বংশীবদনের বহির্গমন

হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক

যাকে বলে দশাসই পুরুষ।

মাথায় লম্বা সাড়ে ছয় ফুট, ছাতির মাপ পঞ্চাশ ইঞ্চি, পেশিগুলো যেন লোহার মতো শক্ত।

সবাই বললে, হ্যাঁ, একখানা চেহারা বটে!

মুখশ্রী ভালো নয় এবং গায়ের রংটাও এমন মিশমিশে কালো যে তার সঙ্গে কষ্টিপাথরে গড়া মূর্তির তুলনা করলে অত্যুক্তি করা হবে না।

তবু সুপুরুষ না হলেও এমন পুরুষোচিত সুগঠন নজরে পড়ে কদাচিৎ। বয়স হবে বিশ কি একুশ। নাম বংশীবদন। নামকরণটা হয়েছিল বোধ করি রঙের জন্যই, কারণ বংশীবদন বলে কেষ্টঠাকুরকেই।

আমাদের পাড়ায় এসে বাসা ভাড়া নিয়েই সে দস্তুরমতো আসর জমিয়ে তুলতে দেরি করলে না।

শোনা গেল, বংশীবদন বংশীবাদন ভালোবাসে না, রোজ মুগুর ভাঁজে, ডন- বৈঠক দেয়, কুস্তি লড়ে। পাড়ায় এসেই বশ করে ফেললে সেই সব অখদ্যে ও অভব্য ছোঁড়াকে, রাস্তার রোয়াকে দিন-রাত আড্ডা না দিলে যাদের পেটের ভাত হজম হয় না। তার মুখশাবাশি শুনে ও ধরনধারণ দেখে ডানপিটেরাও তাকে সমীহ করে চলতে লাগল।

এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামালে না, কারণ কোন পাড়াতেই বা এমনি লক্ষ্মীছাড়া ছোঁড়ার দল ও তাদের পালের গোদা নেই? কিন্তু ক্রমেই শুরু হল হরেক রকম উৎপাত।

দুই

সবচেয়ে বিষম উপদ্রব হচ্ছে, চাঁদার উপদ্রব।

বংশীবদন মতপ্রকাশ করলে, বছরে আমরা তিন বার সর্বজনীন পূজা করব— দুর্গাপুজোর সময়, কালীপুজোর সময় আর সরস্বতীপুজোর সময়। দুর্গাপুজোর আর মাসদেড়েক বাকি। সবাই বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাঁদা আদায়ে লেগে যাও। গরিবরা যে যা পারে দেবে, কিন্তু বড়োলোকদের কাছ থেকে পঁচিশ টাকার কম নিবি না।

পাড়ায় সম্পন্ন 'গৃহস্থ ছিল পঁচিশ ঘর। তাদের মধ্যে মাত্র একজন দিলে পঁচিশ টাকা। কেউ কেউ আট আনা, এক টাকা বা দুই টাকা পর্যন্ত দিতে চাইলে, কেউ কেউ কিছুই দিলে না।

যারা কম চাঁদা দিতে চাইলে বা কিছুই দিলে না, তাদের বাড়িতে আরম্ভ হল সব বিপরীত কাণ্ড। কোথাও বোমা পড়ে, কোথাও হয় ইষ্টক বা বিষ্ঠা বৃষ্টি।

থানায় খবর গেল। কিন্তু পুলিশ এসে কোনোই সুরাহা করতে পারলে না। পুলিশ বংশীবদন ও তার সাঙ্গোপাঙ্গকে সন্দেহ করলে বটে, কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার করবার মতো প্রমাণ পেলে না।

বিষ্ঠা; ইষ্টক ও বোমার কবল থেকে নিস্তার পাবার জন্যে সবাই যেচে এসে চাঁদা দিয়ে গেল।

প্রফেসর সুরেন চৌধুরির বাড়ির বড়ো রোয়াকটাই বংশীবদন বেশি পছন্দ করত। সদলবলে সেইখানে বসেই সে বাক্য-বন্দুকে বধ করত রাজা-উজিরকে।

সুরেনবাবু প্রফেসর মানুষ, নীচের ঘরে বসে পড়াশোনা করতেন। আড্ডাধারীদের হুল্লোড়ে তিনি অতিশয় অতিষ্ঠ হয়ে একদিন বাইরে এসে বললেন, “তোমরা এখনই আমার রক ছেড়ে চলে যাও।'

বংশীবদন উঠে দাঁড়িয়ে বুক ও হাতের গুলি ফুলিয়ে বললে, 'যদি না যাই?” —“থানায় ফোন করব।'

— মাইরি নাকি প্রফেসর? আচ্ছা, সেলাম!' সে দলবল নিয়ে প্রস্থান করলে। চার দিন পরে এক সন্ধ্যাবেলায় সুরেনবাবু সদরদরজা থেকে বাড়ির ভিতরে পা বাড়িয়েই হলেন পপাতধরণীতলে; তাঁর মাথা গেল ফেটে দরজার সামনে ছড়ানো ছিল আট-দশটা কলার খোসা।

হপ্তাখানেক পরে দেখা গেল, সুরেনবাবুর পড়বার ঘরে এখানে-ওখানে কিলবিল করছে পনেরো ষোলোটা সাপের বাচ্ছা।

ব্যাপারটা আরও বেশি দূর গড়াবার আগেই সুরেনবাবু সে বাড়ি ছেড়ে উঠে গেলেন। বংশীবদন ছোঁড়ার পাল নিয়ে আবার হাসতে হাসতে এসে রোয়াক অধিকার করলে।

পাড়ার লোক ভয়ে বোবা।

তিন

নামে এবং দেহে ভোঁদা হলেও বুদ্ধি তার মোটা ছিল না।

ভোঁদাই ছিল এতদিন এ পাড়ার মায়ে খেদানো বাপে তাড়ানো ছোঁড়াগুলোর পালের গোদা। তার পসার মাটি হয়ে গিয়েছে শ্রীমান বংশীবদনের আবির্ভাবে। এখন আর কেউ তাকে মানে না। এজন্যে সর্বদাই সে মনমরা হয়ে থাকে। গলার জোরে এবং গায়ের জোরে বংশীবদনের কাছে সে নগণ্য।

সেদিন সকালে দালানে বসে ভোঁদা পাঁপর ভাজা খেতে খেতে চা পান করছে এবং দাসী বাটনা বাটতে বাটতে তার মায়ের সঙ্গে কথা কইছে। ঠিকে ঝি, আরও দু-বাড়িতে কাজ করে।

মা বলছিলেন, ‘হ্যাঁ রে, ভালোর মা, তুই তো বংশীদেরও বাড়িতে কাজ করিস। অমন দজ্জাল ছেলেকে বাড়ির লোক শাসন করতে পারে না?”

ভালোর মা দুই চোখ কপালে তুলে বললে, 'কে দাদাবাবুকে শাসন করবে গো? সে একটা খুনে ডাকাত, সবাই তার ভয়ে কেঁচো হয়ে থাকে।'

মা বললেন, “ওমা, এমন কথাও কখনো শুনিনি!'

ভালোর মা বললে, 'দাদাবাবু জব্দ কেবল রাতের বেলায়। অমন যে দত্যির মতো গতর, অন্ধকারে গেলেই কেঁপে সারা। সঙ্গে আর কেউ না শুলে ভয়ে ঘুমোতেই পারে না!

মা সবিস্ময়ে শুধোন, ‘কেন রে!”

—ভূতের ভয় মা, ভূতের ভয়। রাতে কেউ ভূতের নাম করলেও দাদাবাবু আঁতকে ওঠে। যেন যত রাজ্যের ভূত-পেতনি তারই ঘাড় মটকাবার জন্যে ওঁত পেতে আছে।'

ঝি হাসতে লাগল, মা হাসতে লাগলেন, ভোঁদাও হেসে খুন!

চার

বংশীবদনদের বাসা বড়ো রাস্তার পাশে একটা গলির ভিতরে। একদিন একটা কাবুলিওয়ালা সেই গলির ভিতরে ঢুকল, নিশ্চয় কারুর কাছে তার টাকা পাওনা ছিল।

কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই সে বংশীবদনের বাড়ির সামনে টলে ধপাস করে পড়ে গেল। একেবারে আড়ষ্ট!

সবাই চারিদিক থেকে ছুটে এসে দেখলে, কাবুলির দেহে আর প্রাণ নেই। বোধ হয় তার হৃদরোগ ছিল। পুলিশ এসে লাশ তুলে নিয়ে গেল।

বংশীবদন মুখ ভার করে শুকনো গলায় বললে, 'কাবুলিটা কি নচ্ছার হে! দুনিয়ায় এত ঠাঁই থাকতে ব্যাটা কিনা পটল তুললে আমাদের বাসার সামনে এসেই!' তাকে তখন দেখাচ্ছিল খানিকটা গ্যাস বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের মতো।

দিন তিন-চার পরেই পাড়ায় খবর রটে গেল, একজন কাবুলি সন্ধ্যা হলেই খট খট শব্দ তুলে গলির ভিতরে পায়চারি করে এবং দুই চোখে তার দুটো আগুন জ্বলে! নিশ্চয় সে খাবি খেয়েও দেনাদারকে ভোলেনি, নিজের পাওনা টাকা ছাড়তে নারাজ।

কাবুলিটাকে প্রথম কে দেখেছিল তা জানা গেল না বটে, কিন্তু দূর থেকে আরও কেউ কেউ তাকে দেখতে পেলে। প্রত্যেকেই বলে এক কথা—পায়ের জুতোয় খট খট শব্দ হয় এবং চোখে জ্বলে দুটো আগুন!

সন্ধ্যা নামলেই গলি একেবারে ফাঁকা—জনপ্রাণী বাড়ির বাইরে পা বাড়ায় না এবং সন্ধ্যা হবার আগেই বংশীবদনও সুড়সুড় করে বাড়ির ভিতরে ঢুকে সদর দরজা বন্ধ করে দেয়।

দলপতির অভাবে রোয়াকের আড্ডা মাটি হয় বুঝি।

পাঁচ ৷৷

বংশীবদনদের বাড়িখানা একতলা। সদর দরজার পাশেই তার ঘর। সন্ধ্যা হতে না হতেই সে গলির দিকের জানালাগুলোর খড়খড়ি বন্ধ করে দিলে। তার অবস্থা হয়েছে পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের মতো। এখন থেকে কাল সকাল পর্যন্ত তাকে ঘরের ভিতরেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে।

উপায় কী? সময় কাটাবার জন্যে সে সাহিত্যচর্চা করতে বাধ্য হল—অর্থাৎ একখানা বই নিয়ে পড়তে বসল। গোয়েন্দাকাহিনি—নাম ‘কন্ধকাটার হত্যাকাণ্ড'। দম বন্ধ করে পড়বার মতো বই।

কোথা দিয়ে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কাবুলি ভূতের কথাও ভুলে যেতে হয়।

আচম্বিতে শব্দ শোনা গেল—খট খট, খটাখট!

বংশীবদনের বুক ধড়াস করে ওঠে, সর্বাঙ্গে জাগে রোমাঞ্চ! বই ফেলে সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রাণপণে সাহস সঞ্চয় করে ভাবে, শব্দ বলতেই তো ভূত বোঝায় না, ব্যাপারটা কোনো ধাপ্পাবাজের চক্রান্ত নয়তো?

যা থাকে কপালে! চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন করবার জন্যে সে রুদ্ধশ্বাসে কম্পিত হস্তে খড়খড়ির একটা পাখি নিঃশব্দে একটুখানি খুলে গলির মধ্যে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে।

ওরে ব্রাদার! পরমুহূর্তে বিকট চিৎকারে পাড়া কাঁপিয়ে মাটির উপরে লম্বমান হল বংশীবদন।

বাড়ির লোকজন হাঁ হাঁ করে ছুটে এল। হল কী রে, হল কী? —কাবুলি ভূত! কাবুলি ভূত! চোখ দুটো দপ দপ করে জ্বলছে!’

৷৷ ছয় ৷৷

কাবুলি ভূতের বিপজ্জনক সান্নিধ্য পরিত্যাগ করে পরদিনেই বংশীবদনরা সে পাড়া ছেড়ে সরে পড়ল। ভূতটা আজ যেন পথে পায়চারি করে, কাল যদি তার বাড়ির ভিতরে বেড়াবার শখ হয়, তখন তাকে ঠেকিয়ে রাখবে কে?

ভোঁদার মুখে হাসি ধরে না। আবার রোয়াকে গিয়ে সে দখল করলে দলপতির গদি।

কিন্তু সকলের মনে একটা সন্দেহ থেকে গেল। বংশীবদনদের পলায়নের সঙ্গে সঙ্গে কাবুলি ভূতটাও অদৃশ্য হল কেন?

এ গুপ্ত কথাটা ভোঁদা' কেবল আমার কাছে প্রকাশ করেছে চুপিচুপি।

থিয়েটারের বেশকারের কাছে ধন্না দিয়ে সে কাবুলিওয়ালার ছদ্মবেশ সংগ্ৰহ করে এনেছিল। জ্বলন্ত চক্ষুর ভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল ফসফোরাস।

নামে এবং দেহে ভোঁদা হলেও বুদ্ধি তার মোটা ছিল না।

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%