হেমেন্দ্রকুমার রায়
বেড়াতে এসেছি। পুরী। আমি আর শচীন দুই বন্ধু।
সমুদ্রের গায়ে একটি হোটেল ছিল— “সাগর-পুরী।” শচীন আগে আর একবার এই হোটেলে এসে উঠেছিল। এবারেও সে আমাকে নিয়ে সেইখানে গিয়ে হাজির হলো।
“সাগর-পুরীর”র ম্যানেজার দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, তাঁর হোটেলের কোন ঘরই খালি নেই।
শচীন বললে,—“মশাই, আমি আপনাদের পুরোনো খদ্দের। কিন্তু এখানে যখন ঠাঁই নেই, তখন আমাকে বাধ্য হয়েই অন্য হোটেলে যেতে হবে।”
ম্যানেজার বললেন,—“এবারকার পুজোর মরসুমে পুরীর কোন হোটেলেই তিলধারণের ঠাঁই নেই। যাবেন কোথায়?”
শচীন হতাশ ভাবে বললে,—“তাহলে উপায়?”
ম্যানেজার খানিক ভেবে বললেন—“আপনি যখন পুরোনো খদ্দের, তখন উপায় একটা করতে পারি। কিন্তু একটু কষ্ট হবে।”
শচীন বললে,—“হোক কষ্ট। এই বিদেশ-বিভূঁয়ে চেনা জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে মন সরছে না।”
ম্যানেজার বললেন,—“আমাদের রান্নাঘরের পাশে ছোট একখানা কুঠরী আছে। সেখানে থাকতে পারবেন?”
শচীন বললে, – “খুব পারব।”
ম্যানেজার বললেন,—“তবে আসুন।”
একখানা কয়লা রাখবার কুঠরীর মতো খুব ছোট্ট ঘর। সমুদ্রের ধার, তবু সেখানে আলো-হাওয়া ঢোকে না। তার বদলে সর্বদাই সেখানে রান্নাঘরের নানারকম গন্ধ, ধোঁয়া আর উত্তাপ এসে ঢোকে ৷
বৈকাল হতে-না-হতেই শচীনের সহ্যশক্তি নিঃশেষে ফুরিয়ে গেল ৷ মাথা নেড়ে বললে,—“উঁহু, এ অসম্ভব। আমরা কেউ ইট কি পাথর নই। এখানে থাকলে মারা পড়ব।”
আমি বললুম,—“তাহলে কোথায় যাবে?”
শচীন বললে,—“যেখানে মানুষ থাকে। গেল-বারে এই হোটেলের সবচেয়ে ভালো ঘরে আমি ছিলুম। এবারেও সেই ঘরে থাকতে সাধ হচ্ছে।”
আমি বললুম,—“তোমার সাধ চাঁদ ধরবার সাধের মতো। এ-সাধ মিটবে না, কারণ সে ঘর এখন অন্য লোকের দখলে।”
শচীন মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে,—“সেই তো হচ্ছে সমস্যা!” তখন বেলা সাড়ে পাঁচটা, উপর থেকে চা-পান করবার জন্যে ঘণ্টার আওয়াজ এলো।
শচীন উঠে দাঁড়িয়ে বললে,—“চল, খানিকক্ষণ ভালো ঘরে গিয়ে গায়ের জ্বালা জুড়িয়ে আসি!”
খাবার ঘরের জানালা দিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখি, আকাশে মেঘের পর মেঘ জমেছে।
চা-পান শেষ হবার আগেই সারা আকাশ মেঘের কাজলে এমন কালো হয়ে গেল যে, তার ছায়ায় সমুদ্রের গায়ে নীলরঙের একটুও চিহ্ন রইল না। চারিদিকে অকাল-সন্ধ্যা নেমে এলো, তারপরেই বাজের বাজনা আর বিজলীর রোশনাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝম্ ঝম্ বৃষ্টি শুরু।
টেবিলের ধারে বসে যাঁরা চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছিলেন, একে একে তাঁদের অনেকেই অদৃশ্য হলেন। আমরা দুজন ছাড়া আরো যে- তিনজন লোক তখনো স্থান ত্যাগ করলেন না, তাঁদের একজন হচ্ছেন কলকাতার কোন সওদাগরী অফিসের মাঝবয়সী বড়বাবু, আর একজন হচ্ছেন কলকাতার কোন স্কুলের বুড়ো মাস্টারমশাই এবং আর একজন হচ্ছেন কলকাতার কোন কলেজের নব্য ছাত্র ৷
জল-ঝরা অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি বললুম,— “এমনি বাদলার দিনে ভূতের গল্প বেশ জমে”
নব্য ছাত্রটি নাক সিটকে বললেন,—“আমি ভূত মানি না।”
মাঝবয়সী বড়বাবু বললেন,—“আমি ভূত মানি। ভূতকে ভয় করি। আমার বুকের ব্যামো আছে,— ভূতের গল্প শুনলে বুক ঢিব ঢিব করে।”
বুড়ো মাস্টারমশাই বললেন,— “আমি ভূতের গল্প শুনতে খুব ভালোবাসি। কিন্তু সত্যি ভূতের গল্প।”
শচীন এতক্ষণ কি-যেন ভাবতে ভাবতে অপলক চোখে বড়বাবুর মুখের পানে তাকিয়ে ছিল। এখন হঠাৎ—মুখ খুলে বললে,—“আমি একটা খুব সত্যি ভূতের গল্প বলতে পারি। এ-ভূতটাকে আমি নিজের চোখে দেখেছি। কিন্তু উনি যে ভূতকে ভয় করেন—তার ওপরে ওঁর নাকি আবার বুকের ব্যামো!”
বড়বাবু বুকে হাত দিয়ে বললেন,—হ্যাঁ, অনেক দিনের ব্যামো ৷ সত্যি ভূতের গল্প শুনলে হয়তো ভিরমি যাব।”
নব্য ছাত্রটি বাঁকা চোখে বড়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন,—“আমি ভূত মানি না,—কিন্তু সময় কাটাবার জন্যে ভূতের গল্প শুনতে রাজি আছি।”
মাস্টারমশাই বললেন,—“ভোটে গল্প শোনার লোকই বেশি হলো। আপনার সত্যি ভূতের গল্পটি বলুন।”
চাকর ঘরে আলো জ্বেলে দিয়ে গেল। বড়বাবু হতাশ চোখে একবার সকলের মুখের পানে তাকিয়ে, চেয়ার টেনে একেবারে আলোর কাছে সরে গিয়ে বসলেন।
শচীন গল্প বলতে লাগল! আকাশও তখন মেঘ-বিদ্যুৎ-বৃষ্টির গল্প ভালো করে জমিয়ে তুলেছে!
“গল্পের নায়ক হচ্চি আমি। কিন্তু গল্পের ঘটনাস্থলের নাম আমি বলব না। সত্যি ভূতের গল্পে ঘটনাস্থলের নাম বলতে নেই। তবে একটা কথা শুনে রাখুন, এই গল্পের ভূতটিকে দেখেছিলুম এই হোটেলেরই মতন আর একটা হোটেলে।”
বড়বাবু চমকে উঠে বললেন, “তাই নাকি?”
“আজ্ঞে হ্য৷৷ সেবারেও আমি পুজোর সময় বেড়াতে বেরিয়ে সেই হোটেলে গিয়ে উঠেছিলুম। আমি যে ঘরখানি পেলুম সে-খানি বেশ বড়-সড়। তার পাঁচটা জানলা আর দুটো দরজা। ঘরখানি হোটেলের দোতলায়, আর ঠিক সিঁড়ির ডান পাশে ৷ ”
বড়বাবু বিড় বিড় করে বললেন,—“হোটেলের দোতলায়, সিঁড়ির ডান পাশের ঘর—”
—“হ্যাঁ। ঘরের ভিতরকার বর্ণনাও একটু দিতে হবে—সত্যি গল্প কিনা! দক্ষিণদিকে ছিল একখানা লোহার খাট। আর একদিকে দুটো দেয়াল-আলমারি। আর একদিকে ছিল চৌকো আয়না-বসানো একটা ‘ড্রেসিং-টেবিল'। তার সামনে একখানা কাঠের চেয়ার। সে ঘরে একখানা ইজি-চেয়ারও ছিল। একটা দরজার মাথায় কুইন ভিক্টোরিয়ার ছবি ছাড়া আর কোথাও কোন ছবি ছিল না।”
মাস্টারমশাই অধীরভাবে বললেন,—“ভূত কোথায় মশাই, ভূত কোথায়? এত ঘরের বর্ণনা কেন?”
—“যদিও ঘটনাস্থলের নাম বললুম না, তবু ঘরের বর্ণনাটা শুনে রাখুন। বিদেশের কোন হোটেলে এ রকম ঘর দেখলে আগে থাকতেই সাবধান হতে পারবেন। · ...এখন শুনুন। সে ঘরখানার ভিতরে দিনের বেলাটা আমার দিব্যি আরামে কেটে গেল। কিন্তু ঘরের ভেতরে সন্ধ্যার অন্ধকার যেই নেমে এলো,—অমনি কেন জানি না, আমার মনটা কেমন ছ্যাৎ-ছ্যাৎ করতে লাগল! সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে কি যেন একটা অজানা ভয় পা টিপে টিপে সেই ঘরের ভেতরে এসে ঢুকে পড়ল। যেন অদৃশ্য একটা বিভীষিকা ছায়ার মতন আমার পিছনে ফিরতে লাগল। যেন দেখা যাচ্ছে না এমন দুটো স্থির আড়ষ্ট চোখ ড্যাবড্যাব, করে আমার পানে তাকিয়ে রইল তো তাকিয়েই রইল!
আমি ভীতুলোক নই, তবু কিছুতেই মন থেকে এই ভয়-ভয় ভাবটা তাড়াতে পারলুম না। মনকে প্রবোধ দিলুম, অন্যমনস্ক হবার জন্যে বার বার চেঁচিয়ে গান গাইতে লাগলুম, কিন্তু মন আমার শান্ত হলো না। তখন তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ে এই অজ্ঞাত ভয়টাকে ভোলবার চেষ্টা করলুম।।
ঘুম আমাকে সব ভুলিয়ে দিল বটে—কিন্তু বেশিক্ষণের জন্যে নয় ৷ গভীর অন্ধকারের ভিতরে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল! জেগে উঠেই বুঝলুম, আমার ঘুম স্বাভাবিক ভাবে ভাঙে নি। ঘরের ভিতরে একটা কিছু বিপদ এসে উপস্থিত হয়েছে—এই কথাটাই তখনি আমার মনে হলো!
শচীন এইখানে থামল। বাইরে তখন অবিরাম চলেছে বজ্রের হুঙ্কার, সমুদ্রের গর্জন, বৃষ্টিধারার কান্না ও ঝোড়ো হাওয়ার হাহাকার। দমকা বাতাস মাঝে মাঝে ঘরের ভিতরেও এসে ঠাণ্ডা জলের ছিটে ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে!
মাস্টারমশাই রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলেন—“ওকি মশাই, এমন জায়গায় এসে থামলেন কেন?”
বড়বাবু দুই চোখ মুদে বললেন,—“আমার বুক ঢিপঢিপ, করছে!”
ছাত্রটি বললেন—“আমি ভূত মানি না।”
শচীন আবার আরম্ভ করলে,—“কোথাও একটি পাতা নড়ার শব্দও নেই এবং রাত করছে ঝাঁ ঝাঁ! আগেই বলেছি, আমার ঘুম ভাঙল গভীর অন্ধকারের ভিতরে। কিন্তু আপনারা বুঝতে পারবেন কিনা জানি না, সে অন্ধকার কালো অন্ধকার নয়, সে যেন আলোময় অন্ধকার কারণ বাতি জ্বলছিল না, খোলা জানালা দিয়ে একটুও চাঁদের কিরণ আসছিল না, তবু অন্ধকারের ভিতরেই বায়োস্কোপের ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল, ঘরের সেই ‘ড্রেসিং-টেবিল’টা! স্তম্ভিতভাবে দেখলুম, টেবিলের আয়নার সামনে, আমার দিকে পিছন ফিরে চেয়ারের উপরে বসে আছে একজন লোক! আয়নার ভিতরে তার মুখও আমি দেখতে পেলুম—সম্পূর্ণ অচেনা মুখ! তার নাকের তলায় দুর্গাঠাকুরের অসুরের মতন মস্ত বড় গোঁফ আর তার ভয়ঙ্কর দুটো চোখ যেন জ্বলন্ত ভাটার মতো! তার ডান হাতে একখানা চক্চকে খুর,—আর সেই খুর দিয়ে নিজের গলা সে নিজেই কাটছে!

হঠাৎ ফিকি দিয়ে রক্ত ছুটল- -এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই ভয়ানক দৃশ্যটা আবার মিলিয়ে গেল! ঘর আবার অন্ধকার এবং সেই অন্ধকারে কার পায়ের শব্দ পেলুম। কে ড্রেসিং টেবিলের দিক থেকে আমার বিছানার দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে! আমি আর স্থির থাকতে পারলুম না, একলাফে বিছানা ছেড়ে নেমে, কোনরকমে দরজা খুলে ঘরের বাইরে পালিয়ে গেলুম!
পরের দিন সকালে খোঁজখবর নিয়ে জানলুম, “সেই হোটেলের তিননম্বরের ঘরে একজন লোক আত্মহত্যা করেছিল। কিন্তু হোটেলের ম্যানেজার আমার কাছে কোনমতেই সে কথা স্বীকার করলে না!”
বড়বাবু হঠাৎ চেয়ারের উপরে আড় হয়ে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে চিঁ চিঁ করে বললেন,—“আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে। এই রে, আমি ভিরমি যাব।”
মাস্টারমশাই আর নব্য ছাত্রটি ব্যস্ত হয়ে তাঁর কাছে ছুটে গেলেন।
শচীন উঠে দাড়িয়ে বললে,—“দেখচি ওঁর সামনে ভূতের গল্প বলা আমার উচিত হয় নি ৷”
রাত তখন সাড়ে নয়টা। আমি আর শচীন আমাদের অন্ধকূপে বসে আছি, এমন সময় হোটেলের একটা চাকর এসে আমার হাতে একটুকরো কাগজ দিয়ে বললে,— “ম্যানেজারবাবু দিলেন।”
কাগজে ম্যানেজারবাবু লিখেছেন :
“হোটেলের তিন নম্বরের ঘর হঠাৎ খালি হয়েছে। আপনারা যদি ইচ্ছা করেন তাহলে তিন নম্বরের ঘরে উঠে আসতে পারেন।”
শচীন দুষ্টুমির হাসি হাসতে হাসতে বললে, – “এ আমি আগেই জানতুম!”—
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, “কেমন করে?”
শচীন বললে,—“হোটেলের দোতলায়, সিঁড়ির ডানপাশের ঐ তিন নম্বরের চমৎকার ঘরখানিতে আমি গেলবারে এসে থেকে গিয়েছি। আজ দুপুরেও ও-ঘরে গিয়ে উঁকি মেরে দেখে এসেছি, ও-ঘরের আসবাব - গুলো ঠিক আগেকার মতোই সাজানো আছে। ঐ ঘরেই বড়বাবু ছিলেন।”
—“তার মানে?”
—“তার মানে, তুমি একটি আস্ত গাড়ল! এতক্ষণেও এটা বুঝলে না যে, বড়বাবুকে তাড়াবার জন্যেই আমার ভূতের গল্পে তিন নম্বরের ঘরের বর্ণনা স্থান পেয়েছে?”
—“তাহলে তোমার সত্যি ভূতের গল্পটা—”
—“একেবারে গাঁজাখুরি।”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন