হেমেন্দ্রকুমার রায়
এবারে (১৩৪৮ সাল) কালবৈশাখী করেছিল কলকাতাকে ‘বয়কট’। বরাবরই সে ফাগুনের শেষ থেকে চৈত্র মাসের মধ্যেই দেখা দেয় এবং সঙ্গে আসে তার অল্পবিস্তর বৃষ্টিধারা। আজ পর্যন্ত আমি
তাকে এই বাৎসরিক কর্তব্যপালনে অমনোযোগী হতে দেখিনি। কিন্তু এবারে সে ছিল অদৃশ্য। এমনকি বৈশাখের তিন-তিনটে দিন গেল, অথচ আকাশ থেকে ঝরল না একটি ফোঁটা জল! রোজই বৈকালে তৃষিত চোখে মুখ তুলে দেখি কাঠফাটা রোদে পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে আকাশের নীলিমা। ধুলোয় ধূসর কলকাতায় জাগল নাগরিকদের হাহাকার। ঠিক এই সময়ে আমাদের ‘রংমশালের দল’ রেডিয়োর আসরে বসে একতানে ধরলে যখন গান—
জাগো জাগো কালবৈশাখী!
আর থেকো না সুপ্ত হে
আকাশে ছিল না তখন একখানা মেঘ।
কিন্তু ‘বৈশাখী’র পালা শেষ হবার পরই রেডিয়ো-অফিস থেকে পথে বেরিয়ে সবিস্ময়ে দেখি, পশ্চিম আকাশ ভরে গিয়েছে কালো কালো মেঘে আর মেঘে!
এ যে অবাক কাণ্ড! মনে মনে বললুম, ধন্য 'রংমশালের দল', ধন্য! সারা দেশ গোটা ফাগুন- চৈত্র মাস ধরে কোটি কোটি কণ্ঠে ডেকেও যার সাড়া পায়নি, ‘রংমশালের দলে'র কাতর আরজি বেতারে অদৃশ্য বিদ্যুৎ-প্রবাহের সঙ্গে শূন্যে ছড়িয়ে পড়বার সঙ্গে-সঙ্গেই হল তার অভাবিত আবির্ভাব! উড়ল মেঘের কাজল-কালো পতাকা, বাজল ঘন ঘন বাজের দামামা, ফুটল বিজলির আলো নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, ঝরল ঝরো ঝরো জলের ঝরনা! ‘রংমশালের দলে’র বাহাদুরি আছে বই কি!
এরকম আশ্চর্য ব্যাপার আমার জীবনে আরও বার কয়েক ঘটেছে।
ছেলেবেলায় একদিন আমি ও আমার খুড়তুতো ভাই শক্তি আমাদের পাথুরেঘাটার বাড়ির ছাদের উপরে খেলা করছি। বাড়ির সামনেই তখন গলির ওপাশে ছিল ঘোষেদের লম্বা একতলা আস্তাবল-বাড়ি। ছেলেমানুষির কোন খেয়ালে হঠাৎ বললুম, ‘দেখ শক্তি, আমি যা বলব এখুনি তা ফলে যাবে!” শক্তি বললে, ‘ইস!’
—“বিশ্বাস হচ্ছে না? দেখবি? আমি যদি বলি, তাহলে ওই আস্তাবল-বাড়ির ছাদ এখুনি ভেঙে পড়বে! কেন যে হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে বিশেষ করে ওই কথাটাই বেরুল তা জানি না, কিন্তু কথাগুলো উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে সত্যসত্যই সেই পাকা আস্তাবল-বাড়ির একাংশের ছাদ ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে! শক্তি বিপুল বিস্ময়ে হাঁ করে আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইল। আমি নিজেও রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেলুম ৷
আর একদিনের কথা বলি। বছর উনিশ-বিশ আগেকার কথা।
আমার বাল্যবন্ধু ডাক্তার শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ হালদার ও আরও দুজন সঙ্গীর সঙ্গে পি, সেট কোম্পানির বাগানে (বোধ হয় দমদমায়) যাচ্ছি। সরু একটা পথ, তার একদিকে একটানা ঝোপঝাপ ।
হঠাৎ কী মনে হল, বললুম, দেখ নরেন, এই ঝোপ থেকে এখনই যদি একটা সাপ বেরিয়ে পড়ে?
নরেন কোনও জবাব দেবার আগেই পাশের ঝোপ থেকে ফস করে বেরিয়ে পড়ল মাঝারি আকারের একটা কালো সাপ! কী সাপ বুঝতে পারলুম না, কারণ দেখা দিয়েই সে বিদ্যুৎবেগে আবার ঝোপের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল!
অবশ্য, এর মধ্যে আমার নিজের কোনও বাহাদুরি নেই। এই ধরনের ঘটনা প্রত্যেক মানুষের জীবনেই ঘটে। হয়তো পরিচিত ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে আট-দশ বৎসর দেখা নেই, তার কথাও ভাবিনি। হঠাৎ একদিন অকারণেই তাকে মনে পড়ল এবং ঠিক সেইদিনেই হল তার আকস্মিক আবির্ভাব!
উপরে যে-দুটি ঘটনার উল্লেখ করলুম, ও-রকম ঘটনা আমার জীবনে আরও ঘটেছে, কিন্তু এখানে আর পুথি বাড়িয়ে লাভ নেই। তবে ‘রংমশালের দলে'র আবাহন গীতির সঙ্গে-সঙ্গেই কালবৈশাখীর বিস্ময়কর উদয় দেখে আর একটি মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল ৷
আমি তখন বালক। মা-বাবার সঙ্গে থাকি সুদূর রাওলপিণ্ডির পে-অফিস লেনে। রাস্তাটির অস্তিত্ব এখনও আছে কি না জানি না, কিন্তু তখন সেখানে বাস করতেন প্রধানত বাঙালিরাই।
সেখানে একটি প্রাচীন ভদ্রলোক থাকতেন, তাঁর আসল নাম ভুলে গিয়েছি। কিন্তু মনে আছে, সবাই তাকে ‘খুড়ো” বলে ডাকতেন।
খুড়োর ভারী গানের শখ ছিল, নিজেকে তানসেন-জাতীয় বলে মনে করতেন।
কিন্তু পাড়ার লোকের ধারণা ছিল অন্যরকম। কারণ প্রতিদিন যখন তানপুরো নিয়ে খুড়ো ভগ্নকণ্ঠে দীর্ঘকালব্যাপী আর্তনাদ বা সংগীতসাধনায় নিযুক্ত হতেন, তখন পাড়ার লোকের প্রাণের ও কানের অবস্থা হয়ে উঠত দস্তুরমতো ভয়াবহ।
এক সন্ধ্যায় খুড়ো তানপুরোর ‘তবলি’তে চাঁটি মেরে গান ধরেছেন বিকট স্বরে। সে কী গান!
পাড়ার কেউ কেউ আর সইতে না পেরে খুড়োর কাছে গিয়ে করলেন প্রবল প্রতিবাদ। খুড়ো ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, ‘তোমরা তো আচ্ছা অরসিক হে! জানো, সংগীতের মতন বিদ্যে নেই! জানো, আজ তিন মাস এখানে বৃষ্টি হয়নি?’
—‘বৃষ্টি হয়নি তো হয়েছে কী?
— হয়েছে কী? বৃষ্টি হয়নি বলেই তো আমি ‘মেঘমল্লার' ধরেছি!’
যাও যাও খুড়ো, বাজে বোকো না। তোমার গান শুনলে বৃষ্টিও পালাবার পথ খুঁজে পাবে না! ওই গানে বৃষ্টি আসবে!’
—“কী! আসবে না? জানো তানসেন ‘দীপক’ গাইলেই আগুন জ্বলত, মল্লার ধরলে বৃষ্টি পড়ত?” —“থো করো খুড়ো, তানসেনের কথা থো করো! আমাদের কথা হচ্ছে, তোমার গান আর সহ্য করা অসম্ভব। আমরা হয় প্রাণে মারা পড়ব, নয় পাগল হয়ে যাব?’
—পাড়ার লোকের দুর্ভাগ্যক্রমে সেই রাত্রেই এল ঝমঝম করে জল।
শেষ রাতে আমাদের বাড়ির সদর দরজার কড়া এমন বিষম উৎসাহে নড়তে লাগল যে, বিছানা ছেড়ে উঠে বাবা তাড়াতাড়ি ছুটে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমিও।
দরজা খুলেই দেখা গেল লন্ঠনধারী খুড়োকে।
—‘কী খুড়ো, ব্যাপার কী? কোনও বিপদ-আপদ হয়েছে নাকি?”
—বলি, আরও চাই নাকি?”
—‘কী আরও চাইব?’
—কী আবার! বৃষ্টি হে, বৃষ্টি! আমার মেঘমল্লারের মাহাত্ম্যটা দেখলে তো? বৃষ্টিকে কান ধরে টেনে এনেছি—বুঝলে হে?' বলতে বলতে খুড়ো চলে গেলেন এবং তারপরেই পাশের বাড়ির দরজায় বেজে উঠল কড়াজোড়া।
পরদিন সকালে উঠে শুনলুম, সে-পাড়ার কোনও বাড়ির কড়াই সে-রাত খুড়োর কবল থেকে অব্যাহতি লাভ করেনি।
এতদিনে খুড়ো নিশ্চয়ই লোকান্তরে গমন করেছেন। পৃথিবীকে বঞ্চিত করে হয়তো তিনি ধন্য করেছেন স্বর্গসভাকে। কিন্তু মাভৈ, চিন্তারও কারণ নেই। খুড়ো নেই, আমাদের ‘রংমশালের দল’ আছে, অনাবৃষ্টির সময়ে তোমরা এই দলটিকে গান গাইবার জন্যে আমন্ত্রণ কোরো।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন