হেমেন্দ্রকুমার রায়
সে বছরে আমরা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে সবে কলেজি লেখাপড়া শুরু করেছি। আমি, অখিল ও ভূতনাথ।
সাঁওতাল পরগণায় অখিলদের একখানা ছোটো বাংলো ছিল। স্থির করলুম অখিলের সঙ্গে সেখানে গিয়ে গোটাকয়েক দিন আনন্দে কাটিয়ে আসব।
ভূতনাথ খবর পেয়ে আমার কাছে এসে শুধোলে, 'তোমরা নাকি বেড়াতে যাচ্ছ?”
—‘খালি বেড়াতে নয়, ভ্রমণের সঙ্গে উদরপোষণ করতে।' —‘কলকাতা ছেড়ে সাঁওতাল পরগণায় গিয়ে উদরপোষণ! খাবে কী? পাথর, বালি, গাছের পাতা?’
—উঁহু, ওখানে এখনও জলের দরে মুরগি পাওয়া যায়।’
এতক্ষণ ভূতনাথ ছিল উদাসীন। কিন্তু এইবারে তার আগ্রহ জাগ্রত হল। বললে, “ —ও, তাই নাকি? প্রতিদিন প্রত্যেকের ভাগ্যে একটা করে রামপাখি জুটবে নাকি?”
—“অনায়াসে। দরকার হলে দুটো করেও জুটতে পারে।'
সে যে তৎক্ষণাৎ কর্তব্য স্থির করে ফেলবে আমরা তা জানতুম। সে ছিল পয়লা নম্বরের উদরপিশাচ, তাই আমরা তার নাম দিয়েছিলুম ‘পেটুক ভূতনাথ।' পরিপূর্ণ মাত্রায় উদরপূজা করবার সুযোগ পেলে সে হয়ে উঠত দস্তুরমতো দুর্দমনীয়।
ভূতনাথ দৃঢ়স্বরে বললে, 'তাহলে আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব। '
প্রতিবাদ নিস্ফল হবে বুঝে আমরা আর উচ্চবাচ্য করলুম না।
গন্তব্যস্থলে পৌঁছে একটা রাত কাটিয়েই পরদিন সকালে হাটের পথে নরেশ ও তার বন্ধু পরেশের সঙ্গে দেখা। আগে তারাও আমাদের সহপাঠী ছিল, কিন্তু গতবারের পরীক্ষায় ফেল করে আমাদের নাগাল ধরতে পারেনি। নরেশ ধনীর সন্তান, পরেশও গরিবের ছেলে নয়।
আমি বললুম, ‘আরে, তোমরাও এখানে! কোথায় উঠেছ হে?”
নরেশ বললে, ‘কেন, এখানে যে আমাদেরও একখানা বাড়ি আছে। অখিল তো সে কথা জানে।'
অখিল বললে, ‘হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু সে-বাড়ি তো ভাড়া দেওয়া হয়, এই পুজোর সময়ও সেখানা কি খালি পড়ে আছে?’
নরেশ বললে, 'হ্যাঁ, এবারে সে-বাড়ির ভাড়াটে জোটেনি। তাই দুটো দিন কাটিয়ে দিতে এসেছি।'
—'মাত্র দুটো দিন!’
—হ্যাঁ। বাড়িখানার একটা ব্যবস্থা করেই ফিরে যাব। গুরুজনের আদেশ। তবে সেই ফাঁকে আর একটা কাজও সারতে চাই। এখানে নদীর ধারে পাওয়া যায় বালিহাঁস আর বন্য কুক্কুট। আমরা দুজনে দুটো বন্দুক নিয়ে তাদের সঙ্গেও মুলাকাত করতে যাব।’
আমি বললুম, 'আমরাও যদি তোমাদের সঙ্গী হই, আপত্তি করবে না তো!' —“আরে, সে তো সুসংবাদ! পার্টি জমবে ভালো। ...
অখিল বললে, ‘তোমাদের বাড়ি আমি চিনি। বৈকালেই আবার দেখা হবে।' ভূতনাথ রীতিমতো উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললে, “কিন্তু রাত্রের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা?” ভূতনাথের উদরপরায়ণতার কথা কারুর কাছেই অবিদিত ছিল না। ফিক করে হেসে ফেলে 'নরেশ বললে, ‘মাভৈঃ! সে ভারও আমরা নেব।'
আমি বললুম, ‘আমরাও তোমাদের জন্যে কিছু উপহার নিয়ে যাব।'
—“যথা?’
—‘রামপাখির ‘স্যান্ডউইচ' আর একটি ‘এয়ার-টাইট' টিনে ভরা রসগোল্লা।'
—“আহা, সে তো হবে সোনায় সোহাগা! '
যথাসময়ে নরেশদের বাড়িতে গিয়ে উঠলুম। মাঝারি আকারের দোতলা বাড়ি! অবস্থান সুন্দর। চারিদিকে পাহাড়, মাঠ ও বন। কাছেই নদীর তীর। কানে আসে খালি নদীর জলতান আর পাখির কলগান।
ভূতনাথ উৎসুক হয়ে বললে, ‘এইবারে চা-চক্রের আয়োজন হবে তো?”
—’হ্যাঁ।'
—সেই সঙ্গে আমাদের ‘স্যান্ডউইচ’ প্রভৃতি?’
নরেশ মাথা নেড়ে বললে, 'না, এখন খালি চা, আমাদের তাড়াতাড়ি আছে। নদীর ধারে গিয়ে শিকারের জায়গাটা একবার তদারক করে অন্ধকার নামবার আগেই আবার এখানে ফিরে আসতে হবে। তারপর ‘স্যান্ডউইচ' আর রসগোল্লার সদ্ব্যবহার করলে কোনই ক্ষতি হবে না।’
—‘আজ তো জ্যোৎস্না আছে। অন্ধকার এলেও ভয়টা কীসের?'
—“যে দারোয়ান আর মালির উপরে বাড়ি দেখবার ভার আছে, আর অন্ধকার হবার আগেই তাদের ছুটি দিতে হবে। একটা ঠিকে চাকরও রেখেছি, সে-ও রাত্রে এখানে থাকতে নারাজ।'
—‘কী আশ্চর্য! কেন?
নরেশ বাধো-বাধো গলায় বললে, ‘নিতান্তই শুনবে তাহলে?’
—“নিশ্চয়ই! রাত্রে এখানে কেউ থাকতে চায় না, এর মানে কী?’
—“শোনো তবে। আমাদের বাড়ির শেষ ভাড়াটিয়া গেল বছরে এখানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাই বাড়িখানার বদনাম হয়ে গেছে, কেউ আর ভাড়া নিতে চায় না। সবাই বলে, প্রতি রাত্রেই এখানে প্রেতাত্মার আবির্ভাব হয়। সেইজন্যেই তো একটা ব্যবস্থা করবার জন্যে আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে।'
ভূতনাথ লাফ মেরে দাঁড়িয়ে উঠে দুইচক্ষু বিস্ফারিত করে বললে, ‘কচুপোড়া কী ব্যবস্থা করবে শুনি? রোজা ডাকবে? ভূতকে গ্রেপ্তার করবার জন্যে থানায় খবর দেবে?' নরেশ বললে, ‘ও-সব কিছুই করব না। আমি এখানে দুটো রাত্রি বাস করে প্রমাণিত করব, এ বাড়িতে ভূতের ভয়টয় কিছুই নেই—ওসব হচ্ছে দুষ্ট লোকের মিথ্যা রটনা মাত্র।'
ভূতনাথ হনহনিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বললে, ‘বেশ তাই কোরো। কিন্তু আমি এই চললুম।'
আমি বললুম, ‘ওহে ভূতনাথ, যাও কোথায়?’
—অখিলের বাংলোয় ফিরে যাচ্ছি।
—সে কী, রাত্রে পেটের খোরাকের ব্যবস্থা না করেই?'
—“আলবত! পেটের খোরাক জোগাতে গিয়ে আমি ভূতের খোরাক হতে রাজি নই।
অখিল ডাকলে, ওহে ভূতনাথ! শোনো, শোনো! অন্তত খানকয় ‘স্যান্ডউইচ’ আর গোটাকয় রসগোল্লা নিয়ে যাও!'
কিন্তু কেবা শোনে কার কথা! লম্বা লম্বা পা ফেলে ভূতনাথ হল অদৃশ্য।
নরেশ বললে, “ভূতনাথটা খালি পেটুক চূড়ামণি নয়, কাপুরুষদের মধ্যেও অধমাধম! চুলোয় যাক, এসো আমরা চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ি।
নদীর ধার থেকে সন্ধ্যার আগেই আমরা ফিরে এলুম।
প্রথমেই ভূতনাথ, তারপর এখন আবার দারোয়ান, বেয়ারা ও মালিরও দ্রুতপদে পলায়ন দেখে আমরাও বুকটা ছাঁৎ ছাঁৎ করতে লাগল। অখিল, নরেশ ও পরেশেরও শুকনো মুখ দেখে বুঝলুম, কারুর অবস্থাই ভালো নয়। ভয় হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধির মতো।
তার উপরে আর এক অভাবনীয় ব্যাপার—যাক এলে একেবারেই আক্কেলগুড়ুম!
একটা বাস্কেটের ভিতর ছিল দুই ডজন ফাউল স্যান্ডউইচ ও এক টিন রসগোল্লা, কিন্তু আতিপাঁতি করে খোঁজবার পরও তার আর কোনও চিহ্নই আবিষ্কার করা গেল না।
আমি বললুম, ‘তবে কি ?
অখিল বাধা দিয়ে বললে, ‘যেতে দাও,—যা হবার তা হয়ে গেছে!'
আহারাদি সারবার পর প্রায় সারা রাতটাই কী অস্বস্তি ও হৃৎকম্পের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে যে কেটে গেল, তা আর বর্ণনায় বোঝানো যাবে না। খোলা মাঠের দমকা বাতাস এসে জানালায় শব্দ তুললেই নরেশ ও পরেশ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে তাড়াতাড়ি বন্দুক বাগিয়ে ধরে!
আমি বলি, 'ও কিছু নয়। '
অখিল বলে, ‘বন্দুক ছুড়ে অশরীরীকে শিকার করা যায় না!
নরেশ বলে, ‘আবার অশরীরী কথা তোলো কেন? লোকের মুখে কি গল্প শোননি? অশরীরীরাও মাঝে মাঝে শরীরী হয়, আর মানুষের হাত থেকে ইলিশমাছ ছিনিয়ে নেয়? আজকেই কি এখান থেকে খাবারের বাস্কেটটা অদৃশ্য হয়নি?”
পরেশ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলে, ‘উঃ, রাতটা কাটলে বাঁচি!'
ভূতনাথ সময় থাকতে সরে পড়ে যথার্থ বুদ্ধিমানেরই কাজ করেছে বলে মনে হল। কেবল একটু মাথা খাটিয়ে কিছু মিষ্টি আর 'স্যান্ডউইচ' নিয়ে গেলেই তাকে আজ আর উপোস করতে হত না৷
অবশেষে পূর্বাকাশ সামান্য ফরসা হতেই আমরা চটপট বাইরে বেরিয়ে পড়ে আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম।
চুলোয় যাক ভূত-টুত, আর আমাদের পাত্তা পায় কে? মস্ত মস্ত বীরের মতো ছুটলুম সবাই নদীর দিকে।
শিকার রীতিমতো সফল। লাভ হল পাঁচটা বন্য কুক্কুট ও চারটে বালিহাঁস। অরণ্য ও ধু ধু মাঠ রোদে সোনালি—কোথাও নেই ভৌতিক প্রতিবেশ। যেখান থেকে সভয়ে ছুটে বেরিয়ে পড়েছিলুম, বুক ফুলিয়ে ফিরে এলুম সেইখানেই।
বিস্মিত চোখে দেখলুম, বাগানের খাসজমিতে পদচারণ করছে প্রশান্ত মুখে ভূতনাথ! একগাল হেসে বললে, 'দিনের বেলায় আমার ভূতের ভয় থাকে না। তাই নরেশের নিমন্ত্রণ রাখতে এলুম।'
বললুম, “তা বেশ করেছ! কিন্তু কাল রাতটা মিছে উপোস করে মরলে কেন? কিছু মিষ্টি আর ‘স্যান্ডউইচ’ নিয়ে গেলেই তো পারতে!
মুচকে হেসে ভূতনাথ বললে, ‘কে বলে আমি উপোস করেছি—আমি কি সেই ছেলে ব্রাদার? তোমার কি খাবারের ‘বাস্কেট’টা খুঁজে পেয়েছ?”
সচমকে বললুম, ‘তবে কি ভূত নয়, ভূতনাথই ‘বাস্কেট'টা নিয়ে উধাও হয়েছে?”
ভূতনাথ বেশ সপ্রতিভ মুখেই বললে, ‘তা ছাড়া আর কে? খাবারের কথা আমিও তাড়াতাড়িতে ভুলেই গিয়েছিলুম, যথাসময়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যে অখিলকে ধন্যবাদ! খানিক দূর গিয়েই ভেবেই দেখলুম—তাই তো, তোমরা তো নরেশের এখানে মজা করে ‘ডিনার’ খাবে, আর আমিই বা খামকা উপোস করে মরি কেন? আবার এখানে ফিরে এসে দেখলুম তোমরা সবাই বেরিয়ে গিয়েছ। অতএব—'
সবিস্ময়ে বললুম, 'অতএব তুমি সেই দুই ডজন 'স্যান্ডউইচ' আর একটিন রসগোল্লা একাই নিজের উদরগহ্বরের নিক্ষেপ করেছ?”
—“আরে, ও হচ্ছে আমার কাছে নস্য ভাই, নস্য! দরকার হলে আমি অনায়াসেই পাঁচ ডজন ‘স্যান্ডউইচ’ আর দু-টিন রসগোল্লা উড়িয়ে দিতে পারি!'
নরেশ চমৎকৃত কণ্ঠে বললে, 'ভূতনাথ, তোমারই জয়জয়কার।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন