হেমেন্দ্রকুমার রায়
রমঝম রমঝম! বৃষ্টি থামবার আর নাম নেই।
সন্ধে হয়-হয়। আমার বাড়ির বারান্দায় আমরা পাঁচজনে বসে আছি।
বেয়ারা এসে আচার-তেল-মাখা, গোটার মশলা ছড়ানো, নারকেলকুরি আর পেঁয়াজের কুচি মেশানো মুড়ি এবং তার সঙ্গে বেগুনি, পটলি ও শসা দিয়ে গেল।
সামনেই গঙ্গা। বৃষ্টির ধারা ঠিক কুয়াশার মতই গঙ্গার বুকের উপরে ছড়িয়ে পড়েছে। ওপারে কোথায় আকাশ আর জলের সীমা, কিছুই বোঝার জো নেই,—এমন কি ওপারের বনের সবুজ রেখা পর্যন্ত আর দেখা যায় না।
গঙ্গাজলের উপরে বৃষ্টিধারার চিকের ভিতর দিয়ে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে, এক-একখানা পানসি ঠিক অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো জেগে উঠেই আবার অদৃশ্য হয়ে পড়ছে। নৌকাগুলোর দেহ যেন ছায়ার মায়া দিয়ে গড়া—তাদের যেন দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না !
শ্যামচন্দ্র একমুখো মুড়ি মুখে পুরে গঙ্গার দিকে ফিরে চর্বণ করতে করতে অস্পষ্ট স্বরে বললে, ‘আজ চারিদিক রহস্যের ঘেরাটোপে ঢাকা। ওই দ্যাখো না, নৌকাগুলো ভেসে যাচ্ছে, ঠিক যেন ভূতুড়ে নৌকোর মতই।'
রামচন্দ্র চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে, মুখগহ্বরে টপ করে একখানা বেগুনি নিক্ষেপ করে বললেন, “হুম। আজকে চারিদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে হ্যামলেটের বুড়ো বাবার প্রেতাত্মা যেন দেখা দিলেও দিতে পারে।'
মানিকলাল বললে, 'এমন বাদলায় দল বেঁধে ইলেকট্রিক লাইটের তলায় সোফা-কোচে বসে ভূতের গল্প শুনতে ভারি ভালো লাগে।...তোমরা কেউ কখনও ভূত দেখেছ?'
রামচন্দ্র ও শ্যামচন্দ্র একসঙ্গে বললে, ‘না। ভূত আমি বিশ্বাস করি না।’
অপূর্ব এতক্ষণ একমনে মুড়ি-ফুলুরি খেতেই ব্যস্ত ছিল। এখন সে মুখ খুলে বললে, 'হ্যাঁ, কোনও ভদ্রলোকেরই ভূত বিশ্বাস করা উচিত নয়। আমি ভূত বিশ্বাস করি না, কিন্তু ভূতের গল্প শুনতে ভালোবাসি।
আমি বললুম, ‘আমিও ভূত বিশ্বাস করি না, কিন্তু ভূতের গল্প বলতে ভালো-বাসি।' রামচন্দ্র ও শ্যামচন্দ্র একসঙ্গে বললে, 'বাদলার গল্পই হচ্ছে ভূতের গল্প। কিন্তু সে গল্প সত্যি হওয়া চাই।'
আমি বললুম, ‘আমার এ গল্প একেবারে সত্য ঘটনা।'
মানিকলাল বললে, “তবে যে বললে, তুমি ভূত বিশ্বাস করো না?”
—না, আমি ভূত বিশ্বাস করি না। কিন্তু সত্য ঘটনা না হলে ভূতের গল্পের জোর হয় না। তাই প্রত্যেক ভূতের গল্পই সত্য বলে মনে করা উচিত।'
অপূর্ব বললে, ‘যে গল্পটা তুমি বলবে, সেটা কার মুখে শুনেছ?'
—'কারুর মুখে শুনিনি। এ গল্প আমার নিজের গল্প।'
মানিকলাল বললে, মুড়ি-ফুলুরি ফুরুলো। বেয়ারা চায়ের ট্রে নিয়ে আসছে। সন্ধ্যার অন্ধকারে চারিদিক ছেয়ে গেছে। আকাশের চাঁদ-তারা মেঘের চাদর মুড়ি দিয়েছে। হু-হু করে ঝোড়ো হাওয়া বইছে, ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে, গঙ্গা কাতর আর্তনাদ করছে— আর নদীর তীরে জনপ্রাণী নেই। এই তো ভূতের গল্প শোনবার সময়। কিন্তু এমন সময় গল্প শুনতে চাই, যাতে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। গায়ে কাঁটা না দিলে, বুকটা ভয়ে ছ্যাঁৎ-ছ্যাঁৎ না করলে ভূতের গল্প শুনে আরাম হয় না। ভূত বিশ্বাস করি না, কিন্তু এই ভয় পাওয়ার আরামটুকু ভারি মিষ্টি লাগে।'
চায়ের পেয়ালায় তাড়াতাড়ি গোটাকয়েক চুমুক দিয়ে আমি আরম্ভ করলুম :
‘কালীপুরে আমার দেশ। আমি কলকাতায় জন্মেছি, ছেলেবেলা থেকে এইখানেই মানুষ হয়েছি, দেশে ভারি ম্যালেরিয়া বলে বাবা আমাকে কখনও দেশের মাটি মাড়াতে দিতেন না। ‘কিন্তু দেশকে আমি বরাবরই ভালোবাসি। কলেজে যখনই কেউ ‘আমার দেশ’ কি ‘ও আমার দেশের মাটি' প্রভৃতি গান গাইত, তখনই দেশের জন্যে আমার প্রাণ কেঁদে উঠত।
‘তাই গেল-বছরে একদিন আমার দেশকে দেখতে গেলুম। শুনেছি, দেশে আমাদের ভিটে এখনও আছে। বাপ-পিতামহের ভিটের উপরে দুফোঁটা চোখের জল ফেলে আসব, এই ছিল আমার মনের ইচ্ছা।
‘কালীপুরের স্টেশনে গিয়ে যখন নামলুম, তখন সন্ধে উৎরে গেছে। তবে আকাশে দশমীর চাঁদ ছিল বলে পথ চলতে বিশেষ কষ্ট হল না। গ্রামের কেউ-না-কেউ আমাকে আশ্রয় দেবে, এই ভেবে মনের আনন্দে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে অগ্রসর হলুম।
“তখন বৃষ্টি ছিল না বটে, কিন্তু বর্ষাকাল। কাদায় হাঁটু পর্যন্ত পা বসে যাচ্ছে দেখে, তাড়াতাড়ি জুতোজোড়া খুলে পবিত্র পুথির মতন বগলদাবা করলুম। মাথার উপরে ম্যালেরিয়ার মশার মেঘ কনসার্ট বাজাতে বাজাতে আমার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। কালো কালো বাদুড় উড়ছে, ঝিঁঝি পোকা ডাকছে, প্যাঁচারা চ্যাঁ চ্যাঁ করে চ্যাঁচাচ্ছে। মাঝে মাঝে ঝোপঝাপের ভিতর থেকে সাপের মতন কি যেন বেরিয়ে আসছে। কলকাতার রাস্তায় গ্যাসের আর ইলেকট্রিকের আলোতে পথ চলা অভ্যাস, দশমীর চাঁদের আলোও আমাবস্যার অন্ধকারের চেয়ে উজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে না। এক জায়গায় পথের মাঝখানেই একটা প্রায় তিনফুট গভীর ডোবা ছিল, হঠাৎ ঝপাং করে তারা মধ্যে না-জেনে ঝাঁপ খেতে হল। তবু আমি দমলুম না,–ডোবা থেকে উঠেই মনের সুখে আবার গান শুরু করলুম। এসব কি গ্রাহ্যের মধ্যে আনতে আছে? কবি গেয়েছেন—
‘ও আমার দেশের মাটি
তোমার পরেই ছোঁয়াই মাথা।'
‘গাইতে গাইতে গায়ের কাদা ঝেড়ে-পুঁছে মুখ তুলেই দেখি, সামনেই একটা ঝোপের আবছায়ায় কালো গা মিশিয়ে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
“তাকে দেখে কেমন সন্দেহ হল। চশমাখানা খুলে পরিষ্কার করে ভালো করে আবার চোখে লাগিয়ে দেখলুম। দেখে সন্দেহ আরও বাড়ল। দিব্যি নাদুস-নুদুস চেহারার একটা লোক।” রামকান্ত ও শ্যামকান্ত রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল, 'অ্যাঁ, বলো কি? ভূত নাকি? আমি বললুম, ‘বোধহয়। কিন্তু লোকটার মাথাটা কাঁধের উপরে ছিল না, ছিল তার হাতে। —
দুই হাতে মুণ্ডটা সে পেটের কাছে ধরে ছিল, আর সেই মুণ্ডের ভাঁটার মতন চোখ দুটো আমার দিকে কটমট করে তাকিয়েছিল।'
মানিকলাল বললে, ‘গল্পটি এইবারে জমেছে—সত্য গল্প কিনা! আমার গায়ে কাঁটা দিতে শুরু করেছে। তুমি নিশ্চয়ই কন্দকাটা ভূত দেখেছিলে?” আমি বললুম, 'হ্যাঁ।’
অপূর্ব বললে, 'তারপরেই তুমি বোধহয় ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লে?”
আমি বললুম, ‘না’। আমি তার আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলুম।
‘কন্দকাটার হাতে ধরা মুণ্ডটা বলে উঠল, 'হাঁউ-মাউ খাউ, মানুষের গন্ধ পাউ !
‘আমি তুড়ি গিয়ে গাইলুম--
‘ও আমার দেশের মাটি ! '
‘কন্দকাটার হাতেধরা মুণ্ডটা এবার আরও জোরে বললে, ‘হাঁউ-মাউ-খাঁউ!'
'আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, দুত্তোর, হাঁউ মাঁউ-খাঁউয়ের, নিকুচি করেছে! ব্যাপার কি? বেসুরে অমন বাজে চ্যাঁচাচ্ছ কেন?
‘কন্দকাটা খানিকক্ষণ হতভম্বের মতো চুপ করে রইল। তারপর বললে, আমি ভয় দেখাচ্ছি। ‘আমি বললুম, ‘কাকে?'
‘সে বললে, “তোমাকে।'
– আমাকে! কেন?
—"ভয় দেখাতে আমরা ভালোবাসি।'
—কিন্তু আমি ভয় পাইনি।'
—ভয় পাওনি? আচ্ছা, এইবারে তুমি নিশ্চয়ই ভয় পাবে।'—এই বলে সে মস্ত হাঁ করে ভয়ানক জোরে আবার হাঁউ মাঁউ-খাঁউ বলে চ্যাঁচাবার উপক্রম করলে।
‘কিন্তু তার আগেই আমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে কন্দকাটার মুণ্ডের গালে ঠাস করে এক চপেটাঘাত করলুম।
‘কন্দকাটার হাতেধরা মুণ্ডটা ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলে বললে, বিনা দোষে তুমি আমাকে চড় মারলে কেন?'
‘আমি বললুম, মুণ্ড থাকা উচিত কাঁধের উপরে। মুণ্ডটাকে তুমি কাঁধ থেকে খুলে নামিয়ে রেখেছ কেন?
‘কাঁদতে কাঁদতে কন্দকাটা বললে, ‘নইলে যে তোমরা ভয় পাও না।’
আমি বললুম, কাঁধের মুণ্ড হাতে দেখলে আমার মাথা ঘোরে। যদি ভালো চাও তো যেখানকার মুণ্ড সেখানেই রেখে দাও। নইলে আবার আমি চড় মারব।
‘কন্দকাটা তাড়াতাড়ি মুণ্ডটাকে আবার কাঁধের উপরে বসিয়ে, ম্রিয়মাণভাবে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“তার অবস্থা দেখে আমার মনে অত্যন্ত দয়া হল। আস্তে আস্তে তার পিঠ চাপড়ে আদর করে বললুম, না, না তুমি কিছু মনে কোরো না, আর আমি তোমাকে চড় মারব না।
‘কন্দকাটা ভেউ ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললে, 'তুমি আমাকে দেখে ভয় পেলে না,—উল্টে আমাকে চড় মারলে! এখন ভূতের সামাজে আমি এ পোড়া মুখ দেখাব কেমন করে? ওগো এ আমার কি দুর্দশা হল গো! ওগো, আমি যে ভূত-পেত্নীর নাম ডোবালুম গো ! ওগো, বেলগাছের ডালে ব্রেহ্মদত্যিঠাকুর যে সব দেখছেন গো! ওগো, তিনি যে আমার কথা সবাইকে বলে দেবেন গো !
‘আমি বললুম, থামো, থামো,—অত চেঁচিয়ো না। কোথায় তোমার বেহ্মদত্যিঠাকুর? ‘চোখের জল মুছতে মুছতে কন্দকাটা বললে, 'ওই বেলগাছটার ডালে।'
‘পাশেই একটা বেলগাছ। তারই একটা মোটা ডালে উবু হয়ে বসে, সাদা ধবধবে পৈতে পরে একজন মিশকালো লোক গড় গড় করে হুঁকোয় তামাক খাচ্ছে।
‘আমি বললুম, প্রণাম হই বেহ্মদত্যিঠাকুর। সব শুভ তো?”
“হুঁকোর আওয়াজ থেমে গেল। উপর থেকে হেঁড়ে গলায় প্রশ্ন হল, ‘তুমি কে হে? নিবাস কোথায়?
— আজ্ঞে, আমি চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। নিবাস কলকাতায় ৷
—'এখানে মরতে এসেছ কেন বাপু?”
‘বেহ্মদত্যির কথায় আমার ভারি রাগ হল। আমি বললুম, কি রকম লোক মশাই আপনি? ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কইতে জানেন না?
—আমি কথা কইতে জানি কি না জানি, তা নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না। জ্যাঠা ছেলে কোথাকার!’
— আপনি বক্সিং লড়তে জানেন?
বেহ্মদত্যি চমকে উঠে বললেন, ‘সে আবার কি?'
—‘গাছের ডাল থেকে নেমে এসে দেখুন না, তাহলেই বুঝতে পারবেন। ~~~না, আমি নিচে নামতে পারব না। আমার পায়ে গেঁটেবাত হয়েছে। আমি এখন এইখানে বসেই তামাক খাব।’
—তাহলে আমি নিচে থেকেই আপনাকে থান ইট ছুড়ে মারব।
‘বেহ্মদত্যি এইবারে হা হা করে হেসে উঠে বললেন, “বেশ, বেশ! ছোকরা তোমার মিষ্টি কথা শুনে ভারি খুশি হলুম। তোমার বাবার নাম কি?'
—আজ্ঞে, সূর্যনাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জন্ম এই কালীপুরেই। আমার পিতামহের নাম “ভাস্করনাথ চট্টোপাধ্যায়।
‘বেহ্মদত্যি বললেন, অ্যাঃ, বলো কি? তুমি ভাস্করের নাতি? আরে, আরে, এতক্ষণ এ কথা বলতে হয়,—তুমি আমাদেরই ঘরের ছেলে হে! ভাস্করের বাপ শশীনাথ যে আমার প্রাণের বন্ধু ছিল। তা, খবর সব ভালো তো?”
—"আজ্ঞে হাঁ, আপনার আশীর্বাদে আপাতত সব মঙ্গল।
—"তা কন্দকাটাকে তুমি কি বলেছ? ও কাঁদছিল কেন?”
— “আজ্ঞে, কন্দকাটা আমাকে ভয় দেখাতে এসেছিল বলে আমি ওকে একটা চড় মেরেছি।
—"অন্যায় করেছ। দ্যাখো, তোমরা পৃথিবীতে এখন সশরীরে বর্তমান আছ—কত দিকে কত আনন্দ নিয়ে মেতে থাকতে পারো। কিন্তু ভূতবেচারাদের ভাগ্যে সেসব কিছুই নেই, তাদের আনন্দলাভের একটিমাত্র উপায় আছে, আর তা হচ্ছে, তোমাদের ভয় দেখানো। তোমাদের ভয় দেখিয়েই তাদের সময় মনের সুখে কোনওরকমে কেটে যায়। কিন্তু তোমরা আজকালকার কলেজের ছোকরারা, দু-পাতা ইংরিজি পড়েই ভূত-প্রেতদের ডোন্ট কেয়ার করে দাও। এই সেদিন মামদোভূত এসে আমাকে তার দুর্দশার কাহিনী বলে গেল। সে কাহিনী শুনলে চোখে আর জল রাখা যায় না। কে এক ছোকরা নাকি ডাক্তারি পড়ে, মড়া কেটে কেটে তার বুক থেকে ভয় চলে গিয়েছে। এক রাতে সে ঘুমোচ্ছিল, এমন সময়ে মামদো তার ঘরে গিয়ে হাজির মামদো যেই তার খাটের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, ছোকরার ঘুম অমনি গেল ভেঙে। মামদোর প্রথমটা মনে হল, ছোকরা ভয়ানক ভয় পেয়েছে। কারণ সে মামদোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মামদোও তার দিকে চোখ যতটা পারে পাকিয়ে কটমট করে তাকালে। ছোকরা তখন ডানপাশ ফিরলে। মামদোও সেই পাশে গিয়ে হাজির। ছোকরা তখন শুধোলে, তুমি কি চাও?” মামদোও কোনও জবাব না দিয়ে আরও বিশ্রীভাবে তাকালে। তারপর যা হল তুমি শুনলে বিশ্বাস করবে না। ছোকরা মামদোর দিকে আবার খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললে, 'দ্যাখো, তোমার যদি আর কোনও কাজ না থাকে, তবে তুমি ওইখানে চুপ করে দাঁড়িয়েই থাকো। আমার অন্য কাজ আছে—অর্থাৎ এখন আমি ঘুমবো।' বলেই সেই পাজি ছোকরা আবার বাঁ পাশ ফিরে অম্লানবদনে ঘুমিয়ে পড়ল। বলো তো, এর পরে আমাদের ভয় দেখানোর সুখটুকুই বা কোথায় থাকে, আর আমাদের মুখরক্ষাই বা হয় কেমন করে? তুমিও দেখছি ওই দলেরই লোক। তোমার এই অন্যায় ব্যবহারে আমি অত্যন্ত দুঃখিত। ভবিষ্যতে আমাদের দেখে তোমরা ভয় পেয়ো তাহলেই আমাদের আনন্দ। কিন্তু এইটুকু আনন্দ থেকেও তোমরা যদি আমাদের বঞ্চিত করো, তাহলে—'
'বেহ্মদত্যির কথা শেষ হবার আগেই কন্দকাটা বলে উঠল, 'সরে দাঁড়াও, সরে দাঁড়াও,—পথ থেকে সরে দাঁড়াও। '
ফিরে দেখি, একটি স্ত্রীলোক পথ দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, লজ্জায় আধ হাত জিভ কেটে মুখে সাতহাত ঘোমটা টেনে দিলে।
‘কন্দকাটা বললে, এখনও সরে দাঁড়ালে না। কেমন লোক হে তুমি? মহিলার সম্মান জানো না?”
‘তাড়াতাড়ি আমি সরে দাঁড়ালুম। মহিলাটি ঘোমটার ফাঁক দিয়ে একবার আমাকে দেখে, ফিক করে একটুখানি কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে হেলে-দুলে চলে গেলেন। ‘আমি বললুম, উনি কে?
‘কন্দকাটা খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে বললে, ‘উনি হচ্ছেন শ্রীমতী পেত্নীবালা দত্ত।’
‘বেহ্মদত্যি মুখ থেকে হুঁকোটি নামিয়ে বললেন, ‘পেত্নীবালার ডাক নাম কুণি। ও হচ্ছে বুনির বোন।
‘আমি বললুম, বুনি কে?
‘বেহ্মদত্যি বললেন, তুমি কি কখনও কুণি বুনির গল্প শোনোনি?’
— “না ৷’
— তবে শোনো কুণি আর বুনি হচ্ছে দুই বোন। মরবার পর দুই বোনই পেত্নী হয়েছে। কুণি থাকে দত্তদের বাড়ির রান্নাঘারের এককোণে, আর বুনি থাকে বাঁশবনে। এক রাত্রে দত্তদের বাড়ির বামুনঠাকুর বাঁশবনের পাশ দিয়ে আসছে, এমন সময়ে বুনি বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে তার পথ জুড়ে দাঁড়াল। পেত্নী দেখেই তো বামুনঠাকুর একেবারে ভয়ে আড়ষ্ট। কিন্তু বুনি সেদিন বামুনকে ভয় দেখাতে আসেনি, সে খালি বললে,
'কুণিকে বোলো বুনির বেটা হয়েছে।
সুমুখদিকে গুড়মুড়ো তার পিছন দিকে পা,
একবার বলে দিয়ো তো গা!'
‘এই বলেই বুনি অদৃশ্য হল। বামুনঠাকুরও ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে দত্তবাড়ির রান্নাঘরের সামনে এসে পড়ে দাঁতকপাটি লেগে অজ্ঞান হয়ে গেল। সকলে তার চোখে-মুখে জল দিয়ে তাকে আবার চাঙ্গা করে তুলল। তারপর বামুনঠাকুর যখন একটু ধাতস্থ হয়ে সকলের কাছে বুনির বেটা হওয়ার বিবরণ বলছে, তখন হঠাৎ রান্নাঘরের কোণ থেকে কুণি নাচতে নাচতে বেরিয়ে এসে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললে—ও ঠাকুর! কয় দিবসের? ও ঠাকুর! কয় দিবসের?’—অর্থাৎ খোকার বয়স কদিন হল?—এবারে দত্তবাড়ির সবাই ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। আজ যাকে দেখলে, ও হচ্ছে সেই কুণি। বুনির সঙ্গে দেখা করতে চলেছে। কুণি ভারি লজ্জাবতী। অচেনা লোক দেখলেই ঘোমটা দেয় আর ঘোমটার ভিতর থেকে ফিক ফিক করে হাসে।
কথায় কথায় রাত বেড়ে যাচ্ছে দেখে আমি বললুম, আপনার সঙ্গে আলাপ করে বড়ো আনন্দিত হলুম। তাহলে আজ আমি আসি?
‘বেহ্মদত্যি বললেন, ‘সেকি, এই রাত্রে কোথায় যাবে? তার চেয়ে বেলগাছের ডালে এসে বসে দুদণ্ড বিশ্রাম করো।'
‘আমি বললুম, আজ্ঞে, আমি এখনও জ্যান্ত আছি,—বেলগাছের কাঁটা আমার সহ্য হয় না। আমি আমার পৈতৃক ভিটেবাড়ি দেখতে এসেছি, আরও কতদূর যেতে হবে বলতে পারেন?
‘বেহ্মদত্যি বললেন, ‘তোমাদের ভিটে? হা হা হা হা! ওই যে! হাত-পনেরো তফাতে চেয়ে দ্যাখো। ওই যে উঁচু ঢিপিটা দেখছ, ওইখানেই আগে তোমাদের বাড়ি ছিল। এখন ওখানে গো- ভূতেরা থাকে। মানুষ দেখলে তারা ভয় দেখায় না—একেবারে গুঁতিয়ে দেয়।
‘আমি বললুম, তাহলে আজ রাতটা আমি স্টেশনেই কাটিয়ে দেব—গো-ভূতদের আমি পছন্দ করি না। প্রণাম হই বেহ্মদত্যিঠাকুর।
‘এই বলে আমি চলে আসতে যাব, এমন সময় কন্দকাটাটা আবার আমার সামনে এসে কাকুতি মিনতি করে বললে, ‘দোহাই তোমার। তোমার দুটি পায়ে পড়ি অন্তত যাবার সময়েও আমাকে দেখে দয়া করে একবার ভয় পেয়ে যাও, নইলে ভূতেরা কেউ আমাকে মানবে না।
—আচ্ছা, আচ্ছা, আমি খুব ভয় পেয়েছি,—এই বলে আমি সেখান থেকে হাসতে হাসতে চলে এলুম। আমার কথাটি ফুরলো।'
রামচন্দ্র ও শ্যামচন্দ্র একবাক্যে মতপ্রকাশ করলে, ‘ধেৎ। ডাহা গাঁজাখুরি গল্প।’
অপূর্ব বললে, ‘সব ভূতের গল্পই গাঁজাখুরি। তবে কোনোটাতে গাঁজার মাত্রা কম থাকে, আর কোনোটাতে থাকে খুব বেশি—এই যা তফাত।'
মানিকলাল বললে, “আমার গায়ের কাঁটা গায়েই মিলিয়ে গেল। এখন আর এক কাপ চা খেয়ে গা তাতিয়ে না নিলেই নয়।'
আমি বললুম, ‘বেয়ারা! চা লে আও।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন