হেমেন্দ্রকুমার রায়
তোমরা কণারকের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। কণারক হচ্ছে একটি জায়গার নাম - পুরী থেকে প্রায় আঠারো মাইল সেখানে খুব- দূরে পুরানো একটি ভাঙাচোরা সূর্য্যমন্দির আছে। মন্দিরের বেশীরভাগ এখন ভেঙে পড়েছে বটে, কিন্তু যেটুকু এখনও দেখতে পাওয়া যায়, তা এত সুন্দর যে, পৃথিবীর সব দেশ থেকে দর্শকের দল আসে আগ্রহে।
কণারক ও পুরীধামের মাঝখানকার, আঠারো মাইল জায়গাটাকে মরুভূমি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এই মরুভূমির একদিকে দাঁড়িয়ে আছে জগন্নাথের মন্দির, একদিকে আছে কণারকের সূর্য্যমন্দির, একদিকে দেখা যায় অনন্ত সমুদ্র এবং আর একদিকে আকাশের ” সীমা- রেখা পর্যন্ত চলে গেছে অনন্ত বালির প্রান্তর। এই বালুকার রাজ্যে ছোটখাটো একটি জন জঙ্গল শ্যামলতা পাওয়া যায় কেবল কণায়কের ভাঙা দেউলের আশেপাশে।
এই বন জঙ্গলের মধ্যেই একটি সরকারি ডাকবাংলো আছে। আমি যখন সেই বাংলোয় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলুম, তখন সেখানে এক তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর নির্জন আশ্রয় দেখেছিলুম! বাংলোর ভিতরে দু'খানি শোবার ঘর – তার একখানিতে ছিলুম আমি, এবং আর একখানি দখল করেছিলেন আর একজন অপরিচিত ভদ্রলোক। পরে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর নাম পূর্ণবাবু, কলকাতার কোন কলেজের অধ্যাপক, এখানে এসেছেন কণারকের মন্দির দেখবার জন্যে।
কণারকের মন্দির থেকে খানিক তফাতে এগিয়ে গেলে পাওয়া যায় চন্দ্রভাগা নদী। একদিন সন্ধ্যার কিছু আগে আমি এই নদীর ধারে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছি, হঠাৎ আমার পায়ে কিসে ঠোক্কর লাগল। হেঁট হয়ে চেয়ে দেখি, বালির ভেতর থেকে কি একটা জিনিষের আধখানা খানিক টানাটানি করতেই জিনিষ্ঠার বাইরে বেরিয়ে রয়েছে! সবখানাই বেরিয়ে পড়ল! ভালো ক'রে পরীক্ষা ক'রে বুঝলুম সেটা হচ্ছে অদ্ভূত আকারের এক বাঁশী। অন্যমনস্ক ভাবে সেটাকে হাতে নিয়ে -আমি আবার বাংলোর দিকে ফিরলুমু।
যখন বাংলোর খুব কাছে এসে পড়েছি, তখন কেন জানিনা আমার মনে হ'ল, একবার পিছন পানে ফিরে তাকানো উচিত। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে দাঁড়িয়ে দেখি, নদীর ধার থেকে একটা মানুষের মূর্ত্তি হন্ হন্ আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। তার যেন খুব তাড়া অথচ সে কিছুতেই তাড়াতাড়ি আসতে পারছে না – অন্ততঃ তার ভাবভঙ্গী দেখে আমার এইরকমই মনে হ'ল! সে যেন আসছে আসছে, আছেই—সে আসছে অথচ আসতে পারছে না! সন্ধ্যার আসন্ন অন্ধকারে মূর্ত্তিটাকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় না – অথচ তাকে ভালো ক'রে দেখবার জন্যে মনের ভিতরে - - একটা অকাষণ কৌতূহল জেগে ওঠে ৷
বাংলোর ঘরের ভিতর বসে বাতীর আলোতে বাঁশীটাকে ভালো ক'রে পরীক্ষা করে দেখলুম ৷ বাঁশী, এবং বয়েস এ হয়তো -তার গায়ে কতকগুলো যেন বাঁশীটা মোটেই একালের নয়। তামার কণারকের মন্দিরেরই মতন সুপ্রাচীন। অক্ষর খোদা রয়েছে, কিন্তু সেগুলো যে কোন-ভাষার অক্ষর, কিছুই বোঝা গেল না।
এই সেকেলে বাঁশীটা কখনও বাজে কিনা দেখবার জন্যে তার রন্ধ্রে একবার ফু দিলুন। আমার সেই সামান্য ফু য়েই বাঁশীটা হঠাৎ আশ্চৰ্য্য তীক্ষ্ণ ও তীব্র স্বরে বেজে উঠলো। বাঁশী যে অত জোরে বাজতে পারে এটা ছিল আমার কল্পনারও অতীতে! অত্যন্ত চমকে উঠে বাঁশীটা টেবিলের উপর রেখে দিলুম, এবং সঙ্গে সঙ্গে শুনলুম, একটা এলোমেলো ঝোড়ো হাওয়া বাহির থেকে ঘরের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাতীটা গেল নিবে। জানালা বন্ধ ক'রে আমি আবার বাতীটা জ্বাললুম।
এবং তার পরেই, শুনলুম ঘরের দরজায় কে করাঘাত করছে। আস্তে আস্তে উঠে দরজা খুলে দিলুম। আর একটা ঝোড়ো- হাওয়ার দমকা এসে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু দরজা খুলে কাউকেই দেখতে পেলুম না। ভাবলুম, আমারই মনের ভ্রম, দরজায় শব্দ হয়েছে হাওয়ার জন্যেই।
সে রাত্রে হাওয়ার জোর ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগল। দরজা- জানালায় ক্রমাগত ঠেলা মেরে পাগলা হাওয়া কেবলই যেন ঘরের ভিতরে আসতে চায়, তার আওয়াজ শুনে আমার মনে হ ল কণারকের প্রাচীন ভগ্নমন্দিরের আত্মা যেন করুণ আর্তনাদ করছে। যেন দেউলের সমস্ত পাথরের মূর্ত্তি হঠাৎ আজ জ্যান্তো হয়ে কাতর কান্না শুরু ক'রে দিয়েছে! অসংখ্য যক্ষ রক্ষ কিন্নর ও নাগকন্যার দল যেন এই বাংলোর চারিদিকে ঘিরে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে! দরজায় করাঘাত করছে তারাই ৷
এরকম সব কথা মনে হওয়া মনের খুব ভালো অবস্থার লক্ষণ নয়, মন থেকে এই সব ভুশ্চিন্তা তাড়িয়ে এখন ঘুমোবার চেষ্টা করাই উচিত। চেয়ার ছেড়ে উঠে ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লুম। খানিক পরেই চোখে একটু তন্দ্রার আমেজ এল। কিন্তু ঘুম আসবার আগেই আমার কেমন সন্দেহ হ'ল যে, বিছানায় আমি আর একলা নেই – আমার পাশেই যেন আর একজন কেউ শুয়ে আছে। টেবিলের উপরে বাতীটা তখনও জ্বলছিল। সেই আলোতে আড়ষ্টভাবে পাশ ফিরে দেখলুম, বিছানায় আমি ছাড়া আর কেউ নেই। নিজের মিথ্যা ভয়ে নিজেই মনে মনে হেসে আমি আবার চোখ মুদে ফেললুম। কিন্তু তখনি আবার মনে হ’ল আমার পাশে আর একজন কে শুয়ে পড়েছে! কিন্তু এবার এই অলীক কল্পনা নিয়ে আর মাথা না ঘামিয়ে আমি নিদ্রাদেবীর আরাধনায় নিযুক্ত হলুম।
সকাল বেলায় বেড়াতে বেড়িয়েছি পূর্ণবাবুর সঙ্গে দেখা। তিনি কি-রকম এক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, “আমাকে কিছু বলতে চান?"
পূর্ণবাবু বললেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ। কাল সারারাত কি আপনার ভালো ঘুম হয় নি?”
—“কেন বলুন দেখি?
কাল সারা রাত আপনার ঘরের ভিতর থেকে নানারকম শব্দ এসেছে। কে যেন চেয়ার-টেবিল, সরাচ্ছে, ঘরময় লাফালাফি আর ছুটোছুটি ক'রে বেড়াচ্ছে, দুম্-দুম্ ক'রে জানলা খুলছে আর বন্ধ করছে,— এই সব গোলমালে আমিও কাল রাতে ঘুমতে পারি নি!”
আমি বললুম, “এতো ভারি আশ্চর্য্য কথা! " কাল সারা রাত আমার তো ঘুমের কোন ব্যাঘাত হয় নি।”
পূর্ণবাবু অস্তুত হয়ে বললেন, “তাহলে আমারই বোধ হয় শুনতে ভুল হয়েছে—শব্দগুলো অন্য কোন জায়গা থেকে এসেছে।”
এননি সব কথা কইতে কইতে ফিরে এসে আমরা বাংলোর বারান্দার উপরে উঠেছি, এমন সময় আমার ঘরের ভিতর থেকে হাউমাউ ক’রে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে একটা বালক ছুটে বেরিয়ে এল। বাংলোর রক্ষকের হলে। .
ভয়ে সে ঠক্ ঠক্ করে কাপছে দেখে আমি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, “কিরে কি হয়েছে?”
“ও ঘরের খাটে কে বসে আছে!”
দৌড়ে ঘরের ভিতরে গিয়ে হাজির হলুম। খাটের উপরে কেউ নেই। কেবল বিছানার চাদরখানা এলোমেলো হয়ে গুটিয়ে পাকিয়ে ঘরের মেঝেয় প'ড়ে রয়েছে।
বালক বললে, “না, সে ঐ খাটেই ব'সেছিল! ঠিক যেন একটা সাদা কাপড়ে তৈরী মূর্ত্তি! আমাকে দেখেই সে খাট থেকে নেমে এল।"
পূর্ণবাবু বললেন, “বোধ হয় এখানকার কোন লোক চাদর মুড়ি দিয়ে ছেলেটাকে ভয় দেখিয়ে আবার পালিয়ে গেছে!”
আমারও মন বললে, তাইই হবে ৷ .
সেদিন সন্ধ্যার পর টেবিলের ধারে বসে বই পড়ছিলুম।
হঠাৎ চোখ পড়ল সেই তামার বাঁশির দিকে। এই ছোট্ট বাঁশীটা কাল কি-রকম জোরে অস্বাভাবিক স্বরে বেজে উঠেছিল, সেই কথা মনে পড়ল। এমন অদ্ভুত গড়নের বাঁশীও কখনো দেখি নি, এমন তীব্র আওয়াজও কখনো শুনিনি!
একটি বাঁশীটাকে আবার তুলে নিয়ে বাজাবার চেষ্টা করলুম। মাত্র ফুঁ দিতেই বাঁশীটা এমন বিকট স্বরে বেজে উঠল যে আমার কাণ যেন ফেটে গেল!
পর-মুহূর্ত্তে ই বাহির থেকে বিষম ঝোড়ো হাওয়া হু-হু-ক'রে ঘরের ভিতরে ঢুকে প'ড়ে আলোটাকে দিলে নিবিয়ে। ঘরের জানালা-দরজা -বন্ধ ক'রে আলোটা আবার জ্বেলে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম, বাইরে কোন দুৰ্য্যোগ নেই, তবু আচম্া এমন ঝোড়ো হাওয়া জাগে কেন? -কালও এই ব্যাপার হয়েছিল আজও তাই।
খাটের দিকে চোখ গেল, বিছানার চাদরখানা আপনা আপনি "তাল পাকিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে! এও কি সম্ভব? নিজের চোখকে বিশ্বাস হল না ৷
চোখদুটো দুহাতে রগড়ে ভালো ক'রে আবার তাকিয়ে দেখি, খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে এক কিন্তু তকিমাকার মূর্ত্তি। ধব-ধবে কাপড়ের মত সাদা তার দেহ! তার হাত আছে, পা আছে, মাথা আছে, কিন্তু চোখ-নাক ঠোঁট দেখা যায় না!
কী ভয়ানক! মূৰ্ত্তিটা উঠে দাড়াল, দু-দিকে দু-হাত বাড়িয়ে -বাধো বাধো পায়ে যেন কি ধরবার চেষ্টা করতে লাগল। তার ভাবভঙ্গি অন্ধের মত!
কিন্তু সে কাকে খুঁজছে? — আমাকে? - একথা মনে হ'তেই দারুণ
আতঙ্কে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালুম। সেই শব্দ পেয়েই অন্ধ যুত্তিটা বেগে আমার দিকে আসতে লাগল!
আমি একলাফে দরজার কাছে এসে পড়লুম। পাগলের মত দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়ে চ্যাচাতে লাগলুম, “রক্ষা কর! রক্ষা কর।”
চারিদিক থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ পেলুম। পূর্ণবাবুর গলা শুনলুম, “ব্যাপার কি মশাই, ব্যাপার কি?”
দু-হাতে চোখ চেপে মাটির উপরে ব'সে পড়ে আকুল স্বরে বললুম, “ঘরের ভিতরে সেই সাদা কাপড়ের মুত্তিটা!”
সকলে ঘরের ভিতরে গেল। পুর্ণবাবু উচ্চস্বরে বললেন, “কে, কেউ তো এখানে নেই!”
হতভম্বের ·মত ঘরে ঢুকে দেখলুম, মূর্ত্তি অদৃশ্য হয়েছে! মেঝের উপরে দরজার কাছে বিছানার চাদরখানা গড়াগড়ি দিচ্ছে!
- এমন সময় কণারকের মঠের সেই তান্ত্রিক সন্ন্যাসী ঘরের ভিতর ঢুকে বললেন, “কি হয়েছে, এখানে এত গোলমাল কেন?”— বলতে বলতে তাঁর চোখ হঠাৎ টেবিলের উপরে প'ড়ে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তারপর তিনি এগিয়ে গিয়ে টেবিলের উপর থেকে তামার বাঁশীটা তুলে নিয়ে সেটা গভীর ভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, “এটা এখানে কেমন ক'রে এল?”
আমি বললুম, “এটা চন্দ্রভাগা নদীর তীরে কুড়িয়ে পেয়েছি।”
সন্ন্যাসী ঘরের ভিত্তর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, “এ বাঁশীটাকে আমি সমুদ্রে বিসর্জন দিতে চললুম। এ হচ্ছে যাদুকরের অভিশপ্ত বাঁশী,— এ অমঙ্গলকে ডেকে আনে! ”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন