সমরেশ মজুমদার

ভোর হতে না হতেই রাম-রাবণের যুদ্ধ। রোজই হয়; কে কার ঘুঁটে চুরি করেছে, কে কার ঘরের সামনে বাচ্চা বসিয়ে দিয়ে গেছে নোংরা করার জন্য, কোন শালা কার ঘরে ঢুকে মেয়েছেলের গায়ে হাত দিয়েছে, এরকম কত ঘটনা। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা যেন একটু অন্য মেজাজের।
চেঁচামেচিতেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল কেলোর। পিটপিট করে একটু তাকাল। বুঝবার চেষ্টা করল, কী হতে পারে! কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকল না। চুলোয় যাক। সটান চিত হয়ে উপরে চালের দিকে তাকাল। তাকাতেই একটু চমকে উঠল, আই বাপ, এ যে তিন-চারটে ফুটো দেখা যাচ্ছে। মাস তিনেক আগে গোটা তিনেক ক্যানেস্তারা টিন চুরি করে এনে উপরে চাপিয়েছিল, কিন্তু এ তো দেখছি আবার ফুটো। বৃষ্টি নামলে এ ঘরে কি আর থাকা যাবে!
বাইরে যা হবার হোক গে, ফুটোর দিকে তাকিয়েই মেজাজ খিঁচড়ে গেল ওর। ছফুট বাই আট ফুট ছোট্ট ঘরের চারপাশে চাঁচের বেড়া। দরজা বলতে কিছুই নেই, কোনওরকমে একটা ঝাঁপ দড়ি দিয়ে বেঁধে সাঁটিয়ে রাখা। ঘরের ভিতর একপাশে পুরু করে খড় বিছানো। ওটাই ওর বিছানা। একপাশে একটা প্ল্যাস্টিকের জগ, কোন ভাগাড় থেকে কুড়িয়ে এনেছিল কে জানে, তার উপর একটা মাটির ভাঁড় বসানো। বেড়ার গায়ে দু-একটা টুটাফাটা পাজামা আর গেঞ্জি গোঁজা। আর মাথার কাছে কাঠের একটা প্যাকিং বাক্স। বাক্সটার ভিতরেই ওর যাবতীয় সম্পত্তি।
ঘরফর বানিয়ে যে বাস করতে হবে কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি কোলো। কিন্তু কপালে থাকলে সবই হয়। মনে পড়ছে গঙ্গার কথা। গঙ্গাই ওর পেছু লেগেছিল, কেমন লোক গো তুমি, রাস্তার ফুটপাতে শুয়ে শুয়ে রাত কাটাও, একটা ঘর বানিয়ে নিতে পার না?
ঘর! হা হা করে হেসে উঠেছিল কোলো, ঘর কোথায় বানাব! ঘর কি ভেলপুরি নাকি, পঞ্চাশ ষাটটা পয়সা ছাড়লেই পাওয়া যাবে? তা, তোর যদি কোথাও ঘর থাকে তো নিয়ে চল, সেখানে গিয়ে থাকব।
গঙ্গাই ওকে নিয়ে এসেছিল এখানে, এই রেল লাইনের ধারে উঁচু জমিটায়। তখন এখানে বনতুলসী আর বিচুটির জঙ্গল। সবে সেই জঙ্গল সাফাসুফা করে গোটা কয়েক ঘর উঠতে শুরু করেছে। গায়ে গায়ে জড়ামড়ি করা ঘর। কোনওরকমে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। খানিকটা জমি পরিষ্কার করে খুঁটি পুঁতে ঘর বানিয়ে নিয়েছিল কোলোই। রেল কোম্পানির জমি, কে ওঠায়।
গঙ্গা বলল, ঘর কেবল বানালেই হয় না, রক্ষা করতে হয়। সামনেই তো লেক। লেকের পাড় থেকে কিছু কাদামাটি নিয়ে এসো দেখি, মেঝেটা লেপে দিই।
কেলোর তখন উৎসাহ কি! ঝুড়ি ভরে-ভরে কাদা আনল, বালতি ভরে জল। ঘরের মেঝে নিকিয়ে দিল গঙ্গা। বিছানাপত্র তো কিছুই নেই, কোত্থেকে গোছা-গোছা খড় নিয়ে এল, তাই বিছিয়ে বিছানা। তা ভালোই হল, রাস্তা ঘাটে আর পড়ে থাকতে হবে না। এখন নিজের ঘরে নিশ্চিন্তি।
গঙ্গা বলে, কি গো বাবু, কেমন হল বলো?
কেলো হাসে, ঘরবাড়ি যেমন তেমন, তোকে যে আমি কাছে পেলাম এই আমার ভাগ্যি।
তা, মাসখানেক সেই ঘরে সেই খড়ের বিছানায় জড়ামড়ি করে কাটিয়ে দিল গঙ্গা আর কেলো। তারপরই হঠাৎ একদিন কেমন যেন সব ফুটফাট হয়ে গেল।
ভাবতেই বুকের ভেতরটা হু-হু করে ওঠে কেলোর। গঙ্গা যে অমন চারশো বিশ হতে পারে, ও ভাবতেই পারে নি। একদিন টুক করে কেটে পড়ল। কোথায় যেতে পারে, নাকি কোথাও গিয়ে গাড়ি চাপা পড়ল, নাকি—
পাগলের মতো দিন কয়েক খোঁজাখুঁজি করল কেলো। আশ্চর্য কোথাও নেই। কেউ কোন হদিশই দিতে পারেনা। দিন দশ বারো কেটে যেতে গঙ্গার শোকও ধীরে-ধীরে উবে যেতে শুরু করেছিল, এমন সময় একদিন ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিয়ে গেল ফটকে, জানো কেলোদা, গঙ্গাকে আজ দেখলাম গো।
কোথায়?
টেশনে। শেয়ালদা টেশনে।
কেলো ভুরু বাঁকা করে তাকিয়ে থাকে।
হ্যাঁ গো এক ভুজিয়ালার দোকানের সামনে, এক বাবুর সঙ্গে মসকরা করছিল। নিজের চক্ষে দেখলাম।
তুই কিছু বললি না?
বলব বলে তো এগোলাম। কিন্তু আমাকে দেখেই ওরা ফুড়ুৎ করে পালিয়ে গেল।
মাথায় রক্ত চড়ে এসেছিল কেলোর। পারলে যেন ফটকের নাকেই একটা ঘুষি চালিয়ে দেয়। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে রেল লাইনের ওপর বসে পড়ল, যাক গে, ও মাগীকে আর ঘরে ঢুকতে দিলে তো! এবার এলে জুতো পেটা করে তাড়াব।
দিন কয়েক পরে আবার নাকি দেখা গিয়েছিল গঙ্গাকে। কালিঘাটের কাছে। চুলোয় যাক, আর তেমন গা করে নি ও।
পিটপিট করে ফুটোগুলির দিকে তাকিয়েই থাকে কেলো। বাইরে চেঁচামেচির আরো বেড়েছে। কী নিয়ে যে আজ শুরু হয়েছে কে জানে। মারো গোলি! পাশ ফেরে। মনে পড়ে, গঙ্গা যখন ওকে এখানে নিয়ে আসে, তখন সব মিলে ছিল পাঁচ ছ'ঘর। এখন তো বেড়ে দাঁড়িয়েছে চোদ্দ পনেরয়। ঘর যেমন বেড়েছে, লোকও বেড়েছে অনেক। এন্ডিগেন্ডিগুলো যেন মুরগির ছানা, সারাক্ষণ ঘ্যানর-ঘ্যানর, দেখলেই গা জ্বলতে শুরু করে ওর। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, দু চারটেকে তুলে লেকের জলে ফেলে দিয়ে আসে। তবে যদি কিছুটা চেঁচানি কমে।
শেষটায় একদিন তুলকালাম বাধিয়ে বসল কেলো, ব্যাপারটা কী? অ্যাঁ? শালাদের থাকার জায়গা নেই, কেবল বংশ বাড়ায়। রাত দুপুর অবদি যদি এত খিচিরমিচির চলে তা হলে তো ভারী বিপদ হল দেখছি।
নুলো এগিয়ে এসেছিল, সত্যি বলেছ কেলোদা। সারাদিন এত চেঁচামেচি কার ভাল লাগে। তুমি একটু হুড়কো দাও না।
কেলোর ঘরের সামনে কার একটা ভাঙা ঝুড়ি পড়েছিল, তাতে দাড়াম করে একটা লাথি কষাল কেলো, এবার, এবার থেকে যে শালা চেঁচাবে, তাকে গলা টিপে মারব। যত শালা মড়াখেকো এসে জুটেছে এখানে।
ধুমসো ভোলাও বিড়ি ফুঁকতে-ফুঁকতে এগিয়ে আসে, আসলে লোক বেশি হয়ে গেছে কেলোদা। আগে আমরা পাঁচ ছ'ঘর ছিলাম, ভালো ছিলাম।
কথাটা খুব খারাপ বলেনি। লোক বাড়ালেই যত রাজ্যের হ্যাপা বাড়ে। কেলো চেঁচিয়ে ওঠে, যে শালা এবার থেকে চেঁচাবে তাকে ঘর ছেড়ে দিতে হবে বলে রাখলাম।
বুদ্ধুর মা উনুন সাজাতে বসেছিল, বলল, হ্যাঁ বাবা কেলো, আর যাতে কেউ এখানে ঘর তুলতে না পারে সেটা দেখ দেখি। যার যেমন খুশি এসে ঘর তুলে বসছে, তোমরা কেউ বাধা দেবে না তো কী হবে।
না আর কাউকে ঘর তুলতে দেওয়া হবে না। এ জমিতে আমরা আগে এসে বসেছি, এ জমি আমাদের।
আবার পাশ ফেরে কেলো। হাঁটু মুড়ে একটু আরাম নেবার চেষ্টা করে। কিন্তু ঠিক এ সময়ই টের পায় ওর ঘরের ঝাঁপি ধরেই চেঁচাচ্ছে ভোলা, ও কেলোদা ওঠ-ওঠ, দেখ না কি হচ্ছে বাইরে! কে এয়েচে!
কেলো উত্তর না দিয়ে পারে না। গলায় একটু মেজাজ ঢেলে বলে, কি বে ধুমসো, কি বলছিস?
দরজা খোল না গো, দেখ না কে এল।
কে এল! একটু অবাক হয় কেলো। কে আসতে পারে। আসার লোক বলতে তো পুলিশ। এসে ডান্ডা ঘুরিয়ে বলতে পারে, ঝুপড়ি হটাও। এটা রেল কোম্পানির জায়গা।
উঠতেই হয় কেলোকে। উঠে লুঙ্গি ঠিক করতে করতে কেলো হুংকার ছাড়ে, দাঁড়া বে, অত চেঁচাস না, আসছি।
একটুক্ষণের মধ্যেই ঝাঁপ খুলে বাইরে বেরয় কেলো। বেশ রোদ উঠে গেছে। রেল লাইনের গা ঘেঁষে ঝুপড়িগুলোর সামনে বেশ উত্তেজনা। হাত পঞ্চাশেক দূরে লেবেল ক্রসিং। তারই কাছাকাছি একটা টিপ কল। সেখানে রোজই এই সাত সকালে ভিড় লেগে থাকে, আজও ভিড়। কিন্তু কী এমন ঘটনা ঘটল যে সবাই হাঁই-হাঁই করে চেঁচায়!
ভোলা বলল, ওদিকে দেখ কেলোদা। হাই দেখ।
রেল লাইনের দিকে চোখ পড়ে কেলোর। দেখল, হাঁটুর ওপর কাপড় তোলা দশাসই একটা মেয়ে ড্যাব-ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। বয়স বড়জোর বাইশ চব্বিশ। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল।
মেয়েটাকে ঘিরে এন্ডিগেন্ডিগুলো তো আছেই, দেখা গেল, বুদ্ধুর মাও হাত পা নেড়ে কি যেন বোঝাচ্ছে মেয়েটাকে। পাশে ফটিক, ঝাঁটু আরও দু-একজন।
কেলো এগিয়ে গেল, কী হয়েছে রে?
বুদ্ধুর মা বলল, গায়ের জোর দেখাচ্ছে। বলে কি না ঘর তুলবে। ওই দেখ না, তোমার ঘরের পেছনে কোথথেকে একগাদা বাঁশ ব্যাখারি এনে জমা করেছে।
কেলো দেখল, সত্যি-সত্যি কালি ঝুলি মাখা বেশ কিছু বেড়াফেড়া।
এই কি নাম রে তোর? কোথথেকে উদয় হলি শুনি?
মেয়েটার পরনে ছাই রঙের নোংরা একটা শাড়ি। আঁচলটা শক্ত করে কোমরে গোঁজা বলে বুকদুটো বেশ জেগে রয়েছে। কেমন রহস্যময় লাগে কেলোর।
কি হল? বোবা নাকি, কি নাম তোর?
বুদ্ধুর মাও খেঁকিয়ে ওঠে, উত্তর দে মাগী, এতক্ষণ তো খুব গলাবাজি করছিলি।
মেয়েটা বলে, আমি টুনি।
বুদ্ধুর মা ফিক করে হেসে ওঠে, টুনি না টুনি বাল্ব?
কেলো বুদ্ধুর মাকে সরিয়ে দিয়ে মেয়েটার মুখোমুখি দাঁড়ায়, কি চাই এখানে?
টুনি চটপট জবাব দেয়, আম্যো ঘর বানাব ইখানে। আমার কুথাও থাকার জায়গা নেই। আম্যো—।
বলতে বলতে মেয়েটার চোখ ছল-ছল করে ওঠে। কেলো বলল, আর কে আছে তোর? বাপ মা? মাথায় তো সিঁদুর দেখছি না।
টুনি আঁচল দিয়ে চোখ মোছে, কেউ নেই। মা টা ছিল, মরে গেছে।
বাপ?
জানি না। বাপ যদি থাকবে তো এখানে আসি।
তা উ সব বাঁশ ফাঁকা কোথায় পেলি? ঝেঁপেছিস।
আই বাপ, ইগুলো আমার গো। হাই টেশনের কাছে আমাদের একটা ঘর ছিল, সেটা ভেঙে দিল বলে না এখানে এলাম।
কে ভেঙে দিল?
কে আবার মড়া খোকোরা। মাসে মাসে তোলা নিয়ে যেত। তা, মা যতদিন বেঁচে ছিল তোলা দিত। এখন আমি একা, খেতেই পাই না তোলা দিব কি করে। ওরা তাই লাঠি মেরে ঘর ভেঙে দিল। তাইড়ে দিল।
হুম। কেলোর কেমন খারাপ লাগে। কিন্তু খারাপ লাগলে চলবে কেন! এই কেলোই তো হম্বিতম্বি করে আইন করে দিয়েছে, এখানে আর কাউকে ঘর বানাতে দেবে না।
জিগ্যেস করল, কবে ভাঙল?
পরশু।
পরশু, তো রাতে কোথায় কাটালি?
টেশনে। পেলাটফরমে।
বুদ্ধুর মা আবার খেঁকিয়ে ওঠে, টেশনে না আর কিছু। কোথায় কোন বাবুর ঘরে গিয়ে রাত কাটিয়ে এল, এখন সাধু সাজছে। না বাপু, এখানে জায়গা হবে না। অন্য কোথাও দেখ তুমি।
কেলোর গলার স্বর একটু নরম হয়ে এসেছিল। বলল, ঠিক আছে, আমাদের মধ্যে আগে মিটিঙ হোক, তারপর ঠিক হবে। এখন তুমি যেতে পার।
মিটিঙ! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে টুনি।
হ্যঁ হ্যাঁ মিটিং। আমরা চোদ্দো ঘর এখানে আছি, সবাই যদি মত দেয় তাহলে তুমি জায়গা পাবে, না হলে বাপু কিছু করার নেই।
বুদ্ধর মাও কেমন বোকার মতো তাকায়, মিটিঙ কথাটা ও প্রথম শুনছে। চোদ্দ ঘর বাসিন্দা সবাই বসে মিটিঙ করবে কথাটা ভাবতেই কেমন যেন একটু পায়াভারী লাগে। ওরা যত ফালতু লোকই হোক না কেন, চোদ্দো ঘর একসঙ্গে বাস করে কেমন যেন একটু মর্যাদা পেয়ে গেছে। কেলোর ওপর আস্থা বেড়ে যায় আরও।
টুনি উঠে দাঁড়ায়, তাহলে মিটিং কর এখন।
এখন কী করে হবে। সন্ধ্যায় সবাই যখন ফিরবে তখন হবে।
তালে?
তালে কী কাল সকালে তোমাকে জানিয়ে দেব, এখন আর কিছু করার নেই।
কেলো গটমট করে আবার ফিরে আসে নিজের ঘরে। আটটার লোকলটা পাস করে গেছে কিনা বুঝতে পারে না। দশটার মধ্যেই আজ ওর স্ট্যান্ড রোডের পেট্রল পাম্পের কাছে দাঁড়ানোর কথা। হারু আসবে। হারু আজ ওকে একটা নতুন ঠেকে নিয়ে যাবে। এমনও হতে পারে, আজ থেকেই হয়তো ওর একটা নতুন জীবন শুরু হয়ে যেতে পারে।
সব মনে পড়ে গেল। হারুটা বেশ কিছুদিন ধরেই পিছু লেগেছিল ওর, আয় না বে, দিনে আট দশটা ব্লাডার পাচার করে দিতে পারলেই দেখবি অনেক টাকা। গত মাসে আমি আরো দুটোকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। ঘাঁতঘোঁত সব শিকিয়ে দেওয়া হবে, আয় না।
পুলিশ?
ভাগ বে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে লাইন করা আছে। তুই কাজে হাত দিলেই সব বুঝতে পারবি।
বলছিস?
তো কি, চলে আয়।
ঠিক হয়েছিল, আজই ও পেট্রোল পাম্পের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। হারু এসে ওকে জায়গা মতো নিয়ে যাবে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই শালা মেয়েছেলের সঙ্গে বকবক করতে হল। জোটেও সব।
ঘরে ঢুকে আবার সেই চালের ফুটোয় চোখ পড়ে ওর। আরো কিছু ক্যানেস্তারা টিন ঝেঁপে না আনতে পারলে আর চলছে না।
ভোলারা কয়েকজন ততক্ষণে আবার ওর ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কি হল আবার?
কখন তা হলে মিটিঙ হবে কেলোদা?
সে এক সময় তোরা করে নে। তোরা সবাই মিলে যা করবি তাই হবে।
মুখ চাওয়াচায়ি করে ওরা, ও সব আমরা বুঝি নাকি! তুমি না থাকলে হবে না।
কাঠের বাক্স থেকে একটা জামা বার করে কেলো, হবে না কেন, সবাই একসঙ্গে বসে ঠিক করে নিতে পারবি না? আমি কখন ফিরব না ফিরব ঠিক আছে।
তুমি ফেরার পরই তা হলে হবে।
কেলো বলল, ঠিক আছে, এখন যা। এখনি আমাকে বেরুতে হবে।
দূর থেকে গাড়ি আসার শব্দ ভেসে আসছিল। কেলো কান খাড়া করে, দেখতো কোন গাড়ি?
ভোলাই উত্তর দিল, আটটার বজবজ।
আই বাপ, অনেক দেরি হয়ে গেল রে, লেকে একটা ডুব মেরে আসি আগে। ভাগ ভাগ।
ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে কেলো। লেকের ধারে যেতে যেতে আবার চোখে পড়ে টুনিকে, লেবেল ক্রসিংয়ের কাছে টিপ কল থেকে জল খাচ্ছে। কেলোকে দেখেই ড্যাব ড্যাব করে তাকায়। কেলোও আড় চোখে দেখে নেয় একবার। গঙ্গার মতো অত তড়বড়ে নয় মেয়েটা। কেমন যেন চাপা একটা আকর্ষণ বোধ করে কেলো। কিন্তু না বাবা, কেলোর পক্ষে এখনি আবার ডেকে কথা বলা সাজে না। বুদ্ধুর মা যা ঠোঁট কাটা শেষ পর্যন্ত না জানি, কাটকাট করে শুনিয়ে দেয়, আর অত বকিস না কেলো, তুইও তো মাগীর গন্ধে পালটি খেলি।
কেলো চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে লেকের জলে দুতিনটে ডুব সেরেই উঠে এল। চোখ ঘুরিয়ে দেখে যাহবাবা মেয়েটা এখনো হাঁ করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কেলোর ভেজা লুঙ্গি চড়াৎ করে উঁচু হয়ে ওঠে। কানের কাছে ভোঁ ভোঁ শুরু হয়। ডাকে, এই—
টুনির চোখে যেন প্রজাপতি লাফায়, ডাকছ?
হ্যাঁ। কি দেখছিস হাঁ করে?
কিছু না, আমাকে একটু জায়গা দাও না গো। কোথায় আমি যাই বলো তো?
কেলো গলার স্বর ভারী করে তোলে, বললাম না মিটিঙ হবে। কাল সকালে আসিস।
টুনি কেমন অসহায়ভাবে তাকিয়েই থাকে। এ চোখ দেখলে মায়া না হয়ে যায় না। কেলো বলল, কাল আয় না, বললাম তো কাল আয়, তারপর ঘরফর যা বানাতে চাস বানাস। এখন আমার সময় নেই।
আর দাঁড়ায় না কেলো। ওর মনের কথাটা যেন ও বলে ফেলেছে, আর দাঁড়াবার দরকার নেই।
ঘরে ঢুকে আর সময় নষ্ট করে না কেলো। জামাকাপড় পরে বেরুতে যেটুকু সময়। ঘর থেকে বেরিয়ে ঝাঁপ বন্ধ করে। আবার চারপাশে তাকায়, না মাগীটাকে আর চোখে পড়ল না। মরুক গে, এখনি ওকে ছুটতে হবে স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে। না জানি হারুটা এসে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
হন-হন করে হাঁটা শুরু করে কেলো। লেক পেরিয়ে এসে বাস ধরে। তারপর আজব শহর কলকাতার ভিড়ে মিশে যায় একটু পরেই।
ফিরতে-ফিরতে বেশ রাত। রাস্তা ঘাট ফাঁকা। লাস্ট বাস যে কখন বেরিয়ে গিয়েছিল খেয়ালই ছিল না। চুলোয় যাক। বাস নেই তো নেই, ওর পাদুটো তো আছে, চল রে পা গাড়ি।
হাঁটতে থাকে কেলো। হারুটার শালা জবাব নেই। এমন জায়গায় আজ ওকে নিয়ে গিয়েছিল যে দিনে চল্লিশ পঞ্চাশ টাকা কামাতে আর কষ্টই হবে না। একটু শুধু টিকটিকির ভয়। তা ভয় কোথায় নেই। এই যে দিনের পর দিন ও রাস্তার ফুটপাতে শুয়ে কাটাত, ভয় ছিল না। পত্থরঅলার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, পাগলা গাড়ি ফুটপাতে উঠে ঝগরুকে শালা মেরেই ফেলল একদিন। নিজের চক্ষে দেখা।
তবু ভাল, এখন ওর ঘরবাড়ি হয়েছে। রাস্তায় আর পড়ে থাকতে হয় না। ঘরে ঢুকে ধপাস করে একবার পড়লেই হল, নিশ্চিন্তে রাত কাবার করে উঠতে পারে ও।
হাঁটতে থাকে কেলো। প্রথম দিনেই পঁচিশটা চোলাই মদের টিউব পাচার করে হিম্মত দেখিয়ে এসেছে ও। দেখ শালা, চিনে রাখ কেলোকে। ভগবান সিংকে কেলোর পিঠ চাপড়ে বলতেই হয়েছে, সাবাস বেটা। আজ প্রথম দিন যা পারিস তোরা খেয়ে যা এখান থেকে। আজ ফ্রি।
তা পেট পুরে তরকা রুটি আর চোলাই সাঁটিয়ে বেরিয়ে এসেছিল কেলো। না বে হারু আর না। আমাদের আবার আজ একটা মিটিঙ আছে।
মিটিঙ!
হ্যাঁ বে, জবরদস্ত মিটিঙ, তুই বুঝবি না। তুই আরো সাঁটবি তো সাঁটা, আমি উঠলুম।
মাতালরা যেমন হয়। কে কোথায় যায়, কেউ বোঝে না। যে যায় সেও বোঝে না। কিন্তু কেলোর মাথায় আজ ঘুরঘুর করছে টুনি। সন্ধে হতেই মনটা কেমন উড়ু-উড়ু হয়ে রয়েছে। মিটিঙটা ওরা কেলোকে ছাড়াই করে ফেলল কিনা কে জানে।
কেলো হাঁটতে থাকে। পা টলে, মাথা টলে। টলুক, কেলো ঠিকই আছে। এই তো লেক। লেকের ভিতর দিয়েই হাঁটছে ও। ওই তো লেবেল ক্রসিং। ওই তো সেই টিপ কল। খাঁ-খাঁ করছে ফাঁকা। একটা কুকুর ঘুর ঘুর করছে ওখানে। করুক গে, ওর কি! কেলো হাঁটতে থাকে। ওই তো ওদের ঝুপড়িগুলো। আবছা আবছা অন্ধকার। নিস্তব্ধ। সব শালা এরই মধ্যে আউট। আশ্চর্য। বুনো তুলসী আর আশ শেওড়ার ঝোপ পেরিয়ে এগিয়ে আসে কেলো। একেবারে ঝুপড়িগুলোর সামনে এসে একটু থমকে দাঁড়ায়। ওর ঘরের ঠিক পিছনটাতেই জড় করা একগাদা বাঁশ বোখারি বেড়া। মাগীটাই ওসব বয়ে এনে জড় করেছিল এখানে। ঘর বানাবে। বানা না, কে বারণ করেছে তোকে, বানা।
চারপাশে একবার তাকিয়ে নেয়। মাগীটা কি আজও স্টেশনে গিয়েই পড়ে রইল! অসম্ভব নয়। নাকি পাঁচ-দশ টাকা আঁচলে বেঁধে কোন বাবুর সঙ্গে রাত কাটাতে গেল। কে জানে, মরুক গে।
হঠাৎ কেমন যেন চমকে ওঠে। কি রে বাবা, নেশাটা কি একটু বেশিই হয়ে গেছে নাকি, বেড়াটা কেমন নড়ে উঠল যেন।
দাঁড়াতেই হয়! কেবল নড়ে না মিহি সুরে কে যেন ককাচ্ছে না! কে হতে পারে, কে ওখানে! চারপাশে ভয়ে-ভয়ে তাকায় কেলো। দূরে সিগন্যালের লাল আলোটা টিমটিম করে জ্বলছে। ধু-ধু করছে ফাঁকা রেল লাইন।
ভাবল ভুলই হচ্ছে ওর। মাটিতে পড়ে থাকা বেড়া হঠাৎ নড়তে যাবে কেন! কিন্তু ককানিটা তো মিথ্যে নয়, বেশ শুনতে পাচ্ছে ও।
বেড়ার কাছাকাছি এগোতেই শব্দটা আরো স্পষ্ট হয়। তবে কি, হুই করে বেড়ার একটা কোণা ধরে টেনে তোলে ও। তুলতেই কেলো যেন বিশ্বরূপ দেখে।
এই কে রে ওখেনে?
মূর্তিটা একটু নড়েচড়ে বেড়ার নীচ থেকে বেরিয়ে আসে, আমি।
আমি! আই বাপ, তুই এখানে!
টুনি ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকায়, আমার কোন থাকার জায়গা নেই, কোথায় থাকব আমি!
বটে, আয়। আমার সঙ্গে আয়।
কোথায়?
বলছি আয়। কেলো খপ করে হাতটা চেপে ধরে টুনির। আয় না।
টুনি এগোয় কেলোর পিছুপিছু।
ঘরের দরজা খোলে কেলো, আয়।
অন্ধকার ঘর। কেলো জড়িয়ে ধরে টুনিকে। ঘর নেই তো কি হয়েছে, এখানেই তুই থাকবি, এটাই তোর ঘর।
এ মা, কি বলে!
কি বলে মানে, দাঁড়া ঝাঁপ বন্ধ করি।
ঝাঁপ বন্ধ করে কেলো। চেঁচাবি না বলছি, আয়।
কোথায়? শিরশির করে কাঁপে টুনি।
কেলো ওকে নিয়ে আছড়ে পড়ে বিছানায়, এখানে। আমার বুকের মধ্যে।
উহ।
কেলো ঘ্রাণ নেয় টুনির। জীবনের ঘ্রাণ, বাঁচার ঘ্রাণ। শেষ পর্যন্ত কেলো আর কেলো থাকে না। হিংস্র একটা জন্তুর মতো হয়ে ওঠে।
ভোর হতে না হতেই কেলো দেখে, টুনি লেকের জলে চান করে এসে ফিটফাট। চুল বাঁধছে। পরনে শায়া বুকের ওপর গামছা।
কি হল, উঠবে না?
কেলো ড্যাবড্যাব করে তাকায়। ভারি ভালো লাগে ওর টুনিকে। হেসে বলল, একটু চা নিয়ে আয় না মোড়ের দোকান থেকে।
টুনিও হাসে, বাইরে বেরুলেই যে ওরা আবার ছেঁকে ধরে।
কারা?
কারা আবার। লেকে চান করতে গেলাম, পেছু লাগল কজন।
কোন শালা? উঠে বসে কেলো।
তুমি তো বাপু ভোলানাথ, কিছুই বোঝ না।
এই মাগী, পরিষ্কার করে কথা বলবি তো বল, নইলে,—
টুনি এগিয়ে আসে কেলোর কাছে, মরণ।
মানে?
মানে আমার পোড়া কপাল। আমি বাপু কোথাও যাব না, এই শুধু তোমার কাছে। আবার খড়ের গাদার ওপর শুয়ে পড়ে টুনি।
কেলো কুতকুত করে তাকায়, কোথাও যেতে হবে না তোকে, এখানেই থাকবি তুই।
টুনি জড়িয়ে ধরে কেলোকে, উম।
উম কি, এটাই তোর ঘর। আলাদা করে আর তোকে ঘর বানাতে হবে না।
ততক্ষণ বাইরে আবার চেঁচামেচি শুরু হয়েছে। এ শালা, রোজকার ব্যাপার। কেমন একটু আড়ষ্ট হয়ে যায় টুনি, কে চেঁচায় দেখ না গো।
কেলো টুনিকে টেনে নেয় বুকের ভেতর, ও কিছু না। শালারা রোজ চেঁচায়।
তবু একটু দেখে এসো না।
ফের বকবক করে! বলছি না কিছু না। বেশি বকবক করবি তো পাছায় লাথি মেরে তাড়াব।
ভয়ে গুটিয়ে যায় টুনি।
কিন্তু খানিকক্ষণ পরেই কেলোর ঘরের দরজায় থাবড়া পড়ে, কেলোদা ও কেলোদা।
কেলো বুঝতে পারে এটা ভোলার গলা, কি বে কী বলছিস?
মিটিঙ হবে না? তুমি ওঠ।
কীসের মিটিঙ! ভাগ শালা, ঘুমুতে দে। টুনিকে এক ঝটকায় বুকের ওপর টেনে তোলে কেলো।
তারপর এই টুনিই হল ওর জীয়নকাঠি। দুদিন যেতে না যেতেই একটা শাড়ি কিনে আনল কেলো, নে পর দেখি।
ওমা কি সোন্দর গো। তা একটা জামা আনতে পারলে না? এ জামাটা আর চলে! টেনেমেনে তো ছিঁড়ে ফেলেছ।
কাল আনব।
জামা এল। কোত্থেকে পুচকে একটা চটা ওটা আয়নার টুকরোও এসে গেল। টুনি নিজেই ঘর সংসার গুছিয়ে ফেলল। নিজের হাতেই লেক থেকে মাটি তুলে এনে উনুন বানাল। বুদ্ধুর মা হয়ে গেল মাসি। ভোলা ফটিক বিষ্টুরা হয়ে গেল ওর দেওরতুল্য। এক সঙ্গে থাকলে এ সব হয়ই। এই নিয়েই তো বেঁচে থাকা।
মাসি একদিন সিঁদুর পরিয়ে দিল টুনির মাথায়, সিঁদুর না পরলে কি মানায়। রোজ পরবি। কেলোটা তো বাউন্ডুলে; দেখ তো বউ এবার যদি ওকে মানুষ করতে পারিস। হ্যাঁ পারবি, তুইই পারবি।
টুনি ঢিপ করে মাসির পায়ে মাথা ছোঁয়ায়। বলা নেই কওয়া নেই, দুচোখ জলে ভিজে ওঠে ওর।
এমনি হয়। কপালে থাকলে এমনিই হয়।
বাঁশ বেড়াফেড়া সঙ্গে করে যা নিয়ে এসেছিল টুনি, তাই দিয়ে কেলো নিজের ঘরটাকেই আরও সামলে সুমলে নিল। এখন আর চিত হয়ে শুলে ঘরের চালে ফুটো দেখা যায় না। যাক বাবা নিশ্চিন্তি।
টুনি বলে, রোজ বাবা এত রাত করে ফের আমি ভয়ে বাঁচি না।
কেলো হাসে, ঝামেলা কি কম নাকি, মাল তোল, পাচার করো, অনেক ঝামেলা। জানিস টুনি কাল না একটা মজাই হল সাইকেলের টিউব পেটে জড়িয়ে তো ভালো মানুষ সেজে হাঁটছি, হাঁটছি আর তোর কথাই ভাবছি, খেয়ালই নেই, টিউবটা শালা কোথায় যেন একটা ফুটো। চুঁইয়ে-চুঁইয়ে মাল ঝরতে শুরু করেছে। পাশে-পাশে হাঁটছিল হারু। দু-চারবার নাক টেনে একটু দাঁড়াল, বড্ড গন্ধ বেরুচ্ছে রে।
আমারও খেয়াল হল, মা কালীর গন্ধে ভুরভুর করছে।
হঠাৎ বুঝলি টুনি, খিঁ-খিঁ করে হেসে ওঠে হারু, আই বে তুই হিসি করেছিস?
হিসি! নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি প্যান্ট ভেজা।
কি আর করি ভগবান সিংয়ের মাল দরিয়ামে ডাল। দিলাম ফেলে।
যাহ, তুমি ভারি অসভ্য।
হুঁ দাড়া, হারুকে একদিন নিয়ে আসব এখানে। সবার থাকে দুটো ঠোঁট ওর তিনটে।
তিনটে।
হ্যাঁ রে, ওর ওপরের ঠোঁটটা মাঝখানে দিয়ে কাটা। তিন ঠোঁটের মানুষগুলি বড় দিলদার হয়। দেখিস না, একদিন এনে দেখাব।
সত্যি-সত্যি একদিন হারুকে নিয়ে এল কেলো। তখন বেশ রাত। ঘরে ঢুকেই কেলো হাঁক পাড়ল, কোথায় রে টুনি গেলাস দুটো কোথায় রাখলি?
টুনি ঘরে ঢুকে দেখে সত্যি সত্যি তিনটে ঠোঁট। দুই ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দাঁত দেখা যায়। গেলাস এগিয়ে দিল। মোড়ের মাথা থেকে নিয়ে এল আলুর চপ, ঘুগনি।
কেলো বলল, এবার প্রণাম কর হারুকে, ও আমার গুরু।
টুনি প্রণাম করার জন্য হাত বাড়ায়। হাত সরিয়ে দেয় হারু, যাহ মাইরি, কি করে!
তারপর অনেক রাত অবধি খানাপিনা। দেখতে দেখতে বেঁহুশ। টুনি বাকি রাতটুকু কাটিয়ে এল মাসির ঘরে।
চলছিল এভাবেই। রাতের রেলগাড়িগুলো যেন ঝুপড়িগুলোর গায়ের ওপর দিয়ে ছুটে যায়। ভয়ে তখন দু-হাত দিয়ে কেলোকে জড়িয়ে থাকে টুনি। মরতে হয় এক সঙ্গেই মরব, বাঁচতে হয় একসঙ্গেই।
সিঁদুর পরতে কোনদিনই ভুল হয় না ওর। কেলো ফিরতে দেরি করলে ঘরের ঝাঁপ খুলে হাঁ করে বসে থাকে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে টকটক করছে দূরে সিগন্যালের আলো। টের পায়, পেছনের আঁশ শেওড়া আর বুনো বিছুটির ভেতর দিয়ে কুকুর ছুটছে। মাঝে মাঝে মাসির গলা পায়, হ্যাঁ রে টুনি, কেলো ফেরেনি?
না মাসি এখনও ফেরেনি। তুমি ঘুমোওনি?
এবার ঘুমোব।
ঝুপড়িগুলো গায়ে-গায়ে জড়ামড়ি করে ঘুমোয়। কোন একটা ঘরের ভিতর থেকে হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে শিশু। নেড়ি কুকুর চাপা পড়লে যেমন করে চেঁচায়, শব্দটা যেন তেমনি।
রা করে না টুনি। কেলো না ফেরা অবধি ও অন্য মানুষ।
হ্যাঁ রে টুনি, কেলো ফেরেনি?
না মাসি ফেরেনি।
বলে কি গো, রাত তো ফুরোল বলে।
বিড়বিড় করে ওঠে টুনি, দেখ না, কী জ্বালা!
ঘর থেকে বেরিয়ে লেবেল ক্রসিংয়ে গিয়ে দাঁড়ায় টুনি, যদি দেখা যায়। কিন্তু না, কেবল নিস্তব্ধতা ছাড়া কিছুই নেই চারপাশে।
ভোর হয়, পাখি ডাকে। বায়ুসেবীর দল লেকের চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কেলোর কোনও দেখাই নেই।
ঝুপড়ির পাশে আবার ফিরে আসে টুনি।
কি রে টুনি, ফেরেনি?
না মাসি, কোথায় যে গেল।
কোথায় আর যাবে, ঘরে যা ঠিক ফিরে আসবে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হল, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সন্ধ্যাও বুঝি হয় হয় এমন সময় উদ্ভ্রান্তের মতো এল হারু। মুখটা ভাঙাচোরা, হাঁড়ির মতো কালো।
কি হয়েছে হারুদা? ককিয়ে ওঠে টুনি।
হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ে হারু, সর্বনাশ হয়েছে।
সর্বনাশ, কি সর্বনাশ? ঝুপড়ির সবাই এসে ভিড় করে ঘিরে ধরে।
ভাবতেই পারছি না, এমন হবে। লাশ পেতে পেতে কাল বাদে পরশু ছাড়া হবে না।
ওমা, কী বলে গো, কিসের লাশ?
পঞ্চু শালা চাকু চালিয়ে দিল পেটে। তারপর ফটাফট বোমাবাজি। পুলিশ এসে লাশ তুলে নিয়ে গেছে।
রেল লাইনের ওপরই যেন আছড়ে পড়ছিল টুনি। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে চিৎকার করে উঠল, ওগো, আমার কী হল গো,
মাসি এসে জড়িয়ে ধরে টুনিকে।
দেখতে দেখতে মাস খানেকও পার হয়ে গেল। ঘরের ঝাঁপ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে টুনি। এদিক ওদিক গায় গতরে খেটে কোনওরকমে তো চালিয়ে এল একমাস। এ ভাবেই যাবে। এ রকমই হয়। ঘরের চারপাশে চোখ বোলায় টুনি, কার থাকার কথা, কে থাকে!
পাশের ঝুপড়ি থেকে হঠাৎ মাসির গলা, কিরে টুনি, ঘুমলি?
টুনি উত্তর করে না। বড় ভয় হয় ওর উত্তর করতে।
বহু দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসল শুনতে পায় ও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন