নিম অন্নপূর্ণা

সমরেশ মজুমদার

যুথী বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবুজ পাখিটির ঘোরাফেরা দেখছিল, এ সময় তার হাত-দুটি অদ্ভুতভাবে উঁচু করা ছিল, একারণ, যে-ফ্রকটি তার পরনে ছিল সেটিতে একটিও বোতাম নেই এবং বোতামের জায়গা থেকে সোজা শেষপর্যন্ত ছিঁড়ে দু-হাট খোলা, ফলে বেচারিকে সর্বক্ষণই সাধারণভাবে চলাফেরার সময় তার আপনকার হাত দুটিকে উঁচু করে রাখতেই হয়, এতে করে মনে হয় তার ভারী আনন্দ হয়েছে—সে খুশি, অন্যথা অর্থাৎ যদি ভুল হয়, যদি সে হাত নামায়, ঝটিতি ফ্রকটি গা বেয়ে ঝরে পড়ে, খুলে পড়ে, তখন সে, যুথী সখেদ একটি 'আরে' বলে, পুনরায় ঠোঁটে ঠোঁট চেপে জোর পটুত্বের সঙ্গে, ফ্রকটি আপনার কাঁধে তুলে দিয়ে থাকে।

সম্মুখের টিয়া কেমন ঘাড় বাঁকায়, সন্মুখের টিয়া কেমন পক্ষবিস্তার করে—কেমনে পক্ষবিস্তার করত লাল ঠোঁট দ্বারা কী যেন বা পাখাতেই খোঁজে, এসবই তার নজরে পড়েছিল। কখনও বা টিয়াপাখিটি তেতো বিরক্তির সঙ্গে এক পাহাড় ছোলা থেকে শুধুমাত্র একটি তুলে ছাড়িয়ে ফেলে, খোসাটি মাটিতে পড়ে, যুথী তা লক্ষ করেছিল এবং সে, তখনই একটি ঢোক গিলে তার দিকে দেখেছিল। এবার, আবার তার সামনে, সবুজ পাখি সাদা দেওয়াল, অতি মনোহর এক দৃশ্য রচিত হয়েছে—তবুও যুথীর চক্ষুদ্বয় দুবৃত্ত এবং সে মরিয়া হয়েই, কোনক্রমে, পাখির বাটিতে আঘাত করে—ফলে দাঁড়টিতে দোলা লাগল, আর সেই সঙ্গেই দুচারটি ছোলাও ছিটকে পড়েছিল, সত্বর তৎপর ছোলাগুলি তুলতে গিয়ে ফ্রকটি তার খুলে যায়, ছোলাগুলি তুলে মুখে পুরেই তবে সে ফ্রকটি ঠিক করে, এখন সে দাঁড়ের কাছে এল, এক হাত দ্বারা অন্য হাতের কাঁধের কাছের জামার অংশটি ধরে, ডান হাতখানি জামায় মুছে মুছে আপনাকে প্রস্তুত করছিল, বোধহয় হাতে ঘাম জমেছিল, একথা প্রকাশ থাকে যে জামার একদা রঙিন অদ্য ম্লান ফুলগুলি মুচড়ে মুষড়ে গিয়েছিল। আর পাখিটি ভারী অস্থির, পাখিটি ভারী তেরছা, নিজের দেহেতেই যেন বড় বেশি করে জোট পাকিয়ে গিয়েছে। অবশ্য সে পাখিটি একবারও আওয়াজ করেনি।

এসময়, যুথী একটু ভাবুক হয়েছিল। অন্যমনস্ক হয়েছিল, ভেবেছিল। ভেবেছিল—সে যদি পাখি হত—কেন না সে শুনেছে কোনও কোনও ময়রা দোকানের ঝাঁপ খুলেই রাস্তায় নামে, হাতে এক চ্যাংয়ারি খাবার, তাতে জিলিপি আছেই, কচুরি নিমকি আর আর কী সব আছে, ময়রা 'চিলো চিলো' বলে চিৎকার করে, এবং তার ঘটিয়াল ভুঁড়িখানি নসরপসর, আকাশ চিলে চিলময়—আকাশটা যেমত বা গাড়ির আড্ডা—ছ্যাকরা গাড়ির ঘোড়ার মতো চিলগুলো চিঁহি চিঁহি করে উঠে, তদনন্তর খাবারগুলি সে, ময়রা, ছুড়ে ছুড়ে দেয় আর বলতে থাকে, 'আমরা বাসি খাবার বেচি না, কাউকে দিইও না,' এখানে অনেক ভিখারির ছেলেরা দাঁড়িয়ে, কেউ মার কোলে, সকালের সৌখিন রোদ এদের পাশ কাটিয়ে রাস্তায় ইতস্তত, এরা যেমন বা আচারের শিশি থেকে বার হয়ে এসেছে, তারা ময়রার মহানুভবতা দেখে, হাতখানি প্রসারিত করে চিলের খাওয়া দেখে।—এই সূত্রে যুথীর, 'ভিখারি' কথাটা মনে পড়তেই, মুখখানি সিটিয়ে উঠেছিল, কেননা সে শুনেছে অনেক পাপ, সাতজন্ম পাপ করলেই ভিখারি হয়, ছেলেমানুষ যুথী একথা স্মরণেই ছোট একটা নমস্কারও করেছিল, অর্থ এই যে, তার অতি বড় শত্রুরও যেন এমন দশা না হয়। নমস্কার যেমন সে করেছিল, তেমন সে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিল, চিলকে দেখলে তার বড় ভয়, সে চিল হতে চায় না, কেন না চিল যদি হয়, তাহলে হয়তো চিলই তার ভয়ঙ্কর ঠোঁট দিয়ে তাকে ছিঁড়ে ফেলবে। এইটুকু ভাববার পর, সে আর বেশি সময় নেয়নি, একারণে যে বেশি দেরি করলে, এ বাড়ির লোক—নিশ্চয়ই এসে পড়বে।

ইদানীং পাখিটি কিয়ৎপরিমাণে শান্ত, তার ঠিক কিছু নীচে যুথীর জ্বলজ্বলে মুখখানি, ছেঁড়া লাল পাড় দিয়ে বেড়া-বেণী করা, চোখদুটি পিঙ্গল, এলেবেলে, হিঙ্গুল, মারাত্মক, মুখের ছোলাগুলি একান্তে ঠেলে দিয়ে, মাথাটা তার কী যেন লক্ষ করবার জন্য আনচান করছিল, পরক্ষণেই সে হাতটা তিন তিনবার কপালে আর বুকে ঠুকেই ধাঁ করে দাঁড়টায় যেই না ঠেলা দিতে গেল, পাখিটা তৎক্ষণাৎ তার লাল ঠোঁট দিয়ে যুথীর আঙুলে কামড়ে ধরেছে।

ছেলেমানুষ যুথীর চিৎকারে এই বাড়িখানি যেন বা 'শ্রীমধুসূদন' বলে উঠেছিল, পাখিটা এখনও যুথীর আঙুল ছাড়েনি, দাঁড় নড়ছে, এবং কয়েকটি ছোলা যুথীর মাথা এবং গা বেয়ে ঝরে পড়ে। কোনক্রমে, ভাগ্যক্রমে সে আপনার হাতখানি ছাড়িয়ে আনতে পেরেছিল।

যুথী বোকার মতোই আঙুলটির দিকে চেয়েছিল, কেন না, আঙুল বেয়ে খরধার রক্ত পড়ে, আর যে কোনও কিছু করার মতো দক্ষতা তার নেই। এবাড়ির বউটি বয়েসে নবীনা, সদ্যস্নাত মুখমণ্ডল, ব্লাউজটি পরা, সবেমাত্র সায়াটি পরে পরনের ভিজে গামছাখানি একহাতে খানিক টেনে যখন বার করেছে তৎক্ষণাৎ এই ভয়াবহ চিৎকার তাকে বিদ্রাবিত করে, এবং পরক্ষণেই এই আতঙ্ককারী দৃশ্যে সে বক্ষোহীনা স্পন্দন-রহিত, ফলে সায়া থেকে ওঠা লাল গামছাখানি তার হাতে তেমনি সম্বদ্ধ ছিল, সুন্দর খঞ্জন নয়নযুগল—স্ফীত, স্বপ্নহীন, ভীত, শক্ত, উজ্জ্বল, রগছোঁয়া, ভ্রূদ্বয়ে বিদ্যুৎ ইঙ্গিত, দেহ বয়সোচিত ধর্মে উষ্ণ, এখন, এতদ্দর্শনে আগুনগরম সুতরাং আপনার আলুলায়িত কেশরাশি—যা সিক্ত—তার ঘাড়ে সপসপে হিম সঞ্চার করে, তাই তার রোমহর্ষ হয়। এবং এ তরুণ মুখখানি কক্ষের আঁধার থেকে সকালের তীব্র আলোয় ক্ষণেকের জন্য এসেই পুনশ্চ কক্ষে ফিরে যায়।

যুথীর পালাবার কোনও পথ ছিল না। ভয়ে, বিশেষত যন্ত্রণায় এবং কিয়ৎ-পরিমাণে লজ্জায় তার আনন পিঙ্গল, চক্ষুদ্বয় জলে কালো, মুখখানি পাশ্ববর্তী শূন্যতায় আটকে জমে আড়ষ্ট এমত মনে হয়, আর যে, সে বিবিধ সুকৌশল ভঙ্গি সহকারে তা খুলে আনবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে এবং ঠিক এই সময় ডানহাতের আঙুলটি চেপে ধরবার উচিতবুদ্ধি তার হয়েছিল, এতে করে গায়ের জামাটি, খুব আশ্চর্য যে, মাত্র একপাশেই খুলে পড়েছিল। এবং যন্ত্রণায় আর একবার সে চিৎকার করেছিল। এই হৃদয়বিদারক শব্দে পরিচ্ছন্ন, শুভ্র, লক্ষ্মীশ্রীযুক্ত বাড়িখানি বিড়ালের চোখের মতো বড় হয়ে গিয়েছিল এবং তন্নিমিত্ত এ গৃহস্থিত চিনিপাতা জীবন মুহূর্তকালের জন্য পাশার অক্ষের মতো নিষ্পেষিত শব্দ করে উঠে।

দ্বিতীয় চিৎকারে এবাড়ির বিধবা গিন্নি খেতু মিত্তিরের মা ছুটে আসবার চেষ্টা করেছিলেন, কেননা তাঁর ভিজে কাপড় —ভিজে কাপড়েই তাঁকে অনেক শুদ্ধ কাজ করতে হয়—মুখ তাঁর, এ সময়োচিত আষ্টোত্তর শত নাম—'বিদুর রাখিল নাম কাঙাল ঈশ্বর' পদে এসে থেমেই, 'কী হল—কী হল' বাক্য, ভিজে কাপড়ে এখনও কিছু ব্যস্ততার শব্দ ছিল, এ কারণে যে সম্মুখবর্তী এ-দৃশ্যে কিরূপ ভঙ্গি যে করা উচিত তা ভাববার মতো তাঁর অবকাশ ছিল না, হয় তিনি বেশি করে আলো অথবা বেশি করে ঝাপসা কিছু দেখেছিলেন, তাঁর দেহটি কেবলমাত্র কর্তব্যবশে সম্মুখে এবং শুচিবায়ুতার জন্য পিছনে দুলে গিয়েছিল, আর মুখে বারম্বার একই কথা ধ্বনিত হয়েছিল, 'ওমা কী সব্বনাশ গো, কী সব্বনাশ'। তাঁর স্বরের মধ্যে যথাযথ অসহায়তা ছিল। ইত:মধ্যে নবীনা বউটি কোনক্রমে এখানে এসেছিল, তখনও বাঁ হাতে সায়াটি আঁট করে ধরা, এবারে ঝটিতি গিঁট বেঁধেই যখন সে যুথীকে সাহায্য করতে যাবে তৎক্ষণাৎ থমকে গেল।

কেন না, খেতুর মা আপনার গায় গতর খেলিয়ে বলেছিলেন, 'বলি হ্যাঁগা, তুমি কী পাগল নাকি। বললে বড় অন্যায় হয়, সাধে কী তোমার ভাগাড়ে কোল...বলি চান করেছ না, ওকে ছুঁলে আবার কাপড় জুটবে...?' ইত্যাকার বাক্যে বুঝা গেল খেতু মিত্তিরের মা খানিক নিশ্চিন্ত খানিক সমঝে উঠতে পেরেছিলেন, এবং আপন পুত্রবধূকে নিবারণ করে এবার যুথীকে ধমক দিয়ে বললেন, 'নে নে চোষ না হারামজাদি আঙুলটা, মরণ! হ্যাঁরা কাটল কী করে?'

যুথী চুপ, হয়তো তার মনে পড়েছিল যে পাখিটা কথা বলতে পারে, ফলে আরও ভীত হয়ে সে দাঁড়িয়েছিল, নবীনা বৌটি রক্তদর্শনে মুখখানিকে ঠেলে বাঁধা পুটলির মতো করেছিল, অজস্র চুলকে ঘাড় থেকে একটু হাটাবার জন্য মাথা নাড়া দিয়ে বললে, 'পাখি।'

'পাখি!' সাতসকালে কী অলুক্ষণে কাণ্ডরে বাবা'—বলে খেতুর মা সাক্ষী-মানা কণ্ঠে বললেন, 'পাখি, আমার পাখির তো অমন স্বভাব নয়' এবং পাছে দোষ পড়ে—একথা নিশ্চয়ই স্মরণ করত পুনরায় বলেছিলেন, 'তুই সাত সকালে মরতে আমাদের বাড়ি ঢুকেছিলি কেন?...নে চোষ না আঙুলটা পোড়ারমুখী, আবার ধ্যানাপানা...নাও বউমা, টক করে একটু চুন এনে দাও...'

বউটি সত্বর চুন আনতে গেল।—যুথী, এখনও বুদ্ধিভ্রংশ, খেতুর মার কথায় খানিক হাঁ করে রক্তাক্ত আঙুলটি মুখে পুরবে কিনা ভাবতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ—এতাবৎ আপনার মুখে সযত্নে রক্ষিত ছোলাগুলি, যা সে মুখে পুরেই চিবোয়নি, একারণে যে চিবোলেই তো শেষ, তাই অতি কৃপণের মতোই মুখের একান্তে রেখেছিল এবং হাঁ করে আঙুল মুখে পুরবে, না মুখটা আঙুলের কাছেই নিয়ে যাবে এই বিষম দ্বিধায় অদ্ভুত হাস্যকর অবস্থা তার হয়েছিল—হঠাৎ ঠিক এই মুহূর্তে তার মুখনি:সৃত ছোলা কটি পড়ে, গড়িয়ে খেতুর মার জল-সাদা হাজাদষ্ট পায়ের নিকটে লেগেছিল। বেচারি যুথী! উপরন্তু বেচারি যুথীর মুখ থেকে অল্প লালা তার নিজের হাতেই পড়েছিল এবং সে কম্পমানা!

অন্যপক্ষে, ছোলা পড়তেই, খেতুর মা ঝটিতি দু-এক পা সরে এসেছিলেন, মাটি থেকে চোখ ফিরিয়ে তিনি যুথীকে দেখে, রাগে রোষে আক্রোশে তাঁর গাত্রবস্ত্র যেমত বা শুষ্ক হয়েছিল, কী বলে যে গঞ্জনা শুরু করবেন তা সঠিকভাবে তাঁর ঠোঁটে গুছিয়ে নিতে পারছিলেন না, সহসা আক্রমণ আরম্ভ হয়ে গেল, 'ওমা মেয়ের কী নোলা গো!...কোথা যাব গো...' এসময় আপনার গণ্ডস্থলে তর্জনী ছিল, এরপরই দাঁতে দাঁতে ঘষে বলতে লাগলেন, 'বেশ হয়েছে, খুব হয়েছে, এবার নিজের রক্ত পেট ভরে খাও...'

যে যুথী এতক্ষণে কাঁদেনি, হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়ার দরুন চিৎকার করে কেঁদে উঠল, তথাপি চোখ দুটি ভারী সজাগ ছিল, খেতুর মা আপনকার গা গতর ভিজে কাপড়ে ঘর্ষণ করত বললেন, 'এক চড়ে তো...দাঁত কপাটি ভেঙে দেব, আবার কাঁদনা হচ্ছে ছ্যাঁচড়া আক্কটে ভিকিরির মরণ। পাখিটা তোর টুটি ছিঁড়লে আমি হরিনুট দিতুম...হারামজাদি ছোলাচুরি। ফের যদি এ বাড়ির ত্রিসীমানায় আসবি তো ঝেঁটিয়ে তোর খাল খেঁচে নেব...তাই বলি আমার পাখি কেষ্ট নাম ভেন্ন যে জানে না, সে কেন কামড়াবে...উ: তো বাপ মা কি কিছু খেতে দেয় না...চোষ না রক্তটা।'

এমন সময় বৌটি একটি গোটা পানে খানিক চুন নিয়ে এসে দাঁড়াতেই, খেতুর মা সত্যিই ক্ষিপ্ত তিরিক্ষি হয়ে উঠে ছোট একটা লাফ দিয়ে উঠেছিলেন, বললেন, 'খুব যে দরদ দেখাতে এগিয়ে যাচ্ছিলে' বলেই, পরেই, হঠাৎ চুনসমেত পানটির দিকে নজর পড়তেই গায়ে যেন বিছুটি লাগল, খেঁকিয়ে উঠে বলেছিলেন, 'তোমার কী কোনও আক্কেল নেই গা, বলি এই বাজারে একটা গোটা পান নষ্ট করলে, বলি...আকালের কথা কী তোমার অজানা...না...'

বউটি তটস্থ, থ, জড়সড়, চকিতেই মেঝেতে পানটি রেখে দিলে, না পানটি হাত থেকে খসে মেজেতে পড়েছিল, তা বুঝা গেল না। রক্তের অজস্র ফোঁটার মধ্যে পানটি লক্ষ্য করেই খেতুর মা যুথীকে প্রচণ্ড কণ্ঠে বললেন, 'তোল বলছি, হাঁ করে রইলি যে হারামজাদি।'

এবম্প্রকার বাক্যে বেচারি যুথীর প্রকৃতপক্ষে কী যে করা শোভনীয় তা সে নিজেই কিনারা করতে পারছিল না, সে একবার মেজের দিকে অন্যবার খেতুর মার দিকে আড়ে-আড়ে চেয়েছিল। খেতুর মা এইটুকু বিলম্বেই অস্থির। মুহূর্তের মধ্যেই সকালের আলোকে বাঁকা চোখে দেখেন এবং নিমেষেই পান তাঁর নিজের হাতে তুলে, একবার মাত্র চুনসমেত পানটির দিকে তাকিয়ে নিশ্চয়ই একথা ভেবেছিলেন যে তাকে এ কাজের পর আর একবার স্নান করতে হবে, ভেবে পরক্ষণেই যুথীর বেড়া-বেণীটা হেঁচকাটানে নামিয়ে বেশ জবর মুঠো করে ধরার পরে পানটা তার কাছে এগিয়ে দিতে—সে, যুথী, অতি সহজভাবে সেটা নিয়ে নিজের আঙুলের উপর চেপে ধরেছিল, এবং যুগপৎ আপনার দাঁত দ্বারা কাঁধের জামাটা কিঞ্চিৎ টান দিয়েছিল।

খেতুর মার ক্রোধ-উন্মত্ত বেণী আকর্ষণে যুথী বড় নিশ্চিত হয়, ঝাঁটা লাথি—এ সবে তার যেমন বা সকল কিছু বোধগম্য পরিষ্কার লাগে, সুতরাং এই সে চেয়েছিল, যেহেতু সে কোনওমতেই দুই চোখে দুইদিকে দুভাবে আর দেখতে পাচ্ছিল না, এ ছাড়া এত আলো থেকেও সব কিছুতেই যেমন বা সন্ধ্যা, তাই যুথী ইত্যাকার নির্মম ব্যবহারেও অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিল, এখন খেতুর মার সঙ্গে পা মিলিয়ে অক্লেশে চলতে পারবে। খেতুর মা আর কালবিলম্ব না করে তার চুলের মুঠি ধরে এক টান মেরেছিলেন।

খেতুর মা তাকে যখন নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পাখিটার পাশ দিয়েই তাঁদের যেতে হয়, ফলে, এ সময়ে যুথী খেতুর মার কাছে ঘেঁষে এসেছিল, এবং চোরা-গোপ্তা চাহনিতে পাখিটার প্রতি সে দেখে, পিতলের চকচকে দাঁড়ের উপরে নিশিত তীব্র সাংঘাতিক রুক্ষ পা দুটি, আর তার ঠিক উপরেই পাখির সুডৌল উদর দেখা যায়,—শেষ রাতে চন্দ্রকিরণে প্রকাশমান শরৎকালীন মেঘ যেমন, হয়তো সবুজ কিম্বা পাণ্ডুর, কী নরম কী তুলতুলে! সুওদর সুউমার—শুকউদর সুকুমার তথা কোমলতা, এরূপ যে প্রবচন, সেইটুকু প্রত্যক্ষের, দেখার মানসে মানুষ কী টিয়াপাখি পোষে!

যুথী আপনাকে নির্বিকারভাবে, খেতুর মার বজ্রমুষ্টির মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিল। তাকে নিয়ে, রাস্তায় নেমে, এই পরিপ্রেক্ষিতহীন লালগলিতে নেমেই, দুবার চিকচিক করে থুতু ফেলে—মাথার কাপড়ে হাত দেবার কথা তাঁর মনেই হয়নি, একারণে যে গলি সুনসান—যুথীদের বাড়ির দরজার সুমুখে এসে দাঁড়ালেন। এবং দরজায় লাথি মারতেই দরজাটা আপনা থেকে খুলে গেল, এটা তিনি, খেতুর মা, আশা করেননি, ফলে দোমনা হয়ে ছেলেমানুষের মতো অহেতুক সর্দি টেনেছিলেন।

দরজা খোলার পর, ভিতরের ঝাপসা অন্ধকার কাটার পর দেখা গেল প্রীতিলতা।

প্রীতিলতা দেওয়ালে একটি পা ঠেস দিয়ে দণ্ডায়মান, হাতের আলগা মুঠোয় একগাদা, একথোকা চুল, যা অবহেলায় অনিয়মে মেহেদিপিঙ্গল, তবু সেখানে অন্ধকার; সে জননী, তথাপি এ খেলা তার ভাল লাগে, অজস্র চুলে চুলে পাচনতুল্য গন্ধ, এ-হেন গন্ধে আপনাকে বড় পুরাতন বলে বোধ হয়, গায়ে ন্যাপথলির আর তোরঙ্গের মরিচার গন্ধে—মিলেমিশে—দিনগুলিকে যেমন বা সুদীর্ঘ করে আর যে, তাকে, প্রীতিলতাকে, অযথাই, মন্দভাগ্যক্রমে, নিশ্চিহ্ন করেছে, বস্তুত সে নিজেকে খুঁজে না পেলেও, আপনাকে বুঝে না পেলেও অদ্য সে নিশ্বাস নেয়, আজও সে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে। ভেবেছে, হায় আমার থেকে আমার ছায়া সুখী। সে চোখ ছোট করে দিনমান দেখে, সে চোখ সুতীক্ষ্ম করত অন্ধকার দেখে।

খেতু মিত্তিরের মা প্রীতিলতাকে দেখে থমকেছিলেন, তারপর নিজের বেণীধৃতমুষ্টি দেখেই যেন বা নিশ্চয়াত্মক বুদ্ধি ফিরে পেলেন, এবং অন্যহাতে ভিজে কাপড়ের খানিক দিয়ে ওষ্টদ্বয় আবৃত ছিল, এখন কথা বলার সময় মুখের কাপড় কিয়ৎ পরিমাণে সরানো হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, 'এই নাও বামুনের মেয়ে...'এই 'নাও' বাক্যের মধ্যে সত্যনিষ্ঠার গরব ছিল।

প্রীতিলতা, অল্প আয়াসেই মুখখানি বাঁকিয়ে তাদের দেখেছিল—ভাতে ব্যাঙ লাফিয়ে পড়লে চাষা যেমত লাফ দিয়ে উঠে—তেমন তেমন লাফ, তেমনই যেমন বা তার ভিতরে দিয়ে উঠল, কিন্তু দেহে কোনও সাড় দেখা গেল না, কেবলমাত্র হস্তধৃত চুলসমূহ, এ দৃশ্য দেখেই, সে চকিতে মুঠো ছেড়ে দিয়েছিল।

অন্যপক্ষে, খেতুর মা যুথীর বেণীও ছেড়ে দিয়েছিলেন, দিয়েই বললেন, 'তোমার মেয়ে কী বলব বাবা, বললে পেত্যয় যাবে না, সাতসকালে লোকে শুনলে বলবে খেতু মিত্তিরের মা কি লোক গা...'

ভদ্দরনোকের মেয়ে ঘেন্না পিত্তি নেই, একেবারে ভিকিরির অদম গা...পাখির ছোলা চুরি করতে গিয়ে কী কাণ্ড বাধালে...মুখ থেকে না পড়লে কী আমিই টের পেতুম...' এইটুকু বলেই খেতুর মা চারিদিকে চেয়েছিলেন, এ কারণে যে তাঁর মনে হয়েছিল, এখানে বারান্দায় কেউ নেই, আর যে—তিনি একাই বকে মরছেন, খেতুর মা আশা করেছিলেন এইটুকু বলতেই যুথীর মা যুথীকে আর আস্ত রাখবে না, কিন্তু কই? ফলে তাঁর বড় অসম্ভব রাগ হয়, কণ্ঠস্বর কর্কশ এবং দৃঢ় হল, বলেছিলেন, 'বলি তোমার কী মনে হয় আমি মিথ্যে বলেচি...সৎশাসনে না রাখলে মেয়ে কালে...বাতাসি ছেনতাল হবে, ঝরঝরে হবে, পরকালে...'

প্রীতিলতা, আশ্চর্য, মনোযোগ সহকারে সকল কথাই শুনছিল, যেহেতু খেতুর মার গলায়, কথার টানের মধ্যে, লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ার ধাঁচ ছিল, মিল ছিল, বিশেষত যেখানে আছে, 'বন অধিষ্ঠাত্রী তুমি বনে বনে।' যেখানে, 'গৃহলক্ষ্মীরূপে তুমি সকলের ঘরে। দীনজনে রাজ্য পায় তব কৃপা বলে' সে, প্রীতিলতা, যেমত বা করজোড়ে যুথী-সংবাদ শুনছিল, কিন্তু তা হলেও এ কথা সত্য যে 'ভিকিরি' কথা তাকে রক্তের প্রাচুর্য্য দিয়েছিল—চুরির কথাটা এ তুলনায় মাটির—আচম্বিতে প্রীতিলতার স্বল্পতোয়াসদৃশ দেহখানি রুষ্ট সাপের মতোই আলোড়িত হয়ে উঠে, আপনকার বরফ-দেওয়া চোখের দৃষ্টিকে, আমোঘভাবে ছোরা যেমন করে হাতে ধরে, তেমনি—সেইভাবে উদ্যত করে ধরেছিল। খেতুর মা কথা শেষ না করেই যেই তুড়ি দেওয়ার শব্দের মতো তাচ্ছিল্যভরে 'হ্যাঁ' আওয়াজ করেছেন, তদ্দণ্ডেই প্রীতিলতা 'ই:' ধ্বনি করে উঠে, আর ঠিক এ হেন সময় এক ঝাঁক জঙ্গি-বিমান উড়ে গিয়েছিল। এখানকার সকলেই এ বারান্দা প্রায়-ঢাকা-পাঁচিলের ওপরে, উপরে যে আকাশ, সেদিকে চাইল। তথাপি, প্রীতিলতা নিজেকে এখন, ইত:মধ্যেই শাণ দেবার অবকাশ পেয়েছিল, সে মুখখানিতে ঈদৃশ ভঙ্গি করে যে যেমন মনে হয় সে কিছু খাচ্ছে অথবা তার জিহ্বা আঠায় জড়িয়ে গিয়েছে, এরপরেই সে বিড়ালের মতো ফ্যাস করে উঠেছিল, বললে, 'নিজে যে বগলে, সাবান দাও বিধবা হয়ে, তা-বেলা কিছুটি হয় না...না?' একবার নিজস্ব ভাষাটা অনুধাবন করেই পুনর্বার বললে, 'সে-বেলা কিছু হয় না'...এই সঙ্গে অঢেল শোনা ইংরাজি বলার জন্য—অবশ্য এ সকল শব্দ বাক্য নয়, গ্যাট ম্যাট হুট ফাট জাতীয় ইংরাজিআত্মক—তার জিহ্বা যারপরনাই কড়কে উঠল।

প্রীতিলতার ঘোর বাক্যস্রোতে খেতুর মার মুখাবৃত কাপড়ের অংশ ঝরে পড়ল, কোনদিকে যে অজস্র আলো তথা কোনদিকে যে দরজা তা বেচারি খেতুর মা, বুড়োমানুষ, ঠিক ঠিক ঠাওর করতে পারলেন না, অবশ্য অবশেষে তিনি অদৃশ্য হন। প্রীতিলতার কাছে খেতুর মার এই চিত্তভ্রমবশত হাঁকাপাক বড় মজার মনে হয়েছিল এবং বেচারি এই প্রসঙ্গে হাসতে গিয়ে আপনকার বিবর্ণ, আর্ত বেদনাময় মুখখানিকে যন্ত্রণা দিয়েছিল। তবু সে কাতর নয়, সে হেসেছিল, তার শতচ্ছিন্ন কাপড়ের আঁচল তুলতে গিয়ে মাকড়সার পায়ের দক্ষতায় তার আঙুলগুলি পুনরায় চুলগুলিকে সংগ্রহ করে, এবং সে, প্রীতিলতা আপনকার অজস্র চুলের অঞ্জলিবদ্ধ অন্ধকারে মুখমণ্ডল ন্যস্ত করত বর-দেখা হাসি হাসল।

যুথী নিজের ব্যথাটাকে বড় করবার চেষ্টা করে তার মাকে হাতখানি দেখাচ্ছিল, তবু চুলের আঁধার এবং তার উপর ঘোরদর্শন রাত্রে বিদুৎরেখাতুল্য হাসি, তাকে, যুথীকে, অনেকের কথা স্মরণ করিয়েছিল, যথা বাবা কোথায়, যথা লতি কই? নিশ্চয়ই সে তাদের আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল, কেন না সে এক আপৎকালের সমুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। সহসা, পলকেই তার মাথায় যেমত বা বাত্যাপ্রবাহ খেলে গেল, আর যে, সে কেবলমাত্র এক পা পিছনে সরে, ভীতত্রস্তস্বরে আ: আ: করে বলেছিল, 'তোমার পায়ে পড়ি আর করব না আ...করব না' এবং তার অল্পবুদ্ধিতে রক্তাক্ত হাতটি ইষৎ উঁচু করে দেখিয়ে মার, প্রীতিলতার, দৃষ্টি আকর্ষণ অথবা করুণা ভিক্ষা করতে চেয়েছিল এ কারণ প্রীতিলতা—সূক্ষ্ম, বিবশ, যদিও বিশীর্ণা যদিচ বহুদিবস হাভাতে তথাপি ইদানীং সরোষিত তীব্র ভয়ঙ্কর ফণা তুলে আসছিল—অজস্র ছেঁড়া-মধ্য দিয়ে প্রকাশিত তার অঙ্গাংশ সকল লাল—মলিন ছিন্ন কাপড়ে ধরা-পড়া একটি ঝড়!

যুথীর গলায় আর কোনও স্বর ছিল না, মুখমণ্ডল ভয়ে কালসিটে, তবু এটুকু ব্যবধান মধ্যে সে একটিমাত্র চোরা ঢোক গিলেছিল, যেহেতু প্রীতিলতা আর বেশি এগিয়ে আসতে পারনি, যেহেতু গায়ে গতরে, তার নিজেরই, কোনও ক্ষমতা ছিল না, যেহেতু সে, প্রীতিলতা, যে যুথীর মুখে না-পাওয়ার দুর্দৈব তৎসহ না-মাজা বাসনের মতো ময়লা—এই 'না-মাজা' কথাটা তার আপনার ইজ্জতে লেগেছিল, যেহেতু 'না-মাজা' কথাটায় এই সংসার, এখনকার দিনের পরিচ্ছন্ন দৈন্য-উপহত চেহারাটা ছিল, যেরূপে বীজমধ্যে বৃক্ষের ছায়া পর্যন্ত নিহিত থাকে; এবং দীনা প্রীতিলতার মধ্যে দিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেল; এখন সে থমকে দাঁড়াল।

প্রীতিলতা অন্য আর একদিক থেকে নিশ্বাস নেবার জন্য ছোট বারান্দার আর আর দিকে চাইল, এখানে সেখানে সাতবাসটে অন্ধকার—বালতি আর টোল খাওয়া ডেকচির জল ছাড়া আর কোথাও যে সকাল হয়েছে এ সত্যের উল্লেখ নেই, প্রায়-ঢাকা বারান্দার উপর দিয়ে এক লুপ্ত আকাশ দেখা যায়, যাতে করে মনে হয়—তারা যেখানে আছে, সেটা পৃথিবী। অবশ্য, মেঘমন্দ্র প্লেনের শব্দ, ক্কচিৎ মোটরের হর্ন, অথবা কখনও সাইরেন আছেই; এতদ্ব্যতীত রাত্রে হরিধ্বনি থেকেও বীভৎস হয়ে উঠে মানুষের কণ্ঠস্বরের নামে উত্তাল উদ্দাম পোড়ার আওয়াজ, মনে হয় এক আপনাকেই কামড়ায়—ধনীরা সুখী, কেন না এ-হেন মর্মন্তুদ আওয়াজে তারা পাশবিক অত্যাচারীর সদর্প-মাভৈ ধ্বনি শুনে আপনার দ্বার অর্গলবদ্ধ করে; সুতরাং তারা নিশ্চিন্তে ঘুমায়। অন্যপক্ষে, সামান্যা রমণী প্রীতিলতা তাদৃশ্য চর্ম-লোল-কারী টঙ্কার শ্রবণে অল্পকাল নিমিত্ত নিশ্বাস স্থগিত রাখে, আপনার গৃহস্থালির কতিপয় ফাঁকা বাসনপত্রে, হাঁড়িতে, এ আওয়াজ নির্দয়ভাবে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠে, তখন সে আত্মরক্ষাহেতু আপনার বক্ষদ্বয়ে হস্তস্থাপন করে, তবু বেচারির শীর্ণ একটি হাত কপালে করাঘাত করতে ছুটে যেতে চায়, এবং সে কোনরূপে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে 'নারায়ণ-নারায়ণ' বলে কোনক্রমে হাতের তালু দেয়ালের গায়ে এঁটে ধরে, হাঁকায়, মনে হয় সে যেন বা পালাচ্ছে, রুগ্ন শুষ্ক শক্ত হিম ওষ্ঠপুট জিহ্বা দ্বারা অল্প অল্প বুলাবার চেষ্টা করে এবং পাগল চোখে এদিক সেদিক তাকায়, মনে হয় এ রৌদ্রকর্মা, সে-আওয়াজ তাকে যেন টানছে, ডাকছে। সে 'না, না' বলে উঠেছে তবু ঘাম হয় এবং ঝটিতে 'লতি-যুথী' বলে ডাক দিয়ে আপন কন্যাদ্বয়ের সাড়া নেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে মনস্থ করে ঝুল ঝেড়ে ফেলবে, পয়সা পেলেই পরনের কাপড় ধোপ-দুরস্ত করতে হবে তাহলে এ-দু:সহ আওয়াজ তাকে—তাদের আর চিনতে পারবে না। কিন্তু অনেক শূন্যতা, অনেক পাগলা সেলাই তাকে, প্রীতিলতাকে অতিমাত্রায় ছোট করে।

এখন, প্রীতিলতা আপন গর্ভজাত কন্যা যুথীর দু:খময় সুখের দিকে চাইল, ফলে হঠাৎ-নিভে যাওয়া মনটা দুর্দ্ধর্ষ লাল হয়ে উঠল, রক্তস্রোত স্ফীত তাতাথৈ, যদিও সে নিজে ভেবে পায়নি, এমনধারা এক বিচ্ছু খেউড়ে নিষ্ঠাবতী বিধবা খেতুর মাকে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য করতে পারে, যার ফলে তার পেটটা যেন বা ভরে গিয়েছিল, পরিধেয় বস্ত্রসকল নিরবচ্ছিন্ন, তা ছাড়া শুভ্র, মুহূর্তের জন্য সে রৌদ্রকর্মা আওয়াজের ফাঁদ থেকে অনায়াসে অব্যাহতি পেয়েছিল—প্রীতিলতার দেহটা যেমত বা দেহ থেকে ছুটে বার হয়ে চলে গেছে, নিমেষের জন্য লজ্জাও তার হয়েছিল যেহেতু যুথী তার কথাটা, খেতুর মা'র প্রতি, নিশ্চয়ই শুনেছিল। তাদের মতো ঘরে এমন কুৎসিত কথা শুনলেও পাপ হয়। এ-কারণেই রক্ত তার দিঙমণ্ডলকে প্লাবিত করে, উক্ত কথার স্মৃতি মেয়ের মন থেকে মুছে দেবার নিমিত্তই সে ক্ষিপ্রবেগে ছুটে গিয়েছিল, এবং এই আশাতীত দুর্বিভাব্য গতিবেগে যুথীকে পার হয়ে ক্ষণেক থেমে, আশ্চর্য, পলকেই নিশ্চয় করে, অসম্ভব ঢঙে পুনশ্চ কন্যাকে প্রদক্ষিণ করে—বাজিকর যেমন মড়ার খুলিকে কেন্দ্র করে, সাপুড়ে যেমন সাপকে কেন্দ্র করে, পৃথিবী যেমন সূর্যকে—এসময় নাবালিকা যুথী আপনার রক্তাক্ত হাতখানি অন্য কোনও উপায় না দেখে তুলে ধরেছিল।

এখানকার, বারান্দায়, ধূমসদৃশ আলোয় রক্তাক্ত হাতখানি দেখতে দেখতে প্রীতিলতার চিত্তবিভ্রম ঘটে; সহসা, তাই, সে নতজানু হয়ে বসেই যুথীকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেই সেঁকো কদর্য অভাবের মধ্যেও—যে গভীরতা গীতের শুদ্ধ পর্দায় থাকে, যে গভীরতা জলে প্রতিফলিত তারায়, যে গভীরতা শিশুর হাস্যের রহস্যের মাধুর্যের প্রাণধর্ম—এ-গভীরতা সহজেই সে খুঁজে পেলে ঘুমজড়িত কণ্ঠে সে বলেছিল, 'খুব কেটেছে।'

যুথী এখন মার বাহুবন্ধনে, ঈষৎ সলজ্জ আপন হাতের প্রতি নজর রেখে, অতীব ধীরে মাথা নাড়িয়েছিল।

এখন তারা ঘরে। যুথীর আঙুলটি বাঁধা হয়েছিল, সে মার কোলে ঠেস দিয়ে, আর লতি আর এক পাশে, তারা দুই বোন একটি কথাও বলেনি, এক তক্কে বুঝেছিল যে আমরা বড় নি:সহায়। এবং মার দিকে বড় বেশি করে ঘেঁষে এসেছিল, প্রীতিলতা এইটুকু উষ্ণতার মধ্যে এমন হতে পারে যে সচেতন হয়ে উঠেছিল, কেন না সে যুথীর মাথার উপরে আপন গণ্ডস্থল স্থাপন করে, পরক্ষণেই তার নাসিকা কুঞ্চিত হয়ে উঠল, যেহেতু গন্ধকের মতো ঘৃতকুমারীর মতো এক ধরনের গন্ধ তাকে বিপর্যস্ত করে, সুতরাং প্রীতিলতা, ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মতো উঠে বসে, আড়ে চাইল, সে এখন কঠিন! এ সময়ে তার মনে হয়, মনে পড়ে কী অদ্ভুতভাবে দুইজনে পিঁপড়েকে অনুসরণ করেছিল, একজন হামাগুড়ি দিয়ে, আর একজন বেঁকে হাঁটুতে হাত দুটি রেখে, অল্পকাল পরে পরেই তাদের দ্রুতগতি দেখা যায়, মাটি থেকে মুখ সরিয়ে ঝটিতি যুথী লতিকে বলেছিল, 'এই, মা দেখছে কি না দেখ,' এতে লতি যখন এদিকে চায়, তখন তার মাথাটা বই পড়ার মতো করে নেড়েছিল, আর যুথী সখেদে বলল, 'হ্যাঁ।' লতি হঠাৎ চাপা গলায় বললে, 'দিদি এই যে!' আ: সুন্দর, রুক্ষ, দিবালোক, লাল আনুগত্য, সবুজ যেমন বৃষ্টির অনুগত, বৃষ্টি যেমন মেঘের, মেঘ যেমন বাষ্পের, বাষ্প যেমন নীলব্ধিবসনার। এরপর দুই বোন 'লাইন লাইন' বলে চেঁচিয়ে উঠল। এ লাইন বন্ধ জানালার ফুটো দিয়ে চলে যায়; দুই বোনেই দেখেছিল, মধ্যে পগার তারপর যে বিরাট বাড়ি তারই খানিকটা, যে বাড়ি থেকে কালোয়াতি গান আসে, ফোড়নের গন্ধ আসে, বিড়ালের ঝগড়ার শব্দ আসে। বেচারি লতি বলেছিল, 'দিদি আমরা যদি পিঁপড়ে হতাম'—প্রতিলতা জননী হয়েও এ দৃশ্য কোনও এক অন্তরাল থেকে দেখেছিল, কোনও এক মন দিয়ে শুনেছিল। এ কথা স্মরণে তার গায়ে যেন বা কাঁটা দিয়ে উঠল। প্রীতিলতা ভীতা।

ঠিক এমত সময়ে একটি কাশির আওয়াজ, সে আওয়াজে বটগাছের শিকড় পর্যন্ত অস্থায়ী হয়ে যায়, প্রীতিলতার প্রাণপুরুষ কেঁপে উঠল। প্রীতিলতা আপনার দৃষ্টিকে রূঢ় করে কব্জা করে রেখেছিল সন্মুখের অনেকটা সিমেন্ট করা ড্যাম্প সিক্ত দেওয়ালের দিকে, অথচ বিস্ময়কর এ কথা যে, কে যেন বা তার দৃষ্টি দেহ মন সব কিছুকে জানালার দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে, যে জানলার দু-একটা গরাদ নেই, সেখানে দড়ি দিয়ে বাঁধা। প্রীতিলতা অত্যন্ত শক্ত করে নিজেকে ধরে রাখবার চেষ্টা করেছিল, কেননা এসময় কাশির এবং লাঠির ঠক ঠক আওয়াজ ক্রমে নিকটস্থ হয়, স্বল্পালোকে অদ্ভুত একটু ছায়া পড়বে, এরপর গলির মাঝের নর্দমার ঝাঁঝরিতে লাঠির আঘাতে ঠং করে একটা পাজি আওয়াজ সংঘটিত হবে, আর যে, তার পরক্ষণেই পৌঁছবে, তাদের সূক্ষ্ম গলিতে এবং তাদের রকে—ওই জানলার পিছনে—ধপ করে গাঁঠরি রাখার শব্দ হবে, আর যে তখনই শ্বাসপ্রশ্বাস দীর্ঘনিশ্বাস সমস্ত কিছু মিলে সঘন অধীরতার শব্দ মিলে একটি পাতাহীন পৃথিবীর রুক্ষতার উদয় হবে। এই ভয়ঙ্কর নিশ্বাস সকলের শব্দ প্রীতিলতার ঘাড়ের অতীব নিকটে অনুভূত হয়, সে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিল, কেন না ঘাড়ের এইটুকু গোপন-অতীব অল্পপরিসর স্থানেই কেবলমাত্র কাম, অভাবের দ্বারা তাড়িত হয়ে আশ্রয় করেছিল, কেন না দেহের মধ্যে অন্য কোথাও দেহ ছিল না, ফলে প্রীতিলতা বিমর্দিত, ত্রাসিত, শঙ্কার, জড়তার, ক্লৈব্যের, শৈত্যের, জাড্যের, হিমবাহ স্বেদবিন্দু সঞ্চার হল, সে আপনাকে আর কোনক্রমে আর দৃঢ় করে ধরে রাখতে পারল না, ঝটিতি জানালার দিকে সে ঘাড় বাঁকিয়ে চেয়েছিল।

জানলার পিছনেই রক, সেখানে ইদানীং পথশ্রমে যারপরনাই ক্লান্ত—দ্রুত নিশ্বাসে ব্যস্ত হাড়ের খেলা, এ খেলার আশপাশ দিয়ে অন্ধকার সহস্র ছেঁড়া চুলের মতো ভেসে যায়। এবার ছোট ছোট স্বস্তির কাশির আওয়াজ, এবং অশীতিপর বৃদ্ধের সমস্ত মুখমণ্ডলে যেমত বা ছানিপড়া মুখখানি, দু:খময়, গ্রহকবলিত, মুমূর্ষু ঘাড়ের উপর নড়ছিল। অনেকটা কাঁচা সর্দি গড়িয়ে পড়ে স্থির বৃদ্ধ অদ্ভুতভাবে এদিক ওদিক চাইল, তারপরেই ভগ্নস্বরে গান আরম্ভ করল। গানটা টহলদারি, রেখাবের নিজস্ব বেদনা এ গানের সুরে বর্তমান ছিল।

প্রীতিলতা কখন যে এ গানে আপনকার বোধ হারিয়েছিল, তা সে জানত না, গানটি শুনে শুনে এই কয়দিনেই, তার ভালো লেগেছে এবং সে আপন মনে, অনেক সময়, গায়। এখন, সহসা সে বুঝতে পারল যে সে অতিধীরে বৃদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে গলা মিলিয়ে গানটি গাইছে, আর যে, ত্বরিতে লজ্জায়, কাঁধের পিছন থেকে কাপড় তুলে মাথায় দেবার কারণে তুলতে গিয়ে বুঝতে পারলে হাতে কাপড়ের পাড় মাত্র উঠে এসেছে, এবং আর কোনও উপায় নেই বলে মেনে নিয়ে সেটাকেই যথাযথভাবে রাখল। কিছু পরে, যুথী-লতিকে বিশেষ সাবধানতার সঙ্গে আপন দেহ থেকে মুক্ত করত প্রীতিলতা উঠে দাঁড়াল, কারণ এখন সে ধীরে-ধীরে জানলার এক পাশে এসে, জানলার পাট বন্ধ করে দিয়ে, আপতত শায়িত বৃদ্ধকে এ কয়েকদিনের অভ্যাসবশত উঁকি মেরে দেখবে। এইভাবে দেখার সময়ে তার নিশ্বাস রূদ্ধ হয়ে এসেছিল, অভুক্ত দেহ কি এক উত্তেজনায় রিমঝিম করে উঠেছিল। পলকেই স্থান পরিত্যাগ করে যে দেওয়ালে বহুকাল পূর্বে একটি আয়না ছিল, সেখানে এসেই থমকে দাঁড়াল, এখানে একমাত্র জায়গা যেখানে সে আপনাকে আবছায়া দেখতে পায়! হায়! সত্যিই যদি আয়না থাকত!

খানিক সেখানে কালক্ষয় করে, উন্মত্ত যেমত, চঞ্চল পদবিক্ষেপ মেয়েদের কাছে গিয়ে তাদের সজোরে নাড়া দিয়ে জাগিয়ে দিল, এরা তিনজন কোনও কিচ্ছু ভাববার পূর্বেই প্রগলভ ভয়ঙ্কর কাশির আওয়াজ শুনতে পেলে। প্রীতিলতার কর্তব্যবুদ্ধি ভ্রংশ হয়নি, সে অসম্ভব উলটোপালটা কণ্ঠে বলে উঠেছিল, 'ওঠ না তোরা, বুড়ো কী মরবে?'

দুই বোন বিশেষ সপ্রতিভ হয়ে উঠল, কর্তব্যপালনে এদের অল্পক্ষণ দিকভ্রম ঘটেছিল, তারা খানিক সন্তপর্ণে বারান্দায় এল, অন্ধকারে খুঁজল। এরপর একজন দরজা খুলে দিলে, ইতিমধ্যে মার গলা এল, 'দেখিস ছুঁসনি যেন।' অন্যজন জল নিয়ে এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধ এখন উঠে বসে কাশছিল, ওদের দেখে আপনার টিনটা এগিয়ে দিলে।

বৃদ্ধ অদ্ভুতভাবে দুইহাতে টিনটা মুখের কাছে আনতেই, এ লোল-দেহে যেমত বা বিদ্যুৎ খেলে গেল, দ্রুত একটি হাত সরিয়ে পা স্থিত জগদ্দল বালিশের উপর রাখতে যেই গেল, সে-মুহূর্তে খানিক জল তার দেহের এখানে সেখানে পড়ে সাধারণ মনুষ্যদেহের হিম কল্পনা হয়ে দেখা দিল। বৃদ্ধ দু-একটা কাশি সহযোগে জল খায়...।

যুথী লতিকে খুব অল্প-স্বরে বলেছিল, 'কী বোকা জল গিলে খাচ্ছে।'

লতি গ্যাসের অন্তিম আলোর কিছুটা মুখে তুলে নিয়ে বললে, 'চিবিয়ে খাবে বুঝি।'

যুথী পাখির মতো মুখখানিকে উঠানামা করে বলেছিল, 'আমি তো করি,' এবং পরে স্কুল মাস্টারনীর মতো করে স্পষ্ট বলেছিল, 'ওতে পেট ভরে যায়।'

লতি এ তত্ব বুঝবার পূর্বেই হঠাৎ ভৌতিক আওয়াজ শুনল, 'ঘরকে যাওনা, ঘরকে যাওনা।' তারা দুই বোন দেখল বৃদ্ধ আপনার বোঁচকাটি দুই হাতে আগলে তাদের ও কথা বলছে। এতে করে দুই বোন ঈষৎ ক্ষুদ্ধ হয়, কিন্তু বৃদ্ধের রকম-সকম দেখে মুখটিপে হাসতে লাগল।

বোঝা গেল বৃদ্ধ এবার বেশ রাগ করেছে, যেহেতু,বলেছিল, 'খামাকা দাইড়ে আচ কেন, ঘরকে...ভালো জ্বালা,' এ কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিলতার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 'লতি যুথী...'

প্রীতিলতা জানত, বৃদ্ধ কাউকে কাছে আসতে দেয় না কেন, প্রথম যেদিন সে তাদের এ গলিতে এসে আশ্রয় নেয় সেদিনই। তাদের বাড়িতে ঠিক দুদিন পর যৎকিঞ্চিৎ চোকর সিদ্ধ হয়েছিল। তারা সকলেই শুয়েছে, ইতিমধ্যে বৃদ্ধ ভাঙা গলায় গান গেয়ে উঠেছিল। বজ্র ঘুমের জন্য তখন হাঁকপাঁক করেছে, কেন না সে কোনক্রমেই অবশ্যম্ভাবী তথা ভবিতব্যের দিকে আর চাইতে পারছিল না, কেননা আগামীকালের সূর্য শুধুমাত্র যে সে জড়ভরত, তা প্রমাণ করার জন্য পূনর্বার দেখা দেবে। কিন্তু এমত সময় প্রীতিলতার ধোঁয়াটে কণ্ঠস্বর তাকে, ব্রজকে, ইহকালের স্যাঁতসেঁতে পৃথিবীর মধ্যে এনে দিয়েছিল। প্রীতিলতা বললে, 'বুড়ো হলে কী হয়, খুব টনটনে জ্ঞান। যখনই যুথী-লতি যায় অমনি মারমুখো হয়ে উঠে...বোধহয় জানে, বোঁচকায় অনেক টাকা আছে।'

'দূর।'

'শুনেছি ভিখারিদের অনেক টাকা থাকে...'

'দূর, লড়াইয়ের বাজারে...টাকা করতেই লোকে...বলে...পয়সা দেবে কে।'

ব্রজর উত্তরের মধ্যে উর্ধ্বের সিলিঙের সমস্ত নগ্নতা ব্যক্ত হয়েছিল। ফলে প্রীতিলতা আপনার কবজিরএকমাত্র লোহাটা ঘোরাতে-ঘোরাতে বললে, 'মজা দেখছ, বুড়ো রোজ দাড়ি কামায়...'

ব্রজ এ-হেন এজাহারে চোখ দুটি খুলেছিল, সন্মুখের অন্ধকার দেখে নিয়ে পুনরায় চক্ষুদ্বয় বন্ধ করে আপনার দাড়ি দিয়ে হাতের বাজুর কাছে ঘষলে এবং কথার মোড় ফিরোবার জন্য বললে, 'বস্তায় মানে বোঁচকায় চাল আছে...'

প্রীতিলতা ব্রজর কথা শুনে প্রথমে বলেছিল, 'তাই-নাকি,' তারপর বলেছিল, 'ও'—ছোট কথা অর্থাৎ উত্তর দুটি তার নিজের কাছে কেমন যেন বোকা বোকা ঠেকেছিল। ইতিমধ্যে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই যা আত্মনিগ্রহ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল, তা বৃদ্ধের গান, যা এখন সদ্য সদ্য শুনলেও মনে হয় বহুদিন পূর্বে শুনেছি—কেননা এই গানটির মধ্যে আধিদৈবিক পূর্ণতা ছিল, বর্ষার নিশ্চিন্ত ঘুমের মোহ অথবা সুন্দর প্রভাতের সোহাগ এ গীতির ধমনী, এ জগতের মধ্যে পরিচ্ছন্ন গ্রাম, বাপ-মা, ভাইবোন, আকাশ বাতাস, পুষ্করিণীতে হাঁসের সন্তরণ, সব কিছুই ছিল।

সকালবেলা, প্রীতিলতা একটু গুঁড়ো চায়ের পুরিয়া নিয়ে এসে, গতকালের যুথী-লতি সংগৃহীত কাঠ-কুটো দিয়ে উনোন জ্বালিয়ে জল চাপিয়ে দিয়েছিল। অদূরে ব্রজ উবু হয়ে বসে, দুটি হাত তার নিজেরই পায়ের তলায় চাপা, কেননা এ সময়ে তার দাড়ি বড় চুলকাচ্ছিল। চুলকালে পাছে প্রীতিলতার নজরে পড়ে, এবং তারই দুরদৃষ্ট অথবা হয়তো অকর্মণ্যতা ষ্পষ্টত ওতপ্রাোত হয়ে উঠে। বেশিক্ষণ ব্রজকে এভাবে থাকতে হয়নি, যেহেতু তারা দুই বোন খাওয়া-খাওয়া খেলা করছিল।

তারা দুইবোন, যুথী এবং লতি, খাওয়া-খাওয়া খেলা করছিল, এ খেলার মধ্যে নিশ্চয়ই পেটভরা বা তৃপ্তির আনন্দ ছিল না, একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাদের দক্ষতার কারণে মা-বাবাকে গর্বিত করা। প্রীতিলতা অন্যমনস্কভাবে ধোঁয়া থেকে চোখ ফেরাবার অথবা সকালের আলোকে পড়ে নেবার জন্য কপালে একটি হাত রেখে এদিকে চেয়েছিল। যুথী-লতির ন্যাকা, কদর্য, অস্বাভাবিক, পৈশাচিক চর্বণের চাকুম চাকুম শব্দ ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে বড় বিশ্রী লাগছিল, প্রীতিলতার দেহে এ কারণে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল, সে আর যেন স্থির থাকতে পারল না, ত্বরিতে উঠে ওদের দিকে না গিয়ে সদর দরজার দিকে গিয়েই আপনাকে স্মরণ করার অর্থে আপনকার কেশদাম দুই হস্ত দ্বারা আকর্ষণ করেই একবার ভেবে নিয়েছিল যে পিছনের দর্শকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারেনি যে, কেন সে বাইরের দিকে যেতে চাইছিল—থমকে দাঁড়াল। তার পরক্ষণেই, ঘুরে সেইভাবে দাঁড়িয়ে, কর্কশ তীক্ষ্ণ আনুনাসিক আওয়াজ করে বলল, 'বসে আছ, মারতে পারছ না?' ব্রজর পৌরুষ এতাবৎ একগলা জলে নিমজ্জিত হয়েছিল, আপনার কন্যাদ্বয়ের এরূপ খেলা তার সকল কিছুকে অপহরণ করে, তথাপি নিজে থেকে কোনও বিহিত করার মতো মানসিক ক্ষমতা তার আয়ত্তের বাইরে ছিল, কেননা ভয় ছিল যে, যদি করে তাহলে প্রীতিলতা তার প্রতি হয়তো অদ্ভুতভাবে তাকাতে পারে। এখন প্রীতিলতার হুকুমের সঙ্গে সঙ্গে সে লাফ দিয়ে উঠল, এসময় তার ছেঁড়া কাপড়টা প্রায় খসে যাচ্ছিল, সেটা নিমেষেই ধরে, প্রচণ্ডভাবে অফুরন্ত কিল চড় ঘুষি মারতে লাগল। প্রীতিলতা নিশ্চয়ই আপনার ক্রোধ সম্বরণ করতে পারেনি, সে-ও লতিকে নিয়ে পড়েছিল। দুজনেই, কন্যাদ্বয়, যখন ধরাশায়ী, তখন প্রীতিলতা তার নগ্ন বক্ষদ্বয় দেখে ঘুরে দাঁড়িয়ে কাপড় সংযত করতে করতে ব্রজর দিকে চাইল, এবং যে ব্রজ তার প্রতি চেয়েছিল। এরপর স্বামী-স্ত্রী জোড়ে, ভুমিলুণ্ঠিত ব্যাকুল ক্রন্দনরত মেয়ে দুটির প্রতি পিছন ফিরে দেখেছিল যুথী উদম ল্যাংটা এ কারণে যে সমস্ত ফ্রকটা খুলে গুছিয়ে তার একান্তে, পাশে লতির সর্বাঙ্গসুন্দর দেহটি আভরণহীন, দুজনে মিলে মনে হয় এক মহতী কল্পনার সৃষ্টি করেছে, মনে হয় এরা দুজনেই মধ্যযুগীয় কোনও স্থাপত্যের আহ্লাদিত ফ্রিজের (frieze) অংশ, বাপ মা ওই দৃশ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবার কালে দুজনে মুখোমুখি হয়েছিল, দুজনেই অপূর্বভাবে হেসেছিল, হয়তো আপন আপন চোখে জল রোধ করবার জন্যই হেসেছিল।

এদিকে উনুনের জল তখন ফুটন্ত। প্রীতিলতা তাড়াতাড়ি গুঁড়ো চায়ের পুরিয়া খুলে জলের উপর ফেলল এবং একটি ছোট চামচ দিয়ে গুলতে গুলতে ব্রজর দিকে চাইল। ব্রজর কাছে এ চাহনীর অর্থ অতীব সুপষ্ট, সে অনন্য উপায়ে আপন মেয়েদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, এসময় এক ঝাঁক বোমারু বিমান উড়ে যাওয়ার মর্মভেদী শব্দে তীক্ষ্ম ক্রন্দনধ্বনি আর ছিল না, ছেলেমানুষ দুটির মুখে শুধুমাত্র ক্রন্দনের ভঙ্গিমাত্র ছিল। ক্রন্দনের অভিব্যক্তি কী অ-ছবিলা।

'আমার ইচ্ছে করে গলায় দড়ি দিতে, না লেখা না পড়া, খালি খাই...খাই...কোথাকার দুর্ভিক্ষ হাভাতের ঘর থেকে যে এসেছে ভগবান জানেন...' প্রীতিলতা বলেছিল।

এ কথায় ব্রজ ভেবেছিল পুনরায় মারবার হুকুম আছে, তাই তার দেহটা ঈষৎ উঠতে গিয়ে থেমে গেল, একারণ যে এখন সে আর এক কথা ভাবছিল—ভাবছিল নয়তো, পাচ্ছিল—ভয়ঙ্কর দু:সহ গলিত ঘৃণ্য কদর্য গন্ধ, অনেক মৃতদেহের গন্ধ...মানুষেরা কী আদতে মাছ—অভুক্ত তথা বুভুক্ষ জীবিতদের শবের গন্ধ নিশ্চয়ই এরূপই হয় ফলে এ কথায়, নিজের জন্য অবশ্যই ব্রজর যথেষ্ট লজ্জা হয়েছিল।

এখন প্রীতিলতা অনেক কথা বলে চলেছে, 'এই ধাড়িটাই ছোটটাকে পর্যন্ত নষ্ট করলে—কথা সব শুনলে গা জ্বলে যায়, সেদিন বলছে, ঘরে বসে শুনছি,' বলে অসম্ভবভাবে যুথীর কণ্ঠস্বর নকল করে তথা ভেঙিয়ে বলেছিল, 'লতি মেঘ কি করে হয় জানিস—হাজার হাজার বাড়ির রান্নার ধোঁয়া মেঘ হয়, ওটা না রুই মাছের ঝোলের মেঘ—ওটা না সোনা মুগের ডালের মেঘ...' এ কথা শেষ করেই অদ্ভুত করে ভেঙাতে গিয়েই, প্রীতিলতা ভয়ঙ্কর ত্রাসে কম্পিত, সে বড় অবাক হয়, কেননা নিমেষেই তার সম্যক উপলব্ধি হয়েছিল যে বহিরাগত ত্রাস তার দেহে সঞ্চারিত এবং রক্তকে যা হেতুহীন করেছে। এই প্রকার জ্ঞানোদয়ে সে বুঝেছিল তার সুন্দর আয়ত নয়নযুগলের একটি ছোট যুগপৎ অন্যটি বড়, এবং বিশেষ পরিমাণে উষ্ণ। প্রীতিলতা, এমন মনে হয়, তার ইদানীং স্বভাবসিদ্ধ যন্ত্রণায় চিৎকার—কি আর্তনাদ—করে উঠতে চেয়েছিল, এ কারণে যে তার মুখ চিৎকারকারীর ন্যায় ভাঙাচোরা অথচ কোনও আওয়াজ নেই। পরক্ষণেই যেহেতু সে স্ত্রীলোক সেইহেতু আপনাকে সংযত করতে পেরেছিল। এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি যে প্রীতিলতা সেই ত্রাসকে প্রতি-আক্রমণ করতে অথবা ত্রাসের ভাবনা থেকে অব্যাহতি পেতে চেয়েছিল। গরম চায়ের খানিকটা চুমুক দিতেই সে বুঝতে পারলে, দেহে অজস্র শিরা-উপশিরা বর্তমান, এবং সে আপনকার হাঁটুদ্বয় প্রজাপতির পাখার ন্যায় ধীরে বিভক্ত করল, ঝটিতি বন্ধ করে এবং পুনরায় এ কার্যে সে ব্যাপৃত হয়—কারণ তার গাত্র উত্তপ্ত, চোখে লজ্জা অথচ দেহ-প্রজ্বলন-হেতু বৃশ্চিক নিশ্বাস প্রবাহিত হয়নি অথচ তৃপ্তির পূর্বেই অথ খণ্ডিতা লক্ষণনিশ্চয় ওতপ্রাোত, মনে হয়, নিশ্চয় দেহগত ত্রাসকে দুপুরণীর কাম দ্বারা জর্জরিত করতে চেয়েছিল, বলেছিল, 'ওই বুড়োটাকে আজ বলে দিও, বড় ভয় ভয় করে...কার মনে যে কী আছে...। বলা যায় না' বলেই শায়িত উলঙ্গ মেয়ে দুটিকে বলেছিল, 'মরণ—ওঠ না বুড়োধাড়ি নির্লজ্জ বেহায়া', বলেই গলা নামিয়ে বলল, বুঝলে...'

ব্রজ বুঝল, যদিও এ-হেন আপৎকালে দীন-ভিখারি-জনিত প্রীতিলতার ইঙ্গিতের পিছনে কোনও সুস্পষ্ট ছবি সে দেখতে পায়নি অথবা আদৌ ছিল না। কেননা মন নির্জনতা-অদ্বেষী নয়, কেন না মন দ্বীপ-সন্ধানী নয়, তথাপি বলেছিল, 'পাগল!' ইস! ভাত যদি থাকত তাহলে সে অনায়াসে এ-মিথ্যা ভয়ের, ত্বরিতেই, সুযোগ নিতে পারত।

'না না বড় ভয় করে'—এ কথায়, অন্য কিছু নয়, প্রীতিলতার আপন ত্রাসের উল্লেখ ছিল। আয়না থাকলে, দেখতে পেত যে সে, যারা এখন সমস্ত শহর-কলকাতায় ভূগর্ভের অন্ধকার ছড়িয়ে দিচ্ছে—তাদেরই মধ্যে একজন। কিন্তু সে হার মানবার মতো দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করেনি। কেননা তার কাছে একটা পাড়ই যথেষ্ট—যুথী কাদের বাড়ি থেকে মনোরম নয়ন-অভিরাম জরির পাড় নিয়ে এসেছিল, সেটি প্রীতিলতা আপনার গায়ে জড়িয়ে দুই মেয়েকে দেখিয়েছিল, তারা মাকে এরূপ সজ্জায় দেখে চকিতে শিল্পী হয়ে যায়, তারা রহস্য যে কী তা বুঝেছিল, যে রহস্যে বলাকা-চিহ্নিত শ্যাম আকাশের বৈচিত্র্য, নীল সাগরের বারিরাশির মধ্যে সন্তরণবিলাসী আলোক, তারই পূর্ণ হেমকান্তি ধরেছিল। যুথী-লতি আর স্থির থাকতে পারেনি, এরই মধ্যে যুথী বুদ্ধি করে জানলাটা আরও ভালো করে খুলে দিয়েছিল যাতে মায়ের দেহ জুড়ে যে আলো, তা দূর শতাব্দীর স্মৃতির মধ্যে, তাকে কোলে নেওয়া যায়—এরপর দুজনেই মাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিল, মনে হয় তারা যেমত বা অতিশয় ভীত, শঙ্কিত। (ভগবান। তুমি অন্তরে থাকতেও মানুষের এত ভয় কেন।) প্রীতিলতা অবশ্যই হার স্বীকার করবে না। সে কোনদিন মরা মাগুর মাছ খায়নি, কাউকে খেতেও দেয়নি। সে হাভাতের একজন হতে কোনক্রমেই পারবে না।

প্রীতিলতা মুখ ঘুরিয়ে বসে, এদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে পরক্ষণেই সে সেইদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে বসে। পুনরায় সেদিক থেকে অন্যদিকে। কিন্তু এই মেয়ে দুটি। মনে হয় এরা বীভৎস, এরা ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, ব্রজর প্রতি রাগ করার কিছু নেই, এ কারণে যে ব্রজর প্লুরিসিই তার কাল, উপরন্তু তার অক্ষমতা—দুই মিলে তার সমস্ত স্বপ্ন শুধু নয়, জীবনকে বানচাল করেছে। এখন এ সময় একটা টিউশানি পর্যন্ত নেই, শহরে অনেকে নেই, যারা আছে বোরখা-পরিহিত আলোয় ভৌতিক। তারা সকলেই পরমায়ুকে সবকিছু বলে ধরে নিয়েছে। প্রীতিলতাদের কণ্ঠস্বর ফাঁকা হাঁড়িতে প্রতিধ্বনিত হয়, এতে করে আর কারও না হোক প্রীতিলতার গা ছমছম করে। তখন এ ভয়কে ঠেকাবার জন্য বৃদ্ধের গীতটি প্রথমে গুনগুন করে গেয়ে যেন আরোগ্য-স্নান করে।

কিন্তু কতক্ষণের জন্য এ গীত। পলকেই প্রীতিলতার দৃষ্টিপথে উদয় হয় এখানে সেখানে জমে থাকা আবর্জনা যেমত অযত্নের গৃহের মাকড়সার জালের মতো শঙ্কাপ্রদ অন্ধকার! এ-অন্ধকার ফাংগাস-শীল। প্রীতিলতা মনকে ফেরাবার জন্য তৈজসপত্রের কিছুটা সংস্কার করতে মনস্থ করেছে কিন্তু বাড়িতে এক ফোঁটা ছাই নেই। ছাই নেই তাতে কী যুথী-লতি তো আছে। যুথী-লতি ছাই নিয়ে এসে খবর দিল, 'মা আমরা মোড়ের পাঁশগাদায় গিয়ে ছাই তুলব, এমন সময় গিয়ে দেখি বুড়োটা...'

'বুড়োটা' শুনেই প্রীতিলতার গায়ে হিমপ্রবাহ খেলে গেল, আপনার শৃঙ্খলিত অস্থিসমূহের বিশৃঙ্খলতার শব্দ শোনা গেল, তবু আপনাকে সংযত করতে করতে সে বলেছিল, 'ছি:, বুড়োটা বলেতে নেই...আমাদের অমন করে কথা বলতে নেই...'

যুথী এতে, এখন, থেমেছিল, ফলে লতি দিদির মুখের দিকে একবার চেয়ে নিয়ে বলতে লাগল, 'জানো মা বুড়ো...মানে বুড়োমানুষ' বলে মার মুখের দিকে চেয়ে অল্প হাসবার চেষ্টা করেছিল, 'বুড়োমানুষ রাস্তায় বসে কাশছে, তার গলা দিয়ে রক্ত পড়ছে...'

শুনে যেটুকু মন সাড়া দিয়েছিল সেইটুকু দিয়ে এদের মা বলেছিল, 'বলিস কী!' বলেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, যেহেতু এরূপ সমাচার তার মধ্যে ধুমায়িত হয়ে এক অভূতপূর্ব বিদ্যুৎ-সম্ভুত রোশনাইয়ের সৃষ্টি করে, এমন কী দুটি হাত ছেলেমানুষের মতো হাততালি দেবার জন্য খানিক অগ্রসর হয়েছিল, সে সেইভাবে হাত দুটি রেখে কিম্ভূত এক প্রশ্ন করে ফেলল, 'আ: কোথায় সে মর...' কথাটা 'মর'-এ এসেই থেমে গেল, 'বে' অক্ষর যোগে সম্পুর্ণ হয়নি। যুথী-লতি মার এহেন পদ রচনাটা যথাযথ বুঝে উঠতে পারেনি, তারা অবাক হবে কিনা এ কারণে দুজনে দুজনের দিকে চেয়েছিল, ইতিমধ্যে শুনল তার মা পুনর্বার সংশোধন করে বলেছিল, 'বেচারাকে কোথায় দেখলি।'

'মোড়ে—কাশছে আর রক্ত পড়ছে...' এরপর তিনজনেই স্তব্ধ, তিনজনে তিন জনকে অদ্ভুত বিশেষ রূপে নিপট গম্ভীর দেখেছিল। প্রীতিলতা, এ কথা ঠিক যে, এই মুহূর্তের জন্য অন্তত ছেলেমানুষ ভাবেনি। সহসা এই স্তব্ধতার মধ্যে থেকে, কচি কচি মুলো দিয়ে আধা সর্ষে বাটা দিয়ে ডেং ও ডাটার চচ্চড়ি বেশ খানিকটা গুড় দেওয়া—স্বাদ পেল। এত করে একটি ঢোঁক গিলেই, গলিত শবদর্শনজনিত ভীতি তাকে, প্রীতিলতাকে, অতিমাত্রায় কুক্ষিগত করল। কখন যে আপনকার ছিন্নভিন্ন অঞ্চলপ্রান্ত খসে পড়েছিল তা তার খেয়াল হয়নি এ কারণে যে, এখন সে সেই প্রথম ভোরের মোহমুক্ত সজল গীতটি গুনগুন করছিল, কেন না এই গীতে অদ্য সকালের একটি দৃশ্যকে সে মুছে দিতে চেয়েছিল।

প্রীতিলতা, তখন, ছোট করে আগুন জ্বালিয়ে একটু চোকর সিদ্ধ করছিল, যুথী আর লতি নিকটে বসে আনন্দে নিজেদের আর সামলে রাখতে পারছে না, তারা বাবু হয়ে বসে আপন আপন হাত কোঁচড়ে ঠেসে রেখেছিল, মাঝে মাঝে কাঁধ উঠছিল। এমত সময়ে লতি জানলার বসানের দিকে দেখে বললে, 'মা দুটো আমলকী ফেলে দাও না—বেশ টকটক হবে।' জানলার বসানে বহুদিন পূর্বে আনা ত্রিফলা পড়েছিল। লতির কথায় প্রীতিলতা গোটাকয়েক আমলকী বেছে নিয়ে ফুটন্ত চোকরে ফেলে দিল।

লতি আহ্লাদে সমস্ত দেহকে কেমন একভাবে মুড়ে ফেলতে চাইল, অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হয়েছে সে, এই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে অর্থাৎ মাকে খুশি করবার মানসে বলেছিল, 'ভাতের থেকে আমার চোকর খুব ভালো লাগে।'

যুথী আপনার নীরবতার বোকামি থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য যোগ দিল, 'ভাতের থেকে চোকর একশগুণে ভালো, হাই ক্লাস...' মুখখানা এ সময় এমন বিসদৃশ করেছিল যে তার কানটা মলে দিতে ইচ্ছা করে।

প্রীতিলতা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠে বললে, 'থাক থাক আর চোকরের গুণ গাইতে হবে না...লোককে যেন বোলো না আমরা চোকর খাই।' এই শেষ উক্তিতে প্রীতিলতা আপনাদের ঘরগত চরিত্রের পরিচয় দিয়েছিল। এর পরেই সে চোকর পরিবেষণ শুরু করে।

লতি আপনার পাশতলা থেকে একটি চামচ বার করে বললে, 'আমি সাহেবদের মতো খাই' এ কথা শেষ না হতেই যুথী সুকৌশলে চামচটা কেড়ে নিল, ফলে দুজনে মারপিট বেধে গেল। এ কারণে থালা উলটে পড়েছিল, যুথী পা দিয়ে লতির থালাও উলটে দিল। প্রীতিলতা খুব সহজেই দুজনকে প্রচণ্ড দুই চড়ে শান্ত করে পড়ে যাওয়া চোকরের দিকে চেয়ে অদ্ভুত এক দেহভঙ্গি করে মুখ ফিরিয়ে ঘরে যেতে যেতে বললে, 'তুলে খেয়ে ফেল।' এই কথাটা বার হতেই এক ঝলক ত্রাস এসে তার দেহে প্রবেশ করেছিল। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে ঘরের জানলার দিকে চেয়েছিল। খানিকটা নির্ঝঞ্ঝাট স্থান সেখানে বর্তমান, খানিকটা অব্যক্ততা সেখানে ওত:প্রাোত। এইটুকু দর্শনে প্রীতিলতা বলেছিল, 'বেচারা' আর যে সে অন্যমনস্কভাবে কোনও আপনজনের সঙ্গে প্রত্যহের আগন্তুক হাড়ের খেলাকে মিলিয়ে নিতে চেয়েছিল, ভেবেছিল 'বাবা যদি বেঁচে থাকতেন, এমনই হতেন।' এ সব কথার কারণ এই যে, আপনজন হলে মানুষ অনায়াসেই নিগূঢ় বেদনা অনুভব করতে পারে।

ব্রজ আজ দুদিন কোনও কিছু আনতে পারেনি, গতকাল সে বলেছিল, 'আজ এক অদ্ভুত জিনিস দেখলুম জানো—এক ভদ্রলোক লোঙ্গরখানায়...' আর কথা বার হয়নি, অনুক্ত কথার স্বর তার বিশ্রী দাড়িতে ঘোরাফেরা করতে লাগল, শায়িত প্রীতিলতা একটা চোখ খুলে ভয়ঙ্করভাবে চেয়ে থেকেই ঝটিতি উপুড় হয়ে শুয়েছিল, ব্রজ স্ত্রীর ব্যবহারে সত্যিই অস্থিহীন হয়ে পড়লে। সে ধীরে ধীরে বসে পড়ল। অন্যপক্ষে, প্রতিলতা, খানিক সামলে উঠে বসে হঠাৎ ব্রজর হাত ধরে, 'আমার বুকে হাত দিয়ে বলো কখনও এসব গল্প...আমার বড় ভয় করে', বলে আস্তে হাত সরিয়ে পুনরায় তড়িৎগতি স্বামীর হাতে হাত রেখেই ভীতভাবে বলে উঠল, 'আবার জ্বর—তাহলে...'

'একটু গা গরম...'

প্রীতিলতার কণ্ঠস্বরে ম্লান সন্ধ্যার মমত্ব ছিল, যে মমত্ব দীর্ঘশ্বাসের পরমার্থ, যে মমত্ব কিশোরীর লজ্জার লাল, আপনকার ধমনীসমূহকে ত্বক বিদীর্ণ করত বাইরে আনতে ব্রজর ইচ্ছা হল, কেন না প্রীতিলতার প্রশ্নে নয় আগ্রহে, আগ্রহ নয় অনুভূতির মধ্যে সময়ের বিবেচনা ছিল, পূর্ণতা ছিল, যে পূর্ণতা দ্বারা রমণীরা চিরকাল ভালোবেসেছে। অতএব এরূপ প্রশ্নে ব্রজ কিছুটা ঘর্মাক্ত হল।

অন্যপক্ষে প্রীতিলতা আপনার আঁচল দ্বার স্থানটি সংস্কার করে যুথীকে বলতে গিয়ে দেখল সে ঘুমিয়ে, লতির মুখে বুড়ো আঙুলটি, সে বলতে গিয়ে নিজেই উঠে দাঁড়াল। ব্রজ মাটিতেই শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল কিন্তু প্রীতিলতা অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠে, 'ও কী মাথা খারাপ নাকি—আশ্চর্য আজ মাসখানেকও হয়নি ভুগে...' বলে মাদুরটা মাটিতে খানিকটা গড়িয়ে দিয়ে একান্ত তখনও তার হস্তগত, অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে প্রথম ছোট একটি হাঁ করে ব্রজর প্রতি চোখ তুলে ধরেছিল, বলেছিল, 'জানো বুড়ো মিনষের নাকি মুখ দিয়ে...'

ব্রজ নিজের অসুস্থতার কারণে অর্থাৎ সে নিজে ভুগছে, স্ত্রীর কথায় ভীত হবার পূর্বেই বলেছিল, 'দূর...'

'আমারও তাই মনে হয়...দাঁত ফাঁত দিয়ে হয়তো পড়ে থাকবে...' এই বলতে বলতে মাদুর পেতে দিয়ে বললে, 'ভেবেছিলাম তোমাকে বলব ওকে এখান থেকে চলে যেতে, তোমার শরীর...'

'আ: দূর'

'তা পরে ভাবলুম কিছু তো দিতে পারি না, অন্তত একটু জায়গা, কী বলো...গরিবকে দিলে ভগবান মুখ তুলে...'

পুনরায় অভুক্ত স্তব্ধতা। ব্রজ জ্বর-উত্তপ্ত চোখেই ভাবছিল, খুব আশ্চর্য নয়, প্রীতিলতা গান গাইত, প্রীতিলতার কণ্ঠস্বরে লালিত্য ছিল। এখন, বিশেষত আজ তার—একদা মায়াবিনী প্রীতিলতার—কণ্ঠস্বরে ক্রমাগত বালি ঝরার ভয়াবহতা। কে মনে নেই, একদা ধাঁধা জিজ্ঞাসা করেছিল, 'জ্বলল আঁধার নিভল আলো' এর মানে কী ব্রজ, নির্বোধের মতো এই হেঁয়ালির দিকে চেয়েছিল। তেমনি এই কণ্ঠস্বরের দিকে চেয়েছিল, অর্থ করতে পারেনি, হেঁয়ালির অর্থ যে পেট তা ব্রজর বুদ্ধিতে আসেনি—উদর যখন জ্বলে তখন সকলই অন্ধকার, উদর প্রজ্বলন হেতু আলোক, হায় কী অন্ধকারময়ী! তারাই ধন্য, যারা খাবার দেখলে সত্যি-সত্যি যারপরনাই ভীত হয়।

অনেকক্ষণ পর অসম্ভবভাবে ঘুম ভেঙে গেল, দেখল ছিন্নভিন্ন বস্ত্রে ভূষিতা প্রীতিলতা, আপনকার হাঁটুতে মাথা রেখে নির্লজ্জভাবে ঘুমিয়ে, অদূরে কন্যাদ্বয় দেওয়ালে—ভিজে ভিজে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে কান্নার বীভৎসতা প্রকাশ করছে, একারণে ব্রজ রোজগারি বাপের মতো বিরক্ত, সে উঠে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড চড় মারার জন্য কিঞ্চিৎমাত্র চেষ্টা করতেই, দেখল যে তার দুর্বল দেহটা দেওয়ালের সঙ্গে গিয়ে আঘাত খেলে : ইচ্ছা দেহটা যুত করতে পারেনি। খানিক দেওয়ালের কাছে সেইভাবে সে দণ্ডায়মান ছিল।

যুথী লতি কান্না থামিয়ে চোখ বড় করে, প্রীতিলতা চোখ খুলে তাকিয়েছিল—প্রীতিলতা কিন্তু মাথা তোলেনি, ফলে যে দু:খময় রেখা তার দেহে ভর করেছিল তা অদৃশ্য হয়ে যায়নি, কী দুগ্ধহীন-স্তনক্ষুদ্ধ সে রেখা।

প্রীতিলতা বুঝেছিল, ব্রজ বার হচ্ছে, কেননা এখন সে অতীব নিষ্ঠার সঙ্গে আপনার প্যান্টুলুনের ভাঁজ ঠিক করেছিল। প্রীতিলতা প্রশ্ন করল, 'কোথায়?'

'বালিগঞ্জ।'

প্রীতিলতা দক্ষিণ দিকে চাইল, কেননা বালিগঞ্জ দক্ষিণে, মনে হল সেখানে কী মৃত্যু নেই, আর্তনাদ নেই। যে আর্তনাদ আরও প্রবলতর হয়ে তাদের দরজায় ফিরিঙ্গি কায়দায় আঘাত করছে। প্রীতিলতা ভয়ে আপন মুখমণ্ডলে বস্ত্রপ্রদান করেছিল। সে ত্রস্ত শঙ্কিত। সমগ্র পৃথিবীটা যেন বা ডাক্তারবাবুর কম্পাউণ্ডার নিমাই জগমণির মতো, অনেকটা ধুকুড়ীয়া বাগানের আখমাড়া 'ম'ম করা রাণ্ডি যেন, যার হাস্যে সদ্য কাঁচা সর্দির আদুরে আওয়াজ, পাটের রকমারি রঙে উদব্যস্ত রুমালে বটবৃদ্ধ শরীরটা ঢেকে বসে আর যাই হোক এ দৃশ্য খুব সুন্দর নয়।

প্রীতিলতা মুখমণ্ডলের বস্ত্র সরিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, 'ফিরতে তো...'

'হ্যাঁ সাতটা আটটা...' ব্রজ এই উত্তর দিতে দিতে চলে গেল। প্রীতিলতার মনে হল কোথায় যেন বা ব্রজ অদৃশ্য হয়ে গেল। কী দুর্দ্ধর্ষ রহস্য! মানুষ যে দোমড়ান অনন্ত বৈ অন্য নয়, সে সত্য বুঝবার পূর্ব মুহূর্তে প্রীতিলতা প্রীতিলতার মধ্যেই থেমেছে এবং গুনগুন করে সেই গীতধ্বনি করেছিল।

এখন সে শুয়ে, সে যখন ভাবছিল, ব্রজ দুটি ভাত না পেলে আর উঠতে পারবে না, ঠিক এমত সময়ে, যুথী প্রায় মার ঘাড়ের উপর পড়ে দ্রুত নিশ্বাসে বলেছিল, 'মা দেখো লতি কী কুড়িয়ে খাচ্ছে...'

অচিরাৎ জ্যা-মুক্ত ছিলার মতন প্রীতিলতা উঠে দাঁড়াল, সত্বর বারান্দায় গিয়ে লতির সন্মুখে দাঁড়াল। ক্ষণেকের জন্য মার মনে হয়েছিল, আমার কী যুথীর মতো হিংসে হয়েছে! সঙ্গে-সঙ্গে একটি চড়ের আওয়াজ শোনা গেল—এ চড় লতির গালে প্রীতিলতাই মেরেছিল, সঙ্গে সঙ্গে লতির মুখ থেকে কী যেন ছিটকে পড়ল। পলকেই প্রীতিলতা এবং যুথী ছুটে গিয়ে দেখে জলসিক্ত হরীতকী...। ছোট একটি নিরেট নিপট আর্তনাদ—আর্তনাদের সঙ্গেই ধ্বনিত হয়েছিল বহু পূর্বে সেনেটে উক্ত লাটিন ডায়লগ : 'এবং তুমিও!' এ দৃশ্যে পরক্ষণেই জলদগম্ভীর রৌদ্রকর্মা আওয়াজ শুনেছিল।

প্রীতিলতা সমাগত পবিত্র সন্ধ্যাকে কশ্চিৎ জলপ্রপাতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। অমিত্রাক্ষর ছন্দ যেরূপ সদাই বিষণ্ণভাবে শেষ হয়, তেমনি তার দক্ষিণ হস্ত থেকে ধ্যানপ্রসূত কতিপয় নকশা অদৃশ্য হল। সে সেই গীতটি ক্লান্তকণ্ঠে, ছোট ঘরের মধ্যে মন্থর গতিতে ঘুরে ঘুরে গাইছিল। ঘরে আর অন্য কারও নিশ্বাস ছিল না। এ কারণে যে যুথী-লতিকে বাপের জন্য অপেক্ষা করতে এই কিছুক্ষণ আগে মোড়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।

এখন অন্ধকারে কোথায় যে সে, এ কথা ভুলে গেল, সে সত্যই দেওয়ালে হস্তদ্বারা অনুভব করত 'এই যে বোধ হয় আমি' এরূপ মনে করবার চেষ্টা করেছিল, এবং তৎসহ সমস্ত স্থাপত্যের প্রতি তার বীতশ্রদ্ধা এসেছিল, সমস্ত আকাশের কিছুটা নিদ্রার বাস্তবতা এখানে যে, সে তা জানত না অথবা কেউ তাকে জানায়নি—অনেকবারই সে সেখানে, দেওয়ালে, মাথা খুঁড়েছিল। কিন্তু তবু প্রীতিলতা অতীব আশ্চর্য সহকারে দেখেছিল যে এরূপ সংঘাতপ্রসূত বেদনা উক্তির 'উ:'-কারের মধ্যে বৃদ্ধের প্রভাতী গীতের রেশ বর্তমান।

ইতিমধ্যে, ইদানীং প্রত্যেহের সময়মাফিক নর্দমার লোহা আর লাঠির আওয়াজ, ভয়ঙ্কর আওয়াজ, সমস্ত দিককে বিমর্দিত করেছিল, এবং অন্ধকার কক্ষমধ্যে একাকিনী প্রীতিলতা চকিত ভীতা, আপনাকার শীর্ণ হাত দুটি দিয়ে কাকে যে সে রক্ষা করতে চাইল তা সঠিক বুঝা গেল না—যেহেতু এখানে অন্ধকার—সন্মুখের শূন্যতাকে অথবা নিজেকেই। (হায় প্রীতিলতা যদি বুদ্ধিমতী হত তাহলে সে দেখতে পেত, এই শূন্যতা ভেদ করে সে কখনও যায়নি)!

প্রীতিলতা ভীত হয়ে অদ্ভুতভাবে আপন আত্মরক্ষায় যত্নবান হয়েছিল। এবং একথাও ঠিক যে, সে সেই আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে আপন বস্ত্র পরিত্যাগ করে। এবং এতে করে সে আর একটি অন্ধকারে পরিবর্তিত হল।

আদতে আপনাকে ধরে রাখাই তার উদ্দেশ্য ছিল। এই ব্যবস্থা অতীব সাধু কৌশল। ইত্যাকারে খানিক অসময় পার সত্যি হয়েছিল, কিন্তু আর পারা গেল না, কখন যে জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা তার খোঁজ ছিল না।

তির্যক গ্যাসের আলোয় বসে বৃদ্ধ খানিক শ্রান্তি দূর করে শূন্যতার সংঘাত হেতু কম্পিত হাতখানি দ্বারা আপন কপাল মুছছিল, এরপর অসম্ভব মায়াজড়িত কণ্ঠে বলেছিল, 'হরিবল'—অনন্তর এখন, যখন সে কিঞ্চিন্মাত্র সুস্থ বোধ করেছিল তখন সে গীতটির সুর ধরেছিল। অন্ধকার কক্ষমধ্যে ইদানীং অন্ধকারে পরিবর্তিত একটি দেহে সে গীত প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, এ কারণে যে প্রীতিলতা এখনও তেমনিভাবে দণ্ডায়মান।

বৃদ্ধ গীতটি গাইতে গাইতে খানিক স্থলিত পদে স্বভাব মতো বাইরে যাবার নিমিত্ত এখান থেকে চলে গেল, শুধুমাত্র বস্তাটা সেখানে। প্রীতিলতা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেনি। খানিক বিবস্ত্রতা সত্বেও ছুটে, থমকে, কাপড় সংগ্রহ করত কোনক্রমে জড়িয়ে, সদর দরজার নিকটে এসে স্থির, এমত সময় সে আপনার নিশ্বাসের সময় পেয়েছিল, শব্দও নিশ্চয়। কত রকমারি নিশ্বাস প্রীতিলতা ফেলেছে উষ্ণ, দীর্ঘ, হারমানা!

এখন, সে, সদর দরজার এপাশে, অল্প গ্যাসের আলোয় সেই ঘুমন্ত ভাল্লুকের মতো বস্তুটা এবং সন্মুখেই অদ্ভুত এক ভঙ্গিসহকারে প্রীতিলতা, গৃহিণী, দণ্ডায়মান। মনে হয়, এক মুহূর্তের জন্য মুখ ফিরিয়েছিল, এমন হতে পারে সে ছায়া দেখতে চেয়েছিল। আ: পরোক্ষ অনুভূতি!

ঝটিতি প্রীতিলতা রাস্তায় নেমে, বস্তাটায় হাত দিতেই, হস্তদ্বয় তড়িৎবেগে ফিরে, কিছুক্ষণের নিমিত্ত, আকাশহীন শূন্যতায় কম্পিত হতে থাকল। পরক্ষণেই যখন সে বস্তুটা ধরে কায়দা করার চেষ্টা করে, তখন দেখে—বৃদ্ধ হাঁ হাঁ করে ছুটে আসছে, একটু এসেই বৃদ্ধ কেমন যেন বা নেচে উঠল—বোধহয় খোয়ার জন্য, তারপরেই পাশের দেয়ালে হেলে পড়ে, দেওয়াল ঘষটে একটু এসেই সমগ্র জোর দিয়ে প্রীতিলতার দেহের উপর ঝুঁকে পড়ল। পুরুষের স্পর্শে গৃহিণী প্রীতিলতা অচিরাৎ এক নৈসর্গিক বয়স ফিরে পেলে, সে পিঠের ঝটকায় এমনভাবে বৃদ্ধকে আঘাত করেছিল যে বৃদ্ধ টাল সামলাতে না পেরে রকে মুখ থুবড়ে পড়ল, কম্পিত, বিচলিত হাত দ্বারা কোনক্রমে রকের কিনারাটা ধরেছিল, চোখ দুটি চাইবার চেষ্টা করলে, মুখমণ্ডল যেন বা ফুলে উঠে, গ্যাসের আলো পেলে, মুখখানি এসময় অর্দ্ধ উন্মুক্ত ছিল, হঠাৎ বোতল থেকে তরল পদার্থ যেরূপ নির্গত হয় তেমনই সশব্দে রক্ত পড়ল। এ দৃশ্যে, প্রীতিলতা মজ্জাগত মনুষ্যত্বের বশে তাকে সাহায্য করতে গিয়ে থমকে আপনকার উদ্যত হস্তদ্বয় দেখেই সেই হাতে বস্তুটা তুলতে গিয়ে পুনরায় দেখল যে, রকের কিনার থেকে জর্জরিত হাত দুটি ধীরে নেমে গেল, ফলে সমস্ত শরীরটা তারই দিকে ঢলে পড়তেই একটু সরে গিয়ে—রকে বসে পড়েছিল। শুধু মনে হল, এখনও কী মানুষেরা মৃদুস্বরে কথা কয়, ছোট করে হাসে।

প্রধূমিত কক্ষের মধ্যে প্রীতিলতা যেমত সাঁতার দিয়ে বেড়াচ্ছিল, বহুবার সে জানালায় দাঁড়িয়েছে, গরাদ মুঠো করে পুনর্বার ফিরে গেছে। এমত সময় শুনল, দুটি কচি পদধ্বনি, এখানে এসেই যেন নিভে গেল। জানলা থেকে প্রীতিলতা বললে, 'রক থেকে দেখ তো কী হল বুড়োর—' এ কণ্ঠস্বর আজও প্রতিধ্বনিত হয়নি। যুথী-লতি দেখার পূর্বে—প্রীতিলতা বলেছিল, 'ঝট করে ক্লাবে খবর দে।'

কিছু পরে ক্লাবের ছেলেরা এল, এসে দেখে বললে, 'হ্যাঁ শাললা—চ বে ওঠা শালাকে...'

যুথী-লতি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, একবার বুড়োর বস্তার বা লাঠির বা মগের কথা তাদের মনে হল না। ইতিমধ্যে মার কণ্ঠস্বর শুনেই তারা ভিতরে চলে গেল।

হঠাৎ হাঁড়ি উনুনে চড়েছে, তলায় আগুন, এসব দেখে তারা যেন এক পরীর রাজ্যে চলে গেল। তারা হাসল, তারা স্বাভাবিকভাবে চলতে গিয়ে সর্পগতিতে এগিয়ে গিয়েছিল।

যদিও যুথী প্রশ্ন করতে গিয়ে চুপ, তারা দুই বোন বাবু হয়ে বসে, বাপের জন্যেও একটা জায়গা করেছে, এমন সময় খানিক সুস্থ আওয়াজ। মেয়ে দুটি 'বাবা! বাবা!' বলে উঠে গিয়েছিল।

'আজ খুব বরাত ভালো—চাল পেয়েছি,' বলে এক পকেট থেকে চাল বার করল। 'একি চাল কোথায়...'

'বলছি,—তোমার শরীর...'

'জ্বর নেই—পাঁচটা টাকাও পেয়েছি...'

'বেশ বেশ...আর দেরি করো না, বসে পড়ো।'

গরম ভাতের সামনে বসে ব্রজর নিজেকে মানুষের মতো মনে হল, এবং প্রীতিলতাকে তারিফ করবার জন্য বলেছিল, 'হ্যাঁ কোথায় পেলে...'

এ কথার উত্তর প্রীতিলতা প্রস্তুত করবার জন্য ডালভাতের ন্যাকড়াটার গিট খুলবার জন্য একটু ঘুরে বসতেই...ব্রজ তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করলে, 'ওমা তোমার পাছার কাছে রক্ত...'

এ কথার সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিলতা ঘুরে বসেই শুনলে, লতি বলছে, 'জানো বাবা বুড়োটা মরে গেছে...'

প্রীতিলতা যুগপৎ বলেছিল, 'কী যে অসভ্যতা করো এদের সামনে, জানো না কিসের রক্ত—নোংরা,' বলেই থেমে গিয়ে জিব কাটল।

ব্রজ দুবার 'ও ও' বলেই কেমন যেন থ হয়েছিল।

'নে খা-না তোরা,' প্রীতিলতা দমকা আওয়াজ করে বলেছিল। অনন্তর গরম ভাত পাওয়ার জন্যই হোক, অথবা অন্য কোনও কারণেই হোক, একটু সোহাগ-খোরাকি গলায় বলেছিল, 'বুড়োর জন্য মন খারাপ করছে...খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না...'

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%