মড়ার মৃত্যু

হেমেন্দ্রকুমার রায়

ভৈরবের পরিচয়

যে ঘটনার কথা বলব, সেটা কেউ বিশ্বাস করবেন কি না জানি না। সত্যি কথা বলতে কি, এটা বিশ্বাস করবার মতো কথাও নয়। বিংশ শতাব্দীতে কলকাতা শহরে বসে এমন ঘটনার ধারণাও করা অসম্ভব।

যদিও কলকাতার মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র দিলীপকুমার সেন এই ঘটনার আগাগোড়াই লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, এবং তার সাক্ষীরও অভাব নেই, তবু সমস্ত রহস্যই যে স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়েছে এমন কথা বলা যায় না। যেসব ঘটনা অলৌকিক, পার্থিব জগতে তাদের অস্বাভাবিকতার যুক্তিসঙ্গত কারণ আবিষ্কার করা সহজ নয়। আমরাও সে চেষ্টা করব না, কেবল সোজা কথায় সমস্ত ব্যাপারটা পাঠকদের কাছে বর্ণনা করব। যাঁদের বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হবে না তাঁদের বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলবার নেই।

দিলীপ আজ চার বছর কলকাতার মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রজীবন যাপন করছে। সে নির্জনতা ভালোবাসত বলে টালিগঞ্জের এমন এক জায়গায় বাসা নিয়েছিল যেখানে লোকালয় কম, মাঠ-ময়দান ও গাছপালাই বেশি। টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর পিছন দিয়ে যে সুদীর্ঘ রাস্তাটি সোজা গড়িয়াহাটার দিকে অগ্রসর হয়ে গেছে, দিলীপের বাসাবাড়িটি ছিল তারই এক ধারে। তার পড়বার ঘরে বসে চারিদিকে তাকালে দেখা যায় কেবল সুনীল আকাশ, সবুজ মাঠ আর দূরে ও কাছে বনজঙ্গলের জীবন্ত ছবি। কোথাও কোনও গোলমাল নেই, মাঝে মাঝে কেবল দ্রুতগামী মোটরের কর্কশ চিৎকার আশপাশের মৌনব্রত ভাঙবার অল্পস্বল্প চেষ্টা করে।

কিন্তু বাসাবাড়িতে দিলীপ খালি একলাই থাকত না। একতালাটি ছিল দিলীপের এবং দোতালায় বাস করত ভৈরবচন্দ্র চৌধুরী নামে আর একটি যুবক। তার সঙ্গে এখনও দিলীপের ভালো করে পরিচয় হয়নি, কারণ ভৈরব অল্পদিনই এই বাসায় এসে উঠেছে।

একদিন সকালে কতকগুলো মড়ার হাড় ও মোটা মোটা ডাক্তারি কেতাবের মাঝখানে বসে দিলীপ নিজের মনেই পড়াশুনা করছে, এমন সময়ে তার দুই বন্ধু প্রতাপ ও অবনী এসে হাজির। এদেরও দুজনের বাড়ি ছিল টালিগঞ্জেই এবং তারা প্রায়ই দিলীপের সঙ্গে গল্প করতে আসত ৷

বই থেকে মুখ তুলে দিলীপ সুধোলে, “কিহে, সক্কালবেলায় কি মনে করে?’ প্রতাপ একখানা চেয়ারের উপরে বসে পড়ে বললে, 'আমি এসেছি তোমার সঙ্গে গল্প করতে, আর অবনী এসেছে তার হবুভগ্নিপতির সঙ্গে দেখা করতে।’

দিলীপ একটু আশ্চর্য হয়ে বললে, 'আমার বাড়িতে অবনীর হবুভগ্নিপতি? তার মানে?” —“তোমার বাসায় যে ভৈরবচন্দ্রের আবির্ভাব হয়েছে, তারই সঙ্গে অবনীর বোনের বিয়ের কথা হচ্ছে যে !

—বটে, তা তো আমি জানতুম না! ভৈরববাবু তাহলে একটি ভালো পাত্র, বিয়ের বাজারে তাঁর দাম আছে?” অবনী হাসতে হাসতে বললে, “ঘটকরা তো তাই বলছে, কিন্তু প্রতাপ তা স্বীকার করে না।

— 'কেন?'

প্রতাপ বললে, ‘ভৈরবকে আমি কিছু কিছু চিনি। তার নাম বা স্বভাব কিছুই মিষ্ট নয়।

দিলীপ বললে, 'ভৈরববাবুর কথা আমি কিছুই জানি না। কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে তোমার আপত্তির কারণ কি?

— ভৈরব হচ্ছে ভবঘুরে। তার বয়স তিরিশের বেশি নয়, কিন্তু এই বয়সেই সে মিশর, আরব, পারস্য, চীন আর জাপান প্রভৃতি দেশ ঘুরে এসেছে।'

—‘দেশভ্রমণ কি দোষের বিষয়?”

—"না। লোকে নানান উদ্দেশ্যে দেশভ্রমণ করে। কিন্তু ভৈরব যে কিসের খোঁজে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায় তা শিবের বাবাও জানেন না। তার দেশভ্রমণের উদ্দেশ্য অত্যন্ত সন্দেহজনক। সে যে দেশেই গিয়েছে সেইখান থেকেই নানান সব সেকেলে জিনিস সংগ্রহ করে এনেছে। তার মতন একেলে ছেলের অত সেকেলে জিনিস সংগ্রহ করবার ঝোঁক কেন, তারও খবর কেউ রাখে না। এসব রহস্য আমি পছন্দ করি না।'

দিলীপ সকৌতুকে হেসে উঠে বললে, 'তুমি দেখছি অকারণেই ভৈরববাবুর উপর খাপ্পা হয়েছ! ভৈরববাবুর সেকেলে জিনিস সংগ্রহ করবার বাতিক থাকতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে আমি তো কিছু অন্যায় দেখছি না!

প্রতাপ বললে, “তাহলে তার স্বভাবের একটু পরিচয় দি, শোনো। নন্দলালকে তুমি চেনো তো, সেও মেডিক্যাল কলেজে পড়ে। এই পরশুদিনই নন্দলালের সঙ্গে ভৈরবের রীতিমতো একটা ঠোকাঠুকি হয়ে গেছে!

—“কি রকম, কি রকম?

—“তোমার মনে আছে বোধহয়, পরশু সকালে কিরকম বর্ষা নেমেছিল? সেই সময় টালিগঞ্জের একটা খুব সরু গলির ভিতর দিয়ে ভৈরব কোথায় যাচ্ছিল। পথের ওদিক দিয়ে মাথায় একটা মস্ত বড়ো শাকসবজির ঝুড়ি নিয়ে এক বুড়ি আসছিল বাজারের পানে। বদমাইস ভৈরবটা কি করলে জানো? সেই বুড়ি-বেচারিকে এমন এক ধাক্কা মেরে এগিয়ে গেল যে, ঝুড়িসুদ্ধ বুড়ি পড়ল গিয়ে পাশের এক খানার ভিতরে মুখ গুঁজড়ে! দৈবক্রমে নন্দলালও ঠিক সেই সময়েই সেখানে এসে পড়ে। ভৈরবের নিষ্ঠুরতা দেখে নন্দলাল একেবারেই ক্ষেপে গেল। সে তখনই ভৈরবকে রীতিমতো উত্তম-মধ্যম দিতে কসুর করলে না। তারপর থেকে ভৈরবের সঙ্গে নন্দলালের কথা বন্ধ হয়েছে। এখন বলো দেখি, এর পরেও কি আর ভৈরবের উপরে কারুর শ্রদ্ধা থাকতে পারে? এই লোকের সঙ্গেই অবনী দিতে চায় তার বোনের বিয়ে! আশ্চর্য!”

অবনী অপ্রতিভ স্বরে বললে, 'কি করব ভাই, বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার কি কথা কওয়া উচিত? ভৈরব নাকি ধনীর ছেলে, তার উপরে গ্রাজুয়েট! বাবার মতে এমন পাত্র নাকি হাতছাড়া করতে নেই! আমি আজ পাকা দেখার দিন স্থির করতে এসেছি।’

প্রতাপ বললে, “তাহলে তুমি তাড়াতাড়ি ভৈরবচন্দ্রের চন্দ্রমুখ দর্শন করে এস। ততক্ষণে আমি দিলীপের স্টোভ জ্বেলে একটু চা তৈরির চেষ্টা করি।'

দিলীপ আবার একটা মড়ার মাথার খুলি টেনে নিয়ে বললে, 'দেখো ভাই অবনী, বিয়ের পরে তোমার বোন সুখী হবেন কি না জানি না, কিন্তু বিয়ের দিনে যেন আমরা লুচি-মণ্ডা থেকে বঞ্চিত না হই।’

কে চ্যাঁচায়?-কেন চ্যাঁচায়?

চা পান করে প্রতাপ চলে গেলে পর দিলীপ আবার ভালো করে পড়ায় মন দেবার চেষ্টা করছে, এমন সময় হঠাৎ বিষম তোড়ে বৃষ্টি নামল। টালিগঞ্জের সেই নির্জন ও অন্ধকার মাঠের শূন্যতা বৃষ্টি ও ঝড়ের কোলাহলে পূর্ণ হয়ে উঠল। দিলীপ উঠে জানলাগুলো বন্ধ করে ঘরের দরজাটাও বন্ধ করতে যাচ্ছে, এমন সময় অবনী নিচে নেমে এসে ব্যস্ত হয়ে বললে, ‘দরজা বন্ধ করছ কি হে, এই বৃষ্টিতে আমি যাব কোথায়?”

দিলীপ বললে, ‘কে তোমায় যেতে বলছে? ঘরের ভেতরে এস। ইজিচেয়ারে শুয়ে চুপ করে বৃষ্টির গান শোনো, আর আমি নিজের মনে লেখাপড়া করি।'

অবনী ঘরে ঢুকে ইজিচেয়ারে বসে পড়ে বললে, ‘এই বাদলায় রাখো তোমার লেখাপড়া ! এস, খানিকটা গল্পগুজব করা যাক।’

দিলীপ অনিচ্ছাসত্ত্বেও বই মুড়ে বললে, 'আজ যখন শনি-অবতার তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে, তখন আমার লেখাপড়া যে হবে না সেটা আগেই বুঝতে পেরেছিলুম! বেশ, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক!'

বাইরে পড়তে লাগল বৃষ্টি, আর ভিতরে চলতে লাগল দুই বন্ধুর গল্প। একঘণ্টা পরেও বাইরের বৃষ্টি ও ভিতরের গল্প থামবার কোনও লক্ষণই দেখা গেল না।

ঘরের ঘড়িতে টুং টুং করে যখন এগারোটা বেজে গেল, অবনীর তখন খেয়াল হল যে, তাকে আজ বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু জানলার উপরে তখনও ঝোড়ো হাওয়ার ধাক্কার সঙ্গে বৃষ্টি পড়ার অশ্রান্ত শব্দ হচ্ছে।

দিলীপ বললে, ‘অবু, আজ বাড়ি ফেরার কথা ভুলে যাও। এখান থেকে বেরুলে তোমাকে সাঁতার কাটতে হবে।'

অবনী উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'তাই সই। বাবা আমার অপেক্ষায় বসে আছেন, সব কথা শোনবার জন্যে। চললুম।' সে এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজাটা খুললে।

—সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃষ্টি ও ঝড়ের শব্দের ভিতরেই বাহির থেকে ভেসে এল একটা ভীত আর্ত চিৎকার! অবনী চমকে ফিরে দাঁড়াল।

দিলীপও লাফ মেরে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বললে, 'কে চিৎকার করলে?”

দুই বন্ধুই দরজার কাছে উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আগেই বলেছি, দিলীপের বাসা যে জায়গায় তার কাছে কোনও লোকালয় নেই। এই ঝড়-জলে পথেও কোনও লোক থাকবার কথা নয়। এখানে কে চিৎকার করবে?

অবনী ভয়ে ভয়ে বললে, ‘অন্ধকারে পথে কেউ মোটর চাপা পড়ল নাকি? ”

দিলীপ ঘাড় নেড়ে বললে, ‘পাগল! পথ এখন জলের তলায়, সেখানে মোটর চালাবার শখ কারুর হবে না।’

আবার শোনা গেল—কেউ যেন দারুণ আতঙ্কে প্রায়-অবরুদ্ধ স্বরে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আর্তনাদের পর আর্তনাদ করছে! এবারে বেশ বোঝা গেল, শব্দটা আসছে দিলীপের বাসার উপরতালা থেকেই।

অবনী কম্পিত স্বরে বললে, ‘এ যে ভৈরববাবুর গলা! তিনি তো ঘরে একলা আছেন! কী দেখে তিনি ভয় পেয়েছেন?'

দিলীপ কয়েক পদ অগ্রসর হয়ে বললে, ‘সেটা জানতে হলে আমাদেরও ওপরে যেতে হয়।

অবনী বললে, ‘তাহলে আমিই ওপরে যাই, তুমি এইখানে দাঁড়াও। ভৈরববাবু তাঁর ঘরে বাইরের লোক আসা পছন্দ করেন না!’

—‘পছন্দ করেন না! কেন?”

— তাঁর ঘরের সাজসজ্জা অদ্ভুত। বাইরের লোক সেসব দেখলে কেবল অবাকই হবে না, ভয় পেতেও পারে, তাঁকে পাগলও ভাবতে পারে!' বলেই অবনী দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।

দিলীপ সেইখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে, বিস্মিত মনে অবনীর কথাগুলো ভাবতে ভাবতে শুনতে লাগল, ভৈরবের বদ্ধকণ্ঠের অস্ফুট কাতরানি !

তারপরই শোনা গেল উপর থেকে অবনীর ব্যস্ত কণ্ঠস্বর—'দিলীপ, দিলীপ! শিগগির, শিগগির ওপরে এস! ভৈরববাবু মরো মরো হয়েছেন!”

দিলীপ তিন-চার লাফে দোতালার সিঁড়িগুলো পার হয়ে ভৈরবের ঘরের সুমুখে গিয়ে দাঁড়াল। খোলা দরজা দিয়ে উজ্জ্বল বিদ্যুৎ-আলোকে ঘরের ভিতরটা স্পষ্টরূপে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ঘর দেখে সত্যিসত্যিই তার চক্ষু স্থির হয়ে গেল! এমন দৃশ্য সে জীবনে আর কখনো দেখেনি !

পণ্ডিতরা প্রাচীন মিশরের মাটি খুঁড়ে অতীতের সমাধিমন্দির প্রভৃতি থেকে যেসব অদ্ভুত মূর্তি আবিষ্কার করেছেন, দিলীপ অনেক কেতাবে তাদের অসংখ্য ছবি দেখেছে। ঘরের দেওয়ালের সামনে দাঁড় করানো রয়েছে সেই রকম অনেকগুলো ছোটো-বড়ো কাঠের মূর্তি ! মূর্তিগুলোর চেহারা মানুষের মতোই, কিন্তু তাদের কারুর মাথা ষাঁড়ের মতো, কারুর মাথা সারস পাখির মতো, কারুর বা বিড়াল কি প্যাঁচার মতো! এরাই ছিল প্রাচীন মিশরের দেব- দেবী! ঘরের কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে একটা কুমিরের মৃতদেহ—দিলীপ জানত, কুমিরও ছিল প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে দেবতাস্থানীয়।

ঘরের মাঝখানে একটা বড়ো টেবিলের উপরে প্রাচীন মিশরের একটা 'কফিন' বা ‘মমি’র বাক্স, তার ডালা খোলা। এবং তারই ভিতরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা মিশরী ‘মমি’ বা মানুষের সুরক্ষিত মৃতদেহ !

কলকাতার যাদুঘরে দিলীপ একটা 'মমি' দেখেছিল। সেটা হচ্ছে কয়েক হাজার বছর আগেকার একটি মিশরীয় নারীর মৃতদেহ! সে মড়াটার দেহ কলকাতার স্যাঁতস্যাতে আবহাওয়ায় এসে শীঘ্রই জীর্ণ হয়ে পড়েছে, তাই আগে সেটা দাঁড় করানো ছিল বটে, কিন্তু এখন তাকে শুইয়ে রাখতে হয়েছে। যাদুঘরের ওই 'মমি'টা হচ্ছে স্ত্রীলোকের মৃতদেহ, তার দেহের নানান জায়গা খসে পড়েছে কিন্তু আজ সে চোখের সামনে প্রাচীন মানুষের যে সুরক্ষিত দেহটা দেখলে, এটা পুরুষের দেহ, আর এমন পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্তের মতো দেখতে যে তাকে মৃতদেহ বলে কল্পনা করাও অসম্ভব! যদিও হাজার হাজার বছরের মহিমায় তার গায়ের রং অস্বাভাবিকরূপে কালো হয়ে গিয়েছে, তার সমস্ত শরীর রীতিমতো অস্থিচর্মসার হয়ে গিয়েছে, তবু তার শুকনো, বীভৎস মুখের দিকে তাকালে মন এক অপার্থিব ভয়ে পরিপূর্ণ হয়ে যায় !

'মমি'টার ঠিক পায়ের তলাতেই ঘরের মেঝের উপরে লম্বা হয়ে পড়ে রয়েছে ভৈরবচন্দ্রের দেহ এবং তার হাতে রয়েছে কোষ্ঠী-ঠিকুজীর মতো পাকানো একখানা আধখোলা লম্বা কাগজ। দিলীপ বুঝলে, সেখানা হচ্ছে প্রাচীন মিশরের ‘পাপিরাস' পাতার পুথি !

অবনী কাতর কণ্ঠে বলে উঠল, 'ভৈরববাবু বোধহয় আর বাঁচবেন না!'

দিলীপ হচ্ছে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, এত সহজে কাতর হবার পাত্র নয়। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে ভৈরবের পাশে গিয়ে বসে পড়ল এবং তার দেহটা পরীক্ষা করে বললে, “ভয় নেই অবনী, ভৈরববাবু কেবল অজ্ঞান হয়ে গেছেন। তুমি এগিয়ে এসে এঁর পা-দুটো ধরো, মাথার দিক আমি ধরছি। এখন চলো, এঁকে ওই শোফার উপরে শুইয়ে দিতে হবে। জলের কুঁজোটা নিয়ে এস, ভৈরববাবুর মুখে আর বুকে জলের ঝাপটা দাও।... কিন্তু এঁর এমন দশা হল কেন?”

অবনী বললে, জানি না। ঘরে এসে ওঁকে আমি ওই অবস্থাতেই দেখেছি।'

দিলীপ ভৈরবের বুকের উপর হাত রেখে বললে, ‘এঁর বুক যেন হাপরের মতন উঠছে নামছে! বেশ বোঝা যাচ্ছে, ভয়ানক কিছু দেখেই ইনি ভীষণ ভয় পেয়েছেন। অবনী বললে, তাহলে হয়তো যত নষ্টের গোড়া ওই ‘মমিটা!’

— মমি’? কিরকম? ”

—“ওই কত-হাজার বছরের পুরানো মড়া দেখলে কার না ভয় হয়? জ্যান্ত মানুষের পক্ষে এসব ভূতুড়ে ব্যাপার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা ভালো নয়। কিছুকাল আগে আর একবারও এঁকে আমি এই অবস্থায় দেখেছিলুম। সেদিনও ইনি ওই ভূতুড়ে মূর্তিটার পায়ের তলায় এমনিভাবেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন!'

— 'মমি'টাকে নিয়ে ইনি কি করতে চান?’

—কে জানে! ভৈরববাবুর মাথায় বোধহয় ছিট আছে। এইসব জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া করাই হচ্ছে ওঁর বাতিক! আমি কত মানা করি-বলি, জীবন্তের সঙ্গে মৃতের সম্পর্ক রাখা ভালোও নয় উচিতও নয়! শুনে উনি হাসেন, বলেন, এ হচ্ছে আমার শব-সাধনা !

—চুপ! রোগীর জ্ঞান ফিরে আসছে।'

ভৈরবের মুখ এতক্ষণ সাদা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল, এইবারে তার উপরে একটু একটু করে রঙের আভাস ফুটে উঠছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাসও ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে এল। খানিক পরে সে চোখ খুলে ঘরের এদিক ওদিকে তাকিয়ে দেখলে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল ‘মমি’র দিকে, সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে বসল এবং তারপরেই এক লাফে এগিয়ে গিয়ে পাকানো ‘পাপিরাস' কাগজের সেই পুথিখানা তুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি টেবিলের একটা টানার ভিতরে পুরে ফেললে। তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বললে, ‘আমার ঘরে বাইরের লোক কেন? আপনাদের কি দরকার? অবনী আহত স্বরে বললে, 'দরকার আমাদের কিছুই নেই! আপনি চিৎকার করে কাঁদছিলেন, তাই শুনে আমরা এসেছি সাহায্য করতে।'

ভৈরব অপ্রতিভ স্বরে বললে, ‘এই যে, দিলীপবাবু! আমার এখন মাথার ঠিক নেই, কি বলতে কি বলে ফেলেছি, আপনারা আমাকে মাপ করবেন। ভাগ্যিস আপনারা এসেছিলেন, নইলে কি যে হত জানি না! ওঃ, আমি কি নির্বোধ, আমি কি নির্বোধ !'—বলতে বলতে আবার সোফার উপরে গিয়ে বসে পড়ে দুই হাতের ভিতরে মুখ ঢেকে ফেললে।

অবনী ভৈরবের কাছে গিয়ে তার মাথার উপরে হাত রেখে বললে, ‘ভৈরববাবু, আপনি আগুন নিয়ে খেলা করছেন! নিশুত রাতে ‘মমি' নিয়ে নাড়াচাড়া করা মানুষের উচিত নয়। কিসে কি হয় বলা যায় না।”

ভৈরব মুখ তুলে মৃদুস্বরে বললে, 'অবনীবাবু, আমি যা দেখেছি, তা যদি আপনিও দেখতেন, তাহলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যেতেন।'

—কী দেখেছেন আপনি?

ভৈরব হঠাৎ গলার স্বর বদলে বললে, 'না, এমন কিছু নয়। আমি বলছি কি, দুপুর রাতে 'মমি'র সঙ্গে থাকতে হলে অনেকেরই সাহসে কুলোবে না!..একি, আপনারা চলে যাচ্ছেন নাকি? না, না, এখনই যাবেন না, আর একটু বসুন!'

অবনী বললে, ‘ঘরের ভেতরে এ কিসের গন্ধ? দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে!'

টেবিলের উপরের একটা পাত্র থেকে শুকনো পাতার মতো কি কতকগুলো তুলে নিয়ে একটা জ্বলন্ত ধুনচির ভিতরে নিক্ষেপ করে ভৈরব বললে, ‘এ হচ্ছে মিশরী পুরুতদের পবিত্র ধুনো।...আচ্ছা অবনীবাবু, আমি কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিলুম?' —বেশিক্ষণ নয়, মিনিট পাঁচ-ছয়। '

ভৈরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, 'অচেতনতা হচ্ছে এক অদ্ভুত জিনিস ! অচেতনতার মধ্যে সময়ের মাপ নেই। অজ্ঞান হয়ে থাকলে কেউ বুঝতে পারে না তার অসাড়তার ভিতর দিয়ে কয়েক মুহূর্ত কি কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে! টেবিলের উপরে ওই যে মৃত মানুষটিকে দেখছেন, প্রাচীন মিশরে ও বেঁচে ছিল চার হাজার বছর আগে! কিন্তু ওকে যদি এখনই জাগাতে পারা যায়, ও হয়তো বলবে, মিনিট খানেক আগেই ও বেঁচে ছিল! দিলীপবাবু, এই 'মমি'টা খুব চমৎকার, নয়?”

পচা মড়া কাটাই হচ্ছে দিলীপের ব্যবসা। নরদেহের নাড়িনক্ষত্র তার জানা আছে। ‘মমিটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে সে তাকে ভালো করে আবার দেখতে লাগল। তার দেহের মাংস শুকিয়ে গিয়েছে বটে। কিন্তু কোথাও কোনও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অভাব নেই। হাড়ের উপরে চামড়া এখনও টাইট হয়ে চেপে আছে, দুই কানের উপরে রুক্ষ ঝাঁকড়া চুলগুলো এখনও ঝুলে রয়েছে। কোটরের ভিতরে বাদামের মতন দুটো তীক্ষ্ণ চোখ এখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ভৈরব উঠে দাঁড়িয়ে ‘মমি'র কপালের কোঁচকানো চামড়ার উপরে হাত রেখে বললে, ‘এই প্রাচীন ভদ্রলোকের নাম আমি জানি না। এঁকে আমি কিনেছিলুম একটা নিলাম থেকে। ' দিলীপ বললে, ‘জ্যান্ত অবস্থায় লোকটি বোধহয় খুব জোয়ান ছিল।

ভৈরব বেশ সহজভাবেই কথা কইবার চেষ্টা করছিল বটে, কিন্তু দিলীপ স্পষ্ট বুঝতে পারলে, তার মনের ভিতরটা এখনও, ভয়ে থমথম করছে! তার হাত কাঁপছে, তার ঠোঁট কাঁপছে এবং তার চোখের দৃষ্টি থেকে থেকে কেবলই সেই 'মমি'টার মুখের দিকে ফিরে যাচ্ছে। তবু তার ভয়ের ভিতর থেকেও যেন একটা আনন্দের আভাসও ফুটে উঠছে! বিষম বিপদের মধ্যেও সে আবিষ্কার করেছে যেন কোনও সফলতার কারণ! দিলীপকে দরজার দিকে অগ্রসর হতে দেখে ভৈরব বললে, ‘আপনি কি এখনই যাবেন? আর একটু থাকবেন না?'

দিলীপ বললে, ‘আর থাকা অসম্ভব। আমার পড়া এখনও শেষ হয়নি।

—অবনীবাবু, আপনি?’

—আমিও আর থাকতে পারব না, রাত অনেক হল।'

জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে ভৈরব বললে, 'আচ্ছা, চলুন অবনীবাবু, আপনাকে খানিক এগিয়ে দিয়ে আসি।'

দিলীপ বুঝলে, ভৈরব এখন এ ঘরে একলা থাকতে রাজি নয়। কিন্তু কেন? নিজের ঘরে তার ভয় কিসের?

কে কথা কয়, খাবার খায়, চলা-ফেরা করে?

তারপর থেকেই দিলীপের সঙ্গে ভৈরব রীতিমতো মাখামাখি শুরু করে দিলে। যদিও দিলীপ খুব মিশুক লোক ছিল না এবং ভৈরবের কর্কশ স্বভাব তার বিশেষ ভালো লাগত না, তবু সাধারণ ভদ্রতার অনুরোধে ভৈরবের সঙ্গে তাকে অল্পবিস্তর মেলামেশা করতেই হল। ভৈরব প্রায়ই তার কাছ থেকে নানা শ্রেণীর বই পড়বার জন্যে নিয়ে যেত এবং সেও মাঝে মাঝে তার কাছ থেকে ভালো ভালো বই চেয়ে আনত।

এইভাবে দিনকয়েক পরে পরিচয় কিঞ্চিত ঘনিষ্ঠ হলে দিলীপ বুঝলে যে, নানা বিষয়েই ভৈরব হচ্ছে অসাধারণ পণ্ডিত। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে দিলীপ তার কাছে প্রায় শিশু। প্রাচীন মিশর সম্বন্ধে তার চেয়ে বিশেষজ্ঞ লোক বোধহয় সারা ভারতবর্ষে নেই।

দিলীপ একদিন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘আচ্ছা ভৈরববাবু, প্রাচীন মিশরীরা মড়াকে ‘মমি’ করে কবর দিত কেন?”

ভৈরব বললে, ‘প্রাচীন মিশরের বিশ্বাস ছিল, আত্মা অমর। পৃথিবীর মৃত্যুর পরে আর অনন্ত জীবন আরম্ভ হবার আগে দেহ ছেড়ে আত্মা কিছুকাল আলাদা হয়ে থাকে বটে, কিন্তু তারপর আবার পার্থিব দেহের ভিতরেই ফিরে আসে। আত্মা আর দেহের এই পুনর্মিলনের আগেই নশ্বর দেহ পাছে নষ্ট হয়ে যায়, সেই ভয়ে মিশরীরা নানারকম রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে দেহকে চিরস্থায়ী করে রাখবার চেষ্টা করত। তারা দেহকে কফিনে পুরে কেবল গোর দিয়েই নিশ্চিন্ত হত না, আত্মা যেদিন আবার দেহের ভিতরে ফিরে আসবে, তখন তার জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্যে কবরের ভিতরে খাবারদাবার, কাপড়চোপড়, খাট-বিছানা, তৈজসপত্র প্রভৃতি যা কিছু দরকার সবই রেখে দিত। রাজা-রাজড়া আর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যু হলে তাঁদের দাস-দাসিদেরও দেহের সঙ্গে কবরে যেতে হত, অর্থাৎ তাদের হত্যা করে দেহগুলো কবরে পাঠানো হত—যাতে করে দেহের ভিতরে ফিরে এসে রাজার আত্মা লোকাভাবে কষ্ট না পায় !

— ভৈরববাবু, আপনি কি এই বিশ্বাস সত্যি বলে মনে করেন?'

–আমি কি সত্যি বলে ভাবি, সে কথা শুনে কি হবে? তবে প্রাচীন মিশরের পুরুতরা যে মমিকে বাঁচিয়ে তোলবার মন্ত্র জানত, এটা হয়তো মিথ্যা নয়!’

—সে মন্ত্র এখন আর কেউ জানে না?'

—‘প্রাচীন মিশরে যে অদ্ভুত মানুষরা বাস করত, তাদের কেউ আর বেঁচে নেই, ‘মমি' রূপে নষ্ট হয়নি কেবল তাদের দেহগুলো। তবে পুরানো পাপিরাস পাতার গুটানো পুথিতে মড়া জাগানো মন্ত্র-তন্ত্র এখনও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেরকম পুথি এখন অত্যন্ত দুর্লভ।'

—আপনি প্রাচীন মিশরের ভাষা জানেন?'

— জানি।’

—তাদের মড়া জাগানো মন্ত্র আপনি কখনও পড়েছেন?

—“আমি? না, সে সৌভাগ্য আমার হয়নি'—বলেই ভৈরব অন্য প্রসঙ্গ তুললে।

কিন্তু সে প্রসঙ্গটাও হচ্ছে মমির প্রসঙ্গ। সে বললে, 'প্রাচীন মিশরের মানুষরা তাদের সভ্যতা আর অনেক গুপ্তকথা নিয়ে পৃথিবী থেকে চিরকালের মতো লুপ্ত হয়ে গেছে বটে, মমিদের জ্যান্ত মানুষ করে তোলবার বিদ্যাও আজ কেউ জানে না বটে, কিন্তু মিশরের পুরানো গোরস্থানের মধ্যে আজও যে দেহহীন আত্মারা জীবন্ত হয়ে আছে, মিশর সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ অনেক বিলাতি পণ্ডিত এই বৈজ্ঞানিক যুগেও সে সন্দেহ প্রকাশ না করে পারেন না! বিলাতি সংবাদপত্রেও প্রায়ই পড়া যায়, কৌতূহলী সাহেব-ভ্রমণকারীরা মিশর থেকে মমি কিনে বিলাতে নিয়ে গিয়ে নানান অলৌকিক কাণ্ড দেখেছেন, আশ্চর্য সব বিপদে পড়েছেন! কবর থেকে বার করে আনলে মমি যে অভিশাপ বহন করে আসে, একথা তো এখন চলতি বিলাতি প্রবাদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে! যেসব বিখ্যাত সাহেবপণ্ডিত মাটি খুঁড়ে প্রাচীন মিশরের কবর ঘেঁটে তছনছ করেন, তাঁদের অনেকেই যে পরে নানা দৈবদুর্ঘটনায় অপঘাতে মারা পড়েন, একথাও সবাই জানে! এইসব দেখেশুনে স্বীকার করতে হয় যে, আজ আমরা যাদের মমি দেখি, তাদের আত্মা এখনও মরেনি, নিজেদের পার্থিব দেহকে এখনও তারা ভালোবাসে এবং সুযোগ পেলেই আবার সেই দেহে ফিরে আসতে চায়! আমরা হিন্দু, আমরাও প্রাচীন জাতি, আর আমরাও আত্মার অমরতায় বিশ্বাস করি। দেহের প্রতি মমতা থাকলে পাছে আত্মা পৃথিবী ছাড়তে না চায়, হয়তো সেই ভয়েই হিন্দুদের শাস্ত্র বিধান দিয়েছে, আগুনে পুড়িয়ে মৃতদেহকে একেবারে ধ্বংস করে ফেলতে!

সময়ে সময়ে দিলীপের মনে হত, ভৈরবের মধ্যে উন্মাদরোগের পূর্বলক্ষণ দেখা দিয়েছে ! একদিন কথা কইতে কইতে হঠাৎ সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল, 'মঙ্গল আর অমঙ্গলকে নিজের অধিকারে আনতে পারা—ওঃ সে কী সৌভাগ্য! স্বর্গের দেবতা আর নরকের দানবকে যদি আমার হাতের মুঠোয় পাই, তাহলে আমি পৃথিবী শাসন করতে পারি!'

আর একদিন সে বললে, 'অবনীর বোনকে আমি বিয়ে করব বটে, কিন্তু অবনী কোনও কর্মেরই নয়! অবশ্য মানুষ হিসাবে অবনী ভালো লোক, কিন্তু যার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, সে তার যথার্থ বন্ধু হতে পারবে না। সে আমার বন্ধু হবার যোগ্য নয়!

আজ কদিন থেকে তাকে আবার একটা নতুন রোগে ধরেছে। দিলীপ নিচে থেকে প্রায়ই শুনতে পায়, উপরের ঘরে একলা বসে ভৈরব নিজের সঙ্গে নিজেই কথা কয়! গভীর রাতে দিলীপ পড়াশুনো করছে, উপরের ঘরে বাইরের জনপ্রাণী নেই, অথচ চারিদিকের নিস্তব্ধতার মধ্যে বেশ শোনা যায়, ভৈরব খুব মৃদু স্বরে—প্রায় ফিসফিস করে—আপন মনে কথাবার্তা কইছে!

তার এই অদ্ভুত অভ্যাসে বিরক্ত হয়ে দিলীপ একদিন বললে, ‘ভৈরববাবু, নিজের সঙ্গে নিজেই গল্প করতে কি আপনার খুব ভালো লাগে?”

ভৈরব চমকে উঠে বললে, 'আমি কি নিজের সঙ্গে গল্প করি? না, না, আপনি ভুল শুনেছেন!

কিন্তু দিলীপ ভুল শোনেনি, শীঘ্রই সে প্রমাণ পাওয়া গেল। কেষ্ট হচ্ছে দিলীপের পুরানো চাকর। সে একদিন বললে, ‘বাবু, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?'

— “কি কথা?’

—‘ওপরের ঘরের ওই বাবুটির মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?”

– কেন?'

—আমার তো তাই মনে হয়। ঘরে কেউ থাকে না, অথচ তিনি কথা বলেন কার সঙ্গে?”

—সে কথায় তোমার দরকার কি কেষ্ট?

— দরকার নেই বটে, কিন্তু এটা কি আশ্চয্যি নয়? এর চেয়েও আশ্চয্যি কি জানেন? বাবুটি যখন নিজের ঘরের দরজায় চাবি বন্ধ করে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যান, তাঁর ঘরের ভেতরে মেঝের ওপরে ভারি ভারি পা ফেলে তখনও কে বেড়িয়ে বেড়ায়! বাবু, এসব ভালো কথা নয়, আমার ভারী ভয় হয়!

—কী বাজে বকছ!’

—'বাজে নয় বাবু, আমি নিজের কানে শুনেছি! কেবল ঘরের ভেতরে নয় বাবু, এক একদিন বাইরেও পায়ের শব্দ শুনতে পাই। একদিন হল কি, আমি উঠোনের কোণে আমার ঘরের সামনে বসে তামাক সাজছি। তখন সন্ধে উৎরে গেছে, উঠোনের ওদিকটা অন্ধকার। বাসায় কেউ ছিল না বলে সদর দরজায় খিল দিয়ে রেখেছি। হঠাৎ শুনলুম, সিঁড়ি দিয়ে কে নেমে আসছে! বাসায় কেউ নেই, তবু সিঁড়ি দিয়ে কে নামে! আমি শুধুলুম—‘কে যায়?’ সাড়া, পেলুম না, কিন্তু উঠোনের যেখানটা অন্ধকার, সেখানে শুনলুম কার পায়ের শব্দ! তারপরই দুম করে সদরের খিল খুলে গেল আর দরজা খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল! এ কী কাণ্ড, বাবু! —“কেষ্ট, ভৈরববাবু নিশ্চয়ই তোমার অজান্তে বাসায় ছিলেন, বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই!'

– তাহলে তিনি সাড়া দিলেন না কেন?”

—সেটা তাঁর খুশি।'

—তাহলে আর একটা কথা বলি শুনুন! ভৈরববাবুর খাবার আসে রোজ হোটেল থেকে, জানেন তো? এতদিন দুবেলা একজনের জন্যেই খাবার আসত, কিন্তু হোটেলের চাকরের মুখে শুনলুম, আজকাল রোজ রাত্রে খাবার আসে দুজনের জন্যে। ভৈরববাবু একলা, কিন্তু তাঁর ঘরে রাত্রে দুজনের খাবার যায় কেন? সে খাবার কে খায়?”

— ভৈরববাবুই। হয়তো তাঁর ক্ষিধে বেশি, একজনের খাবারে কুলোয় না।'

—“কিন্তু তাঁর ক্ষিধে কি রাত্রেই বাড়ে? সকালে তো দুজনের খাবার আসে না? আর আগে তো তাঁর এমন রাক্ষুসে ক্ষিধে ছিল না? হঠাৎ তাঁর রাতের ক্ষিধেই বা বাড়ল কেন? যখন থেকে এই আশ্চয্যি পায়ের শব্দ পাচ্ছি, তাঁর ক্ষিধে বেড়েছে তখন থেকেই!” —কেষ্ট, তুমি একটি রাবিশ!

— “বিশ্বাস করছেন না, কি আর বলব!'—এই বলে কেষ্ট চলে গেল।

দিলীপ অবাক হয়ে ভাবতে লাগল—ভৈরব যখন ঘরে থাকে না, তখন কে সেখানে চলা- ফেরা করতে পারে? ভৈরব কি তার ঘরের ভিতরে অন্য কোনও লোককে লুকিয়ে রেখেছে? সে কে? আর লুকিয়েই বা থাকবে কেন? আজ কেষ্ট যে এই দুজনের খাবারের কথা বললে, সেটাই বা কী ব্যাপার? যদি ধরি, ভৈরবের ঘরে কেউ লুকিয়ে আছে আর দুজনের খাবার আসে সেই জন্যেই, তাহলে রোজ সকালেও দুজনের খাবার আসে না কেন? সকালে সে কি উপোস করে থাকে?....এসবই যে ধাঁধার মতন গোলমেলে কাণ্ড! কেষ্টকে ঠাট্টা করে উড়িয়ে দিলুম বটে, কিন্তু আমাকেও যে ভাবিয়ে তুললে!

আবার পদশব্দ

সে রাত্রে ভৈরব নেমে এসে দিলীপের সঙ্গে গল্প করছিল। কথা কইতে কইতে দিলীপ স্পষ্ট শুনতে পেলে, দোতালার ঘরের মেঝে কার পদশব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে—কে যেন ভারি ভারি পা ফেলে পায়চারি করে বেড়োচ্ছে! তারপরেই দুম করে উপরের দরজার আওয়াজ!

দিলীপ সচমকে বলে উঠল, 'ভৈরববাবু, কে আপনার ঘরের দরজা খুললে, কি বন্ধ করলে!'

ভৈরব এক লাফে উঠে পড়ে একান্ত অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখের ভাব দেখলে মনে হয়, সে যেন ভয়ও পেয়েছে এবং দিলীপের কথা বিশ্বাসও করতে পারছে না! সে থেমে থেমে বললে, “ঘরের দরজা নিশ্চয়ই আমি তালা দিয়ে এসেছি। হ্যাঁ, সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই! দরজা খোলা অসম্ভব!'

—শুনুন ভৈরববাবু শুনুন! সিঁড়ির ওপরে পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন! কে নিচে নেমে আসছে!'

ভৈরব বেগে বাইরে ছুটে গিয়ে দিলীপের দরজার পাল্লা দুখানা চেপে বন্ধ করে দিলে এবং দ্রুতপদে সশব্দে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। সিঁড়ির মাঝামাঝি উঠে তার পায়ের শব্দ হঠাৎ থেমে গেল এবং তারপরে শোনা গেল ফিসফিস করে কথার আওয়াজ! খানিক পরে আবার দোতালা ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল, তারপর ভৈরব নিচেয় এসে ফের যখন দিলীপের ঘরে ঢুকলে, তখন তার কপাল বেয়ে নেমে আসছে ঘামের দর দর ধারা!

অবসন্নের মতো চেয়ারের উপরে বসে পড়ে ভৈরব হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, “নাঃ, সব ঠিক আছে! ওই হতচ্ছাড়া কুকুরটার কাণ্ড আর কি! সেই-ই দরজাটা খুলে ফেলেছিল, আমি তালা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলুম কিনা!”

ভৈরবের বিকৃত মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দিলীপ বললে, 'আপনার যে আবার একটা কুকুর আছে, এ খবর তো আমার জানা ছিল না!

— হ্যাঁ, সবে পুষেছি! আবার তাড়িয়ে দেব, জ্বালিয়ে মারলে !”

—আমিও কুকুর ভালোবাসি। একবার তাকে আনুন না, দেখব।’

—“বেশ তো, তবে আজ নয়। আজ আমার একটা জরুরি কাজ আছে, এখনই বাইরে যেতে হবে।”

ভৈরব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। কিন্তু দিলীপ নিচে বসেই শুনতে পেলে জরুরি কাজে বাইরে না গিয়ে সে নিজের ঘরে ঢুকেই ভিতর থেকে দরজায় খিল বন্ধ করে দিলে!

দিলীপ মনে মনে খাপ্পা হয়ে উঠল! ভৈরব তাহলে পয়লা নম্বরের মিথ্যাবাদী! এমন কাঁচা মিথ্যাকথা কইলে যে, একটা শিশুকেও ফাঁকি দিতে পারবে না! ঘরে কুকুর আছে না ছাই আছে! সিঁড়ির উপরে এইমাত্র যে পায়ের শব্দ শোনা গেল, কোনও কুকুরের পায়ের আওয়াজই সেরকম হতে পারে না! দস্তুরমতো মানুষের পায়ের আওয়াজ! কেষ্ট তো ঠিক কথাই বলেছে! কিন্তু কে তার ঘরে লুকিয়ে আছে? কেন লুকিয়ে আছে? সে কি খুনে? চোর? পুলিশের ভয়ে এখানে এসে গা ঢাকা দিয়েছে? তাই কি ভৈরব মিথ্যা বললে? কিন্তু যে লোক পলাতক আসামিকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রাখে, তার সঙ্গে তো আর কোনও সম্পর্ক রাখাই উচিত নয়! শেষটা কি সেও পুলিশ মামলায় জড়িয়ে পড়বে?

মনে মনে ভৈরবকে ‘বয়কট' করবার প্রতিজ্ঞা করে দিলীপ ‘অ্যানাটমি'র একখানা মস্ত বই টেনে নিয়ে পড়তে বসল। কিন্তু খানিক পরেই আবার পড়ায় বাধা পড়ল ৷

পায়ের শব্দে মুখ তুলে দেখে, ঘরের মধ্যে প্রতাপের আবির্ভাব হয়েছে। তার পাশে বসে পড়ে প্রতাপ বললে, “দিলীপ, তুমি একটি আস্ত গ্রন্থকীট! দিন-রাত খালি পড়া আর পড়া আর পড়া! এদিকে পরশু আমাদের 'ইলিয়ট সিল্ডে'র খেলা সে কথা কি তোমার মনে নেই?'

—‘টিমে কি আমি আছি?”

—"নিশ্চয়! ‘সিলেকসান’ হয়ে গেছে আজই। তুমি খেলবে রাইট লাইনে। কাল মাঠে গিয়ে 'প্র্যাকটিস' করে এস।

—যাব। কিন্তু আজ বিদায় হও দেখি, আমাকে পড়তে দাও। আর কোনও খবর নেই তো?'

—একটা খবর আছে। তোমাকে সেদিন নন্দলাল আর ভৈরবের ঝগড়ার কথা বলেছিলুম, মনে আছে তো? কাল নন্দলাল বিষম বিপদে পড়েছিল।'

— “কি বিপদ?”

– নন্দলাল কাল মাঠের রাস্তা দিয়ে সন্ধ্যার সময়ে বাড়ি ফিরছিল, এমন, সময়ে হঠাৎ কে তাকে আক্রমণ করে!’

—‘কে আক্রমণ করে?”

—“সেইটে বলাই তো মুশকিল! নন্দলালের মতে, সে মানুষ নয়! অবশ্য তার গলায় নখের আঘাতে যে গভীর ক্ষত হয়েছে, মানুষের নখে সেরকম ক্ষত হওয়া সম্ভবও নয়!”

—“তবে? তবে কি নন্দলালের ঘাড়ে ভূত চেপেছিল?'

নন্দলালের বিশ্বাস সে সেই গাছের ডাল থেকেই তার কাঁধের উপরে অবতীর্ণ হয়েছিল। পিঠের উপরে পড়েই জীবটা দুই হাত দিয়ে তার গলা প্রাণপণে চেপে ধরে! নন্দলালের মনে হচ্ছিল কে যেন ইস্পাতের ফিতে দিয়ে তার গলা চেপে ধরেছে! সে কিছুই দেখতে পেলে না; কেবল সেই ভীষণ হাত দুখানা তার গলার চারিধারে চাপের উপর চাপ দিতে থাকে! প্রাণের ভয়ে সে আকাশ-ফাটানো আর্তনাদ করে ওঠে এবং তার চিৎকার শুনে কোথা থেকে দুজন লোক ছুটে আসে! তাদের দেখেই সেই জীবটা চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্রগতিতে একটা পাঁচিলের উপর লাফ মেরে অদৃশ্য হয়ে যায়! নন্দলাল শুধু অনুভব করেছে একজোড়া লৌহ-হস্তের মৃত্যু-বাঁধন আর একটা মস্ত বড়ো অপচ্ছায়া,—এছাড়া আর কিছুই সে জানে না।’

দিলীপ বললে, 'হয়তো সে কোনও খুনে ঠগীর হাতে পড়েছিল।'

—"হতে পারে। কিন্তু নন্দলাল বলে, তা নয়। তার মতে, যে তাকে আক্রমণ করে গলা টিপে ধরেছিল, তার হাত দুখানা বরফের মতো কনকনে ঠান্ডা।—কোনও জীবনের স্পর্শই সেরকম শীতল হয় না! নিশ্চয়ই এটা তার মনের ভ্রম, কিন্তু বেচারি ভয়ে একেবারে মুষড়ে পড়েছে।...হ্যাঁ, ভালো কথা! তোমার বন্ধু ভৈরবচন্দ্র নন্দলালকে যেরকম ভালোবাসে, বোধহয় এ খবরটা শুনলে আনন্দে নৃত্য করতে থাকবে! আমি তাকে খুব চিনি, সে কোনও শত্রুকেই ক্ষমা করে না। অতএব সাবধান, কোনোদিন তাকে ঘাঁটিও না!’

দিলীপ বললে, ‘সে আমার মিত্রও নয়, শত্রুও নয়। তার সঙ্গে আমার সামান্য পরিচয়ই হয়েছে, তাকে আমার ঘাঁটাবার দরকার কি?

—তোমার কথা তুমিই বুঝবে, আমি শুধু বলে খালাস। কেবল এইটুকু মনে রেখো, তার কাছ থেকে যত তফাতে থাকতে পার ততই ভালো!” এই বলে প্রতাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দিলীপ আবার পড়ায় মন দেবার চেষ্টা করলে। কিন্তু তার মন তখন এমন চঞ্চল হয়ে উঠেছে যে, ডাক্তারি কেতাবের কোনও কথাই সে যেন দেখতে পেলে না। থেকে থেকে তার মন কেবলই ছুটে যায় দোতালার ওই বিচিত্র ঘরের অদ্ভুত লোকটির কাছে—যার চারিদিকেই রয়েছে আজানা রহস্যের এক মায়াময় অপার্থিবতা! তারই ফাঁকে ফাঁকে তার বিস্মিত চিত্ত নন্দলালের উপরে এই আশ্চর্য আক্রমণ নিয়ে আলোচনা করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠল। ওই ভৈরবের স্বভাব, আর নন্দলালের উপরে এই আক্রমণ—এদের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও যোগাযোগ আছে! কিন্তু কী যে সে যোগাযোগ, ভাষায় স্পষ্ট করে তা প্রকাশ করা যায় না।

দিলীপ তার ডাক্তারি বইখানা একদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিরক্ত স্বরে বলে উঠল, ‘চুলোয় যাক ভৈরব আর তার বিদকুটে ‘মমি’! তার জন্যে আজ আমার পড়া হল না, আর কেবল এইজন্যেই তার সঙ্গে ভবিষ্যতে আর কখনও মেলামেশা করব না।

ভৈরবের গুপ্তকথা কি?

দশ দিন কেটে গেল।

দিলীপ তার মড়ার কঙ্কাল আর ডাক্তারি কেতাব নিয়ে নিজের বিদ্রোহিতার বিরুদ্ধেই জোর করে এমন ব্যস্ত হয়ে রইল যে, ঘরের বন্ধ দরজায় মাঝে মাঝে ভৈরবের করাঘাত শুনেও সাড়া দেবার নামটি করলে না। সে এসেই হয়তো সেকেলে মিশর আর তার গুপ্তরহস্য নিয়ে এমন সব আজগুবি গালগল্প জুড়ে দেবে যে, শুকনো ডাক্তারি কেতাবের সমস্ত কথাই ভুলে যেতে হবে!

একদিন সে বাইরে বেরুবার উদ্যোগ করছে, এমন সময়ে তার খোলা দরজা দিয়ে দেখতে পেলে, তার বন্ধু অবনী অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে দালানের উপরে নেমে এল এবং তার পিছনে পিছনে ছুটে এল রুদ্রমূর্তিতে ভৈরবচন্দ্র—ভীষণ ক্রোধে তার মুখ হয়ে উঠেছে হিংস্র জন্তুর মতো কদাকার!

ভৈরব সাপের মতন ফোঁস করে বলে উঠল, 'নির্বোধ ! এর প্রতিফল পাবি।'

অবনী চেঁচিয়ে বললে, ‘যা হয়, হবে! কিন্তু তোমার সঙ্গে আজ থেকেই সব সম্পর্ক তুলে দিলুম! আমি আর তোমার কোনও কথাই শুনব না !

—“বেশ, শুনো না! কিন্তু তুমি যা প্রতিজ্ঞা করেছ সেটা মনে রেখো!'

—হ্যাঁ, হ্যাঁ! প্রতিজ্ঞা আমি রাখবই! কারুকে কোনও কথাই বলব না! কিন্তু এরপরে আমার বোনের সঙ্গে তোমার বিয়ে হওয়া অসম্ভব! তার চেয়ে আমার বোনকে গঙ্গাজলে ডুবিয়ে মারব! আমি আর তোমার মুখ দেখতে চাই না'—এই বলেই অবনী হন হন করে দালান পেরিয়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল!

দিলীপ ঘরের ভিতর থেকে সব দেখলে, সব শুনলে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে ওদের গোলমালে যোগ দিতে তার ইচ্ছা হল না। ভৈরবের সঙ্গে কোনও কারণে অবনীর ঝগড়া হয়েছে এবং সে তার বোনের সঙ্গে ভৈরবের বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে দিলে, দিলীপ, এটুকু বেশ বুঝতে পারলে। তারপর সে জামাকাপড় পরে বেরিয়ে পড়ল এবং বাইরে গিয়েও এই কথাই তার বারংবার মনে হতে লাগল, ভৈরবের সঙ্গে অবনীর এমন ঝগড়া হল কেন?

পরদিনের কথা। সেদিন ছিল ইলিয়ট সিল্ডের ফাইনাল'। গড়ের মাঠে মোহনবাগান গ্রাউন্ডে নানান কলেজের ছাত্ররা এসে গগনভেদী কোলাহলে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে! দিলীপদের কলেজের সঙ্গেই আজ মেট্রোপলিটান কলেজের প্রতিযোগিতা, খেলার আগেই দুই পক্ষের পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে রীতিমতো একটা বাক্যযুদ্ধ হয়ে গেল! চলচ্চিত্রের সেই দৃশ্যটি গ্রহণ করলে দর্শকরা চমৎকার একটি কৌতুকনাট্যের রস উপভোগ করতে পারে !

খেলার শেষে দিলীপ যখন ‘ইউনিফরম’ ছেড়ে বাড়িমুখো হয়েছে, কোথা থেকে হঠাৎ অবনী এসে তার সঙ্গ নিলে।

অবনী বললে, 'ভাই দিলীপ, সেদিনকার ব্যাপার কতকটা তুমিও দেখেছ আর শুনেছ। কিন্তু সেদিন আমার এত রাগ হয়েছিল যে, তোমার সঙ্গে কথা না কয়েই চলে এসেছিলুম। সেজন্যে কিছু মনে কোরো না।”

—"আমার তো কিছু মনে করবার কোনও কারণ নেই।

‘বেশ কথা! কিন্তু আমার একটি কথা তুমি রাখো। ভৈরব যে বাসায় থাকে, সেখানে কোনও ভদ্রলোকের থাকা উচিত নয়। ও বাসা ছেড়ে দাও।' —‘কেন বলো দেখি?”

অবনী প্রথমটা কোনও জবাব দিলে না, দিলীপের সঙ্গে নীরবে খানিকক্ষণ এগিয়ে এল। তারপর বললে, ‘কেন যে তোমাকে ও বাসা ছাড়তে বলছি, আমার পক্ষে তার কারণ বলা অসম্ভব। কেন না ভৈরবের কাছে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, কারুর কাছে কোনও কথাই আমি বলব না। কিন্তু এইটুকু আমার বলা উচিত যে, ভৈরবের কাছে ভদ্র বা অভদ্র কোনও 'মানুষেরই থাকা নিরাপদ নয়। যে কোনও মুহূর্তে তুমি বিপদে পড়তে পারো—সাংঘাতিক বিপদ!

—বিপদ? তুমি কী বলছ অবনী? '

—‘স্পষ্ট করে তোমাকে আমি কিছুই বলতে পারব না। কিন্তু ও বাসা ছেড়ে দাও।'

– কেন?’

—‘ভৈরব হচ্ছে অমানুষিক মানুষ, এ ছাড়া তার আর কোনও বর্ণনা করা যায় না। সেই যে সেদিন সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, তারপর থেকেই আমার মনে কেমন একটা সন্দেহ হয়। কাল আমি তাই তাকে চেপে ধরেছিলুম। দিলীপ, তখন দায়ে পড়ে সে আমাকে যেসব কথা বললে, শুনে আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল! তার উপর ভৈরব বলে কিনা আমাকে তার দলভুক্ত হয়ে সাহায্য করতে! ভাগ্যে যথাসময়ে ভৈরবের আসল চরিত্র টের পেয়েছি, তার সঙ্গে আমার বোনের বিয়ে হয়ে গেলে কি সর্বনাশই না হত! ভগবান রক্ষা করেছেন!’

—অবনী, হয় তুমি খুব বেশি বলছ, নয় বলছ খুব কম !

—আমি কিছুই বলব না বলে ভৈরবের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি।'

—"তুমি যদি জানতে পারো, কেউ তার প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে চায়, তাহলে অঙ্গীকার করেছ বলে কি সেকথা প্রকাশ করবে না? ভৈরবকে আমি ভয় করব কেন?”

—"কারণ সে হিংস্র পশুর মতো ভয়ঙ্কর। হয়তো সে এখনও তোমার কোনও অনিষ্ট করে নি, কিন্তু সাপ কখনও কামড়ায়নি বলে কে সাপের গর্তের পাশে বাস করতে চায়? —অবনী, তুমি ভাবছ ভৈরবের গুপ্তকথা আমি জানি না। এটা তোমার ভুল! তুমি তো এই কথাই আমার কাছে প্রকাশ করতে চাও না যে, ভৈরবের ঘরে আর এক ব্যক্তি বাস করছে?'

অবনী চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মহা বিস্ময়ে দিলীপের মুখের পানে তাকিয়ে বললে, 'তুমি তাহলে সব জানো?’

গর্বের হাসি হেসে দিলীপ বললে, 'হুঁ, তা আর জানি না! ভৈরব কোনও ফেরারি আসামিকে তার ঘরে লুকিয়ে রেখেছে, এই তো?'

অবনীর বিস্মিত ভাবটা মিলিয়ে গেল। সে ঘাড় নেড়ে বললে, 'আমি কিছু বলতে পারব না। ভৈরব আমার মুখ বন্ধ করে রেখেছে।’

দিলীপ বললে, ‘আমি আর কিছু শুনতেও চাই না। তবে এটা জেনে রেখো, তুমি ভৈরবকে খারাপ লোক বললে বলেই বাসা ছেড়ে আমি পালাব না। কেন পালাব? ও বাসা আমার খুব পছন্দসই।'

—অবনীকে পিছনে রেখে দিলীপ ট্রাম লাইনের দিকে অগ্রসর হল। তার সেই যুক্তিহীন ভয় দেখে দিলীপ মনে মনে কৌতূক অনুভব করলে। মানুষ হিসাবে ভৈরব অমানুষিক হবে কেন? বড়ো-জোর তার স্বভাবটাই মিষ্ট নয়! হয়তো তার কোনও কোনও অস্বাভাবিক বাতিক আছে—এমন বাতিক কত লোকেরই তো থাকতে পারে! মানুষের প্রকৃতি হরেকরকম বলেই তো এই পৃথিবী এমন বিচিত্র! হয়তো ভৈরব তার ঘরের মধ্যে কোনও খুনি আসামিকে আশ্রয় দিয়েছে! কিন্তু সেজন্যে বাইরের লোক অকারণে মাথা ঘামিয়ে ভয় পাবে কেন?

টালিগঞ্জের অমন খাসা বাসা কি ছাড়া যায়? কলকাতায় থেকেও সে কলকাতার বাইরে আছে! জনতার আর ট্রাম-বাস-ট্যাক্সির হট্টগোল নেই, হাজার পাখির ‘কোরাস' শুনে তার ঘুম ভাঙে, চারিদিকে তাকিয়েই দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ ভরে সবুজ রঙের স্রোত বইছে এবং তার উপরে ঝরে পড়ছে নীলাকাশের আলোর ঝরনা! ও বাসা ছাড়া হবে না !

শূন্য ও পূর্ণ কফিন

দিলীপের এক বন্ধু ছিল, মণিলাল। সে বয়সে কিছু ছোটো হলেও তার সঙ্গে দিলীপের খুব বনিবানাও ছিল।

মণিলাল ধনীর ছেলে এবং দিলীপের মতো সেও নির্জনতার ভক্ত। কলেজের পড়া সাঙ্গ করেও সংসারে ঢোকেনি। নিজের প্রকাণ্ড লাইব্রেরি ও ফুলের বাগান নিয়েই দিন কাটিয়ে দিত মনের খুশিতে। দিলীপদের বাসা ছাড়িয়ে আরও মাইল দেড়েক এগিয়ে গেলেই তার বাগান ঘেরা সুন্দর বাড়িখানি দেখতে পাওয়া যায়। জায়গাটি অনেকটা পল্লীগ্রামের মতো।

হপ্তায় বার দুয়েক দিলীপ তার এই বন্ধুটির সঙ্গে আলাপ করতে যেত। অবনীর সঙ্গে তার শেষ দেখা হবার পরদিন সন্ধ্যা আটটার সময়ে দিলীপ ঘর থেকে বেরুল তার বন্ধু মণিলালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। বেরুবার সময়ে টেবিলের দিকে চোখ পড়াতে দেখলে, তার উপরে পড়ে রয়েছে ভৈরবের কাছ থেকে চেয়ে আনা একখানি দামি বৈজ্ঞানিক বই।

দিলীপের মনে হল ভৈরবের সঙ্গে সে আর মেলামেশা করতে চায় না বটে, কিন্তু তার বইখানি ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।

বইখানি তুলে নিয়ে সে দোতালায় সিঁড়ি ধরে উপরে উঠল। ভৈরবের দরজার সামনে গিয়ে তার নাম ধরে দুবার ডাকলে। সাড়া পেলে না। দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। উঁকি মেরে দেখলে, ঘরের ভিতরে ভৈরব নেই। ভাবলে, ভালোই হল, ভৈরবের সঙ্গে আর কথা কইতে হল না, বইখানা ঘরের ভিতরে রেখে চুপিচুপি চলে যাই।

সে ঘরের মধ্যে ঢুকল। ল্যাম্পটা কমানো রয়েছে বটে, কিন্তু আবছা আলোয় ঘরের সব দেখা যাচ্ছে। সমস্ত ঘরখানার মধ্যে যেন এক অজানা অলৌকিক রহস্য স্তম্ভিত হয়ে আছে, আলোকের অল্পতায় তার ভিতরে এসে দাঁড়ালেই বুকের ভিতরে জেগে ওঠে কেমন একটা অস্বস্তি! দিলীপ এধারে ওধারে চোখ ফিরিয়ে দেখলে, ছাদে সেই ঝুলন্ত কুমির, দেওয়াল ঘেঁসে সেই পশুমুণ্ডধারী মিশরী দেবদেবীর জটলা এবং মাঝখানে সেই মমির কফিন। ... কিন্তু, কফিনের মধ্যে বীভৎস মমিটা নেই! ঘরের চারিদিকে তাকিয়েও দিলীপ সেটাকে দেখতে পেলে না। হয়তো তাকে ঘর থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। ভালোই হয়েছে।

দিলীপ নিজের মনেই বললে, ‘ভৈরবের উপরে আমি বোধহয় অবিচার করেছি। এখানে যদি কোনও গুপ্তরহস্য থাকত, তাহলে সে নিশ্চয়ই ঘরের দরজা এমন করে খুলে রেখে যেত না!'

দিলীপ বই রেখে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। সিঁড়িতে আলো ছিল না। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। সে একদিকের দেওয়াল ধরে নামছে, হঠাৎ সিঁড়ির উপরে শোনা গেল একটা অস্পষ্ট শব্দ, একটা আগুনের ফিনকির আভাস, একটা ঠান্ডা- কনকনে হাওয়ার ঝটকাকে যেন তার পাশ কাটিয়ে বেগে উপরে উঠে গেল!

—কে, ভৈরববাবু নাকি?'

কোনও সাড়া নেই—কিন্তু উপরে ঘরের দরজা খোলার শব্দ হল। দিলীপের মন কৌতূহলে ভরে গেল, সেও তাড়াতাড়ি আবার উপরে উঠল। ভৈরবের ঘরের দরজা তেমনি বন্ধ রয়েছে, ঠেলতেই খুলে গেল।

ঘরের ভিতরে উঁকি মারতেই সর্বপ্রথমে তার চোখ পড়ল কফিনটার উপরে। তার মধ্যে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই মৃতদেহটা।

দিলীপ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলে না! আরো দুই পা এগিয়ে গিয়ে ভালো করে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখলে, কফিনের মমি কফিনেই বিরাজ করছে!

কিন্তু তিন মিনিট আগেই কফিনের ভিতরে যে কিছুই ছিল না, দিলীপ শপথ করে তা বলতে পারে! চোখের ভ্রম? এও কি সম্ভব? সে আড়ষ্ট চক্ষে সেই বিভীষণ সুদীর্ঘ মৃত মূর্তির পানে তাকিয়ে রইল এবং তার মনে হল, মমির কোটরগত চোখদুটো যেন জ্যান্ত চোখের মতো একবার চকচক করে উঠল!

দিলীপের হতভম্ব ভাবটা তখনও কাটেনি, হঠাৎ নিচে থেকে প্রতাপের ব্যস্ত চিৎকার শোনা গেল—“দিলীপ! দিলীপ! কোথায় তুমি? শিগগির এস!'

দিলীপ দ্রুতপদে নেমে গিয়ে দেখলে, তার ঘরের সামনে কাতর মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্ৰতাপ!

—‘কি হে, ব্যাপার কি?

—“অবনী হঠাৎ জলে ডুবে গেছে! ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না, আপাতত তুমি হলেই চলবে! তাকে জল থেকে তোলা হয়েছে, দেহে এখনও প্রাণ আছে। দেরি কোরো না, শিগগির চলো!’

দুজনে তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং শীঘ্র অবনীর বাড়িতে পৌঁছবে বলে দৌড়তে আরম্ভ করলে।

অবনীদের বৈঠকখানায় ঢুকে দেখা গেল, চৌকির উপরে তার জলসিক্ত অচেতন দেহকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে।

দিলীপ প্রভৃতির চেষ্টায় প্রায় কুড়ি মিনিট পরে অবনীর দেহে একবার শিহরণ দেখা গেল, তারপর তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল, তারপর সে চোখ খুললে।

প্রতাপ বললে, ‘এইবারে জেগে ওঠো ভাই, জেগে ওঠো! তুমি আমাদের যথেষ্ট ভয় দেখিয়েছ!'

দিলীপ বললে, 'আমার ডাক্তারি ব্যাগ থেকে খানিকটা ব্রান্ডি বার করে ওকে খাইয়ে দাও।

অবনীর এক সহপাঠী সেখানে ছিল। সে বললে, “কী ভয়ই আমি পেয়েছিলুম! মাঠে বসে চাঁদের আলোয় আমার সঙ্গে গল্প করতে করতে অবনী হঠাৎ উঠে একটা পুকুরধারে গেল। মাঝখানে কতকগুলো গাছ থাকাতে আমি তাকে দেখতে পাচ্ছিলুম না। আচমকা শুনলুম, তার আর্তনাদ আর ঝপাং করে জলে পড়ার শব্দ! তারপর ছুটে গিয়ে পুকুরে ঝাঁপিয়ে কী কষ্টে যে তাকে ডাঙায় তুলেছি, তা খালি আমিই জানি। আমি তো ভেবেছিলুম, অবনী আর বেঁচে নেই!”

ইতিমধ্যে অবনী কতকটা সামলে নিয়েছে। সে দুইহাতে ভর দিয়ে উঠে বসল এবং তার মুখে-চোখে ফুটে উঠল দারুণ ভয়ের চিহ্ন!

দিলীপ বললে, “কি করে তুমি জলে পড়ে গেলে?’

—আমি পড়ে যাইনি।’

– তবে?'

—'কে আমাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে।'

—সে কি হে?'

—“হ্যাঁ। পুকুরধারে দাঁড়িয়েছিলুম, হঠাৎ কে আমাকে দুখানা বরফের মতো ঠান্ডা হাতে হালকা পালকের মতো শূন্যে তুলে ধরে জলে ছুড়ে ফেলে দিলে!”

— “কে সে?”

—“আমি কিছুই দেখিনি, কিছুই শুনিনি। কিন্তু সে যে কে, আমি তা জানি।’

খুব মৃদুস্বরে দিলীপ বললে, ‘আমিও জানি।’

অবনী সবিস্ময়ে বললে, 'তাহলে তুমি জেনেছ? মনে আছে, আমি তোমাকে কি অনুরোধ করেছিলুম?'

—"মনে আছে। এইবারে বোধহয় আমি তোমার অনুরোধ রক্ষা করব।'

প্রতাপ বিরক্ত কণ্ঠে বললে, “তোমরা কি গুজগুজ ফুসফুস শুরু করলে হে? অবনী এখন বিশ্রাম করুক, এখন আর কোনও কথা নয়। এস হে, আমরা বিদায় হই। '

- বাসার দিকে ফিরতে ফিরতে দিলীপের কত কথাই মনে হতে লাগল। —মমি-শূন্য কফিন, সিঁড়ির উপরে শব্দ ও কনকনে হাওয়া, তারপরেই কফিনের মধ্যে হারা মমির রহস্যপূর্ণ অসম্ভব পুনরাবির্ভাব এবং তারপর অবনীর উপরে এই অকারণ আক্রমণ! এর আগেই নন্দলালও ঠিক এই ভাবেই আক্রান্ত হয়েছিল এবং এদের দুজনেরই উপরে ভৈরব তুষ্ট নয়! এই সঙ্গে ভৈরবের ঘরের অসাধারণ ব্যাপারগুলোও স্মরণ হতে লাগল। এই সমস্ত ঘটনা একত্রে নাড়াচাড়া করতে করতে দিলীপের মনের ভিতরে একটা সম্পূর্ণ নাটক গড়ে উঠল! এসবকে মিথ্যা বলা অসম্ভব, কিন্তু পৃথিবীর চক্ষে এদের সত্যতা প্রমাণিত করাও কতটা কঠিন! পৃথিবী বলবে—দিলীপ, তুমি ভুল দেখেছ, কফিন এক মুহূর্তও মমিশূন্য হয়নি, আরো অনেকের মতো অবনীও হঠাৎ জলে ডুবে গেছে, ভেবে ভেবে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, তুমি কোনও ভালো ডাক্তারের ঔষধ খাও!..... দিলীপ নিজেও নিশ্চয় এরকম গল্প শুনলে এই কথাই বলত! কিন্তু তবু সে এখন স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারে যে, ভৈরবের মন হচ্ছে হত্যাকারীর মন এবং সে এমন এক অশ্রুতপূর্ব ভয়াবহ অস্ত্রের দ্বারা নরহত্যা করতে চায়, পৃথিবীর অপরাধের ইতিহাসে আর কেউ কখনো যা ব্যবহার করতে পারেনি!

দিলীপ স্থির করলে, হপ্তাখানেকের মধ্যেই কোনও নতুন বাসায় উঠে যাবে! এ বাসায় থাকলে তার পড়াশোনা আর হবে না, দোতালার ঘরের রহস্য নিয়েই মন ব্যস্ত হয়ে থাকবে! সে বাসার কাছে এসে পড়ল। দোতালার ঘরে তখনো আলো জ্বলছে এবং বাইরের দিকে তাকিয়ে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভৈরব।

বাড়ির ভিতরে ঢুকে দিলীপ দেখলে, ভৈরব সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছে।

ভৈরব বললে, “দিলীপবাবু, নমস্কার। আপনার সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে চাই। এখন কি আপনার সময় হবে?”

দিলীপ ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'না!'

—“সময় হবে না? লেখাপড়া নিয়ে আপনি এতই ব্যস্ত? আমি অবনীর কথাই বলতুম। শুনছি তার নাকি কি বিপদ হয়েছে?' ভৈরবের মুখ গম্ভীর, কিন্তু তার চোখে যেন আনন্দের আভাস!— দিলীপের ইচ্ছা হল, মারে তার মুখে এক ঘুসো !

সে বললে, ভৈরববাবু, শুনে আপনি বড়ো দুঃখিত হবেন যে, অবনী এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে! আপনার শয়তানি কৌশল এবার কাজে লাগেনি! বেহায়ার মতো কিছু উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করবেন না, আমি সব জেনে ফেলেছি!'

খাপ্পা দিলীপের রুক্ষ কথা শুনে ভৈরব প্রথমটা থতমত খেয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। তারপর বললে, ‘আপনি পাগল হয়ে গেছেন দিলীপবাবু। কী আপনি বলতে চান? অবনীর দুর্ঘটনার জন্যে আমি দায়ি?'

বজ্ৰনাদে দিলীপ বললে, 'হ্যাঁ! দায়ি আপনি, আর আপনার ওই শুকনো মড়া! ভৈরববাবু, সেকাল হলে আপনাকে হয়তো জীবন্তে পুড়িয়ে মারা হত, কিন্তু ভুলে যাবেন না, একালেও ফাঁসিকাঠ আছে! এই টালিগঞ্জে যদি আর কোনও লোক এইভাবে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায় তাহলে আমিই আপনাকে পুলিসের হাতে সমর্পণ করব! মিশরী মড়ার খেলা বাংলাদেশে চলবে না,—বুঝেছেন?

—আপনাকে শীঘ্রই পাগলাগারদে পাঠাতে হবে দেখছি।'

– আচ্ছা! দেখা যাবে, আমিই পাগলাগারদে যাই, না আপনিই ফাঁসিকাঠে দোল খান ! —বলেই দিলীপ নিজের ঘরে ঢুকে দোর বন্ধ করে দিলে।

চলন্ত মৃতদেহ

পরদিন সন্ধ্যায় দিলীপ স্থির করলে, আজ মণিলালের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। পথে বেরিয়ে পিছন ফিরে দেখলে, উপরের আলোকিত ঘরের জানলায় ভৈরব আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে মূর্তির মতো। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোধহয় তাকেই দেখছিল। তার পাপ-সংসর্গ থেকে তফাতে এসে দিলীপ একটা অস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলে।

দূরে তালকুঞ্জের মাথার উপর থেকে চাঁদ যেন সকৌতুকে পৃথিবীকে নিরীক্ষণ করছে এবং হালকা বাতাসে ভেসে আসছে শান্ত সন্ধ্যার একটি স্নিগ্ধ গন্ধ। জ্যোৎস্নায় স্বপ্নময় নীলসাগরে যেন কোনও পরিপুরীর উদ্দেশে চলেছে ছোটো ছোটো মেঘের তরণী। দুইপাশে মাঠের জনশূন্য উন্মুক্ততা নিয়ে এগিয়ে চলল দিলীপ, মনের আনন্দে।

তখন জনমানবের সাড়া নেই। প্রায় আধঘণ্টা পরে দেখা গেল, খানিক তফাতে মণিলালের বাড়ির জানলাগুলো আলোকে সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

হঠাৎ দিলীপের কি মনে হল, একবার ফিরে পিছনপানে তাকিয়ে দেখলে। চাঁদের কিরণে ধবধবে পথটি একটি চওড়া শুভ্র রেখার মতো অনেক দূরে অস্পষ্টতার মধ্যে গেছে হারিয়ে কিন্তু তারই উপর দিয়ে অভিশপ্ত অপচ্ছায়ার মতো কিএকটা দ্রুতবেগে এগিয়ে আর এগিয়ে আসছে!

দিলীপের বুক ছাঁৎ করে উঠল। কী ও? মানুষ? কী লম্বা ওর কালো দেহ, শুভ্র পথের জ্যোৎস্নাকেও ও যে কলঙ্কিত করে তুলেছে! ওর চোখদুটো যেন দপদপ করছে, প্রত্যেক পদক্ষেপের তালে তালে হাড়গুলো বেজে উঠছে খড়-মড় করে, যেন ওর সারা দেহের সঙ্গেই মাংসের সম্পর্ক নেই! কী অস্বাভাবিক ওর গলা—যেন একটা বাঁখারির উপরে বসানো আছে মুণ্ডুটা! ভয়াবহ সাক্ষাৎ-মৃত্যুর মূর্তি ঝড়ের মতো ছুটে আসছে শিকারের দিকে!

দিলীপ আর দাঁড়ালে না, মণিলালের বাড়ির দিকে প্রাণপণে ছুটতে লাগল—কণ্ঠে তার আর্ত চিৎকার! পিছনে মৃত্যু-পিশাচ, সামনে আলোকজ্জ্বল জীবনময় অট্টালিকা, ওদিকে নরক, এদিকে স্বৰ্গ, কিন্তু মাঝখানে এখনো রয়েছে বিপজ্জনক ব্যবধান! এই পথটুকু আজ কী লম্বাই মনে হচ্ছে, আজ যেন আর পথের শেষ আসবে না!

কিন্তু পথের শেষ এল—জীবন্ত-মৃত্যু তখন তার কাছ থেকে মাত্র দশ হাত দূরে, জ্বলন্ত চক্ষে দুখানা অস্থিসার দীর্ঘ বাহু বাড়িয়ে সে দিলীপকে ধরবার জন্যে প্রস্তুত হয়েছে। একটানে বাগানের ফটক খুলে দিলীপ আবার ছুটল, বাড়ির দরজা সেখান থেকেও খানিকটা দূরে!

সভয়ে শুনলে, বিভীষিকা তখনও তার পিছু ছাড়েনি—সেও সশব্দে ফটকটা খুলে ফেললে এবং পিছনে, অতি নিকটে তার কঠিন পায়ের শব্দ।

দেহের শেষ শক্তিটুকু প্রয়োগ করে দিলীপ তার দ্রুতগতিকে দ্বিগুণ দ্রুত করে তুললে এবং কোনোরকমে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে বিকট স্বরে চেঁচিয়ে দরজাটা বন্ধ করে খিল তুলে দিলে!

কোথা থেকে ছুটে এসে মণিলাল বললে, 'কি আশ্চর্য! দিলীপ–দিলীপ, ব্যাপার কি? দরজার উপরে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে দিলীপ অতি ক্ষীণস্বরে বললে, ‘আগে এক গেলাস জল !’

মণিলাল দৌড়ে গিয়ে যখন এক গেলাস জল নিয়ে ফিরে এল, দিলীপ তখন একান্ত অবসন্নের মতো একখানা চেয়ারের উপরে বসে পড়ে হাঁপ সামলাবার চেষ্টা করছে! —এই নাও জল! বন্ধু, তোমার এ কী মূর্তি, মুখ যে একেবারে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে!

দিলীপ সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে তার তপ্ত পাথরের মতন শুকনো গলাটা ভিজিয়ে নিলে। তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে থাকবার পর বললে, মণিলাল, সব কথা পরে বলছি। আপাতত শুনে রাখো, আজ রাত্রে তোমার বাড়িই হবে আমার শয়নমন্দির। কাল সকালে আবার সূর্যোদয় না হলে আমি আর এ বাড়ির বাইরে যেতে পারব না!'

দিলীপের মুখের দিকে তাকিয়ে মণিলাল বললে, 'তুমি যা বলবে, তাই হবে। আমি তোমার জন্যে ব্যবস্থা করতে বলছি। ওকি, উঠে আবার কোথায় যাচ্ছ?'

—দোতালার বারান্দায়। সেখান থেকে চারিদিকের সব দেখা যায়। তুমিও আমার সঙ্গে এস। আমি যা দেখেছি তুমিও তা নিজের চোখে দেখলে ভালো হয়।’

দোতালার বারান্দায় বেরিয়ে চোখে পড়ল চারিদিকেই চন্দ্রালোকের রাজ্য—যার প্রজা হচ্ছে গাছপালা লতা-পাতা ফুল-ফল!

দিলীপ প্রথমে বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে বাগানের যতখানি দেখা যায় তার উপরে চোখ বুলিয়ে নিলে। সেখানে দখিনা বাতাসে কেবল ছোটো-বড়ো ফুলগাছেরা দুলে দুলে চন্দ্রলেখার স্বপ্ন দেখছে।

তারপর সে মাঠের পর মাঠের দিকে এবং সুদীর্ঘ সাদা ফিতার মতো মেঠো পথের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলে। সেখানেও জনহীন পূর্ণ শান্তির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে সুমধুর জ্যোৎস্না! কাছে বা দূরে জীবন্ত কোনও প্রাণীর ছায়া পর্যন্ত দেখা গেল না।

মণিলাল বললে, ‘দিলীপ! তুমি কি সিদ্ধি খেয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছ? এখানে এসে কাকে তুমি খুঁজতে চাও?'

—সে কথা তোমাকে বলছি।...কিন্তু, কোথায় সে গেল, কোথায় লুকোল? .....হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই দেখো মণিলাল, ওই দেখো! পথটা যেখানে মোড় ফিরেছে, ওইখানে তাকিয়ে দেখো'—বলেই সে উত্তেজিতভাবে মণিলালের বাহু সজোরে চেপে ধরলে !

মণিলাল বললে, ‘হ্যাঁ, আমি দেখতে পাচ্ছি! আমাকে দেখাবার জন্যে এত জোরে আমার হাত চেপে ধরবার দরকার নেই! হ্যাঁ, ওখান দিয়ে কেউ যাচ্ছে বটে! কোনও মানুষ, দেখলে মনে হয়—সে রোগা, কিন্তু ঢ্যাঙা—খুব ঢ্যাঙা! বেশ তো, পথ দিয়ে মানুষ যাচ্ছে—আর মানুষরা চিরকালই পথ দিয়ে চলে, কিন্তু সেজন্যে তোমার এত বেশি ভয় পাবার কারণ কি? —কারণ কিছুই নেই, তবে ওই মূর্তিটাই আমাকে ধরবার জন্যে পিছনে তাড়া করেছিল !

আচ্ছা, তোমার বৈঠকখানায় চলো, সব কথা সবিস্তারে বর্ণনা করছি!'

দুজনে আবার নেমে বৈঠকখানায় এসে বসল। প্রচুর আলোকে আনন্দময় সেই সাজানো ঘরের একখানা কৌচের উপরে বসে দিলীপ একেবারে গোড়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা একে একে মণিলালের কাছে বর্ণনা করে গেল—ছোটোখাটো খুঁটিনাটিটি পর্যন্ত বাদ দিলে না।

কাহিনী সাঙ্গ করে সে বললে, 'মণিলাল, এই হচ্ছে আমার অভিশপ্ত অভিজ্ঞতার ইতিহাস। এ কাহিনী অসম্ভব বটে, কিন্তু এর প্রত্যেক বর্ণই সত্য!'

মণিলাল বেশ খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, তার মুখের উপরে একটা হতভম্ব ভাব ! তারপর সে ধীরে ধীরে বললে, 'আমার জীবনে এমন গল্প কখনো শুনিনি! তুমি সমস্ত বিষয় বর্ণনা করলে বটে, কিন্তু তুমি নিজে কি সিদ্ধান্তে উপস্থিত হয়েছ বলো দেখি?” —তোমার নিজের মত কি?'

—"তার আগে তোমার মত শুনতে চাই। এ বিষয় নিয়ে তুমি ভাববার সময় পেয়েছ, আমি পাইনি। '

—“আসল ব্যাপার আমার যা মনে হয়, তা হচ্ছে এই। ওই শয়তান ভৈরব মিশরে গিয়ে এমন কোনও গুপ্তমন্ত্র শিখে এসেছে, যার গুণে মমিকে—অর্থাৎ হাজার হাজার বছর আগেকার মড়াকে—অথবা একটা বিশেষ মড়াকে অন্তত খানিকক্ষণের জন্যে জ্যান্ত করে তুলতে পারা যায়। যেদিন সে প্রথম অজ্ঞান হয়ে যায়, সেদিন সম্ভবত মড়াটাকে সর্বপ্রথম জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল। কিন্তু একটা পুরানো শুকনো মড়া জীবন্ত হয়ে উঠছে, এই অনভ্যস্ত অসম্ভব দৃশ্য দেখেই যে সে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল, তাতে আর কোনোই সন্দেহ নেই। তারপরে জীবন্ত মড়ার নড়াচড়া দেখতে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যদিও মমির সেই জীবন নিশ্চয়ই দীর্ঘস্থায়ী নয়। কারণ আমি তাকে দিনের পর দিন সম্পূর্ণ জড়পদার্থের মতো কফিনের ভিতরে থাকতে দেখেছি। কিন্তু এক অপার্থিব অদ্ভুত শক্তির অধিকারী হয়ে ভৈরব বুঝলে যে, মড়ার সাহায্যেও সে মনের মতো কার্য সফল করতে পারে। কারণ এটা হচ্ছে মানুষের মড়া, অতএব জ্যান্ত হলে তার মানুষি বুদ্ধি আর শক্তিও ফিরে পায়। নন্দলালের উপরে ভৈরবের রাগ ছিল, তার উপরেই সে প্রথম পরীক্ষা করলে। তারপর এই নতুন ক্ষমতা পেয়ে আনন্দে অধীর হয়ে সে অবনীকেও নিজের দলে টানবার চেষ্টা করলে। কিন্তু অবনী হচ্ছে ভিন্ন ধাতুতে গড়া। এসব অন্যায় ভূতুড়ে ব্যাপারে সে যোগ দিতে চাইলে না। ভৈরবের সঙ্গে তার ঝগড়া বাধল। এমন লোকের হাতে সে নিজের বোনকে সমর্পণ করতে নারাজ হল, আর তার ফলে সেও পড়ল ভৈরবের হুকুমে এই জ্যান্ত মড়ার হাতে। কিন্তু আগে নন্দলাল, তারপরে অবনী যে প্রাণে প্রাণে কোনরকমে রেহাই পেলে, সেটা হচ্ছে দৈবের মহিমা! নইলে ভৈরবের উপরে আজ দু-দুটো নরহত্যার চাপ পড়ত। তারপর সে যখন টের পেলে যে, আমিও তার গুপ্তকথা জেনে ফেলেছি, তখন আমাকেও তার পথ থেকে সরিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইলে! আমি যে এখানে আসব সে তা জানত। দিলে তার মমিকে লেলিয়ে! কিন্তু ভাগ্য আমার প্রতি সুপ্রসন্ন, নইলে কাল সকালেই তোমার বাগানের ভিতরে দেখতে পেতে আমার মৃতদেহ! আমি ভিতু লোক নই, কিন্তু এরকম মৃত্যু-ভয় অতি বড়ো সাহসীও সহ্য করতে পারে না!”

মণিলাল অবিশ্বাসের হাসি হাসতে হাসতে বললে, 'বন্ধু, অতিরিক্ত লেখাপড়া করে করে তোমার মাথার গোলমাল হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর কলকাতায় চার হাজার বছরের পুরানো মিশরের জ্যান্ত মমি! সবচেয়ে কড়া গাঁজার ধোঁয়াও এর কাছে হার মানে! এই মমিকে খালি তুমিই দেখেছ, আর কেউ একে জ্যান্ত অবস্থায় দেখেনি!'

—“নিশ্চয়ই আরও কেউ কেউ দেখেছে। কারণ এ অঞ্চলের অনেকেই বলছে যে, বানর জাতীয় কোনও জীব যেখানে সেখানে মানুষের উপরে অত্যাচার করছে! তা ছাড়া তারা আর কি বলবে? আসল ব্যাপারটা যে কল্পনা করাও অসম্ভব!

—কল্পনার দরকার কি? আসল ব্যাপার তো বেশ বোঝা যাচ্ছে।’

—"কী বোঝা যাচ্ছে?’

—‘প্রথমত ধরো, তুমি বলছ শূন্য কফিনকেও হঠাৎ পূর্ণ হতে দেখেছ! তুমি ভুলে যাচ্ছ, ভৈরবের ঘরে আলো কমানো ছিল। সেই ম্লান আলোতে প্রথমটা তোমার ভালো করে তাকাবার দরকার হয়নি, তাই তুমি চোখের ভ্রমে মমিটাকে দেখতে পাওনি!' —“না, না, মণিলাল! এ হতে পারে না।’

— হতে পারে না কি, তাই-ই হয়েছে। তারপর আমার বিশ্বাস, এ অঞ্চলে হঠাৎ কোনও গুণ্ডা এসে লীলাখেলা শুরু করেছে। নন্দলালের উপরে সেই-ই আক্রমণ করেছে, তোমাকে একলা পেয়ে সেই-ই তেড়ে এসেছে, আর অবনী জলের ভিতরে নিজেই পড়ে গেছে দৈবগতিকে। এসবের জন্যে ভৈরবকে দায়ি কোরো না, কারণ তোমার এ উদ্ভট মত ধোপে টিকবে না। তাকে জোর করে আদালতে হাজির করলেও আইন তোমার একটা কথাও বিশ্বাস করবে না।’

দিলীপ গম্ভীর স্বরে বললে, 'আমি তা জানি। তাই আইনের আশ্রয় না নিয়ে আমি নিজের শক্তির উপরেই নির্ভর করতে চাই।'

— “তার মানে?’

—"আমি কলকাতাকে এক অদ্ভুত বিপদ থেকে রক্ষা করতে চাই। কেবল তাই নয়, সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, আমি নিজে আত্মরক্ষা করতে চাই। আমার কর্তব্য আমি স্থির করেছি। এখন ঘণ্টাখানেক আমাকে একলা থাকতে দাও। আমাকে একটা কলম আর একখানা কাগজের ‘প্যাড দিতে পারবে?”

—“নিশ্চয়ই। ওই কোনের টেবিলের ধারে গিয়ে বসলেই তুমি যা চাও তাই পাবে।'

দিলীপ টেবিলের ধারে গিয়ে বসল। তারপর কাগজ-কলম নিয়ে কি লিখতে লাগল। একঘণ্টার পর দুই ঘণ্টার আগে তার লেখা শেষ হল না। ততক্ষণ ধরে মণিলাল একখানা সোফায় বসে বই পড়তে ও মাঝে মাঝে দিলীপের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল ৷

তারপর দিলীপ এক তাড়া কাগজ নিয়ে উঠে এসে মণিলালের সামনে দাঁড়িয়ে বললে, ‘এখন তুমি সাক্ষী হও। এই কাগজের তলায় একটা সই করে দাও।’

—সাক্ষী হব? কিসের সাক্ষী?”

—এটা যে আজকের তারিখে আমি সই করেছি, তারই সাক্ষী হবে তুমি। বন্ধু, এরই ওপরে আমার জীবন নির্ভর করছে!”

—“দিলীপ, তুমি পাগলের মতো কথা কইছ। চলো, খেয়েদেয়ে শোবে চলো।'

—আমি যা করেছি, অনেক ভেবেচিন্তেই করেছি। যে মুহূর্তে তুমি সই করবে, আমি তোমার সব কথাই শুনব। নাও, সই করো।’

–কিন্তু, কিজন্যে সই করব সেটা বলো।'

—“আজ আমি তোমাকে যে ঘটনাগুলো বলেছি, এইসব কাগজে তা লিখে রাখলুম। তুমি কেবল সাক্ষী হও, মণিলাল !”

মণিলাল তখনই সই করে দিয়ে বললে, ‘নাও, কেমন? হল তো? কিন্তু তোমার মতলব কি, আমি জানতে চাই।'

—পুলিসের হাতে যদি ধরা পড়ি, তাহলে এই কাগজগুলো দাখিল কোরো।'

—'পুলিসের হাতে তুমি ধরা পড়বে? কেন?’

—'হয়তো আমি নরহত্যা করব !”

— দিলীপ, দিলীপ! গোঁয়ারের মতো কোনও কাজ কোরো না!”

—মোটেই নয়। আমি আমার কর্তব্যই করব। এখন এই কাগজগুলো তুমি রেখে দাও। আমি এইবার খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে চাই। কাল সকালে আমার অনেক কাজ।

অপূর্ব শবদাহ

দিলীপকে যারা চেনে তার জানে যে, শত্রু হিসাবে সে বড়ো সহজ মানুষ নয়। যেমন মন দিয়ে সে লেখাপড়া করত, তেমনি ভাবে দেহমন একাগ্র করেই লোকের সঙ্গে বন্ধুতা বা শত্রুতা করতে পারত। এই ছিল তার স্বভাব। অর্ধসমাপ্ত করে কোনও কিছুই সে ফেলে রাখতে পারত না।

সে যে কি করবে সেকথা কিছুতেই মণিলালের কাছে ভাঙলে না। কিন্তু পরদিন প্রভাতে পূর্ব আকাশে রঙের খেলা শুরু হবার আগেই দিলীপ বিছানা ছেড়ে জামাকাপড় পরে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল।

এই তো সেই চিরপরিচিত বিহঙ্গ-কলরোলে ও তরুমর্মরে সঙ্গীতময় পথ আর মাঠ, কিন্তু অবর্ণনীয় বিভীষিকার চলন্ত ছায়াকে বুকে করে রাতে ওরাই কি ভয়ানক হয়ে উঠেছিল! রাতের অন্ধকার ও অস্পষ্টতা এসে পথঘাটে যে কোনও বিভীষিকার জন্যে জমি তৈরি করে রাখে। তাই হঠাৎ কোথাও একটা গাছের ডাল নড়লে বা প্যাঁচা ডেকে উঠলে বা বাদুড় ডানা ঝটপট করলে মানুষের বুকও ছমছম করতে থাকে! কিন্তু দিনেরবেলায় সুস্পষ্ট সূর্যালোক কাপুরুষকেও সাহসী করে তোলে। সেই সৃষ্টিছাড়া মূর্তিটা আজ যদি এখন এই মেঠো পথে এসে দাঁড়ায়, দিলীপ নিশ্চয়ই তাহলে কালকের মতো ভয়ে উদভ্রান্ত হয়ে ওঠে না !

এমনি সব ভাবতে ভাবতে দিলীপ কাঁচা রোদের সোনামাখা পথের উপর দিয়ে এগিয়ে চলল ৷

প্রথমে প্রতাপের বাড়িতে গিয়ে হাজির হল। প্রতাপ তখন সবে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে প্রভাতি চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ নিয়ে বসেছে।

দিলীপকে এত ভোরে দেখে বিস্মিত হয়ে বললে, 'তুমি যে এখন? চা আনতে বলি?’

—না, ধন্যবাদ! প্রতাপ, তুমি এখনই আমার সঙ্গে আসতে পারবে?’

—'কেন পারব না?’

—'আমি যা বলব, করবে?”

—“নিশ্চয়!

—“তোমাদের বন্দুক আছে না?'

—আছে। কিন্তু বন্দুক কি হবে?'

—“সেটা সঙ্গে করে নিয়ে এস। আর এক গাছা খুব মোটা লাঠি!

— “বাঘ মারা যায় এমন লাঠি তোমায় দিতে পারি। কিন্তু এত অস্ত্রশস্ত্র কেন? যুদ্ধযাত্ৰা করবে নাকি?”

—‘দেওয়ালের উপরে ওই যে বড়ো রাম-দাখানা টাঙানো রয়েছে, ওখানাও চাই।'

— “এ যে কুরুক্ষেত্রের আয়োজন! আর কিছু চাই? কামানটামান?”

—আপাতত দরকার হবে না। তোমাকেও দরকার হত না, কিন্তু পাছে একজনের বেশি লোক আমাকে আক্রমণ করে, সেই ভয়েই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা কেউ শিশু নই, কেউ আক্রমণ করলে নিশ্চয়ই লড়াই করতে পারব, কি বলো?”

—‘পারা তো উচিত! কিন্তু এখন বীরদর্পে কোন দিকে যাত্রা করতে হবে, বলো? ফোর্ট- উইলিয়মের দিকে?”

—“না। আমার বাসার দিকে!

—“তোমার বাসার দিকে!'

—অর্থাৎ ভৈরবের বাসার দিকে!'

—“কিন্তু সেজন্যে এমন সমরসজ্জার প্রয়োজন কি? ভৈরবকে যদি বধ করতে চাও, একটা ঘুসি বা চড় বা লাথিই যথেষ্ট !”

–না প্রতাপ, না! ভৈরব একলা নেই!”

– তাহলে সেও কি সৈন্য সংগ্রহ করেছে?'

—'এসব প্রশ্নের জবাব পরে দেব। এখন যা বলি, শোনো। বন্দুক আর রাম-দা নিয়ে আমি ভৈরবের ঘরে ঢুকব। ওই মোটা লাঠি কাঁধে করে তুমি দরজার বাইরে অপেক্ষা করবে। যদি আমার দরকার হয়, তোমাকে আমি ডাকব। তখন তুমি লাঠি চালিয়ে শত্রু মারতে একটুও ইতস্তত কোরো না। এখন চলো!’

—জো হুকুম, জেনারেল! তাহলে এই আমি ‘কুইক-মার্চ শুরু করলুম!

ভৈরব টেবিলের সামনে বসে একমনে কি লিখছিল। দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলে দেখলে, দিলীপ ঘরে ঢুকে আবার দরজা ভেজিয়ে দিলে—তার পিঠে বাঁধা বন্দুক, হাতে রাম-দা! প্রথমটা সে হতভম্বের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর বিষম রাগে তার কপালের শিরগুলো ফুলে উঠল।

দিলীপ কফিনটার দিকে তাকিয়ে দেখলে, নিসাড় মৃত্যুর আড়ষ্টতা নিয়ে প্রাচীন মিশরবাসী সেই সুদীর্ঘ মানবের মৃতদেহটা কফিনের ভিতরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার কোটরগত চক্ষে আজ জাগ্রত দৃষ্টির এতটুকু আভাস নেই, তার মাংসহীন বিবর্ণ চামড়া-ঢাকা অস্থিসার দেহের উপরে শত শত শতাব্দীর কুৎসিত জীর্ণতা মাখানো, লম্বা হাত দুখানা অনাবশ্যক উপসর্গের মতো একান্ত অসহায়ভাবে দেহের দুইদিকে ঝুলছে—যদিও তার কাঁকড়ার দাড়ার মতো বাঁকানো নিষ্ঠুর হাতের আঙুলগুলো দেখলে মন যেন দমে যায়। কিন্তু চার হাজার বছরের ওই পুরানো শুটকো মড়া যে আবার ওই কফিন ছেড়ে পৃথিবীর সবুজ মাটির উপরে পদচালনা করতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা শুনলে পাগলও বোধহয় অবিশ্বাসের হাসি হেসে উঠবে!

দিলীপ রীতিমতো গদিয়ানি চালে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে যেন নিজের মনেই বললে, ‘দেখছি ধুনুচিতে আজ ধুনোও পুড়ছে না, পাপিরাস-পুথির মন্ত্রও কেউ পড়ছে না, জন্তুমুখো দেবতাদের পুজোর আয়োজন নেই, মমিরও ঘুম এখনও ভাঙেনি!”

ঠোঁট ফাঁক করে হিংস্র দাঁতগুলো দেখিয়ে ভৈরব বললে, 'দিলীপবাবুর বোধহয় ভ্রম হয়েছে! এটা তাঁর নিজের ঘর নয়!’

দিলীপ বললে, দিলীপবাবুর ভ্রম হয়নি! তিনি যে একটা হত্যাকারীর আস্তানায় এসেছেন, এ জ্ঞান তাঁর আছে।'

ভৈরব বললে, ‘আমি যদি এখন ফোন করে পুলিস ডাকি, তাহলে ঘরে ঢুকে কি দেখবে তারা? শান্তিপ্রিয় গোবেচারা ভৈরবের হাতে রয়েছে মাত্র একটি ফাউন্টেন পেন আর মহাবীর দিলীপবাবুর পৃষ্টদেশে বাঁধা দোনলা বন্দুক আর হাতে চকচক করছে মস্ত খাঁড়া !”

দিলীপ গাত্রোত্থান করে বললে, 'পিঠের বন্দুক এই আমি হাতে নিলুম, আর এই রাম- দা উপহার দিলুম তোমাকে! এইবার তুমিও সশস্ত্র হলে তো?”

টেবিলের উপরে স্থাপিত রাম-দার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভৈরব বললে, ‘তারপর? রাম-দার সঙ্গে কি বন্দুকের যুদ্ধ হবে?”

দিলীপ বুঝতে পারলে, ভৈরব মনের ভাব চাপবার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু ভয়ে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে উঠছে! সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললে 'রাম-দা নিয়ে তুমিও উঠে দাঁড়াও! তারপর ওই মমিটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলো!”

শুকনো হাসি হেসে ভৈরব বললে, 'ও, খালি এই? মড়ার ওপরে খাঁড়ার ঘা?'

—হ্যাঁ, খালি এই! শুনলুম, রাজার আইন তোমাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু আমার নিজের একটা আইন আছে। তার কাছে তোমার মুক্তি নেই। তোমার ঘরের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখো। বেলা আটটা বাজতে আর পাঁচ মিনিট বাকি। এই আমি বন্দুক তৈরি রাখলুম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তুমি যদি ওই মমিটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে না ফেলো, ফদুকের গুলিতে আমি তোমার খুলি উড়িয়ে দেব।'

— তুমি আমাকে খুন করবে!

—'হ্যাঁ।'

— “কি কারণে?’

—'তোমার শয়তানির জন্যে।...ভৈরব, এক মিনিট গেল?'

—"কিন্তু কী শয়তানি আমি করেছি?'

—‘বলাবাহুল্য। তুমিও জানো, আমিও জানি।'

– এ হচ্ছে ধাপ্পা দিয়ে ভয় দেখানো।’

—“দু মিনিট কাটল!’

—ধাপ্পায় আমি ভয় পাব না। তুমি হচ্ছ পাগল—বিপজ্জনক পাগল। তোমার কথায় আমার নিজের সম্পত্তি নষ্ট করব কেন? ওটি মূল্যবান মমি!'

—তোমাকে ওটা কেটে খান খান করে আর পুড়িয়ে ফেলতে হবেই।'

—'আমি ওসব কিছুই করব না।'

—চার মিনিট কাটল।'

দিলীপ বন্দুক তুলে তার নলটা ফেরালে ভৈরবের দিকে। তার মুখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ভাব। — ভগবানের নামে শপথ করছি, আটটা বাজলেই আমি তোমাকে পাগলা কুকুরের মতো গুলি করে মারব! এর জন্যে আমি ফাঁসি যেতেও রাজি! এখনও উঠলে না? ঘড়িতে আটটা বাজছে! তবে মরো'—দিলীপ ঘোড়ার উপর আঙুল রাখলে।

তারপর মড়ার উপরে কোপের পর কোপ পড়তে লাগল, ভৈরব এক একবার কোপ বসায়, আর এক একবার মহাভয়ে ফিরে দেখে, দিলীপ কি করছে! মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সব শেষ—ঘরের মেঝের উপরে শুকনো মড়ার খণ্ড-বিখণ্ড হাত, পা, বাহু, নাক, মুখ, চোখ, ধড় ও কুচি কুচি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুঞ্জীভূত হয়ে উঠল।

বজ্রগম্ভীর স্বরে বললে, 'ওর ওপরে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন লাগাও!” ভৈরব নীরবে তার হুকুম তামিল করলে। শুকনো মড়ার টুকরোগুলো কাগজের মতো সহজেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল—বিশ্রী দুর্গন্ধে ও আগুনের তাপে টেকা দায় ! কিন্তু দিলীপ তখনও বন্দুক তুলে স্থির মুখে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দিলীপ ভৈরব ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললে, ‘কেমন, হয়েছে তো?”

—“না। বার করো তোমার সেই মন্ত্র লেখা পাপিরাস পাতার পুথি। সেটাও আগুনে ফেলে দাও।'

কাতর স্বরে ভৈরব বললে, 'না, না, তাত্থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না। দিলীপবাবু, আপনি কি রত্ন নষ্ট করতে চাইছেন জানেন না! সে পুঁথি জ্ঞানের আধার। তেমন পুথি পৃথিবীতে আর নেই!’

—ভৈরব, পোড়াও সেই পুথি !'

—দিলীপবাবু, আমার কথা শুনুন। পুথিখানা পোড়াতে বলবেন না! ও পুথি আমাদের দুজনের সম্পত্তি হয়ে থাক। ওর সব কথা আপনাকে আমি নিজে শিখিয়ে দেব। তাহলে আমরা দুজনে হব বিশ্বজয়ী !'

টেবিলের কোন টানায় পুথিখানা আছে, দিলীপ তা জানত। সে এগিয়ে গিয়ে সেখানা টেনে বার করলে।

ভৈরব হাউমাউ করে উঠে তার হাত থেকে সেখানা কেড়ে নিতে এল। কিন্তু দিলীপ এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিয়ে পুথিখানা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করলে।

পুথিখানা যখন পুড়েএকবারে ছাই হয়ে গেল, দিলীপ ফিরে হাসিমুখে বললে, 'ভৈরবচন্দ্র, এখন তুমি হলে নির্বিষ সাপের মতো। আর আমার এখানে কোনও কাজ নেই—বিদায়! *

——————

* বিদেশী কাহিনীর অনুসরণে

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%