মোহনপুরের শ্মশান

হেমেন্দ্রকুমার রায়

একখানি ছবি

আমি যাঁর জীবনের আশ্চর্য কাহিনী বলব, তাঁর নাম হচ্ছে আনন্দমোহন সেন। তাঁকে আমি চিনি না, চোখে দেখিও নি, খুব সম্ভব তাঁর মৃত্যু হয়েছে আমার জন্মাবার আগেই।

আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন, এমন একজন লোকের জীবনকাহিনীর সঙ্গে আমি পরিচিত হলুম কেমন করে? আগে এই জিজ্ঞাসারই জবাব দেওয়া উচিত। নইলে আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন যে, নিজের মন-গড়া একটা আজগুবি উপকথা বলে আমি খামোকা আপনাদের পিলে চমকে দেবার চেষ্টা করছি।

এই বিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক জগতে আনন্দমোহনের গল্প যে বিশ্বাসযোগ্য হবে না, আমিও অস্বীকার করি না এ কথা। কিন্তু যে কাহিনী আমি নিজে রচনা করি নি তা সত্য বা মিথ্যা বলে একতরফা ডিক্রি জারি করবারও অধিকার নেই আমার। বিশ্বাস করা এবং না-করার সম্বন্ধে আমি আপনাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে রাজি আছি।

শঙ্কর বসু ছিলেন অধ্যাপক এবং আমার বন্ধু। এবারের পুজোর ছুটিটা তাঁর দেশের বাড়িতে কাটাবার জন্যে আমাকে তিনি সঙ্গে নিয়ে গেলেন। তাঁর দেশের বাড়ি ছিল বর্ধমানের দামোদর নদের ধারে। এর আগে আর কখনো এখানে আসি নি।

বৈঠকখানায় ঢুকেই একখানা বড় তৈলচিত্রের দিকে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। চিত্রের বিষয়বস্তু এই ঃ

চারিধারে অন্ধকার। একটি তরুণী—তাঁর ঊর্ধ্বোত্থিত ডানহাতে সেকেলে লণ্ঠন। তরুণীর দেহের অন্যান্য অংশ অন্ধকারের ভিতরে প্রায় মিলিয়ে গিয়েছে, কেবল ভালো করে দেখা যাচ্ছে তার মুখখানি—অপূর্ব ও জীবন্ত সৌন্দর্য-ভরা সেই মুখ। পটের একপাশে খানিক স্পষ্ট ও খানিক অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে আর এক মূর্তি। সে যুবক এবং তার মুখে-চোখে ফুটে উঠেছে বিষম বিস্ময় ও দারুণ আতঙ্ক ! সুন্দরীর লণ্ঠনের আলোতে যুবক বোধহয় এমন কোন ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে পেয়েছে মানুষের বুকের রক্ত যাতে জমে যায় বরফের মতন!

অদ্ভুত বিষয়বস্তু। তরুণী কী দেখাতে চায় এবং যুবক কেনই বা এত ভয় পেয়েছে? ছবিতে তার কোন ইঙ্গিতই নেই।

শঙ্কর হেসে বললে, “হিমাংশু, এ-রকম রহস্যময় ছবি তুমি বোধহয় আগে কখনো দেখ নি?

—না। ছবিতে চিত্রকর কি দেখাতে চায়? মনে হচ্ছে এখানা কাল্পনিক ছবি নয়। ছবিতে যে দৃশ্য রয়েছে, এই পৃথিবীর উপর একদিন সত্য-সত্যই তার অভিনয় হয়ে গিয়েছে।'

—“তোমার অনুমান মিথ্যা নয়। ছবিখানি আঁকা হয়েছে একটি সত্য ঘটনাকে অবলম্বন করে।’

—‘কী সে ঘটনা? '

—উঃ, ভয়ঙ্কর! এই ছবিতে ফুটেছে একটি বিয়োগান্ত নাটকের শেষ দৃশ্য ! ঐ যে তরুণী, ওর নাম লীলা। ঐ যে যুবক, ওর নাম আনন্দমোহন সেন।'

—"কে ওরা।’

—‘লীলার বাবার নাম চন্দ্রমোহন চৌধুরী, সেকালকার একজন সুবিখ্যাত মূর্তিচিত্রকর। আনন্দমোহন ছিল তাঁরই কৃতীছাত্র, এই ছবিখানা দেখলেই তার কলানৈপুণ্যের পরিচয় পাবে, কারণ এখানা তারই আঁকা। এরা কেউই আজ বেঁচে নেই।

—এখন গল্পটি কি শুনি?”

—"আমার বাবা আনন্দমোহনের নিজের মুখ থেকে গল্পটি শুনে আমাকে বলেছিলেন অনেকদিন আগে। বাবাকে আনন্দমোহন খুব ভালোবাসত, তাই মারা যাবার সময় ছবিখানা তাঁকে উপহার দিয়ে গিয়েছিল।'

—‘কিন্তু গল্পটি কি?'

—একটু ধৈর্য ধর। এমন রোদে-ধোয়া সকালে এ-রকম গল্প অস্বাভাবিক বলে মনে হবে। অলৌকিক জমে নিরালা রাতের ছায়ায়।'

—গল্পটি খালি ভয়ানক নয়, অলৌকিকও !

—‘শুনলেই বুঝবে।” .

সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল বাস্তবিকই গল্প শোনার পক্ষে রীতিমত উপযোগী। সন্ধ্যার আগেই ঝম্-ঝম্ করে বৃষ্টি নেমেছে, ঝোড়ো হাওয়ার উদ্দাম দীর্ঘশ্বাসে গাছে গাছে থেকে থেকে ফুটছে বেদনার ভাষা, মেঘে মেঘে আকাশ ঢাকা এবং পৃথিবী ঢাকা অন্ধকারের ঘেরাটোপে। মাঝে মাঝে অন্ধকারকে ধাক্কা মেরে মেঘের পর্দা ছিঁড়ে আকাশ থেকে পৃথিবীতে স্যাঁৎ করে নেমে আসছে বিদ্যুতের তীব্র শিখা এবং ক্ষণিকের জন্যে দেখা যাচ্ছে বিপুল দামোদরের উচ্ছ্বসিত তরঙ্গভঙ্গ।

লম্বাচওড়া বারান্দা। একটা সেকেলে গোল মার্বেল টেবিলের উপরে টিটিম্‌ করে জ্বলছে হারিকেন ল্যাম্প, তার আলো বারান্দার অন্ধকারকে উদ্ভাসিত করে তুলেছিল মাত্র। স্পষ্ট করে কিছু দেখা যায় না এবং অস্পষ্টতার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে বেশ একটি রহস্যের সম্ভাবনা।

বাইরের দিকে মুখ করে এবং দেওয়ালের দিকে পিঠ রেখে দুখানা পুরাতন ‘ইজি-চেয়ারে’র উপরে চুপ করে বসে আছে শঙ্কর এবং হিমাংশু। কোথাও নেই মানুষের কাজের বা কণ্ঠের সাড়াশব্দ। তারা উপভোগ ছিল এই বৃষ্টিধারা- ধৌত নির্জনতা।

বোধকরি বৃষ্টি ও ঝড়কে ফাঁকি দেবার জন্যেই হঠাৎ একটা বাদুড় ভিতরে এসে বারান্দার ছাদ ঘেঁষে দুই ডানা দিয়ে ঝট্‌পট্ শব্দ তুলে উড়ে বেড়াতে লাগল ৷

হিমাংশু বললে, ‘লেখকরা অলৌকিক গল্প বলবার সময়ে প্রায়ই বাদুড়ের উল্লেখ করেন। তোমারও গল্পে বাদুড় আছে নাকি?'

– না।'

—“তাহলে সেই ভ্রম সংশোধনের জন্যে বাদুড় নিজেই এসে হাজির হয়েছে। রসিক বাদুড়কে ধন্যবাদ। নাও, এখন গল্প শুরু কর।'

পাত্র-পাত্রীর পরিচয়

আজ থেকে অন্তত সত্তর বছর আগেকার কথা।

সে-সময়ে ফোটোগ্রাফ তোলবার কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে বটে, তবে বাংলাদেশে তার প্রভাব একরকম ছিল না বললেও চলে। কিন্তু মানুষের অহং জ্ঞান অল্প নয়, মৃত্যুর আগে সে ইহলোকে নিজের স্থায়ী চিহ্ন কিছু-কিছু রেখে যেতে চায় এবং ধনীদের ভিতরেই এই স্বভাবের প্রকাশ পাওয়া যায় বেশি।

বাংলাদেশের প্রাচীন ধনী-পরিবারের বসতবাড়ির ভিতরে গেলেই দেখা যাবে, দেওয়ালের চারিদিকে টাঙানো রয়েছে বড় বড় তৈলচিত্রের পর তৈলচিত্র — অধিকাংশই হচ্ছে পূর্বপুরুষদের ছবি। আজকের ধনী এবং নির্ধনরাও সাধারণত ফটোগ্রাফের সাহায্যে নিজেদের নশ্বর চেহারাটা পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রেখে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সেকালে ছিল কেবল তৈলচিত্রের চলন। ধনীরা নিজেদের নশ্বর দেহগুলোকে অবিনশ্বর করবার জন্যে বড় বড় চিত্রকরকে আহ্বান করতেন। সেকালকার গরিব আর সাধারণ গৃহস্থরা ইচ্ছা থাকলেও এ বিলাসিতাকে প্রশ্রয় দিতে পারত না। কারণ তৈলচিত্র আঁকতে যত টাকার দরকার তত টাকা থাকত না তাদের পকেটে বা ট্যাঁকে।

চন্দ্রবাবু সেকালকার একজন নামজাদা মূর্তিচিত্রকর ছিলেন। শিল্পীসমাজে তাঁর ছিল ওস্তাদ বলে খ্যাতি। এবং ধনীসমাজে তাঁর ছিল অতিশয় সমাদর। নিজেদের খোলস অর্থাৎ বাইরের চেহারাটাকে অমর করবার প্রত্যাশায় সেকালকার অনেক রাজা, মহারাজা এবং জমিদার আশ্রয় গ্রহণ করতেন সাগ্রহে।

চন্দ্রবাবুর ছাত্রও ছিল কয়েকজন। অবসর-কালে তিনি তাদের চিত্র সম্বন্ধে শিক্ষা দিতেন। এবং ছাত্রদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল আনন্দমোহন।

আনন্দ ছিল যাকে বলে অনাথ। তার বাড়ি-ঘর, আত্মীয়স্বজন কিছুই ছিল না ৷ কিন্তু আনন্দের চিত্রাঙ্কনপটুতা ও মিষ্ট প্রকৃতি দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন চন্দ্রবাবু। তাকে তিনি নিজের সংসারে আশ্রয় দিয়েছিলেন বাড়ির ছেলের মতন।

এবং চন্দ্রবাবুর পক্ষে আনন্দের মত একজন বিশ্বস্ত লোকের আবশ্যক ছিল অত্যন্ত। চন্দ্রবাবু ছিলেন চিরকুমার, নিজের আর্ট নিয়ে সর্বদাই এমন মত্ত হয়ে থাকতেন যে, প্রৌঢ় বয়স পর্যন্ত তাঁর স্মরণ-পথে উদিত হয় নি, মনুষ্যসমাজে ‘বিবাহ’ বলে কোন-কিছু অনুষ্ঠানের অস্তিত্ব আছে। তাঁর পরলোকগত কনিষ্ঠ ভ্রাতার একটি মেয়ে ছিল, তার নাম লীলা। গৃহস্থালীর সমস্ত কর্তব্য সেই-ই পালন করত। আর গৃহস্থালীর বাইরেকার যা-কিছু কাজ, তার ভার ছিল আনন্দের উপরে। এই দুজনের হাতে সমস্ত ছেড়ে দিয়ে চন্দ্রবাবু নিশ্চিন্ত হয়ে করতেন কলালক্ষ্মীর সেবা।

কলিকাতার হট্টগোল চন্দ্রবাবুর মোটেই ভালো লাগত না। অথচ তাঁর পক্ষে কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলেই নয়। তাই তিনি বাস করতেন শহরতলির এমন এক জায়গায় যেখানে শহরের কাছাকাছি থেকেও উপভোগ করা যায় পল্লী-প্রকৃতির নির্জনতা।

হিমাংশু, মনে রেখো এ হচ্ছে সত্তর বছর আগেকার কথা। তখন নিজ কলকাতা শহরেও ছিল না ইলেকট্রিক, মোটর, বাস এবং অন্যন্য আধুনিক যুগের লক্ষণ। অনেক রাস্তায় থাকত মিট্‌মিটে তেলের আলো এবং অনেক রাস্তার দুধারে থাকত নালা বা খোলা ড্রেন। খোলার ঘর এবং বস্তি দেখা যেত তখন কলকাতার যেখানে-সেখানে। আজ কলকাতায় তুমি সরকারি বাগান ছাড়া ছোট বা বড় মাঠ প্রায় খুঁজেই পাবে না। কিন্তু তখনকার দিনে কলকাতার বহু স্থানেই এত মাঠ-ময়দান ও ছোটোখাটো জঙ্গলের মতন জায়গা ছিল যে, সেখানে গেলে শহরে বসেই দেখতে পাওয়া যেত পল্লীগ্রামের আংশিক ছবি।

সে-সময়ে শহরের অবস্থাই যখন ছিল এইরকম, তখন শহরতলি ছিল যে পল্লীগ্রামের মতই, এটুকু নিশ্চয়ই আন্দাজ করা তোমার পক্ষে কঠিন হবে না। তখন টালিগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে গেলে মনে হত, অরণ্যে এসেছি। এমনি এক জায়গাতেই ছিল চন্দ্রবাবুর বসতবাড়ি। এবং তাঁর চিত্রশালা ছিল সেখান থেকে খানিক দূরে, কলকাতার প্রান্তসীমায়।

আসল গল্প শুরু করবার আগে এখানে আর একটি কথা বলে রাখি। লীলার বয়স হয়েছিল ষোল-সতেরো। তখনকার দিনে এত বয়সের কুমারী কন্যার সংখ্যা ছিল খুবই অল্প। কিন্তু চন্দ্রবাবু ছিলেন ইংরেজি মেজাজের লোক। ব্রাহ্ম বা ক্রিশ্চান না হলেও বিশ্বাস করতেন যে, অল্পবয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

কেবল পরমাসুন্দরী বললেও লীলার রূপের কথা ঠিকমত বুঝানো যায় না। সে ছিল অদ্ভুত রূপসী। রং, গড়ন, মুখচোখ ছিল এমন ধারা যে খুঁজলেও তার জোড়া মিলত না। তার উপরে লীলার প্রকৃতিও ছিল অতি মধুর, অতি নম্ৰ। সুতরাং এমন একটি মেয়ের দিকে যে আনন্দ হবে আকৃষ্ট, এ হচ্ছে খুব সহজ কথা। মনে মনে সে অদূর ভবিষ্যতে লীলাকে নিজের সহধর্মিণীরূপে কল্পনা করত। লীলাও বোধহয় এটুকু বুঝতে পারত—যদিও আনন্দ কোনদিনই মুখে প্রকাশ করে নি আপন মনের কথা।

আনন্দ ও লীলা ছিল এক জাতেরই লোক, তবু আপাতত লীলার সঙ্গে যে তার বিবাহের প্রসঙ্গ ওটাও অসম্ভব, এ সত্য আনন্দের অজানা ছিল না। সে হচ্ছে অনাথ, পরের আশ্রয়ে বাস করে। সে লীলাকে বিয়ে করতে চাইলে চন্দ্রবাবু হয় খাপ্পা হয়ে উঠবেন, নয় হেসেই উড়িয়ে দেবেন অমন অদ্ভুত প্রস্তাব। অতএব নিজেকে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তৈরী করে তোলবার চেষ্টা করছিল আনন্দ৷

চন্দ্রবাবু নিজেই মত প্রকাশ করেছেন, তার শিক্ষা-প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে, অল্পদিনের মধ্যেই স্বাধীন ভাবেই সে চিত্র-ব্যবসায় অবলম্বন করতে পারবে।

স্বাধীন হওয়ার অর্থই হচ্ছে অর্থ উপার্জন করবার ক্ষমতা। ধনীসমাজে আনন্দের যদি পসার হয়, তাহলে তার হাতে লীলাকে সমর্পণ করতে চন্দ্রবাবুর নিশ্চয়ই আপত্তি হবে না।

আনন্দ দিনের পর দিন গুনছিল সেই আশাতেই।

মোহনপুরের মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণ

তখন সন্ধ্যা হয় হয়। অন্যান্য ছাত্ররা বিদায় নিয়েছে, চিত্রশালার মধ্যে কাজ করছে অনন্দ একাকী।

একখানি বড় ঘর—দোতালার উপরে। এখানে সেখানে, দেওয়ালের উপর রয়েছে অনেকগুলো ছোট-বড় সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণ ছবি। সবই তৈলচিত্র। তখনকার দিনে শিক্ষিত বাঙালি চিত্রকররা সাধারণত জলীয় রং বা 'ওয়াটার কলার’ ব্যবহার করতেন না। জলীয় রং ব্যবহার করত যারা, শিক্ষিতরা অবজ্ঞা করে তাদের ডাকতেন ‘পটুয়া’ বলে। বাংলাদেশের আধুনিক শিক্ষিত সমাজে জলীয় রঙের প্রাধান্য স্থাপন করেন সর্বপ্রথমে শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ

তাড়াতাড়ি স্বাধীন হবার জন্যে আনন্দমোহন পরিশ্রম করত প্রায় দিবারাত্রিব্যাপী। অন্যান্য ছাত্ররা ছুটি নিয়ে চলে গেলে পরও সে অনেকক্ষণ ধরে চিত্রশালায় রং আর তুলি নিয়ে নিযুক্ত হয়ে থাকত।

কোন খেয়ালি ক্রেতার ফরমাশে সে আঁকছিল একখানা অদ্ভুত ছবি। নরকের দৃশ্য।

যমদূতেরা জনৈক পাপীকে ধরে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয়েছে! পাপীর মূর্তি প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে। কিন্তু আনন্দ বিপদে পড়েছে যমদূতগুলোকে নিয়ে।

জ্যান্ত মানুষের সঙ্গে যমদূতের পরিচয় হয় না। আনন্দও কখনো দেখে নি যমদূত। তাদের চেহারা যে ঠিক কি-রকম হওয়া উচিত আনন্দ কিছুতেই তা ধারণায় আনতে পারছে না।

বিলাতি ছবিতে imp, demon ও devil প্রভৃতিকে দেখেছে। তাদের কালো কালো প্রায়-মানুষের মতন চেহারা, কিন্তু তাদের মাথায় থাকে শিং, পিছনে থাকে ল্যাজ এবং পায়ে থাকে গরু প্রভৃতির মতন খুর।

কিন্তু যিনি ছবির ফরমাশ দিয়েছেন তিনি হচ্ছেন নাকি পরম হিন্দু, গঙ্গাজল ছাড়া আর কোন জল পান করেন না। আনন্দ অনায়াসেই ফিরিঙ্গি imp, de- mon ও devil এর মূর্তি আঁকতে পারত, কিন্তু সে-সব ক্রিশ্চানী মূর্তি দেখলে হিন্দু ক্রেতার হিন্দুত্ব নিশ্চয়ই জখম হবে।

আর ছবি আঁকা সম্ভবপর নয়। চিত্রশালার মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে ওঠবার চেষ্টা করছে সন্ধ্যার অন্ধকার। বাইরে ক্রমে ক্রমে স্তব্ধ হয়ে আসছে নাগরিক কোলাহল।

তখনও তুলি হাতে করে আনন্দ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে—‘যমদূতদের- হিন্দু যমদূতদের কি-রকম দেখতে? রাক্ষসের মতন? ভূত-প্রেতের মতন? কিন্তু রাক্ষস আর ভূতপ্রেতদেরই বা চেহারা কিরকম হওয়া উচিত? তাদেরও তো আমি চোখে দেখি নি!'

অনেক মাথা ঘামিয়েও কূল-কিনারা না পেয়ে আনন্দ শেষটা ধৈর্য হারিয়ে বলে উঠল, ‘নিকুচি করেছে! যমদূতেরা জাহান্নামে যাক, আমি তাদের আঁকতে পারব না!’

সঙ্গে সঙ্গে তার পিছন থেকে চাপা গলায় কে হেসে উঠল!

সচমকে আনন্দ ফিরে দেখলে, ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা অপরিচিত মূর্তি।

চিত্রশালার ভিতরে তখন ভালো করে চোখ চলে না। বেশ ঘন অন্ধকার। বাইরে শোনা গেল প্যাঁচার ডাক।

মূর্তি স্থির চক্ষে তাকিয়ে ছিল চিত্রপটের সম্পূর্ণ যমদূতগুলোর দিকে। বিচিত্র তার চেহারা। মাথায় প্রায় সাড়ে ছয় ফুট লম্বা মস্ত একটা পাগড়ি সে এমনভাবে পরেছে যে, মুখের আধখানা দেখাই যাচ্ছে না। পোশাকও সাধারণ লোকের বা বাঙালির মতন নয়, সাজগোজ দেখলে মনে হয় সে কোন রাজা-রাজড়া—এমন কি কটিবন্ধ থেকে ঝুলছে একখানা তরবারি পর্যন্ত !

সৈনিকের মতন সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মূর্তি। অন্ধকারে তাকে খানিক দেখা যাচ্ছিল, খানিক দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও ঝক্‌ক্‌ করে উঠছিল তার স্বর্ণখচিত ও নানা রত্নে অলঙ্কৃত বহুমূল্য পোশাকটা।

এমন মূর্তি এখানে দেখবার আশা আনন্দ করে নি। সে রীতিমত হতভম্ব হয়ে গেল।

মূর্তি গম্ভীর স্বরে বললে, ‘ছোক্রা, পৃথিবীতে যখন বেঁচে আছ, যমদূতদের নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ কেন?'

তার চেহারা দেখলে ও গলার আওয়াজ শুনলে বুক ধড়ফড় করে ওঠে ভয়ে। কিন্তু একটা জবাব না দিলেও চলে না। আনন্দ কোনরকমে বললে, 'আজ্ঞে, খরিদ্দারের ফরমাশ!

মূর্তি একখানা হাত রাখলে আনন্দের কাঁধের উপরে। আনন্দের মনে হল, তার সর্বাঙ্গের উপর দিয়ে বয়ে গেল যেন একটা তরঙ্গিত তুষারবারির হিল্লোল। সে পিছিয়ে দাঁড়াল সভয়ে।

মূর্তি বললে, ‘খরিদ্দারের ফরমাশেও আর কোনদিন যমদূতদের দেখবার চেষ্টা কোরো না।'

আনন্দ ভয়ে ভয়ে বললে, ‘চন্দ্রবাবুর কাছে আপনার কোন দরকার আছে? অনুগ্রহ করে ঐ আসনে বসুন।'

—“চন্দ্রমোহন চৌধুরী কোথায়?”

—“আজ্ঞে, তিনি কাজে বেরিয়ে গিয়েছেন। ফিরতে রাত হবে।'

—চন্দ্রমোহন চৌধুরীকে বোলো, আমি মোহনপুরের মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণ। আসছে কাল সন্ধ্যায় ঠিক আটটার সময়ে আমি আবার তার সঙ্গে দেখা করতে আসব। সে যেন এখানে হাজির থাকে।'

মূর্তি হঠাৎ ফিরে দাঁড়াল। তারপর সোজা বেরিয়ে গেল নিঃশব্দ পদসঞ্চারে। ঘরের আবহ এতক্ষণ যেন তুষারশীতল হয়ে ছিল, মূর্তি অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ঘরের মধ্যে জেগে উঠল গ্রীষ্মের উত্তাপ।

আনন্দের কেমন কৌতূহল হল, চিত্রশালা থেকে বেরিয়ে মূর্তি কোন্ দিকে যায় দেখবার জন্যে। ঐ জানালাটার তলাতেই আছে চিত্রশালা থেকে বেরিয়ে যাবার একমাত্র দরজা। সে তাড়াতাড়ি জানালার কাছে দাঁড়াল।

সে প্রায় দশ মিনিটকাল জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সদর দরজা দিয়ে কারুকেই বাইরে বেরিয়ে যেতে দেখলে না।

তবে কি লোকটা এখনো বাড়ির ভিতরেই আছে?

এই সম্ভাবনা মনে জাগতেই আনন্দের সমস্ত দেহ হয়ে উঠল রোমাঞ্চিত ! কি এক অজানা ভয়ে সে তাড়াতাড়ি উপরের ঘর থেকে বেরিয়ে একতলায় নেমে গেল। কিন্তু কোথাও কারুকেই দেখতে পেলে না। তখন এই-আশ্চর্য ব্যাপার নিয়ে আর মাথা না ঘামিয়ে সে চিত্রশালার দরজা বন্ধ করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

মহারাজের প্রস্তাব

সেই রাত্রেই আনন্দ আগন্তুকের কথা চন্দ্রবাবুকে জানালে। চন্দ্রবাবু একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘মোহনরের মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণ? কখনো তাঁর নাম পর্যন্ত শুনি নি। কি চান তিনি? নিশ্চয়ই আমার হাতে তাঁর রাজ্যভার সমর্পণ করতে আসবেন না। বোধহয় তাঁর একখানা ছবি আঁকাতে চান। বেশ, কাল যথাসময়েই মহারাজা বাহাদুরকে সসম্মানে অভ্যর্থনা করবার জন্যে চিত্রশালায় উপস্থিত থাকব।'

পরদিনের সন্ধ্যা। চিত্রশালার মধ্যে একমাত্র আনন্দ ছাড়া আর কোন ছাত্র নেই।

চন্দ্রবাবু ঘরের ভিতরে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘আটটা তো বাজে-বাজে। আনন্দ, কই, এখনো তো কারুর টিকি দেখতে পাচ্ছি না !’

—"আজ্ঞে, তিনি ঠিক আটটার সময়ে আসবেন বলেছেন।'

—"কি নাম বলেছিলে? মোহনপুরের মহারাজ মহেন্দ্রনারায়ণ?’

— “আজ্ঞে হ্যাঁ।’

—দেখতে কি রকম?'

—"দেখলেই মনে হয়, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি।'

—বয়স কত?’

—‘বলা শক্ত সার্! তবে এইটুকু বলতে পারি বয়সে তিনি যুবক নন। ' ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চন্দ্রবাবু বললেন, 'আটটা বাজতে আর এক মিনিট বাকি! এখনো মহারাজা বাহাদুরের দেখা নেই। আনন্দ, আমি কিন্তু আটটা বাজলেই চলে যাব—আমার অনেক কাজ। মহারাজা বাহাদুর যদি তারপরেও আসেন, তুমি তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা কোয়ো। জীবনে রাজা-মহারাজা দেখেছি প্রায় দু ডজন। কোন মহারাজের জন্যেই আমি এখানে ধর্ণা দিয়ে বসে থাকতে রাজি নই ! মহারাজাদের চেয়ে আমি মহাশয়দের বেশি পছন্দ করি।'

ঘড়িতে ঢং ঢং করে আটটা বাজল।

একতালা থেকে দোতালায় ওঠবার কাঠের সিঁড়ির উপরে শোনা গেল না কারুর পায়ের শব্দ, কিন্তু ঘরের দরজার সামনে দেখা গেল মোহনপুরের মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণের মূর্তি !

মহেন্দ্রনারায়ণের মূর্তির ভিতর দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছিল এমন একটা আশ্চর্য ব্যক্তিত্বের ভাব যে চন্দ্রবাবু তাড়াতাড়ি মাথা হেঁট করে তাঁকে প্রণাম না করে পারলেন না।

মহেন্দ্রনারায়ণ ঘরের ভিতর এসে দাঁড়ালেন।

চন্দ্রবাবু তাড়াতাড়ি একখানা চেয়ার টেনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'আজ্ঞে, বসতে আজ্ঞা হোক্! ’

মহেন্দ্রনারায়ণ সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করলেন না, দাঁড়িয়ে রইলেন।

চন্দ্রবাবু বললেন, ‘আপনিই কি মোহনপুরের মহারাজা বাহাদুর?’

—হ্যাঁ।'

—'শুনলুম আমার সঙ্গে মহারাজা বাহাদুরের কোন দরকার আছে?'

এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মহেন্দ্রনারায়ণ হাত তুলে আনন্দকে দেখিয়ে বললেন, ‘তোমার ও লোকটি কি বিশ্বস্ত?”

—আজ্ঞে হ্যাঁ, অত্যন্ত।'

পরিচ্ছদের ভিতর থেকে একটি ছোট বাক্স বার করে মহেন্দ্রনারায়ণ বললেন, ‘এই বাক্সটা নিয়ে ওকে কাছাকাছি কোন জহুরির কাছে যেতে বল। ও যাচাই করে আসুক, এই বাক্সের ভিতরে যা আছে তার দাম কত?’

বাক্সটি নিয়ে আনন্দ বেরিয়ে গেল। জহুরির বাড়ি যেতে তার বেশিক্ষণ লাগল না। পরিচিত জহুরি।

আনন্দ বললে, ‘বাক্সটা খুলে দেখুন।’

বাক্সের ভিতর ছিল নানারকম রত্নখচিত অলঙ্কার!

জহুরি সবিস্ময়ে বললে, 'আনন্দবাবু, এ-সব জড়োয়া গয়না কার?

—'মোহনপুরের মহারাজার।'

-আশ্চর্য! এ-রকম জড়োয়া গয়না,একালেও কেউ ব্যবহার করে নাকি?'

—গয়নাগুলো কি ভালো নয়?’

—"ভালো নয়! বলেন কি? এমন চমৎকার গয়না আজকাল কেউ দেখতে পায় না! এ-রকম গয়নার চলন ছিল সেই নবাবি আমলে।’

—ওর দাম বলতে পারেন?’

— নিশ্চয়ই পারি।'

জহুরি গয়নাগুলো নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ পরীক্ষার পর বললে, 'ভারি দামি গয়না দেখছি।'

— কত দাম হবে?'

—“দশ লক্ষ টাকার কম নয়।'

শুনে আনন্দের মাথা ঘুরতে লাগল! দশ লক্ষ টাকার ভার বহন করে এখানে এসেছে, অথচ সে কিছুই অনুভব করতে পারে নি। দশ লক্ষ টাকা এত হাল্কা ! ওদিকে আনন্দ ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার পরেই মহেন্দ্রনারায়ণ গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘শোনো চন্দ্ৰমোহন! এখানে আজ আমার মিনিট-কয়েকের বেশি থাকবার উপায় নেই। কিছু দিন আগে কলকাতার এক রঙ্গালয়ে তোমার ভ্রাতুষ্পুত্রীকে আমি দেখেছিলুম। তাকে আমি বিবাহ করতে চাই।'

চন্দ্রবাবু সচকিত চোখে মহারাজার মুখের পানে তাকালেন। কি বললেন, বুঝতে পারলেন না। অদ্ভুত প্রস্তাব।

মহারাজা অবিচলিত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি অবাক হচ্ছ? কেন? আমার চেয়ে ধনী পাত্র পাবার আশা তুমি কর নাকি?”

চন্দ্রবাবু তখনো জবাব দিতে পারলেন না। কেবল এই অদ্ভুত প্রস্তাব বা বিস্ময়ের জন্যে নয়, আগন্তুককে দেখে তাঁর বুকের ভিতরে জাগ্রত হয়েছে কেমন একটা অজ্ঞাত আতঙ্ক! সেখান থেকে তাঁর পালিয়ে যাবার ইচ্ছা হল, কিন্তু কেবল ভদ্রতার খাতিরেই সে ইচ্ছা তিনি দমন করলেন।

অনেক কষ্টে শেষটা তিনি বললেন, 'মহারাজা বাহাদুর, আপনার প্রস্তাব শুনে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। কিন্তু লীলা বালিকা নয়, তার মত না নিয়ে আপনাকে কেমন করে কথা দেব?'

মহারাজা বললেন, 'চন্দ্রমোহন আমাকে ছলনা করবার চেষ্টা কোরো না। আমি জানি তুমিই লীলার একমাত্র অভিভাবক, তোমার অনুরোধ কিছুতেই সে অমান্য করবে না।’

মহারাজা সামনের দিকে দুই পা এগিয়ে এলেন। চন্দ্রবাবু পিছিয়ে গেলেন। তাঁর ভয় আরো বেড়ে উঠল, এই অদ্ভুত মূর্তির কাছে একলা থাকাও যেন বিপদজনক। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করলেন—হে ভগবান, আনন্দকে অবিলম্বে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও !

মহারাজা অধীর কণ্ঠে বললেন, ‘বল, তোমার মত কি?’

চন্দ্রবাবু আমতা আমতা করে বললেন, ‘কিন্তু মহারাজা আপনার জাতি- বাধা দিয়ে মহারাজা বললেন, 'আমার জাতি? তুমি কি জানো না রাজা- রাজড়ারা সব জাতেই বিবাহ করতে পারে?

— ‘কিন্তু — ‘

—"আর কোন কিন্তু নয়। শোনো, সেই ছোকরা বাক্স নিয়ে ফিরে এলেই শুনবে, তার ভিতরে আছে লক্ষ লক্ষ টাকার জড়োয়া গয়না। এ গয়না পাবে লীলাই। তার উপরে যৌতুক স্বরূপ আমি দেব আরো দশ লক্ষ টাকা! এর পরেও তোমার আপত্তি আছে?'

মহারাজ' নিষ্পলকনেত্রে চন্দ্রবাবুর মুখের দিকে তাকালেন। চন্দ্রবাবুর মনে হল সে জ্বলন্ত দৃষ্টি যেন তাঁর সমস্ত ইচ্ছাশক্তির হরণ করে নিচ্ছে। তাঁর মুখ দিয়ে যেন ইচ্ছার বিরুদ্ধেও বেরিয়ে গেল, 'আমার কোন আপত্তিই নেই।'

এই সময়ে গয়নার বাক্স নিয়ে ফিরে এল আনন্দ। তাকে দেখে চন্দ্ৰবাবু যেন মনের ভিতরে খানিকটা জোর পেলেন। ভাবলেন, আর একটু আগে ছোকরা যদি আসত তাহলে আমি কথা দিতুম না।

আনন্দ বললে, ‘জহুরি বললে বাক্সের ভিতরে দশ লক্ষ টাকার গয়না আছে।'

মহারাজা বললেন, “শুনলে?’

চন্দ্রবাবু নিজের মনকে এই ভেবে প্রবোধ দিতে চাইলেন, ‘মহারাজা দেখতেও সুপুরুষ নন, বয়সেও নবীন নন। কিন্তু লীলা হবে মহারাণী আর সম্পত্তিও পাবে বিশ লক্ষ টাকার, তার পক্ষে যেটা কল্পনাতীত। সুতরাং এমন বিবাহে সম্মতি দিলে আমার পক্ষে বিশেষ অন্যায় হবে না।' প্রকাশ্যে বললেন, ‘কিন্তু মহারাজা, আমার একটি আরজি আছে।'

– বল।’

—“বিবাহের আগে লীলার সঙ্গে আপনার পরিচয় করা উচিত।'

—"আজ আর সময় নেই। কাল ঠিক সন্ধ্যা আটটার সময়ে তোমার বাড়িতে আমি যাব।'

—আমার ঠিকানা জানেন?

—"জানি। গয়নার বাক্সটা তোমার কাছেই রেখে গেলুম।'

—‘একটা রসিদ দিই?'

চলে যেতে যেতে মহারাজা বললেন, ‘কোন দরকার নেই। আমাকে ঠকাতে পারে এমন কোন মানুষকে আমি জানি না। '

চন্দ্রবাবুর মনে হল, ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে গেল যেন একটা অপার্থিব ছায়া!

আনন্দ নিজের সন্দেহভঞ্জনের জন্যে আজও গিয়ে দাঁড়াল জানালার ধারে।

আজও মহারাজা বাহাদুরকে সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরুতে দেখলে না। ব্যাপারটা বড়ই আশ্চর্য, বড়ই অদ্ভুত, বড়ই ভয়াবহ! কিন্তু মুখে সে কিছুই প্রকাশ করলে না।

আর এ-সব কথা নিয়ে আলোচনা করবার মতন মনের অবস্থাও ছিল না তার। সে বুঝলে, তার সুখের মেঘে আগুন লাগতে আর দেরি নেই। যাকে কেন্দ্র করে তার ভবিষ্যতের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা বিকশিত হয়ে উঠেছিল, এইবারে সেই দেবীকে বিসর্জন দিতে হবে অশ্রুজলে। তবু সে স্বার্থপর হতে চায় না। লীলা যদি সুখী হয়, হোক্ সে মোহনপুরের মহারাণী।

ভয়াবহ মহারাজা

পরের দিন সন্ধ্যা আটটার কিছু আগে।

চন্দ্রবাবু অতিথি সৎকারের জন্যে আহার্যের আয়োজন করেছিলেন প্রচুর। ডিমের পরোটা, লুচি, পোলাও, মাংস, তিন রকম মাছ, তিন রকম নিরামিষ তরকারী, রুই মাছের ডিমের চাটনি, ইলিশ মাছের ডিম ভাজা, সন্দেশ, রসগোল্লা, দই, রাবড়ি ও ছানার পায়স প্রভৃতি। লীলা নিজের হাতে সারা দিন ধরে এই- সব রেঁধেছে। যদিও এখনো সে জানে না যে অতিথি আসছেন, তাঁর সঙ্গে তার ভবিষ্যতের সম্পর্ক কি !

আনন্দও তার কাছে কোন কথা ভাঙেনি। নিজের দুঃখ সে পুষে রেখেছে নিজের মনের ভিতরেই।

বোধহয় তার মুখেও মনের ছায়া পড়েছিল কিছু-কিছু। কারণ লীলা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছে, ‘আনন্দবাবু, আপনার মুখ আজ শুকনো দেখাচ্ছে কেন?’ আনন্দ সহাস্যে লীলার প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়েছে এই বলে, শরীরটা আজ তেমন ভালো নেই।'

বাজল আটটা। সঙ্গে সঙ্গে বৈঠকখানার দরজার সামনে দেখা গেল মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণ বাহাদুরকে।

চন্দ্রবাবুর বুকের কাছটা ধ্বক্ করে উঠল। এমন আকস্মিকভাবে মহারাজার আবির্ভাব তিনি প্রত্যাশা করেন নি। মহারাজা আত্মপ্রকাশ করলেন যেন হাওয়ার ভিতর থেকেই। যদিও এমন চিন্তা হাস্যকর, তবু এই কথাই মনে হল চন্দ্রবাবুর। কিন্তু বিস্মিত হল না আনন্দ। সে এইটেই আশা করছিল।

মহেন্দ্রনারায়ণ দরজার কাছ থেকেই বললেন, 'আমার হাতে আধ ঘণ্টার বেশি সময় নেই। তোমার ভ্রাতুষ্পুত্রী কোথায়? '

চন্দ্রবাবু বললেন, ‘দোতালায়।’

—তবে দোতালায় চল।' মনে রেখ, ‘কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে আটটার সময়ে আমাকে এখান থেকে যেতে হবে।'

ভালো করে মহেন্দ্রনারায়ণের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রবাবু কেমন শিউরে উঠলেন! আনন্দেরও দুই চক্ষু হল বিস্ফারিত।

মহেন্দ্রনারায়ণ আজ এসেছেন পদস্থ সৈনিকের বেশে এবং তাঁর সমস্ত মুখখানা স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। আর সে কী মুখ !

মুখের রঙ একেবারে হলদে, তার মধ্যে রক্তের চিহ্নমাত্র নেই। চোখের তারার উপর ও নীচের দিকেও দেখা যাচ্ছে সাদা অংশ—সে যেন কোন উন্মাদগ্রস্থের চোখ! মাথায় লম্বা লম্বা রুক্ষ, কটা চুলগুলো এসে পড়েছে কাঁধের উপরে, যেন তৈলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ঘুচে গেছে বহুকাল! ওষ্ঠাধর কালো কুচকুচে, তাদের ঠেলে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে দু-পাশে দুটো শ্বাপদের মতন হিংস্র, হলদে-রঙের লম্বা দাঁত! হঠাৎ দেখলে মনে হয়, এ যেন অনেক দিন আগেকার গলায়-দড়ি-দিয়ে-মরা মানুষের মুখ, কোন দুষ্ট প্রেতাত্মা দেহের ভিতরে আশ্রয় নিয়ে মুখখানাকে জ্যান্তো করে রেখেছে কতকটা !

মনের ভাব প্রাণপণে গোপন করে চন্দ্রবাবু বললেন, ‘বেশ, আসুন মহারাজা বাহাদুর, আমরা দোতালাতেই যাই।'

সশব্দে ভারি ভারি পা ফেলে মহেন্দ্রনারায়ণ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলেন—ঠিক যন্ত্রচালিত কোন মূর্তির মতন। কিংবা যেন কোন পুতুল বাজির পুতুলকে চালনা করছে অদৃশ্য রজ্জুর সাহায্যে !

উপরের ঘরে বসেছিল লীলা। মহেন্দ্রনারায়ণকে দেখেই সে চমকে আড়ষ্ট হয়ে রইল কাঠের মতন।

চন্দ্রবাবু বললেন, ‘লীলা, ইনি হচ্ছেন মোহনপুরের মহারাজা বাহাদুর।' লীলা নিজেকে সামলে নিয়ে তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে দুই হাত জোড় করে প্রণাম করলে।

মহেন্দ্রনারায়ণ প্রায় আধ মিনিট ধরে লীলার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ ফিরে পাশের ঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চন্দ্রমোহন, একবার ঐ ঘরে আমার সঙ্গে এস।'

চন্দ্রবাবু বললেন, 'যাচ্ছি মহারাজা বাহাদুর! আপনার যখন সময় নেই তখন তাড়াতাড়ি খাওয়ার ব্যবস্থাটা করে যাই।'

মহেন্দ্রনারায়ণ অত্যন্ত বিস্মিত স্বরে বললেন, ‘খাবার !’

চন্দ্রবাবু বললেন, “মহারাজা বাহাদুর! আপনাকে খাওয়াবার শক্তি আমার কোথায়? সামান্য আয়োজন।'

—সামান্য বা অসামান্য কোন খাদ্যই আমি গ্রহণ করতে পারব না।'

—সে কি! লীলা এত কষ্ট করে রেঁধেছে।'

—'বাজে সময় নষ্ট কোরো না। পাশের ঘরে চল।'

অগত্যা আর বাক্যব্যয় না করে মহেন্দ্রনারায়ণকে নিয়ে চন্দ্রবাবু পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। বললেন, ‘এখন কি আদেশ বলুন।'

—‘এই নাও দশ লক্ষ টাকার নোট। লীলাকে আমি সঙ্গে নিয়ে মোহনপুরে ফিরে যেতে চাই।'

—বিবাহ না করেই?'

—আমাদের বংশের নিয়ম, পাত্র রাজধানীতে নিয়ে গিয়ে পাত্রীকে বিবাহ করবে।'

—“মহারাজার রাজ্যের কথা জানি না, কিন্তু এদেশে ও-নিয়ম অচল।' মহেন্দ্রনারায়ণ সিধে হয়ে দাঁড়ালেন, মাথায় তিনি যেন উঁচু হয়ে উঠলেন আরো এক ফুট! দীপ্ত চক্ষে চন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরকে গম্ভীরতর করে বললেন, ‘চন্দ্রমোহন! আমাকে তোমাদের দেশের নিয়ম মেনে চলতে হবে নাকি? লীলাকে আমার হাতে সমর্পণ করবে বলে তুমি কথা দিয়েছ—নিজের কথা রাখতে তুমি বাধ্য। কাল আমার সঙ্গে মোহনপুরে যেতে হবে। বুঝলে? বুঝলে? বুঝলে?”

. সেই দীপ্ত দৃষ্টির মধ্যে ছিল কোন জাদু! আবার চন্দ্রবাবুর মনে হল, তাঁর সমস্ত ইচ্ছাশক্তি যেন বিলুপ্ত হয়ে গেল! সামনের মূর্তি যেন প্রভু, তিনি যেন গোলাম! মাথা নত করে বললেন, ‘যে আজ্ঞে, তাই হবে।'

—"কাল সকাল দশটার সময় সিপাহিদের সঙ্গে ডুলি আসবে। লীলা যেন প্রস্তুত হয়ে থাকে। তার সঙ্গে আর কেউ যেতে পারবে না। এই আমার আদেশ। তুমি কথা দিয়েছ, এ আদেশ অমান্য করে নিজের বিপদকে ডেকে এনো না।' মহেন্দ্রনারায়ণ হঠাৎ ঘর ছেড়ে বাইরে এবং তারপর বেরিয়ে গেলেন বাড়ির ভিতর থেকে।

চন্দ্রবাবু আচ্ছন্নের মতন দাঁড়িয়ে রইলেন।

লীলা ও আনন্দ সেই ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল।

লীলা সভয়ে বললে, ‘উঃ, মহারাজের কি ভয়ঙ্কর চেহারা!’

চন্দ্রবাবু যেন স্বপ্নাবিষ্টের মতন বললেন, 'ভয়ঙ্কর চেহারা?’

লীলা শিউরে উঠে বললে, 'মাগো! তুমি কি লক্ষ্য করে দেখ নি মহারাজা যতক্ষণ এখানে ছিলেন, একবারও তাঁর চোখের পাতা পড়ে নি? ঠিক যেন মরা মানুষের চোখ!'

আনন্দ বললে, ‘আমি আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্যে জ্যান্তো মানুষের বুক ওঠে আর নামে। কিন্তু মহারাজের বুক ছিল একেবারে স্থির। ঠিক যেন মরা মানুষের বুক!'

চন্দ্রবাবু বললেন ‘তোমরা ভুল দেখেছ। মরা মানুষ কখনো চলে-ফেরে, কথা কয়?'

লীলা বললে, ‘সে কথা সত্যি। কিন্তু আমি যদি একটি রাজ্য পাই, তাহলেও তোমার মহারাজা বাহাদুরকে আবার চোখে দেখতে রাজি হব না!’

চন্দ্রবাবু শ্রান্ত স্বরে বললেন, ‘আমি বললেও রাজি হবি না ! লীলা আদর করে দুই হাতে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, 'তুমি বললে সব পারি।'

—পারিস্ তো?’

—হ্যাঁ জ্যাঠামশাই!'

—তাহলে শুনে রাখ, ঐ মহারাজ বাহাদুরের সঙ্গে তোর বিয়ে হবে। আমি কথা দিয়েছি।'

লীলা দারুণ বিস্ময়ে চমকে উঠল।

চন্দ্রবাবু আবার বললেন, ‘কাল সকালে দশটার সময়ে তোকে মোহনপুরে নিয়ে যাবার জন্যে মহারাজের লোকজন আসবে। সঙ্গে আমরা কেউ থাকব না। তোর বিয়ে হবে মোহনপুরেই।' তাঁর মনে হল কেউ যেন জোর করে তাঁকে বাধ্য করলে এই কথাগুলো উচ্চারণ করতে!

লীলা চেয়ে রইল বিস্ফারিত চক্ষে।

চন্দ্রবাবু আবার বললেন, “মহারাজ বাহাদুর তোর জন্যে বিশ লক্ষ টাকার সম্পত্তি আমার হাতে দিয়ে গিয়েছেন।'

লীলা কিছু বললে না, কেবল মাথা করলে নত।

মোহনপুর

লীলা মোহনপুরে চলে গিয়েছে। তার অভাবে সমস্ত বাড়িখানা ঠেকছে ফাঁকা- ফাঁকা। চন্দ্রবাবুর আর কিছু ভালো লাগে না।

নিজেকে তাঁর অপরাধী বলে মনে হয়। একজন অজানা—কেবল অজানা নয়, প্রাচীন-বয়সী এবং ভয়াভয়-রূপে কুৎসিত বিদেশীর হাতে টাকার লোভে এমন করে লীলাকে সমর্পণ করা তাঁর পক্ষে উচিত হয় নি কিছুতেই। না জানি তিনি লীলার চোখে হীন হয়ে পড়েছেন কতখানি !

কিন্তু লীলা তো কিছুই জানে না, তাঁর কোন উপায় ছিল না। মহেন্দ্রনারায়ণ নিশ্চয়ই মায়াবী। সে যখনি এসেছে তখনি কি মন্ত্রগুণে তাঁকে বশ করে ফেলেছে।

তার সামনে তিনি হারিয়ে ফেলতেন নিজের সমস্ত নিজস্ব। তার হাতে লীলাকে তিনি তুলে দিয়েছেন নিজের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারেই। লীলার সঙ্গে দেখা হলে এই সত্যটাই তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে।

আনন্দও যে মন-মরা হয়ে আছে সে কথা বলাই বাহুল্য। চন্দ্রবাবুর বাড়িতেও সে খুব অল্পক্ষণই থাকে। চিত্রশালায় গিয়ে দিনের অধিকাংশ সময়েই সে কাজকর্মের মধ্যে ডুবে থেকে ভোলবার চেষ্টা করে লীলার অভাব। তিন দিনের কাজ সে শেষ করে ফেলে এক দিনে।

প্রায় এক মাস কেটে গেল লীলার কোন খবর নেই।

একদিন আনন্দকে ডেকে চন্দ্রবাবু বললেন, ‘ব্যাপার বড় ভালো বুঝছি না। ’

— “কি ব্যাপার?'

—‘যাবার সময়ে লীলা বলে গিয়েছিল নিয়মিতভাবে চিঠিপত্র লিখবে। কিন্তু এক মাসেও তার একখানা চিঠিও এল না। এর কারণ কি?

—হয়তো তার অসুখ করেছে।'

—আমারও সেই ভাবনা হচ্ছে। এখন কি করা উচিত বল দেখি? ' —‘মোহনপুরে নিজে একবার যান না।'

—'মহারাজা যদি অসন্তুষ্ট হন?'

– কেন?’

—আমি গরিব। তুচ্ছ পোটো। সকলের সামনে আমাকে শ্বশুর বলে মানতে যদি তাঁর মানে বাধে?”

—তবু আপনার যাওয়া উচিত।'

—এ কথা ঠিক। লীলার প্রতিও তো আমার কর্তব্য আছে! বেশ আনন্দ, কালকেই আমি মোহনপুরে যাত্রা করব।'

কলকাতা থেকে মোহনপুর হচ্ছে প্রায় দুই শত মাইল।

মোহনপুর হচ্ছে একটি ছোটোখাটো শহর। প্রধান রাজপথটি মাঝারি আকারের, সোজা চলে গিয়ে শেষ হয়েছে রাজবাড়ির ফটকের সামনে। ফটকের মুখে বন্দুক ঘাড়ে করে পাহারা দিচ্ছে সুসজ্জিত সিপাহী। প্রকাণ্ড প্রাসাদ— মাঝখানে মস্ত গম্বুজ।

চন্দ্রবাবু সিপাহীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'মহারাজা বাহাদুরের সঙ্গে দেখা হবে?'

—'ম্যানেজারবাবুকে জিজ্ঞাসা করুন।'

—‘তিনি কোথায়?'

—'ঐ যে, এইদিকেই আসছেন। একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক রাজবাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন ৷ চন্দ্ৰবাবু তাঁকে নমস্কার করলেন।

ম্যানেজার বললেন, ‘মহাশয়ের কি চাই?'

—'একবার মহারাজা বাহাদুরের দর্শন প্রার্থনা করি।'

– আপনি কোথা থেকে আসছেন?’

—"কলিকাতা থেকে।'

—আপনি মহারাজ বাহাদুরকে চেনেন? '

—‘কিছু কিছু চিনি।’

—'কি সূত্রে তাঁর সঙ্গে আপনার পরিচয়?'

চন্দ্রবাবু ভেবেছিলেন, মহারাজার সঙ্গে তাঁর আসল সম্পর্কের কথা বাইরের কারুর কাছে ভাঙবেন না। কিন্তু এখন তাঁকে বাধ্য হয়ে বলতে হল, ‘মহারাজ বাহাদুরের সঙ্গে আমার ভ্রাতুষ্পুত্রীর বিবাহ হয়েছে।

ম্যানেজার চমকিত চোখে চন্দ্রবাবুর মুখের পানে তাকালেন। বললে, ‘অসম্ভব!' চন্দ্রবাবু আহত কণ্ঠে বললেন, ‘কেন, অসম্ভব কেন? আমার চেহারা হোমড়া- চোমরা নয় বলে আমার ভ্রাতুষ্পুত্রীও কি মহারাজের অযোগ্যা?”

—“না মশাই, তা নয়। আমি সেজন্যে অসম্ভব বলছি না।'

— “তবে?”

– আমাদের মহারাজা এখনো বিবাহ করেন নি।'

এইবারে চন্দ্রবাবুর বিস্মিত হবার পালা। খানিকক্ষণ স্তব্ধ থেকে বললেন, ‘এত বয়সেও তাঁর বিবাহ হয় নি, আমাকে কি এই কথা বিশ্বাস করতে হবে? —“মশাই কি বলছেন? আমাদের মহারাজা নরেন্দ্রনারায়ণ এই সবে তেইশে পা দিয়েছেন!'

চকিত স্বরে চন্দ্রবাবু বললেন, 'আপনাদের মহারাজা নরেন্দ্রনারায়ণ? —হ্যাঁ, আমাদের মহারাজার ঐ নাম।

—তবে কি তিনি কলিকাতায় গিয়ে নাম ভাঁড়িয়েছিলেন?'

—'কলকাতায় কতদিন আগে তাঁর সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?

—'মাসখানেক আগে।'

ম্যানেজার এইবারে হেসে বললেন, “মশাই কোন জুয়াচোরের পাল্লায় পড়েছেন। আমাদের মহারাজা সবে গেল হপ্তায় বিলাত থেকে ফিরেছেন। বিলাতে তিনি আট মাস ছিলেন।'

চন্দ্রবাবুর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল। তবে কি তিনি লীলাকে সমর্পণ করেছেন কোন প্রতারকের কবলে? তবু তিনি একটা নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত- পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখানে মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণ বলে কেউ আছেন?”

—‘একালে নেই। সেকালে ছিলেন।'

—"মানে?’

—মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণ ছিলেন বর্তমান মহারাজার পিতামহ। ষাট বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

চন্দ্রবাবু সেইখানে দাঁড়িয়ে রইলেন মন্ত্রাচ্ছন্ন স্তম্ভিতের মতন। তারপর তাঁর মাথার ভিতর দিয়ে খেলে গেল আর এক ভয়াবহ সম্ভাবনার বিদ্যুৎ! তাড়াতাড়ি তিনি বললেন, ‘মহেন্দ্রনারায়ণের কোন প্রতিকৃতি আছে?'

ম্যানেজার হেসে বললেন, 'আপনি সন্দেহভঞ্জন করতে চান? বেশ, আসুন ৷ রাজবাড়ির বৈঠকখানায় মহারাজার পূর্বপুরুষদের ‘অয়েল পেন্টিং’ আছে।'

প্রকাণ্ড বৈঠকখানা, রাজকীয় ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ—দেওয়ালে দেওয়ালে বড় বড় নতুন ও পুরাতন মূর্তিচিত্ৰ ৷

একদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে ম্যানেজার বললেন, ‘ঐ দেখুন মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণকে। শুনেছি তাঁর মৃত্যুর তিনদিন আগে ছবিখানা আঁকা হয়। তিনি হঠাৎ মারা যান জলে ডুবে। তাঁর দেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি।'

কিন্তু এ-সব কথা চন্দ্রবাবুর কর্ণে প্রবেশ করছিল না। প্রায় বাহ্যজ্ঞানহীন হয়ে তিনি চিত্রাঙ্কিত মহেন্দ্রনারায়ণের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন নিষ্পলকনেত্রে। এই তো লীলার স্বামী মহেন্দ্রনারায়ণ! তবে তিনি দেখেছেন এক অপার্থিব মৃত মুখ, আর এ মুখ হচ্ছে জীবন্ত মানুষের—আকাশপাতাল তফাত, কিন্তু মুখ এক!

চন্দ্রবাবুর মনে হল ছবির মহেন্দ্রনারায়ণ যেন তাঁর দিকে তাকিয়ে ক্রূর উপহাসের হাসি হাসলেন !

ম্যানেজার তাঁর গায়ে হাত দিয়ে বললেন, “মশাই, সাড়া দেন না কেন? এখন আপনার সন্দেহ মিটল তো?”

সুপ্তোত্থিতের মতন চন্দ্রবাবু বললেন, 'অ্যাঁ, কি বলছেন? হ্যাঁ, একমাস আগে এই মূর্তিই আমার বাড়িতে গিয়েছিল।'

—‘পাগলের মতন প্রলাপ বকরেন না।’

চন্দ্রবাবু হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠে বললেন, ‘পাগল এখনো হই নি, এইবারে হব'—বলতে বলতে তিনি অবশ হয়ে বসে পড়লেন গৃহতলে।

অপার্থিব দুঃস্বপ্ন

রাত নয়টার সময়ে চন্দ্রবাবু শেষ আহার করতেন। সেদিনও আনন্দের সঙ্গে তিনি আহারে বসেছিলেন।

গতকল্য তিনি মোহনপুর থেকে কলিকাতায় ফিরছেন। তাঁর মুখ থেকে সব শুনেছে আনন্দও ৷

দুজনেরই মনের অবস্থা ভালো নয়। কথা নেই কারুর মুখেই। হঠাৎ সজোরে বেজে উঠল সদর দরজার কড়াজোড়া। তারপর হল দরজা-খোলার শব্দ।

চন্দ্রবাবু বিরক্তকণ্ঠে বললেন, ‘বেয়ারা কেন দরজা খুলে দিলে? এত রাত্রে কে আবার জ্বালাতে এল?’

সিঁড়ির উপরে লঘুপদের দ্রুত শব্দ শোনা গেল। তারপরেই ছুটে ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল লীলা !

কিন্তু কী মূর্তি! কী বেশ!

এলোমেলো এলানো চুল—যেন তেল-জলের সঙ্গে বহুকালের সম্পর্ক নেই ! অসম্ভব আতঙ্কে চোখ দুটো যেন বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, গাল দুটো গেছে ভিতরে বসে এবং থর্ থর্ করে কাঁপছে সারা গা।

ধুলো-কাদা মাখা পরনের কাপড়ে পাট নেই, জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া এবং সেখানা হচ্ছে সেই কাপড় যা পরে সে গিয়েছিল মোহনপুরে।

মাটির উপরে ধপাস্ করে বসে পড়ে লীলা চেঁচিয়ে উঠল, 'জল! জল ! নইলে এখনি বুক ফেটে যাবে।'

আনন্দ তাড়াতাড়ি জল এনে দিলে, সে এক সঙ্গে ঢক্ ঢক্ করে তিন গেলাস জল খেয়ে ফেললে। যেন তার নির্জল মরুযাত্রীর তৃষা !

আবার সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘খাবার! খাবার! নইলে এখনি আমি মরে যাব!

চন্দ্রবাবু নিজের খাবারের পাত্রগুলো তখনি তার দিকে ঠেলে দিলেন। সে দুই হাতে গোগ্রাসে খাবারগুলো মুখে তুলে খেয়ে ফেললে, কিন্তু মিটল না তার দারুণ ক্ষুধা! নিজেই হুমড়ি খেয়ে আনন্দেরও খাবারের পাত্রগুলো টেনে নিয়ে আবার দুই হাতে খেতে আরম্ভ করলে—যেন তার দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা !

চন্দ্রবাবু নির্বাক বিস্ময়ে লীলার প্রকৃতিবিরুদ্ধ এই অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করতে লাগলেন। আনন্দও।

পানাহার শেষ করেই সে ভীতস্বরে বলে উঠল, 'সব কথা পরে হবে। যদি আমাকে বাঁচাতে চাও, শিগগির একজন ভাল রোজা ডেকে আনো! একটুও দেরি কোরো না—একটুও না!'

আনন্দ রোজা ডাকতে ছুটল। সেই পাড়াতেই এক বিখ্যাত রোজার বাড়ি ছিল।

মিনতি-ভরা কণ্ঠে লীলা বললে, ‘জ্যেঠামশাই, তোমার দুটি পায়ে পড়ি। এ ঘরে আমাকে একলা ফেলে যেও না!”

—‘যাব না মা, যাব না। আমি তোর কাছেই থাকব!'

—"হ্যাঁ, আমার কাছেই থাকো। একলা হলেই আবার আমি মরব!'

—তোর কথার মানে বুঝতে পারছি না।'

আগেই বলেছি এ-ঘরের মাঝের এক দরজা দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়া যায় এবং দেখাও যায় তার ভিতরটা! সেইদিকে তাকিয়েই আঁতকে উঠে লীলা অতি আর্তস্বরে আবার চিৎকার করে উঠল, 'ওগো সে এসেছে, সে এসেছে!'

চন্দ্রবাবু সবিস্ময়ে বললেন, ‘কে এসেছে রে?'

—সে, সে, সে! তার নাম নেই, তার দেহ নেই, কিন্তু আছে। জ্যাঠামশাই, জ্যাঠামশাই, তুমি কি পচা মড়ার দুর্গন্ধ পাচ্ছ না? '

চন্দ্রবাবু ভয় পেয়ে বললেন, 'কই, পাচ্ছি না তো!'

—'কিন্তু আমি পাচ্ছি। আমাকে সে ঠকাতে পারবে না।'

—তুই কার কথা বলছিস্ !

—সে আমাকে আবার নিয়ে যেতে এসেছে, সে!'

–কোথায় সে?'

আঙুল দিয়ে পাশের ঘর দেখিয়ে কাঁদন-ভরা গলায় লীলা বললে, 'ঐখানে ! ঐ যে দাঁড়িয়ে আছে, আমি ওকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি! উঃ!’

পাশের ঘরের দিকে ত্রস্ত চক্ষে তাকালেন চন্দ্রবাবু। হ্যাঁ, ওখানে সুদীর্ঘ ছায়ার মতন কি একটা দেখা যাচ্ছে বলেই তো বোধ হচ্ছে! তারপর ভালো করে দেখে বুঝলেন, তাঁর চোখের ভ্রম। উপর থেকে সমুজ্জ্বল আলোর আঁধার ঝুলছে, ছায়া বা কায়া কোন-কিছুই নেই ওখানে। খালি ঘর।

বললেন, 'তুই ভুল দেখছিস্ লীলা। ও-ঘরে কেউ নেই।'

দুই বাহু দিয়ে চন্দ্রবাবুকে জড়িয়ে ধরে লীলা আকুল-স্বরে বললে, 'আছে, আছে, আছে! আমি ওকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ও আমাকে আবার নিয়ে যাবে।’ তুমি যদি একবার ছেড়ে যাও, ও আবার আমাকে নিয়ে যাবে।’

এমন সময়ে রোজাকে সঙ্গে করে আনন্দ পাশের ঘরে এসে দাঁড়াল। রোজা ভিতর এসেই বললে, 'আমি এই ঘরে কোন দুষ্ট আত্মাকে অনুভব করছি।.......হ্যাঁ কোন সন্দেহ নেই। দুষ্ট আত্মা—পিশাচ, পিশাচ! রাজা নলের দেহে যেমন শনি ঢুকেছিল, সেও তেমনি কোন মানুষের মৃতদেহের মধ্যে ঢুকে পৃথিবীর উপর অত্যাচার করে বেড়ায়। ভীষণ পিশাচ! আমাকে আগে এই ঘরে বসেই কাজ আরম্ভ করতে হবে।'

আনন্দ ভীত ও সন্দিগ্ধনেত্রে পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে চারিদিকে ফিরে ফিরে তাকাতে লাগল। কিন্তু সন্দেহ করবার মতন কোন-কিছুই দেখতে পেলে না। অথচ এইটুকু অনুভব করতে পারলে, ঘরের ভিতরে সে এবং রোজা ছাড়া অন্য কোন হিংস্র, ভয়ানকের অস্তিত্ব আছে।

উত্তেজনার পর উত্তেজনায় চন্দ্রবাবুর দেহ ক্রমেই নেতিয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই অবস্থাতেই রোজার কথা শুনে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তাঁর সর্বাঙ্গ।

লীলা চোখের সামনে কি দেখতে পাচ্ছিল তা সেই-ই জানে, কিন্তু এইবারে সে দুই চক্ষু দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে এলিয়ে পড়ল।

রোজা মাটির উপরে আসন পিঁড়ি হয়ে বসে পড়ে মন্ত্র উচ্চারণ করতে উদ্যত হল—এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল একটা প্রবল দমকা হাওয়া~~~সঙ্গে সঙ্গে ছাদ থেকে বিলম্বিত আলোটা হল নিৰ্বাপিত।

রোজা চিৎকার করে বললে, আলো, আলো—শিগগির আর একটা ‘আলো আনো। অন্ধকারে ফুটে উঠেছে দুটো মারাত্মক দীপ্ত চক্ষু, এখনি সর্বনাশের সম্ভাবনা। শিগগির আলো,—আলো, আলো, আলো!'

চন্দ্রবাবু আত্মহারার মতন এক লাফে দাঁড়িয়ে উঠে টেবিলের উপর থেকে আলোটা তুলে ও-ঘরের দিকে ছুটে গেলেন।

লীলা তীক্ষ্ণস্বরে কেঁদে উঠে বললে, 'জ্যাঠামশাই যাবেন না-যাবেন না—আমাকে একলা ফেলে যাবেন না, জ্যাঠামশাই।'

'আমি তোর সামনেই আছি মা, আলোটা ও-ঘরে রেখেই আবার তোর পাশে এসে বসব’ —বলতে বলতে চন্দ্রবাবু পাশের ঘরে গিয়ে আলোটা মেঝের উপরে বসিয়ে দিয়েই আবার এ-ঘরে ফিরে আসবেন—

এমন সময় আচম্বিতে মাঝের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল সশব্দে! পর মুহূর্তেই লীলার কণ্ঠে জাগল পরিত্রাহি চীৎকারের পর চীৎকার!

চন্দ্রবাবু পাগলের মতন মাঝের দরজার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আনন্দ ও রোজা যোগ দিলে তাঁর সঙ্গে। ও-ঘরের মধ্যে লীলার বিষম চীৎকার ও ব্যাকুল ক্রন্দন আরো বেড়ে উঠল, কিন্তু তিনজনের সমবেতশক্তিও দরজার পাল্লা দুখানাকে এক চুল ফাঁক করতে পারলে না।

তারপরেই একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল লীলার কণ্ঠস্বর! ও-ঘরের বারান্দার দিকের একটা দরজা খোলার শব্দ হল। এবং তারপরেই অকস্মাৎ খুলে গেল মাঝের ঘরের বন্ধ দরজাটা। যারা প্রাণপণে দরজা ঠেলছিল তারা সকলেই টাল সামলাতে না পেরে খোলা দরজার ভিতর দিয়ে ও-ঘরের মেঝের উপরে পড়ে গেল হুম্‌ড়ি খেয়ে!

আলো এনে দেখা গেল, ঘরের মধ্যে কেউ নেই।

আনন্দ বারান্দায় যাবার খোলা দরজা দিয়ে ছুটে গেল বাইরে। সেদিন উঠেছিল প্রতিপদের চাঁদ। চারিদিক করছে ধবধব।

বারান্দার তলাতেই একটি ছোট রাস্তা। তারপরেই একটা পুষ্করিণী এবং তার ভাঙা ঘাট।

সেই ভাঙা ঘাটের সামনে পুষ্করিণীর খানিকটা জল ঘুরছিল চক্রের পর চক্র দিয়ে। যেন এইমাত্র সেখানে কোন ভারি জিনিস পড়েছে কিংবা কেউ ঝাঁপ খেয়ে অতলে তলিয়ে গিয়েছে।

এক যুগ পরে

তারপর কেটে গিয়েছে বারো বৎসর—অর্থাৎ এক যুগ।

দেবতারা নাকি অমর, তাঁদের কথা বলতে পারি না; কিন্তু মানুষের পৃথিবীতে এক যুগ বড় অল্পকালের কথা নয়। এই দেখ না, ধরতে গেলে বারো বৎসরের মধ্যেই সমস্ত পৃথিবীতে রক্তসাগরের ঢেউ খেলার জন্যে ধূমকেতুর মতন হিটলারের আবির্ভাব ও অন্তর্ধান।

বারো বৎসর পরে লীলাকে না ভুললেও তার অভাব আনন্দকে আর তেমন ভাবে আঘাত দেয় না। চন্দ্রবাবু পরলোকে। নিজের সম্পত্তি তিনি দান করে গিয়েছেন আনন্দকেই এবং আনন্দও এখন একজন ভারতবিখ্যাত চিত্রকর। তার খ্যাতি হয়তো চন্দ্রবাবুর চেয়েও বেশী।

সেদিন আনন্দ চিত্রশালায় বসে নিজের মনে কাজ করছে। এমন সময়ে একটি ভদ্রলোক এসে উপস্থিত। আনন্দ মুখ তুলে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল জিজ্ঞাসু চোখে।

আগন্তুক বললেন, ‘আমি মোহনপুরের মহারাজা নরেন্দ্রনারায়ণের প্রাইভেট সেক্রেটারি।'

মোহনপুর, মোহনপুর! স্মৃতি-বীণার একটি পুরাতন তার নূতন করে বেজে উঠল অনেকদিন পরে!

বাইরে কোন রকম চাঞ্চল্য প্রকাশ না করে আনন্দ জিজ্ঞাসা করলে, 'আমার কাছে কি দরকার?'

—মহারাজা বাহাদুরের একখানা তৈলচিত্র আঁকবার জন্যে আপনি মোহনপুরে যেতে পারবেন? পারিশ্রমিক যা চাইবেন পাবেন।'

আনন্দ সম্মতি জানালে।

—“কবে যেতে পারেন?’

—আগামী রবিবার।

যথাসময়ে আনন্দ মোহনপুরে গিয়ে হাজির হল।

বৈঠকখানায় বসেছিলেন মহারাজা বাহাদুর। অতি সদালাপী লোক। তাঁর সঙ্গে কথা কইতে কইতে হঠাৎ আনন্দের দৃষ্টি পড়ল মহেন্দ্রনারায়ণের প্রকাণ্ড তৈলচিত্রের উপরে। মহারাজের কি-একটা প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে সে একেবারে থেমে গেল—বিস্ফারিতনেত্রে আড়ষ্ট হয়ে তাকিয়ে রইল ছবিখানার দিকে। তার মনে হল ছবির মুখ যেন তাকে দেখেই নির্দয় ব্যঙ্গভরা হাসি হাসছে।

মহারাজা বিস্মিত হয়ে বললেন, 'মনে হচ্ছে আমার পিতামহের ছবি দেখে আপনি ভয় পেয়েছেন! কেন বলুন দেখি?'

আনন্দ তাড়াতাড়ি আপনাকে সামলে নিলে।

সন্ধ্যার পর বেড়িয়ে আনন্দ বাসার দিকে ফিরে আসছে। মোহনপুর এবং তার আশেপাশে দেখবার কিছুই নেই, বন, মাঠ আর নদী ছাড়া।

তখন চাঁদ উঠেছিল। খণ্ডচাঁদ। অন্ধকার একটুখানি পাৎলা হয়েছিল বটে, কিন্তু ভালো করে নজর চলে না। তার উপরে আনন্দ যেখান দিয়ে আসছিল সেখানে পথের দুই ধারে দাঁড়িয়ে বড় বড় গাছের পর গাছ সৃষ্টি করেছে অন্ধ- করা অন্ধকার।

তফাতে দেখা যাচ্ছে একটা আলো।

খানিক এগিয়ে আনন্দ দেখলে, আলো হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে একটা মূৰ্তি। আরো এগিয়ে বুঝলে মূর্তিটা স্ত্রীলোকের। কাছে এসে দেখলে, লীলার মূর্তি !

নিজের চোখকে আনন্দ বিশ্বাস করতে পারলে না, চমৎকৃত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দুই চক্ষু বিস্ফারিত।

লীলা নীরবে হাসলে—অতি মৃদু করুণ হাসি।

আনন্দ বললে, ‘লীলা।’

ওষ্ঠাধরে তর্জনী রেখে লীলা কথা কইতে মানা করলে আনন্দকে। তারপর ইসারা করে বললে আনন্দকে তার সঙ্গে সঙ্গে যেতে। তারপর সে অগ্রসর হল। লীলার পিছনে পিছনে যেতে যেতে তার হাতের লণ্ঠনের আলোতে আনন্দ এটাও লক্ষ্য করলে, আজও সে পরে আছে সেই কাপড়খানাই, যা পরে যাত্রা করেছিল মোহনপুরের দিকে।

বন এত নিস্তব্ধ যে একটা ঝিঁঝিঁপোকাও ডাকছে না, গাছের একটা পাতার শব্দও হচ্ছে না। মরে গিয়েছে পৃথিবী। এটা যেন ইহলোক নয়, পরলোক।

বন শেষ। নদীর ধার, কিন্তু জলকলরোল শোনা যায় না। মরা চাঁদের আলো। বাতাসের দম বন্ধ ৷

একখানা পুরানো বাড়ীর খানিকটা ভেঙে পড়েছে, খানিকটা দাঁড়িয়ে আছে। লীলা তার ভিতরে গিয়ে ঢুকল। একখানা মস্ত ঘর। তারই মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল লীলা এবং আনন্দ।

ঘরের মাঝখানে রয়েছে প্রকাণ্ড পালঙ্ক—চারিধার তার মশারি দিয়ে ঘেরা। মৌনমুখে ধীরপদে এগিয়ে গিয়ে লীলা মশারির কাপড় টেনে তুললে। খাটের উপর একেবারে সিধে হয়ে বসে আছে মোহনপুরের মহারাজা মহেন্দ্রনারায়ণের বিভীষণ মূর্তি!

বিকট চীৎকার করে আনন্দ মূর্ছিত হয়ে পড়ল।

পরদিন প্রভাতে নদীর ধারে মোহনপুরের শ্মশানে আনন্দকে পাওয়া গেল। তখনও তার মূৰ্চ্ছা ভাঙে নি। তার কাছে ছিল একটা সেকেলে লণ্ঠন।

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%