প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ

হেমেন্দ্রকুমার রায়

রক্তলোভীর গর্জন

নাচতে-নাচতে ভেসে যাচ্ছিল নৌকো। কেবল নৌকো নয়, নাচছিল মহানদীর স্রোতে আলো ছায়া, চাঁদ আর তারা।

নদীতীরের বনভূমি থেকে বার্তাস বহন করে আনছিল অশ্রান্ত পত্রমর্মর। অনেক দূর থেকে তান ধরেছিল কোনও এক গানের পাখি চঞ্চল হয়ে আনন্দের ছন্দে।

অরণ্যের মাঝখানে দেখা যাচ্ছে একটা মস্ত পাহাড়কে ঝাপসা ঝাপসা। যেন ওখানে কৌতূহলী পৃথিবী তৃণশয্যায় উঁচু হয়ে শূন্যে মাথা তুলে দেখে নেবার চেষ্টা করছে প্রকৃতির সাজঘর।

নৌকোচালনা করছিল দুই বন্ধু প্রমোদ এবং প্রফুল্ল। কারুর বয়সই পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি নয়। মাঝে-মাঝে তারা শখ করে এমনি নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

সন্ধ্যা ক্রমে হারিয়ে গেল রাত্রির মাঝখানে। কোনওদিকে আর কোনও জীবের সাড়া নেই। শোনা যায় কেবল অরণ্যের শ্যামল ভাষা আর নদীর জল-রাগিণী।

নৌকোচালনা ছেড়ে দুজনেই হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল নীলাকাশ-জোড়া তারকা-সভার সভাপতি চাঁদের দিকে।

প্রফুল্ল বললে, ‘প্রমোদ, একটা গান শোনাও।'

প্রমোদ জবাব দিলে না।

প্রফুল্ল আবার বললে, 'আজকের রাত ভালো লাগছে। তুমি একটি গান গেয়ে তাকে আরও সুন্দর করে তোলো।'

প্রমোদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, ‘গান গাইতে ভালো লাগছে না।'

— “কেন?”

– মনে হচ্ছে যেন কী এক চরম অমঙ্গল আমার সঙ্গে দেখা করবার চেষ্টা করছে। সকৌতুকে হেসে উঠল প্রফুল্ল।

প্রমোদ বললে, 'হাসলে যে?’

—এমন সুন্দর রাত, এমন চাঁদের আলো, এমন নদীর গান, এর ভিতরে তুমি অমঙ্গলকে সন্ধান করছ?'

—আমি সন্ধান করছি না প্রফুল্ল, অমঙ্গলই করছে আমাকে সন্ধান। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি পরলোকের সিংহদ্বার।'

প্রফুল্ল একটুখানি চুপ করে থেকে বললে, 'ভাই প্রমোদ, তোমার মুখে প্রায়ই এমনি সব কথা শুনতে পাই। এর কারণ কী বলো তো?”

—বন্ধু, বিনা কারণে কেউ অমঙ্গলকে ধ্যান করে না!'

—অমঙ্গলকে ধ্যান? '

—হ্যাঁ, এখন অমঙ্গলই হচ্ছে আমার একমাত্র ধ্যান-ধারণা! —'তুমি পাগল।'

— যদি তুমি আমার জীবনের কথা জানতে, তাহলে আমাকে পাগল বলতে তোমার বাধত।’

—এ কথা তোমার মুখে সাজে না।'

– কেন? ’

—"নিজের জীবনকে তুমি তো নিজেই রহস্যের এক ঘেরাটোপ দিয়ে ঢেকে রেখেছ। কতবার তোমার জীবনের কথা শুনতে চেয়েছি, কিন্তু তুমি কি কোনওদিনই আমার প্রার্থনা পূর্ণ করেছ।'

প্রমোদ উঠে বসল ধীরে ধীরে। তারপর আস্তে-আস্তে বললে, ‘কেন যে তোমাকে আমার জীবনের কথা বলিনি তা কি তুমি জানো?

—'কেমন করে জানব বলো? আমি গনতকার নই।'

—আমার জীবনের কথা হচ্ছে অলৌকিক। '

— “অলৌকিক?”

—"হ্যাঁ। অলৌকিক বা অপার্থিব। শুনলে তুমি বিশ্বাস করবে না।’

—তোমার চেয়ে বড়ো বন্ধু আমার আর কেউ নেই। তোমার কথায় আমি করব অবিশ্বাস !’

—কেবল অলৌকিক নয়, আমার জীবনের কথা হচ্ছে ভয়ঙ্কর! তোমার সর্বাঙ্গ হবে রোমাঞ্চিত! শেষ পর্যন্ত হয়তো সহ্য করতে পারবে না!’

প্রফুল্ল সবিস্ময়ে প্রমোদের মুখের পানে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল বোবার মতো। তারপর সে-ও উঠে বসে হাসতে হাসতে বললে, ‘বন্ধু, জীবন বড়ো একঘেয়ে। কিন্তু তোমার কথায় পাচ্ছি ‘অ্যাডভেঞ্চারে'র গন্ধ। রোমাঞ্চিত হতে আমি ভালোবাসি। পৃথিবীতে বসেই যদি অপার্থিবের সন্ধান পাওয়া যায়, তাও মন্দ লাগবে বলে মনে হচ্ছে না! বেশ, ব্যক্ত করো তোমার জীবন-কাহিনি !

চাঁদের দুধের-ধারা-মাখা নদীর স্রোতের সঙ্গে নৌকো ভেসে যাচ্ছিল আপনা-আপনি। হঠাৎ থেমে গেল বাতাসের উচ্ছ্বসিত গতি, স্তব্ধ হয়ে গেল বনমর্মর। ক্ষীণ হয়ে এল নদীর কলতান ৷ এবং সেই স্তব্ধতার মধ্যে আচম্বিতে জাগ্রত হল কোথায় রক্তলোভী ব্যাঘ্রের ভয়াবহ গর্জন। শিউরে উঠে প্রমোদ বললে, ‘শুনলে?'

—'কী? ’

—কোথায় বাঘ ডাকছে?’

— ডাকুক্‌-গে! তাতে আমাদের কী?’

—“কিছু না। বিশ্বাস করো আর না-করো, শোনো তবে আমার কথা ৷ '

প্রেতপর্বত

আমরা যখন আসামের এক জঙ্গলে বাস করতুম, তখনকার কথাই আমি ভালো করে বলব। কিন্তু আমাদের আদি বাস ছিল বাংলাদেশে, চব্বিশ পরগনা জেলায়। যে কারণে আমাদের নিজের দেশ ছাড়তে হয়েছিল, আগে সেই কথাই বলি।

ভাই-বোন আমরা ছিলুম তিনটি। দাদা, আমি আর মায়া। বাবা খুব ধনী না হলেও লাখ- খানেক টাকার মালিক ছিলেন! তারই সুদে স্বাধীনভাবে চলত আমাদের সংসার।

মায়াকে প্রসব করবার পরেই আমার মা মারা পড়েন। বাবা ছিলেন পরম হিন্দু, মাকে বাঁচাবার জন্যে তিনি অনেক ঠাকুর-দেবতার কাছে গিয়ে ধরনা দিয়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুর- দেবতারা মোটা টাকার প্রসাদ খেয়েও মাকে বাঁচাবার জন্যে যৎসামান্য চেষ্টাও করেননি।

তার ফলে বাবা হিন্দু-দেবতাদের নাম শুনলেই রেগে আগুন হয়ে উঠতেন। এবং মায়ের শোকে বাবার মস্তিষ্ক বোধহয় কিঞ্চিৎ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। যে কারণেই হোক বাবা হঠাৎ খ্রিস্টধর্ম অবলম্বন করলেন।

এসব ব্যাপারে বাংলার পল্লিসমাজে কীরকম বিশ্রী আন্দোলন জাগে, সেটা বোধহয় তোমাকে বর্ণনা করে বুঝিয়ে দিতে হবে না। কেবল প্রতিবেশীরা নয়, গ্রামের জমিদার পর্যন্ত গেলেন খেপে। চারিদিকে রক্তচক্ষু, চারিদিকে গালাগালি।

একদিন জমিদারবাড়িতে বাবার ডাক পড়ল। সেখানে কোন দৃশ্যের অভিনয় হবে সেটা আন্দাজ করতে পেরে বাবা নিজের বাড়িতেই বসে রইলেন।

ক্রুদ্ধ জমিদারবাবু সেইদিনের সন্ধ্যাতেই পাঠিয়ে দিলেন এক যষ্টিধারী দরোয়ান। বাবা বাইরের ঘরে বসেছিলেন। দরোয়ান সোজা ঘরের ভিতর ঢুকে জানালে, তার উপরে হুকুম হয়েছে বাবাকে কান ধরে টেনে নিয়ে যাবার জন্যে।

বাবা অল্প-কথার মানুষ ছিলেন। সংক্ষেপেই বললেন, ‘একবার সেই চেষ্টা করেই দ্যাখো না।’

বিনাবাক্যব্যয়ে দরোয়ান হল একেবারে কুপোকাৎ। মুহূর্তে তার আত্মা হল দেহহীন। এমন অঘটন যে ঘটবে বাবা কল্পনাও করতে পারেননি। দরোয়ানকে হত্যা করবার ইচ্ছা তাঁর মোটেই ছিল না।

কিন্তু বিপদে পড়েও বাবা বুদ্ধি হারালেন না! তাড়াতাড়ি নিতান্ত দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেললেন। তারপর কেউ কিছু টের পাবার আগেই রাত্রের অন্ধকারে তিনি আমাদের নিয়ে দেশত্যাগ করলেন।

তারপর কেমন করে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে বাবা সুদূর আসামের জঙ্গলের ভিতরে গিয়ে বাসা বাঁধলেন, তা রোমাঞ্চকর হলেও এখানে সেসব সবিস্তারে বলবার দরকার নেই।

ভারতবর্ষের সর্বত্রই বনে-বনে এমন অনেক লোক বাস করে যারা শিকারি বলে আত্মপরিচয় দেয়। শিকার করাই তাদের পেশা!-বাবা কী বলে আত্মপরিচয় দিতেন তা আমি জানি না, তবে আমার বিশ্বাস তিনি শিকারি বলেই নিজেকে পরিচিত করেছিলেন।

যখন আসামের জঙ্গলে আসি তখন আমি খুব ছোটো, সব কথা ভালো করে মনে পড়ে না। খান-চারেক কুটির তুলে বাবা বাঁধলেন বনের বাসা। সেখান থেকে মানুষের বসতি ছিল মাইল-কয়েক দূরে। বিশেষ দরকার না থাকলে বাবা লোকালয়ের দিকে পা বাড়াতেন না। আমাদের গোরু ছিল, ছাগল ছিল আর ছিল হাঁস আর মুরগি। এবং বাসার পিছনে খানিকটা ঘেরা-জমির ভিতরে ছিল শাক-সবজির বাগান। চাল-ডাল প্রভৃতি আসত মাঝে-মাঝে দূরের লোকালয় থেকে। বাবাও প্রত্যহ বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন বনে-বনে শিকারের সন্ধানে। প্রায়ই পাখি বা হরিণ মেরে আনতেন। সুতরাং বুঝতেই পারছ, জঙ্গলের ভিতরেও আমাদের মোটামুটি খোরাকের অভাব হয়নি।

সে বনের ছবি উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার মনের ভিতরে। একাধারে তা অপূর্ব, বিচিত্র, ভয়াবহ! সুন্দরের সঙ্গে ভীষণের তেমন সম্মিলন আমি আর কোথাও দেখিনি। আমাদের বাসার পরেই ছিল খানিকটা ঘাস ও আগাছা-ভরা জমি এবং তারপরেই একটি ছোটো নদী। বৎসরের অন্য সময়ে নদীটি বালির বিছানার উপর দিয়ে শীর্ণ জল-রেখা এঁকে ঝির-ঝির করে বয়ে যেত এবং তখন তার গান শোনাত মৃদু গুঞ্জনের মতো। কিন্তু বর্ষার সময়ে সে হয়ে উঠত সত্যসত্যই ভয়ঙ্করী! দুই তটের আগল ভেঙে ছড়িয়ে পড়ত অনেকদূর পর্যন্ত এবং প্রচণ্ড জলধারা ফুলতে ফুলতে, ফেনার শুভ্রতা ছড়াতে-ছড়াতে এবং উন্মাদিনী বন্যার মতন গর্জন করতে করতে চমকিত করে তুলত শ্রবণ-মন-নয়নকে! তার ছোট্ট ও শান্ত মূর্তি তখন কল্পনাও করা যেত না।

নদীটির জন্ম তার উত্তরদিককার বিশাল পর্বতপুরীর মধ্যে। সেখানে পাহাড়ের পর পাহাড়ের প্রস্তর-স্তূপ ক্রমেই উঁচু হয়ে উপরপানে উঠে গিয়ে নীলাকাশের অনেকখানি ঢেকে ফেলেছে একেবারে। শিখরের পর শিখর, শিখরের পর শিখর—যেন অজানা, রহস্যময় ও বিভীষণ- দেবতাদের পূজার জন্যে যেসব মন্দির গড়া হয়েছে ওগুলো হচ্ছে তাদেরই চুড়ো!

এ-অঞ্চলের কোনও লোকই একলা ওই পর্বতপুরীর মধ্যে ঢুকতে সাহস করত না, দিনের বেলাতেও। সন্ধ্যা নামলে দলে ভারী হলেও সকলে ওখান থেকে পালিয়ে আসত। তাদের বিশ্বাস, সূর্য অস্ত গেলেই ওখানে যাদের আসর বসে তারা কেউ জন্তুও নয়, মানুষও নয় ৷ ওখানে যাওয়া আর যমালয়ে যাওয়া নাকি একই কথা। বিশেষ করে একটি পাহাড় নাকি এমনি ভয়ানক যে, লোকে তার নাম রেখেছে, ‘প্রেতপর্বত’। বাবা আগে এইসব জনরব অলস জল্পনা-কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতেন বটে, কিন্তু পরে তাঁকেও করতে হয়েছিল মত-পরিবর্তন। নদীর পূর্ব-পারে আমাদের কুটির। এদিকেও জঙ্গল আছে বটে, কিন্তু তা খুব ঘন বা দুর্গম

নয়। এদিকে কাঠ-কাটা বা মধুসংগ্রহ প্রভৃতির জন্যে মানুষের চলাচলও আছে।

কিন্তু নদীর পশ্চিম দিক থেকে আরম্ভ হয়েছে যে বিরাট ও গভীর অরণ্য মনুষ্যের পক্ষেও তা অগম্য স্থান বললেও অত্যুক্তি হবে না! সে অরণ্যের অনেক জায়গাই দিবালোকের স্পর্শও পায়নি কখনও। সেখানকার অধিকাংশ বৃক্ষই পরস্পরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে সর্বদাই করে যেন মর্মর-ভাষায় আর্তনাদ। তাদের তলায় এবং আশেপাশে বাস করে যে নিবিড় অন্ধকার, মানুষের দৃষ্টি যেন তার গায়ে ধাক্কা খেয়ে আহত হয়ে আবার বাইরে পালিয়ে আসে সভয়ে!

ওই অরণ্যের বাসিন্দা হচ্ছে হাতি, বাঘ, ভাল্লুক, বন্য বরাহ, মহিষ, নেকড়ে, অজগর এবং অন্যান্য সর্প প্রভৃতি। তাদের অনেকেই নদী পার হয়ে আমাদের এদিকেও মাঝে-মাঝে বেড়াতে আসত। তাই বাবার হুকুম ছিল, তিনি বাইরে গেলে আমরা যেন ঘরের ভিতরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকি। ছেলেমানুষি খেয়ালে হয়তো বাবার অনুপস্থিতির সময়ে এক-আধ দিন বাইরে বেরিয়ে পড়তে পারতুম, কিন্তু দিনের বেলাতেও অরণ্যের ভিতর থেকে যেসব হিংস্র জীবের হুঙ্কার ভেসে আসত তা শুনে কোনওদিন আমরা কেউ পিতার অবাধ্য হতে ভরসা করিনি। আর রাত্রে তো সে অরণ্য হয়ে উঠত রোমাঞ্চকর শব্দময়! কত বৃহৎ জন্তু করত গর্জনের পর গর্জন, আবার কত জন্তুর কণ্ঠে ফুটত কাতর মৃত্যুক্রন্দন! মাঝে মাঝে মাতঙ্গের দল আমাদের কুটিরের চারিদিকে ভূমিকম্প জাগিয়ে ছুটে চলে যেত আর কুটিরের ভিতরে পরস্পরকে জড়াজড়ি করে বসে আমরা তিনটি ভাই-বোন ভয়ে কেঁপে-কেঁপেই সারা হতুম, কারণ ওদের কোনও-একটি জীবের শুণ্ডের আঘাতে বা দেহের ধাক্কায় আমাদের কুটির তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারত যখন-তখন!

বাবা আমাদের দুই ভাইকে যে খুব ভালোবাসতেন এটা আমরা বেশ বুঝতে পারতুম। কিন্তু আমাদের বোন মায়ার সম্বন্ধে তিনি ছিলেন বেশ খানিকটা উদাসীন। মায়াকে প্রসব করতে গিয়েই যে আমাদের জননীকে ইহলোক ত্যাগ করতে হয়েছে, এই চিন্তাই বোধকরি তাঁকে করে তুলেছিল মায়ার প্রতি বিমুখ। মায়ার সম্বন্ধে তিনি নিজের কর্তব্যপালন করতেন মাত্র, কিন্তু তাঁর প্রাণের স্নেহ পায়নি সে কোনওদিন।

বেচারা মায়া! সে হচ্ছে জন্মদুঃখিনী। জ্ঞান হবার আগেই মাতৃহারা, পিতার স্নেহ থেকেও বঞ্চিত। জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যে থাকে ভগবানের হাত, মা যে বেঁচে নেই এজন্যে তাকে দায়ী করলে চলবে কেন? মায়ের প্রতি বাবার ছিল অন্ধ ভালোবাসা, তাই বোধহয় তিনি বুঝেও বোঝেননি এই সত্য কথাটা।

মায়া কিন্তু বাবাকে কী ভালোই বাসত! যদিও আমরা তার মুখ দেখেই বুঝতুম, তার প্রতি যে বাবার দরদ নেই এটা সে সর্বদাই অনুভব করতে পারত। তার শিশু-মন কী ভাবত জানি না, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই তার মুখ হয়ে থাকত বিমর্ষ।

আমরা দুই ভাই মিলে প্রাণপণে চেষ্টা করতুম পিতার এই স্নেহের অভাব পূরণ করবার জন্যে। মায়া ছিল আমাদের প্রাণের পুতলি।

আর মায়া ছিল পরমাসুন্দরী—তার সর্বাঙ্গে ছিল গোলাপ-পাপড়ির রং আর কোমলতা। তার সেই ঢল-ঢল মুখের পানে তাকালে অতি-পাষণ্ডেরও মন বিগলিত না হয়ে পারত না। নিজের বোন বলে বলছি না, কিন্তু এমন রূপের ডালি পৃথিবীর মাটিতে আর আমি দেখিনি। প্রফুল্ল, আজ যদি তোমার সামনে মায়াকে এনে দেখাতে পারতুম তাহলে তুমি বুঝতে যে আমি অত্যুক্তি করছি না একটুও। কিন্তু হায়, মায়াকে আর কেউ দেখতে পাবে না!

কী জিজ্ঞাসা করছ? মায়া বেঁচে আছে কি না? না, সে অভাগিনি আর বেঁচে নেই। কেমন করে সে মারা পড়ল? এখনই সেই কথাই বলব।

বনবাসে এসে বাবাকেও কোনওদিন সুখী দেখিনি। হাসতে তিনি যেন ভুলেই গিয়েছিলেন এবং তাঁর মুখের কথা হত প্রায়ই বিরক্তিভরা। হয়তো এই সমাজ-পরিত্যক্ত জীবন তাঁর পক্ষে ছিল অসহনীয়। হয়তো মায়ের অভাব তিনি অনুভব করতেন পদে পদে। হয়তো একটা মানুষের প্রাণ গিয়েছে তাঁরই হাতে, এই দুশ্চিন্তা তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখত সর্বক্ষণ।

দায়ে পড়লে মানুষ প্রবীণ হয় অল্প-বয়সেই। সকালের আহারাদি সেরে বাবা প্রত্যহই বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে যেতেন বাইরে। তারপর প্রায়ই ফিরে আসতেন রাত্রিবেলায় অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায়। কোনও জীব শিকার করে আনলেও সেদিন আর রান্নাবান্নার সময় থাকত না। সেইজন্যে দুপুরের পর থেকেই আমরা তিন ভাই-বোনে মিলে রাত্রের আহার্য প্রস্তুত করবার জন্যে নিযুক্ত হয়ে থাকতুম। আমরা কীরকম রান্না করতুম জানি না; বাবা কিন্তু আমাদের তৈরি-করা খাবার গ্রহণ করতেন পরম পরিতুষ্টের মতো।

এইভাবেই কিছুকাল ধরে আমরা জীবন যাপন করলুম। তারপরেই আরম্ভ হল যেসব ঘটনার ধারা, বললেও তুমি হয়তো তা ধারণা করতে পারবে না। দাদার বয়স তখন নয়, আমার সাত আর মায়ার পাঁচ বৎসর।

প্রেতপর্বতের অন্তঃপুরে

শীত পড়ল! পাহাড়ে-দেশের আসল বন্য-শীত। এখানে বসে ওদেশি শীতের মর্ম কিছুতেই তোমরা আন্দাজ করতে পারবে না!

রাত হয়েছে, গহন বনের শীতার্ত রাত্রি। দরজা-জানলা বন্ধ করে আমরা তিনজনে উনুন ঘিরে বসে আগুন পোয়াচ্ছিলুম। বাবা সারা দিনের পর ফিরে শ্রান্ত দেহে শয্যায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

বাইরে হিমকাতর ঝোড়ো হাওয়া হু-হু-হু-হু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বনে-বনে ঘুরে কাঁদিয়ে তুলছিল সবুজ পাতাদের।

দাদা বললেন, ‘কী রাত! এ-সময়ে যারা বাইরে আছে তাদের কী অবস্থা!”

মায়া কচি মুখখানি তুলে বললে, 'হাতি আর বাঘ বেচারিদের তো ঘরবাড়ি নেই। আহা, না জানি তাদের কত কষ্ট হচ্ছে।'

ঠিক সেই সময়ে আমাদের দরজার ওপাশে জাগল একটা গর্জন। বাবা ধড়মড়িয়ে বিছানার উপরে উঠে বসে বললেন, ‘নেকড়ে!’

মায়া আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে সভয়ে বলে উঠল, ‘মাগো!’ আমি বললুম, ‘এখন ভয় পাচ্ছিস কেন? এই তো শীতে ওদের কষ্ট হচ্ছে বলে দুঃখ করছিলি। যা, উঠে গিয়ে ওকে দরজা খুলে দে!'

বাবা বললেন, ‘এ তো ভালো কথা নয়। দেখতে হল।'

তিনি বিছানা থেকে নেমে পড়লেন। তারপর বন্দুকটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। আমি দরজাটা আবার ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলুম।

আধ ঘণ্টা, এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা কেটে গেল। তবু বাবা ফিরলেন না। বন্দুকের শব্দ বা নেকড়ের গর্জনও শুনলুম না। ঘুমের কথা ভুলে আমরা তিনজনে বসে-বসে ভাবতে লাগলুম, এমন কনকনে ঠান্ডা রাতে বাবা এতক্ষণ ধরে বনের ভিতরে কী করছেন? কোনও বিপদে পড়েননি তো?

ছোট্ট খুকি মায়া, তন্দ্রার ঝোঁকে থেকে-থেকে তার মাথা নুয়ে পড়ছে, তবু সে-ও ঘুমোতে পারলে না।

ব্যাপারটা যা হয়েছিল, পরে বাবার মুখে শুনেছি।

সে রাতে আকাশে ছিল চাঁদ। জ্যোৎস্নার ধবধবে আঁচলে চাপা পড়েছিল অন্ধকার। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে বাবা দেখলেন, প্রায় ত্রিশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা প্রকাণ্ড দীপ্তচক্ষু নেকড়ে বাঘ। বাবাকে দেখেই সে গজরাতে গজরাতে আরও খানিক তফাতে গিয়ে দাঁড়াল।

জানোয়ারটাকে অত দূর থেকে গুলি করলে লক্ষ্য ব্যর্থ হবে, এই ভেবে বাবা বন্দুক তুলে তাড়াতাড়ি তার দিকে অগ্রসর হলেন।

একই অভিনয় চলল খানিকক্ষণ ধরে। বাবা যত এগিয়ে যান, নেকড়েটাও তত এগিয়ে যায়। বাবা যেই দাঁড়ান, সে-ও দাঁড়িয়ে পড়ে দুই চক্ষে অগ্নিবৃষ্টি করে গজরাতে থাকে। বাবা ছুটলে সে-ও ছোটে, বাবা ধীরে ধীরে চললে সে-ও চলে ধীরে ধীরে।

বাবা ভারী একরোখা ছিলেন। তাঁরও গোঁ হল যেমন করে হোক আজ ওই নেকড়েটাকে বধ করবেনই। তিনি ছুটলেন পশুটার পিছনে-পিছনে, মাইলের পর মাইল পার হয়েও থামলেন না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল তবু হুঁস নেই।

তারপরেই নেকড়ের সঙ্গে-সঙ্গে বাবা এসে পড়লেন প্রেতপর্বতের তলদেশে। তার সম্বন্ধে জনরব কী বলে সেটা তাঁর অজানা ছিল না। কিন্তু তিনি সেসব কথাকে কুসংস্কার বলেই উড়িয়ে দিয়েছেন বরাবর।

প্রেতপর্বতের বুকের ভিতরে লক-লক করে খেলা করছিল অগ্নিশিখা। বাবা স্থির করলেন, দাবানল। বনে যাদের বাস প্রায়ই তাদের পরিচয় হয় দাবানলের সঙ্গে। কিন্তু এমন প্রচণ্ড শীতকালে হিমে-ভেজা বনে কি দাবানল জ্বলে? শিকারের উত্তেজনায় বাবার মনে এ-প্রশ্ন জাগল না।

দাবানল জ্বলছে দাউ দাউ দাউ। কে যেন অপবিত্র নরকাগ্নির খানিকটা নিক্ষেপ করেছে প্রেতপর্বতের মধ্যে। তারই শিখাগুলোকে নিয়ে কারা যেন দুরন্ত আহ্লাদে লাফালাফি দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে পাহাড়পুরের বনে-বনে-গাছে-গাছে।

একে জ্যোৎস্না, তার উপরে দাবানল। চারিদিক আলোয় আলো! নেকড়েটাকে আরও স্পষ্ট করে দেখা যেতে লাগল। সে তখন পাহাড়ের উপরে উঠছে। বাবাও তার পিছু নিলেন।

খানিকটা উপরে উঠেই নেকড়েটা হঠাৎ একখানা বড়ো পাথরের উপরে বসে পড়ল।

সে হাঁপিয়ে পড়েছে বুঝে বাবা এগিয়ে গেলেন দ্রুতপদে। নেকড়ে নড়ল না। বাবা দাঁড়ালেন, বন্দুক তুললেন, তবু সে পালাবার চেষ্টা করলে না।

লক্ষ্য স্থির করে বাবা বন্দুক ছোড়েন আর কী—আচম্বিতে নেকড়ে হল অদৃশ্য।

বাবা বিপুল বিস্ময়ে হতভম্ব! জ্যোৎস্না আর দাবানল সেখানটা স্পষ্ট করে তুলেছে দিবালোকের মতো, চোখের ভ্রম হবার কোনও সম্ভাবনাই নেই, অথচ হাড় এবং মাংস দিয়ে গড়া একটা নিরেট মূর্তি কি কখনও এমনভাবে মিলিয়ে যেতে পারে বাতাসের মতো বাতাসে?

বাবা শেষটা অবশ্য দোষ দিলেন নিজের চোখকেই, কারণ এক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে তা ছাড়া আর উপায়ই ছিল না।

নিজের দৃষ্টির অক্ষমতাকে বার-বার ধিক্কার দিতে-দিতে বাবা যেই ফিরে দাঁড়িয়েছেন, অমনি রাত্রির স্তব্ধ আকাশকে বিদীর্ণ করে জাগল একটা উচ্চ ও তীক্ষ্ণ চিৎকার—‘কে কোথায় আছ, সাড়া দাও, আমি পথহারা বিপন্ন পথিক, আমাকে সাহায্য করো!

এ আবার নতুন বিস্ময়!

কুবিখ্যাত প্রেতপর্বত, দিনের বেলাতেও লোকে যার কাছে আসতে আতঙ্কে শিউরে ওঠে, এই গভীর নিশীথে সেখানে মানুষ-পথিক। সে আবার এমন সৃষ্টিছাড়া স্থানে অন্য মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে! ও কি উন্মত্ত?

মূর্তিদুটি ক্রমেই কাছে এসে পড়ল, তাদের একজন পুরুষ আর একজন নারী। না, এরা যে পৃথিবীর মানুষ, সে-বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই।

বাবা শুধোলেন, ‘কে আপনারা?’

পুরুষটি বললে, “বিদেশি ৷

—"এখানে কেন?'

—শত্রুদের কবল থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে বনের ভিতরে পালিয়ে এসেছিলুম। তারপর পথ হারিয়ে এখানে এসে পড়েছি।'

—আপনি দেখছি বাঙালি। '

—হ্যাঁ, বাংলা আমার দেশ বটে, তবে এখন থাকি আসামে।'

– কেন?'

—এখানে চাকরি করি।'

-শত্রুর কথা বলছিলেন না?”

-হ্যাঁ।'

—"কে আপনার শত্রু?'

—’জমিদার।

—’জমিদার!’

—"জমিদার জোর করে আমার মেয়েকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়?

—"সে কী!’

—'সে জোর করে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। তার চরিত্র নরপিশাচের মতো। তার কবল থেকে উদ্ধার পাবার জন্যেই মেয়েকে নিয়ে আমি পালিয়ে এসেছি।

—'কিন্তু আপনি কোথায় এসেছেন জানেন?”

—’কোথায়?’

—’প্রেতপর্বতে।’

—’এ কীরকম নাম !

—‘লোকে বলে, রাত্রে এ-পাহাড়ে বসে ভৌতিক-সভা।'

—'আপনি এসব বিশ্বাস করেন?”

—’করলে এত রাত্রে এখানে আসতুম না।”

—”মশাই, এইটি আমার মেয়ে। লীলা, তুমি কি ভূত মানো?”

প্রশ্ন শুনে লীলা চমকে উঠল। তারপর তাকালে প্রেতপর্বতের শিখরের দিকে। সেখানে তখনও নৃত্য করছিল দাবানলের শিখা।

বাবা বললেন, ‘এ আলোচনার স্থান নয়। আপনার নামটি জানতে পারি কি? —শ্রীগিরীন্দ্রশেখর চৌধুরি। আপনার?

—’প্রবোধকুমার বসু।’

—’পরিচয় তো হল, এখন আমাদের কী করতে বলেন?'

—গিরীন্দ্রবাবু, আপনি জানেন না আপনার সঙ্গে আমারও জীবনের কতকটা সাদৃশ্য আছে। আমিও জমিদারের অত্যাচারে দেশছাড়া। আমরা দুজনেই দুজনের ব্যথার ব্যথী হতে পারি। আসুন আমার সঙ্গে।'

জ্বলন্ত প্রমাণ দাবানল

মায়া তখনও ঢুলছিল, আমরা তখনও বসে ভাবছিলুম। হঠাৎ দরজায় করাঘাত হল, সঙ্গে সঙ্গে শুনলুম বাবার কণ্ঠস্বর। আমরা আস্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলে দিলুম।

বাবার সঙ্গীদের দেখে আমার দৃষ্টি হয়ে উঠল সচকিত। মায়া অস্ফুটকণ্ঠে কেঁদে উঠে এক ছুটে পালিয়ে গেল।

বাবা আগন্তুকদের দিকে ফিরে বললেন, 'আমার ছেলে-মেয়েরা এখানে অতিথি দেখেনি কোনওদিন। ওরা তাই বিস্মিত হয়েছে।'

গিরীন্দ্র বললে, 'হবারই কথা! ওগো খোকাখুকুরা, ভয় নেই! আমরা বাঘও ন‍ই, ভাল্লুকও নই। বনে আমরা পথ হারিয়েছিলুম, তোমাদের বাবা দয়া করে আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। বাবা বললেন, ‘আসুন গিরীন্দ্রবাবু, আসুন লীলা দেবী, উনুনে এখনও আগুন আছে দেখছি। এতক্ষণ ধরে বাইরে শীতের যে ধাক্কা সামলাতে হয়েছে, দেহগুলো একটু তাতিয়ে না নিলে চলবে না।' তারপর দাদার দিকে ফিরে বললেন, ‘প্রকাশ, এঁরা নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত। এত রাত্রে ভালো করে খাওয়াবার সময় তো হবে না, এখন কী করা যায় বলো তো?”

দাদা বললেন, 'চাল আছে, ডাল আছে, আলু আছে। আর আছে তাজা মুরগির ডিম। বলো তো এক ঘণ্টার মধ্যে খাবার তৈরি করে দিতে পারি।'

গিরীন্দ্র বিপুল উৎসাহে বলে উঠল, 'সাধু, সাধু! খোকাবাবুজি, তোমার মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক! এ যে মরুভূমিতে বৃষ্টিধারা! গহন বনে রাজভোগ!'

ইতিমধ্যে মায়ার খোঁজে পাশের ঘরে ঢুকে আমি দেখলুম, বিছানার উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

বিস্মিত হয়ে বললুম, 'কী রে মায়া, কাঁদছিস কেন?”

—"ভয় করছে, আমার বড্ড ভয় করছে!'

-ভয় করছে? কেন রে?'

– ওই মেয়েটাকে দেখে !”

—"কোন মেয়েটা? বাবার সঙ্গে যে এসেছে?'

—"হ্যাঁ ছোটদা !'

—“সে কী রে? ও-যে পরির মতন সুন্দরী! অমন সুন্দরী আমি কখনও দেখিনি! —"কিন্তু তুমি ওর চোখ দেখেছ?'

—'চোখ?’

-হ্যাঁ। ওর চোখ দেখেই আমার ভয় করছে!'

—"যত সব বাজে কথা! চোখ দেখে আবার ভয় কী -রে?’

—"জানি না। আমি ওর কাছে যাব না—কক্ষনো না।' মায়া আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল, কিছুতেই আর শয্যাত্যাগ করতে চাইলে না।

অতিথিরা বেশ কিছুকাল ধরে বাস করলে আমাদেরই সঙ্গে।

বাবা ও গিরীন্দ্রবাবু প্রতিদিনই নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে যেতেন শিকারের সন্ধানে। লীলা থাকত কুটিরেই।

দেখলুম, ঘরকন্নার কাজে সে একেবারেই পাকা। সারাদিনই সংসার নিয়ে নিযুক্ত থাকত, যা করবার সবই নিজের হাতে করত, আমাদের কারুকে কিছুই করতে দিত না। এমন কাজের মেয়ে খুবই কম দেখা যায়।

দাদাকে আর আমাকে ভারী যত্ন আর আদর করত লীলা। সর্বদাই চেষ্টা করত কিসে আমাদের মন খুশি থাকে। মায়াকেও সে বশ করবার জন্যে কম চেষ্টা করেনি, কিন্তু তাকে বাগে আনতে পারেনি কিছুতেই। মায়া তার কাছ থেকে সর্বক্ষণই তফাতে-তফাতে থাকবার চেষ্টা করত এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও লীলা যদি তাকে আদর করবার চেষ্টা করত, তাহলে সে কেঁদে ফেলত তখনই। শেষটা লীলাকেও বাধ্য হয়ে মায়ার সঙ্গে ভাব করবার চেষ্টা ছেড়ে দিতে হল। সে-ও মায়ার কাছে যেত না, মায়াও তার কাছে আসত না।

অথচ লীলা ছিল অতি-আমুদে মেয়ে। প্রতিদিনই সে আমাদের আনন্দ দেবার জন্যে শোনাত নতুন নতুন হাসির গান! তার অধিকাংশ গানেই থাকত বনের জীবজন্তুদের কথা গোটা-তিন গানের কথা এখনও আমার মনে আছে। প্রথমটি হচ্ছে প্যাচা-পেঁচির কথা :

.

প্যাঁচা বলে, ‘পেঁচি রে আজ

পাইনি ইঁদুর-ছানা।'

পেঁচি বলে, ‘কর্তামশাই,

হবে কিসে খানা?'

প্যাঁচা বলে, ‘খা না খাবি,

শ্রীমুখেতে দিয়ে চাবি

পরম সুখে স্বর্গে যাবি,

—গাইব তা-না-না-না'।

.

আর-একটিতে আছে, বাঘ-বাঘিনির কথা

এক যে ছিল বনের বাঘা,

ধরতে গিয়ে হরিণ

সেদিন পেয়েছিল বিষম দাগা।

ব্যাধ ছিল এক লুকিয়ে ঝোপে,

ছাড়লে কী বাণ বাঘার গোঁপে,

জাঁদরেলি গোঁপ কচু-কাটা—

পালাল বাঘ চেঁচিয়ে গাঁ-গাঁ !

হায় বেচারা গোঁপ হারিয়ে ফিরল যখন গর্তে,

বাঘিনি কয়—‘আ মরে যাই! হেথায় কেন মরতে?

জলদি ভাগো গোঁফ-কাটা বাঘ!

মুখ দেখে তোর হচ্ছে যে রাগ!’

ব্যাপার দেখে কা-কা করে ধরলে হাসি যত কাগা !

তৃতীয় গানটিতে আছে কাক-শালিক-সংবাদ :

শালিক পাখি আজ গিয়েছে শালকে!

বিয়ে করে আনবে সে বউ কালকে!

.

কাক ছিল—যার মনটা বাঁকা, ——— বললে—‘আমি সবার কাকা,

নিমন্ত্রণে কাকাকে বাদ? ——— করব আমি জোর-প্রতিবাদ !

ঠুকরে যে তার ভাঙব ঘরের চালকে।'

শালিক শুনে উঠল রেগে ——— কাকের বাসায় ছুটল বেগে—

কয় সে—'কে কয় তোরে কাকা? ——— নিজেই ডাকিস করে কা-কা !

সাগর বলে কেউ কি কাটা খালকে?

‘হাম কাকা হ্যায়!’—যেই বলে কাক, জোরসে শালিক খুব দিলে হাঁক

আজ ধরে-গা ধ্রুপদ-ধামার, ——— লে আও নতুন গিন্নি হামার !

জলদি লে আও আমার খাঁড়া-ঢালকে!

দেখছি যে তোর বিপুল বড়াই, ——— হোক তবে আজ তুমুল লড়াই!'

যেই দেখে কাক—শক্ত মাটি, ——— পড়ল সরে পার্শ্ব কাটি—

বাঁচাতে তার কালো গায়ের ছালকে।

কবি বলে—‘এরও পরে ——— গল্প আছে আমার ঘরে,

ভাব করে মোর কিল-বিল-বিল, ——— কিন্তু দাদা, নেই ভালো মিল !

শুন শুন আমার ভক্ত! ——— পদ্যে গল্প বলাই শক্ত-

মিথ্যে কেবল ঘা হল হায়—চুলকে!

‘চুলকে’র সাথে মিলবে না যে ‘শালকে’-

মিষ্টি কভু লাগবে না ভাই, ঝালকে!

.

কেবল আমরা কেন, বাবার মন রাখবার জন্যেও লীলার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। প্রায়ই সে নতুন নতুন খাবার তৈরি করত—বিশেষ করে বাবার জন্যেই। বাবা খেতে বসলে সে সামনে গিয়ে বসত, পাখা নেড়ে মাছি তাড়াবে বলে। এত যত্নাদর পেয়ে বাবাও হয়ে উঠলেন তার প্রতি অত্যন্ত সদয়। ক্রমে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, লীলা ছাড়া বাবার একদণ্ড চলত না। একদিন রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা তিনজনে শয্যায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি, বাবা আর গিরীন্দ্রবাবু বসে বসে কইছেন কথাবার্তা।

গিরীন্দ্রবাবু হঠাৎ বললেন, 'প্রবোধবাবু, কাল থেকে আর আপনার আতিথ্য স্বীকার করতে পারব না!’

—“সে কী!’

–কাল আমাকে কলকাতায় যেতেই হবে। বিশেষ জরুরি দরকার।'

– তারপর আবার ফিরবেন তো?'

-আবার ফিরব কেন? আসামে আর তো আমার চাকরি নেই !

বাবা একটু দুঃখিত-স্বরে বললেন, ‘এতদিন ঘনিষ্ঠতার ফলে আপনারা আমাদের আত্মীয়ের মতন হয়ে গিয়েছিলেন। এই মায়ার বাঁধন ছিঁড়তে আমার কষ্ট হবে।

—মায়ার বাঁধন ছিঁড়বেন কেন? আপনি ইচ্ছা করলে আমরা আরও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হতে পারি।'

—‘কেমন করে?

—"আপনার হাতে আমি আমার কন্যা সম্প্রদান করতে রাজি আছি।'

বাবা কথাটা যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। বললেন, 'তার মানে?’

—"আমার জামাই হতে আপনার আপত্তি আছে কি?'

অল্পক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চিন্তা করে বাবা বললেন, 'না।’

—'বেশ, তাহলে এখনই বিবাহ হয়ে যাক!

বাবা সবিস্ময়ে বললেন, 'অসম্ভব!’

—"অসম্ভবকেই সম্ভব করতে হবে। কারণ কাল খুব ভোরেই আমি কলকাতার দিকে যাত্রা করব।'

—"কিন্তু এই বনে, এত রাত্রে—'

বাধা দিয়ে গিরীন্দ্রবাবু বললেন, ‘প্রবোধ, তুমি কী বলবে বুঝতে পেরেছি। তুমি বলতে চাও, এতরাত্রে এখানে পুরুত খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কী দরকার পুরুতের? তুমি ক্রিশ্চান, আমিও কোনও ধর্ম মানি না, তবে আর সামাজিক অনুষ্ঠান নিয়ে মাথা ঘামানো কেন? তুমি লোকালয় ত্যাগ করেছ, যাপন করছ বন্য-জীবন, সুতরাং বন্য-রীতি অনুসারেই তোমাদের বিবাহ্ হলে কোনওই ক্ষতি নেই !

—'কিন্তু'-

—"আর কোনও কিন্তু-টিন্তু নয়, আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব নিজের শর্তে।' গিরীন্দ্রবাবু উঠে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, ‘লীলা, এদিকে এসো!”

লীলা এগিয়ে এল।

—'প্রবোধ, উঠে দাঁড়াও। লীলার হাত ধরো। আচ্ছা, এইবার প্রতিজ্ঞা করো।' —'কী প্রতিজ্ঞা?'

—'বলো, প্রেতপর্বতের আত্মাদের নামে আমি শপথ করছি যে—

বাবা বাধা দিয়ে বললেন, ‘শপথ যদি করতে হয়, ভগবানের নামেই করা উচিত।'

—"না প্রবোধ, আমি ভগবান মানি না! তুমি বাস করছ—প্রেতপর্বতের ছায়ায়। তোমার শপথ শুনতে পাবে এখানকার আত্মারাই।'

বাবা নাচারের মতন বললেন, ‘তবে তাই-ই হোক।'

—শপথ করো।'

—'প্রেতপর্বতের আত্মাদের নামে শপথ করছি যে, আজ থেকে লীলাকে আমার বৈধ পত্নীরূপে গ্রহণ করলুম। তার ভালো-মন্দের জন্যে দায়ী থাকব আমিই।'

গম্ভীর-স্বরে গিরীন্দ্রবাবু বললেন, 'ওইসঙ্গে বলো যে, যদি আমার দ্বারা লীলার কোনও অনিষ্ট হয়, তাহলে প্রেতপর্বতের আত্মাদের অভিশাপ যেন আমার আর আমার সন্তানদের মাথার উপরে এসে পড়ে। যেন তাদের মাংস হয় শকুনি, গৃধিনি, নেকড়ে আর বনের অন্যান্য হিংস্র জন্তুদের খাদ্য! করো শপথ!”

একটু ইতস্তত করে বাবা গিরীন্দ্রবাবুর কথাগুলো আর-একবার আউড়ে গেলেন।

গিরীন্দ্রবাবুকে দেখাচ্ছিল তখন কী ভয়ঙ্কর! মনে হচ্ছিল মাথায় তিনি যেন আরও একফুট উঁচু হয়ে উঠেছেন এবং তাঁর দুই চক্ষু দিয়ে ঠিকরে পড়ছে তুবড়ির আগুনের ফিনকি! দাদা বিছানার উপরে আড়ষ্ট হয়ে শুয়ে রইলেন, আমার বুকের ভিতরটা ধড়ফড় করতে লাগল, মায়া চিৎকার করে কেঁদে উঠল!

লীলা অসন্তুষ্ট-স্বরে বললে, ‘অমঙ্গল ডেকে এনো না মায়া। বিয়ের সময়ে কাঁদতে নেই। হঠাৎ আমাদের ঘরের ভিতরটা যেন বদলে গেল একেবারে! এ যেন আমাদের সেই পরিচিত ঘর নয়, যেন আমরা কোনও অজানা ও অচেনা ঘরের ভিতরে বসে চোখের সামনে দেখছি এক অলৌকিক ও অস্বাভাবিক দৃশ্যের অভিনয় !

ঘরের ভিতরে এসে পড়েছে একটা আগুনের আভা। সচমকে মুখ তুলে দেখি, প্রেতপর্বতের উপরে দাউ-দাউ করে জ্বলছে দাবানল—তার শিখরে-শিখরে উৎকট আনন্দে নৃত্য করছে যেন প্রচণ্ড অগ্নিসাগরের রক্তাক্ত তরঙ্গের পর তরঙ্গ।

বাবা বললেন, ‘প্রেতপর্বতে আবার দাবানল !

হো-হো করে কঠিন-হাসি হেসে গিরীন্দ্রবাবু বললেন, ‘প্রেতপর্বতের আত্মারা যে তোমার শপথ শুনতে পেয়েছে, ওই দাবানলই হচ্ছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ !

নিশাচরী

গিরীন্দ্রবাবু চলে গিয়েছেন। বাবা হুকুম দিয়েছেন, লীলাকে মা বলে ডাকতে। কিন্তু কেবল বাবা ও লীলার সামনেই আমরা মা শব্দটি উচ্চারণ করতুম, নিজেদের মধ্যে ব্যবহার করতুম লীলার ডাকনামই! কেন জানি না, তাকে মা বলতে গেলে যেন বদ্ধ হয়ে আসত আমাদের কণ্ঠস্বর। লীলার যত গুণই থাক তার মধ্যে মাতৃত্বের ভাব ছিল না একটুও। কিছুদিন কেটে গেল। তারপরই ঘটনার ধারা বইতে লাগল সিনেমার ছবির মতো দ্রুত তালে।

আমাদের শোবার ঘরে ছিল দুটি বিছানা। একটিতে শুতেন বাবা আর লীলা, আর- একটিতে আমরা তিনজন।

এক রাত্রে মায়া হঠাৎ ঠেলে-ঠেলে দাদাকে আর আমাকে জাগিয়ে দিলে। দাদা জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী হয়েছে মায়া?'

মায়া চুপি-চুপি বললে, 'লীলা বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে।'

—'বাইরে মানে?’

—বনের ভেতরে !

—"এত রাত্রে? দূর, কী যে বলিস!

– সত্যি বলছি দাদা! লীলা আস্তে-আস্তে বিছানা থেকে উঠল। একবার ফিরে চেয়ে দেখলে বাবা ঘুমোচ্ছেন কি না। তারপর পা টিপে-টিপে এগিয়ে দরজা খুলে বাড়ির বাইরে চলে গেল। ওই দ্যাখো না, বিছানায় সে নেই।'

এই হাড়কাঁপানো শীতের নিঝুম রাতে, পদে পদে বিপজ্জনক অরণ্যের মধ্যে গিয়ে লীলা একলা কী করছে? আমাদের বিস্ময়ের আর সীমা রইল না! তিনজনেই না ঘুমিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলুম।

ঘণ্টাখানেক পরে ঘরের খুব কাছেই শুনলুম একটা গর্জন। আমি বললুম, ‘নেকড়ে!’ দাদা বললেন, ‘কী সর্বনাশ, লীলাকে দেখতে পেলে নেকড়ে যে ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলবে?” মায়া মাথা নেড়ে বললে, 'কক্ষনো না, কক্ষনো না!'

মিনিট-কয় কাটাল। তারপর লীলা আবার ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়াল। ওদিককার জানলার সামনে ছিল জলভরা বালতি। সেখানে গিয়ে সে হাত-মুখ ধুয়ে ফেললে। তারপর বিছানায় গিয়ে বাবার পাশে শুয়ে পড়ল।

আমরা ভয়ে কাঁপতে লাগলুম, কেন জানি না।

পরদিন থেকে আমরা লীলার উপরে পাহারা দিতে শুরু করলুম। কিন্তু পরদিনেও সেই ব্যাপার! তার পরদিন এবং তার পরদিনেও! এমনি উপর-উপরি আরও কয়েক রাত্রি ধরে দেখলুম একই দৃশ্য! ঠিক যেই রাত বারোটা বাজে, লীলা বিছানা ছেড়ে উঠে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়। তারপরেই বাইরে থেকে গর্জন করে ওঠে একটা নেকড়ে! অনেকক্ষণ পরে লীলা আবার ফিরে আসে এবং প্রতিদিনই আবার বিছানায় গিয়ে শোবার আগে হাত-মুখ ধুয়ে ফেলে। বাবার ঘুম খুব প্রগাঢ়। তিনি কিছুই জানতে পারেন না।

একদিন বললুম, 'দাদা, বাবাকে এসব কথা জানানো উচিত।'

দাদা বললেন, হ্যাঁ, উচিত। কিন্তু তার আগে আমাদের জানা উচিত, লীলা বাইরে গিয়ে কী করে!'

—"তা কী করে সম্ভব হবে?”

—আজ লীলার পিছনে-পিছনে আমিও বাইরে যাব।'

—"না দাদা, তা হয় না।'

মায়াও ব্যস্ত-স্বরে বললে, 'ও দাদা, অমন কথা মুখেও এনো না! তাহলে ভয়েই আমি মরে যাব!'

দাদা ভারী সাহসী ছেলে। দৃঢ়স্বরে বললেন, 'আজ আমি বাইরে যাবই।' সেদিন দাদা লেপের ভিতরে ঢুকলেন বাইরে যাবার জামা-কাপড় পরেই।

যথাসময়ে লীলা বাড়ির বাইরে চলে গেল। দাদাও তখনই নীচে নেমে বাবার বন্দুকটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

আমি আর মায়া মহা উৎকণ্ঠায় প্রায় শ্বাস বন্ধ করে দাদার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলুম। তারপরেই শুনলুম একটা বন্দুকের শব্দ! এবং তারই মিনিট-খানেক পরে দেখলুম লীলা ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল খোঁড়াতে-খোঁড়াতে। তাড়াতাড়ি বালতির কাছে গেল। উঁকি মেরে দেখলুম, একখণ্ড কাপড় নিয়ে সে নিজের পায়ে হাঁটুর কাছে ‘ব্যান্ডেজ' বাঁধছে! খানিকক্ষণ পরে সে আবার শুয়ে পড়ল বাবার পাশে গিয়ে।

কিন্তু দাদা কোথায়? দাদা এখনও বাইরে কেন? দাদাই কি বন্দুক ছুড়ে লীলাকে জখম করেছেন? তাই কি তিনি বাবার ভয়ে বাড়িতে ফিরতে পারছেন না?

সারারাত কেটে গেল দুশ্চিন্তার ভিতর দিয়ে।

বাবার ঘুম ভাঙল সকালে।

আমি ভয়ে-ভয়ে বললুম, ‘বাবা, দাদা কোথায়?

বাবা বিস্মিতকণ্ঠে বললেন, দাদা? কেন, সে কি বিছানায় নেই?

— না।’

লীলা বললে, 'দ্যাখো, কাল রাতে আমি ঘুমের ঘোরে শুনেছিলুম, কে যেন দরজা খুলে বাইরে গেল! আচ্ছা, ঘরের কোণে তোমার বন্দুকটা দেখতে পাচ্ছি না কেন বলো দেখি? ” সেইদিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর একলাফে শয্যার উপর থেকে নেমে পড়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন দ্রুতপদে।

অল্পক্ষণ পরেই তিনি আবার ফিরে এলেন, দুইহাতে দাদার রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ বহন করে। দেহটা নামিয়ে রেখে তিনি তার উপরে বিছিয়ে দিলেন একখানা কাপড় আমি ও মায়া মাটির উপরে আছড়ে পড়ে কাঁদতে লাগলুম।

লীলা দুঃখিত-স্বরে বললে, ‘প্রকাশ নিশ্চয় তোমার বন্দুক নিয়ে নেকড়ে মারতে গিয়েছিল। বাচ্চা ছেলে, পারবে কেন? বেচারা বুদ্ধির দোষেই নেকড়ের হাতে প্রাণ দিলে।' বাবা জবাব দিলেন না। তাঁর দেহ মূর্তির মতো স্থির।

আমি কথা কইতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু মায়া আমার দুইহাত চেপে ধরে এমন মিনতি ভরা চোখে আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইল যে কোনও কথাই বলতে পারলুম না।

সেইদিনই বাবা আমাদের বাসার অনতিদূরে দাদার মৃতদেহ নিয়ে মাটি খুঁড়ে কবরস্থ করলেন। বন্য জন্তুদের কবল থেকে রক্ষা করবার জন্যে কবরের উপরে চাপিয়ে দিলেন মস্ত মস্ত পাথর!

বাবা কয়েকদিন আর শিকারে গেলেন না। সারাক্ষণ জড়ের মতন বসে থাকেন, বিমর্ষ মুখে কী ভাবেন এবং মাঝে-মাঝে গর্জন করে বলে ওঠেন, ‘ধ্বংস করব, আমি নেকড়ে-বংশ ধ্বংস করব।'

ইতিমধ্যে একদিনও কিন্তু নিশাচরী লীলার বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়নি। তখনও যদি সব কথা বাবাকে বলতুম! কী এক ছেলেমানুষি ভয় আমার মুখকে রেখেছিল বোবা করে। শেষটা শোকের প্রথম ধাক্কাটা সামলে বাবা আবার শিকার করতে বেরুলেন। কিন্তু প্ৰথম দিনেই ফিরে এসে বললেন, 'লীলা, তুমি বললে হয়তো বিশ্বাস করবে না, কিন্তু নেকড়েরা কবরের পাথর সরিয়ে আমার অভাগা ছেলের দেহটার সব খেয়ে ফেলেছে! কবরের ভিতরে পড়ে আছে কেবল খানকয়েক হাড়।

লীলা সভয়ে ও সবিস্ময়ে বললে, “ওমা, তাই নাকি গো?'

বাবা বললেন, ‘নেকড়ে-বংশ জাহান্নামে যাক !”

মায়া বলে ফেললে, ‘বাবা একটা নেকড়ে রোজ আমাদের দরজার কাছে এসে চিৎকার করে ! বাবা বললেন, “তাই নাকি? একথা আমাকে বলোনি কেন? এবারে নেকড়ের ডাক শুনলেই আমাকে জাগিয়ে দিয়ো–আমি তার রক্তদর্শন না করে ছাড়ব না।'

মায়ার মুখের দিকে একটা হিংস্র ও জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লীলা সেখান থেকে হনহন করে চলে গেল ৷

প্রেতপর্বতের প্রেতাত্মা

কয়েকদিন পরে।

আমাদের শাক-সবজির বাগান। মায়া এক জায়গায় বসে বসে ধুলো-মাটি দিয়ে খেলাঘর বাঁধবার চেষ্টা করছে। আমি দিচ্ছি গাছের গোড়ায় জল! বাবা কোদাল নিয়ে কোপাচ্ছেন মাটি। এমন সময়ে লীলা এসে বললে, মায়া, ভাতের হাঁড়ি চড়িয়ে এসেছি, তুমি কিছুক্ষণ উনুনের কাছে গিয়ে বোসো গে, আমি ততক্ষণে বন থেকে জ্বালানি কাঠ নিয়ে আসি।’ মায়া খেলা ছেড়ে কুটিরের দিকে গেল। লীলা চলে গেল বনের দিকে ৷

আন্দাজ আধঘণ্টা পরে কুটিরের ভিতর থেকে ভেসে এল আর্তনাদের পর আর্তনাদ। মায়ার আর্তনাদ! বাবা আর আমি দুজনেই বাগান থেকে বেগে ছুটে এলুম—কিন্তু আসতে আসতেই আর্তনাদ হল নীরব।

আমরা কুটিরে ঢোকবার আগেই ভিতর থেকে উল্কার মতো ছুটে বেরিয়ে এল মস্তবড়ো এক নেকড়ে! চোখের পলক ফেলবার আগেই সে বনের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘরময় বইছে রক্তের ধারা! তারই মধ্যে পড়ে রয়েছে মায়ার ছিন্নভিন্ন দেহ। কিন্তু তার মুখে-চোখে তখনও জীবনের আভাস!

বাবা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বসে পড়লেন। আমাদের পানে তাকিয়ে একটু ম্লান-হাসি হাসলে মায়া, তারপরেই সে আমাদের মায়া কাটালে।

এমন সময়ে লীলা ঘরের ভিতরে ঢুকে দৃশ্য দেখে থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ক্রন্দনভরা কণ্ঠে বললে, ‘ওগো, এ কী দেখছি গো! কে এমন সর্বনাশ করলে গো ! বাবা খালি বললেন, ‘নেকড়ে।’

—"হায় রে অভাগি! একটু আগেই একটা নেকড়ে আমার পাশ দিয়ে ছুটে গিয়েছিল! মাগো, আমার যা ভয় হয়েছিল! এ নিশ্চয় তারই কাজ!'

আমার আর বাবার শোকের কথা বর্ণনা করে তোমাকেও আর কষ্ট দিতে চাই না। শুভ্র পূজার ফুলের মতো সুন্দর, কোমল ও পবিত্র মায়া—সে ছিল আমাদের প্রাণের দুলালির মতো। তাকে হারিয়ে জীবন হয়ে গেল অন্ধকার।

দাদার কবরের পাশে বাবা মায়ার দেহকেও সমাধিস্থ করলেন।

রাত্রি। যে বিছানা ছিল আগে তিন ভাই-বোনের জন্যে, আজ আমি সেই বিছানায় একলা ৷ চোখে ঘুম নেই। শুয়ে শুয়ে ভাবছি। মায়ার মৃত্যুর সঙ্গে লীলার কোনও সম্পর্ক আছে বোধহয়। কিন্তু কীরকম সম্পর্ক?

হঠাৎ দেখলুম, লীলা শয্যা ছেড়ে নামল। তারপর ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল পা টিপে-টিপে অতি সন্তর্পণে।

সাংঘাতিক নারী! এখনও সে নিজের অদ্ভুত অভ্যাস ছাড়তে পারলে না? দুর্দান্ত কৌতূহল হল। উঠলুম। দরজা একটু ফাঁক করে বাইরে উঁকি মারলুম।

জ্বলজ্বলে চাঁদের আলো—চারিদিক স্পষ্ট।

খানিকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম। কিন্তু তারপর যখন দেখলুম, লীলা কবরের ভিতর থেকে মায়ার মৃত দেহকে দুই হস্তে টেনে বার করছে, তখন আর আমি স্থির হয়ে থাকতে পারলুম না। বেগে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জাগিয়ে দিয়ে বললুম, ‘বাবা বাবা! শিগগির ওঠো! তোমার বন্দুক নাও!'

—“কী! আবার নেকড়ে এসেছে? বটে, বটে!' বাবা খাট থেকে লাফিয়ে পড়লেন, বন্দুকটা তুলে নিলেন, তারপর ছুটে চলে গেলেন ঘরের বাইরে। আমিও রইলুম পিছনে-পিছনে। দাদার আর মায়ার কবরের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। একটা অস্ফুষ্ট শব্দ করে চমকে ও থমকে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর দুই চক্ষু যেন ঠিকরে পড়তে চাইছে।

কিন্তু তাঁর এই আড়ষ্টতা মুহূর্তের জন্যে। তারপরেই হঠাৎ তিনি বন্দুক তুলে ঘোড়া টিপে দিলেন।

তীব্র চিৎকারে রাত্রির স্তব্ধতাকে যেন ফাটিয়ে দিয়ে লীলার দেহ পড়ল শূন্যে দুই বাহু বিস্তার করে মাটির উপরে লুটিয়ে।

বাবাও চেঁচিয়ে উঠলেন, “ভগবান, রক্ষা করো।' তারপরেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

খানিকক্ষণ পরে বাবার জ্ঞান হল। ধীরে ধীরে উঠে বসে কপালের উপরে ডানহাত বুলোতে-বুলোতে তিনি বললেন, “আমি কোথায়? আমার কী হয়েছে বলো দেখি?...ও, মনে পড়েছে—মনে পড়েছে! উঃ, কী দৃশ্য !

তাঁর সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল একবার! তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে গাত্রোত্থান করে তিনি কবরের দিকে চললেন। আমিও করলুম অনুসরণ।

কিন্তু কবরের পাশে কোথায় লীলার দেহ? সেখানে পড়ে রয়েছে প্রকাণ্ড একটা মৃত নেকড়ে! বাবা অভিভূত-কণ্ঠে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, 'লীলা নেই, আছে সেই নেকড়েটা! এটাকে

আমি চিনতে পারছি—এইবার সব বুঝতেও পারছি! এই নেকড়েটাই আমাকে ভুলিয়ে পাহাড়ের দিকে নিয়ে গিয়েছিল! হা ভগবান, আমি পড়েছিলুম প্রেতপর্বতের প্রেতাত্মাদের পাল্লায়!’

পরদিনের প্রভাত। এখনও ভালো করে সূর্যোদয় হয়নি। ঘরের ভিতরে আলো-আঁধারি বিষম শব্দে দরজা ঠেলে ঘরের ভিতরে বেগে প্রবেশ করল এক উদ্ভ্রান্ত মূর্তি! অগ্নিরক্ত চক্ষু, মাথার লম্বা চুলগুলো করছে ক্রুদ্ধ সর্পের মতো লটপট, থর-থর করে কাঁপছে সর্বশরীর। গিরীন্দ্র !

কান-ফাটানো চিৎকার করে, সামনের দিকে দুই বাহু বাড়িয়ে সক্রোধোন্মত্ত গিরীন্দ্র বললে, ‘দে আমার মেয়ে দে! দে আমার মেয়ে দে! আমার মেয়ে, আমার মেয়ে,–কোথায় আমার মেয়ে? বাবা তার সুমুখে গিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে তেমনি জোরে চিৎকার করে বললেন, ‘কোথায় তোর মেয়ে? তোর মেয়ের যেখানে থাকা উচিত, সেইখানে! নরকে! দূর হ শয়তান, দূর হ! নইলে তোকেও আমি পাঠিয়ে দেব নরকে!'

গিরীন্দ্র অট্টাহাস্য করে বললে, 'হা-হা-হা-হা! তুচ্ছ, নশ্বর জীব! তুই ভয় দেখাচ্ছিস প্রেতপর্বতের প্রেতাত্মাকে? হা-হা-হা-হা-হা-হা।

—বেরিয়ে যা শয়তান! আমি তোকে থোড়াই কেয়ার করি!’

—“তোর শপথের কথা ভুলে যাচ্ছিস বুঝি? আমার মেয়ের ভালোমন্দের জন্যে দায়ী থাকবি তুই-ই?”

—‘প্রেতাত্মার কাছে শপথ? তার কোনওই মূল্য নেই।'

—‘মূল্য নেই? বেশ, বুঝতে পারবি মূল্য আছে কি না! তোর সন্তানদের মাংস ভক্ষণ করবে অরণ্যের শকুনি, গৃধিনি, নেকড়ে আর অন্যান্য হিংস্র পশুরা। তারা—' —এখনও বলছি শয়তান, বিদেয় হ!’

—"হা, হা হা হা! তোর বংশে বাতি দিতে কেউ থাকবে না।'

ঘরের দেওয়ালে টাঙানো ছিল একখানা রাম-দা। বাবা চোখের নিমিষে হাত বাড়িয়ে সেই রামদা খানা টেনে নিয়ে মাথার উপরে তুললেন। বাবার হাত এবং রাম-দা তীব্র বেগে নীচে নামল, গিরীন্দ্রের শরীর ভেদ করে সেখানা সাঁৎ করে চলে গেল—টাল সামলাতে না পেরে বাবা মাটির উপরে পড়ে গেলেন সশব্দে !

গিরীন্দ্রের দেহ অক্ষত—তার দেহ যেন বাতাস দিয়ে, ধোঁয়া দিয়ে গড়া, শাণিত অস্ত্র তার কোনওই ক্ষতি করতে পারে না! সে আবার বিকট স্বরে হা হা হা হা করে হেসে বললে, 'ওরে নশ্বর জীব! কেবল তাদের উপরেই আমরা প্রভুত্ব করতে পারি যারা করেছে নরহত্যা! মানুষ খুন করে তুই পালিয়ে এসেছিলি প্রেতপর্বতের কোলে? কর এইবারে শাস্তিভোগ! তোর দুই সন্তান গিয়েছে, তোর তৃতীয় সন্তানকেও রক্ষা করতে পারবি না—মরবে, মরবে, সে-ও মরবে! তারও মাংসহীন হাড়গুলো পড়ে-পড়ে শুকোবে গভীর অরণ্যের মধ্যে! তোকেও আমি হত্যা করতে পারতুম অনায়াসেই—কিন্তু তা আমি করব না! তুই বেঁচে থাক—সেইটেই তোর সব-চেয়ে-বড়ো শাস্তি। হা হা হা হা হা হা! তোকে হত্যা করাও তোর প্রতি দয়া করা—হা হা হা হা।’ পরমুহূর্তে গিরীন্দ্রের মূর্তি মিলিয়ে গেল আমাদের চোখের সুমুখেই।

এর পর আর বিশেষ কিছু বলবার নেই। আগেই বলেছি বাবা গরিব ছিলেন না, পরদিনই তিনি সেই অভিশপ্ত অরণ্য ছেড়ে আমাকে নিয়ে চলে গেলেন একেবারে কাশীধামে। কিন্তু সেখানে গিয়েও তাঁর পরিণাম হল না আনন্দজনক। কিছুদিন পরেই তিনি পাগলের মতো হয়ে গেলেন এবং সেই অবস্থাতেই তার মৃত্যু হল ভয়াবহ প্রলাপ বকতে বকতে।

তারপর থেকে একাকী আমি দেশে-দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি স্রোতের শৈবালের মতো। জীবনের আকর্ষণই আমার নেই—চেয়ে আছি কেবল মৃত্যুর দিকে।

বন্ধু, আমার কথা বিশ্বাস করো। যা স্বচক্ষে দেখেছি তাই বললুম। কখনও কি শুনেছ এমন জীবনকাহিনি?

অবশিষ্ট

প্রমোদ বললে, ‘শুনলে আমার সব কথা? এরকম অদ্ভুত জীবনকাহিনি তুমি আর কখনও শুনেছ? এখন বলো আমার কী করা উচিত?'

প্রফুল্ল জবাব না দিয়ে ভাবতে লাগল।

পৃথিবীর উপরে ঝরছে পূর্ণিমার ঝরনা। মহানদীর আলোকিত স্রোতের সঙ্গে নৌকো তখনও আপনি ভেসে যাচ্ছে লক্ষ্যহীনের মতো।

প্রমোদ আবার বললে, 'আমারও জীবন হচ্ছে এই নৌকোর মতো লক্ষ্যহীন! প্রফুল্ল, তুমিও তো বলতে পারলে না, আমার কী করা উচিত?'

—'প্রমোদ, বিবাহ করো, সংসারী হও। জীবন আর লক্ষ্যহীন বলে মনে হবে না।'

— “বিবাহ !’

—'বিবাহের নাম শুনেই অমন চমকে উঠলে কেন?”

—আমি করব বিবাহ! প্রফুল্ল, তুমি কি ভুলে যাচ্ছ প্রেতপর্বতের প্রেতাত্মা কী ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছে? আমার অকালমৃত্যু নিশ্চিত!'

—'প্রমোদ, তুমি তো আর প্রেতপর্বতের এলাকায় বাস করছ না! এখানে কে তোমার উপরে প্রভুত্ব করতে পারবে?'

–তুমি কি তাই মনে করো?'

—“নিশ্চয়ই করি!’

—“তবে আজ মনের ভিতরে আসন্ন-মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি কেন?”

—ভুল নয় বন্ধু, ভুল নয়। চোখের সামনে দেখছি, আমার আর পৃথিবীর মাঝখানে একখানা কালো পর্দা নেমে আসছে ধীরে ধীরে।'

—এমন পূর্ণিমার ভিতরেও তুমি আবিষ্কার করলে কালো পর্দা। তোমার কল্পনাশক্তি আছে বটে!”

—"আমার মাথা ঘুরছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে!'

—'প্রমোদ, এখন বুঝছি তোমার জীবনকাহিনি শুনতে চেয়ে আমি বুদ্ধিমানের কাজ করিনি। তুমি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়েছ, অতীতের দুঃস্বপ্নের কথা বর্ণনা করতে-করতে তোমার মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ওঠো, ধরো হাল, নৌকো তীরে নিয়ে যাই।'

—"কেন?”

—“তীরে নৌকো ভিড়িয়ে আমার সঙ্গে তুমিও নদীর ঠান্ডা জলে স্নান করবে। তোমার অলৌকিক কাহিনি শুনে আমারও মন যেন কেমন-কেমন করছে। স্নান করলে আমরা দুজনেই হয়তো কতকটা প্রকৃতিস্থ হতে পারব।’

—"জলে দেহ স্নিগ্ধ হতে পারে, কিন্তু মন কি ভিজবে প্রফুল্ল?”

—"মনের উপরেও দেহের প্রভাব আছে বইকী! ব্যাধি যখন দেহকে জীর্ণ করে মন তখন সুস্থ থাকে না।'

—“যখন এত করে বলছ, তোমার আদেশই পালন করব।' এই বলে প্রমোদ উঠে হালের কাছে গিয়ে বসল।

দুই হাতের দুই দাঁড়ের দ্বারা নদীর জলে হীরক-চূর্ণ ছড়াতে ছড়াতে প্রফুল্ল নৌকো নিয়ে চলল তীরের দিকে।

যেখানে নৌকো ভিড়ল সেখানে দাঁড়িয়ে নীল অরণ্য স্নান করছিল চন্দ্রকিরণধারায়- সবুজপত্রের ছন্দে তাল রেখে গান গাইছিল রাতের গায়ক-পাখি। চারিদিকে ছড়িয়ে আছে একটি নিবিড় শান্তির মাধুর্য।

প্রমোদ নৌকো থেকে নেমে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে গাঢ়স্বরে বললে, ‘এই বিশ্বে আছে কত সৌন্দর্য, কত ঐশ্বর্য! কিন্তু আমি কিছুই গ্রহণ করতে পারলুম না!’

প্রফুল্ল জবাব দিলে না, সে তখন পিছন ফিরে নৌকোর দড়িগাছা একটা গাছের গুড়ির সঙ্গে বাঁধতে ব্যস্ত ছিল।

আচম্বিতে একটা গুরু দেহপতনের শব্দ হল—সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ ও ব্যাঘ্রের ভৈরব গর্জন ৷ অত্যন্ত চমকে ফিরে প্রফুল্ল কেবলমাত্র দেখতে পেলে, প্রকাণ্ড একটা ব্যাঘ্র প্রমোদের দেহ মুখে করে বিদ্যুতের মতো তীব্র-গতিতে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল!

খানিকক্ষণ আচ্ছন্নের মতন সে দাঁড়িয়ে রইল, নিজের চক্ষুকেই বিশ্বাস করতে পারলে না। তারপর শিশুর মতন কেঁদে উঠে যন্ত্রণা-বিকৃত-স্বরে বললে, ‘প্রমোদ, প্রমোদ! তোমাকে তীরে এনে শেষটা আমিই তোমাকে হত্যা করলুম—উঃ!' জ্ঞান হারিয়ে সে পড়ে গেল নদীর বালুকাতটের উপরে।

—————————————

এই কাহিনি রচনায় ফ্রেডারিক মারিয়াটের একটি গল্পকে কঙ্কালের বা কাঠামোর মতো ব্যবহার করেছি। আসল গল্পটি এদেশের তরুণদের বা আধুনিকযুগের উপযোগী নয়—(মারিয়াটের মৃত্যু হয়েছে প্রায় এক শতাব্দী আগে)। এই বাংলা-গল্পটির সর্বত্রই আমি যেসব ভাব, ভাষা, ঘটনা, বর্ণনা, ব্যবহার করেছি, মারিয়াটের কাহিনির মধ্যে তা নেই।—লেখক।

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%