হেমেন্দ্রকুমার রায়
প্রমথবাবু বললেন, ‘পুলিনবাবু, ভূত বলতে আপনি কী বোঝেন?’
‘দেহমুক্ত আত্মা৷ নশ্বর দেহের অস্তিত্ব না থাকলেও যে আবার দেহ ধারণ করে পৃথিবীর মানুষকে দেখা দেয়৷’
‘কিন্তু আমি যদি ও-কথা না মানি? আমি যদি বলি, মৃত্যু হচ্ছে চিরনিদ্রা? মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা আর জাগে না?’
আমি সবিস্ময়ে বললুম, ‘এ-কথা আপনি বলবেন কেমন করে? সকলেই জানে, আপনি হচ্ছেন একজন বিখ্যাত প্রেততত্ত্ববিদ৷ প্রেতের অস্তিত্ব না থাকলে আপনি প্রেততত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করতেন না৷’
প্রমথবাবু একটু হেসে বললেন, ‘প্রেততত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেই আমি এই সিদ্ধান্তে এসে উপস্থিত হয়েছি যে মৃত্যুর পরে মানুষের আত্মা চিরকালের জন্যে ঘুমিয়ে পড়ে৷ সে আর জাগে না, জাগতে পারে না৷’
‘তাহলে মানুষ মরা লোককে আবার দেখতে পায় কেন?’
‘আপনারা যাকে বলেন ভূত, আমার মনে সেটা হচ্ছে প্রপঞ্চ বা ‘‘ইলিউশান’’৷’
‘অর্থাৎ মিথ্যা মায়া৷’
‘ঠিক তাই৷’
‘তাহলে ভূত বলে কিছুই নেই?’
‘একটা-কিছু আছে বই কী! কিন্তু লোকে যাকে ভূত বলে আমি তাকে বলি চিন্তার মূর্তি৷’
‘চিন্তার মূর্তি?’
‘হ্যাঁ৷’
‘মানে বুঝলুম না৷’
‘মুখের কথায় সহজে বুঝতে পারবেন না৷ তবে এইরকম মূর্তি যদি স্বচক্ষে দেখতে চান, আমি আপনাকে দেখাতে পারি৷’
‘কোথায়?’
‘কাঁচড়াপাড়ায় একখানা বাড়ি ‘‘হানাবাড়ি’’ বলে বিখ্যাত৷ প্রতি বৎসর কালীপুজোর রাত্রে সেখানে একই দৃশ্যের পুনরাভিনয় হয়৷ গেল বছরে আমি নিজে সেখানে উপস্থিত থেকে সেই দৃশ্য দেখে এসেছি৷ আর সাত দিন পরে এ বছরের কালীপুজো৷ আপনিও কি সেই দৃশ্য দেখতে চান?’
‘বিপদে পড়ব না তো?’
‘বিপদ? এরকম দৃশ্য দেখে মানুষ বিপদে পড়ে নিজেই ভয় পেয়ে৷ নির্ভীকের বিপদ নেই৷ বিশেষ, আমি যখন সঙ্গে আছি, বিপদে পড়বার বা ভয় পাওয়ার কোনো কারণই নেই৷’
ভূত মানি, কিন্তু ভূত কখনো দেখিনি, আর দেখবার ভরসাও নেই৷ কিন্তু প্রমথবাবুর কথায় মনে জাগল কৌতূহল৷ একটু ইতস্তত করে রাজি হয়ে গেলুম৷
কালীপুজোর দিন৷ বৈকাল বেলা৷ পুরাতন কাঁচড়াপাড়ার একটি প্রশস্ত রাজপথ৷ লোকজনের চলাচল খুব কম৷ সারি সারি বাড়ির-পর-বাড়ি, অনেক বাড়িই প্রাসাদের মতো বৃহৎ৷ কিন্তু প্রত্যেক বাড়িই পরিত্যক্ত, বাসিন্দারা ম্যালেরিয়ার ভয়ে বসতবাড়ি ছেড়ে পলায়ন করেছে৷ বাড়িগুলোর চারদিক বেষ্টন করে আছে ঘন জঙ্গল৷ তাদের বিবর্ণ দেয়ালগুলো ফুঁড়ে আত্মপ্রকাশ করেছে অশ্বত্থ, বট ও নিম গাছের জঙ্গল৷ এই নিস্তব্ধ, নির্জন, মৃত শহরের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে কেবল ভেসে আসছে ঘুঘুর করুণ কান্নার সুর৷
ওমর খৈয়ামের লাইন মনে পড়ল—
রাজার বাড়ির থামের সারি আকাশ-ছোঁয়া তুলত মাথা,
রতন-মুকুট পরে হোথায় সোনার তোরণ ধরত ছাতা৷
আজ সেখানে আঁধুল মায়ায় বিজন ছায়া দুলিয়ে দিয়ে
‘ঘুঘুঘুঘু’-র অকুল স্বরে গাইছে কপোত কাতর গাথা৷
বললুম, ‘প্রমথবাবু, এমন জায়গায় ভূত থাকবে না তো আর কোথায় থাকবে বলুন?’
সে কথার কোনো জবাব না-দিয়ে একদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে তিনি বললেন, ‘আমরা আজ ওই বাড়িখানার ভেতরে রাত্রিবাস করব৷’
সে-খানাও মস্তবড়ো বাড়ি৷ তারও সর্বাঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে বন্য গাছের দল এবং তাকেও লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে রীতিমতো একটি অরণ্য৷ বহুস্থলেই চুন-বালি খসে বেরিয়ে পড়েছে বুড়ো বাড়ির ইষ্টক কঙ্কাল! দেখলেই বুক ছাৎ-ছাৎ করে৷ মনে হয় ওটা যেন অভিশপ্ত বাড়ি৷ মানুষ হচ্ছে বসতবাড়ির আত্মার মতো৷ জনশূন্য বাড়ি দেখলে আমার আত্মাহীন মৃতদেহের কথা মনে হয়৷ হাহা করতে থাকে মন৷
প্রমথবাবু বললেন, ‘চলুন, এখন আমার বন্ধু সুবোধের ওখানে গিয়ে উঠি৷ আমার চিঠি পেয়ে নিশ্চয়ই সে হানাবাড়ির একখানা ঘর আমাদের রাত্রিবাসের উপযোগী করে রেখেছে৷ সন্ধ্যাবেলাতেই আহারাদি সেরে নিয়ে যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে যেকোনো দৃশ্য দেখবার জন্যে প্রস্তুত থাকব৷’
দুজনেই একটা করে হারিকেন লণ্ঠন হাতে নিয়ে, সাবধানে নড়বড়ে সিঁড়ি মাড়িয়ে দোতলায় উঠে একখানা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলুম৷
রাত তখন আটটা৷ এরই মধ্যে একেবারে নীরব হয়ে পড়েছে মানুষের কণ্ঠস্বর এবং আশপাশ থেকে ঝিল্লিরা শুরু করেছে তাদের কণ্ঠসাধনা৷ ঘুটঘুটে অন্ধকারমাখা রাত্রি, মাঝে মাঝে শোনা যায় বাদুড়দের ডানার ঝটপটানি৷
প্রকাণ্ড হলঘর৷ পঙ্খের কাজ করা দেওয়াল অযত্নে মলিন৷ মার্বেল পাথরের মেঝে, কিন্তু তার ওপরে বিছানো আছে কত কাল ধরে সঞ্চিত ধুলোর আস্তরণ৷ কোথাও কোনো আসবাব নেই৷ জানলাগুলোর কোনোটা খোলা, কোনোটা বন্ধ৷
ঘরের একটা কোণ আমাদের জন্যে পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে৷ আর আছে দু-খানা ইজিচেয়ার৷
আমার হাত ধরে প্রমথবাবু বললেন, ‘চলুন, পাশের ঘরখানা দেখে আসি৷’
এ ঘরের ভেতর দিয়েই পাশের ঘরে যাওয়ার দরজা৷
পুরু ধুলোয় ভরা ছোটো ঘর৷ আসবাবের মধ্যে একখানা শয্যাহীন সেকেলে পালঙ্ক৷ জানলাগুলো বন্ধ৷
আচম্বিতে আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল, গায়ে দিলে কাঁটা৷ মনে হল এ-ঘরের বন্ধ বাতাসের মধ্যে সজাগ হয়ে আছে কোনো অজানা ও অদৃশ্য আতঙ্ক!
প্রমথবাবু ফিরে আমার কাঁধের ওপরে একখানা হাত রেখে শুধোলেন, ‘কিছু অনুভব করছেন?’
‘করছি৷’
‘আমরা ছাড়া অন্য কারুর উপস্থিতি৷’
‘হ্যাঁ৷’
‘চলুন, হলঘরে গিয়ে বসি৷’
হলঘরে এলুম৷ দুজনে দখল করলুম এক-একখানা ইজিচেয়ার৷ নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে কেটে গেল প্রায় দশ-বারো মিনিট৷ কথা বলবার ইচ্ছেও হল না৷ মনের ভেতরে কেমন একটা অহেতুকী অস্বাচ্ছন্দ্য৷
জানলার ভেতর দিয়ে বাইরের দিকে তাকালুম৷ কষ্টিপাথরের মতো জমাট অন্ধকার৷ থেকে-থেকে গায়ে এসে লাগছে একটা শীতার্ত বাতাসের কনকনে নিশ্বাস৷
হঠাৎ মনে হল, আমার চোখের সামনে নেমে এসেছে যেন পাতলা কাচের মতো স্বচ্ছ পরদা এবং তারই ভেতর দিয়ে দেখছি ঘরের অন্য অংশটা৷
প্রমথবাবুর দিকে ফিরে দেখলুম৷ কোনোদিকে দৃকপাত না-করে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন তিনি৷
তারপরেই সচমকে আমি নিজের পা দুটো চেয়ারের ওপরে তুলে ফেললুম৷
প্রমথবাবু বললেন, ‘কী?’
‘আমার পা ধরে কে টানছে!’
‘টানছে?’
‘না, ঠিক তা নয়৷ আমি কারুর হাতের স্পর্শ পাইনি৷ কিন্তু কী এক আকর্ষণে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও পা দুটো চেয়ারের তলায় চলে যাচ্ছিল!’
প্রমথবাবু একটু হেসে বললেন, ‘মনের ভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়৷ আমরা অস্বাভাবিক কিছু দেখবার আশায় অপেক্ষা করছি৷ এ-সময়ে ও-রকম মনের ভ্রম হতে পারে৷’
হোকগে মনের ভ্রম৷ আমি আর নীচে পা নামালুম না৷
তারপর, এই খানিক আগে পাশের যে খালি ছোটো ঘরখানায় গিয়েছিলুম, তার ভেতর থেকে পেলুম দুটো গলায় আওয়াজ! একজন স্ত্রীলোক ও একজন পুরুষ কথা কইছে অত্যন্ত উত্তেজিত স্বরে৷
প্রমথবাবু শান্তভাবে বললেন, ‘গেল বছর কালীপুজোর রাত্রেও আমি ওই দুটো গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলুম৷’
তাঁর মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই ভয়াবহ নারীকণ্ঠের আর্তনাদের-পর-আর্তনাদে রাত্রির স্তব্ধতা যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল! প্রথমে অত্যন্ত উচ্চস্বরে জেগে উঠে, তারপর ধীরে ধীরে মন্দীভূত হয়ে এল সে চিৎকার৷ একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে গেল আমার সর্বাঙ্গ৷
হঠাৎ পাশের ঘরের দরজাটা খুলে গেল সশব্দে৷ ঝড়ের মতো বেগে বেরিয়ে এল একটা উন্মত্তের মতো বীভৎস মূর্তি! হাতে তার রক্তাক্ত শাণিত ছোরা! সে তাড়াতাড়ি ছুটে একটা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়ে কী দেখলে, আবার দ্রুতপদে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে পড়ল, তারপর আবার ছুটে ফিরে এল ঘরের ভেতরে এবং পরমুহূর্তে ছোরাখানা সজোরে আমূল বসিয়ে দিলে নিজের বুকের ওপরে! তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বার কয়েক ছটফট করে মূর্তিটা স্থির হয়ে গেল৷ তার বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল ঝলকে ঝলকে রক্ত!
এক লাফে আমি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠলুম উদভ্রান্তের মতো৷
প্রমথবাবু বললেন, ‘ওকী, কোথা যান?’
আমি আর্তস্বরে বললুম, ‘এ দৃশ্য দেখবার পর আমি আর এখানে থাকতে পারব না৷’
‘দৃশ্য? এখানে আর কোনো দৃশ্যই নেই৷ ফিরে দেখুন৷’
ফিরে দেখে আমি একেবারে হতভম্ব৷ ঘরের ভেতরে কোথায় সেই ভয়ানক দৃশ্য, কোথায় সেই বীভৎস মূর্তি, কোথায় সেই রক্তের ধারা? কিছুই নেই, সব অদৃশ্য!
বাধো বাধো গলায় বললুম, ‘এতক্ষণ কি আমি স্বপ্ন দেখছিলুম?’
প্রমথবাবু বললেন, ‘প্রপঞ্চ৷ আর এখানে কিছুই দেখা যাবে না৷ নিন, এইবারে ইজিচেয়ারে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন৷’
‘অসম্ভব! এখানে আমার চোখে আর ঘুম আসবে না৷’
‘উত্তম৷ তাহলে জেগে জেগে আমার নাসিকার সংগীত শ্রবণ করুন৷’
সকালবেলায় প্রমথবাবু বললেন, ‘কত বছর আগে তা জানি না, এই বাড়িতে কালীপুজোর রাত্রে একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে হত্যা করেছিল৷ স্ত্রীর আর্তনাদ শুনে চারদিক থেকে পাড়াপড়শিরা এসে পড়ে৷ হত্যাকারী জানলা দিয়ে তাদের দেখে বাড়ির ভেতরের অন্য পথ দিয়ে পালাবার চেষ্টা করে৷ কিন্তু সে পথও বন্ধ দেখে শেষটা সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়৷’
আমি বললুম, ‘আমরা কি কাল তারই প্রেতাত্মা দেখলুম?’
‘প্রেতাত্মার নয়, তার চিন্তার মূর্তি৷’
‘চিন্তার মূর্তি কী?’
‘উগ্র বা তীব্র বা প্রচণ্ড চিন্তা ঈথারের (ether) ভেতরে একটা ছাপ রেখে যায়৷ মানুষের দেহ নষ্ট হলেও ঈথারের ভেতরে সেই চিন্তার অস্তিত্ব লোপ পায় না৷ ক্ষেত্রবিশেষে নির্দিষ্ট দিনে আবার তা মূর্তি ধরে আত্মপ্রকাশ করতে পারে৷’
‘এ কী অসম্ভব কথা!’
‘বেতারে মানুষের কণ্ঠস্বর আর মূর্তি ধরে বিলাত থেকে এদেশেও পাঠানো হচ্ছে৷ তার রেকর্ড চিরস্থায়ী করে রাখা যায়৷ সেটা আপনারা অসম্ভব মনে করেন না৷ তবে ঈথারের মধ্যেই বা চিন্তার মূর্তি ধরে রাখা যাবে না কেন?’
আমি বৈজ্ঞানিকও নই, প্রেততত্ত্ববিদও নই, কাজেই এ-জিজ্ঞাসার জবাব দিতে পারলুম না৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন