হেমেন্দ্রকুমার রায়
উঃ—ম্যালেরিয়ার মতন ছ্যাচড়া অসুখ পৃথিবীতে আর কিছু আছে কি? উঁহু ৷
এই দ্যাখ না, শখ করে সেদিন ঢাকুরিয়ায় ‘লেক’ দেখতে গিয়েছিলুম, সন্ধ্যার একটু আগে। হঠাৎ কাঁপুনি দিয়ে আমার জ্বর এল।
সেকি যে-সে জ্বর, যে-সে কাঁপুনি? না পারি দাঁড়াতে না পারি বসতে, একেবারে ঘাসের উপর পড়লুম শুয়ে। কী শীত রে বাপ! পা থেকে মাথা পর্যন্ত চাদর মুড়ি দিয়ে, কাঁপতে কাঁপতে কেমন যেন আচ্ছন্নের মতো হয়ে রইলুম।
সেই ভাবে কতক্ষণ ছিলুম, ভগবান জানেন। তবে একবার চাদরের ভিতর থেকে জুল-জুল করে চোখ মেলে উঁকি মেরে দেখলুম চারিদিকে গাঢ় অন্ধকারের মেলা বসেছে, কোথাও জনমানবের সাড়া নেই ৷
বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। কোথায় বাগবাজারে আমার বাড়ি, আর কোথায় পড়ে আছি আমি একলা, গুণ্ডায় গলায় ছুরি বসাতে পারে, সাপে কামড়াতে পারে, বিনা চিকিৎসায় প্রাণপাখি ফুড় ক করে পালিয়ে যেতে পারে! বাড়ির লোক এতক্ষণে হয়তো ভেবেই সারা হচ্ছে!
আর তো এখানে থাকা চলে না! যেমন করেই হোক আমাকে আজ বাড়ি যেতে হবে!
অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালুম। গায়ের ভিতর দিয়ে তখনো যেন আগুনের ঝলক ছুটছে, চোখের সামনে দিয়ে যেন রাশি রাশি সর্ষে ফুল নাচতে নাচতে একবার আঁধার-সাগরে ডুবে যাচ্ছে, আর একবার ভেসে ভেসে উঠছে। প্রতিবার পা ফেলি আর মনে হয়, এই বুঝি আমি দড়াম করে পপাত ধরণীতলে হলুম। তবু থামলুম না, মাতালের মতে৷ টলতে টলতে এগিয়ে চললুম।
রাত ঝাঁ ঝাঁ করছে! সেই রাত্রে আমি প্রথম বুঝতে পারলুম, পৃথিবী কত বেশি স্তব্ধ হতে পারে! শহরের হট্টগোলে রাগ হয় বটে, কিন্তু এ স্তব্ধতাও সহ্য করা অসম্ভব! একটা ব্যাঙ, কি ঝিঁঝিঁ পোকা, কি একটা পাহারাওয়ালার নাক পর্যন্ত ডাকছে না, গাছের পাতায় বাতাসের একটু নিঃশ্বাস পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না! সারি সারি কোম্পানির আলোর থামগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত চক্ষে যেন থমথমে অন্ধকারকে নিরীক্ষণ করছে! তিমির-তুলির প্রলেপ মাখানো গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে বাড়ির পর বাড়ি দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু তারাও যেন প্রেতপুরীর মতন নিস্তব্ধ—তাদের ভিতর থেকে একটা ঘুম ভাঙা খোকার কান্নার আওয়াজ পর্যন্ত জেগে উঠছে না। কে যেন আজ নিদুটীর মন্ত্র পড়ে সমস্ত জগৎকে বোবা করে দিয়ে গেছে!
জ্বরের ঘোরে চলেছি তো চলেছিই—এই নিঃশব্দ পল্লী ছেড়ে শহরের শব্দের রাজ্যে গিয়ে পড়বার জন্যে প্রাণ যেন আই-চাই করতে লাগল, তবু এ পথ যেন আজও শেষ হবে না, কালও শেষ হবে না—আমাকে যেন কোন অভিশপ্ত আত্মার মতন চলতে হবে অনন্তকাল ধরে! এক বেচারা ইহুদীর গল্প পড়েছিলুম। কার শাপে তাকে নাকি অনন্তকাল ধরে সারা বিশ্বে ছুটোছুটি করে বেড়াতে হয়েছিল। আমারও তাই হলো নাকি?—
মাথাটা একবার নাড়া দিয়ে ভাবলুম, দূর ছাই, এ-সব কি উদ্ভট কথা ভাবছি? জ্বরে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?
মাঝে মাঝে এক-একটা মাঠ—যেন এক একটা অন্ধকারের মায়া সরোবর। সেখান দিয়ে যেন অন্ধকারের ঢেউ বইছে, অন্ধকারের স্রোত ছুটে আসছে আমাকে গ্রাস করবার জন্যে! অন্ধকারের তরঙ্গের ভিতরে গাছগুলোকে দেখাচ্ছে যেন বড় বড় দৈত্য-দানবের মতো—পথিকের হৃৎপিণ্ড ছিড়ে খাবার জন্যে তারা ওঁৎ পেতে প্রস্তুত হয়ে আছে! কান্না- ভরা কনকনে বাতাস এসে চুপিচুপি যেন আমার কানে কানে বলে যাচ্ছে—“হে নিঝুম রাতের অজানা মানুষ! এ মৃত্যুপুরীর ভিতর দিয়ে কোথায় চলেছ তুমি? আমার কথা শোনো, ভূত-প্রেতেরা একে একে জেগে উঠছে, এই বেলা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাও, পালিয়ে যাও, যাও গো!...
আরো খানিক অগ্রসর হয়ে মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত শব্দ এসে আমার দুই পায়ের দুই জুতোর ভিতরে আশ্রয় নিয়েছে! প্রত্যেকবার পা ফেলি আর সেই শব্দগুলো জুতোর ভিতর থেকে চলকে উঠে রাজ- পথের উপরে আছাড় খেয়ে পড়ে আমাকে চমকে চমকে তোলে! শব্দ শুনতে চাই, নিজের পায়ের শব্দ পাচ্ছি, কিন্তু কেন জানি না, সে শদ্য শুনে শুনে মন আমার খুশি হবে কি, আরো বেশি নেতিয়ে পড়তে লাগল!—সে যেন রাজপথে ঘুমন্ত কোন অশরীরী প্রেতাত্মার চিৎকার, আমার পদাঘাতে সে যন্ত্রণায় গজরে গজরে উঠছে!
আঃ! এতক্ষণ পরে রসা রোডের মোড়ে এসে পড়লুম। আশ্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ট্রামওয়ের একটা লোহার থামে ঠ্যাসান দিয়ে খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিলুম।
এখানটাও তেমনি নির্জন ও তেমনি নিস্তব্ধ হলেও আমার মন যেন অনেকটা আরাম পেল। এই তো ট্রামের রাস্তা! এই পথ ধরে সিধে গেলেই—যত মাইল দূরেই থাক—আমাদের পাড়া বাগবাজার যাওয়া যাবেই যাবে! খানিক দূর এগুতে পারলেই লোকজনের সাড়া পাব নিশ্চয়, আর ট্রাম বাস বন্ধ হলেও ট্যাক্সি মেলাও তো অসম্ভব নয়।
তখন জ্বরে আমার চোখ ছলছল করছে, কান করছে ভোঁ ভোঁ, আর মাথা ঘুরছে বোঁ বোঁ করে! বারবার ইচ্ছে হতে লাগল পথের উপরে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বার জন্যে, কেবল বাপ-মায়ের বিষণ্ন মুখের কথা ভেবেই মনের সে ইচ্ছা দমন করলুম, অনেক কষ্টে। নিজে নিজেই বললুম,—মন, তুমি শান্ত হও! এই পথের শেষেই আছে তোমার বাড়ি, তোমার আত্মীয়-স্বজন, তোমার নরম তুলতুলে বিছানা! কোন রকমে , চক্ষু মুদে এই পথটুকু পার হতে পারলেই—ব্যাস, সকল কষ্ট সকল ভাবনার অবসান!
হঠাৎ দূর থেকে একটা শব্দ জেগে উঠে চারিদিকের নিস্তব্ধতার মুখে যেন ভাষা দিলে! ঘড় ঘড় ঘড় ঘড়ং করে একটা বাজ ডাকার মতন শব্দ আমার দিকেই এগিয়ে আসছে—তারপরেই শুনলুম ভেঁপুর আওয়াজ—ভোঁপ, ভোঁপ,, ভোঁপ, ভোঁপ!
ট্যাক্সি, ন৷ বাস?
আহ্লাদে চাঙ্গা আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে রইলুম।
তারপরেই দেখা গেল, নিচে দুটো আর উপরে একটা আলো। তিনটে আলো দেখেই বুঝলুম ট্যাক্সি নয়, বাস আসছে। ......তাহলে জ্বরের ধমকে আমি ভুল বুঝেছিলুম, বাস যখন চলছে তখন রাত খুব বেশি হয় নি। কিন্তু আশ্চর্য, এরি মধ্যে এ-অঞ্চলটা এমন ভয়ানক নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে? বাবা, আমার কলকাতার গোলমাল বেঁচে থাক, এ অঞ্চলে আবার ভদ্রলোক বাস করে?
কিন্তু বাসের আলো অত বেশি জ্বলছে কেন, সামনে সারা পথে সে যেন আগুনের ঢেউ বইয়ে ছুটে আসছে। আর এই নিরালা পথে অত ভেঁপু বাজাবারই বা দরকার কি, এ-অঞ্চলের সন্ধের-পরেই-ঘুমকাতুরে লোকগুলোর কানে যে তালা ধরে যাবে!
ঊর্ধ্ব শ্বাসে ছুটতে ছুটতে ধুলোয় ধুলোয় পথ অন্ধকার করে একখানা রাঙা- টক্টকে মস্ত বড় বাস আমার কাছে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে একজন তীব্র, তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,—“ধর্মতলা, ওয়েলেলি, শ্যামবাজার!”
আমি তাড়াতাড়ি বাসে উঠে একখানা গদীমোড়া আসনের উপর গিয়ে ধুপ, করে বসে পড়লুম। হোক শ্যামবাজারের বাস, এই স্তব্ধ মড়ার মুল্লুক থেকে এখন তো সরে পড়ি, শ্যামবাজার থেকে বাগবাজার পায়ে হেঁটে যেতে এমন বিশেষ দেরি লাগবে না!
কিন্তু কেন জানি না, বাসের ভিতরে ঢুকেই আমার বোধ হল আমি যেন এক জগৎ ছেড়ে আর এক অচেনা জগতের ভিতরে প্রবেশ করলুম! বাস ছুটছে, তার ভেঁপু বাজছে। এত বেগে বাস ছুটছে, তার জানালাগুলো সব খোলা রয়েছে, অথচ বাহির থেকে বাতাসের একটু- খানি ঝলক পর্যন্ত আমার গায়ে লাগছে না। ভারি অবাক হয়ে গেলুম। আমার জ্বর কি এত বেশি উঠেছে যে দেহের অনুভব করবার ক্ষমতাটুকুও আর নেই?
পথ তেমনি নির্জন আর নিঃসাড়। কিন্তু বাতাসও কি আজ ঘুমিয়ে পড়েছে? আমার খালি মনে হতে লাগল, দমবন্ধ হয়ে সারা পৃথিবী আজ মারা পড়েছে—তার কোথাও আর জীবনের লক্ষণ নেই। বেঁচে আছি খালি আমি ও এই বাসের ড্রাইভার আর কণ্ডাক্টর।
আমরা তিনজন ছাড়া বাসের ভিতরেও কোন আরোহী ছিল না ৷ থাকবেই বা কেন? এত রাতে কার ঘাড়ে ভূত চাপবে যে বাসে চড়ে বেড়াতে বেরুবে!
বাসের ভেঁপু বাজছে আর বাজছে আর বাজছে! কান যে ঝালা- পালা হয়ে গেল! কণ্ডাক্টারের দিকে ফিরে বিরক্ত স্বরে বললুম, “ড্রাইভারকে বারণ করে দাও। পথে লোকও নেই,তবু এত ‘হৰ্ণ’ বাজছে কেন?”
লোকটা শিখ। মস্ত-বড় লম্বা দেহ, মস্ত-বড় দাড়ি। সে কালা আর বোবার মতো আমার পানে তাকিয়ে রইল!
আবার বললুম, “শুনচ? ‘হর্ণ’ দিতে বারণ কর।”
সে তবু জবাব দিলে না, ড্রাইভারকে হর্ণ থামাতেও বললে না। লোকটা সত্যি-সত্যিই কালা ও বোবা নাকি? কিন্তু না,।তাই বা হবে কি করে? এই খানিক আগেই তো সে “ধর্মতলা, ওয়েলেসলি, শ্যামবাজার” বলে চেঁচিয়ে পাড়া মাত করছিল।
সে বোধ হয় আমার কথার জবাব দিতে চায় না। এরা কি ভেবেছে যে এদের ভেঁপুর আওয়াজে সারা শহরের ঘুম ভেঙে যাবে, আর তাহলেই সবাই বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়ে ছুটে এসে বাসের প্যাসেঞ্জার হয়ে বসবে?
কিন্তু শহর জাগবার কোন লক্ষণ প্রকাশ করলে না। পথের আশেপাশে লেড়ি কুকুরগুলো আরাম করে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল, কিন্তু এই বাসের সাড়া পেয়েই তারা তাড়াতাড়ি উঠে, ল্যাজ পেটের তলায় ঢুকিয়ে পালাতে লাগল—মহা-ভয়ে কেঁউ কেঁউ করে কাঁদতে কাঁদতে। আজকে বাইরের জীবের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে কেবল ঐ কুকুরগুলোর কাছ থেকে, কিন্তু তারাও দেখা দিয়েই অদৃশ্য হচ্ছে।
কুকুরগুলো কেন আমাদের বাস দেখে পালাচ্ছে? মনের ভিতর কেবল এই প্রশ্নই জাগতে লাগল—কেন? কেন? কেন?
কণ্ডাক্টার কেন আমার কথার জবাব দিচ্ছে না—কেন? কেন? কেন?
ড্রাইভার কেন ক্রমাগত ভেঁপু বাজাচ্ছে?—কেন? কেন? কেন?
কণ্ডাক্টারের দিকে ফিরে বললুম, “তোমার ভাড়ার পয়সা নাও।” সে মস্ত একখানা কালে৷ হাত বাড়ালে। ভাড়া দিয়ে টিকিট নেবার সময়ে আমার হাতে তার হাতের ছোঁয়া লাগল—উঃ, অমনি মনে হলো কে যেন একখানা তীক্ষ্ণ বরফের ছুরি দিয়ে আমার হাতে খ্যাচ করে খোঁচা মারলে! জ্যান্ত মানুষের হাত এমন ঠাণ্ডা-কনকনে হয়!
আশ্চর্য হয়ে তার মুখের পানে তাকালুম। তার লম্বা চুল আর দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ভরা মুখখানা বাসি মড়ার মতো স্থির। তার চোখেও পলক পড়ছে না। তার চোখ যেন পাথরে গড়া ৷

আমার বুকটা গুড়গুড় করতে লাগল। আজকের শহরের এই নির্জনতা, পৃথিবীর এই নিঃশব্দতা, বাতাসের এই অভাব, ভাড়াটে বাসের এই ভেঁপুর আওয়াজ, কণ্ডাক্টারের এই উদাসীন মূর্তি সমস্তই যেন রহস্যময়, সমস্তই যেন অস্বাভাবিক!
কী কুক্ষণেই আজ বাড়ির বাইরে পা দিয়েছি!
যতবার ফিরে তাকাই, ততবারই কণ্ডাক্টারের সেই মড়ার মতো স্থির মুখ আর পলক-হারা পাথুরে দৃষ্টি চোখে পড়ে! কেমন একটা অমানুষিকভাবে আমার মনটা ছেয়ে গেল—আর সহ্য করতে পারলুম না—সামনের বেঞ্চের উপরে, দুই হাতের ভিতরে মাথা রেখে চোখ মুদে আমি চুপ করে বসে রইলুম। ভাবলুম, শ্যামবাজারে পৌঁছবার আগে আর মাথা তুলে চাইব না!
কিন্তু মাথা তুলতে হলো—আবার চোখ খুলতেও হলো।
আধ ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেছে, গাড়িও না থেমে ক্রমাগত ছুটছে, তবু এখনো শ্যামবাজার এল না কেন?
মুখ তুলে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আমার আর বিস্ময়ের সীম৷ রইল না। শ্যামবাজার তো অনেক দূরের কথা, গাড়ি এখনো ভবানী- পুরেই আসে নি! অথচ গাড়ি এত বেগে ছুটছে, যে, পথের দু-পাশের বাড়িগুলো তীরের মতন পিছনে সরে সরে যাচ্ছে! এও কি সম্ভব?
হতভম্বের মতন মুখ ফিরিয়েই দেখি, গাড়ির ভিতরে দশ বারোজন লোক বসে রয়েছে! নিজের চোখকেও আমি আর বিশ্বাস করতে পারলুম না!
আমি হলপ করে বলতে পারি, এতক্ষণের ভিতরে গাড়ি একবারও থামে নি, তবু কোত্থেকে এরা এল, কখন এরা গাড়িতে উঠল?
একে একে সকলকার মুখের পানেই তাকিয়ে দেখলুম, সব মুখই মড়ার মতন স্থির, নির্বিকার, সব চোখের পাথুরে দৃষ্টিই আড়ষ্ট হয়ে আছে! কে যেন শ্মশান থেকে কয়েকটা মৃতদেহ তুলে নিয়ে এসে বেঞ্চের উপরে সারি সারি বসিয়ে দিয়ে গেছে!
তাদের ভিতরে বাঙালী আছে, খোট্টা আছে, সাহেব আছে। কিন্তু তারা সবাই চেয়ে আছে আমার দিকেই। সে চাউনিতে কোন ভাবের আমেজ নেই, সে চাউনি যেন চাউনিই নয়—অথচ সে চাউনি দেখলেই গা ছমছম করে, দেহের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তাদের চাউনি যেন চোখের ভিতর দিয়ে আসছে না—আসছে আলোকের ওপার থেকে, অন্ধকারের আত্মার ভিতর থেকে, যে দেশে জ্যান্ত মানুষ নেই, সেই দেশ থেকে! ভাবহীন অথচ ভয়ানক তাদের সেই চাউনি!
আর এক আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, গাড়ির ঝাঁকুনিতেও তাদের কারুর দেহ একটুও নড়ছে না! গাড়ির ভিতরে বসেও তাদের দেহ যেন গাড়িকে না ছুঁয়ে শূন্যে বিরাজ করছে! মনে হতে লাগল আমার অজ্ঞাতসারে যেমন হঠাৎ তারা গাড়ির ভিতরে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, তেমনি হঠাৎ তারা আবার হাওয়া হয়ে হাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে যেতে পারে, আমার অজান্তেই। যেন তারা ছায়ার কায়াহীন অনুচর দেখা দেয়, ধরা দেয় না। তাদের দেখা যায়, ধরা যায় না।
আমার সভয় দৃষ্টি আবার পথের দিকে ফিরিয়ে নিলুম। গাড়ি তেমনি হেঁচকি তোলা আওয়াজের মতন ভেঁপুর শব্দ করতে করতে তীর- বেগে ছুটছে—কিন্তু তখনো ভবানীপুর আসে নি! আমি শ্যামবাজার না সোজা যমালয়ের দিকে চলেছি?
কি এক দুঃসহ অজানা টানে অস্থির হয়ে চোখ আবার গাড়ির ভিতরে ফেরালুম! গাড়িতে ইতিমধ্যে লোকের সংখ্যা আরো বেড়ে উঠেছে—তারাও স্থির নেত্রে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে!
সমস্ত গাড়ির ভিতরে একটা বোঁটকা গন্ধ ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে—
যেন বাসি-মড়ার গন্ধ। হাসপাতালের মড়ার ঘরে গিয়ে আমি একবার এই রকম গন্ধই পেয়েছিলুম!
আমার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিলে, বুকের কাছটা শিউরে শিউরে উঠতে লাগল।—আমি কি জেগে আছি, না স্বপ্ন দেখছি?
আর থাকতে না পেরে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে বললুম, “এই কণ্ডাক্টার গাড়ি বাঁধো!”
কণ্ডাক্টার কোনো সাড়া দিলে না, গাড়ি থামাবারও চেষ্টা করলে না। আবার বললুম, কিন্তু কোনো ফল হলো না।
গেলুম রেগে দাঁড়িয়ে উঠে কণ্ডাক্টারের দেহ ধরে আমি নাড়া দিতে —কিন্তু তাকে ছুঁতেও পারলুম না! চোখের সামনে তাকে স্পষ্ট দেখতে পারছি, কিন্তু তাকে স্পর্শ করতে পারছি না, সে দেহ যেন হাওয়া দিয়ে তৈরি।
হঠাৎ গাড়ির সব লোক একসঙ্গে অট্টহাস্য শুরু করে দিলে! সে অদ্ভুত বীভৎস হাসি আসছে, যেন অনেকদূর থেকে, অনেক আকাশ- ভেদ করে, অনেক সমুদ্র-পাহাড়-প্রান্তর পার হয়ে, অনেক নরকের অন্ধকারে ডুব দিয়ে — অথচ তার আওয়াজ এত স্পষ্ট যে, আমার কান ফেটে যাবার মতো হলো!
আমি পাগলের মতন চিৎকার করে বললুম, “গাড়ি থামাও, জলদি গাড়ি থামাও—এই—ড্রাইভার!”—গাড়ি-থামানো-ঘণ্টার দড়ি ধরে আমি ঘন ঘন নাড়তে থাকলুম!
ড্রাইভার এতক্ষণ পরে আমার দিকে মুখ ফেরালে — সে মুখে এক তিলও মাংস নেই, সে মুখ সাদা ধবধবে হাড়ের মুখ—নাক-চোখের জায়গায় তিন-তিনটে গর্ত, দু-ঠোঁটের জায়গায় দু-সারি দাঁত বেরিয়ে আছে।
এতক্ষণ তবে এই পোশাক-পরা কঙ্কালটাই গাড়ি চালিয়ে আসছে?
গাড়ির ভিতরে অট্টহাসির আওয়াজ আরো বেড়ে উঠল!
আর সইতে পারলুম না—সেই ভীষণ অট্টহাসি শুনতে শুনতে আমি একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেলুম।
জ্ঞান হলে দেখলুম, নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে আছি, আমার চারপাশে বসে মা, বাবা, ভাই আর বোনেরা।
শুনলুম, আমি নাকি রসা রোডের ফুটপাতের উপরে জ্বরের ঘোরে বেহুশ হয়ে শুয়েছিলুম।
কালকের রাতের বিভীষিকার কথা সকলকে বললুম।
বাবা বললেন, “ও-সব বাজে কথা। জ্বরের ঝোঁকে লেকের ধার থেকে রসা রোড পর্যন্ত এসেই তুমি বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলে। তারপর ঐ-সব খেয়াল দেখেছ।”
কিন্তু আমার মন বলতে লাগল—না, না, আমি যা দেখেছি তা খেয়াল নয়, খেয়াল নয়!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন