সূর্যদেবতার পুরোহিত

হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রিয় বিমলেন্দু,

তিনদিনের ঘোর বর্ষার পর আজ সন্ধ্যার পর থেকে চারদিকের আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা হয়ে এসেছে৷ মনে হচ্ছে, প্রায় শীতকাল৷ স্থির করেছি, আজ রাত দশটার পর ‘মমি’টাকে পরীক্ষা করব৷ যদি কৌতূহল চরিতার্থ করতে চাও, সেই সময়ে তুমি উপস্থিত থেকো৷

অবনীকেও খবর পাঠিয়েছি৷ ইতি—

সুরেশ্বর

৷৷ ক ৷৷

তখন সন্ধ্যা উতরে গেছে৷ তাড়াতাড়ি আহারাদি সেরে বিপুল উৎসাহে সুরেশ্বরের বাড়ির দিকে যাত্রা করলুম৷

প্রাচীন মিশর ও তার বিলুপ্ত সভ্যতা নিয়ে সুরেশ্বর বহুকাল থেকেই আলোচনা করে আসছে এবং এ সম্বন্ধে তার জ্ঞান ছিল অগাধ৷ মিশরে বসেই সে কাটিয়ে দিয়েছে কয়েকটা বৎসর৷ প্রাচীন মিশরের ‘হাইয়ারঅগ্লিপ’ বা চিত্রাক্ষরে লেখা পুঁথি পর্যন্ত সে অনায়াসেই পাঠ করতে পারত৷

গত মাসে মিশর থেকে ফেরবার সময়ে সুরেশ্বর বহু চেষ্টার পর একটি মমি সংগ্রহ করতে পেরেছিল৷ এতদিন কলকাতায় অতিরিক্ত গ্রীষ্মাধিক্যের জন্যে সে মমির আবরণ খুলতে পারেনি৷

মমি কী, তোমরা অনেকেই তা জানো৷ কলকাতার জাদুঘরেও একটি মমি রক্ষিত আছে৷ পঁয়ত্রিশ কী চল্লিশ বৎসর আগে তার অবস্থা ছিল বেশ ভালো৷ কিন্তু বাংলাদেশের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় এখন তার বিশেষ দুর্দশা হয়েছে৷

মমি হচ্ছে শুকনো মড়া৷ প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরেও মানুষের দেহকে রক্ষা করলে আত্মা আবার দেহের ভেতরে বাস করতে পারে৷ এইরকম সব সুরক্ষিত দেহ মিশরের নানাস্থানে সমাধিগৃহের মধ্যে পাওয়া যায়৷ যেসব দেহ কবরস্থ হয়েছিল হাজার হাজার বৎসর আগে৷ কেবল প্রাচীন মিশরে নয়, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ারও কোনো কোনো জায়গা থেকে রক্ষিত শব পাওয়া গিয়েছে৷

প্রাচীন মিশরে আগে মড়ার নাকের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্ক টেনে বার করে নেওয়া হত৷ তারপর পেটের পাশে ছ্যাঁদা করে বার করে নেওয়া হত নাড়িভুঁড়িগুলো৷ তারপর ক্ষুর চালিয়ে দেহটাকে কামিয়ে ও ধুয়ে ফেলা হত৷ অবশেষে ভেতরে নানা সুগন্ধ ঔষধ পুরে এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ার পর দেহটিকে ক্ষৌমবস্ত্রে জড়িয়ে কফিনের মধ্যে স্থাপন করা হত৷ একেই বলে মমি৷

যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে দেখি, প্রখর আলোকে সমুজ্জ্বল একটি ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে সুরেশ্বর ও অবনী এবং ঘরের ঠিক মাঝখানে লম্বা টেবিলের ওপরে রয়েছে একটি প্রকাণ্ড কাষ্ঠাধার৷ আন্দাজ করলুম, সেটি লম্বায় নয় ফুট, চওড়ায় তিন ফুট ও গভীরতায় আড়াই ফুটের কম হবে না৷

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সুরেশ্বর বললে, ‘দশটা বেজে তিন মিনিট৷ বিমল, আমরা তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলুম৷ এসো, এইবারে কাজ আরম্ভ করা যাক৷’

সে টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল৷ কাষ্ঠাধারটি সুদৃশ্য৷ তার গায়ে আঁকা রয়েছে রঙিন চিত্রাক্ষর ও শবযাত্রার ছবি প্রভৃতি৷ সুরেশ্বর ধীরে ধীরে কাষ্ঠাধারের ডালা তুললে এবং তারপর আমরা সকলে মিলে গুঁড়ো রজনের আবরণ সরিয়ে ভেতর থেকে একটি কফিন বার করে টেবিলের ওপরে স্থাপন করলুম৷ কফিনটি দেবদারু-কাঠ দিয়ে তৈরি৷

কিছুক্ষণ চেষ্টার পর যন্ত্রপাতির সাহায্যে কফিনেরও ডালা খুলে ফেলা হল৷ তারপর দেখা গেল বস্ত্রাবৃত দেহটাকে৷

সুরেশ্বর বললে, ‘তোমরা দুজনে দেহটাকে তুলে ধরো, আমি ওর গায়ে জড়ানো কাপড়টা খুলে নিই৷’

বাবা, মান্ধাতার আমলের শুকনো মড়া! খানিক ইতস্তত করে আমরা সুরেশ্বরের কথামতো কাজ করলুম৷

তারপর সে যেন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো ব্যাপার! মমির গায়ে কাপড়ের পাকের-পর-পাক! অবশেষে তাও খুলে ফেলা হল৷

একটা পুরুষের মমি৷ গায়ের রং লালচে, মুখ ও দেহের সর্বাঙ্গ অবিকৃত, চামড়া কঠিন ও মসৃণ৷ চোখ দুটি মোদা৷

সুরেশ্বর সানন্দে বললে, ‘এতটা আমি আশা করিনি! আমার ভাগ্য ভালো, এমন নিখুঁত মমি সহজে পাওয়া যায় না৷’

আমি বললুম, ‘কিন্তু এই শুকনো মড়াটাকে নিয়ে তোমার কী লাভ হবে? এ আর নড়বেও না, অতীতের গল্পও বলবে না৷’

অবনী বললে, ‘সুরেশ্বর, তোমার ইলেকট্রিক ব্যাটারিটা একবার নিয়ে এসো তো!’

‘কেন?’

‘এই দেহটার ওপরে প্রয়োগ করে দেখব৷’

‘আরে, এটা তো এখন মাটির পুতুলের শামিল! ইলেকট্রিক ব্যাটারি চালিয়ে কী লাভ হবে?’

‘তবু একবার দেখাই যাক না৷’

সুরেশ্বর ব্যাটারি নিয়ে এল৷ অবনী ব্যাটারির তারের একটা প্রান্ত মমির দেহের সঙ্গে সংলগ্ন করে চালিয়ে দিলে৷

দেহটা তেমনি আড়ষ্ট, কিন্তু—

ও কী ব্যাপার! এতক্ষণ মমির যে চোখ ছিল বোঁজা, এখন খুলে গিয়েছে তার পাতা!

এ যে অপ্রত্যাশিত, অপার্থিব দৃশ্য! অবনী তো মাটির ওপরে টপ করে বসে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে চটপট টেবিলের তলায় ঢুকে গেল৷ আমিও আঁতকে উঠে তাড়াতাড়ি পিছিয়ে পড়লুম৷

সুরেশ্বর হেসে উঠে বললে, ‘মাভৈঃ! তোমরা মিছে ভয় পাও কেন? যা দেখলে তা বৈদ্যুতিক শক্তির ক্রিয়া! অবশ্য, আমিও প্রথমটায় একটু চমকে গিয়েছিলুম, কারণ এতকালের পুরোনো একটা শুকনো মড়ার ওপরে বিদ্যুৎপ্রবাহ যে কোনো কাজ করবে, এ কথা আমি ভাবতে পারিনি৷’

আশ্বস্ত হয়ে আমি এগিয়ে এলুম৷ অবনীও টেবিলের তলা থেকে আত্মপ্রকাশ করল৷

সুরেশ্বর বললে, ‘আর একবার ব্যাটারি চালিয়ে দেখা যাক আবার কী কাণ্ড হয়৷’ বলতে বলতে ব্যাটারি চালিয়ে দিলে৷

অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে মমি তার ডান পা-খানা নিজের পেটের কাছ পর্যন্ত গুটিয়ে নিলে এবং পরমুহূর্তেই সুরেশ্বরের বুকের ওপরে এমন প্রকাণ্ড পদাঘাত করলে যে, সে ছিটকে পাঁচ হাত তফাতে গিয়ে ভূতলশায়ী হল৷

আমরা আবার নিরাপদ ব্যবধানে সরে যেতে দেরি করলুম না৷

সুরেশ্বর উঠে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বললে, ‘কাঠের আধারে চিত্রাক্ষরে লেখা তারিখ আমি পড়ে দেখেছি৷ এই মমিটাকে কবর দেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার বছর আগে৷ কিন্তু আজ সে মরে গিয়েও আমাকে পদাঘাত করতে ছাড়লে না!’

কিন্তু এবারে যা হল তা একেবারেই স্বপ্নাতীত!

মমি বিকট হেঁড়ে গলায় বিজাতীয় ভাষায় কথা কয়ে উঠল! পরে প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় অভিজ্ঞ সুরেশ্বরের মুখে শুনেছিলুম মমি বলেছিল, ‘নির্বোধ! আমার মৃত্যু হয়নি!’

শিউরে উঠে আমার সর্বাঙ্গ হিম হয়ে গেল৷ আর তো ইলেকট্রিক ব্যাটারির দোহাই দেওয়া চলে না! বিদ্যুতের যতই মহিমা থাক, মড়ার মুখে কোনোদিনই সে ভাষা দিতে পারবে না৷

এবারে সুরেশ্বরও স্তব্ধ ও স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে রইল৷ তার মুখ দেখলে মনে হয়, নিজের কানকেও সে বিশ্বাস করতে পারছে না৷

সভয়ে দেখলুম, প্রবল শ্বাসপ্রশ্বাসে উঠছে আর নামছে মমির বক্ষদেশ!

সুরেশ্বর অভিভূত কণ্ঠে মিশরীয় ভাষায় বললে, ‘তুমি মৃত নও!’

ক্রুদ্ধ, কর্কশকণ্ঠে মমি বলল, ‘না, না! আমি জীবিত! আত্মা হচ্ছে অমর৷ এই দেহের ভেতরেই আমি বিরাজ করি৷’

‘কে তুমি?’

‘আমি রাজপুরোহিত উর-নিনা, সূর্যদেবতারা আমার প্রভু৷’

বাধো-বাধো গলায় সুরেশ্বর বললে, ‘পাঁচ হাজার বৎসর পরে তোমার দেহকে আবার আমরা জাগিয়ে তুলেছি৷ এজন্যে কি কৃতজ্ঞ নও?’

হুংকার দিয়ে মমি বলে উঠল, ‘কৃতজ্ঞ! তোদের অপবিত্র হাতের ছোঁয়ায় আমার দেহ কলঙ্কিত হয়েছে৷ এইবারে আমি তোদের শাস্তি দেব!’

আমরা পায়ে পায়ে দরজার দিকে অগ্রসর হতে হতে দেখলুম, আচম্বিতে মমির দেহটা টেবিলের ওপরে সিধে হয়ে উঠে বসল এবং তারপর শুনলুম অমানুষিক কণ্ঠে ঘর-ফাটানো চিৎকার—‘ক্ষুধা! ক্ষুধা! পাঁচ হাজার বছরের ক্ষুধার জ্বালায় আমি ছটফট করে মরছি! দে রে-দে রে—খেতে দেরে, খেতে দে!—হা হা হা হা হা হা!’

দারুণ আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে আমরা প্রাণপণ বেগে ঘরের ভেতর থেকে পলায়ন করলুম৷

সে রাত্রে সুরেশ্বর আমার সঙ্গেই বাস করলে৷

পরদিন প্রভাতে বহু লোকজন নিয়ে আমরা আবার সুরেশ্বরের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলুম ভয়ে ভয়ে৷

কিন্তু কেউ কোথাও নেই৷ ঘরের ভেতরে পড়ে রয়েছে কেবল চিত্র-বিচিত্র কাষ্ঠাধার, রাশিকৃত ক্ষৌমবস্ত্র ও শূন্য কফিনটা৷

……………………………….

* এডগার অ্যালান পো অবলম্বনে৷

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%