সমরেশ মজুমদার

টিফিন শেষ হবার ঘণ্টা এখনই পড়বে। ক্লাসে যাবার জন্য এবার প্রস্তুত হতে হয়। একটু যেন তেষ্টা পেয়েছে বলে বোধ হচ্ছে। এখনই আবার ক্লাসে গিয়ে চেঁচাতে হবে—গলাটা ভিজিয়ে নেওয়া ভাল। টেবিলের উপর মৌলবী সাহেবের পা দুটো নড়ছে। পাশেই পানের কৌটো। কৌটোটার ভিতর থেকে খানিকটা ভিজা খয়েরি নেকড়া বেরিয়ে এসেছে—দেখলেই গা ঘিনঘিন করে—দিনরাত দাঁত খোঁটেন মৌলবী সাহেব আঙুল দিয়ে —হাত ধোয়া নেই—কিছু না, সেই হাতেই পান বার করে খাবেন। অথচ কিছু বলবার উপায় নেই। এই সব অনাচারের মধ্যে রাখা জল খেতে মন সরে না। তাঁর দিককার দেওয়ালের পেরেকে টাঙানো জল-তুলবার দড়িটা পেড়ে নিলেন পণ্ডিতজি। আর এক হাতে লোটা। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ তিনি—পূজা আহ্নিক করেন—শুদ্ধাচারে থাকেন—কুক্কুটাণ্ড দেখলে বমি ঠেলে আসে। ছেলেদের স্কুলে যখন চাকরি করতেন, তখন তেওয়ারী চাপরাশীটা জল তুলে এনে দিত। এখানে সে রামও নেই, আযোধ্যাও নেই। মিথিলার শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ তিনি; জেলা স্কুলের চাকরি থেকে পেনশন নেবার পর মেয়ে স্কুলে চাকরি নিয়েছেন। কিন্তু কটা টাকার জন্য নিজের আচার-বিচার বিসর্জন দিতে আসেননি এখানে। স্কুলের দাইদের হাতের জল কি তিনি খেতে পারেন? লোটা মেজে নিজ হাতে ইঁদারা থেকে জল তুলে আলগোছে ঢকঢক করে খেয়ে যা তৃপ্তি, তা কি কখনও অপরের এনে দেওয়া জলে পাওয়া যায়?...
আজ মাস দুয়েক থেকে পণ্ডিতজির মনটা ভালো যাচ্ছে না। একটি মুমূর্ষু মহিলার মুখ থেকে নির্গত একটি বাক্য, তাঁর কর্ণগোচর হবার পর থেকে অষ্টপ্রহর তাঁকে পীড়া দিচ্ছে। বাক্য নয়, বাক্যের একটি শব্দ। না না, এর মধ্যে ব্যক্তিগত কিছু নেই; এ হচ্ছে নিছক একটা ব্যাকরণের প্রশ্ন। মনের এই অস্থিরতার জন্য পণ্ডিতজি আজকাল নিজে উপযাচক হয়ে মৌলবী সাহেবর সঙ্গে বেশি করে গল্প করা আরম্ভ করেছেন।
...আর যদি তিনি স্কুলের দাইদের হাতের জল খেতেনও তা হলেও কি এখান থেকে চেঁচিয়ে দাইকে ডেকেও এক গ্লাস জল আনতে বলতে পারতেন?...
'মৌলবী সাহেব, কোন একটা কাজে এখান থেকে দাই, দাই বলে চীৎকার করতে লজ্জা করে না?'
'লজ্জা মনে করলেই লজ্জা। দাই বলতে দ্বিধা হয়তো হরখুরমা বলে ডাকলেই পারেন।'
...মৌলবী সাহেব ঠিক বুঝতে পারেননি কেন এই দ্বিধা, কিসের এই লজ্জা। সে দ্বিধাটুকু ওঁর মনে জাগে না যে কেন, তাই আশ্চর্য।...দ্বে বিধে—দ্বিধা—তদ্ধি-তান্ত শব্দ।...
'মেয়ে স্কুলের পুরুষ শিক্ষক। আমাদের অবস্থাটা এখানে একটু কেমন কেমন না?'
আফিংখোর মৌলবী সাহেব এতক্ষণে চোখ খুললেন—পণ্ডিতজীর কথার সমর্থনে একটু রসিকতা করবার জন্য।
'আপনাদের সানসকির্তে আছে না— হাংস মধ্যে বগুলা যথা—তেমনি আর কি আমরা এখানে।'
না। ঠিক এই ভাবটার কথা পণ্ডিতজী বলতে চান নি। তবু মৌলবী সাহেবের কথার প্রতিবাদ সোজাসুজি করতে পারলেন না। স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য তুলে একটু খোঁচা দিয়ে কথা বললেন।
'আপনাকে আর বক বলি কি করে। বকের পালকের মত আপনার সাদা চুল আর দাড়ি, আবার ভ্রমরের মতো কালো হয়ে উঠেছে। আপনি বক কেন হতে যাবেন—আপনি হলেন ভ্রমর।'
সম্প্রতি মৌলবী সাহেব আবার আর একটা নতুন বিবি ঘরে আনবেন ঠিক করেছেন। কালো কুচকুচে দাড়িগুলোর মধ্যে আঙুল চালিয়ে তিনি হাসতে হাসতে জবাব দিলেন—'হাতি চলে বাজারে, কুকুর ডাকে হাজারে।'
'কিন্তু বুঝলেন কিনা মৌলবী সাহেব—সেই হাতি যখন পাঁকে পড়ে...'
মৌলবী সাহেব কথাটাকে শেষ করতে দিলেন না।
'আপনি চুল সাদা রেখেছেন বলে বলছেন। না? বগুল-ভকত (বকধার্মিক) দেখতে সাদাই হয়।' নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে আকুল মৌলবী সাহেব। সে হাসিতে যোগ দেবার চেষ্টা করেও পারলেন না পণ্ডিতজি। বকধার্মিক শব্দটা তীরের মতো তাঁর মনের গভীরে গিয়ে বিঁধেছে। আজ দুই মাস থেকে যে কথাটি তাঁকে পীড়া দিচ্ছে, তারই সঙ্গে যেন বকধার্মিক কথাটার সম্বন্ধ আছে।
আচমকা একটা স্পর্শকাতর জায়গায় ঘষটানি লেগেছে। মৌলবী সাহেব নিজের খেয়াল-খুশিতেই অষ্টপ্রহর মশগুল; পণ্ডিতজির মুখ চোখের চকিতের বৈলক্ষণ্য তাঁর নজরে পড়ল না। তাঁর টেবিল তোলা নড়ন্ত পা দুটোকে দেখে হঠাৎ অপ্রসন্ন হয়ে উঠল পণ্ডিতজির মন। চাকরির জীবনে অনেক কিছুই গা-সওয়া করে নিতে হয়। এখানে আসা থেকে অনেক কিছুই সইয়ে নিতে হয়েছে তাঁকে। মেয়ে স্কুলে তাঁদের গতিবিধি অবাধ নয়; সর্বত্র বাঞ্ছিতও নয়। স্কুলঘর থেকে একটু দূরে তাঁদের এই ঘরখানি। আগে ছিল স্কুলের ঝাড়ুদারনীর ঘর। এখন সেই ছোটটো ঘরখানার মধ্যে পাতা হয়েছে একখানা টেবিল, দুপাশে দুখানা চেয়ার। টেবিল-খানাকে দিয়ে অলিখিত আইনে তাঁরা ঘরখানাকে হিন্দুস্থান পাকিস্তানে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন; একদিকে থাকে ঘটি, আর একদিকে থাকে বদনা। নিজের ঘটিটাকে নিয়ে তিনি বার হলেন ঘর থেকে। বহুকাল তিনি আর মৌলবী সাহেব এক সঙ্গে কাজ করেছেন জেলা স্কুলে। কিন্তু তাঁর পা-দোলান এত খারাপ এর আগে আর কখনও লাগেনি। ক্লাসে গিয়ে ঝিমুতে ঝিমুতে পা-দোলানো তাঁর চিরকালের অভ্যাস। হেডমাস্টারমশায়রা বলে বলে হার মেনে গিয়েছিলেন; মৌলবী সাহেব তাঁদের ধমক পর্যন্ত গায়ে মাখতেন না। এমন একটা খোশমেজাজি লোক হঠাৎ তাঁকে বকধার্মিক বললেন কেন? নিজের জানতে তিনি তো মিথ্যাচার কখনও করেন না। টোলে পড়বার সময় কিশোর বয়সে একবার কৃচ্ছাসাধনার বাতিক জেগেছিল। তাঁর জীবন-যাত্রায় আজও তার রেশ রয়ে গিয়েছে। সৎ ও নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের লোক বলে পাড়ায় তাঁর খ্যাতি। তিনি নেপালের মহাকালী দর্শন করে এসেছেন, কলকাত্তাবালী কালীর চরণে জবাপুষ্প দেবার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছে, কামরূপ কামাখ্যায়ও তিনি সস্ত্রীক তীর্থ করে এসেছেন। তাঁর নিষ্ঠা ও সদাচারের মধ্যে কোথাও তো একটুও ফাঁকি নেই। তিনি যা নন তা দেখাতে তো কোনদিন চেষ্টা করেন নি। তবে কেন মৌলবী সাহেব তাঁকে বকধার্মিক ভাবলেন? টোলে পড়বার সময় সেখানকার পণ্ডিতমশাই তাঁকে খুব স্নেহ করতেন, তিনি বলেছিলেন, 'তুরন্ত, তুমি ব্যাকরণ পড়। কাব্য পড়ে কি হবে? বড় মনকে চঞ্চল করে ও জিনিস। বিনাশ্রয়ং ন তিষ্ঠন্তি কবিতা বণিতা লতা। ইন্দ্রিয়াশক্তির অবলম্বনেই কাব্যের রস জীবিত থাকে।' সেইজন্য গুরুর আদেশে, লঘু চাপল্যের হাত থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য পণ্ডিতজি মেরুদণ্ডহীন কাব্যের বদলে ব্যাকরণ পড়েছিলেন। ব্যাকরণের বিধানগুলোর মতনই আষ্টেপৃষ্ঠে সংযমের শৃঙ্খলে বাঁধা তাঁর জীবন, তাঁর আচরণ, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ। তার মধ্যে বিচ্যুতি নেই। তবে কেন মৌলবী সাহেব অমন কথাটা বললেন? না না, ওটা একটা নির্দোষ রসিকতা—কিছু না ভেবে বলা—ঠাট্টা করে কথার পৃষ্ঠে বলা কথা মাত্র। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। ও বিশেষণটা কখনই তাঁর সম্বন্ধে প্রযোজ্য নয়। আর সেই মুমূর্ষুর উক্তির যে শব্দটি দু-মাস থেকে তাঁর মনে কিরকির করে বিঁধছে, সেটা একটা সর্বনাম; তার উপর বহুবচন। দুটোর মধ্যে কোন মিল নেই, কোন সম্পর্ক নেই। শব্দটা হচ্ছে 'ওরা' বাক্যটি হচ্ছে 'ওরা' কি ওই চায়। এই 'ওরা'। শব্দটিকে নিয়েই যত গোলমাল। স: তৌ তে—ওরার অর্থ তে।...
হঠাৎ নজরে পড়ল হেডমিস্ট্রেস নিজের কোয়র্টার থেকে তাড়াতাড়ি আসছেন। চোখ নামিয়ে নিলেন; চোখাচোখি হয়ে গেলে অপ্রস্তুত হতে হত। হেডমিস্ট্রেস যখন আসছেন, তখন টিফিন শেষ হবার ঘণ্টা এখনই পড়বে নিশ্চয়। নিজেদের বসবার ঘরে পৌঁছে তবে মাটি থেকে চোখ তুললেন উপরে পণ্ডিতজি। অকূল সমুদ্রের মধ্যে নির্বিঘ্ন দ্বীপ এই ঘরখানি। টেবিলের উপর পা-জোড়া নড়ছে। মৌলবী সাহেবের প্রায় সারাদিনই ছুটি, কেন না সব ক্লাসে উর্দু পড়বার মেয়ে নেই। সংস্কৃতের ছাত্রী এ স্কুলে কম নয়। পণ্ডিতজি নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে, অভিভাবকদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছাত্রী জুটিয়েছেন; নইলে মেয়েরা আবার আজকাল অন্য সব ফাঁকির বিষয় নিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে চায়। সংস্কৃত ব্যাকরণ না পড়লে শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে কি করে, নৈতিক অনুশাসন আসবে কোথা থেকে,—একথা কেউ বুঝবে না। মৌলবী সাহেবের কিন্তু ছাত্রী জুটলো কিনা, সেসব বিষয়ে কোন দুশ্চিন্তা নেই।
তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বলে ক্লাসে যাওয়া দেখায় খারাপ; ভেবে নিতে পারেন যে 'বকধার্মিক' বলবার জন্য চটেছেন তিনি, তাই পণ্ডিতজি জিজ্ঞাসা করলেন—'ও মৌলবী সাহেব, ক্লাস নেই নাকি?'
মৌলবী সাহেব চোখ বুঁজেই উত্তর দিলেন—'আমার আবার টিফিনের পরের পিরিয়াডে কোনদিন ক্লাস থাকে নাকি?'
'বেশ আছেন মৌলবী সাহেব।'
'যে যেমন নসিব নিয়ে এসেছে।'
'আচ্ছা আপনি ততক্ষণ ঝিমুতে ঝিমুতে পা দোলান; আমি ক্লাস ঠেঙিয়ে আসি।'
নিজের অতর্কিতে তিনি আজ মৌলবী সাহেবের প্রতি রূঢ় বাক্য ব্যবহার করছেন বারবার। কিন্তু যাঁকে বলা তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হাসির রেখা।
'আরে ভাই, যে কটা টাকা মাইনে দেয়, তার বদলে দিনে পাঁচ ঘণ্টা করে পা দোলানর মেহনতই যথেষ্ট।'
পাটকরা চাদরখানা পণ্ডিতজি কাঁধের উপর সাজিয়ে নিলেন। পাকা গোঁফ-জোড়ার উপর হাতের উলটো পিঠটা বুলিয়ে নিলেন একবার। ঠিক আছে সব। হঠাৎ খটকা লাগল মনে—ছেলেদের স্কুলে চাকরি করবার সময়ও কি ক্লাসে পড়াতে যাবার আগে, চাদর ও গোঁফের বিন্যাস সম্বন্ধে এত সজাগ থাকতেন? ঠিক মনে পড়ছে না। তবে একটা বিষয় না স্বীকার করে উপায় নেই; চিরকাল তিনি নিজের জামা-কাপড় সাবান দিয়ে কেচে নিতেন; ইদানীং ধোপার বাড়িতে দেন। তবে এসবগুলো ঠিক প্রসাধনকর্ম নয়। দাঁত খুঁটে হাত ধোবার মতো খেয়ে কুলকুচা করবার মতো নির্দোষ অভ্যাস।...
ঘণ্টা পড়ল। পণ্ডিতজি ক্লাসের দিকে পা বাড়ালেন। তাঁর অসাক্ষাতে সবাই তাঁকে তুরন্ত পণ্ডিত বলে ডাকে। কিন্তু তিনি নিজের নাম দস্তখত করবার সময় লেখেন—তুরন্তলাল মিশ্র, ব্যাকরণতীর্থ। বাড়ির চিঠিতে পর্যন্ত। ব্যাকরণ যেমন তার অস্থিমজ্জায় ঢুকে গিয়েছে, ব্যাকরণতীর্থ পদবীটা তেমনি তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গিয়াছে। প্রতিমাসে একবার করে আগে থেকে কোনও সূচনা না দিয়ে, পুরনো পড়ার পরীক্ষা নেন পণ্ডিতজি। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছেন যে আজ এই ক্লাসের ছাত্রীদের পরীক্ষা নেবেন।
...এই ক্লাসের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি বকুনি খায় হেডমিস্ট্রেসের কাছে, সবচেয়ে বেশী চেঁচামেচি করে বলে। মহান শব্দ—মহাঞ্ছব্দ:...। ছেলেদের দুষ্টু বলা চলে, কিন্তু মেয়েদের দুষ্টু বলতে বাধে। অবাধ্য কথাটাও ঠিক হয় না। হ্যাঁ, একটু চঞ্চল বেশি। নৃত্যন-চকোর:—নৃত্যংশ্চকোর:...। কোন ক্লাসের শান্ত-অশান্ত হওয়া নির্ভর করে সেই ক্লাসের লীডারদের সাহসের দৌড় কতদূর তারই উপর। কিন্তু তিনি চিরকাল লক্ষ্য করে আসছেন যে সব ক্লাসের ছাত্ররাই সংস্কৃত পণ্ডিতের পিছনে লাগতে ভালবাসে। দেবভাষার অনুস্বার বিসর্গসম্বলিত উচ্চারণগুলোই ছাত্রছাত্রীদের চোখে সংস্কৃত শিক্ষকদের ছোট করে দেয় কিনা কে জানে। ব্যাকরণের 'ষষ্ঠী চানাদরে' বিধানটি পড়াবার সময় হাসেনি, এমন ক্লাস তিনি দেখেন নি। প্রথম যখন চাকরিতে ঢোকেন, তখন ভাবতেন যে ইংরেজি না জানা পণ্ডিত বলেই ছেলেরা তাঁকে উপেক্ষা করে। কতকটা এইজন্য, আর কতকটা ক্লাসে পড়ানর সুবিধার জন্য, প্রাণপণ চেষ্টা করে সামান্য ইংরেজি শিখেছিলেন। এর ফল কিন্তু হয়েছিল উলটো; ছাত্ররা আরও বেশি করে তাঁর পিছনে লাগত। কিন্তু সেই সামান্য ইংরেজির জ্ঞানটুকু তাঁর অতি গর্বের জিনিস। সুবিধা পেলেই ক্লাসে জানিয়ে দিতে ছাড়েন না যে তিনি ইংরেজি জানেন।
এই ক্লাসের লীডার মালবিকা। প্রখর বুদ্ধির দীপ্তি তার প্রতিটি কথা থেকে ঠিকরে পড়ে; কিন্তু প্রগলভতা যেন আর একটু কম হলেই ভাল হত। ক্লাসের সজীব গুঞ্জনধ্বনি কানে আসছে।...
একটি মেয়ে দূর থেকে তাঁকে দেখেইে ক্লাসে খবর দিল—'তুরন্তপণ্ডিত আসছে রে!' তিনি ক্লাসে ঢুকলেন হন হন করে—যেন একমিনিটও সময় নষ্ট করতে চান না। ছাত্রীদের মুখে একটা কৃত্রিম গাম্ভীর্যের মুখোশ। হাসি চাপবার চেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে। ছেলেদের স্কুল হলে তিনি বেশ কয়েকটি চপেটাঘাত দিয়ে ক্লাস আরম্ভ করতেন; কিন্তু মেয়ে স্কুলে তাঁর সেই চিরাচরিত পদ্ধতি অচল। মেয়েদের গায়ে কি হাত তোলা যায়? মায়ের জাত! দেবীর মতো পূজ্যা কুমারীরা। তাঁদের যুগে এই বয়েসের মেয়েদের কবে বিয়ে হয়ে যেত।
ক্লাসের উপযুক্ত বাতাবরণ ফিরিয়ে আনবার জন্য তুরন্তপণ্ডিত চেঁচিয়ে সুর করে বললেন—'বা—আ-আই ইনটেলেকট।' অর্থাৎ মতি শব্দের তৃতীয়ার একবচনে কি হয়? খুব সহজ প্রশ্ন দিয়ে আরম্ভ; এ শুধু গলা পরিষ্কার করে নিচ্ছেন; পরে আস্তে আস্তে শক্ত হবে। মুহূর্তের মধ্যে ছাত্রীরা বুঝে গেল, আজ গতিক সুবিধার নয়। অমন হন হন করে ঘরে ঢুকতে দেখে আগেই বোঝা উচিত ছিল।
এতক্ষণে তিনি তাঁর দৃষ্টি কেন্দ্রিত করেছেন লিলির দিকে। ক্লাসের মধ্যে একমাত্র এই মেয়েটির দিকে তাকাতে তাঁর মনে কোনওরূপ সঙ্কোচ আসে না। মেয়েটি কুরূপা।
'এসব নামতার মতো কণ্ঠস্থ থাকা উচিত। ইউ! ইউ বয়! তুমি বলো!'
সারা ক্লাস ফেটে পড়ল।
...কেন? হঠাৎ এত হাসির কি হলো? মালবিকাই নিশ্চয় আরম্ভ করেছে। ও অভ্যাসবশে ভুলে 'ইউ বয়' বলে ফেলেছেন। এরকম ভুল তাঁর হয় মাঝে মাঝে। আজ দিনটাই খারাপ যাচ্ছে, সকাল থেকে। আর বুঝি ক্লাসকে শাসনে রাখা যাবে না আজ! নিজের উপর বিরক্ত হয়ে ওঠেন তিনি।
মালবিকা উঠে দাঁড়িয়েছে। তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই পণ্ডিতজি চোখ নামিয়ে নিলেন। মালবিকার মুখে কৌতুকের হাসি।
'একটা কথা বলি পণ্ডিতজি, কিছু মনে করবেন না। আপনার পাইতাটা কানে জড়ান রয়েছে।'
...ছি, ছি, ছি! (পশ্যন—চকিত:—পশ্যংশ্চকিত:)...লজ্জায় পণ্ডিতজির মুখ লাল হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি পইতাটা জামার মধ্যে ঢুকিয়ে নিলেন। অপ্রস্তুতের ভাবটা কাটিয়ে নেবার জন্য আরও জোরে সুর করে চেঁচালেন—'বা—আ—আই ইন-টেলেকট।'
উচ্চহাসির রোল তাঁর গলার সুরকেও ছাপিয়ে উঠেছে।
হাসতে হাসতেই মালবিকা জিজ্ঞাসা করে—'আজ বুঝি ব্যাকরণের পুরোনো পড়া ধরবেন পণ্ডিতজি?'
অন্যদিকে তাকিয়েই পণ্ডিতজি বললেন—'আবার ব্যাকরণ শব্দটির ভুল উচ্চারণ করছ? প্রতিদিন কি একবার করে বলে দিতে হবে?'
উপরের ক্লাসগুলোর সব মেয়েই বাঙালি। অবাঙালিদের আগেই বিয়ে হয়ে যায় বলে, তারা আর অতদূরে পৌঁছতে পারে না। বড় ভাল লাগে পণ্ডিতজির এইসব বাঙালি মেয়েদের। ওরা হাসাতে জানে; ওদের কথার ধ্বনি মৈথিলীর মত মিষ্টি; কিন্তু এক দোষ ওদের—সংস্কৃত ভাষার উচ্চারণ মোটেই করতে পারে না। বকতে গেলে, হেসে ফেলবে; কি করে শেখাবে বলো এদের। কিন্তু ওদের মুখের ভুল উচ্চারণের ধ্বনিটা শুনতে খুব ভাল লাগে। ইচ্ছা করে অনেকক্ষণ ধরে শোনেন।...(মহতী-ইচ্ছা—মহতীচ্ছা)।...কুক্কুটাণ্ডলোভী বাঙালি পুরুষরা কবে সাহেব হয়ে যেত; শুধু পারেনি এই মেয়েদের জন্য। নিষ্ঠায়, আচার-বিচারে পুরুষদের বিচ্যুতি-টুকু মেয়েরা পুষিয়ে দিয়েছে বলেই ওদের সমাজটা এখনও টিকে আছে। ওদের সম্বন্ধে কৌতূহল তাঁর কোনওদিন মিটাবার নয়।...
কোন কথার কি প্রতিক্রিয়া হয় পণ্ডিতজির উপর, সে সব ছাত্রীদের মুখস্থ।
'কেমনভাবে ব্যাকরণ উচ্চারণ করব পণ্ডিতজি?'
মালবিকার পাতা ফাঁদে ঠিক পা দিলেন তিনি।
'বলো—বিয়া-কারণ—বিয়া-করণ।'
'বিয়া-করণ, বিয়া-করণ'—বিয়া আর করণ শব্দ দুটিকে ভেঙে আলাদা করে বলেছে সে। ক্লাস সুদ্ধ সবাই হাসছে। সকলেই নিশ্চিন্ত যে পণ্ডিতজীর পরীক্ষা নেবার ঝাঁজ আজকের মত কমিয়ে দিয়েছে মালবিকা।
'আবার বলো। ত্রিশবার বলো।'
এই চটুলা মেয়েটিকে শাসনে রাখা শক্ত। কিন্তু মেয়েটি সত্যিই খুব ভালো।...মাস দুয়েক আগের সেইদিনকার কথা তিনি ভোলেননি। তখন তাঁর মাথায় অত বড় বিপদ। ছোট শালা স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিল এখানে বেড়াতে। সৌখীন মানুষ দিনে তিনবার চা না হলে চলে না। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে স্টোভ। কে বোঝাতে যাবে এইসব ছেলেছোকরাদের যে, বাপদাদারা এতকাল যা করে এসেছে তাই করাই ভালো। হল ও কি তাই। স্টোভ ধরাতে গিয়ে শালাজের শাড়ীতে আগুন লেগে যায়। ভীষণভাবে পুড়ে যান তিনি। জামাকাপড়ে আগুন লেগেছিল কিনা, তাই গলা থেকে পা পর্যন্ত একেবারে বেগুন পোড়ার মত পুড়ে থসথসে হয়ে যায়। চোখে দেখা যায় না সে দৃশ্য। সে কি অসহ্য যন্ত্রণা! এখনও মনে করলে গা শিউরে ওঠে।
কিন্তু আশ্চর্য, মুখখানি একটুও পোড়েনি! গলা পর্যন্ত ঢেকে দিলে, কে বলবে যে তিনি পুড়ে গিয়েছেন। প্রথম একদিন তো অজ্ঞান হয়েই ছিলেন। জ্ঞান ফিরে আসবার পর থেকে তাঁর বাঁচবার আকাঙ্ক্ষা মোটেই ছিল না, যেতে পারলে যেন বাঁচেন।...সেই সময় বোঝা গিয়েছিল, মালবিকা মেয়েটি কত ভাল। এত প্রগলভতা সত্বেও কত কোমল ওর হৃদয়। সে এসে বলেছিল—'পণ্ডিতজি, সীতাকুণ্ডের সন্ন্যাসীর দেওয়া একটা পোড়ার ওষুধ মা জানেন, লাগাবেন কি? আস্ত ডাব পুড়িয়ে তয়ের করতে হয়। খুব ভাল ওষুধ, পোড়ার দাগ একেবারে থাকে না।'
তাঁর ইচ্ছা ছিল; কিন্তু তাঁর শালার অ্যালোপ্যাথিক ছাড়া আর অন্য কোন ওষুধে বিশ্বাস নেই। মালবিকাকে সেকথা বললেন। তবু সে পরদিন ওষুধ নিয়ে হাজির তাঁর বাড়িতে। কোথা থেকে ডাব জোগাড় করেছে, কখনই বা মাকে দিয়ে ওষুধ তৈরি করিয়েছে, সেই জানে। কিন্তু সে ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি—আজও কৌটায় অমনি পড়ে আছে। ব্যবহার করলে কি হত কে জানে। তার বাড়িতে বেড়াতে এসে এত বড় অঘটন ঘটেছিল, তাই নিজেকে আজও দোষী মনে হয়, খানিকটা দায়িত্ব ছিল বৈকি। তাঁর ছোটশালার মুখের দিকে তাকান আর যেত না, শালাজ স্বর্গে যাবার পর। অনেক মৃত-পত্নীক দেখেছেন, কিন্তু অত মুষড়ে ভেঙে পড়তে আর কাউকে দেখেন নি। ওর জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল। বড় অনুরাগ ছিল দুজনকার মধ্যে; সচরাচর দেখা যায় না অমন। এত অনুরাগ, তবু কেন স্বামীর সম্বন্ধে ওরকম ধারণা ছিল সেই পতিব্রতার?...
'হয়ে গেল ত্রিশবার? গুড! Expound সমাস—অর্ধদগ্ধশরীর:।
'অর্ধদগ্ধ শরীরং যস্য স:—বহুব্রীহি।'
'গুড। কিন্তু অর্ধদগ্ধটুকু যে বাকি থেকে গেল।'
'অর্ধং যথাতথা দগ্ধম—সুপ—সুপোতি সমাস।'
'গুড। কিন্তু চংড়ী মছলী খাওয়া বাঙালীরা দন্ত্য স উচ্চারণ করতে পারে না। শমাশ নয়, বলো সমাস। দন্ত্য স দিয়ে।'
'ও তো পণ্ডিতজি সামাসা হয়ে যাচ্ছে।'
'ওই ঠিক উচ্চারণ ওই বলো দশবার।'
কচি কচি ছেলেমেয়েদের মুখের আধো-আধো বুলি যেরকম ভালো লাগে, সেই রকমই ভাল লাগছে এই মেয়েটির শুদ্ধ উচ্চারণ করবার ব্যর্থ চেষ্টার ধ্বনি। সঙ্গীতের ঝঙ্কারের মতো এর মধ্যেও একটা মিষ্টতা আছে।
...মধুরা: ঝঙ্কারা:—মধুরাঝঙ্ককারা।....
'হল দশবার? সিট-ডাউন! এবার গৌরী তুমি বলো। Expound সমাস—মৃত-পত্নীক। ভেবে বলো, তাড়াতাড়ি দরকার নেই। ভয় কিসের?...আশন-কতে। আশঙ্কতে? হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক হচ্ছে। গুড। সিট ডাউন। নেক্সট। গীতা। নম্বর এক, তুমি বলো। আজকাল গীতা নামটা এত বেশি কেন তোমাদের মধ্যে? কিন্তু নামটি বেশ ভাল। ওরকম গ্রন্থ আর নেই পৃথিবীতে।'
...স্ত্রীর অনুরোধে তিনি শালাজের মৃত্যুশয্যার পাশে গীতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। তখন শেষ সময়। যাঁকে শোনান, তাঁর তখন শোনবার বা বুঝবার ক্ষমতা ছিল না। আগের দিনেও শালাজ কথা বলেছেন; জ্ঞান ছিল পুরো মাত্রায়। যে কথাটি তাঁকে গত দু-মাস থেকে পীড়া দিচ্ছে সেটা তো তার আগের দিনেই বলা।...তাঁর স্ত্রী ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছিলেন তখন শালাজের গায়ে। পুরুষ মানুষদের সে ঘরে যাবার উপায় ছিল না। তিনি পাশের ঘরে উৎকণ্ঠিতচিত্তে দাঁড়িয়ে। ডাক্তারবাবু কোনও ভরসা দেননি রোগিনী সম্বন্ধে। ননদ কত কি বলে চলেছেন...'খুব হচ্ছে? ওষুধ দিতে লাগছে? ভাবনা কি, সেরে যাবে দিনকয়েকের মধ্যে। না, আবার কিসের? সারবে না। কত লোকের কত শক্ত শক্ত রোগ সেরে যাচ্ছে, আর তোমার এই ঘা-ফোস্কাটুকু সারবে না।'
...'না না আমার আর বেঁচে দরকার নেই'...'ছি, ওকথা বলতে নেই।'...
'আমার মরে যাওয়াই ভালো।'
'কি যে বলো। কেন, হয়েছে কি তোমার?' এর পরের কতকগুলি কথা তিনি মাঝের বন্ধ দরজায় কান লাগিয়ে বুঝতে পারেননি। একটু পরে আবার কানে এল...'না না সে সব ভেবো না তুমি। সর্বাঙ্গ পুড়েছে তোমার কোথায়? দেখ দিকিনি, এই ব্যথা বিষের মধ্যে তোমার মুখখানি কি সুন্দর দেখাচ্ছে;'...'ওরা কি ওই চায়'...যেন দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দটিও তাঁর কানে এল। অন্তরের তাগিদে বেরিয়ে এসেছে হৃদয় নিঙড়ানো কথা কয়টি। এই বাক্যটিই তাঁকে অস্থির করে তুলেছে গত দুই মাস থেকে। কথাটিকে মোটেই লঘু বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পাণিনীর সূত্রের মতই সংক্ষিপ্ত ও অর্থপূর্ণ। বহু টীকা ভাষ্য করেও আজও বোঝা গেল না, ঠিক কি মনে করে মহিলাটি ওই ওরা শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।....
'পণ্ডিতজি, আমিও কী সমাসের উচ্চারণ অভ্যাস করব নাকি?'
'ও, তুমি। নো। তুমি বলো সন্ধি—তদ-ছবি: —কি হয়? তচ্ছবি:। গুড। সখী-উক্তম-সখ্যুক্তম। গুড। বাণী-ঔচিত্যম। ঠিক হচ্ছে। বলো। হ্যাঁ বাণ্যৌচিত্যম। গুড। সিটডাউন। কিন্তু মূর্ধন্য ণ এর উচ্চারণ হল না। তোমরা যে দন্ত্য ন আর মূর্ধন্য ণ এর একই উচ্চারণ কর। আচ্ছা এবার বাণী উঠবে। বাণী তোমার নামের উচ্চারণ কর। সংস্কৃত উচ্চারণ। বাংলা নয়। যে নামের উচ্চারণ করতে পারে না, সে-নাম রেখে লাভ কি? দশবার বলো।'
এই চেষ্টায়, হাসির ধুম পড়ে গেল ক্লাসে। হেডমিস্ট্রেস অফিস থেকে বেরিয়ে, একবার বারান্দা দিয়ে ঘুরে গেলেন। পণ্ডিতজির ক্লাসের সময় এ তাঁর ডিউটি দাঁড়িয়ে গিয়েছে। ক্লাস শান্ত হয়ে গেল। অপ্রতিভ পণ্ডিতজি কথার খেই হারিয়ে ফেললেন অল্প কিছুক্ষণের জন্য।
মালবিকা আসছে। কেন তা তিনি জানেন। ফাঁকি দিতে পারলে ও ছাড়ে না; কিন্তু কি বুদ্ধিমতী! ও গন্ধ তেল মাখে। পায়ের নখ কাটে না কেন?...সে এসে টেবিলের উপর থেকে বাইরে যাবার পাসটা নিয়ে গেল। ছেলেদের স্কুলে এ ব্যবস্থা ছিল না। এ স্কুলেও অন্য শিক্ষয়িত্রীদের ক্লাসে 'পাস' এর ব্যবস্থা নেই। এ তিনি নিজে করেছেন, নিজের ক্লাসের জন্য পকেটে করে নিয়ে যান প্রতি ক্লাসে। প্রথমে গিয়েই টেবিলের উপর রেখে দেন, যাতে মেয়েদের বাইরে যাবার সময় মুখ ফুটে কথাটা বলতে না হয়। শোভন অশোভন সম্বন্ধে এত সজাগ কেন তিনি মেয়েদের বেলায়, এত নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে চলবার প্রয়াস কেন? এসব মেয়েরা তাঁর নাতনীর বয়সী; তবু কেন তিনি এদের সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক ব্যবহার করতে পারেন না? ছেলেদের স্কুলের সেই নি:সংকোচ ভাব এখানে আসে না কেন?...ক্লাসে এর পরে কি প্রশ্ন করবেন, কিছুতেই মনে করতে পারছেন না তিনি—সব গুলিয়ে যাচ্ছে। হেডমিস্ট্রেস একবার ক্লাসের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে চলে যাবার পর এমনিই হয়। স্ত্রী চ পুমাংশ্চ স্ত্রী পুংসৌ—দ্বন্দ্ব সমাস নিপাতনে সিদ্ধ—তাঁর বড় পছন্দসই প্রশ্ন, ছেলেদের স্কুলে থাকা কালের। নির্দোষ শব্দটি, কিন্তু এখানে জিজ্ঞাসা করতে বাধল। আবার খটকা লাগল মনে—আচ্ছা, বাঙ্গালি ছেলেদের মুখের ভুল উচ্চারণে সংস্কৃত বলা, তাঁর কানে কি এত মিষ্টি লাগত?...মনে পড়েছে আর একটা ব্যাকরণের প্রশ্ন। ছেলেদের ক্লাশে পড়াবার সময় প্রায়ই জিজ্ঞাসা করতেন—বিম্বোষ্ঠ: শব্দের স্ত্রীলিঙ্গে কি হয় বলো। বিম্বোষ্ঠ ও বিম্বোষ্ঠা দুই-ই হয়, এই উত্তর তিনি আশা করতেন। কিন্তু এই প্রশ্নটি যে মেয়েদের ক্লাসের অনুপযোগী। এসব শব্দ ব্যবহার না করেও যদি পারা যায়, তবে দরকার কি! কে কোন মানেতে নেবে কে জানে। ব্রাহ্মণের ঘরের বালবিধবাদের মতো, তাঁকেও যে সব সময় সর্তক থাকতে হয়; কে আবার কি কোথা থেকে বলে দেবে।...আচ্ছা ব্যাকরণের আমোঘ বিধানগুলি তো স্থানকালপাত্র নিরপেক্ষ। তবে তাঁর পড়ানর উপর পরিবেশের প্রভাব পড়ে কেন? মেয়েদের বেলা একরকম, ছেলেদের বেলা আর একরকম হয়ে যান কেন তিনি? দুজনের মনের ভাবই যে আলাদা। আদর্শ ছাত্র শিক্ষককে গুরু বলে ভক্তি করে—সেটা ভয়ের সম্বন্ধ; ছাত্রীরা শিক্ষয়িত্রীদের দিদি বলে—সেটা ভালবাসার সম্বন্ধ...কারণটা ঠিক মনের মতো হল না।
'লিলি! কাম টু দি বোর্ড।'
যখনই দিশেহারা পণ্ডিতজির মুখে ক্লাসে জিজ্ঞাসা করবার প্রশ্ন জোগায় না, তখনই তিনি লিলিকে ডাকেন। এই রুগ্না কুরূপা মেয়েটিই তাঁর খেই-হারানো নিবারাণের ওষুধ।
'লেখো, ওরা শব্দের সংস্কৃত কি। এর মধ্যে আবার ভাবছ কি?'
'আমি ভাবছিলাম যে আপনি সমাস, না হয় সন্ধি জিজ্ঞাসা করবেন।'
'বা:, বেশ জবাব। তাই শব্দরূপ জিজ্ঞাসা করলে পারবে না? তুমি হচ্ছ বিদুষীকল্পা—অর্থাৎ ইষদূনা বিদুষী বুঝেছ? সম্ভবত বোঝনি, শব্দরূপ যে জানে না, তার পক্ষে তদ্ধিত বোঝা কঠিন। ব্যাড, গো টু ইওর সিট।'
অযথা দরকারের চেয়েও চটে উঠেছেন পণ্ডিতজি। লিলির হাত থেকে খড়ি আর ঝাড়ন যথাস্থানে রাখবার নির্দেশ দেন।
এতক্ষণে নজরে পড়ল। ব্ল্যাকবোর্ডের উপর আগে থেকেই লেখা আছে—'বিয়াকরণ শব্দটি দিয়া একটি বাক্য রচনা কর। উত্তর : মৌলবী সাহেবের ন্যায় পুনরায় বৃদ্ধ বয়সে শ্রীতাড়াতাড়িলাল মিশ্র, বিয়াকরণতীর্থে যাইবার মনস্থ করিয়াছেন। গুড। সিট ডাউন।'
মৈথিলী আর বাংলার লিপি একই। সেইজন্য পণ্ডিতজির বাংলা পড়তে কোনও অসুবিধা হয় না। তুরন্ত শব্দটির হিন্দিতে অর্থ তাড়াতাড়ি। তাই তুরন্তলাল নামটা চিরকাল বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের হাসির খোরাক জুটিয়ে এসেছে। চটুলা মালবিকা একদিন তাঁকে তুরন্তলাল নামটার মানে পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করেছিল। দষ্টু ছেলেরা তো চিরকাল বাইরে যাবার ছুটি নেবার সময় বলত—তুরন্ত ফিরে আসবো পণ্ডিতজি। শুনে ক্লাসসুদ্ধ সবাই হাসত, আর তিনি বেশ উত্তমমধ্যম প্রহার দিতেন তাদের। কিন্তু তিনি এখানে মনে মনে হাসেন ছাত্রীদের এই সমস্ত রসিকতায়। বাঙালী মেয়েদের সূক্ষ্ম মনের অন্ধিসন্ধিগুলোর সম্বন্ধে তাঁর কৌতূহলের সীমা নেই। বোর্ডের লেখাটি নিশ্চয়ই মালবিকার; হ্রস্ব ইকারটা রেফের মত করে লেখা। সেই জন্যই ক্লাস থেকে পালিয়েছে। শব্দবিন্যাসে কিন্তু বেশ রসনিপুণতা আছে। সারা ক্লাস থেকে একটা চাপা হাসির শব্দ কানে আসছে। মেয়েরা জানে যে, হেডমিস্ট্রেসের সঙ্গে কথা বলতে হবে ভয়ে, পণ্ডিতজি কোনদিন নালিশ করতে যাবেন না তাঁর কাছে। তাই তাদের এত সাহস। মেয়েরা যে সব বোঝে। তারা যে সবসময় বলাবলি করে, প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের সময় পণ্ডিতজি অন্য শিক্ষয়িত্রীদের মধ্যে চোখ বুঁজে আড়ষ্ট হয়ে কেমন করে বসেছিলেন। তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে, ক্লাসের ছাত্রীদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, এ নিয়ে যে তারা কত সময় হাসিঠাট্টা করে নিজেদের মধ্যে।
পণ্ডিতজি ঝাড়ন দিয়ে বোর্ড পরিষ্কার করে নিয়ে লিখলেন—স: তৌ তো। তে বহুবচন, তে মানে ওরা। তে শব্দটির সঙ্গে ইংরাজি they শব্দটির কিরকম মিল লক্ষ্য করেছ লিলি? তিনি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে মুখ করেই বলছেন। তে'র জায়গায় গিয়ে খড়িসুদ্ধ হাত থেমে গিয়েছে।...সেই সতীসাধ্বী মরবার আগের উক্তিতে বহুবচন ব্যবহার করলেন কেন? 'ওরা কি ওই চায়।' 'ওরা' বলতে তিনি কি বুঝেছিলেন? নিজের স্বামীর কথাই কি তিনি তখন ভাবছিলেন? 'ওরা' বলতে সমগ্র পুরুষ জাতিকে তিনি বোঝেন নি তো? তা কি করে হবে। ওরূপ সামান্যকরণ যে ভুল, সে-কথা নিশ্চয়ই তাঁর শালাজও জানতেন। তাঁর জানাশোনা আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই কত নিষ্ঠাবান সংযমী পণ্ডিত তিনি দেখেছিলেন। সকলে সেরকম হতে যাবে কেন। স্বামীর সম্বন্ধে চূড়ান্ত মন্তব্যের তীব্রতা বয়স্কা ননদের সম্মুখে কমাবার জন্যেই কি তিনি অনিচ্ছায় একবচনের বদলে বহুবচন ব্যবহার করেছিলেন? নিজের স্বামীর সম্বন্ধেই বা ওরকম ধারণা হল কেন—সে পতিব্রতার? কি ভেবে সে মহিলা 'ওরা' বলেছিলেন তিনিই জানেন। দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যা:।...আচ্ছা এই ক্লাসের ছাত্রীরা তাঁকে আর মৌলবীসাহেবকে, একই শ্রেণির লোক বলে ভাবে নাকি? ব্ল্যাকবোর্ডের উপরকার লেখাটা দেখে ত তাই মনে হয়? কেন এরকমভাবে?...কি দেখে তাঁকেও ওই দলে ফেলল?
স্কুলের দাই চিঠি নিয়ে ক্লাসে এসে ঢুকল। খামে চিঠি এসেছে পণ্ডিতজির। ডাকপিয়ন হেডমিস্ট্রেসের কাছে স্কুলের ডাক দিয়ে যায়, তিনি তারপর যার যার চিঠি তার তার কাছে পাঠিয়ে দেন। দাই-এর হাত থেকে চিঠিখানা নেবার সময় খুব সাবধানে নিলেন পণ্ডিতজি, যাতে দাই-এর আঙুলের সঙ্গে তাঁর আঙুল না ঠেকে। এসব বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি সদা-জাগ্রত। কিন্তু আজ প্রথম খটকা লাগল মনে। প্রশ্ন করলেন নিজেকে—পরস্ত্রীর ছোঁয়াচ থেকে বাঁচবার জন্য এই এত শুচিবাই কেন?...কেন স্ত্রীলোকদের সম্মুখে সহজ ব্যবহার করতে পারেন না তিনি?
পণ্ডিতজি চিঠিখানা খুললেন। বড় শালা লিখেছেন তাঁর দিদিকে। এদেশে স্ত্রীর চিঠি স্বামীর নামেই আসে, তাই খামের উপর তাঁর নাম ছিল। ছোট শালার বিয়ে এক সপ্তাহ পরে; তাই বোন আর ভগ্নীপতিকে যেতে লিখেছেন। ছোট শালা কিছুতেই বিবাহ করতে রাজি হচ্ছিল না; অতি কষ্টে ধরেবেঁধে রাজি করান গিয়েছে।
চিঠি পড়েই কি জানি কেন পণ্ডিতজির মেজাজ বিগড়ে গেল ছোট শালার উপর।...দুই মাসও কাটেনি। সবুর সইছে না! আর কিছুদিন পর করলেই তবু কতকটা শোভন হত।
'লিলি, বুঝেছ—তে হচ্ছে বহুবচন। সাধারণত অনেক লোককে বোঝায়। কিন্তু বলতো একজন লোকের বেলায় কখন বহুবচন ব্যবহার হয়? জান না? নেকসট! নেকসট! এনিবডি ইন দি ক্লাস? কেউ জান না?...(মালবিকা থাকলে পারত)...। গৌরবে বহুবচন হয় কেউ জান না? স্ত্রীর উক্তিতে পতির সম্বন্ধে উল্লেখের সময়, সম্মানার্থে বহুবচনের ব্যবহার হতে পারে। বুঝেছ?'
পণ্ডিতজি ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লিখে দিলেন—'গৌরবে বহুবচন।' লেখাটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন, নিজের বিবেককে আশ্বাস দেবার জন্য। এতক্ষণে তাঁর ক্লাসের দিকে মুখ ফেরাবার সময় হল। নজর পড়ল লিলির দিকে। কাঁদছে তাঁর বকুনি খেয়ে। ছেলেরা বিলক্ষণ প্রহার খেয়েও কাঁদত না, কিন্তু সামান্য কথাতেই মেয়েদের চোখে জল আসে। তিনি এমন কিছু রূঢ় ভর্ৎসনা করেননি, যার জন্য এতক্ষণ ধরে কেঁদে ভাসাতে হবে।
'ললিতা, এবার তুমি বলো। সন্ধি। খুব সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব তোমাকে। মধু-উৎসব: কি হয়? বানান করে বলো। গুড। হ্যাঁ দীর্ঘউকার, মনে করে রেখো। সমাস কর— দ্বিতীয়া ভার্যা যস্য স:। হ্যাঁ। গুড। সিট ডাউন। নেকসট। গায়ত্রী। তুমি ভ্রম সংশোধন কর এই বাক্যটির—ভ্রমরা: পুষ্পমধু পিবতুম ধাবন্তি। কি? ভেবে বলো। হল না। এনিবডি ইন দি ক্লাস; কেউ পার না;...(মালবিকা এখনও ফেরেনি)!...পিবতুম ভুল। পাতুম হবে। মনে করে রেখো।'
...আজকে মালবিকাকে বেশ করে বকে দিতে হবে। একি অন্যায় কথা। গিয়েছে, সে কি এখন! সমস্ত ঘণ্টাটা বাইরে কাটিয়ে সে আসবে। প্রতিদিন সে এই করে! নাই দিয়ে মাথায় চড়েছে। এতটুকু আক্কেল নেই—অন্য মেয়েদেরও তো ওই পাসখানা নেবার দরকার হতে পারে।
মেয়েরা সকলেই জানে যে, পণ্ডিতজির সবচেয়ে কড়া ধমক হচ্ছে 'ব্যাড' শব্দটি। মালবিকা এসে ঘরে ঢুকল। তার মানে ঘণ্টা শেষ হবার আর দু-চার মিনিট মাত্র দেরি আছে। পাসখানা পণ্ডিতজির টেবিলের উপর রাখবার জন্য সে এগিয়ে আসছে। তেলের গন্ধটা নাকে এল।...শোভন:—গন্ধ শোভনোগন্ধ। পায়ের আঙুলের নখ কাটে না কেন?
'অনেক দেরি হল তোমার।'
'আমি তো পণ্ডিতজি পরীক্ষা দিয়ে, বিয়াকরণ সামাসার উচ্চারণ শিখে, তারপর গিয়েছি।'
মেয়েটি এমন সব কথা বলবে যে না হেসে উপায় নেই। বড় বড় পাকা গোঁফের মধ্যে হাসিটুকু আটকে গেল। ক্লাসের মেয়েরাও হাসছে। পণ্ডিতজি হাসি চাপবার চেষ্টা করতে করতে বললেন—'ক্লাস ফাঁকি দেবার শাস্তি হিসাবে তোমাকে আবার পরীক্ষা দিতে হবে।'
'উচ্চারণের পরীক্ষা নাকি পণ্ডিতজী?'
অপ্রস্তুতের ভাবটা কাটিয়ে নিয়ে তিনি বলেন—'না না। তুমি বলতো বিম্বোষ্ঠ: শব্দের স্ত্রীলিঙ্গে কি হয়?'
এত সহজ প্রশ্ন? মালবিকার মত ক্লাসে ফাস্ট-হওয়া মেয়েকে? ক্লাসের মেয়েরা একটু অবাক হল।
'বিম্বোষ্ঠী, বিম্বোষ্ঠা দুই-ই হয়।'
এতক্ষণে পণ্ডিতজি নিজেকে সামলে নিলেন। গুড, সিট ডাউন, বলতে গিয়ে থেমে গেলেন তিনি। মালবিকা ফিরে আসবার এক মুহূর্ত আগেই যে উনি ঠিক করেছিলেন, আসামাত্র আগেই ওকে কড়া ধমক দিতে হবে—ব্যাড বলতে হবে। মুহূর্তের অসংযতচিত্ততায় তিনি ব্যাড বলতে ভুলে গিয়েছেন। শুধু তাই নয়। আজ প্রথম এই স্কুলে বিম্বোষ্ঠ: শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ জিজ্ঞাসা করেছেন। ক্লাসের মেয়েরা কি তাঁর এই বিচ্যুতির কথা ধরতে পেরেছে? আতঙ্ক, বিষাদ, আর অনুশোচনার ছায়া পড়ল, তাঁর মনে। মনের কুহেলীর মধ্যে শুধু একটা জিনিস তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। 'ওরা' শব্দের অর্থ। ভদ্রমহিলা কাউকে বাদ দেননি। পক্ককেশ নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পর্যন্ত না। অদ্ভুত অর্থবোধিকা শক্তি কথা কয়টির। বৃথাই তিনি গত দুই মাস থেকে—একটি অলঘু বিষয়কে লঘু করবার চেষ্টা করছিলেন, গৌরবে বহুবচন সূত্র দিয়ে। বুঝেও বুঝতে চাচ্ছিলেন না। ঝাড়নখানাকে নিয়ে তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা গৌরবে বহুবচন কথা কয়টি মুছে দিলেন। মনের মধ্যে এতদিনকার পোষা আত্মগৌরবটুকুও মুছে গেল এরই সঙ্গে।
'এসব তোমাদের দরকার নেই, বুঝলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এসব প্রশ্ন কখনও আসে না।
ঘণ্টা পড়ল ক্লাস শেষ হবার। খড়ির গুঁড়ো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবার ছলে, নিজের হাতের আঙুলগুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তিনি ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ব্যাকরণের সমস্যাটা মিটেছে; কিন্তু অঙ্কর উত্তর মিলে যাবার পরিতৃপ্তি নেই এর মধ্যে। নিজের উপর অপ্রসন্নতার সবকিছু খারাপ লাগছে। সবাই সমান—তিনি মৌলবীসাহেব, ছোটশালা—সবাই। গুতো ঔৎসুক্যম—গতাবৌৎসুক্যম...। শোভন আচরণের পথ দিয়ে তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে বিশ্রামঘরের দিকে চলেছেন। আকৃষ্ট ত: আকৃষ্ট। সহস্র জোড়া কুতূহলী চোখ নিশ্চয়ই তাঁকে লক্ষ্য করছে, চিনে নিয়েছে সবাই তাঁকে—বিবস্ত্র, নগ্ন তিনি আজ লজ্জার ভারে ঝুঁকে পড়েছেন ঘরে ঢুকবার আগে চৌকাঠে হোঁচট খেলেন।
টেবিলের উপর মৌলবী সাহেবের পা-দুটো নড়ছে, অবিরাম গতিতে। এর জ্বালায় টেবিলের উপর একখানা বই পর্যন্ত রাখবার জো নেই। পুস্তক হলেন সাক্ষাৎ সরস্বতী। এই বকধার্মিক লোকটা যদি চোখদুটোও খুলে রাখত পা দোলানর সময়, তাহলে আর তাঁর কানে পইতা জড়ানো অবস্থায় ক্লাসে যেতে হত না আজ।
'ও মৌলবীসাহেব, ঘুমিয়ে নাকি? একটা কথা বলছি—এতদিন বলি বলি করেও বলিনি—কিছু মনে করবেন না। আপনি যদি আবার বিবাহ করেন, তাহলে হেডমিস্ট্রেস আর স্কুল-কমিটির মেম্বররা বিরক্ত হবেন।
মৌলবী সাহেব চোখ বোঁজা অবস্থাতেই ছড়া আওড়ালেন—'জো গুল কি জোহিয়া হ্যায়, উসে কেয়া খার কা খটকা? যে গোলাপ তুলতে চায় তার কি কখনও কাঁটার ভয় করলে চলে?'
...বলা বৃথা লোকটাকে।...অলঘুম লঘুম করোতি—লঘু-করোতি। ঘ-এ দীর্ঘ উ হবে, বুঝলে মালবিকা।...আচ্ছা, আজকের চিঠিখানির কথা স্ত্রীর কাছে চেপে গেলে কেমন হয়? পোস্টঅফিসে কত চিঠিই তো হারিয়ে যায়। তাহলে তাঁকে আর যেতে হয় না, ছোট শালার বিয়েতে।...কিন্তু মেয়েমানুষদের চোখে ধূলো দেওয়া কি অত সহজ! তারা যে সব ধরে ফেলে! তারা যে পুরুষদের মনের ভিতরটা পর্যন্ত দেখতে পায়।...কোন উপায় নেই।...তবু তিনি চেষ্টা করে দেখবেন আজ।—আজ প্রথম জেনেশুনে মিথ্যাচার করবেন।...কিন্তু সত্যিই কি বকধার্মিকের এই প্রথম মিথ্যাচার?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন