হেমেন্দ্রকুমার রায়
[এটি একটি আশ্চর্য সত্য ঘটনা। কাহিনী যিনি বলেছেন তাঁর নাম টি। ডব্লিউ। ড্রেসার - তিনি সওদাগরি জাহাজের বেতার বিভাগের পদস্থ কর্মচারী। ]
সে আজ পঁচিশ বছর আগের কথা।
নানা জাহাজে চাকরি নিয়ে নানা দেশে বারবার আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। তখন আমার বেপরোয়া উদ্দাম যৌবন। দুনিয়ায় অলৌকিক কোনওকিছু আছে শুনলে একেবারেই বিশ্বাস করতুম না। কিন্তু রামস্বামী আমার সেই বিশ্বাসের মূল আলগা করে দিয়েছে।
রামস্বামীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল বোম্বাই শহরে গিয়ে। বারংবার দেখা সাক্ষাতে আমাদের আলাপ বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। তখন তাকে দেখলে খুশি হতুম। কিন্তু এখন তার দেখা পাওয়া তো দূরের কথা, তাকে মনে পড়লেও আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। সেবার আমি এল্লারম্যান-উইলসন কোম্পানির ওথেলো জাহাজে চেপে বোম্বাই শহরে গিয়ে পৌঁছলুম। রামস্বামীও জাহাজে এসে উঠল। বন্দরে যে কোন জাহাজ এলেই সে তার উপর উঠতে ছাড়ত না। সে জহুরি - তার ব্যবসাই ছিল রত্ন বিকিকিনি। জাহাজে জাহাজে সে খরিদ্দার সন্ধান করত। -
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মানুষটি। মাথা ভরা ঘণকৃষ্ণ চুল। ফিটফাট সাদা ধবধবে পোশাক। তার কাছে সর্বদাই থাকত মোড়কে মোড়া বহুমূল্যের বা স্বল্পমূল্যের বিবিধ রত্ন বা প্রস্তর। এমন নাবিক ছিল না যে বোম্বাই শহরে গিয়েছে অথচ রামস্বামীর সঙ্গে চেনাশোনা হয়নি। সেদিন সকাল সাড়ে দশটা। সূর্যের নিষ্ঠুর কিরণে চারিদিক উত্তপ্ত। নিজের কাম্ররায় শুয়ে একখানা ডিটেকটিভ গল্পের বই পড়ছি এমন সময় দরজার ওপরে করাঘাত। বেরিয়ে দেখি, রামস্বামী। একমুখ হেসে বললে, "কিছু কিনবেন?" বলেই পকেট থেকে বের করে ফেলল গোটাকয়েক মোড়ক।
বললুম, "যা কেনার আগেই কিনেছি, আজ আর কিছু নয়।
"বেশ, তাই সই। তবে একটা অনুরোধ। একখানা কাগজ দিতে পারেন?
প্যাড থেকে একখানা কাগজ টেনে নিয়ে তাকে দিলুম। - আমার সামনে তিনটে মোড়ক রেখে দিয়ে একটা ময়লা ও কিছু-কিছু ছেঁড়া মোড়ক নিয়ে রামস্বামী আমার দেওয়া কাগজখানার ওপরে উপুড় করে ধরলে, ঝর - ঝর করে ঝরে পড়ল একরাশ টুকরো টুকরো হীরা - গুণতিতে শ-খানেকের কম নয় ! আমার দিকে পিছন ফিরে সে হীরাগুলো বেছে বেছে গুছিয়ে রাখতে লাগলো। আমি একটা মোড়ক কৌতুহলী হয়ে খুলে ফেললুম। ভিতরে রয়েছে তিনখানা চমৎকার উপলমণি (opal)। তার মধ্যে বিশেষ করে একখানা হচ্ছে যার-পর নাই অপূর্ব। উপলের তেমন বর্ণবৈচিত্র্য আর কখনো দেখিনি।
মনে এমন দুর্মতি জাগল যে কিছুতেই লোভ সামলাতে পারলুম না, সরিয়ে ফেললুম - জীবনে সেই আমার প্রথম এবং শেষ চুরি। উপলখানা কিছুই আন্দাজ করতে না পেরে রামস্বামী তার মালপত্র নিয়ে বিদায় গ্রহন করলে আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।
পরদিনেই আমাদের জাহাজ বোম্বাই ছাড়ল।
পর-পর সাত সপ্তাহ কেটে গেল সমুদ্রের ওপরেই। প্রতিদিনি মুগ্ধ চোখে উপলখানা দেখি আর নাড়াচাড়া করি। তারপর বিলাতে ফিরে উপলখানা মাকে উপহার দিলুম। মা সেখানা পদকের মত কণ্ঠদেশে ধারণ করলেন।
কিছুদিন পরেই রামস্বামীর কাছথেকে একখানা টেলিগ্রাম পেলুম। সে লিখেছে ঃ “সাহেব দয়া করে উপলখানা ডাকে ফেরত পাঠাও। নইলে তোমার অনিষ্ট হবে।“ মনে-মনে ভীত হয়েও দোষ মানলুম না। জবাবে জানালুম, “ উপল আমি পাইনি। এটা তোমার মনের ভুল।"
উত্তরে আর কোন তার এলনা দেখে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।
কিছুদিন পরে আমাদের জাহাজ আবার আলেকজান্দ্রিয়া,সুয়েজ হয়ে বোম্বাই বন্দরে গিয়ে নোঙর ফেললে। তার পরদিনেই যা ভয় করেছিলুম, তাই !
বেলা তখন দশটা। আমার কামরায় করাঘাত।
কম্পিত স্বরে বললুম, “ভেতরে এসো।"
রামস্বামী ঘরে ঢুকল। তার চেহারা দেখে আমার চমক লাগলো।
তার মাথার চুল উস্কোখুস্কো, তার পোশাক ময়লা। তার তামাটে ত্বকের ভিতরদিক থেকে ফুটে উঠেছে কেমন একটা ভয়াবহ পান্ডুবর্ণ, এবং তার চোখ দুটো বসে গিয়েছে ভেতরের দিকে।
সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলুম,” রামস্বামী, কি হয়েছে তোমার?”
আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সে বললে,” সাহেব দয়া করে উপলখানা ফিরিয়ে দিন। ওটা বিক্রীর জন্য নয়, ওটা আমার নিজস্ব জিনিস, ওটা না পেলে আমার মহা অমঙ্গল হবে, আর ওটা কাছে রাখলে তোমারও মঙ্গল হবে না।"
মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে প্রকাশ্যে বললুম,” রামস্বামী, উপলখানা আমার কাছে থাকলে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে ফিরিয়ে দিতুম।"
পরমুহূর্তেই রামস্বামী যেন পাগল হয়ে গেল। থরহরি কম্পমান দেহে, দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে সে নিজের ভাষায় চিৎকার করে কিসব বলতে লাগলো।
আমি আর সইতে পারলুম না, তাড়াতাড়ি নিজের কামরা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লুম, — কিন্তু রামস্বামী তবু আমার সঙ্গ ছাড়লো না, পিছু পিছু আসতে লাগল – কখনও বকতে- বকতে,কখনও চ্যাঁচাতে –চ্যাঁচাতে এবং কখনও মিনতি করতে করতে। তারপর অন্য একটা ঘরে ঢুকে আমি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলুম।
অনেকক্ষণ ভেবে চিনতে শেষটা স্থির করলুম, এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব, রামস্বামীর জিনিস তাকেই আবার ফিরিয়ে দেব।
সেইদিনই তার বাড়ির দিকে যাত্রা করলুম, কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনলুম বাড়ির ভিতরে কারা উচ্চস্বরে কাঁদছে।
পাশেই এক দরজির দোকান। জিজ্ঞাসা করলুম,” এখানে এওত কান্নাকাটি কিসের?” দরজি বললে,” রামস্বামী মারা পড়েছে।"
আমি বললুম,” অসম্ভব। রামস্বামী আজ চার ঘন্টা আগে আমার সঙ্গে দেখা করেছিল।" দরজি বললে,”কি যে বল সাহেব। রামস্বামী মারা গিয়েছে কাল,চব্বিশ ঘন্টা আগে।" আমার মনে উঠল ঝড় - বিস্ময়ের আতঙ্কে,অনুতাপের ঝড়! ,
যথাসময়ে দেশের বাড়িতে ফিরে দেখি,মায়ের গলায় উপলমণির পদকখানা নেই। জিজ্ঞাসা করে জানলুম, মা পদকখানা খুলে গহনার বাক্সে রেখে দিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুদিন থেকে সেখানে পাওয়া যাচ্ছে না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন