বদলি মঞ্জুর

সমরেশ মজুমদার

ছোটো একটি ব্র্যাঞ্চ লাইন। এক জংশন স্টেশন হইতে বাহির হইয়া আর এক জংশন স্টেশনে গিয়া মিশিয়াছে। মাঝেমাঝে কয়েকটি ছোটো ছোটো স্টেশন।

তা লাইনের সব কয়টি স্টেশনই দেখিতে প্রায় একরকম।

পয়েন্টিং করা লাল ইটের তৈরি ছোট্ট একখানি ঘর, সুমুখে একটুখানি ঢাকা বারান্দা, বারান্দার এক পাশে কাঠের বেঞ্চি পাতা, তাহার পাশেই ওজন করিবার লোহার যন্ত্র, জানালার গায়ে টিকিট কিনিবার ঘুলঘুলি।

ভিতরে একটি টেবিলের উপর টেলিগ্রাফের যন্ত্র সাজানো। যিনি টেলিগ্রাফ করেন, তাঁহাকেই টিকিট দিতে হয়, তিনিই স্টেশন মাস্টার—তিনিই সব। অ্যাসিস্ট্যান্টের বালাই এ লাইনে নাই। অ্যাসিস্ট্যান্ট বলিতে একজন খালাসি। স্টেশনেও কাজ করে, আবার মাস্টারের বাড়ির কাজও করিয়া দেয়। মাস্টারের চাকর রাখার খরচটা অন্তত বাঁচে।

মন্দ নয়।

স্টেশন মাস্টার এইচ পি ব্যানার্জি। আসল নাম হরিপদ। মাহিনা বাহাত্তর টাকা। সুখে স্বাচ্ছন্দ্যেই সংসার চলে। স্টেশনের কাছেই ঠিক তেমনি পয়েন্টিং করা ইটের তৈরি দুখানি ঘরের একটি কোয়ার্টার —হরিপদ মাস্টারের সংসার। সংসার বলিতে একমাত্র তাহার স্ত্রী বীণাপাণি। ছেলেপুলে নাই, একা মানুষ—একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট।

বীণার কাজকর্ম একরকম নাই বলিলেই হয়। ইঁদারা হইতে রামধনিয়া খালাসি জল আনিয়া দেয়, তাহার স্ত্রী লছমির কল্যাণে ঘর ঝাঁট দিতে হয় না, বাসন মাজিতে হয় না—শুধু দু-বেলা দুটি রান্না।

আছে একরকম ভালোই, কষ্টের মধ্যে শুধু সে নি:সঙ্গ, একাকিনী। এখানে আসিবার পূর্বে বীণা ছিল এক পল্লীগ্রামে—তাহার মামার বাড়িতে। সেখান হইতে আসিয়া অবধি কোথাও যাওয়া তাহার আর একটিবারের জন্যও ঘটিয়া ওঠে নাই। মনে হয়, এই আট বৎসর ধরিয়া সে যেন এই ছোট্ট খাঁচাটির মধ্যে বন্দিনী হইয়া আছে। আশেপাশে এমন কেহ নাই যে, ডাকিয়া দুটা কথা কয়। উন্মুক্ত প্রান্তরের মধ্যে শুধু ওই খাঁচার মতো ছোট ঘরখানি এত অপরিসর যে, দু-দণ্ড নড়িয়া চড়িয়া ছুটিয়া খেলিয়া বেড়াইবারও উপায় নাই—এক লছমির সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টা কথা কহিতে তাহার ভালোও লাগে না।

হরিপদ খাইবার সময় বাসায় আসে। স্নান করিয়া ঠান্ডা হইয়া খাইতে বসিলে পাখা হাতে লইয়া বীণা তাহাকে বাতাস করিতে করিতে বলে,—'হ্যাঁ গো, আর কতদিন? এখান থেকে তোমার বদলি কি আর হবে না ছাই?'

হরিপদর সেই এক জবাব। বলে, 'কই আর হয়!'

বলে, 'কেন জায়গাটা তেমন মন্দ তো নয়। সব জিনিসই সস্তা। তরি-তরকারি তো একরকম কিনতেই হয় না, তাছাড়া কাল থেকে আধ সের করে দুধের বন্দোবস্ত করেছি, খাঁটি দুধ—একেবারে বিনি পয়সায়।'

বলিয়া একটুখানি গর্বের হাসি হাসিয়া হরিপদ তাহার মুখের পানে তাকায়। ভাবে হয়তো বীণা তাহার এই বুদ্ধিমত্তার তারিফ করিবে। কিন্তু তারিফ করা দূরে থাক, হাতের পাখা তখন তাহার অত্যন্ত মৃদু গতিতে চলিতে থাকে, হেঁট মুখে বুকের আঁচলের পাড়টা সে বাঁ হাত দিয়া টানিয়া টানিয়া সোজা করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠে, মনে হয়, কথাটায় যেন সে কানই দেয় নাই। হরিপদ কিন্তু না শুনাইয়া তৃপ্তি পায় না, বলে, 'ওইখানে ওই জানালায় দাঁড়ালে বাইরে দক্ষিণদিকে উ-ই যে ওই গাছপালায় ঢাকা গাঁ-টা দেখা যায়, ওই গাঁ থেকে চাষাদের আর গয়লাদের ছেলেগুলো সব লাইনের ধারে গোরু চরাতে আসে। কচি কচি অমন ঘাস তো আর কোথাও পাবে না। রামধনিয়াকে দিয়ে গরুগুলো কাল আটক করেছিলাম। বললাম খবরদার, বেটারা ওই একটা গোরু কি বাছুর কোনওদিন যদি লাইনের ওপর কাটা পড়ে তো হাজার টাকা জরিমানা—একেবারে ভিটেমাটি উচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তারা তো কেঁদেই অস্থির। বলে, গাঁয়ে আর কারও বাড়ি এক আঁটি খড় নাই হুজুর, গোরু চরাবার 'বাথান' নাই, ছেড়ে দিলেই পেটের জ্বালায় হাঁ-হাঁ করে, লোকের ফসলে গিয়ে মুখ দেয়, এই লাইনের ধার ছাড়া আমাদের আর উপায় নাই হুজুর। বললাম, আমি যে চরাবার হুকুম তোদের দেব, তাতে আমার লাভ? রামধনিয়া এক সের বলেছিল, কিন্তু এক সের আর হল না, শেষে আধ সের করে খাঁটি দুধ। ঠিক হল যে, ওরা নিজেরাই এসে কাল থেকে পৌঁছে দেবে। বলিয়া একটুখানি থামিয়া সে আবার বলে, 'কেমন ভালো হয়নি?' হাসিয়া একবার ঘাড় নাড়িয়া বীণা নীরবে সে কথার জবাব দেয়। কিন্তু অমন বসিয়া বসিয়া গল্প করিয়া করিয়া খাইতে গেলে তো হরিপদর চলে না।

রামধনিয়া ছুটিয়া একেবারে ঘরে ঢুকিয়া বলে, 'বাবু টেলিগিরাপ'...ব্যস! সেদিনের মতো হরিপদর খাওয়া ওইখানেই শেষ।

হাতে জল ঢালিয়া দিয়া পান আনিয়া যে বীণা তাহার হাতে দিবে তাহারও অবসর নাই।

'পান ওই রামধনিয়ার হাতে দিও।' বলিয়া হন্তদন্ত হইয়া হরিপদ ছুটিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া যায়।

আবার কখন ফিরিবে কে জানে!

বীণা তাহার জানালার কাছটিতে গিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকে। প্যাসেঞ্জার ট্রেন হুশ-হুশ করিয়া স্টেশনে আসিয়া দাঁড়ায়। কোনওটা বা এই দিক দিয়া, কোনওটা বা ওইদিক দিয়া। কিন্তু যেদিক দিয়াই হোক, তাহার এই জানালাটির পাশ দিয়া সকলকেই পার হইতে হয়। এই ট্রেনে চড়িয়াই সেই যে আট বৎসর আগে সে এইখানে আসিয়া নামিয়াছে, তাহার পর আর কোনও দিনই তাহাকে ট্রেনে চড়িতে হয় নাই। ট্রেন দেখিতে তাহার বড়ো ভালো লাগে। জানালার ফাঁকে মুখ বাড়াইয়া ট্রেনের যাত্রীরা তাহারই দিকে তাকাইয়া তাকাইয়া চোখের সুমুখ দিয়া পার হইয়া যায়। বীণার দুটি ব্যথিত ম্লান ব্যগ্র ব্যাকুল চক্ষু পরম ঔৎসুক্যভরে তাহাদের মুখের পানে তাকাইয়া থাকে। কোনওদিন হয়তো বা একটি মুখের চেহারা সে সারাদিন মনে করিয়া রাখে, আবার কোনওদিন বা সব মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া যায়, মনে করিয়া রাখিবার মতো একখানি মুখও তাহার নজরে পড়ে না।

ট্রেন চলিয়া যায়। বীণা দেখে দিগন্তবিস্তৃত শূন্য প্রান্তর, এদিকে ধানের মাঠ, ওদিকে ওই মাঠের মাঝখানে গাছপালায় ঢাকা ছোট্ট একখানি গ্রাম—দূরে—বহু দূরে, মাঠ প্রান্তর পার হইয়া গিয়া অস্পষ্ট বৃক্ষশ্রেণির মাথার উপরে নীল আকাশ যেন ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে। দিনের পর দিন, ঋতুর পর ঋতু ঘুরিয়া আসে, বীণার চোখের সুমুখে তাহার ওই সংকীর্ণ সংকুচিত খণ্ড পৃথিবীটার রং বদলায়।

বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের খর রৌদ্রতাপে দেখে চারিদিক খাঁ খাঁ করিতেছে, মাঠের মাটি ফাটিয়া চৌচির হইয়া গেছে, দূরে শুধু শুষ্ক প্রান্তরের মাঝখানে পত্রহীন কয়েকটি পলাশের গাছে রক্তরাঙা পুষ্পের সমারোহ। বৈকালের দিকে পশ্চিমের আকাশ অন্ধকার করিয়া কালবৈশাখীর কালো মেঘ দেখা যায়, মাঠের ধূলা উড়াইয়া ঘূর্ণিবায়ু ঘুরিয়া-ঘুরিয়া নাচিয়া বেড়ায়, তাহার পর কোনওদিন বা বৃষ্টি নামে, কোনওদিন বা ঠান্ডা বাতাস বহিতে শুরু করে।

দেখিতে দেখিতে বর্ষা নামে। দিবারাত্রি ঝন ঝন করিয়া বৃষ্টি পড়ে। নিদাঘতপ্ত তৃষিত ধরিত্রী যেন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচে। বীণা তাহার সেই ছোট্ট জানালার পাশে তখনও বসিয়া থাকে—দেখে বহু দূর হইতে বৃষ্টির ধারা ঝমঝম করিয়া তাহারই দিকে আগাইয়া আসিতেছে, চোখে মুখে তাহার বৃষ্টির ঝাপটা আসিয়া লাগে, তবু সে কোথাও উঠিয়া যায় না। তাহারও তৃষিত আত্মা যেন অজান্তে বর্ষণ কামনা করে, এদিকের দরজার ফাঁকে ঘনঘন স্টেশনের দিকে তাকায়, স্বামী তাহার কাজ করিতেছে, কখন যে আসিবে তাহার কোনও স্থিরতা নাই। মাঠ-ঘাট সব জলে ভরিয়া যায়, দুপুরে দূরের গ্রাম হইতে জালি কাঁধে লইয়া লাইনের ধারে ডোবায় বাগদীর মেয়েরা মাছ ধরিতে আসে, ধানের মাঠে চাষীদের নিড়ান চলে, সূর্যাস্ত হইতে না হইতেই কড় কড় করিয়া ব্যাঙের ডাক শুরু হয়।

তাহার পর শরতের নির্মল আকাশে চাঁদ ওঠে। জ্যোৎস্নার আলোয় সবুজ ধানের মাঠের উপর দিয়া বাতাস বহিয়া যায়। রোমাঞ্চিত শস্যক্ষেত্রের শিহরণ যেন বীণার দেহে আসিয়া লাগে।

দেখিতে-দেখিতে সবুজ ধানের মাঠ হলুদ হইয়া ওঠে। উত্তর দিক হইতে ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস বয়। বীণা তখনও তাহার সেই ক্ষুদ্র বাতায়ন পার্শ্বের নির্দিষ্ট স্থানটি পরিত্যাগ করে না, গায়ে কাপড় জড়াইয়া দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখে, চাষীরা ধান কাটিতে আরম্ভ করিয়াছে, গরুর গাড়ি বোঝাই করিয়া কাটা ধানের আঁটি লইয়া তাহারা গান গাহিতে গাহিতে গ্রামের দিকে চলিয়াছে।

তাহার পরই বসন্ত। সৃষ্টিছাড়া এই প্রান্তরের মাঝখানে তাহাদের ওই ছোট্ট ঘরখানির ততোধিক ছোট জানালার পথেও বসন্তের হাওয়া অনধিকার প্রবেশ করে। অপরিসর উঠানের এক পাশে বীণা তাহার নিজের হাতে বেলফুলের যে গাছটি পুঁতিয়াছে, তাহারও শুষ্ক শাখায় সাদা সাদা কয়েকটি কুঁড়ি ধরে।

এমনি করিয়া বছর কাটিয়া যায়।

জানালার বাহিরে প্রতিদিনই সেই একই দৃশ্য দেখিয়া দেখিয়া বীণার জীবন যেন এইবার হাঁপাইয়া উঠিয়াছে।

সকালের ট্রেনটা পার করিয়া দিয়া হরিপদ যখন বাসায় আসে, বীণা তখন রান্না করে। তাও সে রান্না করিতে করিতে উঠিয়া একবার স্বামীর কাছে আসিয়া বসে। হাসিয়া বলে, 'হ্যাঁ গা, তুমি বদলির দরখাস্ত করছ, না আমায় মিছে কথা বলে ভুলিয়ে রাখছ?'

হরিপদ তাহার জুতায় কালি ঘষিতে ঘষিতে মুখ তুলিয়া বলে, 'কেন গো, বদলি বদলি করে যে আমায় ক্ষেপিয়ে তুললে দেখছি।'

বীণা রাগ করিতে জানে না। মৃদু হাসিয়া আবার তাহার উনানের কাছে গিয়া দাঁড়ায়। অর্থাৎ আর সে তাহাকে ক্ষেপাইবে না। খানিকক্ষণ সে চুপ করিয়া এটা-সেটা নাড়াচাড়া করিতে-করিতে ভাবে, রেল কোম্পানির মতো নিষ্ঠুর কোম্পানি আর পৃথিবীতে কেহ নাই, স্বামী তাহার খাটিয়া খাটিয়া হয়রান হইয়া উঠিতেছে, ছুটি না থাক, অন্যত্র বদলি না করুক—স্ত্রীর সঙ্গে দুদণ্ড বসিয়া কথা বলিবার অবসরও তো দেওয়া উচিত।

উনানে ভাত চড়াইয়া দিয়া হাত ধুইয়া বীণা আবার ঘরে আসিয়া ঢোকে। বলে, 'কেন আমি কি তোমার জুতো ঘষে দিতে পারি না?'

হরিপদ বলে, 'না, পারবে না কেন? আমিই ঘষছি, তাতে আর হয়েছে কি!'

তাহার পর বেচারা বীণা আর কোনও কথা খুঁজিয়া পায় না, হেঁট মুখে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া একদৃষ্টে স্বামীর জুতা ঘষা দেখিতে থাকে।

সেইদিন দুপুরে বীণা হঠাৎ এক সময় বলিয়া বসে, 'বিকেলের দুটো ট্রেনই নাকি উঠে যাবে শুনছিলাম, কই গেল না তো?'

হরিপদ বলে, 'ট্রেন উঠে গেলে তোমার ভারী দু:খু হয়, না?'

বীণা জিজ্ঞাসা করে, 'কেন?'

হরিপদ বলে, 'জানালার ধারে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তাহলে আর লোক দেখা হয় না।'

বীণা হাসিয়া বলে, 'না, পারলে না বলতে। বিকেলের ট্রেন দুটো উঠে যাওয়াই আমি চাইছি। উঠে গেলে বাঁচি।'

এবার হরিপদ বলে, 'কেন?'

এ 'কেন'র জবাব দিতে গিয়া বীণার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া আসে। লজ্জায় সে তাহার গাল দুটি রাঙা করিয়া ঈষৎ হাসিয়া বলে, 'বারে! ও সময় একা থাকতে আমার কষ্ট হয় না বুঝি! তোমার কি! তুমি তো লোকজনের সঙ্গে...'

বলিয়াই বীণা জানালার কাছে গিয়া পিছন ফিরিয়া দাঁড়ায়। বাহিরে চাহিয়া দেখে, ইাঁদারাটার কাছে রামধনিয়ার পাঁঠী ছাগলটাকে একটা খুঁটির সঙ্গে 'দিকদড়ি' দিয়া বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে। পাছে লাইনে কাটা যায় বলিয়া লছমি তাহাকে এমনি করিয়াই গলায় তাহার একটি লম্বা দড়ি দিয়া রোজ বাঁধিয়া রাখে।

সুদীর্ঘ আট বৎসর পরে তাহাদের একঘেয়ে জীবনে হঠাৎ একদিন এক বৈচিত্র্য দেখা দিলো।

সন্ধ্যার ট্রেনখানা স্টেশনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, হরিপদ তাহার কালো আলপাকার কোট ও মাথায় গোল টুপিটি পরিয়া ট্রেনের যাত্রীদের টিকিট লইবার জন্য একটা আলোর খুঁটির নীচে দাঁড়াইয়া। ট্রেন হইতে লোক নামিল মাত্র দুজন, উঠিল একজন। হঠাৎ কে যেন ট্রেনের হাতল ধরিয়া ডাকিল, 'হরিপদ দাদা!'

পরিচিত কণ্ঠস্বর!

হরিপদ দেখিল, প্ল্যাটফর্মের আলোটা তাহার মুখে গিয়া পড়িয়াছে। চিনিতে দেরি হইল না।—'সুকুমার যে রে? নাম, নাম।—নেবে পড়!'

সুকুমার ছোকরাটি কি যেন বলিতে যাইতেছিল, হরিপদ ততক্ষণে তাহার কাছে আগাইয়া আসিয়া হাত ধরিয়া তাহাকে গাড়ি হইতে নামাইল, সঙ্গে মাত্র একটি সুটকেশ। গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

সুকুমার বলিল, 'তুমি যে এ স্টেশনে আছো সে আমি জানতাম না দাদা, তবে এই লাইনে যে আছ তা জানি। সেই জন্যেই তো প্রত্যেকটি স্টেশনে উঁকি মেরে-মেরে দেখছিলাম—যদি দেখা হয়ে যায়। ভালোই হল, অনেক দিন পরে দেখা হয়ে গেল। তুমি ভালো আছ? বউদি ভালো আছে?'

ঘাড় নাড়িয়া হরিপদ বলিল, 'হ্যাঁ ভালোই আছে! আচ্ছা চল, তোকে বাসাতেই রেখে আসি। বলিয়া সেই জ্যোৎস্নালোকিত সন্ধ্যায় দুজনে তাহাদের সেই ছোট্ট বাসার দরজায় আসিয়া দাঁড়াইল। হরিপদ ডাকিল, 'ওগো, খোলো খোলো, দেখো, কে এসেছে দেখো।'

বীণা তাড়াতাড়ি দরজা খুলিতে আসিয়া দেখে স্বামীর সঙ্গে এক অপরিচিত যুবক। তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিয়া সে সরিয়া যাইতেছিল, হরিপদ বলিল, 'বিয়ের সময় মাত্র একবার দেখেছিলে, চিনতে পারবে না। আমাদের যোগেশমামার ছেলে গো—সুকুমার। এবার চিনলে তো?'

বীণা এইবার তাহার ঘোমটাটি ঈষৎ তুলিয়া দিয়া সুকুমারের মুখের পানে চকিতে একবার তাকাইয়া চোখ নামাইল।

সুকুমার তাড়াতাড়ি কাছে গিয়া মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিয়া বলিল, 'প্রণাম বৌদি, ওরকম লজ্জা যদি করেন তো এই আমি চললাম।'

বীণাকে বাধ্য হইয়া তাহার মুখের পানে আর একবার তাকাইতে হইল।

সুটকেশটা ঘরের ভিতর রাখিয়া হরিপদর সঙ্গে সুকুমার কথা কহিতেছিল। বীণা, তাহার জন্য চা তৈরি করিতে গেল।

সুকুমার বলিল, 'কয়লার কারবার করছি কিনা, তাই একবার মানিকগঞ্জে যাচ্ছিলাম। কাল সকালেই কিন্তু আমায় চলে যেতে হবে হরিপদ দাদা!'

'আচ্ছা সে এখন দেখা যাবে। তুই বোস, তোর বউদির সঙ্গে কথাবার্তা বল, ততক্ষণ আমি আমার কাজটা সেরে আসি।' বলিয়া হরিপদ স্টেশনে চলিয়া গেল।

বউদিদির চা তখনও হয় নাই।

একটা ঘরের মধ্যে একাই বা সে চুপ করিয়া বসিয়া থাকে কেমন করিয়া!

উঠানের পাশেই ছোট্ট রান্নাঘর। সুকুমার উঠিয়া গিয়া রান্নাঘরের চৌকাঠের ওপর চাপিয়া বসিল।

'বউদির ঘরকন্না দেখতে এলাম। বা:! এখনও লজ্জা করছেন বউদি? না বউদি, তাহলে আমি চললাম।'

বীণা এইবার তাহার মাথার ঘোমটা সম্পূর্ণ খুলিয়া দিয়া তাহার সে সুন্দর মুখখানি অনাবৃত করিয়া হাসিয়া বলিল, 'কেন, যাবে কেন ঠাকুরপো? বিয়ে করেছ নাকি?'

সুকুমার হাসিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল,'না বউদি, বিয়ে আর হল না। হলে আপনাকে নেমন্তন্ন করব। যাবেন তো?'

বীণা বলিল, 'কেন যাব না?'

চা তৈরি করিয়া চায়ের বাটিটি বীণা সুকুমারের হাতের কাছে আগাইয়া দিয়া বলিল, 'ভালো চা হয়তো হল না ঠাকুরপো; তা কি আর করবে বলো, ওই খেতে হবে।'

চায়ে চুমুক দিয়া সুকুমার বলিল, 'বউদির হাতের তৈরি চা, এ-ই আমার অমৃত। এর চেয়ে ভালো চা জোটে না বউদি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।'

আলাপ জমিয়া উঠিতে দেরি হইল না। বীণা আজ বহুদিন পরে কথা কহিয়া বাঁচিয়াছে। কথা যেন তাহাদের আর ফুরাইতে চায় না।

'রাত্রে তুমি কি খাও ঠাকুরপো? লুচি করে দিই খানকতক কি বলো?'

'দোহাই বউদি, রাত্রে লুচি আমি কোনওদিনই খাই না, আমি ভাত খাবো'।

বীণা বলে, 'ভালো তরি-তরকারির ব্যবস্থা কিছু নেই ঠাকুরপো, ভাত খেতে তোমার কষ্ট হবে। এমন হতচ্ছাড়া জায়গা—কিছু মেলে না। '

সুকুমার বলে, 'এবার আমি রাগ করব বউদি, এ কী আরম্ভ করলেন আপনি? অত লৌকিকতা আমার ভালো লাগে না।'

বউদিদি বলে, 'লৌকিকতা নয় ভাই, তুমি কি আর রোজ আসছো। পথ ভুলে হঠাৎ এসে পড়েছ, আর হয়তো এ বউদিদির কথা তোমার মনেই থাকবে না।—'

সুকুমার বলে, 'থাক। ভুলে যাবার মতো বউদিদি আপনি নন। আপনাকে একবার যে দেখে সে বোধহয় জীবনে আর ভোলে না।'

এ কথার জবাব সে আর খুঁজে পায় না, চোখ তুলিয়া সুকুমারের মুখের পানে একবার তাকাইয়াই মুখ নামাইয়া সেও ঈষৎ হাসিয়া বলে, 'থাক।'

তাহার পর দুজনেই চুপ।

সুকুমারের চা খাওয়া শেষ হইয়াছিল। বাটিটি হাত হইতে নামাইয়া দিয়া বলিল, 'আপনি এবার রান্না করবেন? আমি এইখানে বসে থাকলে আপনার লজ্জা করবে না তো?'

বীণা ঘাড় নাড়িয়া বলিল, 'না।'

বলিয়া সে চৌকাঠের কাছেই একটি আসন পাতিয়া দিয়া বলিল, 'ভালো করে এখানে চেপে বোসো ঠাকুরপো, তোমার কষ্ট হচ্ছে।'

সুকুমার ভালো করিয়াই চাপিয়া বসিল।

পরদিন সকালেই সুকুমারের চলিয়া যাইবার কথা, বীণা বলিল, 'পাগল হয়েছ ঠাকুরপো, আজ কি তোমায় ভালো করে না খাইয়ে ছেড়ে দিতে পারি কখনও! যেতে হয়, কাল যেও।'

এ অনুরোধ এড়ানো শক্ত। বাধ্য হইয়া সেদিন তাহাকে থাকিতে হইল।

বীণা তাহার স্বামীকে রাত্রেই বলিয়াছিল, সকালে হরিপদ কোথা হইতে একটা মাছ সংগ্রহ করিয়া রামধনিয়াকে দিয়া পাঠাইয়া দিয়াছে।

সুকুমার বলিল, 'দাদাকে দেখছি স্টেশনের সব কাজই করতে হয়, বাড়ি এসে দু-দণ্ড বিশ্রাম করবে, তারও ফুরসত মেলে না—, না বউদি? একা একা দিন আপনার কাটে কেমন করে বলুন তো?'

বাহিরে মাছটা পড়িয়া আছে, তাড়াতাড়ি সেটাকে কুটিবার ব্যবস্থা না করিলে এখনই হয়তো কাকে মুখ দিবে, তাই সে সলজ্জ একটুখানি হাসিয়া একরকম ছুটিয়াই বাহিরে চলিয়া গেল। মুখে কিছুই বলিতে পারিল না।

ব্যাপারটা যে সুকুমার বুঝিল না তাহা নয়, কথাটা বলা হয়তো তাহার উচিত হয় নাই, তাই সে কিয়ৎক্ষণ জানালার বাহিরে একদৃষ্টে তাকাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

কিন্তু তাহার নীরবতাও বীণার ভালো লাগিল না। মাছ কোটা শেষ করিয়া হঠাৎ এক সময়ে ঘরে ঢুকিয়া বলিল, 'অমন চুপ করে বসে রইলে যে ঠাকুরপো?'

হাসিয়া সুকুমার বলিল, 'ঝগড়া করব আপনার সঙ্গে?'

বীণাও হাসিল। বলিল, 'করো না। পারবে?'

বলিয়াই সে আর জবাবের অপেক্ষা না করিয়াই রান্নাঘরে গিয়া ঢুকিল।

আহারাদির পর খানিকটা বিশ্রাম করিয়া সুকুমার বলিল, 'যাই একটু স্টেশনে বেড়িয়ে আসি।'

বীণা বলিল, 'এস। খাঁচার ভেতর কাল থেকে বাস করে জীবন বোধহয় তোমার হাঁপিয়ে উঠেছে।'

সুকুমার তাহার বউদির দিকে তাকাইয়া মৃদু একটুখানি হাসিল মাত্র।

বীণা জিজ্ঞাসা করিল, 'হাসলে যে?'

সুকুমার বলিল, 'আমার যদি এই একদিনেই হাঁপিয়ে ওঠে, আপনার তাহলে আট বছরে কি হওয়া উচিত?'

তাচ্ছিল্যভরে বীণা বলিল, 'আমার কথা ছেড়ে দাও ভাই, আমি মেয়েমানুষ, আমাদের উপায় কি। 'বলিয়াই ম্লান একটুখানি হাসিয়া বলিল,—বেশি দেরি করো না, আমি চা তৈরি করে রাখব।'

দেরি অবশ্য বেশি সে করে নাই, ফিরিয়া যখন আসিল তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। দরজার কড়া নাড়িবামাত্র হ্যারিকেন লণ্ঠন হাতে লইয়া বীণা আসিয়া দরজা খুলিয়া দিল।

দেখা গেল, বীণা বেশ করিয়া গা ধুইয়া ভালো করিয়া চুল বাঁধিয়াছে, ভালো একখানি শাড়ি পরিয়াছে, জামা গায়ে দিয়াছে, পায়ে লাল টকটকে আলতা, হাতে কয়েক গাছা সোনার চুড়ি, জামা কাপড় হইতে ভুরভুর করিয়া সস্তা একটা এসেন্সের উগ্র গন্ধ বাহির হইতেছে।

কিন্তু মানাইয়াছে চমৎকার। হঠাৎ দেখিলে দু-দণ্ড তাকাইয়া থাকিতে হয়। সুকুমার বলিয়া উঠিল, 'বা:! এ যে তোমায় দেখছি আর চিনতে পারা যাচ্ছে না বৌদি!'

সলজ্জ একটু হাসিয়া বীণা বলিল, 'কেন? অপরাধ?'

সুকুমার বলিল, 'অপরাধ নয়, বউদি, ছাইচাপা আগুনের যেমন ছাই উড়ে গেলে আগুন বেরিয়ে পড়ে, তোমারও দেখছি আজ তাই হয়েছে। কাল থেকে দেখছিলাম চুলগুলো উষ্কোখুষ্কো, ময়লা একখানা কাপড়, পায়ে আলতা ছিল না—সত্যি বউদি, আজ আপনাকে একেবারে নতুন মানুষ বলে বোধ হচ্ছে।'

বীণা বলিল, 'তোমারও যে দেখছি মাথা খারাপ হল ঠাকুরপো, আমার রূপ নিয়ে কবিত্ব করতে গিয়ে 'আপনি' 'তুমি'তে যে গুলিয়ে ফেললে।'

সুকুমার বলিল, 'তা হোক বউদি, আপনাকে 'আপনি' না হয় নাই বললাম, কিন্তু সত্যি বলছি বউদি, তোমায় আজ ভারী ভালো দেখাচ্ছে। দেখ তো, পায়ে আলতা না পরলে মেয়েদের কখনও মানায়! আজ তোমার ও পায়ের ওপর প্রণাম করতেও সুখ!'

বীণা হঠাৎ হাসিয়া উঠিল—

'বা:, হাসছ যে বউদি? আমি কি মিছে বললাম?'

'না, সে জন্য হাসিনি, তুমি আলতার কথা বললে, তাই হঠাৎ হেসে ফেললাম। বাক্স খুলে দেখি—আলতা নেই। সে যে আজ ক-বছর ধরে নেই কে জানে! তখন কি করলাম জান? ওই দেখো।' বসিয়া বীণা আঙুল বাড়াইয়া মেঝের উপর যে জিনিসগুলি দেখাইয়া দিল সুকুমার সেগুলি চিনিতে পারিল না। বলিল, 'কি ওগুলো?'

বীণা বুঝাইয়া বলিল, 'আমাদের ওই ইঁদারার পাশে কতকগুলো ফণী-মনসার গাছ আছে দেখেছ? ওই গাছের ওগুলো ফুল কি ফল জানিনে ভাই, ছোটোবেলায় আমরা ওই দিয়ে আলতা পরতাম। আজও হঠাৎ আলতা পরার সখ হতেই লছমিকে ডেকে ছুরি দিয়ে ওইগুলো কেটে আনালাম। ভারী বিশ্রী কাঁটা, হাতে একবার ফুটলে আর সহজে বেরোতে চায় না, তাই খুব সাবধানে বেছে বেছে ওইগুলো টিপে টিপে লাল লাল রস নিংড়ে আলতা যখন আমি পরছিলাম তখন তুমি দরজায় কড়া নাড়লে। অতি কষ্টে হাসি চেপে তোমায় আমি দরজা খুলে দিলাম—দাঁড়াও, ওগুলো ফেলে দিই।'

বলিয়া সেই ফণী-মনসার ফলগুলো মেঝে হইতে কুড়াইয়া লইয়া বীণা হাসিতে হাসিতে জানালা গলাইয়া বাহিরে ফেলিয়া দিতে লাগিল।

সুকুমার বলিল, 'এতেই এমনি, তা না জানি সত্যিকারের আলতা পরলে...'

হাত নাড়িয়া বীণা বলিল, 'হয়েছে।' বলিয়াই একবার হাসিল।

বলিল, 'না:, এত প্রশংসা যখন করলে, তখন তোমায় এক পেয়ালা চা আমায় দেখছি এনে দিতেই হল। উনোন আমার ধরে গেছে, বেশি দেরি হবে না, বোসো।'

বলিয়া বীণা চা তৈরি করিতে গেল।

রান্নার কাছেই সুকুমার সেইখানে বসিয়া বসিয়াই বলিল, 'প্রশংসা নয় বউদি, সাজলে তোমায় সত্যি বড় সুন্দর দেখায়।'

রান্নাঘর হইতে জবাব আসিল, 'কিন্তু তাতে তো কিছু লাভ হবে না ঠাকুরপো, তুমি এবার খুব সুন্দরী একটি মেয়ে দেখে বিয়ে করো। মেয়ে দেখবার ভারটা না হয় আমার হাতেই দিও।'

লজ্জায় সুকুমার চুপ করিয়া বসিয়া-বসিয়া মুচকি-মুচকি হাসিতে লাগিল।

সেইদিন রাত্রেই সুকুমারকে মানিকগঞ্জে যাইতে হইবে। না গেলে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা।

সুকুমার বলিল, 'তোমায় ছেড়ে যেতে আমার ইচ্ছে হয় না বউদি। সে-কথা না বললেও বুঝতে নিশ্চয়ই পেরেছ। আচ্ছা—ফেরবার পথে যদি পারি তো না হয় আর একবার...'

'এসো' কথাটা বীণার মুখ দিয়া আর বাহির হইল না। সুকুমার যে এত শীঘ্র হঠাৎ আবার চলিয়া যাইবে তাহা সে একরকম ভুলিয়া গিয়াছিল।

হরিপদ ইহারই মধ্যে দরজার কাছে গিয়া দাঁড়াইয়াছে। হাঁকিয়া বলিল, 'তুই তবে আয় সুকুমার, আমার আর দাঁড়াবার অবসর নেই।'

'যাই'। বলিয়া সুটকেশটা তুলিয়া লইয়া হরিপদর পিছুপিছু সুকুমারও বাহির হইয়া গেল।

বীণার বাড়ির পাশ দিয়া যে গাড়ি পারই হইয়া যায় এ দুদিন বীণা সে-কথা ভুলিয়াই ছিল, আজ এই অতিথিটি চলিয়া যাইবামাত্র দৃষ্টি তাহার আবার সেইদিকে নিবদ্ধ হইয়াই রহিল।

মানিকগঞ্জ যাইবার গাড়ি পার হইল প্রায় একঘণ্টা পরে। গাড়ির আরোহীদের মধ্যে ছিল সুকুমার জানালার পথে তাকাইয়া, আর সেই ক্ষুদ্র গৃহের বাতায়ন পার্শ্বে বীণা ছিল তাহার ব্যগ্র ব্যাকুল দৃষ্টি প্রকাশিত করিয়া, আকাশে ছিল অজস্র জ্যোৎস্না, গাড়িতে ছিল আলো, অথচ কেহ কাহাকেও দেখিতে পাইল না, বীণার অস্থির চঞ্চল দুটি চক্ষু-তারকার সম্মুখ দিয়া সশব্দে ট্রেনখানা পার হইয়া গেল।

শূন্য গৃহ আবার তেমনি খাঁ-খাঁ করিতে লাগিল।

আবার সেই একঘেয়ে একটানা জীবন!

দু-তিনদিন পরে আবার সুকুমারের ফিরিবার কথা।

বীণা জানালার কাছে বসিয়া বসিয়া ট্রেন দেখে আর ভাবে, আর দিন গুণে।

জানালার বাহিরে ধরিত্রীর যে ভগ্নাংশটুকু তাহার চোখের সম্মুখে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে প্রতিভাত হইয়া আছে, চোখ বুজিলেই যে দৃশ্য তাহার মানসচক্ষে হুবহু ছবির মতো ভাসিয়া ওঠে, সেটুকু দেখিয়া দেখিয়া এখন তাহার এমন হইয়াছে যে, সে না দেখিয়াও বলিয়া দিতে পারে—লাইনের ধারে একটি হেলানো পলাশগাছের নিচে একটি উই-এর ঢিপি, পাশেই ছোট্ট একটি ডোবায় বারোমাস জল জমিয়া থাকে, তাহারই এক কোণে একটি রক্ত-সাপলার ঝাড়, লাল রঙের দুইটি-শালুক সেখানে রোজই ফুটিয়া থাকিতে দেখে, ঝোপের ভিতর একটি ডাহুক দম্পতি বোধকরি তাহাদের বাসা বাঁধিয়াছে। দিনেরবেলায় তাহারা কোথায় থাকে কে জানে, সন্ধ্যা হইলেই ডাহুক দুইটি তাহাদের সন্তানসন্ততি লইয়া ওই সাপলা ঝোঁপে আসিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। বীণা জানে, সুমুখে বীণার মাঠের তিনটা মাঠ বাদ দিয়া চতুর্থ মাঠের আলটা বাঁধা। দূরে একটা পুকুরের পাড়ে দিনের সূর্য সেইখানে গিয়া পৌঁছিলেই তাহার রঙ হয় লাল—বীণা তখন বুঝিতে পারে, সূর্যাস্ত হইতে আর দেরি নাই।

কিন্তু আজকাল আর ও-সবের দিকে তাহার নজর যেন কম, আজকাল সে দেখে শুধু মানিকগঞ্জ হইতে আসিবার ট্রেন। ট্রেনের জানালার পথে আরোহীদের মধ্যে সুকুমারের অনুসন্ধান করে। নিরাশ হইয়া শেষে চুপ করিয়া বসে। বহুদূর হইতে শব্দ শুনিয়া সে ঠিক বলিয়া দিতে পারে—মালগাড়ি কি প্যাসেঞ্জার।

দুদিন যায়, তিনদিন যায়, চার দিনের দিন—তখনও সে আশা ছাড়ে না, মনে হয় সুকুমার আসিবে।

কিন্তু দিনের পর দিন পার হইয়া শেষ সপ্তাহ পার হইয়া গেল। সুকুমার আসিল না।

বীণা ভাবে, বিবাহ না করুক, ছেলেটি বেশ ভালো ছেলে, কয়লার কারবার করিয়া বেশ দু-পয়সা রোজগার করে। যে মেয়ের সঙ্গে তাহার বিবাহ হইবে সে হয়তো তপস্যা করিতেছে। নিজের রোজগার ছাড়িয়া দিয়া এখানে তাহার এমনই বা কি আকর্ষণ যে, বসিয়া বসিয়া দুদিন গল্প করিয়া যাইবে। আসিতে সে পারে না, আর কেনই বা আসিবে, আর সেই বা নিতান্ত স্বার্থপরের মতো তাহার আসিবার কথাই বা ভাবে কেন?

হরিপদর জামাটা বড় ময়লা হইয়াছিল, বীণাকে সেদিন সে ডাকিয়া বলিল, 'জামাটায় আজ একটু সাবান দিয়ে দিয়ো তো।'

সাবান দিবার জন্য জামাটা সে উঠানে লইয়া যাইতেছিল, পকেটে কিছু আছে কিনা দেখিবার জন্য একটা হাত ঢুকাইতেই ভারীমতো কি একটা বস্তু তাহার হাতে ঠেকিল,—'এটা কি গো?'

জিনিসটা বাহির করিয়া বীণা দেখিল—লাল কাগজের বাক্সয় মোড়া তরল আলতার শিশি। জিজ্ঞাসা করিল, 'হ্যাঁ গা, তুমি পেলে কোথায়?'

আহারাদির পর হরিপদ একবার গড়াইয়া লইতেছিল, বলিল, 'দেখলে, কিরকম মনের ভুল! আজ চার দিন ধরে তোমায় বলব বলব করেও ভুলে গেছি। সুকুমার সেদিন রাত্রের ট্রেনে মানিকগঞ্জ থেকে বাড়ি ফিরছিল, গাড়ি থেকে আমায় ডেকে সেদিন তোমার জন্য ওই আলতার শিশিটি দিয়ে গেছে। এত করে বললাম তা কিছুতেই নামল না, বললে, বড় জরুরি কাজ আছে দাদা, আজ আসি।'

অনেকক্ষণ ধরিয়া আলতার শিশিটি বীণা নাড়াচাড়া করিয়া দেখিতে লাগিল। খুলিয়া দেখিল, চমৎকার আলতা! রক্তের মতো লাল!

*

তাহার পর দেড় বৎসর পার হইয়াছে। সুকুমার আর আসে নাই। হরিপদর আরও চার টাকা মাহিনা বাড়িয়াছে।

তখন বসন্তকাল। পলাশের ঝোপে, লাইনের ধারে, যেখানে সেখানে যখন তখন কোকিল ডাকিতে শুরু করিয়াছে। এমনি দিনে হরিপদর বদলির দরখাস্ত মঞ্জুর হইয়া আসিল।

বদলি হইয়াছে প্রকাণ্ড এক জংশন স্টেশনে। সেখান হইতে বেশি দূরে নয়। বীণার মামার বাড়ির কাছেই।

কিন্তু হইলে কি হয়, বীণার যেন এখন আর সে উৎসাহ নেই। গত তিন-চার মাস তাহাকে ম্যালেরিয়ায় ধরিয়াছে। অত রূপ তাহার এই অল্পদিনের মধ্যেই কেমন যেন ম্লান হইয়া গেছে।

বাসার জিনিসপত্র রামধনিয়া বাঁধা-ছাদা করিয়া দিল। লছমি আসিয়া চোখে কাপড় দিয়া কাঁদিতে লাগল। যে স্থান পরিত্যাগ করিবার জন্য বীণা একদিন পাগল হইয়া উঠিয়াছিল, আজ এই সুদীর্ঘ নয় বৎসরের পর সে বাড়ি ছাড়িয়া যাইতে বীণার চোখে জল আসিল।

জংশন স্টেশনের চমৎকার কোয়ার্টার। বাড়িগুলাও বড়, উঠানে জলের কল, স্নান করিবার ঘর, চৌবাচ্চা, ইলেকট্রিকের আলো। চারিদিকে লোকজন, গাড়ি, ঘোড়া, সাহেব-মেম—পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছোটোখাটো শহরের মতো জায়গা। লাল ফুলে ভরা প্রকাণ্ড একটি কৃষ্ণচূড়ার গাছ দরজার সুমুখে একেবারে তাহাদের উঠানের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে।

হরিপদ হাসিয়া বলে, 'কেমন? হয়েছে তো এবার?'

বীণাও ম্লান একটুখানি হাসে। ঘাড় নাড়িয়া বলে, 'হ্যাঁ।'

হরিপদ বলে, 'ভালোই হল। এখানে এসে শরীরটা তোমার সারবে এবার। রেলের একজন খুব বড়ো ডাক্তার আছে, কালই একবার ডেকে দেখাবো ভাবছি।'

বীণা বলে, 'না গো না, আর ডাক্তার দেখাতে হবে না। এমনিই সেরে যাবে।' কিন্তু সারে না। স্নান করিতে গেলেই গায়ে জল ঠেকিবামাত্র শরীরটা তাহার কেমন যেন শির শির করিয়া ওঠে, স্পষ্ট জ্বরও হয় না, অথচ ভিতরে-ভিতরে দিন দিন দুর্বল হইয়া যায়, তাহাতেই কোনোরকমে নিজের হাতেই সংসারের কাজকর্ম করে, স্নানও করে, রান্না করে, ভাতও খায়—অথচ মুখ ফুটিয়া স্বামীকে কোনওদিন কোনও কথাই বলে না।

বলে না তো বলে না, হরিপদও নিজের কাজকর্ম লইয়া ব্যস্ত থাকে, ডাক্তার আনিবার কথা সে ভুলিয়া গেছে।

এখানে আসিয়া অবধি হরিপদর প্রায়ই রাত্রে 'ডিউটি' পড়ে, দিনের বেলা পড়িয়া পড়িয়া ঘুমায়।

সেদিন সে অমনি ঘুমাইতেছে, রান্না সারিয়া হরিপদকে স্নান করিবার জন্য উঠাইতে গিয়া বীণা থরথর করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে সেইখানেই বসিয়া পড়িল।

বলিল, 'ওগো আমার জ্বর এল।'

লেপের পর লেপ চাপা দিয়া জড়াইয়া ধরিয়াও হরিপদ বীণার কাঁপুনি আর থামাইতে পারে না।

শীতে কাঁপিতে-কাঁপিতে লেপের তলা হইতে বীণা বলিল, 'ওগো, তুমি রাত জেগেছ, যাও স্নান কর গে, করে নিজেই চারটি হেঁসেল থেকে—কি আর করবে লক্ষ্মীটি...'

বলিয়া লেপের তলায় হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া হরিপদর হাতখানা বীণা তাহার আগুনের মতো গরম হাত দিয়া ধরিতে গিয়া কাঁদিয়া ফেলিল।

সে কান্না হরিপদ দেখিতে পাইল না।

'দাঁড়াও, আজই ডাক্তার আনছি।' বলিয়া সে স্নান করিবার জন্য উঠিয়া গেল।

নিজেই ভাত বাড়িয়া খাইয়া হরিপদ ফিরিয়া আসিতেই বীণা জিজ্ঞাসা করিল, 'খেলে? ভালো করে খেয়েছ তো? কাঁসার সেই বড়ো বাটিতে মাছের ঝোল ছিল, আর কলাই-করা সেই সাদা রঙের—'

কথাটা হরিপদ তাহাকে আর শেষ করিতে দিলো না, বলিল, 'হ্যাঁ গো হ্যাঁ, সবই খেয়েছি। তুমি একটুখানি চুপ করে ঘুমোও দেখি। আমি ডাক্তার ডেকে আনি।'

বীণা তাহার মুখের ঢাকা খুলিয়া বলিল, 'না, তুমি যেও না। ডাক্তার ডাকতে হয়—এরপর ডেকো।'

এই বলিয়া সে একদৃষ্টে তাহার স্বামীর মুখের পানে কিয়ৎক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া বলিল, 'আমায় এক গ্লাস জল দিয়ে তুমি ঘুমোও। তোমায় আবার রাত জাগতে হবে।'

বীণাকে জল খাওয়াইয়া হরিপদ সত্যই ঘুমাইল।

বৈকালে ঘুম ভাঙিতেই দেখে, বীণা বসিয়া বসিয়া একটা ঝাঁটা লইয়া ঘর ঝাঁট দিতেছে। হরিপদ ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল, 'ও কি! ও কি হচ্ছে?'

বীণা হাসিয়া বলিল, 'জ্বর আমার অনেকক্ষণ সেরে গেছে।'

হরিপদ বিশ্বাস করিল না। বলিল, 'পাগল হলে না কি?'

বীণা তাহার কাছে উঠিয়া আসিয়া বলিল, 'বিশ্বাস না হয়, দেখ গায়ে হাত দিয়ে।'

হরিপদ তাহার গায়ে হাত দিয়া দেখিল, সত্যই তাই। জ্বর তাহার ছাড়িয়া গেছে।

বীণা বলিল, 'বড় খিদে পেয়েছে। কি খাই বলো দেখি?'

হরিপদ উঠিয়া দাঁড়াইল। জামা গায়ে দিয়া বলিল—'দাঁড়াও, আগে ডাক্তারবাবুকে একবার ডাকি।'

বলিয়া সে তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেল।

ডাক্তার বলিয়া গেলেন, 'ম্যালেরিয়া পুরোনো জ্বর, ও-অমনি আসে আর যায়।

খেতে দিন, কিন্তু একবার চেঞ্জে পাঠাতে পারলে ভালো হয়।'

হরিপদ খানিক ভাবিয়া বলিল, 'চেঞ্জে? পাড়াগাঁয়ে পাঠালে চলে?'

ঘাড় নাড়িয়া ডাক্তারবাবু বলিলেন, 'চলে।'

বলিয়া তিনি ঔষধের প্রেসক্রিপশন লিখিয়া দিলেন।

ঔষধ চলিতে লাগিল।

জ্বর অমনি আসে আর যায়। হরিপদ বুঝাইয়া বলে, 'দেখ, আমি কিছুদিন না হয় হোটেলেই খাই, আমার কোনও কষ্ট হবে না। তুমি যাও দিন কতক মামিমার কাছেই থেকে এসো গো, কেমন?'

বীণা বলে, 'না গো না আমার কিচ্ছু হবে না, আমি বেশ আছি।'

হরিপদ রাগ করিয়া বলে, 'তোমার সঙ্গে কে পারবে বলো! বেশ তবে, এমনি করে জ্বর আসুক আর অনাচার অত্যাচার করো, তারপর একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থাকবে, এখন হোটেলে খেতে দিচ্ছ না, তখন আমায় নিজে রেঁধে খেতে হবে।'

বীণা হাসিয়া বলে, 'মরি, মরি, নিজে রেঁধে খাবার লোকটি কেমন! তখন তুমি আর একটা বিয়ে করবে।'

হরিপদ আর জবাব দেয় না। রাগ করিয়া নীরবে বসিয়া থাকে।

বীণা তাহার রাগ ভাঙাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠে। বলে, 'না গো না, রাগ করলে? না না, বিয়ে তুমি করবে না তা আমি জানি। তোমার বিয়ে করবার সময় কোথায়?'

এমনি করিয়া রাগ-অভিমানের পালা চলিতে চলিতে বীণাকে একদিন রাজি হইতে হইল। বলিল, 'আচ্ছা তবে তাই, আমায় দিয়েই এসো বাপু, শরীরটা না হয় সারিয়েই আসি। কিন্তু—'

'কিন্তু কি?'

বীণা বলিল, 'আমার গা ছুঁয়ে দিব্যি করে বলো—ওগো না ছি! হোটেলে আবার মানুষে খায়! তার চেয়ে এক কাজ করো, এখানে একটা রাঁধুনি বামুন পাওয়া যায় না?'

হরিপদ বলিল, 'আচ্ছা তাই না হয় একটা বামুন-টামুন দেখে বাড়িতে রান্না করিয়েই খাব।'

বীণা বলিল, 'খাব নয়। তোমায় আমি খুব ভালো করে চিনি। পকেটে আলতার শিশি রেখে যে চার দিন ভুলে যায়...বামুন তুমি একটা নিয়ে এসো ডেকে। তাকে আমি দেখিয়ে শুনিয়ে দিই, দুদিন রান্না করুক, আমি দেখি—তারপর...'

ব্রাহ্মণ এক ছোকরাকে পাওয়া গেল। নাম যতীন। সেখান হইতে ক্রোশখানেক দূরের একটা গ্রামে তাহার বাড়ি। রাঁধে ভালো। কাজকর্মও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

বীণা তাহাকে অনেক করিয়া বুঝাইয়া বলিল। তাহার পর স্বামীকে তাহার গায়ে মাথায় হাত দিয়া ঠিক সময়ে স্নানাহার করিবার শপথ করাইয়া জানাইল যে, সে যাইতেছে বটে কিন্তু মোটেই সেখানে বেশি দিন থাকিতে পারিবে না, চিঠি লিখিবামাত্র সে যেন তৎক্ষণাৎ নিজে গিয়া তাহাকে লইয়া আসে।

বলিল, 'বাক্স আমি নিয়ে যাব না। দু-চারখানা কাপড়জামা তোমার ওই টিনের হাতবাক্সটাতে যা ধরে তাই নিয়েই আমি চললাম। তারপর দরকার হয়—মামিমা দেবেন, সেজন্য ভেব না।'

দিন কয়েক পরে একটি দিনের মাত্র ছুটি লইয়া হরিপদ তাহাকে তাহার মামিমার কাছে রাখিয়া আসিল।

বাপের বাড়ি কাছেই, কিন্তু সেখানে তাহার মা-ও নাই, বাবাও নাই, মামার বাড়িতেই ছেলেবেলা হইতে মানুষ, তাই তাহাকে তাহার মামিমার কাছে রাখিয়া আসা ছাড়া আর উপায় কি।

বীণার চিঠি আসে—সে বেশ ভালোই আছে। জ্বর এক আধটু মাঝে মাঝে আসে বটে, কিন্তু সে কিছুই নয়, আসে আর যায়।

চিঠি পড়িয়া হরিপদ খুশি নয়। আহা, এতদিনের সাধ তাহার—বদলি হইয়া যদিই বা সে জংশন স্টেশনে আসিল, আসিয়া অবধি একটি দিনের জন্যও সে সুখে বাস করিতে পায় নাই, এইবার সে সরিয়া আসিয়া আবার এই আগের মতোই হাসিয়া খেলিয়া কাজ করিয়া বেড়াইবে।

কিন্তু দুনিয়ার বিধাতা বুঝি হরিপদর চেয়েও নিষ্ঠুর। তাহারই মতো অন্ধ!

এক মাস পার হইতে না হইতেই বীণার মামিমার কাছ হইতে এক চিঠি আসিল : 'বীণার যেমন জ্বর হইত তেমনি জ্বর আসিতেছে, দিন চার পাঁচ আগে জ্বরটা একটু বেশি করিয়াই আসিয়াছে, এখনও বন্ধ হয় নাই, কাল রাত্রে একটু বিকারের মতো হইয়াছিল, ভুল বকিতে বকিতে হঠাৎ বাকরুদ্ধ হইয়া গেছে, জ্ঞান রহিয়াছে কিন্তু কথা কহিতে পারিতেছে না। তুমি বাবা একবার আমার এই চিঠি পাইবামাত্র আসিও।'

চিঠিখানি পাইবামাত্র হরিপদর মাথা ঘুরিয়া গেল। তৎক্ষণাৎ স্টেশন মাস্টারের কাছে গিয়া ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞাসা করিয়া এক শিশি ঔষধ লইয়া হরিপদ ট্রেনে চড়িয়া বসিল।

গ্রামে ঢুকিতে বুকখানা তাহার অজানা আতঙ্কে দুর দুর করিতেছিল, তবু সে গ্রামে ঢুকিল। লোকজনের মুখের পানে তাকাইতে তাহার ভরসা হইল না। কোনোরকমে মুখ নীচু করিয়া মামিমার ঘরের দরজার কাছে গিয়া দাঁড়াইতেই দেখা গেল মামিমা নিজেই দরজার কাছে দাঁড়াইয়া আছেন। হরিপদকে দেখিবামাত্র তাহার একখানা হাত চাপিয়া ধরিয়া তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন। হরিপদ তাহার মুখের পানে তাকাইয়া থর-থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল। অতি কষ্টে মামিমা বলিলেন, 'হয়ে গেছে বাবা, বীণি চলে গেছে।' আর কিছু তিনি বলিতে পারিলেন না। বলিবার প্রয়োজনও ছিল না। হরিপদ তখন মাটিতে বসিয়া পড়িয়াছে। চোখ দিয়া দরদর করিয়া জল গড়াইতেছে, ঠোঁট দুইটা থরথর করিয়া কাঁপিতেছে।

এমন অকস্মাৎ সে যে চলিয়া যাইবে কে জানে!

মামিমা কাঁদিতে-কাঁদিতে তাহাকে হাতে ধরিয়া উঠাইলেন। বীণার ঔষধের শিশিটা সেইখানেই কাত হইয়া পড়িয়া রহিল।

দেখা গেল, শবদাহের জন্য গ্রামের লোকজন আসিয়া উঠোনে জড়ো হইয়াছে। সুমুখে ঘরের মেঝের উপর বীণার মৃতদেহ আপাদ-মস্তক সাদা চাদর দিয়া ঢাকা।

চাদরখানা সরাইয়া দিয়া উন্মাদের মতো হরিপদ তাহার মৃতদেহের উপর পড়িয়া পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল।

মামিমা কাঁদিতে-কাঁদিতে বলিলেন, 'যাবার সময় কিছু বলে গেল না বাবা, শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।'

কথাটা শুনিয়া হরিপদর কান্না যেন আরও বাড়িয়া গেল। বীণার সেই অর্ধমুদ্রিত ঘোলাটে দুইটি চক্ষুর পানে তাকাইতে গিয়াও সে আর তাকাইতে পারিল না। বুকের ভিতরটা তাহার মোচড় খাইয়া হু-হু করিয়া উঠিতেই সে মামিমার পদপ্রান্তে লুটাইয়া পড়িয়া বলিতে লাগিল, 'আসতে সে চায়নি মামিমা, আমি ওকে জোর করে পাঠিয়েছিলাম।'

নদীতীরের শ্মশানে বীণার মৃতদেহ দেখিতে-দেখিতে চোখের সুমুখে পুড়িয়া ছাই হইয়া গেল।

হরিপদকে মামিমা বারবার করিয়া শ্মশান হইতে বাড়ি ফিরিতে বলিয়াছিলেন, শবযাত্রীরাও বারে বারে তাহাকে গ্রামে ফিরিবার জন্য অনুরোধ করিতে লাগিল, কিন্তু হরিপদ কাহারও কথা শুনিল না। অবস্থা তখন তাহার ঠিক পাগলের মতো। বীণার হাতের আটগাছি সোনার চুড়ি ও কানের দুলটি লইয়া ভিজা কাপড় পরিয়া ভিজা জামাটা কাঁধে ফেলিয়া নদীতীরের পথের উপর দিয়া হরিপদ চলিয়া গেল। পুরোহিত তাহার পিছনে-পিছনে কিছুদূর ছুটিয়া আসিয়া কাঁচা মাটির একটা ঢেলার মধ্যে খানিকটা চিতাভস্ম ও বীণার অস্থি কয়টি তাহার হাতে দিয়া বলিল, 'পারো তো এইটি গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ো বুঝলে? দিতে হয়।'

মাটির ঢেলাটি হরিপদ হাত বাড়াইয়া গ্রহণ করিল।

ট্রেনে চড়িয়া হরিপদ যখন তাহার নির্দিষ্ট স্টেশনে নামিয়া বাসার দিকে চলিতে লাগিল, তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। রেল লাইনের ওপর দিয়া প্রকাণ্ড একটা সেতু পার হইতে হয়। তাহার উপর দিয়া হরিপদ ধীরে-ধীরে চলিতেছিল। কিছুদিন পূর্বে এই স্টেশনে কয়েকবার মালগাড়ি হইতে প্রচুর জিনিসপত্র চুরি যায়, তাই এখন এখানে বহুদূর পর্যন্ত ইলেকট্রিক আলোর ব্যবস্থা। আলোগুলো জ্বলিয়া উঠিয়াছে। চারিদিকে লোহার লাইন, আর তার, আর গাড়ি। অদূরে 'লোকোশেড'। কালো কালো প্রকাণ্ড দানবের মতো ইঞ্জিনগুলো হুম হুম করিয়া চারিদিকে ছুটাছুটি করিতেছে। ওদিকে ইলেকট্রিকের ইঞ্জিনঘর, শুধু স্টিম আর আগুন! হরিপদর আপিসটা দেখা যাইতেছিল। কলের মতো লোকগুলো সেখানে কাজ করিতেছে। মনে হইল, সে নিজেও ওই কলকারখানার সামিল। যন্ত্রের মতো পরের ইঙ্গিতে সেও তাহার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের যাত্রাপথে অন্ধের মতো হাঁটিয়া চলিয়াছে। ছুটি নাই, অবসর নাই, বিশ্রাম নাই, ক্লান্তি নাই—মৃত্যুপথযাত্রী বীণাকে একটুখানি দেখিবার অবসর পর্যন্ত নাই। বীণার কথা মনে হইতেই তাহার চোখের সুমুখে যেন হু-হু করিয়া চিতাগ্নি জ্বলিয়া উঠিল—নদীতীরের সেই শ্মশান আর সেই চিতা। আর সেই ধূম, সেই আগুন, আর সেই নি:সাড় নিস্পন্দ বীণার মৃতদেহ।...হাতে তাহারই অস্থি!

ধীরে-ধীরে এক পা এক পা করিয়া হরিপদ সেই কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলা দিয়া তাহার কোয়ার্টারের দরজায় আসিয়া দাঁড়াইল। সেই কোয়ার্টার। এইখান হইতেই বীণাকে সে জোর করিয়া মামিমার কাছে রাখিয়া আসিয়াছিল। ঘরের বাহিরে একটা আলো জ্বলিতেছে। দেখিল,—যতীন ছোকরাটি বারান্দায় মাদুর বিছাইয়া গভীর নিদ্রায় মগ্ন। হরিপদ তাহাকে আর জাগাইল না। ঘরে ঢুকিয়া আলো জ্বালিল। ভিজা কাপড় প্রায় শুকাইয়া গেছে। জামাটা কাঁধ হইতে নামাইয়া রাখিতে গিয়া ঠক করিয়া কিসের যেন শব্দ হইল। হাত দিয়া দেখিল, বীণার চুড়ি। বীণার চুড়ি ও দুল সে বীণার বাক্সেই রাখিয়া দিবে ভাবিয়া খাটের নিচে বালিসের তলা হইতে তাহার চাবির তোড়াটি বাহির করিয়া সে বাক্স খুলিল। বীণার সেই বাক্স। তাহারই নিজের হাতের সাজানো জিনিস। কিন্তু একি! থাকে থাকে সাজানো কাপড় জামা সব যেন লাল। মনে হইল সব যেন রক্তে ছোপানো। হরিপদ তাহার চোখ দুইটা ভালো করিয়া রগড়াইয়া লইল, দেখিল, না, চোখের ভুল নয়, সত্যই তাই। কম্পিত হস্তে ধীরে-ধীরে একটি একটি করিয়া কাপড় জামাগুলি হরিপদ নামাইতে লাগিল। দেখিল বাক্সের এক কোণে রক্ষিত সুকুমারের দেওয়া সে আলতার শিশিটি। ভাঙিয়া কোন সময় সমস্ত আলতা গড়াইয়া পড়িয়াছে।

কয়েকটি কাপড়ের তলায় দেখিল, তাহারই দেওয়া রেল কোম্পানির একটি সাদা খাতা। খাতার কয়েকটি পাতা ছিঁড়িয়া চিঠির মতো কি যেন লেখা হইয়াছে, কাগজগুলি হরিপদ তুলিয়া লইয়া পড়িতে লাগিল। বীণার হাতের লেখা কয়েকখানি চিঠি। কিন্তু চিঠির অধিকাংশ অক্ষর লাল আলতার দাগে অস্পষ্ট। একখানি চিঠির কিয়দংশ সে পড়িতে লাগিল। লেখা আছে—

ভাই ঠাকুরপো—তাহার পর অনেকগুলি অক্ষর কাটা! তাহার পর লিখিয়াছে,—'তোমাকে যে চিঠি দেব কিন্তু ঠিকানা জানি না যে!'

সে চিঠিখানার আর কিছু পড়িবার উপায় নাই।

আর একখানি চিঠি! আগাগোড়া সবই লাল, মাঝখানে মাত্র কয়েক লাইন...'সাজিলে আমাকে ভালো দেখায়। তুমি যে আমায় আলতা পরিয়া ভালো করিয়া সাজিতে বলিলে, কিন্তু কাহার জন্য সাজিব ভাই? কে দেখিবে? তোমার দাদা কাজের লোক। চব্বিশ ঘণ্টা সে তাহার কাজ লইয়া ব্যস্ত থাকে। তাহার কি আর দেখিবার অবসর আছে ছাই।...'

হরিপদর হাত হইতে কাঁপিতে-কাঁপিতে কাগজগুলি মাটিতে পড়িয়া গেল। মাথার ভিতরটা বোঁ বোঁ করিয়া ঘুরিতে লাগিল এবং তাহার দুই মুদ্রিত চক্ষুর সম্মুখে মনে হইল যেন সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লাল রক্তে রাঙা হইয়া উঠিয়াছে! চারিদিকে অজস্র ইঞ্জিন আর ধোঁয়া, কল আর কারখানা, টেলিগ্রাফের তার আর যন্ত্রের শব্দ!...ওদিকে হুইশিল বাজিল, এদিকে ট্রেন আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, রামধনিয়ার চিৎকার, লছমির ঝগড়া...টেলিগ্রাফ আসিয়াছে...বীণার অসুখ, বীণা রাগ করিয়াছে, বীণা চলিয়া যাইবে। সত্যই তো! তাহার অবসর কোথায়! তাহার অবসর কোথায়!...

কোয়ার্টারের মাঠে যাত্রা শুনিয়া যতীন এমন ঘুম ঘুমাইয়াছে যে, উঠিল যখন তখন প্রভাত হইয়া গেছে। ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিতেই দেখিল, দরজা খোলা, ঘরে আলো জ্বলিতেছে, বাবু কোন সময় আসিয়াছেন তাহাও সে বুঝিতে পারে নাই। ঘরে ঢুকিতেই দেখে, বাবুর খালি গা, খালি পা, বাক্স খোলা, বাক্সর জিনিসপত্র ঘরময় ইতস্তত ছড়ানো, আর তাহারই মাঝখানে বাবু তাহার বাক্সর ডালির উপর মাথা রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন।

আর...পাশের বাড়ির সাদা রঙের একটা পোষা বিড়াল বীণার সেই অস্থিপিণ্ডটা লইয়া ঘরের মেঝের ওপর পা দিয়া গড়াইয়া গড়াইয়া খেলা করিতেছে।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%