সমরেশ মজুমদার

এই যে গগনবাবু এসে গেছেন, চলুন এইবেলা বেরিয়ে পড়া যাক। হুঁ, তাই তো, শীতের দুপুর— পৌষের বেলা, ফুরফুরে মিঠে রোদ্দুর গায়ে মেখে দিব্যি হাঁটা যাবে। হিম পড়ার আগে দিন ফুরোবার আগে অনেকখানি পথ আমরা হেঁটে আসতে পারব। কিন্তু আর সব কোথায়! প্রকাশবাবু, জয়দ্রথবাবু, শিবদাসবাবু?
এই তো আমরা এসে গেছি। আমরা তৈরি হয়ে ছিলাম। হি-হি। লাঠির ঠুক ঠুক শব্দ করে প্রকাশ ও জয়দ্রথ তেরাস্তার মোড়ে এসে যান। ভালো-ভালো। গগন খুশি হন। অঘোরবাবু খুশি হন। এখন শিবদাসবাবু এসে গেলেই হয়।
শিবদাস বোধ করি আজ বেরোবেন না। কাল বলেছিলেন গা ভারি-ভারি ঠেকছে মাথা কনকন করছে। আরে দু:, গগনবাবু মাথা নাড়েন, ও একটা কথার কথা! শিবদাস ভয়ানক শক্ত। মেদমজ্জা ঝরে গিয়ে শাঁস মাস শুকিয়ে শুকনো খটখটে ক'খানা হাড় তেঁতুল কাঠের চেয়েও মজবুত। একটু ঠান্ডা লেগেছে, ও কিছু না। ঠিক বেরোবে ঘোষাল। আমাদের সবার চাইতে শিবদাস এখনো ফিট।
ওই—যে, ওই—যে! চারজন হাঁটা বন্ধ করে ঘাড় ফেরান। আমি এসে গেছি। আপনাদের গলার আওয়াজ টের পেয়েছি। শিবদাস হাসতে হাসতে তাঁর মাধবী লতান, আর্চের মতন বাঁকান, পুরোনো ছাঁদের গেট পার হয়ে বেরিয়ে আসেন। আহা, আজও তেমন তেজী ফুটফুটে চেহারা। গরম পাঞ্জাবি। কত লম্বা ঝুল, কোঁচান ধুতি, পায়ে পাম্পসু। যেন কার্তিক ঠাকুর, প্রকাশ বলেন, বা কেষ্ট ঠাকুর। শুনে অঘোরবাবু হাসেন, বলেন, কার্তিক না, আশী পার হওয়া বাঁশি বাজানেওলা ওই কেষ্ট ঠাকুরই ঠিক। তবে কিনা বাঁশি ফুঁকে ফুঁকে গলা দিয়ে রক্ত ঝরালেও গোপিনীরা কেউ আজ আসছে না।
আসবে আসবে, আমি এখনও আশা ছাড়িনি। শিবদাস খিকখিক হাসেন। হাসলে তাঁর বাঁধান দাঁত ঠকঠক কাঁপে। ঠান্ডা লেগে গলায় সর্দি জমেছে বোঝা যায়। গলার স্বর খসখসে শোনাল ও দেখা গেল হাসতে গিয়ে চোখের কোণায় সামান্য জল জমেছে। রুমাল বের করে শিবদাস চোখ মুছে ফেললেন।
মাফলার-টাফলার কিছু সঙ্গে আছে তো! অঘোরবাবু প্রশ্ন করেন। আছে বইকি। শিবদাস তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবির পকেট থেকে মাংকি ক্যাপ বের করে সকলের চোখের সামনে মেলে ধরেন। জয়দ্রথবাবু ও প্রকাশবাবু নস্যি রঙের গরম টুপিটার ভূয়সী প্রশংসা করেন। আপনারা? উৎসুক চোখে শিবদাস চারজনের মুখের দিকে তাকান। আমি মাফলার এনেছি। প্রকাশ ঘাড় কাত করেন। জয়দ্রথ মাথা নাড়েন। টুপি মাফলারে আমার সুবিধে হয় না। চোখের ইশারায় তিনি কাঁধের ভাঁজ করা র্যাপারটা দেখান। তক্ষনি অঘোরবাবু বলেন, শিবদাসবাবুর মতন আমার অবিশ্যি বাঁদর টুপি। কিন্তু যাই বলুন র্যাপারের চেয়ে আরামদায়ক আর কিছু নেই। কান মাথা গলা বুক সব ঢাকা যায়। তা যায়—এতক্ষণ পর গগনবাবু কথা বলেন। কথা বলতে গিয়ে দাঁড়ান। দেখাদেখি অন্যরাও হাঁটা বন্ধ করেন। বেঁটে ছোটখাটো মানুষ গগনবাবু। মেয়েদের মতন পাতলা লাল ঠোঁট। ডায়াবিটিজে ভুগছেন। এককালে ফরসা টুকটুকে চেহারা ছিল। এখন গায়ের চামড়াটা ফ্যাকাশে দেখায়। কম কথা বলেন। তবে ভদ্রলোক রসিক। তাঁর এক আধটা রসাল উক্তি শুনতে সবাই যখন উৎসুক তখন গগন হঠাৎ আর কথা বলেন না। আকাশের দিকে চোখ রেখে গাঢ় শ্বাস ফেলেন। কি হল গগনবাবু! শিবদাস বলেন, হিমকুয়াশা রুখতে গরম চাদর সবচেয়ে সুবিধে, আপনি কি এতে দ্বিমত? হ্যাঁ ভাই, আমার সোয়েটার। ব্যস, আর কিছু লাগে না। কান মাথাগলা কিছু না। আসল হল বুক। ঠান্ডার সময় ওটি আগে দেখতে হয়।
হুঁ, তাই তো, তক্ষনি কথাটা সকলের মনে পড়ে যায়, এক সঙ্গে তাঁরা হই-হই করে ওঠেন। যদিও সকলের গায়েই একটা করে সোয়েটার আছে, তবু গগনবাবুর গায়ের জিনিসটা দেখবার মতন। গগনবাবুর সোয়েটার! দেখি দেখি এবারেরটা কীরকম হল! শিবদাস প্রকাশ জয়দ্রথ ও অঘোর—চারটে মাথা গগনের দেহের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর তখন গগন পাতলা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসেন ও গায়ের মুগা রঙের শার্টটা তুলে ধরেন। রহস্যের উন্মোচন নয়। এবং রহস্যটা এতক্ষণ ঢেকে রাখতেই যে তিনি জামার ওপর ডবল বুনটের চমৎকার সোয়েটারটি না চাপিয়ে তলায় পরে এসেছেন বুঝতে কারো কষ্ট হয় না। তাঁরা জানেন যে ফি বছর না হলেও দু-বছর অন্তর গগনবাবু একটা করে নতুন উলের জামা উপহার পান। গগনবাবুর ছয় শালি। স্বামী পুত্র কন্যা নিয়ে তাঁরাও একরকম বুড়ো হতে চলেছেন। তা হলে হবে কি, বছর বছর রং-বেরঙের উল কিনে নয়া নয়া ডিজাইন মাথায় নিয়ে তাঁরা জামা বুনতে বসে যান। তারপর বোনা হয়ে গেল ভগ্নীপতিকে সেসব উপহার দেন। অঘোরবাবু ও শিবদাসবাবুর চক্ষু স্থির হয়ে গেল। প্রকাশবাবু ও জয়দ্রথবাবুর চোখের পলক পড়ে না। আগেরবার নীল জমির ওপর এক ঝাঁক রূপোলি মাছের নকশা ছিল, তার আগের বছর লাল জমির ওপর হলুদ হলুদ প্রজাপতি উড়ছিল। আবার তার আগের বছর যেন সবুজের ওপর অগুণতি গোলাপ ও গোলাপকলি বোনা হয়েছিল। এবারের সোয়েটারের রং গাঢ় নীল। তার ওপর, নীল জলের ওপর, ছোট ছোট লাল শাপলা ফুল ফুটে আছে। বলছিলাম কি, চার জোড়া মুগ্ধ চোখের দিকে চোখ রেখে গগন হাসেন, এটা আমার মেজ শালির হাতের বোনা—হুঁ, বলছিলাম ওকে, এই শাপলা ফুলের সোয়েটারে আমার বাকি কটা দিন কেটে যাবে। এরপর আর আমার জন্য শীতের জামা বুনতে হবে না। শুনে মেজ শালি ঠোঁট বেঁকিয়েছিল। ষাট ষাট, অমন কথা মুখে আনবেন না, আমরা ছ বোনে যেন আরও দশটা গরম জামা বুনে আপনাকে প্রেজেন্ট করতে পারি।
তবে তো দেখা যাচ্ছে, গগনবাবু থামতে জয়দ্রথ হাসলেন, এখন আপনার বিরাশি, ছ শালির হাতের আরও দশটা সোয়েটার গায়ে দিতে আপনাকে শতায়ু হবার পরেও বেঁচে থাকতে হবে। হুঁ, তা ছাড়া কি, গগন বললেন, সুরমা—আমার মেজ শালির একটা চোখে ছানি পড়তে শুরু করেছে, আর একটা চোখেও ঝাপসা দেখছে, গায়ের চামড়া—
তাতে কি! গগনের কথা শেষ হবার আগে প্রকাশবাবু বললেন, তাঁরা আশা করেন শ পার করেও আপনি কটা বছর বাঁচবেন, আর তাঁরাও বুঝি ততদিন তাজা চোখ, তাজা মন নিয়ে মাছ প্রজাপতি ফুলের ডিজাইন বুনে নতুন নতুন উলের জামা জামাইবাবুকে উপহার দেবেন।
তা ছাড়া কি। শিবদাস বলেন, আমরা কেউ মরতে চাই না—সবাই চাইছি চিরকাল এই পৃথিবীতে—কথা বলতে বলতে পাঁচজন হাঁটেন। পাঁচটা সাদা মাথা নড়তে থাকে। পাঁচটা লাঠি ঠুকঠুক করতে থাকে। দেখুন দেখুন, গাড়ি আসছে! গগনবাবু সাবধান করে দেন। গগনবাবুর দেখাদেখি জয়দ্রথ প্রকাশ অঘোর ও শিবদাস রাস্তার একপাশে জড়ো হয়ে যান। দৈত্যের মতন হুড়মুড় করে লরি ছুটে যায়। গাড়ি চলে যেতে আবার তাঁরা হাঁটেন। আজ কোথায় যাবেন? শিবদাস সকলের আগে প্রশ্ন করেন। আজ বিকেল চারটেয় বিকেকানন্দ পাঠচক্র বীরেশ্বর বিবেকানন্দর ওপর আলোচনার ব্যবস্থা করেছেন, প্রকাশবাবু বলেন, যাবেন নাকি! অঘোরবাবু বললেন, কাঁকুলিয়া রোডে সাড়ে পাঁচটায় অনন্ত গোঁসাই পদাবলী কীর্তন গাইবেন। জয়দ্রথ বললেন, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউটে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ ও ব্যাখ্যা হবে। তা ছাড়া, জয়দ্রথ আবার বলেন, তারাচাঁদ রোডের ভবানী হলে মুণ্ডকোপনিষদ পাঠ ও আলোচনা হবে কাগজে দেখেছি, যাবেন নাকি আপনারা!
না না! গগনবাবু মাথা নাড়েন। আজ কোনো ধর্মসভা না কীর্তনটির্তন না। আজ আমরা নিজেদের মতন করে হাঁটব বেড়াব গল্প করব। তারপর পছন্দমতন একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসে বিশ্রাম করব। শিবদাস উৎসাহে মাথা ঝাঁকান। আমার তাই ইচ্ছে। পৌষের মিঠে উমসুম রোদ যতটা গায়ে লাগান যায় ভাল। হা-হা-হা! ঠিক বলেছেন। অঘোরবাবু শব্দ করে গাল ছড়িয়ে হাসেন। পৌষের রোদে বেগুন পরিপুষ্ট হয়, বেগুনের চেকনাই বাড়ে। আমাদের এই বয়সেও তা হলে নতুন করে চেকনাই ফিরে আসবে। কি বলেন গগনবাবু! গগন কথা বলেন না। শিবদাস বলেন, আসবে এমন আশা করতে ক্ষতি কি আপনি কি বলেন প্রকাশবাবু! হুঁ নিশ্চয়, প্রকাশ ঘাড় কাত করেন। আশা করা ভাল। আশার মধ্যে একটা সান্ত্বনা আছে।
দেখবেন, আবার গাড়ি আসছে। গগনবাবু চেঁচিয়ে ওঠেন।
আসুন আমরা বড় রাস্তা ছেড়ে ওই সরু পথ ধরি। অঘোর বলেন, গাড়ি ঘোড়ার ঝামেলা নেই। জয়দ্রথ সায় দেন। তাই ভাল। যেমন বেয়াদপের মতন সব চালায়। হঠাৎ একটা গায়ে তুলে দিতে কতক্ষণ।
বড় রাস্তা ছেড়ে পাঁচজন নিরিবিলি সরু রাস্তায় নেমে হৃষ্টমনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাঁটেন। এদিকে বাড়িঘর কম, দোকানপাট বিশেষ নেই। এদিক-ওদিক সবুজ মাঠ ময়দান গাছ গাছড়া চোখে পড়ে। আহা, দেখুন! অঘোরবাবু প্রায় নেচে ওঠেন। একটা ডুমুর গাছ শিকড় থেকে মগ ডাল পর্যন্ত কচিপাতায় ছেয়ে গেছে। বুড়োর দল দাঁড়িয়ে পড়েন। খুশির চোখে চিকন সবুজ পাতায় মোড়া ডুমুর গাছ দেখেন। প্রকাশবাবু বলেন, পৌষ শেষ হতে এখনও ঢের দেরি। এর মধ্যেই বসন্ত উঁকি দিয়েছে। গগনবাবু বলেন, তাই তো দেখছি। আমার বাড়ির পাশে ডাক্তার চ্যাটার্জি কোকিল পোষেন। এখনই বেটা ডাকতে শুরু করেছে। কাল রাত্তিরে ত্রয়োদশীর জোছনা ছিল। দুবার তিনবার ডেকে উঠেছে। বেশ খানিকটা সময় আমি আর ঘুমোতে পারিনি। হেঁ হেঁ! হেসে মাথা দুলিয়ে শিবদাস অঘোরবাবুর দিকে তাকান। শুনছেন অঘোরবাবু! জ্যোৎস্না উঠলে কোকিল ডাকলে এখনও গগনবাবুর প্রাণে রস উথলে ওঠে। গগনবাবু চুপ করে থাকেন। যেন লজ্জা পান। আবার মনে মনে খুশিও হন। তাঁর মুখের ফ্যাকাশে চামড়ায় একটু লালের আভা জেগে ওঠে। মিটিমিটি হেসে সঙ্গীদের মুখ দেখেন। যেন কথাটা বলে ফেলে অপরাধ করেছেন—তাঁর হাসি ও তাকানোর মধ্যে এমন একটা কিছু আবিষ্কার করেন জয়দ্রথ। জয়দ্রথ সান্ত্বনার গলায় বলেন, আহা, তাই তো! শুকিয়ে আমরা এক একটি খড়কে কাঠি হলে হবে কি—প্রাণের রস কি কারও শুকোতে চায়। জ্যোৎস্না উঠলে কোকিল ডাকলে আমরা আজও ছটফট করব। করাটা ভাল।
অর্থাৎ গগনবাবুর সঙ্গে জয়দ্রথ সকলকে জড়িয়ে ফেললেন। প্রকাশবাবু বললেন, তবে শুনুন, রসের আমরা কতটা পেয়েছি কতটাই বা দেখেছি, আমার মেজছেলে দুদিন ধরে একটা ইংরেজি বই পড়ছিল, বেশ রঙচঙে মলাট। কাল দুপুরে নাতনীকে দিয়ে ছেলের টেবিল থেকে বইটা আনিয়ে একটু চোখ বুলোলাম। হুঁ, আপনারা নাম শুনেছেন, ভয়ানক জ্ঞানী গুণী মানুষ বার্ট্রান্ড রাসেল। কিন্তু আমি কি অতশত জানতাম মশাই, কয়েকটা পৃষ্ঠা ওলটাতে দেখলাম তিন তিনটে বিয়ে করার পরেও সাহেব আমাদের মতন পাকা চুল, ঘোলা চোখ নিয়ে বুড়ো বয়সে আবার একটা বিয়ে করল, কেমন সাহস কত বড় বুকের পাটা চিন্তা করুন! পেছনের মলাটে ভদ্রলোকের ছবিটা দেখলাম। এই রোগা মরকুটে চেহারা। হুঁ হুঁ, সঙ্গে সঙ্গে শিবদাস নাকে হাসলেন, রাসেলের দেশেই এটা সম্ভব মশাই, ওরা এসব খুব পারে। আমি আপনি এমন একটা কাজ করি, পাড়ায় হই-চই পড়ে যাবে, ছোঁড়ারা ঠেঙ্গাতে আসবে।
অঘোর বললেন, আমি যদি বাড়িতে ওই বুড়ো রাসেলের গল্পটা করি তাতেই আমার গিন্নি দোষ ধরবেন। চটেমটে যা তা শোনাবেন, বলবেন, যত সব আস্তাকুঁড়ের নোংরা খবর কুড়িয়ে এনেছ, খবরদার এসব বাঁদরামির গল্প আমাকে শোনাবে না।
শিবদাস আবার নাকের শব্দ করে হাসলেন। বললেন, আর যদি ঘুণাক্ষরেও উনি টের পান এই বয়সে আপনিও একটি টগবগে তরতাজা মেয়েকে বিয়ে করে মুখের স্বাদ পাল্টাতে চান তো কথাই নেই। আপনার পিঠে তুলো ধুনবেন গিন্নি।
এই তো ট্র্যাজেডি মশাই, একটু পরে শিবদাস বললেন, জীবনে আমরা একবারই বিয়ে করি, আর ওই এক গিন্নির ভয়ে বাকি সারাজীবন ঘরে জিয়ানো কাছিমের মতন আধমরা হয়ে থাকি। চলুন এগোনো যাক।
ডুমুর গাছ পিছনে রেখে পাঁচজন হাঁটেন।
কদিন মহিমবাবুকে দেখছি না, প্রকাশ বললেন, রোজ দুবেলা আমাদের সঙ্গে বেরিয়েছেন।
ওই যে, জয়দ্রথ বললেন, পায়ের বাতটা সারছে না। সাতদিন ঘরে বসা।
গগন বললেন, অথচ ভদ্রলোক আমাদের চেয়ে অনেক ছোট। যেন এখনও সত্তর হয়নি। এর মধ্যেই কিনা অচল হয়ে...গগনের কথা শেষ হয় না। শিবদাস বলেন, মহিমবাবু কথা শোনেন না। বললাম রোজ বেলের শরবত খান মশাই। আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য না সারলে পায়ের বাত সারবে না। অঘোর বললেন, আমি ইসবগুলের ভুষি খেয়ে ভালো আছি। কনস্টিপেসন আমার ধারে কাছেও আর ঘেঁষছে না। জয়দ্রথ বললেন, আমি রাত্তিরে শোবার সময়, নাক্স থাট্টি খেয়ে উপকার পেয়েছি। হোমিওপ্যাথির মতন জিনিস নেই—
দেখুন দেখুন কী চমৎকার পাখি! প্রকাশ আঙুল দিয়ে রাস্তার বাঁ-পাশে একটা পুরোনো গ্যারেজের সামনে দূর্বা ঘাসে ঢাকা জমিটা দেখান। সকলে সেদিকে চোখ ফেরান। টুকটুকে হলুদ রঙের ঠোঁট, হলুদ রঙের দুখানা পা। সবটা শরীর মিশমিশে কালো। যেন কালো সিল্কের শাড়িতে গা মাথা মুড়ে এক আশ্চর্য পাখি পৃথিবীর মাটিতে নেমেছে। ঘাস থেকে পোকা খুঁটে খাচ্ছে।
আরে এ যে গুবরে শালিক মশাই, অঘোরবাবু হাসলেন, আমাদের খুব পরিচিত পাখি, কি বলেন জয়দ্রথবাবু! হুঁ, জয়দ্রথ থুতনি নাচান। হাসেন তবে কিনা পরিচিত অত্যধিক জানাশোনা কাউকেও হঠাৎ হঠাৎ স্থান বিশেষে সময় বিশেষে ভয়ানক অচেনা অপরিচিত মনে হয়। কথাটা মিথ্যে কি, শিবদাস তৎক্ষণাৎ বললেন, তখন আমি শোভাবাজারে—এ পাড়ায় আসিনি। ধরুন আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে। অফিস ছুটির পর ওদিকের একটা পার্কে গিয়ে বসতাম। পাঁচটা মানুষ আসতেন। গল্পগুজব সেরে—একটু রাত করে রোজ বাড়ি ফিরেছি। একদিন কি একটা বিষয় নিয়ে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে খানিকটা তক্কাতক্কি হল। আমি হেরে গেলাম। তখন মন খারাপ করে পার্ক থেকে বেরিয়ে বাড়ির রাস্তা না ধরে গঙ্গার ঘাটের দিকে হাঁটতে লাগলাম। একটু এগোতে ডানদিকে একটা শিব-মন্দিরের সামনে চার-পাঁচটি মেয়ে ও মহিলার সঙ্গে ছিপছিপে লম্বা আর একটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। তখনও ওদিকটায় গ্যাসের বাতি। দেখলাম ভারি সুন্দর ফীগার মহিলার। তার ওপর টানাটানা চোখ চমৎকার একজোড়া ভুরু। অবশ্য রাস্তায় চলতে চলতে আমি এক পাশ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে দু-এক সেকেন্ডের জন্য মাত্র দেখেছিলাম। তারপর ঘাটের দিকে চলে গেছি। আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ঘাটে বিশ্রাম করে বাড়ি ফিরি। সদরের কাছে পৌঁছে পেছনে হঠাৎ পায়ের শব্দ শুনে সেদিকে চোখ ফেরাতে, আমি মশাই বলব কি, ভয়ানক চমকে উঠলাম। মন্দিরের সামনে দেখা সেই ভদ্রমহিলা আমার পিছু পিছু আসছেন। ব্যাপার কি! অবশ্য আমার সদরের কাছটা অন্ধকার ছিল। তখনি সিঁড়ির আলোটা জ্বাললাম, সঙ্গে সঙ্গে সব রহস্য ফাঁক হয়ে গেল। হেসে উঠলাম। আমার হাসি দেখে গিন্নি অবাক। কারণটা বলতে তিনিও খুব হাসলেন। বললেন, পাশের বাড়ির রানির মার সঙ্গে ঘাটের কাছ শিবমন্দিরে আরতি দেখতে গিয়েছিলেন। কোনওদিন আমার স্ত্রী সেদিকে যান না। পাড়ার ছোট মন্দিরটায় মাঝে-মাঝে যান। তা-ও আমি বাড়ি ফেরার আগে সন্ধ্যা-সন্ধি প্রণাম সেরে ফিরে আসেন।
গল্প শুনে গগনবাবু খুশি। বললেন, ওই একই কথা হল, নিত্য দেখা গুবরে শালিক প্রকাশবাবুর চোখে এক তাজ্জব অচিন পাখি হয়ে গেল। গগনবাবু টেনে টেনে হাসেন।
হুঁ তাই, আমার স্ত্রীরও বেশ টল ফিগার তো, আর ওই বয়স। তার ওপর কোনওদিন গঙ্গার ঘাটের কাছের শিবমন্দিরে যান না। তায় আবার একটু বেশি রাত হয়েছিল সেদিন। শিবদাস বললেন, ঘরের মানুষটিকে হঠাৎ চিনতে পারা যায়নি। কেমন যেন একটা বিভ্রম ঠেকেছিল।
শিবদাস দেখতে পেলেন না, পিছন থেকে অঘোরবাবু গগনবাবুর গা টিপলেন। তারপর মিহি গলায় বললেন, তবে কিনা শিবদাসবাবু, সেদিন আপনার লাভই হয়েছিল। ঘরের মানুষকে অচেনা আশ্চর্য এক সুন্দরীর মতন চোখে ঠেকা পরম ভাগ্যের কথা। বটে বটে! গগনবাবু জয়দ্রথবাবু ও প্রকাশবাবু সমস্বরে গুঞ্জন করে ওঠেন। শিবদাস বিব্রতবোধ করেন। অঘোরবাবুর কথার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ঠাট্টার খোঁচা আছে কিনা বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকেন। তবে মুখের হাসি হাসি ভাবটা নিবতে দেন না। সকলের সঙ্গে পা মিলিয়ে হাঁটেন।
দেখুন মোষ আসছে! এবার জয়দ্রথের সাবধান বাণী শোনা গেল। রাস্তার পাশে সকলে আবার জড়সড় হয়ে দাঁড়ান। উঁচু উঁচু শিং, মাতালের মতন লাল চোখ এক একটা মোষের। হাঁসফাঁস শব্দ করে হাঁটে। তা হলেও, গগনবাবু বলেন, এই সব গুণ্ডা চেহারার জন্তুুর চেয়ে রাস্তার গাড়িকেই আমি ভয় করি বেশি। মোষের পাল সরে যেতে রাস্তা ফাঁকা হয়। আস্তে-আস্তে আবার তাঁরা এগোন। একটু একটু করে বেলা পড়ে আসছে। তবু রোদের উজ্জ্বলতা কমেনি। মাঝে মাঝে বাতাস দিচ্ছে। রোদের তাপ লাগা ঝুড়িভাজার মতন শুকনো মুড়মুড়ে শীতের বাতাস অঘোরবাবুরা উপভোগ করছিলেন। দুপাশে গাছপালার সংখ্যা ক্রমে বাড়ছিল। এবার পাখপাখালির ডাক বেশি শোনা গেল।
হুঁ তাই। হঠাৎ কি মনে পড়তে লম্বা শ্বাস ছাড়েন অঘোরবাবু। ঘাড় বেঁকিয়ে সঙ্গীদের দেখেন, বলেন, শিবদাসবাবু তখন ঠিকই বলেছেন। আমরা একবারই দারপরিগ্রহ করি, আর সেই গিন্নীর ভয়ে আধমরা হয়ে থাকি। পাছে ঘর ভেঙ্গে যায়, পাছে দুর্নাম রটে, তাই নিত্য বকাঝকা খেয়েও ওই ঘরের মানুষটির বশংবদ হয়ে থেকে সংসারের ঘানি টানি। আর সাহেবদের দেশে? দুজনার বনিবনা হয় না, পান থেকে চুন খসলে খটাখটি বাধে, ব্যস, ডিভোর্স। সংসারের পাট তুলে দাও। তখনি আবার একটা বিয়ে করে নতুন গিন্নীকে নিয়ে ডেরা বাঁধ।
ওখানকার ঢেউ এদেশেও লাগছে, প্রকাশবাবু বললেন।
হুঁ, এখন লাগছে, অঘোরবাবু বললেন, আমাদের আমলে আমরা এ জিনিস দেখিনি। দেখেছি কি? আমরা ভাবতেও পারতাম না। রোজ ঘরে কুরুক্ষেত্রের রণ চলছে, আর বাইরে মুখে হাসি টেনে দিব্যি যে যার 'ফ্যামিলি' 'ওয়াইফ'-এর গুণ গেয়ে বেড়িয়েছি। ভণ্ডামির চূড়ান্ত করেছি।
না মশাই, গগনবাবু বললেন, ওই মেকি হাসি ধরা পড়ে যায়। গেছে। ভেতরের ঘা লুকোনো যায় কি। যায় না। আমাদের পাড়ার বসন্ত রায়। বড় অ্যাডভোকেট ছিলেন। হয়তো আপনারা দেখেছেন! এই পাহাড়ের মতন দশাসই চেহারা ছিল। হেঁটে গেলে মাটি কাঁপত। তেমনি বাঘা গলার আওয়াজ। বেশিদিন বাঁচলেন না কিন্তু। মাত্র ষাটে পা দিয়েছিলেন, করনারি অ্যাটাক হয়ে—
এক সেকেন্ড চুপ থেকে গগন আবার বললেন, আমার সঙ্গে খুবই ভাব ছিল, বন্ধুত্ব ছিল। যেমন শরীর, গলার আওয়াজ, তেমনি মনটাও ভারি দরাজ ছিল ভদ্রলোকের। একেবারে খোলামেলা মানুষ। হেসে ছাড়া লোকের সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি। টাইটেল স্যুটটা খুব বুঝতেন। পরিষ্কার ব্রেন ছিল। পয়সাও যথেষ্ট কামিয়ে গেছেন। ভাল পসার করেছিলেন বসন্ত রায়। পকেট ভরতি করে টাকা নিয়ে কোর্ট থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরছেন। এসেই সব উপুড় করে গিন্নীর হাতে তুলে দিতেন। অ্যাঁ।
যেন খচ করে পায়ে কাঁটা বিঁধল গলার এমন একটা স্বর করে গগন দাঁড়িয়ে পড়েন। বাকি সবাইকে হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়াতে হয়। উৎসুক চোখে গগনকে দেখেন। দু-হাত মুঠো করে গগন দেখান কেমন করে বসন্ত রায় পকেটের সব টাকা তুলে বউয়ের হাতে ঢেলে দিতেন। কিন্তু তাতে হলটা কি? গগন বললেন, পেয়েছিলেন বউয়ের মন? সবাই দেখত এত হাসিখুশি বসন্তবাবু—আর আমি দেখতাম, কদিনই দেখেছি, সন্ধ্যার পর মুখ অন্ধকার করে বসন্ত তাঁর বৈঠকখানায় একা চুপচাপ বসে আছে। উঁহু, ক্লাবে যাওয়া নেই, পাড়ার দাবার আড্ডায় বসা নেই। আমাকে কিন্তু সব বলত, কিছুই গোপন করত না। জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে গিন্নী। কিছুতেই ওই একটি মানুষের মন জুগিয়ে চলতে পারছে না উকিল। সারাক্ষণ স্ত্রীর ঘ্যানর ঘ্যানর। এত টাকাকড়ি, শাড়ি, গয়না, প্রতিদিন চর্বাচুষ্য লেহ্য পেয় আহার, তিনটে চারটে চাকর চাকরানি—প্রকাণ্ড তেতলা বাড়ি—তবু অর্ধাঙ্গিণীর তুষ্টি নেই। রাতদিন আমার সঙ্গে খিটিমিটি। বসন্ত বলত, আমি ডাইনে গেলে উনি বাঁয়ে চলতে চান, আমি বাঁয়ে গেলে উনি ডাইনে পা বাড়ান। আমার যেটাতে 'হ্যাঁ', তাতেই তাঁর 'না'। আমাকে শেষ করে দিয়েছে ওই বউ—বুঝলে গগন ইচ্ছে করে কোথাও পালিয়ে যাই। শুনে গগনবাবু অবিশ্যি চুপ করে থাকতেন। কী বলার ছিল! কিন্তু মনে মনে বলতেন, পালিয়ে যাবে কোথায় বসন্ত—ঘর ছেড়ে পরিবার ছেড়ে আমাদের পালাবার উপায় নেই। বিয়ে করেছ তার অর্থ একটা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা পড়েছ। চিতায় না ওঠাতক ওই খুঁটির চারপাশে ঘুরতে হবে।
অঘোর হাসলেন। যা বলেছেন। ওই যে ইংরেজিতে বলে ন্যাগিং ওয়াইফ—ওই এক স্ত্রী প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তোলে। বলা ভাল না, তবু আমি বলব আমাদের মতন আশি বিরাশি পর্যন্ত যে বসন্তবাবুকে পৌঁছতে হয়নি। আগেই চলে গেলেন।
তা বটে! গগনবাবু মৃদু মাথা নাড়লেন। তবে শুনুন, এবার জয়দ্রথ মাথা নাড়লেন, ন্যাগিং ওয়াইফ— কুঁদুলে বউ, চব্বিশ ঘণ্টা স্বামীকে তাড়া করে মারে এমন সব গিন্নীদের নিয়ে, সেদিন ওপাড়ার সুধীনবাবু বলেছিলেন, কবে নাকি বিলিতি পাঞ্চ কাগজে এক সাহেবের একটা চমৎকার লেখা বেরিয়েছিল। তিনি পড়েছেন। সাহেবের বক্তব্য দুনিয়ার জাঁদরেল জাঁদরেল বিপ্লবী—ডাকসাঁইটে রাজনৈতিক মাতব্বরদের দাম্পত্যজীবন মোটেই সুখের ছিল না। অতএব হিস্টরিক ফিগার নেপোলিয়ান থেকে আরম্ভ করে জর্জ ওয়াশিংটন, ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট, মার্শাল টিটো অনেকের নাম তিনি করেছেন। গিন্নিদের সঙ্গে কারও নাকি বনিবনা ছিল না। কুঁদুলে গিন্নিদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিপ্লব-টিপ্লব করে বেড়িয়েছেন—রাজনীতি নিয়ে মেতে গেছেন, যুদ্ধ করেছেন। তালিকায় চেয়ারম্যান মাও, ফিদেল কাস্ত্রো, স্টালিনের নামও রয়েছে।
হুঁ, বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলেন বই কি তাঁরা। প্রকাশবাবু অল্প শব্দ করে হাসলেন। ঘরে থেকে রাতদিন দজ্জাল বউয়ের মুখ ঝামটা দাঁত খিঁচোনি চোখ রাঙ্গানি হজম করার চেয়ে পলিটিকস করা বিপ্লব করা ঢের ভাল। কাগজে নাম ওঠে, ছবি ছাপা হয়—আর তাঁদের নিয়ে কেতাব টেতাবও মেলা লেখা হয়। হয়েছে। কি বলেন, অঘোরবাবু?
হুঁ, ওই একই কথা, আমিও শুনেছি। অঘোরবাবু ঘাড় কাত করেন। গিন্নীদের সঙ্গে বনিবনা হয় না বলে গগনবাবুর অ্যাডভোকেট বন্ধু বসন্ত রায়ের মতন একলা অন্ধকার বৈঠকখানায় চুপ করে বসে তাঁরা মাথার চুল ছেঁড়েন না। গিন্নিকে কাঁচকলা দেখিয়ে আবার বিয়ে করেন নয়তো সোজাসুজি পলিটিকস-এ নেমে পড়েন। তাতে শান্তি বেশি।
শক্ত ধাতের মানুষ ওরা, শিবদাস বলেন, যেমন পাথুরে মজবুত গায়ের হাড় তেমনি ইস্পাতের মতন নার্ভ। কিছুতেই ঘাবড়ায় না। পলিটিকস করে—কেউ কেউ শুনি আদাজল খেয়ে রকফেলার হেনরি ফোর্ড হবার জন্য ব্যবসাবাণিজ্য করতে লেগে যায়।
তা বউ ছেড়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে ব্যবসা বাণিজ্য করুক আর রাজনীতি করুক, এবার জয়দ্রথ খ্যাকখ্যাক হাসেন, তা বলে, না-ই বা করল বিয়ে, বউ নিয়ে আবার ঝঞ্ঝাট পোহাবার ভয়ে অনেকেই হয়তো সে পথে আর পা বাড়ায় না, কিন্তু তার জন্য ভদ্রলোকদের জীবনে এনজয়মেন্ট বলে কিছু বাদ থাকে, সেটি মনে করবেন না।
কে মনে করছে! গগনবাবু এমন চোখে জয়দ্রথবাবুর দিকে তাকালেন যেন জয়দ্রথ একটি শিশুর মতন কথা বললেন। তারপর শিবদাস প্রকাশবাবুর দিকে গগন ঘাড় ফেরান। বলেন, ওদের সেক্স লাইফটা যে কত ফ্রী আমরা তা কল্পনাও করতে পারি না।—একটু বয়স বাড়ল তো আমাদের ওদিকটা একেবারে পাথরচাপা পড়ে গেল। বুঝলেন প্রকাশবাবু, আমার ভায়রাভাই জ্ঞান মুকুয্যে, লোকটার মুখে আগল নেই, তা হলেও খাঁটি কথা বলে—বলে কি, তোমরা ইয়ুথ জিনিসটাকে ধরে রাখতে পার না। সাহেবরা পারে। উঁহু, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খেয়ে গ্ল্যান্ড অপারেশন করে এই জিনিস হয় না। রিজুভেনেশনের চাবিকাঠি হল সেক্স—ফ্রী সেক্স লাইফ। এ দেশে সেটা নেই। তাই তোমরা বুড়ো হবার আগেই বুড়িয়ে যাও, ব্লাড প্রেসার ডায়বেটিজ ডিসপেপসিয়ার এক একটা পুঁটুলি হয়ে কোনওরকমে বেঁচে থাক—আর ওঁরা নব্বুইয়ে পা দিয়েও কিনা—আসল কথা হল সেক্সের মতন দাওয়াই আর কিছু নেই—
আস্তে! জয়দ্রথ গগনবাবুর কাঁধে মৃদু চাপ দেন। গগনের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সবাই দাঁড়িয়ে পড়েন। ব্যাপার কি! গাড়ি ঘোড়া গরু মোষ না, দুপদাপ পা ফেলে ওরা আসছে। সবে গোঁফ গজিয়েছে, কারও তা-ও না, ফাঁপান চুল মাথায়, জামায় রঙিন বেলুন জাহাজ রকেট-এর ছবি—মাছ বক পালতোলা নৌকোর ছবি ছাপা জামাও কারও-কারও গায়ে, রঙবেরঙের প্যান্ট। এরা কারা। আমাদের বংশধর। জয়দ্রথ ফিসফিসিয়ে বলেন, আর একটা উঠতি জেনারেশন, দেখছেন না নাতির বয়সি সব।
আসুন আসুন আমরা এখানটায় লুকোই। অঘোরবাবু আঙুল দিয়ে রাস্তার পাশে একটা মেহেদী ঝোপ দেখান।
হুঁ, সেই ভালো। শিবদাস আগে আগে হাঁটেন। তাঁর দেখাদেখি বাকি চার বুড়ো। চুপ করে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছোঁড়াদের দেখেন।
দেখুন দেখুন, অঘোরবাবু ফিসফিসিয়ে ওঠেন, যেন রণ জয় করতে যাচ্ছে। কেবল ছটফট করছে, হাত নাড়ছে, মাথা নাড়ছে। টাট্টু ঘোড়ার মতন টগবগ করছে—কেমন রুক্ষ মেজাজ, তাকানোর মধ্যে কী ভয়ানকরকম তাচ্ছিল্য।
উড়ুক্কু বয়সে তাই হয়। চাপা গলায় শিবদাস বলেন, পৃথিবীর যা কিছু সাবেকি পুরোনো সব তাদের কাছে তেতো বিষ।
আমাদের কি দেখতে পেয়েছে, প্রকাশ বললেন, আমরা ঝোপের আড়ালে চলে এসেছি। আমাদের দেখতে পায়নি যেন।
জয়দ্রথ বলেন, আমাদের দেখতে পাওয়া না পাওয়া সমান কথা। ওদের চোখে কি আমরা মানুষ আছি। এক আঁটি শুকনো লাকড়ির শামিল। নিজে থেকে তো যাচ্ছি না পাঁচ বুড়ো। ওরা ভাবছে কেউ লাকড়ির আঁটিটা জ্বালিয়ে শেষ করে দেয় না কেন।
এটা বলেছেন ভালো। শিবদাস নাকের ভিতর হাসলেন। ওই তো ক্লিক ক্লিক লাইটার জ্বেলে নাতির দল সিগারেট ধরাচ্ছে। আমাদের দেখতে পেলে ওই আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ওরা আবর্জনা সাফ করবে।
তা করুক বা না করুক, এতক্ষণ গম্ভীর থেকে গগনবাবু হঠাৎ আবার মুখ খুললেন। রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে বাঁদরগুলো আমাদের মুখের ওপর সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলত, কি দাদুরা কেমন আছ—এখনো টিকিট কাটছ না যে বড়। আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা। ওদের আমি এড়িয়ে চলি। ওদের ভয় করি।
যাক চলে গেছে, চলে যাচ্ছে, আর ভয় নেই। এবার বেরিয়ে আসুন। অঘোরবাবুর দেখাদেখি ঝোপের আড়াল ছেড়ে হালকা মনে সবাই রাস্তায় উঠে আবার হাঁটেন। কিন্তু গগন তখনও গম্ভীর। বিরক্তি ও উষ্মাটা কিছুতেই যেন ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না। ফলে অন্যরাও চুপ করে হাঁটেন। কিন্তু এই থমথমে পরিবেশ জয়দ্রথের ভয়ানক অপছন্দ। এই মোলায়েম রোদালো শীতের দুপুরে বেশ মেজাজ নিয়ে বেড়াবেন বলে তাঁরা আজ কোনো ধর্মসভাটভায়ও গেলেন না, এদিকে চলে এসেছেন। কিন্তু—
খানিকটা চলার পর রাস্তার ধারে একটা আমড়া গাছ দেখে জয়দ্রথ দাঁড়ান। কি হল! দেখাদেখি অন্যরাও হাঁটা বন্ধ করেন। আমড়া গাছের পাশেই, একেবারে গায়ে গায়ে একটা সজনে গাছ। আমড়ার সব পাতা শুকিয়ে ফ্যাকাশে হলুদ। সজনের ডালে ডালে কচি চিকন পাতার শোভা। শুকনো খটখটে উত্তুরে হাওয়ায় আমড়ার হলদে পাতা ঝুরঝুর খসে পড়ছে। দেখে সজনে পাতাগুলো যেন খিলখিল হেসে বাঁচে না। হাতের লাঠি উঁচু করে ধরে জয়দ্রথ সকলকে দৃশ্যটা দেখান। আমাদের দশা আর কি! আমড়া পাতার মতো আমরা ঝুরঝুর খসে পড়ব, খসে পড়ছি! দেখে কচি কাঁচা নাতির দল ঠাট্টা ইয়ার্কি করবে হাসবে জানা কথা। প্রকৃতির নিয়ম।
হুঁ, নিয়ম! কেউ কথা বলার আগে গগন হুঙ্কার ছাড়েন। লাঠিটা জোরে মাটিতে ঠোকেন। তা বলে মুখের ওপর সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া—বেয়াদপি বদমাইসির একটা সীমা আছে। গগন ঘাড় ঘুরিয়ে প্রকাশবাবুর দিকে তাকান। বুঝেছেন, একদিন রাস্তায় আসবে, তবে এ জন্মে আর নয়। প্রকাশবাবুর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে অঘোরবাবুও রসিকতা করতে ছাড়েন না। কুলকুল হাসেন। বেটা এই মাত্তর আমার কানে-কানে বলে গেছে, আবার যখন জন্ম নেব তখন আমাদের গায়ে কপালে এসে সে ঠিক উড়ে বসবে।
গগনবাবু বললেন, তবেই হয়েছে। আর একবার আমাদের জন্ম নিতে নিতে তারপর আঁতুড় থেকে বেরিয়ে হাঁটি হাঁটি পা-পা করে বড় হয়ে চকরাবকরা জামা চড়িয়ে হরেক নকশার ইজের পাতলুন পরে ফাঁপাই চুলে পাকানো গোঁফে ল্যায়েক চেহারা নিয়ে যেদিন বিয়ের কনে খুঁজতে বেরোব সেদিন বিয়ে জিনিসটাই আর থাকবে না। প্রজাপতির নির্বন্ধ কথাটা অভিধান থেকে তুলে দেওয়া হবে।
তাই কি? শিবদাস ভুরু কুঁচকোন।
আলবত তাই হবে। গগন মাটিতে লাঠি ঠোকেন। আমার ভায়রা জ্ঞান মুকুয্যে তাই বলে। ওদেশে জিনিসটা প্রায় চালু হয়ে গেছে। বন্ধু বন্ধুনী, সঙ্গি সঙ্গিনী। ব্যস, আর কিছু না। ওটাই সমাজ মেনে নেবে। দেশের মাথাওয়ালা লোকেরা তাই ভাবছেন। যেখানে তিন মিনিট অন্তর একটা বিয়ে হচ্ছে, দু মিনিট অন্তর বিয়ে ভাঙছে সেখানে কী দরকার রেজিস্টারি অফিসে গিয়ে গির্জায় ঢুকে ঘটা করে গাঁটছড়া বাঁধার। ভণ্ডামি! কোনো অর্থ নেই। ওই গিঁট খুলতে পরদিন থেকে আবার কোর্ট কাছারি মামলা মোকদ্দমার ঝামেলা পোহান কেন।
চমৎকার! জয়দ্রথ বললেন, যতদিন ভালো লাগল চকাচকী এক সঙ্গে নীড়ে থাকল। শীতকালে ভাল লাগল, বসন্তে দুজন দুদিকে উড়ে গেল। গ্রীষ্মে ভালো লাগল তো বর্ষায় ছাড়াছাড়ি। কিন্তু বাচ্চা?
আরে এমন একটা নিয়ম চালু হলে বাচ্চার ব্যবস্থাও তখন হবে। স্টেট দেখবে। আমার ভায়রা জ্ঞান মুকুয্যে তাই বলে।
বা:! প্রকাশ মাথা ঝাঁকালেন। ওখানে এমনটি হলে আমাদের এখানেও তার ঢেউ আসতে দেরি হবে না।
অঘোর বললেন, তা বলতে! দেখছেন না, ওদের দেখাদেখি এ দেশেও বিয়ে ভাঙাভাঙির বহর। রাতারাতি জিনিসটা কেমন বেড়ে গেছে।
আমি ভেবে পাই না, আকাশের দিকে চোখ তুলে শিবদাস দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, পাটকাঠির মতন মটাস মটাস ওদের এত বিয়ে ভাঙে কেন। কারণ কি?
কারণ একটা না—অনেক। গগনবাবু পাকা ভুরু কপালে তুললেন। আমার ভায়রা জ্ঞান মুকুয্যে বলে, ওদের ডিকশন্যারিতে অনেক শব্দ। এক নম্বর নিমফোম্যানিয়া, দু নম্বর স্কিৎসোফ্রেনিয়া, তিন নম্বর অ্যালকোহলিজম, চার নম্বর স্যাডিজম, পাঁচ নম্বর ম্যাজো...
চুপ চুপ! প্রকাশবাবু গগনবাবুর পিঠে হাত রাখেন। গগন থমকে যান। অন্যরাও দাঁড়িয়ে পড়েন। তখন প্রজাপতি নিয়ে কথা হচ্ছিল। এখন সকলের চক্ষুস্থির, প্রজাপতির ঝাঁক আকাশপথে না, রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। পনেরো ষোলো আঠারো উনিশ—নাতনীর বয়সি সব, কিন্তু ছোঁড়াদের মতন অসভ্যতা নেই, অকারণে হাত নাড়া মাথা নাড়া মুখ নাড়া নেই। কলকল শব্দ করছিল এরাও। বুড়োদের দেখে এক সময় নীরব হয়ে গেল। এখানেও রাস্তার পাশে একটা, আশ্যাওড়ার ঝোপ। কিন্তু আগের মতন প্রকাশবাবুরা আর ঝোপের পিছনে লুকোন না, ঝোপের গা ঘেঁষে দাঁড়ান। এখানে একটা হাঁটছি আমি, এক ছোঁড়া ওই কাজ করেছিল।
জয়দ্রথ অপ্রকৃতস্থ হন। মুখ কালো করে চুপ করে থাকেন। আমড়া পাতা ও সজনে পাতার উপমা দেওয়াটা ঠিক হল না। ভাবেন। তাতে গগনবাবু আরও বেশি চটে গেছেন।
জয়দ্রথের অসহায় অবস্থা দেখে শিবদাস মনে মনে হাসেন। আর তখনি দেখতে পান সজনে গাছের গুঁড়ি ঘেঁষে একটা কাঠবেড়াল। নড়ছে না, ঠায় এদিকে তাকিয়ে আছে। অমনি শিবদাসের মাথায় একটু বুদ্ধি এল! এই বেটা। কি দেখছিস! শিবদাস হাতের লাঠিটা তুলে এমনভাবে বাগিয়ে ধরেন যেন লাঠির আগা দিয়ে খুঁচিয়ে কাঠবেড়ালের কাচের মতন ঝকঝকে চোখ দুটো গেলে দেবেন। অবশ্য ওই অবস্থায় গুজগুজ করে শিবদাস হাসেনও। কি রে বেটা, চুপ কেন, পাকা চুল দাঁতপড়া বুড়োদের রূপ দেখছিস?
আমার যেন মনে হয় ওটা কাঠবেড়ালি, অঘোর আস্তে বললেন।
তাই কি? শিবদাসের মনে খটকা লাগে।
হুঁ, তাই। প্রকাশবাবু বলেন, বেটি পাঁচ বুড়োর প্রেমে পড়েছে। তাই এমন টলটল চোখে তাকিয়ে আছে।
আমার মনে হয় ওটা পুরুষ—কাঠবেড়াল। জয়দ্রথ বলেন।
উঁহু, নারী। অপজিট সেক্স। অঘোর ও প্রকাশ এক সঙ্গে উত্তর করেন।
আপনার কি মনে হয় গগনবাবু?
গগনবাবু তখনও চুপ দেখে শিবদাস তাঁর দিকে চোখ ফেরান।
এতক্ষণ পর গগনের মুখে একটা সরু হাসি উঁকি দেয়। বলেন, সরীসৃপ প্রাণীর সেক্স চট করে বোঝা কঠিন।
তা যাই হোক। গগনবাবুর মেঘাচ্ছন্ন মুখে হাসির রোদ দেখা দিয়েছে। শিবদাস মনে মনে খুশি হন। চোখ দুটো আবার সজনের গুঁড়ির দিকে ঘুরিয়ে উৎসাহের গলায় চেঁচিয়ে বলেন, তা তুই বেটা হোস বা বেটি হোস, এদিকে আয় না, কাছে আয়। লাঠির ডগা নাচিয়ে শিবদাস কাঠবেড়ালকে কাছে ডাকেন। এসে দ্যাখ যত বুড়ো ভেবেছিস ততটা বুড়ো নই আমরা। নখ দিয়ে আমাদের গায়ের শুকনো বাকল খুঁটলে সবুজ বেরিয়ে পড়বে। পেট টিপে দ্যাখ—চোখ দিয়ে নাই দিয়ে পিছকিরির মতন ফ্যাচ করে এখনো কত রং বেরোয়।
শিবদাসের অঙ্গভঙ্গি দেখে ও কথা শুনে জয়দ্রথ হাসেন। গগনবাবুও হাসেন। শোরগোল শুনে কাঠবেড়াল ছুটে পালায়। শিবদাস তবু থামেন না। তখনও সজনে গাছের দিকে চোখ রেখে কাঠবেড়ালকে উদ্দেশ করে চেঁচান। বুঝলি, আমাদের বাইরেটা দেখতে ঝুনো নারকেল, ভেতরটা তরমুজ।
চলুন খুব হয়েছে। এবার হাঁটা যাক। শিবদাসের পিঠে গগনবাবু হাত রাখেন। আপনার ভেতরে যে এত রস আছে জানা ছিল না। গগন টেনে টেনে হাসতে থাকেন। বুড়োর মেজাজ ফিরে এসেছে। চিন্তা করে শিবদাস হালকা মনে সকলের সঙ্গে এগোন।
এই যে! প্রকাশবাবু আর এক রসিকতা করেন। হাঁটা অবস্থায় হাতের লাঠি উঁচু করে আকাশের দিকে তুলে ধরেন। অঘোরবাবুর মাথার ওপর একটা নীল বেগুনি প্রজাপতি উড়ছে। পাখার সোনালি বুটি রোদে ঝলমল করছে। ধরুন, পাকড়াও করুন বেটাকে। প্রকাশবাবু চেঁচিয়ে ওঠেন। ধরে বেটাকে জিগ্যেস করুন, এমন বয়কট করল কেন আমাদের—আর কি কোনোদিন ও আমাদের গায়ে মাথায় এসে উড়ে বসবে না।
প্রজাপতি ততক্ষণ আকাশের আর একদিকে উড়ে যায়। হুঁ, গাছেরও পাতা নেই। পৌষের রোদে সারি সারি কঙ্কালের মতন দাঁড়িয়ে সব। আর সেইসব গাছের তলা দিয়ে অকাল বসন্তের মতন শাড়ি ম্যাকসি কার্ডিগানের চোখজুড়ানো রঙের মিছিলটা আস্তে-আস্তে পার হয়ে গেল। দূরে মিলিয়ে গেল। তারপর আর দেখা গেল না। গগনবাবুর দিকে মুখ ঘুরিয়ে শিবদাসবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কেমন ভব্য সভ্য নম্র লাজুক প্রকৃতির এরা। যেন গলায় ঘড়ঘড় কফ জমেছে, কেশে গলা পরিষ্কার করে গগনবাবু বললেন, বাঁদরগুলোর মতন মেয়েগুলো এখনো একেবারে নষ্ট হয়নি। গুরুজনদের দেখলে আজও ভক্তি শ্রদ্ধার ভাব নিয়ে চলে। বুড়োদের সমীহ করে।
কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। মুখখানা আহ্লাদে আটখানা করেন অঘোর। যেন কথাটা বলা ঠিক কিনা চিন্তা করে খানিক ইতস্তত করেন। তারপর না বলে পারেন না। আমরা ওদের ক্ষীণাঙ্গী কোমলাঙ্গী বলি। অবলা বলি। ফুলের মতন নরম পলকা এক একটি শরীরের স্ট্রাকচার। যেন দু আঙুলের চাপ সহ্য হবে না। আর এই শরীরে, আমি সিরিয়াসলি জিনিসটা মাঝে মাঝে ভাবি, অঘোর আর হাসেন না, গম্ভীর। বলেন, এদেরই এক একটির গর্ভে চেঙ্গিস নেপোলিয়ান হিটলারের মতন দুনিয়া কাঁপানো পুরুষ জন্মায়।
হুঁ, প্রকাশ বলেন, আবার রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দর মতন মহাপুরুষও জন্মায়। জন্মেছেন।
জয়দ্রথ বেশ বেঁটে। চোখে লাগে। তুলনায় মাথাটা বড়। নাকটা মোটা, থ্যাবড়া। তার ওপর পচাত্তর বছর বয়সেও অসম্ভব মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরেন। এদিকে মাথা জুড়ে টাক। টাক ঘিরে চুনের পোঁচের মতন কিছু সাদা চুল। ভদ্রলোক যখন হাসেন ক্লাউনের মতো দেখায়, শিবদাস বলেন। অবশ্য জয়দ্রথের অসাক্ষাতেই এটা বলা হয়।
সেই জয়দ্রথবাবু এখন খ্যাকখ্যাক হাসলেন। যদি তাই বলেন, হেসে প্রকাশবাবুর দিকে তাকান —গামা জিবিস্কোর মতন মস্ত মস্ত পালোয়ান, মহম্মদ আলি ক্যাসিয়াস ক্লে-র মতন জাঁদরেল বক্সিং লড়িয়ে—সোবার্স পেলের মতন চাঁই চাঁই ক্রিকেট ফুটবল খেলোয়াড়—সবাই এই ক্ষীণাঙ্গী অবলাদের গর্ভজাত।
যেন ভদ্রলোকের হাসির মধ্যে কথার মধ্যে একটা অশ্লীলতার গন্ধ পান গগন! মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বলেন, এই জন্যই বলা হয় স্ত্রীজাতি—নারী হল শক্তির উৎস। আদ্যাশক্তি মহামায়ার অংশ এরা।
চলুন খুব হয়েছে। আলোচনাটা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। যেন ঈষৎ বিরক্ত হয়ে শিবদাস হাঁটতে শুরু করেন। অন্যরাও হাঁটেন।
একটা কালভার্ট পার হন তাঁরা। কালভার্ট থেকে নেমে রাস্তার ঢালুর কাছে মুথাঝোপের গায়ে কালো মিশমিশে বিশাল ডানার একটা পতঙ্গ বসে আছে। দেখে সকলের আগে শিবদাস দাঁড়িয়ে পড়েন।
অঘোর বললেন, দেখতে অবিকল প্রজাপতির আকৃতি। আসলে ওটা মথ।
তা জানি, শিবদাস এদিকে ঘাড় না ফিরিয়ে, চাপা গলায় উত্তর করেন, আমাদের বুড়োদের কাছে প্রজাপতি আসে না। আমাদের মথই ভালো। এক-পা দু-পা করে সন্তর্পণে ঝোপের দিকে তিনি এগোন। তারপর খপ করে পতঙ্গটাকে ধরে ফেলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে, তাঁর ঠিক পিছনে গগনবাবুর কাঁধের ওপর বসিয়ে দেন।
কি হল কী! গগন রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খান। তারপর একটু সামলে নিয়ে দৃষ্টি আড় করে কাঁধের দিকে তাকান। তারপর শিবদাসের দিকে চোখ ফেরান—এখানে কেন মশাই, আমার গায়ে এটাকে বসিয়ে দেওয়ার অর্থ কী।
অর্থ সোজা। শিবদাস মিটিমিটি হাসেন। তাঁর হাসি দেখে অন্যরাও টিপেটিপে হাসেন। মথ নড়ছে না, লক্ষ্মী ছেলের মতন গগনের কাঁধে চুপ করে বসে আছে।
প্রকাশ বললেন, ঠিকই হয়েছে। উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান পেয়েছে বেটা। এতক্ষণ মুথাঝোপের ওপর বসে খামকা সময় নষ্ট করছিল।
হুঁ, ঠিক ঠিক। এবার জয়দ্রথ ঘাড় নাড়লেন। মনের মতন পাত্র জুটেছে। মথ বাবাজী এখন একেবারে নিশ্চিন্ত। এবার নতুন করে গগনবাবুর বিয়ের ফুল ফুটবে।
অ্যাঁ, কী বললেন। ব্যাপারটা ইতিমধ্যে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন গগন। এবার রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠলেন। তাঁর ফরসা ছোট-খাটো মুখ লাল হয়ে যায়। ক্রোধ বা বিরক্তি নয়, যেন একটা চাপা খুশিতে শুকনো চামড়ার নিচে কপালের রগটা ধিকিধিকি লাফাতে থাকে। উপযুক্ত পাত্রটা আমি হলাম কি করে? সকলের চোখের দিকে চোখ তুলে গগন প্রশ্ন করেন।
হুঁ হুঁ, প্রকাশ বললেন, আমাদের গিন্নিরা আজও আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিঁকে আছেন। আমাদের সঙ্গে লঞ্জিভিটির রেস খেলছেন। শুধু কি তাই, কাটারি হাতে আমাদের আজও পাহারা দেন—আমরা এদিকে ওদিকে ঘাড় ফেরাতে সাহস পাই না।
অঘোর বললেন, সেদিক থেকে আপনি গগনবাবু অতি ভাগ্যবান। আপনার গিন্নী অনেকদিন আগে—
অঘোরবাবুর কথাটা লুফে নেন জয়দ্রথ। বললেন, সুতরাং এর দৌলতে—চোখের ইশারায় জয়দ্রথ গগনবাবুর কাঁধের পতঙ্গটাকে দেখান—আপনার শিগগির একটি সুলক্ষণা কন্যে জুটবে।
হি হি, গগন শিশুর মতন হাসলেন। আর সেই মুহূর্তে মথ তাঁর কাঁধ ছেড়ে উড়ে পালায়। যেন হতাশ হন গগন। একটা বিষণ্ণতা চোখে মুখে ফুটে ওঠে। কিন্তু তখনি আবার মুখের ঝলমলে চাঙ্গা হাসি ফিরে আসে। শিবদাসের দিকে চোখে ফেরান। বলেন, আজ আপনাকে ছেলেমানুষী রসিকতায় পেয়ে বসেছে খুব। ছেলেবেলায় আমরা ওই মথকে বলতাম প্রজাপতির মাসতুতো ভাই। ওটিকে আমার কাঁধে চাপিয়ে দিলে কি সুবিধে হত ভাবছেন?
অসুবিধের ছিল কি? হাসি হাসি চোখে শিবদাস উত্তর করেন।
আমার গিন্নি বেঁচে নেই ঠিক—অনেকদিন স্বগগে গেছেন। গগন আর হাসেন না। লম্বা শ্বাস ফেলেন। কিন্তু ওই ছ'শালি? বছর বছর যারা আমাকে সোয়েটার বুনে উপহার দেয়? যদি কথাটা ওরা টের পায়—ওদের ঘরেও কাটারি আছে মশাই—ছুটে তক্ষনি এসে ঘ্যাঁচ করে বুড়ো বোনাইয়ের নাক কান কেটে দেবে।
গগন তাঁর ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে নাক ও কান দেখান। দৃশ্যটা সকলেই উপভোগ করেন। হাসেন। তারপর সপ্রশংস চোখে শিবদাসের দিকে তাকান। শিবদাসের রসিকতায় তাঁরা বেজায় খুশি।
মাঝে মাঝে কি আমাদের ঘাটের মড়া এই বুড়োদের ছেলেমানুষ হতে ইচ্ছে করে না গগনবাবু! প্রকাশ বলেন।
একশ বার একশ বার। প্রকাশের কথায় অঘোর ও জয়দ্রথ সায় দেন।
চলুন হাঁটা থাক। শিবদাস আগে পা বাড়ান। দেখাদেখি ওঁরাও হাঁটেন। আরও খানিকটা এগোন তাঁরা। মাথার ওপর প্রকাণ্ড বটগাছ। সকলে দাঁড়ান সেখানে। নদী দেখা যাচ্ছে। গঙ্গা। সুতরাং মনোমত জায়গা। মাটিতে ছড়ানো শুকনো মচমচে বটপাতা মাড়িয়ে তাঁরা আর একটু অগ্রসর হন, নদীর ধারে চলে আসেন। এখন কনকনে ঠান্ডা বাতাস গায়ে কামড় বসায়। তা হলেও উপাদেয়। বাতাসে জলের গন্ধ। রোদের লাল রং ধরতে শুরু করেছে। বিকেল হয়ে এল।
সত্যি এমন আনন্দের ভ্রমণ অনেকদিন হয়নি। গগন বললেন।
এবার তবে বসা যাক। শিবদাসবাবু প্রস্তাব করেন। নিশ্চয় নিশ্চয়। অঘোরবাবুরা সায় দেন। কিন্তু বসবেন কোথায়। বসার মতন বাঁধানো ঘাট নেই।
একটা পুরোনো ইটের পাঁজা খানিকটা দুর্বাঘাস। তাতেই সকলে খুশি। ঘাসের ওপর বসা যাবে। পকেট থেকে রুমাল বাসি খবর কাগজের টুকরো ইত্যাদি টেনে বের করেন সব। কিন্তু বসা হয় না। সকলের চোখ গেছে পাড়ের কাছে একটা নৌকোর দিকে। নৌকোয় কিছু এসে যেত না। এদিক ওদিক আরও কয়েক গন্ডা নৌকো রয়েছে। কিন্তু এই নৌকোর সওয়ারী সেই উঠতি বংশধরের ঝাঁক। রঙিন বেলুন নৌকো জাহাজের ছাপ মারা জামা গায়ে, মাথায় উলুখড়ের মতন ঝুপসি চুল। ছুঁড়ির দলটাও এসে জুটেছে। ভাবা যায়!
আঘোরবাবু বললেন, জোট বেঁধে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে। প্রকাশবাবু বললেন, বটানিক্যাল গার্ডেন যেতে পারে। খিদিরপুর ডায়মন্ডহারবার পাড়ি দেওয়া অসম্ভব কি? শিবদাস মন্তব্য করলেন।
জয়দ্রথ খ্যাকখ্যাক হাসেন। ওই যে বলে, গাই বাছুরে মিল থাকলে কেউ আটকাতে পারে না। হয়তো বাড়ির লোক জানেই না। নাতিদের পিছু পিছু নাতনীরা পিলপিল চলে এসেছে।
দেখুন দেখুন, গগনবাবু লাঠি তুলে দেখান। মেয়েগুলোর হাত ধরে কোমর ধরে পাছা ধরে টেনে টেনে নৌকোয় তুলতে আরম্ভ করেছে গুণ্ডার দল।
এমন করে টেনে তুলবে বলেই তো ওরাও ছুটে এসেছে। প্রকাশবাবু হাসেন।
অ্যাঁ, ওইটুকুন নৌকো, কী বিচ্ছিরি গা ঘেঁঘাঘেঁষি ঠাসাঠাসি ব্যাপার! রাগে গরগর করেন গগন। হাতের লাঠিটা দুবার মাটিতে ঠোকেন।
ফ্রী সেক্স,—একেবারে আগুনে ব্যাপার। জয়দ্রথ আবার খ্যাকখ্যাক শব্দ করে বিদঘুটে হাসিটা হাসেন।
বেশি তাকাবেন না ওদিকে মশাই। শিবদাস খোঁচা দেওয়ার মতন করে বলেন, আগুন এসে গায়ে লাগতে পারে।
তাই তো, অঘোর মন্তব্য করেন, শুকিয়ে সব খটখটে লাকড়ি হয়ে আছি, জ্বলে পুড়ে শেষ হতে দু-মিনিট লাগবে না।
সকলে একসঙ্গে হাসেন। গগনবাবু হাসেন না। নৌকো ছেড়ে দেয়, দুলতে দুলতে দূরে ভেসে যায়। জায়গাটা হঠাৎ ফাঁকা ঠেকে।
এবার রুমাল খবর কাগজ বিছিয়ে ঘাসের ওপর সকলে বসেন।
প্রকাশবাবু বললেন, গঙ্গার পাড়ে এলে একটা আধাত্মিক ভাব ভেতরে জাগে।
অঘোর বলেন, আমার ওই ইস্কুলে পড়া কবিতার একটা লাইন ভারি মনে পড়ে। গঙ্গার তীর ছায়া সুনিবিড় জীবন জুড়ালে তুমি—বাকি কথাগুলো ভুলে গেছি।
বুড়ো হলে মেমারির কিছু থাকে না। শিবদাস বলেন।
জয়দ্রথের আবার সেই হাসি। নদীর ধারে এলে তাঁর কেবল চিনাবাদাম খেতে ইচ্ছে করে। ছেলেবেলায় খুব খেয়েছেন কিনা। বলেন।
আমার জানতে ইচ্ছে করছে দল বেঁধে সব গেল কোথায়। কোল থেকে লাঠিটা নামিয়ে ঘাসের ওপর রাখেন গগনবাবু। বড় করে শ্বাস ফেলেন। আর কেউ কথা বলে না। রোদের রং এখন আলতার মতন গাঢ়। সূর্য একেবারে হেলে গেছে। এবার টুপ করে ডুববে। হাওয়ায় কনকনে ধার।
দেখুন, দেখুন, অঘোরবাবুর হাঁটুতে আঙুলের খোঁচা দেন প্রকাশ। আগুনের কথা বলছিলেন, ওই ওখানে আগুন জ্বলছে।
হুঁ দেখেছি। অঘোর ঘাড় ফেরান। আগুনের ধোঁয়া বেশি উঠছে।
জয়দ্রথ ও শিবদাস একসঙ্গে সেদিকে তাকান। অনেকটা দূরে যদিও। মেটে রঙের একটা আগুন। ঝাপসা ঝাপসা দেখায়। যেন এখনি ওদিকে কুয়াশা জমছে। জয়দ্রথ বলেন।
আপনি দেখলেন আগুনটা? শিবদাস গগনের দিকে চোখ ফেরান।
না, আমার চোখে ক্যাটারাক্ট। আমি কিছুই দেখছি না। অতিরিক্ত গম্ভীর গগনের গলার স্বর। জলের দিকে তখনও চোখ। মুখটা থমথমে। আমড়া গাছে সজনে গাছের সামনে ওই চেহারা করে রেখেছিলেন।
সূর্য ডুবে গেল। মাথার ওপর দিয়ে বালিহাঁসের ঝাঁক উড়ে যায়। বাঁশের গিঁট ফাটার মতন দুবার দুটো শব্দ হল।
প্রকাশবাবু শুনলেন?
হুঁ, আপনি?
আমি দুবারই শুনেছি। অঘোর বললেন।
একটা চিমসে পোড়া গন্ধ আসছে—আপনারা টের পাননি? জয়দ্রথ বললেন।
হুঁ, শিবনাথ মাথা নাড়েন, শব্দ হবার আগে থেকেই গন্ধটা আমার নাকে লাগছে।
সকলে চুপ। আপনি কি একটা গন্ধ টের পাচ্ছেন গগনবাবু? শব্দ শুনলেন? শিবদাস আবার গগনের দিকে তাকান।
না, আমি কিছুই শুনছি না মশাই, গন্ধটন্ধও টের পাই না। বোঝা যায়, গগনের রাগ কিছুতেই পড়ছে না। লাঠিটা কোলে টেনে নিয়ে বলেন, ঠান্ডায় আমার নাক কান বন্ধ হয়ে আসছে।
তাই তো! শিবদাসের হুঁশ হয়। গল্পে গল্পে রাত করে ফেললেন সব। এবার উঠতে হয়। রোদ থাকতে বাড়ি ফেরার পথ ধরা উচিত ছিল। শিবদাস তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ান। দেখাদেখি সকলেই। শিবদাস তাঁর মাংকি ক্যাপ পরে নেন। অঘোরও টুপি পরেন। প্রকাশবাবু গলায় মাফলার জড়ান। জয়দ্রথ কাঁধের ভাঁজ করা র্যাপার খুলে গায়ে জড়ান ও কান মাথা ভাল করে ঢাকেন। গগন কিছুই করেন না। শালির হাতের ডবল বুনটের উলের জামা গায়ে। আর কিছুই দরকার নেই তাঁর। যদিও ঠান্ডায় নাক কান বন্ধ হয়ে আসছে, তবু। কান মাথা ঢেকেঢুকে রাস্তায় চলা তাঁর ঘোর অপছন্দ।
সকলের সঙ্গে হাঁটতে থাকেন, এবং ওই অবস্থায় লাঠিটা শূন্যে নাচিয়ে, যেন কাউকে শাসাচ্ছেন, বলেন, ঠান্ডা পড়ুক আর যত রাত হোক—ইচ্ছে ছিল ওই ঘাসের ওপর বসে অপেক্ষা করি। দেখতাম বাঁদরগুলো ফুর্তিটুর্তি সেরে ছুঁড়িগুলোকে নিয়ে কখন ফেরে জেদ চেপেছিল—ওই ফুটফুটে লক্ষ্মী লক্ষ্মী চেহারার রঙ্গিণী নাতনীরা উল্লুকগুলোর সঙ্গে হুল্লোড় করে কত রাত করে ঘরে ফেরে একবার চোখে দেখে যাই—
উত্তেজিত গগন দাঁড়িয়ে পড়েন। তাঁকে দেখতে তাঁর কথা শুনতে সকলেই হাঁটা বন্ধ করেন।
চলুন। শিবদাস তাড়া দেন। তাঁরা হাঁটেন। করো মুখে শব্দ নেই। কিন্তু এই থমথমে আবহাওয়া নিয়ে কি হাঁটতে ভালো লাগে! কথা না বলে বেড়িয়ে সুখ? তাই প্রকাশবাবুর কাঁধে হাত রেখে অঘোর নীচু গলায় বলেন, পোড়া গন্ধটা এখনও আসছে—এখান থেকেও টের পাচ্ছি।
জয়দ্রথ শুনতে পান। বলেন, তা তো পাবেনই টের। এখনও যে পোড়ান শেষ হয়নি। সবটা শরীর পুড়ে ছাই হতে অনেক সময় লাগে।
হুঁ, তা লাগে। শিবদাস দুবার মাথা নাড়েন। তবে সব পুড়ে ভস্ম হবার পরেও মনুষ্যদেহের একটা অংশ থেকে যায়। আপনারা জানেন নিশ্চয়!
আশ্চর্য, শিবনাথ তখন অল্প অল্প হাসেন, হেসে গগনবাবুর দিকে তাকান। যেন তাঁর ইচ্ছে গগনবাবু একটা দুটো কথা বলুক—পরিবেশটা তরল হবে।—তাই না গগনবাবু! শিবদাস বললেন, মন মন কাঠ পোড়ালেও আমাদের এই নাভি—নাইটা কিছুতেই পোড়ে না। বাকি সবটা দেহ ছাই হয়ে যায়।
গগন থমকে দাঁড়ান। ঘাড় ফিরিয়ে শিবদাসকে দেখেন। ধমকের সুরে বলেন, আচ্ছা বেরসিক তো আপনি। অ্যাঁ, কী সব ছাইভস্ম আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বেড়ানোটা মাটি করে দিলেন? খেপে গিয়ে গগন এবার পা চালিয়ে সকলের আগে আগে হাঁটেন।
ধমক খেয়ে শিবদাস চুপ। মুখে আর হাসি নেই।
নীচু গলায় প্রকাশ বললেন, পোড়ানোটোড়ানোর কথা গগনবাবুর ভালো লাগছে না। বিরাশি বছরে পা দিয়েছেন। শ্মশানভীতি এসে গেছে।
উঁহু, জয়দ্রথ খ্যাকখ্যাক হাসেন, বলেন, বুড়োর মগজে এখনো নৌকোটা দুলছে—ঠাসাঠাসি যৌবন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন