ভীমেডাকাতের বট

হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক

বড়োদিনের ছুটিতে আমাদের বন্ধু অসিতের দেশে বেড়াতে গিয়েছিলুম৷

বৈকালে শশা, নারিকেল, মুড়ি ও ফুলুরির থালা এবং চায়ের পিয়ালা টেবিলে সাজিয়ে নিয়ে বসে আমরা সবাই মিলে গল্প করছিলুম৷

অসিত বিনয় জানিয়ে বললে, ‘পাড়াগেঁয়ে ‘‘লাইট রিফ্রেশমেন্টে’’ হয়তো পেট ভরলেও তোমাদের মন ভরবে না! কিন্তু কী করব ভাই, এখানে পেলিটি কী ভীম নাগের কোনো আত্মীয়ই বাস করে না!’

পরিতোষ টপ করে একখানা মস্ত বড়ো কপির ফুলুরি মুখের গর্তে ফেলে দিয়ে বললে, ‘বহুত আচ্ছা! কলকাতায় যা পাওয়া যায়, পাড়াগাঁয়ে এসে আমরা তা চাই না! কিন্তু অসিত ভায়া, তুমি বোধ হয় ভুলে গিয়েছে যে, আমি দুনিয়ার আলো দেখেছি সেই পূর্ব-বাংলায়, যেখানে কাঁচালঙ্কাকে মনে করা হয় মুড়ি-ফুলুরির অলংকারের মতন৷ তুমি কাঁচালঙ্কাকে ‘‘বয়কট’’ করেছ কেন?’

প্রিয়নাথ বললে, ‘যেহেতু আমরা বাঙাল নই৷’

এবারে একখানা পেঁয়াজের বড়াকে চোখের নিমেষে উড়িয়ে দিয়ে পরিতোষ বললে, ‘তোমরা বাঙাল নও, কিন্তু তোমরা হচ্ছ বিখ্যাত ঘটিচোর৷ তাই লাল কাঁচালঙ্কা দেখলে লাল পাগড়ির কথা মনে করে ভয়ে তোমাদের বুক কাঁপে৷’

শ্রীপতি দুই হাত আন্দোলন করে বললে, ‘বাঙাল আর ঘটিচোর! তোমরা দুজনেই ক্ষান্ত হও! অকারণে গৃহবিবাদে দরকার নেই! তার চেয়ে অসিতের মুখ থেকে শোনা যাক, তার দেশে দ্রষ্টব্য আছে কী কী?’

অসিত বললে, ‘এখানকার ধোঁয়া-ধুলোহীন আকাশ, মোটরের উৎপাতহীন মেঠো পথ, আর জনতার চিৎকারহীন প্রান্তরের মধ্যে তোমরা হয়তো দ্রষ্টব্য কিছুই খুঁজে পাবে না৷ তবে আমাদের খঞ্জনা নদীর ধারে গেলে তোমরা অনেক হাঁস শিকার করতে পারবে৷ ঘুঘু, স্নাইপ আর চকাও পাওয়া যায়৷’

প্রিয়নাথ বললে, ‘আমি হচ্ছি বৈষ্ণবকুলতিলক৷ জীবহিংসা আমার পক্ষে মহাপাপ৷’

পরিতোষ বললে, ‘তুমি হচ্ছ ভণ্ড দি গ্রেট! আমাদের দলে তোমার চেয়ে মুরগিখোর আর কেউ নেই৷’

প্রিয়নাথ বললে, ‘হতে পারে৷ মুরগি ভক্ষণ করা আর নিধন করা—এককথা নয়৷’

শ্রীপতি বললে, ‘আহা হা, আবার বাক্যযুদ্ধ কেন? প্রিয়নাথ কেন শিকারে যেতে চায় না, আমি তা জানি৷ বন্দুকের শব্দ শুনলে তার পেটের অসুখ হয়৷ কিন্তু সে কথা যাক৷ কী বলছিলে অসিত! এখানে দেখবার জায়গা কিছুই নেই?’

অসিত একটু ভেবে বললে, ‘দেখ, এখানে একটি দেখবার বিষয় আছে বটে, কিন্তু তোমরা সেটাকে হেসেই উড়িয়ে দেবে৷’

আমি বললুম, ‘কেন?’

‘তোমরা হয়তো বলবে, সেটা মোটেই দ্রষ্টব্য নয়৷’

‘তবু সেটা কী শুনতে ইচ্ছা করি৷’

‘ভীমে-ডাকাতের বট গাছ৷’

‘বট গাছ তো পথেঘাটে ছড়াছড়ি যায়৷ কিন্তু এ বট গাছের নামটা ইন্টারেস্টিং বটে!’

‘এর কাহিনিও কেবল ইন্টারেস্টিং নয়, থ্রিলিং!’

পরিতোষ বললে, ‘আরও দু-ডজন ফুলুরির অর্ডার দিয়ে কাহিনিটা তুমি আমাদের কাছে বলতে পারো৷’

‘তথাস্তু৷’

দুই

অসিত বলতে লাগল:

‘নবাবী আমলের পর বাংলাদেশে তখন ইংরেজ রাজত্ব শুরু হয়েছে৷ খালি ইংরেজ নয়, দেশ জুড়ে তখন ঠগী, ডাকাত আর বোম্বেটেরাও রাজত্ব আরম্ভ করেছে৷ দূর দেশে যেতে হলে লোকে তখন প্রাণ হাতে করে পথে বেরোয়৷

সেই সময়েই এ-অঞ্চলে ভীমে ডাকাতের নামে সবাই হত থরহরি কম্পমান! তোমরা সবাই নিশ্চয় বিশে ডাকাতের নাম শুনেছ? বিশে ছিল অত্যাচারী ধনীর যম, কিন্তু গরিবের মা-বাপ৷ তাকে অনায়াসেই বিলিতি ডাকাত রবিনহুডের সঙ্গে তুলনা করা যায়৷ ডাকাত হলেও বিশের মধ্যে উদার মনুষ্যত্বের অভাব ছিল না৷

কিন্তু ভীমে ডাকাত ছিল সম্পূর্ণ উলটো ধরনের মানুষ৷ গরিব বা ধনী কারুকেই সে ছেড়ে দিত না৷ কেবল ডাকাতি নয়, নরহত্যাতেও ছিল তার উৎকট আনন্দ! শোনা যায়, দু-এক আনা পয়সার জন্যেও সে অগুন্তি মানুষ খুন করেছে৷ সাধারণ ডাকাতরা টাকা পেলে মিছামিছি খুনখারাপি করে না৷ ভীমে কিন্তু আগে করত খুন, তারপর নিত টাকাকড়ি৷ যে কালীকে পুজো করে ভীমে ডাকাতি করতে বেরুত, সেই কালী-মূর্তির গলায় আর কোমরে সে পরিয়ে দিয়েছিল আসল নরমুণ্ড ও কঙ্কালের মালা৷ কালী ঠাকুরের হাতে সে নাকি প্রতি রাত্রেই নিত্যনতুন মানুষের রক্তমাখা কাঁচা মাথা ঝুলিয়ে দিত৷ বনের মধ্যে এক ভাঙা মন্দিরে সেই ডাকাতে-কালী আজও বিরাজ করছেন, কিন্তু তাঁর ভীষণ অলংকারগুলো অনেক দিন আগেই খুলে নেওয়া হয়েছে৷

ভীমের চেহারাও ছিল নাকি ভয়াবহ৷ তার মতন লম্বা-চওড়া লোক কেউ কখনো দেখেনি, আর তার রং-ও ছিল মিশমিশে কালো৷ সেই কালো মুখে তার টকটকে লাল চোখদুটো জ্বলত আগুনের ভাঁটার মতন৷ তার মূর্তি দেখলেই লোকে ভয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়ত৷

ভীমে-ডাকাতের অত্যাচারে এ-অঞ্চলে লোক চলাচল যখন বন্ধ হয়ে গেল, অনেকেই যখন দেশ ছেড়ে দেশান্তরে পালাতে লাগল, তখন এক সায়েব এল সেপাইদের নিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে৷

কয়েক মাস ধরে বহু চেষ্টার পর ভীমের দলের কয়েকজন ধরা পড়ল বটে, কিন্তু ভীমের পাত্তা পাওয়া ভার! বিপদ দেখলেই সে তার ‘‘রণ-পা’’-এ চেপে হাওয়ার আগে উধাও হয়ে যেত৷ ‘‘রণ-পা’’ কি জানো? দুটো লম্বা বাঁশের লাঠি, তাতে আছে পা রাখবার জায়গা৷ এই রণ-পা ছিল বাংলার সেকেলে ডাকাতদের ভারী আদরের বস্তু৷ কারণ তার ওপরে চড়ে তারা এক রাত্রেই পঞ্চাশ-ষাট মাইল পথ অনায়াসেই পার হয়ে যেতে পারত৷ রণ-পায়ে উঠে ভীমে যে কোথায় সরে পড়ত, তার খোঁজ আর কেউ পেত না৷

কিন্তু সায়েব ছিলেন মহা বুদ্ধিমান৷ একদিন ভীমে সদলবলে এক গ্রামে ডাকাতি করতে গিয়েছে, এমন সময়ে সায়েবও সেখানে এসে পড়লেন সদলবলে৷ সেপাইরা বন্দুক ছুড়লে, জন কয়েক ডাকাত মরল বা জখম হল৷ বেগতিক দেখে ভীমে ‘‘রণ-পা’’-এ চড়ে লম্বা দিলে, সায়েবও এবারে ঘোড়ায় চেপে তার পিছু নিলেন৷ কিন্তু কিছুদূর যেতে-না-যেতেই সায়েবের ঘোড়া গেল ভীমের ‘‘রণ-পা’’র কাছে হেরে৷ খানিক পরেই ভীমে-ডাকাতের টিকিটি পর্যন্ত আর দেখা গেল না!

কিন্তু সায়েবের চোখ বড়ো সাফ৷ তিনি দেখলেন, ধূলিধূসরিত পথের ওপর দিয়ে চলে গিয়েছে ভীমের ‘‘রণ-পা’’র দীর্ঘ রেখা৷ সেই চিহ্ন ধরে তিনি এগুতে লাগলেন৷ মাইল চার পরে ‘‘রণ-পা’’র চিহ্ন যেখানে শেষ হল, সেখানে দেখা গেল যুগযুগান্তরের পুরোনো বিপুল এক বুড়ো বট গাছকে৷ তত বড়ো বট গাছ দেখা যায় না৷ তার গুঁড়ির বেড় প্রায় চবিবশ-পঁচিশ হাত৷ সেই গুঁড়ি আর শতশত ঝুরির ওপরে ভর দিয়ে এই একটিমাত্র বট গাছ অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছোটোখাটো অরণ্যের মতন দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ তার মোটা মোটা প্রত্যেক ঝুরি এক-একটা আলাদা গাছের গুঁড়ির মতন শিকড় গেড়েছে মাটির ভিতরে৷

সায়েব আন্দাজ করলেন, ভীমে নিশ্চয় এই মস্ত গাছে চড়ে ঘন ডালপালার আড়ালে কোথাও লুকিয়ে আছে৷ পিঠে বন্দুক বেঁধে তিনিও গাছে উঠলেন৷ কিন্তু বহুক্ষণ এ-ডালে ও-ডালে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ভীমেকে পাওয়া গেল না৷

হতাশ হয়ে সায়েব যখন মাটিতে নেমে পড়বার জোগাড় করছেন, তখন হঠাৎ দেখা গেল, বটের গুঁড়ির ওপর দিয়ে ধোঁয়ার চক্র বেরিয়ে আসছে৷

অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে সায়েব আরও ওপরে উঠে উঁকি মেরে দেখেন, বটের প্রকাণ্ড গুঁড়িটা একেবারে ফাঁপা, আর তার ভিতরে পরম আরামে বসে ভীমে ডাকাত আপন মনে হুঁকোয় দম মারছে৷

তামাকখোর ভীমে সে-যাত্রা আর রক্ষা পেলে না৷ এক ছিলিম তামাকের লোভেই সে নিজের প্রাণটা বিলিয়ে দিলে৷ সেই বট গাছেরই এক ডালে তাকে গলায় ফাঁসি লাগিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হল৷ কিন্তু মরবার সময়েও সে ভয় পেলে না৷ দম্ভ করে বললে, ‘‘সায়েব, আমি আমার এ আস্তানা ছেড়ে নড়ব না! ভূত হয়ে এখানেই রাজত্ব করব, এখানে যে আসবে সে আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে না!’’

সেই ফাঁপা বট গাছই আজ ‘‘ভীমে-ডাকাতের বট’’ নামে বিখ্যাত৷ শতশত ঝুরির শিকড় দিয়ে রস টেনে সে কেবল বেঁচেই নেই, আকারে আগেকার চেয়েও আরও বড়ো হয়ে উঠেছে৷ এ-অঞ্চলের প্রত্যেকেরই কাছে সে একটা দ্রষ্টব্য জিনিস হয়ে পড়েছে৷

কিন্তু রাতের বেলায় কেউ তার ত্রিসীমানায় যায় না৷

ঠাকুরদাদার মুখে শুনেছি, ভীমে-ডাকাতের কথা পরীক্ষা করবার জন্যে, সেকালে কোনো কোনো অতি বড়ো ডানপিটে রাত্রে ওই বট গাছের কাছে গিয়েছিল৷ কিন্তু তারা কেউ আর ফিরে আসেনি৷ কোনোরকম চিহ্ন না-রেখেই তারা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে!

আজ আর কেউ ভীমে-ডাকাতের কথা পরীক্ষা করতে সাহস করে না৷ সেই বট গাছের চারিদিকের জমি আজ জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে৷ জলাভূমির কাছে জ্যান্ত মানুষের বসবাস নেই, আছে কেবল মড়াদের রাজ্য—অর্থাৎ গোরস্থান!’

অসিতের কাহিনি শেষ হলে পরে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ‘তাহলে তোমাদের বিশ্বাস, রাত্রে সেই বট গাছের কাছে গেলে আজও ভীমে-ডাকাতের সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আছে?’

‘লোকে তো তাই বলে৷’

‘বট গাছটা এখান থেকে কত দূরে?’

‘চার মাইল৷’

পরিতোষ বিপুল উৎসাহে বলে উঠল, ‘আজ দ্বাদশীর চাঁদ উঠবে আকাশে৷ তারই আলোতে আমরা ভীমে-ডাকাতের সঙ্গে দেখা করব!’

অসিত বললে, ‘কিন্তু—’

শ্রীপতি বাধা দিয়ে বললে, ‘কিন্তুর নিকুচি করেছে! আমরা আজ হাতে-নাতে প্রমাণ করতে চাই, সেকেলে গাঁজাখুরি উপকথা কোনোকালেই সত্য হয় না৷’

কেবল প্রিয়নাথ আমতা আমতা করে বললে, ‘ওই বট গাছটাকে আমি থোড়াই কেয়ার করি৷ কিন্তু ওই যে গোরস্থানের কথা বললে, ওটা আমার ভালো লাগছে না৷’

কিন্তু তার প্রতিবাদ আমরা কেউ আমলেও আনলুম না৷

তিন

শীতকালের কুয়াশায় আচ্ছন্ন চাঁদের আলো দেখলেই শনিগ্রস্ত বলে মনে হয়৷ একেবারে নির্জন পথ, ঝিঁঝির ডাকে শব্দময় ও বুনো পুষ্পপত্রে গন্ধময়৷ বহুদূর থেকে নিস্তব্ধ রাত্রির বক্ষ ভেদ করে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে চলন্ত রেলগাড়ির আওয়াজ৷ এ আওয়াজ আগেও অনেকবার শুনেছি, কিন্তু আজকে শুনে মনে হল, ওই রেলগাড়িতে চড়ে যেন ইহলোকের যাত্রীরা চলেছে পরলোকের দিকে!

বন্ধুদের মুখের পানে তাকিয়ে দেখলুম৷ তাদেরও শ্বাসপ্রশ্বাস হয়েছে দ্রুত৷ কারুর মুখেই কোনো কথা নেই৷ মুখে কেউ মানি আর না-মানি, আসন্ন কোনো অলৌকিক ভাবের প্রভাবে আমাদের সকলেরই মন আজ মোহগ্রস্ত!

এখানে মানুষের শেষ আশ্রয় হচ্ছে সরকারি ডাকবাংলো৷ তাকেও পিছনে ফেলে মাইল খানেক এগিয়ে গেলুম৷

তারপর একদিকে আঙুল দেখিয়ে অসিত চুপি চুপি বললে, ‘ওটা হচ্ছে গোরস্থান!’

মৃতের সেই মৌন জগতেও জীবন্ত ঝিঁঝিদের ভাঙা গলার অশ্রান্ত আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে৷ কী-একটা কালো জন্তু আমাদের সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে একটা উঁচু কবরের আড়ালে পালিয়ে গেল৷ প্রিয়নাথ ছিল সব পিছনে৷ সে এগিয়ে সকলের মাঝখানে এসে দাঁড়াল৷ তার মুখের ভাব অস্বাভাবিক৷

শ্রীপতি বললে, ‘কিন্তু সেই বুড়ো বট গাছটা কোথায়?’

অসিত নীরবে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে৷

একটা মস্তবড়ো জলাভূমি দৃষ্টিসীমা জুড়ে ধু-ধু করছে এবং তারই ওপরে পড়ে হিংস্র দাঁতের মতন চকচক করে জ্বলছে কুয়াশায় আধমরা চাঁদের আলো৷ জায়গায় জায়গায় কুয়াশা এত ঘন যে তাকে ঠেলে চোখ চলে না৷ জলারই একপাশে পাহাড়ের মতন উঁচু প্রকাণ্ড একটা ঢিপির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, শূন্যের অনেকটা পূর্ণ করে বিপুল সেই বট গাছ৷ কেউ বলে না-দিলে আমরা তাকে অরণ্য বলেই ধরে নিতুম! আবছায়াময় রহস্যময় জ্যোৎস্নায় বৃদ্ধ বটের ডালপালা শীতার্ত হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে সজোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে এবং তার তলায় জমে আছে বিরাট ও নিরেট একখানা অন্ধকার৷

প্রিয়নাথ অর্ধস্ফুট স্বরে বললে, ‘ওগুলো কী? ওগুলো? ওই যে, নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে? কী ওগুলো?’

শ্রীপতি বললে, ‘আলেয়া৷’

প্রিয়নাথ বললে, ‘আমার মনে হচ্ছে, যাদের দেখা যায় না তারা ওই জলায় আগুনের ফুটবল নিয়ে ‘‘ওয়াটার-পোলো’’ খেলছে!’

মনে মনে ভাবছি, এ-স্থানটা গোরস্থানের চেয়েও স্তব্ধ, কারণ, এখানে ঝিঁঝিরাও ডাকছে না৷ ঠিক সেইসময় নানা শব্দে চতুর্দিক হঠাৎ জাগ্রত হয়ে উঠল! প্রথমে চিৎকার করে উঠল বিকট স্বরে একপাল শেয়াল, তারপরই কোথা থেকে চেঁচাতে লাগল তিন-চারটে প্যাঁচা এবং তারপরই শুনতে পেলুম মাথার ওপরে একদল বাদুড়ের ডানার ঝটপট ঝটপট শব্দ—যেন কী দেখে ভয় পেয়ে তারা প্রাণপণে উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে!

প্রিয়নাথ সচকিত কণ্ঠে বললে, ‘ওহে, এখানে দাঁড়িয়ে মিছামিছি আর হিম লাগিয়ে আর শীতে কেঁপে কী হবে? এবারে ফেরা যাক, আর নয়!’

পরিতোষ ঠাট্টা করে বললে, ‘কী হে অসিত, তোমার ভীমে-ডাকাত কোথায়?’

শ্রীপতি বললে, ‘ভীমে-ডাকাত আজ বোধ হয় নরকের দরজা খোলা পায়নি!’

আচম্বিতে একটা বরফের মতন ঠান্ডা-কনকনে হাওয়ার ঝটকা উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গে আলেয়াদের দলে যেন একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল৷ কাকে দেখে তারা যেন দু-ভাগে ভাগ হয়ে পথ ছেড়ে দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে!

প্রিয়নাথ কাঁদো কাঁদো গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, ‘কুয়াশার একটা মেঘ আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে! ওর পিছনে কী আছে, কে জানে!’

পরিতোষ চিৎকার করে বললে, ‘কোথায় হে ভীমে-ডাকাত! দয়া করে একবার দেখা দাও!’

সেই মুহূর্তে শুনতে পেলুম, জলার জলে ছপ-ছপ-ছপ-ছপ-ছপ-ছপ করে কীসের শব্দ উঠল৷

দুই চোখ পাকিয়ে অসিত ক্ষীণ স্বরে বললে, ‘মনে হচ্ছে কে যেন ‘‘রণ-পা’’-এ চড়ে জলা পেরিয়ে আমাদের দিকেই আসছে!’

আড়ষ্টভাবে অবরুদ্ধ কণ্ঠে শ্রীপতি বললে, ‘কোথায় ‘‘রণ-পা’’?...কোথায় কে?’ তার স্বরে এখন কিন্তু আর কৌতুকের ভাব ছিল না৷

আমি দুর্বল স্বরে বললুম, ‘কেবল একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে, আর একখানা ঘন কুয়াশার মেঘ হু-হু করে এগিয়ে আসছে!’

প্রিয়নাথ হঠাৎ বিকট ও বিশ্রী এক চিৎকার করে পাগলের মতন দৌড় মারলে! সে অমনভাবে চেঁচিয়ে না পালালে আমরা কী করতুম জানি না৷ কিন্তু ভয় হচ্ছে এমন সংক্রামক যে, দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে আমরাও ছুটতে লাগলুম প্রিয়নাথের সঙ্গে সঙ্গে!

গোরস্থান ছাড়িয়ে মিনিট-পাঁচেক ছোটবার পর আমরা আবার দাঁড়িয়ে পড়লুম৷

পরিতোষ হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, ‘ঘটি, তুমি হঠাৎ পালিয়ে এমন ভয় দেখালে কেন?’

প্রিয়নাথ হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, ‘বাঙাল, তোমাকে তো আমার পিছু নিতে বলিনি, তুমি পালালে কেন?’

পরিতোষ কী জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ শিউরে উঠে থেমে গিয়ে আবার দৌড় মারবার উপক্রম করলে! আমরাও আড়ষ্ট হয়ে শুনতে পেলুম, আমাদের পিছনে পথের ওপরে জেগে উঠেছে, ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের খটমট শব্দ!

শ্রীপতি সভয়ে বললে, ‘‘‘রণ-পা’’-র শব্দ কি ঘোড়ার পায়ের শব্দের মতো?’

কিন্তু কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিলে না, কারণ তখন আমরা সকলেই ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার চেয়েও দ্রুতবেগে আবার ছুটতে শুরু করেছি! পিছনের শব্দও যত এগিয়ে আসে, আমরাও তত বেশি পা চালাতে থাকি—এ যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের দৌড়ের পাল্লা!

এবারে একেবারে এসে থামলুম ডাকবাংলোর সীমানার মধ্যে৷ আমাদের দমাদ্দম পদাঘাতে বাংলোর দরজা ভেঙে পড়ে আর কী! রক্ষী দরজা খুলে দিয়ে বিস্মিত স্বরে বললে, ‘কী হয়েছে বাবু, কী হয়েছে?’

আমি বললুম, ‘কিছু হয়নি৷ আজ রাত্রে আমরা এখানে থাকব৷’

একটা ঘরে ঢুকে যে যেখানে পারলুম হাত-পা এলিয়ে বসে পড়লুম৷

বাইরের স্তব্ধ পথের ওপরে আবার সেই ভয়াবহ ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল৷ বেশ বুঝলুম, শব্দটা বাংলোর সীমানার মধ্যে এসে থামল৷

আমার হৃৎপিণ্ড বুকের ভিতরে ছটফট করে লাফাতে লাগল!

রক্ষী আবার দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে পরিতোষ ছুটে গিয়ে তাকে চেপে ধরে উন্মত্তের মতন বলে উঠল, ‘খবরদার, দরজা খুলে দিও না!’

রক্ষী আশ্চর্য হয়ে বললে, ‘দরজা খুলে দেব না কী বাবু? আজ যে এখানে পুলিশ-সায়েবের আসবার কথা আছে!’

চার

ঘোড়া থেকে নেমে পুলিশ-সায়েবই বাংলোর ভিতরে প্রবেশ করলেন৷

আমরা বোকা এবং বোবার মতন পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলুম৷

খানিক পরে পরিতোষ বললে, ‘ওই কাপুরুষ প্রিয়নাথই যত নষ্টের গোড়া!’

প্রিয়নাথ বললে, ‘জলায় যাওয়ার রাস্তা খোলাই আছে৷ তুমি আবার সেখানে গেলে আমি বারণ করব না৷’

অসিত বললে, ‘হতে পারে, পথ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পুলিশ-সায়েবই আসছিলেন৷ কিন্তু জলার জলে যে ছপ ছপ করে শব্দ হচ্ছিল, সেটা কীসের শব্দ?’

শ্রীপতি বললে, ‘হয়তো কোনো জন্তু সাঁতরে জলা পার হচ্ছিল৷ আমরা রজ্জুতে সর্পভ্রম করেছি, কাল আমরা আবার এই বট গাছ দেখতে আসব৷’

কিন্তু যাঁরা এই কাহিনি শুনছেন তাঁদের কানে কানে আমি জানিয়ে রাখছি যে, পরদিনের সন্ধ্যায় বট গাছ দেখতে আসবার কথা আমরা সকলেই আশ্চর্যরূপে ভুলে গিয়েছিলুম৷ আজও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সেই ছপ-ছপ শব্দ শুনি আর গলদঘর্ম হয়ে জেগে উঠি! আজও মনে মনে প্রশ্ন জাগে—সে শব্দটা কীসের?

তোমরা কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারো?

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%