কামরা আর আমরা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

মা বললেন, ‘ওরে আজ অগস্ত্য যাত্রা! আজকে বিদেশে যেতে নেই। সুটকেশটা গোছাতে গোছাতে আমি বললুম, ‘কেন বলো দেখি? আজ বিদেশে গেলে কি হয়?

মা বললেন, ‘আজকে যাত্রা করে অগস্ত্যমুনি আর ফিরে আসেননি।’ আমি বললুম, 'অগস্ত্যমুনির বউ ভারি কোঁদল করত। তার ভয়েই ‘এই আসি' বলে তিনি পিঠটান দিয়েছিলেন।'

মা প্রতিবাদ করে বললেন, “কই, শাস্তরে তো সেকথা লেখে না!’

আমি বললুম, ‘শাস্ত্রে সেকথা লিখলে অগস্ত্যমুনির বউ মানহানির মামলা এনে শাস্ত্রকারকে জব্দ করে দিতেন যে! কাজেই শাস্ত্রকাররা সেকথা চেপে গিয়েছেন।'

মা বললেন, “না রে, না। বিন্ধ্য পাহাড়—'

আমি বাধা দিয়ে বললুম, ‘থাক মা, ও গল্প আমিও জানি। তোমার কোনও ভয় নেই মা, মাসখানেক ভারতবর্ষের বুকে বেড়িয়ে আবার আমি ঠিক ফিরে আসবই। তোমার মতো মাকে ছেড়ে কোনও ছেলে কি ঘর ভুলে থাকতে পারে? এই নাও, একটা প্রণাম নিয়ে হাসিমুখে আমাকে আশীর্বাদ করো।’

মা খুঁৎ খুঁৎ করতে করতে করতে আমাকে আশীর্বাদ করলেন।

যতীন আর আমি, দুই বন্ধুতে দেশ বেড়াতে বেরিয়েছি। যতীন পড়ে ল-কলেজে, আর আমি মেডিকেল কলেজে।

হাওড়া ইস্টিশানে গিয়ে একটা সেকেন্ড কেলাস কামরায় ঢুকলুম। এ সময়ে কেউ বেড়াতে যায় না বলেই আমরা বেড়াতে বেরিয়েছি। গাড়িতে ভিড় থাকবে না, দিব্যি ধীরে-সুস্থে শুয়ে- বসে হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে যেতে পারব। পুজোর সময়ে আর বড়োদিনে বেড়াতে যাওয়ার পায়ে নমস্কার! সে কি বেড়াতে যাওয়া, না নরক যন্ত্রণা ভোগ করা?

প্রথমেই আমাদের বেনারসে যাবার কথা,—সেখানে গিয়ে পৌঁছাব কাল প্রায় দুপুরে। সারা রাত ট্রেনেই কাটাতে হবে। কাজেই আমাদের কামরায় লোক নেই দেখে ভারি আনন্দ হল। বাইরের কোনও লোক আসবার আগেই তাড়াতাড়ি দুখানা বেঞ্চে দুটো বিছানা বিছিয়ে আমরা দুজনেই শুয়ে পড়লুম।

শুয়ে শুয়ে দুই বন্ধুতে অনেক গল্প হল। তারপর ট্রেন যখন বর্ধমান পার হল, যতীন উঠে আলো নিবিয়ে দিলে। খানিকক্ষণ পরে অন্ধকারেই যতীনের নাক-ডাকার আওয়াজ শুনতে শুনতে আমারও চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম জানি না, আচমকা আমার ঘুম ভেঙে গেল। কে আমার গা ধরে নাড়া দিচ্ছে। ধীরে ধীরে উঠে বসলাম—সঙ্গে সঙ্গে সামনের বেঞ্চ থেকে যতীনও ধড়মড় করে উঠে বসল।

আমি বললুম, ‘যতীন, আমার ঘুম ভাঙলে কেন? '

যতীন বললে, আমিও তোমাকে ঠিক ওই কথাই জিজ্ঞাসা করতে চাই।'

—"তার মানে?’

—তুমি তো আমার গা ধরে নাড়া দিচ্ছিলে?'

আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, ‘সে কি হে, আমি তো দিব্যি আরামে ঘুমিয়েছিলুম, তুমিই তো আমার গা-নাড়া দিয়ে আমাকে তুলে দিলে!'

যতীন হেসে বললে, “বাঃ, বেশ লোক যাহোক! নিজে আমাকে ধাক্কা মেরে তুলে দিয়ে আবার আমার ঘাড়ে দোষ চাপানো হচ্ছে?”

আমি বললুম, 'না ভাই, সত্যি বলছি, আমি এখান থেকে এক পা নড়িনি। তোমাকে আমি ধাক্কা তো মারিইনি বরং আমাকেই তুমি ধাক্কা মেরেছ। আমার সঙ্গে ঠাট্টা হচ্ছে বুঝি?”

যতীন গম্ভীর স্বরে বললে, 'গাড়িতে আর জনপ্রাণী নেই, আমাদের দুজনকে তবে ধাক্কা মারলে কে? চোর-টোর আসেনি তো?’

শুনেই তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে আমি আবার আলো জ্বেলে দিলুম। এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে দেখলুম কামরায় আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই এবং আমাদের মোটঘাটগুলোর একটাও অদৃশ্য হয়নি।

যতীন বললে, “নিশ্চয়ই চোর এসেছিল। ভাগ্যে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল, তাই চুরি করবার আগেই তাকে সরে পড়তে হয়েছে। বড্ড বেঁচে যাওয়া গেছে হে!'

আমি বললুম, ‘জানলাগুলো সব বন্ধ করে দাও, আর আলো নিবিয়েও কাজ নেই। আচ্ছা জ্বালাতন!”

আবার খানিকক্ষণ বসে বসে গল্প হল। তারপর আবার দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লুম।

কিন্তু আবার ঘুম গেল ভেঙে।

এবারে কেউ আর আমাকে ধাক্কা মারছিল না, এবারে কামরার ভিতর থেকে পরিত্রাহি স্বরে একটা কুকুর আর্তনাদ করছিল।

আলো জ্বালিয়ে শুয়েছিলুম, কিন্তু উঠে দেখি, কামরার ভিতরে ঘুটঘুট করছে অন্ধকার ! অন্ধকারে যতীনের গলা পেলুম, সে বললে, 'এ আবার কি ব্যাপার! আজ কি রাজ্যের আপদ এইখানেই এসে জুটেছে?”

কুকুরটা যেভাবে চ্যাচাচ্ছে তাতে মনে হল, সে যেন ভয়ানক জখম হয়েছে। কিন্তু কামরার জানলা-দরজা সব বন্ধ, সে ভিতরে এলই বা কেমন করে?

কুকুরটা হঠাৎ একবার জোরে কেঁউ কেঁউ করে চেঁচিয়েই একেবারে চুপ মেরে গেল। আমি বললুম, ‘যতীন, আলো নেবালে কে?’

যতীন বললে, 'জানি না তো! আমি ভাবছিলুম, তুমিই নিবিয়েছ।'

-কুকুরটা ভিতরেই আছে। বেঞ্চি থেকে পা নামানো হবে না, ব্যাটা যদি খ্যাঁক করে কামড়ে দেয়! তোমার টর্চটা কোথায়?”

—আমার পাশেই আছে।'

—জ্বেলে দ্যাখো তো, কুকুরটা কোথায় আছে?'

যতীন টর্চ জ্বেলে দেখতে লাগল, আর আমি আমার মোটা লাঠিগাছটা মাথায় তুলে প্রস্তুত হয়ে রইলুম, কুকুরটা যদি তেড়ে আসে তাহলে তখনই তার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেব।

কিন্তু কামরার কোথাও কুকুরটাকে আবিষ্কার করা গেল না। এখানে কুকুর-টুকুর কিছুই নেই।

সুইচের কাছে গিয়ে দেখি, সুইচ টেপাই আছে।

কী ও-দুটো? অন্ধকারের অগ্নিময় চক্ষু?

যতীন বললে, ‘কুকুরটা বোধহয় পাশের কামরা থেকে চ্যাঁচাচ্ছিল। আমরা ঘুমের ঘোরে ভুল শুনেছি।'

আমি বললুম, 'ঠিক বলেছ। কিন্তু আজকে ঘুমের দফায় ইতি। এসো, বসে বসে গল্প করা যাক।'

–এই বলে আমি বসে পড়লুম-

এবং মনে হল, সঙ্গে সঙ্গে আমার পাশেই ঠিক যেন আর একজন কে বসে পড়ল। নিবিড় অন্ধকারে কামরার ভিতরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বললুম, 'নিজের বিছানা ছেড়ে হঠাৎ উঠে এলে যে যতীন?' ওপাশের বেঞ্চি থেকে যতীন বললে, 'কই আমি তো এখান থেকে উঠিনি!'

আমার পাশে হাত বাড়িয়ে দেখলুম, কই, কেউ তো সেখানে নেই!

তারপরেই শুনতে পেলুম, আমার কানে কে ফিসফিস করে কথা কইছে। কি যে বলছে, তা বোঝা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু কথা যে কেউ কইছে, সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই! হঠাৎ যতীন বললে, ‘মোহন, তুমি কোথায়?’

আমি আড়ষ্টভাবে বললুম, 'আমার বিছানায়।’

যতীন সভয়ে বললে, 'তবে আমার কানে কানে কথা কইছে কে?’

জবাব না দিয়ে দু-পাশে দু-হাত বাড়িয়ে দিলুম, কিন্তু কারুর গায়ে হাত লাগল না। অথচ তখনও আমার কানের কাছে মুখ এনে কে ফিসফিস করছে।

ডাক্তারি পড়ি, রোজ দু-হাতে টাটকা বা পচা মড়ার দেহে হাসিমুখে ছুরি চালাই, গভীর রাত্রে একলা মড়ার পাশে অম্লানবদনে বসে থাকি, স্বপ্নে কখনও ভূত দেখিনি, তবু কেন জানি না, আজকে এই অন্ধকারে আমার সর্বাঙ্গ কি একটি অজানা ভয়ে পাথরের মূর্তির মতো স্থির ও ঠাণ্ডা হয়ে গেল,—একখানা হাত নাড়বার শক্তিও আর রইল না।

যতীনেরও বোধহয় সেই অবস্থা। সে প্রায় কান্নার স্বরে বললে, ‘মোহন, মোহন, কামরার ভেতরে কারা সব এসেছে, কে আমার সঙ্গে ফিসফিস করে কথা কইছে,—ওই শোনো, কে আবার চলে বেড়াচ্ছে!'

সত্যি কথা! ঘরময় কে চলে বেড়াচ্ছে, খট খট খট খট, খড়মড় খড়মড় খড়মড়! এ যেন কোন মাংসহীন হাড়ের আওয়াজ—এ ভীষণ আওয়াজ আমি জানি, কঙ্কালকে নাড়লে ঠিক এমনি অস্থিঝঙ্কার জেগে ওঠে।

কিন্তু তখন আর আমার নড়বার শক্তি নেই, কে যেন কি যাদু মন্ত্র পড়ে আমার সমস্ত দেহকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিয়েছে। আচম্বিতে আর এক ব্যাপার! কামরার এক কোণ থেকে মেয়ে- গলায় কে উঁ-উঁ-উঁ-উঁ করে কাঁদতে লাগল !

কানের কাছে সেই ফিসফিস কথা, ঘরময় কঙ্কালের সেই চলাফেরার খটখটানি, এককোণ থেকে মেয়েগলায় সেই উঁ-উঁ-উঁ-উঁ করে কান্না—গাঢ় অন্ধকারে ডুবে, আড়ষ্টভাবে বসে বসে একসঙ্গে এইসব শুনতে লাগলুম। যতীনের কোনও সাড়া নেই, সে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়নি তো?

ও আবার কি? মার্বেলের গুলির মতো দুটো জ্বলন্ত রক্তের মতো কি চারিদিকে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে! কী ও দুটো? অন্ধকারের অগ্নিময় চক্ষু?

চোখ দুটো ভাসতে ভাসতে আমার কাছ থেকে হাত তিনেক তফাতে এসে শূন্যে স্থির হয়ে রইল! যেন আমাকে খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করছে! দেখতে দেখতে সেই আগুনচোখ দুটোর রঙ নীল হয়ে এল। রক্ত-রঙে যে চোখ দুটোকে দেখাচ্ছিল ক্রুদ্ধ, নীল-রঙে তাদের দেখাতে লাগল বিষাক্ত!

হঠাৎ কেমন একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ এসে আমাকে চাঙ্গা করে দিলে। এক মুহূর্তে আমার সব মোহ কেটে গেল—আমি একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে, অন্ধকারের ভিতরেই দু-হাতে দুদ্দাড় ঘুসি ছুড়তে ছুড়তে পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠলুম—আমি তোদের ভয় করি না, আমি তোদের ভয় করি না, আমি তোদের কারুকে ভয় করি না, সরে যা, সরে যা সব—আমি তোদের কারুকে ভয় করি না!

তৎক্ষণাৎ কামরার ইলেকট্রিক লাইট আবার দপ করে জ্বলে উঠল।

নিজের বিছানায় বসে যতীন ঠক ঠক করে কাঁপছে। তারও অবস্থা আমার চেয়ে ভালো নয়।

কামরার ভিতরে আর সেই আগুনচোখ দেখা গেল না—কোনওরকম শব্দ বা কান্নার আওয়াজ কানে এল না। আমরা দুজন ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই।

হাঁপাতে হাঁপাতে যতীনের পাশে গিয়ে বসে পড়লুম।

যতীন অস্ফুট স্বরে বললে, 'আমি কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলুম?'

আমি বললুম, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে।'

একদিকে তাকিয়ে যতীন তীব্র স্বরে বলে উঠল, 'না, স্বপ্ন নয়, ওই দ্যাখো!” - ঠিক যেন শূন্যকে বিদীর্ণ করে ফিনকি দিয়ে কামরার মেঝের উপরে রক্ত ছিটকে পড়ছে। তাজা, রাঙা রক্ত! রক্তে রক্তে ঘর বুঝি ভেসে যায়! শূন্য যেন রক্ত প্রসব করছে! আমি আর সইতে পারলুম না— অ্যালাম কর্ড ধরে একেবারে ঝুলে পড়লুম। পরমুহূর্তে প্রচণ্ড একটা ঝাঁকানি দিয়ে চলন্ত ট্রেন থেমে গেল। আমি আর যতীন এক এক লাফে ট্রেন ছেড়ে বাইরে গিয়ে পড়লুম।

গার্ড এসে জিজ্ঞাসা করলে, “তোমরা ট্রেন থামিয়েছ?”

আমি বললুম ‘হ্যাঁ।’

— “কেন?”

—গাড়ির ভেতরে আমাদের জীবন বিপন্ন হয়েছিল। আসল ব্যাপারটা কি, তা আমি বলতে চাই না। কিন্তু ও কামরার ভেতরে আমরা যদি আর কিছুক্ষণ থাকতুম, তাহলে হয় পাগল হয়ে যেতুম, নয় মারা পড়তুম।

গার্ড খানিকক্ষণ অবাক হয়ে আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইল। তারপর বললে, 'বাবু, তোমার অসংলগ্ন কথার অর্থ আমি বুঝতে পারলুম না। তুমি কি বলতে চাও, ভালো করে বুঝিয়ে বলো।’

যতীন বললে, ‘ও কামরায় ভূত আছে!

গার্ড হো হো করে হেসে বললে, ‘কামরায় ভূত। এ একটা নতুন কথা বটে! বাঙালিবাবুদের মাথা খুব সাফ, ট্রেনের কামরাতেও তারা ভূত আবিষ্কার করে!”

আমি বললুম, “ভূত কিনা জানি না, কিন্তু ও কামরার ভেতরে আমরা এমন সব বিভীষিকা দেখেছি, যা স্বাভাবিক নয়।

গার্ড বললে, ‘অ্যালার্ম-কর্ড টেনে, বাজে কথা বলে তোমরা এখন আইনকে ফাঁকি দিতে চাও? ওসব চালাকি আমার কাছে চলবে না, তোমাদের জরিমানা দিতে হবে।'

আমি বললুম, ‘সাহেব, আমরা জরিমানা দিতে রাজি আছি, তবু ও কামরায় আর ঢুকতে রাজি নই।'

আমার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটে গেল! কামরার ভিতর থেকে আমাদের জিনিসপত্তরগুলো সবেগে বাইরে নিক্ষিপ্ত হতে লাগল—ট্রাঙ্ক, সুটকেশ, ব্যাগ ও পোঁটলা-পুঁটলি প্রভৃতি। ঠিক যেন কে সেগুলোকে বাইরে ছুড়ে দিচ্ছে! গার্ডসাহেব মাথা হেঁট করে তাড়াতাড়ি মাটির উপর বসে পড়ল—নইলে যতীনের স্টিল ট্রাঙ্কটা নিশ্চয়ই তার মাথা চূর্ণ করে দিত!

গার্ড চ্যাচাতে লাগল, 'এই, পাকড়ো—পাকড়ো!'

একদল রেলপুলিশ ও কুলি হুড়মুড় করে কামরার ভিতরে গিয়ে ঢুকল এবং বলাবাহুল্য, সেখানে জনপ্রাণীর আধখানা টিকি পর্যন্ত দেখা গেল না।

গার্ড উত্তেজিত, ভীত কণ্ঠে আমাদের বললে, 'বাবু, ব্যাপার কি বুঝতে পারছি না। ট্রেন লেট হয়ে যাচ্ছে, এখন আর বোঝবার সময়ও নেই—তবে তোমাদের কথাই সত্যি বলে মনে হচ্ছে। আপাতত তোমরা অন্য কোনও কামরায় উঠে পড়ো, আমি ট্রেন চালাবার হুকুম দেব।

পাশের যে ইন্টার-কেলাসে গিয়ে আমরা উঠলুম, তার মধ্যে অনেক লোক, – সকলেই আমাদের কথা শোনবার জন্যে ব্যগ্র।

যতটা সংক্ষেপে পারা যায়, তাদের কাছে আমাদের বিপদের কাহিনী বর্ণনা করলুম। একটি আধবুড়ো ভদ্রলোক, পোশাক দেখে তাঁকে রেলকর্মচারি বলে চেনা গেল, আমাদের কাছে এসে বললে, মশাই, গেল বৎসরে এই ট্রেনের এক কামরায় একটা ভীষণ হত্যাকাণ্ড হয়েছিল।'

আমি বললুম, 'তার সঙ্গে এ ব্যাপারের কি সম্পর্ক?'

—সম্পর্ক? সম্পর্ক হয়তো কিছুই নেই, তবু শুনুন না! রানীগঞ্জে গাড়ি থামলে পর দেখা গেল, একটা সেকেন্ড কেলাস কামরার ভিতরে দুজন পুরুষ, একজন স্ত্রীলোক, একটি শিশু আর একটা কুকুরের মৃতদেহ রক্তের মধ্যে প্রায় ডুবে আছে। কিন্তু কে বা কারা এতগুলো প্রাণীকে খুন করলে, তার কোনও সন্ধানই পাওয়া গেল না।'

আমি রুদ্ধশ্বাসে বললুম, 'একটা কুকুরও ছিল?...তারপর?'

— তার কিছুদিন পরে ওই কামরাতেই তিনজন সায়েব হাওড়া থেকে আসছিল। কিন্তু রানীগঞ্জেই তারা গাড়ি থেকে নেমে পড়ে স্টেশনমাস্টারের কাছে অভিযোগ করে যে, কামরার আলো নিবিয়ে দিয়ে কারা তাদের ভয়ানক ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও যারা ভয় দেখিয়েছিল তাদের পাত্তা পাওয়া গেল না।'

যতীন বললে, 'ভূতকে কখনও খুঁজে পাওয়া যায়? মানুষকেই ভূতেরা খুঁজে বার করে। তিনি বললেন, “তারপর প্রায়ই ওইরকম সব অভিযোগ হতে লাগল। আর লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, অভিযোগ হয়েছে প্রত্যেকবারই রানীগঞ্জ স্টেশনে,–কেবল আপনারাই রানীগঞ্জ পার হতে পেরেছেন।

যতীন বললে, 'হ্যাঁ, রানীগঞ্জ কেন, আর-একটু হলেই আমাদের ভব-নদীর পারে যেতে হত!”

আমি বললুম, ‘যতীন, মায়ের কথা আর কখনও ঠেলব না। সত্যিসত্যিই আজকের যাত্রা অশুভ!’

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%