হেমেন্দ্রকুমার রায়
অনেক অনেক কাল আগেকার কথা৷
আমরা তিন বন্ধু গেছিলাম দিল্লিতে বেড়াতে৷ প্রতি বছর পূজার ছুটিতে আমরা তিন বন্ধু বাইরে কোথাও-না-কোথাও বেড়াতে যেতাম৷
তখন এদেশে ব্রিটিশ রাজত্ব৷ বাংলাদেশ তখনও দু-ভাগ হয়নি৷
সারা ভারতের লোক তখন পরম সুখে দিন কাটাচ্ছে৷ দেশে এত দাঙ্গাহাঙ্গামা ছিল না৷ এত খুনজখম ছিল না৷ এত গুন্ডামি, রাহাজানিও ছিল না৷
সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে পথে বের হতে পারত৷
তিনজনে আমরা টিকিট কেটে সেদিন সকালে তুফান মেলে উঠে বসলাম৷
ওল্ড দিল্লিটা ছিল অনেকটা আমাদের চিৎপুর রোডের মতো৷ সরু সরু রাস্তা, সরু সরু গলি, পুরোনো আমলের সব ঘরবাড়ি৷ আর আমরা যেখানে উঠেছিলাম, সেই ‘ফতেপুরী’ ছিল ওল্ড দিল্লি স্টেশনের খুব কাছে৷ ওল্ড দিল্লিতে দর্শনীয় ছিল লাল কেল্লা, জুম্মা মসজিদ, লৌহোরি গেট, আজমীরি গেট, কাশ্মীরি গেট প্রভৃতি৷
ওল্ড দিল্লি থেকে বাসে উঠে আমরা নিউ দিল্লিতে গিয়ে সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, ভাইসরয়ের বাড়ি এবং আরও নানা দ্রষ্টব্য স্থান দেখলাম৷ একদিন বাসে উঠে তিনজন গেলাম কুতুবমিনার দেখতে৷ এই ঐতিহাসিক কীর্তি দেখে খুব ভালো লাগল৷
আমরা হোটেলে ফিরে এলাম৷ এবার হাওড়ার দিকে ফিরব বলে কথাবার্তা বলছি৷ ওই হোটেলের ম্যানেজার আমাদের প্রশ্ন করলেন—আমরা কী কী দর্শনীয় স্থান দেখলাম৷
আমরা আগ্রা মথুরা থেকে দিল্লি পর্যন্ত যা যা দেখেছি সব তাঁকে বললাম৷ এমনকী সেকেন্দ্রার আকবরের সমাধি পর্যন্ত দেখেছি, বললাম৷
তিনি তখন বললেন, ‘আপনারা কুতুবপুর যাননি?’
আমরা বললাম, ‘না৷’
তিনি বললেন, ‘পূর্ণিমার রাতে কুতুবপুরের বাদশার সমাধি একটি বিশেষ দ্রষ্টব্য বস্তু৷’
আমরা প্রশ্ন করলাম, ‘সেটা এখান থেকে কতদূর?’
‘বেশি দূর নয়—মাইল পনেরো-ষোলো৷ বাসে যেতে হয় কুতুবপুরে৷ স্টেশন থেকে বাস ছাড়ে৷ তারপর হেঁটে মাইল খানেক গেলেই বাদশার সমাধি৷’
আমরা প্রশ্ন করলাম, ‘এ কোন বাদশা?’
ম্যানেজার বললেন, ‘মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর অনেক বাদশা দিল্লির সিংহাসনে আসীন হন—কিছুদিন পরেই তাঁরা আবার একে-একে চক্রান্তের শিকার হয়ে নিহত হন৷ ইনি তাঁদের মধ্যে একজন৷ এই বাদশা ও তাঁর বেগমকে চক্রান্তকারীরা ওই কুতুবপুরেই হঠাৎ আক্রমণ করে হত্যা করে৷ তাঁদের সমাধিই ওখানে আছে৷’
একটু ভেবে ম্যানেজার বললেন, ‘আগামী পরশু তো পূর্ণিমা আছে৷ ওইদিন সকালে খেয়ে-দেয়ে রওনা হবেন৷ সব দেখে পরদিন ফিরবেন৷’
আমরা রাজি হলাম৷
গাইড ধরলাম আমরা কুতুবপুরে গিয়ে৷ সে আমাদের সঙ্গে চলল বাদশার সমাধিতে৷
তখন সন্ধ্যা সাতটা৷ আমরা সমাধি থেকে কিছু দূরে একটা গাছের কুঞ্জের আড়ালে বসে রইলাম৷ মাঝে-মাঝেই এখানে এমন সব ঝোপ আছে৷ এদের বলে কুঞ্জ৷
আমরা গাইডকে প্রশ্ন করলাম, ‘এইসব কুঞ্জে সাপ-খোপ নেই তো?’
‘না, সব নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়৷’
আমরা প্রশ্ন করলাম, ‘তাহলে এই সমাধি দেখতে কি প্রায়ই লোক আসে?’
‘হ্যাঁ আসে বটে, তবে শুধু পূর্ণিমায়৷ সবাই তো এ-সমাধির কথা জানে না৷ তাই ভিড়ও হয় না৷’
আমরা চুপ করে বসে রইলাম৷
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠল৷
সঙ্গে-সঙ্গে দেখি আজব কাণ্ড৷
একটি সমাধি থেকে বাদশা এবং অন্য সমাধি থেকে বেগম বের হলেন৷
বাদশা হাততালি দিলেন দু-বার৷
সঙ্গে-সঙ্গে কোত্থেকে একটা সুন্দর সিংহাসন বার করে আনল দু-জন লোক ধরাধরি করে৷ তারপর তারা একটা আলবোলা আনল৷ তাতে সুগন্ধি তামাক সেজে দিল৷
বাদশা ও বেগম সিংহাসনে বসলেন৷
বাদশা বুড়ুক-বুড়ুক করে আলবোলা টানতে শুরু করলেন৷
অপূর্ব সুমধুর গন্ধে চারদিক যেন আমোদিত হয়ে উঠল৷ তামাকের যে এত সুমধুর গন্ধ হয়, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি৷
তামাক খাওয়া শেষ হল৷
তারপর বাদশা আবার দু-বার হাততালি দিলেন৷
সঙ্গে-সঙ্গে এসে হাজির হল বিশাল একটা সাদা ঘোড়া৷
বাদশার পরনে ছিল দামি কুর্তা, পাজামা, মাথায় দামি উষ্ণীষ৷ তাতে অনেক হিরা, মণি, মুক্তা বসানো৷ কুর্তাতেও মাঝে মাঝে হিরা, চুনি, পান্না প্রভৃতি বসানো৷
চাঁদের আলো সেগুলির ওপরে পড়ে ঝকঝক করছিল যেন৷ বাদশার কোমরে খাপে মোড়া তলোয়ার৷
বাদশা তারপর ঘোড়ার পিঠে উঠলেন৷
বেগমকে ইশারায় সিংহাসনে বসে থাকতে বললেন৷
বাদশা ঘোড়ায় চেপে ভ্রমণে বের হলেন৷
খটাখট-খটাখট করে শব্দ তুলে ঘোড়া ছুটে চলল বাদশাহকে পিঠে নিয়ে৷
একটু পরে তারা অদৃশ্য হল৷
দু-জন বাঁদি এসে বেগমের হাত-পা টিপতে লাগল৷
আমাদের চোখের সামনে একের-পর-এক এইসব দৃশ্য দেখতে লাগলাম৷ এ যেন কোনো যাত্রা-নাটকের অভিনয় দেখছি৷
মিনিট কুড়ি-পঁচিশ কেটে গেল৷
তারপর আবার দূর থেকে শোনা গেল খটাখট শব্দ৷
দেখা গেল বাদশা ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে আসছেন৷
এইসময় আমার কেমন যেন মনে হল, এইসব কিছু সাজানো নয় তো? কতকগুলি লোক হয়তো এসব অভিনয় করছে৷
আমি লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে বাদশার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে কুর্নিশ করলাম৷
বাদশা তাকালেন আমার দিকে৷
কেমন যেন নিষ্প্রভ দৃষ্টি৷ মরা কোনো জন্তু-জানোয়ারের চোখের মতো৷ সেই চোখের দৃষ্টি স্থির, চোখের পাতা নড়ছে না৷
বাদশা বললেন, ‘কোন হো তুম?’
আমি বললাম, ‘ম্যয় হুঁ এক গরিব ভিখারি বান্দা৷ বাদশাকো পাশ কুছ ভিখ মাঙতা হুঁ৷’
সঙ্গে-সঙ্গে বাদশা পকেটে হাত দিয়ে কতকগুলি সোনার আমলকী বের করে আমার দিকে ছুড়ে দিলেন৷
সেগুলি ছিটকে পড়ল৷
আমি আমলকীগুলি কুড়িয়ে পকেটে রেখে দিলাম৷ মনে মনে ভাবলাম, এতগুলি সোনার আমলকীর দাম কয়েক হাজার টাকা হবে৷
কিন্তু এদিকে কবরের কাছের সেই বাদশা ও বেগমের মূর্তি এবং তাঁদের সব সঙ্গীসাথীদের মূর্তি যেন হঠাৎ কোথায় মিলিয়ে গেল৷
গাইড ছোকরা আমার কাছে এসে বললে, ‘এ আপনি কী করলেন?’
‘কেন? কী হল?’
‘আপনার জন্যে ওরা অদৃশ্য হল৷ তা না হলে আপনারা কত কী দৃশ্য দেখতে পেতেন৷’
আমি বললাম, ‘মৃত আত্মাদের এইসব দৃশ্য দেখে লাভ কী?’
গাইড বললে, ‘এইসব দেখতেই তো লোকে আসে এখানে৷’
আমি বললাম, ‘তার চেয়ে আমি যে আমলকী পেয়েছি, তা অনেক মূল্যবান৷’
গাইড ছোকরা কিছু বললে না, শুধু মৃদু হেসে উঠল৷
আমরা ফিরে চললাম৷
পরদিন ভোর পর্যন্ত একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে গল্প করে কাটালাম৷
শুনলাম, প্রতি পূর্ণিমার রাতে চায়ের দোকানটা সারারাত খোলা থাকে৷
অবশেষে ভোরের বাসে ফিরে এলাম দিল্লি৷
হোটেলের ম্যানেজার আমাদের বললেন, ‘কেমন দেখলেন সব কিছু?’
আমরা তখন সব ঘটনা বর্ণনা করলাম৷
তিনি তখন বললেন, ‘কই দেখি আমলকীগুলো৷’
আমি পকেট থেকে সেগুলো বের করতে গেলাম৷
কিন্তু একী!
পকেটে আমলকী একটাও নেই—তার বদলে সব মাটির খোলার টুকরো৷ যেন কোনো ভাঙা মাটির হাঁড়ি বা কলসির টুকরো টুকরো চাকতি৷
বিস্ময়ে আমরা সকলেই হতবাক হয়ে গেলাম৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন