হেমেন্দ্রকুমার রায়
কেউ কেউ বলে, ভূতের গল্প ভালো নয়। কেন? ভূতের গল্পে নাকি থাকে ভূতের ভয় এবং ভয় ব্যাপারটা ভীতু করে তোলে তোমাকে-আমাকে।
তাহলে বলি দাদা, মানুষের ভয় কি খালি একটা? রাত হলেই অন্ধকারের ভয়, শীত পড়লেই সর্দি-কাশির ভয়, বসন্তকালে মারী-ভয়, জলপথে ডুবে যাবার, স্থলপথে গাড়ি চাপা পড়বার ও শূন্যপথে বিমান বিকল হবার ভয় এবং চুপ করে বাড়ির ভিতরে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলেও হঠাৎ বজ্রপাত ভূমিকম্পের ভয়। এ-সবার উপরেও আছে অগুনতি ভয়, সঠিক ফর্দ দাখিল করা অসম্ভব। কোন দিক সামলাবে? ভয় আছে মানুষের হৃদয়ের পরতে পরতে গাঁথা, তাকে এড়াবার চেষ্টা বৃথা। মারা পড়বার ভয়ে সৈনিকরা কি যুদ্ধে যায় না? ভয়কে দমন করে সাহস। যার সাহস নেই, ভূতের গল্প না শুনলেও সে হবে পয়লা নম্বরের ভীতু।
কী বলছ? আমার আসল বক্তব্য কী? আরে ভায়া, ভূতের গল্পের বিরুদ্ধে তোমাদের নজিরগুলো শুনতে শুনতে অনেক দিন আগেকার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ঘটনাটা ঘটেছিল আমার জীবনেই। আমি ভূত মানি না, কিন্তু সেই ভয়াবহ ঘটনায় আমার সমস্ত সাহস উপে গিয়েছিল।
ঘটনাটা শুনতে চাও? বেশ, শোনো তবে—
বাহান্ন বৎসর আগেকার কথা, অর্থাৎ আমার বয়স তখন আঠারো।
প্রেমলাল জাতে ছিল স্বর্ণবণিক কি গন্ধবণিক, ঠিক আমার মনে নেই। সে আমাদের পাড়ার কাছেই থাকত। তার সঙ্গে কিছুদিন পর্যন্ত আমার বেশ দহরম-মহরম ছিল, কিন্তু তারপর সে কোথায় হারিয়ে গেল এবং এখনও ইহলোকে টিকে আছে কি না, এসব খবর আমার জানা নেই।
যখন এই প্রেমলালের বিয়ে হয়ে গেল সতরো বছর বয়সে তখন আমরা কেউই অবাক হলুম না। সে সময়ে কোনও কোনও জাতের ছেলেদের খুব অল্প বয়সেই বিবাহ হয়ে যেত। হেয়ার স্কুলে এক সুবর্ণবণিকদের ছেলে আমার সহপাঠী ছিল, সে যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, তখনই এক সন্তানের পিতা!
কিন্তু ও-সব কথা থাক! প্রেমলালের অকালবিবাহের কথাটাও এখানে উপলক্ষ মাত্র, তবু উল্লেখ করবার কারণ, সেই সূত্রেই পূর্বোক্ত ভয়াবহ ঘটনাটার উৎপত্তি।
প্রেমলালের বিবাহের জের শহরেই মিটল না, উৎসবটা ভালো করে জমিয়ে তোলবার জন্যে তার বাবা ও মা, ছেলে আর নতুন বউ নিয়ে কিছুদিনের জন্য দেশে রওনা হলেন। প্রেমলাল আমাকেও নিমন্ত্রণ করে বললে, “চলো না, দিন-তিনেক পাড়াগাঁয়ে ঘুরে আসবি, মন্দ লাগবে না!' আমিও রাজি হয়ে গেলুম।
প্রেমলালদের দেশ কলকাতার কাছেই। ছোটো গ্রাম, এতদিন পরে তার নাম আমার মনে পড়ছে না।
সেখানে গিয়ে আমি পড়লুম কিন্তু বিপদে। যত সব অচেনা লোকের ভিড় এবং বিরক্তিকর প্রশ্ন! তার উপরে সেকেলে গ্রাম্য ধুমধড়াক্কার চোটে প্রথম দিনেই প্রাণ আমার আইঢাই করতে লাগল। রাত্রে ঘুমের দফা প্রায় রফা হবার ব্যাপার।
প্রেমলাল চালাক ছেলে, সকালে দেখা হতেই বললে, 'ভাই, তোর মুখ দেখেই পেটের কথা বুঝতে পারছি। তোর কষ্ট হচ্ছে, নয়? তা তুই এক কাজ কর। মুখুজ্জেদের বাগানবাড়িতে থাকবি? ’ —সে আবার কোথায়?”
—‘গাঁয়ের শেষে, মাঠের ধারে। তুই কবি মানুষ, তোর ভালো লাগবে।' (তখন থেকেই আমি গদে-পদ্যে হাতমক্স শুরু করেছি এবং ছোটো ছোটো মাসিকপত্রে আমার দুই-একটি লেখা বেরিয়েও গিয়েছে।)
আমি ইতস্তত করে বললুম, 'কিন্তু মুখুজ্জেদের তো আমি চিনি না!’
প্রেমলাল বললে, 'সত্যসত্যই বাগানখানার পারিপার্শ্বিক দৃশ্য আমার ভালো লাগল। পশ্চিমে ও দক্ষিণে ধু ধু মাঠ। পূর্ব দিকে গ্রাম এবং উত্তর দিকে কলাইশুঁটি খেতের কোলে একটি ঝিলমিলে ঝিল। মেহেদীগাছের বেড়া দিয়ে ঘেরা বাগানের ভিতরে নানান ফলফুলের গাছ ও কানায় কানায় জল-ভরা পুকুর এবং একখানি ছোটো একতলা বাড়ি। আর এক প্রান্তে মালির জন্যে আর একখানা মেটেঘর। চারিদিক নির্জন ও নিরিবিলি। গ্রাম্য হট্টগোল থেকে মুক্তি পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।
তারা ওখানে নেই। বাগানখানা আমাদেরই জিম্মায় আছে।'
সন্ধ্যার পর খাবারদাবার এল বিয়ে বাড়ি থেকে এবং একখানি দক্ষিণখোলা ঘরে তক্তাপোশের উপরে বিছানো হল আমার বিছানা। কিন্তু সকাল সকাল শুয়ে পড়তে ইচ্ছা হল না। প্রতিপদের চাঁদের আলোতে তেপান্তরের মাঠ হয়ে উঠেছিল স্বপ্নলোকের মতো, আমার শহুরে দৃষ্টিকে তা আকৃষ্ট করে রাখলে অনেকক্ষণ ধরে। গানের পাখিরাও কানে করছিল মধুবৃষ্টি।
ঘরের কোলে বারান্দায় বসে এই সব দেখতে দেখতে ও শুনতে শুনতে বেশ একটু তন্দ্রার আবেশ এসেছিল, কিন্তু চটকা ভেঙে গেল শেয়ালদের হুক্কাহুয়া চিৎকারে! চাঁদ তখন বাড়ির ছাদের আড়ালে সরে গিয়েছে দেখে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে পড়লুম। জানালা দিয়ে আসছিল দখনে বাতাসের মেঠো উচ্ছ্বাস। ঘুমিয়ে পড়তে দেরি লাগল না।
আমার ঘুম বরাবরই সজাগ। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলুম জানি না, আচম্বিতে অজানা কারণে ঘুম গেল ছুটে। বিছানায় উঠে বসে কারণটা অনুধাবন করবার চেষ্টা করলুম। ঝাঁ ঝাঁ রাতে ঝিঁঝিপোকাগুলো খালি ঝিঁ ঝিঁ করছে। গানের পাখিদের জলসা বন্ধ হয়েছে। বাতাসও আর গাছে গাছে সবুজ পাতার বীণা বাজাচ্ছে না!
কিন্তু একটা শব্দ—সন্দেহজনক শব্দ শোনা যায়। খস খস খস খস খস খস! বারান্দার উপরে কে পায়চারি করছে!
অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম। চোর-টোর নয়, চোর পায়ের শব্দে গৃহস্থকে জাগায় না। কোনও জন্তুর পায়ের শব্দ বলেও মনে হয় না। কিন্তু অজ পাড়াগাঁয়ে এই নিশুতিতে মেঠো বাড়ির বারান্দায় বেড়াবার শখ হল কার?
আবার শব্দ—খস খস খস খস খস খস! তারপর খানিকক্ষণ সব চুপচাপ! একবার উঠে দেখতে হল তো! তখনও ভূতের কথা একবারও মনে জাগেনি। ছেলেবেলা থেকেই ভূতের গল্প পড়তে ভালোবাসি, কিন্তু ভূতের ভয় আমার ছিল না।
জানালা দিয়ে উঁকি মারলুম। চাঁদ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ধু ধু মাঠ জ্যোৎস্নায় ধবধব করছে। মাথা-ঢাকা বারান্দায় রয়েছে আলোমাখা ছায়া কিংবা ছায়ামাখা আলো—সব দেখা যায় কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায় না।
আচমকা আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। সেই আবছায়ায় আমার দিকে পিছন ফিরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন কালি জমিয়ে তৈরি একটা অতি শীর্ণ কঙ্কালসার নারীমূর্তি? এটুকু আন্দাজ করা গেল, তার দেহের উপরার্ধ নগ্ন এবং মাথায় জটপাকানো চুলগুলো সর্পশিশুদের মতো কাঁধের উপরে ঝুলছে!
সত্যই আমার গায়ে জাগল রোমাঞ্চ! যে-সব নিশীথ-প্রেতিনীর কথা শোনা যায়, এ কি তাদেরই কেউ? তবু ভয়ে ভয়ে গলা তুলে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘কে কে ওখানে?'
তৎক্ষণাৎ এমন বিদ্যুৎবেগে সেই প্রস্তর স্থির মূর্তিটা ফিরে দাঁড়াল যে আমি সচমকে পিছু হটে জানালার কাছ থেকে সরে এলুম ৷
মূর্তিটা আবার মুহূর্তকাল স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইল। লক্ষ করলুম সে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। মনে হল, অন্ধকারের ভিতর থেকে দুটো ক্ষুধিত চক্ষু যেন জ্বল জ্বল করে জ্বলছে! যদিও আমি বদ্ধদ্বার ঘরের মধ্যে আছি, তবু নিজেকে কী অসহায় বোধ হতে লাগল! বাইরে যে অমন মাঠভরা চাঁদের আলোর জোয়ার, তাও যেন আমার চোখের সামনে ডুবে গেল অমাবস্যার গহন আঁধারে!
তারপরেই যেন শিকার খুঁজে পেয়ে সেই বিভীষণ মূর্তিটা তীব্র স্বরে খিল খিল করে হেসে উঠল। এবং পায়ে পায়ে জানালার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমি আর সহ্য করতে পারলুম না—বেগে দৌড়ে গিয়ে দড়াম করে জানালা বন্ধ করে দিলুম।
কিন্তু বাহির থেকে আর কোনও সাড়া পাওয়া গেল না—না হাসির, না পায়ের শব্দ! বাকি রাতটা জেগে জেগেই কেটে গেল। অবশেষে ভোরের পাখিদের বৈতালিকী শুনে আশ্বস্ত হয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলুম। সন্তর্পণে এদিক ওদিকে খুঁজে দেখলুম—কিন্তু সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়েছে সেই নৈশ অপচ্ছায়া!
চিৎকার করে মালিকে ডাক দিলুম।
মালির কথা সমস্ত রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল। পর্বতের মূষিক প্রসব!
এই গাঁয়েরই এক বাগদি জাতের পাগলি ঘুরে বেড়ায় হাটে-মাঠে-ঘাটে এবং রাত্রে মাঝে মাঝে বাগানের বেড়া পেরিয়ে বারন্দায় উঠে শুয়ে থাকে।
গল্পটি শুনে তোমরা হয়তো বলবে, ‘বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া!' কিন্তু এ গল্পের ‘মর্যাল’ হচ্ছে ভূত নেই বললেই ভয় যায় না! আমার অবস্থায় পড়লে তোমরা কী করতে, সেইটে একবার ভেবে দ্যাখো।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন