হেমেন্দ্রকুমার রায়
সুখে ছিলুম উত্তর-বাংলায়। কিন্তু উত্তর-বাংলা হঠাৎ পরিণত হল পাকিস্তানে। সে আস্তানা ত্যাগ করতে বাধ্য হলুম।
এলুম কলকাতায়। কিন্তু ভারতের রাজধানী হবার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েও ভারতের সর্বপ্রধান নগরী বলে কীর্তিত কলকাতায় মাথা গোঁজবার জন্যে একটিমাত্র খালি গর্ত পর্যন্ত খুঁজে পেলুম না। অবশেষে—হ্যাঁ, বহু অন্বেষণা ও পদচালনার পর অবশেষে— হাওড়ার শেষ প্রান্তে ভাড়া পাওয়া গেল একখানা ছোট্ট, সেকেলে, নড়বড়ে বাড়ি।
বাড়ি তো ভারী! বুড়ো বাড়ি, বয়স তার ষাট-সত্তরের কম নয়। দোতলায় একখানা ঘর একটুখানি দালান। তিনখানা ঘর একতলায়। সব ঘরই ছোটো ছোটো। তিন-চার যুগের মধ্যে বাড়ির কোথাও যে রাজমিস্ত্রির হাত পড়েছে, এমন সন্দেহ প্রকাশ করবার উপায় নেই। ভাঙা, রেলিংহীন সিঁড়ি, তার উপরে পদার্পণ করলে বুকও কাঁপে, সিঁড়িও কাঁপে। সর্বত্রই দেওয়ালের চুন-সুরকির প্রলেপ খসে পড়েছে কিংবা খসে পড়ি পড়ি করছে। কোনও কোনও জানালার গরাদ ভাঙা। একতালার রোয়াকে যে এক সময়ে সিমেন্টের আবরণ ছিল, তার কিছু কিছু পরিচয় আজও পাওয়া যায়। মেটে উঠান, বর্ষাকালে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কাদায় বসে যায় ৷
কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে বাড়ির পশ্চিম দিকে জমিটা। সেখানে আছে পানায় ভরতি ডোবার মতো একটা ছোটো পুকুর আর বেশ বড়ো বড়ো একটা জঙ্গল, তাকে নিবিড় অরণ্য বলা চলে। সেখানে রোজ রাত্রে নিয়মিতভাবে কণ্ঠসাধনা করতে আসে শৃগালরা। সেখানে যখন তখন আনাগোনা করে নানা জাতের সাপ ও সরীসৃপরা, তাদের কেউ কেউ বাড়ির ভিতরেও তদারক করতে আসে মাঝে মাঝে।
প্রথম যেদিন এখানে পদার্পণ করি, বাড়ি দেখেই গৃহিণী কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, ‘ও মাগো এ বাড়িতে আমি থাকতে পারব না।’
আমি বললুম, ‘থাকতে পারবে না কী সরলা, থাকতেই হবে। ভারত অঙ্গহীন হয়েছে বটে, আমরা বাস্তুহারা হয়েছি বটে, কিন্তু গান্ধিজি-নেহরু-প্যাটেলের কৃপায় আমরা যে এখন স্বাধীনতা পেয়েছি। সেই স্বাধীনতার মূল্য দিতে হবে না?”
পরিবারের মধ্যে কেবল আমি, সরলা, কুত্তা টুনি ও বিল্লী মেনি। আমরা নিঃসন্তান, তাই শেষোক্ত দুটি চতুস্পদের সাহায্যে সরলা তার মাতৃহৃদয়ের অভাব কতটা পূরণ করবার চেষ্টা করত।
আমরা এখানে এসেছিলুম বর্ষার শেষে। একটু বেশি জোরে বৃষ্টি হলেই দোতলার ঘরের ছাদ দিয়ে ঝরত অনর্গল জল। দিনের বেলায় একতালার ঘরে এসে আত্মরক্ষা করতুম, কিন্তু রাত্রে সরলা কিছুতেই একতলায় নামতে রাজি হত না।
বলত, ‘পাড়ার লোকের মুখে শুনেছি এখানা হানাবাড়ি। রাত্রে আমি নীচেয় নামতে পারব না।'
আমি বলতুম, ‘গিন্নি, পাড়ার লোকরা ভ্রান্ত। ভূতেরা নির্বোধ নয়, হানা দেবার জন্যে তারা এমন একখানা যাচ্ছেতাই বাড়ি নির্বাচন করবে না।'
কিন্তু সরলা তবু নীচে নামবার নামও মুখে আনত না।
টুনি আর মেনি বৃষ্টি-সমস্যার সমাধান করে ফেলেছিল খুব সহজেই। রাত্রে ছাদ ফুঁড়ে ধারাপাত হলেই তারা খাটের তলায় গিয়ে ঢুকতে একটুও দেরি করত না। খাটের বিছানা ভিজলেও তাদের দেহ ভিজত না। শেষটা আমরাও তাদের অনুসরণ করতে বাধ্য হতুম। সারমেয়-মার্জারের কাছেও মনুবংশীয়রা জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
বর্ষা কাটল, শীত এল, আমরাও অস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম। কিন্তু তারপর থেকে ঘটতে লাগল সব ভয়াবহ ঘটনা। সত্যই কি এখানা হানাবাড়ি?
একদিন সন্ধ্যার পর টুনি চাঁদের আলোয় বাগানে বেড়াতে গিয়েছে। শোনায় ভালো বলে জঙ্গলের নাম দিয়েছিলুম আমরা ‘বাগান’।
টুনি অবশ্য চন্দ্রকিরণ উপভোগ করবার জন্যে বাগানে বেড়াতে যায়নি। ওখানে সে যেত ভেক শিকার করতে। হাওড়া অঞ্চলে ভেক শিকারে সে ছিল অদ্বিতীয় I
কিন্তু সেদিন টুনি বাগানে গিয়ে হঠাৎ আর্তস্বরে প্রাণপণে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তারপর সব চুপচাপ। একটা লন্ঠন ও লাঠি নিয়ে বাগানে ছুটে গেলুম। কিন্তু টুনির কোনও চিহ্নই আর আবিষ্কার করতে পারলুম না। তারপর সে আর ফিরে আসেনি। সরলা কেঁদে কেঁদে অস্থির।
মেনি শিকার করত বাড়ির ভিতরেই। সে ছিল ইঁদুর ও আরশোলা মারতে ওস্তাদ। কিন্তু সে-ও রাত্রে উদ্যান-ভ্রমণ করতে ভালোবাসত। বোধহয় সে উদ্যানবিহারী অন্যান্য বিড়ালদের সঙ্গে আলাপ করতে যেত। কিন্তু একদিন রাত্রে সে-ও বাগানে গিয়ে বিকট চিৎকার করে কেঁদে উঠে একেবারে নিখোঁজ হল।
ব্যাপার ক্রমেই আরও সঙিন হয়ে উঠল। রাত্রি হলেই বাড়ির একতলায় কারা যেন আনাগোনা করে, এটা-ওটা-সেটা নিয়ে টানাটানি করে। শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি, সরলার নিষেধ না মেনেই নীচে নেমে যাই, কিন্তু জনপ্রাণীকেও দেখতে পাই না।
রান্নাঘরে খাবার থাকলেই কে খেয়ে যায়। ধরলুম ভাঙা জানালা দিয়ে বাড়ির ভিতরে চোর আসে। কিন্তু সে বাসন-কোসন চুরি না করে কেবল খাবার খেয়েই খুশি হয়ে সরে পড়ে কেন?
তারপর এক গভীর রাত্রে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি, বিছানার এক কোণে দুই হাতে দুই কান চেপে সরলা সভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে। —‘ব্যাপার কী সরলা? কী হয়েছে, তুমি অমন কাঁপছ কেন?”
শিউরোতে শিউরোতে সরলা বললে, ‘বাগান থেকে কে হেসে হেসে উঠছে।'
তার মুখের কথা ফুরোতে না ফুরোতেই শুনলুম, বাড়ির পশ্চিম দিকের জঙ্গলের ভিতরে উঠল হা হা হা হা হা হা অট্টহাস্যের ধ্বনি। তেমন ভয়ঙ্কর অট্টহাসি আমি জীবনে আর কখনও শুনিনি। সরলা তো ভীরু নারী মাত্র, সে হাসি শুনে আমারও সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
ও কে হাসে? কোনও পাগল-টাগল? কিন্তু পাগলও তো মানুষ, আর ও হাসি যে একেবারেই অমানুষিক। ও অট্টহাসির মধ্যে রয়েছে যেন একটা অপার্থিব, অমঙ্গলকর, বিশ্বগ্রাসী বুভুক্ষা। কোনও পাগলই অমন করে হাসতে পারে না।
সরলা সাশ্রুনেত্রে বললে, ‘ওগো, এখনও কি তুমি বিশ্বাস করবে না? এখানে ভূত আছে। কালকেই এখান থেকে পালাই চলো।'
আমি বললুম, না। কাল সকালে উঠে আগে আমি একটা বন্দুক কিনে আনব। শেষ পর্যন্ত না দেখে কাপুরুষের মতো বাড়ি ছেড়ে পালাব না।'
পরের দিন রাত্রেও আবার সেই ভীষণ হাস্যধ্বনি শুনলুম বটে, কিন্তু অনেক দূর থেকে। বন্দুক হাতে নিয়ে দোতলার জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম, কিন্তু হাস্যধ্বনি আর কাছে এগিয়ে এল না। নৈশ আকাশকে বিষাক্ত করে তুলে হাসি থামল এবং তার পরিবর্তে জেগে উঠল পথের কুকুরদের ভীত আর্তধ্বনি।
আর একটা বিষয় লক্ষ করছি। আজ কয়দিন ধরে পশ্চিমের জঙ্গলে শৃগাল-সভায় কোলাহল শোনা যাচ্ছে না। কোনও অজ্ঞাত বিভীষণ নিশাচরকে দেখে তারা এখান থেকে পালিয়ে গিয়েছে?
পরদিন আমাদের বাগানের পুকুরের কাছেই উঠল আবার সেই ভৈরব অট্টহাস্যধ্বনি! সে যেন খালি হাসিও নয়, কাশিও বটে। কে যেন একসঙ্গেই বিকট স্বরে কাশছে আর হাসছে, কাশছে আর হাসছে। কী তীব্র ধ্বনি, খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল যেন রাত্রির নিস্তব্ধতা।
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছি, হাতে বন্দুক প্রস্তুত।
পাণ্ডু চাঁদ, ছায়ামাখা আলো। হাস্যধ্বনি মৌন। পুকুর-পাড়ের একটা ঝোপ নড়ছে। তারপর দেখা গেল দুটো আগুনের গুলি। কে যেন ঝোপের ভিতরে বসে বসে আমাকে নিরীক্ষণ করছে জ্বলন্ত চক্ষে।
সেই অগ্নিময় হিংসুক চোখদুটোর মাঝখান লক্ষ করে টিপলুম আমার বন্দুকের ঘোড়া। সঙ্গে সঙ্গে নিবে গেল দীপ্ত চোখদুটো।
পরের দিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বাগানের ভিতরে ছুটে গেলুম। পুকুরপাড়ের সেই ঝোপের কাছে গিয়ে দেখি, একটা মস্তবড়ো হায়না সেখানে মরে কাঠ হয়ে পড়ে আছে।
চমৎকৃত হলুম, প্রথমটা নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলুম না হায়নার হাসি বিশ্রী অট্টহাসির মতো বটে, কিন্তু হাওড়া শহরে হায়না! এও কি সম্ভবপর?
দু-দিন পরেই এ রহস্যেরও কিনারা হল। খবর পাওয়া গেল, হাওড়ার ময়দানে একটা সার্কাসের দল এসেছে, কয়েক দিন আগেই তার পশুগৃহ থেকে একটা হায়না কেমন করে পালিয়ে গিয়েছিল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন