সর্বনাশা নীলা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক

প্রথম দৃশ্যের যবনিকা অন্তরাল ভেদ করে সন্ধ্যার অন্ধকারে যেটুকু দৃশ্যপট ভেসে উঠতে দেখা গেল, তাতে কোনও আনন্দমুখর উৎসাহ-দীপ্তির বিদ্যুৎ-বিচ্ছুরণ নেই, কোনও ভয়াবহ বিভীষিকার নির্মম নগ্ন পদক্ষেপও বুঝি চোখে পড়ে না, কেবল একটা সন্দিগ্ধ আশঙ্কার ছায়া-সঞ্চরণ অনুভব করা যায়। কিন্তু কানে শোনা যায় না, চোখে দেখা যায় না কিছু। বহু সংশয়িত একটা গূঢ় জিজ্ঞাসা যেন অশরীরী প্রেতের মতো অস্পষ্ট রহস্যের অন্ধকার গবাক্ষদ্বারে বারে বারে অলক্ষে হানা দিয়ে চলে যায়, আর আকাশ বাতাস অন্ধকার যেন কোনও নিগূঢ় চাপা আতঙ্কে অন্তরের অন্তস্থলে থেকে থেকে শিউরে ওঠে!

মহানগরী কলকাতার উত্তর অঞ্চলের ওই যে স্বল্প-আলোকিত অন্ধগলি, বাইরের পৃথিবী অজস্র তরঙ্গভঙ্গে উদ্দাম স্রোতবেগে বয়ে চলেছে, কিন্তু এখানে এসে আছড়ে পড়ে ব্যাহত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয় ব্লাইন্ড লেনে—সামান্য একটু আবর্ত সৃষ্টি করে। এই অন্ধগলিতে জনশব্দশূন্য একখানা বিরাট পুরোনো বাড়ি, ছোট্ট কপাটওয়ালা দরজাটা খুললেই মনে হয় কোনও বুভুক্ষু বিবর বুঝি লোলুপ জিঘাংসায় হাঁ করে সব কিছু আকর্ষণ করতে চায়। নিচের নিস্তব্ধ স্যাঁতসেঁতে ঘরের জমাটবাঁধা অন্ধকার যেন পাতালপুরীর দুর্গম সুড়ঙ্গ পথের নির্দেশ দেয়। কোলাহলমুখর সন্ধ্যার কলকাতা এই অন্ধগলিতে ওই বোবা দরজাটার চৌকাঠে যেন হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়িয়ে পড়ে মরে গিয়েছে।

বাড়িখানা দোতলা, নিচের ঘরে কেউ থাকে না; উপরেও যদিবা কেউ থাকে তাকে বাইরে থেকে দেখা যায় না। দোতলায় ভিতর দিকের কোনও একখানা সুসজ্জিত হলঘর। ঘরটা অন্ধকার, একটা দেওয়াল ঘড়ির একঘেয়ে টক-টক শব্দ অশ্রান্ত কালপ্রবাহের সূচনা দিচ্ছে মাত্র। এই সমূহ মূর্ছাহত আবেষ্টনীর মধ্যেও কোথায় যেন এখনও প্রাণ আছে, ওই টক-টক একখানা শব্দ যেন তারই বিমূঢ় স্পন্দন। ঘরের প্রতিটি টেবিল চেয়ারে, আয়না আলমারিতে, ড্রয়ার দেরাজে, সমস্ত আসবাবপত্রে কত জটিল ষড়যন্ত্র কুটিল চক্রান্ত অসংখ্য গুপ্তনাগিনীর মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে রয়েছে—হাতলে-পায়ায় রন্ধ্রে-রন্ধ্রে পরতে-পরতে! কত গূঢ় অভিসন্ধি ক্রূর সংকল্পে বজ্রমুষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে চাপা আক্রোশে উৎক্ষিপ্ত হয়েছে, ঘরের নির্বাক কড়ি-বরগা জানালা দেওয়াল ভিন্ন কেউ তার সাক্ষ্য বহন করে না।

ঘরখানা অন্ধকার, পিচের মতো ভারী অন্ধকার। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ যেন শোনা যাচ্ছে। মানুষ তো? তবে কি অন্ধকার নিশ্বাস ফেলে? না, আর কিছু? মেঝের উপর একটু খস করে জুতোর সংঘর্ষ হল। আচম্বিতে সুইচ টেপার শব্দের সঙ্গেই বিজলি আলো সমস্ত ঘরটাকে যেন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মূর্ছা ভেঙে দিল। চোখ মেলতেই দেখা গেল উৎকণ্ঠিত চিন্তায় ভূ-যুগল সঙ্কুচিত করে একটা লোক দেওয়ালে ঘড়ির দিকে তাকাল। এবং দৃঢ় নিবদ্ধ চিবুকের মধ্যে থেকে চাপা নিশ্বাসে একটা গম্ভীর ‘হুঁ’ শব্দ করে রেডিওর চাবিটার দিকে হাত বাড়াল। বোবা বাড়িটা চমকে উঠে রেডিওর কথায় মুখর হয়ে উঠল। একমাত্র শ্রোতা—স্বনামধন্য পান্নালাল, নিজের চিন্তা থেকে রেডিওর অভিনয়ে মন নিবিষ্ট করবার চেষ্টা করছে। রেডিওর পালায় শ্রীরাধিকার সঙ্গে কথা কইছে চন্দ্রাবলী

রাধিকা

শোনো শোনো চন্দ্রাবলী ——— তন্দ্রামাখা কুন্দকলি,

বৃন্দাবন-চন্দ্ৰ আজি নাই বৃন্দাবনে,

মন্দবায়ু গন্ধহারা, ——— কোকিল যে ছন্দহারা

নিরানন্দ ঘন মেঘ ঢাকে চন্দ্রাননে।

চন্দ্রাবলী

কেষ্ট ভারি দুষ্ট সুজন কষ্ট দিয়ে হাসে

তারে ভালবাসবে যে সে চোখের জলে ভাসে।

শ্রীরাধিকার হাহাকার আর চন্দ্রাবলীর সান্ত্বনা রেডিওতে বেজে চলেছে, –শ্রোতা পান্নালালের কানে যেন তা প্রবেশ করছে না। তার মুখে উদ্বিগ্নতার ছায়া! কোনও বন্য চিন্তা ঝোড়ো পাখার ঝাপটা মেরে মেরে যাচ্ছে তার মনে। সে উৎকীর্ণ হয়ে আছে, তবু রেডিওর পালা তাকে যেন ঠিক আকর্ষণ করছে না। রেডিও চলছেই

.

রাধিকা

মথুরায় কত মধু ——— পেয়েছে জানি না, শুধু

বিধুর হৃদয়ে করি বৃথা হাহাকার।

এত জপি শ্যাম নাম ——— তবু মোরে বিধি বাম,

রাধা রাধা বলে বাঁশি সাধে নাকো আর !

চন্দ্রাবলী

ভেবো না ছার বাঁশির কথা, কী আছে তার মূল্য?

এবার থেকে বাজবে বেসুর যখন তোমায় ভুললো !

.

উত্তেজিত পান্নালাল উঠে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল—অধৈর্য ত্রস্ত! বন্ধ জানালার খড়খড়ি খুলে বাইরে একবার অস্থির ঔৎসুক্যে কী নিরীক্ষণ করল। আবার গিয়ে বসে পড়ল। পাশে রেডিওতে তেমনই শোনা যাচ্ছে :

.

রাধিকা

আর তো যমুনা কূলে ——— জলকে যাব না ভুলে,

কলসি ভাসায়ে দেবো, নেই যে কানাই!

ঘন ঘোর বরষায় ——— বায়ু করে হায় হায়,

মোর আঁখিবারি-কথা কাহারে জানাই?

চন্দ্রাবলী

ছাড়াছাড়ি হল যখন আজ থেকে দাও আড়ি,

রাত বারোটা বাজলো, বোধ হয়, যাই চলো ভাই বাড়ি।

রাধিকা

দুটি আঁখি, দুটি নীলা...........

.

অতিষ্ঠ ও বিরক্তভাবে পান্নালাল ঘট করে রেডিওটা বন্ধ করে দিল। আপন মনেই বলল

–ধ্যেৎ, রাধার সেকেলে কান্না আর ভালো লাগে না! কিন্তু শেষ কথা দুটি ভালো লাগল। দুটি আঁখি—দুটি নীলা!' হ্যাঁ, নীলা—নীলা! তবে দুটি নীলা বড়ো বাড়াবাড়ি, একটিমাত্র নীলা পেলেই আমি বেঁচে যাই!—শুধু একটি—একটি মাত্র নীলা?'

বলতে বলতে পান্নালাল কেমন যেন বিমর্ষ বিহ্বল হয়ে যায়। কোনও সুদূর দুর্গম বিভীষিকার মধ্যে যেন তার উৎকণ্ঠিত কল্পনা অভিযান করে।.....বাইরে থেকে দরজায় মৃদু করাঘাত হল। শিকারি বিড়ালের মতো সে সতর্ক-তৎপর হয়ে ওঠে, চোখ দুটো তার দপ দপ করে করে জ্বলছে। আর একবার দরজায় শব্দ হতেই আত্মস্থ কণ্ঠে প্রশ্ন করে পান্নালাল কে?’

আগন্তুকের উত্তর শোনা যায় ‘আমি শোহনলাল হে! পান্নালাল স্বাভাবিক হয়ে বলল ‘ভিতরে এসো।'

ভিতরে প্রবেশ করল শোহনলাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পান্নালালের মুখে চেয়ে যেন কিছু পাঠোদ্ধার করবার চেষ্টা করল, পরমুহূর্তেই জিজ্ঞাসা করল 'আমায় ডেকেছ?” পান্নালাল ‘হ্যাঁ। বসো। কথা আছে।’

শোহনলাল ‘তোমার মুখে ভাবনার রেখা কেন?”

উৎকণ্ঠিত পান্নালাল একবার ঘড়ির দিকে তাকাল, চিন্তিত স্বরে বলল

—রাত নটা বাজছে। চুনিলাল আর হিরালাল এখনও এসে পড়ল না! একটা জরুরি কাজে তাদের কলকাতার বাইরে পাঠিয়েছি। ট্রেনের সময় তো অনেকক্ষণ হয়ে গেছে!' শোহনলাল ‘তোমার জরুরি কাজ মানেই তো বিপদের কাজ! হয়ত তারা কোনও বিপদে পড়েছে।'

পান্নালাল ‘বিপদ? হুঁ, অসম্ভব নয়! কিন্তু তাদের বিপদে যে আমারও বিপদ!' শোহনলালের কাছে কথাগুলো দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। সে সরাসরি বলে

— “দ্যাখো পান্নালাল, ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। আগে সব কথা খুলে বলো দেখি।' পান্নালাল শোহনলালের মুখে তার প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কী চিন্তা করে, পরমুহূর্তেই কল্পনায় রহস্যময় ব্যাপারটার সমস্তটুকু পর্যালোচনা করে নেয়। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায়, কোনও দুর্ধর্ষ দুঃসাহসিকতার মধ্যে নিজেকে হয়ত হারিয়ে ফেলে। তারপর গম্ভীর বিজ্ঞতায় ঠোটের বিস্ফোরণে আর চোখের সঙ্কোচনে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে পান্নালাল স্থির মনস্থ কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলে

—‘আচ্ছা, খুব সংক্ষেপেই বলছি শোনো।... সাঁওতাল পরগণার এক পাহাড়ে, গুহার মধ্যে অদ্ভুত এক দেবতা আছে। সাঁওতালিরা অনেক ভূতকে পূজা দেয়। এ দেবতাটিও হচ্ছে একটি ভূত। যে সে ভূত নয়, দস্তুরমত দুষ্টু ভূত। রং করা কাঠে গড়া বারো ফুট উঁচু সেই মূর্তি, তার বীভৎস মুখের দিকে তাকালেই বুকের রক্ত ভয়ে একেবারে জমাট বেঁধে হিম হয়ে যায়। মূর্তিটা তুচ্ছ কাঠে গড়া বটে, কিন্তু তার গলার মালায় আছে একখানা আশ্চর্য নীলা, ওজনে নাকি দেড়শো ক্যারেট!”

শোহনলালের চোখ দুটো যেন শামুকের চোখের মতো ঠেলে উপর দিকে খাড়া হয়ে উঠে! অত্যন্ত উত্তেজিত ভাবে বিস্ময় বিস্ফোরণ করে

—‘দে-ড়-শো-ও ক্যারেট! বল কী হে?...ফরাসি গভর্নমেন্ট একবার বাংলাদেশ থেকে একখানা একশো ক্যারেটের নীলা কিনেছিল, তারই দাম যে এক লক্ষ দু হাজার টাকা!

পান্নালাল ‘তাহলে এ নীলাখানার দাম কত হবে আন্দাজ করে দ্যাখো!” শোহনলাল ‘গরিব সাঁওতালিরা এত দামি নীলা কোত্থেকে পেলে?'

পান্নালাল ‘তা কেউ জানে না। ওই ভূত দেবতাটি হচ্ছে অতি প্রাচীন ভূত—বয়স তার তিনশো বছর হবে। সাঁওতালিদের বিশ্বাস, তাদের দেবতা ওই নীলা নিয়ে পরলোক থেকে ইহলোকে অবতীর্ণ হয়েছে। অবশ্য নীলাখানার কথা তারা কারুর কাছে প্রকাশ করে না, দৈবগতিকে আমি জানতে পেরেছি।'

শোহনলাল ‘বুঝেছি। রতনেই রতন চেনে!—জানতে পেরেই নীলাখানা চুরি করবার জন্যে চুনিলাল আর হিরালালকে পাঠিয়ে দিয়েছ?'

কৃতবিদ্য পান্নালাল ঈষৎ আত্মপ্রসাদের হাসির সঙ্গে বলে

—হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিকই ধরেছ। ওদেরই পাঠিয়েছি, এ সব কাজে ওরা দুজন কী রকম ওস্তাদ, জানো তো?'

পান্নালালের কথার পিঠে পিঠে তৎক্ষণাৎ শোহনলাল কথা কয়ে ওঠে। তোষামোদের আকারে যেন একটু শ্লেষ মিশিয়েই সে বলে

—হ্যাঁ, হ্যাঁ তা আর জানিনে? জানি বৈকি, তারাই তো তোমার ডান হাত, বাঁ হাত তাদের দৌলতেই তো কলকাতার পথে পথে তোমার চার চারখানা মোটর ছুটোছুটি করে, আর তোমার দরজায় মোসাহেবের ভিড় হয়!'

ঘাড় নাড়তে নাড়তে পান্নালাল সংশোধন করে

—তোমার কথা ঠিক হল না শোহনলাল! তারা আমার সৈন্য, আমি তাদের সেনাপতি। বুদ্ধি জোগাই আমি!'

কথাবার্তা ব্যক্তিগত বিষয়ে সংক্রামিত যাতে না হয়, শোহনলাল সেদিকে সতর্ক। নীলার কৌতূহলে আগের কথায় ফিরে এসে সে বলে

—সে কথা সত্য। কিন্তু পান্নালাল, এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে চুনিলাল আর হিরালাল সে নীলাখানা চুরি করবে কেমন করে? সাঁওতালিরা অমন বহুমূল্য রত্ন তো অরক্ষিত অবস্থায় পথে ফেলে রাখবে না!’

পান্নালাল শোহনের আশঙ্কা দূর করে দিয়ে বলল

—হ্যাঁ শোহনলাল, নীলাখানা বেওয়ারিশ মালের মতো প্রায় অরক্ষিত অবস্থাতেই আছে। সাঁওতালিদেরও ভিতরে হয়ত লোভী লোকের অভাব নেই, কিন্তু ওই ভুতুড়ে দেবতাকে তারা ভয় করে যমের মতো। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, যে ওই নীলা চুরি করবে তার সর্বনাশ হবে!'

শোহনলালের অনুসন্ধিৎসা বেড়ে যায়। প্রশ্ন করে

—এমন বিশ্বাসের কারণ?’

পান্নালাল চেয়ারে গা এলিয়ে বসেছিল, সোজা হয়ে উঠে উৎসাহ ভরে বলল

—তবে শোনো। অনেক কাল আগে নাকি একজন লোভী সাঁওতালি ওই নীলাখানা চুরি করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। তার পরের দিনই ভুতুড়ে দেবতার মূর্তিও অদৃশ্য হয়। কিন্তু দুদিন পরেই সকলে অবাক হয়ে দেখলে, তাদের দেবতা আবার নিজের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে আছে, তার গলার মালায় ঝুলছে সেই নীলা, আর নীলার নীল গায়ে রক্তের রাঙা দাগ!

শোহনলাল শিউরে ওঠে, তবু অবিশ্বাসের স্বরে প্রশ্ন করে

—‘রক্তের দাগ? তার মানে?”

পান্নালাল ‘তার মানে, দেবতা নাকি স্বশরীরে গিয়ে চোরকে বধ করে হারানো রতন নিয়ে ফের ফিরে এসেছিলেন।'

শোহনলাল অবিশ্বাসপূর্ণ তাচ্ছিল্যে ব্যাপারটা উড়িয়ে দেয়

—'যত সব গাঁজাখুরি গল্প!'

পান্নালাল দ্বিগুণ উদ্যমে যেন শোহনের বিশ্বাস উৎপাদনের চেষ্টা করে। আবার বলে —'শোনো, আরও একটা গল্প আছে, যদিও তাতে গাঁজার গন্ধ বেশি নেই। আর একবার রাতে আর একটা চোর গুহার ভিতরে ঢুকেছিল। কিন্তু গুহার ছাদ থেকে মস্ত একখানা পাথর খসে তার মাথায় পড়ে। সকালে সবাই গিয়ে দেখে, চোরের মাথাটা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে, আর তার হাতে রয়েছে সেই সর্বনেশে নীলা! সাঁওতালিদের মত হচ্ছে, দেবতাই পাথর ছুড়ে তার দফারফা করে দিয়েছিলেন।'

এই ধরনের গল্পে শোহনলালের বিরক্তি একেবারে উগ্র হয়ে ওঠে। অবিশ্বাস্য বক্তব্য থেকে সে বক্তার উপরই যেন বিশ্বাস হারায়। প্রশ্নছলে তীক্ষ্ণ ইঙ্গিতটা নিক্ষেপই করে শোহনলাল

—এসব রূপকথায় তুমি বিশ্বাস করো?”

শাণিত হাসির বিদ্যুৎ স্ফুরণে পান্নালাল বিনাবাক্যেই যেন এই বক্রোক্তির জবাব দেয়। ক্ষণপরে অবিচলিতভাবে বলে পান্নালাল

—আমি করি না, তবে সাঁওতালিরা করে। কোনও চোরই তাই আর ওমুখো হয় না। রাত্রে গুহার মুখে পাহারা দেয় সাঁওতালি এক পুরুত—একেবারে একলা। চুনিলাল আর হিরালাল অনায়াসেই তার চোখে ধুলো দিতে পারবে।'

এতক্ষণে নীলার প্রসঙ্গে একরকম নিরুৎসাহ প্রকাশ করেই শোহনলাল যেন অন্য কাজের কথায় তৎপর হয়ে উঠে বলে

—হুঁ, সব তো বুঝলুম। কিন্তু তুমি হঠাৎ আমাকে স্মরণ করেছ কেন? পান্নালাল ‘তুমি একে জহুরি, তার উপরে চোরাই মাল বিক্রি করতে ওস্তাদ। তুমি ছাড়া যে আমার গতি নেই।'

ওস্তাদ ব্যবসাদার শোহনলাল, বাজপাখির মতো কোনও সুযোগই সে হারাতে দেয় না,—প্রখর তৎপরতায় যেন পান্নালালের প্রস্তাবে একটা ছোঁ মেরে প্রশ্ন করে ‘ধরো, নীলাখানা যদি আমি দেড় লাখ টাকায় বেচে দিতে পারি, তাহলে আমার কী পাওনা হবে?'

পান্নালাল ‘দশ পারসেন্ট। '

শোহনলাল : ‘মোটে পনেরো হাজার টাকা? –উঁহু, তা হয় না। এসব কাজে পদে পদে বিপদ। আমি পঁচিশ হাজার টাকা চাই।'

পান্নালাল ‘শোহনলাল, সেসব কথা যথাসময়ে হবে। গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল দাও কেন? আগে চুনিলাল আর হিরালালকে আসতে দাও।'

শোহনলালের লাভ করার লোভ তার ব্যবসাদারী সতর্কতাকেও ছাড়িয়ে গেছে,— হুঁশিয়ার পান্নালালের কাছে তা উলঙ্গ নির্লজ্জতায় প্রকাশ হয়ে পড়লেও পান্নালালের ভর্ৎসনায় সে লজ্জা বোধ করে না বরং সপ্রতিভাবে যেন পান্নালালের নীলা প্রাপ্তির সম্ভাবনাকেই অভিসম্পাত করে জানায়

—'কিন্তু তারা কি আর আসবে?–হয় তারা নীলা নিয়ে উধাও হয়েছে, নয় কোনও বিপদে পড়েছেই পড়েছে।'

ঈষৎ উৎকর্ণ হয়েই হঠাৎ পান্নালাল উল্লাসভরে বলে ওঠে

—হুররা! তোমার দুটো অনুমানের একটাও সত্যি নয়! সিঁাঁড়ির উপর আমি হিরালালের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি! —জয় মা কালী।’

অতি দ্রুত পায়ের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে!—ধনুকের ছেঁড়া ছিলার মতো পান্নালাল চেয়ার থেকে উৎক্ষিপ্ত হয়ে দরজার দিকে যেন ছিটকে এল। বাইরে থেকে দড়াম করে ঘরের দরজা খুলে গেল। ঝড়ের ঝাপটার মতো আছড়ে পড়ল হিরালাল ঘরের মধ্যে—পান্নালালের পায়ের কাছে। পান্নালাল ও শোহনলাল তাকে ধরে তুলতে গেল। ভয়ার্ত বিস্ফারিত চোখ দুটো কপালে তুলে কোনওরকমে উচ্চারণ করে হিরালাল

—‘পান্নাবাবু!—পান্নাবাবু!—জ—ল!'

সংজ্ঞাহীন হিরালাল অসাড় নিস্পন্দ হয়ে ভারী পাথরের মতো ওদের হাত থেকে নিচে স্খলিত হয়ে পড়ল। শোহনলাল জল আনতে ছুটল।—মুহূর্তের অবকাশ! ক্রূর বিদ্যুৎ ভঙ্গিতে পান্নালাল হিরালালের হাতের মুঠো ও জামার পকেটগুলো সতর্ক ক্ষিপ্রতায় হাতড়ে দেখল। শোহনলাল জল এনে চোখে মুখে দিতে লাগল। পান্নালাল সহজভাবেই বলে

—'সেনস নেই! চলো, একে ধরাধরি করে শোবার ঘরে বিছানার উপর নিয়ে চলি। মাথার কাছে টেবিল ফ্যানটা চালিয়ে দাও।—ওর জ্ঞান না ফিরলে তো কিছুই বুঝতে পারছিনে, কী হয়েছে আর কী-ই বা হতে চলেছে। তবে ইতিমধ্যে যদি—

এই বলতে বলতেই পান্নালাল তাড়াতাড়ি সামনের দরজাটা বন্ধ করে চাবি ঘুরিয়ে দিলে। তারপরে ত্রস্ত পায়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে দুটো রিভলবার বের করে কার্টিজগুলো একবার ঘুরিয়ে দেখে নিল এবং কোমরের দুই ধারে দুটোকে গুঁজে নিয়ে শোহনলালের সঙ্গে মিলে হিরালালকে ধরাধরি করে শোবার ঘরের দিকে অগ্রসর হল।

দুই

দ্বিতীয় দৃশ্যের ঘূর্ণাবর্তে ঘটনাস্রোত দুর্বার বেগে এসে জমা হচ্ছে, তার ভয়াল তরঙ্গের পুচ্ছে পুচ্ছে মরণের উন্মত্ত তাড়না, মানুষের লোভোন্মত্ত জীবনকে যেন নিষ্ঠুর টানে কোনও অন্ধ অতলে তলিয়ে নিতে চায়! আশঙ্কার ছায়ারা বুঝি আতঙ্কের কায়ারূপে মূর্ত হয়ে হো- হো-হো করে হেসে উঠছে—তাদের পৈশাচিক হাসি। ভয়াবহ বিভীষিকার নির্মম নগ্ন অমোঘ পদক্ষেপে মানুষের শত আশা-আকাঙক্ষার ক্ষীণ প্রাণ বুঝি দলিত মথিত হয়ে যায়। কোন শক্তি এর প্রতিরোধ করবে? এ যে সর্বনাশী নীলার সর্বগ্রাসী ক্ষুধা।

শোবার ঘরখানি অপেক্ষাকৃত ছোটো। বিছানায় পড়ে রয়েছে হিরালাল—আতঙ্ক আচ্ছন্ন জ্ঞানহীন। বনবন করে তার শিয়রে ঘুরছে ইলেকট্রিক ফ্যান। হিরালালের চেতনার প্রতীক্ষায় তার দুই পাশে দুই চেয়ারে বসে রয়েছে নির্বাক পান্নালাল ও শোহনলাল—মুখে চোখে তাদের একই উদ্বেগের কালো ছায়া।

অবশেষে হিরালাল চোখ মেলে চাইল—দৃষ্টিহীন শূন্য চাহনি। কোনও অদৃশ্য আতঙ্কের ভ্যাম্পায়ার যেন শরীরের সমস্ত রক্তটুকু শুষে নিয়ে তাকে একেবারে শুকনো ফ্যাকাশে করে ফেলে গেছে। তার সম্পূর্ণ চেতনা ফিরতেই সে আবার অস্থির হয়ে ওঠে—কোনও করাল নিয়তি তাকে যেন আবার অনুসরণ করেছে—পলায়নে পঙ্গু সে, অসহায়ভাবে ঘন ঘন হাঁপাতে লাগল। নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থান সে একবার দেখে নিল এবং একটু আশ্বস্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতেই বলে উঠল ' পান্নাবাবু! '

পান্নালাল: ‘কী ব্যাপার হীরালাল? আবার অত হাঁপাচ্ছ কেন?'

হিরালাল: ‘ওঃ, অনেক কষ্টে পালিয়ে এসেছি—ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছি!'

পান্নালাল: ‘সে কী?

হিরালাল: 'হ্যাঁ। আমি আসবার আগেই কলকাতার পুলিশ চুরির খবর পেয়েছে। নিশ্চয় ওখানকার পুলিশ তাকে খবর পাঠিয়েছে। হাওড়ায় তারা আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। কী করে যে তাদের ফাঁকি দিয়েছি, তা আর বলবার নয়।...ও, আগে এক গেলাস জল !

পান্নালাল নিজেই তাড়াতাড়ি জল এনে তার মুখের কাছে ধরে বললে 'এই নাও ’ জল গেলাসটা এক নিশ্বাসে পান করে হিরালাল আবার যেন প্রাণ ফিরে পেল। গভীর তৃপ্তির উচ্ছ্বাস তার মুখ দিয়ে আপনিই যেন বেরিয়ে আসে

—আঃ, বাঁচলুম! যা তেষ্টা পেয়েছিল।'

পান্নালাল যথেষ্ট অপেক্ষা করেছে! হিরালালের জামার পকেটে নীলা নেই সে দেখেছে। তবে কি নীলা চুনিলালের কাছে? কিন্তু চুনিলালও তো আসেনি। আসল সংবাদ এখনও সবই রহস্যময়। হিরালাল জল পান করে বিছানার উপর উঠে বসল। তার সুস্থতা লক্ষ করে পরের প্রশ্নেই জিজ্ঞাসা করে পান্নালাল

—তাহলে নীলাখানা পেয়েছ? কই সে নীলা আমায় দেখাও তাকে দেখবার জন্যে আমি ব্যাকুল হয়ে আছি।'

কথা বলতে বলতে অধীর আগ্রহে পান্নালাল তার হাতখানা বাড়িয়ে দেয়। হিরালাল তার অধৈর্য ও অশোভন লোভ লক্ষ করে। পান্নালাল-এর প্রতি একটা উৎকট ঘৃণা তার অন্তঃস্থল থেকে উদগারিত হয়ে আসে। সে নির্বাক দৃষ্টিতে পান্নালালের দিকে তাকিয়ে থাকে। পান্নালাল কী ভেবে হাতখানা সরিয়ে নিয়ে বলে

—তবে কি নীলাখানা চুনিলালের কাছে আছে? চুনিলাল কোথায়?’

কঠিন স্বরে হা-হা করে হেসে ওঠে হিরালাল,—নির্বিকার ভাবেই উত্তর দেয়: —চুনিলাল এখন কোথায় আছে জানি না!’

বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো লাফিয়ে উঠে পান্নালাল বলে

—জানো না!'

হিরালাল: ‘না পান্নাবাবু। স্বর্গের দরজা তো সে খোলা পাবে না, হয়ত এতক্ষণে সে নরকের দিকে যাত্রা করেছে।'

ক্রুদ্ধস্বরে পান্নালাল তার অধৈর্য প্রকাশ করে

— “হিরালাল, আমি হেঁয়ালি ভালোবাসি না। আগে আমি জানতে চাই, নীলাখানা পেয়েছ কিনা?”

হিরালাল: ‘পেয়েছি—পেয়েছি পান্নাবাবু।'

আশ্বস্ত হয়ে পান্নালাল যেন অনুমতি দেয় ‘তাহলে এইবারে সব খুলে বলো।' হিরালাল : ‘শুনুন তবে। কাল অমাবস্যার রাত গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে গা ঢেকে আমরা দুজনে গুহার দরজার কাছে গেলুম। চারিদিক একেবারে নিঝুম—গাছের পাতারা পর্যন্ত নিঃসাড়। তারই মধ্যে শোনা যাচ্ছে কেবল গুহার দরজায় সাঁওতালি পুরুতের নাক ডাকার আওয়াজ। চুনিলাল এক লাফে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুরুত-এর গলা টিপে ধরে এ জন্মের মতো তার নাক ডাকা বন্ধ করে দিল।...তারপর দুজনে গুহার ভিতর ঢুকলুম। ঘুটঘুটে অন্ধকার গুহা। ঢুকেই কেন জানি না, আমাদের গা ছমছম করতে লাগল! চুনিলাল তো এগুতেই চায় না, আমার গুঁতো খেয়ে তবে এগুলো! কিন্তু—'টর্চ' জ্বেলেই দেখলুম, সেই ভীষণ ভূতদেবতার ভয়ংকর মুখে দুটো ড্যাবডেবে আগুনচোখ দপদপ করে জ্বলছে!' এতক্ষণ শোহনলাল নীরব শ্রোতা হিসেবে এদের কথোপকথন শুনছিল। এইবার জোর দিয়ে বলে উঠল

—'অসম্ভব! কাঠের মূর্তি, চোখ জ্বলবে কেমন করে?”

পান্নালালও শোহনলালের অবিশ্বাসে যোগ দেয়

—“ভয়ে তোমরা কী দেখতে কী দেখেছ!’

কথাগুলো বলতে বলতে হিরালাল উত্তেজনায় জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগল। একদৃষ্টে সে পান্না ও শোহনলালের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের সামনে সেই ভয়াবহ দৃশ্যের পুনরাভিনয় যেন ভেসে ওঠে। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে বলে ওঠে: ‘ওঃ!’ পান্নালাল “নরকে যাক চুনিলাল! সে নীলাখানা কোথায়? এখনই দাও সেই নীলা আমার হাতে! আমি তাকে এখনই চাই!'

কোঁচার খুঁটে বাঁধা ছিল নীলাখানা—পেটের কাছে অতি সাবধানে গোঁজা। সেটা খুলতে খুলতেই বলল হিরালাল

—'এই নিন আপনার নীলা।'

হিরালালের হাত থেকে একরকম ছোঁ মেরেই নীলাখানা নিয়ে পান্নালাল নীরবে অনেকক্ষণ ধরে উলটে-পালটে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে কেমন যেন হয়ে যায় পান্নালাল। সে ভুলে যায় সকল উত্তেজনা সমস্ত আতঙ্ক বিভীষিকা! — হিরালালের বীভৎস কাহিনি তার কাছে স্বপ্নে শোনা গল্প হয়ে গেছে—! চুনিলালের মৃত্যু, হিরালাল-এর পিছনে পুলিশের অনুসরণ, এখানকার অবস্থানে তাদের আসন্ন বিপদের সম্ভাব্যতা সমস্তই সে বিস্মৃত হয়। অপলক আবিষ্ট নেত্রে সে চেয়ে থাকে নীলাখানার দিকে। এই কি নীলার সম্মোহন?এই মোহের পথেই কি নীলা ডেকে আনে সর্বনাশ মানুষের লোভী জীবনে? কে জানে!

শোহনলালও আগ্রহ সহকারে ঝুঁকে পড়ে দেখছিল নীলাখানা। মুগ্ধস্বরে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সে

—'আশ্চর্য নীলা! এর তুলনা নেই!”

পান্নালাল আর চোখ ফেরাতে পারে না। কী এক ঐন্দ্রজালিক মায়ার দ্যুতি নীলার নীল অঙ্গে দুলে দুলে উঠছে। পান্নালালের গলা দিয়ে যেন অন্য কেউ কথা বলে। নীলার সৌন্দর্যে আচ্ছন্ন হয়ে পরিপূর্ণ অভিভূত আবেগে বলে ওঠে

——"আহা-হা, আশ্চর্যই বটে! নীল-পদ্ম, নীল-আকাশ, নীল-সাগরের রং এর কাছে ম্লান হয়ে যায়!’

ওস্তাদ ব্যবসাদার শোহনলাল স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে এবং বলে —তোমার কবিত্ব রাখো পান্নালাল। নীলাখানা আমার হাতে দাও, ওর কত দাম হবে দেখি ৷'

মোহগ্রস্ত আবিষ্ট পান্নালাল যেন উন্মাদ অপত্যস্নেহে নীলাখানা বুকে চেপে ধরে বলে —'এ নীলা আমার আর বেচবার ইচ্ছে নেই !

শোহনলাল ও হিরালাল উভয়েই বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে থাকে, পান্নালালের খেপাটে কথাটা যেন অনুধাবন করার চেষ্টা করে। স্থিরসংকল্প পান্নালাল দৃঢ় চিবুক সংবদ্ধ করে বজ্রমুষ্টিতে নীলাখানা চেপে ধরে ওদের দিকে সেনাপতির আদেশের ভঙ্গীতে শাণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।

শোহনলাল ‘সে কী, আমার পঁচিশ হাজার টাকা মাঠে মারা যাবে?'

হিরালাল ‘ও নীলা না বেচলে আমার টাকা দেবে কে? ওর জন্যে চুনিলাল মরেছে,

আমিও যমের দরজা থেকে ফিরে এসেছি।'

পান্নালাল ‘তোমাকে তিন হাজার টাকা বখশিস দেব।'

হিরালাল "তিন হাজার টাকা! ও নীলার কত দাম হবে শোহনলালবাবু?'

শোহনলাল ‘দেড় লাখও হতে পারে।'

হিরালাল ‘আর আমি পাব তিন হাজার টাকা! পান্নাবাবুর দয়ার সীমা নেই!” শোহনলাল ‘পান্না, ও-নীলা তোমাকে বেচতে হবেই। আমাকে না হয় পনেরো হাজার 'টাকাই দিও।'

পান্নালাল ওদের কথায় যেন কানই দেয় না। ক্রমেই তার অন্তরের তলদেশ থেকে সমস্ত চিন্তা সংকল্প, দেহের প্রতিটি স্নায়ুতন্ত্রী,—সমস্তই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে এক অদ্ভুত পৈশাচিক নির্মমতায় যেন রূপান্তর গ্রহণ করে। দুর্দম অধৈর্য বুঝি প্রচণ্ড বিস্ফোরণে তার নিষ্ঠুরতম আত্মপ্রকাশ প্রত্যক্ষ করাতে চায়। তবু নিজেকে সম্বরণ করে পান্নালাল। দৃঢ় গাম্বীর্যে সে উঠে দরজার দিকে অগ্রসর হল। ওরা দুজনও পান্নালালের পশ্চাতে উঠে দাঁড়াল। পান্নালাল চলে যায় দেখে শোহনলাল বলে:

—'পান্না, তোমার টিকি আমার কাছে বাঁধা। জানো, আমি তোমার সর্বনাশ করতে পারি?'

উত্তেজনার আতিশয্যে হিরালাল ঝট করে পান্নালালের বাঁ হাতখানা ধরে ফেলে বলে —'পান্নাবাবু, আমিও ওই নীলার সমান ভাগ চাই।'

ধৈর্যের শেষ সীমান্তে পান্নালাল—কোন অলক্ষ হিংস্র নিয়তি যেন অবিমৃষ্য ক্ষিপ্রতায় তাকে ঠেলে দেয় এক চরম সমাধানের পথে! দুই চোখে আগুনের ঝলক তুলে বলে পান্নালাল

—"হুঁ। শোহনলাল করবে আমার সর্বনাশ, আর হিরালাল চায় সমান ভাগ! তাহলে আমার উত্তর হচ্ছে এই!'

কথার সঙ্গে সঙ্গেই চকিতে রিভলবার বের করে দুবার ছুড়লে পান্নালাল। দুটো জ্বলন্ত

গুলি দুজনের দাবি ঠান্ডা করতে যথেষ্টই—পান্নালাল তা জানে। শোহন ও হিরালাল আর্তনাদ করে সশব্দে আছড়ে পড়ে গেল। পান্নালাল এক পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল— আপনমনেই পুনরাবৃত্তি করে

—হুঁ, ইনি করবেন আমার সর্বনাশ, আর উনি চান আমার সমান ভাগ!' অবজ্ঞাভরে আরও কী বলতে যাচ্ছিল পান্নালাল, কিন্তু হঠাৎ তার যেন কণ্ঠরোধ হয়ে গেল। বাড়ির দরজায় একখানা মোটর এসে দাঁড়ানোর শব্দ হল। সচমকে বিভ্রান্ত স্বরে পান্নালাল বলে:

—"ও কার মোটরের শব্দ!

নিচে সদর দরজায় দমাদম পদাঘাতের শব্দ এসে পান্নালালের কানের পর্দাই যেন ভেঙে ফেলতে চায়। উৎকণ্ঠিত স্বরে সে বলে ওঠে 'ও কারা দরজায় লাথি মারে?” নিচে কে চিৎকার করে বলছে

—“দরজা খোলো, দরজা খোলো! নইলে আমরা দরজা ভেঙে ফেলব!'

পান্নালাল সন্ত্রস্ত হয়ে জানালার খড়খড়ি তুলে কিছুটা অনুমান করবার চেষ্টা করে। জানালা খুললেও বাড়ির ঠিক নিচে কিছু দেখা যায় না। শুধু কথাগুলো আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তা থেকেই সে সভয়ে বলে ওঠে: 'পুলিশ!'

সদর দরজায় পদাঘাতের পর পদাঘাত! আর সেই সঙ্গে পান্নালাল-এর চেতনার উপরে যেন কেমন একটা ভারী বিভ্রান্তির প্রলেপ কে লেপে দিচ্ছে। সমস্ত ঘরের বাতাস যেন প্রতিধ্বনি করে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে তুলছে অনুনাসিক কণ্ঠের বিকট ও তীব্র স্বর, কোথায় যেন একটা পৈশাচিক অট্টহাস্য হা-হা-হা-হা করে পান্নালালের সমস্ত সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে চায়। উদভ্রান্ত স্বরে সে চিৎকার করে ওঠে

—"ও কে? ও কে অমন করে হাসছে!'

দরজায় পদাঘাতের শব্দ আর ওই বিকট অট্টহাসি যেন আরও নিকটে, আরও জোরে, আরও নিষ্ঠুরভাবে তাকে ঘিরে ফেলতে আসছে। পান্নালাল ছিটকে বাড়ির ভিতর দিকের দরজা দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে সেই ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

৷৷ তিন ৷৷

তৃতীয় দৃশ্যের পটভূমিকায় সেই অন্ধবাড়ির বন্ধ ঘরে ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছে মুমূর্ষুর আর্তনাদ—লোভলোলুপ দুঃসাহসিক যড়যন্ত্রের অনিবার্য পরিণতি। মৃত্যুর অরাজকতা বয়ে গিয়েছে ঘরখানার মধ্যে দিয়ে। টেবিল, চেয়ার, বিছানা ওলট-পালট বিপর্যস্ত। শোহনলাল ও হিরালালের অবিন্যস্ত দেহ রক্তাক্ত মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে রয়েছে।

ঘরের আবদ্ধ পরিসরে একটা অশুচি আবহাওয়া যেন চারিদিকের দেওয়ালে মাথা কুটে ফিরছে, কোনও পাপাত্মার অনুশোচনা তা নয়—অন্তিমকালে জীবনভিক্ষার দুর্বল প্রার্থনাও নয়। শোহনলাল ও হিরালাল বহু মরণাত্মক অভিজ্ঞতা থেকে একথাটা ভালো করে জানে যে তাদের দুর্ধর্ষ জীবনের ইতি একদিন এমনই করেই টানতে হবে। তবু পৃথিবী থেকে যাওয়ার আগে পান্নালালের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নেওয়া তাদের চাই-ই। আসন্ন মরণের যন্ত্রণার চেয়ে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা তাদের সারা দেহের পেশি-তন্ত্রী কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে তুলছে। ঘরের দেওয়ালে-দেওয়ালে যেন দুরাত্মার প্রতি দুরাত্মার আক্রোশ আছাড় খেয়ে পড়ছে। এদের নিশ্বাস প্রশ্বাসে যে প্রতিহিংসার বিষবাষ্প স্ফুরিত হচ্ছে, তাই যেন ঘরের আবহাওয়াটাকে আরও ভারাক্রান্ত, আরও অশুচি করে তুলেছে।

শোহনলালের দেহকুণ্ডলীর ভিতর থেকে একটা অস্ফুট গোঙানি যেন কোনও অদৃশ্য সর্বশক্তিমান বিচারকের কাছে নালিশ জানাচ্ছে।—মানুষের কানে তার কোনও অর্থ ধরা পড়ে না, তবু ভাবটা বুঝা যায়। ইহজগতের মেয়াদি আয়ু তার পূর্ণ হয়ে এল, প্রতিহিংসা বুঝি আর এখানে নেওয়ার সময় হবে না। এই শরীরে যে কাজ শেষ হল না, অন্য কোনও অশরীরীর কাছে তাঁর রেশ পৌঁছে দেওয়ায় হয়তো সান্ত্বনা আছে। তাই হয়তো সে নালিশ জানাচ্ছে ঘরের বাইরের আকাশের কাছে। ঘরের জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতা ভেদ করে তার গোঙানি সাতনলি ফলার মতো ক্রমশই আকাশ চিরে উপরে উঠছে। ওদিকে সদর দরজায় তেমনই দমাদম আওয়াজ হচ্ছে; আর মাঝে মাঝে যেন পাহাড়ে পাঁজরা ফাটিয়ে বিকট শব্দে ফেটে ফেটে পড়ছে একটা হা-হা-হা অট্টহাসি।

শোহনলালের রক্তাক্ত দেহ তখনও ছটফট করছে, কিন্তু হিরালাল সম্পূর্ণ মৃতবৎ। হঠাৎ যেন তার দেহ নড়ে উঠল,—পাখি আকাশে উড়ে যেতে তার আশ্রয়-শাখায় যেমন দোলা লাগে তেমনই। কিন্তু হিরালালের প্রাণবিহঙ্গ তার দেহশাখার আশ্রয় ছেড়ে শূন্যে পক্ষবিস্তারের কোনও লক্ষণই দেখাল না। বরং তিরের চকচকে ফলার মতো তৃণাবরণ ভেদ করে তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ধীরে ধীরে খুলল; প্যাটপ্যাট করে চারিদিকটা একবার দেখে নিল এবং তার চিরকালের অভ্যাস মতো পরিহাসপক্ক ভাষায় বলল

—'পান্নাবাবু তো পগার পার! এইবারে আমাকেও গাত্রোত্থান করতে হবে! ওহে শোহনলালবাবু, চোখ তো মুদে আছেন, কিন্তু পটল তুলেছেন, না আমারই মতো কপট- মৃত্যু?'

পাথরচাপা অনুভূতির মধ্যে শোহনলালের চেতনা যে সমাধিগ্রস্ত ছিল। দেহের যন্ত্রণাটাকে মনে হচ্ছিল বুঝি নরকদূতের সাঁড়াশির কামড়ে-ধরা টান। বহুযোজন দূর থেকে যেন হিরালালের কথা তার কানে ভেসে এসে লাগছে। শরীরখানায় একটা আপ্রাণ মোচড় দিয়ে সে উৎকর্ণ হয়ে ওঠে এবং চোখ মেলতেই পূর্ণ সম্বিতে ফিরে আসে।—সে উত্তর দেয়

—"হিরালাল, আমার আর কোনও আশাই নেই। আমার আঘাত সাংঘাতিক।' হিরালাল: ‘কিন্তু পান্নাবাবুর গুলিতে আহত হয়েছে কেবল আমার পাঞ্জাবির হাতা। তার চোখে ধুলো দেবার জন্যেই এতক্ষণ আমি মড়ার মতো পড়ে ছিলুম!' —

হিরালাল ভূমিশয্যা ছেড়ে উঠে বসল। শোহনলাল যেন সারা দেহখানা ধনুকের মতো বাঁকিয়ে একটা পূর্ণ-জ্যা টংকার তুলবার চেষ্টা করেই মচ করে ভেঙে পড়ে,—আর সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিয়ে ওঠে : 'ওঃ বড়ো যাতনা!...বড়ো যাতনা!'

কিছুক্ষণ নিঃস্পন্দ থেকেই আবার মাথা তোলে-শোহনলাল—আহত সাপের ফণা তোলার মতো। লাল চোখ দুটো ঠিকরে দিয়ে কাটা-কাটা ভাষায় ফাটা-ফাটা আওয়াজ তুলে বলে: —'কিন্তু...কিন্তু শয়তান পান্না কি পালাতে পারবে?' —

হিরালাল ‘খুব পারবে! বাড়ির পিছনদিকে একটা গুপ্তদ্বার আছে যে! পুলিশ সদরে যে রকম লাথির উপর লাথি চালাচ্ছে, আমাকেও এখনই সেই পথই অবলম্বন করতে হবে।' হিরালাল আহত নয়, সে তার পূর্ণজীবন নিয়ে এখনও নিরাপদ হতে পারে—এই সংবাদে শোহনলাল অস্বাভাবিকভাবে আশ্বস্ত হয়ে উঠল! কিন্তু হিরালাল গাত্রোত্থান করে দেখে অসহায়ভাবে সে অনুরোধ জানাতে চায়:

—না না হিরালাল, যেও না!'

, হিরালাল তার কাতর নিষেধের কোনও অর্থ খুঁজে পায় না, তার ভূলুণ্ঠিত রক্তাক্ত দেহের দিকে একটা বক্রদৃষ্টি হেনে হো হো করে হেসে ওঠে হিরালাল। সে মনে করে, যে মরছে, অপরের বেঁচে থাকাটা হয়ত তার অসহ্য, তাই বলে এখন ওঁর শুশ্রূষা করতে বসে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সেও মরবে নাকি! সে টেবিলের কাছে গিয়ে একখানা কাগজ টেনে নেয়। শোহনলাল আবার কাকুতি জানায় :

—এখনই যেও না হিরালাল, শোন। আমার তো শিয়রে মৃত্যু, কিন্তু মরবার আগে আমি শুনে যেতে চাই, তুমি এই শয়তানির প্রতিশোধ নিতে পারবে কিনা! —চুপ করে রইলে কেন হিরালাল? — কাগজে কী লিখছ?'

হিরালাল 'আপনি বলবার আগেই প্রতিশোধের ব্যবস্থা করছি।'

এতক্ষণে সে বুঝতে পারে কেন শোহনলাল তাকে ছাড়তে চায় না। এতক্ষণে যেন শোহনের প্রতি তার অনুকম্পা হয়, শ্রদ্ধা জাগে। মৃত্যুযন্ত্রণাও এদের যদি বা সহ্য হয়, প্রতিহিংসা চরিতার্থ না হওয়ার জ্বালা বুঝি একেবারেই অসহ্য। এই বৃত্তিটুকুর পরিচয়ে হিরালাল শোহনলাল-এর প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারে অবশ্যই। শোহনের কাছে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে সে একটু বসে, সতর্কভাবে খেয়াল রাখে বাইরে পুলিশের দরজা ভাঙার আওয়াজ। অস্থিরভাবে তাকে বলে শোহনলাল

—“হিরালাল, আমার চোখে চারিদিক ঝাপসা হয়ে আসছে!—শীঘ্র বলো, করছ?' কী ব্যবস্থা

হিরালাল “শুনুন, পান্নাবাবু নিশ্চয় তার স্ত্রীর কাছে গেছে। কাগজে সেই ঠিকানা লিখে পুলিশের জন্যে টেবিলের উপরে রেখে গেলুম। এ ঠিকানা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।’ শোহনলালের যন্ত্রণাকাতর মুখেও যেন হাসি ফুটে ওঠে, কিন্তু নিমিষেই ভুরু কুচকিয়ে তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞাসা করে :

—সে যদি সেখানে না যায়?'

নিস্পৃহভাবেই উত্তর দেয় হিরালাল:

—তাহলে তার বরাত ভালো! অদৃষ্টের বিরুদ্ধে আমি তো আর লড়তে পারব না! শোহনলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পরমুহূর্তেই আতঙ্ক-স্ফীত চোখ দুটোকে হিরালালের দিকে তুলে ধরে প্রশ্ন করে :

— কিন্তু হিরালাল তুমি শুনেছ?' -

হিরালাল 'কী?’

শোহনলাল ‘সেই ভয়ানক হাসি?”

হিরালাল “শুনেছি। বোধহয় পুলিশের কেউ হেসেছে।

শোহনের গলার স্বর কেঁপে কেঁপে যায়। আরও ক্ষীণ চাপা কণ্ঠে বলে: ‘না হিরালাল, সে হাসি মানুষের নয় !

হিরালাল “তাহলে যমদূত বোধহয় আপনাকে অভ্যর্থনা করতে এসেছে!' শোহনলাল যন্ত্রণা চেপে এতক্ষণে জোরে জোরে শ্বাস ফেলছিল। তার যে জীবন তাতে মৃত্যুর সময়ে কারও সহানুভূতি বা অশ্রুজল সে কামনা করতে পারে না—করেও না। তবু হিরালালের কথায় তার বুকের কোথায় বুঝি একটু আঘাত লাগে। অতিকষ্টে হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে

—“হিরালাল! প্রাণ যায়! মরবার সময়ে তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ, না ঠাট্টা করছ?' হিরালাল ‘ঠাট্টা করছি শোহনলালবাবু! আমাদের কাছে জীবন আর মরণ দুই-ই যে মস্ত বড়ো ঠাট্টা! যে ব্যবসা ধরেছি, আমাকেও যে এইভাবে মরতে হবে! কিন্তু সেদিন আমি হাসতে হাসতেই মরব !'

জীবন আর মরণ দুই-ই যাদের কাছে মস্ত বড়ো ঠাট্টা তারাই পারে অকাতরে জীবনের রাশ আলগা করে দিতে—সুপথে অথবা কুপথে। মাঝে যদি থাকে কোথাও মরণের খাদ তা তারা লাফিয়ে পারও হতে পারে, অথবা তাতে চিরকালের সমাধি রচনাও করতে পারে। হিরালাল—এর দুর্ধর্ষ দস্যু-জীবনে এইখানেই মনে হয় তার সত্যোপলব্ধি আছে। পরিণাম না ভেবে এপথে সে আসেনি, মৃত্যুর আশংকা তার চলার পথে বহুবার উত্তুঙ্গ পূর্ণচ্ছেদের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, সে তার সতর্ক উপস্থিত বুদ্ধিতে বারে বারেই এড়িয়ে এসেছে, আর মনে মনে হেসেছে—জীবনের প্রতি—মৃত্যুর প্রতি পরিহাসের হাসি। তাই হিরালাল যখন বলে সে হাসতে হাসতেই মরবে তখন মনে হয় না সে কিছু বাড়িয়ে বলে। কিন্তু শোহনলাল?— সে তো আসন্ন মৃত্যুমুখে, সে কি সত্যই কাঁদছে? হাঁপাতে হাঁপাতে সে উত্তর দেয়: — আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে! আমিও হাসতে হাসতে মরতে পারি হিরালাল—যদি পান্না ধরা পড়ে!’

বাইরে হুড়মুড় করে একটা আওয়াজ হল। চমকে ভেঙে হিরালাল বলে ওঠে —ওই সদর দরজা ভেঙে পড়ল! আপনি এখন মরুন, আমি এখন পালাই! পরে নরকে একদিন আবার দেখা হবে।'

দ্রুত পদশব্দ তুলে প্রস্থান করে হিরালাল বাড়ির কোথায় গুপ্তদ্বার আছে সেইদিকে। শোহনলাল অন্তিমকালে শেষ দুই-চারিটি মুহূর্ত মাত্র ভিক্ষা চায়,—অন্তত পুলিশের লোক তার ঘরে না আসা পর্যন্ত তার শেষ নিশ্বাস যেন না বের হয়। —ওই তো সিঁড়ির উপর বহুলোকের ত্রস্ত জুতোর শব্দ শোহনের কানে আসছে! —মাত্র কয়েকটি মুহূর্তের আয়ু, সে- কি এতই বেশি?

সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন করে তার চোখের সামনে বয়ে এল কুজ্ঝটিকার ঝড়, অন্ধকারের ঢেউ-এর বন্যা নিঃশব্দে ডুবিয়ে দিল তার সামনের টেবিল চেয়ার খাট আয়না। পৃথিবীর যত ভিন্ন অর্থের ভিন্ন ভিন্ন গোটা-গোটা শব্দ—সব যেন গুঁড়িয়ে একটা তরল মিশ্চার করে কে তার কানের পর্দায় ঢেলে দিচ্ছে। হাত-পাগুলো কেমন যেন ঝিমঝিম করে একটা ঠান্ডা অনুভূতির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। শোহনলালের সারা অস্তিত্ব কোনও অমোঘ আকর্ষণে চেতনার নিস্তরঙ্গ অতলে নিঃশব্দে তলিয়ে যায়। সে নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে চায়—

জীবনের শেষ পরিধিকূলে সে আরও দু-একটি মুহূর্তের আশ্রয় পেতে চায়—তাহলেই সেও হিরালালের কথামত হাসতে হাসতেই মরতে পারে।

- পুলিশের লোক প্রায় উঠে এসেছে। —তাদের হই-চই যেন শব্দের সরীসৃপ, দুর্বার হিংস্রতায় ফণা মেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে। দরজায় ধাক্কা দিয়ে ঘরের মধ্যে দমকা ঝড়ের মতো প্রবেশ করল পুলিসের ইনস্পেকটার। আসার মুখেই যেন আচমকা ইলেকট্রিকের শকে থমকে গিয়ে ইনস্পেকটার বলে ওঠে

—এ কী! ঘরের ভিতর যে রক্তারক্তি কাণ্ড ! – কে তুমি? –কে তুমি?” নিবে যাওয়ার আগেই বুঝি একবার জ্বলে উঠল শোহনলালের চেতনা। সমস্ত শক্তি কণ্ঠে এনে ক্ষীণস্বরে সে টেনে টেনে বলে

—'আর পরিচয় দেবার সময় নেই। আসামি পান্নালাল আমাকে মেরে গুপ্তদ্বার দিয়ে পালিয়েছে! —ওই টেবিলে তার ঠিকানা!'

ইনস্পেকটারের পিছনে আরও অনেকে ঘরে ঢুকল। ভিতরের দৃশ্যে সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়! ঝট করে ইনস্পেকটার কাগজখানা হাতে তুলে নিয়েই বলে —কাগজে লেখা আছে—‘দশ নম্বর চন্দ্রমোহন লেন'।—পান্নাবাবু নীলা নিয়ে সেইখানে পালিয়েছে।'

শোহনলাল শুধু এইটুকু শুনবার জন্যেই তার শেষবিন্দু শক্তি দিয়ে যেন তার শেষ নিশ্বাসটুকু স্থগিত রেখেছিল। প্রতিহিংসার চরম চরিতার্থতায় তার দুর্বল মুখেও যেন একটা ক্ষীণ হাসির অতি সূক্ষ্ম রেখা খেলে গেল। পরম পরিতৃপ্তিতে একবার ‘আ-আঃ’ শব্দ করেই সে একেবারে চিরকালের মতো নিস্পন্দ হয়ে গেল। সাব-ইনস্পেকটার বলল: —“স্যার, লোকটা বোধহয় মরে গেল!”

ইনস্পেকটার ‘মরুক গে, ভদ্র গুণ্ডা পান্নালালের আড্ডায় সাধুলোক মরতেও আসে না। কলকাতার আর একটা আপদ দূর হল। কিন্তু মরবার আগে লোকটা আরও দু-একটা কথা কয়ে গেলেই পারত!’

সাব-ইনস্পেকটার “হ্যাঁ স্যার, এমন করে মরা বড়োই অন্যায় স্যর! এখন আমরা কী করব! এ আড্ডার মালিক পান্নালালকে জানি, কিন্তু আবার কোথায় তার দেখা পাব?'

ইনস্পেকটার 'চলো, দশ নম্বর চন্দ্রমোহন লেনে গিয়ে তো আগে দেখাই যাক।'

যাওয়ার আগে পুলিশের দলবল তন্ত্র-তন্ন করে সারা বাড়িখানা তল্লাসি করল। তাদের ঈপ্সিত বস্তু কোথাও নেই। শোহনলালের মৃত দেহখানা নেড়ে-চেড়ে একবার পরীক্ষা করল এবং তারপর সেই রক্তমাখা লাশের পাহারায় দু-একজনকে রেখে তারা সকলেই প্রস্থান করে পান্নালালের উদ্দেশ্যে চন্দ্রমোহন লেনে। শোহনলালের অশরীরী আত্মা হয়ত তখনও তার সদ্যত্যক্ত দেহের শিয়রে অলক্ষে দাঁড়িয়ে থাকে।

চার

চতুর্থ দৃশ্যে অবশ্যম্ভাবীকে প্রতিরোধ করবার সমস্ত আয়োজন বুঝি পান্নালাল গড়ে তুলেছে। বিজয়গর্বে সে আজ ঐশ্বর্যের উচ্চ শিখরে বলা যেতে পারে। তবু সে ভুলতে পারে না তার দুর্ধর্ষ জীবনের এই প্রথম দুর্বলতার আতঙ্ক। আর কখনও এমন হয়নি। মানুষের বিরুদ্ধে শত-শত ষড়যন্ত্র সে বারে বারে সৃষ্টি করেছে। জয় হোক, পরাজয় হোক, দুর্বলতা তাকে কোনওদিন এমন করে ছেয়ে ফেলেনি। নির্মম প্রত্যয়ে সে পদক্ষেপ করে—অব্যর্থ আঘাতে সে ছিনিয়ে নিয়ে আসে মানুষের সতর্ক সঞ্চিত ধনসম্পদ! বারে-বারে সে ব্যাহত করেছে তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের প্রতিটি অভিযান! আজও সে শেষ পর্যন্ত তাই-ই করল, কিন্তু সে বিজয়গর্বের অনুভূতি তার আজ নেই। এখনও তার মনের দিগন্তে যেন রূঢ় গাম্ভীর্যে আতঙ্কের কালো মেঘ ঘনঘটায় বিদ্যুৎ হেনে যাচ্ছে। দুর্বল মস্তিষ্কের বিকারের মতো ক্ষণে ক্ষণে পান্নালাল এখনও শিউরে ওঠে। কানে বাজে সেই প্রতিধ্বনি শূন্যতার অট্টহাসির প্রতিধ্বনি—হা-হা-হা-হা!

চন্দ্রমোহন লেনে দশ নম্বর বাড়ির সম্মুখ-অংশ এত রাত্রেও আলোকিত, সরকারি রাস্তার গ্যাসের আলো এখানে সারারাত্রি অন্ধকারকে আসতে দেয় না। বাড়ির ভিতরের অংশ অন্ধকার—শুধু উপরের ঘরে একটা জানালার ফাঁক দিয়ে একটু ক্ষীণ আলোর রেখা চোখে পড়ে। ভিতর এবং বাইরে একটা নির্দোষ গার্হস্থ্য আবহাওয়া—পাপের আতঙ্ক, লোভের উত্তেজনা কোনও কিছুকে এখনও কলুষিত করেনি। কিন্তু পান্নালাল যেখানে আসছে—পান্নালাল যেখানে আশ্রয় নেবে—পান্নালাল যেখানে সেই নীলা গোপন রাখতে চাইবে সেখানকার নিষ্কলুষ শান্তি কি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করতে পারবে? নীলার মোহে পান্নালাল মুগ্ধ, লোভে অন্ধ;—আর নীলা তার পিছনে নিয়ে আসছে আগুনের উপপ্লব, সব পুড়িয়ে ছারখার করবে, তবু নিবৃত্তি মানবে না। দশ নম্বর চন্দ্রমোহন লেনের নির্বিরোধ গার্হস্থ্য পরিবেশের হয়ত কোনও কিছু নিষ্কৃতি পাবে না—হয়তো বা সে আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে এল।

পান্নালাল হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে—যেন জলে ডোবা কোনও জাহাজের নাবিক এসে ডাঙায় উঠল। অকূলের মাঝে কূল পেয়ে আপন মনেই সে বলে —"যাক, মানে মানে ফাঁড়া বোধহয় কেটে গেল, নিজের বাড়িতে এসে পড়েছি। এখানকার ঠিকানা জানে খালি হিরালাল – কিন্তু সে আর কথা কইবে না!—ওরে রামু’ রামু সংসারের চাকর, অদূরেই কোথায় ঘুমিয়ে ছিল, প্রভুর এক ডাকেই সাড়া দেয়

—আজ্ঞে, বাবু!’

পান্নালাল ‘গিন্নিমা কোথায়?”

রামু ‘শোবার ঘরে, বাবু!'

পান্নালাল “আচ্ছা, তুই সদর বন্ধ কর!’

পান্নালাল সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠল। নিজের মনের আলোড়ন-বিলোড়ন যতদূর সম্ভব চেপে রেখে সহজভাবেই সে একটা বন্ধ দরজা ঠেলে ঘরের ভিতর ঢুকল। পান্নালালের স্ত্রী প্রভা আগেই তার গলার স্বর শুনেছে—কিন্তু ঘর থেকে নেমে নিচে যাওয়া প্রয়োজন বোধ করেনি। যেমন এতক্ষণ ছিল তেমনই খাটের উপর গা এলিয়ে দিয়ে বুকের ওপর একখানা বই খুলে পড়বার চেষ্টা করছিল। দাম্পত্য জীবনের প্রথমদিকেই তার এ শিক্ষা হয়েছে যে অহেতুক ঔৎসুক্য যেন সে পারতপক্ষে না দেখায়, তার স্বামীর রহস্যময় গতিবিধির প্রতি যেন সে কোনওরূপ কৌতূহল পোষণ না করে। আগে হয়ত সে পীড়া অনুভব করত, কিন্তু এখন দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততায় এটা তার স্বাভাবিকভাবেই গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই নিতান্ত সাংসারিক ব্যাপার ছাড়া অন্য সবকিছুতে প্রভা ব্যাহত অনেকটা নিস্পৃহ অসংশ্লিষ্ট ভাব দেখায়।—এটা এখন তার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে বলতে হবে।

তবু আজ পান্নালালের সঙ্গে তার অনেক কথা জানতে ও জানাতে ইচ্ছে করছে। সে এতক্ষণ যে মানসিক অবস্থায় কাটিয়েছে তা তার স্বামীকে না জানিয়ে সে পারবে কেমন করে? সে এতক্ষণ যেন পান্নালালেরই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু রাত তিনটের আগে যার বাড়ি ফেরা অভ্যাসবিরুদ্ধ তাকে এগারোটার আগেই আশা করা বাতুলতা। কিন্তু সেই পান্নালাল সত্যিই এত আগে বাড়ি ফিরল দেখে প্রভা মনে মনে একটু বিস্মিত হল। কী মেজাজে যে পান্নালাল আসছে কে জানে। প্রভা জানে, স্বামী আর যেখানে যাই করুক, তার কাছে অন্তত সে সদয় ও স্নেহপ্রবণ। বহু আদর-আব্দার সে সহ্য করে, কিন্তু মাঝে মাঝে যেন তাকে আর ধরে-ছুঁয়ে পাওয়া যায় না। না, আজ সে আশঙ্কা নেই। প্রভা দেখল পান্নালাল যেন একটু বেশি তৎপর হয়েই সোজা তার কাছে উঠে আসছে। তার বুকের মধ্যে যে দুর্ভাবনার ভারী পাথর চেপে ছিল তা ক্রমেই নেমে যাচ্ছে। সে বইটা পাশে রেখে খাটের উপর উঠে বসল। মুখে কৃত্রিম হাসি মাখিয়ে নিয়ে পান্নালাল ঘরে ঢুকেই বলে —'এই যে প্রভা, জেগে আছ? কী বই পড়ছ?

আপাতত নির্লিপ্তভাবেই উত্তর দেয় প্রভা

—এই যে-বই ভালো লাগছে না।'

হাসতে হাসতে কৌতূহল প্রকাশ করে পান্নালাল

—ভালো লাগছে না, তবু পড়ছ?'

অধিকতর নির্লিপ্তভাবেই যেন প্রভা বলে

—উপায় কী? ঘুম না হলে কড়িকাঠ গোনার চেয়ে যে কোনও বই পড়া ভালো।' পান্নালাল ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। অনেকটা যেন অন্যমনস্কভাবেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। প্রভা তার মুখের চেহারা ও সাধারণ হাবভাব নিরীক্ষণ করতে থাকে, এবং একটু অভিমানের সুরেই প্রশ্ন করে

— কিন্তু তোমার ব্যাপার কী বলো দেখি? রাত এগারোটা না বাজতেই তোমার আবির্ভাব, বন্ধুদের আসর বুঝি জমল না?'

পান্নালাল কঠিন হয়ে জিজ্ঞাসা করে

—'এ প্রশ্ন কেন?'

প্রভা ‘তোমার মুখ দেখে।'

পান্নালাল যেন নরম হয়ে পড়ে! উৎসুক হয়ে বলে

—'আমার মুখে কী দেখছ প্ৰভা?”

প্রভা ‘ভয় আর দুশ্চিন্তা।'

নাটকীয় রীতিতে একটা কৃত্রিমতার শুষ্ক হাসি হাসতে থাকে পান্নালাল এবং টেনে টেনে বলে —'চোখের ভ্রম!–তোমার চোখের ভ্রম !”

প্রভা ‘ভুল হল গো! তোমার মুখের পানে তাকিয়ে আমার কখনও চোখের ভ্রম হয় না।

পান্নালাল দুনিয়ায় ভয় কাকে বলে জানি না। আর হঠাৎ দুশ্চিন্তাই বা আমায় আক্রমণ করবে কেন?”

প্রভা ‘জ্যোতিষ শাস্ত্র জানলে সেকথা বলে দিতে পারতুম।'

পান্নালাল ‘তুমি ও-বিদ্যাটা জানো না বলে ভগবানকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। কিন্তু দ্যাখো প্রভা, আমাকে নিয়ে অত বেশি মাথা ঘামিও না।'

প্রভা ‘মাথা ঘামানোর অধিকার বোধ করি আমার ছিল, তবে তুমি আমার কাছে চিরকাল রহস্যময়ই থাকলে!'

‘রহস্যময়' কথাটা পান্নালালের কোথায় যেন তিরের মতো লাগে— সবিস্ময়ে সে পুনরুক্তি করে —‘রহস্যময়!’

প্রভা ‘হ্যাঁ, রহস্যময়। আমার কাছে তুমি যেন শিলমোহর করা খাম। সামনে থাকলেও বুঝতে পারি না, তোমার ভিতরে কী আছে! আমার আড়ালে তুমি কী করো, কোথায় থাক, কিছুই জানি না। এত টাকা পাও কোথা থেকে, তাও বুঝি না। আমার কাছে তুমি রহস্যময়, এটা যে আমার কত বড়ো দুর্ভাগ্য তা যদি তুমি জানতে! খালি তুমি নও, আজ থেকে দেখছি, এই বাড়িখানাও রহস্যময় হয়ে উঠেছে!'

পান্নালালের সমস্ত দেহের মধ্যে অলক্ষে যেন তড়িৎ-প্রবাহ বয়ে যায়। দ্বিগুণ মাত্রায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলে

—'বাড়িখানা রহস্যময় হয়ে উঠেছে! কী বলছ?'

প্রভা ‘হ্যাঁ, তাই। তুমি ঠাট্টা করবে বলে এতক্ষণ আমি বলিনি, কিন্তু আমার ঘুম না হওয়ার কারণই হচ্ছে তাই।'

অন্তরের তলদেশে উদ্বিগ্নতার ঢেউ পান্নালালকে ভিতরে ভিতরে চঞ্চল করে তুলেছে। বাইরে গম্ভীর স্বরে সে বলে

—'প্রভা, তোমার কথার অর্থ আমি বুঝতে পারছি না।'

প্রভা ‘শোনো, তুমি তো কোনওদিনই শেষ রাতের আগে বাড়ি ফের না, কাজেই রাত দশটার সময় আমি শুয়ে পড়ি। আজও বিছানায় গিয়ে শুয়েছি, হঠাৎ শুনলুম, পাশের ঘরে কে ঠক-ঠক শব্দ তুলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে!'

সচমকে পান্নালাল বলে ওঠে

—"কী বললে? ঠক ঠক শব্দ তুলে?

প্রভা ‘হ্যাঁ, ঠক-ঠক ঠক-ঠক ঠক-ঠক—ঠিক যেন দুখানা কাঠের পা ও-ঘরে চলে চলে বেড়াচ্ছে!'

রুদ্ধশ্বাসে পান্নালাল আবার বলে

—‘কাঠের পা?’

প্রভা 'হ্যাঁ, কাঠের পা।'

পান্নালাল ‘তারপর?'

প্রভা ‘উঠে পড়ে ও ঘরে গেলুম। দরজার শিকল বাইরে থেকে তোলা ছিল। কিন্তু ঘরের ভিতরে কেউ নেই।'

পান্নালাল ‘শব্দটা?'

প্রভা ‘থেমে গেছে। দরজা বন্ধ করে আবার এ ঘরে এসে শুয়ে পড়লুম। আবার সেই শব্দ! আবার ও ঘরে গিয়ে দেখি, কেউ নেই—শব্দও থেমে গেছে। আবার এ ঘরে এলুম —আবার সেই চলন্ত কাঠের পায়ের শব্দ! বলো, এর পরেও কারুর চোখে আর ঘুম আসে?’ পান্নালাল নিজেকে সামলে নেয়। অন্তরের উত্তেজনা একেবারে গোপন করবার চেষ্টা করে। অন্তত প্রভার কাছে তার দুর্বলতা সে ধরা দিতে চায় না—কারুর কাছেই না। সে সমস্ত ব্যাপারটা যেন উড়িয়ে দিয়েই বলে

—“তোমার শুনবার ভুল প্রভা।’

প্রভা জোর দিয়ে বলে

—'অসম্ভব।’

পান্নালাল ‘নইলে এ হচ্ছে ইঁদুরের কীর্তি।’

প্রভা ‘ও সন্দেহ আমারও হয়েছে। কিন্তু সে যে খুব ভারী পায়ের আওয়াজ! ঠিক যেন মস্ত বড়ো একটা দেহ ও ঘরে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিল!'

পান্নালাল ‘ওইটেই তোমার ভ্রম। কই, এখন তো আর কোনও শব্দ হচ্ছে না।' বিষয়টা যেন তর্কের দ্বারা প্রমাণ সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াল। প্রভা আর কোনও জবাব খুঁজে পায় না। অতএব তাকে শেষ পর্যন্ত পান্নালালের কথাতেই সায় দিতে হল—সত্যিই তো এখন কেন সে শব্দ আর হচ্ছে না? প্রভা বলে

—তাও তো বটে। তাহলে মানতে হয়, আমারই ভ্রম হয়েছে।'

প্রভার কথায় যেন পান্নালাল কানই দেয় না। তার দুশ্চিন্তাক্লিষ্ট মুখে ভয়ের স্পষ্ট চিহ্ন ফুটে উঠল, প্রভার দৃষ্টি তা এড়ায় না। অসতর্কভাবে সে আবার বুঝি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। কপাল কুঁচকে কী ভাবতে ভাবতে অনেকটা যেন আপন মনেই সে বলে

—‘কী আশ্চর্য, আজ আমাদের দুজনেরই শুনবার ভুল হয়েছে।— তুমি শুনেছ কাঠের পায়ের শব্দ, আর আমি শুনেছি বিকট অট্টহাসি!

যে মানসিক উত্তেজনার স্রোত পান্নালাল অন্তরের তলদেশে জোর করে বাঁধ দিয়ে আটকে রাখতে চেয়েছিল তা হঠাৎ উঁচু ঢেউ তুলে প্রভার সামনে ভেঙে পড়ল। প্রভা আতঙ্কে শিউরে উঠে বলে

—'অট্টহাসি? কখন?’

পান্নালাল সন্ত্রস্তভাবে তাড়াতাড়ি নিজেকে আবার সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে —না, না,—কী বলতে কী বলছি! — অ্যা—হাসি-টাসি কিছুই আমি শুনিনি! এই ভাবান্তর প্রভা লক্ষ করে এবং বলে

—আবার তুমি রহস্যময় হয়ে উঠলে?”

বলে এ-বিষয়ে পান্নালাল আর কোনও কথা বলা পছন্দ করছিল না। সে প্রভাকে আদেশ করে

—'আচ্ছা, যাও প্রভা, ঘুমোও-গে যাও।' ....কথা শেষ না হতেই পান্নালাল কীসের শব্দে চমকে উঠে শঙ্কিত কণ্ঠে বলে

—‘কিন্তু,—কিন্তু ও কী !

প্রভা একটা চিৎকার দিয়ে পান্নালালের গা ঘেঁষে সরে আসে। পাশের ঘরে আবার ঠক ঠক-ঠক করে কাঠের আওয়াজ, স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর শোনা যাচ্ছে। প্রায় কাঁপতে কাঁপতে প্রভা বলে

—ওগো শুনছ?—ওটা কি আমার শুনবার ভ্রম? না, ইঁদুরের কীর্তি?’

পান্নালাল তাকে অভয় দিয়ে বলে

—আচ্ছা দাঁড়াও প্রভা, আমি এখনই দেখে আসছি।'—

এই বলে সম্পূর্ণ আত্মস্থ সাহসে সে বেরিয়ে গেল। কোমরের বাঁদিক থেকে বের করে নিল অটোমেটিকটা, সেফটি বোতাম টিপে নিয়ে শক্ত মুঠোর মধ্যে সেটা বাগিয়ে ধরে ঢুকল গিয়ে পাশের ঘরে। কাঠের পায়ের শব্দ তখন কোনও শূন্যে যেন মিলিয়ে গেল। পান্নালাল দেখল, সত্যই সে-ঘরে কেউ নেই। সেখান থেকে সে চেঁচিয়ে বলে

—‘প্রভা, এ-ঘরে কেউ নেই! শব্দ কি এখনও শুনতে পাচ্ছ?' উচ্চকণ্ঠে তেমনই কাঁপতে কাঁপতেই প্রভা উত্তর দেয়

—না—আ—আ!

পান্নালালের দুঃসাহসী রক্তস্রোত চঞ্চল হয়ে উঠে। সে বিস্মিত হলেও আতঙ্কের লেশ পর্যন্ত আর তার মনে এখন নেই! উপরন্তু কেমন যেন একটা দুর্দমনীয় কৌতূহল জাগে সব ব্যাপারটা খোলাখুলিভাবে জানতে। সে আবার বলে

—তুমি দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ো প্রভা। আমি আজ এই ঘরেই থাকব।

প্রভার সারা দেহ তখনও ভয়ে ছমছম করছে। তবু সে দ্বিরুক্তি করে না। অভিমান করা বৃথা—তার মূল্য পান্নালালের কাছে হয়ত বা কোনওদিনই নেই। পান্নালালের কথা মানেই আদেশ। প্রভাকে একলাই থাকতে হবে এই ঘরে। সে জানে, বিপদে বা সম্পদে পান্নালাল যা ইচ্ছা করবে তা থেকে তাকে সে বিরত করতে পারে না। সে সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে ভিতর থেকে ছিটকিনি এঁটে দিল। তারপর বিছানার উপর গড়িয়ে পড়ে আকাশ-পাতাল চিন্তা করতে করতে হয়ত বা ঘুমিয়েই পড়ল।

নিয়তিই হয়ত প্ৰত্যক্ষ জীবনের নেপথ্য নায়িকা,—কিন্তু পান্নালাল বোধহয় জানে না বা জানতে চায় না, কার কটাক্ষ-সংকেতে তার জীবনের গতি তারই অলক্ষে কোনও অনিবার্য পথে নিয়ন্ত্রিত হতে চলেছে।

পাঁচ

পঞ্চম দৃশ্যে মূর্ছাহত নিশীথ নগরীর বুকের উপর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছে রক্তমাখা কালো ঘোড়ার পিঠে কালো মরণ-দূত। তার কুটিল ভ্রুকুটি নিক্ষেপে ঠিকরে পড়ছে। তার নিষ্ঠুর করস্পর্শে কত দম্ভ, কত ধৃষ্টতা, কত শত ঔদ্ধত্যের উচ্চ চূড়া নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে লোষ্ট্রসম নিক্ষিপ্ত হচ্ছে অন্তিম যবনিকার ক্ষুধার্ত জঠরে।... পান্নালাল কি কান পেতে শুনছে সেই দূরাগত ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ,—তার দশ নম্বর চন্দ্রমোহন লেনের সম্মুখে প্রলয়ংকর হ্রেষাধ্বনি?

পাশের ঘরে প্রবেশ করার পর পান্নালালের কেমন জিদ চেপে যায়, সে তার সমস্ত আতঙ্ক ঝেড়ে ফেলে প্রতিপক্ষকে যেন সম্মুখ যুদ্ধে আহ্বান করতে প্রস্তুত। সামনা-সামনি যে কোনও প্রত্যক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সে তিলমাত্র ভয় পায় না—একথা সত্য। পুলিশকে সে কোনওদিন পরোয়া করেনি, যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে তার কারসাজি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এসেছে। আজ তবে তার এত আশঙ্কা কিসের? আধিভৌতিক চক্রান্তে সে বিশ্বাস করে না, তবু তার দুঃসাহসী আত্মচেতনার ভিত্তিমূলে হয়তো ছিল কোনও দুর্বলতার ছিদ্রপথ;—তাই ঘটছে তার ক্ষণিকের বিভ্রান্তি। অবশ্য আতঙ্কে আত্মহারা হওয়ার মতো উত্তেজনা সে এখনও অনুভব করেনি। তাই নিজের ঘরে প্রবেশ করেই যখন সে দেখল কোনও চলমান কাঠের মূর্তি কোথাও নেই, শব্দও থেমে গেছে, তখন ব্যাপারটা সে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারল না। সে স্থির-সংকল্পে ঘরের মাঝখানে একটা চৌকি টেনে নিয়ে বসল,–শেষ পর্যন্ত এ রহস্যের সমাধান সে করবেই। মন ঘুরে ফিরে ওই একই চিন্তায় ডুবে যায়!—সেই অট্টহাসি, এই কাঠের পায়ের শব্দ, সাঁওতালিদের দেবতা সম্বন্ধে জনশ্রুতি। আপন মনেই পান্নালাল বলে

—সেই সাঁওতালি ভূত দেবতা! তার কাঠের মূর্তি নাকি সচল হয়ে পলাতক নীলা- চোরকে হত্যা করে নীলা কেড়ে নিয়ে আসে! নীলা চুরি করতে গিয়ে চুনিলাল মরেছে সাপের কামড়ে, কিন্তু হিরালাল নীলা নিয়ে পালিয়ে এসেছে। কাঠের ভূত তখন বাধা দিতে পারেনি! —আরে এটা তো জানা কথাই, কাঠের মূর্তি কখনও জ্যান্ত হয়?'

পান্নালাল নিজেই নিজেকে বুঝিয়ে মনের সংশয় দূর করবার চেষ্টা করে। বিচার- বিশ্লেষণের অতীতে কোনও অপ্রাকৃতিক ঘটনায় জন্মসংস্কারের বশে বুকের তলায় হয়ত সংশয় জাগে, হয়ত তার দোষী মন অসতর্কে চমকে ওঠে, বিস্মিত হয়, কিন্তু কোনও ভৌতিক কিংবদন্তিতে পূর্ণ বিশ্বাস সে কোনওদিনই করে না।

কিছু পরে চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে দরজাটা বন্ধ করল এবং পকেট থেকে নীলাখানা বের করে ফিরে ফিরে দেখতে লাগল। বসে বসে সে দেখছে নীলার ঐশ্বর্য- নীল বর্ণের দীপ্তি চোখের সামনে মহাসমারোহে দুলিয়ে তুলছে কুহক-বৈচিত্র্য। স্ফটিক অঙ্গ বেয়ে গলে গলে পড়ছে স্নিগ্ধ নীল দ্যুতি,—যেন নীল বরফের টুকরো। কত লোকের লাল রক্তে স্নান করেও এই নীলা আজ অম্লান নীল! কত তস্করের লোভ অসংযত হয়েছিল ওই রূপের মোহে—ওই মোহিনী সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে কত দস্যু প্রাণ নিয়েছে কত পুরোহিত আর মন্দির রক্ষীর;—কিন্তু এত করেও কোনও তস্কর বা কোনও দস্যু নীলার অধিকার পায়নি, পেয়েছে শুধু রহস্যময় মৃত্যুর অব্যর্থ অপঘাত। ...পান্নালালের ষড়যন্ত্রে এবারেও চুনিলালের হাতে মন্দির পুরোহিত আর সর্পাঘাতে চুনিলাল প্রাণ হারিয়েছে—ওই নীলার জন্যে; ওই নীলার জন্যেই তার রিভলবারের গুলিতে প্রাণ দিতে হল শোহনলাল আর হিরালালকে! এখন আর কেমন করে কোন পথে পান্নালাল এই নীলার অধিকারে বঞ্চিত হবে?—পুলিশ? ... পুলিশ তো তাকে ধরতে আসেনি। হিরালালের অনুসরণেই ও বাড়িতে তারা হানা দিয়েছিল। পান্নালালই যে নীলা চুরি করেছে, এমন প্রমাণ তারা কোথায় পাবে? শোহন ও হিরালালের হত্যার জন্য পুলিশ তাকেই সন্দেহ করবে? করুক না! এমন কত গন্ডা হত্যার জন্যে সে তো কতবারই পুলিশের সন্দেহ অর্জন করেছে। তার গতিবিধির হদিস মিলাবে এমন পুলিশ এখনও জন্মায়নি। ও ঠিকানার গুন্ডাদলপতি আর এ ঠিকানার সাংসারিক কর্তা যে ভিন্ন নামে একই লোক—এ তথ্য কেউই জানে না। এই কথা বা এই ঠিকানা যে জানত সে হিরালাল। তার মুখ তো সে বন্ধ করেই এসেছে। তবে আর কে আছে যে এই নীলা—যা তার নির্জন ঘরের মধ্যে, তার চোখের সামনে, তার হাতের উপরে ধরা রয়েছে—তা ছিনিয়ে নিয়ে যাবে?—সেই আকাশ-চেরা অট্টহাসি?—এই ঠক-ঠক কাঠের পায়ের শব্দ?—অশরীরী প্রেতের অনুসরণ? অবাস্তবের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে বাস্তব স্বার্থ ত্যাগ করতে পান্নালাল কেন, কোনও মানুষই সহজে পারে না...তবু তার হাত দুটো কেঁপে উঠল! হাতের উপর নীলার স্নিগ্ধ স্ফটিক দীপ্তি যেন ক্রুদ্ধ পাবকশিখার মতো জ্বলে উঠল,—নীলা তো নয়, যেন অগ্নিদেবের রুষ্ট আঁখির তারা, নীল শিখার বিচ্ছুরণে পান্নালালের সবকিছুকে বুঝি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেবে। পান্নালালের সারা দেহে শিহরণ তুলে শিরায় শিরায় যেন গুপ্ত সরীসৃপের দল একসঙ্গে বিচরণ করে গেল। সে ধীরে ধীরে নীলাখানা আবার তার পকেটে রাখল; এবং চৌকি থেকে উঠে ঘরের মধ্যে ইতস্তত পায়চারি করতে লাগল। চিন্তাক্লিষ্টভাবে সে আবার আপন মনেই প্রশ্ন করে —“তাই তো, আজকের এ-সব ব্যাপারের অর্থ কী! কে তখন অট্টহাসি হাসলে?— এ ঘরে থেকে থেকে কাঠের পায়ে চলে বেড়াচ্ছেই বা কে? ...

অনেকক্ষণ পান্নালালের এমনি করেই কাটে! কোনও রহস্যের কোনও সমাধানই সে খুঁজে পায় না। এতক্ষণ পর্যন্ত কোনও ঠক-ঠক শব্দও শোনা গেল না, কোনও অট্টহাসিও কেউ হাসল না। যত সময় যাচ্ছে এই দুই রহস্যের গুরুত্বও পান্নালালের কাছে কমে আসছে। সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে উন্মুখ যে তার আশঙ্কা অমূলক, ভিত্তিহীন আশঙ্কায় সে কোনও মিথ্যা বিভীষিকার আতঙ্ক ভোগ করছিল।

ক্রমেই মনটা তার হালকা হয়ে আসে। নিজের জন্যে তার হাসতে ইচ্ছে করে—তার মনের মধ্যে এত বড়ো দুর্বলতা কেমন করে বাসা বেঁধে ছিল। ঘরের বাতাসকে উদ্দেশ্য করেই সে যেন কৌতুকভরে বলে

—ওহে বাপু কেঠো ভূত! তুমি আর একবার তোমার অট্টহাসি হাসো দেখি, আর- একবার ঘট-ঘটিয়ে চলে বেড়াও দেখি। তুমি যদি সত্য হও, যদি জ্যান্ত হয়ে আমাকে দেখা দিতে পার, তাহলে এখনই তোমার সাধের নীলা আমি তোমাকেই ফিরিয়ে দেব। এই দ্যাখো তোমার নীলা আমার পাঞ্জাবির ডান পকেটে রয়েছে! পারো তো জোর করে কেড়ে নাও!...হা-হা-হা-হা, কাঠের মূর্তি যদি জ্যান্ত হত, তাহলে পৃথিবী যেত উলটে! যত সব আজগুবি কথা!’

পান্নালালের স্বগত প্রলাপের মাঝে হঠাৎ তার ঘরের দরজায় যেন কে আঘাত করল।

পান্নালাল ‘কে রে’ বলে চমকে ওঠে!

বাইরে থেকে আস্তে আস্তে রামু উত্তর দিল

—‘আমি, হুজুর!’

পান্নালাল যেন আশ্বস্ত হয়, দরজাটা খুলে জিজ্ঞাসা করে

—'কী রে রামু?”

অত্যন্ত চাপা গলায় সভয়ে রামু বলে

—হুজুর, পুলিশ!

সচমকে পান্নালাল বলে ‘পুলিশ! কোথায়?’

রামু ‘বাড়ির চারিদিকে। তারা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে, হুজুর! সদর দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা মারার শব্দ আসছে। পান্নালালের মনে হচ্ছে, ঠিক কিছুক্ষণ আগেই যেমন ও-বাড়িতে হয়েছিল, এখানেও যেন তারই পুনরাভিনয় ঘটছে। রামু বলল

—ওই শুনুন হুজুর, তারা বাড়িতে ঢুকতে চায়। দরজা কি খুলে দেব?' পান্নালাল গম্ভীরভাবে কী চিন্তা করল এবং রামুর দিকে মুখ তুলে কঠোরস্বরে বলল —'না!’

রামু “ওরা যে দরজা ভেঙে ফেলবে!’

পান্নালাল ‘ফেলুক! তুই গিন্নির ঘরের দরজার বাইরে থেকে শিকল তুলে দে ! পুলিশ দেখলে গিন্নি ভয় পাবে। —যা।’

রামু ‘যে আজ্ঞে’ বলেই ছুটে গেল—গিন্নিমার ঘরের দিকে। প্রভা এতক্ষণ ঘুমে অচেতন তার ঘরে বাইরে থেকে শিকল বন্ধ হল, সে এসব ব্যাপারের বিন্দু-বিসর্গও জানতে পারল না।

পান্নালাল এই প্রথম যেন পুলিশের কাছে সহায়হীন বলে নিজেকে ভাবতে পারল। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে দমাদম আওয়াজ আর চিৎকার—বিরাম নেই। একটু ভাববারও সময় যদি সে পেত! মনের মধ্যে এক-একটা চিন্তা আকাশে বিদ্যুৎ হানার মতো সর্বদিক ক্ষণিকের আলোকে ভাসিয়ে তুলেই অনন্ত অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আজকে সন্ধ্যা থেকে যে-সমস্ত ঘটনা ঘটছে তা একেবারে খাপছাড়া—প্রত্যেকটাই অচিন্ত্যপূর্ব, বিচিত্র। ভয়াবহতায় কোনওটাই কম নয়। বিভিন্ন ঘটনা বিভিন্ন প্রকারের উপদ্রব বহন করে তার দিকে ছুটে আসছে। যেন ডারবি ঘোড়ার রেস চলেছে তার এক রাত্রির জীবনের উপর দিয়ে—ভ্রুক্ষেপহীন নির্দয় গতিতে আসছে আশঙ্কা-আতঙ্ক-বিভীষিকা-রোমাঞ্চকর পরিহাস। এদের প্রতিরোধ করা অসাধ্য। কোনও সমস্যারই সমাধান আর নেই। তাই সে নিজে নিজেই বিড়বিড় করে বলে

‘পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করেছে—এ বাড়ি থেকে পালাবার গুপ্তপথ নেই!...হুঁ! তাহলে আমার লীলাখেলা ফুরুবার সময় হয়েছে।...কিন্তু পুলিশ এ-বাড়ির ঠিকানা পেলে কোথায়?— আমি ডাঃ জেকিল আর মিঃ হাইডের জীবনযাপন করি। এ বাড়ির উপরে পুলিশের সন্দেহ হল কেন? এখানকার ঠিকানা জানত খালি হিরালাল, কিন্তু সে তো এখন যমের বাড়িতে!’ পান্নালাল এখনও জানে না যে তার গুলিতে হিরালাল মরেনি। যদি তা জানত, যদি তেমন সন্দেহও তার হত, তাহলে হয়ত সে পুলিশের হাতে নিজের ঘরের মধ্যে অন্তত এমন করে বন্দি হত না। যাই হোক, পান্নালালের দুর্ধর্ষ দুঃসাহসিক জীবনে এই দুর্দান্ত ভুলের আর কোনও নিরাকরণ হবে না। এই অবস্থায় সে যদি জানতেও পারে যে হিরালাল মরেনি, সে- ই এ বাড়ির ঠিকানা প্রকাশ করার মূল,—তাহলেও সে নিরুপায়। পান্নালাল কেমন যেন মরিয়া হয়ে ওঠে। অনেকদিন অপরের জীবন নিয়ে অনেক ছিনিমিনি খেলা সে খেলেছে, আজ নিজের জীবনটা দিয়ে তেমনই খেলাই সে করবে। প্রতিপক্ষের কাছে পরাজয় স্বীকার যদি করতেই হয় তবে অহিংস নির্বিরোধ পন্থার চেয়ে সহিংস্র প্রতিরোধ অধিকতর সম্মানকর প্রাণ তো এমন করেই যাবে—আজ যদি সেইদিন এসেই থাকে তবে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। তাই এইসব দুর্বোধ্য ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ আলোচনা সে মন থেকে একরকম মুছে ফেলে নিতান্ত মরিয়া হয়েই নিজের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত যেন নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলল

—‘যাক, এখন ও-সব ভেবে লাভ নেই—এ কাঠের ভূত নয়, জ্যান্ত পুলিশ!—ওই ওরা বুঝি সদর দরজা ভেঙে ফেললে। আমিও এখন ঘরের দরজা বন্ধ করি—প্রাণ থাকতে আত্মসমর্পণ করব না!'

এই বলেই সশব্দে পান্নালাল তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। ওদিকে সদর দরজা ভেঙে পড়ার আওয়াজের পরই সিঁড়ি বেয়ে সশস্ত্র পুলিশের দলবল দ্রুত পদশব্দ তুলে উপরে উঠে আসছে। বারান্দার উপরে উঠে রামুকে ইনস্পেকটার জিজ্ঞাসা করে —‘এই! কে তুই?’

রামু ‘আমি চাকর, হুজুর!'

ইনস্পেকটার ‘তোর বাবু তো পান্নালাল?'

রামু ভ্যাবাচেকা খেয়ে আমতা আমতা করতে লাগল —'আজ্ঞে ন-না,—হ্যাঁ হুজুর —কী লালবাবু?'

ইনস্পেকটার ‘বুঝেছি! তোর যে বাবু সে কোথায়?” রামু ‘ও-ওই ঘরে হুজুর!'

ইনস্পেকটার সদলবলে গটগট করে পান্নালালের ঘরের দিকে এগোল। ঘরের ভিতর থেকে দরজা বন্ধ দেখে জোরে জোরে ধাক্কা দিতে দিতে ইনস্পেকটার বললে —‘পান্নালাল, আর লুকোচুরি মিছে, দরজা খোলো !

ঘরের ভিতর থেকে পান্নালালের দৃঢ় কণ্ঠ সুস্পষ্ট শোনা গেল

—“দরজা আমি খুলব না।'

ইনস্পেকটার ‘তাহলে দরজা ভেঙে ফেলব।'

পান্নালাল ‘যে এ-ঘরে ঢুকবে, তাকে আমি গুলি করে মেরে ফেলব! ইনস্পেকটার আদেশ দিল ‘এই জমাদার!—এই সেপাই! ভেঙে ফ্যালো দরজা! দেখি কে কাকে গুলি করে !

দরজার উপরে দুম-দাম শব্দে ভারী লাথি পড়তে লাগল। প্রত্যেক আঘাতে সমস্ত বাড়িখানা কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিরীহ নিরুপদ্রব এই পল্লি ত্রস্ত চকিত চঞ্চল হয়ে উঠল। বাড়ির বাইরে লোকজন ভিড় করে জমছে—তাদের বিস্ময় আর চাপা কোলাহলে সমস্ত ব্যাপারটা যেন আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এইসব হই চই ছাপিয়ে আচম্বিতে ঘরের ভিতরে জাগল এক সুদীর্ঘ অট্টহাস্য—হা-হা-হা-হা-হা! ইনস্পেকটার চমকে উঠে প্রশ্ন করে —'কে হাসে অমন করে?'

স্যর, স্যর, সাপ স্যর, মস্ত গোখরো সাপ!

সাব-ইনস্পেকটার ‘স্যার, স্যার, আসামি ভয়ে পাগল হয়ে গেছে স্যার!

ইনস্পেকটার ‘পাগলেও কি অমন করে হাসে?'

হঠাৎ ঘরের ভিতর জাগল একটা তীব্র আর্তনাদ। ঘুমন্ত রাত্রির পঞ্জরে যেন কোনও গুপ্ত ছুরি অতর্কিতে আমূল বিদ্ধ হয়ে গেল! আর সারা প্রকৃতি বুঝি মর্মান্তিক আতঙ্কে তীব্র দীর্ঘস্বরে চিৎকার করে উঠল। ইনস্পেকটার বিস্মিত কণ্ঠে বলে

—ও কী যন্ত্রণার চিৎকার!'

সাব-ইনস্পেকটার দরজায় কান পেতে থেকে বলল

—'স্যার, স্যার, দরজায় কান পেতে আমি কী শুনছি জানেন?

ইনস্পেকটার ‘কী শুনছ?'

সাব-ইনস্পেকটার ‘কে যেন কাঠের পা ফেলে খট খট করে ছুটোছুটি করছে!” ইনস্পেকটার ‘ছুটোছুটির নিকুচি করেছে! ভাঙ দরজা!’

আবার পদাঘাতের পর পদাঘাত! হুড়মুড় করে দরজা ভেঙে পড়ল। দেখা গেল পান্নালাল মেঝের উপর চিত হয়ে পড়ে রয়েছে। ঘরে ঢুকেই সাব-ইনস্পেকটার চিৎকার করে ওঠে

—স্যার, স্যার, সাপ স্যার, মস্ত গোখরো সাপ!’

—‘সাপটা মরল না স্যার, জানালা দিয়ে পালাল!'

ইনস্পেকটার ‘তোমাদের হাতে একটুও টিপ নেই!' সাব-ইনস্পেকটার “আজ্ঞে, আপনিও তো রিভলবার ছুড়েছিলেন স্যার! ইনস্পেকটার ‘এখন তর্কের সময় নয়, ওদিকে চেয়ে দ্যাখো, আসামিকে বোধহয় সাপে কামড়েছে!'

সাব-ইনস্পেকটার ‘বোধহয় কী, কামড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে! দেখুন, মড়ার মতো পড়ে রয়েছে, ওর মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে! সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত রক্তারক্তি!'

ইনস্পেকটার ‘আগে ওর জামাকাপড় খুঁজে দ্যাখো নীলাখানা পাওয়া যায় কিনা।' সাব-ইনস্পেকটার পান্নালালের মৃতদেহটা নেড়েচেড়ে খুঁজে দেখতে দেখতে বলে —'না স্যার, নীলা নেই! এর পাঞ্জাবির ডান-পকেটটা কে জোর করে টান মেরে ছিঁড়ে নিয়েছে!

ইনস্পেকটার ‘ছেঁড়া-পকেটটা ওই তো মেঝের উপর পড়ে রয়েছে! দ্যাখো, দ্যাখো ওর ভিতরে নীলা আছে কিনা?”

সাব-ইনস্পেকটার ‘উহুঁ, নেই স্যার!’

ইনস্পেকটার ‘তাহলে রাস্কেল পান্নালাল নিজেই নিজের পকেট ছিঁড়ে নীলাখানা রাস্তায় ফেলে দিয়েছে!'

হঠাৎ সমস্ত উত্তেজনা ছাপিয়ে রাত্রির আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে বাড়ির বাইরে আবার সেই অট্টহাসির শব্দ উঠল—তীব্র পৈশাচিক হাসি—হা-হা-হা-হা!

ইনস্পেকটার ‘আবার সেই হাসি, এবার বাইরে!—আশ্চর্য!’ সাব ইনস্পেকটার ‘ও ভূতের হাসি স্যার!’

ইনস্পেকটার ‘ভূত! হুঁঃ!—আইন ভূত মানে না। দৌড়ে যাও, কে হাসছে ধরে নিয়ে এসো! হয়ত ওই বেটাই নীলা চুরি করে সরে পড়েছে!'

ইনস্পেকটার ও দুজন কনস্টেবল ভিন্ন আর সকলে ছুটে নিচের দিকে অগ্রসর হল....অট্টহাসি ক্রমে দূর থেকে আরও দূরে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই সব হই চই উত্তেজনার মধ্যে প্রভা তার বন্ধ ঘরে ঘুম থেকে জেগে চিৎকার করে উঠে কখন মূর্ছিত হয়ে পড়ল কেউ তা জানতেও পারল না। ইনস্পেকটার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পায়ের কাছে মেঝের উপর পান্নালালের অন্তিমশয্যা। তার জন্যে কোনও চোখে একবিন্দু অশ্রুপাত হল না, কোনও বুকে একটু ব্যথার আঁচড়ও পড়ল না—একটা সত্তপ্ত নিশ্বাসের পাত্রও সে বুঝি নয়!

আকাশের পরপার থেকে যেন আরও দু-একবার সেই বিকট হাসির প্রতিধ্বনি কানে এসে বাজে তারপর একেবারে মিলিয়ে যায়।—আর সেই নীলা?—কে জানে, হয়ত সুদূর সাঁওতাল-পরগণার পর্বত-গুহায় সেই অদ্ভুত প্রেত-দেবতার বারো ফুট উঁচু কাঠের মূর্তির গলায় সে সর্বনাশা নীলা এতক্ষণ আবার দুলিয়ে তুলছে তার সর্বনাশা সম্মোহনী দীপ্তি— তার নীল গায়ে রাঙা রক্তের দাগ এখনও হয়ত পান্নালালের দেহের উত্তাপ হারায়নি।

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%