বিভীষণের জাগরণ

হেমেন্দ্রকুমার রায়

আর্তনাদ ও সিংহনাদ

রাত দুপুর।

একে ‘ব্ল্যাক আউট’-এর মহিমায় মানুষের চক্ষু হয়েছে প্রায় অন্ধ, তার উপরে চারিদিকে ঝরছে ঘোর অমাবস্যার তিমির-ঝরণা!

কলকাতার রাস্তায় একটিমাত্র গ্যাসের আলো জ্বলছে না এবং কোথাও নেই একখানি মাত্র দোকানের এতটুকু বাতির শিখা। মাথার উপরে দীপ্তনেত্রে জেগে আছে বটে লক্ষ লক্ষ তারকা, কিন্তু আকাশের অস্তিত্ব ছাড়া মানুষকে তারা আর কিছুই দেখাতে পারছে না।অনায়াসেই বলা চলে, অন্ধকারের অতলে ডুবে কলকাতা এখন মরে কালো পাথরের মতো আড়ষ্ট হয়ে গেছে।

কেবল কোনও কোনও বাড়ির বন্ধ জানলার পিছন থেকে মাঝে মাঝে জাগছে ক্ষুধিত শিশুর কান্না, পথের মোড়ে মোড়ে এক আধখানা শোনা যাচ্ছে পাহারাওয়ালার পদশব্দ এবং হয়তো বা দূর হতে থেকে থেকে ভেসে আসছে কুকুরদের ঝগড়ার শব্দ—ব্যস, এছাড়া জীবনের আর কোনও লক্ষণই নেই।

শহরের উত্তরাঞ্চলের একটি পথকে হঠাৎ জাগ্রত করে তুললে দুই পথিকের বাধো বাধো জুতোর শব্দ। তারা অতি সাবধানে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে পথ চলছিল দৃষ্টিহীনের মতো। তাদের নাম হচ্ছে, হেমন্ত ও রবীন—পাঠক-পাঠিকাদের কাছে নিশ্চয়ই নতুন করে তাদের পরিচয় আর দিতে হবে না।

এই পূর্ণ ব্ল্যাক-আউট-এর সময়ে চোর-ডাকাত ছাড়া কলকাতার কোনও ভদ্র বাসিন্দাই পথে পা বাড়াতে সাহস করে না। কিন্তু শখের ডিটেকটিভ হেমন্ত ও তার সহকর্মী বন্ধু রবীন কলকাতার ছেলে হলেও, বহুকাল পরে বিদেশ থেকে সম্প্রতি শহরে ফিরে এসেছে, কাজেই এখনকার কলকাতার হালচাল তাদের ভাল করে জানা ছিল না।

তারা একটি বিচিত্র কেস হাতে নিয়ে অপরাধীর সন্ধানে গিয়েছিল পূর্ব আফ্রিকায় ৷ মামলার কিনারা করবার পরই বাধল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ।

এবারকার মহাযুদ্ধ যে কতখানি গুরুতর হয়ে উঠবে, সেটা কেউই তখন অনুমান করে উঠতে পারেনি। কাজেই রবীন যখন প্রস্তাব করলে যে, “আফ্রিকার এত দূরে যখন এসেছি, তখন গোটাকয়েক সিংহ, হিপো, গণ্ডার আর গরিলার সঙ্গে আলাপ না জমিয়ে কলকাতায় ফেরা হতে পারে না”, তখন হেমন্ত সহজেই রাজি হয়ে গেল।

কিছুকাল তারা ঘুরে বেড়ালে আফ্রিকার বনে বনে। তাদের হাতের বন্দুক যে কত হিংস জীবকে জীবন-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলে এবং তাদের বিস্মিত চক্ষু যে কত অদ্ভুত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও নানাজাতের অসভ্য মানুষ দর্শন করলে, চিত্তাকর্ষক হলেও তার বিবরণ দেবার জায়গা নেই।

তারপর তারা সভ্য জগতে ফিরে এসে দেখলে, বর্তমান যুদ্ধ হয়ে উঠেছে পৃথিবীব্যাপী সর্বজাতির যুদ্ধ। এমনকি, তাদের প্রিয় স্বদেশের উপরেও পড়েছে যুদ্ধদেবতার ক্রুদ্ধদৃষ্টি। তখন তারা তাড়াতাড়ি দেশের দিকে যাত্রা করলে।

কাল তারা কলকাতায় এসেছে। আজ গিয়েছিল এক বন্ধুর বাড়িতে। বন্ধুর মুখে তারা শুনলে দেশের খবর এবং তাদের মুখে বন্ধু শুনলেন আফ্রিকার শিকার কাহিনী। দুই পক্ষই পরস্পরের কথা শুনতে ব্যস্ত, ইতিমধ্যে ঘড়ির কাঁটা কখন যে বারটার ঘর পেরিয়ে গেল সেটা কারুর খেয়ালেই এল না।

হঠাৎ বন্ধু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “কি বিপদ, রাত বারটা বেজে গেছে যে। হেমন্ত, রবীন, আজ আর তোমাদের বাড়ি যাওয়া চলবে না,—পথ একেবারে অন্ধকার।” হেমন্ত বললে, “এতকাল পরে দেশে ফিরে এসে নিজের বাড়িকে ভারি মিষ্টি লাগছে। হোক পথ অন্ধকার, বাড়িতে আমি যাবই।”

রবীন বললে, “আমরা কলকাতার ছেলে, সারা শহর আমাদের নখদর্পণে। দুই চোখ মুদেও আমরা বাড়িতে গিয়ে হাজির হতে পারব।”

বন্ধুর মানা তারা মানলে না, তখনই রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু দু'চার পা হেঁটেই রাস্তার অবস্থা দেখে তারা রীতিমতো দমে গেল। এতটা কল্পনা করা অসম্ভব। এ হচ্ছে, অচেনা কলকাতা,–রবীনের ‘নখদর্পণে' এর কিছুই দেখা যায় না।

মিনিট চার চলতে না চলতেই তারা বার কয়েক হোঁচট খেলে। পঞ্চম মিনিটে রবীন সটান লম্বমান হল ফুটপাতের উপর নিদ্রিত প্রকাণ্ড একটা কালো ষাঁড়ের পিঠের উপরে। ষাঁড়টা এ কি হল' ভেবে চমকে ধড়মড় করে দাঁড়িয়ে উঠল এবং রবীন বুঝি গুতো খেলুম' ভেবে তার পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ল একগাদা গোবরে মুখ গুঁজড়ে! ইতিমধ্যে হেমন্ত একটা কুকুরের ল্যাজ মাড়িয়ে দিয়ে, কামড় খাবার ভয়ে মেরেছে মস্ত এক লাফ এবং পরমুহূর্তেই অদৃশ্য কলা বা আমের খোসায় পা হড়কে করেছে কঠিন ভূতলে শয়ন!

রবীন মুখ থেকে গোবরের দুর্গন্ধ প্রলেপ চাঁচতে চাঁচতে ম্রিয়মাণ স্বরে বললে, “ভাই হেমন্ত, বাড়িতে যাচ্ছি বটে, কিন্তু বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে পারব কি?”

হেমন্ত গায়ের ধুলো-কাদা ঝাড়তে ঝাড়তে বললে, “ভাই রবীন, আমারও সেই সন্দেহ হচ্ছে! কে জানত কলকাতার অন্ধকার এমন ভয়াবহ হতে পারে ! ”

তারপর তারা সন্তর্পণে বাড়ির দেওয়াল ধরে ধরে এগুতে লাগল ধীরে ধীরে।

খানিক পরে হেমন্ত বললে, “আন্দাজে বোধ হচ্ছে, পাশের গলিটাই কানাইবাবুর লেন।” রবীন বললে, “ওটা বলাইবাবুর স্ট্রিট হলেও আশ্চর্য হব না। আমার চোখ ভরে ঝরছে খালি আলকাতরার বৃষ্টি !”

— “এটা যদি কানাইবাবুর লেন হয়, তাহলে এখান থেকে আমাদের বাড়ি আছে এক মাইল দূরে!”

— এক মাইল? এই অন্ধকারে এক মাইল মানে, বিশ মাইলের ধাক্কা! বাপ, এ অন্ধকার যেন জীবন্ত বিভীষিকার মতো!”

হঠাৎ কাছ থেকে হুমকি জাগল—“এই! কোন হায় রে!” সুমিষ্ট সম্ভাষণ শুনেই বোঝা গেল, কোনও সজাগ লালপাগড়ির টনক নড়েছে!

হেমন্ত বললে, “আমরা ভদ্রলোকের ছেলে বাবা, অন্ধকারে হয়ে পড়েছি অন্ধ নাচারের মতো !”

পাহারাওয়ালা বললে, “ঝুট বাত! তোম লোক কো থানামে যানে হোগা!” হেমন্ত বললে, “বেশ, তাই চলো বাবা! এ অন্ধকারের চেয়ে, থানা ঢের ভাল! হে লালপাগড়ি, আমাদের পথ দেখাও।”

পাহারাওয়ালা কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই খানিক তফাৎ থেকে জাগল সে কী বিকট ও ভয়ঙ্কর কোলাহল! রাত্রির তিমিরাবগুণ্ঠন ভেদ করে ভেসে আসতে লাগল বহু কণ্ঠের আর্তনাদের পর আর্তনাদ, দুড়ুম দড়াম দড়াম শব্দ এবং বর্ণনাতীত ও অমানুষিক গর্জনের পর গর্জন—যা শুনলে সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে এবং হৃদয় হয়ে যায় স্তম্ভিত!

দ্রুত পদধ্বনি শুনে হেমন্ত ও রবীন বুঝলে, পাহারাওয়ালা বেগে ছুটল—যেদিক থেকে কোলাহল ভেসে আসছে সেইদিকে।

রবীন অভিভূত কণ্ঠে বললে, “হেমন্ত, ভাই! ও কী গর্জন! ও যে কলকাতার মুখে আফ্রিকার হুহুঙ্কার!”

হেমন্ত বিস্ময়রুদ্ধ স্বরে বললে, “হ্যাঁ রবীন, হ্যাঁ! ও যে সিংহের গর্জন!” রবীন বললে, “কিন্তু দারুণ ভয়ে চেঁচিয়ে কাঁদে কারা? অমন দুড়ুম দড়াম শব্দ কিসের?

আর এখানে সিংহের আবির্ভাবই বা হবে কেমন করে?”

আর্ত চিৎকার ও দুড়ুম দড়াম শব্দ কমে এল, কিন্তু সিংহনাদ তখনও থামল না।কলকাতার রাজপথে দাঁড়িয়ে হেমন্ত ও রবীনের মনে হল, তারা দাঁড়িয়ে আছে আফ্রিকার ভীষণ জঙ্গলে—যেখানে নিশীথ রাতের স্তব্ধ বুক ও গহন বনের বিজন মাটি কাঁপিয়ে জাগে রক্তলোলুপ পশুরাজ সিংহের কণ্ঠে মুহুর্মুহু মেঘধ্বনির মতো গুরুগম্ভীর গর্জন! আরও মিনিটখানেক পরে থেমে গেল সিংহনাদ।

রবীন বললে, “এ পাড়ার কোনও ধনী হয়তো শখ করে সিংহ পুষেছে, আর সেই সিংহটা—

হঠাৎ আবার বিকট আর্তনাদ ও সিংহনাদ শুনে সে সচমকে মুখ বন্ধ করলে! হেমন্ত উত্তেজিত স্বরে বললে, “রবীন, রবীন, এবারে চিৎকার যে খুব কাছেই এগিয়ে এসেছে!”

রবীন সভয়ে বলে উঠল, “সিংহটা নিশ্চয় খাঁচা ভেঙে পথে বেরিয়ে পড়েছে—”

“খালি তাই নয়, সে এদিকেই ছুটে আসছে, রবীন, আমি তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি! শিগগির পালিয়ে এসো—শিগগির!

কিন্তু তারা পালাবারও সময় পেলে না, অন্ধকারের ভিতর থেকে ঝড়ের বেগে হুড়মুড় করে তাদের উপরে এসে পড়ল বিরাট একটা তুষারশীতল দেহ—হেমন্ত ও রবীন প্রচণ্ড, ধাক্কা খেয়ে দুইদিকে ছিটকে পড়ে ভূতলশায়ী হল এবং পরমুহূর্তেই কানফাটানো সিংহনাদেই ফুটল খল খল খল অট্টহাস্য আর সঙ্গে সঙ্গে বন্য দুর্গন্ধে চারিদিক হয়ে উঠল পরিপূর্ণ! তারপরেই কার ভারি ভারি দ্রুত পদ মাটি কাঁপাতে কাঁপাতে দূরে চলে গেল!

রবীন উঠে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, “সিংহের কণ্ঠে মানুষের অট্টহাস্য। একি অসম্ভব ব্যাপার!”

হেমন্তও তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। বললে, “রবীন, যে জীবটা এখান দিয়ে ছুটে চলে গেল সে সিংহ নয়! অন্ধকারের ভিতরে মাটি থেকে প্রায় পনের ষোল ফুট উঁচুতে আমি তার জ্বলন্ত চক্ষু দু'টো স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি! জীবটা অন্তত হাতির সমান উঁচু!”

রবীন অবিশ্বাস ভরা কণ্ঠে বললে, “তুমি কী বলছ হেমন্ত? সিংহের মতন গর্জন করতে আর মানুষের মতন হাসতে পারে, অথচ হাতির মতন উঁচু—–এমন কোনও জীবই পৃথিবীতে কখনও ছিল না, এখনও নেই।”

হেমন্ত বললে, “সে কথা আমিও জানি রবীন। কিন্তু নিজের চোখ-কানকে তো অবিশ্বাস করতে পারি না,। আশ্চর্য কাণ্ড, আজকের অন্ধকার কি অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে চায় ?”

— না হেমন্ত, আজকের অন্ধকারে আমাদেরই মাথা বোধহয় খারাপ হয়ে গেছে। যে দেহটার ধাক্কায় আমরা গড়াগড়ি খেলুম, তার ভয়াল স্পর্শটা অনুভব করতে পেরেছ কি? জ্যান্ত দেহ মড়ার চেয়ে ঠাণ্ডা! এ কি অসম্ভব ব্যাপার! তাড়াতাড়ি এখান থেকে সরে পড়ি এসো!” তারা আর অন্ধকার মানলে না, জোরে পা চালিয়ে দিলে। কিন্তু বেশিদূর অগ্রসর হতে হল না—হঠাৎ পথের ধারে বাধা পেয়ে হেমন্ত আবার হল প্রপাতধরণীতলে!

রবীন বললে, “কি মুশকিল, আছাড় খেয়ে খেয়ে আজ যে আমাদের গতর চূর্ণ হয়ে যাবে দেখছি।”

হেমন্ত গম্ভীর স্বরে বললে, “রবীন, এখানে পথের উপরে পড়ে আছে একটা মৃতদেহ।” বলেই সে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বাললে।

দেশলাইয়ের কাঠির পর কাঠি জ্বেলে দেখা গেল, এক বীভৎস দৃশ্য! রক্তধারার মাঝখানে পাহারাওয়ালার পোশাক পরা একটা মুণ্ডহীন নরদেহ পথের উপরে দু'দিকে দু'হাত ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে এবং তার ছিন্নমুণ্ডটাও ছিটকে পড়ে আছে দেহ থেকে আট-দশ হাত তফাতে !

রবীন শিউরে উঠে বললে, “নিশ্চয়ই এই হতভাগ্য একটু আগে আমাদের সঙ্গে কথা কয়েছিল!”

হেমন্ত বললে, “এর কাঁধের আর দেহের দিকে তাকিয়ে দেখো! কোনও অস্ত্র দিয়ে এর মুণ্ডটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি—এর কাঁধের আর দেহের উপর রয়েছে বড় বড় দাঁত আর নখের চিহ্ন।”

এমন সময় পেছনে বেজে উঠল ঘনঘন মোটরের ভেঁপু !

তারা দু'জনেই চমকে ফিরে দেখলে, পথের অন্ধকারকে তীব্র ‘হেডলাইট’-এর উজ্জ্বল আলোতে ভাসিয়ে দিয়ে একখানা মোটর গাড়ি বেগে তাদের দিকে ছুটে আসছে!

টেলিফোনে সিংহনাদ

মোটরখানা হুড়মুড় করে একেবারে কাছে এসে পড়ল — তাদের চাপা দেয় আর কি!

হেডলাইট-এর তীব্রতায় হেমন্ত ও রবীনের চোখ তখন অন্ধ হয়ে গেছে। কোনওরকমে নিজেদের সামলে নিয়ে তারা পথের পাশের দিকে লাফিয়ে পড়ল! সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়িখানাও ৷

গাড়ির ভেতর থেকে হুমকি জাগল—“কে তোমরা? এত রাতে, এই অন্ধকারে এখানে কি করছ?”

হেমন্ত গাড়ির কাছে এসে মুখ বাড়িয়ে বললে, “কে কথা কয়? আওয়াজটা যেন চিনি চিনি মনে হচ্ছে!”

—“আরে, আরে, একি! হেমন্তবাবু যে! আপনি না পগার পার হয়ে আফ্রিকায় লম্বা দিয়েছিলেন?”

হেমন্ত হেসে বললে, “পগার নয় ভূপতিবাবু, আমরা সমুদ্র পার হয়েছিলুম।”

—“এই উড়োজাহাজ, ডুবোজাহাজ আর কলের জাহাজের যুগে সমুদ্র হয়ে পড়েছে পগারেরই মতন ছোট্ট। পার হতে কতক্ষণই বা লাগে।...কিন্তু সে কথা যাক! কবে এলেন? এখানে কি করছেন?”

— আজই এসেছি। বন্ধুর বাড়ি থেকে নিজের বাড়ি ফিরছিলুম। কিন্তু পথের মাঝে হঠাৎ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছি।”

—“স্তম্ভিত হয়েছেন ! কেন ?”

—“এখানে শুনেছি, মানুষের কণ্ঠে আর্তনাদ আর মানুষের কণ্ঠে সিংহনাদ।”

—“মানে?” ভূপতিবাবু তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন! যাঁরা “রাত্রির যাত্রী” পড়েছেন, তাঁদের কাছে ইনস্পেক্টার ভূপতিবাবুর নূতন পরিচয় অনাবশ্যক।

হেমন্ত বললে, “সঙ্গে টর্চ আছে তো? ওই দিকে আলো ফেলে দেখুন। মানেটা বুঝতে দেরি হবে না”।

ভূপতিবাবুর হাতের টর্চ অন্ধকারকে ছ্যাঁদা করে টেনে দিলে অগ্নিশিখার দীর্ঘ রেখা। সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল পাহারাওয়ালার মুণ্ডহীন দেহ এবং দেহহীন মুণ্ড!

ভূপতিবাবু হতভম্ব। মোটর থেকে পুলিসের অন্যান্য লোকেরাও টপাটপ নেমে পড়ল। হেমন্ত বললে, “ভূপতিবাবু, এত সহজে হতভম্ব হবেন না। লাশের কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখুন!”

মোটর ফিরিয়ে হেডলাইট-এর শিখা ফেলা হল মৃতদেহের উপর।

ভূপতিবাবু দেহটা খানিকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করলেন। তাঁর হতভম্ব ভাবটা আরও বেড়ে উঠল। তিনি অতিশয় হতাশভাবে মাথা নাড়তে লাগলেন।

হেমন্ত বললে, “লাশের ওপরে থাবা আর নখের চিহ্ন দেখছেন?”

—“দেখছি তো।”

—“পাহারাওয়ালা মারা পড়েছে কোনও হিংস্র জন্তুর আক্রমণে।”

— কলকাতা শহরে হিংস্র জন্তু!”

— অসম্ভব কথা বটে। কিন্তু আপাতত তা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।” – “কিন্তু, কি জন্তু?”

— জানি না। যদিও আমি সিংহনাদ শুনেছি।”

—“সিংহ? বলেন কি মশাই?”

—“হ্যাঁ, আমি সিংহনাদ শুনেছি বটে—কিন্তু মানুষের কণ্ঠে।”

— এ কি হেঁয়ালি, বাবা ! ”

— একটা জীব অন্ধকারে আমাদের পাশ দিয়ে মাটি কাঁপিয়ে ছুটে চলে গেল। সেটা হাতির মতন উঁচু।”

ভূপতিবাবু হেসে ফেললেন। বললেন, “আজব কথা নম্বর এক হচ্ছে, কলকাতা শহরে সিংহ। নম্বর দুই হচ্ছে, সিংহ চিৎকার আর হাস্য করে—মানুষের কণ্ঠস্বরে। নম্বর তিন হচ্ছে, সিংহটা হাতির সমান উঁচু। হেমন্তবাবু, এই কি রূপকথা বলবার সময়?”

হেমন্ত জবাব দিলে না, পথের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। হেডলাইট-এর মহিমায় পথের খানিকটা দিনের বেলার চেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

ভূপতিবাবু ব্যঙ্গের স্বরে বললেন, “কি ব্যাপার, হেমন্তবাবু? এইবারে পথের ধুলোর ভিতর থেকে আপনি কি সিংহটাকে পুনরাবিষ্কার করতে চান?”

—“না ভূপতিবাবু, পথের ধূলোয় আমি আবিষ্কার করেছি এক আশ্চর্য মানুষের পদচিহ্ন! আপনার ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়—আজব কথা নম্বর চার।” – “কই, দেখি!”

—“এই দেখুন—পরে পরে কতকগুলো পায়ের দাগ! প্রত্যেক পদচিহ্ন লম্বায় প্রায় আঠার- ঊনিশ ইঞ্চি!”

ভূপতিবাবুর চোখ দু'টো যেন ঠিকরে পড়বার মতো হল।

সাব-ইনস্পেক্টর পতিতপাবন এসেছিল ভূপতিবাবুর সঙ্গে। সে বললে, “স্যর, আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমরা এদিকে এসেছি জরুরি ফোন পেয়ে!”

ভূপতিবাবু চমকে উঠে বললেন, “ঠিক বলেছ। কিন্তু কি করব ভাই, পথের মাঝে যা দেখছি আর যা শুনছি, তাতে যে দুনিয়াকেই ভুলে যেতে হয়। এখন কোন দিক সামলাই বলো দেখি?”

পতিত বললে, “আপনি আর একটা মস্ত কথাও ভুলে যাচ্ছেন। টেলিফোনেও আপনি সিংহের গর্জন শুনেছেন !

ভূপতিবাবু লম্ফত্যাগ করে বললেন, “ঠিক বলেছ ভাই, ঠিক বলেছ! এখানেও সিংহনাদ, টেলিফোনেও সিংহনাদ! আমি এখন কি করব? কোন সিংহনাদের পিছনে ধাবিত হব?” পতিত বললে, “স্যর, আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে।”

—“হচ্ছে নাকি? মানে ?”

—“হ্যাঁ স্যর, হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, থানার টেলিফোনে আর এই রাস্তায় গর্জন করেছে একই সিংহ!”

—“ঠিক বলেছ ভাই, ঠিক বলেছ ভাই, ঠিক বলেছ! পতিত, তোমাকে ধন্যবাদ!” হেমন্ত বললে, “টেলিফোনে সিংহনাদ ব্যাপারটা বুঝলুম না!”

—“আরে মশাই, আমিও একটু-আধটু যা বুঝেছিলুম, আপনার কথা শুনে তাও গুলিয়ে গিয়েছে! ব্যাপার কি জানেন? দিব্যি শুয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছিলুম, হঠাৎ ফোনে এল ডাক।রিসিভারটা তুলে নিয়েই শুনলুম, কে একজন লোক বিষম ভয় পেয়ে বলছে—'আপনারা শীঘ্র আসুন—আমার বাড়িতে ডাকাত পড়েছে—আমি দশ নম্বর কানাইবাবুর লেনে থাকি ...', তারপর হঠাৎ তার স্বর থেমে গেল, আমার কানে এল দুমদাম আওয়াজ আর একটা সিংহের ভীষণ গর্জন আর মানুষের আর্তনাদ। তারপর সব চুপ !”

হেমন্ত বললে, “আপনি কি দলবল নিয়ে সেইখানেই যাচ্ছেন?”

—“আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু যেতে যেতে পথে এই কাণ্ড !

— ভূপতিবাবু, ঘটনাস্থল বোধহয় খুব কাছেই। মানুষের আর্তনাদ, সিংহের গর্জন, দুড়ম দড়াম শব্দ আমরাও শুনেছি—আর বেশিদূর থেকেও নয়।”

—“এইটেই তো কানাইবাবুর লেন। খানিক তফাতে এতক্ষণ পরে কতকগুলো আলো দেখা যাচ্ছে না?”

পতিত বললে, “হ্যাঁ স্যর, অনেক লোক ব্যস্তভাবে ছুটোছুটি করছে! বোধহয় এতক্ষণ ওরা ভয়ে চুপটি মেরে লুকিয়েছিল!”

—“ঠিক বলেছ পতিত, ঠিক বলেছ! কিন্তু ভয়ের আর অপরাধ কি বল? কলকাতায় সিংহের তর্জন-গর্জন শুনলে হিটলার-মুসোলিনিও ভয়ে ভড়কে যেতেন! তার ওপরে হেমন্তবাবুর কথায় আমার পিলে চমকে গেছে। হাতি নয়, অথচ হাতির মতো উঁচু জানোয়ার—যা নয়, তাই। সেটাও না হয় গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিলুম, কিন্তু, এগুলো কি বাবা? আঠার-ঊনিশ ইঞ্চি লম্বা মানুষের পায়ের দাগ! স্বচক্ষে দেখছি, এগুলো তো উড়িয়ে দিলেও উড়ে যাবে না? আচ্ছা, এসব নিয়ে পরে মাথা ঘামালেও চলবে—এখন আগে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হওয়া যাক। আসুন হেমন্তবাবু, আপনিও আসুন।”

উন্মত্ত প্রেতাত্মার অট্টহাসি

কানাইবাবুর লেনের দশ নম্বর। মস্ত বড় বাড়ি— প্রাসাদ বললেও চলে। চারিদিকে রেলিং ঘেরা প্রকাণ্ড বাগান। বড় বড় ফুল-ফলের গাছ সবুজ ফুলওয়ারী জমির উপরে ছায়ার আদর ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে! এখানে ওখানে সাজানো মর্মর মূর্তি। মাঝখানে একটি মার্বেল পাথরের ফোয়ারা—উপরে ভূঙ্গার হাতে করে একটি নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে সকৌতুকে জল ঢালছে নিচের দিকে। বাড়ির পিছনদিকে একটি মাঝারি পুকুর।

কানাইবাবুর লেনের মতন একটা গলির ভিতরে এ রকম অট্টালিকা—দৃষ্টিকে সচকিত করে তোলে অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ের মতো। বাড়ির মালিক যে লক্ষপতি, সেটা বুঝতেও বিলম্ব হয় না। বাড়ির সামনে রাস্তার উপরে কোলাহল সৃষ্টি করেছে বিপুল এক জনতা। অনেকের হাতে লণ্ঠন—তারা এতটা উত্তেজিত হয়েছে যে ব্ল্যাক-আউট-এর আইন ভঙ্গ করতেও ভীত নয়। পুলিস দেখে লোকেরা পথ ছেড়ে দিলে।

পুলিসের সঙ্গে হেমন্ত ও রবীন বাড়ির সামনে এসে দেখলে, ফটকের লোহার দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। দরজার লোহার রেলিঙের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, বাগানের মাটির উপরে একটা মানুষের মূর্তি অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে আছে। টর্চ-এর আলো ফেলে বোঝা গেল, লোকটা মৃত—তার সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত, মাটির উপরেও রক্তের ধারা। ভিড়ের ভিতর থেকে একজন মাতব্বর গোছের লোক বেছে নিয়ে ভূপতিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার নাম কি?”

—“শ্রী সুদর্শন বিশ্বাস।”

—“বাড়ি?”

– “সামনেই।”

—“আপনি কিছু দেখেছেন ?”

—“দেখবার বিশেষ কিছু ছিল না। তবে শুনেছি যথেষ্ট।”

– “মানে?”

—“এই ব্ল্যাক-আউট-এর দিনে মানুষের চোখ তো অন্ধেরই সামিল। তবে গোলমাল যা শুনেছি তা আর বলবার নয়।”

—“আচ্ছা সুদর্শনবাবু, গোড়া থেকে সব গুছিয়ে বলুন দেখি!”

—“এই বাড়িখানা হচ্ছে, অবনীকান্ত রায়চৌধুরীর। অবনীবাবু পূর্ববঙ্গের জমিদার, অনেক টাকার মালিক, এ পাড়ার মাথা বললেও চলে। তিনি খুব ধার্মিক, দিনরাত পুজো আর আহ্নিক নিয়ে থাকেন, প্রায়ই তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে মাঝে মাঝে প্রবাসেই মাসকয়েক কাটিয়ে আসেন। শুনেছি, বিন্ধ্যাচলের এক মহাতান্ত্রিক সন্ন্যাসী তাঁর গুরু। মাঝে মাঝে তাঁর গুরুভাইরাও এখানে এসে অতিথি হন, তাঁরাও সবাই সন্ন্যাসী। এই কালকেই তাঁর একদল সন্ন্যাসী-গুরুভাই এখানে এসেছিলেন।”

হেমন্ত বললে, “সন্ন্যাসীরা কি বাংলাদেশের লোক?”

—“হিন্দস্তানি।”

—“তারা এখন নেই?”

— না। কাল এসে, কালকেই চলে গেছে। এত তাড়াতাড়ি তারা আর কোনওবারে যায় না। দশ-পনেরদিন এইখানেই কাটিয়ে যায়।”

—“এবারে এত তাড়াতাড়ি গেল কেন, বলতে পারেন?”

—“না। তবে কাল দুপুরে বাড়ির ভেতর থেকে রাগারাগি আর বচসার সাড়া পেয়েছিলুম। বোধহয় অবনীবাবুর সঙ্গে সন্ন্যাসীদের ঝগড়া হয়েছিল। ঝগড়ার কারণ জানি না।” — অবনীবাবুর বাড়ির ফটক ভিতর থেকে বন্ধ। কোনও লোকজনেরও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ কি?”

—“কেমন করে বলব? বোমার ভয়ে অবনীবাবু পরিবারবর্গকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন বটে, কিন্তু তিনি একলা নেই, বাড়িতে দাসদাসী দারোয়ান আছে অনেক। দেখতেই পাচ্ছেন, একজন দারোয়ান ওখানে মরে পড়ে আছে। কিন্তু বাকি লোকজনরা কোথায় গেল জানি না।”

ভূপতিবাবু বললেন, “বাড়ির ভিতরে ঢুকলেই সেটা বোঝা যাবে। তারপর আপনার কথা বলুন।”

—“রোজ রাতে ঘুমোবার আগে আমি খানিক পড়াশোনা করি। আজ রাত বারটা বাজবার পর আমি বই মুড়ে আলো নেবাবার উপক্রম করছি, হঠাৎ ভীষণ চিৎকার শুনে চমকে বারান্দায় ছুটে এলুম।”

—“ভীষণ চিৎকার?”

— “আজ্ঞে হ্যাঁ, কে যেন ‘বাপ রে, মা রে, মেরে ফেললে রে' বলে চেঁচিয়ে উঠল। বারান্দায় এসে অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলুম না, কিন্তু অবনীবাবুর বাড়ির ভিতরে তখন কি যে হুলুস্থুল বেধেছিল, তা ভগবানই জানেন! একসঙ্গে অনেক লোকের আর্তনাদ, দুড়ুম দড়াম করে যেন দরজা-জানলা ভাঙার শব্দ, ছুটোছুটি হুটোপুটি, হুঙ্কারের পর হুঙ্কার।

হেমন্ত বাধা দিয়েবললে, “কি রকম হুঙ্কার?”

—“সেটা হুঙ্কার না বলে অন্য কিছু বললে আপনারা হয়তো আমাকে পাগল মনে করবেন।”

— অসঙ্কোচে বলুন, আমরা কিছু মনে করব না।”

—“আমার মনে হল, বাড়ির ভিতরে যেন একটা ক্রুদ্ধ সিংহ ক্রমাগত গর্জন করছে! যদিও আমি বেশ জানি, এখানে সিংহের আবির্ভাব অসম্ভব।”

— অবনীবাবু শখ করে সিংহ পোষেননি?”

—“পাগল! অবনীবাবুকে যে চেনে, সে জানে যে, তাঁর ও রকম অদ্ভুত শখ হতেই পারে না !”

—“তারপর?”

— কিন্তু সিংহগর্জনের চেয়েও ভয়ানক আর একটা শব্দ আমি শুনেছি।” – “কি?”

—“খলখল করে অট্টহাসি! সিংহের গর্জন যতবার থেমেছে, সেই প্রচণ্ড অট্টহাসি জেগে উঠেছে ততবার! সে এমন বিশ্রী হাসি যে, ভাবতেও আমার বুক এখনও শিউরে উঠছে! আপনারা হাসবেন না, কিন্তু আমার মনে হল, একটা প্রেতাত্মা যেন হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে গিয়ে অট্টহাস্য করছে!”

অন্য কেউ হাসলে না, কিন্তু ভূপতিবাবু হো হো করে হেসে উঠে বললেন, “উন্মত্ত প্রেতাত্মার অট্টহাস্য! সুদর্শনবাবু, আপনার কল্পনাশক্তি আছে!”

সুদর্শন আহত কণ্ঠে বললেন, “ঘটনার সময়ে এখানে হাজির থাকলে আপনি কেমন করে হাসতেন, দেখতুম! আমি যা শুনেছি আর দেখেছি, কোনও কল্পনাশক্তিই তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না!”

—“তাহলে শুধু শোনা নয়, আপনি কিছু দেখেছেনও ?”

—“এই অন্ধকারে ছায়া ছায়া যা দেখেছি তা না দেখারই সামিল।”

—“তবু কি দেখেছেন বলুন!”

— “আমি বলব না।”

– “মানে?”

—“আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমি ভুল দেখেছি। সুতরাং সে কথা বলে আপনার হাসিকে আর উৎসাহিত করতে চাই না।”

—“মশাই, পুলিসের কাছে কিছু লুকোবেন না। ভুল হোক, ঠিক হোক, বলুন।”

—“দেখছেন, ফটকের পাশে এই আধঘোমটা দেওয়া মিটমিটে গ্যাসের আলোতে এখানটায় অল্পস্বল্প নজর চলে? যদিও এরকম মর মর আলো গাঢ় অন্ধকারের চেয়েও খারাপ। কারণ, এমন আলোতেই রজ্জুতে সর্পভ্রম হয়। তার উপরে সেইসব তীব্র আর্তনাদ, বিকট হুঙ্কার আর অমানুষিক অট্টহাসি শুনে আমার অবস্থা হয়েছে তখন আচ্ছন্নের মতো। ধরতে গেলে তখন আমার ভাল করে দেখবার শক্তিই ছিল না। আমি যা দেখেছি বলে মনে করছি তা হচ্ছে একেবারেই অলৌকিক। অলৌকিক কথা বলে খোকাদের মন ভোলানো যায়, কিন্তু পুলিসের কাছে তার কোনও দামই নেই!”

—“তবু বলুন, আর আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।”

—“অবনীবাবুর বাড়ির সেই বিষম গোলমাল থামবার পরেই শুনলুম, ধুপধুপ করে মাটি- কাঁপানো পায়ের শব্দ—যেন একটা মত্ত মাতঙ্গ ধেয়ে আসছে। এত দূরে বারান্দার উপর থেকেও আমি সেই আশ্চর্য পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলুম! তারপরেই ফটকের কাছে এই না- আলো না-অন্ধকারে আবির্ভূত হল এক বিভীষণ ছায়ামূর্তি।”

— “ ছায়ামূর্তি?”

—“ঠিক ছায়ামুর্তি নয়, তবে আবছা আলোয় তাকে দেখাচ্ছিল বিরাট একটা ছায়ার মতো !”

—“বিরাট মানে?”

— “বিরাট মানে মহাপ্রকাণ্ড। মূর্তিটা আমার চোখের সামনে জেগে ছিল এক কি দুই মুহূর্ত মাত্র। কিন্তু তার মধ্যেই আমি দেখেছিলুম, মূর্তির মাথাটা ফটক ছাড়িয়ে উপরে উঠেছে। এই ফটকটা দেখুন। এটা চোদ্দ ফুটের চেয়ে কম উঁচু নয়। তাহলেই বুঝুন, মূর্তিটা বিরাট কিনা?” হেমন্ত জিজ্ঞাসা করলে, “সেটা কিসের মূর্তি?”

—“তা বলতে পারব না, স্পষ্ট করে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মনে তো হল, সে একটা অতিকায় মানুষের দেহ, আর মানুষের মতোই সে সিধে হয়ে হাঁটছিল। কিন্তু তার দেহের উপর দিকটায় যেন কি একটা অবর্ণনীয়, অমানুষিক বিভীষিকার ভাব ছিল, আলোর অভাবে যা দেখতে পাইনি, কেবল অনুভব করতে পেরেছি।”

— “তারপর? তারপর?”

—“মূর্তিটা ঝড়ের মতো ছুটে এল, তারপর খুব সহজেই এই উঁচু ফটকটা এক লাফে পার হল—সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার তাকে যেন গ্রাস করে ফেললে—পথের উপরে শুনলুম কেবল ধুপধুপ শব্দ আর সিংহের গর্জন! ভয়ে অজ্ঞানের মতো হয়ে আমি কাঁপতে কাঁপতে বারান্দার উপর বসে পড়লুম!”

ভূপতিবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ধ্যেৎ! যত সব বাজে কথা! ফটকের চেয়ে উঁচু মানুষ - দানব, আবার সিংহের গর্জন!”

হেমন্ত বললে, “সিংহের গর্জন আপনিও শুনেছেন, আমরাও শুনেছি। আর পথের উপরে সেই প্রকাণ্ড পদচিহ্ন কি আমরাও দেখিনি?”

ভূপতিবাবুর মুখ ম্লান হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি তিনি বললেন, “চলুন চলুন, আর দেরি নয় ! এইবারে বাড়ির ভিতরে ঢোকা যাক।”

ভূপতিবাবুর হৃৎকম্প

হেমন্ত শুধোলে, “ভূপতিবাবু, আপনি ফোনে শুনেছিলেন, দশ নম্বর বাড়িতে ডাকাত পড়েছে! কিন্তু এখানে ডাকাত-টাকাতের কথা কেউ তো বললে না!”

ভূপতিবাবু বললেন, “ঠিক কথা! ও সুদর্শনবাবু! বলি, মস্ত বড় নরদানবের কথা চেপে যান, আদালতে ওকথা তুললে হাকিম আপনাকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেবে। আসল ব্যাপারটা ভাঙুন দেখি! এখানে ক'জন ডাকাত হানা দিয়েছিল?”

সুদর্শন বললে, “ডাকাত! কোনও ডাকাতের সাড়া বা দেখা আমি পাইনি।”

—“লুকোবেন না দাদা, খুলেই বলুন না!”

—“না মশাই, ডাকাতের কথা আমি জানি না।”

—“এখানে আর কেউ ডাকাতদের দেখেছে?”

ভিড়ের কেউ বললে না—হ্যাঁ ৷

— তবে চলুন বাড়ির ভেতরে।”

একজন কনস্টেবল লোহার রেলিং টপকে বাগানের ভিতরে গেল। ফটকের ভিতর থেকে তালা লাগানো ছিল। তালা ভেঙে ফটক খোলা হল।

প্রথমেই বাগানের মধ্যে দারোয়ানের যে মৃতদেহটা পড়েছিল সকলে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।মৃতদেহের অবস্থা দেখলে শিউরে ওঠে সর্বাঙ্গ। মাথার বেশির ভাগ উড়ে গিয়েছে, ঘাড়টা ভেঙে একদিকে লটকে পড়েছে—দেহের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে মাংস, খুলি ও মস্তিষ্কের রক্তাক্ত টুকরো।

হেমন্ত বললে, “দেখছেন, এখানেও অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি? একে একবার মাত্র প্রচণ্ড, তীক্ষ্ণ আঘাত করা হয়েছে!”

ভূপতি বললেন, “কিন্তু কিসের আঘাত?”

— আমার বিশ্বাস, বড় বড় নখওয়ালা থাবার।”

— থাবার! গাঁজার ধোঁয়া আপনারও মাথায় ঢুকেছে? আপনিও ভাবছেন এখানে সিংহ- টিংহ কিছু এসেছিল?”

— “সিংহনাদ শুনেছি বটে, কিন্তু সিংহ আমি দেখিনি। এ লোকটা যে সিংহেরই থাবায় মরেছে, এমন কথাও আমি জোর করে বলছি না। তবে এর মৃত্যুর কারণ যে কোনও বিষম বলবান জন্তুর নখযুক্ত থাবা, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই।”

ভূপতি জবাব না দিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চললেন। বাড়ি একেবারে স্তব্ধ—কোথাও একটি মাত্র আলোও জ্বলছে না। আলো জ্বালবার জন্যে পাহারাওয়ালাদের নিয়ে পতিত বাড়ির ভিতরে গিয়ে ঢুকল।

এত রাত্রে ঘুম ভাঙানোর জন্যে ভূপতি অদৃশ্য ডাকাতদের উদ্দেশ্যে বাছা বাছা গালাগালি বৃষ্টি করতে লাগলেন।

রবীন বললে, “ভাই হেমন্ত, আজকের সব ব্যাপারটাই কেমন অদ্ভুত বলে মনে হচ্ছে না ?”

—“কেবল অদ্ভুত নয়, অপার্থিব। বাড়ির কেউ ফোনে পুলিসকে ডেকে বলেছে, এখানে ডাকাত পড়েছে। পাড়ার কেউ কিন্তু ডাকাতদের দেখেনি। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, এখানে কোনও অমানুষিক দানবের আবির্ভাব হয়েছিল। আমরা কিছু দেখিনি বটে, কিন্তু যে অট্টহাসি আর গর্জন শুনেছি, আর যে অদ্ভুত দেহের ধাক্কা খেয়েছি দুঃস্বপ্নেই তা স্বাভাবিক। সত্য কথা বলতে কি রবীন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না—আমারও মাথা দস্তুরমতো গুলিয়ে গিয়েছে!” বাড়ির ভিতরে ভীত ও বিস্মিত কণ্ঠের সাড়া জাগল।

পতিত দৌড়ে এসে উত্তেজিত স্বরে বললে, “স্যর, স্যর! শিগগির—শিগগির আসুন!” ভূপতি পায়ে পায়ে পিছোতে পিছোতে বললেন, “মানে? শিগগির যাব কি রকম? না আমি শিগগির যাব না! আগে কি হয়েছে বলো!”

—“স্যর, ভয়ঙ্কর ব্যাপার ?”

ভূপতি তখনও পিছোচ্ছেন। দুই চোখ বিস্ফারিত করে বললেন, “সেই সিঙ্গিটা এখনও বাড়ির ভেতরে আছে? যাও পতিত, দৌড়ে যাও—শিগগির ফোন করে দাও-সেপাই আসুক, বন্দুক আনুক, একটা মেশিন গান আনলেও মন্দ হয় না! হেমন্তবাবু, রবীনবাবু, পালিয়ে আসুন মশাই, পালিয়ে আসুন!”

পতিত বললে, “পালাবেন না স্যর, পালাবেন না। সিঙ্গি-টিঙ্গি কিচ্ছু নেই! খালি লাশ ! ”

—“লাশ? মানে?”

— আজ্ঞে, হ্যাঁ স্যর!লাশ—খালি লাশ—লাসের পর লাশ ! বাড়ির উঠোনে লাশ, সিঁড়িতে লাশ, দালানে লাশ, ঘরে লাশ ! বাড়িময় লাশ! ভীষণ হত্যাকাণ্ড ! একটা লোকও বেঁচে নেই!”

ভূপতি ঢোক গিলতে গিলতে বললেন, “ও হেমন্তবাবু, উপায় ?”

—“কিসের উপায়?”

—“আমার ভগ্নদূত কি খবর এনেছে শুনলেন তো? বাড়িময় লাশ—খালি লাস ! এত লাশ আমি একলা সামলাতে পারব কেন? বড়সায়েবকে খবর পাঠাব নাকি?”

—“আগে নিজেরাই গিয়ে দেখি না, ব্যাপারটা কি?”

ভূপতি ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “ঝাড়ু মারি এই পুলিসের কাজে ! এখন পৃথিবীর সমস্ত ভদ্রলোক দুগ্ধফেননিভ শয্যায় শুয়ে সুখস্বপ্ন দেখছে, আর আমাদের কিনা, মুদ্দাফরাসের মতো মড়ার গাদা ঘেঁটে মরতে হবে।...বাবা পতিত, তুমি দুই চক্ষু উন্মীলন করে আর একবার চারিদিক ভাল করে দেখে এসো তো! কে জানে সিঙ্গি ব্যাটা আনাচে কানাচে কোথাও ঘুপটি মেরে বসে আছে—শেষটা লাশ দেখতে গিয়ে কি, লাশ হব বাবা?”

—“না স্যর, আমি খুব ভাল করে দেখেছি—সিঙ্গি-ফিঙ্গি কিছু নেই, খালি লাশ! আমি গুণে দেখেছি—সবসুদ্ধু ঊনিশটা!”

— ওরে-ব্বাপ রে, ঊনিশটা! ডাকাতের দল তাহলে রীতিমতো ভারি ছিল বলো? বাড়ির ভিতরে ঊনিশটা, বাগানে একটা আর রাস্তার আর একটা—কি সর্বনাশ, একরাত্রে এক জায়গায় একুশটা খুন! আমার যে হৃৎকম্প হচ্ছে!”

হেমন্ত অগ্রসর হয়ে বললে, “আসুন ভূপতিবাবু, আর সময় নষ্ট করবেন না।”

বাড়ির মধ্যে ঢুকে যে বীভৎস দৃশ্য দেখা গেল, এখানে তার বিস্তৃত বর্ণনা দিতে চাই না।পতিত একটুও অত্যুক্তি করেনি—বাড়ির সর্বত্র, ঘরে, দালানে, সোপানে, উঠানে বইছে যে রক্তগঙ্গার ঢেউ—কোথাও দারোয়ানের, কোথাও দাস বা দাসীর এবং কোথাও বা পড়ে আছে বাড়ির অন্যান্য লোকের মৃতদেহ! প্রত্যেক দেহই ভয়াবহ রূপে ক্ষতবিক্ষত এবং অনেক দেহেই মুণ্ডের চিহ্নমাত্র বর্তমান নেই।

ভূপতি আতঙ্কগ্রস্ত কণ্ঠে বললেন, “এতকাল এ লাইনে আছি, কিন্তু এমন অভাবনীয় ব্যাপার কখনও দেখিনি। কখনও শুনিওনি।”

ত্রিতলের একটি ঘরে ঢুকে আবার যা দেখা গেল, তার চেয়ে ভীষণ দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। ঘরের মেঝেয় এমন জায়গা নেই যেখান দিয়ে বইছে না রক্তের প্রবাহ! কেবল কি মেঝেয় ? দেওয়ালের—এমনকি ছাদেরও গায়ে গিয়ে লেগেছে রক্তের ফিনকি !

এবং গৃহতলে—এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে মানুষের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ! কোথাও হাত, কোথাও পা, কোথাও দেহের বিভিন্ন অংশ এবং কোথাও চূর্ণবিচূর্ণ মুণ্ড! চেনবারও জো নেই সেটা মানুষের মুণ্ড কিনা !

রবীন বলল, “আমার গা কেমন করছে, আমি চললুম।”

হেমন্ত বললে, “আমারও দেহ সুস্থ নয়। কিন্তু পালালে চলবে না ভাই, এই নৃশংস হত্যাকারীকে ধরতেই হবে!”

ঘরের মেঝের উপরে পড়েছিল টেলিফোনের তার ছেঁড়া রিসিভারটা। সেটা তুলে নিয়ে ভূপতি বললেন, “যাঁর খণ্ড দেহ এখানে পড়ে রয়েছে, তিনিই বোধহয় ফোনে থানায় খবর পাঠিয়েছিলেন।”

হেমন্ত বললে, “আর তিনি ফোন ছাড়বার আগেই হত্যাকারী এসে তাঁকে আক্রমণ করেছিল।”

সুদর্শনও সকলের সঙ্গে উপরে এসেছিল। সে বললে, “এটা অবনীবাবুর শোবার ঘর।” ভূপতি বললেন, “বলেন কি, তাহলে এগুলো কি অবনীবাবুরই দেহের অংশ?”

হেমন্ত বললে, “খুব সম্ভব তাই। বোঝা যাচ্ছে, অবনীবাবুরই ওপরে হত্যাকারীর আক্রোশ ছিল বেশি! সে তাঁকে কেবল হত্যা করেনি, তাঁর দেহকে খণ্ড খণ্ড করে ফেলেছে। লক্ষ্য করে দেখুন, এখানেও কোনও অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি—অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো যেন দাঁতে কামড়ে আর থাবা মেরে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে! আবার ওইদিকে দেখুন, রক্তের উপরে সেই এক হাতেরও চেয়ে লম্বা পায়ের ছাপ!”

অত্যাশ্চর্য হাত

ভূপতি অনেকক্ষণ আগে থেকেই মনে মনে ভড়কে গিয়েছিলেন, কেবল মুখে কিছু ভাঙেননি।কিন্তু এবারে আর সামলাতে পারলেন না, একখানা চেয়ারের উপরে ধপাস করে বসে পড়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “ভাই হেমন্তবাবু, একি সর্বনেশে মামলা আমাদের হাতে পড়ল!”

ঠিক সেই সময়ে বাইরের দালান থেকে পতিত ভয়ার্ত স্বরে বললে, “স্যর শিগগির আসুন!”

একসঙ্গে ভূপতির মুখ চোখ ভুরু ভুঁড়ি হাত পা সব চমকে উঠল ! লাফ মেরে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “ওই রে বাবা, সেরেছে। দরজা বন্ধ করে দিন—দরজা বন্ধ করে দিন!” হেমন্ত বললে, “দরজা বন্ধ করব কেন?”

— আরে মশাই, আগে দরজা বন্ধ করুন! পতিত নিশ্চয় সেই সিঙ্গিটাকে দেখেছে!” শুনেই সুদর্শন রক্তময় মেঝের উপরে ঝাঁপ খেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলায় সড়াৎ করে ঢুকে পড়ল।

বাহির থেকে পতিত বললে, “সিঙ্গি-ফিঙ্গি কিছু নয় স্যর! সিঙ্গির দেখা পেলে আমি কি আর এখানে থাকি—আমি কি তেমনই কাঁচা ছেলে, স্যর!”

বুকের উপরে হাত দিয়ে বুকের ধুকপুকুনি বন্ধ করবার চেষ্টা করে ভূপতি বললেন, “সিঙ্গি-ব্যাটা নয়? আঃ বাঁচলুম।... পতিত, তোমাকে আগে থাকতে বলে রাখছি, ফের যদি তুমি ‘শিগগির আসুন' বলে হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠো, তাহলে তোমার নামে আমি রিপোর্ট করব। ‘শিগগির আসুন'! না, আমি শিগগির যাব না ! ”

—“তাহলে স্যর, আপনি ধীরে ধীরেই একবার এদিকে এলে ভাল হয় !”

—“কেন, ওদিকে আবার কি মাথামুণ্ডু আছে?”

—“মাথাও নয় স্যর, মুণ্ডুও নয়। খালি একখানা হাত !”

—“হাত! হাত মানে ?”

—“হাত মানে, একখানা অত্যাশ্চর্য হাত!”

—“হাত আবার অত্যাশ্চর্য! নাঃ পতিত, তুমি আমাকে জ্বালালে দেখছি। চলুন হেমন্তবাবু, পতিতবাবুর হুকুম—অত্যাশ্চর্য হাত দেখতে হবে!”

কিন্তু দালানে এসে পতিতের অঙ্গুলি নির্দেশে দেওয়ালের উপর দিকে তাকিয়ে সত্য সত্যই ভূপতির চক্ষুস্থির হয়ে গেল !

মাটি থেকে প্রায় চোদ্দ পনের ফুট উঁচুতে, দেওয়ালের গায়ে রয়েছে একখানা প্ৰকাণ্ড রক্তমাখা করতলের ছাপ। সে হাতখানা সাধারণ মানুষের হাতের চেয়ে প্রায় আড়াইগুণ বড়! ঘর্মাক্ত কপাল মুছতে মুছতে ভূপতি ভয়ে ভয়ে কেবল বললেন, “বাপ!”

হেমন্ত বললে, “যে দেহের ওই হাত, সে দেহটা কত উঁচু, কল্পনা করতে পারেন ভূপতিবাবু?” ভূপতি হতাশভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে করুণস্বরে বললেন, “না। এসব দেখেশুনে আমি কল্পনাশক্তি হারিয়ে ফেলেছি।”

সুদর্শন বললে, “এখন কি আমার কথায় আপনার বিশ্বাস হচ্ছে?”

—“না বলবার শক্তি আমার নেই।”

হেমন্ত বললে, “হাতের আঙুলগুলোর ডগার দিকে তাকিয়ে দেখুন। প্রত্যেক আঙুলের ডগায় একটা করে রক্তের আঁচড়ের মতো রেখা রয়েছে দেখছেন? রেখাগুলোর প্রত্যেকটাও প্রায় দুই ইঞ্চি লম্বা।”

— “দেখছি বটে। কী ওগুলো?”

— নখের দাগ!”

—“বাস রে বাস! আক্কেল-গুড়ুম বলে একটা কথা শুনেছি, আজ তার মর্ম বুঝতে পারলুম।”

—“কিন্তু বাড়িতে ডাকাত পড়েছে বলে ফোন করা হয়েছিল, তাদের তো কোনও চিহ্ন‍ই দেখতে পাচ্ছি না।”

—“মশাই, যা দেখছি তাই-ই কি যথেষ্ট নয়? এর ওপরেও ডাকাতদের চিহ্ন দেখতে চান ? বোঝার ওপরে শাকের আঁটি!”

— “কিন্তু ও কথা বলে ফোন করা হয়েছিল কেন, সেটা তো জানা দরকার !”

—“এ প্রশ্নের জবাব দিতেন যিনি, তিনি এখন পরলোকে।”

— “আমার কি সন্দেহ হচ্ছে, জানেন? অবনীবাবু হয়তো নিজেই জানতেন না, কে তাঁকে আক্রমণ করতে আসছে! নিচের তলায় দুমদাম দরজা ভাঙার শব্দ, লোকজনের আর্তনাদ, চিৎকার, হুটোপুটি, একটা অজানা ভৈরব হুঙ্কার শুনে তিনি বোধহয় ভেবেছিলেন, বাড়িতে ডাকাত পড়েছে।”

— অসম্ভব নয়।”

—“আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করবার মতো। হত্যাকারী বাড়ির সব লোককে বধ করেছে, সাক্ষ্য দিতে পারে এমন একজনও লোক রেখে যায়নি। তবু যে আমরা কিছু কিছু অনুমান করতে পেরেছি, সে হচ্ছে, দৈবের কৃপা।”

— “আমিও আর একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি। হত্যাকারী দরজা ভেঙেছে, হত্যার পর হত্যা করেছে, কিন্তু কোনও দেরাজ আলমারি বা সিন্দুকে হাত দেয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য যদি চুরি না হয়, তবে আর কি হতে পারে ?”

—“খুনের কত রকম কারণ থাকে। ঈর্ষা, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিহিংসা, গৃহবিবাদ।দু'দিন পরেই কোনও না কোনও সূত্র পাওয়া যাবেই।”

রবীন বললে, “আমার বিশ্বাস, কোনওরকম সূত্রই পাওয়া যাবে না। ঈর্ষা, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিহিংসা, গৃহবিবাদ—এসবের সঙ্গে থাকে মানুষের যোগাযোগ। কিন্তু আজকের এই আশ্চর্য হত্যাকাণ্ডের ভিতরে মানুষের হাত আমি কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।

ভূপতি বললেন, “ঠিক বলেছেন রবীনবাবু! ওই হাত! আর ওই পা! একি মানুষের হাত পা? বড় ভাবনায় পড়ে গেলুম মশাই! আমি এখন কি রিপোর্ট লিখি বলুন তো?”

—“কেন, যা দেখলেন আর যা শুনলেন, তাই লিখবেন।”

— “বিলক্ষণ! ভারি পরামর্শ দিলেন তো! আমি যদি রিপোর্টে লিখি, দশ নম্বর কানাইবাবুর লেনে এমন একজন হত্যাকারী এসেছিল, যার দেহ হাতির চেয়ে উঁচু, হাত হচ্ছে এক হাতের চেয়ে বড় আর পা হচ্ছে আঠার ঊনিশ-ইঞ্চি লম্বা, চিৎকার করে যে সিংহের কণ্ঠস্বরে আর হাস্য করে মানুষের মতো, আর লাফ মেরে উঠতে পারে একতলা ছাদে—তাহলে কাল কি আমার চাকরি থাকবে?... হেঁঃ! রিপোর্ট লিখব, না ছাই লিখব!”

— স্যর!”

—“মরছি নিজের জ্বালায় পতিত, তুমি আবার 'স্যর স্যর' কর কেন বাপু?”

— স্যর, সুদর্শনবাবুর কথাই ঠিক।”

– “মানে?”

— “এখানে এক উন্মত্ত প্রেতাত্মার আবির্ভাব হয়েছিল।”

—“তুমি আমাকে রিপোর্টে ওই কথাই লিখতে বল নাকি?”

—“স্যর, অনেক রকম প্রেতাত্মার গল্প শুনেছি, তারা কেবল মাঝে মাঝে মানুষকে ভয় দেখিয়েই খুশি হয়। কিন্তু আজকের এই প্রেতাত্মাটা উন্মত্ত না হলে—”

—“চোপরাও পতিত, চোপরাও! তোমার মূল্যবান উপদেশ আমি শুনতে চাই না!”

—“দেখবেন স্যর, দেখবেন! এ খুনের কিনারা করা পুলিসের কর্ম নয়! শেষ পর্যন্ত রোজা যদি ডাকতে না হয়, আমি নাকে খত দেব!”

দ্বিতীয় হত্যানাট্য

পরের দিনের সকালবেলার কথা। প্রভাতী চা — পান সাঙ্গ হয়েছে। মধু বেয়ারা চায়ের ট্রে নিয়ে গেল।

ইজিচেয়ারের উপরে আড় হয়ে পড়ে হেমন্ত খবরের কাগজখানা টেনে নিলে। রবীন বললে, “খবরের কাগজের ভিতরে একটু পরে ডুব দিও। আগে একটা জিজ্ঞাসার জবাব দাও।”

হেমন্ত হেসে বললে, “মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। তোমার জিজ্ঞাসাও নিশ্চয় কালকের ঘটনাক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে দৌড়তে পারবে না ?”

—“না। তোমার মনও কি এরই মধ্যে কালকের ঘটনাক্ষেত্রের বাইরে যেতে পেরেছে?”

—“সেটাকি স্বাভাবিক?”

—“স্বাভাবিক নয় জানি। তাই তো একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।”

— “গোলাম হাজির।”

—“ঠাট্টা নয় হেমন্ত। কাল যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতুম না।”

— “আমিও না। কাল যেন আমাদের ঘাড়ে চেপেছিল আরব্য উপন্যাসে কথিত এক আজগুবি রাত্রি। আলাদিনের দেখা পাইনি বটে, কিন্তু তার বন্ধু দৈত্যের পদধ্বনি শুনেছি।”

—“আলাদিনের দৈত্য নরহত্যা করত না।”

— “আলাদিনের হুকুম পেলে করতে পারত।”

—“কিন্তু এখানে আলাদিন কোথায়?”

—“আলাদিন আছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমি এই আধুনিক আলাদিনকে আবিষ্কার করতে পারলে সুখী হব।”

—“কোথায় তাকে পাবে বলে সন্দেহ কর ?”

— একদল সন্ন্যাসীর মধ্যে ! ”

রবীন সচমকে বললে, “হেমন্ত, অবনীবাবুর মৃত্যুর আগের দিন যে সন্ন্যাসী গুরুভাইদের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়েছিল, তুমি কি তাদেরই সন্দেহ কর?”

—“অল্পবিস্তর করি বৈকি!”

– “তাদের ঠিকানা তুমি জান না।”

—“রবীন, এইবার তুমি বোকার মতো কথা কইলে। মাত্র একজন অজানা খুনি খুব চুপিসাড়ে কাজ সেরে পালিয়ে গিয়েও ধরা পড়ে। একদল সন্ন্যাসীর সন্ধান করা কি বিশেষ শক্ত কথা?”

—“কিন্তু খুনের রাত্রে সন্ন্যাসীদের কেউ দেখেনি। আর ঘটনাক্ষেত্রেও তাদের উপস্থিতির কোনও প্রমাণ নেই।”

—“মানি। আমিও জানি, সন্ন্যাসীদের সন্ধান পেলেই খুনি ধরা পড়বে না। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে, সন্ন্যাসীদের সঙ্গে খুনের কোনও সম্পর্ক আছে।”

—“সন্দেহের কারণ?”

—“কারণ খুব স্পষ্ট বা মস্ত নয়।”

– “তবু?”

—“প্রথমত সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ঝগড়ার পরের দিনই এই হত্যাকাণ্ড হল কেন? দ্বিতীয়ত, অবনীবাবু থানায় ফোন করে ‘আমার বাড়িতে ডাকাত পড়েছে' বলেছিলেন কেন ? —“তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনও মানে হয় না।”

—“হয়। নিচের তলায় হট্টগোল মারামারি শুনেই অবনীবাবু ভেবেছিলেন তাঁর বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। হঠাৎ তাঁর এরকম ভাববার কারণ কি? আগের দিনে সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়েছে, হয়তো তিনি এইরকম আক্রমণেরই আশঙ্কা করেছিলেন।”

—“হতে পারে। কিন্তু তাঁর সে আশঙ্কা অমূলক। সন্ন্যাসীরা তাঁর বাড়ি আক্রমণ করেনি। ঘটনাক্ষেত্রে যার সাড়া, দেখা আর চিহ্ন পাওয়া গেছে, সে যেই হোক—সন্ন্যাসী নয়।”

—“হত্যাকারী যে সন্ন্যাসী এ কথা আমিও বলছি না। আমার বক্তব্য হচ্ছে, অবনীবাবু হয়তো সন্দেহ করেছিলেন, তাঁর উপরে চটে একদল সন্ন্যাসী তাঁকে আক্রমণ করতে এসেছে। আমার অনুমান ঠিক হলে দেখা দরকার, কেন তাঁর মনে এমন সন্দেহ হয়? কেন তাঁর সঙ্গে সন্ন্যাসীদের ঝগড়া হয়েছিল? সুদর্শনবাবুর মুখে শুনলে তো, অন্য অন্য বারে সন্ন্যাসীরা অবনীবাবুর বাড়িতে দশ — পনের দিন না কাটিয়ে যায় না। এবারে কেন তারা এসেই চলে গেল ? তারা কি যথার্থ সাধু নয়? তাই কি অবনীবাবু তাদের বিদায় করে দিয়েছিলেন? আমি এইসব প্রশ্নের উত্তর চাই। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ঝগড়ার পরের দিনেই অবনীবাবু খুন হলেন কেন ?”

—“তোমার কথা শুনে এইবারে বুঝেছি, খুনের কিনারা হোক বা না হোক সন্ন্যাসীদের সন্ধান নেওয়া দরকার বটে।”

হেমন্ত অল্পক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বললে, “রবীন, তুমি অতিপ্রাকৃত ঘটনা বিশ্বাস কর?”

—“হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন ?”

—“বলো না, বিশ্বাস কর কিনা?”

—“কি করে বলব? আমি কোনও অতিপ্রাকৃত—অর্থাৎ অসম্ভব ঘটনা দেখিনি।”

—“কালকের ঘটনা কি অতিপ্রাকৃত নয়?”

— “না হতেও পারে।”

— “কেন?”

– “কালকের ঘটনার উপরে রয়েছে গভীর রহস্যের আবরণ। এ আবরণ সরে গেলে হয়তো দেখা যাবে, সমস্ত ব্যাপারটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক।”

— “অসম্ভব নয়। কিন্তু তুমি অতিপ্রাকৃত ঘটনা বিশ্বাস কর না?”

— “এই বিজ্ঞানের যুগে বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হয় না ৷ ”

—“কিন্তু আমার প্রবৃত্তি হয়।”

—“আশ্চর্য কি, লোকচরিত্র বিচিত্র। চার সহোদরের প্রকৃতি চাররকম হয়।”

—“রবীন, আমি অন্ধের মতো কোনও কিছুতে বিশ্বাস করি না। এ বিশ্বের সর্বত্র যে রহস্যময়, অজ্ঞাত শক্তি বাস করে, আমরা যদি তার সঠিক খবর রাখতে পারতুম, তাহলে প্রত্যেক মানুষই হয়ে উঠত মহামানুষ। ‘স্পিরিচুয়ালিজম' নিয়ে তুমি কিছু পড়াশোনা করেছ?”

—“বিশেষভাবে নয়।” -

—“এমন অনেক মানুষ আছে, যারা স্পর্শ না করেও ধাতুকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ আগুনের উপর দিয়ে নগ্নপদে হাঁটতে পারে, হাজার হাজার লোক এ ব্যাপার স্বচক্ষে দেখেছে। তারা এসব শক্তি কেমন করে অর্জন করলে?”

—“ও প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না হেমন্ত !”

—“বিলাতের এক সাহেব গেল শতাব্দীতে সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি তোমার আমারই মতন সাধারণ মানুষ—যোগী বা সাধু নন। কিন্তু তাঁর ভিতরে আত্মপ্রকাশ করেছিল প্রকৃতির এক দুর্লভ শক্তি। এই জড়দেহ নিয়েই তিনি শূন্যে বিচরণ করতে পারতেন। ইউরোপের বড় বড় প্রসিদ্ধ লোকের সামনে তিনি শূন্যপথে ঘরের এক জানলা দিয়ে বেরিয়ে, আর এক জানলা দিয়ে আবার ভিতরে এসে ঢুকেছিলেন।”1

—“তোমার কথা শুনে বিস্মিত হচ্ছি।”

—“আমেরিকার এক পরীক্ষাক্ষেত্রে নামজাদা ডাক্তাররা একত্র হয়ে এক সমাধিগ্রস্ত যোগীকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরীক্ষা করে বলেছিলেন, তাঁর দেহে জীবনের কোনও লক্ষণ নেই—এমনকি তাঁর হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছে—আধুনিক বিজ্ঞানের মতে যা মৃত্যুরই নামান্তর।কিন্তু তারপর সমাধিভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গেই যোগীর দেহে জীবনের পূর্ণলক্ষণ ফিরে এসেছিল। দেখছো রবীন, তুমি যে বিজ্ঞানের দোহাই দিচ্ছ, বিশ্বব্যাপী রহস্যময় শক্তির কাছে সে কতখানি পঙ্গু !”

—“বিজ্ঞানের কাজই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী রহস্যময় শক্তিকে মানুষের সামনে পূর্ণভাবে প্রকাশ করা। সুতরাং বিজ্ঞানের দোহাই দেব না কেন ?” -

—“কেবল বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে কোনও লাভ নেই ভাই, বিজ্ঞানের সত্যিকার ভক্ত নিজের চোখ আর মন সর্বদাই খোলা রাখেন। ভারতবর্ষের অনেক যোগী যে ভূপ্রোথিত হয়ে সমাধিগ্রস্ত হয়ে ত্রিশ-চল্লিশ দিন কাটিয়েছেন, শত শত প্রত্যক্ষদর্শী তার সাক্ষ্য দিতে পারেন।একবার ভেবে দেখো দেখি, চারিদিক অন্ধকার—সমস্ত দেহ ঘিরে বিরাজ করছে ছিদ্রহীন পাতালের মাটি—আর সেই দেহও সমাধিগ্রস্ত, অর্থাৎ পঙ্গু, বিজ্ঞানের ভাষায়, জীবনহীন ! তারপরে আলো নেই, বাতাস নেই, জল নেই, খাবার নেই—যার অভাবে জীব বাঁচে না—অন্তত একেলে বিজ্ঞান বলবে, বাঁচা অসম্ভব! ত্রিশ-চল্লিশ দিন পরে সমাধি ভেঙে যোগী কেমন করে অক্ষত আর জীবন্ত দেহ নিয়ে আবার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেন? কোন অজানা রহস্যময় শক্তির আশীর্বাদ তিনি লাভ করেছেন? এসব কি অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়? এসব চোখে দেখলেও কি বিশ্বাস করব না? বিজ্ঞান — অর্থাৎ নব্য বিজ্ঞান এখনও শিশু, এই রহস্যসাগরে মগ্ন হবার শক্তি এখনও সে অর্জন করেনি। কিন্তু প্রাচীন জগতের বিজ্ঞান এসব সত্য বলে জানত আর মানত, কারণ গভীর অনুসন্ধানের ফলে রহস্যলোকের চাবি একবার সে হস্তগত করতে পেরেছিল। আজ সে পুরনো চাবি হারিয়ে গিয়েছে, তোমাদের নূতন চাবি দরজায় আর লাগছে না !”

— তোমার হঠাৎ এই বক্তৃতার কারণ কি হেমন্ত? কালকের ব্যাপারের মধ্যে তুমি কি অতিপ্রাকৃত কোনও কিছুর খোঁজ পেয়েছ?”

— “খোঁজ আমি কিছুই পাইনি। তবে আপাতত কালকের ঘটনাগুলোকে অসাধারণ বলতে পারি বটে। হয়তো তোমার অনুমানই ঠিক। রহস্যের আবরণ সরিয়ে নিলে কালকের ঘটনাগুলো খুবই সাধারণ হয়ে পড়বে।”

হেমন্ত মুখ বন্ধ করে খুললে খবরের কাগজ। রবীন মধুর উদ্দেশে চেঁচিয়ে আর এক পেয়ালা চা পান করবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে।

রবীন চা পান করছে, হেমন্ত হঠাৎ অভিভূত কণ্ঠে বলে উঠল, “কি সর্বনাশ, কি সর্বনাশ?” চায়ের পেয়ালা নামিয়ে রেখে রবীন জিজ্ঞাসুভাবে বন্ধুর মুখের পানে তাকিয়ে রইল। হেমন্ত খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বললে, “রবীন, কাগজে কালকের ঘটনা বেরিয়েছে।

— আমাদের পক্ষে ও তো পুরনো খবর। এ জন্য তোমার অতটা অভিভূত হবার কারণ নেই।”

—“না! আমি অভিভূত হয়েছি, আর একটা খবর পড়ে! অবনীবাবুর হত্যাকারীই কাল রাত্রে আর এক জায়গাতেও আর এক হত্যানাট্যের অভিনয় করেছে!”

—“বল কি, বল কি!”

– “শোনো।” হেমন্ত উচ্চস্বরে খবরটা পড়তে লাগল:

“দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটিয়াছে দুই নম্বর তালপুকুর স্ট্রিটে।

—“বাড়ির মালিকের নাম বিধুরঞ্জন বসু। তিনি চিরকুমার, বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ। তাঁহার আত্মীয়স্বজন কেহ নাই—অন্তত তাঁহার সঙ্গে কেহ বাস করিতেন না। বাড়িতে থাকিত কেবল একজন পাচক ও একজন বেয়ারা।

“যতদূর জানা গিয়াছে, বিধুবাবুও অবনীবাবুর মতো ধর্মপ্রাণ লোক ছিলেন, তান্ত্রিক পূজা - অর্চনাই ছিল তাঁহার জীবনের প্রধান আনন্দ। এবং তাঁহার বাড়িতেও মাঝে মাঝে কোথা হইতে একদল সন্ন্যাসী আসিয়া দিন কয়েকের জন্য রীতিমতো আসর জমাইয়া তুলিতেন !

“গত রাত্রে প্রায় একটার সময় অমাবস্যা ও ব্ল্যাক আউটের গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে ভীষণ এক গোলমালে প্রতিবেশীদের নিদ্রাভঙ্গ হয়। গোলমাল হইতেছিল বিধুবাবুর বাড়ির ভিতরে। ডাকাত পড়িয়াছে ভাবিয়া প্রতিবেশীরা লাঠি, দা ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র লইয়া ছুটিয়া আসে। তাহাদের মধ্যে ছিলেন ও পাড়ার বিখ্যাত ব্যায়ামবীর ও লাঠিয়াল বিনোদলাল। সর্বাগ্রে সাহস করিয়া তিনিই বিধুবাবুর বাড়ির দরজার নিকটে গিয়া উপস্থিত হন।

“তাহার পর কি হইল, কেহই ঠিক করিয়া বলিতে পারে না। তবে সকলে বলে, হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে মাটি হইতে সতের-আঠার ফুট উপরে দপদপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল ভাঁটার চেয়ে বড় দু'টো তীব্র, ক্রুদ্ধ ও অগ্নিময় চক্ষু, জাগিয়া উঠিল বজ্রধ্বনির মতো প্রচণ্ড সিংহের গর্জন ও তার পরেই খলখল অট্টহাস্য—সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল একটা মর্মভেদী আর্তনাদ।তাহার পর সকলের মনে হইল, যেন একটা মদমত্ত হস্তী পদভরে পৃথিবী কম্পিত করিয়া দ্রুতবেগে কোথায় চলিয়া গেল।

“এই কাণ্ডের পর প্রতিবেশীরা কেহই আর অগ্রসর হইতে ভরসা করিল না। ইতিমধ্যে কে থানায় ফোনে খবর দিয়াছিল, পুলিস আসিয়া পড়িল! পুলিস আসিয়া রাস্তার উপরে সর্বপ্রথমে আবিষ্কার করিল হতভাগ্য যুবক বিনোদলালের মৃতদেহ। কোনও দারুণ হিংস্র জন্তু যেন কাঁধের উপর হইতে তাহার মুণ্ডুটা থাবার এক আঘাতে উড়াইয়া দিয়াছে! বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিয়া পুলিস দেখিল, নিচের তলায় পড়িয়া রহিয়াছে বিধুবাবুর পাচক ও বেয়ারার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। উপরতলায় শয়নকক্ষের মধ্যে যাহা পাওয়া গিয়াছে, তাহাকে বিধুবাবুর দেহ না বলিয়া, দেহাবশেষ বলা উচিত। কারণ, এই নৃশংস হত্যাকারী অবনীবাবুর মতন বিধুবাবুর দেহকেও খণ্ডবিখণ্ড করিয়া ফেলিয়াছে!

“কে এই হত্যাকারী? বেশ বুঝা যায়, অবনীবাবু ও বিধুবাবুর হত্যাকারী একই ব্যক্তি। কিন্তু কে সে? একই রাত্রে কেন এই দুই হত্যাকাণ্ড? একদিনে একই ব্যক্তি বা দলের দ্বারা পঁচিশটি নরহত্যা কলিকাতায় কখনও হইয়াছে বলিয়া শুনি নাই। এরপরেও আমরা যদি পুলিসকে অকর্মণ্য বলিয়া মনে করি, তাহা হইলে কি অন্যায় করা হইবে?

“দুই ঘটনাক্ষেত্রেই সিংহনাদ ও অট্টহাস্য শোনা গিয়াছে। নিহত ব্যক্তিদের দেহ দেখিলেও বুঝা যায়, কোনও প্রকাণ্ড জন্তুর কবলে পড়িয়াই সকলকে মৃত্যুবরণ করিতে হইয়াছে। অট্টহাস্য করিয়াছে হয়তো হত্যাকারীরাই। কিন্তু সিংহনাদের অর্থ কি? হত্যাকারীরা কি কোনও পালিত, পোষমানা সিংহ লইয়া ঘটনাক্ষেত্রে আসিয়াছিল? অনেকে নাকি সন্দেহ করিতেছেন, এই দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভৌতিক ব্যাপারের সম্পর্ক আছে। প্রথম ঘটনাক্ষেত্রে নাকি আশ্চর্য ও প্রকাণ্ড হাত ও পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, ওসব হইতেছে পুলিসের চক্ষে ধুলি নিক্ষেপের জন্য কৌশলী হত্যাকারীদের ছলনামাত্র। ওই হাত ও পায়ের ছাপ হইতেছে নকল ছাপ।

“দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আর একটি লক্ষ্য করিবার বিষয় আছে। দুই স্থলেই কোনও মূল্যবান দ্রব্য চুরি যায় নাই। সুতরাং হত্যার কারণ অর্থলোভ নয়।”

রবীন স্তম্ভিতপ্রায় স্বরে বললে, “ভয়ানক! এর ওপরে কোনওরকম মত প্রকাশ করবার শক্তি আমার নেই।”

হেমন্ত বললে, “বন্ধু খবরের কাগজের এই রিপোর্টারটি তোমার দলভুক্ত হলেও তোমার চেয়ে উচ্চশ্রেণীর মনুষ্য।”

—“কি রকম?”

— “ইনি তোমার দলের লোক, কারণ অতিপ্রাকৃত ঘটনায় বিশ্বাস করেন না। আবার ইনি তোমার চেয়ে উচ্চশ্রেণীরও বটে, কারণ হরেকরকম মূল্যবান মত প্রকাশ করেছেন।”

—“মূল্যবান মত ?”

—“যথা, পুলিস অকর্মণ্য, অট্টহাসি হেসেছে হত্যাকারীরা, তাদের পরিচালনায় হত্যা আর সিংহনাদ করেছে পোষা সিংহ, সেই হাত আর পায়ের ছাপ জাল-পুলিসের চোখে ধুলো দেবার জন্যে!”

—“চুলোয় যাক রিপোর্টারের গবেষণা। হেমন্ত, এখন তুমি কি করতে চাও?”

—“আপাতত ফোনের কাছে যেতে চাই—ওই শোনো ঘণ্টা বাজছে।” টেলিফোন ছেড়ে ফিরে এসে হেমন্ত বললে, “অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার সতীশবাবুর টনক নড়েছে, তিনি নাকি সোজা আমার বাড়ির দিকেই ধাবমান হয়েছেন!”

কড়িকাঠের সার্থকতা

হেমন্তের বৈঠকখানাতে ঢুকেই সতীশবাবুর প্রথম কথা—“নতুন খবরটাও শুনেছেন ?”

—“আজ্ঞে হ্যাঁ।” – “কি কাণ্ড !”

— কল্পনাতীত।”

— ভুতুড়ে বললেও চলে।”

– “কেন ?”

—“হাতির মতো উঁচু জীব, দানব-মানুষের হাত-পায়ের ছাপ, মাটি থেকে সতের-আঠার ফুট ওপরে অগ্নিময় চক্ষু, খলখল অট্টহাস্য, সিংহনাদ, আঁচড়ে কামড়ে পঁচিশটা নরহত্যা—এসব কী ?”

—“আমায় যদি জিজ্ঞাসা করেন, জবাব পাবেন না। কারণ, আমিও হতভম্ব হয়ে গিয়েছি।”

—“আপনি হতভম্ব হলে তো চলবে না হেমন্তবাবু! খবরের কাগজওয়ালারা পুলিসের বিরুদ্ধে ‘জেহাদ ঘোষণা করেছে। আমরা যে আপনারই সাহায্য চাই।”

—“ভূপতিবাবু কি বলেন?”

—“ভূপতির কথা ভুলে যান! সে একেবারে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে পড়েছে! বলে, ভুত- প্রেতের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে না—তা চাকরি থাক আর যাক!”

—“ভূপতিবাবুর সহকারি পতিতবাবু উপদেশ দিয়েছেন, রোজা ডাকবার জন্যে। —“পতিত? এর মধ্যেই ডাক্তারের সার্টিফিকেট দাখিল করে সে তিনমাসের ছুটি চেয়েছে।”

– “তাই নাকি?”

— তার অসুখটা ভান। আসল কথা, সে এ মামলা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে রাজি নয়।”

—“আমি কিন্তু ঠিক তার উল্টো। আমি চাই এ মামলার রহস্যটা ভাল করে বুঝতে। আপনার অবস্থা কি রকম?”

—“সুবিধের নয়। তাই তো আপনার দরজায় ধর্না দিতে এসেছি।”

—“আমাকে লজ্জা দেবেন না সতীশবাবু! নিজের তুচ্ছতার কথা আমি ভাল করেই জানি।”

— আপনার তুচ্ছতা অনেক শ্রেষ্ঠতারও চেয়ে লোভনীয়।”

—“থাক সতীশবাবু, থাক! বিনয়ে আপনাকে হারাবার জন্যে ব্যর্থ চেষ্টা করে আর সময়ের অপব্যবহার করব না। এইবার কাজের কথা হোক। দ্বিতীয় ঘটনাক্ষেত্রের কি কি সূত্র পেয়েছেন?”

—“সূত্র? যা পেয়েছি, প্রথম ঘটনাক্ষেত্রেও সেইরকম সব সূত্রই পাওয়া গিয়েছে।”

—“বলুন দেখি, পরশু দিন একদল সন্ন্যাসী বিধুবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল কি না?”

সতীশবাবু সবিস্ময়ে বললেন, “আপনি কি এর মধ্যেই ঘটনাস্থলে ঘুরে এসেছেন ?”

—“না।”

— তবে কেমন করে জানলেন?”

—“অনুমানে।”

—“আশ্চর্য আপনার অনুমানশক্তি। হ্যাঁ, বিধুবাবুর প্রতিবেশীদের মুখে খবর পেয়েছি, ঘটনার আগের দিন একদল হিন্দুস্তানি সন্ন্যাসী বিধুবাবুর বাড়িতে এসেছিল। কিন্তু খানিকক্ষণ পরেই তারা আবার চলে যায়! হ্যাঁ, হেমন্তবাবু, আপনি কি এই সন্ন্যাসীদের সন্দেহ করেন? না, না, অসম্ভব। ঘটনার সময়ে কেউ তাদের দেখেনি। যে এসেছিল, যার সাড়া আর চিহ্ন পাওয়া গেছে, সে তো এক বিভীষণ মূর্তি! সে মানুষ, না দানব, না জন্তু—কিছুই ঠিক করে বলবার উপায় নেই!

হেমন্তের ভাব দেখে মনে হয়, সতীশবাবুর কোনও কথাই তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছিল না, দুই চোখ মুদে সে যেন কি গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে!

সতীশবাবু বললেন, “বিধুবাবুর ঘর থেকে একটা জিনিস পেয়েছি হেমন্তবাবু!”

—“কি বললেন?”

—“বিধুবাবুর একখানা ডায়েরি পেয়েছি।”

সাগ্রহে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে হেমন্ত ডায়েরিখানা গ্রহণ করলে। দুই এক পাতা উল্টে বললে, “যাদের ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে, আমি তাদের ভালবাসি। পুলিসের বহু সমস্যার সমাধান করতে পারে এই ডায়েরি।” আরও কয়েকখানা পাতার উপরে চোখ বুলিয়ে বললে, “ওরে মধু, সতীশবাবুকে চা আর খাবার দিয়ে যা! ভগবানের ইচ্ছা নয় যে, শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ অলস হয়ে বসে থাকে। আমি পড়ি ডায়েরি, আর সতীশবাবু নিযুক্ত থাকুন পানাহারে। কি বল রবীন ?”

— আর আমি?”

—“তুমি একবার আমার দিকে, আর একবার সতীশবাবুর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে সময় কর্তন কর। যার যা কাজ।”

—“তার মানে তুমি বলতে চাও, আমি হচ্ছি নির্বোধ, আর সতীশবাবু হচ্ছেন পেটুক?” কিন্তু হেমন্ত আর কিছু বলতে চাইলে না, হেঁটমুখে একমনে ডায়েরির পাতার পর পাতা ওল্টাতে লাগল।

চা আর খাবার এল। রবীন খবরের কাগজখানা টেনে নিলে। চায়ের পেয়ালা আর খাবারের থালা খালি করে সতীশবাবু ফিরে দেখলেন, হেমন্ত হাঁ করে এক দৃষ্টিতে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে আছে।

সতীশবাবু হেসে ফেলে বললেন, “হাতে বই, চোখ কড়িকাঠে। আপনি উচ্চশ্রেণীর পাঠক!”

—“যা পড়বার, পড়েছি। এখন আমি ভাবছি—কড়িকাঠের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমার চিন্তাশক্তি বাড়ে।”

—“জানা রইল। এবারে আমিও এই পদ্ধতি পরীক্ষা করব। কিন্তু আপনার চিন্তাশক্তি বাড়াবার প্রয়োজন হল কেন?”

—“ডায়েরিখানা পড়েছেন?”

— না। এখনও সময় পাইনি।”

—“তাহলে এই অংশটুকু শুনুন।”

হেমন্ত পড়তে লাগল :

“না, না, অসম্ভব—সম্পূর্ণ অসম্ভব! গুরুর ইচ্ছা হয়েছে বলে পাপাচার সমর্থন করতে পারব না। একজটা স্বামীজি বলেছিলেন, আমাদের গুরুভক্তি তিনি পরীক্ষা করবেন। মহাকালী নাকি স্বপ্নে তাঁকে আদেশ দিয়েছেন, এক বৎসরকাল ধরে প্রতি অমাবস্যায় তিনি একটি করে নরবলি চান। গুরুদেব তাঁর শিষ্যমণ্ডলীর ভেতর থেকে বারজনকে বেছে নিয়ে বললেন, ‘তোমাদের প্রত্যেককে একটি করে বলির জীব সংগ্রহ করতে হবে। মহাকালীর ইচ্ছা পূর্ণ করলে আমিই যে কেবল পূর্ণসিদ্ধি লাভ করব, তা নয়; আমার অনুগ্রহে তোমরাও দৈবশক্তির অংশ লাভ করবে!' গুরুদেবের অন্যদেশীয় শিষ্যেরা সম্মত হল, কিন্তু আমরা তিনজন বাঙালি—আমি, অবনী আর শক্তিপদ—দৃঢ় প্রতিবাদ না জানিয়ে পারলুম না। গুরুদেব ক্রুদ্ধ হলেন। আমরা তিনজনেই একবাক্যে বললুম, 'আমরা নরহত্যায় সাহায্য করতে পারব না। এমন কি, গুরুদেব যদি এই নিষ্ঠুর আর অন্যায় সংকল্প পরিত্যাগ না করেন, তাহলে আমরা পুলিসে খবর দিতেও বাধ্য হব।' গুরুদেব শাসিয়েছেন, যোগবলের দ্বারা তিনি আমাদের সর্বনাশ করবেন। আমরা কিন্তু তাঁর শাসানি গ্রাহ্য না করে কলকাতায় চলে এসেছি।” সতীশবাবু সবিস্ময়ে বললেন, “আশ্চর্য কথা! কে এই ভয়ানক গুরু!”

—“তার নাম আছে বটে, ধাম নাই।”

—“ভারতবর্ষে এখনও এমন ধর্মোন্মাদ আছে!”

—“ভারতবাসী এখনও অতীতকে ভুলতে পারেনি। ভাল করে খোঁজ নিলে দেখবেন, অশিক্ষিতদের তো কথাই নেই, অধিকাংশ শিক্ষিতদের মনেও প্রাচীন সংস্কারের ধারা এখনও অল্পবিস্তর মাত্রায় বর্তমান আছে।”

—“মানি। কিন্তু এ যে একেবারে চরম!”

হেমন্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। খানিক পরে বললে, “সতীশবাবু, আমি সূত্র পেয়েছি!”

—“পেয়েছেন?”

— আজ্ঞে হ্যাঁ। অন্তত সূত্রের একটা দিক। যদিও সূত্রের অন্য প্রান্ত আছে এখনও নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে।”

—“তবেই তো!”

—“নিৰ্ভয় হোন সতীশবাবু! মামলাটা যতই জমকালো আর চমকদার হোক, একটা হেস্তনেস্ত করতে বোধহয় বেশি বেগ পেতে হবে না। সূত্রের একদিক যখন হাতে পেয়েছি, তখন অন্য প্রান্তে যতই অন্ধকার থাক, এই সূত্রের খেই ধরে অন্ধের মতো যথাস্থানে গিয়ে হাজির হতে পারব।”

—“তাহলে আপাতত আমাদের কর্তব্য কি?”

— শক্তিপদকে আবিষ্কার করুন।”

—“শক্তিপদকে! কেন ?”

— মাথা স্থির করে একটু ভেবে দেখুন।অবনী, বিধু আর শক্তিপদ হচ্ছে কোনও দুরাচার তান্ত্রিক গুরুর বিদ্রোহী শিষ্য। গুরু শাসিয়েছে এই তিন বিদ্রোহী চ্যালাকে শাস্তি দেবে বলে। তিনজনের মধ্যে দুইজনকে একরাত্রেই রহস্যময় উপায়ে পথ থেকে সরানো হয়েছে, বাকি রইল একজন মাত্র, আর সে হচ্ছে শক্তিপদ। খুব সম্ভব, সে এখনও ইহলোকেই বিদ্যমান আছে, কারণ তার মৃত্যুর খবর এখনও পাওয়া যায়নি। সতীশবাবু, এই ডায়েরি আমাদের সকল সন্দেহ ঘুচিয়ে দিয়েছে! জাগ্রত হোন, শক্তিপদকে আমাদের পাওয়া চাই-ই চাই! সেই হবে আমাদের অকূল পাথারের কাণ্ডারী!”

সতীশবাবু বিশেষ জাগ্রত হয়েছেন বলে মনে হল না। বললেন, “শক্তিপদকে খুঁজে বের করতে গেলে সময়ের দরকার। ইতিমধ্যেই সে যে খুনিদের খপ্পরে গিয়ে পড়বে না, এমন কথা কে বলতে পারে ?”

—“কেউ বলতে পারে না সতীশবাবু, কেউ বলতে পারে না!”

— তার চেয়ে আগে এই নরবলির ভক্ত, বদমাইশ গুরুর সন্ধান করা হোক না কেন ? একেবারে গোড়ায় কোপ মারাই কি ঠিক নয় ?”

— “এখনও সময় হয়নি। তারপর দেখুন—প্রথমত, আমরা গুরুমশাইয়ের ঠিকানা পর্যন্ত জানি না। দ্বিতীয়ত, সে এখনও নরবলি দিয়েছে বলে প্রমাণ নেই। সুতরাং ও অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, কলকাতার এই দু'টো মহা হত্যাকাণ্ডের জন্যেও তাকে বা তার দলকে বন্দী করবার মতো প্রমাণও আমরা পাইনি। তবে তাকে লক্ষ্য করে আমাদের কি লাভ হবে?”

—“আপনার কথা যুক্তিসঙ্গত বটে।”

—“কিন্তু শক্তিপদকে যদি আমরা হাতে পাই, গুরুকে হস্তগত করতে বেশি বিলম্ব হবে না।...আচ্ছা, রসুন—রসুন, শক্তিপদ লাভ করবার একটি সহজ উপায় আমার মাথায় আছে। হ্যাঁ, সেই ঠিক! রবীন, কাগজ — কলম নিয়ে বোসো। যা বলি, লিখে নাও!'

রবীন কথামতো কাজ করলে। হেমন্ত বলতে লাগল :

“শক্তিপদবাবু,

আপনি অবনীকান্ত রায়চৌধুরী ও বিধুভূষণ বসুর গুরুভাই। আপনার মাথার উপরে বিপদের খাঁড়া ঝুলছে। যদি নিজের প্রাণরক্ষা করতে আর বন্ধুহত্যার প্রতিশোধ নিতে চান, তাহলে বিনা বিলম্বে নিম্নলিখিত ঠিকানায় এসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। ইতি—"

তলায় রইল হেমন্তের নাম ও ঠিকানা।

রবীন বললে, “তুমি বোধহয় চিঠিখানা খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন পৃষ্ঠায় প্রকাশ করতে চাও ?”

—“হ্যাঁ। সমস্ত বাংলা কাগজে।”

—“এ বিজ্ঞাপন হত্যাকারীদের চোখে পড়বে। তারাও সাবধান হয়ে যাবে।”

—“ডায়েরিতে দেখছি আর সুদর্শন প্রভৃতিরও মুখে শুনেছি, সন্ন্যাসীরা হিন্দুস্তানি। সম্ভবত তারা বাংলা পড়তে জানে না। তবে তুমি যা বললে, সে সম্ভাবনাও যে নেই তা নয় ৷ তবু দৈবের উপরে নির্ভর করলুম, হয়তো দৈব আমাদের সহায় হবে।”

সতীশবাবু প্রশংসা ভরা স্বরে বললেন, “হেমন্তবাবু, আপনি এত তাড়াতাড়ি চিন্তা করতে আর পথ বাতলাতে পারেন যে, চমৎকৃত হতে হয়।”

হেমন্ত হাতজোড় করে বললে, “দোহাই সতীশবাবু, কথায় কথায় আমাকে এত উঁচু স্বর্গে তুলবেন না মশাই। আমি মর্ত্যের মানুষ। যদি মাথা ঘুরে যায়, পড়ে গতর চূর্ণ হয়ে যাবে!”

ভাবেরও মূর্তি আছে

দিন তিনেক কাটবার পর।

হেমন্ত পাঠাগারের এককোণে একটি প্রকাণ্ড সোফার সুগভীর কোলের মধ্যে প্রায় যেন বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে একখানি পুস্তকপাঠে নিযুক্ত ছিল। তার সামনের গোল টেবিলের এবং পদতলের কার্পেটের উপরেও ছোট বড় মাঝারি ও রোগা মোটা দোহারা হরেক আকারের আর হরেক রঙের গ্রন্থ ছড়ানো রয়েছে।

রবীন ঘরের ভিতরে ঢুকে হেমন্তকে প্রথমে খুঁজেই পেলে না। সে আপন মনেই বললে, “তাই তো, বাড়ির কোথাও নেই! বন্ধু আমার যাত্রা করলেন কোন সিন্ধুপারে ?”

—“কোথাও নয়! আপাতত বন্ধু তোমার স্তম্ভিত হয়ে আছে তোফা আরামে সোফার অন্তরালে।”

— “ওখানে! চোরের মতো চুপিচুপি কি করছ হে?”

—“প্রেতবিদ্যাচর্চা।”

—“প্রেতবিদ্যা—অর্থাৎ স্পিরিচুয়ালিজম? শরীরী তুমি, অশরীরীদের নিয়ে হঠাৎ মাথা ঘামানোর কারণ কি?”

— “কথায় কথায় তুমি বড্ড কারণ জানতে চাও রবীন।

মনে করো শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর ছাঁদ

তুমি রইবে চুপটি করে, অন্যে করবে সিংহনাদ!

তারপর? সোনার না হোক—ননীর দেহ পুড়বে চিতার আগুনে। তারপর তোমাকে — আমাকে—সকলকেই হতে হবে অশরীরী। কাজেই শরীরটা বজায় থাকতে থাকতেই অশরীরীদের রহস্য একটু ভাল করে বোঝবার চেষ্টা করছি।”

— “সাধু! কিন্তু কি বুঝছ?”

—“বুঝছি অনেক কিছুই। তবে একটা বড় কথা এই যে, শরীর নষ্ট হলে আত্মা অশরীরী হয় বটে, কিন্তু দরকার হলে সে আবার অস্থায়ীভাবে শরীর ধারণ করতে পারে।” — “এইসব রাবিশে তুমি বিশ্বাস কর?”

—“বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি ভাই!” হেমন্ত একখানা মস্ত বড় বই টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে কতগুলো সচিত্র পাতা উল্টে বললে, “এগুলো কি দেখছ?” — “ছবি।”

—“ছবি বটে, কিন্তু ফোটোগ্রাফ। প্রেতাত্মাদের ফোটো।”

— “জাল!”

হেমন্ত চেয়ারের উপরে সোজা হয়ে উঠে বসল। রীতিমতো ক্রুদ্ধস্বরে বললে, “জাল?

তুমি কি বিচার করে এ কথা বলছ? প্রেততত্ত্বের কী জান তুমি?”

—“কিছু না ভাই, কিছু না! জানতে চেও না। প্রেততত্ত্বে আমার বিশ্বাস নেই।” — তুমি খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাস কর?”

– “না।”

—“তুমি খ্রিস্টধর্মকে জাল মনে কর?”

– “না।”

—“কেন? তুমি তো খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাস কর না?”

—“বিশ্বাস না করা এক কথা, জাল বলা আর এক কথা। খ্রিস্টধর্মের ভালমন্দ জানি না বলেই বিশ্বাস করি না।”

—“তবে প্রেততত্ত্বে তোমার বিশ্বাস নেই বলে এই ফোটোগুলোকে জাল বললে কেন?”

রবীন অপ্রস্তুত হয়ে চুপ করে রইল।

হেমন্ত বললে, “স্যর উইলিয়ম ক্রুকস, স্যর অলিভার লজ, স্যর কন্যান ডইল, ওয়ালেস, ফ্লামেরিয়ন আর স্টেড প্রমুখ পৃথিবীবিখ্যাত বৈজ্ঞানিক, রাসায়নিক, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক আর লেখকদের মতো পণ্ডিত লোকেরাও পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রেততত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করলে বুদ্ধি বা বিদ্যা কিছুরই পরিচয় দেওয়া হয় না। যা জান না, তাকে অবহেলা কোরো না। ও বাহাদুরি নয়, ও মূর্খতা।”

— “আমার দু’ অক্ষরে একটিমাত্র কথার ওপরে তোমার অসংখ্য অক্ষরের এত বড় বক্তৃতা হচ্ছে, সানকির ওপরে বজ্রাঘাতের মতো। বেশ ভাই, অপরাধ হয়েছে, ক্ষমা করো। ....কিন্তু যদি রাগ না কর, একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?”

—“অনায়াসে।”

—“প্রেততত্ত্ব নিয়ে এত গভীর আলোচনা কেন ?”

—“আমিও দেখতে চাই, কত ভাবে কত উপায়ে প্রেতাত্মারা স্থূল শরীর লাভ করতে পারে।”

—“দেখে তোমার লাভ।”

—“জ্ঞান।”

দুজনে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হেমন্ত ধীরে ধীরে বললে, “প্রেততত্ত্ববিদরা আর একটা কথা বলেন, তুমি শুনলে অবাক হয়ে যাবে রবীন।” — “কি কথা?”

“প্রত্যেক ভাব বা মানসিক চিন্তা হচ্ছে বস্তু।”

— বুঝলুম না।”

—“প্রত্যেক ভাব বা মানসিক চিন্তার এক একটা নিজস্ব রূপ আছে। সেইসব রূপকে চোখের সামনে দেখানো যায়।”

—“আরও পরিষ্কার করে বলো। এসব বিষয়ে আমি হচ্ছি শিশুর মতো নির্বোধ। ”

— তোমাকে বোঝাবার জন্যে আমি খুব সহজ একটা উপমা দিচ্ছি। ধর, লক্ষ্মীদেবী। এই দেবীটি হিন্দুর সংসারে নিত্য পূজা পান বটে, কাব্যেও এঁর অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, এঁকে স্বচক্ষে কেউ দেখেছে বলে শুনিনি। প্রেততত্ত্ববিদদের মত মানলে বলতে হয়, লক্ষ্মীদেবীকে স্থূলশরীরে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করা যায়।”

—“কি বলছ হেমন্ত!”

— লক্ষ্মীদেবীর একটি চিন্তার বা ভাবের প্রতিমা প্রত্যেক হিন্দুর মনেই বিরাজ করে। মানস চক্ষে সেই ভাবপ্রতিমা দেখে ভক্ত করে পূজা, কবি আঁকে শব্দছবি, শিল্পী গড়ে মূর্তি। ভক্তি বা শিল্পের রাজ্যে বাস্তবতা নেই—যথার্থ জীবন নেই। কিন্তু প্রেততত্ত্ববিদরা বলেন, আমরা ইচ্ছা করলে গভীর ধ্যান বা ইচ্ছাশক্তির দ্বারা লক্ষ্মীদেবীকে শরীরিণী আর জীবন্ত করে তুলতে পারি। তিনি তখন কথা কইবেন, চলে বেড়াবেন, আমাদের স্পর্শ করবেন ! ”

—“রক্ষে কর ভাই, এসব কথা আমার মাথায় ঢুকছে না।”

—“কেন ঢুকবে না, পাঁকেও ফোটে পদ্মফুল।”

—“তার মানে, তুমি বলতে চাও আমার মাথাটি গোবর ভরা ?”

— “যা বোঝো তাই।...রবীন, পাশ্চাত্য প্রেততত্ত্ববিদদের কথা ছেড়ে দাও, আমাদের শাস্ত্রকারদেরও কি এই মত নয় যে, সিদ্ধসাধকরা ধ্যানশক্তির দ্বারা মানসিক দেব-দেবতার মূর্তিকে বাইরের স্থূলচক্ষে জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পান? তা যদি তাঁরা দেখতে না পেতেন, শ্রীচৈতন্য প্রভৃতি শত শত মহাজ্ঞানী সাধক যুগে যুগে কিসের পিছনে ছুটে নিজেদের সারাজীবন কাটিয়ে দিয়ে গিয়েছেন? আমার দৃঢ়বিশ্বাস, নাটোরের মহারাজা রামকৃষ্ণ, সাধক রামপ্রসাদ, একালের রামকৃষ্ণ পরমহংস প্রভৃতি বাইরের পৃথিবীতেই স্বচক্ষে জীবন্ত কালীদেবীকে দর্শন করেছেন!”

রবীন নাচারভাবে বললে, “তোমার কথার প্রতিবাদ করতে চাই না। কিন্তু যখন আমরা সাধক নই—কখনও হতেও পারব বলে মনে হয় না, তখন ওসব অজানা ব্যাপার নিয়ে তর্ক করবারও দরকার নেই। তুমি বললে, আমি শুনলুম—ব্যস, ফুরিয়ে গেল!”

—“ফুরিয়ে যায় না ভাই, ফুরিয়ে যায় না! অজানাকে জানবার চেষ্টাই হচ্ছে মানুষের প্রধান ধর্ম। অজানাকে জানবার চেষ্টা না করলে মানুষ আজ সভ্য হত না ৷” মধু বেয়ারা ঘরে ঢুকে বললে, “একটি বাবু ডাকছেন।”

—“কেন? কি নাম?”

—“কেন তা জানি না, তবে নাম বললেন, শক্তিপদ মজুমদার।”

এক লাফে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে হেমন্ত বললে, “শক্তিপদ? যা, যা, এখানে ডেকে আন্!”

রবীন বললে, “শক্তিপদবাবুকে ধন্যবাদ! প্রেততত্ত্বের কবল থেকে নিস্তার পেলুম ! ”

ভয়াবহ মৃত্যুদূত

ঘরের মধ্যে যে লোকটি প্রবেশ করলে তার বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। রং শ্যাম, দেহ দোহারা, মাথায় কাঁচা পাকা চুল, পরনে চাদর, পাঞ্জাবি, কাপড়, ক্যাম্বিসের জুতো। চেহারায় উল্লেখযোগ্য কিছু নেই, দশজনের ভিড়ে হারিয়ে যায় অনায়াসেই। কিন্তু তার হাতের লাঠিগাছা উল্লেখযোগ্য, এত মোটা লাঠি নিয়ে ভদ্রলোকেরা পথে বেরোয় না। হেমন্ত তার হাতের লাঠির দিকে চোখ রেখে বললে, “আপনিই শক্তিপদবাবু?”

— আজ্ঞে হ্যাঁ। হেমন্তবাবু কার নাম?”

— আমার।”

– “কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন আপনি?”

– “আজ্ঞে হ্যাঁ। বসুন। লাঠিগাছা দিন—ঘরের কোণে রেখে দিই।” শক্তিপদ ইতস্তত করলে।

হেমন্ত মুখ টিপে হেসে বললে, “ভয় নেই, এখানে আপনার আত্মরক্ষা করবার দরকার হবে না। শক্তিবাবু, কার ভয়ে আপনি অত বড় গুপ্তি নিয়ে পথে বেরিয়েছেন?” শক্তিপদ প্রথমে চমকে উঠল। একটু চুপ করে থেকে মৃদুস্বরে বললে, “দিনকাল ভাল নয়, রাস্তার আলো থাকে না। ফিরতে হয়ত সন্ধ্যে উৎরে যাবে। তাই—”

—“বুঝেছি। কিন্তু শক্তিবাবু, যাদের ভয়ে আপনি অস্ত্রধারণ করেছেন, ওই গুপ্তি দিয়ে তাদের ঠেকাতে পারবেন কি?”

শক্তিপদর মুখে ফুটল অতি করুণ ভাব। আস্তে আস্তে বললে, “আপনি কে?”

—“আপনার বন্ধু।”

—“কিন্তু আপনাকে তো আমি চিনি না।”

— আমিও আপনাকে চিনি না, তবু আপনার গুপ্তকথা জানি।”

—“জানেন?” কি করে জানলেন? একথা জানতেন শুধু আমার দুই বন্ধু।”

—“যদি বলি তাঁদের কারুর কাছ থেকেই আপনার কথা আমি জানতে পেরেছি?”

—“অসম্ভব।”

— এক্ষেত্রে অসম্ভবও সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আপনার সব কথা এখনও আমি জানতে পারিনি—যা শোনবার জন্যে আপনাকে এখানে আমন্ত্রণ করেছি। আমাকে যদি বিশ্বাস না করেন। তাহলে খুব শীঘ্রই আপনাকেও অবনীবাবু আর বিধুবাবুর অনুসরণ করতে হবে।” শক্তিপদ শিউরে উঠল! বললে “আমাকে রক্ষা করবার শক্তি যে আপনার আছে, এ কথা কেমন করে বিশ্বাস করব?”

—“বিশ্বাস করা, না করা আপনার হাত। তবে সন্ন্যাসীদের ষড়যন্ত্র থেকে আমিও যদি আপনাকে বাঁচাতে না পারি, তাহলে কলকাতায় আর কেউ বাঁচাতে পারবে বলে মনে হয় না।” বিপুল বিস্ময়ে দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে শক্তিপদ বললে, “সন্ন্যাসীদের কথাও আপনি জানেন ?”

—“আপনার নরবলিভক্ত গুরুজীরও পরিচয় জানতে আমার বাকি নেই।”

শক্তিপদ আর ইতস্তত করলে না, একেবারে দাঁড়িয়ে উঠে দুই হাতে হেমন্তের দুই হাত চেপে ধরে আকুলকণ্ঠে বললে, “তাহলে আমাকে রক্ষা করুন!”

—“সেইজন্যেই আপনাকে ডেকেছি। কিছু না লুকিয়ে সমস্ত কথা আমাকে খুলে বলুন। কোনও ভাবনা নেই। আমি সত্যই আপনার বন্ধু।”

ইতিমধ্যে সতীশবাবুও এসে হাজির হলেন। শক্তিপদর পরিচয় পেয়ে একখানা আসন গ্রহণ করে কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

শক্তিপদ চেয়ারের উপরে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর বলতে আরম্ভ করলে :

—“অবনী, বিধু আর আমি—তিনজনেই বন্ধু। আমাদের তিনজনের রুচি আর প্রকৃতি প্রায় একরকম বলে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কও হয়ে উঠেছিল বেশি ঘনিষ্ঠ। আমাদের ভিতরে অবনী ছিল সবচেয়ে ধনবান। বিধুর আর আমার অর্থভাণ্ডার অফুরন্ত না হলেও ভাল ভাবে সংসার চালিয়ে অপব্যয় করবার ক্ষমতা আমাদেরও ছিল যথেষ্ট।

কিন্তু সাধারণ বিলাসী ধনীর মতো আমরা অর্থের অপব্যয় করতুম না। ছেলেবেলা থেকেই আমাদের তিনজনের ধর্মকর্ম আর সাধু-সন্ন্যাসীদের দিকে প্রাণের টান ছিল অত্যন্ত। সৎগুরুর সন্ধান করবার জন্যে আমরা প্রায়ই দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়তুম। তীর্থক্ষেত্রে সাধুদের ভিড় হয় বলে আমরা ভারতের তীর্থে তীর্থে ঘুরে এসেছি বারংবার।

প্রায় পাঁচ বছর আগে বিন্ধ্যাচলে একজটা স্বামী নামে এক বামাচারী তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। বিপুল দেহ, দীপ্ত চক্ষু, বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর। তিনি বাক্যসংযমে অভ্যস্ত— প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় মিনিট কয়েকের জন্যে দু'চারটি মাত্র বাক্যব্যয় করেন। তাঁর মধ্যে এতটুকু শান্তভাব ছিল না, অত্যন্ত রুক্ষ মেজাজ—দেখলে ভক্তির চেয়ে ভয় হয় বেশি।

সকলেরই মুখে শুনলুম, তিনি সিদ্ধপুরুষ, শবসাধনা করেছেন, শ্মশানকালীর বর পেয়েছেন, জলে-স্থলে-শূন্যে তাঁর অবাধ গতি। তাঁর এমন কয়েকটি কার্যকলাপও দেখবার সুযোগ পেলুম, সত্যসত্যই যা অলৌকিক বলে বিশ্বাস হল।

তাঁর শিষ্যের সংখ্যা হয় না। কি এক মর্মভেদী দৃষ্টির আকর্ষণে আমরা তিনজনেও তাঁর বশীভূত হয়ে শিষ্যের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ফেললুম।

তারপর প্রতি বৎসরেই তিন চারবার করে আমরা তাঁর পায়ের ধুলো নিতে গিয়েছি। ভারতের কয়েকটি তীর্থক্ষেত্রে অজস্র অর্থব্যয় করে গুরুদেবের জন্যে নূতন নূতন আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছি। প্রণামীর জন্যেও তাঁর পায়ে যে কত টাকা ঢেলেছি, সে কথা ভাবলেও আজ দুঃখ হয়। গুরুদেবের আদেশ বহন করে বারংবার দলে দলে গুরুভাই সন্ন্যাসীরা বেশ কিছুকালের জন্যে আমাদের বাড়িতে এসে অতিথি হয়ে রাজভোগ লাভ করে গিয়েছে। গুরুদেবের কাছ থেকে বিনিময়ে পেয়েছি কেবল শূন্য আশীর্বাদ। এ কথাও বলে রাখা ভাল, মাঝে মাঝে গুরুদেব সম্বন্ধে এমন সব ভাসা ভাসা কথা শুনেছি, যা কদর্য। কিন্তু সে সব আমরা দুষ্ট লোকের মিথ্যা রটনা বলে উড়িয়ে দিয়েছি। কী মোহটানে বাঁধা পড়েছিলুম, কিছুতেই আমাদের গুরুভক্তি কমেনি।

আমরা শেষবার গুরুদেবের দর্শন করতে যাই মাসখানেক আগে।

গুরুদেব আমাদের দেখে বললেন, “বৎস, তোমরা এসেছ, ভাল করেছ। আমি এমন এক স্বপ্নাদেশ পেয়েছি যা পালন করতে গেলে তোমাদের সাহায্যের দরকার হবে।' অবনী বললে, ‘আমরা পতঙ্গের মতো তুচ্ছ। আপনার মতো মহাপুরুষকে আমরা কি সাহায্য করতে পারি?'

বলছি, গুরুদেব ছিলেন স্বল্পবাক আর কোনওরকম গৌরচন্দ্রিকা না করে তিনি বললেন, ‘আজ তিনরাত্রি ধরে মহাকালী স্বপ্নে আমাকে আদেশ দিয়েছেন'—

এইখানে হেমন্ত বাধা দিয়ে বললে, “শক্তিপদবাবু, একজটা স্বামী স্বপ্নে কি আদেশ পেয়েছেন তা আমি জানি। আপনারা তিনজনে যে তাঁর অনুরোধে বলির পশু অর্থাৎ মানুষ সংগ্রহে রাজি হননি, উল্টে পুলিসে খবর দেবার ভয় দেখিয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন, তাও আমার অজানা নেই! একজটা স্বামীও যোগবলে আপনাদের সর্বনাশ করবেন বলেছেন, কেমন এই তো? তারপরের কথা বলুন—যা আমি জানি না !

শক্তিপদ খানিকক্ষণ অবাক হয়ে হেমন্তের মুখের পানে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর বললে, “এত কথা আপনি জানেন? আশ্চর্য! কিন্তু এরও পরে তো আর বেশি কিছু বলবার নেই!”

—“আছে বৈকি! একজটা স্বামী কি স্বপ্নাদেশ পালন করতে—অর্থাৎ নরবলি দিতে আরম্ভ করেছেন?”

— না। তাহলে আমরাও পুলিসে খবর দিতুম। আসছে কালীপুজোর রাত্রে তাঁর প্রথম নরবলি দেবার কথা।”

—“বেশ। এইবারে কলকাতার এই হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে আপনার মতামত জানতেচাই।”

—“অবনী আর বিধু কেমন করে মারা পড়েছে, তা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।কেবল খবরের কাগজে আমি দুই শোচনীয় হত্যাকাণ্ডের কথা পাঠ করেছি। তবে একটা বিষয়ে আমার খটকা লেগেছে আর নিজের জন্য যথেষ্ট ভয়ও হয়েছে।” – “কি রকম?”

—“গুরুদেব আমাদের সর্বনাশ করবেন বলেছিলেন, সে কথা আমি ভুলিনি। আমার সন্দেহ হচ্ছে, এই দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হয়তো গুরুদেব কিংবা তাঁর শিষ্যদের কোনও যোগাযোগ আছে।”

— আপনার এ রকম সন্দেহের কারণ?”

—“কারণ, গুরুদেবের শিষ্যরা কলকাতায় এসে হাজির হয়েছে।”

—“তাই নাকি? আপনার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে?”

—“না। মাঝে আমি দিন চারেকের জন্যে কলকাতার বাইরে গিয়েছিলুম। ফিরে এসে বাড়ির লোকের মুখে শুনলুম, একদল সন্ন্যাসী আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, আমি কলকাতায় নেই শুনে চলে গিয়েছে।”

—“কি করে জানলেন তারাই আপনার গুরুভাই ?”

—“কারণ, গুরুদেবের শিষ্যরা ছাড়া দল বেঁধে আর কারা আমার বাড়িতে আসবে?”

—“সেটা কোন তারিখে?”

—“ঠিক তার পরের দিনেই অবনী আর সিধু মারা পড়েছে।”

হেমন্ত খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর বললে, “শক্তিপদবাবু, সন্ন্যাসীরা কেন এসেছিল জানেন ?”

—“ঠিক জানি না।”

—“তারা জানতে এসেছিল, নরবলি সম্বন্ধে আপনি মত পরিবর্তন করেছেন কিনা?” — তাদের সঙ্গে দেখা হলে বলতুম—না, আমি মত পরিবর্তন করিনি।”

— তাহলে পরের দিন আপনাকেও পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হত।”

—“কী বলছেন আপনি ?”

—“হ্যাঁ, এই আমার অনুমান। জানেন শক্তিপদবাবু, ঠিক ওই দিনে সন্ন্যাসীরা অবনীবাবুর বাড়িতেও গিয়েছিল?”

—“তাই নাকি? কেন?”

“এ খবরও পেয়েছি, অবনীবাবুর সঙ্গে কোনও কারণে তাদের ঝগড়া হয়, তারা খাপ্পা হয়ে চলে যায়। আমার অনুমান, নরবলি সম্বন্ধে অবনীবাবু মত পরিবর্তন করেননি বলেই সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর বিবাদ হয়। আমার বিশ্বাস, তারপর তারা গিয়েছিল বিধুবাবুর বাড়িতে, আর সেখানেও তারা মনের মতন উত্তর পায়নি। ফল—পরদিনেই অবনী আর বিধবাবুর মৃত্যু!”

—“কি ভয়ানক!”

—“আপনি যে তারিখ বললেন তাইতেই বোঝা যাচ্ছে, সন্ন্যাসীরা ওই দিনেই আপনারও বাড়িতে গিয়েছিল। আপনিও যদি তাদের বিপক্ষতা করতেন, পরদিন তাহলে অবনী আর বিধুবাবুর সঙ্গে আপনাকেও পরলোকে প্রস্থান করতে হত। কিন্তু আপনি যে এখনও সশরীরে আমাদের সামনে বিদ্যমান আছেন, তার কারণ হচ্ছে প্রথমত, সন্ন্যাসীরা আপনার মত জানতে পারেনি; দ্বিতীয়ত, তারা খবর পেয়েছিল, আপনি তাদের নাগালের—অর্থাৎ কলকাতার বাইরে চলে গিয়েছেন।”

বিষম আতঙ্কে দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে শক্তিপদ বললে, “বলেন কি হেমন্তবাবু! এতক্ষণ পরে আমি আপনার বিজ্ঞাপনের অর্থ বুঝতে পারলুম।”

— “যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে, কিন্তু এইবারে আমরা সাবধান হব। একজটা স্বামী যোগবলে আপনাদের সর্বনাশ করবেন বলেছিলেন, এ কথার অর্থ কি?”

– “জানি না। গুরুদেবের কিছু কিছু অলৌকিক শক্তি দেখে বিস্মিত হয়েছি। কিন্তু এটাও জানা কথা যে, অনেক সময়ে ম্যাজিককেও অলৌকিক ব্যাপার বলে ভ্রম হয়!” — সন্ন্যাসীদের কলকাতায় আস্তানা কোথায়?”

“গড়িয়াহাটা থেকে খানিক তফাতে জঙ্গলের ভেতরে একটি পুরনো ভাঙা কালীমন্দির আছে। একজটা স্বামীর অনেক চ্যালা সেইখানে এসে থাকেন। কলকাতায় সন্ন্যাসীদের আর কোনও আস্তানা আছে বলে জানি না।”

—“আচ্ছা, সে খোঁজ আমরা নেব। কালি-কলম নিয়ে বসুন দেখি! আমার কথামতো আপনাকে একখানি চিঠি লিখতে হবে।”

শক্তিপদ বিস্মিত চোখে হেমন্তের মুখের পানে তাকালে। কিন্তু কোনও প্রতিবাদ না করে কালি-কলম নিয়ে বসল।

হেমন্তের কথামতো যে পত্রখানা লেখা হল, তা হচ্ছে এই :

শ্রীশ্রীএকজটা স্বামীজি সমীপেষু,

প্ৰভু,

আমি যখন কলিকাতায় ছিলাম না, তখন আপনার কয়েকজন শিষ্য আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন। ইহার কারণ কি জানিনা। এখন আমি কলিকাতায় ফিরিয়া আসিয়াছি। আপনার কোনও আদেশ থাকিলে অনুগ্রহ করিয়া জানাইলে বাধিত হইব।

প্রভুর চরণে আর একটি নিবেদন করিতেছি। মহাকালীর স্বপ্নাদেশ মানিবার ইচ্ছা আমার নাই। আপনার অভিপ্রায়ের কথাও শীঘ্রই পুলিসকে জানাইতে চাই। ইতি

সেবক—শ্রীশক্তিপদ মজুমদার

হেমন্ত উৎসাহিতভাবে বললে, “সন্ন্যাসীরা যদি গড়িয়াহাটার কাছে থাকে, চিঠিখানা কাল বৈকালের মধ্যেই পাবে।”

সতীশবাবু এতক্ষণ পরে মুখ খুলে বললেন, “তারপর?”

“তারপর? অবনী আর বিধবাবুর বাড়িতে রাত্রে যে বা যারা হানা দিয়েছিল, শক্তিপদবাবুর বাড়িতেও তার বা তাদের আসবার সম্ভাবনা আছে—অবশ্য, এ ব্যাপারের সঙ্গে সত্যই যদি সন্ন্যাসীদের কোনও যোগাযোগ থাকে!”

শক্তিপদ শিউরে উঠে বললে, “কি সর্বনাশ! আপনি কি আমাকেও যমালয়ে পাঠাতে চান?”

— “মোটেই নয়, যম-দ্বার থেকে আপনাকে ফিরিয়ে আনতে চাই। কাল আপনাকে সপরিবারে আমার আতিথ্য স্বীকার করতে হবে।”

—“আমাকে? সপরিবারে ?”

—“হ্যাঁ মশাই, হ্যাঁ। কাল সন্ধ্যার আগেই আপনি সপরিবারে আমার বাড়িতে এসে রাত্রি যাপন করবেন। আপনার বাড়ির ভার নেব আমরা।”

সতীশবাবু বললেন, “সুন্দর ফন্দি! কিন্তু এত সহজ চালে আমরা কি কিস্তিমাত করতে পারব?”

— “অনেক সময়ে বোড়ের চালেই দাবা মরে। সতীশবাবু, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ মামলাটার মধ্যে এমন কোনও অদ্ভুত, অজানা রহস্য আছে, যা সাধারণ গোয়েন্দার ধারণার বাইরে। তাই সম্পূর্ণ নূতন দিক দিয়ে এই মামলাটাকে দেখবার চেষ্টা করছি। শেষ পর্যন্ত যদিও-বা রহস্য ভেদ করতে পারি, আসামীদের আইনের কবলে আনতে পারব কিনা সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”

— হত্যাকারীকে জানতে পারলেও ?”

—“হত্যাকারীকে জানতে পারলেও। যথার্থ আসামী হয়তো হত্যাকারী নয়।”

—“তাহলে সে কি কোনও দূতকে পাঠায়?”

— ধরুন তাই। কিন্তু এ হচ্ছে এমন ভয়াবহ মৃত্যুদূত, কোনও কারাগারের পাথরের দেওয়ালও তাকে ধরে রাখতে পারবে না। অন্তত আমি সেই সন্দেহ করছি। আমার সন্দেহ মিথ্যা হতেও পারে।”

সতীশবাবু হতাশভাবে বললেন, “মশাই, আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।আপনার সঙ্গে আজ আমার প্রথম পরিচয় নয়, নইলে আপনাকে আমি পাগল বলে মনে করতুম। যাক ও কথা। এখন আমাদের কি করতে হবে বলুন।”

—“আমি, আপনি আর রবীন, আমাদের দল হবে কেবল এই তিনজনকে নিয়ে। আমরা আশ্রয় নেব শক্তিপদবাবুর বাড়ির আশেপাশে কোথাও।”

—“আর, ভূপতি?”

- “ঠিক বলেছেন, এ মামলার ভার পেয়েছেন ভূপতিবাবু। তাঁকে দলে না নিলে তিনি আবার অভিমান করতে পারেন!”

—“আমাদের সঙ্গে জনকয় পাহারাওয়ালা নিলে ভাল হয় না? হত্যাকারীর যে অমানুষিক শক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে – ”

— তার কাছে লালপাগড়িদের সব জারিজুরি ব্যর্থ হওয়াই সম্ভব। তবু ইচ্ছা যদি করেন তাদের নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু তাদের তফাতে লুকিয়ে রাখবেন আর বলে দেবেন যে, সঙ্কেত-বাঁশি না বাজালে তারা যেন কিছুতেই আত্মপ্রকাশ না করে।”

শক্তিপদর মুখ তখন মড়ার মতো সাদা হয়ে গেছে। তাকে উৎসাহ দেবার জন্যে সতীশবাবু বললেন, “আপনার কোনও ভয় নেই মশাই! আপনি এখানে নিরাপদেই থাকবেন, কারণ, হত্যাকারীরা এ ঠিকানা জানে না। আপনার বিপদের ভার গ্রহণ করব আমরাই।”

ভূপতির ক্ষুধা সর্বদাই জাগ্ৰত

শক্তিপদর বাড়ির সদর দরজায় ঢুকতে গেলে ছোট্ট একটি জমি পার হতে হয়। জমির উপরে দু'টি গাছ আছে—একটি জাম, আর একটি কাঁঠাল গাছ। সেই দুই গাছের মাঝখান দিয়ে পথ।

জমির এপারে রাজপথ। তারও এপাশে একখানা প্রায় সম্পূর্ণ তিনতলা বাড়ি, এখনও তার ভিতরে-বাহিরে বালির কাজ আরম্ভ হয়নি—বাড়ির নিচে থেকে উপর পর্যন্ত মিস্ত্রীদের বাঁশের ভারা বাঁধা। স্থির হয়েছে, এই বাড়ির দোতলার একখানা ঘরের ভিতরে আশ্রয় নেবে হেমন্ত ও তার সঙ্গীরা।

যাদের অভ্যর্থনার জন্যে আজ তাদের এখানে আগমন, ব্ল্যাক আউট ও রাতের আঁধারে গা ঢেকে কখন যে তারা শক্তিপদর বাড়ির সদর দরজার সামনে গিয়ে সাংঘাতিক অভিনয় আরম্ভ করবে, কেউ তা বুঝতে পারবে না। যথাসময়ে তাদের উপস্থিতি আবিষ্কারের জন্যে হেমন্ত এক সহজ, কিন্তু ফলপ্রদ কৌশল অবলম্বন করলে। সন্ধ্যার পরেই কুলিদের দ্বারা ছোট্ট জমিটুকুর উপরে প্রায় একহাত পুরু করে বিছিয়ে রাখলে রাশি রাশি শুকনো পাতা! যে কেহ আসুক, মড়মড় ধ্বনি না জাগিয়ে নিঃশব্দে বাড়ির দরজার কাছে গিয়ে পৌঁছতে পারবে না। সতীশবাবু বললেন, “ছোট ছোট ব্যাপারে আপনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে মুগ্ধ হতে হয়! আজ এখানে পাহারাওয়ালার কাজ করবে শুকনো ঝরাপাতারা! চমৎকার!”

এমন সময়ে মোটা ভুঁড়ি নিয়ে হাঁসফাস করতে করতে ভূপতির আবির্ভাব। তিনি এসে ঘনায়মান অন্ধকার ভেদ করে চারিদিকটা দেখবার চেষ্টা করে ভুরু কুঁচকে বললেন, “পাহারাওয়ালারা কোথায়? তাদের সাড়া পাচ্ছি না বড় যে?”

সতীশবাবু বললেন, “তারা তফাতে লুকিয়ে আছে।”

—“তফাতে? তারা কাছে থাকলেই ভাল হত না?”

হেমন্ত বললে, “না। হত্যাকারীর পথ আমি খোলা রাখতে চাই।... কেবল তাই নয়, আমি পাহারাওয়ালাদের প্রাণরক্ষা করতে চাই।” – “মানে?”

—“হত্যাকারীর প্রকৃতি কিছু কিছু আপনারও তো জানা আছে! তারপরেও মানে’ জানতে চাইবেন না।”

—“চাইব না কি রকম? আমাদের প্রাণের বুঝি কোনও দাম নেই?”

সতীশবাবু বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, “থামো ভূপতি, বাজে বোকো না! তোমাকে জবাই করবার জন্যে এখানে আনা হয়নি। আমরা থাকব ওই বাড়ির দোতলায়। এসো!” সকলে সেই প্রায় সম্পূর্ণ বাড়ির দোতলায় গিয়ে উঠলেন। নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে দেখা গেল, এককোণে জ্বলছে একটা হ্যারিকেন লণ্ঠন।

ভূপতি খুঁতখুঁত করতে লাগলেন!—“মোটে একটা টিমটিমে হারিকেন! এর মানেই হয় না !”

হেমন্ত বললে, “একটু পরে এও নিবিয়ে দেওয়া হবে।”

— ও বাবা! মানে!”

— বলেন তো হত্যাকারীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে চার পাঁচটা লণ্ঠনও আনতে পারি।” — থাক মশাই, অতটা উপকার নাই-বা করলেন! আমার অন্ধকারই ভাল।”

ঘরটা বেশ বড়সড়। রাস্তার দিকে ছয়টা জানলা। কোনও জানলাতেই গরাদে নেই। তাদের ভিতর দিয়ে চোখ চালালে শক্তিপদর বাড়িটা আঁধারে ছায়া ছায়া দেখা যায়। ভূপতি বললেন, “ঘরের কোণে ওটা আবার কি?”

হেমন্ত বললে, “ক্যামেরা।”

—“জানিনে বাপু, আপনার সবই যেন কেমনধারা! আমরা কি জন্যে এখানে এসেছি, শুনি? ছবি তুলতে, না খুনি ধরতে?”

—“হয়তো খুনিকে আমরা ধরতে পারব না!”

— মানে?”

—“হয়তো খুনিকে ধরবার শক্তি আমাদের হবে না—ধরবার আগেই সে অদৃশ্য হবে !” – “মানে?”

—“ভাবচি যদি পারি, তার একখানা ফোটো তুলে রাখব।”

—“এই অন্ধকারে?”

—“ফোটো উঠবে ফ্ল্যাশ-লাইটে।”

—“জানিনে বাপু!”

— আপনার কিছু জানবার দরকার নেই। আমাদের জানবার কথা হচ্ছে, আপনার ক্ষিদে- টিদে পেয়েছে কি?”

ভূপতির দুই চক্ষু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, “আজকালকার ছেলেদের মতো আমি ডিসপেপটিক নই। আমার ক্ষিদে সর্বদাই জাগ্রত।”

—“তাহলে ডানহাত বার করুন। এ কাজটা সময় থাকতে সেরে নেওয়া যাক।”

ভূপতি একগাল হেসে বললেন, “ভারি সমজদার মানুষ আপনি! এইখানে আপনার সঙ্গে আমার ভারি মেলে। পেটে খেলে, পিঠে সয়। কিন্তু এসে পড়েছি বেমক্কা জায়গায়, খাবারের ফর্দ নিশ্চয়ই খুব ছোট?”

—“নিশ্চয়ই বড় নয়। ফিস স্যালাড, চিকেন ওমলেট, চিকেন রোস্ট, কিমা কারি আর কাশ্মিরী পোলাও!”

—“বলেন কি, বলেন কি! এই মরুভূমিতে এ যে রীতিমতো সরস ভোজ! কই, কই দু’একখানা ডিশ ধীরে ধীরে ছুড়ে মারুন না!”

আহারাদি সমাপ্ত। খানিকক্ষণ হত্যাকারী সম্বন্ধে আলোচনা চলল। ভূপতি যতই শোনেন, ততই মুষড়ে পড়েন। মাঝে মাঝে খাবারের শূন্য পাত্রগুলোর দিকে করুণ চক্ষে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

হঠাৎ হাতঘড়ির দিকে চেয়ে রবীন বললে, “হেমন্ত, রাত এগারটা।”

— তাহলে আলো নেবাও।”

ঘর অন্ধকার–বাইরেও চোখ প্রায় অচল। কেবল আকাশে জেগে আছে আলোকের ম্লান স্মৃতি মাত্ৰ ৷

ভূপতি সকলের অগোচরে চুরি করে একটু ঘুমিয়ে নেবার জন্যে দেওয়ালে ঠেস দিলেন। তিনি হেমন্ত ও রবীনের জন্যে নির্দিষ্ট চিকেন রোস্ট আর ফিস স্যালাড পর্যন্ত নিজের পাতে টেনে নিয়েছেন। আর কাশ্মীরী পোলাও এত বেশি পেটে ঠেসেছেন যে সকলেরই ভাগে কম পড়ে গিয়েছিল। এর পরে মানুষের আর সজাগ হয়ে থাকা অসম্ভব।... সতীশবাবু মৃদুস্বরে হেমন্ত ও রবীনের সঙ্গে কথা কইতে লাগলেন। ...

রাত বারটা। ইতিমধ্যে গ্যাসের ক্ষীণ শিখাগুলো একেবারে নিবিয়ে দিয়ে গেল—পুরো ব্ল্যাক আউট! রাজপথে নেই জনপ্রাণীর পদশব্দ। অন্ধকার আর অন্ধকার! রাস্তার ধারের বাড়িগুলো যেন অধিকতর নিবিড় অন্ধকারের নিরেট প্রাচীর।

কী স্তব্ধতা—যেন শরীরী, যেন চেষ্টা করলে তাকে দু'হাত দিয়ে চেপে ধরা যায়, যেন হিংস জন্তুর মতো সে বুকের উপরে বসে দম বন্ধ করে দিতে পারে।

সেই নিরবচ্ছিন্ন স্তব্ধতার অদৃশ্য অন্তঃপুরে বসে নিশীথিনী যেন একটানা গান গেয়ে চলেছে ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম !

যারা প্রাণের কানে শুনতে পায়, তারাই বোঝে সেই মৃত্যুসঙ্গীতের অর্থ কি !

কিন্তু সেই ভয়ভরা মনদমানো স্তব্ধতাকেও যেন অস্থির করে তুলেছে, ভূপতির বিস্ময়কর নাসাযন্ত্রের অবিরাম ঘড়র ঘড়র ঘড়র ঘড়র গর্জন !

মানুষের অতটুকু নাক অত বেশি গর্জন করতে পারে? রবীন বিস্মিতভাবে সেই কথাই ভাবছিল। তারপর সে আর সইতে পারলে না, ভূপতিকে ধাঁ করে এক ধাক্কা মেরে বললে,

“উঠুন ভূপতিবাবু! আপনার নাসিকার বেয়াড়া হুঙ্কার শুনলে খুনি আর এ পাড়া মাড়াবে না !” ভূপতি ধড়ফড় করে উঠে বসে তাড়াতাড়ি রিভলবারে হাত দিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “কি বললে পতিত, সে এসেছে? ভয় নেই, আমার নাক ডাকলেও আমি ভয়ঙ্কর জেগে থাকি।”

সতীশবাবু ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, “চুপ করো ভূপতি, তোমার পতিত এখানে নেই।”

ঊর্ধতন কর্মচারীর কণ্ঠস্বর শুনেই ভূপতি প্রাণপণে সজাগ হয়ে বললেন, “ভুল হয়েছে স্যর, আমিও জানি, পতিতের ছুটি এখনও মঞ্জুর হয়নি—সে গিয়েছে পাজির পা-ঝাড়া একজটা স্বামীর আখড়ার ওপরে কড়া পাহারা দিতে!”

সতীশবাবু বললেন, “দোহাই তোমার, চুপ করো!”

এরপরে নাকডাকানো বা কথা বলা কিছুই চলে না। সুপিরিয়র অফিসারের হুকুম! ভূপতি সত্যসত্যই চুপ!

অন্ধকার—ঘুট ঘুট ঘুট! স্তব্ধতা থম থম থম! রাত গাইছে ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম! কোথাকার একটা প্রকাণ্ড ঘড়ি আচম্বিতে বেরসিকের মতো চেঁচিয়ে উঠল—ঢং! একটা, রাত একটা। আকাশের তারাগুলো হঠাৎ যেন মহা আতঙ্কে সচকিত! তিন চারটে জোনাকি নিবে আর জ্বলে বাজাচ্ছিল আলো-আঁধারের নীরব নূপুর, হঠাৎ তারা এলোমেলো গতিতে উড়ে পালাল কে জানে কোথায়! অন্ধকারও যেন বিপুলদেহ এক আহত গরুড়ের মতো অসহ্য যাতনায় করতে লাগল ছটফট ছটফট! মৃত রাজপথও যেন কোনও বিপুল পদভরে জ্যান্ত হয়ে উঠল!

হেমন্ত ফিস ফিস শব্দে বললে, “সতীশবাবু!”

সতীশবাবু তেমনই স্বরেই বললেন, “শুনেছি!”

ভূপতি সজোরে রবীনের হাত চেপে ধরে শিউরে উঠে বললেন, “বাপরে! কিসের শব্দ?” রবীন বললে, “চুপ!”

ধুড়ুম, ধুড়ুম, ধুড়ুম, ধুড়ুম! ওকি কারুর পদধ্বনি,—না, কম্পিত পৃথিবীর স্তম্ভিত আত্মার উপরে ভেঙে পড়ছে কোনও প্রচণ্ড উপগ্রহ? ও শব্দ আর এক রাত্রে শুনেছে হেমন্ত ও রবীন। আর এক রাত্রে, সেই রক্তাক্ত অসম্ভব রাত্রে!

কোথা থেকে তিন চারটে নিদ্রোত্থিত কুকুরের অতি কাতর, যেন নেতিয়ে পড়া আর্তনাদ ডাকল—ঘেউ ঘেউ ঘেউ !

থেমে গেল ঝিম ঝিম ঝিম ঝিম রাতের কন্ঠস্বর! কেঁদে কেঁদে উঠল যেন স্তব্ধতা, কেঁপে কেঁপে উঠল কাতর অন্ধকার !

মড় মড় মড় মড়—শুকনো পাতাদের অন্তিম আর্তনাদ! কে চলছে তাদের পাণ্ডুর ভঙ্গুর দেহ মাড়িয়ে, মাড়িয়ে, মাড়িয়ে!

দপ করে জ্বলে উঠল ভীষণ তীব্র ফ্ল্যাশ লাইটের অতি ক্ষণিক বিদ্যুৎ দীপ্তি! ছিন্নভিন্ন আঁধার পটে সিকি সেকেন্ডের জন্যে জেগে উঠেই মিলিয়ে গেল কী এক অতিকায় অপচ্ছায়া— তাকে দেখা গেল এবং দেখা গেল না—তাকে বোঝা গেল, কিন্তু বোঝা গেল না! সঙ্গে সঙ্গেই সে কী গগনভেদী চিৎকার! সে কি গর্জন? সে কি আর্তনাদ? সে কি সিংহনাদ? সে কি? সে কি? সে কি ? আবার অতি—অতি—অতি—দ্রুত ধুড়ুম-ধুড়ুম ধুড়ুম-ধুড়ুম শব্দ, – সে কি পদশব্দ, না ভূমিকম্প?.....কিন্তু কে এল, কে গেল ?

বক্তা হেমন্ত

রাত তখনও ফুরোয়নি। বাইরে তখনও দুঃস্বপ্নের মতো অন্ধকার। শহর তখনও ঘুমন্ত কিন্তু হেমন্তের বৈঠকখানার ভিতরটা আলোর আশীর্বাদে আনন্দময়। মাঝখানকার বড় গোল টেবিলটা ঘিরে বসে আছেন সতীশবাবু, ভূপতি, রবীন ও শক্তিপদ। হেমন্ত দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের উপরে দু'হাত রেখে।

হেমন্ত বলছিল, “আমি যা বলি, মন দিয়ে শুনুন। বিশ্বাস না হলেও দয়া করে প্রতিবাদ করবেন না। যে ঘটনাগুলো ঘটে গেল, আমার কথার সঙ্গে মনে মনে সেগুলো মিলিয়ে দেখুন।তাহলে নিজেদের মন থেকেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পাবেন।

প্রথম থেকেই আমার ধারণা হয়েছিল, বর্তমান মামলার সঙ্গে অলৌকিক রহস্যের সম্পর্ক আছে। কেন আমার এমন ধারণা হয়েছিল, তা যুক্তি দিয়ে বোঝাবার দরকার নেই, কারণ, তার প্রমাণ আমরা স্বচক্ষে দেখেছি।

আমি বুঝলুম, যিনি এ মামলার কিনারা করতে চাইবেন, তিনি খালি গোয়েন্দা হলে চলবে না, তাঁকে আরও কিছু হতে হবে। গোয়েন্দার কাজ, সাধারণ অপরাধী ধরা। অলৌকিক রহস্যের মীমাংসা করবার শক্তি তাঁর নেই।

এই মামলার সাধারণ দিকটা খুবই সহজ। যে কোনও নিম্নশ্রেণীর পুলিস কর্মচারীরও সন্দেহ আর দৃষ্টি আকৃষ্ট হত সন্ন্যাসীদের দিকে। তিনি সন্ন্যাসীদেরই অপরাধী বলে সন্দেহ করতেন, কিন্তু তবু তাদের ধরতে বা স্পর্শ করতে পারতেন না। কারণ, তাদের ধরবার প্রমাণ কেবল মাত্র গোয়েন্দাগিরির দ্বারা পাওয়া অসম্ভব! এমন কি, আইনের সাহায্যেও তাদের অপরাধ প্রমাণিত হবে না। আমিও তাদের গ্রেপ্তার করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না, তবে আপনাদের কাছে তাদের অপরাধ যে প্রমাণিত করতে পারব এমন আশা আমার আছে।

প্রথমেই আমি দেখলুম, হাতির মতো বা তার চেয়ে উঁচু কোনও জীব,—যে সিংহের মতো গর্জন করে, যার হাত-পা মানুষের' মতো, অথচ তীক্ষ্ণ আর বৃহৎ নখওয়ালা—এ হচ্ছে কল্পনারও অগোচর। এমন জীব একালে কি সেকালে—অর্থাৎ ইতিহাসপূর্ব দানব-জীবের যুগেও—কখনও সত্যিকার পৃথিবীর মাটির উপরে বিচরণ করেনি। অথচ এমনই একটা উদ্ভট জীবকে আমি খুব অস্পষ্টভাবে স্বচক্ষে দেখেছি। সুদর্শনবাবুও দেখেছেন। রবীন তার স্পর্শ পেয়েছে। আপনারা অন্তত তার আশ্চর্য হাত আর পায়ের ছাপ দেখে বিস্মিত হয়েছেন।

তার আসুরিক—এমন কি অলৌকিক শক্তির প্রমাণ পেয়েছি আমরা সকলেই।

তখন আমার একমাত্র প্রশ্ন হল, বাস্তব জগতে এমন অসম্ভব জীবের আবির্ভাব সম্ভবপর হল কেমন করে? এর সহজ উত্তর এসেছিল, ভূপতিবাবু আর পতিতের মুখ থেকে।—এ হচ্ছে নাকি ভৌতিক কাণ্ড !”

সতীশবাবু আর রবীনের বোধহয় অজানা নেই, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রেই কিছু কিছু আনাগোনা করবার চেষ্টা আমি করি। এ আমার চিরকালের অভ্যাস। আর আমার মত হচ্ছে, প্রত্যেক গোয়েন্দারই এই অভ্যাস থাকা উচিত।

সাধারণ কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে স্পিরিচুয়ালিজম বা প্রেতবিদ্যা নিয়েও আলোচনা করেছি অল্পবিস্তর। কিন্তু কোনও কিম্ভূতকিমাকার প্রেত যে মানুষের হুকুমের দাস হয়ে যেখানে-সেখানে নরহত্যা করে বেড়ায়, প্রেতবিজ্ঞান আজ পর্যন্ত তার দৃষ্টান্ত দেয়নি। সুতরাং ধরে নিলুম, রামা- শ্যামা, যদু-মধু যেসব তথাকথিত কাল্পনিক ভূতের ভয়ে রাত্রে লেপ মুড়ি দিয়ে কেঁপে মরে, আমাদের হত্যাকারী সে শ্রেণীর অন্তর্গত নয়। প্রেততত্ত্ববিদরা চক্রে বসে যেসব দুরাত্মার শরীরী প্রকাশ দেখেছেন, এই হত্যাকারী তাদের দল থেকেও আত্মপ্রকাশ করেনি। মোট কথা, একে প্রেতাত্মাই বলা চলে না।

তবে এ কী? এর অস্তিত্বের চাক্ষুষ প্রমাণ যখন পেয়েছি, একে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়াও চলে না। এ কে?

আবার ভাল করে প্রেতবিদ্যা নিয়ে নাড়াচাড়া আরম্ভ করলুম। হঠাৎ একটি নতুন তথ্য পেলুম। অনেক বিখ্যাত প্রেততত্ত্ববিদের মত হচ্ছে, বিভিন্ন ভাবের আর চিন্তারও বিশেষ বিশেষ রূপ আছে। গভীর ধ্যান বা প্রবল ইচ্ছাশক্তির দ্বারা বিশেষ বিশেষ ভাবরূপকে মূর্তিমান করা যায় ৷

এই কথা প্রসঙ্গেই দু'তিনদিন আগে রবীনকে আমি বলেছিলুম, কালী-তারা-দুর্গা' প্রভৃতি দেবী এক একটি বিশেষ ভাবের বিশেষ মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নন। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা সিদ্ধসাধক, সাধনার দ্বারা তাঁরা অর্জন করেছেন অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি! আর সেই ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে তাঁরা ইষ্টদেবতাদের মানসিক মূর্তিকে চোখের সামনে দেখতে পান জীবন্ত শরীরী রূপে।

ভাবতে লাগলুম, কোনও সাধু যদি শক্তি অর্জন করবার পর সাধনপথচ্যুত হয়ে দুষ্ট অভিপ্রায়ে ভীষণ কোনও হিংস্র ভাবকে জীবন্ত আর মূর্তিমান করতে চান, তাহলে সে চেষ্টাও তো অনায়াসেই সফল হতে পারে!

কথাটা শুনতে অদ্ভুত বটে, কিন্তু অসম্ভব নয়। অলৌকিক শক্তিশালী পাপাচারী বহু কাপালিকের কথা শোনা গিয়েছে। ভাবতে ভাবতে আমার সন্দেহ পরিণত হল দৃঢ়বিশ্বাসে। তারপর বিধুবাবুর ডায়েরির লেখাটুকু পড়ে আমার মন বলে উঠল, ‘এক্ষেত্রেও যখন এক দুরাচার কাপালিকের সন্ধান পাওয়া গেল, তখন সকল সন্দেহ ধুলোর মতো উড়িয়ে দাও ঝোড়ো বাতাসে!’

সূত্র পেলুম—যদিও এ সূত্র আদালতে গ্রাহ্য হবে না। কিন্তু আদালতে প্রমাণিত হয় না বহু সত্যকথাই। আমরা সকলেই হিপনটিজম বা যোগনিদ্রা বা সম্মোহনবিদ্যার শক্তি দেখেছি। তাকে অলৌকিক শক্তি বললেও মিথ্যা হবে না। অপরাধের ক্ষেত্রে বহুবার নিশ্চিন্ত রূপে জানা গিয়েছে, দুষ্ট সম্মোহনকারীর ইচ্ছাশক্তির দ্বারা চালিত হয়ে অনেকে নরহত্যা বা চুরি করেছে, আদালত তবু সম্মোহনবিদ্যাকে সত্য জেনেও সত্য বলে মেনে নেয় না, সম্মোহনকারী শাস্তি পায় না।

আন্দাজ করলুম, পাপী একজটা স্বামী কোনও বিভীষণ ভাবরূপকে ইচ্ছাশক্তির দ্বারা দেহী ও জ্যান্ত করে তুলেছে, আর তার দ্বারাই পথের কাঁটা সরাবার আশ্চর্য চেষ্টা করছে। সে বামাচারী কাপালিক, ধর্মোন্মাদের বশবর্তী হয়ে বারটি নরবলি দিতে চায়, কিন্তু অবনী, বিধু আর শক্তিপদ চান পুলিসে খবর দিয়ে তার এই ভীষণ ব্রত ভঙ্গ করতে। একজটা স্থির করেছে, এই তিনজনকেই বধ করবে। এমন কি, সে নিজের মুখেই বলেছে, এঁদের সর্বনাশ করবে— যোগবলের দ্বারা।

একজটার সম্বন্ধে সন্দেহ রইল না বটে, কিন্তু তবু আমার দুর্ভাবনা কমল না। এক্ষেত্রে কোন বিভীষণকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তার প্রকৃতি আন্দাজ করতে পারি, কিন্তু তার আকৃতি কি? তার আকৃতি তো খালি আন্দাজ করলে চলবে না, গোয়েন্দার কাজে সর্বাগ্রে দরকার, চাক্ষুষ প্রমাণ। নইলে আর সমস্ত আন্দাজি কথাকেই লোকে বলবে, পাগলের আজগুবি প্রলাপ।অনেক ভেবেচিন্তে যে উপায় আবিষ্কার করলুম, আপনারা তা জানেন। বিভীষণ যতই রাত-আঁধারে গা ঢেকে আসুক, ফ্ল্যাশলাইটে ফোটো তুললে তার ভয়াবহ মূর্তিকে অন্তত ক্যামেরার কারাগারে বন্দী করতে পারব—এই হল আমার সিদ্ধান্ত।

আজ সে এসেছিল। আমি তার ছবি তুলেছি—ডেভালপও করেছি। একটু পরেই সকলে স্বচক্ষে দেখতে পাবেন সে কি প্রচণ্ড, ভৈরব মূর্তি!

আজকের অভাবিত কাণ্ড সম্বন্ধে আমার যা ধারণা, তাও বলে রাখি। যাকে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের দৈহিক শক্তি বাধা দিতে পারে না, সেই বিভীষণ আজ হঠাৎ অমন গগনভেদী আর্তনাদ করে পালিয়ে গেল কেন?

প্রেততত্ত্ববিদরা যখন চক্রে’ বসেন, তখন ঘর করে রাখেন অন্ধকার বা প্রায়ান্ধকার। তাঁদের মতে, যে শক্তিকে তাঁরা চোখের সামনে শরীরী দেখতে চান, তার উৎপত্তি হয় ইথারের কম্পন (vibration of ether) থেকে। সাধারণ আলোক সে সইতে পারে না, ফ্ল্যাশ-লাইটের মতো অতি প্রখর আলোকের তো কথাই নেই। এই বিশ্বাস আমারও ছিল বলেই সেই মূর্তিমান মৃত্যুর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে সাহস করেছিলুম।

তারপর শেষ কথা। বাইরে দেখছি, ভোরের আলো ফুটছে। শুনতে পাচ্ছি পাখিদের ঘুম- ভাঙানো গান। এখনই বোধহয় পতিত এসে একজটা স্বামীর আশ্রমের খবর দেবে। সে কোন শ্রেণীর খবর আনবে বলতে পারি না, তবে আমার একটি সন্দেহ হচ্ছে।

আপনারা “Casting the Runes” বলে ব্যাপারটার রহস্য জানেন?..জানেন না? অল্প কথায় বুঝিয়ে দিচ্ছি।

‘রুন’ হচ্ছে ইউরোপের একরকম আদিম ভাষার নাম। এ ভাষা এখন মৃত। কিন্তু মধ্যযুগেও এ ভাষা চলিত না হলেও ইউরোপের যাদুকররা এই ভাষার সাহায্যে নাকি নানারকম রহস্যময় অপকর্ম করত। ‘রুন’ অক্ষরের সাহায্যে বিশেষ বিশেষ মন্ত্র লিখে তারা হয়তো কোনও কাল্পনিক দানবকে জীবন্ত আর মূর্ত করে তুলত। যাদুকরের যে কোনও শত্রুকে সেই দানব বধ করে আসত। দেখছেন, কাল্পনিক ভীষণতাকে মূর্তিমান করবার চেষ্টা আর কাহিনী আছে পৃথিবীর সব দেশেই?

তারপর ‘রুন' মন্ত্রে সঞ্জীবিত দানবের একটা বিশেষত্বের কথাও শুনুন। বিশেষজ্ঞরা তাকে বিফল করবার পদ্ধতিও জানতেন। কিন্তু সে বিফল হলেও তার মৃত্যু ক্ষুধা কমত না। তখন নিজের সৃষ্ট দানবের কবলে পড়ে প্রাণ দিতে হত যাদুকরকেই!

আজ আমাদের বিভীষণ ব্যর্থ হয়েছে। যদিও সে 'রুন' মন্ত্রে সৃষ্ট হয়নি, তবু তার অশান্ত রক্ততৃষ্ণা কেমন করে তৃপ্ত হবে, বুঝতে পারছি না।

আমার দরজায় একখানা গাড়ি দাঁড়ানোর শব্দ হল না? উঠে দেখো তো রবীন, বোধহয় শ্রীমান পতিতপাবন আসছেন রিপোর্ট দাখিল করতে।”

পতিতের রিপোর্ট

হ্যাঁ, পতিতই বটে! কিন্তু কী তার চেহারা! তার চোখ দু'টো উদভ্রান্ত, মুখের ভাব কাঁদো- কাদো, দেহ কাঁপছে থর থর করে। জামাকাপড় ছেঁড়াখোঁড়া, চুল উস্কোখুস্কো।

ভূপতি ব্যস্ত হয়ে বললেন, “পতিত, পতিত, কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে নাকি? তোমার অত শখের টেরি গেল কোথায় হে?”

পতিত ধপাস করে একখানা চেয়ারের উপর বসে পড়ে অর্ধ অবরুদ্ধ কণ্ঠে বললে, “আর সখের টেরি! স্যর, স্যর, ছুটির দরখাস্ত করেছিলুম, কিন্তু ছুটি দিলেন না কি আমাকে যমালয়ে পাঠাবার জন্যে?”

ভূপতি বললেন, “কিন্তু তুমি তো যমালয়ে যাওনি পতিত। জলজ্যান্ত বেঁচে আছ!”

—“সেটা বাপের পুণ্যে স্যর, বাপের পুণ্যে! নইলে এতক্ষণে হত পতিতের পতন!” সকলে হেসে উঠল।

—“আবার হাসছেন স্যর? আমি যা দেখেছি স্যর, তা দেখলে আর কোনও মানুষ বাঁচে না।”

হেমন্ত বললে, “পতিতবাবু, আপনার বীরত্ব আর সাহসকে আমরা ধন্যবাদ দিতে রাজি আছি—যদি তাড়াতাড়ি সংক্ষেপে সব কথা খুলে বলেন!”

—“বলছি স্যর, বলছি—সব কথা বলবার জন্যেই তো বেঁচে ফিরে এসেছি। আগে এক গেলাস জল দিন, নইলে এই কাঠ গলায় কথা কইতে পারব না!”

জলপান করে কিঞ্চিৎ ঠাণ্ডা হয়ে পতিত যা বললে তা হচ্ছে এই :

“রীতিমতো জঙ্গলের মধ্যে এক পোড়ো কালীমন্দির। সেইখানেই পাঁচ ছয়খানা মাটির ঘর বানিয়ে আড্ডা গেড়েছে দশ-বারজন হিন্দুস্তানি সন্ন্যাসী। বেটাদের চেহারা দেখলেই ভয় হয়। সন্ধের আগেই আমি পাহারাওয়ালাদের নিয়ে চুপিচুপি চারিদিক ঘেরাও করে ফেললুম। আমি নিজে গিয়ে উঠলুম একটা বটগাছের উপরে। সেখান থেকে আখড়ার সমস্তটা দেখা যায়। তারপর সন্ধে হল, আর এল ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমারও চোখ হয়ে গেল অন্ধ। বলতে লজ্জা নেই স্যর, আমি একটু-আধটু ভূত বিশ্বাস করি। মনের ভিতর যা হচ্ছিল, তা আর বলবার নয়। কিন্তু কি করব—ডিউটি ইজ ডিউটি!

রাত প্রায় আটটার সময়ে দেখলুম, সন্ন্যাসীরা মন্দিরের সামনের জমিতে গোল হয়ে বসে আছে। তারা একটা ধুনি জ্বালিয়েছিল—তার ভিতর থেকে যদিও আগুনের শিখা বেরুচ্ছিল না, তবু জাগছিল কেবল একটু একটু আলোর আভা। সেই আভায় সন্ন্যাসীদের মূর্তি ঝাপসা ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছিল।...দেখা যাচ্ছিল বললেও ভুল হয়, একদল কালি দিয়ে আঁকা মানুষ যে ওখানে এসে বসে আছে, আমি খালি এইটুকুই আন্দাজ করতে পারছিলুম!

তারপরেই শুনতে পেলুম, সন্ন্যাসীরা একসঙ্গে বিড়বিড় করে কি মন্ত্র পড়ছে।

এইভাবে কেটে গেল কতক্ষণ! মশা আর নানারকম পোকামাকড়ের কামড়ে ছটফট করতে করতে আমি তখন ভাবছি, কতকগুলো বাজে সন্ন্যাসীর একঘেয়ে মন্ত্রপড়া শোনবার জন্যে কেন নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে এখানে পাঠানো হল, তখন হঠাৎ চমকে উঠে তাকিয়ে দেখি, সন্ন্যাসীদের মণ্ডলের মাঝখান থেকে দুলে দুলে উঠছে যেন একটা বিদকুটে ছায়া!

খুব তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলুম, তবু বুঝতে পারলুম না, সে ছায়াটা কিসের! আরও আশ্চর্য এই যে, দেখতে দেখতে ছায়াটা ক্রমেই যেন ঘন হয়ে দেখাতে লাগল অন্ধকারের চেয়েও কালো অন্ধকারের মতো ! তখন মনে হল, সেটা সাধারণ ছায়া নয়—মস্ত এক ছায়ামুর্তি ! সে লম্বায় হবে প্রায় তের-চৌদ্দ হাত। বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না, ছায়া মূর্তিটাকে মনে হচ্ছিল যেন নিরেট, আর তার উপরদিকে জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল দুটো নীল আগুনের গোলা !

তারপরেই শব্দ শুনলুম হুম হুম হুম হুম। ঠিক যেন প্রকাণ্ড হাঁড়ির মধ্যে ফাটছে বুমবুম করে বোমার পরে বোমা! সন্ন্যাসীদেরও মন্ত্র পড়ার ধুম বেড়ে উঠল—সে তো মন্ত্র পড়া নয়, যেন সংস্কৃত ভাষায় তর্জন গর্জন!

বারবার আমার মনের অবস্থার কথা বলে আপনাদের আর বিরক্ত করব না। আমার মন যে কেমন করছিল, কথায় তা বোঝানোও অসম্ভব। ওইসব দেখেশুনে আমি বেঁচে ছিলুম, এইমাত্র! যাকে বলে –কণ্ঠাগতপ্রাণ।

হঠাৎ দেখি ছায়ামূর্তিটা অদৃশ্য! কানে শুধু শব্দ জাগল, ধড়াম ধড়াম ধড়াম ধড়াম ! কার পায়ের চাপে হচ্ছে থরথর ভূমিকম্প।

ভয়ে আমি গাছের ডালের সঙ্গে একেবারে যেন মিশিয়ে রইলুম।

ধড়াম ধড়াম শব্দ আর ভূমিকম্প থামল, কিন্তু সন্ন্যাসীদের মন্ত্রপড়া থামল না! তখন তারা যেন ক্ষেপে গিয়ে দস্তুরমতো চিৎকার করে মন্ত্র পড়ছিল। তারপর যে আরও কতক্ষণ ধরে আমি সেই ভুতুড়ে মন্ত্রপাঠ শুনলুম তা জানেন খালি ভগবান। নিজের সময়জ্ঞান আমি একেবারে হারিয়ে ফেলেছিলুম।...

হঠাৎ আবার সেই বিশ্রী কাণ্ড! ধড়াম ধড়াম আওয়াজ আর সেই ভূমিকম্প! আমার খানিক তফাৎ দিয়ে বয়ে গেল যেন একটা দমকা ঝড়! গাছের পাখিরা পর্যন্ত আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল।

তারপরেই যা হল, বর্ণনা করতে পারব না। মন্ত্রপাঠের ধ্বনি গেল থেমে, তার বদলে জাগল আচম্বিতে আকাশফাটানো সিংহনাদ, হুঙ্কারের পর হুঙ্কার, অট্টহাস্যের পর অটহাস্য, বীভৎস আর্তনাদ, অনেক লোকের হাঁউমাউ চিৎকার, হুটোপুটি ছুটোছুটির শব্দ! ভীষণ আতঙ্কে আমি গাছের উপর থেকে একেবারে মাটির উপরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলুম ...

যখন জ্ঞান হল, তখনও আকাশ ভাল করে ফরসা হয়নি! ভয়ে ভয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে কোথাও কারুকে দেখতে পেলুম না। তখন সাহস করে পাহারাওয়ালাদের সঙ্গে মন্দিরের কাছে এগিয়ে গিয়ে যা দেখলুম, সেও এক বীভৎস দৃশ্য !

একটা নিবে যাওয়া ছাই ভরা ধুনির চারিপাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে কোনও মানুষের খণ্ড- খণ্ড দেহ! কোথাও চূর্ণবিচূর্ণ মুণ্ড, কোথাও হাতের, কোথাও গায়ের, কোথাও বা দেহের অন্যান্য কুচি কুচি অঙ্গপ্রতঙ্গ! ঠিক এমনই দৃশ্য দেখেছিলুম অবনীবাবুর ঘরে ঢুকে!

মাটির ঘরের ভিতরে পাওয়া গেল কেবল দু'জন ভয়ে আধমরা সন্ন্যাসীকে—তাদের ধরে এনেছি। আর সবাই পিটটান দিয়েছে।

শুনছি ওই খণ্ড খণ্ড লাশ হচ্ছে একজটা স্বামীর !”

হেমন্ত বলে উঠল, “যা ভেবেছি তাই। হিংস্র দানব তার স্রষ্টাকেই সংহার করেছে।”

সতীশবাবু রুদ্ধশ্বাসে বললেন, “আপনি ফ্ল্যাশ লাইটে কার ফোটো তুলেছেন? হেমন্ত পকেট থেকে একখানা প্লেট বার করে দেখালে। সকলে বিষম আগ্রহে তার উপরে ঝুঁকে পড়ল।

সতীশবাবু ভয়স্তম্ভিত স্বরে বললেন, “ভয়ানক, ভয়ানক। এ যে নৃসিংহ মূর্তি! মানুষের দেহে সিংহের মুণ্ড!”

হেমন্ত বললে, “হ্যাঁ। একজটা স্বামীর ইচ্ছাশক্তি জীবন্ত করেছিল এই মূর্তিকেই!” রবীন বললে, “ভগবান তো নৃসিংহরূপ ধারণ করেছিলেন, পাপীকে শাস্তি দেবার জন্যে !”

“এ মূর্তি ভগবানের নয় রবীন, এ কেবল সেই মূর্তির বাইরেকার খোলস! এর মধ্যে আত্মাও ছিল না, পরমাত্মাও ছিলেন না, ছিল কেবল দুরাত্মার দুরন্ত ইচ্ছাশক্তি!”

রবীন বললে, “এই দানব এখন কোথায়?”

হেমন্ত বললে, “ভাবের রাজ্যে।”

ভূপতি বললে, “মানে?”

হেমন্ত বললে, “এ মূর্তি এখন হাওয়ার সঙ্গে মিশে গিয়েছে।”

পতিত সানন্দে নেচে উঠে বললে, “আপদ গেছে স্যর, আপদ গেছে! আর আমাকে তদন্তে যেতে হবে না! ওই মূর্তি এখনও জ্যান্ত থাকলে আমি আর ছুটির জন্যে দরখাস্ত করতুম না, পুলিসের চাকরিতে একেবারে ইস্তফা দিতুম!”

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%