াইয়া উঠানে কুমির-কুমির খেলিতে গেল।

উঠানে যেন ডাকাত পড়িয়াছে, পাড়ার ছেলেমেয়েদের কোলাহলে কান পাতা যায় না। পটলি হইয়াছে কুমির আর উত্তর ও পূর্ব ঘরের দাওয়া হইয়াছে ডাঙা। সেই ডাঙার উপর হইতে উঠানরূপ নদীতে সকলে যেই নাহিতে নামে, পটলি দৌড়াইয়া তাহাদের ধরিতে যায়। রান্নাঘর হইতে মেয়ে কোলে কিরণ দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিতে লাগিল। খুকির মোটে চারিটা দাঁত উঠিয়াছে, কিরণ খুকির গালের মধ্যে একবার একটা আঙুল দিয়াছে আর অমনি সে কামড়াইয়া ধরিল।

—ওরে রাক্ষুসি, ছাড় ছাড়—মরে গেলাম; ভারি যে দাঁতের দেমাক হয়েছে তোমার!

কিরণ হাত ছাড়াইয়া লইল। খুকি হাসিতে লাগিল। কিরণ খুকির দিকে তাকাইয়া মুখ নাড়িয়া বলে—অত হেসো না খুকি, অত হেসো না। সব মানিক পড়ে গেল, সব মুক্তো ঝরে গেল। মেয়ে মোটে এইটুকু, বুদ্ধি কত—সব বোঝে, চৌকাঠ ধরিয়া উঠিয়া দাঁড়ায়, আবার হাততালি দিয়া বলে—তা-তা-তা—

কিরণ বলিল—হাঁ করে হাবলার মতো দেখছ কী? ড্যাবডেবে চোখ মেলে এক নজরে কী দেখছ আমার মানিক? খেলা দেখছ? তুমিও খেলো, বড় হও আগে। ঠান্ডা হয়ে বাবু হয়ে বোসো তো—এই যে দোলে—দোলে—

দোল দোল দুলুনি,

রাঙা মাথায় চিরুনি

বর আসবে এখনি

নিয়ে যাবে তখনি—

খুকি তালে তালে কেমন দোলে। কিরণ মেয়েকে উপরে তুলিয়া কচি কচি নরম হাত—বুক-গাল চাপিয়া ধরিতে লাগিল। খুকির খুব আনন্দ হইয়াছে, মাথা নাড়ে আর টানিয়া টানিয়া বলে —বা-আ-আ-বা-বা-। মেয়ে বাবাকে দেখে নাই, সুধীর বাড়ি হইতে যাইবার সময় কেবল মধুর সম্ভাবনার কথাটি জানিয়া গিয়াছিল। কিরণ ফিসফিস করিয়া বলিল—খুকি, দেখিস—দেখিস, কালকে বাবা আসবে—তোর খোকা বাবা। মার যেমন কাণ্ড—অত বড় ছেলে, এখনও খোকা—হি-হি, ছেলেমানুষের মতো হাসিতে লাগিল। তারপর চারিদিক তাকাইয়া দেখিল, কেহ কোনোখান হইতে শুনিতে পায় নাই তো? এমন সোনার চাঁদ তাহার কোলে আসিয়াছে—সুধীর তা জানে না, চোখে দেখে নাই, সুধীরের জন্য মনে করুণা হইল না। আবার রাগ হইল—এই তো চিঠিপত্র খবর পাইয়াছে, একবার কি এতদিনের মধ্যে মেয়েকে দেখিয়া যাইতেও ইচ্ছা করে না?

সেইদিন গভীর রাত্রে কিরণ বিছানায় শুইয়া আছে, ঘুম আর আসে না। মাথা গরম হইয়া উঠিয়াছে, দু-তিনবার উঠিয়া মাটির কলসী হইতে জল গড়াইয়া মুখে-চোখে দিল। এইবার ঠিক ঘুম আসিবে, চোখ বুজিয়া শুইল। বেড়ার ফাঁকে জ্যোৎস্না আসিয়া অনেকদিন আগেকার স্নেহস্পর্শের মতো সর্বাঙ্গ জড়াইয়া ধরিল। দুই বছর কম সময় নয়।...সুধীরকে গ্রামসুদ্ধ সকলে অকর্মণ্য ঠাওরাইয়াছিল, সেই সঙ্গে কিরণেরও দোষ পড়িয়াছিল, নাকি বরকে আঁচল ছাড়া হইতে দেয় না। শাশুড়ি স্পষ্ট কিছু বলিতেন না, কিন্তু ওর চেয়ে মুখোমুখি হইলেই যে ভালো হইত। শেষাশেষি এমন হইয়াছিল যে সুধীর বাড়ি হইতে বাহির হইলে সে বাঁচে। মুখ ফুটিয়া একথা বলিতে কাহাকেও সাহস হইত না, কাহাকেও দোষ দিবার উপায় ছিল না, এক-এক সময় কিরণের মনে হইত—ডাক ছাড়িয়া কাঁদিয়া ওঠে! যেদিন সুধীর রওনা হইল সেদিন সে খুশি হইয়াছিল, এখন সেসব কথা ভাবিয়া কষ্ট হয়। আর লোকটিরও এমন ধনুক ভাঙা পণ—চাকরি নাই-বা হইল, এতদিনের মধ্যে একবার বাড়ি আসিয়া গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হইয়া যাইত নাকি? কিন্তু সে দু:খের দিন কাটিয়াছে, সুধীর হইয়াছে রাজা, কাজেই কিরণ রাজরাণী—কাল বাড়ি আসিবে। কাল এতক্ষণে—

আগামীকাল এতক্ষণে যে কী হইতেছে চক্ষু বুজিয়া সেই মনোরম ভাবনা ভাবিতে লাগিল।

ঘরে ঢুকিয়া হয়তো দেখিবে ক্লান্ত সুধীর ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, জলের গ্লাস খুঁজিতে হেরিকেন তুলিয়া কিরণ দেখিয়া লইবে। আলোটা মুখের কাছ দিয়া বারবার ঘুরাইবে, তবু চক্ষু খুলিবে না, পা ধুইয়া জলের ঘটি ঠনাত করিয়া তক্তাপোশের নিচে রাখিবে, সজোরে জোরে খিল দিবে, তারপর খুকির মাথাটা বালিশের উপর সাবধানে তুলিয়া দিয়া মশারি র্গুজিতেছে—সুধীর আলগোছে একখানা হাত বাড়াইয়া খপ করিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিবে।

আসলে সুধীর ঘুমায় নাই, ঘুমের ভান করিয়া পড়িয়া ছিল, কিংবা ঘুমাইলে ইতিমধ্যে কখন জাগিয়াছে, আগে সাড়া দেয় নাই।

কিরণ বলিবে—বড্ড গরম, চল দাওয়ায় বসিগে। কেমন ফুটফুটে জ্যোৎস্না দেখেছ।

সুধীর হাসিয়া বলিবে—ভয় করবে না, বাদামগাছে এক পা আর তালগাছে এক পা—ওই যে মস্ত একটা কী দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাচ্ছ?

কিরণ বড় ভীতু। বিয়ের কিছুদিন পরে একদিন রাত্রিতে সে রাগ করিয়াছিল, তারপর সুধীর ভূতের ভয় দেখাইয়া তাহাকে এমন বিপদে ফেলিয়াছিল সেকথা ভাবিলে হাসি পায়। সে সময় কি বোকাই না ছিল!

কিরণ বলিবে—ভয় দেখাচ্ছ, আমায় কচি খুকি পেয়েছ নাকি?

তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ আসিবে—কখনো না, কচি খুকি ভাবব—সর্বনাশ! কুড়ি পেরুল বুড়ি হতে আর বাকি কী?

—এখন আমার মোটেই ভয় করে না, কী দেবে বলো, একলা-একলা এখনি খালের-ঘাটে চলে যাচ্ছি। তারপর কিরণ হঠাৎ আর এক কথা জিগ্যেস করিবে—

কলকাতায় যে বাসা করেছ সে নাকি তিনতলা? ছাত থেকে কেল্লা দেখা যায়? গড়ের মাঠ কতদূর? সুশীলার বর যেখানে বাসা করেছে সে বাড়ি চেন? তুমি আপিসে গেলে আমি দুপুরে খুকিকে নিয়ে সুশীলাদের বাসায় বেড়াতে যাব কিন্তু—

অথবা এরূপও হইতে পারে।...হয়তো কাজ-কর্ম সারিয়া মেয়ে কোলে কিরণ যখন আসিয়া ঢুকিবে, তখন সুধীর শিয়রে আলো রাখিয়া নভেল পড়িতেছে। নভেল পড়া তো ছাই, কিরণকে দেখিয়া মৃদু হাসিয়া বই রাখিয়া দিবে। তারপর হাত ধরিয়া বসাইবে। বলিবে—এত দেরি হল? মেয়ে কি গাঙের জলে ভাসিয়া আসিয়াছে—মেয়ের বুঝি মান নাই।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখাইতে হইবে। সুধীর পকেট হাতড়াইবে। ওমা একছড়া খাসা হার চিকচিক করিতেছে, অতবড় হার এইটুকু মেয়ের জন্য। মজা দেখো না, চারটে দাঁত উঠেছে—তিন দিনের ভেতর দস্যি মেয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে চ্যাপটা করে দেবে।

বাপ নিজের হাতে মেয়ের গলায় হার পরাইয়া দিবে। কিরণ বলিবে—রাত্তিরটা গলায় থাকুক, কাল সকালে কিন্তু মনে করে হার খুলে নিও—ফের নীল কাগজে মুড়ে ভালোমানুষের মতো মার হাতে গিয়ে দিও। হ্যাঁগা, তাই করতে হয়—মাকে বোলো, মা এই তোমার নাতনীর হার নাও—মা খুশি হয়ে খুকির গলায় পরিয়ে দেবেন, সে কেমন হবে বলো তো?

ঘুমন্ত মেয়ে বাপের বুকে ন্যাকড়ার মতো লাগিয়া থাকিবে। সুধীর বলিবে—ই:, একেবারে যে তোমার মতো হয়েছে চোখ দুটো, গায়ের রং, গায়ের গড়ন, একচুল তফাৎ নেই—

সুখের হাসি হাসিয়া কিরণ বলিবে—কিন্তু নাকটা যে বাপের। বিয়ের সময় ওই বোচা নাকের দাম ধরে দিতে হবে হাজার টাকা।

নাকের উচ্চতা কী পরিমাণ হইলে ঠিক মানানসই হয় তাহার তর্ক উঠিবে—সেই তাহাদের পুরাতন তর্ক।

জ্যোৎস্নাময় চৈত্র-রাত্রির স্নিগ্ধ বাতাসে ঘরকানাচে বাদামগাছের পত্রমর্মর ঘুমের ঘোরে খুকির ছোট্ট বুকখানা কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে। বাহির বাড়ির ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে তক্ষক ডাকে, চারিদিকের অতল নিষুপ্তির মধ্যে কিছুক্ষণ অন্তর তাহার রব শোনা যায়—কটরং-র-র তক্ষ-তক্ষ! বিবাহের পরবর্তী স্বপ্নস্মৃতির টুকরো টুকরো আগামী দিনের মধুর কল্পনার সহিত মিলিয়া সেই রাত্রে একটি নিদ্রাহারা বিমুগ্ধ গ্রামবধূর মনের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।

সকালে রোদ না উঠিতেই ননদ-ভাজে খালের ঘাটে গিয়া বাসনের বোঝা নামাইল। বাসন মাজা তো উপলক্ষ্য, কেবল গল্প আর গল্প—এমনি করিয়া উহারা রোজ একপ্রকার বেলা কাটাইয়া আসে। স্টেশন হইতে সাঁকো পার হইয়া গ্রামে আসিতে হয়। কিরণ সাঁকো পিছন করিয়া বাসন মাজিতেছিল, হঠাৎ পটলি চেঁচাইয়া উঠিল—ওমা, এত সকালে এসে পড়ল? তাড়াতাড়ি এঁটো হাতেই কিরণ ঘোমটা টানিল। পটলি খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল।

—ও বউদি, কলাবউ সাজলি কেন? আমি কার কথা বললাম? আসছে আমাদের মুংলি গাইটা।

মুংলি গরু আসিতেছিল ঠিক, কিন্তু পটলি যে ভঙ্গি করিয়া বলিয়াছিল, সেটা মুংলির সম্পর্কে নিশ্চয় নয়। পোড়ারমুখী মেয়ে এই বয়সে এমন পাকা হইয়াছে।

কিরণ বলিল—তাই বইকি। তুমি বড্ড ইয়ে হয়েছ, গুরুজনের সঙ্গে ঠাট্টা—তোমায় দেখাচ্ছি—বড় রাগিয়া শাসন করিতে গিয়া পারিল না, শাসন করিবে না হাসি চাপিবে?

এদিকে নিবারণ ভারি ব্যস্ত! উঠিয়া আগে বেড়ার গায়ে ছাতিমগাছের কয়েকটা ডাল ছাঁটিয়া দিলেন, পথটা যেন আঁধার করিয়া ফেলিয়াছিল। তারপর নিশি গাঙ্গুলির বাড়ি গিয়া বলিলেন—একটা টাকা হাওলাত দিতে পার গাঙ্গুলি? কালকে নিও—

গাঙ্গুলি নিরাপত্তিতে টাকা বাহির করিয়া দিলেন। সুধীর বাবাজি আজ আসছেন বুঝি! বাজারে যাচ্ছ? সাজা তামাকটা খেয়ে যাও, বেলা হয় নি। আর আমার কথাটা মনে আছে তো?

নিশি গাঙ্গুলির কথাটা হইতেছে, সুধীরকে বলিয়া তাহার আপিসে বা অন্য কোথাও সেজছেলে হেমন্তের একটা চাকরি করিয়া দিতে হইবে। তামাক খাইয়া এবং গাঙ্গুলিকে বিশেষ প্রকারে আশ্বাস দিয়া নিবারণ উঠিলেন।

বাজারে মাছ কিনতে গিয়া বিষম বিভ্রাট। চারিটা সরপুটি আসিয়াছে, তাহার ন্যায্য দর চার আনার বেশি এক আধলাও নয়। নিতান্ত গরজ বলিয়া পাঁচ আনা অবধি দর দিয়া নিবারণ ঘণ্টাখানেক ধন্না দিয়া বসিয়া আছেন। মাঝে মাঝে খোসামুদ চলিতেছে—ও পারুয়ের পো, তুলে দে—অলেহ্য দর হয়নি, ছেলে বাড়ি আসবে, বড় চাকুরে—আমাদের মতো কচুঘেচু দিয়ে খাওয়া তো অভ্যেস নেই—দে বাবা তুলে দে। কিন্তু পারুয়ের পুত্র কিছুতেই ভিজিতেছিল না। এমন সময় অক্রুর মোড়ল আট আনা বলিয়া ধাঁ করিয়া মাছ ক'টা লইল।

নিবারণ একেবারে মারমুখী। অক্রুরও ছাড়িবে কেন—গতকল্য মণ দশেক গুড় বেচিয়াছে।

গুড়ের দর যাহাই হোক, একসঙ্গে অতগুলি টাকা গাঁটে থাকায় তাহার মেজাজ ভিন্ন প্রকার।

গ্রামের কয়েকজন নিবারণকে বুঝাইয়া-সুঝাইয়া হাত ধরিয়া ভিড়ের ভিতর হইতে সরাইয়া লইয়া গেল। কিন্তু নিবারণের রাগ মিটে নাই—ছোটলোকের এত আস্পর্ধা। আসুক সুধীর, দেখা যাইবে কত ধানে কত চাল।

সুধীর যখন পৌঁছিল তখন বিকাল হইয়া গিয়াছে। আজ আর আসিল না সাব্যস্ত করিয়া বাড়িশুদ্ধ সকলের খাওয়া-দাওয়া সারা হইয়াছে, কিরণ এইবার চারিটা মুখে দিবে। কী মনে করিয়া ওঘরে যাইতেছিল, এমন সময় দেখিল সাঁকোর উপর একটা ছাতি, শেষে আরও ভালো করিয়া দেখিল। তারপর রান্নাঘরের ভিতর ঢুকিয়া পড়িল।

সুধীর আসিয়া ডাকিল—মা, ওরা কোথায় সব?

সর্বাঙ্গে ঘাম ঝরিতেছে, টিনের একটি সুটকেশ স্টেশন হইতে নিজেই বহিয়া আনিয়াছে, কলিকাতার বাসায় যে অগুন্তি চাকর-বাকর তাহার একটাও সঙ্গে আনে নাই।

মা আসিয়া পাখা করিতে লাগিলেন। পটলি খুকিকে কোলে লইয়া সামনে দাঁড়াইল। সুধীর এক নজরে চাহিয়া দেখিল। চেহারা মলিন রুক্ষ—সে শ্রী নাই, হয়তো চাকরির খাটুনিতে তার উপর পথের কষ্ট।

খাওয়াদাওয়া সারিয়া একটু জিরাইবারও অবকাশ হইল না, ইতিমধ্যে গ্রামের হিতাকাঙ্ক্ষীরা আসিয়াছেন। শ্রীদাম মল্লিক সকলের চেয়ে প্রবীণ, সুধীর সর্বাগ্রে তাঁহার পায়ের ধূলা লইল। মল্লিক মহাশয় বলিলেন—শুনলাম সব কথা নিবারণের কাছে, শুনে যে কী আনন্দ হল! এখন বেঁচেবর্তে থাকো, অখণ্ড পরমাই হোক! বুড়ো বাপ-মাকে এইবারই নিয়ে যাচ্ছ তো? নিয়ে যাবে বইকি! গঙ্গায় চান করবে, হরিনাম করবে, এর চেয়ে আর ভাগ্যের কথা কি? আমাদের পোড়া কপাল—আমরাই পড়ে রইলাম পচা ডোবায়। বলিয়া একটি নিশ্বাস ফেলিলেন।

ভগবতী আচার্য কিঞ্চিৎ হস্তরেখাদি বিচার ও ফলিত জ্যোতিষের চর্চা করিয়া থাকেন। বলিলেন—বলেছিলাম কিনা নিবারণদা, বৃহস্পতি তুঙ্গী—তোমার সুধীর রাজা হবে। ঊর্ধ্বরেখা আঙুলের গোড়া অবধি চলে এসেছে—বলি নি?

নিবারণের সে কথা মনে পড়ে না, কিন্তু ঘাড় নাড়িলেন।

নিশি গাঙ্গুলিও আসিয়াছিল, বলিলেন—বাবাজি আমাদের বাড়িতে সন্ধের পর একবার অবিশ্যি দেখা করে যেও—তোমার খুড়িমা ডেকেছেন।

অমনি ড্রামাটিক ক্লাবের ছেলেরা সমস্বরে কোলাহল করিয়া উঠিল—সে কি করে হবে সন্ধের পর সুধীরবাবু আমাদের রিহার্শাল দেখতে যাবেন যে। ওঁকেই এবার ক্লাবের সেক্রেটারি করা হবে—কালকে আমরা মিটিং করব।

সুধীর সন্ত্রস্ত হইয়া বলিয়া উঠিল, সেক্রেটারি আমাকে কেন? আমাকে বাদ দাও আমি থিয়েটারের কিছু বুঝি নে।

দলের একজন বলিল—তাতে কি হল। আমরাই সব বুঝিয়ে-টুঝিয়ে দেব। এই ধরুন আপাতত উদ্যান দূর্গ আর অন্ত:পুর সংলগ্ন প্রাসাদ—এই তিনটে সিন, পাঁচেক চুল দাড়ি, দুটো রয়াল ড্রেস আর একটা হারমোনিয়ম কিনে দেবেন ব্যস! আমাদের নারদ যে কি চমৎকার গান গায় শুনলে অবাক হয়ে যাবেন। কিন্তু দু:খের কথা কি বলব, জুতসই একটা দাড়ির অভাবে অমন প্লে-টা নামাতে পারছি নে।

গাঙ্গুলি পুনশ্চ বলিলেন—যেমন হোক একবার যেতেই হবে বাবাজি, নইলে তোমার খুড়িমা ভারি কষ্ট পাবে। সারাদিন ঘরে বসে চন্দোরপুলি বানিয়েছে। আমি হেমন্তকে পাঠিয়ে দেব সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।

অনেকের অনেক প্রকার আবেদন, সুধীর উঠিল। জামা গায়ে দিবার জন্যে ঘরে ঢুকিয়া দেখে, সেখানে মাত্র একটি প্রাণী—একলা কিরণ চুল বাঁধিতেছে। কিরণের বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করিতে লাগিল, যে দুষ্টু এই সুধীর! কিন্তু তাহার সে দুষ্টামি আর নাই তো! শান্তভাবে জামাটা পাড়িয়া গায়ে দিল, একটা মুখের কথাও জিজ্ঞাসা করিল না।

ভাবখানা এমন, যেন তাহারা দুটিতে বরাবর একসঙ্গে ঘর-গৃহস্থালী করিয়া আসিতেছে।

পটলি খুকিকে আনিয়া বলিল,—দাদা, একবার কোলে নাও না! দেখো, তোমায় দেখে কেমন করছে।

সুধীর দাঁড়াইল, একবার হাসিয়া মেয়ের দিকে তাকাইল, তারপর কহিল—এখন বড় ব্যস্ত রে। সব দাঁড়িয়ে রয়েছেন—থাকগে এখন।

ড্রামাটিক ক্লাবের যতগুলি লোক—কেহই কলিকাতাবাসী ভাবী সেক্রেটারির সম্মুখে গুণপনার পরিচয় দিতে ত্রুটি করিল না। ফলে রিহার্শাল যখন থামিল তখন চাঁদ মাথার উপরে। নারদ যাইবার মুখেও একবার দাড়ির তাগাদা দিল। সুধীর বলিল—ব্যস্ত হবেন না কালকের মিটিং-এ একটা এস্টিমেট ঠিক হবে।

দু-তিন জন আসিয়া সুধীরকে বাড়ি অবধি পৌঁছাইয়া দিয়া গেল।

দোরে খিল আঁটা, একটা জানালা খোলা ছিল। সুধীর দেখিল—মিটমিট করিয়া হ্যারিকেন জ্বলিতেছে, থালায় ও বাটিতে ভাত—ব্যঞ্জন ঢাকা দেওয়া এবং ঠিক তাহার পাশেই মাটির মেঝেয় কিরণ ঘুমাইয়া আছে। অনেকক্ষণ বসিয়া বসিয়া অবশেষে বেচারি ওখানেই শুইয়া পড়িয়াছে। মনটা কেমন করিয়া উঠিল, ডাকিল—কিরণ, ও কিরণ—

দু-বছর আগেকার সেই ডাক একেবারে ভুলিয়া যায় নাই তো!

কিরণ ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দোর খুলিয়া দিল। সুধীর বলিল—তাড়াতাড়ি করছ কেন, বোসোই না। ভাতের দরকার নেই গাঙ্গুলি-গিন্নির যা কাণ্ড—তিনদিন না খেলেও ক্ষতি হবে না।

কিরণ মৃদু হাসিয়া বলিল—তিনদিন থাকছ তো বাবাকে আজ আসবার জন্যে লিখে দিলাম, পত্তোর পেয়ে মঙ্গলবার নাগাদ এসে পড়বেন—এ তিনটে দিন থাকতে হবে কিন্তু।

সুধীর বলিল—মোটে তিনদিন? এরি মধ্যে তাড়াতে চাও, ভারি নিষ্ঠুর তো তুমি! তিন মাসের কম নড়ছি নে—দেখে নিও।

—আচ্ছা, আচ্ছা—দেখব।

কিরণ মুখ টিপিয়া হাসিতে লাগিল।

—আর বড়াই কোরো না, মায়াদয়া সব বোঝা গেছে! আমরা না হয় পর, নিজের মেয়েকেও কি একটিবার চোখের দেখা দেখতে ইচ্ছে করে না?

সুধীর বলিল,—সে কথা তো বলবেই কিরণ, তার সাক্ষী ভগবান। তারপর মুখখানা অতিশয় ম্লান করিয়া কহিতে লাগিল—শরীরের কি হাল হয়েছে, দেখতে পাচ্ছ তো? দু-বছর যা কেটেছে, অতি বড় শত্তুরের তেমন না হয়! জায়গা না পেয়ে একরকম রাস্তায় ফুটপাথে শুয়ে কাটিয়েছি—এক পয়সার মুড়ি খেয়ে দিন কেটেছে, ক'দিন তাও জোটেনি। ভাগ্যিস রাস্তায় কলের জলে পয়সা লাগে না!

কিরণের চোখ ছলছল করিয়া উঠিল, তাড়াতাড়ি বলিল—থাকগে, তুমি থামো। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—যে দু:খ কপালে লেখা ছিল, তা যাবে কোথায়? সে ছাই-ভস্ম ভেবে আর কি হবে বলো।

দুজনে স্তব্ধ হইয়া রহিল। ঘুমন্ত মেয়ের দিকে তাকাইয়া আবার কিরণের মুখে হাসি ফুটিল।

ওগো, তুমি খুকিকে দেখলে না? এমন দুষ্ট হয়েছে—ওইটুকু মেয়ে হাড়ে হাড়ে বজ্জাতি।

সুধীর কহিল—দেখব না কেন? দেখছি তো।

কিরণ যেন কত বড় গিন্নি, তেমনি সুরে কহিল—ও আমার কপাল ওইরকম, দেখলে হয় নাকি? মেয়ে আমার সঙ্গে কত দু:খ করছিল—বাবা আমায় কোলে নিল না, আদর করল না...তুমি খুকিকে একটা সরু হার গড়িয়ে দিও—নির্মলা দিদির মেয়েকে দিয়েছে খাসা দেখায়।

সুধীর জিজ্ঞাসা করিল—মেয়ে কথা বলতে শিখেছে নাকি?

—বলে না? সব কথা বলে, সে কি আর তোমরা বুঝতে পার? বলিয়া হাসিতে লাগিল। তারপর আবার শুরু করিল—সেদিন বলছিল, বাবাকে একখানা ঠেলা-গাড়ি কিনে দিতে বোলো—তাই চড়ে গড়ের মাঠে হাওয়া খাব।

সুধীর হাসিল, বলিল—বটে, আবার গড়ের মাঠের শখ হয়েছে?

—কেন অন্যায়টা কিসের? খালি খালি চুপটি করে বাসায় বসে থাকবে বুঝি। তুমি ভাব, আমরা কিছু জানি নে। আমাকে না লিখলে কি হয়, শ্বশুরঠাকুর সব রাষ্ট্র করে দিয়েছেন।

—কি শুনেছ বলো তো?

—মস্তবড় বাড়ি ভাড়া করেছ, আমাদের সবাইকে নিয়ে যাচ্ছ—কোনটা শুনিনি? তাই তাড়াতাড়ি বাবাকে আসবার জন্যে চিঠি দিলাম, যাবার আগে একটিবার দেখা করে যাই—কতদিন দেখা হবে না।

সুধীরের মুখ অত্যন্ত বিবর্ণ হইয়া গেল, বলিল—এসব মিছে কথা কিরণ।

—কি মিছে কথা?

—এই বাসা করার কথাবার্তা। মতলব করেছিলাম বটে, কিন্তু সে সব আর হবে না।

কিরণ বলিল—কেন হবে না—আলবত হবে। মাইনে-খাওয়া লোকে কখনও যত্ন করে? তোমার শরীরের দশা দেখে যে কান্না পায়। আমি তোমাকে কখনও একলা ছেড়ে দেব না।

—কিন্তু খরচ চালাব কোত্থেকে?

—ও! বলিয়া কিরণ গম্ভীর হইল।

—কথা বলো না যে!

কিরণ কহিল—আমার খরচ বড্ড বেশি, আমায় নিয়ে কাজ নেই। বেশ তো মাকে নিয়ে যাও। আমি যাব না, কক্ষনও তোমার বাসায় যাব না এই বলে দিলাম।

বলিয়া জানালা দিয়া বাহিরের দিকে তাকাইল।

সুধীর বলিল—রাগ হল? কতদিন বাদে এসেছি আর এইরকম কষ্ট দিচ্ছ?

—আমি কষ্ট দিই, আর তো কেউ কাউকে কষ্ট দেয় না, সেই ভালো। বলিয়া মুখ ফিরাইয়া বলিতে লাগিল—দু-বছরের মধ্যে ক'খানা চিঠি দিয়েছ? দশখানা কি এগারোখানা। সব বেঁধে ওই বাকসোর মধ্যে রেখে দিইছি। বিকেলবেলা এসেছ, তখন থেকেই ভাব দেখছি। বুঝি—বুঝি—সব বুঝি।

কিরণ চোখ মুছিল।

সুধীর বলিল—বললে তো বিশ্বেস করবে না, আমি কি করব?

—কি আর করবে—তিনমহল বাড়ির ভাড়া জোটে, চাকর-বাকরের মাইনে জোটে, কেবল...থাকগে। বলিতে বলিতে কিরণ চুপ করিল।

—তিনমহল বাড়ি ভাড়া করেছি আমি?

কিরণ বলিল, হ্যাঁগো, আমি সব জানি।

সুধীর বলিল—না, লুকব না—আর কি জান বলো তো?

—মাইনে ছাড়া উপরি পাও, রোজ টাকায় আর নোটে পকেট ভর্তি হয়ে যায়। বলো ঠিক কি না?

সুধীর বলিল—ঠিক।

—ঢাকছিলে যে বড়!

সুধীর হাসিল।

বলিল—দেখছিলাম তোমরা কে কি রকম দরদি—অভাবের কথা শুনে কে কি বল। বাসা ভাড়া হয়ে গেছে কিরণ, নিয়ে যাব না তো কি! তোমাদের সব্বাইকে নিয়ে যাব।

কিরণ রুখিয়া বলিল—আমি যাব না, কক্ষনো যাব না—বলছি তো। খুকিকে কোলে নিলে না, বিকেল থেকে একটিবার হাসছ না, দু:খটা কিসের শুনি? টাকাকড়ি হয়েছে—ছাই টাকা, আমরা তোমার টাকা চাইনি।

তখনও ম্লান হাসি ঠোঁটের ওপর ছিল।

সুধীর বলিল—এই যে কত হাসছি, দেখছ না? এত ঝগড়াও করতে পার তুমি, তোমার ও স্বভাবটা আর বদলাল না!

—তোমার স্বভাব বদলেছে, সেই ভালো।

বধূর হাত ধরিয়া টানিয়া সুধীর বলিল—সত্যি, আর রাগারাগি নয়। আজকে সারাদিন বড় কষ্ট গিয়েছে।

কিরণ বলিল—তবু তো একদণ্ড জিরোন নেই এতখানি রাত অবধি।

—কি করব বলো? গাঙ্গুলিমশায় নাছোড়বান্দা—ছেলের চাকরি করে দিতে হবে। বলে এলাম, হেমন্তকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় যাব। কেশব ঘোষ, রাম মিত্তির তারক চক্কোত্তি সকলের চার সনের খাজনা বাকি—তার কড়াক্রান্তি হিসেব হয়ে গেল—কাল সকালে সব আসবেন—মিটিয়ে দিতে হবে। শ্রীদাম মল্লিকমশাই আপ্যায়ন করে বসিয়ে ঠিকানা টুকে নিলেন, গঙ্গাস্নানের যোগে সপরিবারে আমার বাসায় পায়ের ধুলো দেবেন। ক্লাবের ছেলেরা কাল মিটিং করবে, তাদের সিনড্রেসের এস্টিমেট হবে। বড়লোকের হাঙ্গমা কত! সবারই গরজ বেশি, কেউ ছাড়েন না, অব্যাহতি কোথায়?

এই সব বাজে কথা শুনিতে কিরণের মন চাহিতেছিল না।

বেশ করেছ—বড় কাজ করেছ। বলিয়া হঠাৎ ঘুমন্ত মেয়েকে বিছানা হইতে টানিয়া তুলিয়া হাসিতে হাসিতে হুকুমের সুরে বলিল—মেয়ে কোলে নাও—তোমার মতো অধৈর্য নয়, দেখো তো কেমন। নাও।

সুধীর কিন্তু উৎসাহ প্রকাশ করিল না। বলিল—আবার জেগে ওঠে এক্ষুনি কান্নাকাটি শুরু করবে। এ সব কাল হবে। ভারি ঘুম পাচ্ছে, আমি এখন শুই।

ঠিক তাহার ঘণ্টা দুই পরে সুধীর খাট হইতে নামিয়া দাঁড়াইল। হেরিকেনের জোর কমানো ছিল, উস্কাইয়া দিয়া দেখিল—মেয়ের পাশে কিরণ বিভোর হইয়া ঘুমাইতেছে। একখানা চিঠি লিখিল :

কিরণ, আমার সম্বন্ধে কিছু ভুল শুনিয়াছিলে। চাকরি পাইয়াছিলাম, তবে দেড়শ নয়—চল্লিশ টাকা। বাসা ভাড়া করিয়াছিলাম—উহা তিনতলা নয়, পাকা মেঝে, চাঁচের বেড়া, টিনের ঘর। কিন্তু বাজারে মন্দা বলিয়া আজ সাতদিন চাকরির জবাব হইয়াছে। তোমাদিগকে লইয়া একসঙ্গে থাকিব। এই আশায় বাসা ভাড়া করিয়াছিলাম, কিন্তু যে অর্ধেক ভাড়া অগ্রিম দিতে হইয়াছিল, সেইটাই লোকসান। দু-বছর যে কষ্ট গিয়াছে তাহা ভগবান জানেন। শহরে বসিয়া আর উঞ্ছবৃত্তি করিতে পারি না, তাই দু-একদিন জিরাইতে আসিয়াছিলাম।

এই মাসের মাহিনার মধ্যে হোটেল খরচ বাসা-ভাড়া আপিস-দারোয়ানের দেনা এবং বাড়ি আসিবার ট্রেন-ভাড়া বাদে সম্প্রতি হাতে এগারো টাকা বার আনা আছে। চিঠির সঙ্গে দশ টাকার একখানা নোট গাঁথিয়া রাখিয়া যাইতেছি। উহা হইতে খুকির জন্যে গিনি সোনার হার, কেশব প্রভৃতির খাজনা শোধ, ড্রামাটিক ক্লাবের সিন-ড্রেস, গাঙ্গুলি-পুত্রের কলিকাতার রাহা খরচ এবং বাবা ও তোমার যদি অপর কোনও সাধ বাসনা থাকে, সমাধা করিও। আমার জন্য চিন্তা নাই—নগদ সাতসিকা লইয়া রওনা হইলাম।

পরদিন নিবারণ বলিতে লাগিলেন—আপিসের কাজে ওই তো মুশকিল। দুপুর রাত্রে টেলিগ্রাম এসে হাজির, ভোর বেলা ইস্টিশানে পৌঁছে দিয়ে এলাম। ওকে ছাড়া আর কাউকে দিয়ে সাহেবের বিশ্বাস নেই—অপিসের হেড কিনা।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%