চোলি কা পিছে

সমরেশ মজুমদার

কী আছে, তাই ছিল সেই সালের জাতীয় সমস্যা। যে সময়ে এটি ন্যাশানাল ইসু হয়ে ওঠে, সে সময়কার অন্যান্য ভ্যানতাড়াই, যথা শস্যহানি—ভুমিকম্প চতুর্দিকে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী ও রাষ্ট্রশক্তির সংঘর্ষ ও হত্যা—হরিয়ানায় বেজাতে বিয়ে করার অপরাধে তরুণ-তরুণীর মুণ্ডচ্ছেদ—নর্মদা বাঁধ দিয়ে মেধা পাটেকার ও অন্যদের অবুঝ আবদার শত শত ধর্ষণ হত্যা লকাপ নির্যাতন ইত্যাদি নন ইসু স্বাভাবিক নিয়মেই সংবাদপত্রে উচ্চালোকিত হতে গিয়েও হয়নি—এ সব নন ইসু থেকেই যায়। এর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল চোলি কা পিছে।

জাতীয় জীবনে ইসু নন ইসুকে মাড়িয়ে চলে যাবে—চলে যায়, এটাই নিয়ম। এজন্যই 'কী আছে' এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রমাণ হয়ে যায় ভারত শুধুই ঘুমোয়ে রয় না, দরকারে জেগেও ওঠে।

তাই কী আছে তা জানার জন্যে জাতি-মিডিয়া-সেন্সারবোর্ড-ব্রা-বিরোধী মুক্ত মেয়েরা—রাজ্যে বহু সংস্থা-সংগঠন ইত্যাদি-ইত্যাদি—দূরদর্শনের মালটি চ্যানেল—চোখের পাতায় সবুজ শেড লাগানো লেডি ভোটারিয়ার সংস্থা—ধর্মীয় দলসকল—রাজনীতিকরা ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, যেজন্য সে সময়ে 'খলনায়ক' ছবির ক্যাসেট গোপনে দেখাই হয়ে ওঠে 'নর্ম অফ দি ডে'।

এমত চিন্তায় নেশনকে ব্যস্ত দেখেই শুভচিন্তকরা জাতির মগজকে ঘরে ফেরাবার জন্য বোম্বাই ও কলকাতায় বিস্ফোরণ ঘটায়,—যে জন্য ভারত সহসা আবিষ্কার করে যে চোলির পিছনে মধ্যপ্রাচ্য আছে। এ আবিষ্কারও আরেক বিস্ফোরণ কেন না, ইমারত ধসল বলে সহসা জানা গেল মিডল ইস্টই চোলি পরা ও খোলা এবং গুটুর-গুটুর ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। যে পাওয়ারফুল লবি, বোম্বাইয়া ফিল্মকে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী সংস্কৃতিমাধ্যম বলে তরুণ প্রজন্মের মগজে মেসেজ পাঠাতে নিরত, সে লবি এতে খচে যায়। এদের কাউণ্টারলবির (অতীব সংখ্যাগরিষ্ঠ) অধিকর্তা (অবৈতনিক, ইনি সেমিনারে যেতে পারলেই খুশি হয়ে যান) হ্যান্ডবিল ছাপান যা প্রত্যেকের খবরের কাগজের ভাঁজে ঢুকে যায় ও বলে, প্রতি বছর বোম্বাইয়া ফিল্ম-এর স্টক ফুটেজের দৈর্ঘ্য, যা দিয়ে জননী বসুন্ধরাকে আঠারো প্যাঁচে বেঁধে ফেলা যায়, তার পিছনেও অনুরূপ কোন রাষ্ট্র থাকবে যারা দূরে বসেই ভারতীয় জনগণকে হাসায়, কাঁদায়, নাচায়, গানায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। এ খবর পড়ে পাগলা হরিপদ টাটা বিলডিঙের ছাদে উঠে পড়ে চেঁচায় 'ইনভেশান! ইনভেশান!' ও সত্বর এ টি টি এ ডি এফ এ্যাকট, অ্যান্টি টেররিস্টিক ট্যাকটিকস অ্যানড ডিসরাপটিভ ফোর্সেস অ্যাকটে বন্দী হয়ে কারগারে নিক্ষিপ্ত হয়। কোন কারাগার কারা বন্দি করে, তা জানা যায় না। ইনভেশান শব্দটি জাতিকে দুশ্চিন্তায় ফেলে। ১০৬ বর্ষীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী গোপীকৃষ্ণবাবু বলেন, ইংরেজ আবার ভারতের ভাষা না জানা ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা রাজধানীতে এক গোপন সেমিনারে মিলিত হন এবং এ সুধী সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। কালচারাল রেভল্যুশনের চেয়ে কালচারাল ইনভেশান অনেক বিপজ্জনক। তাই তো রোখার জন্য ভারতকে যা করতে হত ভারত তাই করছে। এ হল যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহার। বোম্বাই ফ্যাকটারি মেড গণসংস্কৃতিই প্রকৃত ভারতীয় সংস্কৃতি যা ক্যাসেটমাধ্যমে আধখানা দুনিয়ার জেটগতিতে চলছে আর চলছে। রাশিয়া নেই। মার্ক্স লেনিন-মাও জে দং ব্যর্থ। প্রকৃতির শূন্যস্থান পাইরেটেড ক্যাসেট দিয়েই ভরে ফেলতে হবে। 'চোলি কা পিছে' সে অর্থে এ সময়ের মৃতসঞ্জীবনী। এত কিছুর পরেও শৈলীর মা তার বৃহদায়তন ও ক্রমবর্ধমান বপু শুধু একখানি কাপড়ে জড়িয়ে বলে যায়, জীবনে বেলাউজ পল্লাম না, চোলি পরব কি গো! এ সব ব্যাপারে নেশান ব্যস্ত ছিল বলেই উপীনের খবর কাগজে দেড় ইঞ্চি জায়গা পায়। জাতির চক্ষু এড়িয়ে যায়।

দুই

উপীনের খবর উপীনেরই খবর হিসেবে কাগজে বেরোয়নি। ঝারোয়া ও সেওপুরার মাঝামাঝি জায়গায় রেলের চাকায় পিষ্ট, এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মৃতদেহ যে উপীনের দেহ, তাও আগে জানা যায়নি। তার আগেই উপীনের বন্ধু ও পেড়েদার উজান পোস্টকার্ড পেয়েছিল, কাম টু ঝারোয়া। ভেরি আর্জেন্ট—উপীন। এই চিঠিই উজানকে উপীনের পরিণাম জানতে ঝারোয়া নিয়ে যায়। পোস্টকার্ডে উজান বিদুৎস্পৃষ্ট হয়। এখন ওর মনে পড়ে উপীনের নিরুদ্দেশ হবার প্রথম পর্ব। স্বভাবতই ও শীতল মালিয়ার কাছে যায় চিঠিটি নিয়ে। সল্টলেকে এক কানা রাস্তা, যার দক্ষিণে বড়-বড় গাছ এবং তারপর চিরপ্রবাহিনী কেষ্টপুর খাল,—পথের উত্তরে কতিপয় অসামান্য বাড়ি,—সেখানেই শীতল তার নিজস্ব ফ্ল্যাটে এসেছিল। এ রকম সুন্দরী শক্তপোক্ত, তেত্রিশেও কিশোরী রমণীর নাম শীতল কেন, তা উজান জানে না। উপীন ও শীতল স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু উপীন এক ভ্রাম্যমাণ এস-ফটোগ্রাফার, শীতল এক বিখ্যাত হিমালয় চড়িয়ে। দুজনে বছরে এক-দেড়মাসও একসঙ্গে থাকে না, অথচ দুজনে প্রেমাসক্ত থেকে যায় কেন, তাও উজান জানে না। উজান খুব না জেনে থেকে যেতে পারে। উজানের আনুগত্য শুধুই উপীনের প্রতি। উপীন সময় থেকে সময়ে, ছবি তোলার জন্যে বিগত পাঁচ বছর কলকাতা থেকেই বিহার-ওড়িশা যাচ্ছে, এবং উজানকে নিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু উপীনের ছবি বিদেশে স্বদেশে টপ দামে বিকোয়, সেহেতু উজানও লাভবান হয়েছে। সল্টলেকের ফ্ল্যাটটি উজানের পছন্দ নয়। কেউ থাকে না, অসম্ভব ঝকঝকে একটি ফ্ল্যাট। কখনও কচিৎ শীতল আসে, সব যেন গোলমেলে। উপীন অবশ্য বলে, ভেবে কী হবে? শীতল প্রকৃতিনন্দন। এই কানা রাস্তা, এই সবুজ—এই নি:শব্দ সরু খাল, এগুলো ওর দরকার।

শীতল নাকি দুটো মানুষ। হিংস্র ও অ্যাগ্রেসিভ শীতল বারবার হিমালয়কে আক্রমণ করে। শান্ত, কোমল শীতল এই জল-গাছ নৈ:শব্দ্যে ডুবে বসে থাকে। হিমালয় ও সল্টলেক ব্যতীত ভারতে কত না প্রাকৃতিক শোভা আছে। শীতল সেসব ল্যান্ডস্কেপ সহ্য করতে পারে না। শীতল, মনে মেজাজে ২০৯৪ সালের মেয়ে অথবা শীতলের শতাব্দী এখনো আসেনি।

উপীন এ সব কথা হ্যাঁ হ্যাঁ হেসে বলে। উপীনের বয়স পঁয়ত্রিশ না পঞ্চান্ন বোঝা যায় না। তার চেহারা চৌকো গড়নের, মোটা, মুখে দাঁড়ি গোঁফ, চোখ অত্যুজ্জ্বল। সে কয়েক দিনে একবার স্নান করে, মাংস ও বিয়ার খায়, বিড়ি ফোঁকে উজানের শরিকি বাড়ির এখানে ঘরে এবং দিল্লির বড় হোটেলে সে একইরকম অ্যাট হোম—এক এসপেরেন্টো মানুষ।

এখন শীতল বহমান খালের দিকে তাকিয়ে নিশ্চল বসেছিল। এমন পাথর পাথর বসে থাকতে ওকে নগাধিরাজ হিমালয় নাকি শিখিয়েছে।

উজান পোস্টাকার্ডটি শীতলকে দেয়।

—ও ঝারোয়া।

—তাই লিখেছে।

—আমাকে লেখেনি।

—আপনি তো এ সময়ে কদমকুরি থাকেন।

—বাট, ঝারোয়া থেকেই তো ও দিল্লি গেল।

—হ্যাঁ।

—তোমাকে বলেছিলাম, ওর সঙ্গে লেপটে থাকবে। তুমি জানো এ সময় অ্যাপট-এস্টেট কত কাজ। তোমাকে আমি টাকা দিয়েছিলাম...

—আপনি টাকা না দিলেও আমি উপীনকে আগলে রাখতাম! কী করে জানব, দিল্লি গিয়ে অমন পাগলামি করবে। আমি বিড়ি কিনতে গেলাম, পুলিশ ওকে...

উজানের গলা ভেঙে গেল।

—হ্যাঁ...কাগজে ছবি...কেচ্ছা! কেচ্ছা!

হ্যাঁ, একটা ব্যানারের ছবি। তাতে ইংরেজিতে লেখা। 'ওড়িশার অধনগ্না পীনধ্বস্তনা নারীমূর্তিগুলি ধর্ষণ হতে চলেছে। সেভ দেম! সেভ দি ব্লেস্ট!'

—আমি দিল্লি যাইনি আগে। শহরে চিনি না কিছু। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শেষে ফিরে এলাম।

—সুন্দর!

উজান সহসা দু:সাহসে বলে, জানতাম আমাকেই খবর দেবে। তাই দিয়েছে। ফিরে এসে অপেক্ষাই করছিলাম।

—কিছু বেশি করোনি।

—শীতল রেগে গেলে বা উত্তেজিত হলে নিজেকে শাসনে রাখে ঘনঘন শ্বাস টেনে ও ছেড়ে। এক মিনিটে নিজেকে ঠান্ডা করে নিয়ে বলে, হোআই ঝারোয়া, উজান?

—আপনি তো জানেন!

—শুধু এটা জানি না গতবার গেল কেন? হ্যাঁ,—হাতি মাইগ্রেট করছিল সেবার,—

—তারপর খরা,—

—নদীর জলে পেস্টিসাইড,—

—দুভিক্ষ-অবস্থা, সেমিফেমিন কন্ডিশান,—

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ! সে সবের ছবি ন্যাশনাল প্রেসেই বেরিয়েছে। 'লেনস' ম্যাগাজিনেও। সে তো চার বার হল। পাঁচ বারের বার?

উজান চুপ।

—পাঁচ বারের বার?

—আমি জানি না। আমি বেতলা চলে গিয়েছিলাম। উপীনদা যায়নি।

—ওগুলো কার ছবি?

উদ্ধতস্তনা এক দেহাতি যুবতী শিশুর মুখে স্তন গুঁজে দিয়ে এলিয়ে বসে আছে। আঁচলে স্তনটি আড়াল করা। সেই মেয়েটি অনেক মেয়ের সঙ্গে মাথায় জল নিয়ে যাচ্ছে। ভরা কলসের মতো উছলানো বুক।

সেই মেয়েটিই গাছের গায়ে হেলান দিয়ে আখ কামড়াচ্ছে। প্রস্তর মূর্তির মতো বক্ষ। মুখে অনাবিল আনন্দ।

—কার ছবি, উজান?

—উজান বলে, গাঙ্গোর। গাঙ্গোর কী...তা জানি না।

শীতল বেশ বিস্মিত। গাঙ্গোর? ইউ মিন গাঙ্গোর? গণগৌরী?

—তার মানে?

—তুমি ফ্রি-লানস কলামনিস্ট উজান! নাম তোমাকে কৌতূহলী করে না?

—না। নামে কী আছে?

—শীতল নিমেষে একদার 'ভারতীয় উৎসব ডকু মেকার' শীতল মালিয়া হয়ে যায়। রানিং কমেন্টারি দেবার গলায় বলে রাজস্থানে গাঙ্গোর উৎসব হয়। গঙ্গাপূজা, গঙ্গাদেবী। আশ্চর্য! রাজস্থানে গঙ্গা কোথায়? বড় নদীও তো...

—রাজাগজার দেশ, হয়তো গঙ্গা ছিল।

—সুজান! ও নো, উজান! তুমি ডিভাইন! কালচারাল অ্যাওয়ারনেস এত কম! উপীনও বলে, বাঙালিরা ডিভাইন! ওরা মনে করে অন্য রাজ্য সর্ম্পকে কিছু জানার দরকার নেই।

—এ ছবি আপনি পেলেন কোথায়?

—উপীন লুকিয়ে রেখেছিল। গাঙ্গোরের সঙ্গে উপীনের কি...?

—না।

সেমিফেমিন কন্ডিশন...গাঙ্গোররা কাজের খেঁজে ঝারোয়া চলে এসেছিল। হালকা ইট আর টালি তৈরির ভাঁটায় ফুরনে কাজ করবে। উপীন আর উজান যখন যায়, তখন ওদের দু-তিন মাস ওখানে থাকা হয়ে গেছে। গাঙ্গোরের স্বাস্থ্য দিব্যি ছিল...বাচ্চা দুধ খাচ্ছে দেখে উপীন ছবি তোলে, গাঙ্গোর কোনো আপত্তি করেনি। তবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল...পইসা বাবু, টাকা? ফটো খিঁচবে তো টাকা লিব! উজান যেন শক খেয়েছিল। উপীন পকেট খামচে যত ওঠে সব দেয়।

পি ডবলিউ ডি বাংলোর দিকে হাঁটতে-হাঁটতে উজান বলেছিল, ষাট-সত্তর টাকা দিয়ে দিলে? মেয়েটাই বা কী নির্লজ্জ!

উপীন বলেছিল, নাউ, নাউ উজান! শকিং লাগল তোমার? আরে বাবা, আমি তো ছবি বেচব...ও টাকা নেবে না কেন? ওরা ঘাস খায় না উজান, বোঝে যে বাবুরা যখন রিলিফও দেয়, পিছনে কোনো মতলব থাকে।

তারপর বলেছিল স্ট্যাচুর মতো বুক মাইরি। ম্যামাল প্রাোজেকশান দেখেছ?

—আমি তাকাইনি।

—হয়, এরকম হয়। আমার চেনা এক বন্ধুর কাকা স্বাধীনতার পর দন্ডকারণ্য গিয়েছি। অ্যানথ্রোপলজিস্ট। আদিবাসী মেয়েদের খোলা বুক দেখে...

—ছি ছি ছি!

—তিনিও ছি ছি ছি বলেছিলেন, আর ওদের ব্লাউজ পরতে বলেছিলেন। এখন পরে। তখন তো পরত না। ভদ্রলোক পাগল হয়ে গেলেন ক্রমে-ক্রমে।

—যাকগে, অন্য কথা বলো।

—আমি ওর বুক দেখে...

—ছি উপীনদা! তুমি না বিবাহিত?

—সুন্দর জিনিসকে তারিফ ও শ্রদ্ধা করতে শেখো।

উপীনদার মাথায় গাঙ্গোর ঢুকে যায়। না, সে সব ছবি এখানে নেই। রাতে। ঘুঁটের আগুনে লিট্টি সেঁকছে গাঙ্গোর ঈষৎ সামনে ঝুঁকে। ময়লা লাল আঁচলের নীচে কোনারক বুকের স্তনমধ্যরেখা উদ্ভাসিত।

ট্রেন চলে যাচ্ছে, গাঙ্গোররা সে দিকে চেয়ে আছে। আকাশের পটে অজান্তার গুহাচিত্রের বুক। ময়লা চোলি। ময়লা লাল-কাপড়, মাথায় উকুন নোংরা...নোংরা...

দ্বিতীয়বার তো গাঙ্গোর বলেছিল, একেক ছবি একশো টাকা।

উপীন নিজের ঘড়ি খুলে দেয়।

গাঙ্গোর ঘড়ি ফেলে দেয়। ঘড়িতে বেজেছিল এগারোটা দশ। কাঁটা, থেমে যায়। কাঁটা থেমে আছে, থাকবে। উপীন সে ঘড়ি সারায়নি।

মন্ত্রমুগ্ধ উপীনকে জঘন্য গাল দিয়ে চেঁচিয়েছিল গাঙ্গোর। কোথাকার হারামি বেজন্মা বদমাশ তুমি? এক হাতে ঘড়ি দেবে, আবার থানার গিয়ে লিখবে ঘড়ি চুরা লি? দূর হ, দূর হ বুডঢা!

গাঙ্গোরের মরদ এসে চড়চাপড় মেরে নিয়ে চলে যায় ওকে।

সেদিনই উপীন চুল্লুর ঠেকে গিয়ে বসে। না, ওই ম্যামাল প্রজেকশান ভুলতে পারছে না ও। ওর মগজে লাতুর হয়ে গেছে। উজান! দেয়ার লাইজ অল দি মিস্ট্রি। কী করে এমন হয়?

উপীনকে নিয়ে আসবে বলে উজান কিছু দূরে একটা জমাট সিমেন্টের বস্তার ওপর বসেছিল।

গাঙ্গোরের ওপর ওর ভীষণ রাগ তখন।

আর গাঙ্গোর ওর কাছেই এসেছিল।

বাবু! বাবু। ও লোকটা মরদ নয় আমার। আমাদের ঠেকেদার, কাজ করাতে এনেছে। আমার মরদ ঘরে থাকে না বাবু...চোর বলে পুলিশ বহোৎ মারে...দেশঘর খুব খারাপ জায়গা বাবু...

উজান বলেছিল, বেরিয়ে যাও। চলে যাও।

গাঙ্গোর কাঁদছিল বিনবিন করে, মুখে আঁচল গুঁজে...কামরাবাবুকে বলো না, নিয়ে যাবে আমাকে? কাপড়লতা...খাইদাই দিও...মা আর ছেলের শোবার জায়গা...কা করে বাবু...ন খেতি, ন জমিন, বহোৎ হি মুশকিল জিনা...বাসনবর্তন...চুলাচাক্কি...কামরা সাফা...কাপড়া সাফা...সব করে দেব বাবু...

—আ:! স্বামী তো আছে তোমার!

—ঘরে আসতে পারে না বাবু...রাতে লুকিয়ে আসে...আমি টাকা দিই...ঠেকেদাররা ভালো নয় বাবু...

—চলে যাও। নইলে পুলিশ ডাকব।

উজান হনহনিয়ে চলে আসে। উপীনকে টেনে নিয়ে যেতে খুব ঝামেলা। উপীন গাঙ্গোর! গাঙ্গোর! বলছিল। পরদিন উজানরা চলে আসে।

উপীন গুম হয়ে গিয়েছিল। রাখতে পারবে না...রাখতে পারবে না উজান...ওরকম বডিলাইন রাখতে পারবে না...কিছু থাকবে না,—জানো কি, যে ইলোরার মেয়েদের স্তন ক্ষয়ে যাচ্ছে? গাঙ্গোর ইজ ফ্যানটাসটিক!

—উজান!

—ইয়েস শীতল, বলুন!

—উপীন কি...

উজান কলকাতায় ফিরে এল। বলল না, উপীনদা বারবার বলে, কান্ট্রি লিকার ও-কে! কান্ট্রি উইমেন রিপেল মি!

শীতল ঈষৎ হাসল।

—এ মেয়েটার বিষয়ে আর কিছু জান না?

—না। জানতে চাইও না।

—যাক গে, দিল্লি যাবার আগে কী হল?

জানে না, উজান জানে না। উপীন যে অরুণাচল না গিয়ে কলকাতায় এসেছে, তাও জানে না।

—অরুণাচল যায়নি। কলকাতায় এল, তাও জানি না। ঝারোয়া গেল, তাও জানি না। আমার কাছে হঠাৎ হাজির হুড়তে পুড়তে,—

—হোআট?

—টিপিকাল বেংগলি একসপ্রেশান।

—ডোনট বি সো টিপিকাল। আমি বাংলা অত বুঝি না। উপীনের জন্যে যা শিখেছিলাম। অফ কোর্স, আমাদের ক্লাবে অনেক মাউন্টেনিয়ার বেংগলি। উপীন তো বাংলা একেবারে...

—পাঞ্জাবি তো নামেই। কলকাতাতেই তিন পুরুষ।

—উপীন আঠারো বছর বয়সে কলকাতা ছেড়েছিল।

—সে কথা বলত।

—তারপর?

—ভীষণ যেন কিছু হয়েছে এমনি মনে হল। বলল, খুব দৌড়ে বেড়িয়েছি ক'দিন...

উপীন বলেছিল, হেল! হেঁটেছি, ট্র্যাক চেপেছি, থানার জিপে ঘুরেছি,—গাঙ্গোররা নেই। কেউ কিছু বলেও না কোথায় গেছে। বাংলোর চৌকিদার বলল, ওকে ঝারোয়া আসতেই হবে...খুব খারাপ কাজ করে গেছে গাঙ্গোর...কোনও খোঁজ পেলাম না। একটা কনস্পিরেসি অফ সায়লেনস!

উজান বলেছিল, পেলে কী করতে উপীনদা?

—নিয়ে আসতাম।

—কোথায়?

—যে কোনো জায়গায়।

—কী জন্যে?

—বুঝবে না উজান...ওকে বাঁচাতাম।

—একটা ম্যারেড মেয়েছেলে...

—আমি কি ওকে...না উজান, না। যাক গে, আমি ঘুমোব।

—তোমার ব্যাগট্যাগ?

—আমি ঘুমোব।

—আপনি তো জানেন শীতল। ঘুমোল তিন-চার দিন, তারপরই বলল, দিল্লি যাব। অ্যানড...

—এখন কী করবে?

—কেন, ঝারোয়া যাব? আপনি যাবেন না?

—না। আমি ওর জন্যে অপেক্ষা করব।

—কোথায়?

—কদমকুরিতে!

—তাহলে আমি চলি। আজই যাব।

—ইয়েস।

—আপনার যাওয়া কি উচিত ছিল না? আপনি তো স্ত্রী...

—না। আমাদের তেমন সম্পর্কই নয়। উপীন হারিয়ে যায়। আবার ফিরে আসে। ও এবং ক্যামেরা, —আমি এবং হিমালয়, কোনও সদূর ভবিষ্যতে হয়তো...

—কদমকুরিতে থাকবেন?

—হয়তো।

—যদি এক সঙ্গেও থাকতেন। এমন একটা মানুষ...একা থেকে থেকে খ্যাপাটে হয়ে গেল।

—খ্যাপামি দেখলে কোথায়?

—সেব দি ব্রেস্ট একটা খ্যাপামি নয়?

—উপীন নিশ্চয় তা ভাবে না। আচ্ছা উজান। এই টাকটা রাখো। ওকে পেলে সিধা ফোন করবে আমাকে।

—টাকা লাগবে না।

শীতল ছবিগুলো অভিনিবেশে দেখল। বুক, ব্রেস্ট। বুক কী? ফ্যাট, টিসু, হেনতেন ঝুটঝামেলা।

উপীন এত উদ্বিগ্ন হল কেন?

উজান বেরিয়ে যাচ্ছে, বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করে শীতল নিজের লিকুডি সিলিকন ইঞ্জেকটেড বক্ষে হাত রাখল। শীতলের চোলির পিছনে সিলিকন বক্ষ। উপীন বলেছিল এ সব কৃত্রিম শীতল?

উপীন কী জানবে এর রহস্য, এ স্তন চিরকাল উদ্ধত থাকে। উপীন বলত, প্লাস্টিকের ফুল যেমন, শীতল?

'বলেছিল'—'বলত', না না উপীন 'ছিল' হয়ে যায়নি নিশ্চয়। শীতল ঘন-ঘন নিশ্বাস টানল। শান্ত হও, শান্ত হও মন। উপীনের সব ছবি তোলা হয়ে যাক, শীতলের হিমালয় আরোহণ ফুরাক, কোনোদিন কদমকুরিতে স্থির হয়ে বসা যাবে।

সুজান কবীর ঘরে ঢুকল। ছবিগুলো ছেটানোই আছে। দেখে বলল, চোলি কা পিছে ক্যা হ্যায় নিয়ে উপীন ব্যস্ত কেন?

শীতল নিরুত্তর। উজান টাকা নিল না।

তিন

গাঙ্গোর এবং তার স্বাভাবিক, অতীব জটিল স্বেদগ্রন্থি বা পয়োধর উপীনকে কেন পাগল করছিল তা সে জানে না।

স্তন একটি জটিল স্বেদগ্রন্থি বলা চলে। চর্বি তাতে অনেক। গ্রন্থিসংস্থানটি খুব মনোগ্রাহী। সতেরোটি দুগ্ধদায়িনী ইউনিট থাকে। গ্রন্থিগুলির গন্তব্য স্তনবৃন্ত। শিশু জন্মালে দেহের রক্ত দুধে পরিণত হয়।

উপীন এ সব জানত। লিকুইড-সিলিকনধন্য বক্ষ নয়, স্বাভাবিক, তাই অনন্য। মনে হচ্ছিল গাঙ্গোর ও তার বুক বিপন্ন।

দিল্লি যাবার আগে ওর অরুণাচল যাবার কথা, মাঝপথে ওর ধারণা জন্মায় ডেস্টিনেশান ঝারোয়া। কলকাতায় নেমে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে ট্রেনে গোমো,—অত:পর বাস, ইত্যাদি পথে সেওপুরা। আবার ট্রেনে মাধপুরা হলটে নেমে ঝারোয়া।

কিন্তু ঝারোয়াতে মধ্যাহ্ন রোদেও সবাই নি:শব্দ থাকছিল, রাত নেমেছিল যেন। ঝারোয়াতে রাত নি:শব্দ থাকে, দিন শব্দতরঙ্গিত। এবার দিনও নি:শব্দ। গাঙ্গোরদের ঝোপড়ি ঝোগগি, টালির গোদামঘরের আশেপাশে তাদের কাপড় মেলা নেই পুটুস ঝোপে,—কুয়োতলায় নেই গোলমাল।

—কোথায়, কোথায়, কোথায়?

চৌকিদার বলল, চা এনে দেব দোকান থেকে।

—গাঙ্গোররা কোথায়?

—স্নান করবেন?

—ওরা কোথায়?

ঠেকেদার বাজারে ঘুরছে, উদাস। সে জানে না, দোকানি বাজারি কেউ জানে না।

হেসেগোড়া, লামডি, গ্রামে-গ্রামে গিয়েছিল উপীন। লামডিতে বিকালেই চুল্লচুরচুর গাঙ্গোরের স্বামী 'গাঙ্গোর' শুনে মাটিতে থুথু ফেলে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল।

হতাশ, হতাশ উপীন শুনেছিল, এক শিশুর কান্না। একটি বছর বারোর প্যাকাটে রোগা কালো মেয়ে একটি বছরখানেকের ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছেলেটা কাঁদছিল।

হঠাৎ উপীনের মস্তিষ্কে সংবাহন চালু হয়ে যায়। উপীন বুঝতে পারে, এ গাঙ্গোরের ছেলেই হবে। আর ভয়ংকর কোনো ষড়যন্ত্র ঘটে গেছে কোথাও তাই মানুষগুলি পাথরের মতো নিশ্চুপ।

চৌকিদার বলেছিল, ওকে ঝরোয়া আসতেই হবে। খুব খারপ কাজ করে গেছে গাঙ্গোর।

ঝারোয়াতে পুলিশ ঘুরছিল।

উপীন চলে আসে। ভীষণ কিছু ঘটে গেছে কোথাও। নেশান তা জানে না। উপীনের মাথার ভিতর ভূমিকম্প হচ্ছিল, ফেটে যাচ্ছিল মাটি, গরম বালি উগরে দিয়ে ফাটল জুড়ে যাচ্ছিল, ফেটে যাচ্ছিল, উজান! ট্রেনে ঝকরঝকর চলতে চলতে উপীন বুঝতে পারছিল, আবার ওকে ঝারোয়া আসতে হবে।

চার

উপীন যখন পৌঁছয়, তখন ঝারোয়া তার মৌনব্রত ভেঙেছে। উপীনের মনে হয় এই সে প্রথম আসছে। সেই দোকানঘরগুলো, সেই বাসের ধুলো খাওয়া অকথ্য গজা ও কাঠি ভাজার দোকান। হাটবারে বকরি গরু বেচাকেনাও হচ্ছে। ঝোপরি ও ঝোগগিগুলি দেখা যায় না আর। কিন্তু উপীনের মনের ভিতরে মন ঠিক টের পায়, গাঙ্গোর আছে, এখানেই আছে। চৌকিদার ওকে দেখে এবার কপাল কুঁচকে তাকায়। কোথাও 'চোলি কা পিছে' বাজে।

—সেবার ব্যাগ ছেড়ে চলে গেলেন?

—ব্যাগটা রেখেছ?

—আমার ঘরে। গাঙ্গোরের খোঁজ করতে করতে গেলেন কোথায়?

—সে কোথায়?

—সে...

চৌকিদার বলতে থাকে, আপনি ছবি তুলে-তুলে ওর মাথা বিগড়ে দিলেন বাবু নইলে ওর অত সাহস হয়?

—কী করেছে গাঙ্গোর? মরে গেছে?

—গাঙ্গোররা মরতে আসে না বাবু, মারতে আসে, বেশরম গাঁওলি মেয়ে...যখন তখন গা নাচাবে...বাজারিয়া লোককে বলবে, তোদের ফটো খিঁচেনি, আমার ফটো খিচত। দেখ।

—তারপর?

—সব ধরমনাশ করে দিল গাঙ্গোর।

—কি করল?

—পুলিশের নামে নালিশ করল। তখন এলেন, তখন তো ও সেওপুরাতে ছিল।

—কেন?

—কেন নয় বাবু?

সেওপুরাতেই ফাটক, বড় থানা, আদালত। মহকুমা টাউন নয় সেওপুরা? সেখানেই তো যেতে হচ্ছে ওকে এখন।

—এখন সে সেওপুরাতে?

—আর কি। হপ্তায়-হপ্তায় যাও,—এসো,—যাও—এসো,—পুলিশ তো এত পিছে লেগে গেছে যে টেকেদারের লেবার আসাও ঘুচে গেল। বাবুজি। শিউজির দুনিয়াতে ঔরতকে বুঝেসমঝে চলতে হয়। যে বোঝে না, সে শাস্তি পায়। একটা মেয়ের জন্য পুলিশ এখানে এতবার এল, এতবার এল...ঔরত যখন বোঝে না যে পুলিশও মরদ, আর তাকে খেপালে সে খেপে যাবে।

—কেন, কেন, কেন খেপে যাবে?

—পুলিশের নামে নোংরা কলঙ্ক লাগাবে তাকে ছেড়ে দেবে পুলিশ? কখনো দিয়েছে? পালাতে পারতিস টেরেনে চেপে...নালিশ করতে গেলি...হাজিরা তোকে দিতেই হবে, আর পুলিশ তোকে...

—গাঙ্গোর কোথায়? তার বাচ্চা-বা কোথায়?

—বউ তুই একজনের!

—সে কোথায়, গাঁয়ে?

—গাঁয়ে তাকে ঢুকতে দেবে কেউ? সেখানে ঠাঁই নেই, ঝারোয়াতে কথা বলে না কেউ—সেওপুরা থেকে আসে—আর যা করবার কথা, তাই করছে।

—কোথায় সে?

—সাঁঝ লেগে গেলে বাজারে দেখবেন। চুল্লু খেয়ে-খেয়ে...

—গাঙ্গোর চুল্লু খাচ্ছে?

—আর কী করবে!

—আমি ওকে নিয়ে যাব।

—ছি-ছি বাবু। আপনি নামি-দামি লোক। কে জানত ঝারোয়াকে? আপনি বারবার ছবি উঠালে। অখবরে দিলেন,—আপনি ওকে নিয়ে যাবেন?

—ওকে বাঁচাতেই হবে।

উপীনের মাথা কাজ করছিল না, চৌকিদার কী বলছে তা বুঝতে পারছিল না।

—কিন্তু পুলিশ...

—কী করবে সেওপুরার পুলিশ? বিহারে পুলিশের সঙ্গে আমি অনেক টকরা নিয়েছি। ছবি তুলে অখবরে দেব।

—নিন ব্যাগ দেখে নিন। পুলিশ দেখলে ব্যাগ মেরে দিত। আস্নান করুন। হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসি। বিকাল সন্ধ্যার আগে তো সে আসবে না।

স্নান করে না উপীন ক্যাম্পখাটে শুয়ে পড়ে। বিকেল সন্ধ্যা অবধি ঘুমোয়। উজান থাকলে জোর করে খাওয়াত। বলত, নার্ভাস এনারজিতে চলছ কতদিন,—কোলাপস করে যাবে।

উপীন! অনেকদিন ধরেই কোলাপস করে যাচ্ছে উপীন। উপীন ফেলিওর। ঝারোয়ার এত ছবি উঠাল এত বারে, লাভ হল কী? জলে বিষ খেয়ে যাচ্ছে কতজন মরল, শস্যহানিতে মাইগ্রেট করে চলে গেল, সেবার তো উপীন বনাম রাজ্যসরকার,—না, একে দুর্ভিক্ষাবস্থা বলা যায় না। সব কিছুর পরেও দেখো হাটে শীর্ণ গরু ছাগল, ধুলো ও মবিলগন্ধি খাবার,—ভেরি বিজি ভিডিও প্যালেস, ভেরি লাউড চোলি কা পিছে, এ সময়ের জাতীয় সংগীত—পিছনে কী আছে তা গাঙ্গোর জানে। কিছু তো পরিবর্তন এল না। কিছু গোদামঘর বেড়েছে। একটা পুলিশচৌকি বসেছে, তারা মেয়েদের হ্যাটা দেয়। অশ্লীল হাসে, দোকান থেকে মিনিমাগনা খাবার খায়। সাধে কি কোলাপস করে যাচ্ছে উপীন? এখন শীতলের বীজাণুমুক্ত ঝকঝকে আবাসে ঢুকলে উপীনের দমবন্ধ হয়ে আসে। না, জীবনটা ঢেলে সাজাতে হবে।

উপীনের ঘুম ভেঙেছিল সন্ধ্যার মুখে। কোথাও একটা বিপন্নতা বোধ, বেশ কিছুকাল একটা অবসেশান তাকে লাট্টুলাটিম করে ঘোরাচ্ছে। সহসা মনে হয় এমন জায়গায় সে একা­—সর্বত্রই সে একা। এত একা থাকা, এত জীবনের স্বাভাবিক দাবি অস্বীকার করে চলা ঠিক হয়নি। গাঙ্গোরের উন্নত বক্ষ তো স্বাভাবিক, তৈরি করা নয়। কেন সেটা প্রথমে ছবিতোলার বিষয় মনে হল? কেন মনে হল সে বক্ষ বিপন্ন।—কী পাগলামো করছ বাবু, চলে যাও, তোমার ঘর নেই? চৌকিদারের ঘর আছে, বউ বাচ্চাকাচ্চা আছে। উপীনের জন্য অপেক্ষমাণ কোনও গৃহকোণ নেই, বন্দোবস্তির বিবাহ,—যেমন বিয়ে হরদম দেখা যায়। কিন্তু এখন তো গাঙ্গোরকে বাঁচাতে হয়। বিপন্নতা বোধ ওকে নিয়ে যায় চুল্লুর ঠেকে যেখানে নাড়িভুঁড়ির ঝালচচ্চড়ির গন্ধ, চুল্লুর উগ্র গন্ধ, পায়োরিয়া আক্রান্ত মাড়ির গন্ধ, নালার থকথকে বুড়বুড়ি কাটা নোংরার গন্ধ, নালার ওপাশে পায়খানার গন্ধ। উপীন নাককান বুজে বসে যায়। সহসা চোলি কা পিছে গান বাজতে থাকে।

আর সেখানেই গাঙ্গোর আসে। এখন কাপড় লালে হলুদে নাইলন, যাতে ময়লার চিমসে গন্ধ আর এখনো, ভয়ে-ভয়ে চোখ তোলে উপীন,—অতীব প্রগাঢ় চোলি, অতি উদ্ধত বক্ষ, মাথায় তেল ও বেণী, চোখ সততসন্ধানী।

উপীন ও গাঙ্গোর এ-ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। গাঙ্গোরের ঠোঁটে ফুটে ওঠে ধারালো অভিজ্ঞ হাসি। কোনো পুরুষের হাত সে ঠেলে দেয়। বলে, কামরাবাবু বহোত দিন আমার জন্যে ঘুরছে আর ঘুরছে ঠেকেদার! আজ বাবু আমার গাহক, কি বাবু?

উপীন নিজেকে সমর্পণ করে, ছেড়ে দেয়।

—ঠেকেদার গাঙ্গোর?

—কা করে বাবু? ও তো ঠেকেদারি ছাড়া কিছু জানে না। কিন্তু ভূষণ! তোকে তো হম পোমোট কর দি? এ বেওসায় সবই নাপা।

সবাই হাসে, সবাই। একজন বলে গাঙ্গোর তোহরা চোলি কা পিছে কা হ্যায় রে।

—চলিও বাবু।

গাঙ্গোর উঠে পড়ে। উপীনকে আঙুলের ইশারায় যেন বলে, মামুনসর।

তারপর ভাঙাচোরা রাস্তা, পুটুস ঝোপ, রেললাইন বিছিয়ে পড়ে থাকে, একটা বাস সাইডে রাখা ভাঙাচোরা, সবাই বিক্রি হয় এখন চলক্ষণ বাস, বা ভাঙাচোরা 'মহাবীর'। তারপর জীর্ণ গোদামঘর, সারসার, গাঙ্গোর দ্রুত চলে। একটি ঘরের টিনের দরজায় লাথ মারে।

ঘরে আর কী আছে, দেখতে পায় না, উপীন। গাঙ্গোর লণ্ঠন উসকে দেয় ও নিজস্ব রানিং কমেন্টারি নিজেকে বলে যায়।

সেওপুরাতে চলে গেলে এর চেয়ে টাকা বেশি। কিন্তু থানা তো গাঙ্গোরকে ঢুকতে দেবে না। ওকে ঝারোয়া থাকতে হবে ও সেওপুরা যেতে হবে,—কেসের ডেট পড়বে, পুলিশ ডেট নেবে। এত টাকাও জমছে না যে কোথাও পালায় গাঙ্গোর। পালাবে-বা কোথায়,—সবাই তো জেনে গেছে গাঙ্গোর ওদের চিনেছিল, ঔর থানায় সে কথা বলেওছিল, আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছিল, তাতেই সব তচনছ হয়ে গেল।

—গাঙ্গোর!

—অনেক, অনেক দিন তুমি আমার ছাতির ফটো খিঁচো বাবু। কিন্তু আমি তো জানতাম তোমার মতলব। নইলে অত অত টাকা দিতে?

—গাঙ্গোর!

—কাপড় খুলবে, না শুধু ওঠাবে গাঙ্গোর? কাম সারো, বিশ টাকা। রাত কাটাও পঞ্চাশ টাকা, ঝটপট বলে ফেল।

—তুমি রেন্ডি কাজ করছ গাঙ্গোর?

—তোমার তাকে কী, রেন্ডির বাচ্চা?

—তুমি...জামাটা...খোলো...

গাঙ্গোর নিশ্বাস ফেলে ঘনঘন। ক্রোধে খনখনে গলায় বলে, শুনতে পাচ্ছ? সবসময়ে বাজাচ্ছে, গাইছে, পিছনে লেলিয়ে দিচ্ছে ছেলেদের...চোলি কা পিছে...চোলি কায়...

—না গাঙ্গোর...

—তুমিও বহোত হারামি বাবু...আমার ছাতির ফটোক উঠাতে, না? বেশ...দেখাচ্ছি...কিন্তু পকেটে যা আছে সব নেব, স—ব...

লণ্ঠনের শিল্যুয়েটে গোদামের দেয়ালে দুটি ছায়ার ভায়োলেন্ট আচরণ। গাঙ্গোর চোলি খুলে ফেলে সেটা উপীনকে ছুড়ে মারে। দেখ, দেখ দেখ খড়—ভুষি নেকড়া,—দেখ কী আছে।

স্তন নেই। দুটি শুকনো ঘা, কুঁচকানো চামড়া, একেবারে সমতল। আগ্নেগিরির ক্রুদ্ধ ক্রেটার দুটি গাঙ্গোরের গলায় উপীনকে গলন্ত লাভা ছুঁড়তে থাকে,—গ্যাংরেপ...কামড়ে ছিঁড়ে গ্যাংরেপ...পুলিশ... আদালতে কেস...আবার লকাপে গ্যাংরেপ...এখন ঝারোয়া থেকে সেওপুরা...সেওপুরা থেকে ঝারোয়া... ঠেকাদার গাহক ধরে..পাবলিক সাতায়...গানা বাজায় গানা...

উপীন টলতে-টলতে উঠে দাঁড়ায়।

গাঙ্গোর ক্ষিপ্র হাতে ওর পকেটে হাত ঢোকায়, প্যান্টের পকেট হাতড়ায়, কী হিংস্র ক্ষোভের গন্ধ ওর গায়ে...তারপর লাথ মারে মাটিতে।

উপীন বেরিয়ে আসে, তখনো গাঙ্গোর চেঁচাচ্ছে, কথা বলছে, দমাদম লাথ মারছে কারোগেটেড টিনের দেয়ালে। উপীন ছুটতে থাকে। চোলির পিছনে কোনো নন ইস্যু নয়, পিছনে গ্যাংরেপ থাকে, —কোনো নন ইস্যু নয় গণধর্ষণ থাকে, উপীন জানতে চাইলে জানতে পারত, জানতে পারত।

উপীন রেললাইন ধরে দৌড়য়।

উজান তার অনেক পরে পৌঁছেছিল। তখন ঝারোয়া শান্ত। গোদামঘরগুলির জায়গায় নয়া বাসডিপো। ঝারোয়াতে নতুন থানা। একটি মৃতদেহের ফোটো পেয়েছিল, যা কয়েক মাসের পুরোনো।

গাঙ্গোর নামে ঝারোয়াতে কেউ থাকে না।

নিরুদ্ধিষ্ট উপীনপুরীর সন্ধান জারি আছে কাগজেকলমে। এ সব ফাইল বড় তলিয়ে যায় অন্যান্য ফাইলের নীচে।

সকল অধ্যায়
১.
স্ত্রীর পত্র
২.
অবনীভূষণের সাধনা ও সিদ্ধি
৩.
রসময়ীর রসিকতা
৪.
মহেশ
৫.
ভরতের ঝুমঝুমি
৬.
ঝড়
৭.
কলঙ্কিত সম্পর্ক
৮.
কবির মেয়ে
৯.
এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা
১০.
পথের কাঁটা
১১.
শহুরে
১২.
পুঁইমাচা
১৩.
প্রতিহিংসা
১৪.
বেদেনী
১৫.
আঙটি
১৬.
কসাই
১৭.
অতি সাধারণ ঘটনা
১৮.
রাজা
১৯.
বদলি মঞ্জুর
২০.
প্রেমের বি-চিত্র গতি
২১.
হ্যাংম্যান
২২.
নিবারণের মৃত্যু
২৩.
রুদ্রের আবির্ভাব
২৪.
তেলেনাপোতা আবিষ্কার
২৫.
নেড়ে
২৬.
দুকান কাটা
২৭.
তৃতীয় রিপু
২৮.
বৈয়াকরণ
২৯.
অতসী মামি
৩০.
পোস্টার
৩১.
ফেরিওলা
৩২.
জ্যোতিষী
৩৩.
পাশের বাড়ির মেয়ে
৩৪.
ফসিল
৩৫.
আদিম
৩৬.
আজ কোথায় যাবেন
৩৭.
ঘরন্তী
৩৮.
নিম অন্নপূর্ণা
৩৯.
বাঈজী
৪০.
রস
৪১.
টোপ
৪২.
ইঁদুর
৪৩.
বাঁদী
৪৪.
সুখ
৪৫.
পিকুর ডাইরি
৪৬.
ভারতবর্ষ
৪৭.
সাগিনা মাহাতো
৪৮.
আদাব
৪৯.
চোলি কা পিছে
৫০.
রানীরঘাটের বৃত্তান্ত
৫১.
ঘরবাড়ি
৫২.
নিশীথে সুকুমার
৫৩.
অশ্বমেধের ঘোড়া
৫৪.
রাজা যায় রাজা আসে
৫৫.
গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
৫৬.
রাজার টুপি
৫৭.
খানাতল্লাস
৫৮.
শ্বেতপাথরের টেবিল
৫৯.
উদ্বাস্তু
৬০.
মঁসিয়ে হুলোর হলিডে
৬১.
আত্মজা
৬২.
বড় পাপ হে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%