মাথা-ভাঙার মাঠে

হেমেন্দ্রকুমার রায়

মোহনপুরের পিরু দরজির ছেলে দিলু বা দিলদারের বয়স হল প্রায় ষোলো, কিন্তু আজও সে বাপের কোনও উপকারেই লাগল না। পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের সঙ্গে দিনরাত সে খেলাধুলো করে বেড়ায়, পরের বাগানের ফল চুরি করে এবং ইস্কুলে যাবার নামও মুখে আনে না। দিলুকে পিরু বাপু-বাছা বলে মিষ্টি কথা বলে অনেক বুঝিয়েছে, কিন্তু দিলু সেসব কানেও তোলেনি। দিলুর পিঠে পিরু অনেক লাঠিই ভেঙেছে, তবু দিলু শায়েস্তা হয়নি। দেখেশুনে পিরু হাল ছেড়ে দিয়েছে।

কিন্তু সেদিন পিরুর পকেট থেকে যখন কুড়িটা টাকা চুরি গেল এবং তার সন্দেহ হল ছেলের উপরেই, তখন আর সহ্য করতে পারলে না,—দিলে দিলুকে দূর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলু হচ্ছে মহা ডানপিটে ছোকরা, বাড়ি থেকে গলাধাক্কা খেয়েও সে কিছুমাত্র দমল না। সারাদিন পথে-বিপথে হই-চই করে বেড়াল এবং সন্ধের পর 'মাথা-ভাঙার মাঠে গিয়ে একটা তালগাছের তলায় বসে চিৎকার করে গান গাইতে লাগল।

এখন, এই মাথা-ভাঙার মাঠের একটুখানি ইতিহাস আছে। আগে এ মাঠে সন্ধের পর ভয়ে কেউ হাঁটত না; কারণ ডাকাতেরা লাঠি মেরে পথিকদের মাথা ভেঙে সর্বস্ব কেড়েকুড়ে নিত। এখন আর ডাকাতের ভয় নেই বটে, তবু সন্ধের পরে ভয়ে কেউ এ মাঠ মাড়ায় না; কারণ এখানে নাকি ভয়ানক ভূতপ্রেতের ভয়।

কিন্তু ডানপিটে দিলুর এতবড়ো বুকের পাটা যে, এমন জায়গায় এসেই সে গান জুড়ে দিয়েছে।

রাত বারোটা পর্যন্ত গান গাইবার পর ক্ষিদের চোটে দিলুর পেটের নাড়ি টনটন করতে লাগল। তখন সে আস্তে আস্তে উঠে গাঁয়ের দিকে ফেরার চেষ্টা করলে।

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই খানিক তফাতে কাদের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। কারা কথা কইতে কইতে এই দিকেই আসছে।

মাথা-ভাঙার মাঠে রাত দুপুরে মানুষের সাড়া পাওয়া যায়, এমন অসম্ভব কথা দিলু কোনওদিন শোনেনি। তবে কি সত্যি সত্যিই—

ভয়ে দিলুর মাথার চুলগুলো সটান হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি কোনদিকে চম্পট দেবে তাই ভাবছে, এমন সময় চাঁদের আলোয় দেখতে পেলে, কারা সব দল বেঁধে একেবারে তার সুমুখে এসে পড়েছে।

গুনতিতে তারা বিশজন। মানুষের মতো দেহ, অথচ প্রত্যেকেই উঁচুতে মোটে এক হাত, তাদের অনেকেরই মাথার চুল আর গোঁফদাড়ি পেকে গেছে বটে, কিন্তু তবু তারা ছোটো ছোটো খোকার চেয়ে বেশি ঢ্যাঙা হতে পারেনি!

দিলু চোখ কপালে তুলে অবাক হয়ে ভাবছে—এ আবার কোন মুল্লুকের মানুষ রে বাবা—এমন সময়ে দলের ভিতর থেকে একটা লোক তার কাছে এগিয়ে এল। সে লোকটা বেজায় বুড়ো, বেজায় বেঁটে আবার তার শনের মতো পাকা দাঁড়ি পা পর্যন্ত লুটিয়ে পড়েছে। বুড়ো বললে, ‘এই যে বাপের অবাধ্য ছেলে দিলু! আমরা তোমাকেই এতক্ষণ খুঁজছিলুম।'

দিলু জবাব দেবে কি, তার দাঁতে দাঁত লেগে গেল।

বুড়ো আবার বললে, ‘বুঝেছ দিলু? আমরা তোমাকেই খুঁজছিলুম।'

দিলু তেমনি চুপচাপ।

বুড়ো আবার বললে, ‘আমরা তোমাকেই খুঁজছিলুম। বার বার তিনবার আমি কথা কইলুম। তুমি যে জবাব দিচ্ছ না?'

তবু দিলু জবাব দিলে না।

বুড়ো তখন সঙ্গীদের দিকে ফিরে বললে, দিলু জবাব দেবে না। তোমাদের কাজ তোমরা করো।'

দলের অন্য লোকগুলো কি একটা লম্বা মোট বয়ে আনছিল, হঠাৎ তারা সেই মোটটাকে ধুপ করে দিলুর পায়ের তলায় ফেলে দিলে।

সেটা একটা মড়া।

বুড়ো বললে, দিলু, ওই মড়াটাকে কাঁধে তুলে নাও।'

দিলু আঁতকে উঠে বললে, ‘ওরে বাপরে! সে আমি পারব না'—বলেই সে দৌড়ে পালাতে গেল।

কিন্তু সেই ক্ষুদে ক্ষুদে লোকগুলো চারিদিক থেকে ছুটে এসে তাকে একেবারে মাটির উপরে পেড়ে ফেললে। তারপর তারা মড়াটাকে তুলে এনে দিলুর পিঠের উপর চাপিয়ে দিলে। ভীষণ আতঙ্কে ও বিস্ময়ে দিলু বুঝতে পারলে যে, মড়ার হাত দুটো তার গলা আর পা দুটো তার কোমর বিষম জোরে চেপে ধরলে! ভূতের পাল্লায় পড়ে দিলুর প্রাণ বুঝি আজ যায় ! মড়াটাকে পিঠে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে ভাবতে লাগল, 'বাবার অবাধ্য হয়ে পাপ করেছি বলেই এই ভূতগুলো আজ আমার উপরে এতটা তম্বি করতে পারছে। এই নাক-কান মলছি, আর কখনও বাপ-মায়ের অবাধ্য হব না।'

বুড়ো বললে, “দিলু, যখন আমি তোমাকে মড়াটা তুলতে বললুম, তখন তুমি আমার কথা শুনলে না। এখন যদি আমি তোমাকে বলি যে—মড়াটাকে গোর দিয়ে এসো', তাহলেও তুমি বোধহয় আমার কথা শুনবে না?’

দিলু কাঁপতে কাঁপতে বললে, 'শুনব হুজুর, শুনব! পিঠের আতঙ্ক এখন পিঠ থেকে নামাতে পারলেই বাঁচি।'

বুড়ো খল খল করে হেসে বললে, ‘বেশ বেশ! এরই মধ্যে তোমার সুবুদ্ধি হয়েছে দেখে খুশি হলুম। এখন যা বলি, শোনো। আজ রাত্রের মধ্যেই তুমি যদি ওই মড়াটাকে গোর না দাও তাহলে তোমার ভয়ানক বিপদ হবে। এ গাঁয়ের গোরস্থানে আগে যাও। সেখানে যদি সুবিধে না হয়, তবে অন্য গাঁয়ের গোরস্থানে যেতে হবে। সেখানেও অসুবিধে হলে আবার অন্য কোনও গাঁয়ের গোরস্থানে যাবে। মোদ্দা কথা, আজ রাত পোয়াবার আগেই ওই মড়াটাকে গোর দেওয়া চাই-ই চাই। নইলে মজাটা টের পাবে। এখন বিদেয় হও—খবরদার, আর পিছন ফিরে তাকিয়ো না।’

পিঠে মড়া নিয়ে, তার ভারে দুমড়ে পড়ে দিলু এগুতে লাগল। আকাশে চাঁদের মুখও তখন মড়ার মতই হলদে দেখাচ্ছে, পৃথিবীর কোনওদিক থেকেই জনপ্রাণীর সাড়া আসছে না, গাছগুলো পর্যন্ত যেন দিলুর পিঠের ভয়ঙ্কর বোঝা দেখে স্তম্ভিত ও আড়ষ্ঠ হয়ে আছে,–কোনও শব্দ করছে না। ভালো ছেলেরা এখন পেট ভরে খেয়ে-দেয়ে নরম বিছানায় শুয়ে আরাম করে ঘুমোচ্ছে—আর এই নিশুত রাতে কেবল দিলুকেই কিনা একটা ভূতুড়ে, পচা মড়া পিঠে নিয়ে একলাটি গোরস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। নিজের অবাধ্যতার ফল হাতে হাতে পেয়ে তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়তে লাগল।

ওই তো গাঁয়ের গোরস্থান। দলে দলে বড়ো বড়ো কালো কালো গাছ গোরস্থানের চারিদিক ঢেকে দাঁড়িয়ে থেকে চাঁদের আলোকে তার কাছে আসতে দিচ্ছে না।

অমন যে ডানপিটে ছেলে দিলু, তারও বুক এখন আতঙ্কে ঢিপঢিপ করতে লাগল। একবার ভাবলে, এক ছুটে পালিয়ে যাই। তারপরই লম্বাদাড়ি, একহাত উঁচু বুড়ো আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের কথা দিলুর মনে পড়ল। নিশ্চয়ই তারা কোথাও লুকিয়ে লুকিয়ে সবই লক্ষ্য করছে। না বাবা, আর তাদের পাল্লায় পড়া নয়! যেমন করে হোক, মড়াটাকে গোর না দিয়ে আজ আর কোনও কথা নয়!

গোরস্থানের এক জায়গায় একটা মস্ত গাছ ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে—কিন্তু তার কোথাও একটা পাতা পর্যন্ত নেই। শুকনো ডালপালাওয়ালা মরা গাছটাকে দেখলেই মনে হয়, যেন একটা প্রকাণ্ড কঙ্কাল অনেকগুলো হাত বাড়িয়ে সবাইকে শাসাচ্ছে।

দিলু তার তলায় গিয়ে ভাবতে লাগল, ‘তাইতো, গোরস্থানে তো এলুম, কিন্তু কোদাল ও নেই কুড়ুলও নেই, এখন মাটি খুঁড়ব কেমন করে? হে লম্বাদাড়ি বুড়ো হুজুর! আপনি কোথায় আছেন জানিনা, কিন্তু —

দিলুর কানে কানে কে বললে, ‘ওই শুকনো গাছের তলায় চেয়ে দ্যাখো।' দিলু ভড়কে ও চমকে চারিদিকে তাকিয়েও কারুকে দেখতে পেলে না। তবে কে তার কানের কাছে কথা কইলে?

আবার কে বললে, ‘ওই শুকনো গাছের তলায় চেয়ে দ্যাখো।'

দিলুর গা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। কিছুই না বুঝে সে বলল, ‘তুমি আবার কে বাবা? দেখা দাও না, অথচ কথা কও?”

—"আমি হচ্ছি তোমার পিঠের মড়া।'

—"কি বিপদ! তুমিও আবার কথা কইতে পারো নাকি? ”

– হুঁ, মাঝে মাঝে পারি।

—তাহলে দয়া করে আবার পিঠ থেকে নামো না বাবা! আমি একটু জিরিয়ে নি।’

–আগে আমাকে গোর দেবার ব্যবস্থা কর। ওই শুকনো গাছের তলায় চেয়ে দেখ।’

দিলু গাছের তলায় চেয়ে দেখল সেখানে একখানা কুড়ুল আর একখানা কোদাল পড়ে রয়েছে।

তার কানে কানে মড়াটা ফিস ফিস করে ক্রমাগত বলতে লাগল, 'আমাকে গোর দাও—আমাকে গোর দাও।’

দিলু তাড়াতাড়ি কুড়ুল ও কোদাল তুলে নিয়ে এসে মাটি খুঁড়তে লেগে গেল। খানিকক্ষণ খোঁড়বার পরেই তার কুড়ুলটা কোনও একটা জিনিসের উপরে গিয়ে পড়ল। দিলু হেঁট হয়ে তাকিয়ে দেখলে, একটা কফিন গর্তের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। কফিনের ডালা খুলে দেখা গেল, তার ভিতরেও রয়েছে আর একটা মড়া!’

দিলু বললে, ‘একই গোরে দুটো লাশ রাখা তো চলবে না। ওহে আমার পিঠে-মড়া মড়া মনিব! তোমাকে এখানে গোর দিলে তুমি আপত্তি করবে না তো?”

মড়া জবাব দিলে না।

দিলু মনে মনে বললে, ‘বাঁচা গেছে, মড়াটা এইবারে বোধহয় আবার বোবা হল, কথা কয়ে আর আমাকে ভয় দেখাবে না’–এই বলে সে হাতের কুড়ুলটা অন্যমনস্ক হয়ে ফেলে দিলে। কিন্তু কুড়ুলটা গিয়ে পড়ল গোরের ভিতরকার মড়াটার গায়ের উপরে। সঙ্গে সঙ্গে গোরের ভিতরেই মড়াটা খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে উঠে যাতনায় চেঁচিয়ে উঠল, “উঃ! হুঃ!! হুঃ !! ! – যা ! যা ! ! যা!!! নইলে এখনই মরবি, মরবি, মরবি!' বলেই আবার সে কবরের ভিতরে আড়ষ্ট হয়ে শুয়ে পড়ল। -

দিলুতে তখন আর দিলু ছিল না। তার মাথার চুলগুলো যন শজারুর কাঁটার মতন সিধে হয়ে উঠছে আর সর্বাঙ্গ দিরে দরদর করে ঘাম ছুটছে। অন্ধের মতো চোখ বুজে চটপট কোদাল দিয়ে মাটি তুলে সে কবরটা আবার বুজিয়ে দিলে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, 'বাপ! আর বোধহয় ওটা মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না।

খানিক হাঁপ ছেড়ে দিল আরও কয় পা এগিয়ে আবার মাটি খুঁড়তে আরম্ভ করলে। অল্পক্ষণ পরেই দেখা গেল সে কবরটার ভিতরে রয়েছে একটা শুটকি বুড়ির মড়া। এ মড়াটা বোধহয় আগের মড়াটার চেয়েও বেশি জ্যান্ত! কারণ, ভালো করে মাটি খুঁড়তে না খুঁড়তেই সে চট করে উঠে বসে চ্যাঁচাতে শুরু করলে—হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ! কে রে ছোঁড়া তুই? কে রে ছোঁড়া তুই?”

দিলু ভয়ে পেছিয়ে এল।

কোনও জবাব না পেয়ে শুঁটকি বুড়ির মড়াটা ধীরে ধীরে দুই চোখ মুদে ফেললে, তারপর ধীরে ধীরে আবার কবরের ভিতরে শুয়ে পড়ল। দিলুও যে তখনই তাকে মাটি চাপা দিতে দেরি করলে না, সে কথা বলাই বাহুল্য।

সে আবার আর একটা জায়গা খুঁড়তে শুরু করলে। কিন্তু এবার যেই মাটির ভিতর থেকে আর একটা মড়ার একখানা হাত দেখা গেল, অমনি সে তার উপর মাটি চাপা দিয়ে বললে, “নাঃ, এ গোরস্থানে দেখছি সব কবরই আজ ভরতি।....এখন আমার উপায় কি হবে? আমার পিঠের মড়া পিঠ থেকে নামাই কেমন করে? এ গাঁয়ে তো আর কোনও গোরস্থান নেই !”

যাঁহাতক এই কথা বলা, পিঠের মড়া অমনি দিলুর কানে কানে ফিসফিস করে বললে, মামুদপুরের গোরস্থানে। ওইদিকে।' —বলেই মড়া তার বাঁ হাতখানা এগিয়ে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে।

প্রাণের দায়ে দিলু সেইদিকেই অগ্রসর হল। দু-চারবার এবড়ো-খেবড়ো আঁকাবাঁকা পথে সে হোঁচট খেয়ে পপাত ধরণীতলে হল, কিন্তু তার গলা ও কোমর থেকে মড়ার হাত-পায়ের ব্ৰজআঁটুনি তবু আলগা হল না। তার পিঠের উপরে এই বিভীষণ মোট দেখে প্যাঁচারা চেঁচিয়ে বাদুড়দের শুনিয়ে কি যেন বলতে লাগল,—আশপাশের জলাভূমির মধ্যে আলেয়ার আলোগুলো যেন আরও বেশি জ্বলজ্বলে ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। দিলু বারংবার নিজের মনেই প্রার্থনা করতে লাগল—আল্লা, আমাকে দয়া করো! আল্লা, আমাকে দয়া করো! মামুদপুরকে তাড়াতাড়ি কাছে এনে দাও।

শেষটা সে মামুদপুরে এসে হাজির হল।

মড়া বললে, ‘ওই গোরস্থান। আমাকে গোর দাও—শিগগির আমাকে গোর দাও ! এইবার এই ছিনেজোঁক দুর্দান্ত মড়ার কবল থেকে নিস্তার পাবে বলে দিলু হনহন করে পা- দুটো গোরস্থানের দিকে চালিয়ে দিলে।

কিন্তু বেশি এগুতে হল না,—হঠাৎ দিলু মুখ তুলেই চক্ষু স্থির করে রইল! ওরে বাবা! মামুদপুরের গোরস্থানের পাঁচিলের উপরে পালে পালে ভূত আর পেত্নী বসে আছে। কেউ খুববুড়ো, কেউ আধবুড়ো, কেউ যুবা আর কেউবা শিশু। তাদের প্রত্যেকের চোখ উনুনের জ্বলন্ত কয়লার মতো দপ দপ করছে।

একটা বেজায় রোগা আর ঢ্যাঙা ভূত হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে মাথার উপরে দুটো হাত নেড়ে ক্রমাগত বলতে লাগল—'এখানে হবে না—এখানে ঠাঁই নেই—এখানে হবে না—এখানে ঠাঁই নেই—এখানে হবে না’—প্রভৃতি।

আর একটা বেজায় মোটা ভূত হঠাৎ পাঁচিল থেকে মাটির উপরে থপাস করে লাফিয়ে পড়ে খোনা সুরে বলতে লাগল—

.

‘শোন তবে কান পেতে ওরে দুরাচার!

তোকে মোরা খাব করে চাটনি-আচার।

চোখদুটো ছিঁড়ে নিয়ে খেলা যাবে ভাঁটা,

আঙুল ভাজিয়া হবে চচ্চড়ির ডাঁটা।

লোমে তোর বানাইব শীতের কম্বল,

মেটুলিতে হবে খাসা রসালো অম্বল।

ঠ্যাঙের রাঙেরে খাব করিয়া ডালনা।

নাড়ি-ভুঁড়ি শুষ্ক করি টাঙাব আলনা,

হৃদপিণ্ড কাটিয়া হবে দেয়ালের ঘড়ি,

হাড়ের গুঁড়োতে হবে দাঁত-মাজা খড়ি।

শোন ছুঁচো, কানামাছি, শোন রে মশক!

চুল-দাড়ি ছেঁটে নিয়ে করিব তোশক।

চেঁচে নিলে ছালখানা গায়ে হবে জামা,

নাদা পেটে তৈরি হবে তোফা এক ধামা!’

.

এ রকম সব ভয়ানক কথা শুনলে কোনও ভদ্রলোকেরই আর এগুবার ভরসা হয় না—দিলুরও হল না। কিন্তু দিলুর পিঠের মড়া তার কানে কানে বললে, ‘গোর দাও, গোর দাও, আমাকে গোর দাও!' বলতে বলতে সে তার হাতের বাঁধন এমন শক্ত করে তুললে যে দম বন্ধ হয়ে দিলুর প্রাণ যায় আর কি।

কি আর করে,—মরেছি, না মরতে আছি, যা হবার তাই হোক,—এই ভেবে দিলু পায়ে- পায়ে আবার এগুতে শুরু করল।

আর যায় কোথা? মামুদপুরের গোরস্থানের ভূতপেত্নীরা পাঁচিলের উপরে দাঁড়িয়ে উঠে খনখনে আওয়াজে সমবেত সঙ্গীত আরম্ভ করলে—

‘ধর ধর! মার! মার! হুম হুম হুম হুম !

ঠাস করে মার চড়, আর কিল গুম-গুম।

গো-ভূতকে ডেকে আন—শিঙে তার খুব ধার।

মামদোরা তেড়ে যাক—হুঁশিয়ার! মার! মার!

আচম্বিতে কোথা থেকে দুখানা অদৃশ্য হাত এসে দিলুর চুলের মুঠি ধরে বারকয়েক ঝাঁকানি মেরে, তাকে শূন্যে তুলে বলের মতো চার-পাঁচবার লোফালুফি করলে এবং তারপরে তার দেহটাকে পাশের এক খানায় ছুড়ে ফেলে দিলে।

সেই বিশ্রী একগুঁয়ে মড়াটা তবু দিলুর পিঠ ছেড়ে একটুও নড়ল না! কোনওরকমে আধ- মরা হয়ে দিলু হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলে, পাঁচিলের উপরে তাল ঠুকতে ঠুকতে ভূতপেত্নীরা তখন গাইছে—

‘আয় দিকি, আয় দিকি! ফের হেথা আয় দিকি!

এবারেতে করে দেব ঢিকি-ঢিকি হিকি-হিকি!'

'টিকি-ঢিকি হিকি-হিকি' যে কাকে বলে, দিলু তা জানত না—জানবার সাধও তার ছিল না। সে খালি কাঁদো-কাঁদো মুখে বললে, 'ওগো পিঠেচড়া মড়া মশাই! মরেও যখন আপনি মরেননি, তখন ব্যাপারটা নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন? আর কি ওখানে আমাদের যাওয়া উচিত? তাহলে আমি তো মরবই, আপনারও হাড় কখানা আর আস্ত থাকবে না?

মড়া হঠাৎ তার একখানা হাত বাড়িয়ে দিয়ে একদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে, 'হোসেন-

ডাঙার গোরস্থান! ওইদিকে!' দিলু বললে, ‘আবার! আপনি তো মরেছেনই, এবারে আমাকেও মারলেন দেখছি।' একটা খোঁড়া ভূত তখন নেংচে নেংচে নাচতে নাচতে গান ধরেছে—

‘দেব তেড়ে শিং নেড়ে তোর পেটে ঢু,

হুশ করে যাবি উড়ে ঝাড়ি যদি ফুঁ !

ভারি আমি কড়া লোক, ভয়ানক গোঁ !

ঠাস করে খাবি চড় কান হবে ভোঁ!

সুড় সুড় সরে পড়, কোরোনাকো টু!

দিলুর আর টু শব্দ করবার সাধও ছিল না। সে কাঁপতে কাঁপতে ও মাতালের মতো টলতে টলতে কোনওক্রমে আবার এগিয়ে চলল। সে বেশ বুঝলে, আজ আর তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। পাগলের মতো কতক্ষণ সে যে পথ চলল, কিছুই জানতে পারলে না, কিন্তু মড়াটা যখন আচম্বিতে তার কানে কানে বললে, 'ওই হোসেনডাঙার গোরস্থান,’—তখন সে চমকে চেয়ে দেখলে, পূর্ব আকাশের অন্ধকার বুকের ভিতর থেকে একটু একটু করে রুপোলি আলোর আভা ফুটে উঠছে।

মড়া বললে, ‘আর সময় নেই—আর সময় নেই! গোর দাও, আমাকে গোর দাও।' কিন্তু আগেকার গোরস্থানে যে কাণ্ডটা হয়েছিল, সেটা মনে করে দিল আর অন্ধের মতো এগিয়ে গেল না। ভালো করে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে যখন সে দেখলে, ভূতপেত্নীরা এখানেও সমবেতসঙ্গীত গাইবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে নেই, তখন পায়ে গায়ে এগিয়ে গিয়ে খুব সাবধানে হোসেনডাঙার গোরস্থানে প্রবেশ করলে।

মড়া আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললে, 'ওইখানে! ওইখানে!”

দিলু আরও কয়েক পদ অগ্রসর হয়েই দেখলে, একটা কবরের পাশেই একটা কফিন পড়ে রয়েছে। কবরটা নতুন খোঁড়া হয়েছে এবং কফিনের ভিতরে মড়া-টড়া কিছু নেই।

দিলু বললে, ‘বুঝেছি মড়া মশাই, বুঝেছি। আপনি আমার পিঠে চড়ে আজ আরাম করবার জন্যে এই কফিন থেকেই পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু আগেই এ-কথাটা জানিয়ে দিলে আমাকে তো আর অমন সাতটা ঘাটের জল খেয়ে মরতে হত না!’

মড়া ঠিক মড়ার মতোই বোবা হয়ে রইল।

দিলু তখন কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। অমনি রাত বারোটা থেকে যে ভয়ানক মড়াটা তার পিঠ ছেড়ে একবারও নামবার নাম করেনি, হঠাৎ সে তার হাত আর পা দুটো দিলুর গলা আর কোমর থেকে খুলে নিয়ে ধপাস করে সেই কবরের কফিনের ভিতরে গিয়ে পড়ে একেবারে স্থির হয়ে রইল। পাছে আবার তার জ্যান্ত মানুষের পিঠে চড়বার শখ হয়, সেই ভয়ে দিলু খুব তাড়াতাড়ি তার উপরে মাটি চাপা দিয়ে ফেললে।

বাড়িতে ফিরে এসে দিলু তার বাবার দুই পা ধরে বললে, 'বাবা আজ থেকে তুমি যা বলে তাই শুনব।'

দিলু নিজের কথা রেখেছিল। সে আর কখনও বাবার অবাধ্য হয়নি।

সকল অধ্যায়
১.
অদৃশ্য মানুষ
২.
অমানুষিক মানুষ
৩.
ইন্দ্ৰজালের মায়া
৪.
বিশাল গড়ের দুঃশাসন
৫.
মানব দানব
৬.
বিভীষণের জাগরণ
৭.
মানুষের গড়া দৈত্য
৮.
মোহনপুরের শ্মশান
৯.
মড়ার মৃত্যু
১০.
প্রেতাত্মার প্ৰতিশোধ
১১.
সর্বনাশা নীলা
১২.
কামরা আর আমরা
১৩.
মূর্তি
১৪.
কী?
১৫.
ওলাইতলার বাগানবাড়ি
১৬.
বাঁদরের পা
১৭.
বাদলার গল্প
১৮.
বাড়ি
১৯.
মাথা-ভাঙার মাঠে
২০.
রামস্বামীর উপলমণি
২১.
ভূতের রাজা
২২.
কে?
২৩.
মিসেস কুমুদিনী চৌধুরি
২৪.
চিলের ছাতের ঘর
২৫.
খামেনের মমি
২৬.
ক্ষুধিত জীবন
২৭.
রুদ্রনারায়ণের বাগানবাড়ি
২৮.
বিজয়ার প্রণাম
২৯.
আয়নার ইতিহাস
৩০.
ঐন্দ্রজালিক
৩১.
জ্বলন্ত চক্ষু
৩২.
কঙ্কাল-সারথি
৩৩.
কিসমৎ
৩৪.
তিন নম্বরের ঘর
৩৫.
দিঘির মাঠে বাংলো
৩৬.
পিশাচ
৩৭.
ভীমেডাকাতের বট
৩৮.
জীবন্ত মৃতদেহ
৩৯.
অভিশপ্ত মূর্তি
৪০.
কলকাতার বিজন দ্বীপে
৪১.
বন্দি আত্মার কাহিনি
৪২.
ছায়া, না কায়া?
৪৩.
জীবন্ত মৃত্যু
৪৪.
নবাব কুঠির নর্তকী
৪৫.
কোর্তা
৪৬.
ভূত-পেত্নীর কথা
৪৭.
পোড়ো-মন্দিরের আতঙ্ক
৪৮.
অভিশপ্ত নীলকান্ত
৪৯.
ভূতের ভয়
৫০.
আজও যা রহস্য
৫১.
ভূত যখন বন্ধু হয়
৫২.
এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত
৫৩.
আধ খাওয়া মড়া
৫৪.
স্বপ্ন হলেও সত্য
৫৫.
শয়তান
৫৬.
গঙ্গার বিভীষিকা
৫৭.
বাদশার সমাধি
৫৮.
পোড়ো বাড়ি
৫৯.
ভৌতিক, না ভেলকি?
৬০.
ভৌতিক চক্রান্ত
৬১.
পেপির দক্ষিণ পদ
৬২.
পর্বত ও মূষিক
৬৩.
অট্টহাসক
৬৪.
টেলিফোন
৬৫.
নবাবগঞ্জের সমাধি
৬৬.
ভূত আর ভূতনাথ
৬৭.
আজব সত্য-কাহিনি
৬৮.
বাজলে বাঁশী কাছে আসি
৬৯.
বংশীবদনের বহির্গমন
৭০.
অলৌকিক
৭১.
জুজুর ভয়
৭২.
রামস্বামীর উপল মণি
৭৩.
বাড়ি, বুড়ো, বুট
৭৪.
শয়তানি-জুয়া
৭৫.
রহস্যময় বাড়ি
৭৬.
বাঘের চোখ
৭৭.
মানুষ, না পিশাচ
৭৮.
জাগ্রত হৃৎপিণ্ড
৭৯.
অভিশপ্তা
৮০.
সূর্যদেবতার পুরোহিত
৮১.
অদৃশ্যের কীর্তি
৮২.
নসিবের খেলা
৮৩.
ছায়া—কায়া—মায়া
৮৪.
বিছানা
৮৫.
লোটা
৮৬.
মাঝরাতের ‘কল’
৮৭.
এক রাতের ইতিহাস
৮৮.
কিন্তু
৮৯.
কায়া কি ছায়া কি মায়া
৯০.
ডাকবাংলো
৯১.
তবে
৯২.
মামূর্তের দানব-দেবতা
৯৩.
নবাব বাহাদুরের বংশধর
৯৪.
মুক্তি
৯৫.
মৃতদেহ
৯৬.
নরকের রাজা
৯৭.
ভেলকির হুমকি
৯৮.
আধ খাওয়া মড়া
৯৯.
কালো বিদ্যুৎ
১০০.
নিশীথ রাতের কাহিনী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%