জুজুর ভয়

হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক

বিশু পনেরোয় পা দিয়েছে, কিন্তু মন এখনও তার শিশুর মতো৷

পড়াশুনোর নাম করলেই তার গায়ে আসে জ্বর, কিন্তু খেলাধুলো পেলে সে ভুলে যায় আহার এবং নিদ্রা৷ কেবলই কি খেলাধুলো? শহরতলিতে তাদের বাসা৷ সেখানে পরের বাগানে চুপিচুপি ঢুকে পাকা পাকা ফল চুরি করতেও সে মস্তবড়ো ওস্তাদ হয়ে উঠেছে৷ কেবলই কি ফল চুরি? লুকিয়ে লুকিয়ে পরের পুকুরে মাছ ধরতেও তার মতো লায়েক ছেলে এ তল্লাটে আর দেখা যায় না৷

কেবল খাবার আর শোবার সময়ে মনে পড়ে তার বাড়ির কথা৷ মাথার উপরে বিধবা মা ছাড়া আর কোনো অভিভাবক নেই, তাতেই হয়েছে তার সাপের পাঁচ পা! মায়ের বাধানিষেধ সে গ্রাহ্যের মধ্যেও আনে না৷

এই হল বিশুবাবুর একটুখানি পরিচয়৷

দুই

সেদিন দুপুরবেলায় বিশু যখন মল্লিকদের বাগান থেকে পাঁচিল টপকে বেরিয়ে এল, তখন তার হাতে ছিল এক কাঁদি পাকা কলা৷

এদিকে-ওদিকে তাকিয়েই দেখতে পেলে, পথের উপরে আবির্ভূত হয়েছে এমন এক মূর্তি, যার মাথায় আছে লাল পাগড়ি এবং মুখে আছে কালো দাড়ি৷

পাহারাওয়ালা!

ছোটো-বড়ো কোনো চোরই যে পাহারাওয়ালাকে পছন্দ করে না, সেকথা বলাই বাহুল্য৷ কিন্তু বিশেষ করে এই লাল পাগড়ি এবং কালো দাড়ির উপরে বিশুর ছিল দস্তুরমতো জাতক্রোধ৷

কারণ বড়ো সামান্য নয়৷

গেল মাসে ঠিক এই বাগান থেকেই তার চ্যালা এবং স্যাঙাত নিমাইচাঁদ যখন প্রকাণ্ড একটি কাঁঠাল হস্তগত করে নিরাপদ ব্যবধানে সরে পড়ছিল, তখন এই ছাতুখোর পাহারাওয়ালাটাই তাকে ক্যাঁক করে ধরে থানায় টেনে না নিয়ে গিয়ে ছাড়েনি৷ এতবড়ো অত্যাচার সহ্য করা অসম্ভব৷

এক লাফ মেরে বিশু অদৃশ্য হল পাশের কচুঝোপের আড়ালে এবং দৈবগতিকে সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে ঠেকল একখানা ইটের অর্ধাংশ৷

বিশু ভাবলে, পাহারাওয়ালাটা নিশ্চয়ই তাকে দেখে ফেলেছে, নইলে পায়ে পায়ে কচুঝোপের দিকেই এগিয়ে আসছে কেন?

কিন্তু আসলে পাহারাওয়ালা তখন নিজের বাঁ হাতের তালুতে খৈনি রেখে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে মর্দন করতেই ব্যস্ত ছিল, বিশুর টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পায়নি৷ গালের ভিতরে খৈনি গুঁজে সে নিজের মনেই অগ্রসর হতে লাগল৷

আচম্বিতে ছুটে এল সেই ইষ্টকের অর্ধাংশ এবং পাহারাওয়ালা ভাবলে তার কপালের উপরে হল বিনা মেঘে বজ্রপাত! পরমুহূর্তে ধুলোয় লুটোতে লাগল তার লাল পাগড়ি এবং কালো দাড়ি৷

৷৷ তিন ৷৷

নিজেদের বাড়ির ভিতরে ছুটে এসে বিশু হাঁপাতে হাঁপাতে বন্ধ করে দিলে সদর দরজা৷

মায়ের বিস্ময়ের সীমা রইল না৷ দুপুরবেলায় বিশুবাবুর প্রত্যাবর্তন! এ যে রীতিমতো অঘটন!

ব্যস্ত হয়ে মা শুধোলেন, ‘ও বিশু, তোর অসুখবিসুখ করেছে নাকি?’

—‘উঁহু!’

—‘তবে এমন সময়ে হঠাৎ বাড়িতে ফিরে এলি যে?’

—‘মা, এখন কিছুকাল আমি বাড়ির বাইরে এক পা বেরুব না৷’

—‘বলিস কী রে! হঠাৎ তোর এতটা সুবুদ্ধি হল কেন?’

বিশু নাচারের মতো বললে, ‘বাইরে জুজুর ভয়!’

—‘জুজুর ভয়?’

বিশু ভূতলশায়ী লাল পাগড়ির কাহিনি মায়ের কাছে খুলে বললে৷

এ যে শাপে বর! মা মনে মনে বললে, ‘হে মা কালী, হে মা দুর্গা, বিশুর এই ভয় যেন স্থায়ী হয়!’

মুখে বললেন, ‘এ যাত্রা যখন মানে মানে রক্ষা পেয়েছিস, তখন আর কখনও বাড়ির বাইরে যাবার নাম মুখেও আনিসনে!’

বিশু মুখভার করে বললে, ‘খুব কথাই তো বললে মা! অষ্টপ্রহর বাড়িতে বসে বসে করব কী? ধান ভানব?’

—‘ধান ভানবি কেন, বাড়িতে বসে বসে লেখাপড়া কর, ভালো ছেলে হ, আমাদের মুখ উজ্জ্বল হোক৷’

চার

একে একে তিন দিন কেটে গেল৷ বিশু দায়ে পড়ে বাড়িতেই বন্দি হয়ে থাকে এবং সময় কাটাবার জন্যে বাধ্য হয়ে বইটই নিয়ে নাড়াচাড়া করে৷ মায়ের আর আনন্দের সীমা নেই৷

কিন্তু চতুর্থ দিনেই বিশুর প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল৷ মাকে ডেকে বললে, ‘মা, একটা কাজ করতে পারো?’

—‘কী কাজ?’

—‘পাড়ায় পাহারাওয়ালাটাকে নিয়ে কোনো গোলমাল হয়েছে কি না, এ খবরটা জেনে আসতে পারো?’

মা বুঝলেন, ছেলের মন এরই মধ্যে উড়ুউড়ু করছে, গতিক সুবিধের নয়৷ মনে মনে আবার মা কালীকে স্মরণ করে বললেন, ‘হে মা, ছেলের মঙ্গলের জন্যে যদি দুটো মিছে কথা বলি, তাহলে দয়া করে আমার অপরাধ নিয়ো না!’

মা বেরিয়ে গেলেন এবং খানিকক্ষণ পরে ফিরে এসে সভয়ে বললেন, ‘খবর ভালো নয় বিশু!’

—‘কী হয়েছে মা, কী হয়েছে?’

—‘পাহারাওয়ালাটাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, তার অবস্থা এখন যায় তখন যায়!’

বিশু রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলে, ‘তারপর?’

—‘পুলিশের বিশ্বাস, পাড়ার কোনো দুষ্টু ছেলে এই কাণ্ড করেছে, তারা চারিদিকে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে!’

বিশুর বুক এমন দমে গেল যে, তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরুল না৷

—‘হ্যাঁ রে বিশু, পাহারাওয়ালাটা কি তোকে দেখতে পেয়েছিল?’

বিশু ক্ষীণস্বরে বললে, ‘বোধ হয় পেয়েছিল৷’

—‘তাহলে উপায়?’

বিশু বললে, ‘কিন্তু সে তো আমার নাম জানে না, আমাকে চেনেও না৷ যদি বাড়ির ভিতর লুকিয়ে থাকি, তাহলে কেউ আমাকে ধরতে পারবে না৷’

মা আশ্বস্ত হয়ে বললেন, ‘সেই কথাই ভালো বাবা! বাড়ির ভিতরে থাক, লেখাপড়া কর!’

পাঁচ

হঠাৎ বিশুর মতিগতির পরিবর্তন দেখে পাড়াপড়শিরা বিস্মিত! লোকের মুখে মুখে বিশুর সুখ্যাতি!

কিন্তু সুখ্যাতি শুনে আর কত দিন চলে? দুই হপ্তা কাটতে না কাটতেই বিশুর চড়ুকে পিঠ আবার সড়সড় করে উঠল৷ আবার সে মাকে ডেকে বললে, ‘পাহারাওয়ালাটা কেমন আছে, কারুর কাছ থেকে সে খবরটা আর একবার নিয়ে আসতে পারবে?’

মা আবার খবর আনতে বেরিয়ে গেলেন, কিন্তু মিনিট তিনেক পরেই ছুটতে ছুটতে ফিরে এসে চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ!’

—‘কেন মা, কী হয়েছে?’

—‘ওরে বিশু, পাহারাওয়ালাটা মারা পড়েছে!’

বিশু আঁতকে উঠে বললে, ‘অ্যাঁঃ, বলো কী?’

মা কপালে করাঘাত করে বললেন, ‘আর বলি কী! তুই এইবার খুনের দায়ে পড়লি রে বিশু, আমার অদৃষ্টে কী আছে জানি না৷’

বিশু বললে, ‘তোমার কোনো ভয় নেই মা, আমি যদি বাড়ির ভিতরে থাকি, কেউ আমার কিছুই করতে পারবে না৷’

মা মনে মনে হেসে মনে মনেই বললেন, ‘ভগবান তোকে সুবুদ্ধি দিন, আর আমার মিছে কথা ক্ষমা করুন৷’

৷৷ ছয় ৷৷

এক মাস কেটে গিয়েছে, বাইরের পৃথিবীর কথা বিশুর কাছে এখন প্রায় অতীতের স্বপ্নের মতো হয়ে উঠেছে৷

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় মা রান্নাঘরে বসে চাকি-বেলন নিয়ে পরোটা বেলছেন, এমন সময়ে বিশু হুড়মুড় করে এসে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মাটির উপরে বসে পড়ল৷ দারুণ আতঙ্কে তার দুই চক্ষু বিস্ফারিত!

মা সচমকে শুধোলেন, ‘ও কী বিশু, তোর মুখ-চোখ অমনধারা কেন?’

—‘আমি তাকে দেখেছি মা, সে আমাকে দেখা দিয়েছে!’

—‘তুই কাকে দেখেছিস রে, কে তোকে দেখা দিয়েছে?’

—‘সেই পাহারাওয়ালার ভূতটা৷’

—‘তুই পাগল হলি নাকি?’

—‘না না, পাগল হইনি৷ অনেকদিন বাড়িতে বন্ধ থেকে থেকে প্রাণটা বড়ো হাঁপিয়ে উঠেছিল৷ আজ ভাবলুম সন্ধ্যার আবছায়ায় গা ঢেকে চুপি চুপি গলির মোড়টা পর্যন্ত একটু ঘুরে আসি৷ কিন্তু খানিকটা এগুতে না এগুতেই গলির ঠিক মোড়ে গ্যাসের আলোতে কাকে দেখলুম জানো?’

—‘কাকে?’

—‘সেই মরা পাহারাওয়ালার ভূতটাকে৷ হতভাগা মরে গিয়েও আমাকে ভুলতে পারেনি, ভূত হয়ে প্রতিশোধ নেবার জন্যে আবার আমাকে খুঁজতে এসেছে৷ হয়তো এখনই বাড়ির ভিতরে এসেই হাজির হবে৷ আমি এখন কী করি মা, কোথায় লুকোই বলো দেখি?’

বিশুকে তাড়াতাড়ি নিজের কোলের ভিতরে টেনে নিয়ে মা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘কোনো ভয় নেই! পাহারাওয়ালারা রাস্তায় থাকে, তাদের প্রেতাত্মাও রাস্তা ছেড়ে কারুর বাড়ির ভিতরে ঢুকতে পারে না৷’

সেইদিন থেকে বাড়িই হল বিশুর কাছে সুরক্ষিত দুর্গের মতো৷

তার এই ভ্রান্তি কতদিন স্থায়ী হয়েছিল জানি না, কিন্তু জুজুর ভয়ে দায়ে পড়ে কিছুদিন পড়াশুনো করতে করতে শেষটা সত্যসত্যই লেখাপড়ায় তার মন বসে গেল৷

___

বিদেশি গল্পের সামান্য ছায়া আছে৷

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%