আধ খাওয়া মড়া

হেমেন্দ্রকুমার রায়

রূপনারায়ণ নদের বিরাট একটা চর৷ নদীর বাঁধটা একটা বিরাট অজগরের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে দূর থেকে বহুদূরে৷ বাঁধের ধারে ধারে, দু-পাশেই বট, অশ্বত্থ, জাম, তেঁতুল, শিরীষ, অর্জুন প্রভৃতি গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷

বাঁধ থেকে নেমে খানিকটা এগিয়ে গেলেই গ্রামের সীমানা৷ প্রথমেই জেলেপাড়া৷ তার ডান দিকে বাগদিপাড়া, উত্তর দিকে বিভিন্ন জাতের লোক বাস করে৷ অপরদিকে রূপনারায়ণ নদ ঢেউ তুলে তরতর করে এগিয়ে চলেছে৷ বাঁধের ওপর দিয়ে প্রায় মাইলখানেক গেলেই রূপনারায়ণের প্রকাণ্ড চর৷ এই চরেই গাঁয়ের লোকেরা মড়া পোড়ায়৷

আশপাশের প্রায় দশখানা গাঁয়ের মধ্যে ওই একটাই শ্মশান৷

শ্মশানের কাছাকাছি অনেক নাম-না-জানা বড়ো বড়ো গাছ আর ঝোপঝাড়৷

পাড়াগাঁয়ের শ্মশান যে কত ভয়ংকর না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না৷ শ্মশানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে পোড়া কাঠ, আধপোড়া বাঁশ, ছেঁড়া কাঁথা, ছেঁড়া কাপড়, ছেঁড়া মাদুর, মড়ার হাত, ভাঙা হাঁড়ি আর সরা৷

যারা মড়া পোড়াতে পারে না, তারা সব মড়া আর ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের মড়া মাটিতে পুঁতে দিয়ে যায়৷ তারপর সেইসব মড়া মাটির ভেতর থেকে টেনে বের করে শেয়াল, কুকুর, আর শকুনে মনের আনন্দে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়৷ কাছের ঝাঁকড়া শিরীষ গাছটায় একদল শকুন থাকে৷

হঠাৎ একদিন ঘটে গেল একটা ব্যাপার৷ বাগদিপাড়ার নগেন দলুই বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে চলে যায়৷ প্রায় চার দিন কেটে গেল, সে আর বাড়ি ফেরে না দেখে, সবাই চিন্তায় পড়ল৷ যেখানে যত আত্মীয় ছিল, খোঁজ নেওয়া হল৷ কিন্তু কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না তার৷

সে-দিন সকালে জেলেপাড়ার জনাকয়েক লোক ডিঙি ভাসিয়ে মাছ ধরতে ধরতে এসে পড়েছে শ্মশানের বেশ কাছাকাছি৷

হঠাৎ তাদের নাকে দুর্গন্ধ লাগল৷ আর সেইসঙ্গে শকুনের ডানা ঝাপটানির শব্দ৷ সঙ্গে সঙ্গে তারা দেখল, নগেন দলুই-এর পচা গলা মৃতদেহটা চরে এসে আটকে আছে৷ শকুনে খানিকটা ছিঁড়ে খেয়েছে৷ চোখ দুটোও শকুনে খুবলে খেয়ে নিয়েছে৷ শুধু চোখের গর্ত দুটো আছে৷

জেলেরা এই বীভৎস দৃশ্য দেখে বাগদিপাড়ায় সংবাদ দিল৷ সকলে তখন সেখানে ছুটে এসে দেখল, এত দুর্গন্ধ ছাড়ছে যে কার সাধ্য সেখানে দাঁড়ায়৷ তখন সবাই নাকে কাপড় চাপা দিয়ে, মড়াটার পায়ে দড়ি বেঁধে, শশ্মানের ভেতর এনে মাটি চাপা দিয়ে চলে এল৷ রাত্তির বেলা মাটির ভেতর থেকে নগেনের মৃতদেহটা তুলে শিয়াল, কুকুরে খেয়ে ফেলল৷

নগেন দলুই-এর অবস্থা মোটামুটি ভালোই ছিল৷ তার দুটি ছেলে, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে৷ তারা ভালোভাবেই বাপের শ্রাদ্ধ করলে৷ জেলেপাড়া বাগদিপাড়ার অনেকেই নিমন্ত্রণ খেয়ে গেল৷

এই ঘটনার পর প্রায় এক মাস কেটে গেল৷ তারপর থেকেই নানারকম অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটতে লাগল৷ কখনো বাগদিপাড়া থেকে আবার কখনো জেলেপাড়া থেকে হাঁস, মুরগি, ছাগল চুরি যেতে লাগল৷

একদিন নগেনের বউ রাত্রে একটা শব্দ শুনে এসে দেখলে—তাদের আম গাছটার নীচে, যেন কে একজন সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ সে ভয় পেয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল৷

মায়ের চেঁচানি শুনে ছেলেরা হ্যারিকেন হাতে নিয়ে বাইরে এসে চারদিক দেখল৷ কিন্তু কাউকেই দেখা গেল না৷ তখন তারা বলাবলি করতে লাগল, ও সব মনের ভুল, গাছের ছায়া দেখে মা ভয় পেয়েছে৷

রাত্রে বাঁধের ওপর আর শ্মশানেও একটা কঙ্কালকে ঘোরাফেরা করতে দেখে গাঁয়ের সবাই ভয় পেয়ে গেল৷ রাত্রে শ্মশানে মড়া নিয়ে আসা বন্ধ করে দিল সবাই৷ জেলেরা সারাদিন রূপনারায়ণে মাছ ধরে, সন্ধ্যা হলেই যে-যার বাড়ি ফিরে আসতে লাগল৷ এমনকী বাঁধের ওপর দিয়েও লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেল৷ সন্ধে হলেই রাস্তা একেবারে ফাঁকা৷

সেদিন রাখাল জেলের একটা বাছুর গেল হারিয়ে৷ সারাদিন খোঁজ করা হল কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না বাছুরটাকে৷ একদিন পরে একজন লোক শ্মশানের দিকে এসে দেখল, রাখাল জেলের বাছুরটা মরে পড়ে আছে, তার আধখানা কে যেন চিবিয়ে খেয়েছে৷ বাকিটা পড়ে আছে একটা গাছের তলায়৷

খবরটা শুনে রাখাল এসে দেখল ব্যাপারটা৷ কী করবে? তাই সে কিছু না বলে চলে এল সেখান থেকে৷ মনে মনে সে বুঝল, নগেন দলুই ভূত হয়ে এইসব কাণ্ড করছে৷

জেলেপাড়ার ফকির আর নিধিরাম দেখল নগেনের বাড়ির দরজার কাছে একটা আবছা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে৷ সারাদেহ তার সাদা কাপড়ে ঢাকা৷ ওরা চোর ভেবে জিজ্ঞাসা করলে, ওখানে কে রে? সঙ্গে সঙ্গে আবছা মূর্তিটা ঘুরে দাঁড়াল৷ ওরা আশ্চর্য হয়ে দেখল লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না৷ শুধু চোখ দুটো যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে৷ দেখতে দেখতে মূর্তিটা বিরাট লম্বা হয়ে গেল৷

এই ব্যাপার দেখে ফকির আর নিধিরাম ভয় পেয়ে, ওরে বাবারে, গেলুম রে বলে ছুটে পালাল প্রাণপণে৷

সবার মুখে মুখে খবরটা জানাজানি হয়ে গেল৷ পাড়ার লোক ভয় পেয়ে সন্ধে সাতটার পর নগেন দলুই-এর বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দিল৷

ফকির জেলে নগেনের ছেলেদুটোকে বললে, বাপু, ব্যাপার খুব সুবিধের মনে হচ্ছে না৷ তোদের বাপ ভূত হয়েছে৷ তোরা ছেলেপুলে নিয়ে থাকিস, একটা কিছু ব্যবস্থা কর৷ তা না হলে কোনদিন তোদের বিপদ হতে পারে৷

নগেনের বড়ো ছেলেটা ভয় পেয়ে বললে, কী ব্যবস্থা করা যায় দেখি খুড়ো—মা-ও একদিন দেখেছিল, আমরা তার কথা বিশ্বাস করিনি৷ কিন্তু এখন দেখছি বিশ্বাস না-করে উপায় নেই৷

নগেনের ছোটো ছেলে বললে, আমিও সেদিন ভোরের দিকে বাইরে বেরিয়ে সাদা কাপড় ঢাকা একটা মূর্তি দেখেছিলাম, কিন্তু সবাই ভয় পাবে বলে কাউকে আর কিছু বলিনি৷

নিধিরাম সব শুনে কিছুক্ষণ ধরে কী যেন ভাবলে৷ তারপর গম্ভীরভাবে বললে, এখানে তো ভূতের ওঝাও নেই৷ তবে শুনেছি মহেশপুরে একজন লোক আছে৷ সে নাকি ভূত ছাড়ায়৷ তোরা তার কাছে যা, সে কী বলে দ্যাখ৷

এই পরামর্শ দিয়ে ফকির আর নিধিরাম যে-যার বাড়ি চলে গেল৷

নগেনের বড়ো ছেলে তার ছোটো ভাইকে বললে, মহেশপুর এখান থেকে প্রায় চার ক্রোশের ওপর৷ যেতে আসতে প্রায় নয়-দশ ক্রোশ৷ আজকে তো আর যাওয়া সম্ভব নয়৷ কাল সকালেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাব৷ বিকেলে তাহলে ফিরে আসতে পারব৷ এইভাবে দু-ভাই যুক্তি করলে৷

সে-দিন রাত্রেই ঘটনাটা ঘটল নগেনের বাড়িতে৷

রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সেরে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল৷

রাত প্রায় তখন দুটো-আড়াইটে হবে৷ হঠাৎ হাঁস-মুরগির ঘরে ঝটপটানি আর কোঁক কোঁক শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল নগেনের বউ-এর৷

নগেনের বউ ভাবলে, বোধ হয় হাঁস-মুরগির ঘরে শেয়াল ঢুকেছে৷ এই কথা মনে করে সে একটা হ্যারিকেন আর একটা লাঠি নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে৷

উঠোনে পা দিতেই সে দেখল, খুব লম্বা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে উঠোনের মাঝখানে৷ তার লম্বা লম্বা লিকলিকে হাত দুটোতে দুটো মুরগি, আর সে মুরগি দুটো ছিঁড়ে চিবিয়ে খাচ্ছে৷ এই দৃশ্য দেখে নগেনের বউ আঁ আঁ করে চিৎকার করে উঠোনে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল৷

সেই শব্দ শুনে ছেলেরা বউরা সব ছুটে এল হ্যারিকেন নিয়ে৷

উঠোনের মাঝে মাকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তাড়াতাড়ি জল পাখা নিয়ে এসে সবাই শুশ্রূষা করতে লাগল৷ বেশ কিছুক্ষণ সেবা-শুশ্রূষা করার পর জ্ঞান ফিরে এল নগেনের বউ-এর৷

ছেলেরা জিগ্যেস করলে, কী হল মা? তুমি অজ্ঞান হয়ে গেলে কেন? নগেনের বউ তখন হাঁপাতে হাঁপাতে দু-এক কথায় ছেলেদের সব ব্যাপারটা বলে, উঠোনের যেখানে কঙ্কালটা দাঁড়িয়েছিল, সেই জায়গাটা ইশারা করে দেখিয়ে দিল৷

সবাই আলো হাতে নিয়ে উঠোনের মাঝখানে গিয়ে দেখল, চারদিকে মুরগির পালক আর রক্ত ছড়ানো রয়েছে৷ কিন্তু ধারে-কাছে কাউকে দেখা গেল না৷

ছোটো ছেলে বললে, হয়তো শেয়াল ঢুকে মুরগি খেয়েছে৷ রাতের অন্ধকারে শেয়ালের চোখ দুটো তো দপ দপ করে জ্বলে, মা হয়তো তাই দেখেই ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছল৷

ছেলেদের কথা শুনে নগেনের বউ বললে, তোরা আমার কথা বিশ্বাস করলি না৷ কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখেছি খুব লম্বা একটা মূর্তি উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে৷ তার সারাদেহ সাদা কাপড়ে ঢাকা৷ মুখটাও দেখা যাচ্ছে না৷ চোখ দুটো দপ দপ করে জ্বলছে৷ তার লিকলিকে লম্বা হাত দুটোয় দুটো মুরগি—সে মুরগি দুটো ছিঁড়ে খাচ্ছে৷

এইসব কথাবার্তা হচ্ছে নিজেদের মধ্যে৷ এমন সময় বাড়ির পিছন দিকে শোনা গেল একটা ভয়ংকর হাসির শব্দ৷ সেই হাসির শব্দ শুনলে বুক কেঁপে ওঠে৷ সেই শব্দ শুনে সবাই চমকে উঠল৷ তারা বুঝতে পারল এটা একটা ভৌতিক কাণ্ড ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না৷

ভয় পেয়ে সবাই ঘরে ঢুকে বসে রইল সকাল হওয়ার অপেক্ষায়৷

পরের দিন নগেনের বড়ো ছেলে সাইকেল নিয়ে চলে গেল সেই প্রায় চার ক্রোশ দূরে মহেশপুরে ওঝার বাড়িতে৷ কিন্তু মুশকিল হল, ওঝা তখন অসুস্থ৷ নগেনের ছেলে একে-একে সব কথা বললে তাকে৷

ওঝা সব কথা মন দিয়ে শুনে বললে, দ্যাখ বাবা, আমার বয়েস হয়েছে৷ তা ছাড়া আজ এক সপ্তাহের ওপর আমি উঠতে হাঁটতে পারছি না৷ একটু সুস্থ হলেই আমি গিয়ে সব ব্যবস্থা করে আসব৷ এখন বল, তোমাদের ঘরে মোট কতজন লোক?

নগেনের ছেলে বললে, সবসুদ্ধ আটজন৷

ওঝা বললে, আমি তোমাকে আটটা মাদুলি দিচ্ছি৷ কালো সুতোয় বেঁধে হাতে বেঁধে রাখবে৷ আর ছেলেদের গলায় বেঁধে দেবে৷ আর এই চারটে পেরেক দিচ্ছি তোমাদের ভিটের চার কোণে পুঁতে দিও৷ তাহলে সে আর তোমাদের বাড়ির সীমানায় আসতে পারবে না৷

এই কথা বলে ওঝা আটটা মাদুলি আর চারটে বড়ো বড়ো পেরেক তার হাতে দিল৷

পেরেক আর মাদুলি নিয়ে নগেনের বড়ো ছেলে বিকেলের দিকে ফিরে এল৷ তারপর ওঝার কথামতো সকলকে মাদুলি পরানো হল, আর পেরেক পুঁতে দেওয়া হল৷

সে-দিন থেকে নগেন দলুই-এর বাড়িতে ভূতের উপদ্রব কমে গেছে বটে, কিন্তু গ্রামে উপদ্রব বেড়ে গেল৷

গাঁয়ের লোকের ঘর থেকে হাঁস-মুরগি আর ছাগল প্রায়ই চুরি হতে লাগল৷ অন্ধকারে সেই ছায়ামূর্তিকেও দেখল অনেক লোক৷ তা ছাড়া কারো বাড়িতে গভীর রাতে ইট পড়তে থাকে দুমদাম করে৷ আবার কারো বাড়িতে গোরুর হাড়, মোষের হাড়, মানুষের হাড় পড়তে থাকে৷ আবার কারো ঘরের চালে মড়া-পোড়া কাঠ, বাঁশ পড়ে থাকে৷

সারা গাঁয়ের লোক ভয়ে কাঠ হয়ে গেল৷ সন্ধে হতে-না-হতেই যে-যার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে ভয়ে রাত কাটাতে লাগল৷ সন্ধের পর অত বড়ো গ্রামটা যেন শ্মশানের মতো জনশূন্য মনে হয়৷ সেদিন রাত্রে অনেক দূর থেকে একদল লোক একটা মড়া নিয়ে শ্মশানে এল পোড়াতে৷ লোকগুলো চিতা সাজিয়ে, মড়াটাকে তার ওপর তুলে আগুন দিল৷ তারপর শবযাত্রীরা একটু দূরে বসে আপন মনে তামাক টানতে লাগল৷

এদিকে সেই অবসরে পাশের বটগাছ থেকে লম্বা হাত বাড়িয়ে নগেন মড়াটাকে চিতা থেকে তুলে নিয়ে গাছের ওপর বসে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে লাগল৷

তামাক খেয়ে লোকগুলো চিতার কাছে এসে দেখেই অবাক হয়ে গেল৷ শুধু চিতাটাই জ্বলছে মড়ার পাত্তা নেই৷ লোকগুলো রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল৷ নদীতে তখন মালপত্র বোঝাই করা একটা বেশ বড়ো নৌকো বাঁধা ছিল৷ মাঝি বসে অপেক্ষা করছিল জোয়ারের আশায়৷ নৌকার ছাদের ওপর হালের কাছে বসে মাঝি তামাক খাচ্ছিল৷

অনেক আগেই সে ব্যাপারটা লক্ষ করছিল, কিন্তু শবদাহীরা পাছে ভয় পায়, এজন্যে সে চুপচাপ দেখেই যাচ্ছিল৷ শবযাত্রীরা যখন ভয় পেয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে চেঁচাতে লাগল, আর নৌকার আলো দেখে সেদিকে ছুটে গেল, তখন নৌকার মাঝি চেঁচিয়ে বললে, ভয় পেয়ো না তোমরা৷ ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকো, আমি যাচ্ছি৷

মাঝির কথা শুনে শবযাত্রীরা সেইখানেই দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগল৷

নৌকোর মাঝিটি ছিল একজন বেশ নামকরা ভূতের ওঝা৷ সে একটা পুঁটলি হাতে নিয়ে আর এক হাতে হুঁকো নিয়ে নৌকো থেকে নেমে এল শ্মশানে৷

লোকগুলোকে তখন মাঝি তার কাছে বসিয়ে বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র বলতে বলতে লোকগুলোর চারপাশে কী যেন সব ছড়িয়ে দিয়ে বসে হুঁকোয় দু-একটা টান দিয়ে বললে, কোনো ভয় নেই তোমাদের৷ ভূতের বাবারও সাধ্য নেই যে আর তোমাদের কাছে আসে৷ আমি গণ্ডি দিয়ে দিয়েছি৷ যতক্ষণ তোমরা এই গণ্ডির মধ্যে থাকবে, ততক্ষণ তোমাদের ভূতে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না৷ তারপর সকাল হলে বাড়ি চলে যাবে৷ দিনের বেলা ভূত লোকের কাছে আসে না৷

একজন জিজ্ঞাসা করল, মড়াটা তাহলে গেল কোথায়?

মাঝি বললে, তাকে চিতা থেকে তুলে নিয়েছে৷

মাঝির কথা শুনে সবাই ভয় পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল৷ কারও মুখে আর কথা নেই৷

মাঝি বলল, হ্যাঁ, তাকে তুলে নিয়েছে৷

ওদের মধ্যে একজন যুবক বললে, আগুনের ভেতর থেকে তুলে নিল কী করে?

মাঝি বললে, গাছের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে৷

মাঝির কথা শুনে যুবকটি যেন একটু অবজ্ঞার হাসি হাসল৷

তাই দেখে মাঝি বললে, বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? দেখতে চাও?

যুবক বলল, বেশ দেখান, তাহলে বিশ্বাস করব৷

—দ্যাখো, আবার অজ্ঞান হয়ে যাবে না তো?

—এখনও যখন হইনি, তখন আর হব না৷

—বেশ তাহলে এসো আমার সঙ্গে৷ এই কথা বলে মাঝি তাদের সঙ্গে নিয়ে বটগাছের ওপর ইশারা করে দেখিয়ে দিল৷—ওই দ্যাখো৷

সকলে দেখল, বটগাছের মগডালের ওপর বসে একটা বীভৎস কঙ্কাল তাদের সেই মড়াটাকে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে! কী ভয়ংকর দৃশ্য!

ভয় পেয়ে সবাই চোখে হাত চাপা দিয়ে মাঝির কাছে সরে এল৷

মাঝি বলল, এবার বিশ্বাস হল তো? যাক তোমাদের কোনো ভয় নেই৷ ও গাছ থেকে নেমে আসতেও পারবে না৷ আর কোথাও যেতে পারবে না৷ আমি গাছটাকে গণ্ডি দিয়ে দিয়েছি৷

এই কথা বলে মাঝি হুঁকোটা সেখানে রেখে, পুঁটলিটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তোমরা এখানে চুপচাপ বসে থাকো৷

মাঝিকে চলে যেতে দেখে, লোকগুলো ভয় পেয়ে কাতরভাবে বলল, আপনি আমাদের এভাবে ফেলে রেখে যাবেন না, সকাল হলে তারপর যাবেন৷ দয়া করে সকাল না হওয়া পর্যন্ত আপনি অপেক্ষা করুন৷

মাঝি হেসে বললে, ভয় নেই, আপনারা এখানে বসুন৷ আমি ওর পরিচয় নিয়ে আসছি৷

মাঝি চলে গেল বটগাছের দিকে৷ লোকগুলো ভয়ে কাঠ হয়ে বসে রইল৷ স্পষ্ট শোনা যেতে লাগল, মাঝি বলছে, তুই কে?

—আমি নগেন দলুই৷

—তোর বাড়ি কোথায়?

—বাঁধের ওপারে বাগদিপাড়ায়৷

—বাড়িতে তোর কে আছে?

—আমার বউ, দুটো ছেলে, তাদের বউ, নাতি-নাতনি৷

—ঠিক আছে, তুই গাছেই বসে থাক৷ পালাবার চেষ্টা করলেই, জ্বলে-পুড়ে মরবি৷ আমি তোকে বেঁধে দিয়ে যাচ্ছি৷

মাঝি আবার ফিরে এল, লোকগুলোকে বললে, সকাল হলেই আপনারা গাঁয়ে গিয়ে লোকজনদের ডেকে আনবেন৷

দেখতে দেখতে পূর্ব দিক ফর্সা হয়ে এল৷ গাছে গাছে পাখি ডেকে উঠল৷ একটু পরে সকাল হল৷

দু-জন লোক গাঁয়ে গিয়ে এই সংবাদ দিল৷ গ্রাম থেকে বহুলোক এল দেখতে৷ নগেন দলুই-এর ছেলেদুটোও এল৷

সবাই এল বটগাছের নীচে৷

গাছের ওপর তখন কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধু একটা মড়া ঝুলছে দেখা গেল৷

মাঝি বলল, মড়াটাকে ফেলে দে নগেন৷

সঙ্গে সঙ্গে দমাস করে মড়াটা মাটিতে পড়ে গেল৷

সবাই দেখে তো অবাক! মড়াটার খানিকটা মাংস কে যেন খুবলে খেয়েছে৷

মাঝি বললে, নগেনের ভূতই মড়াটাকে চিতা থেকে তুলে গাছে নিয়ে গিয়ে বসে বসে খেয়েছে৷ দিনের বেলা তো ওদের দেখা যায় না৷ তা না হলে আমি দেখিয়ে দিতাম৷

মাঝি এবার বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র বলে উঠতেই, গাছের ওপর থেকে খনখনে গলায় নগেন বলে উঠল—এবার আমাকে ছেড়ে দে৷

মাঝি বলল, তুই একেবারে এদেশ থেকে চলে যাবি৷

নাকিসুরে উত্তর এল, না, যাব না৷ আমি এখানেই থাকব৷

—এখানে থাকবি কেন?

—এখানে আমার বউ-ছেলে রয়েছে৷ তা ছাড়া বউটার জন্যই আমি জলে ঝাঁপ দিয়ে মরেছি৷ ওকেও আমি ঘাড় মটকে শেষ করব৷

এই কথা শুনে নগেনের ছেলেরা ভয় পেয়ে মাঝিকে বলল, দয়া করে আপনি আমাদের রক্ষা করুন৷

মাঝি বললে, তোমাদের বাবা ভূত হয়ে কষ্ট পাচ্ছে৷ শুধু শুধু ওকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী?

নগেনের বড়ো ছেলেকে মাঝি বললে, তুমি গলায় গিয়ে ওর নামে পিণ্ডি দাও, তাহলেই তোমার বাবা প্রেতযোনি থেকে উদ্ধার পাবে৷

তখন গাঁয়ের একজন বয়স্ক লোক বললে, এখন ওরা কী করবে? যদি আজ রাতেই কারো ঘাড় মটকে দেয় বা গ্রামবাসীর ক্ষতি করে?

মাঝি বললে, তা পারবে না৷ আমি গাছের চারদিকে গণ্ডি দিয়ে যাচ্ছি৷ ও গাছ থেকে কোথাও যেতে পারবে না৷ সাত দিন এই গাছে ও বন্দি থাকবে, তার মধ্যে পিণ্ডি দেওয়া না হলে, ও আবার গ্রামে গিয়ে উপদ্রব করবে৷

নগেনের ছেলে বললে, আমি আজই রওনা হয়ে যাচ্ছি৷

মাঝি বললে, তুই উদ্ধার হলে কী চিহ্ন রেখে যাবি?

এবার কিন্তু কোনো উত্তর এল না, গাছের ওপর থেকে খোনা গলায় চেঁচিয়ে উঠল নগেনের ভূতটা, ওরে বাবারে—গেছিরে—জ্বলে মলুম রে৷

মাঝি বললে, বল কী চিহ্ন রেখে যাবি?

নগেনের ভূত বললে, দাঁড়াও দাঁড়াও বলছি—বলছি৷

এই বলে একটু থেমে, তারপর বললে, এই গাছের একটা মোটা ডাল ভেঙে দিয়ে যাব৷

মাঝি তখন লোকগুলোকে বললে, আপনারা মড়াটা নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দিন৷ তারপর গ্রামবাসীদের বললে, আপনারা ফিরে যান, আজ থেকে আর গাঁয়ে কোনো উপদ্রব করবে না নগেন৷

এই কথা বলে মাঝি ফিরে গেল নৌকায়৷

শবযাত্রীরা আবার নতুন করে চিতা সাজিয়ে আধখাওয়া মড়াটাকে পুড়িয়ে ফিরে গেল যে-যার ঘরে৷

নগেনের বড়ো ছেলে রওনা হয়ে গেল গয়ায়৷ সে যেদিন নগেনের নামে গয়ায় পিণ্ডি দিল, সেই দিন দুপুরেই মড়মড় করে ভয়ংকর শব্দে বটগাছের একটা ডাল ভেঙে পড়ল৷ অবাক হয়ে গ্রামবাসীরা দেখল সেই দৃশ্য৷

সে-দিন থেকে গাঁয়ে আর কোনো ভূতের উপদ্রব রইল না৷

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%