নিশীথ রাতের কাহিনী

হেমেন্দ্রকুমার রায়

( রাত দশটা বেজে গেছে, অন্ধকার আকাশে গড়গড় করে মেঘ ডাকছে,বৃষ্টি কখনো মুষলধারে ঝুপঝুপ করে, কখনো অল্প কমে টিপটিপ করে পড়ছে,কিন্তু অস্রান্ত রিমঝিম বা রমঝম শব্দ সমানে চলেছে। প্রবল বাতাসে কাছে, দূরে গাছপালার মধ্যে থেকে মর্ম্মর –কান্না জেগে উঠেছে।ময়নাপুর ছোট্ট স্টেশনে একখানা রেলগাড়ী সশব্দে এসে থেমে পড়ল। )

.

স্টেশনের কুলি :: ময়নাপুর- ময়নাপুর!

সুরেন :: ওহে ·ওহে শিগগির নেমে পড়! গাড়ি এখানে মোটে তিন মিনিট থামে! (জন চার পুরুষ ও একটি মহিলা যাত্রী স্টেশনে নেমে পড়ল। কামরার দরজা খোলার ও বন্ধ হবার ও কুলিদের মালপত্র নামানোর শব্দ – কুলিদের ও যাত্রীদের কোলাহল।)

কমলা :: ও দাদা, আমার হাতব্যাগটা গাড়িতেই পড়ে রইলো যে!

বিমল :: কমলী! তোকে নিয়ে আর পারিনা! কোনদিন দেখছি তুই নিজেকেও হারিয়ে ফেলবি! দাঁড়া, এনে দিচ্ছি।

(গাড়ি ছাড়ার ঘন্টা, গার্ডের ও ট্রেনের বাঁশী, ট্রেন ছাড়ার শব্দ।)

স্টেশন – মাস্টার :: এই দুর্যোগে, এতো রাত্রে,আপনারা কোথায় যাবেন মশাই?

সুরেন :: হরিণবাড়ী গাঁয়ে। আমরা বরযাত্রী, বরের বন্ধু।

স্টেশন – মাস্টার :: হ্যাঁ হ্যাঁ, বৈকালে একদল লোক বর নিয়ে হরিণবাড়ী গিয়েছে বটে। - সুরেন :: আমাদেরও সেই ট্রেনে আসবার কথা, কিন্তু ট্রেন ফেল করে বাঙালীত্ব বজায় রেখেছি। তবে শেষ রাতে লগ্ন, বয়ের আগেই গিয়ে পড়তে পারব।

স্টেশন – মাস্টার :: আপনাদের সঙ্গে মেয়েও রয়েছেন দেখছি যে।

বিমল :: আজ্ঞে উনি আমার ভগ্নী। আমরা কন্যাপক্ষের লোক, আমরাও ট্রেন ফেল করে বরযাত্রীদের দলে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছি।

সুরেন :: অজিত, ঘড়িতে কটা বাজলো দেখ তো।

অজিত :: দশটা পনেরো। দিন বুঝে ট্রেনও আজ পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেট।

সুরেন :: স্টেশন – মাস্টারমশাই, হরিণবাড়ি এখান থেকে কত দূরে? -

স্টেশন – মাস্টার :: দু মাইল। -

সুরেন :: স্টেশনে ঘোড়ার গাড়ি-টাড়ি পাওয়া যাবে তো?

স্টেশন – মাস্টার :: (হাস্য করে) এটা হাওড়া কি শিয়ালদা বলে ভ্রম করবেন না।অজ - পাড়াগাঁয় স্টেশন, আগে থাকতে ঠিক না করলে দিনের বেলাতেও গরুর গাড়ি পাওয়া যায় না! তার ওপরে এই রাত্রি আর এই দুর্যোগ! আপনি হাসালেন মশাই!জানেন? এতোক্ষণে পথ-ঘাট সব জলে ডুবে গেছে? পা গাড়িও চলবে কিনা সন্দেহ!

সুরেন :: ওহে অজিত,অহে দুলাল শুনছো তো?

দুলাল :: হুঁ,শুনছি সব। আজকের এই আকাশের মত আমারও প্রবল বেগে অশ্রুত্যাগ ইচ্ছা হচ্ছে।

অজিত :: বাড়ি থেকে বেরোবার সময় একটা কালো বেড়াল দেখে বেরিয়েছিলুম। তখনি জানি, বিপদ না হয়ে যায়না। কিন্তু বিপিনের বিয়ে, যেমন করেই হোক, যেতেই হবে।

স্টেশন – মাস্টার :: কিন্তু যাবেন কেমন করে? দুখানা পা তো কোন কাজেই লাগবে না আপনারা চতুস্পদ হলেও আজ যেতে পারতেন না, কারণ খানিক পরেই পথ পড়েছে মাঠের ভিতরে, সেখানে এক কোমর জল!

কমলা :: (উৎকণ্ঠিত স্বরে ) ও দাদা!শুনছো তো?

স্টেশন – মাস্টার :: তার ওপর এই নিরেট অন্ধকার! আবার সঙ্গে মেয়ে! চমৎকার!

সুরেন :: তবু একবার চেষ্টা করে দেখতেই হবে। দুলাল, হ্যারিকেন লণ্ঠন দুটো জ্বালো তো। সঙ্গে টর্চ ও আছে, অন্ধকারের জন্য ভাবি না।

বিমল :: কিন্তু আমি ভাবছি মাঠ ভরা এক কোমর জলের কথা। কমলীকে কি শেষটা কাঁধে করে নিয়ে যেতে হবে?

কমলা :: মাপ কর দাদা! অতটা পরিশ্রম নাই বা করলে! কোলে চড়া আর কাঁধে চড়া জন্মান্তরের জন্য তোলা রইলো।

বিমল :: তাহলে কি সাঁতার কেটে মাঠ পার হবি?

কমলা :: কাঁধে চড়া কি সাঁতার কাটা, ও দুটোর একটাও আমার দ্বারা হবে না। মাগো, আমার বিয়ে দেখায় কাজ নেই!

বিমল :: এই জন্য বলে, পথে নারী বিবর্জ্জিতা।

সুরেন :: বিমলবাবু, তাহলে আপনার ভগ্নীকে নিয়ে স্টেশনেই থাকুন,আমরা অগ্রসর হলুম। স্টেশন – মাস্টারমশাই, হরিণবাড়ি যাবার পথটা কোন দিকে?

স্টেশন – মাস্টার :: স্টেশন থেকে নেমেই বাঁ দিকে।

সুরেন :: অজিত, দুলাল, তোমরা লণ্ঠন দুটো নাও, আমার কাছে টর্চ আছে।

স্টেশন – মাস্টার :: তাহলে মশাইরা কি নিশ্চয় যাবেন?

সুরেন :: তাছাড়া আর উপায় কি? আপনার এই অপূর্ব্ব স্টেশনে তো দেখছি একটা চানাচুরওলা অবধি নেই। পথের ওপারে চৰ্ব্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় আমাদের জন্য সগৌরবে অপেক্ষা করছে,এখানে বসে তো উপবাস করতে পারি না।

স্টেশন – মাস্টার :: কিন্তু একটা কথা শুনবেন কি?

সুরেন :: বলুন।

স্টেশন – মাস্টার :: এখানকার কোন লোকই রাত্রে ও পথে হাঁটে না।

সুরেন :: কেন ডাকাতের ভয় –টয় আছে নাকি?

স্টেশন – মাস্টার :: ডাকাতের ভয়ে নয়।

সুরেন :: তাহলে কি ভূতের ভয়ে? (উচ্চহাস্য করে), মশাই আমরা খাস কলকাতার সুসভ্য ছেলে, পাড়াগাঁয়ে অসভ্য ভূত আমাদের দেখলেই সেলাম ঠুকে লম্বা দিতে পথ পাবে না।চল হে চল, ক্রমেই রাত বাড়ছে।

বিমল :: কমলী . ওদের সঙ্গে আমরাও একবার চেষ্টা করে দেখব নাকি? নিতান্ত , বেগতিক দেখলে শেষটা না-হয় ফিরেই আসা যাবে, কি বলিস?

কমলা :: যা ভাল বোঝ কর দাদা, কিন্তু আমার কেমন ভয় করছে!

বিমল :: ভয় আবার কিসের রে? সঙ্গে এতগুলো লোক! নে চল, আমার হাত ধর।

সুরেন :: এই নিন মশাই, আমাদের টিকিট।

স্টেশন-মাস্টার আপনারা তো পাঁচখানা টিকিট দিলেন,কিন্তু ও ভদ্রলোকের টিকিট কোথায়?

সুরেন :: কে উনি? ওঁকে আমরা চিনিনা। বিমলবাবু, উনি কি আপনাদের লোক?

বিমল :: রামচন্দ্রঃ! ওঁকে কখনো দেখিনি, অত বড় লম্বা গোঁফও জীবনে কখনো চোখে পড়েনি!

স্টেশন-মাস্টার :: আরে, আরে! লোকটা প্লাটফর্ম ছেড়ে নেমে যায় যে! ও মশা, শুনছেন? আরে গেল, লাইনের ওপর দিয়ে ও যায় কোথায়? (উচ্চৈঃস্বরে) কুলি, কুলি! পাকড়ো।

(কুলিদের দ্রুত পদশব্দ )

সুরেন :: লোকটা কে বলতো? গাড়িতে তো আমাদের সঙ্গে আসেনি!

বিমল :: হয়তো অন্য কামরায় ছিল।

অজিত :: কিন্তু লোকটার গোঁফজোড়া দেখেছ? যেন কাঁকড়ার দুখানা দাঁড়া!

কমলা :: আমি লক্ষ্য করেছি দাদা, ও পিছনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিল।

অজিত :: আমিও লক্ষ্য করেছি, এমন অন্ধকারেও ওর চোখ দুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

দুলাল :: তার মানে? তুমি কি বলতে চাও ওর চোখ দুটো বেড়ালের চোখের মত জ্বলছিল?

অজিত :: জ্বলছিল না বলেই তো আশ্চর্য হচ্ছি। জ্বলছিল না কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। যেন মরা মাছের মত স্থির, ভাবহীন দুটো ড্যাবড্যাবে চোখ। তোমরা এত কাছে রয়েছ, তবু তোমাদের চোখ ভাল করে দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু দূর থেকেই ওর চোখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলুম।

সুরেন :: অজিতের ঘুম পেয়েছে, ও এখনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

দুলাল :: আর ওর খিদেও পেয়েছে নিশ্চয়। কারণ উপমা দুটোও মুখোরোচক! কাঁকড়ার দাঁড়ার মত গোঁফ আর মাছের মত চোখ, দুটোই খাবার জিনিস।

জনৈক কুলি (হাঁপাতে হাঁপাতে) :: ও আদমি ভাগ গ্যায়া হুজুর।

স্টেশন-মাস্টার :: বেটা রেল কোম্পানিকে ফাঁকি দিলে আরকি।

সুরেন :: নাও চল,আর দেরী নয়।বিমলবাবু,আপনার ভগ্নীকে নিয়ে আমাদের মাঝখানে আসুন।

(মাথার ওপর একটা প্যাঁচা ডেকে উঠল)

অজিত (চমকে) :: দুর্গা দুর্গা! নচ্ছার পাখী, গলা সাধবার আর সময় পেলে না! কালো বিড়ালের ওপর কাল-প্যাঁচা! কুলক্ষণের ওপর কুলক্ষণ!

স্টেশন-মাস্টার :: মশাই, চারিদিকে নজর রেখে একটু সাবধানে যাবেন। প্যাঁচার ডাকেই চমকে উঠলেন, এখনো অনেক কিছুই ডাকতে পারে।

(সকলে স্টেশন থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে অগ্রসর হতে লাগল। ভীষণ শব্দে একবার বজ্রধ্বনি হল, তারপর সেই একটানা রিমঝিম ধারাপাত, ঝোড়ো বাতাসের গোঁ গোঁ এবং মর্ম্মরিত অরণ্যের আর্তনাদ -কখনো নিকটে কখনো দূরে, কখনো স্পষ্ট কখনো অস্পষ্ট )

সুরেন :: বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আসা, কিন্তু শেষ অবধি আত্মরক্ষা করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না

দুলাল :: এরকম হড়হড়ে কাদার সঙ্গে আর কখনো পরিচয় হয়নি। ঠিক যেন স্কেটে চড়ে এগিয়ে যাচ্ছি – পা ফেলছি কোথায় আর দাঁড়াচ্ছি গিয়ে কোথায়!

বিমল :: লুচি-মন্ডা খাবার আগে অনেকগুলো আছাড় খেতে হবে দেখছি! কমলী, খুব সাবধান!

কমলা (সভয়ে) :: ও মা! এ কি?

সুরেন :: বিশেষ কিছু নয়, একটা গোখরো সাপ! ভয় নেই কমলা দেবী আপনাকে কামড়াতে আসেনি, নিজের প্রাণভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

অজিত :: বৃষ্টি আর ঝড় যে বেড়ে উঠল – পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার যেন একত্রে ষড়যন্ত্র - করে আজ আমাদের আক্রমণ করতে এসেছে!

সুরেন :: অজিত কবিতা লেখে কিনা, তাই আমাদের কাছে প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য বৰ্ণনা করছে!

অজিত :: সৌন্দৰ্য্য বর্ণনা করবার মত মনের অবস্থা আজ আমার নেই। আমি ভাবছি স্টেশন-মাস্টার রাত্রে আমাদের এ পথে যেতে মানা করে ভয় দেখালেন কেন?

সুরেন :: আর কিছু ভাবছ?

অজিত :: আর ভাবছি ষ্টেশনের সেই টিকিটহীন অসাধারণ লোকটাই বা কে?

সুরেন :: তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে কলকাতার ছেলেদের ভয় দেখানো পাড়াগাঁয়ে লোকেরা বাহাদুরি বলে মনে করে। আর ওই লোকটা কে? রেল কোম্পানির শত্রু ·-বিনা টিকিটের যাত্রী। চোর-জুয়াচোর মাত্রেই অসাধারণ।

অজিত :: কিন্তু তার চোখদুটো তো তুমি দেখনি।

দুলাল :: আবার সেই চোখ! জ্বালালে দেখছি।

কমলা :: দাদা, তুমি অজিতবাবুকে ওইভাবে কাথা কইতে মানা করে দাও। আমার বুকটা ছ্যাত-ছ্যাঁত করছে।

সুরেন :: দুরাত্মা অজিত! তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমাদের সঙ্গে একজন মহিলা রয়েছেন।

(অকস্মাত খুব কাছেই চারিদিক কাঁপিয়ে ঘণ ঘণ বাঘের ডাক শোনা গেল )

কমলা (আঁতকে উঠে) :: ও দাদা! দাদা গো!

অজিত ও দুলাল (একসঙ্গে) :: বাঘ! বাঘ!

বিমল :: ওই বনের ভেতর থেকে ডাকছে! কমলী! দৌড়ো।

(দ্রুত পদশব্দ তুলে সকলে খানিকদূর অগ্রসর হল)

অজিত :: বাঘটা সঙ্গে আসছে না তো?

(আবার বাঘের ডাক – খানিক দূর থেকে)

সুরেন :: বোধহয় বাঘটা আজ শিকার খুঁজছে না, কেবল ঝড়, বৃষ্টি-বজ্রাঘাতের বিরুদ্ধে নিজের প্রবল প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

অজিত :: (বিরক্ত স্বরে) তুমি সব ব্যাপারই এমন ঠাট্টা করে উড়িয়ে দিও না সুরেন! এখনই কি হত বল দেখি?

সুরেন :: কি হত তা আর ভাবা মিছে, কিছু যে হয়নি সেইটাই হচ্ছে বড় কথা!

কমলা :: (হাঁপাতে হাঁপাতে) দাদা, স্টেশনে ফিরে চল।

বিমল :: বলিস কি! ওই বাঘের মুখ দিয়ে?

কমলা :: তবে কি হবে?

সুরেন :: হবে আর কি কমলা দেবী, এইবারে সাঁতার কাটাটাই বাকি আছে! আমরা বোধহয় মাঠের সামনে এসে পড়েছি

(আচম্বিতে বিষম চিৎকারে আবার বাঘ ডেকে উঠল)

কমলা :: ওটা কি মাঠ? বিদ্যুতের আলোয় তো দেখা গেল, সমুদ্রের মত কেবল থৈ থৈ করছে জল আর জল!

সুরেন :: মন্দ কি? ও ও তো একটা নতুনত্ব! বাংলাদেশে বসেই সমুদ্র- দৰ্শন!

বিমল :: ও সর্ব্বনেশে মাঠে নামলে কি আর রক্ষে আছে?

(ঝড় ও বৃষ্টির শব্দ অত্যন্ত বেড়ে উঠল)

কমলা :: ফিরে চল দাদা! ফিরে চল!

সুরেন :: দেখছি স্টেশন মাস্টার অত্যুক্তি করেননি। এ মাঠ এখন পার হওয়া অসম্ভব।

(খানিক দূরে আবার ঘণ ঘণ বাঘের ডাক। ডাক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।)

কমলা :: (কাতর স্বরে) দাদা দাদা! বাঘটা এদিকেই আসছে যে!

সুরেন :: এদিকে সমুদ্রের মত মাঠ, আর অদিকে যমের মত বাঘ! এখন উপায়?

অপরিচিত গম্ভীর স্বর :: উপায় আছে।

সকলে (সবিস্ময়ে ও সচমকে) :: কে কে?

সেই স্বর :: আমি।

দুলালা :: ঐ গাছতলায় তাকিয়ে দেখ!অজিতের সেই লোভনীয় কাঁকড়ার দাঁড়া আর মাছের চোখ!

অজিত (মৃদু স্বরে) :: সুরেন দেখেছো! গাছতলায় ঐ ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমাদের লন্ঠনের আলোতে ওর দেহটাই ভাল করে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ওর চোখদুটো কত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে!

কমলা (ফিস ফিস করে) :: দাদা, ওকে দেখে আমার বুকটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কেন?

বিমল (তেমনি স্বরে) :: চুপ!

সুরেন :: মশাই যে দেখছি রেল-লাইন দিয়ে সর্ট কাট করে আমাদের আগেই এখানে এসে হাজির হয়েছেন?

অপরচিত :: হ্যাঁ। আপনারা হরিণবাড়ি যেতে চান? বরযাত্রী?

সুরেন :: আজ্ঞে হ্যাঁ। সবই তো জানেন দেখছি।

অপরিচিত :: কিন্তু দেখছেন, যাওয়া অসম্ভব?

সুরেন :: স্টেশনে ফেরাও অসম্ভব। বনে বাঘ ডাকছে।

অপরিচিত :: এই পথে ফিরে একটু এগোলেই আমার বাড়ি

(আবার বাঘের ডাক )

সুরেন :: অজিত, দুলাল, ভাববার সময় নেই। কি করবে বল?

অপরিচিত :: আমার বাড়িতে আজ রাত্রে অনায়াসেই থাকতে পারেন।

কমলা (ফিস ফিস করে, সভয়ে) :: দাদা, আমি যাব না। ওর চোখদুটো দেখ!

বিমল (তেমনি স্বরে) :: যেতেই হবে, উপায় নেই।

অজিত (তেমনি স্বরে) :: আমার মন বলছে ওর সঙ্গে যাবার চেয়ে মাঠের জলে ঝপ দেওয়া ভাল।

দুলাল (তেমনি স্বরে) :: তোমার মনকে অত বেশী কথা বলতে মানা করে দাও।

সুরেন :: কিন্তু মশায়ের পরিচয় জানতে পারি কি?

অপরিচিত (অত্যন্ত শুষ্ক হাস্য করে) :: লোকে আমাকে কদমপুরের জমিদার বলেই জানত।

সুরেন (সবিস্ময়ে) :: জানত!

জমিদার :: হ্যাঁ। কারণ আমার জমিদারি আর নেই, কেবল আমি আছি। আর আছে নিস্তারিণী- অর্থাৎ আমার স্ত্রী। আর আছে একখানা ভুতুড়ে বাড়ি। সবই দৈবের খেলা -বুঝেছেন?

সুরেন :: নিশ্চয়। আজ এখানে আমাদের অভাবিত আবির্ভাবকেও দৈবের খেলা বলতে পারি। কিন্তু এত রাত্রে আমরা গেলে আপনার কোন অসুবিধা হবে না তো?

জমিদার :: কিছু অসুবিধা হবে না। আসুন।

কমলা (ফিস ফিস করে) :: ও দাদা, লোকটা আমার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছে দেখ! আমার রক্ত যে জল হয়ে যাচ্ছে!

(বাতাসের হু হু - গাছপালার মর্মর )

অজিত (চমকে) :: বাপ!

জমিদার :: ভয় কি? ওটা আমার পোষা বাদুড়।

দুলাল (বিস্মিত স্বরে) :: পোষা বাদুড়! ও বাবা, আপনি বাদুড় পোষেন নাকি?

জমিদার :: আমি পুষি না, তবে বাদুড়ই আমার পোষ মেনেছে।

সুরেন :: আপনি কি বলছেন মশাই?

(দুখানা ডানার ঝট-পট শব্দ)

জমিদার :: অর্থাৎ আমার ভাঙ্গা বাড়িখানা হচ্ছে যত রাজ্যের বাদুড়ের বাসা।

সুরেন (আশ্বস্ত স্বরে) :: ও তাই বলুন।

অজিত (চুপি চুপি) :: সুরেন সুরেন, এখনো ভেবে দেখ, আমরা কোথায় যাচ্ছি!

সুরেন (চুপি চুপি) :: বাঘের মুখে যাচ্ছি না, এইটুকু জানি।

দুলাল (চুপি চুপি) :: এইবারে আমারও ভয় হচ্ছে সুরেন।দেখ এখনো সময় আছে।চল,

সুরেন (চুপি চুপি) :: তোমরা কাপুরুষ! আমরা এতগুলো জোয়ান পুরুষ! ভয়টা কিসের?(স্বাভাবিক স্বরে ) মশাই আপনার বাড়ি আরো কত দূরে?

জমিদার :: এই যে সামনে। অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছেন না বুঝি? টর্চ টা জ্বালুন না ৷

সুরেন (বিস্মিত স্বরে) :: কি সর্ব্বনাশ! এই বাড়িতে আপনি থাকেন! যে-কোন মুহূর্তে মাথায় ভেঙে পড়তে পারে যে!

জমিদার :: উপায় কি! দৈবের লীলা। একজন লণ্ঠন নিয়ে আগে আগে চলুন। এই আমাদের সদর দরজা।

সুরেন :: দরজার দুখানা পাল্লাই অদৃশ্য হয়েছে দেখছি! বাঘ –টাঘ ভেতরে ঢোকেনা?

জমিদার (হাস্য করে) :: বাঘ! বাঘ আমাকে ভয় করে।

কমলা (চুপি চুপি) :: ও কে? ওর কথা ধরণে আমার প্রাণ কেঁপে কেঁপে উঠছে! আমি বাড়ির ভেতরে যাব না।

বিমল (চুপি চুপি) :: পাগলামি করিসনে! ভেতরে আয়। (স্বাভাবিক স্বরে ) আঃ! এতক্ষণে বৃষ্টির হাত থেকে পরিত্রাণ পেলুম। হাড়ের ভেতর অবধি যেন জলে ভিজে গেছে! কি ঠান্ডা!

(ঝড়-বৃষ্টির শব্দ খুব অস্পষ্ট হয়ে গেল)

অজিত (চুপি চুপি) :: দেখ দুলাল! দালানের মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখ!ধূলায় পা বসে যাচ্ছে! কতবছর এখানে ঝাঁট পড়েনি কে জানে! এ মানুষের বাড়ি নয়!

জমিদার (ক্রদ্ধ স্বরে) :: কি বললেন? আপনার কথা শুন্তে পেয়েছি। ঝাঁট দেবে কে? জমিদারি নেই বটে, কিন্তু ঝাঁট দিতে শিখিনি আজও। তবে ঝাঁট দেবে কে? আমার গিন্নি দেবে নাকি?

সুরেন (চুপি চুপি তিরষ্কারের স্বরে ) :: অজিত, তুমি অতি নির্ব্বোধ! (স্বাভাবিক কণ্ঠে ) না মশাই, আমার বন্ধু কথার কথা বলছিল। তার হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি।

তীক্ষ্ণ নারী কণ্ঠস্বর :: কে কে? অখানে কথা কয় কারা?

জমিদার (উচ্চৈঃস্বরে ) :: নিস্তার! নিস্তার!

নিস্তারিণী :: (বাইরে আসতে আসতে) কে? কৰ্ত্তা নাকি? কৰ্ত্তা নাকি?

জমিদার :: দেখ এসে নিস্তার, কাকে এনেছি দেখ!

কমলা (সচকিত –অথচ মৃদু স্বরে) :: ও কে? ও কে দাদা! ও তো মানুষ নয়! যেন খালি ছাল ঢাকা হাড়ে গড়া চামুন্ডার মূর্তি! চোখদুটো আগুনের ভাঁটার মত! ও মা গো!

বিমল (ভীত কন্ঠে ) :: তাই তো! এ আমরা কোথায় এলুম?

নিস্তারিণী (সাগ্রহে- স্বর তীক্ষ্ণ) :: কে এসেছে কর্তা –কাকে এনেছো কৰ্ত্তা?

জমিদার :: তোমার ছেলের বউ গিন্নি, তোমার বেটার বউ!

নিস্তারিণী :: (খিল খিল করে অট্টহাসি হেসে) কই কই? কই রে আমার সোনার বউ?

জমিদার :: ঐ যে ঐ যে! এগিয়ে এস বৌমা।

কমলা :: (সক্রন্দনে – সভয়ে চিৎকার করে) ও দাদা, আমাকে বাঁচাও দাদা। ঐ পেত্নীটা - যে আমাকে ধরতে আসছে!

সুরেন :: এ কি ব্যাপার? অজিত, দুলাল। কমলাদেবীকে আগলাও।

জমিদার :: (বিকট স্বরে প্রথমে হা হা হা হা হাস্য এবং তারপর গর্জ্জন করে) সরে দাঁড়া –সরে দাঁড়া তোরা, গিন্নির পথ ছাড় – নইলে তোদের কি হবে জানিস?

সুরেন :: (সক্রোধে চিৎকার করে) আর এক পা এগুলে এই লাঠি মেরে মাথা গুঁড়িয়ে দেব।

জমিদার :: (হা হা হা হা অট্টহাস্য এবং গৰ্জ্জন)

অজিত :: পালিয়ে এস সুরেন, পালিয়ে এস।

বিমল :: পালা পালা কমলী! আমি পথ আগলে আছি।

দুলাল :: সবাই পালিয়ে এস, এ ভূতের বাড়ি।

নিস্তারিণী :: (তীক্ষ্ণ স্বরে কেঁদে উঠে ) ধর –ধর –বেটার বউ পালায় যে রে!

বৌমা যাসনে! ও বৌমা – যাসনে!

.

(জমিদারের অট্টহাস্যের সঙ্গে নিস্তারীণীর তীক্ষ্ণ কান্না –

কমলার আর্তনাদসকলের চিৎকার করতে করতে - দ্রুতপদে পলায়ন।

সুরেন প্রভৃতি বাইরে এল।

জমিদারের হাসি, নিস্তারীণীর কান্নার বদলে জেগে উঠল চারিদিকে ঝড়ের গর্জ্জন, বৃষ্টির শব্দ।)

(সকাল – ঝড় বৃষ্টি থেনে গেছে, ভোরের পাখীরা ডাকছে, ময়নাপুর স্টেশন )

অজিত :: সকাল হল! আঃ, বাঁচলুম। এখনি ট্রেন আসবে। কিন্তু স্টেশনমাস্টার কোথায়?

সুরেন :: ঐ যে স্টেশনমাস্টার আসছেন!

স্টেশন-মাস্টার :: এই যে! আপনারা কখন ফিরে এলেন? বিয়ে বাড়ি যাননি?

অজিত :: বিয়ে বাড়িতেই যাব বটে! বাবা, প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছি, এই ঢের!

স্টেশন-মাস্টার :: দুর্যোগ্যে যেতে মানা করলুম,শুনলেন না তো? বাঘের খপ্পরে পড়েছিলেন বুঝি?

অজিত :: বাঘের খপ্পরে নয় মশাই,বাঘের খপ্পরে নয়! রীতিমত ভূতের খপ্পরে! সব জেনেশুনে আর চেপে যাচ্ছেন কেন?

স্টেশন-মাস্টার (সবিস্ময়ে) :: ভূতের খপ্পরে! ও পথে ভূতের ভয় আছে তা জানতুম না তো! তবে

সুরেন :: তবে কি? থামলেন কেন?

স্টেশন-মাস্টার :: আমি এখানে মোটে মাস-তিনেক বদলি হয়েছি, সত্যি –মিথ্যে জানিনা, তবে লোকের মুখে শুনেছি, কে এক কদমপুরের জমিদার নাকি রাত্রে দুর্যোগ হলেই পথে বেরোয়

সুরেন :: হ্যাঁ, জমিদার গিন্নিও আছেন।

স্টেশন-মাস্টার :: তাও শুনেছি। তাদের কারোকেই আমার চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে শুনেছি তারা দুজনেই পাগল।

সুরেন :: পাগল!

স্টেশন-মাস্টার :: হ্যাঁ। অনেক কাল আগে নাকি এক দুর্যোগ্যের রাত্রে তাদের একমাত্র ছেলে বিয়ে করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।

সুরেন :: ফিরে আসেনি! কেন?

স্টেশন-মাস্টার :: পথে নৌকাডুবি হয়ে মারা পড়ে। তার কিছুকাল পরেই ছেলের শোকে কর্তা গিন্নি দুজনেরই মাথা খারাপ হয়ে যায়। জমিদারি পাঁচ ভূতে লুটে খায়। তারপর থেকে দুর্যোগ্যের রাত হলেই তাদের পাগলামি বিষম বাড়ে,কৰ্ত্তা বনে বনে ঘোরে, লোকজন দেখলেই ছেলের বইয়ের বরযাত্রী বলে বাড়িতে ধরে নিয়ে যায়, মেয়ে দেখলে তো কথাই নেই – বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বলে গিন্নি, তোমার বউ এনেছি!'

সুরেন :: তার ভয়ে কি ঐ অঞ্চলে লোক চলাচল বন্ধ?

স্টেশন-মাস্টার :: ঠিক তারই ভয়ে না হতেও পারে। রাত্রে এখানে বাঘ বেরোয়। তা আপনারা কি সেই পাগল জমিদারের পাল্লায় পড়েছিলেন?

অজিত :: পড়েছিলুম বলে পড়েছিলুম! বাপরে! ভাবলে এখনো গা শিউরে ওঠে!

দুলাল :: কিন্তু কবিবর অজিত, তোমার কবি কল্পনার বাহাদুরি আছে বটে! মরা মাছের মত চোখ, অন্ধকারেও দেখা যায়। ধন্য!

বিমল :: সব শুনলি তো কমলী, এখন কি করবি? '

কমলা :: রক্ষে কর দাদা! ভূত-ই হোক আর পাগল-ই হোক, আর ও পথে নয়। পরের ট্রেনেই কলকাতায় যাব।

……………………………..

অধ্যায় ১০০ / ১০০
সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%